Wednesday, May 23, 2018

ডাকাতের মার গলা...।

চোরের মার বড় গলা এটা সবাই জানে কিন্তু ডাকাতের মার গলা এতোটাই বড় থাকে যে কোহিনূর হিরার মত অজস্র ধনও দিব্যি এঁটে যায়! সেই ডাকাতের নাতিপুতিরা যখন বিবাহ করে তখন আমাদের আনন্দ দেখে কে! উল্লাসে নগ্ননৃত্য করতে বললেও আমরা বিমলানন্দে রাজি হয়ে যাব।দুরস্ত পোশাকপরা কেউ যখন এমন লেখা প্রসব করে, ‘আমাদের রাজার বিবাহ। আমরা দুয়া করি’, তখন মানুষটাকে স্রেফ নগ্ন মনে হয়।

আর আমাগো মিডিয়া, আহা! এরা কেমন করে বিস্মৃত হবে যে এদের বাপ-দাদারা তাদের লুটেরা প্রভুর এমনই সেবাদাস ছিল যে প্রভু ঘোড়ায় উঠার সময় নিজের পিঠ পেতে দিত। সেই প্রভুর আন্ডাবাচ্চার জন্য পিঠ না হোক প্রথম পাতাসহ কাগজের বিস্তর স্পেস ছেড়ে দেবে এতে অবাক হওয়ার কী আছে!

সহায়ক সূত্র:
১. লুটেরার ছা…: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_3626.html

Sunday, May 20, 2018

মা!

শৈশব ফিরে আসে বারবার, স্মৃতির হাত ধরে। এমনই এক স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন, সালমা রুহি: 
"শৈশব স্মৃতি বললেই আমাদের মনে পড়ে যায় পুতুল খেলা, স্কুল পালানো, বান্ধবীদের নিয়ে আড্ডা দেয়া, মজা করা ইত্যাদি। কিন্তু আজ আমার শৈশবের যে স্মৃতি বার বার মনে পড়ছে তা আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম।
আজকাল সন্তান জন্মানোটা প্রযুক্তি কত সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু আমি যখন ছোট তখন সন্তান জন্মানো ছিল খুবই লজ্জার ব্যাপার, মায়ের পেটে বাচ্চা আসলে অন্য সন্তানদের জানানো হতো না। অনেক গোপনীয়তা রক্ষা করা হতো। নিয়ম!
আমার বয়স ছয় কি সাত হবে, বাবা ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। মা আবার কনসিভ করেছেন, আমি এখনকার যুগের বাচ্চা হলে ঠিকই বুঝতাম মার পেটে বাবু। কিন্তু সেই যুগে এই ব্যাপারটা গোপনীয় হওয়াতে কিছুই বুঝিনি। মায়ের পেট দিন দিন দেখি বড় হয়ে যাচ্ছে। একদিন মাকে জিজ্ঞাস করলাম, 'আচ্ছা মা তোমার পেট এত বড় হয়ে যাচ্ছে কেনো'?
মা মনে হয় লজ্জা পেয়ে গেলেন, অপ্রস্তুত ভাবেই বললেন,'আমি এখন ভাত বেশি খাই তো তাই পেট বড় হয়ে গেছে'।
আমি আবার পন্ডিতের মত বললাম 'মা তোমার পেটে মনে হয় কৃমি হয়েছে, মর্জিনার পেটটা দেখ না কত বড়! তুমি না সেদিন মর্জিনার মাকে বলছিলে, মর্জিনার পেট বড় হয়ে গেছে। কৃমির ঔষধ খাওয়াতে'।
কাজের বুয়ার পাঁচ বছরের মেয়ের ইয়া বড় পেট দেখে সেদিন মা আমার সামনেই একথা বলছিলেন।

কী বোকা আমি, তখন তবুও বুঝি না আমার মায়ের পেটে আমার ছোটভাই। পাশের বাসার টুম্পা আমার সাথে পড়ে। রোজ তাদের বাসায় বিকেলে খেলতে যাই, সন্ধ্যায়  মা ডেকে নিয়ে আসেন। আজ মা ডাকছেন না। নিজেই বাসায় গেলাম। বাসায় গিয়ে শুনি মায়ের রুম থেকে মায়ের গোঙ্গানির শব্দ, বাবা অস্থির ভাবে এঘর ওঘর পায়চারি করছেন। বাবা আমাকে মায়ের রুমে যেতে নিষেধ করেছেন, কিন্তু কেনো? বাবাকে জিজ্ঞাস করলে বাবা বললেন, 'তোমার মায়ের পেটে ব্যথা, তুমি গেলে বিরক্ত হবে'।
কিন্তু তখন আমার মনে ছোট্ট প্রশ্ন, আমাদের কিছু হলে বাবা ডাক্তার কাকার কাছে নিয়ে যান আজ কেনো মাকে ডাক্তার কাকার কাছে নিয়ে যাচ্ছেন না?

মায়ের কাছে যাবো-মায়ের কাছে যাবো বলে কান্না করতে লাগলাম। বাবা আমাকে মায়ের দরজার কাছে নিয়ে গিয়ে আমাকে ভিতরে পাঠিয়ে দিলেন। বাবা কিন্তু ভেতরে গেলেন না। এখন বুঝি, ওই ঘরতো ছিল তখন অশৌচ ঘর-আঁতুড়ঘর। বাবাদের যাওয়ার বেলায় নিষিদ্ধ এক ঘর!
মা শুয়ে আছেন। ঘামে মায়ের শরীর ভিজে জবজব হয়ে আছে। সারা ঘরে ডেটলের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। দরজা-জানালা সব বন্ধ, দম বন্ধ পরিবেশ। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, 'দুষ্টামি করবে না, বাবাকে বিরক্ত করবে না আর সময় মতো স্কুলে যাবে, সময় মত খাবে।
মা শুয়ে-শুয়ে কথাগুলো বলছেন আর তার দু'চোখ গড়িয়ে চোখের পানিতে বালিশ ভিজে যাচ্ছে। এখন বুঝি মা হয়তো তখন ভাবছিলেন, যদি মরে যাই। আমি আমার ছোট্ট হাতে মায়ের চোখ মুছে দিচ্ছিলাম আর বলছিলাম, 'মা তোমাকে বলেছিলাম না তোমার পেটে কৃমি হয়েছে ঔষধ খাও, দেখনা মর্জিনা কয়দিন পর পর পেটের ব্যথায় কাঁদে'।

হঠাৎ লক্ষ করলাম মায়ের পায়ের কাছে কালো নোংরা শাড়ী পড়া একজন বয়ষ্ক মহিলাকে বসে থাকতে। খানিকটা বিরক্ত  বললাম, 'মা এই পচা মহিলা কে'?
মা বললেন, 'ছি, এভাবে বলে না, উনি তোমার একটা নানু। আমার পেট ব্যথায় উনি তেল দিয়ে মালিশ করে দিলে আমি ভাল হয়ে যাবো'।
বাবা আমাকে ডেকে বাইরে নিয়ে আসলেন। মায়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে বাবার গলা জড়িয়ে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম মনেই নেই।

সকালে ঘুম ভাঙ্গলো মায়ের রুম থেকে একটা বাচ্চার কান্নার শব্দে, দৌড়ে মায়ের রুমে গেলাম। মায়ের পাশে কাথায় মোড়ানো ছোট্ট একটা 'দেবশিশু' কেমন পিটপিট করে তাকাচ্ছে! আমি অবাক হয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছি। ওদিকে মায়ের পেট ব্যথা সেরে গেছে কিন্তু চোখ-মুখে ক্লান্তির ছাপ। যেনো মায়ের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে, তারপরও মায়ের ঠোঁটে হাসির ঝিলিক। মা বললেন, 'তুমি না বলতে তোমার সাথে খেলার কেউ নেই, প্রতিদিন টুম্পাদের বাসায় যেতে খেলতে। আল্লাহর কাছে বলেছিলাম, কাল তুমি ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে আল্লাহ তোমার খেলার সাথীকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন'।

আমার খুশি দেখে কে। যেন স্বর্গ আমার হাতের মুঠোয়। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে সারাদিন ভাইটার কাছে বসে থাকি। আমার শৈশবের এই স্মৃতি মনে পড়লে আজও চোখের কোণ ভিজে উঠে আনন্দ-বেদনায়। আনন্দে চোখ ভিজে আসে আমার 'দেবশিশুর' মত ভাইটার জন্মের কথা মনে হলে। বেদনায় ভিজে উঠে মায়ের কথা মনে পড়লে যে মানুষটা আজ না-ফেরার দেশে। সেদিনের ছোট্ট মনে প্রশ্নের উত্তরগুলো আজ খুঁজে পাই, 'বাচ্চা ডেলিভারির'  ব্যাপারটা ছিলো খুবই গোপনীয়, মফস্বলে ডাক্তার নার্স দিয়ে প্রসব করানো হতো না। এটা যেন একটা খুবই স্বাভাবিক গোপন ব্যাপার। সারা গ্রাম জুড়ে অভিজ্ঞ একজন দাই থাকতেন, নোংরা, অপরিষ্কার ও অস্বাস্থ্যকর এক মহিলা। তখন তাঁরাই ছিলেন আমাদের মায়েদের একমাত্র ভরসা, তারাই তাদের নোংরা হাতে আমাদেরকে প্রসব করাতেন।
কোথায় গ্লাভস, কোথায় এন্টিসেপ্টিক, ডেটল-স্যাভলন, কোথায় বেবি ডেলিভারি কিটস! অবশ্য বাবা সচেতন হওয়ায় ডেটল আর নাড়ী কাটার নতুন ব্লেড এনে রেখেছিলেন।

অথচ আমি যখন লেবার পেইন নিয়ে লেবার রুমে ভর্তি হয়েছিলাম। এসি রুম- কোথায় গরম! সব কিছু হাইজেনিক একটু পর পর গাইনি ডাক্তার আসছে, নার্স আসছে। কত ধরনের ইন্সটুমেন্ট, প্রসব সহজ করার জন্য। নরমাল ডেলিভারিতে পেথিডিন ইঞ্জেকশন দিলে ব্যথার তীব্রতা কমে যায়। আমাকে পেথিডিন ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরেও কোরবানির পশুর মত গোঙ্গাচ্ছি, চিৎকার করছি অথচ আমাদের মায়েদের প্রসব ব্যথার তীব্রতা কমানোর কোনো চিকিৎসাই ছিলো না তার উপর চিৎকার করা নিষেধ ছিলো। বাইরে আওয়াজ গেলে বা মানুষ শুনে নিলে যে মহাপাপ হয়ে যাবে।

হাসপাতালের নিরাপদ ওটিতে শুয়ে ব্যথায় ছটফট করছিলাম আর মনে মনে মাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলাম: আম্মা-আম্মা, বদ্ধ আঁতুড়ঘরের কোণে পড়ে থেকে এতো কষ্ট করে আমাদের জন্ম দিলে আর দেখো আমরা প্রযুক্তির সহায়তায় তোমাদের চেয়ে কত কম কষ্টে, কত যত্নে কত নিরাপদে সন্তান জন্ম দিচ্ছি।
তবুও সন্তান জন্ম দেওয়া এত কষ্ট-এত কষ্ট!" সালমা রুহি

ভাত!

সমসাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে লিখছেন, Nishom Sarkar
রফিক এই মুহুর্তে তার আম্মাকে নিয়ে হাসপাতালে। তার আম্মার পেপটিক আলসারের সমস্যা বিকট আকার ধারণ করেছে। গতকাল রাতে পেট ব্যাথা, বমি করে খুব খারাপ অবস্থা। ভোর বেলায় সেহেরি করেই চলে এসেছে তাই হাসপাতালে।

রফিকের আম্মা ম্রিয়মান গলায় বলেন, রফিক।
-আম্মা বলেন।
- সারাটাদিন কি দেখস এই মোবাইলটাতে, তুই বল তো আমারে!
- আপনে বুঝবেন না আম্মা। কিছু খাবেন?
- অল্প কইরা ভাত আন।
- ভাত হাসপাতাল থেইকাই দিবো।
রফিকের আম্মা এবার কাতর হয়ে বলেন, তাইলে ইট্টু স্যুপ কইরা আন ।

রফিক মোবাইল পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বের হয় বাইরে। গতকালই সে একটা ভিডিও শেয়ার দিয়েছে। ৩২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর-এর নির্দেশে লালমাটিয়া এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে যেনো সব খাবার দোকান, টং এর দোকান সব বন্ধ রাখা হয় দিনের বেলায়।
সেই ভিডিওটাই  'শাবাস, বাঘের বাচ্চা' লিখে শেয়ার দিয়েছিলো রফিক, ১৮০০লাইক আর দুশো কমেন্ট! দেখেই ভালো লাগছে। রাস্তায় এসে সে প্রকৃত অর্থেই বোকা** হয়ে গেলো! একটা খাবারের দোকানও খোলা নেই।
রিকশা নিয়ে পুরো এলাকা চক্কর দিলো, কোন দোকান খোলা নেই। সে হাসপাতালের ক্যান্টিনে গেলো, ক্যান্টিন বন্ধ। ছোলা সিদ্ধ দিয়েছে, ইফতারীর জন্য। সে শুকনা মুখে জিজ্ঞাসা করলো, 'ভাত কি হইছে? আমার আম্মা অসুস্থ, উনার একটু আগে আগে খাওয়া দরকার'।

ক্যান্টিনের লোকটা হতাশ হয়ে বললো, 'বাবুর্চি চলে গেছে। বলছিলাম অল্প-স্বল্প করে রান্না করতে। কিন্তু সে বললো, রোজা রেখে এই কাজ করতে পারবে না। আমিও বেশী জোড়াজুড়ি করি নাই ভাই। ইয়ে, চিপস আছে, চিপস নিয়া যান।'

রফিকের গভীর শ্বাস ফেলে ভাবল, কয়েকটা নাস্তিকের বাচ্চা ফেসবুকে বারবার লিখছিলো, যারা অসুস্থ, যারা অমুসলিম তারা কোথায় খাবে, তারা কিভাবে না খেয়ে থাকবে। তখন রফিক বাপ-মা তুলে গালিগালাজ করেছিল কিন্তু  আজকে নিজে যে এই ঝামেলায় পরবে, তা স্বপ্নেও ভাবেনি। রফিক তার কলেজ জীবনের এক হিন্দু বন্ধুকে ফোন দেয়, কলেজ জীবনে এই বন্ধুকে ওরা 'আকাটা' বলে ক্ষেপাতো।

বন্ধু উল্লসিত, কি রে এতোদিন পরে হঠাৎ?
রফিক বিব্রত হয়ে বলল, একটা দরকারে ফোন দিলাম।
-বল।
-আম্মা অসুস্থ খুব।
-কস কী, খালাম্মা কই?
-হাসপাতালে। তোদের বাসা থেকে একটু ভাত দিতে পারবি?
বন্ধু হাসে, আকাটাদের ভাত খাবি? পাপ হবে না তো?
রফিক চুপ করে থাকে, আস্তে করে বলে, 'না। তুই একটা টিফিন বাক্সে ভর। আমি আসতেছি'।

(এটা শুধুই একটা গল্প। কিন্তু কোন হাসপাতালেই কী এরকম হওয়া সম্ভব না? বোঝানোর জন্য লিখলাম যে অসুস্থ, নন-মুসলিমরাও মানুষ। জোর করে তাদেরকে না খাইয়ে রাখাটা কোন ভাল কাজ হতে পারে না। আর ৩২নং ওয়ার্ডের ঘটনাটা সত্যি। সেখানে আসলেই দোকান বন্ধ রাখবার জন্য মাইকিং করা হয়েছে। ভিডিওটা কমেন্টে দিচ্ছি। আমি কেবল চিন্তা করি, আমরা রোজা রাখি বেশ, হোটেল খাওয়ার দোকান খোলা থাকলে আমাদের সংযমের বারোটা বেজে যায়! আর আমাদের আম্মারা যুগযুগ ধরে রোজা রেখে রান্নাঘরে একের পর এক রান্না করে যান, উনাদের সংযমে কোন সমস্যা হয় না...।Nishom Sarkar

Tuesday, May 8, 2018

পায়ের নীচে সর্ষে।

এ মানুষটা আমার কাছে জানতে চাইছিল 'অ্যালিস হাউস' কোনটা? অ্যালিস নামের কেউ এখানে থাকে তার আবার বাসাও আছে এমনটা অন্তত আমার জানা নেই তাই আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, 'অ্যালিসের বাসা তুমি কেন খুঁজছ'?
সে যেটা বলল, লোকজনেরা নাকি তাকে বলেছে অ্যালিসের বাসায় সাপের ডিম, ব্যাঙের ঠ্যাং রাজ্যের আবর্জনা আছে। অনুমতি থাকলে তার দেখার প্রবল ইচ্ছা।

এবার আমার বোঝার বাকী রইল না লোকজনেরা যার কথা বলেছে সেই চিড়িয়াখানার চিড়িয়া আমি ব্যতীত আর কেউ না।  আলী এর কাছে হয়ে গেছে অ্যালিস এবং যথারীতি আলীর বাসা 'অ্যালিস হাউস'!
ইলিয়াস নামের এই মানুষটা সাইকেলে করে পৃথিবী ঘুরতে বেরিয়েছে। সাইকেল নামের ওই জিনিসটায় কী নেই! ঘটিবাটি, চুলা, তাবু সবই আছে। ২৭টা দেশ ঘুরে সে বাংলাদেশে এসেছে এখান থেকে মায়ানমার হয়ে লাউস, কম্বোডিয়া হয়ে কোথায়-কোথায় যেন যাবে।
যে-সব দেশ এ ঘুরে এসেছে একেক করে যখন নাম বলা শুরু করল তখন আমার পক্ষে মনে রাখাই কঠিন হয়ে দাঁড়াল অথচ এ এই দেশগুলো ঘুরে এসেছে। ভারতেই ছিল ঝাড়া দুই মাস। আমি বললাম, 'এক কাজ করো, দেশগুলোর নাম কাগজে লিখে দাও'।
দুই বছর ধরে এ বাড়ির বাইরে। ঘুরে-ঘুরে এর অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। এখন আরও দুই বছর ভ্রমণ করার প্রকাশ্য-গোপন ইচ্ছা এর আছে। ইলিয়াস এবং ইলিয়াসের নামের পরের অংশ বড়ই খটমটে তাই আগেভাগেই বলে নিয়েছি মনে রাখার সুবিধার্থে তোমাকে ইলিয়াস কাঞ্চন ওরফে ইলিয়াস ডাকব।

সেসময় এই মানুষটার তখন খুব তাড়া। সে মাত্রই আগরতলা বর্ডার হয়ে বাংলাদেশে এসেছে এবং ভিসা সংক্রান্ত কি-এক জটিলতার কারণে খানিক পরই সাইকেলে করে ঢাকায় রওয়ানা হবে।
এটা-সেটা করে-করে সময় গড়ায় কিন্তু মানুষটা যাওয়ার নামও নিচ্ছে না। কী কারণে জানি না তার নাকি খুব ভাল লাগছে। কথায়-কথায় আমি বলি, 'তুমি তো অনেক দেশ ঘুরেছ তোমার ঝুলিতে দুনিয়ার অভিজ্ঞতা, না'?
ইলিয়াস মাথা নাড়লে আমি আবারও বলি, 'তুমি কি মার্বেল খেলতে পার'? শোনো কথা, এ নাকি মার্বেলই খেলতে পারে না! তাহলে কী অভিজ্ঞতা অর্জন করলা, বাহে! আমি একে মার্বেল খেলায় লাগিয়ে দেই। ওয়াল্লা, আমাদের বালকবেলার ভাষায় ভালই 'ফইট' করতে পারে দেখি!
আমি একটা বিষয় লক্ষ করেছি এর মধ্যে শেখার ক্ষমতা অসাধারণ। একবার দেখিয়ে দিলেই হয়। এ চমৎকার ফুঁ দিয়ে এই শঙ্খও বাজিয়ে ফেলল।
মহিষের এই শিঙ্গা আমি এক গাঁজাখোরের কাছ থেকে অনেক কায়দাকানুন করে শিখেছিলাম কিন্তু এটাই একে দেখিয়ে দেওয়ার পর এ দিব্যি বিকট ফুঁ দিয়ে দেখিয়ে দিল।
এই বাঁশিটায় অজস্র ছিদ্র। যার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম সেই ওস্তাদজি বাজিয়ে ছিলেন বেশ কিন্তু আমি কখনই এটা বাজানো রপ্ত করতে পারিনি কিন্তু অল্প সময়েই এ এটা বাজাবার কায়দা খানিকটা রপ্ত করে ফেলল!
ইলিয়াসের চোখের এই সানগ্লাসটা ১৯৪২ সালের। এটা যে ভদ্রলোকের তাঁর সঙ্গে ভালই যোগাযোগ ছিল অামার কিন্তু তিনি পরপারে পাড়ি জমাবার পর আর যোগাযোগ হয়নি। এই নিয়ে অবশ্য আমার খেদ নেই। থাকাটা মনে হয় না সমীচীন হত। 
তো, এ সানগ্লাসটা চোখে দিয়ে দিব্যি গোঁফ পাকাতে লাগল। এটা সম্ভবত ভারতে থাকাকালীন রপ্ত করেছে।
তির-ধনুক নিয়ে এর উল্লাস দেখার মত। খানিক পর-পর লাফাচ্ছে, 'আর্চারস...'। কেবল একে 'রণ-পা' নিয়ে হাঁটতে দেইনি কারণ ওল্টে পড়ে উনিশ-বিশ হয়ে গেলে এর বিশ্ব ভ্রমণ লাটে উঠবে।
দেখো কান্ড, সাথে করে আবার এ ক্লারিনেটও নিয়ে এসেছে। বাজায়ও ভাল, মধু-মধু!
আমরা, যাদের ভুঁড়ি দৃশ্যমান মানে পদ্মা সেতুর মত উঁকি দেয়-দেয় ভাব তারা 'বান-তুফানেও' নিয়ম করে ব্যাডমিন্টন খেলি। সেদিন বৃষ্টির কারণে মাঠ ভেজা। আমাদের দেখাদেখি দিব্যি এও ঝাড়ু নিয়ে নেমে পড়ে। 
কথা প্রসঙ্গে আমি জানতে চাইলাম, 'আচ্ছা ইলিয়াস, তুমি যে এত দেশ ঘুরলে এর মধ্যে কোন দেশ তোমার ভাল লেগেছে'।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভেবে-ভেবে এ যে উত্তরটা দিল আমি অনেকখানি অবাক হলাম। অন্তত আমি ভুলেও ইরানের নাম আশা করিনি। ইরানের লোকজনের মায়া, নরোম মন সব মিলিয়ে নাকি এর মনে দাগ কেটে আছে। আসলে লাইলিকে যেমন ছলিমুল্লার চোখ দিয়ে দেখলে হবে না দেখতে হবে মজনুর চোখ দিয়ে তেমনি ইরানকে আমেরিকার চোখ দিয়ে দেখলে হবে না দেখতে হবে ইলিয়াসের চোখ দিয়ে। কোন দেশের সরকারের পলিসি নিয়ে এর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই যেমনটা আমাদের দেশের বেলায়ও।

ওদের স্পেনিশ লেখক সারভান্তিসকে নিয়ে এর গর্বের শেষ নেই। সারভান্তিস আমারও অতি পছন্দের লেখক। তাঁর ডন কুইক্সোট এক অমর সৃষ্টি। ডন কুইক্সোট অভ লা মানচা। 'লা মানচা' নামের যে জায়গাটা সেটা ইলিয়াসের বাসা থেকে কাছেই। ডন কুইক্সোটকে নিয়ে আমার মজার কিছু লেখা আছে 'ডন কুইক্সেট অন দ্য ওয়ে' [১], একালের নাইট, একালের যুদ্ধাপরাধি [২] এটা জেনে এ খুব অবাক হয়। কেন হয় কে জানে! 

স্পেনের কুখ্যাত ষাড়ের লড়াই ছাপিয়ে উঠে যেটা ওরাও আমাদের মত 'বেকুব- পটের গাছ না নারকেল গাছ', যার শেকড় ছড়িয়ে থাকে বহু দূর। এরাও বুড়া হাড় বুকে জাপটে ধরে রাখে। যেমন এর দাদা নেই, দাদি এখনও এদের পরিবারের সঙ্গেই থাকেন।
এ আমার এখানে দুই দিন ছিল। বিদায় বেলায় আমি একে সাবধান করে দেই। বৃষ্টিতে একদম সাইকেল চালাবে না কারণ আমরা আমাদের দেশের বড়-বড় সব গাছ কেটে ফেলেছি দুমদাম করে বজ্রপাতে লোকজন মারা যাচ্ছে।  এবং হাইওয়েতে সাবধান, খুব সাবধান। ফি-রোজ দেদারসে লোকজন মারা যাচ্ছে।
যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ইলিয়াস চোখ নামিয়ে এমন কিছু কথা বলে যা এখানে আলোচনা করা খুব লজ্জার! আমি এটা বিলক্ষণ জানি বিদেশিদের আবেগ খুবই কম-নিয়ন্ত্রিত। এরা খুব গুছিয়ে ভানের কথা বলতে পারে কিন্তু এইসব কথায় এমন কিছু একটা ছিল বুকের ভেতর থেকে অজানা এক বেদনা পাক খেয়ে উঠে। কেবল মাত্র একজন ইলিয়াসই পারে এমন কথা বলতে। মরণ, অহেতুক চোখ ভিজে উঠে।

এরপর যখনই বৃষ্টি নামে তখনই মনে হয়, আহারে-আহারে, ছেলেটা কোথায়-না-কোথায় সাইকেলে ভিজছে...।
Adios, Elias Escribano.


সহায়ক সূত্র:
১. ডন কুইক্সোট অন দ্য ওয়েhttp://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_13.html
২. একালের নাইট, একালের যুদ্ধাপরাধিhttp://www.ali-mahmed.com/2008/08/blog-post.html 
* ভিডিও ঋণ: www.india24live.com-এর সৌজন্যে

Wednesday, May 2, 2018

দানব এগুচ্ছে গুটিগুটি পায়ে।

(অসাধারণ এই লেখাটি যখন পড়ছিলাম, পড়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন এটা একটা কল্পকাহিনী! অন্য গ্রহের অতি তুচ্ছ প্রাণ-জীবাণু কেমন করে অসম্ভব বুদ্ধিমান পৃথিবীর মানুষদের সঙ্গে লড়াই করার পণ নিয়ে নেমেছে। এরা কেমন করে ক্রমশ অজর-দানব হয়ে উঠছে। এই পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে একে-একে মেরে ফেলার নোংরা শলা করছে। কিন্তু এটা আমাদের খুব কাছের গল্প, সত্য ঘটনা...।)

লিখেছেন:  Marufur Rahman Opu 
"বাচ্চাটির বয়স ৪ বছর। ও কি বাঁচবে? প্রশ্নটির উত্তর কারও জানা নেই। ওর কি হয়েছে জানেন? আক্ষরিক অর্থেই ওকে আমরা মেরে ফেলছি। হ্যাঁ, আমি আপনি আমাদের মত মানুষেরাই। আমাদের পাপ বহন করছে এই ৪ বছরের শিশুটি।

"বাচ্চাটি ‘ক্লেবশিয়েলা নিউমোনি’ নামের একটি গোবেচারা টাইপ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত। এর চিকিৎসা অতি সহজ কিন্ত তার প্রস্রাব পরীক্ষা করে দেখা গেলো জীবাণুটি আর গোবেচারা নেই। জীবাণুটি অজর-অক্ষয় হয়ে উঠেছে। পরিচিত সব ধরনের এন্টিবায়োটিক দিয়ে জীবাণুটিকে পরীক্ষাগারে মেরে ফেলার চেষ্টা করে দেখা গেলো জীবাণুটির কিছুই হয়নি- দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে! তাই রিপোর্টে শক্তিশালী এন্টিবায়োটিকগুলোর নামের পাশে R অর্থাৎ রেজিস্টেন্ট বসে গেলো।
এর মানে কি জানেন? এর মানে হচ্ছে এই এন্টিবায়োটিকগুলো দিয়ে বাচ্চাটিকে আর সুস্থ করা যাবে না অথচ এই এন্টিবায়োটিকগুলোর মাঝে ১০টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকা দামের এন্টিবায়োটিকও আছে।

আসলে আমাদের দোষটা কোথায় তাহলে? আমরাই দায়ী- আমরাই এই জীবাণুটি তৈরি করেছি, একে দানব বানিয়েছি। দেখা গেল এই বাচ্চাটি হয়তো এর আগে কোনদিনও কোন এন্টিবায়োটিক নেয়নি, সে সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে এই মাল্টি ড্রাগ রেজিস্টেন্ট জীবাণু দিয়ে। এই জীবানুটি কি করে মাল্টিড্রাগ রেজিস্টেন্ট হলো, শুনবেন?
এই ক্লেবসিয়েলা জীবানুটি কোন একসময় নিরীহ ছিলো। সে কোন-একজনকে আক্রান্ত করেছিলো। সেই বেকুব লোক তখন কোনও দোকান বা ফার্মেসিতে গিয়ে দুইটা ‘এমোক্সিসিলিন’ খেয়ে দেখলো আহা বেশ সুস্থ লাগছে তো, তাই ওই এমোক্সিসিলিন এন্টিবায়োটিক ওষুধটা খাওয়া বন্ধ করে দিলো।

অথচ দুইটা মাত্র ওষুধ খাবার কারণে অনেক ক্লেবশিয়েলার জীবাণু মারা গেলো কিন্তু কিছু বেঁচে রইলো যেহেতু সে পুরো ডোজ কমপ্লিট করে নাই। এরা (ক্লেবশিয়েলার জীবাণু) নিজেদের জেনেটিক মডিফিকেশন করলো যেন এমোক্সিসিলিন এদের মারতে না পারে যেহেতু এরা জানে এমোক্সিসিলিন দেখতে কেমন। ফলে তারা হয়ে গেলো ‘এমোক্স রেজিস্টেন্ট’। এদের বংশধর গিয়ে আরেক বেকুবকে আক্রান্ত করলো সে ‘সেফিক্সিম’ এন্টিবায়োটিক দু-চারটা খেয়ে বন্ধ করে দিলো ফলে বেঁচে যাওয়া ব্যাক্টেরিয়া হয়ে গেলো ‘সেফিক্সিম+এমোক্স রেজিস্টেন্ট’। এভাবে তারা অন্যদের আক্রান্ত করতে থাকলো এবং ভুলভাল ডোজের কারনে ক্রমান্বয়ে সব ড্রাগ এর বিরুদ্ধে রেজিস্টেন্ট হয়ে উঠলো। এটাই মূল প্রক্রিয়া।

ফলে দেখা যাচ্ছে এই জীবাণু তৈরিতে বাচ্চাটির হয়তো কোন ভূমিকা নেই। দোষ করেছে অন্য কেউ, শাস্তি পাচ্ছে বাচ্চাটি। সেই অন্য কেউ তার বাবা মা হতে পারে, নিকটাত্নীয় হতে পারে বা অপরিচিত কেউও হতে পারে। আমি, আপনিও হতে পারি। এই বাচ্চাটিকে এখন বাঁচানো কঠিন। যেহেতু সব এন্টিবায়োটিক অকার্যকরি প্রমাণিত তাই শেষ একটা ভরসার এন্টিবায়োটিক আছে যা হয়তো জীবাণুটিকে মারতে পারবে কিন্তু কিডনির ক্ষতি করে ফেলবে। কপাল খারাপ হলে এই শেষ ভরসা এন্টিবায়োটিকও হয়তো রেজিস্টেন্ট হতে পারে।
এসব রোগী সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা আর নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জোরে বাঁচলেও বাঁচতে পারে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাঁচানো কঠিন।

পাপ মোচনের এখনো সময় আছে। হয়তো সব জীবাণু রেজিস্টেন্ট হয়ে যায়নি। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দোকান থেকে ইচ্ছামত এন্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া বন্ধ করুন। আপনার চিকিৎসক যে ডোজে যতদিন খেতে বলেছে ততদিন সেই ডোজেই খান, না কমলে আবারো সেই চিকিৎসকের কাছেই যান।

জীবাণুমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন, হাত ধুয়ে খাওয়া, মাস্ক ব্যবহার, হাঁচি-কাশির ভদ্রতা মেনে চলা এগুলো পালন করুন। শুধু নিজে করলেই হবে না অন্যকেও উৎসাহিত করুন, আপনি ফার্মেসি ব্যবসায়ী হলে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ করুন, ফার্মেসিতে অন্য কাউকে এভাবে ওষুধ কিনতে দেখলে তাকে বোঝান। ভুয়া ডাক্তারদের চিহ্নিত করে ধরিয়ে দিন, চিকিৎসা পরামর্শ ফেসবুকে বা পাড়াপ্রতিবেশী থেকে নেবার প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান কারণ এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবেন আপনি, নবজাতকের কাছে এ আপনার দৃঢ় অংগীকার। Marufur Rahman Opu