Saturday, May 30, 2009

সভ্যতার মৃত্যু


ঘটনাস্থল ইরাক। সাদ্দাম ক্ষমতাশীন।

ইরাকে টিভি-রেডিওতে যে আজান প্রচারিত হত তা ছিল সুন্নিদের আজান। শিয়াদের আজানে খানিকটা পার্থক্য আছে। একজন শিয়া বালক যখন তার বাবাকে জিজ্ঞেস করত, টিভি-রেডিওতে যে আজান প্রচারিত হয় তার সঙ্গে আমাদেরটার মিল নাই। তাহলে কী আমাদেরটা ভুল?
ওই বালকের বাবা তার সন্তানকে কেমন করে বোঝাবেন ভুল-শুদ্ধ পরের কথা। আসল কথা হচ্ছে গায়ের জোর। সুন্নি ভাবাপন্ন সাদ্দাম ক্ষমতায় তাই তাদের আজানই প্রচারিত হবে। জন্ম নেয় একেকটা বিষবৃক্ষ।

একজন শিয়া বলেন, "I know i am recist but i can't help it. আরবদের আমি ঘৃণা করি। এমন কী মুসলমানদেরও। আমি কোরান পড়ি না কারণ এটা আরবীতে লেখা। আমি ইসলাম মানি না কেননা ইসলাম আরবদের মাধ্যমে এসেছে"।
...................
ইরাকে, এক গভর্নরের ড্রাইভার রাগের বশবর্তী হয়ে একজনকে খুন করলে, অভিযোগ পাওয়ার ৩ দিনের মাথায় ওই ড্রাইভারের ফাঁসির আদেশ হয়। প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হবে। দলে দলে লোকজন আসল। বাদাম টাইপের কিছু চিবাতে চিবাতে ফাঁসির অনুষ্ঠান উপভোগ করল।

এখানে যেটা করা হয়েছিল, ওই ফাঁসি দেয়া অনুষ্ঠানে, ওই ড্রাইভারের বউ এবং নাবালক বাচ্চাকে বাধ্য করা হয়েছিল পুরো অনুষ্ঠানটা প্রত্যক্ষ করতে।

সাদ্দাম হোসেন কারণে-অকারণে হাজার-হাজার শিয়াকে হত্যা করেছেন। সেগুলো নিয়ে না-হয় আলোচনায় গেলাম না। কিন্তু পিতার সন্তানকে এই দৃশ্য দেখতে বাধ্য করা, আমার মতে, একটি সভ্যতাকে থামিয়ে দেয়া। সাদ্দামের নামাজপড়া অবস্থায় ছবি নিয়ে বাংলাদেশের মানুষদের অনাবশ্যক কৌতুহল লক্ষ করেছিলাম। শুনতে পাই, সাদ্দামের কাছে সর্বদা একটা কোরান থাকত। আমার ধারণা, এটা তিনি শো-পিস হিসাবে বগলে রাখতেন। বা কখনও-সখনও চুমু দেয়ার জন্য। পড়ার জন্য না।
কোরান পড়লে অবশ্যই এটা তার নজরে পড়ত,
"...নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্য করা হেতু ব্যতীত কেউ কাউকে হত্য করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করল..."। (৫ সুরা মায়িদাঃ ২৭-৩২)

ইরান, সৌদিসহ তথাকথিত মুসলিম উম্মাহ এই দোষে দুষ্ট। এরা সভ্যতার মৃত্যু ঘটায়। অন্য ধর্মের এরা আবার বাড়াবাড়ি রকমের চালাক। এরা সভ্যতার মৃত্যু ঘটায় খানিকটা বুদ্ধি করে।

ছবিসূত্র: ISNA/PHOTO: ALIREZA SOTAKBAR (ঘটনাস্থল ইরান)।

Thursday, May 28, 2009

বেশি আলো-নিকষ কালো!




যে ১৩ (অন্য সূত্রমতে ১০ বছর) বছরের বালক মুক্তিযুদ্ধে গ্রেনেড মেরে পাক-আর্মির বাঙ্কার উড়িয়ে দিয়েছিলেন। যে বালকটিকে কোলে নিয়ে জনাব, শেখ মুজিবর রহমান গর্বের সঙ্গে ছবি উঠিয়েছিলেন। সেই বালক, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সর্বকনিষ্ঠ বীর প্রতীক, শহিদুল ইসলাম লালু (তাঁর প্রতি সালাম) মারা গেছেন। আমি তো বলব, তিনি মরে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন। ভাগ্যিস, সুরুয মিয়ার মত লালুকে (তাঁদের প্রতি সালাম) আত্মহত্যা করতে হয়নি!

মানুষটা আমাদের বড় যন্ত্রণা দিচ্ছিলেন। যখন লালুকে নিয়ে ওই লেখাটা লিখি তখন আমার কাছে তেমন বিশেষ তথ্য ছিল না। সম্বল কেবল আফতাব আহমদের তোলা সেই ছবিটি।
পরে অনেকটা সহযোগীতা করেছিলেন অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসি মাহবুব সুমন। সুমনের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

লালু তখন মিরপুরে একটা চা-র দোকান চালান। খাবারের বড় কষ্ট! পশুর ন্যায় জীবনযাপন- হায়রে জীবন!
অভাগা দেশ, এখানে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের রাবনের গুষ্ঠির প্রতিদিন ১২২ জনের খাবারের ব্যবস্থা হয়, হয় না কেবল লালু নামের অগ্নিপুরুষদের! একজন দুর্ধর্ষ কমান্ডো ঠেলা চালান এতে আমাদের কোন লাজ-বিকার নাই!

একটা দেশকে প্রথমেই চেনা যায় সেই দেশের এয়ারপোর্টে নেমে আর একটা জাতিকে চেনা যায, সে তার সেরা সন্তানদের কেমন সম্মান করে তার নমুনা দেখে।

শহিদুল ইসলাম লালুর মৃত্যুর খবরটা প্রথম আলো ছাপিয়েছে, ২৬ মে, ২০০৯। বিজ্ঞপ্তি আকারে, ১৯ পৃষ্ঠায়, সিঙ্গেল কলামে, ছোট্ট করে। আজকাল প্রথম আলোর অনেক কিছুতেই অবাক হই না- না ছাপালেও বিস্মিত হতাম না। কিন্তু তাই বলে বিজ্ঞপ্তি আকারে- হা ঈশ্বর!
এরা সম্ভবত এদেশের সেরা সন্তানদের তাচ্ছিল্য করে পাশবিক আনন্দ পান নইলে ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের সঙ্গে একই ঘটনা।
আহারে, এদের জায়গার কী সঙ্কট! সংসদে, কোন নেতা কী কালারের শাড়ি পরে এসেছেন, কোন নেতার শাড়ির পাড় কী কালারের এইসব অতি জরুরি খবর ছাপিয়ে পত্রিকায় জায়গা কোথায়? অবশ্য বিজ্ঞাপনের নামে এদের দিয়ে যে কোন কাজ করিয়ে নেয়া সম্ভব! শেরাটনের বলরুম ব্যতীত এরা আবার মুক্তিযুদ্ধের কথা গুছিয়ে বলতে পারেন না।

৩০০ বাংলাদেশি নিয়ে ট্রলার ডুবে যায়, এই খবরটা আসে পেছনের পাতায়, হেলাফেলা করে। এ আর বিচিত্র কী- যে দেশে প্রাণের মূল্য কেজি দরে। পত্রিকা আলাদা করে মূল্যায়ন করবে কেন! কিন্তু জাঁক করে এটা বলারও প্রয়োজন নাই, আমরা হেন, আমরা তেন। বাস্তবে, যাহা ইনকিলাব তাহাই প্রথম আলো- লাউ আর কদু; আমরা শ্লা বদু।

প্রথম আলো ভুলভাল তথ্য আমাদের একের পর এক দিতে থাকবে আর আমরা বিমলানন্দে গলাধঃকরণ করব, হলাহলকে লাড্ডু ভেবে। এই না হলো আমাদের হলুদাভ মিডিয়া- মুক্তচিন্তার দৈনিক।
এখন পত্রিকাটি পণ করেছে, দেশে আলো জ্বালাবে, অন্ধকার ঝেটিয়ে বিদায় করবে। "নিজেকে বদলাতে হবে আগে" ভাল উদ্যোগ সন্দেহ নেই কিন্তু নিজে দিগম্বর-নগ্ন থেকে অন্যকে কাপড় পরাতে যাওয়াটা কোন কাজের কাজ না। যে পত্রিকা ফটো-সাংবাদিকের নাম ছাপাতে কার্পণ্য করে । ভুল করার পরও যাদের সামান্য একটা মেইলের উত্তর দিতে বড্ড তকলীফ হয়, তাদের, আর যাই হোক এমন লম্বা লম্বা বাতচিত শুনতে ভাল লাগে না।

কীসব টাচি কথাবার্তা! প্রথম পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে, "আইলাও বাধা হতে পারেনি"। মানে হলো, ঘূর্ণিঝড় উপেক্ষা করে লোকজন পিলপিল করে ছুটে আসছে। নব্য হ্যামিলন আর কী! যায় য়দি যাক প্রাণ, করিবো স্বাক্ষর দান। আসলে নিজের ঢোল পেটাবার সময় হুঁশ থাকে না। ফাটে ফাটুক মোর ঢোল, তবুও সমাপ্ত করিব বোল। বোল বোল, হরিবোল!
২৪ মে, প্রথম আলোতে একটা ছবিতে দেখলাম, হাতি ছুটে চলে এসেছে। এদের ডাকে দেশের সুশীলরা ছুটে আসেন, হাতি কোন
ছার! আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, হাতি স্বাক্ষর দিতে ঝড়ের বেগে চলে এসেছে। হাতি লিখবে, 'আমি শপথ করিতেছি যে, কলা-বাগানের মালিকের অনুমতি না লইয়া, আমি এককিনি কলা-গাছও মুখে তুলিব না। এবং আমি শপথ ভঙ্গ করিলে হাতি সমাজের নিয়মানুযায়ী প্রচলিত আইনের যে কোন শাস্তি পা পাতিয়া নিব। স্বজ্ঞানে আমার এই শপথ প্রথম আলোর নিকট হাওলা করিলাম। ইহা নিয়া তাহারা বই বাহির করিতে চাহিলে আমার কোনরূপ আপত্তি টিকিবে না। সানন্দে পা-সহি দিলাম।'
খবরটা পড়ে দেখি, কাহিনি অন্য। হাতি এসেছে স্বাগত জানাতে, এসো, এসো হে, শপথ-যান!

*হুবহু এই লেখাটাই অন্য সাইটে দিলে, ওখানে একজন মন্তব্য করেন, "প্রথম আলো খারাপ বুঝলাম কিন্তু প্রথম আলো বাদে একটা ভালো পত্রিকার নাম বলেন?
...ইদানিং প্রথম আলোর গুষ্টি উদ্ধার করা একটা ফ্যাসনে পরিনত হইছে।সস্তার ইন্টানেট পাইয়া বাসায় বইসা বইসা কি-বোর্ডে ঝড় তোলাও এক ধরনের ভন্ডামী ...পোস্টের লেখক পোস্ট টা দিয়ে হাওয়া, আর ওনার প্রথম আলোর সাথে ব্যক্তিগত কোন সমস্যা আছে সেটা পোস্ট পড়েই বোঝা যায়। ...আমার ধারনা পোস্টদাতা একজন সাংবাদিক অথবা সংবাদ পত্রের সাথে জরিত। "

অনলাইনে লেখালেখির এই এক যন্ত্রণা। এইসব 'এক কাপ চায়ে দুকাপ চিনি' টাইপের মানুষদের নিয়ে বড় সমস্যা হয়ে যায়। আজকাল আর যন্ত্রণা ভাল লাগে না। শান্ত থাকাটা বড় কঠিন হয়ে পড়ে! লিখে জনে জনে ব্যাখ্যা দাও, বকের ন্যায় এক পায়ে অন লাইনে বসে থাকো। এটা জার্মানি না যে বছরের পর বছর ধরে পাওয়ার যায় না। ডিজিটাল বিদ্যুতের কাহিনি এদের কে বাঝাবে?

তবুও ঘোর অনিচ্ছায় লিখতে হয়েছিল:

"ডিয়ার ...,
এই পোস্টের সহায়ক কিছু লিংক দেয়া হয়েছিল। আপনি সম্ভবত লক্ষ করেননি! প্রথম আলো নিয়ে যেসব অসঙ্গতি-ভুলের কথা আমার পোস্টে করা হয়েছে; এগুলো নিয়ে, আমার লেখার ভুল উল্লেখ করলে আমার সুবিধা হতো। আমার ভুল স্বীকার করতে লাজ নাই, আছে কৃতজ্ঞতা। আপনি তা না করে কঠিন কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন।

আপনার প্রশ্নটার উত্তর একটু অন্যভাবে দেই।
আমাদের দেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তাদের বিরুদ্ধে দূর্নীতি-অত্যাচার নিয়ে কথা উঠলে তারা কমন একটা উত্তর দেন। সেটা হচ্ছে, আগের সরকার আমাদের চেয়েও বড় চোর ছিল। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আগের সরকার অনেক বড় চোর ছিল। তো? তাহলে কী বর্তমান সরকারের দূর্নীতি-চুরি নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা যাবে না? নাকি কোন আইনের আওতায় এটা আসবে না? ধরে নিলাম, আর কোন ভাল পত্রিকা নাই তাহলে কী প্রথম আলোর কোন অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না?

ব্লগিং এখন অসম্ভব শক্তিশালি মাধ্যম। যারা বইও লিখেন, অনলাইনে লেখালেখিও করেন তারা বলতে পারবেন ব্লগিং বা অনলাইনে লেখালেখির শক্তি কতটা দানবীয়!
অন্য একটা উদাহরণ দেই। ইরান-ইরাক কট্টর-অসভ্য দেশ। এখনও প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়, লোকজনরা সিনেমা দেখার মত দলে দলে ফাঁসির অনুষ্ঠান উপভোগ করে! ছোট-ছোট বাচ্চাদের ফাঁসি দেখানো হয়, দেখতে বাধ্য করা হয়। এতে যে একটা সভ্যতার মৃত্যু হয় এটা এদের কে বোঝাবে?
কিন্তু ইরাকের মত একটা দেশের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজা ২০০৬ সাল থেকে ওয়েবলগ লেখা শুরু করেন। এই দেশটি যে কালে কালে পৃথিবীর মানচিত্রে বিশেষ একটা জায়গা করে নেবে এতে অবাক হওযার কিছু নাই।
এখানে এই প্রশ্ন উত্থাপন করার অবকাশ নাই তিনি প্রেসিডেন্ট হিসাবে কী বিনে পয়সায় নেট ব্যবহার করেন নাকি চুরি-চামারি করে।

‘দি সান’ পত্রিকাটির ২০০২ সালেই পাঠকসংখ্যা ছিল ৩৫ লক্ষ। বৃটেনের সর্বকনিষ্ঠ গ্রাজুয়েট ১৩ বছরের একজনকে ১ দিনের জন্য ওই পত্রিকার সম্পাদক করা হয়েছিল। ওই দিন ১ দিনের সম্পাদকের ইচ্ছানুযায়ী পত্রিকাটি বের হয়। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ যেটা বুঝতে চেয়েছিলেন নতুন সম্পাদকের ভাবনা। ফাঁকতালে নতুন কিছু যদি শেখা যায়। কারণ কোন নিউজ কোন পাতায় যাবে এই পত্রিকার এই সেন্সটুকুই নাই!

তো ধরুন, আপনাকে ১ দিনের জন্য প্রথম আলোর সম্পাদক বানিয়ে দেয়া হল। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আপনি কী চাইবেন, এই দেশের একজন সেরা সন্তান, একজন অগ্নিপুরুষের শেষ বিদায়ের খবরটা বিজ্ঞপ্তি আকারে ছাপাবেন, ভেতরের পাতায় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে? আপনি কী প্রথম পাতা এসব লিখে ভরাবেন? সংসদে কোন নেতা কী রঙের শাড়ি পরে এসেছিলেন, কোন নেতার শাড়ির পাড় কী রঙের ছিল?
চাকুরির খোঁজে, এই দেশের ৩০০ মানবসন্তান সাগরে ভেসে গেছে। এটা কী আপনি পেছনের পাতায় ছোট্ট করে ছাপাবেন? কেবল ৩০০ মানুষ তো না! একেকজন মানুষের সঙ্গে তার পরিবারের ৫জন সদস্য ধরলেও দেড় হাজার মানুষের আনন্দবেদনা কাব্য!
এখানে উল্লেখিত লিংক ব্যতীত প্রথম আলোর আরও ১০টা অসঙ্গতির লিংক আমি দিতে পারি। সেই বিশদে এখন যাই না। শপথ নিয়ে আমার আপত্তি না। আমার আপত্তি অন্যখানে। আপনি নিজের ঘর নোংরা রেখে গোটা দেশে ঝাড়ু দিতে বেরিয়ে পড়লে কেমন হয়? আপনি কী প্রথম আলোর বা এর সঙ্গে জড়িত কারও শপথবাক্য পেয়েছেন? তার মানে কী, এদের নিজেদের শপথ করার ভাবনা নাই- এদের নিজেদের বদলাবার কিছু নাই।
এরা তথ্য বিক্রি করে। আমরা পাঠক তথ্য কিনি। কেউ কারও মাথা কিনে নিচ্ছে না। পাঠকেরও আছে তার তথ্য পাওয়ার অধিকার। আপনি দুম করে হররোজ ছেপে দিলেন, আজ অনলাইন পাঠকসংখ্য ৭ লাখ। এখন পাঠক হিসাবে আমি কি এ প্রশ্ন করতে পারব না, এটা কী পাঠকসংখ্যা নাকি ক্লিক সংখ্যা? একজন পাঠক পত্রিকাটি পড়তে গিয়ে ২৫ বার ক্লিক করলে এটা কী ২৫বার ধরা হবে, নাকি ১ বার? এটা নিয়ে পাঠক জানতে চাইতেই পারে।
আমার লেখার ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা করলেই ভাল হত। 'পোস্ট দিয়ে হাওয়া…' এটা লিখে আপনি আমাকে অহেতুক আক্রমন করলেন। এর কোন প্রয়োজন ছিল না। একজন মানুষের কত ধরনের সমস্যা থাকতেই পারে- একজন মানুষ পোস্ট দিয়ে অনলাইনে ঠায় বসে থাকবে এটা কোন ধরনের যুক্তি হল? আর আমি পত্রিকার সাংবাদিক, না পত্রিকার চাপরাসি এই বিষয় এখানে শেয়ার করার আগ্রহ বোধ করি না। ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার মন্তব্যর জন্য।"

*ছবিঋণ: প্রথম আলো

Wednesday, May 27, 2009

শেখ আবদুল হাকিম, ভার্চুয়াল করকমলেষু

একটি মাসিক পত্রিকা, 'রহস্য পত্রিকা'। মূলত এটায় অধিকাংশই অনুবাদ লেখা ছাপানো হয়। এ মাসিক পত্রিকায় প্রায় প্রতি সংখ্যায় লেখা হয়, “আমরা পাঠকদের কাছে লেখা আহ্বান করছি। গল্প, উপন্যাস ও বিচিত্র মজার ফিচার পাঠান।”
পতঙ্গ যেমন আগুন দেখে মুগ্ধ হয়, সম্মোহিত হয়ে চোখ বুজে (চোখ খোলা থাকলে ঝাঁপ দেয়ার কথা না) আগুনে লাফিয়ে পড়ে। তেমনি এই অখ্যাত লেখক এদের আহ্বান শুনে লাফাতে লাফাতে পত্রিকা আফিসে হাজির হলেন। এত দিন এ লেখক বড় বিব্রত বোধ করছিলেন। ইনি যে জিনিসটা নিয়ে অসম্ভব মানসিক কষ্টে ছিলেন, সেটা একটা উপন্যাস।

এ বিশাল দেশে গোটা একটা উপন্যাস চিবিয়ে হজম করতে পারে এরকম পত্রিকা নেই বললেই চলে, হাতেগোনা কয়েকটা। তা ছাড়া মার্কেট ভ্যালু তেমন নেই। উপন্যাস লিখে দু-এক জনই টাকার বস্তার উপর শুয়ে নাক ডাকছেন। অন্যরা তাঁদের বই বিয়ে- জন্মদিনে উপহার দিয়ে উদাস গলায় বলেন, বইয়ের উপর কোন গিফট নাই। অবশ্য কবিতা-টবিতার মার্কেট ভ্যালু আরো খারাপ (উইপোকারা কবিদের বদান্যতায় কৃতজ্ঞ হচ্ছে এবং মোটাসোটা হয়ে আমজাদ খান না হউক পিঁপড়ার সমান হয়ে যাচ্ছে)। তবে বাংলাদেশে ‘কাকের সংখ্যা বেশী নাকি কবির সংখ্যা’ এটা গবেষণার বিষয় হলেও পত্রিকায় কবিতা ছাপানোর সুযোগ প্রবল।

এই অখ্যাত লেখক এক শীতের সকালে তিতিবিরক্ত হয়ে ভাবছিলেন, আহ, পান্ডুলিপিটা দিয়ে চা বানিয়ে খেলে মন্দ হয় না। তো এরকম আহ্বান শুনে স্বস্থির নিঃস্বাস ফেলে উদ্বাহু নৃত্য করতে গিয়ে একটুর জন্য ছাদে মাথা ঠুকল না। এ ছাদের দূর্ভাগ্য না মাথার, কে জানে! সহকারী সম্পাদকের সামনে প্রায় দ্বিগুণ হার্টবিট নিয়ে হাজির হলেন (সম্পাদকের দেখা পাওয়ার চেয়ে নাকি চাঁদে যাওয়া সহজ)।
শেখ আবদুল হাকিম। ডিগডিগে শরীরের ইনি হড়বড় করে বললেন, কি ব্যাপার, কি জন্য এসেছেন?
জ্বী, আমি একটা লেখা নিয়ে এসেছি, মাখনের মতো গলে গিয়ে বললাম।
কি ধরনের লেখা?
উপন্যাস। একটু কাইন্ডলী দেখবেন।
রহস্য উপন্যাস?
জ্বী না, রহস্য উপন্যাস না।
রেখে যান। ঢাকায় থাকেন তো, যোগাযোগ রাখবেন।
ইয়ে, মানে আমি ঢাকার বাইরে থাকি। আপনি বলে দেন কখন যোগাযোগ করব।
মাসখানেক পর খোঁজ নেবেন। এরিমধ্যে আমি এটা পড়ে দেখব।

দেড় মাস পর খোঁজ নিয়ে জানলাম, ইনি সপ্তাহে তিন দিন অফিসে আসেন: রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতি- দূর্ভাগ্যক্রমে আজ এ তিন দিনের এক দিনও না। এদের অফিসের সামনের চৌবাচ্চায় পোষা বাহারী মাছ। মাছরা বিভিন্ন সার্কাস দেখাচ্ছে, মুগ্ধ করার অপচেষ্টা। মুগ্ধ হওয়া দূরের কথা, এ মুহূর্তে ইচ্ছে করছে এদের ধরে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে, লবন ছাড়াই।
বেশ ক-বার ঘোরাঘুরি করে সহকারী সম্পাদক সাহেবকে ধরা গেল।
রাশভারী গলায় বললেন, কি ব্যাপার, কি জন্য এসেছেন?
সরি, আপনাকে ডিস্টার্ব করছি, একটা উপন্যাস জমা দিয়েছিলাম।
অ, বাইন্ডিং করা ওই খাতাটা তো। ওহ হো, আমি দেখতে পারিনি।

হন্তদন্ত হয়ে পিয়ন এসে বলল: স্যার বুলায়।
সেই যে গেলেন ঘন্টাখানেক পর এলেন। এতোক্ষণ বসিয়ে রাখার জন্য দুঃখ প্রকাশ করার মতো অসৌজন্যতা দেখানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না।
সম্ভবত অখ্যাত লেখকদের মতো পাগল-ছাগলদের এসব বলার নিয়ম নাই।
স.সম্পাদক (শেখ আবদুল হাকিম) চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন: আপনি আমাকে কাহিনীটা বলেন তো।
আমার মাথায় সব কেমন জট পাকিয়ে গেল, আকাশ পাতাল হাতাতে লাগলাম। অবশেষে ক্ষীণ গলায় বললাম, সরি, আমি ভালো বলতে পারি না- গুছিয়ে বলা আমার পক্ষে তো সম্ভব না।
কয়েক পাতা উল্টেপাল্টে রাগী গলায় বললেন, এতো ফাঁক ফাঁক করে লিখেছেন কেন, এসব কী!
জ্বী, এখন তো এভাবেই লিখা হচ্ছে।
কোথায় দেখেছেন এরকম লিখতে, কারা লিখছে?
কয়েকজন দুঁদে ঔপন্যাসিকের নাম করতেই ওঁর শরীরে অদৃশ্য আগুন ধরে গেল। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, তারা যা লিখে তা কি সাহিত্য, সর্দি মুছে ফেলে দেয়ার জিনিস! এরা ফটকাবাজের দল। অল্প লিখে পাঠকদের কাছ থেকে বেশী পয়সা নিচ্ছে।

অফিসে আরেকজন অনুবাদ লেখকের আগমন। এরা দু’জন চোখ মুখ সিরিয়াস করে আলাপে মশগুল হয়ে গেলেন। অল্প সময়ে টরটর করে যে বাণীগুলো দিলেন, সংক্ষেপ করলে তা হবে এরকম, মৌলিক সাহিত্য লেখা তেমন কোন ব্যাপার না। বাঁ হাতে এমন কি ভাঙ্গা হাতেও তরতরিয়ে লেখা যায়। কিন্তু অনুবাদের ব্যাপারটা খুবই দুরূহ; ঘিলু বলে, থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে।

আমি এইসব অনেক বিষয়েই একমত না, কিন্তু এ নিয়ে পত্রিকা যারা চলান এদের সঙ্গে তর্ক করার প্রশ্নই আসে না। লেখালেখির ভূবনে এরা হলেন দ্বিতীয় ইশ্বর। তো, ঈশ্বরগোছের কারো সঙ্গে আর যাই হোক হাসি-ঠাট্টা, তর্ক চলে না।

*'একালের প্রলাপ' থেকে

Monday, May 25, 2009

তাতা থৈ থৈ

"...নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু, পাছে পাছে
তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ...।"
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ শ্রাবনগাথা)

নাচে রেশমি, নাচে নার্গিস, নাচে আইলা...নাচে আইলা রে।
কোন এক উপ-কথায় পড়েছিলাম। এক লাস্যময়ী নাচুনের নাচ ছিল লা-জবাব! যে তার নাচ দেখত সে আর বাঁচত না। তবুও তার নাচ দেখার লোকের অভাব হত না! ভয়ংকর সম্মোহনী নাচ বলে কথা!

রেশমি, নার্গিস,
আইলা এরাও যেমন তেমন নাচুনে না- আইলাকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে আছি, কেমন নাচা নাচে। এরা সাধারণ নর্তকি না, বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একেকটা ঘূর্ণিঝড়ের নাম। একেকটা ঘূর্ণিঝড় দেশের উপর দিযে বয়ে যায়- গোটা দেশ লন্ডভন্ড করে তার ছাপ রেখে যায়।
আল্লা মালুম, কার উর্বর মস্তিষ্ক থেকে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের এমন নাম বেরিয়েছে? তাকে পেলে খোলা মাঠে এদের নাচ দেখার জন্য বসিয়ে দিতাম। বাওয়া, বইসে বইসে নাচ দেখো আর মাথা দোলাও।

অনেকে উদাস হয়ে কোথাও থেকে কোট করবেন, বলবেন, বাপু, নামে কী আসে যায়।
তাও ঠিক। কিন্তু ধরুন, আপনাকে একজন বিমর্ষ মুখে বলল, জানেন, আজ না টুনটুনি আসছিল।
আপনি গুরুত্বহীন ভঙ্গিতে বললেন, তো?
টুনটুনি হচ্ছে একটা বুলডজারের নাম। এই বুলডজার সব ভেঙ্গে সাফ করে দিয়েছে। বা, আপনি একটা হাড় জিরজিরে কুত্তার নাম রাখলেন, বাঘা। এই নিয়ে অনেকের হাসির উদ্রেক হয়ে বলে বসলেন, 'ছাল উডা কুত্তা, বাঘা তার নাম'। ভাবুন দেখি, বড় একটা গোলমাল হয়ে যায় না?

*যখন এ পোস্ট লিখছিলাম, তখন পর্যন্ত প্রায় নিশ্চিত ছিলাম, আইলা খুব একটা ভয়ংকর হয়ে উঠবে না। কিন্তু আমার ধারণা ভুল, ঠিকই সে তার নৃশংসতার ছাপ রেখে গেছে। এবং বরাবরের মত যা হওয়ার তাই হলো। কোন ধরনের প্রস্তুতি সরকারের ছিল না।
মিশন পসিবল ব্যতীত এতো মৃত্যু রোখা যাবে না। নতুন করে এইসব লিখতে ইচ্ছা করছে না। ফি বছর লোক মরবে আর প্রতিবার আমার মত শস্তা কলমচী কলম চালাবে, এটা হয় না।
.........



*
সিডরের, ইউটিউবের, এই ভিডিও ক্লিপিংস অলৌকিক হাসানের ব্লগ থেকে নেয়া।
**ছবিসূত্র: রাশেদ মাহমুদ, প্রথম আলো

Sunday, May 24, 2009

তালেবানদের কী দোষ?

তালেবানদের নিয়ে আমরা খামাখাই কালির অপচয়, হালের কী-বোর্ড নিয়ে ধস্তাধস্তি করি! হুদাহুদি!
দেশে এমন ঘটনা অতীতে আমরা পড়েছি, এখনও পড়ি, ভবিষ্যতেও পড়ব। ইনশাল্লাহ।

'বাংলা হবে আফগান' এই শ্লোগান যারা দেয় এরা আস্ত নির্বোধ। বাংলা আফগান হবে কেন? বাংলা তো আফগান হয়েই আছে। আমি তো বলব, ছাড়িয়ে গেছে।

দাউদকান্দিতে এক মেয়েকে ৩৯টি দোররা মারা হয়েছে। আমি নিশ্চিত না, দোররা মারার কথা কী ৩৯, না ১০০? ১০০ হয়ে থাকলে এটা অনুচিত হয়েছে। কেবল ৩৯টা মেরেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

যাক গে, এখন এইসব খবর আমাদের তেমন বিচলিত করে না। বিচলিত হচ্ছি অন্য কারণে। ওসি সাহেবের বক্তব্য নিয়ে আমার কিছু কথা আছে।
দাউদকান্দি থানার ওসি সাহেব বলেছেন (ইনাদের নাকি এখন প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দেয়া হবে), "বিষয়টি পুলিশের জানা ছিল না। কেউ অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে"। (আব্দুর রহমার ঢালী, প্রথম আলো, ২৪.০৫.০৯)

পুলিশের জানা ছিল না! না-জানলে কী আর করা। আসলে আমরা সবাই ভুল রোলে অভিনয় করছি। এই সাংবাদিকের হওয়া প্রয়োজন ছিল পুলিশের কর্মকর্তা অথচ বেচারা হলো সাংবাদিক। কী আর করা, এইই আল্লার দুনিয়ার বিচার!

বেশ, যা হোক। কেউ যদি অস্ত্র নিয়ে (সেটা মেটাল না চামড়ার সেই তর্কে যাচ্ছি না) প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, কাউকে আহত করে, অপদস্ত করে, আর কেউ যদি অভিযোগ না করে, তাহলে দেখছি আইনের কোন সমস্যা নাই। বাহ, বেশ তো। আমিও ভাবছি, কোন একটা অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ব। যাকে সামনে পাব তাকেই আল্লাহু আকবর। এবং আমি অবশ্য এও লক্ষ রাখব, অভিযোগ করার জন্য যেন সংশ্লিষ্ট কেউ বেঁচে না থাকে।

Saturday, May 23, 2009

অ-মানুষ!

দুটি বিচ্ছিন্ন সত্তা- মানব মানবীকে ঘিরে কী অপার্থিব রহস্য!

একদিন অপাপবিদ্ধ ভুমিষ্ঠ শিশু প্রাণপণে চেঁচিয়ে ওঠে। মানব মানবী বিস্ময়ে অভিভূত হয়, এই, এই তাহলে রহস্য! ছোট্ট একটা শেকড় ক্রমশ বিস্তৃত হয় জ্যামিতিক হারে, ছেয়ে ফেলে সবকিছু। মহাবিশ্বের সমস্ত কর্মকাণ্ড এই বিশাল শেকড়কে ঘিরে।

পৃথিবীতে এক ধরনের জীব নিয়ে মানুষ খানিকটা সমস্যায় পড়ল। এরা না মানুষ, না জন্তু, না জড় পদার্থ- কি নামে পরিচিত হবে এরা? মানুষ অনেক মাথা খাটিয়ে এঁদের নাম দিল, হিজড়া-ক্লীব-নপুংসক। এক নিঃসঙ্গ পরিত্যক্ত শেকড়, যাদের নিয়ে কোনো রহস্য নেই- এদের কোন শেকড় নেই! পৃথিবীর এই বিশাল রঙ্গমঞ্চে কি ভূমিকায় এরা নিষ্ঠার সঙ্গে অভিনয় করছে, কে জানে? যে জানে, তাঁর এইসব বিষয় নিয়ে আলোচনায় আগ্রহ নাই।
তাই জানা হয় না, কেনই বা পৃথিবীতে অবহেলা ভরে এঁদের ছুড়ে ফেলা হয়েছে! প্রবল আশা, প্রকৃতির কোন সৃষ্টিই অযথা হয়নি, নিশ্চয়ই কোন না কোন কারণ রয়েছে। থাকতে বাধ্য।

সৃষ্টিই যাদের কুৎসিত কৌতুক, সেরা জীব মানুষ ফেলনা এইসব অ-মানুষদের নিয়ে ব্যঙ্গ করবে এ আর আশ্চর্য কি! আমাদের কী আনন্দই না হয় এঁদের দেখে। ছায়াছবিতেও এঁদের ছায়া দেখে আমরা দর্শক, একজন আরেকজনের গায়ে হাসতে হাসতে ঢলে পড়ি। আহা, এমনটা হবেই না কেন? পৃথিবীতে এঁদের কোনও ভূমিকা নির্দিষ্ট নেই বলে কি মানুষ হাসাতেও ভূমিকা থাকবে না!

এমনই এক অ-মানুষের সঙ্গে কথোপকথন। এঁদের গলার স্বর অত্যন্ত কর্কশ, সম্বোধন তুই তুই করে, প্রকাশ ভঙ্গি উগ্র। কথোপকথন খানিকটা মার্জিত আকারে এবং খানিক ভাবানুবাদে (ইনি যখন উপর দিকে আঙ্গুল তোলেন তখন বুঝে নিতে হয়, উপরলোকের বাসিন্দার কথা বলা হচ্ছে) :
আপনার নামটা বলবেন?
অ-মানুষ: আমার নাম মিনু।

মিনু তো মেয়েদের নাম- ইয়ে মানে আপনি...?
অ-মানুষ: আমি মেয়ে না এটাই তো বলতে চান? এ নাম রাখা ঠিক হয়নি, এই তো? কিন্তু এই নাম রেখেছি। বেশ করেছি, আপনার কোনো অসুবিধা আছে? মিনু রাখতে পারব না, বলবেন আমরা মেয়ে না। মনা রাখলে আবার বলবেন ছেলে না। কি হওয়া উচিত ছিল আমার নাম; মন!

আপনারা নারীর মতো সাজগোজ করেন, এটা কেন?
অ-মানুষ : দেখেন, আমাদের প্রধান আয় হলো কোথায় কোথায় শিশু ভূমিষ্ঠ হচ্ছে খোঁজ খবর রাখা- নবজাতককে নিয়ে হইচই, নাচানাচি করা। এসব করে কিছু টাকা পাই। আমরা নারীর সাজ ধরে চট করে অন্দর মহলে ঢুকতে পারি, মহিলারা তেমন উচ্চবাচ্চ্য করে না। এমনিতে এখন তো শিশু জন্মের হার অনেক কমে গেছে- আয় তেমন নেই বললেই চলে। আগে একটা পরিবার ফি বছর বাচ্চা হতো। এখন কি সব বার্থ কন্ট্রোল-ফন্ট্রোল করে।

ছোট্ট, অত্যন্ত গরিব দেশ আমাদের। যে হারে মানুষ বাড়ছে, গিজগিজ করছে, এখনই ১৫ কোটি মানুষ এই দেশে। এই দেশে প্রায় তিরাশি ভাগ সৃষ্টির সেরা জীব পশুর ন্যায় জীবন যাপন করছে। বার্থ কন্ট্রোল না করলে চলবে কেন বলুন?
অ-মানুষ : এটা আপনাদের, মানুষদের সমস্যা, আমাদের না।

প্রঃ এ প্রশ্ন করার জন্যে আগেভাগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনাদের কাউকে কাউকে নিয়ে বখা ছেলেরা বিশেষ উদ্দেশ্যে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে। এরকম কিছু কথাবার্তা আমরা শুনতে পাই, এটা কতোটুকু সত্য?
অ-মানুষ : এটা যে পুরোপুরি অসত্য এমন না। শুধু বখা ছেলেরা না, বয়স্ক মহিলারাও অন্য রকম আগ্রহই দেখায়। কিন্তু বখে যাওয়া ছেলেরা নিজেরাও তো এমন কাণ্ড করে, করে না?

আমরা দেখি আপনারা দল বেঁধে চলাফেরা করেন। পেছনে থাকে আবালবৃদ্ধবণিতার আনন্দমুখর লম্বা মিছিল।
অ-মানুষ : আসলে আপনারা আমাদের নাম ভাঁড় রাখলেই পারতেন। আমাদের কোনো আনন্দ নাই। কেউ হাসি ঠাট্টা করে, খোঁচা মেরে আনন্দ পেলে পাক না। তবু তো আমাদের কিছুটা মিথ্যা অহংকার হয়, এই বিশ্ব সৃষ্টিতে নগন্য হলেও কাজে লাগছি।

এ জীবন আপনার কেমন লাগে?
অ-মানুষ : জীবন, এইটাকে আপনি জীবন বলেন? আমাদের কোনও ভবিষ্যৎ নাই, না আছে কারো প্রতি দায়বদ্ধতা। আমরা একেকজন মারা যাব কোন ছাপ না রেখেই। আপনারা তো সন্তান-সন্ততির মাঝে অমর হয়ে থাকবেন, আমরা কী? কেবল নরক যন্ত্রণার মাঝে বেঁচে থাকা।
মানুষ অতীত ইতিহাস থেকে না শিখুক আমাদের দেখে শিক্ষা নিতে পারত। ধারণা ছিল, এজন্যে আমরা আসছি। মানুষ যেন আমাদের দেখে, আর ভাবে, তারা কী সুখের জীবন-যাপনই না করছে।
অসম্ভব কষ্টে লাগে, ব্যথিত হই, যখন দেখি সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ ইচ্ছে করে যেসব হারাচ্ছে, পায়ে ঠেলছে, তা শ্রেষ্ঠ সময়ের অপচয়, কী কুৎসিত অপচয়! আহা, আহা রে!
তারপরও আমি বলি, কী চমৎকার আমার এ জীবন- ভাল লাগার অসংখ্য উপকরণ ছড়িয়ে আছে চার পাশে! জীবনটা মন্দ না, কী বলেন?

Thursday, May 21, 2009

শত কষ্টেও হাত ছাড়ব না তোমার

এ দৃশ্য এখন বিরল। ভাইসাবের ইস্তারি(!) সাহেবা গেছেন নাইয়রে। কী অমায়িক বিশ্রাম!



বিবাহ করার পূর্বে তিনি যে শখের বাড়িটা করেছেন, দরোজা দেখে তা সহজেই অনুমেয়!



বিবাহ করতে হবে, বাড়ি করতে হবে- কত বায়নাক্কা! এই বায়নাক্কা সামলাতে গিয়ে টাকা প্রয়োজন বেশুমার। তাই মানুষটা গাছগুলো গোড়াসুদ্ধ কেটে ফেলেছে। প্রকৃতির সন্তানরা প্রকৃতিকে ভুলে যায় অবলীলায়। কিন্তু প্রকৃতি-বৃক্ষপিতা, অপার তার পিতৃস্নেহ, ইচ্ছা হলেই কী চট করে সন্তানদের হাত ছেড়ে দেয়া যায়!

Wednesday, May 20, 2009

তবুও একজন শফিক রেহমান

 
শফিক রেহমান, মানুষটার রসময় গুপ্ত নামে যথেষ্ঠ কুখ্যাতি ছিল।
যাযাদির বিশেষ সংখ্যাগুলোতে এমন কিছু আদিরসাত্মক গল্প ছাপা হত যা পড়ে শরীর ছমছম করত- শরীর তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলত।

আমি কেবল শফিক রেহমানকে দোষ দেই না- এই দেশের অনেক বড় বড় লেখক এই দোষে দুষ্ট! এঁরা যখন অহেতুক শরীরে শরীর ঠোকাঠুকির অন্তরঙ্গ বর্ণনা দেন, এমন বিস্তারিত লেখেন, যেন প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের এই সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান নাই!
এঁদের ধারণা, পাঠক শিশুতুল্য, ব্রেন বলতে কোন জিনিস এদের নাই, বা পাঠক ফ্লাওয়ার-ভাসে ব্রেন জমা রেখে তাঁদের লেখা পাঠ করতে বসেন।

এঁরা এটা কেন বিস্মৃত হন, একেকজন পাঠক মাত্রই একেকটা চলমান ক্ষুর। পাঠক বেচারা তার ভাবনাগুলো গুছিয়ে লিখতে পারেন না বা আলস্য বোধ করেন বলেই অন্যজনের (লেখকের) চোখ দিয়ে দেখেন।

শফিক রেহমানের আরেকটা ভয়াবহ রকমের বাড়াবাড়ি ছিল, সব কিছু নিয়ে কুৎসিত রসিকতা করা। ভিনসেন্ট পিউরিফিকেশনের নামে যা তা রসিকতা। একবার দিলেন এমন, মাস্তান নামের অসভ্যরা ইডেন কলেজের কিছু ছাত্রীর জামা ছিঁড়ে ফেলেছিল, ভেতরের অন্তর্বাস দেখা যাচ্ছিল। শফিক রেহমান এই ছবিটার পাশে বোম্বের ব্রা প্রদর্শনীর একটা ছবি দিয়ে কুৎসিত রসিকতা করার চেষ্টা করেন। এখানে এসে এই মানুষটার বুদ্ধিশুদ্ধি নিয়ে সংশয় জাগে।

এরই মাঝে আবার বানান নিয়ে পড়লেন। ক্রিকেটকে কৃকেট, ব্রিটেনকে বৃটেন এইসব শব্দ পরিবর্তনের জন্য ধস্তাধস্তি অনেকের ভাল লাগেনি। আমারও। কিন্তু মানুষটার পড়াশোনা, রুচি বোধ এক কথায় অসাধারণ!

তবে মানুষটার কিছু সদগুণের কথা না-বললে অন্যায় হয়।
যাযাদিন পত্রিকায় অনেক বৈচিত্র এনেছিলেন। আমার মতে, আমাদের সম্পাদক মহোদয়গণের ওখানে গিয়ে কিছু শিখে আসা প্রয়োজন ছিল। একটা মনে পড়ছে। প্রথম পাতায় বক্স টাইপের ছোট্ট একটা জায়গা থাকত। শেষ মুহূর্তের কোন আপডেট, ভুল স্বীকার করার জন্য। এটা খুব জরুরি।

তাঁর এবং মুহম্মদ জাফর ইকবালের হরতাল নিয়ে এক লেখায় আমি খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হলো, দু-জগতের এই দুজন মানুষ এমন ভাবনা পোষণ করে অন্যায় করছেন।
নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করায় জাফর ইকবালের তো কথাই নেই। আর শফিক রেহমান এক নির্বাচনের পূর্বে নতুন প্রজন্মকে অভাবনীয় প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন।

হরতালে আমার নিজেকে মানুষ বলে মনে হতো না! হরতাল নিয়ে আমার যে বইটা প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৫ সালে, 'কয়েদী'। তখনই আমি এই 'কয়েদী' বইটা শফিক রেহমান এবং জাফর ইকবালকে পাঠিয়েছিলাম, সঙ্গে চিঠি। চিঠির বিষয়বস্ত সবটা আজ মনে নাই। মূল বিষয় ছিল, 'আপনাদের এই বক্তব্যে আমি ক্ষুব্ধ এবং আপনাদের হাতের লেজার গান দিয়ে আপনারা পাখি শিকার করছেন'।

পরে ভুলে গেলাম। প্রায় এক বছর পর শফিক রেহমান এই চিঠিটা পাঠালেন। আমার মত সাধারণ একজন মানুষকে হতভম্ব করে দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ! অন্তত এক বছর ধরে চিঠির উত্তর দেয়ার দায়িত্বটা কাঁধে বয়ে বেড়ানো, এও তো কম না!

অনেকেই বলবেন, এটাই তাঁর স্টান্টগিরি, কৌশল। বেশ, এই কৌশলটাই আমাদের অন্য সম্পাদকরা মহোদয়গণ করে দেখিয়ে দিক না! নামে কেবল মুক্তচিন্তা বলে হইচই করলেই হয় না- ইনাদের, ইনাদের চ্যালা-চামুন্ডাদের তো একটা মেইল পড়ার, উত্তর দেয়ারও সময় নাই!

শফিক রেহমানের বিশেষ একটা দলের প্রতি আনুগত্য হেতু মেরুদন্ড
হয়ে যায় জেলির মত কিন্তু এমনটা নাই এই দেশে এমন ক-জনকে খুঁজে পাওয়া যাবে? শফিক রেহমানদের মত মানুষরা ভুল জায়গায়, ভুল ভাবনা আঁকড়ে থাকেন বলেই মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এ প্রজন্মের বড় ক্ষতি হয়ে যায়। আমাদের দেশে স্বপ্নবাজের বড়ো অভাব!

*এখানে তাঁর সবচে বড় অবদানের কথা উল্লেখ করিনি সেটা হচ্ছে পাঠককে লেখক বানাবার জন্য তাঁর আপ্রাণ চেষ্টা, সবিরাম।
পত্রিকাওয়ালাদের পাঠকদের প্রতি থাকে প্রচ্ছন্ন তাচ্ছিল্য। এদিক দিয়ে শফিক রেহমান ব্যতিক্রম। তাঁকে লেখক বানাবার মেশিন বললে অতিশয়োক্তি হবে বলে আমার মনে হয় না।

Tuesday, May 19, 2009

আগে নিজেরা বদলাও, তাহার পর আইসো

 
এই ছবিটা কোন সাধারণ ছবি না। হয়তো কোন এক বিচিত্র কারণে একবারেই তোলা সম্ভব হয়েছে কিন্তু হাজারবার চেষ্টাতেও ঠিক এমন একটা ছবি তোলা সৌভাগ্যের বিষয়!

কী টাইমিং, কী সাবজেক্ট, কী গতি!
দুর্দান্ত, ভাল একটা ছবি উঠাবার জন্য কেমন কস্তাকস্তি করতে হয় তার উদাহরণ সাবজেক্ট দালী সাহেবের এই ছবিটা

যে বিষয়টা এখানে অমার্জনীয় অপরাধ, প্রথম আলোর এই দুর্দান্ত ছবিটায় কোন ফটো-সাংবাদিকের নাম দেয়া হয়নি। কেবল উল্লেখ করা হয়েছে 'প্রথম আলো'। বোঝার যো নেই, ছবিটা কী মতিউর রহমান উঠিয়েছেন, নাকি এই অফিসের কোন চাপরাসি?
এটা কী এদের মোটা-মাথায় ঢোকে না যে, একজন একটা পত্রিকায় চাকরি করলেই তার সন্তানতুল্য সৃষ্টি বেনামী-জারজ হয়ে যায় না!

এদের এইসব 'ফাজিলিয়া' কর্মকান্ড নিয়ে আমি আমার সাইটে প্রচুর লিখেছি। আমি এটা আশা করি না, এরা আমার সাইটে পদধুলি দেবেন। কিন্তু প্রথম আলোর সাইটেও আমি এইসব নিয়ে লিখেছি। আমি এও আশা করি না, তাদের নিজের সাইটের লেখা তারা কেউই পড়েন না।
তাহলে সমস্যা কোথায়?

প্রথম আলো ভুলের পর ভুল করবে, ভুলগুলো হাতেনাতে ধরিয়ে দেয়ার পরও আকাশপানে তাকিয়ে উদাস হয়ে থাকবে। আর আমরা পাঠকরা সেই ভুলগুলো গরুর মত জাবর কাটতে থাকব!
অন্তত কেউ ভুল ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে তাকে ন্যূনতম একটা উত্তর দিতে হয়, এই ভব্যতা শেখাবার অভব্য দায়িত্বই বা কে নেবে?

আসলে সমস্যাটা হচ্ছে, একজন ব্রাক্ষণ টোল থেকে বেরিয়ে এবং একজন মৌলভি মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে মৃত্যুর আগঅবধি পড়ার আর প্রয়োজন বোধ করেন না। কারণ নিজেদের পড়া শেষ, এদের কেবল অন্যদের শেখাতেই যত দায়িত্ব। এই দায়িত্ব এদের কাঁধে কে চাপিয়ে দিল তার খোঁজ আজ অবধি পাওয়া গেল না!
এখন প্রথম আলোও পণ করেছে এরা আমাদের শেখাবে, নিজেদের শেখা সমাপ্ত। 'বদলে যাও বদলে দাও'-এর পর এখন নতুন শ্লোগান, 'নিজেকে বদলাতে হবে আগে'-দেশের সবাইকে এরা শপথ করাবেন। উত্তম!
এই নিয়ে পূর্ণ-পৃষ্ঠাব্যাপি ঢাউস বিজ্ঞাপন। গোলটেবিল বৈঠক- 'ছুছিল' লোকজনের সঙ্গে ডন-বৈঠক দিচ্ছেন। আমি তীব্র সুখি হতাম, শপথের জন্য যে স্বাক্ষর অভিযানে এরা আদা-জল খেয়ে নেমেছেন, ওখানে প্রথমেই যদি এদের স্বাক্ষর থাকত- 'আমরা ভাল হইয়া যাইব, যাহার যে প্রাপ্য সম্মান তাহা ঠিক ঠিক বুঝাইয়া দিব'। এবং এরা মনেপ্রাণে চাইবেন যে, নিজেদেরই বদলানোটা অতি জরুরি।

কোখাও লিখেছিলাম, আবারো লিখি, ডায়নোসর নাই- রাশিয়া নাই- আদমজি জুটমিল নাই।

*ছবিঋণ: প্রথম আলো

Sunday, May 17, 2009

দূর্লভ-পছন্দের, ছবি-চিত্রকলা


এগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা। তাঁর কিছু ছবি যা তা! তাকানো যায় না এমন! তবুও রবিদাদা বলে কথা! তিনি তো আর আঁকিয়ে না।




*ছবি ২টা নেয়া হয়েছে, পূবালী ব্যাংকের সৌজন্যে প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলী(১৯৭৩), সপ্তম খন্ড থেকে।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা এই আত্ম-প্রতিকৃতি, এটা দেখে আমি আক্ষরিকার্থেই মুগ্ধ! অসাধারণ!

*ছবিঋণ: ছবিটি আমি নিয়েছি প্রথম আলো থেকে। এরা কোত্থেকে নিয়েছেন এটার উল্লেখ নাই বিধায়, অনুমান করি, স্বয়ং রবিবাবু স্বহস্তে স্ক্যান করে প্রথম আলো অফিসে ইমেইল করে পাঠিয়েছেন। আশায় আছি, প্রথম আলো একদা রবীন্দ্র-সংগীতও রচনা করে ফেলবে।

......................................................



এখানে দক্ষযজ্ঞ বাঁধিয়ে দেয়া হয়েছে (প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞ অনুষ্ঠানে, স্বয়ং শিবও তার মৃত পত্মীর শব কাঁধে করে এহেন প্রলয়-নৃত্য করেন নাই)।
একজন শূণ্যে চেয়ার ধরে রাখো। ওয়ান-টু-থ্রি বললে পানিসহ তিনটা বেড়াল ছুঁড়ে মারো। ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর বললেই দালি সাহেবকে লাফিয়ে উঠতে হবে। সে এক বিশাল কাহিনী...! সবই বুঝলাম।
(কিন্তু এই পৃথিবীটা যদি বেড়াল শাসন করত তাহলে এই উচ্ছ্বাসের ইতিহাসটা অনেকখানি অন্য রকম হত! মানুষের কী দশা হতো তা ভেবে গায়ে কাঁটা দেয়!)


“Dali Atomicus” by Philippe Halsman
Halsman set up his New York studio and using the 4 x 5 format, twin-lens reflex camera that he had designed in 1947, he prepared to capture one of his most memorable photographs. He suspended an easel, two paintings by Dali (one of which was “Leda Atomica”), and a stepping stool; had his wife, Yvonne, hold a chair in the air; on the count of three, his assistants threw three cats and a bucket of water into the air; and on the count of four, Dali jumped and Halsman snapped the picture. While his assistants mopped the floor and consoled the cats, Halsman went to the darkroom, developed the film, and reemerged to do it again. “Six hours and twenty-eight throws later, the result satisfied my striving for perfection,” wrote Halsman.


ছবি এবং তথ্যঋণ:
http://culturalshifts.com

হে অভিমানাহত বৃক্ষ, ছেড়ে গেলে কেন!







কালবৈশাখির ঝড়, আমার লেখালেখির প্রথম আয়ের টাকায় কেনা, স্বহস্তে লাগানো ক্রিসমাস-ট্রি গাছটাকে ফেলে দিল! আমি শোকে মূহ্যমান।
কিন্তু আমার মাথায় ঘুরপাক খায়, গাছটা কী আমায় ছেড়ে গেল, অভিমানাহত শিশুর মত?


কেউ বাসায় আসলে আমি যে ঘটা করে বলতাম, বুঝলেন, এইটা না আমার লেখালেখির প্রথম আয়ের...বুঝলেন...ইয়ে বুঝ...। অন্য সময় ফিরেও তাকাতাম না- আমার সেই চোখ আজ কই? কতদিন হাত বুলানো হয়নি তোমার গায়ে! আমার উদাসীনতা তোমার বুঝি ভাল লাগেনি? তাই বুঝি অভিমান হয়েছে খুব! বেশি?

কোথাও পড়েছিলাম, "একজন ভয়াবহ রোগাক্রান্ত, তার স্বহস্তে লাগানো বৃক্ষ জড়িয়ে ধরে সারাদিন বসে থাকত। একসময় মানুষটা ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠে, বৃক্ষটি মারা যায়"।

হে অভিমানাহত বৃক্ষ, বাপ আমার, আমি কী তোমায় জড়িয়ে ধরে কোন দিন বলেছি, আমাকে বাঁচিয়ে তুমি মরে যাও? বল, বলেছি? আমার গায়ে হাত দিয়ে বলো, বলেছি ক-কখখনো...?

একটি সংখ্যা-একটি লাশ-অনেক গল্প!

একের পর এক সংখ্যা বাড়ছে। একেক করে লাশ জড়ো হচ্ছে। এই দেশের হাভাতে মানুষদের লাশ। এঁরা প্রবাসে গিয়েছিলেন ভাগ্য ফেরাতে।

দেশ থেকে যখন বের হয়েছিলেন তখন একটা নাম ছিল, ফেরার সময় নামটা পাল্টে যায়। নাম কেবল লাশ। কেউ আর তাঁর নাম ধরে ডাকবে না- সবাই বলবে, এই লাশ উঠাও, লাশ নামাও। এই লাশরে গোসল দাও।

এঁরাই দেশটার চাকা বনবন করে ঘোরান অথচ
আমরা সবচেয়ে বেশি তাঁদেরকেই অবহেলা করি, অসম্মান করি, বিভিন্ন ভাবে। আজ পর্যন্ত এরা ভোটাধিকার পর্যন্ত পাননি! দেশে থেকে যাওয়ার পূর্বে, প্রবাসে গিয়ে দেশের দুতাবাসগুলো থেকে ন্যূনতম সহযোগিতাও এঁরা পান না। দেশে ফেরার পর এঁদের সঙ্গে আমাদের সবার আচরণ হয় স্রেফ লুটেরার।

প্রবাসে বিশেষ করে মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলো এবং মালয়েশিয়ার মত বিচ্ছিন্ন কিছু দেশে তাঁদের উপর কী নির্যাতন হয় এর অল্প-স্বল্প জেনেই আমরা শিউরে উঠি। মানুষগুলো এমন একটা চক্রে আটকা পড়েন, তখন তাঁদের কিছুই করার থাকে না।
এই অভাগা মানুষগুলোর দেখার কেউ নেই। পাশে কেউ নেই। দারিদ্রতা মহান করে এটা যে লিখেছে তাঁকে আমি পেলে, বছরের পর বছর ধরে, জনমানবহীন তপ্ত মরুভূমিতে শুকনো কিছু খাবার দিয়ে ছেড়ে দিয়ে বলতাম, আপনি সুর করে কবিতাটা পড়েন, আমি শুনি।

মালয়েশিয়ায় এই দেশের লোকজনদের কী নির্যাতন করা হয় তা আমরা আঁচও করতে পারব না। পুলিশ হেফাজতে বিশেষ বেত দিয়ে পেটানো হয়, যা পরবর্তিকালে মৃত্যুর জন্য দায়ি। যে মালয়েশিয়া থেকে লাশ আসার হার উঁচু সেই দেশে আমাদের রাষ্ট্রদূত নাই, ১২টি দেশে কোন রাষ্ট্রদূত নাই। ভাবা যায়?
অবশ্য রাষ্ট্রদূত থাকলেই যে ঘোড়ার ডিম প্রসব করতেন এতে আমার ঘোর সন্দেহ আছে! যারা আছেন এদের কর্মকান্ড নিয়ে প্রবাসিদের কেমন ক্ষোভ তা জানার প্রয়োজনও আমাদের নাই।
আবার আমাদের দেশের কিছু 'কলচর'-ঐতিহ্য আছে। চোর-চোট্টা, খুনি, কাউকে দেশে রাখা বিপদজনক মনে হলে, দাও কোন একটা দেশের রাষ্ট্রদূত করে। ফল যা হওয়ার তাই হয়!

কোন বাংলাদেশির অন্য দেশের পাসপোর্ট থাকার সুবাদে ওই দেশের কর্মকর্তাদের ওই বাংলাদেশির প্রতি যে দায়িত্ব, উদ্বেগ, মমতা তার দশ ভাগের এক ভাগও আমাদের দেশের কর্মকর্তাদের আছে বলে আমার ঘোর সন্দেহ!
ব্রিটিশ পাসপোর্টধারি একজন বাংলাদেশির যৌথ বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হওয়ার অভিযোগে হাইকোর্ট পর্যন্ত রুল জারি করেন। যৌথ বাহিনীর লোকদের বিভাগীয় শাস্তি দেয়া হয়েছে এটা সরকার নিশ্চিত করার পরও!

বছরে গড়ে প্রায় ২৫০০ লাশ আসে। আমরা কী প্রত্যেকটা লাশের মৃত্যুর কারণ জানি? আমরা কী জানি লাশ নামের মহিলাদের মৃত্যুর কারণ? মিডিয়ারও জানার খুব একটা আগ্রহ নাই কারণ এই লাশগুলো মহান রাজনীতিবিদ না, যে কে কোন শাড়ি পরে সংসদে এসেছেন, শাড়ির পাড়ের কাজ
কী, রং কী তার বিস্তারিত বর্ণনা থাকবে এবং প্রথম আলো প্রথম পাতায় ঘটা করে আমাদের জানাবে! আল্লা মেহেরবান, প্রথম আলো শাড়ি পর্যন্তই থেকেছে সামনে আর এগোয় নি!
আমাদের জানার খুব একটা প্রয়োজন নাই কারণ এরা হতদরিদ্র। এরা কেবলই একেকটা সংখ্যা। পরিসংখ্যানের বিষয়, সংখ্যার সূচক নিয়ে গ্রাফ করার বিষয়!

একটি লাশকে ঘিরে আবর্তিত হয় অনেক গল্প।
কাস্টমস অফিসার: 'শালার আরেকটা আইলো'। তিনি ক্ষুব্ধ, কারণ লাশ না হয়ে, মানুষটা ফিরে আসলে কিছু টু-পাইস আমদানি হত। কী অনাচার, মরবিই যখন এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে মরলে কোন সমস্যা ছিল! নাকি কফিন ছাড়াবার জন্যও টাকা দিতে হয়? অসম্ভব কিছু না।

মাইক্রোবাস ড্রাইভার: 'আইজকা সকালে উইঠাই মনে হইছিল দিনডা ভালা যাইবো'। সে উৎফুল্ল। মানুষ টানার চেয়ে লাশ টানা লাভজনক।

মিডিয়া: একেজনের একেক ভাবনা। যোগ হয় খানিকটা দুর্ভাবনাও। নিউজটা প্রথম পাতায় বা প্রাইম টাইমে যাবে তো?

জানাযার ইমাম: মানুষটা বৈদেশে ঠিকমত নামায আদায় করছে কিনা, এইটা নিয়া একটা ফতোয়া না দিলে মুবাইল ফোনটা কিনা সমস্যা হয়া যাইব।

সুদখোর:
লাশের জানায়ায় দাঁড়িয়ে, 'এতদিনে আল্লা মুখ তুইল্যা চাইছে'! লাশটা তার কাছ থেকে উঁচু সুদে (বাংলাদেশের বড় সুদখোর গ্রামীন ব্যাংকের প্রায় কাছাকাছি। আমাদের সৌভাগ্য পৃথিবীর বড় বড় সুদখোরদেরও নোবেল দেয়ার চল শুরু হয়েছে। আইসিসিডিআরবি কোটি শিশুর প্রাণ বাঁচালো এটা আহামরি কোন বিষয় না। বাংলাদেশে প্রাণের কেজি ক-টাকাই বা!) বিদেশ যাওয়ার র্পূর্বে যে টাকাটা নিয়েছিল ভিটে বন্ধক রেখে। সে মনে মনে আঁক কষে কেমন করে ভিটেটা হাতিয়ে নেয়া যাবে।

টাউট রাজনীতিবিদ: সুদখোরটা তার সাহায্য চেয়েছে। লাশের পরিবারকে ভিটে থেকে উচ্ছেদ করতে, বায়নাও দিয়ে গেছে পাঁচ হাজার টাকা। বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।

থানার ওসি: বাড়ি দখলের, নেতার কাজটা যে করে দিব। শ্লা, টাকাটা ঠিক-ঠিক পাওয়া যাবে তো?

আমার মতো শস্তা কলমচী: আচ্ছা, কেমন করে এই পোস্টটা লেখলে বেশি পাঠক পাওয়া যাবে। কেউ কেউ মানবদরদি বলে শ্লোগানের মত কিছু মন্তব্য করবে?

এইসব গল্প অনুমান করে লেখা কঠিন কিছু না। কেবল আমরা জানি না ওই লাশের ছেলে-মেয়ে, এদের কী হবে? মেয়েটা কী গার্মেন্টস কর্মি হবে, না নিশিকন্যা, নাকি প্রধানমন্ত্রী? ছেলেটা কী নেশাখোর, না মাস্তান, নাকি প্রেসিডেন্ট?

এটা আমাদের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব না। কেবল সময়ই তা বলে দেবে...।

ছবিঋণ: প্রথম আলো

Saturday, May 16, 2009

কোন পশু এদের কাঁধে ভর করেছিল?

পিলখানার বিডিয়ার বিদ্রোহের পেছনে সাত কারণ চিহ্নিত করেছে সেনাবাহিনীর তদন্ত আদালত। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি না। ভাগ্যিস, সেনাবাহিনীর একটা আলাদা তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। নইলে আবার যে কোন আষাঢ়ে গল্প শুনতে হতো কে জানে! আমাদের দেশে গল্পের গরু গাছে উঠে না, গল্পের গাছ গরুর উপর উঠে।

আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে যেটা, বিদ্রোহ হয়েছে ঠিক আছে। ক্ষোভ আছে ঠিকাছে।
এরা একজন অফিসার নামের মানুষকে গুলি করেছে। অফিসারদের রাগের চোটে মেরে ফেলেছে, তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম। মেরে ফেলার পর দিশামিশা না পেয়ে গর্ত খুড়ে চাপা দিয়েছে, নর্দমায় ফেলে দিয়েছে। এটাও নাহয় বেদনা চেপে মেনে নেয়া গেল।

কিন্তু আমায় যেটা ভাবাচ্ছে, মারার পূর্বে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মুখ থেতলে দিয়েছে, তারপর চারতলা থেকে তাদের অনেকের দেহ নিচে ফেলে দিয়েছে!

এখানে এসে আমার ভাবনা এলোমেলো হয়ে যায়। একটা মানুষের দেহকে কেন চারতলা থেকে ফেলে দেয়া হবে?

একজন মানুষকে রাগে-ক্ষোভে খুন করা আর ঠান্ডা মাথায় কুপিয়ে কুপিয়ে টুকরা করা যোজন তফাৎ!
এই পশুত্ব এরা কোত্থেকে পেল? কোন পশু এদের কাঁধে ভর করেছিল? নাকি এই পশুটাকে এরা দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে, আমাদের অজান্তেই লালন করেছে? সময়ে এর সগর্ব প্রকাশ।

আমি প্রতীক্ষায় ছিলাম, মনোবিদরা এটা নিয়ে কাজ করবেন। এঁরা এদের মস্তিষ্কের গলিঘুঁজি তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখবেন, এরা কেন এমনটা করল? কোন পশুটা এদের এমন করে কাবু করে ফেলল। এই পশুটার নিবাস কোথায়?
দরিদ্র দেশের ততোধিক দরিদ্র ভাবনা, এইসব প্রশ্নের উত্তর কখনই আমাদের জানা হবে না!
................
ডেনিম আফটার শেভ আমার অসম্ভব পছন্দের। একবার দেশে এটা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছিল। উচ্চমূল্যর কারণে তখন কিনতে পারিনি। পাশের যে মানুষটা একবার দাম জিজ্ঞেস করেই চট করে কিনে ফেললেন, মানুষটা আর কেউ না, একজন বিডিয়ার, সাধারণ সৈনিক! খুব অবাক হয়েছিলাম, এতে যে উপরি পয়সার ছড়াছড়ি আছে, এ নিয়ে আমার কোন সন্দেহ ছিল না। রাগ হচ্ছিল কিন্তু খানিক পরেই রাগ উবে গিয়েছিল। আহা, মানুষগুলো রোদে পুড়ে আমাদের সীমান্ত রক্ষা করে। নাহয়, করলই একটু এদিক সেদিক- করলই খানিকটা শখ আহলাদ পূরণ!
.................
হপ্তাহ পূর্বে এক পত্রিকায় নিশিকন্যাদের নিয়ে একটা রিপোর্ট বেরুল। যথারীতি থানা কিছু নিশিকন্যাদের ধরে নিয়ে আসল। আমাদের দেশে নিশিকন্যাদের ধরা এবং বস্তি ভেঙ্গে দেয়াটা খুব বড় একটা বীরোচিত কাজ। আমরা সুনাগরিকরা এতে উল্লসিত হই। যাক বাবা, একটা কাজের কাজ হল। আবর্জনা দূর হল। অথচ এই নিশিকন্যাদের কাছেই আমরা বিমলানন্দে যাই, বস্তির লোকজন না হলে আমাদের চলেই না- গৃহে বলুন বা বানিজ্যে!

থানায় ওই রিপোর্ট করা, ওই সাংবাদিকের পরিচয় পেয়ে এক নিশিকন্যা শ্লেষভরা কন্ঠে যা বলেছিলেন, 'বিরাট একটা কাম করছেন আপনে'। পরে
কথায় কথায় যা বলেছিলেন আমি তা প্রায় হুবহু তুলে দেই:
"আমার নাম...। তহন আমার বয়স এগারো। ছোড থাকতেই বাবা মইরা গেল, আমাগো কোন ভাই আছিল না। আমরা দুই ভইন আছিলাম। বড় বোন চিনি ব্লেক (স্মাগলিং) করত। এই দিয়া আমাগো সংসার চলত। আমি আমার ভইনের লগে আইতাম। বিডিয়ারের কাছ থিক্যা আমার ভইন লাইন লইত (অবৈধ স্মগলিং-এর অনুমতি)।
এরা আমারে দেখলেই, সুযোগ পাইলেই লাং-এর লাহান কথা কইত। একদিন আমার ভইনডার ম্যালা জ্বর। ৩০ সের চিনি লইয়া আমি আইছিলাম। বিডিয়ার আমার চিনি ধইরা লয়া গেল। আমি হেগো (তাদের) পা-ও ধরলাম, কুনু ফায়দা হইল না। এরা কইল, বড় স্যারের অনুমতি লাগবো, মাগরিবের নোয়াজের (নামাজ) পর স্যারকে ক্যাম্পে পাওয়া যাইব।
এই ৩০ সের চিনিই আমাগো পুঁজি আছিল। এইটার আশা বাদ দিলে বাড়িত চুলা জ্বলত না। হাঝে (সন্ধ্যায়) বিডিআর ক্যাম্পে গেলে হেরা এইটা-সেইটা কইয়া ম্যালা সময় (অনেকক্ষণ) বসায়া রাখল। এরপর আমার হাত-পা বাইন্ধা চাইর পাঁচজন...।
রক্তে সব ভাইসা যাইতাছিল। আমার অবস্থা খারাপ দেইখা হেরা আমারে হাসপাতালে ভর্তি করল। আমি দুই মাস হাসপাতালে ভর্তি আছিলাম।
কুন সুমায় (কখন) নডি হয়া গেছি আমি কইতাম পারি না।
.....................
অধিকাংশ বিডিআর, এরা সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্ত ধরনের অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। এদের একের পর এক পাপ পশুটার খাবার যুগিয়েছে হয়তো-বা! আমি ঠিক জানি না।
আমি ভয়ে ভয়ে আছি, আল্লা না করুন, কোনদিন পুলিশ বিদ্রোহ হলে আরেক নারকীয় তান্ডব হবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই।
কারণ ওটাই, এরাও ক্রিমিনালদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত...।

Friday, May 15, 2009

কষ্ট, মনন-দারিদ্রতা এবং ছফা পুরান

আহমদ ছফা নামের মানুষটা পাগল ছিলেন কিনা জানি না কিন্তু পাগল বানাবার কারখানা ছিলেন এটা আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি। কলমের শপথ, তিনি তাঁর পাগলামির অনেকখানি আমার মধ্যে সংক্রমিত করতে পেরেছেন। ভয়াবহ আকারে পেরেছেন! এই কান্ডটা ঘটেছে তাঁর 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' পড়ে!

আমি কোথাও লিখেছিলাম, 'প্রকৃতি এবং প্রকৃতির সন্তানদের জন্য রয়েছে আমার প্রগাঢ় মমতা'। ছফার সম্মানে, তাঁর তীব্র আলো ছটায় ঝলসে, আজ আমি আমার এই কথাটা কেবল ফিরিয়েই নিচ্ছি না, আমার এই ভাবনাটাকে ধৃষ্টতাপূর্ণ মনে করছি।

আহমদ ছফার সঙ্গে কারও তুলনা হয়? ছফা একটা শিশু আপেল গাছের জন্য কলকাতা থেকে রাতারাতি উড়ে চলে এসেছিলেন। প্লেনের ফিরতি টিকেটের জন্য বাংলাদেশ বিমানের অফিসে কেবল মারামারি করতে বাকি রেখেছিলেন। আমি নিশ্চিত, তাঁকে ফেরার টিকেট না দিলে অফিসারের নাকে গদাম করে ঘুসিও বসিয়ে দিতেন!

এটা মিথ্যা না, একদা আমারও ছিল প্রকৃতি এবং তার সন্তানদের জন্য খানিকটা ভালবাসা। নিজস্ব কষ্ট, জাগতিক জটিলতায়, কোথায় উবে গেল সেইসব ভালবাসা। চকচকে চোখ অথচ সবই কেমন ধুসর।
একদা গাছ কিনতাম পাগলের মত। মানুষে ঠাসাঠাসি রেলের বগিতে দু-পা ফেলার জায়গা নেই অথচ আমি ঠিকই দু-হাতে গাছভর্তি ব্যাগ নিয়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে থেকেছি ঘন্টার পর ঘন্টা। গাছগুলো দৃষ্টিনন্দন ছিল বটে কিন্তু অকাজের। কাঠের গাছ লাগালে আজ লাখ-লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারতাম।

আমার লাগানো গাছগুলো কয়টা মরে গেল, কোনটায় পানি দেয়া হলো না তার খোঁজ কে রাখে। ভাবখানা এমন, বাঁচতে পারলে বাঁচো, নইলে মরে যাও, বাপ, আমার কী দায় পড়েছে।

তাঁর 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' বইটা পড়ে আমার মাথা এলোমেলো হয়ে গেল। একজন মানুষের পক্ষে কেমন করে
সম্ভব প্রকৃতি-তার সন্তানদের প্রতি এমন অতীন্দ্রিয় ভালবাসা লালন করা।
অনেকদিন পর আমি আমার লাগানো গাছগুলোর পাশে এসে দাঁড়ালাম। প্রত্যেকটা গাছের গোড়ার মাটি পাথরের মত শক্ত। আমার বুক ভেঙ্গে আসছিল, আহারে, বেচারা, শ্বাস নিতে পারছে না। আমার কী কাতর, কী হাহাকার করা ভঙ্গি।
দারুচিনি গাছটায় কেমন লালচে পাতা মেলেছে। কমলা গাছে ছোট-ছোট কমলা ধরেছে, গাছটা ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। কমলা গাছটার ফুলের কী তীব্র গন্ধ! আমি গাছটাকে বললাম, যাও, আজ থেকে তোমার নাম দিলাম ছফাবৃক্ষ

বিকেলে একজন একমুঠো ফুল এনে আমার কাছে মেলে ধরে বললেন, দেখেন কী ঘ্রাণ! আমি নিমিষেই চিনে ফেললাম, এটা কমলা গাছটার-ছফাবৃক্ষের ফুল। ভ্রুণ-হত্যার মত আমি ওই খুনি মানুষটা দিকে তীব্র আক্রেশে তাকিয়ে রইলাম। কসম আমার লেখালেখির, মানুষটা কাছে আমি বিভিন্ন ভাবে ঋণী না হলে তাকে স্রেফ খুন করে ফেলতাম।

আমি ছুটে গিয়ে কমলা গাছটার কাছে দাঁড়ালাম, বিড়বিড় করে বললাম, ছফাবৃক্ষ, তোমার কাছে আমি নতজানু হয়ে ক্ষমা চাই। তোমার শেকড় মাটিতে, ছফারও। ছফা নামের মানুষটাকে বলো, মনে কষ্ট পুষে না রাখতে।

আমার ওই পোস্টটা দ্বৈতসত্তা-জিনতত্ত্ব, আমার সৃষ্ট জামি চরিত্রটি যখন মৃতপ্রায় কাকের বাচ্চাটাকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে চোখের জলে ভাসতে থাকে। ওইটা তো অন্য কেউ না, আমার ভেতরের শিশুটা। খুনি জামিও কেউ না, আমার ভেতরের পশুটা। ভেতরের শিশু এবং পশুটার হরদম মারামারি লেগেই আছে, ফাঁক পেলেই একজন অন্যজনকে ছাড়িয়ে যায়।

তাঁর 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' বইটা পড়ে আমার বুকের ভেতর থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসছিল, কেন এই মানুষটা নোবেল পাবেন না? কেন, পাবেন না, কেন! কেবল এই একটা বই-ই যথেষ্ঠ ছিল নোবেল কমিটির লোকজনদের প্রভাবিত করার জন্য।
আর্নস্ট হেমিংওয়েকে ১৯৫৪ সালে যখন নোবেল দেয়া হয় তখন নোবেল কমিটি সাহিত্যে তার অবদান সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, 'His vigorous art and the influence of his style on the literary art of our times as manifested in his book "The Old Man and the Sea"...'

"The Old Man and the Sea" তাদের অসম্ভব প্রভাবিত করেছিল এটা সহজেই অনুমেয়। আমাদেরকেও প্রভাবিত করে, আমাকেও। যখন মনে হয় হাল ছেড়ে দেই তখন বুড়ো সান্তিয়াগো কোত্থেকে অজানা সাহস নিয়ে আসে।

আমি নোবেল কমিটির প্রতি করুণা বোধ করি, এদের 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' পড়ার সৌভাগ্য হয়নি! কতিপয় বই নামের গ্রন্থ আছে যার কোন অনুবাদ চলে না। 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' এমন একটা গ্রন্থ। এমনিতেও অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক- এ্যাদুত্তোর এ্যাদিতর।

আমাদের দেশটা দরিদ্র। তারচেয়ে দরিদ্র আমরা মননে। তাই ছফার মত মানুষকে অবহেলায় সমাহিত করা হয়। এতে ছফার কিছুই যায় আসে না। তিনি হয়তো তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলতেন, আমি বুদ্ধিজীবীদের ইয়েতে মুতিও না। কিন্তু দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র হয়ে গেল আমরা, শূণ্যমনন! পাতক থেকে মহাপাতক!

আমাদের সমস্ত দান, অদানে-অব্রাক্ষণে। এরশাদের মত কবির কবিতা (যা দিয়ে আমি আমার বাচ্চার গু-ও পরিষ্কার করব না) পৃথিবীর অনেকগুলো ভাষায় অনুদিত হয়েছিল। ছফার 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' কয়টা ভাষায় অনূদিত হয়েছিল? কেবল বাংলা ভাষায়!
তবে আমি এটাও দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি, 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' অনুবাদ হলেও লাভ হতো না। অন্য ভাষার লোকজন এর দশ ভাগও বুঝত কিনা এতে আমার ঘোর সন্দেহ। ওই যে বললাম, 'এ্যাদুত্তোর এ্যাদিতর'।

হুমায়ুন আজাদের বলেছিলেন, "রবীন্দ্রনাথের পর সম্ভবত এরশাদের লেখাই বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার কবিতা নামের এইসব আবর্জনার প্রশংসা শুরু করলেন কতিপয় দালাল- কবি...।"
এই দালাল কবিদের লেখা দিয়ে ভরে থাকে আমাদের সাহিত্য পাতাগুলো। এরা কী লম্বা লম্বা বাতচিতই না করেন দেশ নিয়ে দেশের মানুষ নিয়ে! এই আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা ওইসব এরশাদের কবিতা নিয়ে কী আহা-উহু না করেছেন। তাদের কীসব অতিশয়োক্তি প্রকাশ, লজ্জায় মাথা কাটা যায়। বেশ্যা তাঁর দেহ বিক্রি করেন ক্ষিধার জ্বালায়, অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী তার বুদ্ধি বিক্রি করেন লোভের জ্বালায়। আমাদের দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে বেশ্যার তেমন পার্থক্য নাই।

এই দেশে একটা ডকুমেন্টরি বানালেও দেখবেন, কত ভাবে দেশকে ছোট করা যায় তার প্রাণান্তকর চেষ্টা। যেন বন্যা, মাদ্রাসা, অভাব এসব ব্যতীত আর দেখাবার কিছু নেই।
প্রবাসে এক বাঙ্গালি মহিলা জুতা কেনবার জন্য এ দোকান-ও দোকান ছুটে বেড়াচ্ছিলেন, ঠিক পছন্দসই জুতাটা চোখে লাগছিল না। তার এই অস্থিরতা দেখে একজন সেলস-গার্ল বলল, 'তোমার সমস্যাটা কী, জুতা নিয়ে তুমি
এত চুজি কেন? তোমাদের দেশের মহিলারা তো জুতাই পায়ে দেয় না'!
আমার ওই সেলস-গার্লকে চাবকাতে ইচ্ছা করে না, এই দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের পশ্চাদদেশে গদাম করে লাথি মারতে সুতীব্র ইচ্ছা জাগে। কারণ, এরা পৃথিবীর কাছে আমাদের দেশটাকে এভাবেই তুলে ধরেন- খালি পায়ের মহিলারা, অপুষ্ট শরীরে ততোধিক অপুষ্ট দু-চারটা শিশুসহ। টাকা কামাবার ধান্দায় এরা পারলে মাকেও বিক্রি করে দেবেন, অবলীলায়।

যেন আমাদের অহংকার করার কোন কোন ঘটনাই নাই। যেন আমাদের ছফা নেই!
আবার এরাই ঘটা করে বলেন, আমাদের দেশে ভাল লেখা কোথায়? তো, পাশের দেশ ভারত থেকে আমদানী করো। ভারতের দেবতা-দাদা-লেখকরা যখন এদেশে এসে দেশউদ্ধার করতেন তখন আমাদের দেশের প্রায় সমস্ত লেখক তাঁদের সামনে মাখনের মত গলে যেতেন; একা ছফাই দাঁড়াতেন মহীরুহ হয়ে। তাঁর সামনে তাসের মত উড়ে যেত মেরুদন্ডহীন বুদ্ধিজীবীরা। অবশ্য আমাদের দেশের এইসব মস্তিষ্ক-পায়ু একাকার হয়ে যাওয়া মানুষদের কাছ থেকে খুব একটা আশা করাটাও বোকামি বৈকি। এমনিতেও এইসব বুদ্ধিজীবী নামের প্রাণীদের বুদ্ধির খেলা দেখলে মনে হয়, অতিদর্পে হতা লঙ্কা! হায় বুদ্ধিজীবী, বেড়ো নাকো ঝড়ে পড়ে যাবে।

*ছবিঋণ:
খান ব্রাদার্সের প্রকাশিত আট খণ্ডে পূর্ণাঙ্গ আহমদ ছফা রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড থেকে নেয়া।

Wednesday, May 13, 2009

আমরা না, তোমরা বদলাও!

প্রথম আলোয় (১৩.০৫.০৯) আব্দুল কাইয়ুম একটা কলাম লিখেছেন। কলামটা সাইজে প্রায় 'এক স্কোয়ার গাব্বা'। এক গাব্বার বিষয়টা একটু ইরশাদ করি। কড়ে আঙ্গুল এবং বুড়ো আঙ্গুল পরস্পরের বিপরীত দিকে যথাসম্ভব ছড়িয়ে দিলে যতটুকু হয় ততটুকু 'এক গাব্বা'। সৈয়দ মুজতবা আলীর আবদুর রহমানের বা অমিতাভ বচ্চনের আঙ্গুলের হিসাবের সঙ্গে আমাদেরটার খানিকটা তারতম্য হবে, এতে হইচই করার কিছু নাই!

কলামের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না কারণ আলোচনার দুঃসাহস করি না! যেহেতু পত্রিকাটা প্রথম আলো, মিডিয়া ঈশ্বর- তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী তারা নিজেরাই, এবং ভুল করে, কেবল ঈশ্বর টাইপেরই কেউ কোন মেইলের উত্তর দেন না (সেই দিন আর নাই শাহাদুজ্জামান); যেহেতু লেখক আব্দুল কাইয়ুম, মিডিয়া দেবদূত- মিডিয়া ঈশ্বরের কারখানায় কাজ করেন; সেহেতু ভুল ধরায় আমার মধ্যে খামতি থাকবে এটা সলজ্জচিত্তে কবুল করি। কবুল-কবুল-কবুল! তিন কবুল!


কিন্তু এই কলামটার শিরোনাম নিয়ে খানিকটা আলোচনা করি। 'দশটা হোন্ডা দশটা গুন্ডা ব্যস সব ঠান্ডা'

ওনার এই শিরোনামের শানে-নযুল হচ্ছে , হোন্ডা দাবড়ে বেড়ায় গুন্ডা; ফলাফল সব ঠান্ডা। ঈশ্বরের আলো পত্রিকায় পূর্বেও বহুবার দেখেছি, 'হোন্ডা নিয়ে কয়েকজন যুবক আসিয়া...'। এদের শ্লোগান, 'বদলে যাও, বদলে দাও'। এরা কিন্তু বদলাবেন না, এটা আমাদের-অন্যদের জন্য, এদের জন্য না।

কলামের এক জায়গায় তিনি আতাউর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, "এটা আতাউর রহমানের কথা। তিনি লিখেছেন, 'শামসুল হুদা চৌধুরী রগড় করিয়া বলে, নির্বাচন খুব সহজ হয়ে গেছে। ১০টা হোন্ডা, ১০টা গুন্ডা, ১০টা ডান্ডা-ব্যস ইলেকশন ঠান্ডা'।"

আতাউর রহমান, শামসুল হুদা চৌধুরী , আব্দুল কাইয়ুম বোঝাতে চাইছেন যারা হোন্ডা চালায় তারা গুন্ডা। আর যারা দ্বিচক্রযান কাওয়াসাকি, সুজুকি চালায় তারা গুন্ডা-ষন্ডা-পান্ডা না। তারা পতপত করে উড়ায় ঝান্ডা- সোজা কথায়, ওরা ভালমানুষের ছা।

এই দেশে সন্ত্রস বন্ধ করার খুব সহজ বুদ্ধি হচ্ছে, হোন্ডা কোম্পানিকে লাল বাতি জ্বালাতে বাধ্য করা। না রাহেগা বাশ, না রাহেগি বাশরি- বাঁশও নাই বাঁশিও নাই। মোদ্দা কথা, হোন্ডা কোম্পানি হোন্ডা বানানো বন্ধ করে দিলে সন্ত্রাসীদের পক্ষে হোন্ডা যোগাড় করা সম্ভব হবে না, সন্ত্রাস করারও উপায় থাকবে না।

কারণ অন্য কোম্পানির দ্বিচক্রযান কাওয়াসাকি, সুজুকি, বাজাজ এগুলো দিয়ে আর যাই হোক, সন্ত্রাস করা যায় না, গুন্ডা হওয়াও উপায় নেই।

কিন্তু জাপানকে কী কাবু করা যাবে? আমরা তো আমেরিকা না, দুম করে জাপানে আরেকটা আনবিক বোমা ফেলে দিলুম। থাক, ওইসব হুজ্জুতের ঝামেলায় গিয়ে কাজ নাই।

দেশের আপামর জনতার গণস্বাক্ষরের মাধ্যমে অন্তত হোন্ডা কোম্পানির কাছে দরখাস্ত লেখা যেতে পারে:

মাননীয় হোন্ডা কোম্পানি
বরাবর: মালিক
জাপান।

হোন্ডা বিক্রি বন্ধ করিয়া আমাদের সন্ত্রাস মুক্ত রাখিতে আকুল আবেদন।

জনাব,
বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের পক্ষ হইতে আপনাদের নিকট হাম্বল রিকোয়েস্ট, আপনাদের হোন্ডায় চড়িয়া গুন্ডারা দেশব্যাপি গুন্ডামি করিয়া বেড়াইতেছে। এই দুষ্টুরা আমাদের জীবনখানা বড় ডিস্টার্ব হইতেছে। সোনার বাংলার সবটা পিতল হইয়া গিয়াছে। সন্ত্রাসের কারণে কোথায় সেই গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, বাগানভরা গাছ। আজ কেবলি গুন্ডাদের গুন্ডামির-অস্ত্র হইতে শব্দ বাহির হয় ঠাস ঠাস।

অতএব, হোন্ডা বিক্রি না করিবার জন্য আপনার আজ্ঞা হয়।
পুনশ্চ: ইহা একখানা হাম্বল রিকোয়েস্ট।

বিনীত নিবেদক,
(১৫কোটি মানুষের পক্ষে)
১. আব্দুল কাইয়ুম
২. আতাউর রহমান
৩.শামসুল হুদা চৌধুরী

সভ্যতা!









*ছবিসূত্র: ইন্টারনেট। আলাদাভাবে সূত্র উল্লেখ করতে পারছি না বলে ক্ষমা প্রার্থনা করি।

স্বপ্নের কারিগর


স্বপ্নের ফেরিওয়ালা স্বপ্ন বিক্রি করে, সবিরাম। স্বপ্ন নেবেন গো স্বপ্ন- হরেক রকম স্বপ্ন, লাল-নীল-সবুজ!

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা স্বপ্ন বিক্রি করতে করতে একসময় নিজেই স্বপ্ন দেখা ভুলে যায়। আত্মা বাঁধা পড়ে দুঃস্বপ্নের ফেরিওয়ালার কাছে। ক্রমশ বিস্মৃত হয়, একদা মুঠো মুঠো স্বপ্নে ভরে থাকত দু-হাত! এখন পড়ে থাকে বাতিল পুতুল একটা! 


একদিন।
কেউ একজন মায়াভরা গলায় হাঁক দেয়, 'অ, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, বাড়িত আছুইন? আপনের স্বপ্নের ঝুড়িটা কোথায়, গো'?
বাতিল পুতুলের মত মানুষটার মনে পড়ে যায়, একদিন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা ছিলাম, রে!

এই স্বপ্নের ফেরিওয়ালাদের যারা বাঁচিয়ে রাখেন- স্বপ্নের কারিগর। এই স্বপ্নের কারিগর বা একটা নাট্যমঞ্চের পেছনের আসল কুশীলবদের কথা আমরা জানতে কে আগ্রহি হই? তেমন কেউ-ই না! আমরা হাঁ করে একটা মুভি দেখি। ক্যামেরার পেছনে ওই মানুষটাকে জানার চেয়ে অনেক জরুরি হচ্ছে, ক্যামেরার সামনের মানুষটিকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়া। এইই নিয়ম!
তাতে ক্যামেরার পেছনের ওই মানুষদের কী আসে যায়! কিন্তু ওই মানুষগুলোই স্বপ্নের ফেরিওয়ালাদের- কাঁচের নায়কদের বাঁচিয়ে রাখেন। হারিয়ে ফেলা মুঠো-মুঠো স্বপ্ন আঁজলা ভরে ফিরিয়ে দেন।

স্বপ্নের কারখানা-স্বপ্নের কারিগর এঁরাই...এঁরা আছে বলেই না আজও স্বপ্নের ফেরিওয়ালা স্বপ্ন ফেরি করে...।

Tuesday, May 12, 2009

বড্ড ভয়ে ভয়ে আছি!

 
সমগ্র ভারতের মধ্যে কেবল এই একটা জায়গায়ই এতো শস্তা খাবার পাওয়া যায়! নমুনা:
Tea=1.00
Soup=5.50
Daal=1.50
Meals=2.00
Chapati=1.00
Chicken=24.50
Dosa=4.00
Biryani=8.00
Fish=13.00
ভাবছেন, এই খাবারগুলো গরীবদের জন্য! না, এই দামে খাবারগুলো পাওয়া যায়, 'ইন্ডিয়ান পার্লামেন্ট ক্যান্টিনে। আর এই সব গরীবদের বেতন হচ্ছে, মাসে ৮০ হাজার টাকা!" ঋণ/ সূত্র:
Debasish Chakrabarty 

ওরে, ওরা বেকুব তাই পয়সা দিয়ে কিনে খায় আমরা পয়সা দিয়ে কিনে খাব কোন দুঃখে! অষ্টম সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির বর্তমান মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার সংসদের ভিআইপি ক্যাফেটেরিয়ার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব সামগ্রী নিয়েছেন। তাও দুইটা বাসার জন্য। মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ধরে। শূন্য পয়সায় যার চালু নাম 'মাগনা'।

দুই বাসা থাকলে এতে দোষ কোথায়? কেন রে বাপু, একজনের দুইটা বউ থাকলে দোষ নেই, একজন মানুষের দুইটা বাসা থাকলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে কেন? দুই বউ একসঙ্গে 'কাজিয়া' করলে থামাবে কে, আপনি? দুইটা বাসায় দুইটা রাবনের চুলা জ্বললে এর জন্য কী দুই ফর্দে রসদের প্রয়োজন হতে পারে না? কী ছন্নছাড়া কথা- পারে, বেশ পারে।
তাছাড়া দেলোয়ার সাহেব নিজে একজন আইনজীবী, আইনের বই কী ওনার বগলে থাকবে নাকি আমার মত ছদুমদুর আন্ডার গার্মেন্টেসের নীচে? তিনি নাকি আবার কোন-এক আইনের বিদ্যালয়ের পড়াতেনও। শোনো কথা, আইন না-বুঝেই বুঝি কেউ শিক্ষক হয়?
যাই হোক, দুইটা বাসার জন্য প্রতি মাসে তিনি যেসব সামগ্রী নিয়েছেন:
১. আড়াই মন কাটারিভোগ চাল।
২. ত্রিশ কেজি পোলাউয়ের চাল।
৩. ত্রিশ কেজি আটা।
৪. পঁয়ত্রিশ লিটার সয়াবিন তেল।
৫. তিন কেজি ঘি।
৬. পনের কেজি মসুর ডাল।
৭. সাড়ে সাত কেজি বুটের ডাল।
৮. সাড়ে সাত কেজি মুগের ডাল।
৯. পনের কেজি পিঁয়াজ।
১০. সাড়ে সাত কেজি রসুন।
১১. সাত কেজি আদা।
১২. পনের কেজি চিনি।
১৩. পাঁচ কেজি সুজি।
১৪. সাত কেজি চিড়া।
১৫. সাত কেজি মুড়ি।
১৬. পাঁচ কেজি চানাচুর।
১৭. ষোল প্যাকেট নুডুলস।
১৮. ডানো বড় তিনটা।
১৯. ট্যাং বড় দুটি।
২০. ওভালটিন দুটি।
২১. মালটোভা দুটি।
২২. আমের আচার তিনটি।
২৩. কমলার জুস।
২৪. দুধ (কনডেন্স) সাতটি।
২৫. টোস্ট বিস্কুট কেজি।
২৬. গরম মসলা।
পত্রিকায় এসেছে, আইটেম হচ্ছে মোট ৩৭টি। কিন্তু পত্রিকায় উল্লেখিত লিস্টে এখানে পেলাম ২৬টি। আর কী-কী নিতেন এটা জানি না বলে খানিকটা বিব্রত বোধ করছি। আসলে আমি তো কখনও ভিআইপি ক্যাফেটেরিয়ারে যাইনি, তাই ওখানে কী-কী বিক্রি হয় তাও জানা নাই। কিন্তু ভয়ে ভয়ে আছি, ওয়াল্লা, ওখানে পায়জামার ফিতা পাওয়া না-গেলে তো সর্বনাশ...!

*স্কেচ: আলী মাহমেদ। স্কেচের ভাব-ঋণ: উম্মাদ

Thursday, May 7, 2009

আমি কেউ না- আমি কিছু না

Stephen Hawking-এর 'A Brief History of Time' নিয়ে কার্ল সাগান বলেন, "আইনস্টাইনের বিখ্যাত প্রশ্ন ছিল, মহাবিশ্ব সৃষ্টি করার সময় ঈশ্বরের কি অন্য রকম কিছু করার সম্ভাবনা ছিল? হকিং এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এই মহাবিশ্বের কোন কিনারা নেই, কালের কোন শুরু কিংবা শেষ নেই এবং স্রষ্টার করার মতো কিছু নেই।"

হকিং 'A Brief History of Time'- এ আলোচনা করছেন, "এই মুহূর্তে সূর্যে নিভে গেলে পৃথিবীতে সূর্যের আলো পেতে কোন সমস্যাই হবে না। সমস্যাটা আমরা জানব আট মিনিট পর। কারণ সুর্য থেকে আমাদের এখানে আলো পৌঁছতে সময় লাগে আট মিনিট।"
(পৃথিবী হতে সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র হচ্ছে সূর্য)

"একইভাবে বলা যায়, এই মহাবিশ্বের অন্যত্র কী হচ্ছে এটা আমরা জানি না, কখনও জানতেও পারব না। অসংখ্য নীহারিকা যাদের দুরত্ব ৮ হাজার মিলিয়ন আলোকবর্ষ! দূরের ওই নীহারিকা থেকে আগত যে আলো আমরা দেখি তা যাত্রা করেছিল ৮ হাজার মিলিয়ন বছর আগে! সুতরাং আমরা যখন এই মহাবিশ্ব দেখি তা আসলে ৮ হাজার মিলিয়ন বছর পূর্বের মহাবিশ্বের অতীত রূপ!"

"এখন আমরা জানি, প্রায় ১ লক্ষ মিলিয়ন Galaxy-এর মধ্যে মাত্র একটি আমাদের Galaxy। প্রতিটি Galaxy-তে প্রায় ১ লক্ষ মিলিয়ন নক্ষত্র থাকে। তারমধ্যে সূর্য একটি অতি সাধারণ হলুদ নক্ষত্র।"
(পৃথিবী থেকে সূর্য ১৩ লক্ষ গুণ বড়)।


এই সূর্যের পাশে আমরা কেমন:


"মনে করা হয়, Big Bang-এর সময় মহাবিশ্বের আয়তন ছিল শূণ্য। সুতরাং উত্তাপ ছিল অসীম। কিন্তু মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তাপ কমতে থাকে। Big Bang-এর ১ সেকেন্ড পর তাপমাত্রা কমে নেমে এসেছিল এক হাজার কোটি ডিগ্রিতে! এ উত্তাপ সূর্যের কেন্দ্রের চাইতে প্রায় ১ হাজার গুণ বেশি! কিন্তু হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণের সময় উত্তাপ এই মাত্রায় পৌঁছায়।
...।
আবার Big Bang-এ ১০০ সেকেন্ড পরই এই তাপমাত্রাই কমতে কমতে নেমে এসেছিল ১০০ কোটি ডিগ্রিতে।"

"Big Bang-এর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই হিলিয়াম এবং অন্যান্য মৌলিক উপাদানের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওযার সম্ভাবনার কথা বলা হয়। ...তারপর ১০ লক্ষ বছর পর্যন্ত মহাবিশ্বের সম্প্রসারন ছাড়া আর কিছু ঘটেনি।"
(এবং মহাবিশ্ব এখনও সম্প্রসারিত হচ্ছে। একটা উদাহরণ আসে এখানে, একটা চুপসানো বেলুনের গায়ে সমসম্ত গ্রহ-নক্ষত্র আঁকা হল, ক্রমশ বেলুনটা ফুলে-ফেঁপে উঠার পাশাপাশি গ্রহ-নক্ষত্রগুলো খানিকটা করে দূরে সরে যাবে। এবং আমি আমার অবস্থায়, অনড় অবস্থান থেকে এই বেলুনের চারপাশের সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্রগুলো দেখা সম্ভব হবে না, কখনও না)।

"শুরুতে পৃথিবী ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। পৃখিবীর কোন বায়ুমন্ডল বা atmosphere ছিল না। কালে কালে পৃথিবী শীতল হল। প্রাণের প্রথম বিকাশ হয়েছিল মহাসমুদ্রে।"

Alan Guth-এর মতে, ১ সেকেন্ডের সামান্য ভগ্নাংশ সময়ের ভেতর মহাবিশ্বের ব্যাসার্ধ বেড়েছে মিলিয়ন, মিলিয়ন, মিলিয়ন, মিলিয়ন, মিলিয়ন (একের পর ৩০টা শূণ্য)।

"একটি বড় Black Hole সূর্যের ভরের চাইতে প্রায় ১ লক্ষ গুণ বেশি। কোন নক্ষত্র Black Hole-এর কাছাকাছি এলে মহাকর্ষীয় আকর্ষনের পার্থক্যর জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। যেকোন বস্তু বা নক্ষত্র Black Hole-এ হারিয়ে যাবে।"
.... ...
তাত্ত্বিকভাবে ধারণা করা হয়, প্রায় এক হাজার ৩৭০ বছর আগে (এখানে টাইপে ভুল করেছিলাম। আসলে হবে এক হাজার ৩৭০ কোটি বছর আগে। আজ, ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৯, জাকির হোসেন বাবু ভুলটা ধরিয়ে দিলেন। তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি)
-এর মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টি। এবং ছোট্ট একটি গ্রহ পৃথিবীও। এর জন্য দায়ি যে শক্তি এটাকে বিজ্ঞানিরা বলছেন, ডার্ক এনার্জি বা ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানিরা ম্যাটারের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জির মাত্র ৪ ভাগ জানতে পেরেছেন।

বিবিসি এবং এএফপি-র বরাত দিয়ে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন,
'পরমাণু গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইউরোপীয় অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্স' বা সার্ন-এর তত্ত্বাবধানে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি করা হয় সুইজারল্যান্ড-ফ্রান্স সীমান্তের কাছে মাটির ১০০ মিটার নিচে ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘি বৃত্তাকার সুড়ঙ্গের ভেতরে পরীক্ষাটি চালানো হয়। এই 'এলএইচসি' নামের এই প্রকল্প সৃষ্টি করতে সময় লেগেছে প্রায় ২০ বছর! পৃথিবীর ৩৬টি দেশের ৫ হাজার বিজ্ঞানি, প্রযুক্তিবিদ এই প্রকল্পে কাজ করছেন!
এখানে কিছু বিষয় সম্বন্ধে বিজ্ঞানিরা জানার চেষ্টায় আছেন। 'এলএইচসি' নামে পরিচিত বৃত্তাকার এই সুড়ঙ্গের মধ্যে অতিপারমাণবিক কণাগুলোকে আলোর গতির কাছাকাছি দ্রুতিতে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানোর ফলে যে তাপমাত্রার সৃষ্টি হবে তা সূর্যের তাপের চেয়ে এক লাখ গুণ বেশি! এতে Big Bang-এর প্রকৃত অবস্থা আঁচ করা যায়।

বিজ্ঞানি, Dr. Michio Kaku (যার 'Hyperspace', 'Parallel Worlds' নামে দুইটা অসাধারণ গ্রন্থ রয়েছে এবং হালের ,'Physics of the Impossible') তিনি এই মতকে সমর্থন করেন, Black Hole-এ যখন কোন বস্তু সিঙ্গালারিটি নামের জায়গাটায় আটকা পড়ে তখন সংকুচিত হতে হতে একটা বিন্দুতে হারিয়ে যায়। কিন্তু বস্তুটি হারিয়ে যায় কোথায়?
সম্ভবত Black Hole-এর উল্টাদিকে White Hole আছে। সেখানে আবার অন্য কাহিনি। সেখানে বস্তুটি একটা বিন্দু থেকে প্রবল বেগে প্রসারিত হতে থাকে। (উদাহরণটা দিয়েছেন বাসন ধোয়ার সিন্কের সঙ্গে!)
Dr.Michio Kaku-এর মতে, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না, Big Bang আসলে একটা White Hole। যেভাবে সৃষ্টি হয়েছে আমাদের গ্রহ এবং মহাবিশ্ব। তো, Big Bang-এর পূর্বে কী ছিল? অন্য কোন মহাবিশ্ব, অন্য কোন ডাইমেনশন। মাল্টিভার্স, প্যারালাল ইউনিভার্স।

Kaku-এর ভাবনার রেশ ধরে একটা ধারণা দাঁড় করানো যায়।
পৃথিবী নামের গ্রহ। একটি সাধারণ হলুদ নক্ষত্র সূর্য। সূর্যের চেয়ে বিশালসব, প্রায় ১ লক্ষ মিলিয়ন নক্ষত্র Galaxy-তে। এমন ১ লক্ষ মিলিয়ন Galaxy নিয়ে মহাবিশ্ব। মহাবিশ্ব সৃষ্টির হয়েছে Big Bang-এর মাধ্যমে। শূণ্য বা ডটটা (!) এসেছে White Hole থেকে। White Hole-এর পূর্বে ছিল Black HoleBlack Hole-এর অন্য পাশে অন্য আরেকটা মহাবিশ্ব, অন্য এক ডাইমেনশন।

বেশ, একটা ধারণা তো পাওয়া গেল। কিন্তু Dr. Michio Kaku-এর কাছে আমার যে প্রশ্নটা করতে ইচ্ছা জাগে, সেটা হচ্ছে, বেশ, ওই অন্য মহাবিশ্বটা এসেছে আরেকটা মহাবিশ্ব থেকে? তাহলে এর শেষটা কোথায়?

এ গ্রহের মহাপুরুষরা ধর্মের আলোকে পৃথিবী সৃষ্টি নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ চালু করেছেন।
এখানে বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না, এটা অন্য প্রসঙ্গ। গৌতম বুদ্ধের ভাবনাটা আমার বেশ পছন্দ হয়। তাঁকে যখন কেউ বিশ্বসৃষ্টি-রহস্য এইসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করত, তিনি এর উত্তর দিতেন না। প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিতেন, আমি জানি না।

তো, এই সব তথ্যে আমার মস্তিষ্ক নামের ডেটা সেন্টার ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। গুগল তার ডেটা সেন্টার নিয়ে যাচ্ছে গভীর সমুদ্রে শীতল রাখার জন্য। কিন্তু আমি আমার
মস্তিষ্ক নামের ডেটা সেন্টার কোথায় নেব শীতল করার জন্য? কার কাছে?
বুকের ভেতর থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসে, আমি জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি কেউ না, আমি কিছু না।

"বললে, নিমিষেই হও
অপাপবিদ্ধ ভুমিষ্ঠ শিশু আমি।
বললে, হোক আলোকিত-
চারদিক আলোয় ছেয়ে গেল সব।
বললে, হাই চেপে: দূর হ
নিজের লাশ কাঁধে বয়ে
তুমিই সব, আমি কিছু না।" 

*আমি আমার অল্প জ্ঞান নিয়ে বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করেছি। যথাসম্ভব চেষ্টা ছিল তথ্যগুলো নির্ভুল দেয়া। তারপরও কোন তথ্যে সামান্যতম বিচ্যুতি থাকলে, কোন সহৃদয়বান ভুলটা ধরিয়ে দিলে, এই নিয়ে আমার কোন লাজ নাই, আছে কৃতজ্ঞতা।
(আমি বারবার যেটা বলে আসছি কবেকার জ্ঞান, কোথাকার জ্ঞান। আজ যে জ্ঞানটাকে আমরা অকাট্য ভাবছি কাল সেটা 'কাট্য' কাটাকাটি হবে না এই দিব্যি কে দিয়েছে! কে জানে, কবে না মানুষ আলোর গতিকে ছাড়িয়ে যায় এমন কিছু আবিষ্কার না করে  বসে এই ভয়ে ভয়ে আছি!)
২০১২ সালে এসে জানা যাচ্ছে, সবচেয়ে দূরবর্তী নক্ষত্রপুঞ্জের সন্ধান পাওয়া গেছে যা এক হাজার ৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে! (যে-কারণে বারবার কথাটা বলে আসছি, কবেকার জ্ঞান...)

**এই লেখাটি অন্য একটা ওয়েব সাইটে, অন্য নামে হুবহু কপি-পেস্ট করা হয়। চোর্যবৃত্তির এই কাজটা করেন অমিত কুমার সরকার নামের একজন। বিষয়টা ধরিয়ে দেন শয়তান নামের একজন ব্লগার। রেফারেন্সের কারণে আমার একটা লেখা, 'চোর-চোট্টায় বিদেশটাও ভরে যাচ্ছে' এই বিষয়টা উল্লেখ করা হয়েছিল কিন্তু ভুলে শয়তান নামের ব্লগারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়নি, পরবর্তীতে এই পোস্টে 'চোর-চোট্টায় বিদেশটাও ভরে যাচ্ছে' শয়তান নামের ব্লগারের কাছে ভুলটা স্বীকার করা হয়।

Monday, May 4, 2009

মাটির কাছাকাছি এক লেখক, মঈনুস সুলতান

 
সাহিত্য সাময়িকী টাইপের পাতাগুলো বিচিত্র কারণে দৌড়াদৌড়ি করে। সময়মত কখনই পড়া হয় না। অনেক দেরিতে হলেও মঈনুস সুলতানের 'চান সদাগরের ডিঙা' পড়ে আক্ষরিকার্থেই মুগ্ধ। লেখার ধাঁচ অনেকটা সৈয়দ মুজতবা আলীর মত।

যেটা খুব চোখে পড়েছে, তাঁর আছে লেখার ক্ষমতার বাইরে অন্য একটা ক্ষমতা।
যেটা আমাকে খুব টানে। 

একজন ভাল লেখক, ভাল গায়ক, ভাল প্রশাসক; পাশাপাশি তিনি একজন ভাল মানুষ কিনা? এটা খুব জরুরি। চালবাজ, ভানবাজ মানুষ সর্বত্রই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকেন। কে মাথার দিব্যি দিয়েছে কোন লেখক চালবাজ হবেন না? আর লেখক চালবাজ হলে এরচেয়ে ভয়াবহ আর কিছু নাই।

এখানে প্রাসঙ্গিক হবে বলে উল্লেখ করি, আহমদ ছফা বলছেন একজন লেখক প্রসঙ্গে, "প্রথম দিনেই একে দেখে আমার ভাল লাগেনি। মনে হয়েছিল ধূর্ত এবং লোভী একজন মানুষ। তবে তার পান্ডুলিপিটা পড়ে আমার অসম্ভব রোমাঞ্চ এসেছিল। বাংলা সাহিত্যের একটি ভাল লেখা, এমন একটা বইয়ের অপেক্ষা করছিলাম দীর্ঘ দিন। লেখককে ভাল না লাগলেও লেখকের সৃষ্টি আমাকে আপ্লুত করে দিয়েছিল।"

পরবর্তীতে আমরা দেখেছি এই ভানবাজ, চালবাজ লেখক মানুষটাকে। অধিকাংশ বিষয়ই তিনি কলুষিত করতে বাকী রাখেননি!

কিন্তু মঈনুস সুলতান মানুষটাকে আমার মনে হয়েছে টলটলে পানির মত। মানুষ যত উপরে উঠে তত সে শেকড়ের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। কেউ কেউ আপ্রাণ চেষ্টা করেন শেকড়ের কাছাকাছি থাকতে, চোখে চোখে রাখতে। অন্তত শেকড়কে দৃষ্টি সীমার বাইরে যেতে দেন না। সেই অল্প মানুষদের একজন তিনি, মাটিতে মাখামাখি হয়ে থাকা।

মঈনুস সুলতান থাকেন কাবুলে। জাতিসংঘের একটা কাজে মালয়েশিয়া গেলে থাকার ব্যবস্থা হয় একটা পাঁচতারা হোটেলে।
যেসব বঙ্গালরা পাচঁতারা হোটেলে উঠেন এদের একটাই কাজ থাকে, কেমন কেমন করে এটা প্রমাণ করা, যে তিনি জন্মের আগ থেকেই পাঁচতারা হোটেলে থেকে আসছেন।

কিন্তু এই মানুষটার চকচকে চোখ সাজানো-গোছানো হোটেল ছাড়িয়ে চলে যায় দূরে। লেখকের মুখেই শুনুন, "মালয়েশিয়ার রাজধানী সংলগ্ন নতুন শহর পুত্রজায়া। পাঁচতারা হোটেলের অদূরে পাহাড়ের ঢালে প্যাকিং বক্সের কাঠ, জং ধরা পামঅয়েলের টিন আর বাঁশের ছেঁড়া মাদুর দিয়ে তৈরি এক সারি ছোট ঘরে মোট ৪৭জন ভিসা-পারমিটবিহীন বাঙালি অভিবাসীর বাস।"

আমি লেখকের ঝকঝকে চোখ দিয়ে দিব্যি দেখতে পাই এই দেশের চাকা যারা বনবন করে ঘোরাচ্ছেন, সেই সব লড়াকু মানুষদের।
ওই মানুষরা অনেক সাহস করে মঈনুস সুলতানকে ধরে নিয়ে যান তাঁদের সঙ্গে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের জন্য। এদের নেতাগোছের একজন যখন সত্যি সত্যি লেখককে তার কথামত আসতে দেখেন, তখন তাঁর উচ্ছ্বাস লেখক বর্ণনা করেন এভাবে, "তাঁর হাসি দেখে মনে হয়, আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে স্যুটকেস হারিয়ে তা কেবল বরাতজোরে ফিরে পেয়েছেন।"
ওই মানুষটার নাম রশীদ মৃধা। ওই হাসির মালিক হচ্ছেন মৃধা নামের মানুষটা।

মঈনুসের লেখায় মুগ্ধ হয়ে এবং আখাউড়ার প্রসঙ্গ (জায়গাটার জন্য আমার রক্তে খানিকটা আলাদা নাচন আছে) আসায় মানুষটাকে মেইল করেছিলাম। ফিরতি মেইলে তিনি ব্যাখ্যা করেন প্রসঙ্গটা নিয়ে আসার কারণ।

মৃধা একটা ফাইভফিফটিফাইভের প্যাকেট খুলতে খুলতে বললেন,"ভাইজানের জন্য এই প্যাকেটটা কিনেছি, আপনি কি এইসব কম দামের জিনিস খাবেন?"
এখানে মইনুস সুলতান লিখছেন, "আমি যে একসময় দেদারসে বগুলা সিগ্রেট খেতাম, এ তথ্য চাউর করে দিতেই তিনি খুশী হয়ে বলেন, ...।"

মৃধা বলছেন, "...। এরা সকলে এই দেশে এসেছে টারজান ভিসায় ...এটা হইল জঙ্গলের লাইন, ঘোরতর অরণ্যের ভিতর দিয়া পলাইয়া পলাইয়া দেশ থেকে দেশান্তরে চইল্লা আসা। আমার ভিসার নাম আমি নিজেই দিছি- চান সদাগরের ভিসা। থাইল্যান্ড থাইকা মাছের ট্রলারে ভাইসা আসছি পিনাঙ দ্বীপ। 

বুঝলেন ভাইজান, এইবার আমারে কেউ ধরতেই পারেনি, ছিঁড়তেও পারে নাই কোন কেশ।"
আফসোস, আমাদের দেশের পশ্চাতদেশ উঁচিয়ে রাখা মানুষগুলো কখনও জানতেও পারবে না, টারজান ভিসা, চান সদাগরের ভিসায় কেমন করে একজন মানুষ প্রবাসে যান। কেমন করে এদের পাখির মত গুলি করে মেরে ফেলা হয়, ইঞ্জিন খুলে মাঝ-সাগরে ছেড়ে দেয়া হয়!

কাছেই সুদর্শন মসজিদ দেখিয়ে মৃধা মৃদু স্বরে বলেন, "...। 'দিলে একটাই খফ,...দেশের দুইডা ছেলে শবেবরাতের রাইতে এ মসিদে গেছিল, পুলিশ তাদের ধইরা কী যে করছে সেটা আপনারে কওয়ন যাইব না। আমি বরইতলির আবদুর রশিদ মৃধা, এ মসিদটারে সামনে রাইখ্যা নামায আমি এইখানেই পড়ি। কবুলের মালিক আল্লা-তালা। ভাইজান কিছু মনে নিয়েন না।'

এই বলে রশিদ মৃধা সেজদার জায়গায় রুমাল বিছিয়ে আসরের নামাযে উঠেন।"

এখানে আমার মত দুর্বল পাঠকদের চোখ জলে ভরে আসে। সামনের ঝাপসা স্ক্রিনে মৃধার মুখ কাঁপতে থাকে, উধাও হয়। ভেসে আসে মাহাথীর মোহাম্মদের মুখ। এই কী মাহাথীরের মত একজন অসাধারণ মানুষের রেখে যাওয়া মালয়েশিয়া? একটা অসভ্য ভাবনা-আচরণ...।
সভায় আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে একপর্যায়ে বলেন, "বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ নবাব সিরাজদ্দৌলা তার সভাকবি বীরবলকে গানে গানে সারা ভূ-ভারতে নববর্ষের মহাত্মকীর্তন প্রচার করতে নির্দেশ দেন...। 
...একজন প্লাস্টিকের বেবি পিয়ানো বাজিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠেন, 'খাঁ খা তোর বক্কিলারে কাঁচ্চা ধইরা খা'। "

এটা পড়ে হাসি চাপি। দামাল মানুষগুলোর পাগলামি দেখে মনে হয় একদৌড়ে ওই সভায় গিয়ে হাজির হই। আমিও হেঁড়ে গলায় তালে তালে বলি, খা খা খা, কাচ্চা ধইরা খা।

"অভিবাসী বাঙালীরা নববর্ষ উপলক্ষে খানাপিনার তোফা আয়োজন করেছেন। ঘরটি নিচু বলে আমরা রুকু সেজদার মতো শরীর বাঁকা করে ভেতরে ঢুকে মাদুরে বসি।"
পড়ে বুকের একদম ভেতর থেকে কষ্টের শ্বাস বেরিয়ে আসে। হায়রে, আমাদের দেশের অভাগা ছেলেরা- কেমন করে এদের পাঠানো রেমিটেন্সের টাকায় 'শিকখিত' স্যাররা বাবুগিরি করেন!

মঈনুস সুলতান নামের মানুষটাকে ঈর্ষা করি, মানুষটা জানেনও না, তিনি কী অসাধারণ একটা কাজ করেছেন। দেশের এই অভাগা মানুষগুলো জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন দেশের একফালি চাঁদ, ফালি ফালি করে কাটা। সেই চাঁদের আলো বুকে কপালে মেখে মানুষগুলো পার করে দেবেন দিনের পর দিন, মাস, বছর।

বেঁচে থাকলে দেশে ফিরে আসবেন। সন্তান, নাতি-পুতিদের কাছে হাত-পা নাড়িয়ে ঝলমলে মুখে গল্প করবেন, জানিস বেটা, আমরা যখন হেই দূর দেশে আছিলাম, আমগো এইখানে অনেক বড় একটা মানু আইছিল। কইলে বিশ্বাস করতি না, কী লম্ফা লম্ফা তাইনের চুল। আউলা বাতাসে ফুরফুর কইরা চুল উড়ে। মানুডা হাসে আর চুল উড়ে...।