Search

Loading...

Tuesday, December 15, 2009

ব্যবচ্ছেদ

একবার এলাকার একজন আমাকে বললেন, আজ আপনার খুব আনন্দের দিন, না?
আমি অবাক, কেন?
সে বলল, আজ পাকিস্তান খেলায় জিতেছে।
 

মানুষটাকে খুন করে ফেললে আরাম পেতাম। আফসোস, সব ইচ্ছা আমরা পূরণ করতে পারি না।
আমি অসহ্য রাগ সামলে বললাম, পাকিস্তানিদের আমি তীব্র ঘৃণা করি। তারা খেলায় জিতলে আমার আনন্দ হবে এরকম মনে হলো কেন আপনার?

সে বলল, আপনারা নন-বেঙ্গলি, পাকিস্তানি, তাই আমি ভাবলাম...।
আমি তাকে কঠিন গলায় বললাম, পাকিস্তানি মানে কী? আমার বাবা এই দেশে এসেছিলেন ভারত থেকে। বাংলাদেশে লক্ষ-লক্ষ মানুষ ভারত থেকে এসেছেন তাদের বেলায় সমস্যা হয়নি, আমাদের বেলায় সমস্যা কেন? মৌলানা ভাসানী কোত্থেকে এসেছিলেন? আর আপনি পাকিস্তানের সঙ্গে কেন গুলিয়ে ফেলছেন?
স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় আমার বাবার দ্বারা কারও শারিরীক, আর্থিক, মানসিক ক্ষতি হয়েছে?
তিনি তখন এখানকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন। তখন বলত, প্রেসিডেন্ট।
আমার জানা মতে, তাঁর উপলক্ষে ৭১-এ অজস্র মানুষের প্রাণরক্ষা হয়েছে। আর ক্ষতি হয়ে থাকলে বলেন। আমি তার সন্তান হিসাবে তার সমস্ত অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করব, শাস্তি মাথা পেতে নেব। আমি এই চ্যালেঞ্জ কেবল আপনাকে না, সমগ্র দেশের লোকজনের প্রতি ছুঁড়ে দিলাম।
মানুষটা বেত্রাহত কুকুরের মত সরে পড়েছিলেন।

আমার বাবা এ দেশে এসেছিলেন ৫১-এ। তিনি থাকতেন লক্ষৌ'র কানপুরের ইস্তেখারাবাদে। ওখানে ভালই ছিলেন, বাড়াবাড়ি রকমের ভাল (কতটা ভাল? খানিকটা অহং প্রকাশ পায় বিধায় এখানে বিস্তারিত বলতে ইচ্ছা করছে না)।
বাবাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওখানে সব ফেলে আপনি এ দেশে কেন এলেন?
তার সোজাসাপটা উত্তর ছিল, আমার ইচ্ছা ছিল একটা মুসলিম দেশে থাকার।
তাঁর এই সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত এটা তিনিই ভাল বলতে পারবেন। আজ তিনি জীবিত নাই, এই নিয়ে নতুন করে জানারও উপায় নাই।

মানুষটা পড়তেন প্রচুর। আমার নিজের পড়ার অদম্য আগ্রহটা সম্ভবত তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছি। তাঁর হিন্দি, আরবি, ফারসি, উর্দুতে ছিল অসাধারণ দখল কারণ সেখানে এসবই পড়ানো হত, তখন এইসব না-পড়া মানে হচ্ছে মূর্খ থাকা! কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন ওখানে বাংলা কেন পড়ানো হতো না তার সঙ্গে বাহাস করার কোন গোপন ইচ্ছা আমার নাই।
আমি যখন খানিকটা পড়া শিখছি তখন আমার প্রধান কাজ ছিল নিয়ম করে আমার বাবার বাংলাটা দেখিয়ে ঠিক করে দেয়া। এই একটা ক্ষেত্রে আমি তাঁর শিক্ষক ছিলাম। তবে আমি তাঁকে বাবা হিসাবে যতটা না মনে রাখব তারচে একজন অসাধারণ শিক্ষকরূপে মনে রাখব।

তাঁর মৃত্যুর ২৬ বছর পরও এলাকায় এখনও তাকে যতটা মানুষ চেনে তার ৫ ভাগও আমায় চেনে না। মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ ভালবাসা।
কী হয়েছে? সাইকেলের জন্য বিয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে, দাও কিনে তাকে একটা সাইকেল। কী, রাস্তা নাই? চলো রাস্তা করি। মৃত্যু আগ-পর্যন্ত মানুষটা এইসব যন্ত্রণা করে গেছেন। যথারীতি আমাদের গোটা পরিবারকে ভাসিয়ে দিয়ে।
 

৭১-এ তাঁর উপলক্ষে যেসব মানুষের প্রাণরক্ষা হয়েছিল এদের অনেকে এখনও দেখা হলে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন, কৃতজ্ঞচিত্তে বাবার অবদানের কথা স্মরণ করেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, এমন কতসব মানুষ।
অনেকে এত বছর পরও যখন বলেন, আরে, আপনি ওই মানুষটা ছেলে, তিনি...। এখনও কোন গ্রামে গেলে একজন কৃষক যখন বলেন, ওয়াল্লা, আপনে তাইনের ছাওয়াল, তাইনে তো আমার বন্ধু মানুষ আছিল। 

বুকটা ভরে যায় তখন, আমাদের পরিবারের প্রতি করা তাঁর সমস্ত অন্যায় বিস্মৃত হই। 

এই দেশে আমার জন্ম, এই দেশের মাটি-জল মেখে মেখে বুক ভরে শ্বাস নিতে নিতে দেশের প্রতি একগাদা মমতা নিয়ে বড়ো হয়েছি। বাংলায় পড়াশোনা করেছি, এ দেশের মেয়েকে বিয়ে করেছি। আমার সন্তানও এদেশের জল-মাটিতে বড়ো হচ্ছে। এখনও এই দেশ কী আমার না? এরচেয়ে মরে যাওয়াটা অনেক কম বেদনার।
ঈশ্বর, আমার বাবা এদেশে আসার ৫৮ বছর চলে গেছে এখনও আমাকে শুনতে হয়, আমি নন-বেঙ্গলি! বড়ো কষ্ট হয় তখন।


আমি জ্ঞাতসারে পাকিস্তানি কোন পণ্য কখনও ব্যবহার করি না, করিনি। যুদ্ধের সময় আমার বয়স ৫। কিন্তু এখনও আমি মানসচক্ষে এই দেশের সেরা সন্তানদের লড়াই, বীরত্ব, ত্যাগ স্পষ্ট দেখতে পাই। নিজের জাগতিক প্রয়োজন তুচ্ছ করে খুঁড়ে-খুঁড়ে বের করার চেষ্টা করি এঁদের বেদনা, এঁদের অবদান। 

দুলা মিয়ার মত অসমসাহসি মানুষটার প্রতি চরম অবহেলা দেখে, তাঁর নিচিহ্ন হয়ে যাওয়া কবর দেখে আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। 
সুরুয মিয়া ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে যে পেয়ারা গাছটায় ফাঁসিতে ঝুলে পড়েছিলেন সেই গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদি।  
ফযু ভাই নামের ওই অগ্নিপুরুষটা গা ছুঁয়ে আবেগে কাঁপি।

মানুষ হিসাবে প্রচুর খাদ আছে আমার। কেবল এই দেশ, এই দেশের সেরা সন্তানদের প্রতি ভালবাসায় কোন খাদ নাই। এই দেশের প্রতিটি বেদনায় কাতর হই, আনন্দে উল্লসিত। এই দেশ আমার কাছ থেকে কী চায়, একবার চেয়ে দেখুক না। কসম, পিছ-পা হবো না। তবুও এই দেশ আমার না এই গালিটা শুনতে চাই না, প্লিজ।

আহ, বড়ো কষ্ট হয় যখন এখনও শুনি আপনারা তো নন-বেঙ্গলি। বড়ো কষ্ট হয়, বড়ো কষ্ট...

No comments: