Saturday, July 20, 2019

আমাদের বাবুটা!

লেখক: Chand Sultana Chy

আমাদের ফুটফুটে, দূরন্ত, নিস্পাপ বাচ্চা মো: ইরতিজা শাহাদ (প্রত্যয়)! আগামী ২৩ জুলাই যার ৭ বছর পূর্ণ হত। গত ০৫/০৭/২০১৯ ইং তারিখে স্কয়ার হাসপাতালে PICU (Paediatric Intensive Care unit)-এ ডেংগু জ্বরের চিকিৎসাধীন অবস্থায় PICU-এর consultant Dr. Ahmed Syed-এর চরম অবহেলা, জরুরি সময়ে অনুপস্থিতি এবং Unskilled Duty Doctor-এর ডেঙ্গু জ্বরের একমাত্র চিকিৎসা Fluid Management-এর চরম অদক্ষতা ও ভুলের কারণে আমাদের ছেড়ে জান্নাতের বাগানের ফুল হয়ে চলে গেছে।আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় আমাদের বাবাসোনাকে হারানোর বেদনা, আমার মেয়েকে তার একমাত্র ছোট ভাইকে হারানোর ব্যাথা সহ্য করার তৌফিক দান করুন!

যে কোন বাবা-মার কাছে তার সন্তান সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আমাদের কাছেও তা-ই । আজকে আমার ছেলের চলে যাওয়া নিয়ে লিখছি কারণ আমি চাই না আর কোন বাবা-মা তাদের বাচ্চাকে শুধুমাত্র ডাক্তারের অবহেলার কারণে হারিয়ে ফেলুক।

স্কয়ার হাসপাতাল আমাদের দেশের তথাকথিত নামী হাসপাতাল! তাদের Paediatric Care Unit-এর যে চরম অদক্ষতা তা নিজের বাচ্চা হারানোর মাধ্যমে বুঝতে পারলাম। ০৪/০৭/২০১৯ ইং সকালে আমার বাবুটা কথা বলতে-বলতে  হেঁটে যখন গাড়িতে উঠল তখন তার BP low এবং Pulse Slow ছিল।
আমরা তাকে আনোয়ার খান মডার্ন হসপিটালে ভর্তি করালাম। সেখানে Fluid inject করার পর আধা ঘন্টার মধ্যে বাচ্চার BP স্বাভাবিক হলো- ১১০/৯০ এবং পালসও স্বাভাবিক হলো। এরিমধ্যে ওর ২ বার urination-ও হয়। তখন আমার বাচ্চা আমাকে বলে, 'mom আমি তো better feel করছি, আমি কি এখন বাসায় যাব'?

Female duty doctors-রা আমার বাচ্চাকে আদর করছিল! এমন সময় আমাদেরকে ওখানকার পরামর্শ দিলেন বাবুটাকে অন্তত ১ দিন close monitoring-এ রাখলে ভালো হয় কারণ BP monitoring করে fluid দিতে হবে কিন্তু Anwar Khan Modern -এ PICU না থাকাতে সেটা ওখানে সম্ভব না । উনি আমাদেরকে বলেছিলেন বিপি আবার কমে গেলে PICU লাগতে পারে। অবশ্য সেটা যে তখনই লাগবে সেটা বলেননি । যেহেতু ওখানে PICU নেই For better monitoring we shifted to Square Hospital as per his Suggestion. তখন বাচ্চার BP, Pulse, Urine সবই স্বাভাবিক ছিল।

Square Hospital-এ গেলে ওরা জরুরি বিভাগ থেকে সরাসরি PICU-তে দিয়ে দিল। দুপুরে বাচ্চা ঘুমাচ্ছিল আর PICU এর Consultant আমাদেরকে brief করলেন বাচ্চা ৯০ ভাগ ঠিক আছে আর যে ১০ ভাগ sick সেটুকু ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সুস্থ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ! এরপর তিনি বাচ্চার treatment plan দিয়ে চলে গেলেন।
আমি বাচ্চাকে দেখে আসলাম ঘুমোচ্ছে। বিকাল ৫ টায় বাচ্চাকে স্যুপ খাওয়ালাম, গল্প করলাম, অভয় দিলাম। ও নার্সের সাথে ঝগড়া করছিল এজন্য সে বড় বেবী তাই ডায়াপার পড়বে না বলে। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। সন্ধ্যা ৭ টায়ও ঘুমাচ্ছিল। রাত ৮ টায় ওর বাবাকে বলল, 'mom কই? আমার ক্ষিধে লেগেছে, আমি খাব'।

রাত ৯ টায় PICU-তে সবার Duty Shift হল। নতুন ডিউটি ডাক্তার , নতুন নার্স। আমি PICU তে ঢুকে দেখলাম বাচ্চা Nurse-এর সঙ্গে আবারও ঝগড়া করছে আবারও ডায়াপার পরিয়েছে বলে! তারপর যখন স্যুপ খাওয়াতে চাইলাম ও বলল, 'এগুলো রোগিরা খায় আমি খাব না '! এরপর বলল, 'এরা সবাই পঁচা আমি এখানে থাকব না, আমাকে বাসায় নিয়ে যাও, তুমি take care কর, আমি ভালো হয়ে যাব'!

তখন আমি লক্ষ করলাম বাবুটা restless হয়ে যাচ্ছে, স্যালাইন ছুটে গেছে অথচ আশেপাশে কোন ডাক্তার, নার্স নেই! বাচ্চাটার sweating হচ্ছে আমি নিজেই মুছে দিচ্ছিলাম! ডিউটি ডাক্তারকে চিৎকার করে ডাকলাম তখন নার্স এসে স্যালাইন ঠিক করে দিল। ডিউটি ডাক্তার এসে ওকে দেখে কোন কিছু না-করেই কানে ফোন লাগিয়ে চলে গেল। আর নার্স আমার বাচ্চাকে শান্ত করার পরিবর্তে বলল, 'তোমাকে কিন্তু injection দিয়ে দিব'! এই হচ্ছে একটা বাচ্চার সঙ্গে নার্সের আচরণ!!
আমি বাবুটাকে এটা-সেটা বলে শান্ত করলাম। ও বলল, 'Mom আমাকে আয়-আয় চাঁদ মামা গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও'! আহারে-আহারে, জীবনের শেষ ঘুম পাড়ালাম আমি আমার বাবুটাকে! আর তখন ডিইটি ডাক্তার আমাকে এসে বলল, 'আপনি এখন যান, আমরা ওকে ওষুধ দেব'। এরপর তারা আমাকে আর আমার স্বামীকে আর ঢুকতে দিল না!

রাত ১১:৪০। Consultant Dr. Ahmed Syed দৌড়াতে দৌড়াতে আসলেন। এসে ১৫ মিনিট পরে আমাদের বললেন, 'আপনাদের বাচ্চার ফিফটি-ফিফটি অবস্থা, আপনারা অন্য কোথাও নিয়ে যেতে চাইলে নিতে পারেন''!
অথচ যে ডাক্তার বিকেলেও বললেন চিন্তার কোন কারণ নেই রিপোর্ট দেখে বলেছিলেন বাচ্চার lung একদম clear সেই ডাক্তার রাতে এসে বললেন বাচ্চার lung এর ৯৫% পানিতে ভর্তি! যে বাচ্চাটা আমার সাথে রাত ৯:৩০ পর্যন্ত কথা বললো, খেতে চাইল সেই বাচ্চাকে তারা life Support এ নিয়ে গেল। তখনও আমার বাবুটা mom-mom বলে চিৎকার করছিল! এরপর Consultant Dr. Ahmed Syed আমার বাবুকে life support এ দিয়ে বাসায় চলে গেলেন। মোবাইল অফ করে দিলেন।
ডিউটি ডাক্তার আমাদেরকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না! আমার স্বামী নিজে একজন ডাক্তার তাকেও তারা এলাউ করছিল না। অনেক হইচই করে আমার স্বামী ভেতরে ঢুকে দেখল আমাদের বাবুটার Blood Pressure zero but they don’t even bother to inform us.

যখন জিজ্ঞেস করা হল তখন বলল আমরা চেষ্টা করছি BP raise করার। আমার বাবুটার lowest platelets level ছিল ৪০,০০০! সকাল হয়ে গেল Consultant Dr. Ahmed Syed-এর দেখা নেই। অনেক ঝামেলা করে Consultant-কে আনতে হল। উনি এসেই আমাকে আরেকটা বাচ্চা মারা যাবার কাহিনী বলা শুরু করেছিলেন তখন আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, আমার বাচ্চার কথা বলুন আমাকে!
ওই ডাক্তার বললেন, আপনার বাচ্চা-কে নিস্তেজ করা যাচ্ছিল না, তাই adult dose দিতে হয়েছে। উনি আমাদেরকে আরও বললেন, বাচ্চার ৬০০ ml urination হয়েছে, যা ছিল ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ বাবুটা আগে থেকেই ডায়াপার পরানো ছিল তাহলে urine মাপলো কি দিয়ে?! এরপর Consultant Dr. Ahmed Syed আবারও উধাও! মোবাইলও বন্ধ !!

আমাদেরকে  ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না । আমি দুপুর ১ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। এরপর আমি জোর করে ঢুকে দেখি বাবুটার মাথার নিচে বালিশ নেই! আহ, আমার যা বোঝার বোঝা হয়ে গেল! আমি জোর করে ঢুকে যাওয়াতে তারা তাদের নাটকের ইতি টানতে বাধ্য হল !

আমার বাবুটার তো condition critical ছিল না। আমরা আমাদের বাবুটাকে better monitoring এর জন্য Square Hospital-এ নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমার বুক খালি করে দিল! আমরা আমাদের বাবুটার সমস্ত রিপোর্ট দেখেছি অন্যান্য বিশেষজ্ঞ Consultant-দেরও দেখিয়েছি। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে শুধুমাত্র Square Hospital PICU-এর Consultant ডাক্তারের চরম অবহেলা আর Duty Doctor-দের চরম অদক্ষতা ও ভুলের কারণে আমাদের সোনাবাবাকে আমাদের হারাতে হয়েছে!


এটা কিভাবে সম্ভব যে এমন একটা নামি হাসপাতালের PICU/NICU-তে একজন মাত্র Consultant Doctor থাকে আবার তাকে on call-এ নিয়ে আসতে হয়? আর উনি কিভাবে এটা বলেন যে, শুক্রবার আমি আসি না কেবল আপনার বাচ্চার জন্য এসেছি! উনি তো বাচ্চাদের দায়িত্বে থাকেন উনি কিভাবে তার দায়িত্ব অবহেলা করেন?!

আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহতায়ালা অন্যায়কারীদের বিচার করবেন। কিন্তু তাই বলে কি তারা তাদের দায়িত্বে অবহেলার মাধ্যমে আরো মা-বাবাকে সন্তানহারা করবে, তারা কি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে?

Friday, July 19, 2019

মনে রেখ, স্রেব্রেনিৎসা!

লেখক: Nadia Islam

১৯৯৫ সালের ১১ জুলাইয়ের এক সকালে স্রেব্রেনিৎসার পতোচারি গ্রামের সকল পুরুষরে পিছমোড়া কইরা হাত বাইন্ধা এক লাইনে দাঁড় করায়ে গুলি কইরা হত্যা করা হয়। উনাদের কারো চোখ বাঁধা হয় নাই।

উনাদের চোখ খোলা রাখা হইছিলো যেন উনারা নিজেদের হত্যাকারীরে চোখ দিয়া দেখতে পারেন, যেন বুঝতে পারেন কী অপরাধে উনাদের হত্যা করা হইতেছে!

উনাদের হত্যা করা হইছে, কারণ উনাদের অপরাধ ছিলো, উনারা সবাই ধর্মীয় বিশ্বাসে মুসলিম ছিলেন।

৮ বছরের শিশু থিকা ৮০ বছরের বৃদ্ধ সহ প্রায় ২০,০০০ মুসলিম পুরুষরে মাত্র এক দিনে, ১৯৯৫ সালের ১১ জুলাইয়ের এক সকালে পিছমোড়া কইরা হাত বাইন্ধা এক লাইনে দাঁড় করায়ে হত্যা করে মিলোসোভিচের সার্বিয়ান অর্থোডক্স আর্মি।

শুধুমাত্র উনারা সবাই ধর্মীয় বিশ্বাসে মুসলিম ছিলেন বইলা!

এই বছরের ১১ জুলাই আমি স্রেব্রেনিৎসাতে গেছিলাম। স্রেব্রেনিৎসার ৬ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে পতোচারি গ্রাম। গ্রীষ্মের সকালে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়ায়ে আমি যেইদিকেই তাকাইলাম, সেইদিকেই দেখলাম হাজার হাজার কবরের হাজার হাজার সাদা পাথরের টুম্বস্টোন দেখা যায়।

সেই টুম্বস্টোনের নিচে লাশ নাই, কারণ গণহত্যা শেষে উনাদের লাশ বেয়নেট দিয়া খোঁচায়ে ক্ষতবিক্ষত কইরা দেওয়া হয়, কুকুর এবং শেয়ালদের খাওয়ার জন্য সেই লাশ ফালায়ে রাখা হয় পাহাড়ের ঢাল জুইড়া। তাই টুম্বস্টোনের নিচে লাশ নাই একটাও।

আমি দেখলাম, একটা টুম্বস্টোনের পাশে হেলান দিয়া একজন ভদ্রমহিলা বইসা বইসা একমনে সুরা ইয়াসিন পড়তেছেন। উনার চোখভর্তি পানি।

আমি তাকায়ে দেখলাম টুম্বস্টোনের গায়ে তারিখ লেখা। ১৯৮০-১৯৯৫। ভদ্রমহিলা আমার দিকে শূণ্যদৃষ্টিতে তাকাইলেন। আমি কথা না বাড়ায়ে দ্রুত হাঁইটা গেলাম সামনে।

দুপুরবেলা জানাজা নামাজ হইলো।

এইরকম জানাজা নামাজ আমি এর আগে দেখি নাই। মুসলিম এবং দাড়ি টুপি হিজাবধারী থিকা শুরু কইরা অর্থোডক্স খ্রিশ্চান এবং ইহুদি ও শর্টস পরা, ট্যাটু করা সকল মানুষ একসাথে পাহাড়ের ঢালে বুকে হাত বাইন্ধা দাঁড়াইলেন। কেউ কইতে আসলেন না, মেয়েরা জানাজা নামাজ পড়তে পারবেন না, কেউ কইতে আসলেন না, মেয়েরা পুরুষদের আগে লাইনে দাঁড়াইতে পারবেন না, কেউ কইতে আসলেন না, ইহুদীরা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে সেজদা দিতে পারবেন না।

আমি শুনলাম, মৃত্যু উপতক্যার মাঝখানে পাহাড়ের দেয়ালে দেয়ালে ইমামের গলার স্বর প্রতিধ্বনিত হইতেছে, উনি বলতেছেন, “অন্যায়ভাবে হত্যা হওয়া পৃথিবীর সকল মানুষকে তুমি তোমার পাশে আসন দিও, আল্লাহ!”

আমি নিজের অজান্তে আমার অস্ত্বিত্বহীন ঈশ্বরের অস্তিত্বের বাসনায় হাত উঠাইলাম আকাশে! ভাবতে চাইলাম এই পৃথিবী ভালোবাসায় সৃষ্টি হওয়া পৃথিবী, ১৫ বছরের কিশোরের লাশহীন কবরের পাশে বইসা থাকা মায়েদের শূণ্যদৃষ্টির জন্য, পুরুষশূণ্য বিধবাদের গ্রামের জন্য, মর্টারে উইড়া যাওয়া কনসেনট্রেশান ক্যাম্পের রক্তের দাগে আঁকা আজকের মৃতদের হিসাবের জন্য, ধর্ম আর রাজনীতি আর সীমানা আর ক্ষমতার যুদ্ধে কংকালসার জীবন্ত লাশের সারির জন্য নিশ্চই এই পৃথিবীর সৃষ্টি হয় নাই!

আমি চোখ তুইলা দেখলাম, বার্চ গাছের আড়ালে দাঁড়ায়ে পনেরো বছরের একজন কিশোর কী জানি এক আপেল না কীসে কামড় দিতে দিতে আমার দিকে তাকায়ে মুচকি মুচকি হাসতেছেন।

Monday, July 15, 2019

ফ্রিডম অভ স্পিচ: সেকাল-একাল

লেখক: মোয়াজ্জেম হোসেন, বিবিসি বাংলা, লন্ডন।

'"আপনার কবিতা পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপানোর জন্য কী কোন নির্দেশ আছে'?
নয় বছরের শাসনামলে সেনাশাসক জেনারেল এরশাদকে কোন সংবাদ সম্মেলনে এরকম বিব্রতকর প্রশ্নের মুখোমুখি সম্ভবত আর হতে হয়নি।

১৯৮৩ সালের অক্টোবর মাস। জেনারেল #এরশাদ তখন বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। মাত্র তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরেছেন।
সংসদ ভবনে তখন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দফতর (সিএমএলএ)। সেখানে রীতি অনুযায়ী এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। জেনারেল এরশাদ কথা বলবেন তার যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে।
জাহাঙ্গীর হোসেন তখন সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস এর কূটনৈতিক সংবাদদাতা। এখন তিনি ঢাকায় অবসর জীবনযাপন করছেন। বিবিসি বাংলার সঙ্গে টেলিফোনে তিনি বর্ণনা করছিলেন ৩৬ বছর আগের সেই সংবাদ সম্মেলনটির কথা।

'সংবাদ সম্মেলনটি হচ্ছিল পার্লামেন্ট ভবনের দোতলায় এক নম্বর কমিটি রুমে। জেনারেল এরশাদকে প্রচুর রাজনৈতিক প্রশ্ন করা হচ্ছিল, কারণ তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডেকেছিলেন। কিন্তু কোন দল তার ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না। কেউ তার সঙ্গে কথা বলতে আসছিল না। বিরক্ত হয়ে জেনারেল এরশাদ বলেছিলেন, আমি কি রেড লাইট এলাকায় থাকি যে আমার সঙ্গে কেউ কথা বলবে না?'
সংবাদ সম্মেলনের এই পর্যায়ে জাহাঙ্গীর হোসেন উঠে দাঁড়িয়ে জেনারেল এরশাদকে বললেন, 'মে আই আস্ক ইউ এ নন-পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন' অর্থাৎ আমি কি আপনাকে একটি অরাজনৈতিক প্রশ্ন করতে পারি?
জেনারেল এরশাদ বেশ খুশি হয়ে গেলেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর হোসেন যে প্রশ্নটি তাকে ছুঁড়ে দিলেন, সেটির জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। একজন প্রবল ক্ষমতাধর সামরিক শাসক আর এক সাংবাদিকের মধ্যে এই প্রশ্নোত্তর পর্ব বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় প্রবাদতুল্য হয়ে আছে। ইংরেজীতে তিনি যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তার বাংলা তর্জমা এরকম:
'আপনি ক্ষমতায় আসার আগে কেউ জানতো না আপনি একজন কবি। এখন সব পত্রিকার প্রথম পাতায় আপনার কবিতা ছাপা হয়। পত্রিকার প্রথম পাতা তো খবরের জন্য, কবিতার জন্য নয়। বাংলাদেশের প্রধানতম কবি শামসুর রাহমানেরও তো এই ভাগ্য হয়নি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে আপনার কবিতা প্রথম পাতায় ছাপানোর জন্য কী কোন নির্দেশ জারি করা হয়েছে'?

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সবাই হতচকিত। জেনারেল এরশাদের পাশে বসা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ আর এস দোহা বললেন, 'শামসুর রাহমান ইজ নট দ্য সিএমএলএ... ' (শামসুর রাহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নন)।
জেনারেল এরশাদ অবশ্য তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে থামিয়ে দিলেন। তিনি প্রশ্নকারী সাংবাদিককে বললেন, 'আমি দেশের জন্য এত করি, এটুকু কি আপনি দেবেন না আমাকে'?
তখন আমি বললাম, 'ওয়েল জেনারেল, আস্কিং কোয়েশ্চেন ইজ মাই প্রিরোগেটিভ, আনসারিং ইজ ইয়োর্স। ইউ হ্যাভ নট আনসার্ড মাই কোয়েশ্চেন। মাই কোয়েশ্চেন ইজ....' (প্রশ্ন করার অধিকার আমার, উত্তর দেয়ার অধিকার আপনার। কিন্তু আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি। আমার প্রশ্নটি হচ্ছে..) জাহাঙ্গীর হোসেন এরপর তার প্রশ্নটি আবার করলেন।
এবার জেনারেল এরশাদ বললেন, 'আপনি যদি চান, আর ছাপা হবে না'।

এরপর পত্রিকার প্রথম পাতায় জেনারেল এরশাদের কবিতা ছাপা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার কবিতা প্রথম পাতা থেকে চলে গিয়েছিল ভেতরের পাতায়। তবে এর পরিণাম ভোগ করতে হয়েছিল জাহাঙ্গীর হোসেনকে।
'এ ঘটনার পর আমাকে বদলি করে দেয়া হয় চট্টগ্রামে। আমি যেতে চাইনি। আমার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমাকে ব্যুরো এডিটর করে পাঠিয়ে দেয়া হলো। আমি দুবছর ছিলাম। দুবছর পর আমি পদত্যাগ করে সেখান থেকে চলে আসি'।

সামরিক শাসক যখন কবি:
এটি ছিল এমন এক সময়, যখন কবিতাকে ঘিরেই চলছিল বাংলাদেশে রাজনীতির লড়াই। একদিকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা সেনাশাসক জেনারেল এরশাদ, যিনি কবিখ্যাতি পাওয়ার জন্য আকুল। অন্যদিকে বিদ্রোহী একদল তরুণ কবি, যারা কবিতাকে পরিণত করেছেন তাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের প্রধান অস্ত্রে।
প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পাতায় তখন হঠাৎ হঠাৎ ছাপা হচ্ছে জেনারেল এরশাদের কবিতা। ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যে বেরিয়ে গেছে তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ, 'কনক প্রদীপ জ্বালো'। বঙ্গভবনে নিয়মিত বসছে কবিতার আসর। ঢাকার সেসময়কার প্রথম সারির নামকরা কিছু কবি তাকে ঘিরে থাকেন এসব অনুষ্ঠানে। কবি এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা মোফাজ্জল করিম তখন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। ক্ষমতা গ্রহণের আগে পর্যন্ত এরশাদের কবিতানুরাগের কথা তিনি শোনেননি, স্বীকার করলেন তিনি।
মোফাজ্জল করিম ছিলেন এরশাদকে ঘিরে থাকা কবিগোষ্ঠীর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ। এর কিছুটা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে, কিছুটা তার কবিতা চর্চার সুবাদে। একারণে এরশাদের বঙ্গভবনের কবিসভায় তিনিও আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন।

'কবিতার প্রতি তার অনুরাগের কথা আমরা প্রথম জানতে পারি ক্ষমতা নেয়ার মাসখানেক পরে এক অনুষ্ঠানে', স্মৃতি হাতড়ে জানালেন তিনি।
'সেই অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে বক্তৃতা দিতে। শিল্পকলা একাডেমীর মিলনায়তনে এটা হয়েছিল। উনি বক্তৃতা করলেন। আমরা সবাই সামনে বসে শুনছি। তারপর বক্তৃতার শেষে তিনি হঠাৎ করে বললেন, "কাল রাতে আমি একটি কবিতা লিখেছি'।"
'এরপর কবিতাটি তিনি পড়ে শোনালেন। সেই প্রথম আমরা তার কবিতা শুনলাম'।

সরকারি ট্রাস্ট থেকে তখন প্রকাশিত হতো দৈনিক বাংলা এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা। দৈনিক বাংলার সম্পাদক তখন শামসুর রাহমান। দুটি কাগজেই নিয়মিত ছাপা হতে লাগলো জেনারেল এরশাদের কবিতা। বঙ্গভবনে তখন যে কবিতার আসর বসতো তাতে একদিন যোগ দিলেন মোফাজ্জল করিম।
'আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল আমার এক কবিবন্ধু এবং সহকর্মী মনজুরে মাওলা। আমি অনেক অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে সেখানে গিয়েছিলাম। প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ বা অনুরোধ, এখানে না গেলে আবার কি না কি হয়, তাই গেলাম, কবিতাও পাঠ করেছিলাম। তো সেখানে আমি লক্ষ্য করেছিলাম, অনেক খ্যাতনামা কবি সেখানে ছিলেন'।"
সেই কবিকুলের মধ্যে প্রধান দুই ব্যক্তি ছিলেন কবি ফজল শাহাবুদ্দীন এবং কবি ইমরান নুর, (এটি তার ছদ্মনাম, তার আসল নাম মনজুরুল করিম, সরকারের ডাকসাইটে আমলা ছিলেন)। মোফাজ্জল করিম মনে করতে পারেন এরা দুজন বিভিন্নভাবে এরশাদ সাহেবের নৈকট্য লাভ করেছিলেন।

তখন কবিদের দুটি সংগঠন ছিল। একটির নাম কবিকন্ঠ। এর নেতৃত্বে ছিলেন ফজল শাহাবুদ্দীন। তার সঙ্গে ছিলেন আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসানের মতো কবিরা। এরশাদ ছিলেন এই সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কবিকন্ঠ বেশ সক্রিয় ছিল। তারা জেনারেল এরশাদকে বলে ধানমন্ডিতে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি এই সংগঠনের নামে বরাদ্দ নেন। সেখানে প্রতি মাসে কবিতার আসর বসতো। সেখানে এরশাদ থাকতেন প্রধান অতিথি। তিনি নিজে কবিতাও পড়তেন।
শামসুর রাহমান এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মিলে কবিদের আরেকটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেটার নাম ছিল 'পদাবলী'। তাদের ঘিরে জড়ো হন আরেকদল কবি।
বাংলাদেশের কবিদের জন্য এটি ছিল এক অভূতপূর্ব সময়। দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তি কবিতার অনুরাগী, কবিযশপ্রার্থী। কাজেই কবিদের মধ্যে শুরু হলো একধরণের প্রতিযোগিতা, কিভাবে কবিতার মাধ্যমে তার নৈকট্য এবং আশীর্বাদ পাওয়া যায়। দেশে সংবাদপত্রগুলোর ওপর তখন জারি রয়েছে কঠোর সেন্সরশীপ। কিন্তু তার মধ্যে নানা কথা, নানা গুজব ভেসে বেড়ায়।
একটি গুজব ছিল, জেনারেল এরশাদের নামে ছাপা হওয়া এসব কবিতা আসলে লিখে দেন নামকরা কজন কবি।
মোফাজ্জল করিম স্বীকার করলেন, এরকম কথা তাদের কানেও এসেছিল তখন। তখন বাংলাদেশের বেশ নামকরা কজন কবির নামই তারা শুনেছিলেন, যারা একাজ করতেন।
'আমরা শুনতাম, কিন্তু এর বেশি আমরা জানতাম না আর কিছু। তবে আমি এটা বিচার করতে যাইনি। এসব কবিতা এরশাদ সাহেবের নামে ছাপা হচ্ছে, আমি সেভাবেই দেখেছি। কে লিখে দিচ্ছে, কেন লিখে দিচ্ছে, সেটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাইনি'

নিষিদ্ধ কবিতা:
পত্রিকার প্রথম পাতায় সামরিক শাসকের কবিতা নিয়ে যখন এত আলোচনা, তখন বাংলাদেশে গোপনে হটকেকের মতো বিক্রি হচ্ছে এক নিষিদ্ধ কবিতা। 'খোলা কবিতা' নামে সেই কবিতা কেউ প্রকাশ করতে সাহসই করছিল না। কবির নাম মোহাম্মদ রফিক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের শিক্ষক।
নিষিদ্ধ কবিতাটির কয়েকটি পংক্তি এরকম:
'সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই, দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই...'
পুরো কবিতাটি ছিল অনেক দীর্ঘ, প্রায় ১৬ পৃষ্ঠা। এটি গোপনে ছাপানো হয় এক ছাপাখানায়। নিউজপ্রিন্টে এক ফর্মায় ছাপানো সেই কবিতা গোপনে বিলি করেন মোহাম্মদ রফিকের ছাত্র-ছাত্রীরা। হাতে হাতে সেই কবিতা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। কিভাবে রচিত হয়েছিল সেই কবিতা, সেই কাহিনী শোনালেন মোহাম্মদ রফিক, যিনি এখন ঢাকায় অবসর জীবনযাপন করছেন।
'কবিতাটি আমি লিখেছিলাম জুন মাসের এক রাতে, এক বসাতেই। আমার মনে একটা প্রচন্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, মনে হচ্ছিল একজন ভুঁইফোড় জেনারেল এসে আমাদের কবিতার অপমান করছে'।
তার মানে তার এই কবিতার লক্ষ্য তাহলে ছিলেন জেনারেল এরশাদই?
'এটা শুধু এরশাদকে নিয়ে লেখা কবিতা নয়। এরশাদের মার্শাল ল জারি আমার কাছে একটা ঘটনা। কিন্তু একজন লোক, যে কোনদিন লেখালেখির মধ্যে ছিল না, ভূঁইফোড় সে আজ সামরিক শাসন জারির বদৌলতে কবিখ্যাতি অর্জন করবে, এটা তো মেনে নেয়া যায় না'।

মোহাম্মদ রফিক ছিলেন ষাটের দশকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। এজন্যে জেলও খেটেছেন। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের মধ্যে তিনি পাকিস্তানি আমলের সামরিক শাসনের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। তার কবিতায় তিনি এর প্রতিবাদ জানালেন।
নিষিদ্ধ খোলা কবিতা তখন নানা ভাবে কপি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। টনক নড়লো নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর। একদিন মোহাম্মদ রফিকের ডাক পড়লো সাভারে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের দফতরে।
'সেখানে তিনজন সেনা কর্মকর্তার মুখোমুখি আমি। তাদের প্রথম প্রশ্ন, এটা কি আপনার লেখা। আমি বললাম হ্যাঁ, আমার লেখা। আমি তাদের বললাম, আমি আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেব, কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দেব না। সেটা হচ্ছে, এটি কে ছেপে দিয়েছে। কারণ আমি তাকে বিপদে ফেলতে চাই না'
এর কিছুদিন পর মোহাম্মদ রফিকের নামে হুলিয়া জারি হয়। তাকে কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকতে হয়।

কবিদের বিদ্রোহ:
এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তখন চলছে নানা জোয়ার-ভাটা। আন্দোলন কখনো তীব্র রূপ নিচ্ছে, আবার কখনো ঝিমিয়ে পড়ছে। ১৯৮৭ সাল। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বড় দলগুলোর মধ্যে যখন চলছে নানা টানাপোড়েন, তখন তরুণ কবিরা এক বিরাট কাণ্ড করে ফেললেন। ঢাকায় তারা এক বিরাট কবিতা উৎসবের আয়োজন করলেন, যার নাম দেয়া হলো 'জাতীয় কবিতা উৎসব।'
এই বিদ্রোহী কবিদের নেতৃত্বে আছেন শামসুর রাহমান। তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি। আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মূল সংগঠকের দায়িত্বে সেই রাগী বিদ্রোহী কবি #মোহাম্মদ_রফিক
কিভাবে এই কবিতা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল, সেটি বলতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন তিনি।
'তখন অনেক তরুণ কবির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। বিশেষ করে রুদ্র, কামাল, এরা অনেকে আমার কাছাকাছি ছিল। আমরা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বা আশে-পাশে আড্ডা দেই। আমাদের মধ্যে তখন আলাপ চলছিল, এরকম কিছু করা যায় কীনা। সেখান থেকেই এর শুরু। তরুণ কবিরাই এর উদ্যোগ নেন। আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেন রফিক আজাদ'।

১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারী ১ এবং ২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় টিএসসির মোড়ে প্রথম জাতীয় কবিতা উৎসব শুরু হলো। সারা বাংলাদেশের কবিরা জড়ো হলেন সেখানে।
এই উৎসব কার্যত পরিণত হলো এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের এক বিরাট মঞ্চে। প্রথম উৎসবের শ্লোগানটাই ছিল, 'শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবিতা'। উৎসবে যত কবিতা পড়া হতো, তাতে রাজনৈতিক কবিতার সংখ্যাই বেশি।
একদিকে সরকার বিরোধী কবিরা যখন রাজপথ গরম করছেন, তখন বঙ্গভবন-কেন্দ্রিক কবিরাও এশিয় কবিতা উৎসব নামে আরেকটি উৎসব করছেন সরকারী আনুকুল্যে। এরশাদ তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তাতে বিভিন্ন দেশের নামকরা কবিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হলো। ১৯৮৯ সালে তাদের একটি উৎসবে যোগ দিতে এসেছিলেন ইংল্যান্ডের সেসময়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান কবি টেড হিউজ।
কিন্তু বিদ্রোহী কবিরা যেভাবে সরকার বিরোধী আন্দোলনে উত্তাপ ছড়িয়ে যাচ্ছিলেন, তা জেনারেল এরশাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। ১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় বারের মতো ঢাকায় জাতীয় কবিতা উৎসবে ঘটলো এক অভাবিত ঘটনা। সেবারের উৎসবের শ্লোগান 'স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা।" উৎসব মঞ্চে অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশের একজন নামকরা শিল্পী, কামরুল হাসান। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি সেখানেই ঢলে পড়েছিলেন। তবে মৃত্যুর আগের মুহূর্তে তিনি এঁকেছিলেন একটি স্কেচ, যার নীচে তিনি লিখেছিলেন, 'দেশ আজ #বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে।'
উৎসবের কর্মীরা রাতারাতি সেই স্কেচ দিয়ে পোস্টার ছাপিয়ে ফেলেন, কিন্তু বিলি করার আগেই পুলিশ হানা দিয়ে জব্দ করে অনেক পোস্টার। একজন শিল্পীর আঁকা একটি স্কেচ যেন একজন সেনাশাসকের ক্ষমতার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

একটি গণঅভ্যুত্থান: 
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এক ব্যাপক ছাত্র-গণ অভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটে এরশাদের। পদত্যাগে বাধ্য হন তিনি।
কিন্তু তারপর যেভাবে একদিন ধুমকেতুর মতো বাংলাদেশের কাব্যজগতে তার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, সেভাবেই হঠাৎ করে তার কবিতা যেন হারিয়ে যায়। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির কারণে তাকে কারাবাসে যেতে হয়। তবে সেখানে অখন্ড অবসর সত্ত্বেও তিনি কবিতার চর্চা করেছেন এমন খবর পাওয়া যায়নি। আর পত্রিকার প্রথম পাতা শুধু নয়, ভেতরের পাতাতেও তার কোন কবিতা আর ছাপা হতে দেখা যায়নি।
কিন্তু যেসব কবিতা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নামে প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে তার কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে কী ধারণা পাওয়া যায়?
মোফাজ্জল করিম বলছেন, এরশাদের মধ্যে একটা কবি মন ছিল বলেই তাঁর মনে হয়েছে।
'আমার একটা জিনিস মনে হয়, তার একটা কাব্যপ্রীতি ছিল। কবিতা তিনি ভালোবাসতেন, কবিদের সাহচর্য পছন্দ করতেন। এ কারণেই তিনি কবিতা পাঠের আসর করতেন, কবিদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। কবিদের জন্য তার একটা সফট কর্ণার ছিল। কেউ কেউ তার কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধেও নিয়েছেন এটাকে কাজে লাগিয়ে, শোনা যায়'।
মোহাম্মদ রফিক অবশ্য জেনারেল এরশাদকে এখনো কবি স্বীকৃতি দিতে রাজী নন।
'সে তো কবি নয়। বাঙ্গালির সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা হচ্ছে কবিতা। কারণ কবিতা চিরকাল বাঙ্গালিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু এই কবিতাকে আসলে এরশাদ ধ্বংস করতে চেয়েছে'।
'আমার দেশের একটা চরিত্র আছে। যখন সে জাগে, তখন সে গান শোনে আর কবিতা পড়ে। আর যখন তার অবক্ষয় শুরু হয়, তখন সে কবিতা থেকেও দূরে সরে যায়'।
মোহাম্মদ রফিক মনে করেন, প্রবল পরাক্রমশালী সেনাশাসক জেনারেল এরশাদকে যে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল, তার পেছনে কবিতা এক বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।"

ঋণ: লেখক: মোয়াজ্জেম হোসেন, বিবিসি বাংলা, লন্ডন