Search

Loading...

Friday, December 19, 2014

একজন ‘নুলা মুসা’ এবং আমাদের মিডিয়া।

মুসা বিন শমসেরকে নিয়ে প্রথম লিখেছিলাম, সালটা সম্ভবত ২০০৬ হবে। তখন অমি রহমান পিয়াল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখির সহযোদ্ধা। পিয়াল আমাকে সতর্ক করেছিলেন, ‘শুভ, এই পাবলিক কিন্তু খতরনাক। তাকে নিয়ে যারা লেখালেখি করেছেন তারাই ভয়াবহ বিপদে পড়েছেন’
প্রমাণিত না কিন্তু ফরিদপুরের যুদ্ধাপরাধিদের নিয়ে লেখালেখি করার কারণে প্রবীর শিকদার [১] বিপদে পড়েছিলেন। আমাদের মুসাও ফরিদপুরের! প্রবীর শিকদার এখনও বেঁচে আছেন কিন্তু বোমায় তার এক পা, চাপাতির আঘাতে এক হাত উড়ে গেছে।

তো, মুসা আবারও সামনে চলে এসেছেন দুদকে হাজিরা দিতে গিয়ে। দুদক অফিসে তিনি হাজিরা দিয়েছেন রাজা-বাদশার মত। একপাল দেহরক্ষী এবং চেলা-চামুন্ডা নিয়ে। এরমধ্যে অধিকাংশ মিডিয়া আবার খুব মজা পেয়েছে নারী দেহরক্ষী নিয়ে। কোথাও ছাপা হয়েছে, “মহিলা বডিগার্ড নিয়ে দুদকে সেই মুসা বিন শমসের”। বা কোথাও “সুন্দরী দেহরক্ষী নিয়ে...।”
বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে মুসা কোন রঙের ব্লেজার পরেছেন, কোন ঘড়ি, কোন ব্রান্ডের গাড়ি ইত্যাদি। ভাগ্যিস, গাড়ির কয়টা চাকা বা মুসার কোন ব্রান্ডের আন্ডারওয়্যার পরেছেন ওই দিকে আর মিডিয়া দৃষ্টিপাত করেনি।

এখনকার মিডিয়া পারে না এইসবও দিয়ে দিতে। যেমন আজকের ‘দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে’ ছাপা হয়েছে, শোবিজের হ্যাপী এবং ক্রিকেট খোলোয়াড় রুবেলের ফোনালাপ। আমারা ছোট্ট একটা অনুসন্ধান ছিল। ফোনের এই কথোপকথনের উৎস কি? এই দুইজনের কেউ একজন কি কথোপকথন রেকর্ড করে রেখেছিল নাকি ফোন কোম্পানি এই অডিও ট্র্যাক সরবরাহ করেছে। নাকি কোনও গোয়েন্দা সংস্থা? একজন পাঠক এটা জানার অধিকার ফলাতেই পারে। আর সরবরাহ করলেই মিডিয়া ছেপে দেবে? “একদম ঠোঁট কামড়াইয়া ধরব কিন্তু...” এটা ছাপিয়ে পাঠকের কাছে চুতিয়া মিডিয়ার এটাই কী দায়? আবার ঢং করে লিখেছে, “[প্রকাশ অযোগ্য শব্দ।]”
এদের “[প্রকাশ অযোগ্য শব্দ।]”, এটা পড়ে দুষ্ট ছেলেদের কথাটাই মনে হলো, ‘মুহাহা, যেন সানি লিওন বলছে, আমি ভার্জিন’।

আচ্ছা, মিডিয়া কি এখন টাট্টিখানা হালের ওয়শরুমেও ক্যামেরা তাক করে ‘বুম’ ধরে রাখবে? ভাল, তাহলে এই পত্রিকার সম্পাদক নঈম নিজামকে দিয়েই শুরু হোক। পরে পত্রিকার প্রথম পাতায় ছবিটা ছেপে দিয়ে মোহনীয় একটা ক্যাপশন দেওয়া যেতে পারে, একদলা হলুদ ফুল বা এক টাল হলুদ ফুলের মাঝখানে নঈম ভাইয়া।

যাই হোক, মুসাকে নিয়ে আমার বেশ কিছু লেখার মধ্যে একটা ছিল যাত্রার প্রিন্স [২]। ওখান থেকে কিছু অংশ শেয়ার করা যাক:
"ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার মেয়ে কমলা ঘোষ। সবে বিয়ে হয়েছে তার। বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে আটকা পড়ে যান কমলা! একদিন পাকিস্তানি মেজর কোরায়শী ও তিন জন সৈন্যসহ কমলাদের বাড়িতে আসে নুলা মুসা। এরপর যা হওয়ার তাই হয়, পাকিস্তানি সৈন্যরা চরম শারিরীক নির্যাতন করে কমলাকে। ...পরে কমলার স্বামী কমলাকে আর কখনই ঘরে ফিরিয়ে নেয়নি।

...ফরিদপুর শহরের মহিম স্কুলের সঙ্গে এক ধর্মশালা দেখাশোনা করতেন কেষ্টমন্ডল। কেষ্টমন্ডলের চার মেয়ে: ননী, বেলী, সোহাগী ও লতা। নুলা মুসার তত্ত্বাবধানে এই বেলী ও ননী মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোরঞ্জনে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে এই চার বোন এবং তাদের মা-র ঠাঁই হয়েছিল ফরিদপুরের পতিতাপল্লীতে।
...কেবল ননী, বেলীই নয় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে অর্ধশতাধিক বাঙালি মা-বোনের সন্ভ্রম লুটের প্রধান নায়ক এই নুলা মুসা।

এখন তার নাম ড. মুসা বিন শমশের হলেও সার্টিফিকেটের নাম এডিএম মুসা। কিন্তু একটা হাত খানিকটা বিকলাঙ্গ থাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল, 'নুলা মুসা' হিসাবেই। নিজেকে ডক্টর বলে দাবী করলেও, ১৯৬৮ সালে ঈশান স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হয়েছিল মুসা। ১৯৮৬ সালে মুসার নামের আগে ডক্টর যুক্ত হলেও উচ্চ-মাধ্যমিক পাসের কোনো প্রমাণ মেলেনি কোথাও!

অভিযোগ আছে, একাত্তরের ২১ এপ্রিল পাকিস্তানি সৈন্যদের ফরিদপুরে ঢোকার ব্যাপারে মানচিত্র এবং পথনির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতা করেছে এই মুসা। মেজর আকরাম কোরায়শীর সঙ্গে মুসার গভীর ঘনিষ্ঠতা ছিল! ফরিদপুরে পাকিস্তানি সৈন্য ঢোকার পরদিনই (একাত্তরের ২২ এপ্রিল) ফরিদপুর সার্কিট হাউজে মুসা এবং মেজর কোরায়শীকে খুবই অন্তরঙ্গ পরিবেশে দেখেন, মুক্তিযোদ্ধা একেএম আবু ইউসুফ সিদ্দিক পাখী।
একাত্তরে মুসা ছিল ফরিদপুরের এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য মানুষকে হত্যা, নারী নির্যাতন একং লুটতরাজ করেছে। ফরিদপুরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ শহরের সমস্ত শহীদ মিনার মুসা পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় ভেঙ্গে ফেলে! মেজর কোরায়শীসহ অনেক পাকিস্তানি সেনা-সদস্যের অবাধ যাতায়াত ছিল মুসার বাড়িতে।
মুসার পিতা তথাকথিত পীর শমসের মোল্লা পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল বাড়াতে তাদের গায়ে ফুঁ দিত আর বলত, 'ইন্ডিয়া পাকিস্তান বন যায়েগা'

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডিসেম্বরেই মুসা মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে ফরিদপুর থেকে পালিয়ে চলে যায় পাবনায়। সেখানে বড় ভাইয়ের শ্যালিকাকে বিয়ে করে ঢাকা-চট্টগ্রামে ছুটাছুটি করে। ঢাকার এক অবাঙ্গালিকে পাকিস্তানে পাঠাবার নাম করে তাঁর সহায়সম্পত্তি আত্মসাতের মাধ্যমে একপর্যায়ে ঢাকায় 'শাহবাজ ইন্টারন্যাশনাল' নামে আদম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলে। এরপর বিদেশে লোক পাঠাবার নাম করে উত্তরবঙ্গের কয়েকশ' লোকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে উধাও হয়ে যায়। বছর তিনেক পর ঢাকায় ফিরে 'ড্যাটকো' নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে আবারও শুরু করে আদম ব্যবসা! এরশাদ আমলে শুরু হয় তার উত্থান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি মুসাকে...।" 

সেই মুসা আজ দম্ভের সঙ্গে বলেন, “...আমার বিষয়ে যা বলা হয়, আমি সাত বিলিয়ন ডলার বা ৫১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছি। কেউ কোনো দিন এতো টাকা দেশে আয় করতে পারেনি, পারবেও না। আমি এই টাকা বিদেশে উপার্জন করেছি...। ...সুইস ব্যাংকে আটকে থাকা ওই টাকা উদ্ধার করা গেলে পদ্মা সেতু, দুস্থ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী, শিক্ষকসহ সামাজিক গঠনমূলক কর্মকান্ডে অবদান রাখব।...

নুলা মুসা মহোদয়ের কাছে জিজ্ঞাসা বিদেশে উপার্জন করেছেন, বেশ; তা কোন ব্যবসায় এই টাকা উপার্জন করেছেন? আর আপনি এই দেশে অবদান রাখবেন জেনে ভাল লাগছে। সবই তো বললেন কিন্তু আপনি ১৯৭১ সালে যে পাপগুলো করেছেন সেই পাপের বিষয়ে মুখ খোলেননি কিন্তু!
যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার পাপের শাস্তি না-হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই দেশের ঝুলেপড়া কাঁধের পাপমোচন হবে না।

সহায়ক সূত্র:
১. প্রবীর শিকদার: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_4.html  
২. যাত্রার প্রিন্স: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_2395.html

Thursday, December 18, 2014

মহাপুরুষ-‘মহাউলুস’!

মহাপুরুষরা আজকাল ‘মহাউলুস’ হয়ে গেছেন। ‘উলুস’ অভিধানে কেবল পাওয়া যেতে পারে জীবিত হলে। আঞ্চলিক ভাষায় ‘উলুস’ হরদম বলা হলেও এর ভাল নাম ছারপোকা।
বসুন্ধরা গ্রুপের পত্রিকায় ঢাউস যে ছবিটা আমরা দেখতে পাচ্ছি এটায় বসুন্ধরার মালিকপক্ষ। এরা দুস্হদের মাঝে কম্বল বিতরণ করছেন। সাধু-সাধু! ওই আসে মহাপুরুষ...।
ছবি সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪
চমৎকার একটা একটা ছবি বটে! বাংলা সিনেমায় যেমন পুলিশের লম্বা চুল দেখে আমরা হাসি চাপি তেমনি এই ছবিটা দেখেও হাসি চাপা মুশকিল হয়ে পড়ে। হোয়াট আ পোজ! কই হাত কই মাথা! ভাব দেখে মনে হচ্ছে, ক্যামেরাবন্দি না-হওয়া পর্যন্ত কম্বল ছাড়াছাড়ি নাই। মহতরমা কম্বল ছেড়ে দিলে কী হবে কম্বল তো ছাড়ে না! আহা, ছবির সঙ্গে তথ্যগুলো মিলিয়েও পাঠক যদি বুঝতে না পারেন ঠিক কে কম্বল দিল তখন কী উপায় হবে গো। পাঠক বেচারাকে তো আর এই তকলিফ দেওয়া চলে না।

যাই হোক, কম্বল বিতরণ করছেন আহমেদ সোকহানের সহধর্মিণী আফরোজা বেগম তার সঙ্গে আছেন ওগো বিদেশীনি পুত্রবধু বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাফায়েত সোবহান সানভিরের ইস্তারি সাহেবা এভলিনা সোবহান। সাফায়েত সোবহান সানভির সাহেবও আছেন।
ওহো, আমার স্মৃতিবিভ্রম না-হয়ে থাকলে ইনিই তো সেই সানবির যিনি সাব্বির খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন?
...২০০৬ সালের ৪ জুলাই রাতে গুলশানের একটি বাড়িতে সাব্বির খুন হন। সানবীর এই হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত প্রধান আসামি ছিল। একপর্যায়ে সানবীর বিদেশে পালিয়ে যান। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর তাঁকে দেশত্যাগে সহায়তা করেছিলেন । সানবীরকে মামলা থেকে রক্ষা করতে বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে বাবরকে ২১ কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি গ্রেপ্তারের পর স্বীকার করেছিলেন।...

ভাল কথা, তা এই সানবীর মহোদয় কি খুনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন? উত্তর যদি না হয় তাহলে এই দেশের তো উফর-ফাঁফর, দমবন্ধ অবস্থা। বেচারা দেশ, শ্বাস নেয় কেমন করে?

Wednesday, December 17, 2014

আমাদের ইশকুল- আমাদের মুক্তিযুদ্ধ- আমাদের মুক্তিযোদ্ধা।

পথশিশু সংগঠনের সঙ্গে জড়িত একজনের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। কথাপ্রসঙ্গে তিনি জানতে চাইলেন স্কুলে (আমাদের ইশকুল) আমি পড়াবার জন্য কোন পদ্ধতি অনুসরণ করি। তিনি এটাও জানালেন তারা ‘ইব্রাহিম মেথড’ (দুর্বল স্মৃতি থেকে লিখছি ইব্রাহিম নামটা ভুল হওয়ারা সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না) অনুসরণ করেন।
আমি সলাজে বললাম, আমি তো কোন পদ্ধতি অনুসরণ করি না। ধারণা করি, তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি গোপন করেছিলেন।

যে শিক্ষক এই স্কুলে পড়ান তাকে আমি আগেভাগেই বলে দিয়েছিলাম, এই বাচ্চাদেরকে প্রচলিত পদ্ধতিতে আমি পড়াতে চাই না। স্কুলে আধ-ঘন্টা এরা বিভিন্ন খেলা খেলবে এরপর আধ-ঘন্টা পড়া। পড়ার সময়টা আমি খুব বেশি সময় রাখতে চাইনি। কারণ তাহলে এরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে না।
স্টেশনের অধিকাংশ বাচ্চাকে আমি হাতের তালুর মত চিনি- আমি জানি কে আজ দুপুরে খেয়ে আসেনি, কে ড্যান্ডিতে আসক্ত! অভুক্ত, স্বপ্নহীন বাচ্চাদের মনোযোগ ধরে রাখা কতোটা কঠিন এটা আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারি।

একদিন এদেরকে বাংলা পড়ানো হয় তো অন্যদিন ইংরাজি। একদিন কেবল গল্প। শিক্ষামূলক কিছু গল্পের সঙ্গে ছোট্ট একটা গল্প আমি এদেরকে শিখিয়েছি। বড়ো সহজ-সরল একটা গল্প:
এক দেশে এক রাজা ছিল। রাজার ছেলে রাজকুমার। রাজকুমার খুব দুষ্ট ছিল। সে চুরি করত, মিথ্যা কথা বলত। মা-বাবার কথা শুনত না। স্কুলের যেত না। আল্লাহ একদিন তাকে শাস্তি দিলেন। তার গায়ের রঙ কালো হতে থাকত। কালো হতে হতে সে একদিন কাক হয়ে গেল। সে আর মানুষ হতে পারল না। 
গল্পের যে জায়গাটায় কাকের কথা আসে তখন বাচ্চারা কা-কা করে চিৎকার জুড়ে দেয়। এ বলার অপেক্ষা রাখে না এই গল্পটা এদের শেখাবার পেছনে আমার বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। 

ওহ, একদিন ধর্ম পড়ানো হয়। একজন স্কুল দেখতে এসে আমাকে নাহক কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি শ্লেষভরা কন্ঠে বলছিলেন, 'মিয়া, তুমি তো বিশেষ ধর্মকর্ম পালন করো না তাহলে আরবি পড়াবার ব্যবস্থা রেখেছো কেন'?
আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, 'আরবি না, একদিন ধর্ম পড়াবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখানে মুসলমান ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের শিশু নাই থাকলে সে ধর্ম পড়াবারও ব্যবস্থা থাকত'।
ওরে শ্লা...শোনো কথা, এই গ্রহের সবচেয়ে বড়ো নির্বোধ আমি [১]- আমি স্মোক করি বলে কী এদেরকেও স্মোক করা শেখাব!

তো, একদিন থাকে আঁকাআঁকি। আমি দেখেছি বাচ্চাদের সবচেয়ে বেশি উৎসাহ আঁকাআঁকিতে। ওদিন স্কুলে উপস্থিতির হারও থাকে বেশি। আঁকাআঁকির কোনও নির্দিষ্ট বিষয় নেই। যার যেটা খুশি আঁকে। স্কুলে আমি উপস্থিত থাকলে বলি, ভূতের ছবি আঁকো। বাচ্চারা ভূতের ছবি আঁকে। বাচ্চারা অবলীলায় হাস্যকর ভূতের ছবি আঁকে। কারণ একদিন এদেরকে বলে দিয়েছিলাম, ভূত বলে কিছু নেই।

এখানকার শিশুরা হাবিজাবি অনেক কিছুর সঙ্গে এটাও জানে পৃথিবী গোল, তিন ভাগ পানি এক ভাগ মাটি। পৃথিবী স্থির না, কেমন করে দিন-রাত হয়। এরা এটাও জানে কলার খোসার ভেতরের পিচ্ছিল অংশ দিয়ে জুতা চমৎকার পরিষ্কার হয়, চকচক করে। কলার খোসার ভেতরের পিচ্ছিল অংশ দিয়ে নিমিষেই দাঁতও পরিষ্কার, ঝকঝক হয়।

স্কুলে মাস্টার মশাইয়ের জন্য আমার তৈরি করা একটা তালিকা আছে। এই তালিকা ধরে-ধরে এদেরকে শেখানো হয়। পড়ান মাস্টার সাহেব- কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই হুটহাট করে আমি হাজির হয়ে যাই। অল্প সময়ে হাবিজাবি বলে আমি উধাও।
দু-দিন পূর্বে মাস্টার মশাই পড়াচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় দিবস নিয়ে। আমাদের কাছে শুনতে যত সহজ মনে হোক বিষয়টা এদের কাছে অতি কঠিন। যে বাচ্চাগুলো তীব্র শীতে ঘুমায় স্টেশনে অধিকাংশ সময় অভুক্ত থাকে এদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টা খুব একটা বোধগম্য বিষয় এটা আমি বিশ্বাস করি না। তো, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টা বোঝাতে গিয়ে মাস্টার মশাইকে দেখলাম শীতেও গলদঘর্ম হতে। শিক্ষক-ছাত্র কাউকে দোষ দেওয়া চলে না।

আমি অন্য পথ ধরলাম। এদেরকে বললাম, দেখো, স্বাধীনতা মানে হচ্ছে, অনেকটা নিজের বাড়ি আর পরের বাড়ির মত। তুমি তোমার নিজের বাড়িতে যা খুশি করতে পারবে কিন্তু পরের বাড়িতে পারবে না। যেমন ধরো, তোমাদের অনেকেই স্টেশনে থাকো। সরকারি লোকজন যখন খুশি তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে দিতে পারবে কিন্তু নিজের বাড়িতে কেউ তোমাকে কিচ্ছু বলতে পারবে না। আলাপচারিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গ আসল কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সম্বন্ধে কোন প্রকারেই এদেরকে ভাল করে বোঝানো গেল না।

পরের দিন। স্কুলের বাচ্চারা খেলছে। একজন খর্বাকৃতি মানুষ আসলেন বগলে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কান পরিষ্কার করব কি না। আমি বিরক্ত। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে গিয়ে জমে গেলাম। মানুষটার বুকে ছোট্ট একটা ব্যাজ- আমার বোঝার বাকী রইল না মানুষটা একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি সটান দাঁড়িয়ে গেলাম। বাচ্চাদেরকে বললাম, 'সবাই দাঁড়াও। আমাদের মাঝে একজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা বসে থাকতে পারি না। যিনি অস্ত্র হাতে প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন বলেই আমরা একটা পতাকা পেয়েছি, একটা দেশ পেয়েছি। আমাদের মা যে ভাষায় কথা বলেন আমরা সেই ভাষায় অনায়াসে কথা বলতে পারি'। তোমরা মুক্তিযোদ্ধা সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিলে। ইনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।
স্কুল থেকে বেরিয়ে আলি আহমেদ নামের এই মানুষটার সঙ্গে কথা হয়। খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে যখন তিনি যুদ্ধে ছিলেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯! যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পূর্বে মোজাহিদ ছিলেন। তাঁর এলাকা ছিল সালদানদী, কসবা। ছোটখাটো এই মানুষটাই অবলীলায় গুলি ছুড়েছেন ২০ রাউন্ডের এসএলআর দিয়ে। যুদ্ধে তিনি ভয়ংকর রকমের আহত হন। আর্টিলারি শেল দিয়ে সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। এখনও তিনি বহন করে চলেছেন শরীরে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত। মানুষটাকে নিয়ে অন্য একদিন বিশদ লেখা ইচ্ছা রইল। তাঁর তাড়া, আমারও।

কিন্তু আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি, বাচ্চাদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বারবার সংকোচের সঙ্গে এড়িয়ে যেতে চাইলেন। না-কামানো দাঁড়িভরা মুখটা নেড়ে নেড়ে বলছিলেন, 'আরে না, কী বলেন, আমি কেন'!
আমার অনুরোধ ফেলতে না-পেরে বড়ো সংকোচ নিয়ে দাঁড়ালেন।

আমাদের মুক্তিযোদ্ধা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিনতাই হয়ে গেছে সেই কবেই, দলবাজির বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে। তাই কী, এঁর মতো মুক্তিযোদ্ধা তুচ্ছ সম্মান পেয়ে বিদায় নেওয়ার সময় তাঁর চোখ ভরে আসে...!

সহায়ক সূত্র:
১. নিবোর্ধ মানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2014/12/blog-post_7.html 

ম্টেশনে বাচ্চা আর কয়জন পড়বে এটা ভেবে ছোট্ট একটা কামরা ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই অনুমান ভুল ছিল। এমনিতে সবাই একই দিনে উপস্থিত থাকে না কিন্তু তারপরও জায়গার সংকুলান হয় না। এর উপর যেদিন আঁকাআঁকি থাকে সেদিন আমরা বিপদে পড়ে যাই কারণ তখন অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হয়। তখন আমাদের দাঁড়াবার জায়গা থাকে না। তবুও সুখ রে সুখ...!