Friday, September 13, 2019

আমাদের একজন শাহ আব্দুল করিম।


(কা্দায় মাখামাখি হয়ে অমূল্য এই মুক্তোটা তুলে এনেছিলেন খোয়াব-এর সম্পাদক টি এম আহমেদ কায়সার আর সেই মুক্তোটা ছড়িয়ে দিয়েছেন, হাসান মোরশেদ)
লেখক: হাসান মোরশেদ.
"শাহ আব্দুল করিমের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহন করেছিলেন কবি বন্ধু টি এম আহমেদ কায়সার, ছোট কাগজ 'খোয়াব' এর পক্ষ থেকে। সময়কাল ১৯৯৭ এর সেপ্টেম্বর। হুমায়ূন আহমেদ এর এক প্যাকেজ প্রোগ্রামে ফুলবালাগনের নৃত্য ও শরীর প্রদর্শনের কল্যাণে নাগরিকগণ সবে মাত্র শাহ আব্দুল করিমের গানের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, তাঁর গানকে পছন্দের তালিকায় গ্রহন করে তারা ধন্য করেছেন প্রত্যন্ত উজান ধলের এই জৌলুসহীন মানুষটাকে।
অথচ তার অর্ধশতক আগে থেকেই ভাটি বাংলার প্রায় কোটি মানুষ যে তাঁর গানকে প্রাণে ঠাঁই দিয়েছেন সে সত্য জানেননি তারা। জানেননি বলেই প্যাকেজ নির্মাতা হুমায়ূনসহ আরো অনেকেই এই লোকজ বাউলের গান দিয়ে টাকা কামান এবং নগরে ডেকে এনে অপমানও করেন তীব্র। 

তাছাড়া তাঁর পিচুটি পড়া রক্তবর্ণ চোখ থেকে জল ঝরছিলো অবিরাম আর ভাঁজ পড়া, স্থানে-স্থানে কুঁচকে যাওয়া গালে, থুতনিতে ছিল সাত-আটদিন ধরে না-কামানো দাঁড়ির সুক্ষ্ণ ভগ্নাংশ আর চোখ দুটো যদিও গর্তের মতো ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলো প্রায়, তাহলেও দৃষ্টি, অন্তত এটুকু আন্দাজ করা যায় যে তা ছিলো খুবই গভীর এবং অন্তর্ভেদীও।
একখানি ভাঙ্গা খাট যাতে বাড়তি একজনমাত্র লোক বসতে গেলেও মড়মড় শব্দ করে করে ভেঙ্গে যাওয়ার ভয় দেখায়। তার উপর ছেঁড়া, ময়লা এবং স্থানে স্থানে বিশ্রী রকম দাগপড়া বিছানার চাদর ফলত দুর্গন্ধই ছড়ায় যা অবশ্য বাড়ীর চারদিকে বিশাল হাওরের জল, কাদা ও পঁচা শ্যাওলার গন্ধের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায় পরবর্তীতে। খাটের পাশে ঘূণে খাওয়া একখানি জীর্ণ টেবিল এবং প্রায় একই অবস্থার একটি লম্বা বেঞ্চ।

আমরা বসে পড়লাম বেঞ্চেই, নূর হোসেন [১] পাশেই ছিলেন, অগত্যা উঠে দাঁড়ালেন বেচারা এবং অন্তঃপুরের দিকে অদৃশ্য হলেন দ্রুত। এদিকে সূর্য অস্তমিত হচ্ছিলো কিন্তু এতে কেউই খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করল না। কেননা আকাশ ছিলো মেঘেঢাকা, তার উপর বৃষ্টি ছিলো গুড়িগুড়ি। নিশ্চিতই সেটা কোন সুখকর দৃশ্য নয়। আর মাসটা তো ছিল আষাঢ়, আষাঢ়ে ভাটি অঞ্চলের গ্রামগুলো যা হয় উঠান, বারান্দা এমনকি ঘরের পুলিতে পর্যন্ত থিকথিক করে কাদা, বাইরের দিকে তাকাতে গা ঘিনঘিন করে তবুও চারদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় সাদা হাওর, এমনকি এই মেঘে ঢাকা সন্ধ্যাবেলা যা চিকচিক করে উঠে তা দেখে ভেতরটা জুড়িয়ে গেলো।

চারদিকে সাদা জল। দূর-দূরান্তে কালো গ্রামগুলো যেন জলে ভাসমান কোন জাহাজ; স্থির, নিশ্চল। এই জল থৈথৈ হাওরের মধ্যে কোথাও থাকবে একটা নদী, নদীর নাম কালনী। কালনী নদীর দুই পাড়ে গ্রাম, গোচার আর বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত। কালনী নদী এমনিতে খুব শান্ত কিন্তু বর্ষায় একে সনাক্ত করা খুব কঠিন। প্রবল বেগে স্রোত বয় প্রথম, দুই পাড় উপচে পানির ঢল গোচার, শস্যক্ষেত ডুবিয়ে দেয়, একসময় জলে ভাসমান মাঠ-ঘাটের মধ্যে কোনটা যে কালনী নদী তা বোঝার জন্য নৌকার লগি ফেলে-ফেলে সন্তর্পণে এগোতে হয় রীতিমত কিন্তু সেটা স্পষ্টতই আমাদের আলোচনার কোন অনুসঙ্গ নয়।

যাহোক, আমাদের পা ছিলো স্বভাবতই কাদাটে। যদিও বারান্দায় পা ধুয়েছি দুবার তাহলেও কাদা তো হলো এক অর্থে হাওরের কালো-কালো জোঁক যা একেবারে ছাড়াতে যাওয়া মানে নিজের চামড়ার কিছু অংশ খুইয়ে ফেলার আশংকা করা খুবই স্বাভাবিক। ফোল্ড করা জিন্সের প্যান্টের এদিক ওদিক কাদার ছোপ, ঘিনঘিন লাগছিলো খুব, তাছাড়াও আমরা সকলেই ছিলাম কমবেশী ক্লান্ত কেননা পাক্কা তিনঘন্টা বাসজার্নি তারপর দুঘন্টা ট্রলার অবশেষে মাইলখানেক হাঁটু বরাবর কাদাটে পথ হেঁটে আসার ধকল শরীরের উপর দিয়ে বেশ যাচ্ছিলো। কেউবা রুগ্ন খাটের উপর, কেউ বেঞ্চিতে বসে যাবার পর নুরুন্নেছা [২] লন্ঠন জ্বালিয়ে দেন ঘরে। 

বাইরে উৎসুক কয়েকজন গ্রামবাসী উঁকিঝুঁকি মারেন, একসময় ঘরের ভেতরও ঢুকে পড়েন কেউ-কেউ পরবর্তীতে অবশ্য এঁদের সবার অংশগ্রহনে প্রাণবন্ত এক গানের আসর জমে উঠবে, আমরাও আমাদের নিজেদের বেসুরো গলা দিয়ে তাল মেলানোর জন্যে হন্যে হয়ে উঠবো কিন্তু সেটা মধ্যরাত্রিরও অনেক পরে। যাহোক শুরুতেই কুশলাদি বিনিময় হয়, উৎসুক লোকজনের সঙ্গে কথা হয় এক-আধটু, এরপরই আমরা মুখোমুখি হই তাঁর, বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের। আশি-উর্ধ্ব এই ভঙ্গুর শরীর নিয়েও এখনো আপোষহীন এক বাউল, এখনো গান লিখেন সমানতালে, এমনকি এখনো সুর করে গানের কলি আওড়ালে সংলগ্ন পরিবেশ ঝিম ধরে যায় যেন।


খোয়াবঃ করিম ভাই, ব্যক্তিগত বিষয় দিয়েই শুরু করি,আপনার বয়স এখন কতো?
করিম শাহঃ আমার জন্ম ১৩২২ বাংলার ফাল্গুন মাসের প্রথম মঙ্গলবার। বোধহয় আশির কোঠা পেরিয়ে এসেছি ইতিমধ্যে

খোয়াবঃ যমদূতের চোখটাকে ও ফাঁকি দিয়ে রীতিমত…। আচ্ছা, করিম ভাই, আপনার পরিবার নিয়ে কিছু বলুন এবার। 
করিম শাহঃ (গানের সুরে) 
পিতার নাম ইব্রাহিম আলী মাতা নাইওরজান
 ওস্তাদ ছমরুমিয়া মুন্সী পড়াইলেন কোরান।
 বাউল ফকির আমি, একতারা সম্বল
 সরলা সঙ্গিনী নিয়ে আছি উজানধল।
 নূরজালাল নামে মোর আছে এক ছেলে…।

খোয়াবঃ আপনার সন্তান কি মাত্র একজনই?
করিম শাহঃ হ্যাঁ। একছেলে মাত্র। ১৩৭১-এ ওর জন্ম।

খোয়াবঃ আপনার স্ত্রী সম্পর্কে কিছু বলুন।
করিম শাহঃ আমার স্ত্রীর নাম আফতাবুন্নেসা। আমি ডাকতাম সরলা নামে। আমার ‘আফতাবসঙ্গীত’ বইটি এই আফতাবুন্নেসার নাম অনুসারেই রাখা। আজকের এই করিম কখনোই করিম হয়ে উঠতে পারতো না যদি কপালের ফেরে সরলার মতো বউ না পেতাম। আমি সরলাকে এখনো মুর্শিদ জ্ঞান করি। দীর্ঘ বাউলজীবনে দিনের পর দিন ঘরবাড়ি ছেড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি, সরলা তার ন্যূনতম কষ্টও আমাকে বুঝতে দেয়নি। পোড়া কপাল আমার, এমন বউকে ধরে রাখতে পারিনি। মৃত্যুই তার সকল কষ্টের অবসান ঘটিয়েছে।

খোয়াবঃ আমরা এবার আপনার নিজের সম্পর্কে জানতে চাইবো। কিভাবে শুরু করলেন? ক্যামনেই-বা গানের জগতে আসলেন?
করিম শাহঃ একে তো ভাটিঅঞ্চল, এই যুগেও দেখেন যোগাযোগ, শিক্ষা-দীক্ষায় কতো অবহেলিত, উপেক্ষিত। তখনকার যুগে তো লেখাপড়া করা ভয়ানক কষ্টের ব্যাপার ছিলো। ছোটবেলায় দুঃখ যে কি জিনিস, দারিদ্র যে কি জিনিস মর্মে মর্মে টের পেয়েছিলাম। আমার মা চাইতেন একটু পড়ালেখা করি। বাবা যদিও এক অর্থে ছিলেন খুবই সরল-সোজা, তবু জীবনের কুৎসিত বাস্তবতার রূপটাও তার জানা ছিলো ভালোই। তাই প্রায়ই বলতেন, ‘আগে অইলো খাইয়াবাঁচা। বাদে পড়ালেখা’। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সুযোগ আর হয়ে উঠেনি।

বেঁচে থাকার জন্য মোড়লের ঘরে গরু রাখালের কাজ করেছি। পরে নৈশবিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়াশুনা করেছি। ইতিমধ্যে বিশ্বযুদ্ধের গুজব উঠলে সবাই বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেয়। ফলে নিজের চেষ্টায় যতটুকু পারি নিজের 'বুঝবাঝটুকু' সেরে নিয়েছি। আর গান তো ছিলো রক্তের ভেতর। ‘ভাবিয়া দেখো মনে, মাটির সারিন্দারে বাজায় কোনজনে’, এরকম গান শুনতাম আগে। গাইতামও। খুব দাগ কাটতো মনে। মাঠে গরু রাখতে রাখতে গান গাইতাম। রাখাল বন্ধুরা তখন গোল হয়ে গান শুনতো। আস্তে আস্তে গান আমাকে কব্জা করতে শুরু করে। আমি বুঝে যাই সারিন্দাই আমার প্রথম ও শেষ।

খোয়াবঃ তখন গান গাওয়া নিয়ে সমস্যা হতো না?
করিম শাহঃ হতো না মানে? শুক্রবারে মসজিদে পর্যন্ত কথা উঠে। মুসল্লীরা অভিযোগ করেন, করিম বেশরিয়তী কাজ-কারবার শুরু করেছে। অচিরেই তা বন্ধ করতে হবে। আমি থামিনি। গান তো মিশে গিয়েছিলো অস্থি-মজ্জায়। ক্যামনে থামি! তবে একটা ব্যাপার ছিলো তখন। গানের দুশমন যতো ছিলো তার চেয়ে অনেক বেশী ছিলো গানের ভক্তকুল। বাউলাগানের আসর শুনলেই মানুষ আট/দশ মাইল পথ হেঁটে আসতো অনায়াসে। গান শুনতোও খুব মনোযোগ দিয়ে। প্যান্ডেলের কোথাও কোন হট্টগোলের আভাস পাওয়া গেলে যখন মঞ্চে উঠে বলেছি, ‘গান শুনতে চান না ঝগড়া করবেন আপনারা'? ওমনি সব গোলমাল থেমে যেতো। এখন সেই ভক্তকুল নাই, সেই পরিবেশ নাই, সেই মানুষও নাই।

খোয়াবঃ আপনার একটা বিখ্যাত গানই আছে যেখানে বর্তমান ও অতীতের একটা চমৎকার তুলনা টেনে এনেছিলেন। গানের প্রথম দিকটা বোধ হয় এইরকম, 'গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান/মিলিয়া বাউলাগান আর মুর্শিদী গাইতাম/আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম'। সন্দেহ নেই গানটা মর্মস্পর্শী। কিন্তু একটা বিষয় এখানে লক্ষণীয় মনে হয় আপনি যেন তুলনামুলকভাবে অতীতমুখী; বর্তমান আপনার কাছে বিশ্রী এবং বিভৎস। বর্তমান থেকে এরকম মুখ ফেরালেন কেন?
করিম শাহঃ বর্তমান আমার কাছে গৌণ কোন বিষয় নয়। আমার চোখের সামনে এই পরিবেশ-পরিপার্শ্ব আমূল বদলে গেছে। নগরায়ন ও যন্ত্রসভ্যতার বিকাশ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে পরিবর্তন করেছে। আমি একে খারাপ চোখে দেখি না। কিন্তু আমার কান্না পায়, ভেতরে তীব্র হাহাকার অনুভব করি চোখের সামনে অবিকল যন্ত্র হয়ে উঠলো মানুষগুলো। ‘মন’ বলতে আমরা যে জিনিসটাকে বুঝাই সেটার চিহ্নমাত্রও থাকলো না আর। তাছাড়া সবচেয়ে আক্ষেপ লাগে যখন দেখি এই বিজ্ঞান বা যন্ত্রসভ্যতার ফল ভোগ করছে কয়েকজন হাতেগোনা কোটিপতি।

এই যন্ত্রসভ্যতা ফলত ধনী-গরিবের মধ্যকার বৈষম্যকে আকাশ-পাতাল পর্যায়ে উন্নীত করেছে। আপনারা আমার গাঁয়ে এসেছেন, দেখে যান এখানে, এই বিশাল ভাটি-অঞ্চল জুড়ে মানুষগুলো কি অপরিসীম দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে বাস করে। যখন মাঝেমাঝে শহরে স্তম্ভিত হয়ে এই ব্যবধান লক্ষ্য করি। লোকে কয়, আমি নিরণ্ণ দুঃস্থ মানুষের কবি। আমি আসলে তাক ধরে দুঃস্থদের জন্য কিছু লিখিনি। আমি শুধু নিজের কথা বলে যাই, ভাটি অঞ্চলের একজন বঞ্চিত নিঃস্ব দুখী মানুষ আমি, আমার কথা সব হাভাতে মানুষের কথা হয়ে যায়…। দ্যাখেন তো, এই অঞ্চল ঘুরে মানুষের আয়ের কোন উৎস আছে কিনা? (করিম শাহ ক্রমশঃ উত্তেজিত এবং তাঁর চোখ দুটো আর্দ্র হয়ে উঠছে।) চারদিকে ভাসান পানি। জলে থৈথৈ করছে প্রতিটি বাড়ির উঠান। মানুষ কি খেয়ে বাঁচবে? (করিম শাহের চোখে অশ্রুধারা) দিনে তিনবেলা নয় শুধু একবেলা যদি দু’মুঠো খেতে না পারে, এই জন্ম কি মানুষের জন্ম?

(গানের সুরে) জিজ্ঞাস করি তোমার কাছে বলো ওগো সাঁই
 এইজীবনে যত দুঃখ কে দিয়াছে বলো তাই।
 দোষ করিলে বিচার আছে, সেই ব্যবস্থা রয়ে গেছে
 দয়া চাইনা তোমার কাছে আমরা উচিত বিচার চাই।
 দোষী হলে বিচারে সাজা দিবা তো পরে
 এখন মারো অনাহারে কোন বিচারে জানতে চাই?
 দয়াল বলে নাম যায় শুনা, কথায় কাজে মিল পড়ে না
 তোমার মান তুমি বুঝো না আমরা তো মান দিতেই চাই
 তুমি আমি এক হইলে পাবে না কোন গোলমালে
 বাউল আব্দুল করিম বলে আমি তোমার গুণ গাই।। 

(তাঁর চোখ বন্ধ। চোখে অশ্রুধারা পূর্বাপর বহমান। পরিবেশ স্তব্ধ, নিরবতা শুধু দীর্ঘ হয়।) আমি বেহেস্ত চাই না দোজখ চাই না, জীবিত অবস্থায় আমার ভাটি অঞ্চলের বিপন্ন মানুষের সুখ দেখতে চাই। এই মানুষগুলোর সুখ যারা কেড়ে নিয়েছে, আমার লড়াই তাদের বিরুদ্ধে। একদা তত্বের সাধনা করতাম। এখন দেখি তত্ত্ব নয়, নিঃস্ব বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে। দেহতত্ত্ব, নিগুঢ়তত্ত্ব আর সোনার বাংলা, সোনার মানুষ বললেই হবে না। লোভী, শোষক, পাপাত্নাদের আঘাত করতে হবে।

তত্বগান গেয়ে গেলেন যারা মরমী কবি
 আমি তুলে ধরি দেশের দুঃখ দুর্দশার ছবি
 বিপন্ন মানুষের দাবী করিম চায় শান্তির বিধান।।

খোয়াবঃ একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। আপনার এ যাবৎ লিখিত গানের সংখ্যা কতো?
করিম শাহঃ দীর্ঘ পঞ্চাশেরও অধিক বছর ধরে গান লিখে যাচ্ছি। কতো যে লিখেছি তার হিসেব আমার কাছে নেই। গানগুলো সংরক্ষন করার চিন্তা কখনো মাথায় জাগেনি। রচনা করার পর এগুলো গুছিয়ে লিখে রাখার অভ্যেস ও ছিলো না। এখন স্মরণশক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছে। মগজের কোনে আমার অনেক গান চাপা পড়ে আছে। তাহলেও এ পর্যন্ত গানের পরিমাণ মোটামোটি দুই হাজারের অধিক তো হবেই।

খোয়াবঃ আপনার কয়টা গানের বই প্রকাশিত হয়েছে অদ্যাবধি?
করিম শাহঃ পাঁচটা। ‘আফতাব সঙ্গীত’ বেরোয় ১৩৫৬ বাংলায়। তারপর ‘গণসঙ্গীত’, কালনীর ঢেউ’, ‘ধলমেলা’ এবং কিছুদিন পূর্বে ‘ভাটির চিঠি’। ‘কালনীর কুলে’ নামে আরেকটা বইয়ের পান্ডুলিপি প্রস্তুত হয়ে আছে। এছাড়া বাংলা একাডেমী আমার দশটা গান ইংরেজী অনুবাদ করে বের ক্রএছিলো বেশ আগে।

খোয়াবঃ আপনার সমসাময়িক বাউলদের সম্পর্কে কিছু বলুন।
করিম শাহঃ আমার সমসাময়িক কেউ এখন আর বেঁচে নেই। যাদের সংগে গান করেছি তাদের মধ্যে সাত্তার মিয়া, কামালুদ্দিন, আবেদ আলী, মিরাজ আলী, বারেক মিয়া, মজিদ তালুকদার, দূর্বিন শাহ এদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিলো। এছাড়া ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গান করতে গিয়ে অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে,তাদের সবার নাম এখন আর মনে নেই। তুলনামুলক ভাবে আমার গাঢ় হৃদ্যতা ছিলো নেত্রকোনার সাত্তার মিয়ার সঙ্গে।
মজিদ একদা অন্যের গান নিজের নামে গাইতো। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতো ‘গানটা গাইতেছে কে? হোক অন্যের; আমি যখন অন্যের গান করি তখন আমিও তো একই ভাবের ভাবুক থাকি। আমার কথা আমি বলবো না কেনো?’
জালালউদ্দিন, উকিল মুন্সী আমার চাইতে বয়সে যদিও অনেক বড় ছিলেন তাদের সঙ্গেও আমি দু-এক আসরে গান করেছি। দূর্বিন শাহ তুলনামুলকভাবে তত্ত্বগানের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন বেশী। ১৯৬৭ সালে আমরা এক সঙ্গে বিলাতে যাই ‘ইষ্টার্ণ ফিল্ম ক্লাবে’র আমন্ত্রণে। তার গলা খুব একটা ভালো ছিলো না, তার উপর ঠান্ডার দেশ-ওখানে গিয়ে তো গলা একেবারে বসে যায়। উপায়ন্তর না দেখে দুর্বিনশা’র অনেক গান আমি নিজের কন্ঠে গেয়েছি ওখানে।

খোয়াবঃ বিলেত সফরের কোন মজার অভিজ্ঞতা কি মনে আছে?
করিম শাহঃ খুব একটা মনে নাই। তবে বিলাতের দিনগুলোর উপর আমার একটা দীর্ঘ গান আছে যা ‘ভাটির চিঠি’ গ্রন্থে প্রকাশিত। বিলাতে সবচেয়ে যে ব্যাপারটা আমার দৃষ্টি আকর্ষন করেছে সেখানে মানুষ মানুষকে মানুষ বলেই গণ্য করে। একেবারে দরিদ্র যে সেও তার কাজের শেষ সমানতালে আনন্দফুর্তি করতে পারে। মোটামোটি একটা মানুষ্য-জীবনের গ্যারান্টি সে পায়। অফিসের বড়কর্তারা আমাদের মতো ঘুষ-টুষ খায় বলে মনে হলো না। আমাদের অফিসগুলোর বড়কর্তারা তো ঘুষ ছাড়া মানুষকে পাত্তা পর্যন্ত দেয় না। 

আমি একবার রেডিও’র একটা চেক ভাঙ্গাতে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’-এ গেলাম। সেখানে যাবার পর আমি মানুষ গিয়েছি না পশু গিয়েছি এ ব্যাপারে নিজেরই কিছুটা সংশয় এসে গিয়েছিলো। এই কি স্বাধীন দেশের অবস্থা! (করিম শাহ আবারো উত্তেজিত হয়ে উঠছেন) আমার পাঞ্জাবী ছিঁড়া তো কি হয়েছে, আমি এই দেশের নাগরিক না? আমার লুঙ্গীতে না হয় তিনটা তালি বসানো, আমি তো ট্যাক্স ফাঁকি দেই না কখনো। এতো ব্যবধান, এতো বৈষম্য কেনো? মানুষই তো মানুষের কাছে যায়। আমি তো কোন বণ্যপশু যাইনি। বন্যপশুরও অনেক দাম আছে কিন্তু এদেশে মানুষের কোন দাম নেই, মানুষের কোন ইজ্জত নেই। (করিম শাহ’র চোখ জলে টলোমল)

খোয়াবঃ এই সুদীর্ঘ জীবনে আপনার কোন প্রাপ্তির কথা বলুন যা আপনাকে মাঝে-মধ্যে পুলকিত করে?
করিম শাহঃ আমি কখনো কোন প্রাপ্তির ধার ধারিনি। প্রাপ্তি-সংবর্ধনা এগুলোর প্রতি আমার বিতৃষ্ণা ধরে গেছে। জীবনে এতো প্রতারিত হয়েছি যে নতুন করে প্রতারিত হতে ভয় লাগে। করিমকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কী দরকার আছে? করিমের গান তো বাংলার মাঠে-ঘাটে খুব ক্ষীণস্বরে হলেও গাওয়া হয় এখনো। আমার সংবর্ধনা পাবার কোন দরকার নেই, আমার গানই আমার সংবর্ধনা। গানের ভেতর আমি কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছি তা প্রতিষ্ঠিত হওয়া এখন জরুরী। নিঃস্ব পরিবারে জন্ম নিয়ে আমি এখনো নিঃস্বই থেকে গেছি, নিঃস্ব হবার যন্ত্রণাটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই। আমি আমার এলাকায় নিজের যথসামান্য সামর্থ্য নিয়ে ‘বাঁচতে চাই’ নামে একটা সংগঠন করেছি। আমার চাওয়াটা খুব সামান্য, দুবেলা দু’মুঠো খেয়ে শুধু বেঁচে থাকা। এই অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছে শোষকের দল।

প্রাপ্তির কথা যদি বলেন, সেটা অনেক হয়েছে। হোসেন সোহরাওয়ার্দী আমার গণসঙ্গীত শুনে একশো পঁচাশি টাকা দেন। শেখ মুজিব তখন দুর্নীতি দমন মন্ত্রী, গান শুনে এগারোশো টাকা দিলেন আর বললেন, 'আপনার মতো শিল্পীকে উপযুক্ত মর্যাদা দেয়া হবে। মুজিব ভাই বেঁচে থাকলে করিম ভাই বেঁচে থাকবে, ইনশাল্লাহ’। করিম ভাই জীর্ণ শরীর নিয়ে বেঁচে আছি, উপযুক্ত মর্যাদা কারে কয় এখনো বুঝিনি। উপযুক্ত মর্যাদার দরকার নাই, জীবনের প্রায় আশিবছর দুঃখ-দারিদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করে এসেছি, বেঁচেই বা থাকবো আর কয়দিন, নতুন করে আর স্বপ্ন না দেখলেও চলবে। কিন্তু লাখ লাখ বঞ্চিত মানুষ, তাদের দিকে চোখ ফেরান একবার। 
প্রাপ্তি, হায়রে প্রাপ্তি! দেশ স্বাধীনের পর সামাদ আজাদ সাহেব লোক পাঠান তার নির্বাচনী সভায় শুধু উপস্থিত হবার জন্য। ঘরে অসুস্থ স্ত্রী রেখে ছুটে গেছি আমি। উপস্থিত দর্শকদের অনুরোধে গানও গেয়েছি। দর্শকরা বক্তৃতা চায়নি, সমস্বরে বলেছে, 'বক্তৃতা লাগতো নায়, ভোট আপ্নারেই দিমুনে, করিম ভাই’র গান আরো দুইডা শুনান’। ক্ষমতায় গিয়ে এরা সব ভুলে যায়। দেশ, জনগন সব। মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনার কথা বলে, সেটাও।

কিছুদিন পুর্বে হুমায়ূন আহমেদ টিভিতে আমার গান দিয়ে একটা প্যাকজ প্রোগ্রাম করলেন। আমি এসবে যেতে চাই না, পারতপক্ষে এড়িয়ে চলি। তবু উনি আমার কাছে যে ব্যক্তিটিকে পাঠিয়েছিলেন তিনি সুনামগঞ্জেরই লোক, একেবারে জোঁকের মতোই ধরলেন যে আমার না গিয়ে কোন উপায় থাকলো না। যাহোক আমি গেলাম। আমার সাক্ষাৎকার নিলেন এক বয়স্ক ভদ্রলোক। ফিরে আসার সময় হুমায়ূন আহমেদ আমার সাথে সৌজন্যমুলক আলাপটুকু পর্যন্ত করলেন না। কিছু টাকা দিলেন তাও ড্রাইভারের মারফত। বাউলরা কি এতোই অস্পর্শ্য? এভাবেই উপেক্ষিত থাকবে যুগের পর যুগ? হাওড় অঞ্চলে বড় হয়েছি, অন্ততঃ মনটাতো ছোট নয়। শুধু টাকার জন্য কি আমি এতোদূর গিয়েছিলাম? টাকাকে বড় মনে করলে তো অনেক আগেই অনেক কিছু করে ফেলতে পারতাম। অর্ধাহারে-অনাহারে কাটিয়েছি দিনের পর দিন, উপোস করার অভিজ্ঞতা আমার আছে, জীবনের শেষ দিকে এসে ক’টা টাকারে জন্য তো হঠাৎ লোভী হয়ে উঠতে পারি না। হুমায়ূন আহমেদ এমনকি অনুষ্ঠানটা কবে প্রচারিত হবে তারিখটাও আমাকে জানাননি। মানুষের কাছে কি মানুষের এতটুকু দাম ও থাকবে না? পরে যখন অনেকেই অনুষ্ঠান দেখে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, আমার খুব আঘাত লাগলো। কষ্ট পেলাম খুবই। আমি এইসব লোকদের ‘মরা গরুর হাড্ডির কারবারী’ বলে থাকি। জীবিত করিম আসলে কিছুই নয়, কিন্তু মৃত করিমের হাড্ডি নিয়ে ও একদিন ব্যবসা হবে, এটাই হলো এদেশের বাস্তবতা। 

গান নিয়ে আমি দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছি। ঢাকা, পাবনা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কুমিল্লা সহ প্রায় সব জায়গায়। লন্ডনেও দুবার গিয়েছি। ১৯৬৭ ও ১৯৮৫ সালে। মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছি। সিলেট রোটারী ক্লাব, উদীচি শিল্পী গোষ্ঠী আমাকে ‘সংবর্ধনা স্মারক’ দিয়েছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অহনা পর্ষদ’ আয়োজিত দু'দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে আমাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। এগুলো যদি প্রাপ্তি বলেন, তাহলে প্রাপ্তি অনেক।

খোয়াবঃ শুনেছি কাগমারী সম্মেলনেও আপনি যোগ দিয়েছিলেন। সেখানকার অভিজ্ঞতা কিছু বলুন।
করিম শাহঃ কাগমারী সম্মেলনে আমি রমেশ শীলের সঙ্গে গান করেছি। তাছাড়া এই সম্মেলনে বড় পাওনা হলো মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে আমার আলাপ হওয়া। তিনি আমার গান শুনে বলেছিলেন, 'সাধনায় একাগ্র থাকলে তুমি একদিন গণমানুষের শিল্পী হবে’। ভাসানীর এই কথাটি আমাকে এখনো প্রেরণা দেয়।

খোয়াবঃ আমরা যতদূর জানি প্রচলিত ধর্ম-ব্যবস্থায় আপনি খুব একটা বিশ্বাসী নন। বিভিন্ন গানে আপনার এ বিষয়ক চিন্তাধারা ঘুরে ফিরে এসেছে বারবার। ধর্মকে আসলে কিভাবে দেখেন আপনি?
করিম শাহঃ আমি কখনোই আসমানী খোদাকে মান্য করি না। মানুষের মধ্যে যে খোদা বিরাজ করে আমি তার চরণেই পুজো দেই। মন্ত্রপড়া ধর্ম নয়, কর্মকেই ধর্ম মনে করি। লাখ লাখ টাকা খরচ করে হজ্জ্ব পালনের চেয়ে এই টাকাগুলো দিয়ে দেশের দুঃখী দরিদ্র মানুষের সেবা করাটাকে অনেক বড় কাজ মনে করি। প্রচলিত ধর্ম-ব্যবস্থা আমাদের মধ্যে সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ তৈরী করে দিয়েছে। কতিপয় হীন মোল্লা-পুরুত আমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে বিভাজন নিয়ে এসেছে। এই বিভাজনই যদি ধর্ম হয় সেই ধর্মের কপালে আমি লাত্থি মারি। 

‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এই হলো আমার ধর্ম। নামাজ রোজার মতো লোক দেখানো ধর্মে আমার আস্থা নাই। কতিপয় কাঠমোল্লা ধর্মকে তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। আমার এলাকায় প্রতিবছর শীতের সময় সারারাত ওয়াজ-মাহফিল হয়। দূর-দূরান্ত থেকে বিশিষ্ট ওয়াজীরা আসেন ওয়াজ করতে। তারা সারারাত ধরে আল্লা-রসুলের কথা তো নয় বরং আমার নাম ধরেই অকথ্য-কুকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। কি আমার অপরাধ? গান গাইলে কি কেউ নর্দমার কীট হয়ে যায়? (তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে দ্রুত, উত্তেজনায় কন্ঠস্বর উঁচু হয়ে উঠছে ক্রমশ) এই মোল্লারা ইংরেজ আমলে ইংরেজী পড়তে বারণ করেছিলো, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের পক্ষে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো। আজো তারা তাদের দাপট সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছে। এগুলো দেখে মনে হয় একাই আবার যুদ্ধ করি। একাই লড়াইয়ের ময়দানে নামি। জীবনের ভয় এখন আর করি না। আরেক যুদ্ধ অবধারিত হয়ে পড়েছে, এছাড়া আর মুক্তি নাই (তাঁর চোখ থেকে জল উপচে পড়ছে) 

কি বলবো, কতো বলবো দুঃখে ভেতরটা পাথর হয়ে আছে। আমার এক শিষ্য, তার নাম ছিলো আকবর। সিদ্ধি-টিদ্ধি খেতো বোধহয়। আকবর মারা গেলো অকালেই। তার মৃত্যুর কথা মাইকে ঘোষণা দেবার জন্য আমি নিজে মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেবকে বললাম। ইমাম তো ঘোষনা করবেনই না বরং জানাজার নামাজ পড়াবেন না বলে সাফ-সাফ জানিয়ে দিলেন। আকবরের দোষ হলো সে আমার শিষ্য। আমি গান গাই, আমি কাফির। শুধু আমি গিয়ে যদি উনার হাত ধরে তওবা করি তাহলেই আকবরের জানাযার নামাজ পড়ানো যায় কিনা তিনি ভেবে দেখবেন। বেতনভোগী এই চাকরটার কথা শুনে রাগে দুঃখে ভেতরটা বিষিয়ে গেলো। আতরাফের সবাই তাকে বাৎসরিক যে চাঁদা দিয়ে রাখে সেই চাঁদার একটা ভাগ তো আমিও দেই। তাৎক্ষণিক কিছুই বলিনি কারণ কথাটা আমার গ্রামবাসীর কানে গেলে একটা ঝামেলা হয়তো বেধে যেতে পারে। অগত্যা আমি নিজেই জানাজা পড়িয়ে আকবরের কবর দেই। এই কথা মনে আসলে আজো চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না।

খোয়াবঃ আচ্ছা, এতো গেলো ধর্ম। ঈশ্বরকে নিয়ে কি ভাবেন আপনি?
করিম শাহঃ ঈশ্বরকে আমি মনে করি একটা পেঁয়াজ, খোসা ছিলতে গেলে নিরন্তর তা ছিলা যায় এবং হঠাৎ একসময় দেখি তা শূন্য হয়ে গেছে। আমি ঈশ্বরকে এক বিশাল শক্তি হিসেবে গণ্য করি, ব্যক্তি হিসেবে নয়। ব্যক্তি কখনো একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নরূপে অবস্থান করতে পারে না, শক্তি তা পারে। বৈদ্যুতিক শক্তির কথা ধরুন, একই সাথে কোথাওবা ফ্যান ঘুরাচ্ছে, কোথাও বাতি জ্বলাচ্ছে, কোথাও কারখানা চালাচ্ছে…।

মক্কা শরীফ আল্লার বাড়ি বোঝে না মন পাগলে 
ব্যক্তি নয় সে শক্তি বটে আছে আকাশ পাতালে।।

তবে আমি কোন অবাস্তব কিছুতে বিশ্বাস করি না। বেহেস্ত, দোজখ, দুই কান্ধে দুই ফেরেস্তা এগুলো আমার কাছে অবাস্তব মনে হয়। আল্লাহ নিজেই যেখানে কর্তা, তার তাহলে এতো কেরানী রাখার কি দরকার আমি বুঝে উঠতে পারি না।

খোয়াবঃ আপনার পূর্বের বাউলা যাঁরা বিশেষতঃ এই সিলেট অঞ্চলে মরমী সাহিত্যের ভূমি কর্ষন করেছেন তাদের আপনি কিভাবে মুল্যায়ন করেন?
করিম শাহঃ আমি নিজেকে তাঁদের উত্তরসূরী হিসাবে বিবেচনা করি। সৈয়দ শানুর, আরকুম শাহ, শীতালং শাহ, রাধারমন, হাছনরাজা এঁরা সত্যিকারের সাধক ছিলেন। ভাবুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন এঁরা। একসময় আমরা গ্রাম-গ্রামান্তরে তাদের গান গেয়ে বেড়িয়েছি। তাদের গান থেকে প্রেরণা নিয়ে আমরা আজো গান লিখি। কিন্তু একটা দুঃখজনক ব্যাপার ঘটছে আজকাল, আমার কিছু গান দেখলাম রাধারমনের নামে গাওয়া হচ্ছে। এই জিনিসটা যে কারো পক্ষেই সহ্য করা খুব কঠিন। আমার বেশ কিছু গান যে যেভাবে পারছে এমনকি কেউ কেউ ভনিতায় নিজের নাম যুক্ত করেও গেয়ে থাকেন, এটা খুবই দুঃখের। দীর্ঘ পঞ্চাশ ষাট বছরের সাধনার ফসল এই গানগুলো। অন্যের কাছে কোন মুল্য থাক বা না থাক আমার নিজের কাছে এই গানগুলোর যথকিঞ্চিৎ মুল্য তো আছে। ঘর অসুস্থ স্ত্রী রেখে গান রচনা করে বেড়িয়েছি। আজ সেওসব স্মৃতি মনে পড়লে চোখে পানির ধারা নেমে আসে। এই গানগুলোই যদি আমার চোখের সামনে অন্য কারো হয়ে যায় তাহলে সারা জীবনের সাধনাই তো ভুল ! 

বেশ কিছুদিন আগে রাধারমনের একটা গানের বই বেরিয়েছিল মদনমোহন কলেজ থেকে গোলাম আকবর সাহেবের সম্পাদনায়। রাধারমনকে একেবারে জীবন্ত কাষ্ঠ করা হয়েছে বইটার পাতায় পাতায়। গানের কলি নেই ঠিক, শব্দ-বিভ্রান্তি, পদ-বিভ্রান্তি, একেবারে যাচ্ছেতাই কান্ড। মনটা দমে গেলো এটা দেখে। রাধারমনের গান তো আমি এই ক্ষীণ স্মৃতিশক্তি নিয়েও আজো ভুলতে পারিনি। এই ভাগ্য যদি রাধারমনের ঘটে, আমি করিম তো কোন ছার! 
আজকাল প্রচার মাধ্যমে এমন কিছু অগ্রজ বাউলের নাম শুনতে পাই যাদের নাম এই পঞ্চাশ বছরের বাউল জীবনে কখনো শুনিনি। আমার এই দীর্ঘ জীবনে রকিব শাহ কোন ফকিরের গান তো দূরের কথা-নাম পর্যন্ত শুনিনি। হঠাৎ রেডিও টেলিভিশনে তার গান শুনে বিস্মিত হই। এমনকি এও দেখলাম তাঁকে আরকুম-হাছনদের সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে।

হায়রে দেশ! টাকা দিয়ে কি সবকিছু কেনা হয়ে যাবে? বয়স তো কম হয়নি, এক জীবনে দেখেছি অনেক। এবার বোধ হয় ছাঁচাছোলা কিছু বলার সময় এসেছে। আজ যে হাছন রাজা-হাছন রাজা বলতে আমরা অজ্ঞান অথচ এই গানগুলো তো কিছুদিন পূর্বেও কাউকে গাইতে শুনিনি। এতো মর্মস্পর্শী গান তাঁর অথচ গাইতো কয়জন? আমার জানামতে উজির মিয়া নামে এক ব্যক্তি হাছন রাজার গানকে সাধারণের গোচরে নিয়ে এসেছিলেন আজ তাঁর নামগন্ধ পর্যন্ত হাওয়া হয়ে গেলো।  প্রচার মাধ্যম তাকে খুঁজে বের করার কোন প্রয়োজন অনুভব করে না। সব সফলতার পেছনে কিছু কষ্ট থাকে, এই কষ্ট যারা করে আমরা তাদের ভুলে যাই। কী নির্মম নিয়তি! ভেতরে জমা থাকা কথাগুলো এবার হয়তো বলা দরকার। যদি কেউ রাগ করে করুক, ভেতরের ক্ষোভ ভেতরে জমাট রেখে কোন লাভ হয় না।

খোয়াবঃ আপনার ব্যক্তিগত কোন দুঃখের কথা বলুন যা গভীর রাতেও আপনাকে কষ্ট দেয়।
করিম শাহঃ দুঃখ তো হাজার-হাজার, কয়টা বলবো? তবে আমার সরলা, যাকে আমি মুর্শিদ জ্ঞান করি সেই সরলা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে এটা মনে পড়লেই কলজে খানি উল্টে যেতে চায় (তিনি একটা বাচ্চার মত হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন)

খোয়াবঃ আপনার শিষ্য-ভক্ত অজস্র,যারা এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে আপনার গান গেয়ে বেড়ান, তাদের সম্পর্কে কিছু বলুন
করিম শাহঃ আমার শিষ্যরা প্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত। রুহী পাঠুর, রণেশ ঠাকুর, আব্দুর রহমান, প্রাণকৃষ্ণ ঘোষ, নূর হোসেন, সুনন্দ দাস [৩] আরো অনেকেই আমার গান করে বেড়ায়, আমি তাদের জন্য আশীর্বাদ করি।

খোয়াবঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, করিম ভাই।
করিম শাহঃ আপনাদেরও অনেক ধন্যবাদ। 

*পাদটিকাঃ
 ১। নূরহোসেনঃ শাহ আব্দুল করিমের শিষ্য। তিনি বেশীর ভাগ সময় উজান ধলে করিম শা’র সাথেই থাকেন। গানও করেন।
 ২। নুরুন্নেছাঃ শাহ আব্দুল করিমের ভক্ত শিষ্য।
 ৩। সুনন্দ দাসঃ কিছুদিন পূর্বে মারা গেছেন। ভক্ত শিষ্যের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্না ভেজানো কন্ঠে করিম বলেন, 'দুনিয়ায় কিছু মানুষ আছে যারা কোন কিছুতেই রা করে না। সুনন্দ ছিলো সেই মানুষ’।

** এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ ২০-৯-১৯৯৭ ইং রোজ শনিবার। সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় অন্যান্য যারা উপস্থিত ছিলেন, ‘খোয়াব’ সম্পাদক হাবিবুর রহমান এনার, ‘বিকাশ’ সম্পাদক মোস্তাক আহমাদ দীন ও মঞ্জু রহমান লেবু।

একটি ডিভোর্স এবং 'ওথেলো সিনড্রম'।





লেখক: Jobayer Ahmed
"সত্য ঘটনা অবলম্বনে
বৃষ্টিস্নাত মন খারাপের বিকেলে জানালা দিয়ে আকাশ থেকে বৃষ্টির নেমে আসা দেখছি। কেমন একটা করুণ কান্নার মত লাগছে আজকের বৃষ্টি পড়ার শব্দ। আকাশের মনে হয় আজ মন খারাপ।সকাল থেকে অজোরে ঝরে যাচ্ছে।
তবে মন খারাপ আমার। একটু আগে ফোন দিয়ে আমার বন্ধু সোফিয়া বললো, 'হারামজাদারে ডিভোর্স দিছি গতকাল আর সহ্য হচ্ছিল না এই পোকামাকডের জীবন্'

আমি চুপ করে আছি দেখে বললো, 'তুই আমার বাচ্চাদের জন্য মন খারাপ করিস না। আমি নিজ পায়ে দাঁড়াবো। জব পেলে বাচ্চাদের আমার কাছে নিয়ে আসব'।
সে ফোনে বিভিন্ন প্ল্যানিং বলে যাচ্ছে। আমি চুপচাপ শুনে যাচ্ছি। সে আমাকে বলে, আমি ন্যাশনাল ভার্সিটিতে আমার সাবজেক্টে সারা দেশে তৃতীয় হয়েছি। তোর মত ব্রিলিয়্যান্ট না তবে একবারে খারাপও তো না।
সোফিয়ার আত্মবিশ্বাস দেখে ভাল লাগছে মনে মনে। আমাকে ব্রিলিয়্যান্ট বলাতে বিব্রত লাগছিল।

সোফিয়া আমার খুব ভাল বন্ধু। অনেক দিনের জানাশোনা। বন্ধুদের আড্ডায় সে গল্পবাজ মেয়ে। সবাইকে সুন্দর করে কথার বাঁশ দেওয়াতে সে নাম্বার ওয়ান। বন্ধু পঁচানোর রানী হিসেবে সে যথেষ্ট সুনাম পেয়েছে। অনেক মজা করে কথা বলে। অথচ চোখ দেখে বুঝার উপায় নেই কতটা বিষাদে ভরপুর সোফিয়ার জীবন।
ক্লাস ফাইভে ওর বাবা মারা যান। ক্লাস সিক্সে মামার বাসা থেকে লেখাপড়া শুরু। সাথে মামীর অত্যাচার-অনাদর ও অবহেলা ফ্রি। এই মেয়ের অসীম সহ্য ক্ষমতা। মামী এত বাজে ব্যবহার করতো কিন্ত কোনদিন কাউকে কিছু বলত না।

অনার্সে ইডেনে ভর্তি হয়ে হলে উঠে। নতুন জীবন শুরু। মাস্টার্সে পড়ার সময়
বান্ধবী অনির বোনের বিয়েতে পরিচয় রাশেদের সাথে। রাশেদ রাজশাহী ইউনির্ভারসিটি তে পড়তো। সে তখনই প্রচন্ড পাগলামি শুরু করে সোফিয়াকে বিয়ে করার জন্য। এদিকে সোফিয়াকে ফাইনাল দিয়ে হল ছাড়তে হবে একটা আশ্রয় তারও বড় দরকার। রাশেদ এর ভালবাসার তীব্র পাগলাটে প্রকাশ সোফিয়া কে দূর্বল করে ফেলে। অবশেষে ফাইনাল এক্সাম এর আগে বিয়ে হয় তাদের।

বিয়ের তিন মাসের মাথায় সোফিয়া প্রেগন্যান্ট হয়। ৬ মাসের বাচ্চা পেটে নিয়ে ফাইনাল এক্সাম দেয় সে। প্রথম ছেলেটি জন্মদিতে গিয়ে মরতে বসে ছিল সে। সিজারিয়ান সেকশন-এর পর শকে চলে যায় সোফিয়া। ডাক্তার আজরাইলের টানাটানিতে অনেক ধকল সামাল দিয়ে প্রথম যেদিন বাচ্চাকে কোলে নিল সে, সেদিন আনন্দ অশ্রুতে চোখ ভিজে ছিল তার।
বেকার স্বামী যখন রীতিমত বেকারত্বের অজুহাতে বাচ্চাটি এবরশনের জন্য ওর গায়ে হাত তুলে সেদিনই বুঝেছিল ভুল মানুষ এর হাত ধরে জীবন নদী পাড়ি দেওয়া সহজ হবে না তার জন্য।

পরের বছর সে আবার প্রেগন্যান্ট। আবার পেট কাটা। এবার মেয়ে। সংসারের হাল ধরতে ও নিজ পায়ে দাঁড়াতে সোফিয়া একটি চাকুরী নেয়। রাশেদ এরও চাকুরী হয়। বিয়ের তিন বছর পর তারা স্বচ্ছল হয়। আস্তে আস্তে সুখ আসা শুরু করছিল কিন্ত সুখ বেশিদিন সইল না।
রাশেদ জড়িয়ে গেল মাদকে। সোফিয়ার সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু হয়ে গেল। বাচ্চা ও সংসার এর খবর নেই। একদিন অফিস এর নাম করে বের হয়ে তিন দিন বাসায় ফিরল না। মাদক এর ভয়াল ছোবলে সোফিয়ার সুখ উড়ে গেল জানালা দিয়ে। আস্তে আস্তে সোফিয়ার দুঃখ-গাথা উপন্যাসে রূপ নিচ্ছিল।

রাশেদ একদিন অফিস থেকে বাসায় এসে বললো, তার ট্রান্সফার হয়েছে সিলেটে। ব্যাগ গুছিয়ে রাতেই সিলেট রওয়ানা দিলো। সোফিয়া দুইটা ছোট্টছোট্ট বাচ্চা নিয়ে কিভাবে থাকবে তা নিয়ে কোন চিন্তাই করল না। সিলেট গিয়ে রাশেদ তিন মাসের জন্য লাপাত্তা হয়ে গেল। ফোনে পাওয়া যায়না। মোবাইল বন্ধ রাখে। সপ্তাহ ১৫ দিন পর দোকান থেকে ফোন দিয়ে ১/২ মিনিট কথা বলে লাইন কেটে দিত। এই তিন মাসে সংসারে এক টাকাও দিলো না। এই দিকে মেয়ে হওয়ার পর দুই বাচ্চা নিয়ে কুলাতে পারছিল না সোফিয়া,তাই চাকুরী ছেড়ে দিল।

চাকুরী ছেড়ে দেওয়ার আরো কারন নাকি ছিল সোফিয়া বললো, পরে জানাবে। রাশেদ জানতেও চাইল না কিভাবে চলছে সংসার। সিলেট থেকে তিন মাস পর বাসায় ফিরল রাশেদ। দরজা খুলে দিলো সোফিয়া। রাশেদ এর চেহারা দেখে আৎকে উঠল। পুরোদস্তুর নেশাগ্রস্থ একজন মানুষের রূপ নিয়ে বাসায় ফিরছে রাশেদ। সারাটা বিকেল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো সোফিয়া।
রাতে রাশেদ সোফিয়ার সাথে সেক্স করতে চাইলো। সোফিয়া আগ্রহ না দেখালে গলা টিপে মেরে ফেলতে চাইলো। রাশেদ চেঁচামেচি করল। বললো, 'মাগী, আমি ছিলাম না তিন মাস। কার কার সাথে শুইছিস তুই আমার লগে শুইতে চাস না'?
রাশেদের মুখের ভাষা শুনে সোফিয়া বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।

রাশেদ এর চিকিৎসা চললো।  সোফিয়ার বড় ভাইয়ের সহায়তায় সংসার চললো কয়েক মাস। সোফিয়া রাশেদকে সব মেন্টাল সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছিল। সংসারের হাল ধরতে নিজে আবার চাকুরী নিলো। অনেক দিন মাদক নেওয়ার কারণে রাশেদ এর ইরেক্টাইল ডিসফাংশন দেখা দিল। সে প্রতিরাতে সোফিয়াকে সেক্সুয়ালি জাগাতো কিন্ত কিচ্ছু করতে পারত না। রাশেদ ঘুমিয়ে যেত, সোফিয়ার শুরু হতো তীব্র পেট ব্যাথা। সারা রাত সেই ব্যাথায় নীরবে অশ্রু ফেলত সোফিয়া। রাতের পর রাত এই অত্যাচার সয়ে গেল মেয়েটি।

রাশেদ সুস্থ হয়ে অফিস শুরু করল। কয়েক মাস ভাল ছিল। এই কয়েক মাস সোফিয়াকে জ্বালাতন করেনি। একদিন রাতে রাশেদ সেক্স করতে চাইল কিন্ত পারলো না নিজের উইকনেস এর জন্য। হঠাৎ সে সোফিয়াকে চড় থাপ্পড় মারা শুরু করলো। সোফিয়া ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো।
রাশেদ চিৎকার করে বললো, 'তুই নিশ্চয় অন্য ব্যাটার সাথে শুইছস নইলে আমি কাছে আসলে আগ্রহ দেখাস না কেন? সোফিয়া কান্না করতে করতে বললো, 'প্লিজ রাশেদ থামো। আমিও তো একটা মানুষ। তুমি ডাক্তার দেখাও। তুমি নিজে কিছু করতে পারো না আবার আমার সাথে এ কেমন ব্যবহার'!

রাশেদ সন্দেহপ্রবণ হয়ে গেল। এই অলীক সন্দেহ তীব্র থেকে তীব্র হতে লাগলো।
ফেসবুকে সোফিয়া কোন ছবি পোস্ট দিলে রাশেদ গালিগালাজ করত। বলত: কোন নাগর এর জন্য ছবি দিছ। তুই তুকারী করতো। একবার সোফিয়ার ছবিতে এক স্কুল ফ্রেন্ড কমেন্ট করল 'মায়াবিনী'। এই কমেন্ট দেখে রাশেদ সোফিয়ার সাথে ঝগড়া শুরু করল, কেন এই কমেন্ট? নিশ্চয় তুই ওই ছেলের সাথে প্রেম করিস নইলে মায়াবিনী বলবে কেন তোরে।
সোফিয়া মেজাজ হারিয়ে রাগ করে বললো, 'আমি শুধু প্রেম করিনা, শুইছি ওই পোলার লগে', এটা বলার সাথে-সাথে ঠাস-ঠাস করে সোফিয়াকে চড় মারা শুরু করলো রাশেদ।

রাশেদের সন্দেহটা চরম মাত্রায় পৌঁছে গেল। ওর অফিস শেষ রাত ৮ টায়। বাসায় ফিরতে ফিরতে ৯ টা। সোফিয়ার অফিস ৪ টায় শেষ হলে ৫ টায় পৌঁছে যেত বাসায়। মাঝে মাঝে সোফিয়া বাসায় এসে দেখত রাশেদ তার আগেই বাসায় এসে বসে থাকত। এত তাড়াতাড়ি বাসায় কেন আসলো জানতে চাইলে রাশেদ রিয়েক্ট করত। সোফিয়া বুঝত সবই। প্রথম প্রথম সোফিয়া বিষয়টাকে পাত্তা না দিলেও রাশেদ এর আচরণ দিন-দিন অসহনীয় হয়ে পড়ল।
রাশেদ এর মনে বদ্ধমূল বিশ্বাস জন্মে গেল যে, সোফিয়া অন্য কারো সাথে ফিজিক্যাল রিলেশন করে বা পরকীয়া করে। কিন্ত সোফিয়া এইসব থেকে যোজন-যোজন মাইল দূরে। সোফিয়া মোবাইলে কথা বললে, রাশেদ সতর্ক ভাবে শোনার চেষ্টা করতো কার সাথে কথা বলছে। আর অল্পতেই রেগে যেতো রাশেদ। কথায় কথায় বাচ্চাদের সামনেই গায়ে হাত তুলতো। অপমানজনক কথা শুনাতো।

অফিসে শাড়ি পড়ে গেলে খোঁচা মেরে কথা বলতো, বসের লগে শুইবি নাকি? মাঝে মাঝে দুপুরে বাসায় ফোন দিয়ে বাচ্চাদের জিজ্ঞাস করত তোমাদের আম্মুর সাথে বাসায় কেউ আসে নাকি। ১০ বছর সংসার করে নিঃস্ব হয়ে এই পোকামাকডের জীবন থেকে গতকাল নিজের একক সিদ্ধান্তে বের হয়ে গেল সোফিয়া। ভালবেসে বিয়ে করে ভালবাসার ছিটেফোঁটাও পেলো না বেচারি!

আমাকে যখন বললো, সব শুনে আমি বুঝে গেছি সোফিয়ার স্বামী রাশেদ 'ওথেলো সিনড্রোম' বা প্যাথলজিকাল জেলাসিতে আক্রান্ত। এটা একটা মানসিক রোগ যেখানে স্বামী তার স্ত্রীকে বা স্ত্রী তার স্বামীকে অবিশ্বাস ও তীব্র সন্দেহ করে এবং এদের মনে বদ্ধমূল ধারনা জন্মে তাদের সঙ্গী পরকীয়া করছে।
শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত ট্রাজেডি নাটক 'ওথেলোতে' ওথেলো তার সৎ ও সুন্দরী স্ত্রী ডেসডিমোনাকে পরকীয়ার অমূলক সন্দেহ থেকে হত্যা করে। এই ঘটনার সাথে মিল রেখেই এই ভ্রান্ত বিশ্বাস ও সন্দেহপ্রবণ মানসিক ব্যাধির নাম রাখা হয় 'ওথেলো সিন্ড্রোম'। ওথেলো সিন্ড্রোম এ আক্রান্তরা নিজের সঙ্গীকে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না।

আমার বন্ধু সোফিয়া। হয়ত এই একটি ডিভোর্স বাঁচিয়ে দিল সোফিয়ার প্রাণ।"

Thursday, September 12, 2019

আহা, অনেকদিন পর আরেকজন মানুষ দেখে ভালো লাগলো!




লেখক: Md Saimon Hossain Raul
১।
- আচ্ছা দাদা, আপনি কি হিন্দু?
- জ্বী, হিন্দু।
- বাহ, আমিও হিন্দু। আপনি বৈষ্ণব, নাকি শাক্ত?
- বৈষ্ণব।
- হরে কৃষ্ণ আমিও বৈষ্ণব। আপনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব, নাকি চৈতন্য বৈষ্ণব?
- চৈতন্য বৈষ্ণব।
- হরে কৃষ্ণ। আমিও চৈতন্য বৈষ্ণব।
- তা আপনি কি ইস্কন নাকি শ্রী গুরু?
- ইস্কন।
- হরে কৃষ্ণ, আমাদের দেশি ইস্কন নাকি বিদেশি ইস্কন?
- দেশি।
- হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ আমিও দেশি।
এভাবেই চলতে থাকে। ...


২।
- ভাই, আপনি কি মুসলমান?
- হ, মুসলমান।
- সুবানাল্লাহ, আমিও মুসলমান। ইয়ে, আপনে শিয়া নাকি সুন্নি?
- সুন্নি।
- আলহামদুল্লিহ! আমিও সুন্নি। কোন মাজহাবে আছেন?
- হানাফি
- মাশাল্লাহ, আমিও হানাফি। আপনি সৌদি নাকি উপমহাদেশীয় হানাফি?
- উপমহাদেশীয়
- মারহাবা, আমিও উপমহাদেশীয়। আপনে শরিয়তি নাকি মারফতি?
- শরিয়তি
- জাযাকাল্লাহু খায়রান। আমিও শরিয়তি। আপনে চরমোনাই নাকি আটরশি?
- চরমনাই।
এভাবেই চলতে থাকে।...


৩।
- ভাই আপনি কি খ্রিস্টান?
- ইয়েস, খ্রিস্টান।
- ও জিসাস। আমিও যে খ্রিস্টান। আপনে ম্যানডেইন নাকি অর্থোডক্স?
- অর্থোডক্স।
- ভালো ভালো। আমিও অর্থোডক্স। আপনে অরিয়েন্টাল অর্থোডক্স, ইস্টার্ন অর্থোডক্স নাকি শুধুই অর্থোডক্স।
- শুধুই অর্থোডক্স।
- গড, আমিও। তা আপনি ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট নাকি এঞ্জেলিকেনিজম।
- ক্যাথলিক।
- আমিও ক্যাথলিক।
এভাবেই চলতে থাকে।...


৪।
- ভাই আপনি কি বৌদ্ধ?
- বৌদ্ধ
- কোন যানে আছেন, হীনযান নাকি মহাযান?
- হীনযান বৌদ্ধ নিকায়
- সাধু, সাধু। আমিও হীনযানি। আপনে শ্রীলঙ্কান নাকি বঙ্গীয়?
- বঙ্গীয়
- মেত্তা করুণা মুদিতা উপেক্ষা, আমিও বঙ্গীয়। আপনি বড়ুয়া নাকি
মারমাগ্রী?
- বড়ুয়া।
- সব্বে সত্তা সুখীতা ভবন্তু। আমিও বড়ুয়া। আপনি সংঘরাজ নাকি
সঙ্ঘনায়ক?
- সংঘরাজ।
- বল বুদ্ধ বল। আমিও সংঘরাজ দলে।
- তো আপনে কি বনভান্তেবাদী, নাকি উছালা মার্মা?
- বনভান্তেবাদী
- সাধু-সাধু, আমিও।
এভাবেই চলতে থাকে।...


অথচ, অথচ কথোপকথনটা যদি এমন হতো।
- ভাই, আপনি কোন প্রাণী?
- মানুষ।
- কি বলেন। আমিও মানুষ।
- আহা, অনেকদিন পর আরেকজন মানুষ দেখে ভালো লাগলো।

Tuesday, September 10, 2019

জাপানীরা কেন বাঙালিদের ভালোবাসে?





লেখক: Apu Nazrul

Image may contain: 1 personজাপানীরা ১৯৩৭ সালে নানকিং (এখন নানজিং) এ চাইনিজদের কচুকাটা করেছিলো। খুন -ধর্ষণ মিলিয়ে এমন নৃশংসতা কমই দেখেছে বিশ্ব। The flowers of war নামে একটি মর্মস্পর্শী মুভি আছে এই গণহত্যা নিয়ে। জাপানীরা এর আগে পরেও লাখে লাখে মরেছে-মেরেছে। শেষতক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জব্দ জাপান বাধ্য হয়েই রক্তের নেশা ছেড়ে জাতি গঠনে মনোযোগ দিয়েছিলো বলেই আজ তারা পৃথিবীর অন্যতম সভ্য জাতিতে পরিণত হতে পেরেছে।

এক্ষেত্রে জাপানীরা চিরকৃতজ্ঞ কুষ্টিয়ায় জন্ম নেয়া একজন বাঙালির কাছে। মিত্রপক্ষের চাপ সত্বেও ইন্টারন্যাশনাল যুদ্ধাপরাধ টাইব্যুনালের 'টোকিও ট্রায়াল' ফেজে এই বাঙালি বিচারকের দৃঢ অবস্থানের কারণেই জাপান অনেক কম ক্ষতিপূরণের উপরে বেঁচে গিয়েছিলো। যে বিচার মিত্রপক্ষ ও অন্য বিচারকরা একপেশেভাবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন জাপানের উপর তার বিপক্ষে নিরপেক্ষ রাধাবিনোদ অবস্থান না-নিলে এখন পর্যন্ত জাতি গঠনের সুযোগই হয়তো আর পাওয়া হতো না জাপানের।

মিথ আছে পরবর্তীকালে স্বাক্ষাতে জাপানী সম্রাট হিরোহিতো নিজে দাঁড়িয়ে সন্মান জামান ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, 'যতদিন জাপান থাকবে বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবেনা। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নি:স্বার্থ বন্ধু'। 
মিথ হতে পারে কিন্তু এটি যে শুধু কথার কথা ছিলোনা তার প্রমাণ আমরা এখনো দেখতে পাই। জাপান এখনো বাংলাদেশের সবচে নি:স্বার্থ বন্ধু। এই ঘটনার প্রায় ৬৫ বছর পর ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিসান হামলায় প্রাণ গেলো নয় জাপানিজ বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারের। জাপান তখনও পাশে ছিলো বাংলাদেশের। 

আর কুষ্টিয়ায় জন্ম নেয়া সেই বাঙালি বিচারকের নাম এখনো জাপানী পাঠ্যপুস্তকে পাঠ্য। তাঁর নামে জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু মেমোরিয়াল ও মনুমেন্ট। এই বিস্মৃত বাঙালির নাম বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল (১৮৮৬-১৯৬৭)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক ছাড়াও জীবদ্দশায় অনেক বড় বড় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে তিনি কুষ্টিয়ায় নিজ গ্রামের স্কুল ও রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে প্রভাষক ছিলেন। কিছুদিন ময়মনসিংহ কোর্টে আইন ব্যবসাও করেছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই জাপানীদের এদেশের প্রতি নি:স্বার্থ সহযোগী মনোভাব দেখে এর কারণ কি হতে পারে ভাবতাম। পরে কারণ জানার পর ভদ্রলোককে নিয়ে লিখবো-লিখবো করেও লেখা হয়ে উঠছিলো না অনেকদিন। আজ ভারমুক্ত হলাম। গুগল করলে আরো ডিটেইলস পাবেন। নেটফ্লিক্সে পাবেন টোকিও ট্রায়াল নামের সিরিয়াল যেখানে রাধাবিনোদের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ইরফান খান।

এই মেধাবী বাঙালিকে আমরা প্রায় কেউই মনে রাখিনি। বাঙালির মেধাগত বীরত্বের এই চমৎকার অধ্যায়টা জানে খুব অল্প মানুষ! অথচ কত ঠুনকো বিষয়ই না বাঙালি মানসে পায় সীমাহীন গুরুত্ব!
...
wikipedia: https://en.wikipedia.org/wiki/Radhabinod_Pal

banglapedia: http://en.banglapedia.org/index.php?title=Pal,_Justice_Radhabinod

Monday, September 9, 2019

শাড়ি নিয়ে সায়ীদিয় ভ্রান্ত থিওরি ও বাড়াবাড়ি!

"সায়ীদ স্যারের 'শাড়ি' নিয়ে ফেসবুকে নারীদের ক্ষোভ কমে এসেছে। কিন্তু এখন গর্ত থেকে বের হয়েছেন তাঁর কিছু সাগরেদ। তারা ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করছেন স্যার সুশীল সাহিত্যসেবী। তার রচনাতে কোনো অশ্লীলতা নেই, জাতিবিদ্বেষ নেই, নারীকে হীন করে কিছু বলা হয়নি। সবই সাহিত্য। এসব জায়েজ ছিল, জায়েজ আছে।
এদেরকে বেশি দোষ দিতেও বাধে। কারণ স্যারের আলোয় তারা আলোকিত হয়েছেন। স্যার যে বই পড়তে বলেননি সে বইয়ের হদিস তারা জানেন না। সময়ের নতুন চিন্তা-ভাবনার সাথেও তারা নিজেদের পরিচিত করে তুলতে পারেননি, কিছুক্ষেত্রে চানও না। বর্তমান সময়, প্রজন্ম ও তাদের ভাবনাকেও এককথায় তারা নাকচ করে দেন, না তলিয়েই। যেসব নারী এই লেখা পড়ে আহত হয়েছেন তারা যেখানে নিজেরাই অভিযোগ করছেন সেখানে সাগরেদরা সেই অভিযোগকে নাক সিঁটকাচ্ছেন তাদের স্বভাবসুলভ উন্নাসিকতায়। বাংলাদেশে কয়েকটা গল্পের বই পড়লে লোকে গ্রামের বাকি সবাইকে মূর্খ ভাবে। তাদের মোটা মস্তিষ্ক নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। সেসব থাক। ফিরে আসি সায়ীদ স্যারের শাড়িতে।

প্রথমেই বলি লেখাটা কেন একটা গুরুত্বহীন ও অপ্রয়োজনীয় লেখা। শুরুতে যথারীতি ফেনানোর পর স্যার লেখার শেষ বাক্যে এসে তাঁর তত্ত্ব দান করেছেন। সেখানে লেখা: 'আমার মনে হয়, এ রকম একটা অপরূপ পোশাককে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বাঙালি মেয়েরা সুবুদ্ধির পরিচয় দেয়নি'।
এই হচ্ছে ওনার থিসিস। প্রশ্ন হচ্ছে, কখন কবে বাঙালি মেয়েরা শাড়িকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করলো যে তিনি মরহুমা শাড়ির কুলখানির দোয়াদরুদ পড়তে বসলেন প্রথম আলোয়। কারা এসব বাঙালি মেয়েরা? তার কাছে আমি পরিসংখ্যান আশা করি না যে তিনি বলবেন শতকরা কতভাগ শাড়ি পরা কমে গেছে বা শাড়ির দোকানিরা মার্কেটে মার্কেটে দোকান বন্ধ করে দিচ্ছে শাড়ি বিক্রি করতে না পেরে, বা কোথায় তাঁতীরা তাদের শাড়ি বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় শাড়ি পুড়িয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। তিনি সাহিত্যের কারবারি, কল্পনায় তিনি দু:খবিলাস করতেই পারেন। সমস্যা হলো কথাটা তিনি তুলেছেন বাস্তব সমাজের। দায়ী করছেন বাঙালি মেয়েদেরকে। যে সমাজদর্শন তিনি বয়ান করছেন তার ভিত্তিটাই অবাস্তব। এরকম কোনো সমস্যা বা সংকট এ সমাজে নেই।

যে সমস্যার অস্তিত্বই নেই তার সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করতে গেলে কথাবার্তায় তালগোল পাকিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তাকে এর জবাব দিতেই বোধহয় ফেসবুক জুড়ে বাঙালি মেয়েরা শাড়ি পরে প্রোফাইল পিকের বন্যা তৈরি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সায়ীদ স্যার তার এলিটিস্ট বক্তব্যের কারণে কিছুদিন আগেই একবার রোষের শিকার হয়েছিলেন। প্রবাসী শ্রমিকদের বিমানভ্রমণের ত্রুটি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তিনি যে রস বের করছিলেন তার শ্রোতাদের অট্টহাসির জন্য সেটার প্রতিবাদ করেছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। এবার লোকে তার ব্র্যান্ডিং নিয়ে টান দিয়েছে। তারা বলছে আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগরের নিজের আলোতেই ভেজাল। এটা একটা বিরাট অভিযোগ। অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা। যারা আরেকটু সহানুভূতিশীল তারা পরামর্শ দিয়েছেন বুদ্ধিজীবিদেরও অবসরে যাওয়া সঙ্গত।

কোথায় আলো হারিয়েছেন সায়ীদ স্যার? আবার ফিরে যাই তার লেখায়। তিনি লিখছেন, ‘বাঙালি সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: আমার ধারণা ‘উচ্চতা’। সবচেয়ে কম যে উচ্চতা থাকলে মানুষকে সহজে সুন্দর মনে হয়—যেমন পুরুষের ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি ও মেয়েদের ৫ ফুট ৫ বা ৬ ইঞ্চি—আমাদের গড় উচ্চতা তার চেয়ে অন্তত ২–৩ ইঞ্চি কম’।

আসলে আমি নিশ্চিত তিনি বা তাঁর সাগরেদরা এই আলোর সন্ধান পাননি। উল্লেখ্য অংশে তিনি যে কম উচ্চতাকে সৌন্দর্য্যের দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করেছেন এবং এটি যে একটা দোষ এটা তার জানার বা জ্ঞানের আওতায় আসেনি। বর্তমানে এরকম বক্তব্যকে হাইট ডিস্ক্রিমিনেশন বা হাইটিজম বলে। আমেরিকার কিছু রাষ্ট্রে, কানাডাতে ও অস্ট্রেলিয়াতে এর বিরুদ্ধে আইন পাশ হয়েছে। তিনি মেয়েদেরকে ৫ ফুট ৫/৬ এর নীচে হলে ‘সহজে সুন্দর মনে হয় না’ বলে যে ভুল করেছেন, ওইসব দেশে হলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতো। তাকে মাফ চাইতে হতো।
উপমহাদেশের উত্তরাংশের নারীদের ‘উন্নত দেহসৌষ্ঠব’ নিয়ে বলেই তিনি জানান দিচ্ছেন, ‘ওই অঞ্চলের মেয়েদের তুলনায় বাঙালী মেয়েদের আরও একটা জায়গায় ঘাটতি আছে’। এই বাক্যই স্পষ্ট করে দেয় তার মন-মানসিকতায় লুকিয়ে আছে জাতিবিদ্বেষ। কাকে বলে জাতিবিদ্বেষ?

উদাহরণ দেই একটা। বুদ্ধিজীবি হত্যার নেপথ্য ঘাতক রাও ফরমান আলী তার বইতে স্বীকার করেছিলেন: '...সারা হাতে ভাত মেখে খায় কালো দুর্বল বাঙালি জাতিকে আমরা ঘৃণাই করতাম'। সেই ঘৃণা আমরা ১৯৭১ এ দেখেছি। বাঙালি নারীদেরকে ধর্ষণ করে জাতির রক্ত শুদ্ধ করে দেয়ার মত প্রকল্পের কথাও আমরা শুনেছি।
সায়ীদ স্যারের কথায় যে জাতিবিদ্বেষ আছে এটা যারা বুঝতে চাইছেন না তাদেরকে রেসিজমের সংজ্ঞায় আবার চোখ বুলাতে অনুরোধ করি। সহজলভ্য একটা রেফারেন্স দেই উইকিপিডিয়া থেকে: Racism is the belief in the superiority of one race over another. Modern variants of racism are often based in social perceptions of biological differences between peoples. তর্জমায় পড়ুন বাক্য দুটি: এক জাতি থেকে অন্য জাতি উন্নত এই বিশ্বাসকে রেসিজম বলে। বর্ণবাদের আধুনিক একটা রূপের ভিত্তি হচ্ছে বিভিন্ন মানুষের দৈহিক পার্থক্য নিয়ে তৈরি সামাজিক ধারণা।

এই যে সায়ীদ স্যার বাঙালি মেয়ের শারীরিক বৈশিষ্ঠ্যে ঘাটতি দেখছেন এবং উত্তরভারতের মেয়েদের উন্নত ভাবছেন এটা পরিষ্কার রেসিজম প্রসূত। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তার পরিচয় বা জাতিও এক। কিন্তু তার মগজে যে বাঙালি জাতির ঘাটতির ধারণা বাসা বেঁধে আছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর অন্যান্য লেখায় প্রমাণ আছে। টিভিতে নানা অনুষ্ঠানে তিনি সেসব নিয়ে মশকরা করেছেন।

নারী পাঠকরা জাতিবিদ্বেষ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছে সেটা হচ্ছে বডি শেইমিংএর। সায়ীদ স্যার তার আলোর সলতেকে নিয়মিত কতটা নবায়ন করেন সে বিতর্কে না গিয়ে বলা যায় তিনি এই নতুন ধারণা সম্পর্কে অবহিত না। এই বডিশেইমিং সায়ীদ স্যারের গুরুরা করে গেছেন সে যুক্তিতে তিনি পার পাবেন না। ধারণাটা নতুন, কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে মোটা, খাটো বলে খোঁচানোকে বা বডিশেইমিংকে এখন নারীরা নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত করছেন। সায়ীদ স্যার ব্যক্তি নয় পুরো বাঙালি নারী গোষ্ঠীর শরীর যে তাঁর মাপকাঠি অনুযায়ী সৌন্দর্যের তালিকায় পড়ে না এই কথা বার বার বলেছেন এই লেখায়।
সায়ীদ স্যারকে আমিও স্যার বলি। কিন্তু শিক্ষক বলে তার ভুলশুদ্ধ সবকথা বিনা প্রশ্নে মেনে নেই না। সামনাসামনিও তাঁর অনেক কথার ত্রুটি ধরিয়ে দিয়েছি (সে উদাহরণ অন্যসময় দেবো, দরকার হলে)। সেই সূত্রে বলবো বডিশেইমিং বিষয়টা তিনি ঠিক বাংলা উপন্যাস পড়ে বুঝতে পারবেন না। একটু ইন্টারনেট ঘেঁটে সাম্প্রতিক দলিলপত্র পড়ে তাকে এটা জেনে নিতে হবে।

আর কি আছে তাঁর লেখায়? তিনি ক্রমাগত এই দুটি দোষ করে গেছেন তার লেখায়। কিছু উদাহরণ দিয়ে দিচ্ছি এখানে, ত্রুটিপূর্ণ বাক্যাংশগুলোর নীচে লাইন টেনে দিচ্ছি। সচেতন পাঠকরা পড়লে এরকম আরো ত্রুটি দেখতে পাবেন:
১. ‘কিছুটা অবিন্যস্তভাবে, তাই বাঙালি মেয়েদের দেহ গঠন উপমহাদেশের উত্তরাংশের মেয়েদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অসম’।
২. ‘শারীরিক অসমতার এত ঘাটতি থাকার পরও অন্যান্য মেকআপের মতো রূপকে নিটোলতা দেওয়ার মতো এক অনন্য সাধারণ মেকআপ রয়েছে বাঙালি মেয়েদের ভাঁড়ারে'।
৩. ‘কিন্তু ওই কাম্য উচ্চতার অভাবে বাঙালি মেয়েদের শাড়ি ছাড়া আর যেন কোনো গতিই নেই’।
৪. ‘আজকাল শাড়ি ছাড়া অনেক রকম কাপড় পরছে তারা ... এবং পরার পর ইউরোপ বা ভারতের ওই সব পোশাক পরা সুন্দরীদের সমকক্ষ ভেবে হয়তো কিছুটা হাস্যকর আত্মতৃপ্তিও পাচ্ছে’।
৫. ‘এসব পোশাক বাঙালি মেয়েদের দেহ গঠনের একেবারেই অনুকূল নয়’।
৬. ‘বাঙালি মেয়েদের উচ্চতার অভাবকে আড়াল করে তাদের প্রীতিময় ও কিছুটা তন্বী করে তুলতে পারে একমাত্র শাড়ি’।

এরকম বাক্যের বাঁকে-বাঁকে তিনি তার মতামতকে সত্য বানিয়ে বাঙালি মেয়েদের উচ্চতা ও দেহসৌষ্ঠব নিয়ে বুলিইয়িং করে গেছেন। এই কাজটা চলচ্চিত্রের জোকার দিলদার করলে লোকে উপেক্ষা করতো। কিন্তু ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ করলে লোকে ক্ষুব্ধ হবেই। 
আমি মনে করি, সায়ীদ স্যারের ভুল স্বীকার করা উচিত। তাতে তাঁর মান কমবে না, বাড়বে। লেখা আর বড় না করি। তাঁর লেখার থিসিসে ফিরে ক্ষ্যামা দেই। কেন বাঙালি মেয়েদের অন্য পোষাক নয় শাড়িই পড়া উচিত বলে তিনি যে যুক্তি জোগাড় করেছেন সেটা ঠিক দাঁড়ায় নাই। শাড়ি যারা পরেন তারা তাদের প্রয়োজন ও ইচ্ছা অনুযায়ীই তা পরেন, নিজের শরীর সম্পর্কে কোনো দ্বিধায় না থেকেই। যুগ যুগ ধরে শহরে গ্রামে বিত্তশালী দরিদ্র নারীরা শাড়ি পরে আসছেন, আরো অনাদি কাল পরবেন।

স্যারের যে মূল থিসিস বাঙালি মেয়েরা শাড়িকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন, এটা ত্রুটিপূর্ণ। এরকম অদ্ভুত দাবীর সাথে তুলনা করা যায় প্রেসক্লাবে জনৈক নাসিমের আসল বিএনপির দাবীর সাথে। বাঙালি মেয়ে শুধু উত্তরা, গুলশান, বারিধারায় থাকে না, তারা আছে রাজধানীর বাইরে এমনকি বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমানার বাইরেও। তারা শাড়ি পরছেন। স্যার কেন দেখতে পাচ্ছেন না সেটা তদন্তের বিষয়।"

Friday, September 6, 2019

বেয়াদবের বড় গলা!



বিচারকের অধিকাংশেরই আচরণ দেখে মনে হচ্ছে স্রেফ একেকটা ঘোড়ামুখো তেলাপোকা। বেয়াদবরা বেয়াদবি করে আবার বড় গলায় বলেও! এই অনুষ্ঠানের 'দোমড়া-হোমড়া' ইবনে হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, "আমরা লক্ষ করলাম, এ ধরনের পরিকল্পনার অনুষ্ঠান দেখতে এখনই বাংলাদেশের দর্শক প্রস্তত হননি...আমরা একটু বেশি আগাম ভেবে ফেলেছি..."।

ওহে, ইবনে হাসান আমরাও বিনয়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম নষ্ট বেয়াদব তিনবার বেয়াদবি করে। প্রথমবার তো বেয়াদবি করে। দ্বিতীয়বার সেই বেয়াদবিকে ইনিয়ে-বিনিয়ে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে। তৃতীয়বার অন্য সবাইকে বেয়াদব বলে।
ওরে, বেয়াদবির আবার এইকাল-সেইকাল কী রে। যে একালে মরদুদ সে সেকালেও মরদুদ!
ফাহমী নামের ছোকরাটা তো আগেও বেয়াদব ছিল এখনও তাই আছে! আফসোস...!




Wednesday, September 4, 2019

একজন আবদুল্লাহ আবু সা্য়ীদ



লেখাটি লিখেছেন, মো. নাজমুল হাসান:

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদকে আরো ভালোভাবে বুঝতে হলে তাঁর পলিটিকাল আইডিওলজিটাকে বুঝতে হবে। তখন ব্লগের যুগ। সামহোয়ারিন, সচলায়তন, মুক্তাঙ্গন প্রবল জনপ্রিয়। ওয়ান ইলাভেনের পরের সময়টার কথা বলছি। ব্লগে আমরা কমেন্টের শেষে পরিচিতিতে নিজেদের সম্পর্কে কয়েকটা লাইন লিখতাম। এখন আপনারা ফেসবুকে যেভাবে বায়ো লিখেন, অনেকটা সেভাবে।

মুক্তাঙ্গন ব্লগে অ্যানোনিমাস ব্লগার ‘অবিশ্রুত’-র লেখায় চোখ আটকে ছিল। খুব সুন্দর কয়েকটা লাইন ছিল উনার পরিচিতিতেঃ
"...সেইসব দিন স্মরণে যখন কলামিস্টরা ছদ্মনামে লিখতেন; এমন নয় যে তাঁদের সাহসের অভাব ছিল তারপরও তাঁরা নামটিকে অনুক্ত রাখতেন। হতে পারে তাৎক্ষণিক ঝড়-ঝাপটার হাত থেকে বাঁচতেই তাঁরা এরকম করতেন। আবার এ-ও হতে পারে, সাহসকে বিনয়-ভূষণে সজ্জিত করেছিলেন তাঁরা।
আমারও খুব ইচ্ছে দেখার, কেউ নামহীন গোত্রহীন হলে মানুষ তাঁকে কী চোখে দেখে। কাঙালের কথা বাসি হলে, কাঙালকে কি মানুষ আদৌ মনে রাখে"?

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে আগে ২০০৮ সালের অক্টোবরে উনার একটা লেখা ছিল মুক্তাঙ্গনে। সেখান থেকে কোট করিঃ
"...সেপ্টেম্বরে (২০০৮) লন্ডনে এসেছিলেন বাংলাদেশের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্ণধার ও বাংলাদেশ দূরদর্শনের অন্যতম উপস্থাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি এসেছিলেন ব্রিটেন ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বাংলাদেশের আবহাওয়া পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে। এরকম একটি নীতিনির্ধারণী বিষয়ে নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে অনির্বাচিত সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অহেতুক এই আগ্রহ অনেককেই কৌতূহলী ও বিস্মিত করেছিল। জোর আপত্তি ও প্রতিবাদ উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদদের গায়ের চামড়া ভারি মোটা, সেসব প্রতিবাদ ও আপত্তি তাঁর ওই চামড়ায় কোনো তরঙ্গ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। পৃথিবীর কোনো স্বৈরশাসকেরই ভাঁড় খুঁজে পেতে দেরি বা কষ্ট হয় না। ড.ফখরুদ্দীন সরকারেরও খুঁজে পেতে কষ্ট হয়নি। তাঁরা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে খুঁজে পেয়েছেন, যিনি জোট সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছেও খুব প্রিয় ছিলেন এবং প্রিয় কর্পোরেট মিডিয়াগুলোর কাছেও।

সন্দেহ নেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটি প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয়, তাঁর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শ্লোগান হলো ‘আলোকিত মানুষ চাই’। তিনি সেদিন বলেছেন, ‘বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র পরিচালনায় সংসদীয় গণতন্ত্র যে মোটেই কার্যকর নয়, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে'।
এর আগে সাপ্তাহিক ২০০০-এর গোলাম মোর্তাজার সঙ্গে তিনি ম্যাগসেসে পুরস্কার পেয়ে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তখনকার (চারদলীয় সরকারের) অরাজক পরিস্থিতির সাফাই গেয়েছিলেন। তিনি যা বলেছিলেন, তা অনেকটা এরকম, ‘একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক অবস্থায় এরকম পরিস্থিতি দেখা দেয়, তখন লুটপাট হয়, দুর্নীতি হয়'।

বোধকরি তিনি অর্থনীতির পুঁজি সঞ্চয়নকালের সঙ্গে জোট সরকারের সেই সময়টিকে তুলনা করতে চেয়েছিলেন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যে চারদলীয় জোট সরকারের নীরব অনুরাগী সেটা বোঝা যায় যখন তিনি ওই মতবিনিময় সভায় বলেন, ‘গত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্ক্ষলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। জনজীবনের নিরাপত্তা বলতে কিছু ছিল না। আইনশৃঙ্ক্ষলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্যই অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে সেনাবাহিনীকে বিনাবিচারে মানুষ হত্যার লাইসেন্স প্রদান করা হয়। তারপর সংসদে আইন করে এইসব হত্যার দায় থেকে সেনাবাহিনীকে দায়মুক্তি প্রদান করা হয়'।

চারদলীয় জোট সরকারের হয়ে এত সুন্দর করে ক্লিনহার্ট খুনপর্বের সাফাই আর কোনো বুদ্ধিজীবী কি গাইতে পেরেছেন বাংলাদেশে? ইতিহাস খুঁজলে এরকম বিকৃত ও অসুস্থ জ্ঞানী মানুষ আরও অনেক পাওয়া যাবে। জীবদ্দশায় তাঁরা অনেক পুজা পেয়েছেন, ফুল পেয়েছেন, কিন্তু মৃত্যুর পর ইতিহাসে ঠাই পেলেও ঘৃণা ছাড়া আর কিছু পাননি। তাঁর সাহচর্য থেকে কোনো আলোকিত মানুষ বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। হয় সে মানুষটি হবে চিন্তার দিক থেকে বিকলাঙ্গ, না হয় অধঃপতিত।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মিশন এখানেই শেষ হয়নি। এরপর উনি নিউইয়র্কে গিয়ে বলেছেন, ‘সংখ্যালঘুদের জাতীয়তাবাদ হয় না। যেমন বাংলাদেশে হিন্দুরা, ভারতে মুসলমানরা, আমেরিকায় অন্যান্য সংখ্যালঘুরা'।
আসলে উনি কী বোঝাতে চান? জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা? সেটি কী কেবল সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? নাকি উনি জাতীয়তাবাদ অর্থে দেশপ্রেম বুঝাতে চাইছেন? মূলধারা বুঝাতে চাইছেন? তার মানে কি এই যে, বাংলাদেশের হিন্দুদের কোনও দেশপ্রেম নেই? চাকমাদের কোনো দেশপ্রেম নেই? বাংলাদেশের হিন্দুরা কিংবা ভারতের মুসলমানরা ওইসব দেশের মূলধারার অংশ হতে পারে না? ভারতের মুসলমানরা ভারতীয় দেশপ্রেমিক হতে পারে না?
বিস্মিত হতে হয়, ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে এসে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদরা এসব ধারণা প্রচার করে যাচ্ছেন আর অনেকে তা মুগ্ধ হয়ে শুনছে..."।

লেখাটির মন্তব্যে জনাব সৈকত আচার্য বলেছিলেন, "…জোট সরকারের শাসনামলের মাঝামাঝি, আবু সাইয়িদ সাহেব একদিন ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে পেশাজীবীদের ডাকা এক সভায় বক্তৃতা করতে উঠে দাঁড়ানোর কিছুক্ষণ পরেই ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে ইনিয়ে-বিনিয়ে বক্তৃতা করা শুরু করেন। ইনিয়ে-বিনিয়ে বলছি এই কারণে যে, তিনি প্রথমে ছাত্র রাজনীতির পক্ষে বলার ভান করে বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। এই কারণে প্রথমে অনেকেই ব্যাপারটি ধরতে পারেননি। যখন তিনিও মনে করা শুরু করলেন যে কেউ তো প্রতিবাদ করছে না, একেবারে সরাসরিই বলা শুরু করলেন। উপস্থিত পেশাজীবিদের মধ্যে সমস্বরে ‘দালাল-দালাল’ বলে রব উঠে গেল। তিনি হেসে বললেন, ঠিক আছে, আপনারা যখন পছন্দ করেছেন না, আমি ও বিষয়ে আর বলতে চাই না। আসলে মানে…আমি ঠিক ওভাবে বিষয়টি বলতে চাইনি…। অতপরঃ প্রতিবাদের মুখে বসে পড়তে হল তাঁকে। তাঁর মুখের হাসিটি মঞ্চের চেয়ারে বসার পরেও গেল না…"। 

মন্তব্যে আরেকজন লিখেছিলেন, “…আব্দুল্লাহ আবু সাইদ সেন্ট্রাল রোডে ফ্ল্যাট কেনার পর তার সামনের রাস্তাটা আরেকটু প্রশস্ত করার জন্য মেয়র খোকার কাছে ধর্ণা দিয়ে তদবির করেন। তদবির করাটা দোষের কি না, তার চেয়ে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো তিনি ব্যাপারটাকে উপস্থাপন করেন ঢাকা শহরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জ্যাম কমানো, দূষণ প্রতিকার প্রভৃতি মোড়কে…”। 

রাজনৈতিক ব্লক চেনা খুব জরুরি। কেয়ারটেকার আমলের মাইনাস টু ফর্মুলা বহুল আলোচিত। সেই ফর্মুলার উদ্ভাবক সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য, কিছু আমলা, ট্রান্সকম গ্রুপ, একজন নোবেলজয়ী ডক্টর এবং বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ, যেমন আবদুল্লাহ আবু সাইদ। গণজাগরণের দিনগুলোতে উনার সলিডারিটি ঘোষণা না করার ঘটনা, উপমহাদেশের উত্তর দিকের নারীদের উন্নত দেহসৌষ্ঠবের প্রশংসা (কাশ্মীর, পাকিস্তান), পাকিস্তানিদের সাথে আমাদের ইন্টার-রেসিয়াল মিক্সচারের মাধ্যমে সুগঠিত দেহ সমৃদ্ধ জাতি গঠনের আকাঙ্ক্ষা (যা একাত্তরের জেনোসাইডের অংশবিশেষের সুস্পষ্ট সমর্থন) সবই এক সূত্রে গাথা।

আজ এসি বাতাসে ধীরে ধীরে আপুদের শাড়ি খুলতে গিয়ে দখিনা বাতাসে একটানে উনার লুঙ্গী খুলে গেছে। এটাই জীবন। ধন্যবাদ ব্লগার অবিশ্রুত। জানি না আপনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন। কাঙালের কথা বাসি হলেও আমরা আপনাকে ভুলি নাই। হয়তো কোনো মোড়ে আপনি বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন, এক যুগ আগের কথা ভুলে গেছেন, কিন্তু আপনার কথাগুলো রয়ে গেছে অন্তর্জালের পৃষ্ঠায়, যা এতদিন পরেও বাস্তব।

তবে আবদুল্লাহ সায়ীদের শাড়ির দুটি অংশের সহমত জ্ঞাপন করা যায়। প্রথমত, ‘শাড়িতে শরীর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যেকোনো মেয়ের রূপে কমবেশি দীর্ঘাঙ্গি বিভ্রম দেখা দেবেই, ঠিক যে কারণে দীর্ঘ পাঞ্জাবি বা শেরওয়ানি পুরুষদের শরীরে দীর্ঘদেহিতার বিভ্রম জাগায়। এতে সঠিক উচ্চতার তুলনায় তাদের কিছুটা বেশি দীর্ঘ লাগে'।
এই বিষয়টা আপনি ফ্যাশন ডিজাইনারদের সাথে কথা বললে বা ফ্যাশন ব্লগ পড়লে জানতে পারবেন। একটা কোট করিঃ wearing long skirt, wearing maxi dress the right way will actually make a short girl look taller.
দ্বিতীয় বিষয়টি ‘শরীর আর পোশাকের বিভাজনের অনুপাত সংক্রান্ত। কথাগুলো আগেও বলেছিলাম। শাড়ির আসল রহস্য কোমড়ে, উন্মুক্ত কটিদেশে যেখানে কোটি কোটি দৃষ্টিপাত, সেখানেই কোমড়ের জয়, শাড়ির জয়।
কিভাবে?

আসুন, শাড়ির ভেতরে ঢুকি। দাড়িয়াবান্ধা খেলার মতো শাড়িটা বান্ধা শিখি।
প্রথমে অবনত, পরিণত, আনত বা বিনত চন্দ্রজোড়াকে লাগাম দিয়ে কষে টেনে ধরে ঊর্ধ্ব গগনে উন্নত টানটান সূর্য হিসেবে আলোকিত করে কোনোমতে শাড়ি দিয়ে ঢেকে দিন। এবার নিম্নদেশেও শাড়িখানা বারবার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে টানটান করে বেঁধে কোমড়টাকে খোলামেলা করে ছেড়ে দিন। তাহলে কী দাঁড়ালো?
নাউজুবিল্লাহ! আগে বলেন, কী দাঁড়ালো না? ছেলেবেলা অনুপাতের অঙ্ক কষেন নাই? উপরে বাড়িলো, মাঝে কমিলো, নিচে বাড়িলো, কী দাঁড়াইলো? আগে কী অনুপাত আছিলো আর এখন কী হইলো?
আগে যাহা ৩২-২৮-৩৪ আছিলো, এখন তা আপনার চোখে ৩৬-২৪-৩৬ এ রূপ লইয়াছে!

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, সারাদিন যারা জয়া আহসানের তারুণ্যোজ্বল ফিগারকে দেখে ফেসবুকে লালা আর বাথরুমে গালা ফেলতেন, মেয়েদের সুতি শাড়ি পরা ছবি স্টোরিতে পেলেই মেসেঞ্জারে ফুঁ আর সুড়সুড়ি দিয়ে তাকে জর্জেট শাড়ির মতো আলগোছে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করতেন, জামদানি শাড়ির মতো ট্রান্সপারেন্ট হয় কিনা দেখার জন্য জুম করতেন, সুযোগ পেয়ে তাঁরাও আজ দু’ ঘা কষে দিচ্ছেন বুড়ো বাবুটাকে! নিজের বেলায় লীলা আর উনার বেলা শালা?
এদিকে আপুরা উনার প্রতিবাদে গণহারে শাড়ি পরে ছবি আপলোড দিচ্ছেন। শুনেছেন যে উনি নাকি শাড়ি নিয়ে কী বলেছেন, ব্যস!

আরে ভাই, উনি কী লিখেছেন, সেইটা তো আগে পড়েন। উনি তো এটাই চেয়েছিলেন। এ আবার কেমন প্রতিবাদ? অর্ধেক পড়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে চলবে?
লেখাটার রবীন্দ্রনাথ অংশটুকুকেই বা আমরা বাদ দিচ্ছি কেন? ‘ইংল্যান্ডের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 'এখানে রাস্তায় বেরোনোর বড় সুবিধা যে থেকে থেকেই সুন্দর মুখ দেখতে পাওয়া যায়।‘
অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ভারত উপমহাদেশের তুলনায় ইংল্যান্ডে সুন্দরীদের ঘনত্ব বেশি। তাঁদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের লিখিত আকর্ষণ ছিল। এই অংশটুকুকে এড়িয়ে গেলে হবে?
নাকি যেটুকু দরকার সেটুকু নেবেন, বাকিটা ছক্কা?

সহায়ক সূত্র:
১. শাড়ী, প্রথম আলো: https://www.prothomalo.com/onnoalo/article/1611837/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BF