Search

Tuesday, December 12, 2023

বেলা বয়ে যায়-পাঠ রয়ে যায়!

মেঘে মেঘে বেলা বয়ে যায়- বুকের গভীর থেকে বেদনা পাক খেয়ে উঠে, আহারে-আহারে, জাগতিক সব বেদনা এক পাশে সরিয়ে কেবল তিনটা কাজ করলাম না কেন?! পড়া-পড়া আর পড়া, এই...! দেখো দিকি কান্ড, হাজার-লক্ষ বই এখনও পড়ার বাকী- কিছুই তো পড়ার সুযোগ হল না। মানুষের জন্য ৩০০-৪০০ বছর কচ্ছপের আয়ু পাওয়াটা ভয়াবহ এক ব্যাপার কিন্তু বই পড়া কেবল এই একটা কারণে সেই ভয়াবহ ব্যাপারটাই এক তুলতুলে আরাম হয়ে যায়!

এই প্রজন্মের কাছে এখন কী বিপুল সুযোগই না বই পড়ার- ইন্টার পড়ুয়া এক বাচ্চা কার্ল সাগানের 'কসমস' পড়ে বসে থাকে। বিশ্বাস হয় না। আমি চাল করে জিজ্ঞেস করি: আচ্ছা, কও তো দেখি শেষে কী নায়ক মারা যায়? কীসের কী, অবলীলায় ফরফর করে বকতে থাকে! অথচ আমার মত মফঃস্বলে থাকা একজনের জন্য তখন মোটেও সহজ ছিল না জাতের একটা বই যোগাড় করা।

এমনিতে পাঠক হিসাবে আমি পশু শ্রেণীর। যা পাই তাই- পড়ার আগামাথা নাই! যা ভাল লাগে তাই পড়ি- মিচিও কাকুর প্যারালাল ওয়ার্ল্ডস হোক বা সোলেমানি তাবিজের বই তাতে কী আসে যায়! যেমন 'কাছাসুল আম্বিয়া' নামের একটা বই পড়েছিলাম [] যা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়:

"একটা গাভী সামান্য মাত্র নড়াচড়া করলেই এই বিশ্ব সংসার লন্ডভন্ড হয়ে যাবে।"  

গাভী শান্ত থাকুক এবং জগতের সবাই সুখি হোক। যাই হোক, বই এবং আমার মধ্যে একটাই অলিখিত শর্ত: বই টানতে হবে মানে বই এবং আমার মধ্যে টানাটানির একটা ব্যাপার থাকে আর কী। না-টানলে আমাদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি নাই। যেমন রবিদাদার 'শেষের কবিতা' দুইবার শুরু করেও শেষ করতে পারিনি! দাদার উপন্যাস আমাকে খুব একটা টানে না। রবিদাদার ফ্যানরা ক্ষেপে গেলে বিপদ কিন্তু তাই বলে আমার মত পশু টাইপের  পাঠকের দানাপানি বন্ধ করা চলে না। অথচ তাঁর ছোট গল্প পড়লে মনে হয় একেকটা মাস্টারপিস! 

তো, বই কালে-কালে আমার জন্য ভারী একটা কাজের কাজ করল! সবারই যখন একটা করে ক্যারিয়ার তখন আমার হাতে টিফিন-ক্যারিয়ার ধরিয়ে দিল। তবে আজ বুকে হাত দিয়ে বলি, এই নিয়ে আমার কোন বিকার নাই। শোনো কথা, যার সাইকেলই নাই তার ক্যারিয়ার নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন কী! বাহে, ইশকুল ফাঁকি দিয়ে গোয়াল ঘরে বসে বই পড়লে যা হয় আর কী []!

আহারে, সেইসব, কীসব সোনালী দিন! কতশত বই হারিয়ে গেছে- রাশিয়ান (সম্ভবত) একটা গল্প পড়েছিলাম। আজও গল্পটার নাম মনে করতে পারি না- বইসহ ওই গল্পটার নামও হারিয়ে গেল []। আহারে-আহারে, এই কষ্ট এখনও বুকে লালন করি....!

আমার অনেক বই অনেকে চুপিসারে (বইয়ের ক্ষেত্রে চুরি শব্দ ব্যবহারে আমার ঘোর অনীহা) নিলেন আর ফেরত দিলেন না। বাসা বদলের সময় হারিয়ে গেল বেশ কিছু বই। জায়গার অভাবে কিছু বই কাউকে-কাউকে দিতে পেরে আনন্দিত হলাম কারণ তাঁরা প্রকারান্তরে আমাকে উদ্ধার করলেন।

এবার ঠিক করলাম বেঁচে যাওয়া বইগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখব দুইটা কারণে। এক স্পেস নষ্ট করা যাবে না- সেই দিন আর নাইরে, বাওয়া যে গোটা একটা রুমে থাকবে কেবল বই আর বই! তাই আপাতত দৃষ্টিতে যে জায়গাগুলো কাজে লাগছে না ওখানে একটু এদিক-সেদিক করে বইগুলো বসিয়ে দেওয়া।

আরেকটা কারণ হচ্ছে জায়গায়-জায়গায় হাতের নাগালে যেন বই থাকে। এগুলো মুরগির বাচ্চার মত খুঁজে-খুঁজে বের করতে না হয় যেন পোষা কবুতরে মত আপনি এসে হাতে বসে থাকে।





 




সূত্র:

১. কল্পনাকেও ছাড়িয়ে: https://www.ali-mahmed.com/2014/06/blog-post_5.html 

২. আমার আনন্দ বেদনার অপকিচ্ছা: https://www.ali-mahmed.com/2009/09/blog-post_02.html

৩. বুক্কা এবং ধ্রুব'র এক চিলতে আকাশ: https://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_15.html

*রাশিয়ান গল্পটার লেখাটা ছিল অনেকটা এই রকম:

'কুয়োতলায় সব মায়েরা জড়ো হয়েছেন। মারা একসঙ্গে হলে যা হয় আর কি? রান্না-বান্না, শাড়ি-গহনা, এইসব নিয়ে তুমুল আলোচনা হচ্ছে। সবশেষে প্রসঙ্গ এলো কার সন্তান কতো প্রতিভাবান এই নিয়ে। দূরে সবার সন্তানরা খেলা করছিল।
এক মা তার এক সন্তানকে কাছে ডাকলেন। তার সন্তান চমৎকার ডিগবাজী খেল। সবাই মুগ্ধ। ওই সন্তানের মার মুখ ঝলমলে।
অন্য একজন মার সন্তান চমৎকার গান গাইল। কেউ -বা কবিতা আবৃত্তি করল। মুগ্ধতা আর মুগ্ধতা!
কেবল মাত্র একজন মা বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্যরা বলল: কিগো তোমার ছেলেকে ডাকলে না যে? ওই মা চোখ নীচু করে বললেন, 'আমার খোকার যে কোন গুণ নাই', বলে ভারী বালতিটা উঠিয়ে তিনি গুটিগুটি পায়ে এগুতে লাগলেন।

রোগা দুবলা কালো কালো মতো তার সন্তান কোত্থেকে জানি ঝড়ের গতিতে এলো, মার ভারী বালতিটা ছিনিয়ে নিল। সোজা বাড়ীর দিকে হাঁটতে লাগল।'