আমরা যারা পোকাকে 'পুকা' বলি কেবল তারাই না হরহামেশা পত্রিকায়ও ছাপা হয় ইঞ্জিন। ইঞ্জিন লাগাও, ইঞ্জিন পড়ে গেছে, ইঞ্জিন উঠাও, নামাও...।
"ন্যানো ড্রাইভটা ফেলেছি হারিয়ে/ যেটায়—রাখা ছিল ৮০০ কোটি/ ইউনিটের স্মৃতি জড়িয়ে থাকা/ গাদা-গাদা ডিএনএ প্রোফাইল।"
Showing posts with label স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা. Show all posts
Showing posts with label স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা. Show all posts
Wednesday, July 1, 2020
আমাদের বুড়াটা!
বিভাগ
স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা
Wednesday, June 24, 2009
গাছটার কেবলই কান্না পায়।
জজ-কোর্টের চত্বরে চা-র এই দোকানটা চলবে জব্বর, গাছটা না-থাকলে সুবিধে হয় যে বড়! এই বুদ্ধির তারিফ না করে উপায় কী!
দেখো দিকি কান্ড- পাতাশূন্য হয়েও গাছটা দিব্যি বেঁচে আছে! এখন কী মায়ায়ই না ছড়িয়ে পড়েছে সদ্য গজানো এর কচি-কচি পাতা।
আহারে-আহারে, চকচকে পাতাগুলোয় আগুনগরম চা ছুঁড়ে মারে কেউ-কেউ।গাছটার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। গাছটা কিচ্ছু বলে না।
কেউ ডালে ময়লা একটা দড়ি ঝুলিয়ে দেয়। তুলতুলে নরোম ডাল-পাতা চাপা পড়ে থাকে। গাছটার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু গাছটা কিচ্ছু বলে না।
কেউবা পান খেয়ে চুন মোছার জন্য পাতা ছিঁড়ে ফেলে অবলীলায়। গাছটার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। তবুও গাছটা কিচ্ছু বলে না।
চা-র চামচ খুঁজে না পেয়ে চা-দোকানদার একট শুকনো ডাল ভেঙ্গে বেদম নাড়ায়। গাছটার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। উঁহু, তাও গাছটা কিচ্ছু বলে না।
কালো কোটের উকিল আসে। নাক ঝেড়ে সময় নিয়ে গাছে মোছার চেষ্টা করে। ফুড়ুৎ-ফুড়ুৎ শব্দে চা খায়। অন্যমনস্ক হয়ে পাতা ছেঁড়ে, অযথাই। মনে মনে ভাবে: মক্কেলটাকে আজ চটকাতে হবে। ওর ফৌজদারী মামলায় জামিন হবে না, এটা বললেই হাত উপুড় করে 'টংকা' না-দিয়ে বাছাধন যাবেটা কোথায়? হারামজাদাটা আজ আসলেই হয়...।
গাছটার যে এমন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, শত অত্যাচারেও গাছটা কিচ্ছু বলে না। আহা, নিদেনপক্ষে একটা ডাল ফেলে কারও-না-কারও মাথা ফাটিয়ে ফেললেও তো খানিকটা ক্ষোভ লাঘব হয়। সে তাও করে না!
একদিন। বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে মামলার তদ্বিরে আসে একজন মানুষ। মানুষটাকে দেখে ঠিক মামলাবাজ মনে হয় না। ভারী চশমার পেছনে এর চোখগুলো যেন কেমন! মানুষটা সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। চুকচুক করে সময় নিয়ে চা খায়। লোকজনের চোখ বাঁচিয়ে হাত বাড়িয়ে আলতো করে গাছটার চকচকে পাতা ছোঁয়। ইশ-শ, কী যে নরোম মানুষটার হাতের স্পর্শ! অজান্তেই গাছটার গা কাঁপে! কাঁপতেই থাকে! পাতাগুলোর উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই যেন- তিরতির করে কাঁপে, চোখে দেখা যায় না এমন। অবাক-এক-কান্ড হে! গাছটার দমবন্ধ ভাবটা এখন আর নেই!
মানুষটাও অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে অদ্ভুত সবুজ চকচকে পাতাগুলোর পানে। মানুষটার চোখগুলো যেন কেমন- অবিকল মাছের মত, পলকই পড়ে না! পাগলাটে টাইপের এই মানুষটার খুব ইচ্ছা করে গাছটাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে। শোনো কথা, এ যে এক অসম্ভব পাগলামী ভাবনা আর কী!
গাছটার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, আবারও। গাছটা কিচ্ছু বলে না। অনড় দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এখন গাছটার কান্না পায়। কেবলই কান্না পায়, পাগলাটে এই মানুষটার সঙ্গে যেতে না পেরে...।
বিভাগ
স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা
Wednesday, May 13, 2009
স্বপ্নের কারিগর

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা স্বপ্ন বিক্রি করে, সবিরাম। স্বপ্ন নেবেন গো স্বপ্ন- হরেক রকম স্বপ্ন, লাল-নীল-সবুজ!
স্বপ্নের ফেরিওয়ালা স্বপ্ন বিক্রি করতে করতে একসময় নিজেই স্বপ্ন দেখা ভুলে যায়। আত্মা বাঁধা পড়ে দুঃস্বপ্নের ফেরিওয়ালার কাছে। ক্রমশ বিস্মৃত হয়, একদা মুঠো মুঠো স্বপ্নে ভরে থাকত দু-হাত! এখন পড়ে থাকে বাতিল পুতুল একটা!
একদিন।
কেউ একজন মায়াভরা গলায় হাঁক দেয়, 'অ, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, বাড়িত আছুইন? আপনের স্বপ্নের ঝুড়িটা কোথায়, গো'?
বাতিল পুতুলের মত মানুষটার মনে পড়ে যায়, একদিন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা ছিলাম, রে!
এই স্বপ্নের ফেরিওয়ালাদের যারা বাঁচিয়ে রাখেন- স্বপ্নের কারিগর। এই স্বপ্নের কারিগর বা একটা নাট্যমঞ্চের পেছনের আসল কুশীলবদের কথা আমরা জানতে কে আগ্রহি হই? তেমন কেউ-ই না! আমরা হাঁ করে একটা মুভি দেখি। ক্যামেরার পেছনে ওই মানুষটাকে জানার চেয়ে অনেক জরুরি হচ্ছে, ক্যামেরার সামনের মানুষটিকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়া। এইই নিয়ম!
তাতে ক্যামেরার পেছনের ওই মানুষদের কী আসে যায়! কিন্তু ওই মানুষগুলোই স্বপ্নের ফেরিওয়ালাদের- কাঁচের নায়কদের বাঁচিয়ে রাখেন। হারিয়ে ফেলা মুঠো-মুঠো স্বপ্ন আঁজলা ভরে ফিরিয়ে দেন।
স্বপ্নের কারখানা-স্বপ্নের কারিগর এঁরাই...এঁরা আছে বলেই না আজও স্বপ্নের ফেরিওয়ালা স্বপ্ন ফেরি করে...।
বিভাগ
স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা
Monday, May 4, 2009
মাটির কাছাকাছি এক লেখক, মঈনুস সুলতান
সাহিত্য সাময়িকী টাইপের পাতাগুলো বিচিত্র কারণে দৌড়াদৌড়ি করে। সময়মত কখনই পড়া হয় না। অনেক দেরিতে হলেও মঈনুস সুলতানের 'চান সদাগরের ডিঙা' পড়ে আক্ষরিকার্থেই মুগ্ধ। লেখার ধাঁচ অনেকটা সৈয়দ মুজতবা আলীর মত।
যেটা খুব চোখে পড়েছে, তাঁর আছে লেখার ক্ষমতার বাইরে অন্য একটা ক্ষমতা।
যেটা আমাকে খুব টানে।
একজন ভাল লেখক, ভাল গায়ক, ভাল প্রশাসক; পাশাপাশি তিনি একজন ভাল মানুষ কিনা? এটা খুব জরুরি। চালবাজ, ভানবাজ মানুষ সর্বত্রই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকেন। কে মাথার দিব্যি দিয়েছে কোন লেখক চালবাজ হবেন না? আর লেখক চালবাজ হলে এরচেয়ে ভয়াবহ আর কিছু নাই।
এখানে প্রাসঙ্গিক হবে বলে উল্লেখ করি, আহমদ ছফা বলছেন একজন লেখক প্রসঙ্গে, "প্রথম দিনেই একে দেখে আমার ভাল লাগেনি। মনে হয়েছিল ধূর্ত এবং লোভী একজন মানুষ। তবে তার পান্ডুলিপিটা পড়ে আমার অসম্ভব রোমাঞ্চ এসেছিল। বাংলা সাহিত্যের একটি ভাল লেখা, এমন একটা বইয়ের অপেক্ষা করছিলাম দীর্ঘ দিন। লেখককে ভাল না লাগলেও লেখকের সৃষ্টি আমাকে আপ্লুত করে দিয়েছিল।"
পরবর্তীতে আমরা দেখেছি এই ভানবাজ, চালবাজ লেখক মানুষটাকে। অধিকাংশ বিষয়ই তিনি কলুষিত করতে বাকী রাখেননি!
কিন্তু মঈনুস সুলতান মানুষটাকে আমার মনে হয়েছে টলটলে পানির মত। মানুষ যত উপরে উঠে তত সে শেকড়ের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। কেউ কেউ আপ্রাণ চেষ্টা করেন শেকড়ের কাছাকাছি থাকতে, চোখে চোখে রাখতে। অন্তত শেকড়কে দৃষ্টি সীমার বাইরে যেতে দেন না। সেই অল্প মানুষদের একজন তিনি, মাটিতে মাখামাখি হয়ে থাকা।
মঈনুস সুলতান থাকেন কাবুলে। জাতিসংঘের একটা কাজে মালয়েশিয়া গেলে থাকার ব্যবস্থা হয় একটা পাঁচতারা হোটেলে।
যেসব বঙ্গালরা পাচঁতারা হোটেলে উঠেন এদের একটাই কাজ থাকে, কেমন কেমন করে এটা প্রমাণ করা, যে তিনি জন্মের আগ থেকেই পাঁচতারা হোটেলে থেকে আসছেন।
কিন্তু এই মানুষটার চকচকে চোখ সাজানো-গোছানো হোটেল ছাড়িয়ে চলে যায় দূরে। লেখকের মুখেই শুনুন, "মালয়েশিয়ার রাজধানী সংলগ্ন নতুন শহর পুত্রজায়া। পাঁচতারা হোটেলের অদূরে পাহাড়ের ঢালে প্যাকিং বক্সের কাঠ, জং ধরা পামঅয়েলের টিন আর বাঁশের ছেঁড়া মাদুর দিয়ে তৈরি এক সারি ছোট ঘরে মোট ৪৭জন ভিসা-পারমিটবিহীন বাঙালি অভিবাসীর বাস।"
আমি লেখকের ঝকঝকে চোখ দিয়ে দিব্যি দেখতে পাই এই দেশের চাকা যারা বনবন করে ঘোরাচ্ছেন, সেই সব লড়াকু মানুষদের।
ওই মানুষরা অনেক সাহস করে মঈনুস সুলতানকে ধরে নিয়ে যান তাঁদের সঙ্গে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের জন্য। এদের নেতাগোছের একজন যখন সত্যি সত্যি লেখককে তার কথামত আসতে দেখেন, তখন তাঁর উচ্ছ্বাস লেখক বর্ণনা করেন এভাবে, "তাঁর হাসি দেখে মনে হয়, আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে স্যুটকেস হারিয়ে তা কেবল বরাতজোরে ফিরে পেয়েছেন।"
ওই মানুষটার নাম রশীদ মৃধা। ওই হাসির মালিক হচ্ছেন মৃধা নামের মানুষটা।
মঈনুসের লেখায় মুগ্ধ হয়ে এবং আখাউড়ার প্রসঙ্গ (জায়গাটার জন্য আমার রক্তে খানিকটা আলাদা নাচন আছে) আসায় মানুষটাকে মেইল করেছিলাম। ফিরতি মেইলে তিনি ব্যাখ্যা করেন প্রসঙ্গটা নিয়ে আসার কারণ।
মৃধা একটা ফাইভফিফটিফাইভের প্যাকেট খুলতে খুলতে বললেন,"ভাইজানের জন্য এই প্যাকেটটা কিনেছি, আপনি কি এইসব কম দামের জিনিস খাবেন?"
এখানে মইনুস সুলতান লিখছেন, "আমি যে একসময় দেদারসে বগুলা সিগ্রেট খেতাম, এ তথ্য চাউর করে দিতেই তিনি খুশী হয়ে বলেন, ...।"
মৃধা বলছেন, "...। এরা সকলে এই দেশে এসেছে টারজান ভিসায় ...এটা হইল জঙ্গলের লাইন, ঘোরতর অরণ্যের ভিতর দিয়া পলাইয়া পলাইয়া দেশ থেকে দেশান্তরে চইল্লা আসা। আমার ভিসার নাম আমি নিজেই দিছি- চান সদাগরের ভিসা। থাইল্যান্ড থাইকা মাছের ট্রলারে ভাইসা আসছি পিনাঙ দ্বীপ।
বুঝলেন ভাইজান, এইবার আমারে কেউ ধরতেই পারেনি, ছিঁড়তেও পারে নাই কোন কেশ।"
আফসোস, আমাদের দেশের পশ্চাতদেশ উঁচিয়ে রাখা মানুষগুলো কখনও জানতেও পারবে না, টারজান ভিসা, চান সদাগরের ভিসায় কেমন করে একজন মানুষ প্রবাসে যান। কেমন করে এদের পাখির মত গুলি করে মেরে ফেলা হয়, ইঞ্জিন খুলে মাঝ-সাগরে ছেড়ে দেয়া হয়!
কাছেই সুদর্শন মসজিদ দেখিয়ে মৃধা মৃদু স্বরে বলেন, "...। 'দিলে একটাই খফ,...দেশের দুইডা ছেলে শবেবরাতের রাইতে এ মসিদে গেছিল, পুলিশ তাদের ধইরা কী যে করছে সেটা আপনারে কওয়ন যাইব না। আমি বরইতলির আবদুর রশিদ মৃধা, এ মসিদটারে সামনে রাইখ্যা নামায আমি এইখানেই পড়ি। কবুলের মালিক আল্লা-তালা। ভাইজান কিছু মনে নিয়েন না।'
এই বলে রশিদ মৃধা সেজদার জায়গায় রুমাল বিছিয়ে আসরের নামাযে উঠেন।"
এখানে আমার মত দুর্বল পাঠকদের চোখ জলে ভরে আসে। সামনের ঝাপসা স্ক্রিনে মৃধার মুখ কাঁপতে থাকে, উধাও হয়। ভেসে আসে মাহাথীর মোহাম্মদের মুখ। এই কী মাহাথীরের মত একজন অসাধারণ মানুষের রেখে যাওয়া মালয়েশিয়া? একটা অসভ্য ভাবনা-আচরণ...।
সভায় আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে একপর্যায়ে বলেন, "বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ নবাব সিরাজদ্দৌলা তার সভাকবি বীরবলকে গানে গানে সারা ভূ-ভারতে নববর্ষের মহাত্মকীর্তন প্রচার করতে নির্দেশ দেন...।
...একজন প্লাস্টিকের বেবি পিয়ানো বাজিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠেন, 'খাঁ খা তোর বক্কিলারে কাঁচ্চা ধইরা খা'। "
এটা পড়ে হাসি চাপি। দামাল মানুষগুলোর পাগলামি দেখে মনে হয় একদৌড়ে ওই সভায় গিয়ে হাজির হই। আমিও হেঁড়ে গলায় তালে তালে বলি, খা খা খা, কাচ্চা ধইরা খা।
"অভিবাসী বাঙালীরা নববর্ষ উপলক্ষে খানাপিনার তোফা আয়োজন করেছেন। ঘরটি নিচু বলে আমরা রুকু সেজদার মতো শরীর বাঁকা করে ভেতরে ঢুকে মাদুরে বসি।"
পড়ে বুকের একদম ভেতর থেকে কষ্টের শ্বাস বেরিয়ে আসে। হায়রে, আমাদের দেশের অভাগা ছেলেরা- কেমন করে এদের পাঠানো রেমিটেন্সের টাকায় 'শিকখিত' স্যাররা বাবুগিরি করেন!
মঈনুস সুলতান নামের মানুষটাকে ঈর্ষা করি, মানুষটা জানেনও না, তিনি কী অসাধারণ একটা কাজ করেছেন। দেশের এই অভাগা মানুষগুলো জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন দেশের একফালি চাঁদ, ফালি ফালি করে কাটা। সেই চাঁদের আলো বুকে কপালে মেখে মানুষগুলো পার করে দেবেন দিনের পর দিন, মাস, বছর।
বেঁচে থাকলে দেশে ফিরে আসবেন। সন্তান, নাতি-পুতিদের কাছে হাত-পা নাড়িয়ে ঝলমলে মুখে গল্প করবেন, জানিস বেটা, আমরা যখন হেই দূর দেশে আছিলাম, আমগো এইখানে অনেক বড় একটা মানু আইছিল। কইলে বিশ্বাস করতি না, কী লম্ফা লম্ফা তাইনের চুল। আউলা বাতাসে ফুরফুর কইরা চুল উড়ে। মানুডা হাসে আর চুল উড়ে...।
বিভাগ
স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা
Friday, May 1, 2009
প্রথম প্রেমসম, প্রথম লিখে আয়!
সেই যে দিয়ে এলাম পরে আমি আর আমার লেখা-উপন্যাস ওরফে বাইন্ডিং খাতার কথা জিজ্ঞেস করি না। রশীদ ভাই, জনাব রশীদ হায়দারের সঙ্গে বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হত। কেবল এই বিষয়টা বাদ দিয়ে যে আমার লেখার গতি কী! এটা জিজ্ঞেস করার কিছু নেই কারণ আমার লেখা নামের কাগুজে জিনিসটা ওটা যে ডাস্টবিন ঘুরে-ঘুরে কোন-এক চটপটিওয়ালা, ফুস্কাওয়ালা, বাবুর গু- ফালানেওয়ালার বেশ কাজে লাগছে এতে আর সন্দেহ কী!
একদিন বিদায় নিয়ে চলে আসার সময় একটা উত্তরাধিকার ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'এটা নিয়ে যাও'।
তখনও বুঝিনি। দুদ্দাড় করে নামতে গিয়ে পাতা উল্টাতে গিয়ে দেখি, অরি আল্লা, গোটা উপন্যাসটাই দেখি ছাপা হয়েছে। কী আনন্দ-কী আনন্দ! এ-ও কী হয়!
ফিরে গিয়ে দেখি রশীদ ভাই ব্যস্ত। দরোজা দিয়ে নাক গলাতেই বললেন, 'উঁহু, বসবা না, আমার দম ফেরার ফুরসত নাই'।
পরে এক যন্ত্রণা হয়েছিল। লেখা ছাপা হওয়ার কথা শুনে কেউ যখন বলত, এটা পড়ব কেমন করে, যোগাড় করব কেমন করে? আমি ভয়ে ভয়ে বলতাম: ইয়ে, বাংলা একাডেমির বিক্রয়কেন্দ্রে। কথা এখানেই শেষ। কারণ প্রশ্নকর্তা উত্তরদাতা দু-জনেই ভাল সমঝদার, ২০ টাকার উত্তরাধিকারের জন্য কেউ ২৫ গুণ টাকা খরচ করবেন না।
পরে বাংলা একাডেমির একজন উপ-পরিচালককে এই কথাটাই বলাতে তাঁর দাম্ভিক উত্তর আমার পছন্দ হয়নি! তার সাফ কথা, 'যার প্রয়োজন হবে সে এখান থেকে যোগাড় করবে। অন্য কোথাও আমরা বিক্রি করতে যাব কেন'! আহারে-আহারে, আমি স্মরণ করিয়ে দেব এই গ্রহে ডায়নোসর নাই, সোভিয়েত ইউনিয়ন নাই, আদমজি জুটমিল নাই!
ওয়াল্লা, কিছু দিন পর দেখি ২০০১ টাকার চেক এসে হাজির- সেটা ৯৩ সালের কথা। বাহরে, এরা দেখি লেখার জন্য আবার টাকাও দেয়। লিখে আমার সেটাই প্রথম আয়। এই আনন্দ কীসের সঙ্গে তুলনা করা যায় আমি জানি না। সদ্যজাত শিশুর গায়ের গন্ধের সঙ্গে? আমি জানি না, আমার লেখালেখির কলমের কসম; জানি না।
একদিন বিদায় নিয়ে চলে আসার সময় একটা উত্তরাধিকার ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'এটা নিয়ে যাও'।
তখনও বুঝিনি। দুদ্দাড় করে নামতে গিয়ে পাতা উল্টাতে গিয়ে দেখি, অরি আল্লা, গোটা উপন্যাসটাই দেখি ছাপা হয়েছে। কী আনন্দ-কী আনন্দ! এ-ও কী হয়!
ফিরে গিয়ে দেখি রশীদ ভাই ব্যস্ত। দরোজা দিয়ে নাক গলাতেই বললেন, 'উঁহু, বসবা না, আমার দম ফেরার ফুরসত নাই'।
পরে এক যন্ত্রণা হয়েছিল। লেখা ছাপা হওয়ার কথা শুনে কেউ যখন বলত, এটা পড়ব কেমন করে, যোগাড় করব কেমন করে? আমি ভয়ে ভয়ে বলতাম: ইয়ে, বাংলা একাডেমির বিক্রয়কেন্দ্রে। কথা এখানেই শেষ। কারণ প্রশ্নকর্তা উত্তরদাতা দু-জনেই ভাল সমঝদার, ২০ টাকার উত্তরাধিকারের জন্য কেউ ২৫ গুণ টাকা খরচ করবেন না।
পরে বাংলা একাডেমির একজন উপ-পরিচালককে এই কথাটাই বলাতে তাঁর দাম্ভিক উত্তর আমার পছন্দ হয়নি! তার সাফ কথা, 'যার প্রয়োজন হবে সে এখান থেকে যোগাড় করবে। অন্য কোথাও আমরা বিক্রি করতে যাব কেন'! আহারে-আহারে, আমি স্মরণ করিয়ে দেব এই গ্রহে ডায়নোসর নাই, সোভিয়েত ইউনিয়ন নাই, আদমজি জুটমিল নাই!
ওয়াল্লা, কিছু দিন পর দেখি ২০০১ টাকার চেক এসে হাজির- সেটা ৯৩ সালের কথা। বাহরে, এরা দেখি লেখার জন্য আবার টাকাও দেয়। লিখে আমার সেটাই প্রথম আয়। এই আনন্দ কীসের সঙ্গে তুলনা করা যায় আমি জানি না। সদ্যজাত শিশুর গায়ের গন্ধের সঙ্গে? আমি জানি না, আমার লেখালেখির কলমের কসম; জানি না।
তবে ১টাকার মরতবা কী বুঝিনি। এটা কী বাদাম খাওয়ার জন্য! ৯৩ সালে ১ টাকায় এক ঠোঙা বাদাম পাওয়া না গেলেও বাদামওলারা অন্তত বাদাম দিত।
জিজ্ঞেস করব করব করেও ওই মানুষটাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। কে জানে, হয়তো না জেনে ভালই হয়েছে। নইলে হয়তো এমন একটা উত্তর শুনতাম, যাতে নিঃশব্দে ওখান থেকে উঠে আসতে হত। চেয়ার সরাতে গিয়ে ভুলে যদি টেবিলে ধাক্কা লাগে। খোদা না খাস্তা, সেই মৃদু ধাক্কায় ওই মানুষটা নড়ে গেলে, যদি, তাঁর জ্ঞান গড়িয়ে পড়ত। শেষে মার্ডার কেসের আসামি হয়ে যেতাম! কে খুনি হতে চায় এ জগতে হায়...!
জিজ্ঞেস করব করব করেও ওই মানুষটাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। কে জানে, হয়তো না জেনে ভালই হয়েছে। নইলে হয়তো এমন একটা উত্তর শুনতাম, যাতে নিঃশব্দে ওখান থেকে উঠে আসতে হত। চেয়ার সরাতে গিয়ে ভুলে যদি টেবিলে ধাক্কা লাগে। খোদা না খাস্তা, সেই মৃদু ধাক্কায় ওই মানুষটা নড়ে গেলে, যদি, তাঁর জ্ঞান গড়িয়ে পড়ত। শেষে মার্ডার কেসের আসামি হয়ে যেতাম! কে খুনি হতে চায় এ জগতে হায়...!
*প্রথম প্রেমপত্র যেমন ফেলে দেয়া যায় না, তেমনি লিখে প্রথম আয়ের নমুনা ফেলা যায় না। কালে-কালে কাগজ লালচে হোক, তাতে কী!
বিভাগ
স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা
Friday, January 30, 2009
শৈশব, ভাসাভাসা এক স্বপ্ন!
বিভাগ
স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা
Tuesday, September 9, 2008
বীভত্স স্বপ্ন এবং আত্মার ফেরিওয়ালা!
শাহাদুজ্জামান 'বীভত্স মজা' নামে একটা লেখা লিখেছেন। লেখা না বলে এটাকে কি শব্দছন্দ বলা হবে নাকি ছন্দশব্দ এটা বলা মুশকিল! শব্দ নিয়ে এমন হেলাফেলায় জাগলিং সম্ভবত শাহাদুজ্জামানের মত দুঁদে লেখকের পক্ষেই সম্ভব! হায়, কেমন করে পারেন একজন মানুষ শব্দের এমন শব্দনাচ দেখাতে!
শাহাদুজ্জামান আপনি টলটলে পানিঘষা চোখ দিয়ে কী অবলীলায়ই না ফালাফালা করেছেন ঢাকা নগরকে। ঢাকা, যেন লাশকাটা টেবিলে শুয়ে থাকা অপরূপ এক মানব। কিন্তু ব্যবচ্ছেদের পর, একপেট আবর্জনা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো অতি সুদর্শন একজন আর গলিত শবে পার্থক্য কী?
আহা, লুই কান নামের পরিকল্পনাবিদের পরিকল্পনা থেকে আপনি এখনো বেরুতে পারেননি বুঝি! বিদেশি না হলে বুঝি কিছুই আমাদের পাতে দেয়া যায় না? আপনার আর দোষ কী বলুন, যে দেশে আইডিয়া বিক্রি হয় কেজি দরে।
এই হতভাগা দেশে স্বপ্নপুরি কোথায়? কে স্বপ্ন বিক্রি করে, কে স্বপ্ন কেনে? কেই বা স্বপ্ন দেখে, কেই-বা স্বপ্ন দেখায়! কোথায় সেইসব স্বপ্নবাজ, যাদের চোখে উপচে পড়ত স্বপ্ন, যাদের হাড় ক্ষয়ে ক্ষয়ে বেড়ে উঠত স্বপ্নের শেকড়? এরা যে আজ নিজেকেই বিক্রি করতে হন্যে হয়ে ঘুরছে। একটা চাকরির জন্য একে-ওকে ধরছে। কেউ হ্যা হ্যা করে হাসছে, যেন ভারী মজার একটা কিছু শুনল যা হোক। কেউবা অন্য দিকে তাকিয়ে থাকার ভান করে।
এই অভাগা দেশে স্বপ্নবাজদের আদৌ প্রয়োজনই বা কী? স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা এখন থেকে স্বপ্নের বদলে নিজের আত্মা ফেরি করবে অন্ধকারের পশুর কাছে!
শাহাদুজ্জামান আপনি টলটলে পানিঘষা চোখ দিয়ে কী অবলীলায়ই না ফালাফালা করেছেন ঢাকা নগরকে। ঢাকা, যেন লাশকাটা টেবিলে শুয়ে থাকা অপরূপ এক মানব। কিন্তু ব্যবচ্ছেদের পর, একপেট আবর্জনা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো অতি সুদর্শন একজন আর গলিত শবে পার্থক্য কী?
আহা, লুই কান নামের পরিকল্পনাবিদের পরিকল্পনা থেকে আপনি এখনো বেরুতে পারেননি বুঝি! বিদেশি না হলে বুঝি কিছুই আমাদের পাতে দেয়া যায় না? আপনার আর দোষ কী বলুন, যে দেশে আইডিয়া বিক্রি হয় কেজি দরে।
এই হতভাগা দেশে স্বপ্নপুরি কোথায়? কে স্বপ্ন বিক্রি করে, কে স্বপ্ন কেনে? কেই বা স্বপ্ন দেখে, কেই-বা স্বপ্ন দেখায়! কোথায় সেইসব স্বপ্নবাজ, যাদের চোখে উপচে পড়ত স্বপ্ন, যাদের হাড় ক্ষয়ে ক্ষয়ে বেড়ে উঠত স্বপ্নের শেকড়? এরা যে আজ নিজেকেই বিক্রি করতে হন্যে হয়ে ঘুরছে। একটা চাকরির জন্য একে-ওকে ধরছে। কেউ হ্যা হ্যা করে হাসছে, যেন ভারী মজার একটা কিছু শুনল যা হোক। কেউবা অন্য দিকে তাকিয়ে থাকার ভান করে।
এই অভাগা দেশে স্বপ্নবাজদের আদৌ প্রয়োজনই বা কী? স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা এখন থেকে স্বপ্নের বদলে নিজের আত্মা ফেরি করবে অন্ধকারের পশুর কাছে!
বিভাগ
স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা
Monday, July 14, 2008
মিশন পসিবল
আমাদের দেশে ফি বছর বন্যা হওয়াটা বড় জরুরী। নইলে আমরা যে কী মানবদরদী এটা প্রমাণ হবে কেমন করে! বন্যা হয় বলেই না এটা আমরা হাতেনাতে দেখিয়ে দিতে পারি একেকজন কেমন হাজী মহসীন! হেলিকপ্টারে করে কয়েক বসত্মা ত্রাণ না দিলে মানবতা যে আমাদের পগারপার হয়! এটা আমরা শিখেছি আমাদের মহান নেতাদের কাছ থেকে। ত্রাণের বিস্কুট খায় নেতাদের পোষা ঘোড়া। আর ত্রাণের টিন এদের পশ্চাদদেশ ব্যতীত কোথায় লাগানো হয়নি?রাজনীতিবিদদের স্টাইলই আলাদা। এই দেখুন না, যমুনা ব্রীজের জন্য বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা ‘যমুনা সেতু সারচার্জ’ দিলাম আমরা আহাম্মক পাবলিকরা, আর অন্যত্র মারামারি হলো এটা কার সেতু এটা নিয়ে! প্রত্যেকেই ডুয়েল লড়লেন, এঁদের দাবী এরাই নাকি এই সেতু করেছেন। সবই আমরা জানলাম, কেবল জানা হলো না, এঁরা এঁদের কোন তালুকটা বিক্রি করে করে ক-টাকা অমুক্ত হস্তে দিয়েছেন, এটা।
তো, বন্যা এলেই শুরু হয় মানব দরদীদের ত্রাণ কর্মকান্ড। কী সব একেকটা ফটোসেশন! আজকালকার ক্যামেরা, মুন্ডুটা ঘুরিয়ে ক্যামেরার দিকে না এনে তাকালে মুন্ডুর রেহাই নেই, ক্যামেরারও!
আজকাল পত্রিকাওয়ালারাও বছর ধরে ত্রাণ বিতরণ করে আসছেন। মহতী উদ্যেগ সন্দেহ নেই। যারা টাকা দান করছেন তাদের নাম ছাপানো হয়, বেশ। কিন্তু পত্রিকাওয়ালারা বিস্মৃত হন এখানে এদের ভূমিকা কেবল সমন্বয়কারীর। নিজেদের পত্রিকায় নিজেদের ঢোল এমন বাজিয়ে ফেলে, অন্য কেউ ঢোল ফাটিয়ে ফেলার আগেই। নিয়ম করে, ফলাও করে, ওই পত্রিকার গুণগান। ‘... মুইরে বাচাই দিলে’- ‘আফনেরা ইতান দিয়া পুতের কাম করছুইন’। ‘পোত্তম আলো থ্যাকি পোত্তম ইলিপ পাইনো’।
কীসব টাচী বাতচিত- ফাও কী সব দুর্ধর্ষ ছবি! কই ত্রাণ, কই মাথা! ওই যে বললাম, ফটোসেশন! আমার বোধগম্য হয় না, ত্রাণ দিতে গেলে ফটোসেশন করার প্রয়োজনটা কোথায়?
দেখাবার অভিলাষ। এটা সম্ভবত আমরা শিখেছি এ দেশের তথাকথিত ধর্মভীরুদের কাছ থেকে। ক্রমশ বাড়ছে এদের পাঞ্জাবীর ঝুল, দাড়ির চুল, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তসবীর দানা। বাজারে হাঁটতে হাঁটতে তসবীহ টিপছেন, বা মুখে থুথু ভরিয়ে মিসওয়াক নামে দাঁত খুলে ফেলার চেষ্টা করছেন। উনি যে কত আল্লাওয়ালা লোক এটা আমাদেরকে না বোঝানো পযন্ত কারো নিস্কৃতি নেই! ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ধর্ম উদ্ধার করতে। ৩ মাসের চিল্লায় বেরিয়ে পড়বেন, কিন্তু ৩ দিনের জন্য বলে দেখুন না, ত্রাণ নিয়ে বেরিয়ে পড়তে। দেখুন, ক-জনকে পাওয়া যায়!
শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে, এই হার ক্রমশ বাড়ছেই! ক-জন মিলে একটা নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। আসলে এইভাবে বিচ্ছিন্ন করে প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই চালানো যায় না। প্রকৃতির সন্তানরা লড়বে প্রকৃতির বিরুদ্ধে সমানে সমানে। বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত লড়াইয়ে প্রকৃতি নিশ্চয়ই ধিক্কার দেয় তার হেরে যাওয়া, অপুষ্ট সন্তনদের প্রতি। আর এই ধারণা আমাদের মাথা থেকে কবে বের হবে? ত্রাণ নামের সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে কেউ কারও মাথা কিনে নিচ্ছে না। এটা বন্যাকবলিতদের অধিকার। এঁরাও পরোক্ষ ট্যাক্স দিয়ে যাচ্ছেন।
যাই হোক, বন্যার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের ছিল, থাকে? আমার মনে হয় না। বন্যার বিরুদ্ধে যেটা করা প্রয়োজন ছিল, সেটা হচ্ছে পুরোদস্তর যুদ্ধ। এই যুদ্ধে আমি চোখ বন্ধ করে চাইতাম সেনাবাহিনীকে, সশস্ত্রবাহিনীকে। জানি-জানি, অনেকে চোখ সরু করে তাকাচ্ছেন। কেন যেন আমাদের একটা বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে যুদ্ধ ব্যতীত সেনাবাহিনী ব্যারাকের বাইরে থাকতে পারবে না। প্রাণ গেলে যাক, তাতে কী! এ তো স্রেফ ক্ষমতার অপচয়! এমন ভাবনাটা কেন, যেন এরা অন্য গ্রহের কেউ! যেন এদের কারো সঙ্গে আমাদের কারো প্রাণের সম্পর্ক নাই।
অন্যরূপও আছে। সেনাবাহিনীর লোকজনরা কতটা সচেষ্ট এটাও ভাবার বিষয়। থাইল্যান্ডে সম্প্রতী সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, হাসিমুখে থাকার জন্য, কারণ সহজেই অনুমেয়।
কে মাথার দিব্যি দিয়েছে, মানুষের বিরুদ্ধেই কেবল যুদ্ধ হয়, মানুষের জন্য অকল্যাণকর কিছুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বারণ! বাস্তবতা হচ্ছে, বন্যাকে, বন্যার্তদেরকে মোকাবেলা করার জন্য যে ট্রেনিং প্রয়োজন এটা সিভিলিয়ানদের নাই।
একজন ফোন করে আমার কাছে দোয়া চাইলেন। কারণটা জানতে চাইলে তিনি বললেন, ভাইরে, ত্রাণ দিতে যাইতাছি। এই মানুষটাকে ব্যক্তিগতভাবে আমি চিনি। আল্লার কসম, একে সামলাতে ৪ জন লাগবে।এই মানুষটার পাজারোর এসি খারাপ ছিল বলে মাত্র ৬০ মাইল আসতে আসতেই প্রাণ বেরিয়ে যায় এমন অবস্থা। তো, এই বান... নাকি ত্রাণ দেবে। শারীরিক ফিটনেসটা কেন জরুরী এটা বলার অবকাশ নেই!
এই যে ক্রিকেট টীম কমান্ডো ট্রেনিং নিচ্ছে, এতে কি লাভ এ নিয়ে মাথা ঘামাতে ঘামাতে বুদ্ধিজীবী ভায়াদের টিকে থাকা অল্প চুল যায় যায় প্রায়। ক্ষতিটা কী হে বাপু? আজ মজার একটা জিনিস নোটিশ করলাম, ক্রিকেটারদের কমান্ডো ট্রেনিং চলাকালীন সময়ে নিউজ কাভার করতে গেছেন বিভিন্ন পত্রিকার ৩৭ জন সাংবাদিক। এদের যখন বলা হল, ‘চাইলে আপনারাও ট্রেনিং নেয়ার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তাতে ক্রিকেটাররাও সঙ্গ পাবেন’। ইস্ট্রাকটরের এই আহ্বানে ৩৭ জন সাংবাদিকের কেউ, আমাদের সোনার সন্তানেরা, মহতী সাংবাদিক ভাইয়েরা মোটেও আগ্রহ দেখালেন না। অন্তত চেষ্টা করা, এই ভাবনাটাও এদের মাথায় খেলা করেছিল কী!
আসলে নাগরিক আমরা, বড্ডো নাগরিক হয়ে গেছি। ফাস্ট ফুড খাওয়া স্টমাক আর ফ্ল্যাটের এক চিলতে জানালা দিয়ে বিশাল আকাশ দেখা, এসি রুমে বসে বসে কলমবাজী করার বাইরে খুব একটা নড়াচড়া করতে আমাদের ভাল লাগে না। তারচে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের কেবল প্রয়োজন চড়া দামে বিক্রি করার মত তথ্য- আমরা একেকজন চলমান তথ্যবাজ! এর বাইরে ভাবার অবকাশ কই! আমরা এটা কখনই বুঝতে চাইব না, আমরা বুঝতে চাই না, একজন দুর্ধর্ষ তথ্যবাজ আর একজন মানবিক মানুষের অনেক তফাত!
ওয়েল, বলছিলাম, মিশন পসিবলের কথা। মিশন পসিবল, প্রকৃতির বিরুদ্ধে প্রকৃতির সাহসী সন্তানদের যুদ্ধ। ন্যূনতম প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট রেখে ব্যবহার করা হবে সশস্ত্রবাহিনী এবং তাদের সব ধরনের লজিস্টিক, অত্যাধুনিক ইক্যুপমেন্ট, সমস্ত হেলিকপ্টার, স্পীড বোট। নখদর্পনে থাকবে এই দেশের প্রতি ইঞ্চির ম্যাপ। প্রয়োজনে মাউসের এক ক্লিকেই যেন জানা যেতে পারে বন্যা উপদ্রুত এলাকার আপডেট; ঠিক কোন ধরনের সহায়তা প্রয়োজন। ধরা যাক, সাপের কামড়ের প্রতিষেধক, এটা যে এক্ষণ বড়ো প্রয়োজন। একটা টিম এটা চাওয়া মাত্রই হেলিকপ্টার উড়ে গিয়ে দিয়ে আসবে।
সশস্ত্রবাহিনীর পাশাপশি, যে সমস্ত মোল্লারা গাট্টি-বোঁচকা নিয়ে ধর্মপ্রচার করেন এদের অংশগ্রহন করানো যেতে পারে। বন্যায় যেখানে সৃষ্টির সেরা জীব নরকযন্ত্রণা ভোগ করছে সেখানে ধর্মপ্রচার আপাতত কিছুদিনের জন্য মুলতবি রাখলে ১টা আসমান ছিটকে পড়বে না নিশ্চয়ই! এমনিতে সিভিলিয়ানরা, যারা এই মিশনে অংশগ্রহন করবেন, অংশগ্রহনে এদের পযাপ্ত র্ট্রেনিং, অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে দুর্দান্ত কাজে আসবে।
আগে থেকেই ফান্ড আলাদা করে রাখা হবে। কোত্থেকে ফান্ড আসবে? আইডিয়া চাইলে সে দেয়া যাবে নে। এমনিতে প্রত্যেকবার ফান্ড উঠানো শুরু হয় বন্যা শুরু হবার পর, রয়েসয়ে। এটা পরবর্তীতে ঠিক কতটা কাজে লাগে আমার জানা নাই- অন্তত মৃত মানুষের কোন কাজে লাগে বলে তো মনে হয় না!
মিশন পসিবলের যুদ্ধ শুরুর আগে মস্তিষ্কে একটামাত্র তথ্যই কেবল ঘুরপাক খাবে, একজনকেও মরতে দেয়া যাবে না; একজনকেও না। বাই এনি চান্স, কেউ মারা গেলে এটা হবে ওই এলাকার দায়িত্বে থাকা পুরা টিমের ব্যর্থতা। সামরিক কায়দায় বাজবে বিউগল, ধর্মীয় কায়দায় হবে মানুষটার দাফন, মানবিক কায়দায় ওই টিমের সমস্ত লোকজনরা মাথা নীচু করে রাখবেন খানিকক্ষণ- এটা যে তাদের ব্যর্থতা!
মিশন পসিবল। একটি স্বপ্নের নাম। আফসোস, আমাদের দেশে স্বপ্নবাজদের বড়ো অভাব। আর আমরা নিজেরা তো স্বপ্ন দেখাই ভুলে গছি...”।
*এই পোস্টে খানিকটা সংশোধনী হবে। প্রায় হুবহু এই লেখাটা অন্য একটা ওয়েব-সাইটে দেয়ার পর মাহবুব সুমন খানিকটা ভুল ধরিয়ে দেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা।
তিনি লেখেন: "আমাদের তথাকথিত মেধাবী সেনাবাহিনীরতো ডিজাস্টার ম্যানেজম্যান্ট এর কোনো রকম ট্রেনিং নাই। ...তবে দুর্যোগে আমাদের পূর্ব প্রস্তুতি থাকে না এটা মনে হয় পুরুপুরি ঠিক না।"
আমার বক্তব্য ছিল: "ভাল একটা পয়েন্ট বলেছেন। আমি খানিকটা শুধরে নিচ্ছি। ধন্যবাদ আপনাকে।
ঠিক বলেছেন এদের ডিজাষ্টার ম্যানেজমেন্ট-এর ট্রেনিং নাই।
আমি মনে করি, একজন মানুষকে কত দ্রুত মেরে ফেলা যায় এই ট্রেনিং-এর চেয়ে, একজন মানুষকে কত দ্রুত বাঁচানো যায় এই ট্রেনিং সহজ। এদের শিখতে সময় লাগার কথা না।
শিখবে।
ডিজাষ্টার ম্যানেজমেন্ট কেন জরুরী এর উদাহরণ দেয়া যায়। আমেরিকার মত দেশ, সব আছের দেশ। অথচ ক্যাটরিনা যখন আঘাত করল তখন নিউ অর্লিন্সে মানুষ চিকিৎসার অপ্রতুলতায় অসহায়ভাবে মরছিল। তখন পাশের বন্দরে uss bataan জাহাজটি ছিল। যে জাহাজে ছিল ৬টি অপারেটিং রুম এবং ৬০০ হসপিটাল বেড। কিন্তু ওই জাহাজকে কোন কাজেই লাগানো হয়নি। এই জাহাজের ১২০০ নাবিক বসে বসে মশা মারছিল। এটাও ডিজাষ্টার ম্যানেজমেন্ট না-থাকার কুফল।
এদের এখানে প্রকৃতিক বিপর্যয় হয় কালেভদ্রে কিন্তু আমাদের তো নিয়ম করে। অন্তত মিনিমাম প্রস্তুতি যদি আমাদের না থাকে তাহলে বেদনার শ্বাস ফেলে বলতেই হয়, আমাদের প্রাণ, কেজি দরের প্রাণ!
এমনিতে এও সত্য, আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর মহাশয়গণ তো আবার গরম মেজাজের লোক। ত্রানের সঙ্গে ফাউ বেত পেলে ওই ত্রান পিষ্টকখন্ড মনে হবে। এখানে উল্লেখ করা যায় থাই সেনাবাহিনীকে একবার বলা হয়েছিল, হাসিমুখে থাকার জন্য। যেন জনগণ তাদের সঙ্গে একাত্ম বোধ করে। আইডিয়া খারাপ না।
এমনিতে আমাদের সেনাবাহিনী আবার বিচিত্র কারণে বৈদেশে জাতিসংঘ মিশনে অতুলনীয় কাজ দেখান। সিয়েরো লিওন-এর জনগণ তো আমাদের সেনাসদস্যদের কর্মকান্ডে মুগ্ধ হয়ে দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসাবে বাংলাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আল্লা জানে, নিজেদের দেশের জনগণ দেখলে কেন এদের মিজাজ খারাপ হয়।
..............
লিখেছিলাম, প্রস্তুতি থাকে না। এটা আক্ষরিক অর্থে গ্রহন করার প্রয়োজন নাই।
যেটুকু থাকে তাকে প্রস্তুতি বলা চলে না। গত বন্যা বা এর আগে ঠিক মনে নাই। ওই সময় ওর-স্যালাইনের তীব্র সঙ্কট। অনেক জায়গায় একেকটা স্যালাইন ২০-২৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছিল। স্যালাইনের অভাবে ছোট-ছোট বাচ্চা মারা যাচ্ছিল।
এই নিয়ে গা করা অবকাশ আমাদের কই! ওষুধ কোম্পানীগুলো, এর সঙ্গে জড়িত লোকজনের সেকি আনন্দ! ‘ইশকুল খুইলাছে মাওলা’ টাইপের- হরিলুট শুরু হয়ে গিয়েছিল। সরকারী অধিকাংশ হাসপাতালে স্যালাইন ছিল না। সরকারকে এটা কী আমার মত অগাবগার বলে দিতে হবে, বন্যার পর স্যালাইনের চাহিদা বেড়ে যায়?
কেবল সরকারকেই দোষ দেই না। আমরা আম-পাবলিকও কম যাই না। এমনিতে প্রতি শ্বাসে আল্লার নাম নিতে নিতে মুখে ফেনা তুলে ফেলি। কিন্তু বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্য়োগের পর চিড়া, গুড়ে, স্যালাইনের দাম কেন বেড়ে যায়, এটা কার কাছে জানতে চাইব?
বিচিত্র দেশ! জিনিসপত্রের দাম লাগামছাড়া হয় রমজান মাসে-সিয়ামের মাসে। সবচেয়ে বেশি ঘুষ চালাচালি হয় রমজান মাসে।
এসবে আমাদের কোন বিকার নাই।
বড় ধর্মভীরু আমরা। এমনিতে পান থেকে চুন খসলেই ধর্ম গেল রে বলে রব উঠে- আকাশলোকের বাসিন্দার পর্যন্ত ঘুম ভেঙ্গে যায়।
সশস্ত্রবাহিনীর কথা আলাদা করে উল্লেখ করেছিলাম। এই কারণে না যে, এদের প্রতি আমি বিশেষ মমতায় মাখামাখি হয়ে আছি। এদের ট্রেনিং-এর অনেক কিছুই এখানে কাজে লাগবে বিধায়।
পৃথিবীর অনেক দেশে বেসামরিক লোকজন বিভিন্ন মেয়াদে সামরিক ট্রেনিং নেয়। কেউ কাজে, কেউ শখ করে। পরবর্তীতে এই ট্রেনিং বিভিন্ন কাজে লাগে। দেশের জন্য, তার নিজের জন্য।
আমাদের দেশেও এটা চালু করা গেলে মন্দ হয় না। ফাঁকতালে সশস্ত্রবাহিনীর বাড়তি আয় হবে। তবে সমস্যাও আছে। টাকার জন্য হয়তো আমার মত সাধারণরা বাদ পড়ব। কিন্তু ঠিকই গালকাটা রমজান, পেটকাটা রব্বান ট্রেনিং নিয়ে ভজকট করে ফেলবে- আগে যে ভুলভাল করত, এখন আর করবে না! কী মোলায়েম করে গাল কাটা যায়, পেট কাটা যায় এটা রপ্ত করে ফেলবে। কে জানে, হয়তো বা অজান্তেই আমাদের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাবে, ভাইয়ের হাতে যাদু আছে।
মুশকিল হচ্ছে, সশস্ত্রবাহিনীর লোকজনরা ব্যারাক থেকে বের হওয়ামাত্রই নিজেদের মত অন্যদেরকে বানাবার ফিকির খোঁজে। আমার চুল ছোট তো সবার চুল ছোট থাকবে। আমার চেহারা রোবটের মত তো সবার চেহারা রোবটের মত থাকবে। ফুল-শ্লীভ শার্টের হাতা গুটিয়ে রেখেছে কে রে? বান…, ব্যাটন দেখছো, এইটা তোমার…।
কই, আমরা ব্লাডি সিভিলিয়ানরা তো তাদের কাছে জানতে চাই না, তুমি কেন হুবহু আমাদের মত না?
এরা যখন হেলমেট না থাকার অপরাধে প্রকাশ্যে, স্ত্রীর সামনে তার স্বামীকে কান ধরে উঠবস করায় তখন একটা সভ্যতা মৃত্যু হয়। এই ট্রেনিংটা এদের কে দেবে?
এরা ট্রেনিং-এর এই অংশটা পুরাপুরি বিস্মৃত হয়। সামান্য একজন সৈনিকের সঙ্গে তার বউ থাকলে এবং ওই সৈনিকের সাথে জেনারেলের দেখা হলেও সে স্যালুট করবে না, জাস্ট সালাম দেবে। এটা করা হয়েছে স্ত্রীর কাছে তার সৈনিক স্বামীর সম্মানার্থে।
আফসোস, এরা এটা বিস্মৃত হয়, এদের বাবা-মা, ভাই-বোন সামরিক না, বেসামরিক লোক। এরা চুল বড় রাখতে পারে, এরাও বন্যায় ভেসে যেতে পারে, ঝড়ে উড়ে যেতে পারে, লঞ্চ ডুবে মরতে পারে!"
ছবিঋণ: প্রথম আলো
বিভাগ
স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা
Subscribe to:
Posts (Atom)
