Wednesday, May 23, 2018

ডাকাতের মার গলা...।

চোরের মার বড় গলা এটা সবাই জানে কিন্তু ডাকাতের মার গলা এতোটাই বড় থাকে যে কোহিনূর হিরার মত অজস্র ধনও দিব্যি এঁটে যায়! সেই ডাকাতের নাতিপুতিরা যখন বিবাহ করে তখন আমাদের আনন্দ দেখে কে! উল্লাসে নগ্ননৃত্য করতে বললেও আমরা বিমলানন্দে রাজি হয়ে যাব।দুরস্ত পোশাকপরা কেউ যখন এমন লেখা প্রসব করে, ‘আমাদের রাজার বিবাহ। আমরা দুয়া করি’, তখন মানুষটাকে স্রেফ নগ্ন মনে হয়।

আর আমাগো মিডিয়া, আহা! এরা কেমন করে বিস্মৃত হবে যে এদের বাপ-দাদারা তাদের লুটেরা প্রভুর এমনই সেবাদাস ছিল যে প্রভু ঘোড়ায় উঠার সময় নিজের পিঠ পেতে দিত। সেই প্রভুর আন্ডাবাচ্চার জন্য পিঠ না হোক প্রথম পাতাসহ কাগজের বিস্তর স্পেস ছেড়ে দেবে এতে অবাক হওয়ার কী আছে!

সহায়ক সূত্র:
১. লুটেরার ছা…: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_3626.html

Sunday, May 20, 2018

মা!

শৈশব ফিরে আসে বারবার, স্মৃতির হাত ধরে। এমনই এক স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন, সালমা রুহি: 
"শৈশব স্মৃতি বললেই আমাদের মনে পড়ে যায় পুতুল খেলা, স্কুল পালানো, বান্ধবীদের নিয়ে আড্ডা দেয়া, মজা করা ইত্যাদি। কিন্তু আজ আমার শৈশবের যে স্মৃতি বার বার মনে পড়ছে তা আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম।
আজকাল সন্তান জন্মানোটা প্রযুক্তি কত সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু আমি যখন ছোট তখন সন্তান জন্মানো ছিল খুবই লজ্জার ব্যাপার, মায়ের পেটে বাচ্চা আসলে অন্য সন্তানদের জানানো হতো না। অনেক গোপনীয়তা রক্ষা করা হতো। নিয়ম!
আমার বয়স ছয় কি সাত হবে, বাবা ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। মা আবার কনসিভ করেছেন, আমি এখনকার যুগের বাচ্চা হলে ঠিকই বুঝতাম মার পেটে বাবু। কিন্তু সেই যুগে এই ব্যাপারটা গোপনীয় হওয়াতে কিছুই বুঝিনি। মায়ের পেট দিন দিন দেখি বড় হয়ে যাচ্ছে। একদিন মাকে জিজ্ঞাস করলাম, 'আচ্ছা মা তোমার পেট এত বড় হয়ে যাচ্ছে কেনো'?
মা মনে হয় লজ্জা পেয়ে গেলেন, অপ্রস্তুত ভাবেই বললেন,'আমি এখন ভাত বেশি খাই তো তাই পেট বড় হয়ে গেছে'।
আমি আবার পন্ডিতের মত বললাম 'মা তোমার পেটে মনে হয় কৃমি হয়েছে, মর্জিনার পেটটা দেখ না কত বড়! তুমি না সেদিন মর্জিনার মাকে বলছিলে, মর্জিনার পেট বড় হয়ে গেছে। কৃমির ঔষধ খাওয়াতে'।
কাজের বুয়ার পাঁচ বছরের মেয়ের ইয়া বড় পেট দেখে সেদিন মা আমার সামনেই একথা বলছিলেন।

কী বোকা আমি, তখন তবুও বুঝি না আমার মায়ের পেটে আমার ছোটভাই। পাশের বাসার টুম্পা আমার সাথে পড়ে। রোজ তাদের বাসায় বিকেলে খেলতে যাই, সন্ধ্যায়  মা ডেকে নিয়ে আসেন। আজ মা ডাকছেন না। নিজেই বাসায় গেলাম। বাসায় গিয়ে শুনি মায়ের রুম থেকে মায়ের গোঙ্গানির শব্দ, বাবা অস্থির ভাবে এঘর ওঘর পায়চারি করছেন। বাবা আমাকে মায়ের রুমে যেতে নিষেধ করেছেন, কিন্তু কেনো? বাবাকে জিজ্ঞাস করলে বাবা বললেন, 'তোমার মায়ের পেটে ব্যথা, তুমি গেলে বিরক্ত হবে'।
কিন্তু তখন আমার মনে ছোট্ট প্রশ্ন, আমাদের কিছু হলে বাবা ডাক্তার কাকার কাছে নিয়ে যান আজ কেনো মাকে ডাক্তার কাকার কাছে নিয়ে যাচ্ছেন না?

মায়ের কাছে যাবো-মায়ের কাছে যাবো বলে কান্না করতে লাগলাম। বাবা আমাকে মায়ের দরজার কাছে নিয়ে গিয়ে আমাকে ভিতরে পাঠিয়ে দিলেন। বাবা কিন্তু ভেতরে গেলেন না। এখন বুঝি, ওই ঘরতো ছিল তখন অশৌচ ঘর-আঁতুড়ঘর। বাবাদের যাওয়ার বেলায় নিষিদ্ধ এক ঘর!
মা শুয়ে আছেন। ঘামে মায়ের শরীর ভিজে জবজব হয়ে আছে। সারা ঘরে ডেটলের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। দরজা-জানালা সব বন্ধ, দম বন্ধ পরিবেশ। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, 'দুষ্টামি করবে না, বাবাকে বিরক্ত করবে না আর সময় মতো স্কুলে যাবে, সময় মত খাবে।
মা শুয়ে-শুয়ে কথাগুলো বলছেন আর তার দু'চোখ গড়িয়ে চোখের পানিতে বালিশ ভিজে যাচ্ছে। এখন বুঝি মা হয়তো তখন ভাবছিলেন, যদি মরে যাই। আমি আমার ছোট্ট হাতে মায়ের চোখ মুছে দিচ্ছিলাম আর বলছিলাম, 'মা তোমাকে বলেছিলাম না তোমার পেটে কৃমি হয়েছে ঔষধ খাও, দেখনা মর্জিনা কয়দিন পর পর পেটের ব্যথায় কাঁদে'।

হঠাৎ লক্ষ করলাম মায়ের পায়ের কাছে কালো নোংরা শাড়ী পড়া একজন বয়ষ্ক মহিলাকে বসে থাকতে। খানিকটা বিরক্ত  বললাম, 'মা এই পচা মহিলা কে'?
মা বললেন, 'ছি, এভাবে বলে না, উনি তোমার একটা নানু। আমার পেট ব্যথায় উনি তেল দিয়ে মালিশ করে দিলে আমি ভাল হয়ে যাবো'।
বাবা আমাকে ডেকে বাইরে নিয়ে আসলেন। মায়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে বাবার গলা জড়িয়ে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম মনেই নেই।

সকালে ঘুম ভাঙ্গলো মায়ের রুম থেকে একটা বাচ্চার কান্নার শব্দে, দৌড়ে মায়ের রুমে গেলাম। মায়ের পাশে কাথায় মোড়ানো ছোট্ট একটা 'দেবশিশু' কেমন পিটপিট করে তাকাচ্ছে! আমি অবাক হয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছি। ওদিকে মায়ের পেট ব্যথা সেরে গেছে কিন্তু চোখ-মুখে ক্লান্তির ছাপ। যেনো মায়ের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে, তারপরও মায়ের ঠোঁটে হাসির ঝিলিক। মা বললেন, 'তুমি না বলতে তোমার সাথে খেলার কেউ নেই, প্রতিদিন টুম্পাদের বাসায় যেতে খেলতে। আল্লাহর কাছে বলেছিলাম, কাল তুমি ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে আল্লাহ তোমার খেলার সাথীকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন'।

আমার খুশি দেখে কে। যেন স্বর্গ আমার হাতের মুঠোয়। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে সারাদিন ভাইটার কাছে বসে থাকি। আমার শৈশবের এই স্মৃতি মনে পড়লে আজও চোখের কোণ ভিজে উঠে আনন্দ-বেদনায়। আনন্দে চোখ ভিজে আসে আমার 'দেবশিশুর' মত ভাইটার জন্মের কথা মনে হলে। বেদনায় ভিজে উঠে মায়ের কথা মনে পড়লে যে মানুষটা আজ না-ফেরার দেশে। সেদিনের ছোট্ট মনে প্রশ্নের উত্তরগুলো আজ খুঁজে পাই, 'বাচ্চা ডেলিভারির'  ব্যাপারটা ছিলো খুবই গোপনীয়, মফস্বলে ডাক্তার নার্স দিয়ে প্রসব করানো হতো না। এটা যেন একটা খুবই স্বাভাবিক গোপন ব্যাপার। সারা গ্রাম জুড়ে অভিজ্ঞ একজন দাই থাকতেন, নোংরা, অপরিষ্কার ও অস্বাস্থ্যকর এক মহিলা। তখন তাঁরাই ছিলেন আমাদের মায়েদের একমাত্র ভরসা, তারাই তাদের নোংরা হাতে আমাদেরকে প্রসব করাতেন।
কোথায় গ্লাভস, কোথায় এন্টিসেপ্টিক, ডেটল-স্যাভলন, কোথায় বেবি ডেলিভারি কিটস! অবশ্য বাবা সচেতন হওয়ায় ডেটল আর নাড়ী কাটার নতুন ব্লেড এনে রেখেছিলেন।

অথচ আমি যখন লেবার পেইন নিয়ে লেবার রুমে ভর্তি হয়েছিলাম। এসি রুম- কোথায় গরম! সব কিছু হাইজেনিক একটু পর পর গাইনি ডাক্তার আসছে, নার্স আসছে। কত ধরনের ইন্সটুমেন্ট, প্রসব সহজ করার জন্য। নরমাল ডেলিভারিতে পেথিডিন ইঞ্জেকশন দিলে ব্যথার তীব্রতা কমে যায়। আমাকে পেথিডিন ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরেও কোরবানির পশুর মত গোঙ্গাচ্ছি, চিৎকার করছি অথচ আমাদের মায়েদের প্রসব ব্যথার তীব্রতা কমানোর কোনো চিকিৎসাই ছিলো না তার উপর চিৎকার করা নিষেধ ছিলো। বাইরে আওয়াজ গেলে বা মানুষ শুনে নিলে যে মহাপাপ হয়ে যাবে।

হাসপাতালের নিরাপদ ওটিতে শুয়ে ব্যথায় ছটফট করছিলাম আর মনে মনে মাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলাম: আম্মা-আম্মা, বদ্ধ আঁতুড়ঘরের কোণে পড়ে থেকে এতো কষ্ট করে আমাদের জন্ম দিলে আর দেখো আমরা প্রযুক্তির সহায়তায় তোমাদের চেয়ে কত কম কষ্টে, কত যত্নে কত নিরাপদে সন্তান জন্ম দিচ্ছি।
তবুও সন্তান জন্ম দেওয়া এত কষ্ট-এত কষ্ট!" সালমা রুহি

ভাত!

সমসাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে লিখছেন, Nishom Sarkar
রফিক এই মুহুর্তে তার আম্মাকে নিয়ে হাসপাতালে। তার আম্মার পেপটিক আলসারের সমস্যা বিকট আকার ধারণ করেছে। গতকাল রাতে পেট ব্যাথা, বমি করে খুব খারাপ অবস্থা। ভোর বেলায় সেহেরি করেই চলে এসেছে তাই হাসপাতালে।

রফিকের আম্মা ম্রিয়মান গলায় বলেন, রফিক।
-আম্মা বলেন।
- সারাটাদিন কি দেখস এই মোবাইলটাতে, তুই বল তো আমারে!
- আপনে বুঝবেন না আম্মা। কিছু খাবেন?
- অল্প কইরা ভাত আন।
- ভাত হাসপাতাল থেইকাই দিবো।
রফিকের আম্মা এবার কাতর হয়ে বলেন, তাইলে ইট্টু স্যুপ কইরা আন ।

রফিক মোবাইল পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বের হয় বাইরে। গতকালই সে একটা ভিডিও শেয়ার দিয়েছে। ৩২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর-এর নির্দেশে লালমাটিয়া এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে যেনো সব খাবার দোকান, টং এর দোকান সব বন্ধ রাখা হয় দিনের বেলায়।
সেই ভিডিওটাই  'শাবাস, বাঘের বাচ্চা' লিখে শেয়ার দিয়েছিলো রফিক, ১৮০০লাইক আর দুশো কমেন্ট! দেখেই ভালো লাগছে। রাস্তায় এসে সে প্রকৃত অর্থেই বোকা** হয়ে গেলো! একটা খাবারের দোকানও খোলা নেই।
রিকশা নিয়ে পুরো এলাকা চক্কর দিলো, কোন দোকান খোলা নেই। সে হাসপাতালের ক্যান্টিনে গেলো, ক্যান্টিন বন্ধ। ছোলা সিদ্ধ দিয়েছে, ইফতারীর জন্য। সে শুকনা মুখে জিজ্ঞাসা করলো, 'ভাত কি হইছে? আমার আম্মা অসুস্থ, উনার একটু আগে আগে খাওয়া দরকার'।

ক্যান্টিনের লোকটা হতাশ হয়ে বললো, 'বাবুর্চি চলে গেছে। বলছিলাম অল্প-স্বল্প করে রান্না করতে। কিন্তু সে বললো, রোজা রেখে এই কাজ করতে পারবে না। আমিও বেশী জোড়াজুড়ি করি নাই ভাই। ইয়ে, চিপস আছে, চিপস নিয়া যান।'

রফিকের গভীর শ্বাস ফেলে ভাবল, কয়েকটা নাস্তিকের বাচ্চা ফেসবুকে বারবার লিখছিলো, যারা অসুস্থ, যারা অমুসলিম তারা কোথায় খাবে, তারা কিভাবে না খেয়ে থাকবে। তখন রফিক বাপ-মা তুলে গালিগালাজ করেছিল কিন্তু  আজকে নিজে যে এই ঝামেলায় পরবে, তা স্বপ্নেও ভাবেনি। রফিক তার কলেজ জীবনের এক হিন্দু বন্ধুকে ফোন দেয়, কলেজ জীবনে এই বন্ধুকে ওরা 'আকাটা' বলে ক্ষেপাতো।

বন্ধু উল্লসিত, কি রে এতোদিন পরে হঠাৎ?
রফিক বিব্রত হয়ে বলল, একটা দরকারে ফোন দিলাম।
-বল।
-আম্মা অসুস্থ খুব।
-কস কী, খালাম্মা কই?
-হাসপাতালে। তোদের বাসা থেকে একটু ভাত দিতে পারবি?
বন্ধু হাসে, আকাটাদের ভাত খাবি? পাপ হবে না তো?
রফিক চুপ করে থাকে, আস্তে করে বলে, 'না। তুই একটা টিফিন বাক্সে ভর। আমি আসতেছি'।

(এটা শুধুই একটা গল্প। কিন্তু কোন হাসপাতালেই কী এরকম হওয়া সম্ভব না? বোঝানোর জন্য লিখলাম যে অসুস্থ, নন-মুসলিমরাও মানুষ। জোর করে তাদেরকে না খাইয়ে রাখাটা কোন ভাল কাজ হতে পারে না। আর ৩২নং ওয়ার্ডের ঘটনাটা সত্যি। সেখানে আসলেই দোকান বন্ধ রাখবার জন্য মাইকিং করা হয়েছে। ভিডিওটা কমেন্টে দিচ্ছি। আমি কেবল চিন্তা করি, আমরা রোজা রাখি বেশ, হোটেল খাওয়ার দোকান খোলা থাকলে আমাদের সংযমের বারোটা বেজে যায়! আর আমাদের আম্মারা যুগযুগ ধরে রোজা রেখে রান্নাঘরে একের পর এক রান্না করে যান, উনাদের সংযমে কোন সমস্যা হয় না...।Nishom Sarkar