Tuesday, October 3, 2017

নায়ক নায়িকাগণ।

এই মানুষটাকে নিয়ে পূর্বে যে লেখাটা লিখেছিলাম [১], ‘এই মানুষটাকে নিয়ে বিপদে আছি’। বিপদ তো আর একা আসে না সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে আসে। এই মানুষটা যেখানে বসে থাকত, একনাগাড়ে একে ৩০ ঘন্টাও বসে থাকতে দেখেছি! বসা মানে বসা, নড়চড় নেই- কাউকে বিরক্ত করা নেই।

কিন্তু প্রভাবশালী এক ‘ভদ্দরনোক’ আপত্তি করলেন, আপত্তির ভঙ্গিটা খুবই আপত্তিকর। কিছুই করার নেই, এখন সবই এদের দখলে। যতদিন পর্যন্ত একটা ‘হোম’ না-করতে পারব ততদিন এদের তামাশা দেখা ব্যতীত আমার উপায় নেই। একে এখান থেকে সরাতে হবে, দ্রুত। কিন্তু কোথায়? খুব অস্থির লাগে।
ওহো, চুলবুল পান্ডেদের মুখ চুলচুল করছে বুঝি, আরে বাহে, আফনের ঘরে লয়া যান না। বললেই হয়! বাপুরে, আমিও তো নাগরিক মানুষদের একজন!


যাই হোক, মনে পড়ে আরে, স্কুল ঘরটা তো খালি। ওখানে একে রাখলে কারও কিচ্ছুটি বলার যো নেই। জরাজীর্ণ একটা ঘরে স্কুল। এটার দর্শনে অনেকের হাসি-কাশি মিশে একাকার হয়ে যাবে কিন্তু জরাজীর্ণ একটা ঘরও বিপদে কী কাজে লাগে এটা এখন হাড়ে হাড়ে বুঝি। (রেলওয়ের সম্প্রসারণের কারণে এই ঘরও এখন যায়-যায় অবস্থা)

ক-দিন ধরে এই মানুষটা এখানেই। সমস্যা একটাই, এ ঘরের ভেতরে থাকতে চায় না তবে বারান্দায় হলে সমস্যা নেই। আমরা আর এটা নিয়ে হুজ্জতে গেলাম না। বাপ, তোমার যেভাবে আরাম হয় সেভাবেই থাকো।
বরাবরের মতই অযাচিত সহায়তা করতে যে লোকগুলো এগিয়ে আসে এবারও তাই হল। এরা আমার মত ‘নেকাপড়া’ করা লোক না।
সুমন নামের যে ছেলেটা একে গোসল করিয়েছে গু-মুত পরিষ্কার করেছে, সেলুনে নিয়ে

চুল কাটিয়েছে এটা চোখে না-দেখলে বিশ্বাস হবে না। ওয়াল্লা, সুমনের সঙ্গে দেখলাম এর ভাল খাতির। এক পর্যায়ে দেখলাম চুকচুক করে চা-ও খাচ্ছে! ভাল-ভাল!


এর ভোলই দেখি পাল্টে গেছে।










আর চা দোকানদারের বউটা, এই মমতাময়ী তো দেখি মমতার ঝাঁপিটা উপুড় করে দেন। এদের পাশে কী ক্ষুদ্রই না মনে হয়, নিজেকে…!

সহায়ক সূত্র: 

Monday, September 25, 2017

বিপদ!



এই মানুষটাকে নিয়ে বড় বিপদে আছি। অতীতে এহেন সমস্যার সম্মুখিন যে হইনি এমন না কিন্তু এবারের বিষয়টা ভিন্ন!
আজ  ক-দিন ধরে একে দেখছি।এই মানুষটা কিছুই চেনে না। না খাবার, না পানি! এক জায়গায় একে আমি টানা সাত ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। পা ফুলে ঢোল তাতেও এর কোনও বিকার নেই। 

অতীতে এমন বাহ্যজ্ঞানহীন মানুষকে নিয়ে কাজ করার সুবাদে এটা বিলক্ষণ জানি শুকনো খাবারই ভরসা। কিন্তু শুকনো খাবার তো আর দিনের-পর-দিন বাথরুম আটকে রাখতে পারে না। কোন এক ফাঁকে লাগোয়া স্কুলের রাস্তার সামনে বাথরুম সারার কারণে স্কুলের দপ্তরি একে বেধড়ক পিটিয়েছে।
ওই দপ্তরি মানুষটার শাস্তির ব্যবস্থা করা গেছে, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আলোকিত প্রসঙ্গ হচ্ছে সেই দপ্তরি নামের মানুষটা তার ভুল বুঝতে পেরেছে। কেউ বলে দেয়নি কিন্তু এই মানুষটার কাছে নাকি ক্ষমা চেয়েছে। হায়, এই মানুষটা যে ক্ষমা করারও ঊর্ধ্বে! 

যাই হোক, এখানে প্রকট যে সমস্যাটা এই ক-দিনে এই মানুষটার মুখে একটা কথাও শুনিনি। একটা টুঁশব্দও না! অসহায় এই মানুষটার চেয়ে নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছে- মানুষটা স্বজনের কাছে ফেরত পাঠাবার কোনও উপায় নেই। কোথায় যাই কার কাছে যাই- এই মানুষটার একটা গতি হওয়া যে বড়ো প্রয়োজন। একটা মানুষ তার স্বজনের কাছ থেকে, তার শেকড়ের কাছ থেকে এমন করে হারিয়ে যাবে এটা কী করে হয়! 

টানেলের শেষ মাথায় কোথাও-না-কোথাও আলো থাকে, থাকতেই হয়। আমি আশাবাদী মানুষ- আমার এটা আশা করতে দোষ কি তার স্বজনের কেউ-না-কেউ তার ছবি দেখে জলভরা চোখে বুকে জাপটে ধরে তাকে তার শেকড়ের কাছে নিয়ে যাবে। এমন অসাধারণ একটা দৃশ্য কেবল কল্পনা করতেই অদেখা এক ভাললাগা পাক খেয়ে উঠে   

Wednesday, May 3, 2017

আপনার জন্য, কেবল আপনারই জন্য...।

আপনি আপনার ব্যক্তিগত কারণে স্কুলের জন্য আর টাকা পাঠাতে পারছেন না, এটার উত্তর লিখব-লিখব করে আর লেখা হয়ে উঠছে না- অমানুষ একটা, আমি, বুঝলেন!
ভাইরে, দেরিতে উত্তর লেখার জন্য সলাজে ক্ষমা চাচ্ছি্- হাঁটু ভেঙে। অন্তত দুঃখের একটা চিহ্ন :( লিখে দিয়েও দায় এড়াতে পারতাম- আসলে আপনাকে কেবল এক লাইনে লিখে দিলে বড়ো অন্যায় হয়।

যে মানুষটা বছরের-পর-বছর ধরে পরম মমতায় স্কুলের খরচ চালিয়ে গেছেন তাঁকে দু-চার লাইনে কেবল এটা লিখে দিলাম, ’ওকে বা না ভাই, কোনও সমস্যা নাই, আচ্ছা…’ বলে হাঁই তুললাম। এ হয় না। কিন্তু কী করব বলেন, এখন যে লিখতে বড়ো আলসেমী লাগে রে, ভাই।
আপনি হয়তো লক্ষ করেছেন কয়েক মাস ধরে কিছুই লেখা হয়ে উঠেনি! যে আমি এক রাতে ‘কনকপুরুষ’ নামে গোটা একটা উপন্যাস লিখে ফেলেছিলাম সেই আমার এক লাইনও লিখতে ইচ্ছা করে না, কী আজব যন্ত্রণা একটা! নষ্ট স্রোতের নষ্ট আঙ্গুল! আমার সম্ভবত আঙ্গুলে পচন ধরেছে। বলা হয়ে থাকে মানুষের পচন শুরু হয় মস্তিষ্ক থেকে আর লেখকের আঙ্গুল থেকে।

আচ্ছা থাকুক এইসব হাবিজাবি কথা…। এটা কিন্তু ঠিক আপনার সহৃদয়তা ব্যতীত সামনের দিনগুলোতে বিকট সমস্যা হবে কিন্তু আমি বিশ্বাস করি টানেলের কোথাও-না-কোথাও আলো থাকে, থাকতেই হয়; এর বিকল্প নেই। এই সংকটেরও একটা সমাধান হবে। নইলে এই ‘হতভাগা’ (!) বাচ্চাগুলোর গতি কী!
আচ্ছা বলেন তো এই দীর্ঘ সময় আপনার মমতার কথা কেমন করে বিস্মৃত হই! স্কুলের নাম করে আপনি যে টাকা পাঠাতেন কেবল কী স্কুলের খরচেরই যোগান হতো? ওখান থেকেই খানিকটা এদিক-ওদিক করে কত কিছুই না করা হতো। আপনি কখনও নাম প্রকাশ করার অনুমতি দেননি আজও আমি সেপথ মাড়ালাম না। কিন্তু আজ এই সব আপনার খানিকটা জানা প্রয়োজন।
ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই। এই ছেলেটার নাম আকাশ। বাহ, কী চমৎকার নাম, না? 
এক হাত এক পা নাই এই ছেলেটাকে যখন আমি স্টেশনে পাই তখন এ ভাত খাচ্ছিল।
নিরাপদ দুরত্বে থেকে এর খাওয়া দেখি। কিন্তু খাওয়া শেষ করে এই ছেলেটি যখন প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছিল তখন আমি কাতর হয়ে এর কাছে জানতে চাই, ‘তুমি ক্রাচ দিয়ে হাঁটতে পারো না’? ছেলেটি উদাস হয়ে বলে, ‘ক্রাচ পামু কই’?

আপনার পাঠানো স্কুলের টাকা থেকে কষ্টেসৃষ্টে বাঁচিয়ে কিছু ক্রাচ আমার কাছে সবসময়ই মজুত থাকে। তাই আমি অনায়াসেই তাকে বলি, ‘আচ্ছা, আমি তোমাকে ক্রাচ যোগাড় করে দেব’।
আপনি জেনে অবাক হবেন আকাশ নামের এই ছেলেটার কিন্তু এক জোড়া না কেবল একটাই ক্রাচেরই প্রয়োজন, যার দাম মাত্র দুশো টাকা! একজোড়া ক্রাচের দাম ৪০০ হলে একটার দাম তাই হয়। কিন্তু এখানেও খানিকটা গল্প আছে। আজ গল্পের ঝাঁপিটা খানিকটা উপুড় করে দেই। ঢাকা ব্যতীত ক্রাচ নামের এই জিনিসটা পাওয়া যায় না, ঢাকার আবার সব জায়গায় না। নির্দিষ্ট জায়গা থেকে কিনতে হয়। অথচ আমার তেমন-একটা ঢাকা যাওয়া পড়ে না- শেষ আমি ঢাকা গেছি বছর দুয়েক পূর্বে! তাহলে? উপায়!

আসলে এটা একটা টিম-ওয়র্ক, আমার ভূমিকা এখানে একেবারেই গৌণ। এখানে আমি কেউ না, কিছু না- মিছরির পুতুল। সব তো আপনারাই করে ফেলেন! যেমন একজন অ্যাম্বুলেন্সচালক আছেন। কালো-কালো মায়াভরা দুবলাপাতলা এই মানুষটাকে বলে দিলেই তিনি ঢাকা থেকে ক্রাচ নিয়ে আসেন। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যাওয়ার সময় যন্ত্রণাকাতর রোগী নিয়ে যান শুইয়ে আর আসার সময় শুয়ে থাকে ক্রাচ, চুপচাপ, পাশাপাশি। এখানে চারশো টাকায়ই হয়ে যায় বাড়তি কোনো টাকার প্রয়োজনই হয় না!

যাই হোক, টাকা না-পাঠাবার কারণে আপনি মনোকষ্টে ভুগবেন না অস্থির হবেন না, প্লিজ। আমি ঠিক-ঠিক কোনও-না-কোনও একটা উপায় বের করব। এবং এটাও আমার প্রবল বিশ্বাস, আমার মৃত্যুর পূর্বে একটা ‘হোম’ করে যাব, যাবই। স্কুল চালু করার পূর্বে এটাই আমার স্বপ্ন ছিল; আমি সেই স্বপ্নটা লালন করি, আজও, এখনও।
আফসোস, ছোট্ট করে হলেও একটা হোম চালু করার জন্য নামকরা কত মানুষের হাতেপায়ে ধরেছি কিন্তু ফল 'আ বিগ জিরো'। এখন ঠিক করেছি এই বিষয়ে কক্ষণও কারও কাছে আর কোনও সহায়তা চাইব না। শোনেন, কেবল আপনাকে চুপিচুপি বলি একতাল মাটি বেচে দেওয়ার তালে আছি চালবাজ লোকজনেরা যার নাম দিয়েছে সম্পত্তি! কাজটা হয়ে গেলে ইয়ালি বলে লাফিয়ে পড়ব।
video
কেবল মনে হয় এটা এই স্কুলে যে বাচ্চারা পড়ে এদের দু-পাতা পড়িয়ে কী লাভ? যখন এই স্কুলেই পড়ে এমন একটা উঠতি বয়সের মেয়েকে স্টেশনে ঘুমাতে হয়, অরক্ষিত। বা যখন এই ‘রাজিব’ নামের ছেলেটি অবলীলায় বলে, ’মা একদিকে বাইর হয়া গেল আর আমি একদিকে...,’ তখন এই 'দু-পাতা পড়া' এদের কী কাজে লাগবে?
এদের জন্য একটা হোম নামের আশ্রয়স্থল না-করে আমার কোনও উপায় নেই, বাহে।

এই গ্রহের যেখানেই থাকুন না কেন এই শিশুগুলোর ব্লেসিংস আপনাকে তাড়া করবে...। ভাল থাকুন, অনেক।