Monday, August 5, 2019

সব সম্ভবের দেশ!

আমাদের মন্ত্রী মহোদয় বললেন, এডিস মশা এবং রোহিঙ্গারা নিয়ন্ত্রণহীন- বেদম বাচ্চা পয়দা করে। ভাগ্যিস, তিনি কোনও উন্নত দেশের বেতনভুক্ত কর্মচারী নন, দরিদ্র একটা দেশের...তাই বাচোঁয়া!


দেশের এহেন চরম বিপদে মন্ত্রী মহোদয় বৈদেশ ভ্রমণে যান, এটা সংবাদ কর্মী জিজ্ঞেস করায় তিনি যে ভঙ্গিতে আঙ্গুল নেড়ে শাসান তাও এই দরিদ্র দেশেই সম্ভব।


এমন একটা তামাশা দেখা কেবল এই দেশেই সম্ভব।


আমাদের আরেক বেয়াদপ বেতনভুক্ত কর্মচারী মহোদয়!




Saturday, August 3, 2019

সেবা প্রকাশনীর স্বরূপ!

লিখেছেন, শেখ আবদুল হাকিম। তাঁর অনুমতিক্রমে লেখাটা এখানে হুবহু প্রকাশ করা হলো।

"ইফতেখার আমিন সাহেবকে অজস্র ধন্যবাদ। সম্প্রতি ‘দিন যায় কথা থাকে’-শিরোনামে এক পোস্টে তিনি সেবা প্রকাশনী এবং কাজী আনোয়ার হোসেন সাহেবকে নিয়ে যা কিছু লিখেছেন তা বর্ণে বর্ণে সত্যি।

কাজী সাহেব আমাদের মতো লেখকদের বেআইনিভাবে শোষণ করছেন, এই কথাটা বেশ ক’বছর আগেই কপিরাইট অফিসকে আমি লিখিত ভাবে জানিয়েছি। তবে দেশের মানুষকে কখনো কিছু জানাইনি। তা না জানানোর মূল কারণ ছিলো নিজে বই লিখে অন্য একজনের নামে ছাপতে দেয়াটা সম্মানজনক বলে কখনো মনে হয়নি আমার। এই বোধ আমাকে সব সময় কষ্ট দিয়েছে, নিজেকে আমার মানুষ হিসেবে খুব ছোট বলে মনে হয়েছে এবং তার পরিণতিতে আমার ভেতর নিজেকে লুকিয়ে রাখার একটা মনোবৃত্তি তৈরি হয়ে যায়, আমি সব সময় সব কিছু থেকে পালিয়ে থাকতে পারলেই স্বস্তি বোধ করেছি। আর এ কারণে বিভিন্ন চ্যানেল থেকে আমার সাক্ষাৎকার নিতে চাইলেও আমি কখনো তা দিইনি, ওদেরকে আমি সবিনয়ে জানিয়েছি যে এত প্রচার পাবার যোগ্য মানুষ আমি নই।

আজও আমার মনে পড়ে এটিএন-এর জনপ্রিয় উপস্থাপিকা মুন্নি সাহা আমাকে ফোন করে যখন বললেন তিনি পুরো টেকনিক্যাল টিম নিয়ে আমার বাড়িতে চলে আসছেন আমার সাক্ষাৎকার নিতে, আমি তখন তাঁকে বলেছিলাম, যে মানুষ নিজের নামে মাত্র গোটা দশ-বারো বই লিখল, আর চারশর ওপর বই লিখল আরেক মানুষের নামে, তার কি নিজেকে নিয়ে গর্ব করার মতো কিছু বলার থাকে? দেশ এবং মানুষের জন্যে ত্যাগ আর অবদান আছে এমন ব্যক্তি সমাজের নানা স্তরে আপনি অনেক খুঁজে পাবেন, আমাকে বাদ দিয়ে তাদের কাছে যান, আমি এমন কিছু নই যে দুনিয়ার মানুষকে সেটা জানাতে হবে।

বেশ অনেক বছর হলো আমার সিওপিডি হয়েছে, মাঝে মধ্যে শ্বাসকষ্ট মারাত্মক হয়ে ওঠে।
আমি ২৬০টার বেশি মাসুদ রানা লিখেছি, কুয়াশা সিরিজের বই লিখেছি ৪০ কি ৪২টা, আরও লিখেছি নিজেকে জানো সিরিজের গোটা দুই-তিন বই, রহস্যোপন্যাস গোটা আটেক, জুল ভার্নও পাঁচ-সাতটা অনুবাদ করেছি সবই হয় কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে, নয়তো তাঁর নিজের পছন্দের কোনো ছদ্মনামে (যেমন, বিদ্যুৎ মিত্র), তবে এসব বইয়ের একটারও কপিরাইট আমি কাজী সাহেবের কাছে বিক্রি করিনি।
আমাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কপিরাইট অফিস অনেক বার কাজী সাহেবকে সশরীরে উপস্থিত হতে বলা সত্ত্বেও একবারও তিনি আসেননি, তার বদলে চিঠির মাধ্যমে আমার দাবি অস্বীকার করতে গিয়ে বলেছেন আমি একটাও মাসুদ রানা লিখিনি, বই লেখার কোনো ক্ষমতাই আমার নেই।

এটা শুনে সত্যি আমার হাসি পেয়েছিল। হাসি পাওয়ার কারণ, আমি যে মাসুদ রানা লিখছি, এটা এত বেশি মানুষ জানতেন যে সেটা ছিলো ওপেন সিক্রেট। যারা জানতেন তাঁদের মধ্যে সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিল্পী হাশেম খান আছেন ( আমার যদি ভুল না হয় তিনি সম্ভবত আমার লেখা মাসুদ রানার প্রচ্ছদও এঁকেছেন), আছেন ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতা শাহরিয়ার কবির, স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন, সাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরি, স্নেহধন্য আলিম আজিজ, সাহিত্যিক এবং কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, শিল্পী ধ্রুব এষ, সাপ্তাহিক বিচিত্রা সম্পাদক প্রয়াত শাহাদত চৌধুরি, প্রয়াত কবি শহীদ কাদরীসহ সমাজে নিজ মেধার গুণে প্রতিষ্ঠিত আরও বহু ব্যক্তি।

কাজী সাহেব একটা চুক্তিপত্রও দেখাতে পারবেন না যে আমি তাঁকে লিখিতভাবে কপিরাইট অধিকার দিয়েছি যার বলে তিনি আমার লেখা একেকটা বই দশবার-বিশবার রিপ্রিন্ট করে গত চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে সম্পদের পাহাড় গড়বেন। প্রথম প্রথম কুয়াশা লিখলে দু’শ টাকা করে দিতেন তিনি। তারপর তিনশ করে। সেটা ষাটের দশকে। মনে পড়ছে, ওই সময় বাইরের লেখক বলতে সেবা প্রকাশনীতে আমি একাই ছিলাম। শত চেষ্টা করেও কাজী সাহেব দেড়-দুই যুগ আমার বিকল্প লেখক খুঁজে বের করতে পারেননি। তিন গোয়েন্দার জনপ্রিয় লেখক রকিব হাসানকে আমিই সেবা প্রকাশনীতে নিয়ে গেছি (মাসিক কিশোর আলোয় ছাপা এক সাক্ষাৎকারে তিনিও স্বেচ্ছায় প্রকাশ করেছেন যে ততদিনে আমার দেড়শর মতো মাসুদ রানা লেখা হয়ে গেছে)। তখন সবকিছু সস্তা ছিল, আমার বোঝাও ছিলো অনেক কম, মাসে গোটা দুয়েক বই লিখতে পারলে দিন বেশ ভালোই চলে যেত। তারপর যখন মাসুদ রানা লেখা শুরু করি, প্রতি বইয়ের জন্যে আমাকে পাঁচশ টাকা দেয়া হত। এটা বাড়তে বাড়তে এক সময় নয়শ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।

এরমধ্যে বনিবনা না হওয়ায় আমি দু’বার সেবা ছেড়ে চলে এসেছি। একবার কাজী সাহেব নিজে আমাদের মিরপুরের বাসায় গিয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আমাকে নিয়ে আসেন, পরের বার সেবার জেনারেল ম্যানেজার কুদ্দুস সাহেবকে পাঠিয়ে ধরে নিয়ে গেছেন। তারপর আগামী প্রকাশনীর ওসগান গণি সাহেব, সালাউদ্দিন বইঘরের সালাউদ্দিন ভাইয়ের মধ্যস্থতায় আমাকে নিয়ে সেবায় মিটিং হয়। কাজী সাহেব কথা দেন এবার থেকে প্রতিটা মাসুদ রানার জন্য আলাদা আলাদা চুক্তি হবে এবং আমি প্রতিটা বইয়ের রিপ্রিন্টের টাকা পাবো।
আমি সেই মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলাম একাধিক কারণে। প্রথমত প্রকাশনা ব্যবসার দুই দিকপাল ছিলেন আমাদের চুক্তির (অলিখিত যদিও) সাক্ষী। কাজী সাহেব যে তাঁদেরকেও বোকা বানাবেন এবং আমার প্রাপ্য টাকা শেষ পর্যন্ত মেরে দেওয়ার চেষ্টা করবেন, এমন সম্ভাবনার কথা কখনোই আমার মাথায় আসেনি।

লেখালেখি ছাড়া অন্য কোনো কাজ জানতাম না (আজও জানি না) এবং সেবায় লিখে যা পেতাম তাতে সংসার মোটামুটি চলে যেত। তাই কত পেলাম হিসেব না করে চোখকান বুজে লিখে যেতে থাকি। টাকার বেশি প্রয়োজন পড়লে পান্ডুলিপি জমা দিলে কাজী সাহেব ১০/১২ হাজার করে টাকা দিতেন। তবে সেগুলোর হিসেব এক খাতায় তুলতেন। আর যেগুলো জমা দিয়ে টাকা নিতাম না, সেগুলোর হিসেব উঠত অন্য খাতায়। সেরকম বই অবশ্য কমই আছে। তাই থাকার কথা। কেননা শুরু থেকেই আমি পেশাদার লেখক এবং সংসারী। এক মাস বা তারও একটু বেশি সময় নিয়ে লিখে পান্ডুলিপি জমা দিতাম, এর মধ্যে সংসারের খরচ তো থেমে থাকত না। টাকার প্রয়োজন হতো এবং আমিও লেখা জমা দিয়ে টাকা নিতাম। যদিও সেগুলোর জন্য কাজী সাহেব ১% কম দিতেন। এই কমবেশি নিয়েও বিশেষ মাথা ঘামাইনি কারণ লেখা আমার কাছে কোনো বিষয়ই ছিল না। তাছাড়া দুই প্রকাশকের সামনে ওয়াদা করেছেন কাজী সাহেব, তাই প্রাপ্য নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাতাম না।
তারপরও একেক সময় হতাশায় ভুগতাম। সুযোগ পেলে সেই চুক্তির কথা কাজী সাহেবকে মনে করিয়ে দিতাম। তিনি কী জবাব দিতেন তা ইফতেখার সাহেব তাঁর ‘দিন যায় কথা থাকে’-তে উল্লেখ করেছেন। আমি সংসারের চাকা চালু রাখার স্বার্থে ঘাড় গুঁজে কাজ করে গিয়েছি আর নিজেকে সান্তনা দিয়েছি: কাজী সাহেব ভদ্রলোক। তিনি আমার টাকা মেরে খাবেন না!
দুঃম্বপ্নেও ভাবিনি পুরোনো ওয়াদার কথা মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দিয়ে আমি কাজী সাহেবের তো বটেই, তাঁর বড় ছেলে টিঙ্কুরও চরম বিরাগভাজন এবং অবাঞ্ছিত হয়ে উঠছি। এমনটাও ভাবিনি কাজী সাহেবকে পাওনা টাকার তাগাদা দেয়ার 'অপরাধে' সেবা থেকে অপমান-অপদস্থ হয়ে কোনোদিন আমাকে খালি হাতে বেরিয়ে আসতে হবে। অবশেষে ২০০৮ সালে তাই ঘটল। তাদের সবার দুর্ব্যবহার এত প্রকট, এত বীভৎস রূপ নিল যে তা সহ্যের বাইরে চলে গেল। অবশেষে ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে মরব, তবু সেবায় আর ফিরব না, এই প্রতিজ্ঞা করে একদিন বেরিয়ে পড়লাম। তারপর কাজী সাহেব আমাকে ফিরে যাওয়ার জন্য, মাসুদ রানা লেখার জন্য অনুরোধও করেছেন, অথচ আমার প্রাপ্য টাকার কী হবে তা ভুলেও উচ্চারণ করেননি।

২০১০ সালের শুরুতে ইফতেখার সাহেব জানালেন, কাজী সাহেব তার রয়্যালিটির টাকা না দিলে তিনি অ্যাকশনে যাবেন, আপনিও আসুন। আমি প্রথমে কিছুদিন দ্বিধায় ভুগেছি। তারপর এক সময় মনে হলো আমি বসে আছি কেন? কিছু একটা করি না কেন? কেন আমার এত কষ্টের টাকার দাবি অভিমান করে ছেড়ে দিয়ে বসে থাকছি? ও টাকা আমার প্রাপ্য, আমার সন্তানদের প্রাপ্য। তাতে অধিকার আমাদের, কাজী সাহেব আর তাঁর ছেলেমেয়েদের নয়। তার আগে পর্যন্ত কাজী সাহেব আমাকে ত্রৈমাসিক পেমেন্ট হিসেবে ১০ হাজার করে বছর দেড়েক দিয়েছেন ( যে অংকটা কম করেও ১ লাখ হওয়ার কথা ছিল)। পরে ইফতেখার সাহেব কাজী সাহেবের কাছে সরাসরি নিজের পাওনা টাকা দাবি করলেন। তিনি সাড়া না দেয়ায় আমরা দুজন মিলে তাকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাই। কাজী সাহেব ঘাবড়ে গিয়ে আমাদের উকিলের অফিসে ছুটে গিয়ে বলে এলেন, মামলা করতে হবে না, ওদেরকে বলুন আমি পাওনা টাকা দিয়ে দেব, কত টাকা পাবেন হিসেব দিতে বলুন। আমরা হিসেব দিলাম। অমনি কাজী সাহেব বলে বসলেন আমরা তাঁর নামে কোনো বই বা মাসুদ রানা লিখিনি, সব তিনি লিখেছেন, তাই কোনো টাকা পাওনা হয়নি আমাদের। এর মধ্যে আমার ত্রৈমাসিকও বন্ধ করে দেয়া হলো। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্য জুলাই পর্যন্ত আর ১ টাকাও পাইনি ওখান থেকে।

বছর পাঁচেক আগে আমি পাওনা টাকা চেয়ে কাজী সাহেবকে শেষবার ফোন করেছিলাম। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন ছিলো, ‘কিসের টাকা? আপনি আমার কাছে টাকা পান, এমন কিছু মনে পড়ছে না'। আমি তাঁকে মনে করিয়ে দিতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমি নিজে এসব নিয়ে আপনার সঙ্গে আলাপ করতে চাই না। সেবা প্রকাশনীর ম্যানেজার মোমিনকে আপনার কাছে পাঠাব, আপনার যা বলার ওকে বলবেন'।
মোমিন আমার বাড়িতে এসে প্রথম যে বাক্যটি উচ্চারণ করলেন, তা ছিলো হুবহু এরকম: ‘কাজী সাহেব প্রথমেই বলতে বলেছেন যে তিনি আপনাকে আগের মতোই ভালোবাসেন। উত্তরে আমি বলেছি, আমার দিক থেকেও তাঁর প্রতি আগের সেই শ্রদ্ধা অম্লান আছে। তিনি আমাকে আরও জানালেন কাজী সাহেব একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছেন: আমার লেখা যে-সব বইয়ের রয়্যালিটি আমি এত দিন পেয়ে এসেছি, কিন্তু বিরোধ শুরু হবার পর থেকে পেমেন্ট আটকে দেয়া হয়েছে, সেগুলোর পেমেন্ট আমাকে এককালীন দেয়া হবে, এবং তারপর নিয়মিত যেমন পেতাম তেমনি পেতে থাকব, তবে অংকটা কত হবে তা হিসেব করে বের করতে সময় লাগবে। শুধু তাই নয়, যে-সব মাসুদ রানা তিনি 'কিনে নিয়েছেন', সেগুলোর রয়্যালিটিও আমাকে দেয়া হবে। অর্থাৎ দু’শ ষাটটার মতো মাসুদ রানার। আমি জানতে চাই, তাতে কত আসবে? মোমিন বললেন, প্রতি তিন মাস অন্তর পঁয়তাল্লিশ থেকে পঁয়ষট্টি হাজারের মধ্যে ওঠানামা করবে। আমি মেনে নিই।
তারপর বললেন, আমাদের উকিল সাহেবকে দিয়ে একটা চুক্তিনামা লেখাতে হবে। সেটায় আপনাকে স্বাক্ষর করতে হবে, তারপর টাকা পাবেন। আমি বললাম কোনো সমস্যা নেই, আমি স্বাক্ষর করে দেব। এরপর আমি কপিরাইট অফিসে কাজী সাহেবের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছি, সেই কাগজটাও তিনি উকিলের নাম করে নিয়ে গেলেন। তারপর ওদিক থেকে আর কোনো সাড়া নেই।

আমি বারবার ফোন করেছি, কেউ ধরে না। বেশ কদিন পর মোমিন ফোন করলেন, আমার সন্দেহ হলো তাঁর চারপাশে দুই ছেলেকে নিয়ে কাজী আনোয়ার হোসেনও বসে আছেন। ম্যানেজার সাহেব বললেন, ‘কাজী সাহেব বলেছেন আপনার কোনো টাকা পাওনা হয়নি'। পরে বললেন, আপনি যে অল্প কয়টা বইয়ের রয়্যালিটি পান, চাইলে তা আমরা উকিলের মাধ্যমে আপনাকে দিতে পারি'
আমার দাবি ছিল ২ কোটি ১২ লাখ টাকা (কমপক্ষে), কাজী সাহেব দিতে চান মোটে আট-দশ লাখ টাকা! স্বভাবতই তা আমি নিতে চাইনি।

প্রশ্ন জাগা খুব স্বাভাবিক, তিনি এত নাটক করে শেষ পর্যন্ত টাকাটা আমাকে দিলেন না কেন? উত্তরটা আমি নিশ্চিত জানি না, তবে অনুমান করতে পারি। ওই অভিযোগপত্রে আমি সঙ্গত কারণেই লিখেছিলাম: ‘কাজী আনোয়ার হোসেন একজন প্রতারক। তিনি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন...’ সম্ভবত এটা পড়েই তিনি রেগে গিয়ে বলেছেন, আমি তাঁর কাছে কোনো টাকা পাই না। আমার প্রশ্ন হলো, কি আশা করেছিলেন তিনি? আমি অভিযোগপত্রে বলব: কাজী আনোয়ার হোসেন নির্লোভ দরবেশতুল্য চরিত্রের অধিকারী, তাঁর সততা নিয়ে মহাকাব্য লেখা যায়, তাই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি আমি?

যাই হোক, এখন আমি আবারও আমার পাওনা টাকা পাবার চেষ্টা করছি। সেই সঙ্গে আমার আরেকটা চাওয়া হলো, মৃত্যুর আগে যেন দেখে যেতে পারি কাজী আনোয়ার হোসেন সাহেব তাঁর উপযুক্ত কর্মফল ভোগ করছেন। সে প্রক্রিয়া বর্তমানে চলছে। আশা করি বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না।"

Friday, July 26, 2019

আপনাদের সো-কল্ড ক...ওরফে একজন ডাক্তার বলছি-।

লেখক: মনোয়ার হোসেন ফয়সল

"আমি একজন সাধারন মানুষ,পেশায় চিকিৎসক। নিজেকে সাধারণ দাবি করার কারণ হচ্ছে আমি দেখতে সাধারণ আমার ক্যারিয়ারও সাধারণ। এখনও বড় ডাক্তার হই নাই আবার একদম জুনিয়রও নই। আমি মফস্বলের মানুষ স্কুল-কলেজ সবই ছোট্ট এক জেলা শহরের। মেডিকেলের পড়া পড়েছি ছোট-এক বিভাগীয় শহরের পুরনো এক মেডিকেল কলেজে। বাবাও একজন সাধারণ মানুষ, স্কুল শিক্ষক।

আমি আজ চিকিৎসক হিসেবে না আপনাদেরই একজন হিসেবে আপনাদেরকে কিছু কথা বলতে চাই। আজ থেকে ১৭ বছর আগে ২০০২ সালে, আমি তখন মাত্রই ১৭ বছরের এক যুবক, কলেজে পড়ি। তখন আমার আম্মু স্ট্রোক করেন। আপনারা যেটা ব্রেইন স্ট্রোক বা প্যারালাইসিস হিসেবে জানেন ওই রোগ। তখন রমজান মাস ছিলো সেহরি খেয়ে আম্মু ঘুমিয়েছিলেন। আহ, সেই ঘুম আর ভাঙ্গেনি! তখন আম্মুকে দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। মেডিসিন কনসালটেন্ট স্যার দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন, নাকে নল দিয়ে খাবার এর ব্যাবস্থাও করে দেন। জেলা সদরে সিটি স্ক্যান হয় না তাই স্ট্রোক-এর রোগীও রাখা হয় না। কারণটা হচ্ছে কোন ধরণের স্ট্রোক (রক্তক্ষরন নাকি রক্তনালি ব্লক) জানাটা চিকিৎসার জন্য অতি জরুরি। এটা সিটি স্ক্যান ব্যতীত জানা যায় না।

আম্মু ভোর রাতে স্ট্রোক করেন। আমরা বিকেলেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই। ঢাকায় পৌছানোর কিছু আগে আম্মু অজানায় চলে যান। বিদায় নেয়া হয়নি কিছু বুঝতেও পারিনি, বুঝতে চাইওনি।

আজ ২০১৯ সাল। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ। আজও আমার জেলা সদর হাসপাতালে সিটি স্ক্যান হয় না। স্ট্রোকের রোগী ঢাকায় রেফার করে দেয়া হয়। ২০১৩ সালে তখন আমি পাস করা ডাক্তার ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এ চাকরি করি। ওখানকার কলিগ রোমেল ভাই আমার জেলার বড় ভাই। মেধাবী মানুষ, মেডিকেলের তিন প্রফেই প্লেস করা। আমরা দুই ভাই মিলে গল্প করি, আমাদের জেলায় হার্ট ফাউন্ডেশন-এর একটা শাখা খোলা যায় কিনা? শুনেছি ফেনী, ফরিদপুর এসব জায়গায় শাখা আছে, জরুরী হৃদরোগের জরুরী প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু এসব জেলার মানুষ ভালো পায়। কিছুদিন পর ভাইয়ের বাবা হার্ট-এটাক করলেন। জেলা সদরে হার্ট-এর ডাক্তার আছে কিন্তু সিসিইউ নাই! রেফার করে দেয়া হল। আংকেলও পথিমধ্যে অজানায় চলে গেলেন।

এরপর আর রোমেল ভাই বিসিএস দিলেন না, ইউকে চলে গেলেন। এখন ২০১৯ সালেও আমার জেলা সদরে এখনো সিসিইউ নাই। আমার বাবা ঢাকায় থাকতে রাজি নন, উনার হার্ট-এটাক হলে কি হবে আমি জানি না। ঘনিস্ট এক শিক্ষক বন্ধুর বাবার মাল্টিপল মায়লোমা (বোন ক্যান্সার) ডায়াগনোসিস হল।
জেলা সদরে কেমো দেয়া যায় না ঢাকায় এসে কেমো দেয়ার মত সাপোর্ট নাই তাই চিকিৎসা করাবেন না। আরেক ঘনিস্ট সাধারণ প্রাইভেট চাকুরীজীবি বন্ধুর মায়ের রেনাল ফেইলিওর। জেলা সদরে ডায়ালাইসিস হয় না তাই চিকিৎসা করাবেন না।

ভাই ও বোনেরা, আপনারা যারা আমাদের ডাক্তারদের গালি দেন আপনারা কি জানেন আমরা কতটা হতাশা-রাগ-ক্ষোভ-অভিমান নিয়ে কাজ করি? আমার বিসিএস পোস্টিংয়ের প্রথম আড়াই বছর আমি নিজ জেলায় কাজ করেছি। প্রভাবশালী এমপি, পৌর মেয়র কাউকে বলেও এসব সমস্যার সমাধান হয় নাই। হসপিটাল ২৫০ শয্যা ঘোষণা হয়েছে ২০০৮ সালে কিন্তু এখনও চলছে ৫০ শয্যার জনবল দিয়েই।

আমি ও আমার ডাক্তার বন্ধুরা জানি জেলা শহরে কয়েকজন করে ট্রেইন্ড মেডিকেল অফিসার এবং নার্স থাকলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ-এর তত্তাবধানে স্ট্রোক ইউনিট, ডায়ালাইসিস ইউনিট, অনকোলজির কেমোথেরাপি, ডে-কেয়ার ইউনিট এমনকি আইসিইউ পর্যন্ত চালানো সম্ভব। কার্ডিওলজিস্ট-এর তত্তাবধানে সিসিইউ চলবে, রোগীরা উন্নত প্রাথমিক সেবা পাবেন। এরপর প্রয়োজনে ঢাকায় যাবেন। লাগবে শুধু কার্ডিয়াক মনিটর সহ কয়েকটি বেড, ইকো মেশিন, ডায়ালাইসিস মেশিন, সিটি স্ক্যান আরেন্টিলেটর মেশিন।সবই সম্ভব। বিশ্বাস করুন, উপরে যেসব মেশিনের কথা বললাম তা ৬৪ জেলায় ১০টি করে সাপ্লাই দেয়া সম্ভব শুধু এক আফজালের চুরি করা ১৫০০০ কোটি টাকা উদ্ধার করা লাগবে। আর হয়ত গুটিকয়েক ঋণখেলাপীর সম্পদ ক্রোক করা লাগবে। আর লাগবে সদিচ্ছা।

দয়া করে আমার এই লেখায় ডাক্তাররা কমিশন খায় ডাক্তারদের ব্যবহার খারাপ এইসব বলে হইচই করবেন না। শোনেন, একজন ডাক্তারকে আউটডোরে ৫০-৬০-৭০জন রোগি ধরিয়ে দেন তারপরো আমার কথা বলি, আমি নিজে একজন ডাক্তার আমি কমিশন খাই না অহেতুক আমার ব্যবহারও খারাপ না। আর যারা কমিশন খায় যাদের ব্যবহার খারাপ ওরা শোধরালে আমি যা বলছি তা আদায় হয়ে যাবে? কক্ষনো নয়। পয়েন্টে থাকুন, ফোকাস করুন। নিজের অধিকার নিজেরা আদায় করে নিন।
আমি চাকরি করি, আমার হাত পা বাঁধা। আমার বদলি আছে, শাস্তি আছে, আছে সম্মানহানীর ভয়। আপনার, আপনাদের কিসের ভয়? বাচ্চা ছেলেপেলে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন করতে পারলে আপনারা স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন কেন করবেন না? যৌক্তিক দাবীতে আন্দোলন করুন ঠিক-ঠিক আমাকে, আমাদেরকে পাশে পাবেন। ভাই, ভালো সার্ভিস না-পেয়ে আপনারা সাফারার হচ্ছেন, রাস্তায়তো আপনাদেরই নামতে হবে। এসব নিয়ে ভাবেন সমস্যার মূলে যাবার চেস্টা করুন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সচিবালয় ডাক্তাররা চালান না। আচ্ছা, একজন কেরানি কিভাবে হাজার কোটি টাকা কামায় ভেবেছেন কখনো

আমরা নাকি উন্নয়নশীল দেশ, তাহলে আপনার আমার স্বজন বেড না-পেয়ে ফ্লোরে থাকবে কেন? হসপিটালে সব পরীক্ষা হবে না কেন? কর্মচারী কম এই অজুহাতে হইলচেয়ার ট্রলি নিয়ে মানুষ হয়রানি হবে কেন? একটু ভাবুন। সরকার, জনপ্রতিনিধি সবাই আপনাদেরকেই ঠকাচ্ছে আর আমাদের ডাক্তারকে ভিলেন বানাচ্ছে। আপনাদের অধিকার আপনারা আদায় করে নেন আর না-পারলে আমাদের গালি দিতে থাকুন তাতে করে আর সমাধান আসবে না কিছুই।
হয়তো একসময় আমি দেশ ছাড়বো ওই রোমেল ভাইয়ের মত, ওটা হবে আমার সমাধান। আপনার, আপনাদের কি হবে ভেবে দেখেছেন কি?