Search

Loading...

Sunday, October 26, 2014

পারিজাত!

রিমাকে নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলাম [১] ওখানে এটা উল্লেখ করা হয়নি পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে কেবল এর পক্ষে হাঁটাই যে অসম্ভব এটুকুই না, এর বুদ্ধির বিকাশও হয়নি! যাদেরকে আমার ভাষায় বলি, ‘ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান, ভালবাসার সন্তান’।

এই মেয়েটির জন্য দুইজন সহৃদয় মানুষ মমতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। এঁদেরকে বিস্তর অনুরোধ করেও নাম লেখার অনুমতি পাওয়া গেল না। এই মানুষদের প্রতি কেমন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয় আমি জানি না, জানা থাকলে ভাল হতো।
যাই হোক, এই দুজন মানুষের অপার মমতার কারণে রিমার জন্য এখানে-ওখানে যাওয়ার এক স্বাধীনতা চলে এলো। আধুনিক মানুষরা যার নাম দিয়েছে, হুইলচেয়ার। এঁদের কল্যাণে কেবল যে একটা চকচকে হুইলচেয়ারের ব্যবস্থাই হলো না, এই টাকায় রিমার জন্য দিব্যি হয়ে যায় কাপড়, খেলনা, রঙ করার পেন্সিল হাবিজাবি এটা-সেটা।
বারবার আমি যেটা বলি, আমি চোখে যে দৃশ্যগুলো দেখি এটা অন্যদেরকে দেখাই কেমন করে? এই দূর্লভ মুহূর্ত দেখাতে যে বড়ো সাধ জাগে। কিন্তু আহা, সেটা অতি সামান্যতমও ধরে রাখার ক্ষমতা ক্যামেরা নামের যন্ত্রের কোথায়?
রিমা নামের মেয়েটিকে হুইলচেয়ারে তার মা বসিয়ে দেওয়ার পর মনে হলো আমি যেন দেখছি পারিজাত-স্বর্গের একটা ফুলকে! তার কথা না-বলতে পারার ক্ষমতা যেটা পুষিয়ে দেওয়া হয়েছে তার হাসি দিয়ে। তার এই উচ্ছ্বাস, অতল আনন্দ কোন নিতল থেকে উঠে আসে কে জানে...!

১. মমতার দাবী...: http://www.ali-mahmed.com/2014/10/blog-post_22.html 

Friday, October 24, 2014

রক্তের দাগ শুকিয়ে যায়, মুছে যায় না।

গতকাল গোলাম আযমের মৃত্যু হয়েছে। অনেকের মধ্যে এক ধরনের হাহাকার কাজ করেছিল, কেন তার মৃত্যুদন্ড হয়নি। আদালত বয়সের কারণে তাকে মৃত্যুদন্ড না-দিয়ে ৯০ বছরের কারাদন্ড দেন। এই রায় নিয়ে আমার নিজেরও অমত আছে। যদি এমন হত তার কৃত অপরাধগুলো মৃত্যুদন্ড পাওয়ার উপযুক্ত না তাহলে বিষয়টা ভিন্ন ছিল। কিন্তু এখানে তার বয়সটা বিবেচ্য হয়েছে। এমনিতে আমাদের দেশে একজন বয়স্ক মানুষ মৃত্যুদন্ড পাওয়ার মত জঘণ্য অপরাধ করলেও তিনি কী পার পেয়ে যাবেন? এটাই যদি আইনের কথা হয় তাহলে তো আর কথা চলে না।

গোলাম আযম অপরাধী হিসাবে দন্ডিত হওয়ার পর ১১০০ দিন কারাগারের পরিবর্তে হাসপাতালে কাটিয়েছেন। তিনি এমন কী অসুখে ভুগছিলেন যে তাকে ১১০০ দিনই হাসপাতালে রাখতে হলো? অন্য কয়েদির বেলায়ও কী এমনটাই ঘটে বা ঘটবে? উত্তরটা না-হয়ে থাকলে এখানে আইনের প্রয়োগে তারতম্য হয়েছে এমনটাই প্রতীয়মান হয়। এও এক ধরনের অন্যায়। আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা! এমন ব্যবস্থা একটা জাতির জন্য বাজে একটা উদাহরণ হিসাবে রয়ে গেল। 

অবশ্য গোলাম আযম মৃত্যুবরণ করেছেন একজন অপরাধী হিসাবে এটাও কিন্তু কম না। আমি যেটা বারবার বলি, রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না। এটাও একটা স্বস্তির কারণ মৃত্যুর পূর্বেই গোলাম আজম নিরপরাধ রূপে পার পেয়ে যাননি। এটাও কিন্তু কম পাওয়া না। আমি এটাকে একটা বিজয় হিসাবেই দেখি।

আজ ২০১৪ সালে এসে যেটা অতি সহজ মনে হয়, পূর্বে এতোটা সহজ কিন্তু ছিল না। ২০০৫-৬ সালের কথা বলি। তখন আমরা যারা ওয়েব সাইটে লেখালেখি করতাম তাদের কাছে বিষয়টা অতি দুরূহ ছিল। এক সময় তো দেখতে দেখতে কৃষিমন্ত্রী পরে শিল্পমন্ত্রী মতিউর নিজামীর গাড়িতে পতপত করে উড়তে শুরু করে আমাদের জাতীয় পতাকা! এদিকে তখন ওয়েবে এই সংক্রান্ত তেমন কোনও তথ্যই নেই। বিশেষ করে বাংলায়। হাতের নাগালে উল্লেখযোগ্য বই-পুস্তকও নেই। যাও আছে আগুনদাম, থাকলেও এর-ওর কাছে ছাড়া-ছাড়া ভাবে। যার কাছে যেটা আছে সেটা নিয়েই অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে লেখা শুরু করলেন।

তখন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দলিল আমার মত সাধারণ মানুষদের কাছে সহজলভ্য ছিল না। একটা লাইব্রেরিতে পাওয়া গেল জরাজীর্ণ অবস্থায়, পাতাগুলো ঝুরঝুরে! আমার মনে আছে, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দলিল তখন ১৫০০০ হাজার পৃষ্ঠা ফটোকপি করেছিলাম। যেটা আমার কাছে এখনও আছে। তো, শুরু হলো ওখান থেকে এবং বিভিন্ন পেপার কাটিং স্ক্যান করে কপি-পেস্ট। লেখার-পর-লেখা।

সবাই যখন ঘুমুতে যায় আমি তখন বগলে করে একগাদা ফটোকপি নিয়ে আমার অফিসের কম্পিউটারের সামনে বসি। আহ, আমার সেই ‘জুতাখাওয়া’ কম্পিউটার (সেই কম্পিউটারকে কতবার চটি দিয়ে পিটিয়েছি তার ইয়াত্তা নাই, তবুও লাভ হয়নি!)! অথচ তখন লেখালেখির জন্য ৩৮৬ মেশিনকে ৪৮৬ মেশিনে আপগ্রেড করেছি কারণ ৩৮৬ মেশিনটা কেমন দুর্ধর্ষ ছিল খানিকটা বলি, ওটার হার্ড ডিস্ক ছিল ১০০ মেগাবাইটের! তাছাড়া ইন্টারনেট কানেকশনও অফিসে। টিএনটির ডায়াল-আপ লাইন। ধীর গতি কাহাকে বলে কত প্রকার ও কি কি! কখনও কম্পিউটার ঘুমিয়ে পড়ে কখনও-বা আমি।

কখন যে ভোর হয় তার হিসাব কে রাখে! কালে কালে হয়ে গেলাম ‘নিশাচর ড্রাকুলা’। প্রায়শ আমার মা ক্ষেপে গিয়ে বলতেন, ‘তুই আমার বাড়ি থিক্যা বাইর হ’। ভদ্রমহিলার হাজবেন্ডের বাড়ি বের করে দিলে তাঁকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। তাই আমি সুবোধ বালকের মত মাথা নেড়ে বলতাম, আচ্ছা, আর রাত হবে না। কীসের কী, তিনি ঘুমিয়ে পড়ামাত্র আমি যথারীতি যেই কে সেই! ‘নিশাচর ড্রাকুলা’!

সেই সময় খুব চালু একটা প্রতিরোধ ছিল। গোলাম আজমকে যে আপনারা অপরাধী বলছেন প্রমাণ কি, কেউ কি দেখেছে? তখন ২০০৬ সালে আমার অনেক লেখার একটা ছিল, ‘গোলাম আযমের চোখে, মুক্তিযুদ্ধ’ [১]
সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল গোলাম আযম ১৯৭১ সালে বলেছিলেন, “...বাংলাদেশ নামের কিছু হলে আমি আত্মহত্যা করবো...”
নিয়তির এ এক চরম পরিহাস, সেই গোলাম আযমকে মৃত্যুবরণ করতে হলো বংলাদেশে! এবং তিনি কখনই তার কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করেননি বা এই দেশের কাছে ক্ষমা চাননি। তাতে কিছুই যায় আসে না। রক্তের দাগ শুকিয়ে যায় কিন্তু মুছে যায় না। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এটা সত্য কিন্তু তিনি যে একজন অপরাধী ছিলেন এটা রাবার দিয়ে ঘসে মুছে ফেলা যাবে না।

১. http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_29.html

Thursday, October 23, 2014

নিছক দুর্ঘটনা।

এতটা কাল আমরা জেনে এসেছি লিমন এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী! অনেকটা এমনই মনে হয়েছিল তখন, প্রশাসনযন্ত্র, দেশের সমস্ত অস্ত্র লিমনের দিকে তাক করা। এমন একজন শক্তিশালী মানুষকে সমীহ না-করার কোনও কারণ দেখি না। তাই আমি এক লেখায় লিখেছিলাম, ‘কদমবুসি করার জন্য লিমনের এক পা-ই যথেষ্ঠ' [১]!

সম্প্রতি মাননীয় আদালত সব ধরনের অভিযোগ থেকে লিমনকে অব্যহতি দেন। আজ পত্রিকায় পড়ছি, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, “সাড়ে তিন বছর আগে লিমনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষযটি ছিল ‘নিছক দুর্ঘটনা’। ...একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে এই অ্যাক্সিডেন্টটি হয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে গুলিটি লিমনের পায়ে লেগে যায়। এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা”। (বিডিনিউজ এর বরাত দিয়ে এটা উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ প্রতিদিন ২৩ অক্টোবর, ২০১৪)

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই যে তিনি স্বীকার করেছেন লিমনের পায়ে যে র‌্যাব সদস্যরা গুলি করেছিল এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা। অবশ্য আমরা এই কুতর্কে যাব না যে মাননীয় আদালত লিমনকে অব্যাহতি দেওয়ার পর লিমনকে এখন আর সন্ত্রাসী বলার উপায় নেই। বললে সেটা আদালত অবমাননার আওতায় পড়ে।
মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতের মান রেখেছেন বলে তিনি একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন। ধন্যবাদপর্ব শেষ হলে আমি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সবিনয়ে জনতে চাই, বেশ-বেশ, এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা ছিল আমরা না-হয় আপনার সঙ্গে একমত হলুম। তবে...? সেটা হচ্ছে, কেউ কার্ও এক পা উড়িয়ে দিয়ে আহা, এটা তো দুর্ঘটনা বলে পার পেয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই। কেউ দুর্ঘটনাক্রমে কাউকে গাড়ি চাপা দিল বা ছাদ থেকে দুর্ঘটনাক্রমে নির্মাণসামগ্রী ফেলে কাউকে নীচ থেকে উপরে পাঠিয়ে দিল ব্যস, এটা নিছক দুর্ঘটনা বলে ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য দুর্ঘটনা ফ্রন্ট’।

তারপরও একটা কিন্তু, একটা কিন্তু রয়ে যায়! ভুলক্রমে গুলি করে লিটনের পা উড়িয়ে দেওয়ার পর র‌্যাব বুঝতে পারল এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা কিন্তু এরপর যে র‌্যাব লিটনকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে লিটনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে একটি অস্ত্র আইনে এবং অন্যটি সরকারী কাজে বাধা দেওয়ার জন্য। সাড়ে তিন বছর ধরে মামলা চলার পর আদালত গত বছর ২৯ জুলাই লিমনকে অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলা থেকে অব্যহতি দেন এবং এ বছর (২০১৪) ১৬ অক্টোবর সরকারী কাজে বাধা দেওয়ার জন্য দায়েরকৃত মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। এই যে দু-দুটি মামলা করেছিল র‌্যাব, সেটাও কী নিছক দুর্ঘটনা?

১. কদমবুসি করার জন্য লিমনের এক পা-ই যথেষ্ঠ : http://www.ali-mahmed.com/2011/05/blog-post_22.html