Loading...

Friday, May 24, 2013

বোতল-ব্যবসা এবং...!

[এই লেখাটা এখানে আগেও পোস্ট করা হয়েছে কিন্তু এর সঙ্গে আরও কিছু বিষয় জুড়ে দিতে হচ্ছে]
আগাম সতর্কতা: (অতি সূক্ষ রুচির লোকজনেরা, রুচিবাগীশ, যারা অল্পতেই  গা দোলান বা মনিটেরের পর্দা নড়লেই যাদের গা গুলায় তারা লেখাটা না-পড়লেই ভাল করবেন।)

পত্রিকার একটা খবর ছিল এমন, "ঢাকায় ৫৫ লক্ষ মানুষের জন্য ৪৫টি পাবলিক টয়লেট"
আমি অংকে বড়ো কাঁচা! তবুও একটা আঁক কষি, আনুমানিক ১ লক্ষ মানুষের জন্য প্রায় ১টা টয়লেট। ঢাকায় আমি যদি মূত্র-বিসর্জনের গোপন ইচ্ছা নিয়ে লাইনে দাঁড়াই তাহলে ক-দিন পর উক্ত কর্ম সম্পাদন করিতে পারিব? যারা অংকে ভাল তারা যদি দয়া করে আমাকে এই হিসাবটা করে দিতেন তাহলে সুবিধে হতো। কারণ ঢাকায় একবার মুত্রবিসর্জন করার জন্য আমাকে ক-দিন ঢাকায় থাকতে হবে সেই মতে আমার গাট্টি-বোঁচকা গোছাতাম আর কী!

ঢাকার মানুষেরা মূত্র বিসর্জন দেন কোথায় এই নিয়ে গভীর চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু সৈয়দ আবুল মকসুদের 'নরমূত্র' লেখাটা পড়ে খানিকটা ধারণা হয়েছিল ঢাকার লোকজনেরা কেমন বেতমিজ! উহারা নাকি প্রকাশ্যে রাস্তায় মূত্র বিসর্জন করে। রাম-রাম! ঢাকা শহরের 'লুকজন এতো 'খ্রাপ'! মকসুদ স্যারের শ্বেতশুভ্র বসনে 'নরমুত্র' লেগে গেলে উপায় আছে!
এ অন্যায়-এ অন্যায়! সৈয়দ আবুল মকসুদ স্যারের শ্বেতশুভ্র বসন বাঁচাতে গোটা ঢাকা শহর এই সাইনবোর্ড লাগিয়ে ভাসিয়ে দিতে হবে 'এখানে প্রস্রাব করিবেন না' নইলে যে ঢাকা শহর মূত্রে ভেসে যাবে! চুজ হেলথ অর টব্যাকো- এখন থেকে ঢাকায় ভাসবে হয় এমন সাইনবোর্ড যে 'এখানে মূত্রবিসর্জন করিবেন না'। সোজা কথা, ঢাকা ভাসবে এই সাইনবোর্ডে নইলে মূতে।

যাই হোক, অচিরেই ঢাকার লোকজন যদি বহুতল ভবনের ছাদে উঠে এই কর্ম করা শুরু করে দেন এতে অন্তত আমি অবাক হব না। ঢালিউডের বৃষ্টির একটা গতি হবে বটে কিন্তু মূত্রবৃষ্টিতে ভিজে এই সব দৃশ্য অবলোকন করে সূক্ষরূচির লোকজনের ব্লাডপ্রেসার বেড়ে গেলে এর দায় কার উপর বর্তাবে? নাহ, এ চলতে দেয়া যায় না। এর একটা উপায় বের না-করলে চলছে না আর।

ভাবছি... দেখো দিকি কান্ড, আজকাল আমার মত লোকজনেরা ভাবাও শুরু করে দিয়েছে! আচ্ছা, এই নিয়ে একটা ব্যবসা ফাঁদলে কেমন হয়? আরে না, পাবলিক টয়লেটের ব্যবসা না। লোকজন বেরুবার পর জিজ্ঞেস করতে হবে, ভাইজানের কি বড়োডা, না ছোডোটা? ওই ব্যাটা ফাঁকি দেতে চাইলে এই নিয়ে কিছু কায়দা-কানুন করে তাকে হাতেনাতে ধরতে হবে। ছ্যা-ছ্যাঁ!

চিন্তা করছে, এখন থেকে 'বঙ্গাল'-দের অভ্যাস খানিকটা বদলাবার চেষ্টা করতে হবে। এই যে এক হাতে বা বগলে পানির বোতল, এই 'কলচর'টা আর কদ্দিনের? ক-বছর হলো লোকজনেরা পানির বোতল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়? আমরা তো চাপাকলের মুখে মুখ লাগিয়েই পানি খেয়ে-খেয়েই বড়ো হলুম। কিন্তু এখন হাতে একটা পানির বোতল না-থাকলে কেমন ফাঁকা-ফাঁকা, নিজেকে কেমন অরক্ষিত-অরক্ষিত মনে হয়! অহেতুক গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়!
কালে কালে এটা একটা ভাবও হয়ে গেছে বটে। কোনো গোলটেবিল, ত্রিকোনা টেবিলের আলোচনায় পানির বোতল না-থাকলে আলোচনা আর জমেই উঠে না! শ্লা, 'মাম' তো মিনিস্টারের পানি হিসাবে খ্যাতি পেল!

যাগগে, আমার প্ল্যানটা হচ্ছে, এক হাতে পানির বোতল নাহয় থাকল কিন্তু অন্য হাত তো মুক্ত। ওই হাতে আরেকটা খালি বোতল ধরিয়ে দিলে অসুবিধা কোথায়, বাপু! কারও সূক্ষ রূচি আহত হলে বোতলের রঙ কালো করে দিলুম নাহয়! মনে হয় না বাংলাদেশের আইনে আটকাবে। আরে বাহে, যেখানে নিষেধ থাকার পরও আমাদের মিনিস্টার সাহেবরা গাড়িতে কালো কাঁচ ব্যবহার করেন সেখানে 'নরমূত্রবোতল' কালো হলে পুলিশ লাঠি মেরে মাথা বা বোতল ফাটাবে এটা অন্তত আমি বিশ্বাস করি না। আর কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর পুলিশ 'নরমূত্রবোতল' বাজেয়াপ্ত করলে চাইলে তাদের সঙ্গে হুজ্জতে যাওয়ার প্রয়োজন কী, বাপু; 'নরমূত্রবোতল'-টা দিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।
যাই হোক, তাহলে আর মুত্র বিসর্জন নিয়ে বাড়তি কোনো চাপ নেই। ঢাকাবাসী গাড়িতে থাকুক বা খেলার মাঠে, পার্কে, ফেসবুকে মুত্র বিসর্জনে আটকাচ্ছে কে!

আরেকটা জরুরি বিষয়। কেবল সরকারকে গালি দিয়ে লাভ নাই। আমরা নিজেরা কী! কলা খেয়ে রাস্তায় কলার খোসা ফেলি, বাড়ির সমস্ত আবর্জনা ফেলি। আবার এই আমরাই রাস্তা নোংরা কেন এই নিয়ে সরকার, মেয়রের ফরটিনথ জেনেরেশনের বাপ-বাপান্ত করি!
আমি বিস্মিত হয়ে লক্ষ করি, আমাদের দেশে কোটি টাকা খরচ করে ঝাঁ চকচকে একটা মার্কেট করবে কিন্তু একটা টয়লেট রাখবে না। খোদা-না-খাস্তা টয়লেট থাকলেও তা থাকবে তালাবদ্ধ।

এ আমার বড়ো দূর্ভাগ্য, ড্রেনটা রাস্তার মাঝখানে চলে আসে, বিনা নোটিশে। এই বিষয়ে আমার বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। স্টেশনের ওয়েটিং রুমের ওয়শরুম যথারীতি তালাবদ্ধ। আমি অনেক যন্ত্রণা করে স্টেশন মাস্টারকে খুঁজে বের করলাম। বাড়িয়ে বলছি না, ঠিক এই বাক্যটাই বলেছিলাম, 'আপনার বাড়িতে চলেন, আমি পেসাব করব'।
তিনি চোখ লাল-টাল করলেন, তাতে আমার বয়েই গেছে। পরে যেটা বললেন, বদনা নাকি চুরি হয়ে যায়। শোনো কথা, একটা প্লাস্টিকের বদনা চুরি হয়ে যায় এই অজুহাতে টয়লেটে তালা সেরে রাখবেন!

একবার হলো কি, গ্রামে ঘুরছি। ব্লাডার খালি করা আবশ্যক। গেলাম এক মসজিদের এস্তেঞ্জাখানায়। কাজ সেরে ফিরে এসেই পড়লাম বাঘের মুখে! আমার জিন্স, লেবাস দেখে ইমাম সাহেব ভারী গলায় বললেন, 'আপনে কি ওখন নোয়াজ পরবেন'।
আমি অমায়িক ভঙ্গিকে বললাম, 'জ্বে না, আমি একজন মুসাফির মানুষ। এখনই চলে যাব'।
তিনি এবার বললেন, 'এইটা মুসুল্লিদের জন্য, সবার জন্য না'।
আমি শুরু করলাম, 'আচ্ছা হুজুর, আপনে কি জানেন, একবার এক বদু মসজিদের কোনায় বসে পেসাব করছিল। নবীজী তখন বয়ান করছিলেন। সাহাবিরা ক্ষেপে গেলেন, পারলে গলা কেটে ফেলেন। কিন্তু নবীজী পেসাবে বাঁধা না-দেওয়ার জন্য নিষেধ করলেন। পরে বদুকে বুঝিয়ে দিলেন। বদু তার ভুল বুঝতে পারল। পরে তিনি নিজেই সেই পেসাব পানি এনে পরিষ্কার করলেন।...তা নবীজী যেখানে এই রকম মায়া দেখিয়েছেন সেখানে আপনি এমন কঠিন আচরণ করছেন কেন। কাজটা কি ঠিক, হুজুর...'।

আরেকবার। এটা ঢাকার ঘটনা। নামকরা এক ফোন কোম্পানির সার্ভিসিং সেন্টার। 'পশ' একটা অফিস। ওয়ারেন্টি ছিল তাই আমার ফোন সার্ভিসিং করাতে এসেছি। আমি এদের জিজ্ঞেস করলাম, 'আমি একটু...'।
এরা বললেন, 'সরি স্যার, আমাদের এখানে তো ওয়শরুম নাই'।
আমি চিন্তা করলাম, এরা তো সারাদিনই অফিসে থাকে তাহলে ব্যাটারা যায় কোথায়? এটাই যখন জিজ্ঞেস করলাম তখন আমাকে জানালো, স্টাফদের জন্য আলাদা ওয়শরুম আছে।
এবার আমি অসহ্য, অদম্য রাগ সামলে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম। হঠাৎ করেই শান্ত গলায় বললাম, 'ইয়ে, আচ্ছা, আপনাদের ছাদে যাওয়া যায়'?
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, 'যায় তো, এভাবে গেলেই যেতে পারবেন। কিন্তু কেন?
আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, 'মুতব'।

এই হচ্ছে আমার নিয়তি, এই 'মুতামুতি' নিয়ে একটা-না-একটা ঝামেলা বাঁধবেই, কপালের ফের। ... 
...
অন্যত্র এই লেখাটা দেওয়ার পর একজন রসিকতা করে মন্তব্য করলেন, মেয়েদের বেলায় কী হবে? এর উত্তরে আমি লিখেছিলাম:
"লেখাটা আসলে আমি লিখেছিলাম ফান করে। কিন্তু বিষয়টা আসলে ফানের না। এ এক অন্যায়, ভযাবহ অন্যায়- মানুষের শারীরিক কষ্ট! আমরা জাতি হিসাবে বড়ো অভাগা, এই সমস্ত ছোট-ছোট অথচ ভয়ানক বিষয়গুলোর সমাধান দূরের কথা, ভাবতেও চাই না।

আমার ধারণা, এই দেশের অধিকাংশ নারী ইউরিন ইনফেকশনে ভোগেন কেবল ওয়শরুমের স্বল্পতার কারণে। আমি ডাক্তার নই বলে বলতে পারছি না এই যে দিনের-পর-দিন, বছরের-পর-বছর, যুগের-পর যুগ ধরে ইউরিন ইনফেকশনে ভোগার কারণে একজন নারীর উপর কতটা প্রভাব ফেলে?
আমি এও অনুমান করি, ঝামেলা এড়াবার ভয়ে অনেক নারী পর্যাপ্ত পানিও পান করেন না! তাঁর কিডনি বা অন্যান্য উপসর্গের কারণে তার উপর এর কতটুকু প্রভাব পড়ে, এই নিয়ে ভাবার সময় কোথায় আমাদের! কারণ আমাদের সব ধরনের চেষ্টা থাকে কেমন করে এই জাতিকে একটা বিকলাঙ্গ জাতি হিসাবে পরিণত করা যায়...।"

Thursday, May 23, 2013

জিয়া-মঞ্জুর-এরশাদ

"...(জেনারেল মঞ্জুর ছিলেন গরম মেজাজের লোক! ১৯৭১ সাল। তখন তিনি একজন মেজর। তৎকালীন মেজর আবু তাহের এবং জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে ভারত যাচ্ছিলেন।)
...ভারতীয় সরকারের একজন অফিসার মঞ্জুর এবং সঙ্গীদের অভ্যর্থনা জানান এবং ট্রেনে তুলে দেন। ট্রেনে থালায় করে যে খাবার পরিবেশন করা হয় মজ্ঞুর সে খাবারের থালা হাতে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলেন এবং তার চাহিদামত খাবার পরিবেশন করতে বাধ্য করেন। যে কারণে ট্রেনটির বিলম্বে যাত্রা করেছিল।..."

"...জেনারেলর শফিউল্লাহ শাফায়েত জামিলকে ফোন করলেন। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে জেনারেল শফিউল্লাহ [*] জামিলকে জানান, 'শেখ মুজিব আর বেঁচে নেই'। এমনকী সেনাবাহিনীর প্রধান, শাফায়েত জামিলকে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশটি পর্যন্ত দিলেন না!
...এরপর শাফায়েত জামিল, জেনারেল জিয়ার বাসায় হাজির হলেন। তিনি দেখলেন, জেনারেল জিয়া দাঁড়ি কামাচ্ছেন। জামিল জিয়াকে বললেন, 'স্যার প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড। এখন আমার করণীয় কী'?
জিয়াকে তখন অত্যন্ত শান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি উত্তর দিলেন, 'প্রেসিডেন্ট যদি বেঁচে না-থাকেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট তো আছেন...'।..."

"...চার নেতাকে জেলে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর। তিনজন সুপ্রিম কোর্টের জজকে নিয়ে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু জেনারেলর জিয়া তাঁর শাসনামলে এই তদন্ত কমিশনকে কাজ করতে দেননি, সুতরা এই কমিশনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। এই ঘটনাটি জেনারেল জিয়ার স্মৃতিকে কলঙ্কিত করে রাখবে।..."
(বাংলাদেশ: 'আ লিগেসি অভ ব্লাড'/ অ্যান্থনি মাসকারেনহাস)।

মেজর রেজাউল করিম চট্টগ্রামে সেনাবিদ্রোহ মামলার ১০ বছর সাজাভোগী। আনোয়ার কবির তাঁর এক সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন। মেজর রেজাউল অকপটে বলেন:
"...আমি ঘুমাচ্ছিলাম। আমার রানার খুব ভোরে আমাকে জাগায়। ...কর্নেল মতিউর রহমান আমাকে বললেন, 'সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমানের ডেডবডি আছে। ডেডবডি পাহাড় এলাকায় নিয়ে যাবে। নিয়ে কোথাও কবর দিয়ে আসবে'।
আমি সরাসরি না বলে বললাম, 'স্যার, আমাকে অন্য কাজ দিন,। কর্নেল আমার উপর চটে গেলেন।

...(মঞ্জুরের নির্দেশে লে. কর্নেল মতি জিয়ার শরীর ঝাঁঝড়া করে ফেলেন) অফিস বারান্দায় মঞ্জুর পায়চারী করছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, 'রাতের কিলিংয়ে তুমিও কি সার্কিট হাউজে গিয়েছিলে'?
আমি বললাম, 'না স্যার, আমি বাসায় ঘুমাচ্ছিলাম'।
তখন তিনি আমাকে বললেন, 'ওদের তো মাথা গরম, তোমার মাথা তাহলে ঠান্ডা আছে। এখন থেকে তুমি আমার চিফ সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করবে, ওকে'।
আমি বললাম, 'রাইট স্যার'।
এরপর আমি জেনারেল মজ্ঞুরের সব কাজ তদারকি শুরু করি। এক পর্যায়ে ঢাকা থেকে ফোন আসল, জেনারেল মঞ্জুর ফোনে কথা বললেন। জেনারেল মঞ্জুরকে বারবার অনুরোধ করা হচ্ছিল জেনারেল এরশাদের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু মঞ্জুর বললেন, '...Bloody Ershad, i cannot talk to him. He is a thief, he is a corrupt person'.

শেষপর্যন্ত তিনি এরশাদের সঙ্গে কথা বলেননি। এটাই ছিল তার কফিনে শেষ পেরেক। কারণ এরশাদ এরপরই সরাসরি জিয়ার মৃত্যুর জন্য মঞ্জুরকে অভিযুক্ত করে সব ধরনের কলকাঠি নাড়া শুরু করলেন। টিভি-রেডিওতে বারবার ঘোষণা আসতে লাগল, চট্টগ্রামের সবাইকে বলা হলো বিদ্রোহী এবং যারা পক্ষ ত্যাগ করবে তাদেরকে ক্ষমা করা হবে এবং তাদেরকে কুমিল্লা ক্যান্টম্যান্টে যোগ দেওয়ার জন্য বলা হলো্।

...আমার (রেজাউল করিম) স্ত্রী বলল, 'চলো, আমরা কুমিল্লায় যাই। আমি তাকে বললাম, 'দেখো, আমি জিওসির নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি। এটাই আমার ডিউটি। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না'। আমি স্ত্রী চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। আমি তার হাত ছাড়িয়ে বাসা থেকে বের হয়ে এলাম।

...জেনারেল মঞ্জুর ক্যান্টনম্যান্ট ছেড়ে হাটহাজারির দিকে রওয়ানা দিলেন। পরে...বললেন, 'নো, আমি স্কেপ করব না। আমি সেরেন্ডার করব'। আমাকে বললেন, 'রেজা, তুমি পালাও'।
আমি বললাম, 'স্যার, আমি তো আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি। আপনি না-গেলে আমিও যাব না। আপনার সঙ্গে আমিও সেরেন্ডার করব'।
জেনারেল মঞ্জুর বললেন, 'Reza, Why you have surrender, my boy. ওরা তো আমাকে মেরে ফেলবে। তুমিও যদি সেরেন্ডার করো, (তুমিও মরবে) তাহলে আমার কথা দেশবাসীকে কে জানাবে'?
অমি বললাম, 'স্যার, ওরা আপনাকে মেরে ফেললে আমিও আপনার সাথে মরব, And I want to die with you. একথা বলার পরই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তখন তিনি সিগারেট খাচ্ছিলেন। আধ-খাওয়া সিগারেটটা আমার ঠোঁটে গুঁজে দিয়ে দিয়ে বললেন, 'ওহ, মাই কমরেড-মাই কমরেড। ইউ স্মোক দিস। ইউ আর মাই অনলি কমরেড'।

জেনারেলর মঞ্জুর আত্মসমর্পণ করেছিলেন পুলিশের কাছে এবং বারবার বলছিলেন তাঁকে যেন আর্মির হাতে তুলে না-দেওয়া হয়। "...মঞ্জুর আত্মসমর্পণ করেছিলেন একজন হাবিলদারের কাছে। এরপর তাঁকে ওসির রুমে নেওয়া হয়। সেখানে খাবার এনে বিভিন্ন অজুহাতে দেরি করিয়ে দেওয়া হয় যেন আর্মি চলে আসে। তখন থানায় চলে এসেছিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিআইজি শাহজাহান।
যিনি পরবর্তীকালে সচিব হয়েছিলেন এবং ২০০১ সালে তত্ত্ববধায়ক সরকারের  উপদেষ্টা হয়েছিলেন।


এই মানুষটাকে মঞ্জুর বারবার বলছিলেন, 'আমি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। আমাকে আর্মির কাছে দেবেন না, I should get an opportunity to face the trail. আমি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমার অনেক কথা বলার আছে এবং সেটি বলব আমি। দেশবাসির জানা প্রয়োজন। আমাকে তাড়াতাড়ি সেফ কাস্টডিতে পাঠান। আমাকে জেলে পাঠান'।
ডিআইজি শাহজাহান বিভিন্ন চল করে কালক্ষেপণ করেছিলেন এবং ঠিকই মঞ্জুরকে আর্মির হাতে তুলে দিয়েছিলেন।


...পরে আর্মি এসে জেনালের মঞ্জুর এবং আমাকে হাত, চোখ বেঁধে আলাদা আলাদা জায়গায় নিয়ে গেল। আমাকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হলো সেখানে মেজর মুজিব আমার দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর কাছে আমি মঞ্জুরের খবর জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'গতরাতে আর্মি চিফের নির্দেশে তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। তখন আমি চিফ হচ্ছেন এরশাদ'।"
...
তৎকালীন ডিআইজি শাহজাহান নামের মানুষটাও একজন কাপুরুষ! আর [*] তৎকালীন সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ নামের কাপুরুষ সৈনিক এখনও পেট চিরে আত্মহত্যা করেননি এটা দেখে আমি বিস্মিত হই!
আমার মনে হয়, আমাদের দেশে কাপুরুষদের জন্য একটা আলাদা গোরস্তান থাকাটাই সমীচীন। যেখানে আমরা ঘটা করে ধুতুরা ফুল দিতে যাব। সঙ্গে থাকবে এই প্রজন্ম। তাঁদেরকে আমরা বলব, ব্যাটা, এই দেখ, এখানে শুয়ে আছে সব কাপুরুষেরা...!

 **ছবি সূত্র: তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পোস্টমর্টেমের রিপোর্টটা নেওয়া হয়েছে, 'বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অভ ব্লাড' থেকে

Sunday, May 19, 2013

বিবিধ: তাহের

'সশস্ত্রবাহিনীতে গণহত্যা' নামে একটি ডকুমেন্টারির কাজ করেছিলেন আনোয়ার কবির, যেটা গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়েছিল। ওই ডকুমেন্টারিতে তিনি অসংখ্য মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, সেসময় যারা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ওখানে হাবিলদার মেজর আবদুল হাই মজুদার (অব.)-এর একটি সাক্ষাৎকার আছে। তিনি সিপাহিবিদ্রোহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এই মামলায় তাঁর এক বছর সশ্রম কারাদন্ডও হয়েছিল। তাঁর সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ:
 

"আমরা কয়েকজন মিলে একটি সংগঠন 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নামে' জাসদের গণবাহিনীর তৎকালীন ওই সংগঠনের সাথে ঐক্যবদ্ধ হই। এর ভেতর আমরা সবাই ছিলাম মুক্তিযোদ্ধা, এখানে অমুক্তিযোদ্ধা কেউ ছিল না। আমাদের সঙ্গে ছিলেন, এয়ারফোর্সের কর্পোরাল আলতাফ, কর্পোরাল মজিদ, কর্পোরাল শামসুল হক, আমাদের রেজিমেন্টের নায়েক সিদ্দিক, আর্মি হেডকোয়ার্টারে ছিলেন সুবেদার জালাল, সুবেদার মাহবুব, বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলেন চান মিয়া, তারু মিয়া, সুবেদার মেজর শহীদ, সুবেদার নুরুল হক...।

...সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে, উনি আমাদেরকে নির্দেশনা দিলেন, কিছু বই-পুস্তক দিলেন।...বিস্তারিত কর্মপন্থার নির্দেশনা উনিই দিতেন।
...১৫ অগস্টে জাতির জনককে হত্যা করা হয়। কার্যত দেশে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমরা কোনোভাবেই এই হত্যাকান্ডকে মেনে নিতে পারিনি। ...সেনাবাহিনীর ভেতর যেভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল এটা দেখে আমরা কোনো ভাবেই মানতে পারছিলাম না।
...আমরা আমাদের নেতাকে চয়েজ করলাম, কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমকে।
...জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়েছে।

...আমরা সবাই বিচলিত হয়ে কর্নেল তাহেরকে বললাম, 'স্যার, আজকে রাতের ভেতর যদি আমরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত না-করি তাহলে স্যার আমরাও বাঁচব না, জিয়াউর রহমানও বাঁচবেন না, তার ফ্যামেলির একটি সদস্য বাঁচবে না। আপনিও বাঁচতে পারবেন না...।

..এক জরুরি বৈঠকে সিরাজুল আলম খান আসলেন। কর্নেল তাহের বললেন, 'যে-কোনো ভাবে জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করতে হবে। এবং এই সেনাবাহিনীকে বাঁচাতে হবে, দেশকে বাঁচাতে হবে'।
এই কথার পর সিরাজুল আলম খান প্রশ্ন করলেন, 'Who is Zia'?
তাহের বললেন, '(চিন্তার কিছু নেই) আমি যা বলব জিয়া তাই করবে'।
আমরা আলোচনায় বসে পড়ি। কে কি করব এই দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। কিন্তু কিছুক্ষণেই মধ্যেই দেখলাম, সিরাজুল আলম খান রুমে নেই। আমরা ভাবলাম, তিনি বাথরুমে গেছেন। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও দেখলাম তিনি কোথাও নেই। আমরা সিদ্ধান্ত নিতে না-পেরে হাসানুল হক ইনুকে দায়িত্ব দেওয়া হলো সিরাজুর রহমানের সঙ্গে এই বিষয়ে পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।

...জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর তিনি কর্নেল তাহেরকে আলিঙ্গন করলেন। প্রাণ রক্ষা করার জন্যধন্যবাদ দিলেন। কর্নেল তাহের আমাদেরকে দেখিয়ে বললেন, 'আমি যুদ্ধাহত, আমার একটি পা নেই, আমি কিই-বা করতে পারতাম। যা করেছে এরাই করেছে'।
এরপর জিয়াউর রহমান আমাদেরকে জড়িয়ে ধরলেন, হাত মেলালেন, চোখের পানি ফেললেন।
এরপর কর্নেল তাহের জিয়াকে বললেন, 'যা করেছে সৈনিকেরা করেছে, তারা কি বলে শোনেন'। আমরা 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার' পক্ষে ১১ জন আবারো একত্রিত হয়ে জিয়াউর রহমানের কাছে ১২ দফা দাবী উত্থাপন করলাম।

...অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলছি, ৭ নভেম্বর স্বাধীনতা যুদ্ধের 'কে' ফোর্সের অধিনায়ক খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদাসহ চারজন অফিসারকে হত্যা করা হয়। কর্নেল তাহের বা আমাদের 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'র কোনো লোক এর সঙ্গে জড়িত নন। আমি হলফ করে বলতে পারি, আমাদের কোনো সদস্য ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদা, কর্নেল হায়দারকে গুলি করেনি। সেদিন কর্নেল তাহের আমাদেরকে এরকম কোনো নির্দেশ প্রদান করেননি। 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার' পক্ষ থেকে যদি কেউ খালেদ মোশারফদেরকে হত্যা করে থাকত তাহলে অন্তত আমি জানতাম। কারণ, কর্নেল তাহেরের সঙ্গে যতবারই আমরা আলোচনায় বসেছি সবগুলোতেই আমি উপস্থিত ছিলাম। সবার পক্ষ থেকে নির্দেশের সবগুলো কাগজে আমি স্বক্ষর করেছিলাম।
খালেদ মোশারফদের হত্যা করেছে পাকিস্তান প্রত্যাগত সৈনিকেরা। আমি বিশ্বাস করি, কোনো মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশারফকে হত্য করতে পারে না। কারণ একজন যোদ্ধা তার সহযোদ্ধাকে কেমন করে হত্যা করবে! যারা মেরেছে তারা দেশের বাইরে পালিয়ে যায়নি। তাদের গ্রেফতার করা হোক, বিচার করা হোক।..."‌

'বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অভ ব্লাড' বইয়ে অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস লিখেছেন:
"...সঙ্গে সঙ্গেই গোলয়োগ ছড়িয়ে পড়ে। এর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই ক্যাপ্টেন আসাদ আর ক্যাপ্টেন জলিল মিলে খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদা আর হায়দারকে কমান্ডিং অফিসারের কক্ষে গুলি করে হত্য করে...।"

অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, যিনি এই মামলায় ১০ বছর সশ্রম কারাভোগী:
"...জাসদ নেতৃত্ব এই অভ্যূত্থানে তাহেরকে নেতৃত্ব দেয়ার অনুমতি দিয়েছিল এবং সব ধরনের সহায়তার আশ্বাসও। ...কিন্তু প্রয়োজনের সময় জাসদ সেই কাজটি করেনি।
...আরেকটি কাজ করেনি জাসদ সেটা হচ্ছে, এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তাহের সুতরাং এটা প্রথম সুযোগেই বেতারও টেলিভিশনে প্রচার করা প্রয়োজন ছিল। এই কাজটি করলে এই অভ্যূত্থানের পরিণতি হতো অন্য রকম হত...।"

Facebook Share