Search

Friday, July 24, 2026

সুর।

(লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)

লেখক:  Uday Rahman (https://www.facebook.com/share/1E3kyyHRRZ/)

"'আমার দাদির একটা নিয়ম ছিল। রাত বারোটার পর গান বাজানো যাবে না। কেন? জিজ্ঞেস করলে বলতেন, 'জ্বিন আসে'।

আমরা হাসতাম। দাদি রাগ করতেন না। শুধু বলতেন, 'হাসনের জিনিসই ভাবো। খালি বারোটার পরে গান বাজাইয়া নাচন দিও না'।

দাদি মারা গেছেন দশ বছর হলো। আমি এখন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। নিকেতনে একটা স্টুডিওতে বসে সারাদিন অন্যের গান মেশা‌ই, মুভি, নাটক বিজ্ঞাপনের গানের সুর বসাই, ভোকাল মিক্স করি। সুরই আমার পেশা, সুরই আমার ভাত। এবং আজ, এই লেখাটা লিখতে বসছি, কারণ দাদি হয়তো ঠিকই বলতেন।

আমার মায়ের একটা হারমোনিয়াম ছিল। কলকাতার 'দ্বারকিন কোম্পানি'র, হারমোনিয়ামটা আমার মায়ের দাদার আমলের। জিনিসটা বহু বছর খাটের নিচে পড়ে ছিল। গত বছর বের করে দেখি বেলো ফাটা, তিনটা রিড বসে গেছে।

স্টুডিওর এক বংশীবাদক ঠিকানা দিয়ে বললেন, 'নবাবপুরের গলিতে যান। সুর ঘর। করিম ওস্তাদরে খুঁইজা বাইর করেন। তয় একটা কথা', বংশীবাদক একটু থামলেন, 'ওস্তাদের কথাবার্তা একটু অন্যরকম। যা কয়, সব বিশ্বাস কইরেন না। আবার সব অবিশ্বাসও কইরেন না'।

নবাবপুরের সেই গলিটা এত সরু যে রিকশা ঢোকে না। ইলেকট্রিকের দোকান, তালা চাবির দোকান, তার ফাঁকে একটা দরজা, ওপরে রঙিন কালিতে হাতে লেখা সাইনবোর্ড। 

সুর ঘর। প্রোপ্রাইটর: মোঃ হাসন রাজা। সাইনবোর্ডের নিচে ছোট করে লেখা: এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়।

সব কিছু? শুধু বাদ্যযন্ত্র না। সব কিছু! মনে মনে ভাবলাম হাসন রাজা গান বাজনা, জমিদারি সব বাদ দিয়ে এখন বাদ্যযন্ত্র রিপায়ারের দোকান দিলো!

ভেতরে ঢুকে মনে হলো একটা বাদ্যযন্ত্রের পঙ্গু হাসপাতালে ঢুকেছি। দেয়াল জুড়ে ঝুলছে তার ছেড়া বেহালা, দোতারা, ভাঙা সেতার, কোনায় ময়লা-জমা জীর্ণ-এক তানপুরা। আর মেঝেতে, জলচৌকির ওপর, সাদা লুঙ্গি আর বাসন্তী ফতুয়া পরে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। ধবধবে সাদা দাড়ি, চোখে পুরু চশমা, কানে একটা হিয়ারিং এইড। ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। যে মানুষের ব্যবসাই শব্দ, তার কানে যন্ত্র।

আমার মনের কথা পড়ে ফেলার মতো করে উনি বললেন, 'অবাক হইতেছো? সারা জীবন সুর শুনতে শুনতে কান দুইটা শেষ। ডাক্তার কয় আর বছর দুয়েক। তারপর পুরা নীরবতা'।

এভার উনি হাসলেন, আমি চিন্তিত না। কান বন্ধ হইলে ক্ষতি নাই। আসল শোনাটা কানে হয় না'।

আমি বিস্ময় চেপে বলি, 'তাহলে কীসে হয়'?

'শিরায় শিরায়', উনি নিজের বুকে টোকা দিলেন। 'শব্দ জিনিসটারে তুমি কী মনে করো? শুধু কান দিয়া শোনার জিনিস! শব্দ হইলো কাঁপন। তুমি সাউন্ডের কাজ করো, তুমি দেখো না, কনসার্টে বেইজ বাজলে বুকের মইধ্যে কেমন ধুম ধুম করে? ওইটা কানে শোনো, না বুকে গিয়ে লাগে'?

আমি হারমোনিয়ামটা নামিয়ে রাখলাম। উনি ঢাকনা খুলে ভেতরে হাত দিলেন, চোখ বন্ধ করে রিডগুলিতে আঙুল বুলালেন, যেভাবে ডাক্তার রোগীর নাড়ি চেক করে। তারপর বললেন, 'আহারে। কতদিন কেউ বাজায় না'। আমি ভয়ে-ভয়ে বলি, 'ঠিক করা যাবে'?

'যাবে', উনি মুখ তুললেন। 'তয় একটা কথা। আমি বান্ধুম চাইরশো বত্রিশে। তোমাগো স্টুডিওর চাইরশো চল্লিশে না। রাজি থাকলে রাইখা যাও'।

আমি ভুরু কোঁচকালাম। 'চার শো বত্রিশ মানে? এ ফোর ইকুয়ালস ফোর থার্টি টু? ওস্তাদ, সারা পৃথিবীর সব বাদ্যযন্ত্রের স্ট্যান্ডার্ড টিউনিং ফোর ফরটি হার্টজে। ইন্টারন্যাশনাল…'!

'জানি', উনি হাত তুললেন। 'উনিশশো উনচল্লিশ সাল থেইকা স্ট্যান্ডার্ড। তার আগে কী আছিল জানো'?

এটা আমি জানতাম না। স্বীকার করলাম।

'বত্রিশ। হাজার বছর ধইরা ৪৩২। গ্রিকরা বত্রিশে বানত, মিশরিরা বত্রিশে বানত, আমাগো ওস্তাদরা, লালন ফকিররা বত্রিশে বানত। তারপর ১৯৩৯ সালে, ঠিক যখন হিটলার দুনিয়াত আগুন দিতাছে, তখন কারা জানি ঠিক করল, না, আইজ থেইকা দুনিয়ার সব গান আট নম্বর উপরে বাজবো। হইয়া গেলো তোমাগো স্ট্যান্ডার্ড চাইরশো চল্লিশ'! উনি আমার দিকে ঝুঁকলেন। 'তুমি সুরের মানুষ। তুমিই কও। যুদ্ধের মইধ্যে দুনিয়ার মানুষের এত জরুরি কাম পড়ল কেন সুর বদলানির'?আমি ইতস্ততভাবে বললাম, 'হয়তো টেকনিক্যাল কারণ…'!

'হইতে পারে', উনি মাথা নাড়লেন। 'আমি মূর্খ মানুষ, ষড়যন্ত্র বুঝি না। আমি খালি একটা জিনিস বুঝি। আট নম্বরের ফারাকটা খালি কানে ধরা পড়ে না, কিন্তু শইলে ধরা পড়ে। বত্রিশের গান শুনলে মনে হয় নদীর পাড়ে বইসা আছি। বৃষ্টির ঝুমঝুম, চারশো চল্লিশের গান শুনলে মনে হয় কিসের জানি তাড়া। কীসের তাড়া, জানি না, খালি তাড়া। তুমি ভাইবা দেখো, আশি বছর ধইরা গোটা দুনিয়ার মানুষ ওই তাড়ার মইধ্যে গান শুনতাছে। মোবাইলে, বড় সাউন্ড বক্সে, দোকানে, অনুষ্ঠানে সব জাগায়। সবাই খালি কয়, অস্থির লাগে, অস্থির লাগে। কেউ জিগায় না, কেন এত অস্থিরতা'!

আমি বললাম, 'কিন্তু বদলাইলো কারা? কেন'?

'হুনছি অনেক কথা'। উনি রিডটা আলোয় ঘুরাতে ঘুরাতে বললেন। 'ইতালির এক মস্ত ওস্তাদ আছিলেন, ভার্দি সাব। অপেরার বাদশা। উনি জান লড়াইয়া গেছিলেন চারশো বত্রিশ হার্টজ বাঁচানের লাইগা। চিঠি লেখছেন, দরবার করছেন। পারেন নাই। আর এক গবেষক সাহেব বই লেখছেন, কামডা নাকি করছে হিটলারের প্রচারমন্ত্রী আর আমেরিকার এক বড়লোকের ফাউন্ডেশন, মিলামিশা কইরা। মতলব আছিল মানুষরে ভিতরে ভিতরে অস্থির কইরা রাখা। অস্থির মানুষ চালানো সোজা। সত্য মিথ্যা আল্লায় জানে। আমি খালি একটা জিনিস দেখছি। যুদ্ধ থামছে আশি বছর, মানুষের ভিতরের যুদ্ধ থামে নাই। আর সেই যুদ্ধের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা বাজতেছে চাইরশো চল্লিশে'।

উনি হারমোনিয়ামের রিডটা নামিয়ে রেখে আমার দিকে ফিরলেন। 'টেসলা সাবের নাম হুনছো না? গাড়ি না, যেই লোকে দুনিয়ারে বিজলি দিছে? সেই সাব কইয়া গেছেন, মহাবিশ্বের রহস্য বুঝতে হইলে শক্তি, কাঁপন আর ঢেউয়ের ভাষায় ভাবতে হবে। দুনিয়ার সব থেইকা ছোড যেই কণা, সেইটাও নাকি আসলে একটা কাঁপতে থাকা সুতার মত। বোঝলা কথাডা? পাথর, মাটি, তোমার হাড্ডি, এমনকি তোমার চিন্তাডাও, সবই কাঁপন। তাইলে দুনিয়াডারে কী বলা যায়'?

এবার উনি হাসলেন, 'দুনিয়াডা একটা তানপুরা। খোদার তানপুরা। আর আমরা সবাই ওই তানপুরার এক একটা তার। এখন কও, তারের কাম কী? তারের কাম সুরে থাকা, টিউনে থাইকা বাজা। বেসুরা তার বাজতে থাকলে দুনিয়ায় শান্তি কেমনে আসবো, অশান্তি ছাড়া আর কিছু থাকবে'?

আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। লোকটার কথা আধপাগলের মতো, অথচ ফেলে দিতে পারছি না। পেশাগত জীবনে আমি নিজে কতবার খেয়াল করেছি, কিছু মিক্স শুনলে অকারণে ক্লান্ত লাগে।

'পৃথিবীরও একটা সুর আছে, জানো'? ওস্তাদ বলে চললেন, 'জার্মান এক সাহেব মাইপা বাইর করছে। মাটি আর আসমানের মাঝখানে একটা কাঁপন সারাক্ষণ চলতাছে'।

'জ্বী এই ব্যপারে আমার জানা আছে। এটাকে বলে শুমান রেজোন্যান্স'।তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, 'আমার ওস্তাদ কইতেন অন্য নাম'।

উনি একটু থামলেন। 'কইতেন, এইটা দুনিয়ার জিকির। সব কিছু জিকির করে, বুঝলা। পাথর করে, গাছ করে, পশুপাখি করে, আকাশ সাগর সবেই করে। খালি মানুষ নিজের কানে শুনতে পায় না'।

আমি অবাক হয়ে বলি, 'আপনি শুনেছেন'?

উনি উত্তর দিলেন না। হারমোনিয়ামের একটা রিড খুলে আলোর দিকে ধরে পরীক্ষা করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, 'সাতদিন পরে আইসো। জিনিস রেডি থাকবো'।

সাতদিন পর গিয়ে দেখি হারমোনিয়াম নতুন যৌবন পেয়েছে। ওস্তাদ বললেন, 'শুনো'।

উনি একটা চেনা সুর ধরলেন, কিন্তু গানের কথা মনে এলো না। এবং আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারব না কী হলো। শব্দটা কানে ঢুকল না। শব্দটা বুকে ঢুকল। মনে হলো কেউ আমার পাঁজরের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে খুব পুরনো একটা তালা খুলে দিল। আমার চোখ ভিজে উঠছিল, অকারণে, এবং সেটা লুকানোর জন্য আমি মাথা নিচু করে রইলাম। জানালার কার্নিশে দুইটা চড়ুই এসে বসল। গলির কুকুরটা দরজায় এসে চুপ করে বসে পড়ল। উনি থামার পরেও ঘরটা কয়েক সেকেন্ড ধরে বাজতে থাকল।

'বুঝলা কিছু'? ওস্তাদ নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

আমার ঘোর কাটেনি, এটা… এটা কী হলো'?

'কিছুই হয় নাই। খালি যন্ত্রটারে তার নিজের সুরে ফেরত দিছি'। উনি আমার দিকে তাকালেন। 'তোমারে ফেরত দিছি। মানুষের শইলের সত্তর ভাগ পানি। আর পানি কাঁপনের কথা শোনে। জাপানি ডাক্তার সাব পরীক্ষা কইরা দেখছেন। পানিরে সুন্দর সুর শুনাইয়া বরফ করলে বরফের ফুলের নকশা বানালে তা হয় নিখুঁত সুন্দর। আর বিকট শব্দ, গালাগালি শুনাইয়া বরফ করলে ফুলডা হয় ভাঙা, তুবড়ানো, লন্ডভন্ড। এইবার হিসাবডা করো। তোমার ভিতরে সত্তর ভাগ পানি, আর তুমি সকাল থেইকা রাইত পর্যন্ত কানে কী ঢালতেছ এই ঢাকা শহরে? হর্ন, ঝগড়া, মিটিংয়ের চিল্লানি, ব্রেকিং নিউজ, মিটিং, মিছিল। ভিতরে রোজ কী জমতেছে, সুন্দর নকশা না ভাঙন? তুমি এতক্ষণ সঠিক সুরে কাঁপলা। এই প্রথম, হয়তো বহু বছরে। এইজন্যই চোখে পানি আইছে। পানি পানিরে চিনছে'।

এরপর থেকে আমি প্রায়ই যেতাম। কাজ থাকুক না থাকুক। ওস্তাদ চা খাওয়াতেন আর কথা বলতেন। সেই কথাগুলি আমি লিখে রাখতাম, রাতে, মনে করে করে।

সুরাইয়ার সাথে দেখা হলো তৃতীয় সপ্তাহে। সেদিন দোকানে ঢুকে দেখি জলচৌকিতে ওস্তাদ নেই। বসে আছে এক তরুণী, কোলে একটা বেহালা। চোখ বন্ধ, কাধ বেহালার গায়ে ঠেকানো, কী-এক মলিন বিষন্ন সুন্দর সুর তাতে বাজছে সে বোঝাতে পারবো না। আমি ঢুকতেই চোখ না খুলে বললো, 'বসেন। দাদাজান ওষুধ আনতে গেছেন'।

আমি বসলাম। মেয়েটা আরও মিনিট দুয়েক তার বন্ধ চোখে সুরের সাধনা চালালো। তারপর চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আপনিই সেই সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার? দাদাজান আপনার কথা বলেন। কয়, পোলাডার কান আছে, খালি কানের ব্যবহার জানে না'।

'মানে', আবাক আমি?

সে উত্তর না-দিয়ে বেহালায় পরপর দুইটা টান দিল। 'ফারাক কি, বলেন তো'।

আমি শুনলাম। মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। 'একই তো লাগল'।

'এই জন্যই দাদাজান ওই কথা কয়'। সে বেহালা নামিয়ে রাখল। 'প্রথমটা চাইরশো চল্লিশ, পরেরটা বত্রিশ। আপনে সারাদিন যেইটা বেচেন, আর যেইটা হারাইয়া ফেলছেন'।

মেয়েটার নাম সুরাইয়া। ওস্তাদের নাতনি, স্কুলে গান শেখায়, আর ওস্তাদের চোদ্দ পুরুষের বিদ্যার একমাত্র ওয়ারিশ। কথার মাঝখানে গলিতে একটা রিকশা বেল বাজাতে বাজাতে গেল। সুরাইয়া এমনভাবে মুখ কোঁচকাল 'শুনছেন? বেলটা গত সপ্তাহ থেইকা বেসুরা। কমা খানিক নাইমা গেছে। রোজ শুনি আর রোজ মেজাজ খারাপ হয়'।

'আশ্চর্য, রিকশার বেলেরও সুর থাকে'?

'সব কিছুর সুর থাকে'। সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল। 'সাইনবোর্ড পড়েন নাই'?

যাওয়ার সময় সে বললো, 'একটা কথা। দাদাজানের সব কথা বিশ্বাস কইরেন না'।

আমি হেসে বললাম, 'আবার সব অবিশ্বাসও করব না'?

সুরাইয়া প্রথমবারের মতো হাসল। বলল, 'ভালই তো চিনছেন তারে'।

এরপর থেকে সুর ঘরে আমার যাওয়ার কারণ দুইটা হয়ে গেল। এই তথ্যটা আমি ওস্তাদকে কোনোদিন বলিনি। বলার দরকারও ছিল না। বুড়া জানে না, বুঝে না এমন কিছুই মনে হয় নাই।

সুরাইয়ার সাথে আমার সবচেয়ে বড় তর্কটা হয়েছিল এক সন্ধ্যায়, দোকানে, ওস্তাদ তখন মসজিদে। ও হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, 'আপনি স্টুডিওতে কী-কী বানান'?

আমি গর্ব করে বললাম, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড, আইটেম গান।

সুরাইয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'আপনি জানেন আপনি আসলে কী বানান? আপনি হিপনোটিস্ট, সুরকার সাহেব। মানুষের অজান্তে মানুষের মন চালানোর যন্ত্র বানান। খালি জানেন না'।

আমি উদাস হয়ে বলি, 'বাড়ায়া বলতেছো'।

'একটা দুঃখের গান ছাড়েন, তারপর নিজেরে খেয়াল কইরেন। পাঁচ মিনিট পরে দেখবেন কাঁধটা কখন নুইয়া গেছে, মুখের হাসিটা কখন মিলাইছে, আপনি নিজেও টের পান নাই। কেউ আপনারে কয় নাই, দুঃখী হন। এইটারে কী কয়? হুকুম মানা। মস্তিষ্কে ডোপামিন বইলা একটা জিনিস আছে, আনন্দের কেমিক্যাল। মাপজোক কইরা দেখা গেছে, প্রিয় গান শুনলে মগজ ঠিক ততটুকু ডোপামিন ছাড়ে যতটুকু ছাড়ে প্রেমে পড়লে। বোঝলেন? আপনার হাতের মিক্সিং কনসোলটা মানুষের মগজের কেমিস্ট্রি বদলানোর মেশিন'।

খানিকটা অবাক হই, 'ভালো কথা। তাতে ক্ষতিটা কী'?

'ক্ষতি'? সুরাইয়ার গলা নেমে গেল। 'আমেরিকায় এক কনসার্টে দশটা মানুষ মারা গেছে, পায়ের নিচে চাপা পইড়া, শুনছেন? সবাই কয় ভিড়ের দুর্ঘটনা। ভিড়টা বানাইলো কে? হাজার-হাজার মানুষ এক বিটে মাথা নাড়তেছিল, এক কাঁপনে শরীর দুলাইতেছিল। হার্টের তালটারে টাইনা নিজের তালে নেয়। তখন মানুষের যুক্তিবুদ্ধি কমে, নিজের উপর দখল কমে, ভিড়ের লগে মিশা যাওয়ার টান বাড়ে। মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না, ঢেউ হয়া যায়। আর ঢেউয়ের কোনো বিবেক নাই'।

খানিক্ষণ চুপ থেকে বলল, 'হিটলার যুদ্ধের সময় এই বিদ্যা জানতো। মশাল, এক ছন্দের স্লোগান, এক কাঁপনে লাখ মানুষের গলা। ওই কাঁপন মানুষরে ব্যক্তি থেইকা দল বানাইতো। আর দল তখন যা করছে, একলা মানুষ জীবনেও করত না। ইতিহাস পড়েন নাই'?

আমি হাসি, আপনার মত সবজান্তা দাদা তো আমার নাই। আমি কেমনে জানবো এগুলা'।

সুরাইয়া বলেই যাচ্ছে, দাদা নাতনির একই স্বভাব, লেকচার শুরু করলে সহজে থামে না, 'শব্দ দিয়া মানুষরে এক করা যায়, আবার শব্দ দিয়াই মানুষ ভাঙা যায়। যে জাতিরে শেষ করতে চাও, আগে তার গান নষ্ট করো। গান হইলো জাতির সবচেয়ে গভীরের শিরা'।

আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। কারণ আমার মনে পড়ছিল, স্টুডিওতে ক্লায়েন্ট প্রায়ই বলে, ভাই, বিটটা আরও অ্যাগ্রেসিভ করেন, মানুষ যেন বইসা থাকতে না পারে।

'তাইলে করণীয় কী'? আমি জিজ্ঞেস করলাম। 'কানে তুলা দিয়া ঘুরবো'?

'না'। সুরাইয়া হাসল। 'বাছবেন। মানুষ মুখে কী ঢুকাইবো দশবার দেখে, আর কানে সারাদিন যা আসে তা-ই ঢালে। পচা খাবারে পেট খারাপ হয় একদিনে, টের পাওয়া যায়। পচা শব্দে মন খারাপ হয়, সহজে টেরও পাওয়া যায় না। যেই গান শোনার পরে আপনার ভিতরটা অস্থির লাগে, রাগ-রাগ লাগে, ওই গান আপনার খাদ্য না, ওইটা বিষ, যত মিঠাই লাগুক। আর যেই শব্দ শোনার পরে ভিতরটা শান্তি পায়, ওইটা ওষুধ।প্রকৃতির শব্দগুলো'। ও জানালার দিকে তাকাল। 'বৃষ্টির শব্দে ঘুম আসে ক্যান জানেন? ওই কাঁপন মগজরে কয়, বিপদ নাই, শুইয়া পড়ো। বৃষ্টির রাইতে বাঘও শিকারে বাইর হয় না। পাখির ডাকে সকালে মন ফুরফুরা লাগে, কারণ পাখি ডাকে খালি নিরাপদ ভোরে, মগজ এইটা লাখ বছর ধইরা জানে। আর সাগরের ঢেউয়ের শব্দ মানুষরে মনে করাইয়া দেয়, সে নিজের চাইতে বড় কিছুর অংশ। খেয়াল করছেন কোনোদিন, বন, নদী, বৃষ্টি, পাখি, প্রকৃতির সব শব্দ ওই চারশো বত্রিশের ঘরের আশেপাশে? আর আমরা থাকি সারাদিন চল্লিশে বান্ধা শহরের ভিতরে। পাহাড়ে গেলে মনে হয় এতদিনে শ্বাস নিতে পারতেছি, সাগরপাড়ে গেলে মনে হয় কতদিন পরে নিজেরে খুঁইজা পাইলাম। আসলে আমরা কিছু খুঁইজা পাই না।আমরা ফিরা যাই। যেই কাঁপনে আমরা বানানো, সেই কাঁপনে'। একনাগাড়ে কথা বলে এবার থামে!

সেই সন্ধ্যার পর থেকে আমার কাজ করার হাতটা বদলে গেল। কনসোলে বসলেই মনে হতো, সুরাইয়া আর তার দাদা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সুরের টিউন ৪৩২ এ নামিয়ে দিতাম। ক্লায়েন্ট টের পেত না।

ওস্তাদ একদিন বললেন, 'আজান শুনলে বুকে টান লাগে ক্যান জানো? ওই শব্দ তুমি শুনছ জন্মের পর থেইকা, দিনে পাঁচবার। শব্দ বারবার শুনলে সে মগজের ভিতরে রাস্তা কাইটা নেয়। যত শুনবা, রাস্তা তত গভীর। সুরা ফাতিহা রোজ প্রতি নামাজে পড়ায় ক্যান? বিপদের দিন যখন মাথা কাম করবো না, তখন ওই রাস্তা দিয়াই শব্দ নিজে নিজে বাইর হয়া আসবো। আর মুসলমানের ঘরে বাচ্চা জন্মাইলে সবার আগে ডাইন কানে আজান দেয় ক্যান, কোনোদিন ভাবছ? দুনিয়ায় আইসা বাচ্চাটা পয়লা যেই শব্দ শুনবো, সেইটা যাতে ঠিক সুরে বান্ধা থাকে। মানুষের টিউনিং শুরু হয় জন্মের পয়লা মিনিটে। আরেকটা জিনিস কই, বিজ্ঞানীরা মাইপা দেখছে। বুকের ভিতর দিয়া একটা লম্বা রগ নামছে, কইলজা ছুঁইয়া, পেট পর্যন্ত। আরবি মাখরাজের কাঁপন, ধীরলয়ে তিলাওয়াতের গুনগুন, ওই রগটারে জাগাইয়া দেয়। আর ওই রগ জাগলে বুক ধীর হয়, পেট শান্ত হয়। দোয়া পড়লে বুকটা হালকা লাগে ক্যান, এতদিনে বুঝলা? এইটা খালি সওয়াব না-রে, ভাই। এইটা শরীর। খোদা মানুষের শইলের ভিতরেই তার নিজের কমান্ডের লাইন বসাইয়া রাখছেন'।

এই পর্যন্ত পড়ে আপনার মনে হতে পারে, ভালোই তো, এক জ্ঞানী বুড়ার সাথে এক যুবকের আলাপের গল্প। মনে হওয়ারই কথা। আসল গল্পটা আমি ইচ্ছা করে শেষের জন্য রেখেছি।

এক বিকালে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'ওস্তাদ, আপনার সাইনবোর্ডে লেখা, এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়। সব কিছু মানে কী'?

ওস্তাদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর উঠে ভেতরের ঘর থেকে একটা পুরনো টিনের বাক্স আনলেন। বাক্সের ভেতরে কাপড়ে মোড়া একটা বাঁশের বাঁশি। কালো হয়ে যাওয়া, মাথায় রুপার কাজ।

'আমার ওস্তাদের ওস্তাদের ওস্তাদের… হিসাব রাখি নাই কত পুরুষ। এই বাঁশি বাজে না। মানে, আমরা বাজাই না'। 

উনি বাঁশিটা ছুঁলেনও না, শুধু তাকিয়ে রইলেন। 'জার্মানিতে একটা শহর আছে। হ্যামেলিন। সাতশো বছর আগে ওই শহরে এক বাঁশিওয়ালা আসছিলো। প্রথমে এক সুর বাজাইলো, শহরের সব ইন্দুর নদীতে গিয়া ডুবল। শহরের লোকেরা তারে ওয়াদামত টাকা দিলো না। সে তখন আরেক নতুন সুর বাজাইলো। এইবার বাইর হয়া আসলো শহরের একশো তিরিশটা বাচ্চা। ঘুমঘুম চোখে, মা বাপের ডাক, নিষেধ কিছুই কানে যায় না, খালি সুরটাই কানে যায়। পাহাড়ের ভিতরে ঢুইকা গেল। আর ফিরে নাই। মানুষ কয় রূপকথা। ওই শহরের পুরানা দলিলে ঘটনাটা লেখা আছে, তারিখসহ। এই জিনিস যে আইজও চলতেছে না তুমি কেমনে জানবা'?

উনি আমার দিকে তাকালেন। 'এইবার আসল কথাটা শোনো। এক বাঁশি। ইন্দুরের লাইগা এক সুর, মানুষের লাইগা আরেক সুর। মানে বোঝো? প্রত্যেক জিনিসের একটা নিজের কাঁপন আছে, আর ওই কাঁপনটা খুঁইজা পাইলে জিনিসটারে যেদিকে ইচ্ছা টানা যায়। সাপুড়ের বীণ সাপরে টানে। মাজারের জিকির মানুষরে ঘোরায়। প্রশ্ন হইলো, সবচেয়ে উপরের সুরটা কী? যেই সুরে সব বান্ধা'?

আমি চুপ করে রইলাম।

তিনি বলে যাচ্ছেন, 'আল্লাহ দুনিয়া বানাইছেন ক্যামনে, কোরানে আছে। কুন ফায়াকুন। হও, আর হইয়া গেল। খেয়াল কইরো, উনি হাত দিয়া বানান নাই, মাটি দিয়া শুরু করেন নাই। শুরু করছেন একটা শব্দ দিয়া। আর শেষটা হইবো ক্যামনে তাও তো জানো? সেইটাও শব্দ। ইস্রাফিল ফেরেশতা সৃষ্টির পয়লা দিন থেইকা শিঙা ঠোঁটে লাগাইয়া খাড়াইয়া আছেন। এক ফুঁয়ের অপেক্ষায়। চিন্তা কইরা দেখো ব্যাপারটা। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বাদক, অনন্তকাল ধইরা রেডি হইয়া আছেন, খালি হুকুম আসে নাই বইলা বাজান নাই। তাইলে দুনিয়াটা কী দাঁড়াইলো? দুই নোটের মাঝখানের একটা গান। পয়লা নোটটা বাইজা গেছে, শেষ নোটটা এখনো বাজে নাই। আমরা সবাই ওই মাঝখানের সুরটার তালেই দুলতে থাকি। এইবার বুঝলা, সাইনবোর্ডে ক্যান লেখছি এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়? সব কিছু আসলেই সুরে বান্ধা। শুরু থেইকা শেষ পর্যন্ত। এখন চিন্তা করো, ওই পয়লা শব্দটার কাঁপন কত আছিল'?

আমি শুধুই হাঁ হয়ে শুনছি ওনার কথাবার্তা। আমার মাথায় সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে!

ওস্তাদের গলা নেমে ফিসফিসে ঠেকল। 'আমার ওস্তাদ মরনের আগে একবার, খালি একবার, ওই সুরের ষোলো ভাগের এক ভাগ খুঁজে পাইছিলেন। তার নিজের গলায়, বাদ্যযন্ত্রে না। আমি পাশে বসা। আমি তোমারে কসম কইরা কইতাছি, ঘরের বাতাস ভারি হয়া গেছিল, দেয়ালের চুন ঝরছিল, আর আমার মনে হইছিল আমি জন্মের আগের কোনো জায়গার কথা মনে করতে পারতাছি। তারপর ওস্তাদ থাইমা গেলেন। কইলেন, বাকিটা বাজাইলে ফেরত আসন যাইবো না'।

আমার মুখ ঝুলে পড়ে, 'ফেরত আসা যাবে না মানে'?

'মানে ওই বাচ্চাগুলার মতো'। উনি হামেলিনের দিকে ইশারা করলেন, যেন শহরটা পাশের ঘরে। 'সুর যখন ডাকে, তখন যাইতে হয়। যেই সুররে আমরা মানা করতে পারি না। রাইত বারোটার পরে দুনিয়া চুপ হয়া নিজের জিকিরে ফিরা যায়। তখন তুমি যেই সুর বাজাইবা, সেই সুর বহুদূর যায়। এবং,' উনি থামলেন, 'সব কান দুনিয়ার না'।

'জ্বীন'?

'নাম দিয়া কী করবা।” ওস্তাদ বাক্সটা বন্ধ করলেন। 'যে শোনে, সে শোনে। আর যে শোনে, সে মাঝে-মাঝে কাছেও আসে'।

এই ঘটনার মাস দুয়েক পরের কথা। বৃহস্পতিবার রাত। স্টুডিওতে কাজ শেষ হতে হতে অনেক দেরি হয়ে গেল। বাসায় ফেরার পথে মনে পড়ল, ওস্তাদ আমার জন্য একটা পুরনো ম্যান্ডোলিন ঠিক করে রেখেছেন, নিতে বলেছিলেন। ঘড়িতে তখন বারোটা বেজে দশ।

গলিতে ঢুকে আমি থমকে গেলাম।

গলিটা নিস্তব্ধ। শুধু নিস্তব্ধ না, অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। ঢাকা শহর রাত বারোটায়ও এতটা চুপ হয় না। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে, কি যে অপূর্ব বিষন্ন সুর ঘরের বন্ধ দরজার ফাঁক গলে ভেসে আসছিলো।

এবং সুরটা একা ছিল না। একটা যন্ত্র বাজছিল, বাঁশির মতো, অথচ বাঁশি না। আর তার সাথে, খুব নিচু, প্রায় ফিসফিসের মতো, একটা মানুষের গলা মিশে ছিল। মেয়েলি মোলায়েম গলা। খুব চেনা ধাঁচের, অথচ ধরতে পারছিলাম না কার।

আমি জীবনে বহু গান শুনেছি। পেশাই আমার শোনা। ওই সুরের সাথে কোনো কিছুর তুলনা আমি দিতে পারব না। শুধু বলতে পারি, সুরটা শুনে আমার একইসাথে মনে হচ্ছিল মায়ের কথা, মনে হচ্ছিল দাদির কথা, মনে হচ্ছিল এমন সব জায়গার কথা যেখানে আমি কোনোদিন যাইনি অথচ চিনি। আমার পা মাটিতে গেঁথে গিয়েছিল। এবং তখন আমি জিনিসটা দেখলাম।

গলির ইঁদুরগুলি। ড্রেনের ধার থেকে, ডাস্টবিনের পাশ থেকে, ওরা বেরিয়ে এসেছে। কেউ দৌড়াচ্ছে না। ওরা বসে আছে। সার বেঁধে, চুপ করে, সুর ঘরের দরজার দিকে মুখ করে, যেভাবে মসজিদে মানুষ সারি বেধে বসে।

সুরটা থেমে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলল। ওস্তাদ দাঁড়িয়ে। ওনার মুখ দেখে আমার বুক ধক করে উঠল। উনি কাঁদছিলেন, এবং একইসাথে ওনার মুখে এমন একটা আলো, যেটার কোনো নাম আমি জানি না।

উনি আমাকে দেখে চমকালেন না। শুধু বললেন, 'শুনছো'?

আমি মাথা নাড়লাম।

'কতখানি শুনছো'?

আমি খানিকটা ভেবে বললাম, গলির মাথা থেকে'।

উনি কী যেন হিসাব করলেন মনে মনে। তারপর বললেন, 'যাও। বাড়িত যাও। দৌড়ায়া যাইবা না, হাঁইটা যাইবা, তয় পিছে ফিরবা না'।” আমি ঘুরে হাঁটা দিতেই পেছন থেকে ডাকলেন, 'শোনো'। আমি থামলাম, ফিরলাম না। উনি বললেন, 'তোমার দাদি ঠিক আছিলেন। মুরুব্বিগো কথা ফালাইও না'।

ওইটাই শেষ কথা।

পরের শুক্রবার গিয়ে দেখি সুর ঘর তালাবন্ধ। তার পরের শুক্রবারও। পাশের দোকানদার বলল, 'ওস্তাদের খবর জানি না ভাই। তয় একটা জিনিস আপনের লাইগা রাইখা গেছে'।

সে ভেতর থেকে আমার সেই ম্যান্ডোলিনটা আনলো, সাথে একটা ভাঁজ করা কাগজ। কাগজে কাঁপা হাতে লেখা:

'সুরটা এতদিন আমি খুঁজতাম। কয়দিন ধইরা টের পাইতেছিলাম, সেই সুরটাও আমারে খুঁজে। বৃহস্পতিবার রাইতে আমরা দুইজন দুইজনরে পাইছি। চিন্তা কইরো না। যেই সুরের ডাকে, হ্যামেলনের বাচ্চারা হাসতে-হাসতে গেছিলো, সেই ডাক খারাপ কিছু হইতে পারে না। খালি আফসোস, তোমারে পুরাটা শোনাইতে পারলাম না। তোমার হারমোনিয়াম, ম্যান্ডোলিন চারশো বত্রিশে বান্ধা। ওইটারে কোনোদিন চল্লিশে তুইলো না। রোজ বাজাইও, দুনিয়া তোমারে সারাদিন যেই সুরে বান্ধে, রাইতে ঘরে ফিরা নিজেরে নিজের সুরে টিউনে ফিরাইয়া নিও'।

সুর ঘর অবশ্য বেশিদিন বন্ধ থাকেনি! মাস খানেক পর গলি দিয়ে যাচ্ছি, দেখি দরজা খোলা। ভেতরে জলচৌকিতে বসে আছে সুরাইয়া। দাদার জায়গায়, দাদার ভঙ্গিতে। আমাকে দেখে মুখ তুলল। চোখ দুটো লাল, তবে শান্ত।

মুখ তুলে বলল, 'দোকান তো বন্ধ করা যাইবো না, এমন ভঙ্গিতে বলল, যেন আমি প্রশ্ন করেছি। 'শহর ভরা বেসুরা জিনিস। কেউরে তো সুরে বান্ধন লাগবো'।

আমি অনেকদিন কথাটা জিজ্ঞেস করব করব করে করিনি। সেদিন করলাম। 'সুরাইয়া। ওই রাতে যন্ত্রের সাথে একটা গলাও ছিল। মেয়ের গলা। তুমি ছিলা'?

সে বেহালার ধুলা মুছছিল। হাতটা থেমে গেল। অনেকক্ষণ পর বলল, 'আমি ওই রাইতে চিটাগাংয়ে। খালার বাসায়'।

'তাহলে গলাটা কার'?

'দাদাজান একটা কথা কইতেন', সুরাইয়া মুখ তুলল না। 'সুরটা যখন কাউরে নিতে আসে, একলা আসে না। চেনা গলা ধইরা আসে। যেই গলা শুনলে মানুষ আর না-কইতে পারে না। দাদাজানের কাছে মনে হয় গেছিল ওনার মায়ের গলায়। দাদাজানের মা গান গাইতেন, জানেন তো'।

তারপর সে মুখ তুলল, এবং আমার সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আপনার কাছে যেদিন আসবো, কার গলায় আসবো, ভাবছেন কোনোদিন'?

গলির ভেতর দিয়ে একটা রিকশা বেল বাজিয়ে গেল। সেই বেসুরা বেল। আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম, তারপর দুজনেই হেসে ফেললাম। ভয়ের পরের হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি হাসি।

এই গল্পের বাকি অংশে একটা বিয়ে আছে। সুরাইয়ার সাথে আমার। প্রেমের অংশটুকু আমি ইচ্ছা করে বাদ দিলাম। কিছু সুর সবাইকে শোনাতে নেই।

শুধু এটুকু বলি, কাবিনের দিন সুরাইয়া তার দাদার সেই টিনের বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলো, 'এইটা এখন আমাদের সংসারের জিনিস। শর্ত একটাই। ঢাকনা খোলা যাইবো না'।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'কোনোদিনই না'?

সে বলেছিল, 'যেদিন খোলার দিন আসবো, সেদিন আপনারে জিগানো লাগবো না। বাক্স নিজেই জানান দিবো'।

এরপর দুই বছর কেটে গেছে। আমি এখনো স্টুডিওতে সারাদিন চার শো চল্লিশে অন্যের গান বাঁধি। পেট চালাতে হয়। কিন্তু রোজ রাতে বাসায় ফিরে মায়ের হারমোনিয়ামটা বাজাই। সুরাইয়া পাশে বসে গলা মেলায়। দুনিয়া আমাদের সারাদিন যে সুরে চালায়, রাতে আমরা নিজেদের নিজেদের টিউনে ফিরিয়ে নিই।

আর গত মাসে আমাদের মেয়ে হয়েছে।

হাসপাতালের কেবিনে, নিয়ম মতো, আমি ওর ডান কানে আজান দিলাম। এবং একটা আশ্চর্য জিনিস হলো। আজানের প্রথম শব্দে বাচ্চাটার কান্না থেমে গেল। এক সেকেন্ডে। নার্স হেসে বলল, 'মাশাল্লাহ, কী শান্ত বাচ্চা'। সুরাইয়া আমার দিকে তাকাল, আমি সুরাইয়ার দিকে। 

বাচ্চাটা শান্ত হয়নি। বাচ্চাটা শুনছিল। মন দিয়ে, পেশাদার কানে শুনছিল। ওর টিউনিং হচ্ছিল, জীবনের প্রথম মিনিটে, ওর বড়দাদার ওস্তাদের কথামতো।

মেয়ের নাম রেখেছি আয়াত।

কাল রাতের কথা। শহর একদম চুপ হয়ে গিয়েছিল এবং সেই নীরবতার ভেতরে মায়ের হারমোনিয়ামের রিডটা কেঁপে উঠল। সাথে সেই বক্সে রাখা বাদ্যযন্ত্র।

আর বিছানায়, ঘুমের ভেতরে, আমার এক মাসের মেয়ে সেই একই সুরে গুনগুন করে উঠল। এক চুল এদিক ওদিক না।

সুরাইয়ার হাত অন্ধকারে আমার হাত খুঁজে নিল। ও ফিসফিস করে বলল, 'শুনছো'?

আমি বললাম, 'হুঁ'।

ও বলল, 'ভয় পাইছ'?

আমি অনেকক্ষণ ভেবে সত্যি উত্তরটা দিলাম। 'না'।

সত্যিই ভয় পাইনি। কারণ ততদিনে আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি।

এই সব জানার পর থেকে আমার একটাই অভ্যাস বদলেছে। আমি এখন শব্দ বাছি। যেভাবে মানুষ খাবার বাছে। আপনি পেটে কী ঢালেন তার হিসাব রাখেন, ক্যালরি গোনেন, ভেজাল দেখেন। কানে সারাদিন কী ঢালছেন, তার হিসাব শেষ কবে করেছেন? যেই শব্দ শুনে ভেতরটা তেতে ওঠে, সেটা বিনোদন না, সেটা ডোজ। আর যেই শব্দ শুনে ভেতরটা শান্ত হয়, বৃষ্টি, তিলাওয়াত, মায়ের গলা, ভালো একটা গান, সেটার দাম ওষুধের চেয়ে বেশি। মহাবিশ্ব সবসময়ই কথা বলছে, সুরে চালাচ্ছে, ওস্তাদ বলতেন। প্রশ্ন হলো আমরা কী শুনছি, আর কারটা শুনছি।

তবে দাদির নিয়মটা আমি এখনো মানি। রাত বারোটার পর আমাদের বাসায় কেউ গান বাজায় না।

সমস্যা একটাই। মাঝে মাঝে, খুব গভীর রাতে, সুর নিজেই আমাদের বাসায় বেজে ওঠে।

ওইটা তো আর আমার হাতে না।"

লেখক:  Uday Rahman

Monday, July 20, 2026

মাহবুব কবির মিলন: দু'মুখো পাইপ!

মাহবুব কবির মিলন, এই মানুষটাকে সরকার যথাযথ কাজে লাগাতে পারেনি! এখনও নিরাপদ খাদ্য সংস্থা বা 'বিএসটিআই' জাতীয় কোথাও দায়িত্ব দিলে আমার চেয়ে কেউ বেশি খুশী হবে না।

তো, সম্প্রতি তিনি 'এফবি'-তে এটা লিখেছেন:

তিনি এই জাতিকে কষে গালি দিয়েছেন। এই জাতির অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ হিসাবে এই আবর্জনা আমার গায়েও পড়ে। হাসের ময়লা পানি ঝেড়ে ফেলার মত  এই আবর্জনা আমি ঝেড়ে ফেলতাম। কারণ রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে এটা অনেক সময় আমরা নিজেরাও লিখি, বলি। কিন্তু...!

মাহবুব কবির মিলনের যে ক্ষোভ খেলায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থন নিয়ে  এই দেশে যে কুৎসিত উম্মাদনা সেটা সত্য, অতি সত্য! আমিও নিজেও চেয়েছি বিশ্বাকাপ থেকে এই দুইটা দল বিদায় নিক। কিন্তু আর্জেন্টিনা নামের দলটা, যেমনটা বলা হয় ঈশ্বর থাকেন ভদ্রপল্লীতে তেমনই মনে হচ্ছিল যেন এই ভদ্রপল্লীটা আর্জেন্টিনায়! ফাইনাল খেলাটা দেখেন! মনে হচ্ছিল, বলটা ইয়ামালদের নিজের এরা আর্জেন্টিনাকে খেলতেই দেবে না। কিন্তু স্পেনের পক্ষে গোল হচ্ছিল না!

আমাদেরকে বোঝাবার জন্য মিলন এটা বলতে পারতেন, এই খেলাকে কেন্দ্র করে কী-কী অনাচার হয়েছে, হচ্ছে? আমি গুগল-চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চেয়েছিলাম?



ভাবা যায়, এই খেলাকে কেন্দ্র করে অন্তত ১০-১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং শতাধিক আহত হয়েছেন! সব তথ্য তো আর পত্রিকায় আসেনি! এই উম্মাদনা কী পর্যায়ে যায় এটা নিয়ে সম্ভবত একটা আস্ত পিএইচডি করে ফেলা যাবে!

এই যে ছেলেটি বলছে, 'মেসি-মেসি, মেসি, আমার আব্বা..., নিজের বাপকেও মেসি ছাড়িয়ে যাচ্ছে...! এর উম্মাদনা একটু ভাল করে লক্ষ করেন—এর পক্ষেই সম্ভব খেলার জেরে অবলীলায় একটা মানুষকে মেরে ফেলা!

কিন্তু এ-ও সত্য, আমাদের গল্প করার মত গল্প নেই তেমনি আমাদের বিনোদন বলতে বলার মত কিছু নেই। আরেক দল আছে এরা খেলা নিয়ে ফতোয়ার-পর-ফতোয়া দেয় []! এটা নিয়ে কিন্তু মিলনের বিকার নেই!

এরা তৌহিদি জনতা না, এরা উম্মাদ, এরা জঙ্গি। টাউনহলে মেলা চলছে বিধায় ঈদগাহ মাঠে কয়েক ঘন্টার জন্য মানুষ খেলা দেখলে সমস্যা কোথায়! এমন না যে এখানে ৫ ওয়াক্ত নামাজ হয়!
এই যে মাদ্রাসায় এন্তার বলাৎকার হচ্ছে [], ছোট-ছোট বাচ্চাদের নিয়ে কুৎসিত টিকটক-রিলস বানাচ্ছে এই নিয়ে কিন্তু এদের কোন প্রতিবাদ, তৎপরতা নেই!

বুঝলাম, এই সমস্ত উম্মাদনা নিয়ে মিলনের ক্ষোভ যথার্থ। এ নিয়ে আমার কোন কথা নাই। কিন্তু, ওই যে বললাম, একটা কিন্তু আছে! মিলনের পুরো লেখাটা পড়লে দেখবেন, এরপরই শুরু হয়েছে, আমি-আমি-আমি! আজ আমি এই করেছি, কাল আমি সেই করেছি।

এটাতেও সমস্যা ছিল না। আমরা দেশ-সমাজের-মানুষের জন্য যেসকল কাজ করি এর একটা গালভরা নাম আছে, সমাজসেবা। আমি বলি, 'ছাতার মাথা'! 'ফা...সমাজসেবা' বলে কিছু নেই। আপনি সমাজসেবার নামে যা-যা করেন, তা করেন নিজের নিতল আনন্দের জন্য এবং এই গ্রহের সন্তান হিসাবে খানিকটা ঋণ শোধ করার জন্য। 


এমনিতে তিনি যে কাজগুলো করছেন আমি স্যালুট জানাই কিন্তু এমন না এই দেশে কেবল মিলনই এইসব করে বেড়ান। চাকুরির সুবাদে এই সেক্টরে তার প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে এবং সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্য বিপুল অনুগত লোকজন আছে মিলনের কাজগুলো জানার জন্য।

কেবল নগ্ন গাত্রই অশ্লীল না—মিলনের এই লেখাটাও অশ্লীল! মিলন যদি অন্য-কোন লেখায় এটা লিখতেন তা স্বাভাবিক হত। কিন্তু তিনি দুইটা প্রসঙ্গকে যেভাবে মিশিয়েছেন তা ভয়াবহ দৃষ্টিকটু। আপনারা যখন এই-এই করে বেড়ান আমি তখন...!

তাহলে মিলনের প্রতি আমাদের সাধারণের প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায় এদিন (কাল সারাদিন) মিলন আর কি কি করেছেন? 'কাল সারাদিন' তিনি কি মুত্র-বিসর্জন করেছেন বা ইয়ে...!

শিরোনানে মাহবুব কবির মিলনকে 'দুমুখো পাইপ' কেন বললাম? কিছু মানুষ থাকে এদের মুখ দুইটা থাকে! কখন যে কোন মুখ দিয়ে বলছেন এটা বোঝা আমাদের মত বেকুব লোকজনের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে!

নিজে তিনি সততার কথা বলে-বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন কিন্তু নিজের জন্য অন্যায্য সুবিধা ঠিকই বাগিয়ে নেন। 


নেন তো নেন আবার নির্লজ্জের মত শিশুসুলভ ব্যাখ্যাও দেন []।

"...আমি জানতামও না যে পাব (প্লট)। একদিন ডাকযোগে বাসায় বরাদ্দপত্র এসে হাজির।..."

যেটা কৌতুকের মত শোনায়! ভাগ্যিস, এটা বলেননি যে বরাদ্দপত্র কীভাবে-কীভাবে যেন আমার ঠিকানা যোগাড় করে 'পয়দল', হেঁটে-হেঁটে চলে এসেছে। এরপর এসে বলেছে, সা-র-প্রা-ই-জ! আমাকে নাও। ভাল কথা, তিনি যখন বুঝতে পারছেন, কাজটা ঠিক হয়নি, প্লটটা সরকারকে ফিরিয়ে দিলেই হয়...। 

সুত্র:

১. বিশ্বকাপ ২০২৬ Vs শায়খ আহমাদুল্লাহ গং!https://www.ali-mahmed.com/2026/07/vs.html?m=1

২. বলাৎকার এবং শরীয়া আইনhttps://www.ali-mahmed.com/2026/06/blog-post.html?m=1

৩. মাহবুব কবির মিলন: তরমুজ-মুরগি-প্লটhttps://www.ali-mahmed.com/2026/05/blog-post_379.html?m=1


Thursday, July 16, 2026

চোখে পানি নিয়ে প্রিয় আনিসুল হক আপনি কী ভাবছিলেন!

আনিসুল হক এমন একজন মানুষ, অনন্ত জলিলের মত অসম্ভবকে সম্ভব করা যার কাজ—তিনি কোলে করে মুসাকে হিমালয়ে চড়াতে পারেন, নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেই দিতে পারেন...  [], [], [], [], []!

মুসা হিমালয়ে কী ভাবেন এটা যেমন বলে দেন তেমনি একজন মানুষ বুকে গুলি নিয়ে কী ভাবেন এটাও বলে দিতে পারেন! তার বুকভরা গুলি!

আহা, একজন লেখক কী না পারেন, তা-ও আবার আনিসুল হকের মত একজন লেখক! 'খোকা যেভাবে বড় হলো', এটা যেমন মানসনেত্রে দেখতে পান তেমনি খোকা বড় হয়ে বুকভরা গুলি নিয়ে কী ভাবছিলেন—এই ভাবনা আনিসুল হক  নিমিষেই পড়ে ফেলবেন, এ আর বিচিত্র কী!

এই যে চোখের জল ফেলতে দিচ্ছেন না, মাস্কে আটকে ফেলছেন—জল আটকাতে-আটকাতে বিড়বিড় করে যে বলছেন, জঙ্গি দেশ, জঙ্গল, সভ্যতা...ব্লা-ব্লা-ব্লা!

আহারে, আনিসুল হক! চুলগুলো সব সাদা করে হাঁদার মত এখন বলছেন, খোকার মেয়ের এই দেশ জঙ্গি দেশ!
বুকভরা গুলি নিয়ে যে মানুষটার ভাবনা আনিস পড়তে পারেন আমরা তার কান্নার সময়কার না-বলা ভাবনাগুলো কি অনুমাণও করতে পারব না? চেষ্টা করতে দোষ কোথায়, বাওয়া। ঠিক না-হলে নাই—মনশ্চক্ষুতে দেখতে দোষ কোথায়!
আনিসুল হক ভাবছিলেন সহকর্মী সঞ্জীব চৌধুরীর কথা। ইন-হাউজে ভজকট পাকিয়ে কেমন করে সঞ্জীব চৌধুরীকে আউট-হাউজ করে দিলেন! নতুন তুর্কি লেখকদের কেমন মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বছরের-পর-বছর লাটিমের মত বনবন করে পাক খাওয়ালেন! নিজের পত্রিকাকে হাতিয়ার বানিয়ে এ দেশের সাহিত্য কেমন করে মিথ্যার বোতলে ভরে আচ্ছা করে ঝাঁকানো যায়—কেমন করে ফারাজকে [] নিয়ে মিথ্যা কাহিনী ফাঁদা যায়! কত, কত কিছু করা যায়...।

সূত্র:

১. আনিসুল হক: একজন 'আ ধর্ষ' সাহিত্যিকhttps://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_07.html?m=1

২. আপাদমস্তক একজন মন্দ মানুষhttps://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_08.html?m=1

৩.একমেবাদ্বিতীয়মhttps://www.ali-mahmed.com/2014/09/blog-post_7.html?m=1

৪. প্রথম বাঙালি, আনিসুল হক: https://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_27.html?m=1

৫. বিজ্ঞাপনে ঢেকে যায় 'ইয়ে': https://www.ali-mahmed.com/2009/03/blog-post_21.html?m=1

৬. ধারাবাহিক ফারাজ-কাহিনী: https://www.ali-mahmed.com/2016/08/blog-post.html?m=1



Tuesday, July 14, 2026

শিক্ষামন্ত্রী: সত্য-মিথ্যা, মিথ্যা-সত্য!

শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন বলেছেন:

কুমিল্লা একটা সেন্টার ব্যতীত কোন সেন্টারে পানি উঠেনি! ... ওই সেন্টারের একজন পরিক্ষার্থী পানিতে ভিজে গিয়েছিল। বাড়ি থেকে তার কাপড় আনা হয়েছিল এবং ১ ঘন্টা দেরিতে পরীক্ষা শুরু হয়েছিল!

এটা জেনে আমার খুব কান্না পাচ্ছিল, বুঝলেন! এতো মায়া-এতো মায়া! আমার এক চোখে জল, অন্য চোখে পানি চলে এসেছিল!

বিশ্বাস করেন, আমি মন্ত্রীদের সমস্ত কথা বিশ্বাস করতে চাই এবং আমি মন্ত্রীদের কথা বিশ্বাস করিও। কারণ?
মন্ত্রীরা সব জানেন, সর্বদা সত্য কথা বলেন এবং প্রচন্ড গরমের মধ্যেও স্যুট পরে থাকেন। এবং বিচিত্র কারণে আমরা যে দেখতে পাই তা দেখতে পান না!

'মন্ত্রীরা সব জানেন', অনেকে ভাবছেন, এটা আমি ফান করে বলছি। না! এটা আমি প্রমাণ করে মার্কেটে ছেড়ে দেব। শেখ হাসিনার সময় একজন বানিজ্য মন্ত্রী ছিলেন।

তিনি বললেন:

তার এলাকার লোকজন এখন খুব সুখে আছে। মহিলারা তিনবার লিপিস্টিক লাগাচ্ছে!

অন্যদের কথা জানি না কিন্তু আমার বউ কয় বেলা লিপিস্টিক লাগায় এটা আমি নিজেই জানি না অথচ মন্ত্রী তার এলাকার হাজার-লক্ষ মহিলাদের তিনবেলা লিপিস্টিক লাগাবার খবর দিব্যি জেনে বসে আছেন। আড়াই বার, পৌনে তিনবার না, একেবারে নিত্তিতে মেপে-মেপে তিনবার! 

যাই হোক, ফ্যাসিস্ট আমলের প্রসঙ্গ থাকুক। কিন্তু, কপাল আমার! জীবনে যা চেয়েছি তার উল্টোটা হয়েছে। কাকে ছেড়ে কাকে বিশ্বাস করব—মন্ত্রীকে বিশ্বাস করব নাকি এই ভিডিও ফুটেজগুলো? আমি খুব করে চাই কেউ এসে প্রমাণ করে দিক এই ফুটেজগুলো এআই দ্বারা নির্মিত।

এটা কুমিল্লা না! যতটুকু জানি কুমিল্লায় মেট্রোরেল নেই! অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী যদি বলেন, কুমিল্লায় মিরপুর আছে, মেট্রোরেল আছে। তাহলে আছে। মন্ত্রীর কথার উপর কথা চলে না।

এটাও কুমিল্লা না! বাই দ্য ওয়ে, বাপটা স্যুট পরে মিডিয়ার সামনে আসেনি, এটা পচা কাজ হলো!

যে বাবাটা জিন্দাবাদ-জিন্দাবাদ করছেন তার বক্তব্য আমরা খুব-একটা গুরুত্ব দিচ্ছি না কারণ তার গায়েও স্যুট নেই! 

এটা এআই হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল কারণ মেয়েটা যে ভঙ্গিতে পানিতে পড়েছে এটা বাস্তবসম্মত না! 

অনুমান করি, এটাও এআই হবে কারণ আমাদের পুলিশ আবার এভাবে দায়িত্ব পালন করে নাকি!

এই যে শিক্ষকরা কাঁধে করে খাতার বস্তা নিয়ে যাচ্ছেন আপনিই বলুন এ কী বাস্তবসম্মত? এটাও যে এআই দিয়ে করা এটা বোঝার জন্য কোন মতো মন্ত্রী হওয়া লাগে না!

এই যে আমাদের আরেক মন্ত্রী বাহাদুর! তিনি ভদ্র ভাষায় বলছেন, চট্টগাম শহর নিয়ে যেসমস্ত সংবাদ এসেছে সবই বানোয়াট! তিনি শহরময় ঘুরে-ঘুরে প্রমাণ দিয়ে দিয়েছেন।
ভাগ্যিস, এই ফুটেজটা মন্ত্রীদের চোখে পড়েনি নইলে বলতেন এটা তামিল ছবির দৃশ্য! 
আবার এ দৃশ্য দেখে মন্ত্রীরা দুম করে বলে বসবেন, এরা 'তাফরি' মানে ঘুরতে বেরিয়েছে:

সংসদভবনে শিক্ষামন্ত্রীর লাফ দেওয়ার দৃশ্য দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, তিনি টম ক্রুজের মত স্ট্যান্টবাজি করতে সক্ষম!

কিন্তু পানির মধ্যে এভাবে মোটরসাইকেল চালাতে পারবেন না! কারণ স্যুট ভিজে যাবে যে...! 







 



Monday, July 13, 2026

মোশারফ করীম: এক চামচ পাতলা 'ইয়ে' খান!

কেমন-কেমন করে যেন চালু হয়ে গেল এই মানুষটা বাংলাদেশের সুদর্শন পুরুষ!

অবশ্য একে 'সুদর্শন পুরুষ' না-বলে 'সুদর্শন মানুষ' বললে, আমি আপত্তি করতাম! বলতাম, ওয়াক!
কিন্তু, সুদর্শন পুরুষ বললে আমার আপত্তি নাই কারণ এটা মেয়েরাই ভাল বলতে পারবে—এদের চোখে এ সুদর্শন পুরুষ হলে আমি বাধা দেওয়ার কে! আমার কী!

'এখা', ওরফে এডলফ খান বলছে, রাত চারটায় তাকে ফোন করে কেউ বলছে:
'তোমার বাসার ছাদে হেলিকপ্টার পাঠাচ্ছি। তোমাকে নিয়ে আসবে'। 
বাংলাদেশে কোন মেয়ের ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার আছে বলে আমার জানা নাই! ছেলেদের আছে, আনভিরের আছে...!

যাই হোক, এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না৷ হালে এ স্টেজে গা দুলিয়ে হাত-পা নেড়েছে:

এটাও গুরুত্বপূর্ণ না! সোস্যাল মিডিয়ায় এখন এন্তার চুতিয়ারা এসে জড়ো হয়েছে [], [], [], [৪]। এরা পারে না গা থেকে কাপড় খুলে ফেলতে।

এখা ওরফে এডলফ খান, স্টেজে গা দোলাবার সময় মোশারফ করীম বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন এবং পুরষ্কারও দিলেন। সিরিয়াসলি, মোশারফ করীম! বাংলা সিনামা হলে আমি ন্যাকা-ন্যাকা গলায় বলতাম, না-আ-আ-আ, এ আমি বিশ্বাস করি না!

আচ্ছা, ভাল পয়সা পেলে মোশারফ করীম কি টাট্টিখানায় মানুষ কেমন করে বসে এটা স্টেজে উবু হয়ে দেখিয়ে দেবেন?

বা ধরুন, আরও ভাল পয়সা পেলে?

তার অভিনীত এই ছবির সংলাপে যেমন বলছেন, কচকচ করে 'ইয়ে' খাবি...!

ডিয়ার, মোশাররফ করীম, আপনাকে 'মু বলে' ট্যাকাটুকা দেব, আপনি স্রেফ এক চামচ পাতলা গু খাবেন, সুড়ুৎ-সুড়ুৎ করে। পারবেন না, স্যার? আলবত পারবেন...! 

* অনেকে আমাকে পাতলা তিরস্কার করেন, আপনাকে এইসব ছাপড়িদের নিয়ে লিখতে হয়' শেষপর্যন্ত আপনাকেও!

অনেকে এই সমস্ত ছাপড়িদের শক্তি আঁচ করতে পারছেন না! এরা দাবড়ে বেড়াচ্ছে—ক্রমশ একেকটা দানব হয়ে ওঠছে। তৈরি করছে এদের অসংখ্য অনুসারী।

কেউ কল্পনা করতে পারবে এডলফ খান নামের মানুষটার টিকটকে ১ কোটি লাইক! আমার জানা হতো না, এই তথ্যটা দিয়েছে এআই! আমি বিশ্বাস করিনি কিন্তু চেক করে দেখি সোনা ঝরা রোদের মত সত্য...! 

সূত্র: 

১. ওয়াকhttps://www.ali-mahmed.com/2026/06/blog-post_148.html?m=1

২. এই জন্তুগুলোকে আটকাতে হবে: https://www.ali-mahmed.com/2026/03/blog-post_13.html?m=1

৩. হাজি সাব... :  https://www.ali-mahmed.com/2026/06/blog-post_08.html?m=1

৪. ব্রাত্য রাইসুhttps://www.ali-mahmed.com/2026/07/blog-post_11.html?m=1

 



Saturday, July 11, 2026

'এক ব্যাগ পিক্ষক': ব্রাত্য রাইসু!

এই গ্রহে কিছু মানুষ আছে এরা স্রেফ 'এটেনশন সিকার'! দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রয়োজন হলে দাঁত বের করে নিজেই নিজের বস্ত্রহরণ করে ফেলবে। নমুনা:

ওই যে বললাম, 'নিজেই নিজের বস্ত্রহরণ'! রাইসু, তিনি আহমদ ছফা [*], সলিমুল্লাহ খান, এদের সঙ্গে নিজের নাম নিজেই ঢুকিয়ে দিয়েছেন! অন্যকে আর তকলীফ দেননি!
ওরে, আমাদের শিক্ষক, রে! ওরে, আমাদের দার্শনিক, রে!
(কাউকে-কাউকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি ভয়ে-ভয়ে থাকি—চুতিয়া লিখে না ফেলি! এটা না-লেখার জন্য আমি পাঠককের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছি! ভাগ্যিস, রাইসুকে 'চু...' লিখিনি! আল্লাহ মেহেরবান। তিনি আমাকে তিনি রক্ষা করেছেন!)
তো, ব্রাত্য রাইসু নিশ্চিত করছেন তিনি দেশ ও জাতির শিক্ষক, দার্শনিক! অন্যদের সঙ্গে তিনিও ঠিক করবেন, আমরা কী ভাবব, কী শিখব!

পূর্বেও বহুবার  বলেছি:
জ্ঞান হচ্ছে সরলরেখা। মানুষ শিখতে থাকবে এগুতে থাকবে—নাথিং গনা স্টপ! আর নির্বুদ্ধিতা হচ্ছে, বৃত্ত। যখন সে মনে করে আমার জানা শেষ, বে-সিন, ব্যস! ফুলস্টপ! সে আর এগুতে পারে না! তখন সরলরেখাটা আর সরল থাকে না বৃত্তে রূপ নেয়—মানুষটা বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকে! আজীবন...।
এই দোষে দুষ্ট হুমায়ুন আজাদও []! আমি রাইসু স্যারকে নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম, 'এক ব্যাগ আহাম্মক'। কিন্তু একজন দেশ ও জাতির শিক্ষক, 'ধার্ষনিক'-কে (আগাম ক্ষমা প্রার্থনা, আমি প্রায়শ বানান ভুল করি) তো আর এটা বলা চলে না তাই 'এক ব্যাগ পিক্ষক'! ওহো, 'পিক্ষক' জিনিসটা কিন্তু অভিধানে পাবেন না। বিনয়ের সঙ্গে একটু বুঝিয়ে বলি। আগে রাইসু স্যারের 'অমড়' কবিতাটাও চোখ বুলিয়ে নিন।
ব্রাত্য রাইসুর 'অমড়' রচনা! 

অন্যদের কথা জানি না কিন্তু যে মানুষটার দোরা কাউয়ার সঙ্গে 'বিশেষ সখ্যতা'—যে উঁচুমানের মানুষটা দোরা কাউয়া এবং পাতি কাককে 'ইয়ে শেখাবার' জন্য পেয়ারা গাছের মগডালে উবু হয়ে বসে থাকেন—সেই মানুষটার কাছ থেকে দর্শন-শিক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা অন্তত আমার নাই! তো, যারা গাছে-গাছে ঝুলাঝুলি করে পাখিদের এই সমস্ত কর্মকান্ড (রাইসু স্যার এটা আবিষ্কার করেছেন, এটা বিরল) গভীর পর্যবেক্ষণ করেন তাদেরকে 'পাখির শিক্ষক' বা 'পিক্ষক' বলে!

আহারে-আহারে, মানুষটা কেমন করে শিক্ষক থেকে 'পিক্ষক' ('পক্ষীর বিশেষ কর্মকান্ড বিশেষজ্ঞ') হয়ে গেলেন এ-এক বিস্ময়! আর এমন-এক জিনিস প্রসব করার পর তার আর প্রসববেদনার মধ্যে দিয়ে না-যাওয়াটাই সমীচীন হবে! কারণ একবার অমর হয়ে গেলে আর মরার সুযোগ নাই!
... ...  ... 
Uday Rahman, সুর নামের একটা লেখা এফবি-তে লিখেছিলেন। ওখানে হাজার-হাজার পাঠক লেখাটি পছন্দ করেছিলেন। আমি নিজেও লেখাটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেই মুগ্ধতা ছাড়িয়ে গিয়েছিল অন্য কারণে! সোস্যাল মিডিয়ায় সচরাচর পাঠক বড় লেখা পড়তে চান না।
কারণ ছোট-ছোট স্ট্যাটাস পড়ে-পড়ে আমাদের অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে!  'সুর' লেখাটা সুবিশাল! ওই হিসাবেও এটা একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা! এই কারণে এই মানুষটা অসাধরণ একটা কাজ করে ফেলেছেন! এই প্রেক্ষিতে লেখার মান নিয়ে খুব-একটা আলোচনায় যাওয়াটা অসীমীচীন!
কারও কোন লেখা ভাল লাগলে আমি বিনয়ের সঙ্গে আমার সাইটে পাবলিশ করার অনুমতি চাই। অন্য-কোন কারণ নেই—স্রেফ ভাল লাগা! এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি []।
এফবি-তে 'সুর' লেখাটা ছাপা হওয়ার পর অনেক পন্ডিত এর ব্যবচ্ছেদ শুরু করেছিলেন। সে না-হয় গেল! এটা আমাদের বঙালদের অভ্যাস! গড়তে না পারি কিন্তু হাতুড়ি-বাটাল নিয়ে ভাস্কর্য ভাঙ্গতে নেমে পড়ি।
যাই হোক, এইসব আমাদের গা সওয়া! কিন্তু ব্রাত্য রাইসু, 'সুর' লেখার রেফারেন্সে একের-পর-এক স্ট্যাটাস প্রসব শুরু করলেন। স্যারের প্রসববেদনা বাংলা সাহিত্যের দন্ড কাঁপিয়ে দিল 
রাইসু স্যার অবশেষে নিজেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করলেন! দৌড়ে আমার সেই মানুষটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। যিনি নিজেকে প্রথম বলে দাবী করলেন কিন্তু বিচিত্র কারণে পেছনে আর কেউ ছিল না, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল একরাশ কাকের বিষ্ঠা...! 

ত্য রাই সু: https://www.ali-mahmed.com/2017/11/blog-post_30.html?m=1
২. এক বস্তা 'ডুমকফ': https://www.ali-mahmed.com/2026/06/blog-post_572.html?m=1
৩. সুর: https://www.ali-mahmed.com/2026/07/blog-post_24.html?m=1

* এই 'পিক্ষক সাহেব' আবার আহমদ ছফাকে নিয়ে একটা লেখা দিয়েছেন:
রাইসু লিখেছেন,
আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার ১৯৯৬। প্রকাশিতব্য।
'প্রকাশিতব্য' মানে কী! এটা কী এখনও প্রকাশ হয়নি!
আহমদ ছফা জীবিত নাই। আপনার যা ইচ্ছা তা তাঁকে উল্লেখ করে ছাপিয়ে দিলেন, বাহ!
আর এটা ছফার সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ হয়ে থাকলেও এর সত্যতা কি? রাইসুর কাছে কি এটার অডিও-ভিডিও ক্লিপ আছে? থাকলে এই লেখার সঙ্গে অবশ্যই সূত্র দেয়া প্রয়োজন ছিল।
আর আমরা কথাচ্ছলে-গল্পচ্ছলে অনেক কথাই বলে থাকি মানুষ হিসাবে আপনি ছোটলোক-ইতর না-হলে (যার আরেক নাম 'কুটনা') তা জনে-জনে বলে বেড়াতে পারেন না। তাছাড়া সাক্ষাৎকার হয়ে থাকলে রাইসু কি আহমদ ছফাকে অবগত করেছিলেন যে, এখন থেকে আপনার কথা রেকর্ড করা হচ্ছে? 
একজন 'এটেনশন সিকার', যিনি চোখের পলক না-ফেলে অনর্গল মিথ্যা বলেন, 'শেন ওয়ার্ন কে, চিনি না', এমন-একজন মানুষের কথা বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই...!  
 

Thursday, July 9, 2026

'বাঞ্চো' ট্রাম্প তার বাম হাত এবং তার ছানাপোনারা!

Folarin Balogun, USA এর স্ট্রাইকার। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার সাথে Round of 32 এর ম্যাচে VAR রিভিউ এর পর Tarik Muharemovic এর পায়ে স্ট্যাম্প করার জন্য রেড কার্ড পেয়েছিল।

ট্রাম্প নিজে স্বীকার করছে সে FIFA প্রেসিডেন্ট Gianni Infantino-কে কল দিয়ে 'রিভিউ' করতে বলছে কারণ তার মনে হয়েছে এটা ফাউলই ছিল না! 

FIFA রেড কার্ড বাতিল করে নাই। Article 27 অনুযায়ী ১ বছরের জন্য সাসপেনশন 'সাসপেন্ড' করেছে, তাই Balogun বেলজিয়ামের সাথে খেলতে পেরেছে। কিন্তু খেলেও লাভ হয় নাই!

Round of 16-এ বেলজিয়ামের সাথে খেলেছে। বেলজিয়াম ৪-১ এ USA-কে হারিয়ে দিয়েছে। USA বাদ।

এটা অভূতপূর্ব! এক বাঞ্চো ট্রাম্প কেমন করে আমেরিকার মত শক্তিশালী দেশকে উলঙ্গ করে দেয় যে মানুষ একবার থুথু ফেলার পরিবর্তে বারবার থুথু ফেলে।

ফিফার প্রেসিডেন্ট বাঞ্চো ট্রাম্পের সঙ্গে ঘষাঘষি আজকের না! বাঞ্চো ট্রাম্প যা বলে তাতেই হাসতে-হাসতে গড়িয়ে পড়ে:


আর্জেন্টিনা-মিশরের যে খেলাটা, এ বড় অদ্ভুত এক খেলা!
মাঠের একমাথায় ফাউল হলো। অন্য মাথায় গোল হলো। পুরো খেলা রেফারি চালিয়ে গেল কিন্তু বাঁশি বাজিয়ে খেলা বন্ধ করল না—এই সময়টায় রেফারি পেশাব করতে হিমালয়ে গিয়ে থাকলে অবশ্য কোন কথা নাই! 

রেফারি সবাইকে কার্ড দেখাতে পারে, কোচকেও, কেবল নিজেকে ব্যতীত! 

আর্জেন্টিনা জেতার পর বেচারা ফিফার প্রেসিডেন্টের উল্লাস লুকিয়ে রাখতে বেগ পেতে হচ্ছিল।

মিশরের কোচ যে সাইনটা দেখিয়েছেন এর অর্থ তো রেফারির জানার কথা!


মিশরের কোচ আগের খেলায় প্রতিবাদ হিসাবে মাঠে প্যালেস্টাইনের পতাকা উড়িয়েছেন।

আমাদের দেশের এক 'মহা-ল্যাকক' বড় ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এই কান্ডে তিনি চাউলের সঙ্গে পানি মেশাবেন না। এরপর কেমন করে ভাতের স্থলে কাচা চাল খেতে হয় তা 'হাতেপায়ে' দেখিয়ে দিয়েছেন।


ইসরাইলীরা কী আদৌ মানুষ? এই একটা ভিডিও ক্লিপ দেখলে, খানিকটা সংশয় থাকলে তাও দূর হবে!

এরপরও এদের পক্ষে কেউ দাঁড়ালে কেবল বাঞ্চো ট্রাম্পেরই গাত্রদাহ হয় না, তার ছানাপোনারাদেও হয়!

* 'বাঞ্চো' শব্দটি অভিধানে খুঁজে লাভ হবে না। এটা 'অভিধান বহির্ভূত' একটি শব্দ। কারও কর্মকান্ডে খুব 'মুগ্ধ' হলে তাকে বলাটা জরুরি হয়ে পড়ে।

Tuesday, July 7, 2026

জীবন বড় সুন্দর—জীবন বড় অসুন্দর!

'জীবন বড় সুন্দর' নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, ২০২০ সালে। এর সঙ্গে []। দেখা হয়েছিল ঠিক এই অবস্থায়! ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায়। একে-ওকে ধরে তখন তার জন্য একটা হুইল-চেয়ারের ব্যবস্থাও করা গিয়েছিল। 


শিশুটার ২ পা, এক হাত নেই। দুর্ঘটনার পর-পরই বাবা-মাও তাকে ফেলে দেয়।
আমি জীবনের কাছ থেকে শিখছিলাম কিন্তু বাবা-মা তার আপন সন্তানকে কেমন করে ফেলে দেয় এটা তখন পর্যন্ত মাথায় আসছিল না!

সেসময় 'ভাসানী' নামের তার এই ভাই তাকে আগলে রেখেছিল যেটা আমাকে অসম্ভব, অসম্ভব মুগ্ধ করেছিল। তখন আমি ক্রমশ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছিলাম! ভাসানী নামের এই কালো-কালো লিকলিকে ছেলেটার মধ্যে কী আছে যা আমার মধ্যে নাই! এত মায়া-এত মায়া!
এ সবই কিন্তু পুরনো গল্প—২০২০ সালের কথা...।

...

এয়ারপোর্ট রেল-স্টেশনে আমি ট্রেন ধরব। ট্রেনের অপেক্ষায় আছি। আমার নিজস্ব জাগতিক কষ্টে খানিকটা অন্যমনস্ক ছিলাম সম্ভবত! আক্ষরিকভাবেই আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার পা আটকে আছে—জোর করে কেউ ধরে রেখেছে। তাকিয়ে দেখি বড়সড় একটা বাচ্চা ছেলে! পূর্বে দেখেছি, ছোট-ছোট বাচ্চারা অনেক সময় কিছু টাকা না-দিলে পা ছাড়ে না!

অনেক সময় এরা নেশার টাকার জন্যও এই কাজ করে। এই ছেলেটি কিন্তু টাকা চাচ্ছে না। হাসি-হাসি মুখ করে বলছে:

'স্যা..., আপনে ভাল আছেন'? কতদিন, কত জায়গায় যে আপনারে খুঁজছি। আপনের ওই অফিসেও গেছি...। 

ওর ভাষায় অফিস মানে? এদের নিয়ে কাজ করার জন্য NEDO নামের একটা প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিলাম।

কারণ আমি বাচ্চাদের নিয়ে, বাচ্চাদের ইস্কুল নিয়ে কাজ করতাম []। একদিন দেখা গেল কারও সঙ্গে  অন্য-কোন কারণে ঝামেলা হয়েছে আর সে পুলিশ ম্যানেজ করে, আমার কোমরে দড়ি লাগিয়ে ফেলেছে। অনেক সময় অজ্ঞাতনামা মানুষকে নিয়েও কাজ করতে হতো।  এই সমস্ত কারণে সরকারের অনুমতিক্রমে একটা প্রতিষ্ঠান করাটা অতি জরুরি ছিল।

কিন্তু আমার সাথের লোকজনের সঙ্গে বনিবনা হলো না কারণ ওদের উদ্দেশ্য ছিল এদের নিয়ে লোভের খনি ড. ইউনূসের [] মত ব্যবসা করা। ওহো, এদের নিয়েই যদি ব্যবসা করতে হয় তাহলে ড্রাগ-নারী নিয়ে ব্যবসা করতে অসুবিধা কোথায়! 

যাই হোক, আমার স্মৃতিশক্তি ভয়াবহ খারাপ! আমি নাম মনে রাখতে পারি না। আমি আজও ইংরাজিতে মঙ্গল-বৃহস্পতি গুলিয়ে ফেলি। পূর্ব-পশ্চিম এলোমেলো হয়ে যায়—আমি ঝিম মেরে মনে করার চেষ্টা করি সূর্য কোন দিকে উঠে। এরপর অতি সহজে বের করে ফেলি উল্টো দিকটাই পশ্চিম। 

কিন্তু আমি নিমিষেই একে চিনতে পারলাম:

এক নদী বিস্ময় চেপে বললাম, 'তুমি সাগর না'?

এরপরই এ আমাকে বলছে, 'স্যা..., কি খাইবেন, আপনে? আপনে একটা-কিছু খান। খান, খাইতেই হইব আপনারে'?

আমার চেহারায় কঠিন-কঠিন একটা ভাব আছে। মানুষটাও আমি কঠিন টাইপের কিন্তু আসলে আমি একজন দুর্বল মানুষ! নিমিষেই আমার চোখ ভরে এসেছে! আমার চোখের সামনে সব অস্পষ্ট, ছায়া-ছায়া!

ট্রেন আসার আগ-পর্যন্ত এর সাথে কথা হয়, অনেক। তার সেই ভাই ভাসানী, সেও একটা মেয়ের হাত ধরে তাকে ফেলে চলে গেছে। এখন কেবল এক পৃথিবী—এক আকাশ—এক সাগর! মাঝামাঝি আর কিছু নেই! কিচ্ছু না...। ফাঁকা জায়গায় কেবল কিছু মেঘ উড়ে বেড়ায় যা দেখে মাঝেমধ্যে আমদের মনটা তরল হয়! 

আমার পুরনো কষ্ট ফিরে আসে। মেঘে-মেঘে বেলা হয়ে যাচ্ছে আমার বিদায়বেলা ঘনিয়ে আসছে কিন্তু এদের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে যেতে পারলাম না। শালার একটা পাইপমানুষ হয়েই রয়ে গেলাম—এই গ্রহে এসেছি কী কেবল খেতে আর বর্জ্যত্যাগে! চুতিয়া এক জীবন!

ট্রেন ঢুকছে। যাওয়ার সময় তাকে বলি, 'দাঁড়াও, তোমার একটা ছবি তুলি'। 

'দাঁড়াও' এই কথাটা কথাচ্ছলে বলা কিন্তু এ তো আর দাঁড়াতে পারবে না। আমার ট্রেন ধরার তাড়া। আমি লম্বা-লম্বা পা ফেলে এগুতে থাকি—আমার নিজের পা'র দিকে তাকিয়ে আমার নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছিল....!

সূত্র:

১. জীবন বড় সুন্দরhttps://www.ali-mahmed.com/2020/03/blog-post.html?m=1

২. আমাদের ইশকুল: https://www.ali-mahmed.com/search/label/%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%E0%A6%87%E0%A6%B6%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%B2?m=1

৩. লোভের খনি, ইউনূস: https://www.ali-mahmed.com/2026/05/blog-post_10.html?m=1

Monday, July 6, 2026

বিশ্বকাপ ২০২৬ Vs শায়খ আহমাদুল্লাহ গং!

বিশ্বকাপের উম্মাদনা প্রায়শ সীমা ছাড়িয়ে যায় এ সত্য। কিন্তু এ-ও সত্য, আমাদের গল্প করার মত গল্প কম!

বৈচিত্র্যহীন জীবনে মাঝে-মাঝে বৈচিত্রের প্রয়োজন আছে বৈকি।

আমাদের ধর্মীয় শিক্ষকরা সব কিছুতে বাম হাত ঢুকিয়ে দেন—একটা-না-একটা ফতোয়া কামানের গোলার মত ছুড়ে দেবেন নির্ঘাত!

নামাজ শুরু হওয়ার আগে ইমাম সাহেব নিয়ম করে বলবেন, টাখনুর উপরে কাপড় রাখার জন্য। আবার কিছু মোল্লা সাহেব 'গভেষণা' করে বের করেছেন টাখনুর নীচে কাপড় থাকলে পুরুষদের 'টেস্টা-ফেস্টারন' নিয়ে ভয়াবহ সমস্যা হয়। এই সমস্যা কেবল লিকলিকে বঙালদের হয় লম্বা রেসের ঘোড়া সৌদি-ফৌদিদের হয় না!

এই যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের, এদের টাখনু নিয়ে সমস্যা হয় না?
এই বিশ্বে পাক্কা মুছলমান-সব হচ্ছে বাংলাদেশে! অথচ এদেশে সবচেয়ে বেশি দূর্নীতি হয় রমজান মাসে (এমন একজনকে যদি এনে দিতে পারেন যে ১১ মাস ঘুষ খায় কিন্তু রমজান মাসে খায় না, প্রকাশ্যে পা ধরে সালাম করব)!

মুর‍তাদের দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স এইসব দেশে রামাদান উপলক্ষে অন্তত ২৫ ভাগ ছাড় দিলেও আমরা সিয়ামের মাসে ২৫০ পার্সেন্ট লাভ করি!

কোথাও কোন প্রার্থনাস্থলে-মসজিদে জুতা চুরি হয় এবং নামাজে জুতা নিয়ে গেল কি না—এই নিয়ে মাথায় কেবল ঘুরপাক খায়, এ-ও এক বিরল দেশ, বাংলাদেশ! জাতীয় সংসদ থেকে সাংসদ হানজালার জুতা চুরি হয়ে গেল।

তারচেয়ে ভয়ংকর হলো, মসজিদে একবার আমার জুতা চুরি হলো। আমি এদিক-ওদিক খুঁজছি। (নামাজ পড়ে বেরিয়েছেন) একজন সহৃদয় মানুষ অমায়িক ভঙ্গিতে বললেন, 'আরে পাইবেন না, বাদ দেন। এইখান থিক্যা একটা নিয়া যান'।

অথচ শিখদের পবিত্র জায়গা গুরুদুয়ারায় অন্যদের জুতা পরিষ্কার করাকে পবিত্র কাজ মনে করা হয়!

শায়খ আহমাদুল্লা ফুটবল নিয়ে ফতোয়া দিয়েছেন।

'সতর' নাকি দেখা যায়! আমি ভুল শুনছিলাম 'চুতার'! 'চুতার' মানে '..ছা' দেখা গেলে অবশ্যই আপত্তিকর কারণ তাহলে বর্জ্য নিষ্কাশন যন্ত্রের ফুটো দেখা যাবে! এতে আমিও আপত্তি করতাম। কিন্তু 'সতর' (ستر)—পুরুষের সতর: নাভির নিচ থেকে শুরু করে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত।

এই যে সাদা জার্সিতে সৌদি আরব খেলছে! নাভির নীচে খোলা তো দেখছি না!  মোজা-টোজা সহ ধরলে কেবল ইঞ্চি দুয়েক ফাঁকা! 

অনেকে বুঝতেই পারে না একজন খেলোয়াড় কেমন করে সমস্ত বিশ্বকে নাড়িয়ে দিতে পারে। 
১৮ বছরের এক তরুণ 'লামিল ইয়ামাল' প্যালাইস্টানের পক্ষে দাঁড়িয়ে সমস্ত পৃথিবী কাঁপিয়ে দিল! সে একা যা করেছিল তা লক্ষ-লক্ষ মোল্লা ওয়াজ করে করতে পারেননি! 
আমাদের দেশের মোল্লারা আবার যান ইসরাইলের দূতাবাস ঘেরাও করতে অথচ বাংলাদেশে ইসরাইলের দূতাবাস কখনও ছিলই না! এই হচ্ছে এদের জ্ঞানের নমুনা!

এমনিতে আহমাদুল্লাহ ক্রিকেট খেললে কোন সমস্যা নাই?

ভাল কথা, এই যে সচিত্র মানে ভিডিও করে আপনারা যে বিভিন্ন ফতোয়া দেন বা ওয়াজ করেন; এই যে ভিডিও-এর নামে ছবি তোলা হয় যেগুলো জোড়া দিলে হাজার-লক্ষ ছবি হবে এতে ধর্মীয় কোন নিষেধাজ্ঞা নাই?
আছে তো, মারাত্মক নিষেধাজ্ঞা আছে। তা, এটা পালন করেন না কেন! দু' ইঞ্চি চামড়া খোলা থাকার জন্য হারাম বলে বিরাট ফতোয়া দিবেন আর এই বিষয়ে উদাসীন থাকবেন এ কেমন বিচার!


 

 

WhatsApp