Search

Showing posts with label অতিথিদের লেখা. Show all posts
Showing posts with label অতিথিদের লেখা. Show all posts

Friday, July 24, 2026

সুর।

(লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)

লেখক:  Uday Rahman (https://www.facebook.com/share/1E3kyyHRRZ/)

"'আমার দাদির একটা নিয়ম ছিল। রাত বারোটার পর গান বাজানো যাবে না। কেন? জিজ্ঞেস করলে বলতেন, 'জ্বিন আসে'।

আমরা হাসতাম। দাদি রাগ করতেন না। শুধু বলতেন, 'হাসনের জিনিসই ভাবো। খালি বারোটার পরে গান বাজাইয়া নাচন দিও না'।

দাদি মারা গেছেন দশ বছর হলো। আমি এখন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। নিকেতনে একটা স্টুডিওতে বসে সারাদিন অন্যের গান মেশা‌ই, মুভি, নাটক বিজ্ঞাপনের গানের সুর বসাই, ভোকাল মিক্স করি। সুরই আমার পেশা, সুরই আমার ভাত। এবং আজ, এই লেখাটা লিখতে বসছি, কারণ দাদি হয়তো ঠিকই বলতেন।

আমার মায়ের একটা হারমোনিয়াম ছিল। কলকাতার 'দ্বারকিন কোম্পানি'র, হারমোনিয়ামটা আমার মায়ের দাদার আমলের। জিনিসটা বহু বছর খাটের নিচে পড়ে ছিল। গত বছর বের করে দেখি বেলো ফাটা, তিনটা রিড বসে গেছে।

স্টুডিওর এক বংশীবাদক ঠিকানা দিয়ে বললেন, 'নবাবপুরের গলিতে যান। সুর ঘর। করিম ওস্তাদরে খুঁইজা বাইর করেন। তয় একটা কথা', বংশীবাদক একটু থামলেন, 'ওস্তাদের কথাবার্তা একটু অন্যরকম। যা কয়, সব বিশ্বাস কইরেন না। আবার সব অবিশ্বাসও কইরেন না'।

নবাবপুরের সেই গলিটা এত সরু যে রিকশা ঢোকে না। ইলেকট্রিকের দোকান, তালা চাবির দোকান, তার ফাঁকে একটা দরজা, ওপরে রঙিন কালিতে হাতে লেখা সাইনবোর্ড। 

সুর ঘর। প্রোপ্রাইটর: মোঃ হাসন রাজা। সাইনবোর্ডের নিচে ছোট করে লেখা: এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়।

সব কিছু? শুধু বাদ্যযন্ত্র না। সব কিছু! মনে মনে ভাবলাম হাসন রাজা গান বাজনা, জমিদারি সব বাদ দিয়ে এখন বাদ্যযন্ত্র রিপায়ারের দোকান দিলো!

ভেতরে ঢুকে মনে হলো একটা বাদ্যযন্ত্রের পঙ্গু হাসপাতালে ঢুকেছি। দেয়াল জুড়ে ঝুলছে তার ছেড়া বেহালা, দোতারা, ভাঙা সেতার, কোনায় ময়লা-জমা জীর্ণ-এক তানপুরা। আর মেঝেতে, জলচৌকির ওপর, সাদা লুঙ্গি আর বাসন্তী ফতুয়া পরে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। ধবধবে সাদা দাড়ি, চোখে পুরু চশমা, কানে একটা হিয়ারিং এইড। ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। যে মানুষের ব্যবসাই শব্দ, তার কানে যন্ত্র।

আমার মনের কথা পড়ে ফেলার মতো করে উনি বললেন, 'অবাক হইতেছো? সারা জীবন সুর শুনতে শুনতে কান দুইটা শেষ। ডাক্তার কয় আর বছর দুয়েক। তারপর পুরা নীরবতা'।

এভার উনি হাসলেন, আমি চিন্তিত না। কান বন্ধ হইলে ক্ষতি নাই। আসল শোনাটা কানে হয় না'।

আমি বিস্ময় চেপে বলি, 'তাহলে কীসে হয়'?

'শিরায় শিরায়', উনি নিজের বুকে টোকা দিলেন। 'শব্দ জিনিসটারে তুমি কী মনে করো? শুধু কান দিয়া শোনার জিনিস! শব্দ হইলো কাঁপন। তুমি সাউন্ডের কাজ করো, তুমি দেখো না, কনসার্টে বেইজ বাজলে বুকের মইধ্যে কেমন ধুম ধুম করে? ওইটা কানে শোনো, না বুকে গিয়ে লাগে'?

আমি হারমোনিয়ামটা নামিয়ে রাখলাম। উনি ঢাকনা খুলে ভেতরে হাত দিলেন, চোখ বন্ধ করে রিডগুলিতে আঙুল বুলালেন, যেভাবে ডাক্তার রোগীর নাড়ি চেক করে। তারপর বললেন, 'আহারে। কতদিন কেউ বাজায় না'। আমি ভয়ে-ভয়ে বলি, 'ঠিক করা যাবে'?

'যাবে', উনি মুখ তুললেন। 'তয় একটা কথা। আমি বান্ধুম চাইরশো বত্রিশে। তোমাগো স্টুডিওর চাইরশো চল্লিশে না। রাজি থাকলে রাইখা যাও'।

আমি ভুরু কোঁচকালাম। 'চার শো বত্রিশ মানে? এ ফোর ইকুয়ালস ফোর থার্টি টু? ওস্তাদ, সারা পৃথিবীর সব বাদ্যযন্ত্রের স্ট্যান্ডার্ড টিউনিং ফোর ফরটি হার্টজে। ইন্টারন্যাশনাল…'!

'জানি', উনি হাত তুললেন। 'উনিশশো উনচল্লিশ সাল থেইকা স্ট্যান্ডার্ড। তার আগে কী আছিল জানো'?

এটা আমি জানতাম না। স্বীকার করলাম।

'বত্রিশ। হাজার বছর ধইরা ৪৩২। গ্রিকরা বত্রিশে বানত, মিশরিরা বত্রিশে বানত, আমাগো ওস্তাদরা, লালন ফকিররা বত্রিশে বানত। তারপর ১৯৩৯ সালে, ঠিক যখন হিটলার দুনিয়াত আগুন দিতাছে, তখন কারা জানি ঠিক করল, না, আইজ থেইকা দুনিয়ার সব গান আট নম্বর উপরে বাজবো। হইয়া গেলো তোমাগো স্ট্যান্ডার্ড চাইরশো চল্লিশ'! উনি আমার দিকে ঝুঁকলেন। 'তুমি সুরের মানুষ। তুমিই কও। যুদ্ধের মইধ্যে দুনিয়ার মানুষের এত জরুরি কাম পড়ল কেন সুর বদলানির'?আমি ইতস্ততভাবে বললাম, 'হয়তো টেকনিক্যাল কারণ…'!

'হইতে পারে', উনি মাথা নাড়লেন। 'আমি মূর্খ মানুষ, ষড়যন্ত্র বুঝি না। আমি খালি একটা জিনিস বুঝি। আট নম্বরের ফারাকটা খালি কানে ধরা পড়ে না, কিন্তু শইলে ধরা পড়ে। বত্রিশের গান শুনলে মনে হয় নদীর পাড়ে বইসা আছি। বৃষ্টির ঝুমঝুম, চারশো চল্লিশের গান শুনলে মনে হয় কিসের জানি তাড়া। কীসের তাড়া, জানি না, খালি তাড়া। তুমি ভাইবা দেখো, আশি বছর ধইরা গোটা দুনিয়ার মানুষ ওই তাড়ার মইধ্যে গান শুনতাছে। মোবাইলে, বড় সাউন্ড বক্সে, দোকানে, অনুষ্ঠানে সব জাগায়। সবাই খালি কয়, অস্থির লাগে, অস্থির লাগে। কেউ জিগায় না, কেন এত অস্থিরতা'!

আমি বললাম, 'কিন্তু বদলাইলো কারা? কেন'?

'হুনছি অনেক কথা'। উনি রিডটা আলোয় ঘুরাতে ঘুরাতে বললেন। 'ইতালির এক মস্ত ওস্তাদ আছিলেন, ভার্দি সাব। অপেরার বাদশা। উনি জান লড়াইয়া গেছিলেন চারশো বত্রিশ হার্টজ বাঁচানের লাইগা। চিঠি লেখছেন, দরবার করছেন। পারেন নাই। আর এক গবেষক সাহেব বই লেখছেন, কামডা নাকি করছে হিটলারের প্রচারমন্ত্রী আর আমেরিকার এক বড়লোকের ফাউন্ডেশন, মিলামিশা কইরা। মতলব আছিল মানুষরে ভিতরে ভিতরে অস্থির কইরা রাখা। অস্থির মানুষ চালানো সোজা। সত্য মিথ্যা আল্লায় জানে। আমি খালি একটা জিনিস দেখছি। যুদ্ধ থামছে আশি বছর, মানুষের ভিতরের যুদ্ধ থামে নাই। আর সেই যুদ্ধের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা বাজতেছে চাইরশো চল্লিশে'।

উনি হারমোনিয়ামের রিডটা নামিয়ে রেখে আমার দিকে ফিরলেন। 'টেসলা সাবের নাম হুনছো না? গাড়ি না, যেই লোকে দুনিয়ারে বিজলি দিছে? সেই সাব কইয়া গেছেন, মহাবিশ্বের রহস্য বুঝতে হইলে শক্তি, কাঁপন আর ঢেউয়ের ভাষায় ভাবতে হবে। দুনিয়ার সব থেইকা ছোড যেই কণা, সেইটাও নাকি আসলে একটা কাঁপতে থাকা সুতার মত। বোঝলা কথাডা? পাথর, মাটি, তোমার হাড্ডি, এমনকি তোমার চিন্তাডাও, সবই কাঁপন। তাইলে দুনিয়াডারে কী বলা যায়'?

এবার উনি হাসলেন, 'দুনিয়াডা একটা তানপুরা। খোদার তানপুরা। আর আমরা সবাই ওই তানপুরার এক একটা তার। এখন কও, তারের কাম কী? তারের কাম সুরে থাকা, টিউনে থাইকা বাজা। বেসুরা তার বাজতে থাকলে দুনিয়ায় শান্তি কেমনে আসবো, অশান্তি ছাড়া আর কিছু থাকবে'?

আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। লোকটার কথা আধপাগলের মতো, অথচ ফেলে দিতে পারছি না। পেশাগত জীবনে আমি নিজে কতবার খেয়াল করেছি, কিছু মিক্স শুনলে অকারণে ক্লান্ত লাগে।

'পৃথিবীরও একটা সুর আছে, জানো'? ওস্তাদ বলে চললেন, 'জার্মান এক সাহেব মাইপা বাইর করছে। মাটি আর আসমানের মাঝখানে একটা কাঁপন সারাক্ষণ চলতাছে'।

'জ্বী এই ব্যপারে আমার জানা আছে। এটাকে বলে শুমান রেজোন্যান্স'।তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, 'আমার ওস্তাদ কইতেন অন্য নাম'।

উনি একটু থামলেন। 'কইতেন, এইটা দুনিয়ার জিকির। সব কিছু জিকির করে, বুঝলা। পাথর করে, গাছ করে, পশুপাখি করে, আকাশ সাগর সবেই করে। খালি মানুষ নিজের কানে শুনতে পায় না'।

আমি অবাক হয়ে বলি, 'আপনি শুনেছেন'?

উনি উত্তর দিলেন না। হারমোনিয়ামের একটা রিড খুলে আলোর দিকে ধরে পরীক্ষা করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, 'সাতদিন পরে আইসো। জিনিস রেডি থাকবো'।

সাতদিন পর গিয়ে দেখি হারমোনিয়াম নতুন যৌবন পেয়েছে। ওস্তাদ বললেন, 'শুনো'।

উনি একটা চেনা সুর ধরলেন, কিন্তু গানের কথা মনে এলো না। এবং আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারব না কী হলো। শব্দটা কানে ঢুকল না। শব্দটা বুকে ঢুকল। মনে হলো কেউ আমার পাঁজরের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে খুব পুরনো একটা তালা খুলে দিল। আমার চোখ ভিজে উঠছিল, অকারণে, এবং সেটা লুকানোর জন্য আমি মাথা নিচু করে রইলাম। জানালার কার্নিশে দুইটা চড়ুই এসে বসল। গলির কুকুরটা দরজায় এসে চুপ করে বসে পড়ল। উনি থামার পরেও ঘরটা কয়েক সেকেন্ড ধরে বাজতে থাকল।

'বুঝলা কিছু'? ওস্তাদ নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

আমার ঘোর কাটেনি, এটা… এটা কী হলো'?

'কিছুই হয় নাই। খালি যন্ত্রটারে তার নিজের সুরে ফেরত দিছি'। উনি আমার দিকে তাকালেন। 'তোমারে ফেরত দিছি। মানুষের শইলের সত্তর ভাগ পানি। আর পানি কাঁপনের কথা শোনে। জাপানি ডাক্তার সাব পরীক্ষা কইরা দেখছেন। পানিরে সুন্দর সুর শুনাইয়া বরফ করলে বরফের ফুলের নকশা বানালে তা হয় নিখুঁত সুন্দর। আর বিকট শব্দ, গালাগালি শুনাইয়া বরফ করলে ফুলডা হয় ভাঙা, তুবড়ানো, লন্ডভন্ড। এইবার হিসাবডা করো। তোমার ভিতরে সত্তর ভাগ পানি, আর তুমি সকাল থেইকা রাইত পর্যন্ত কানে কী ঢালতেছ এই ঢাকা শহরে? হর্ন, ঝগড়া, মিটিংয়ের চিল্লানি, ব্রেকিং নিউজ, মিটিং, মিছিল। ভিতরে রোজ কী জমতেছে, সুন্দর নকশা না ভাঙন? তুমি এতক্ষণ সঠিক সুরে কাঁপলা। এই প্রথম, হয়তো বহু বছরে। এইজন্যই চোখে পানি আইছে। পানি পানিরে চিনছে'।

এরপর থেকে আমি প্রায়ই যেতাম। কাজ থাকুক না থাকুক। ওস্তাদ চা খাওয়াতেন আর কথা বলতেন। সেই কথাগুলি আমি লিখে রাখতাম, রাতে, মনে করে করে।

সুরাইয়ার সাথে দেখা হলো তৃতীয় সপ্তাহে। সেদিন দোকানে ঢুকে দেখি জলচৌকিতে ওস্তাদ নেই। বসে আছে এক তরুণী, কোলে একটা বেহালা। চোখ বন্ধ, কাধ বেহালার গায়ে ঠেকানো, কী-এক মলিন বিষন্ন সুন্দর সুর তাতে বাজছে সে বোঝাতে পারবো না। আমি ঢুকতেই চোখ না খুলে বললো, 'বসেন। দাদাজান ওষুধ আনতে গেছেন'।

আমি বসলাম। মেয়েটা আরও মিনিট দুয়েক তার বন্ধ চোখে সুরের সাধনা চালালো। তারপর চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আপনিই সেই সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার? দাদাজান আপনার কথা বলেন। কয়, পোলাডার কান আছে, খালি কানের ব্যবহার জানে না'।

'মানে', আবাক আমি?

সে উত্তর না-দিয়ে বেহালায় পরপর দুইটা টান দিল। 'ফারাক কি, বলেন তো'।

আমি শুনলাম। মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। 'একই তো লাগল'।

'এই জন্যই দাদাজান ওই কথা কয়'। সে বেহালা নামিয়ে রাখল। 'প্রথমটা চাইরশো চল্লিশ, পরেরটা বত্রিশ। আপনে সারাদিন যেইটা বেচেন, আর যেইটা হারাইয়া ফেলছেন'।

মেয়েটার নাম সুরাইয়া। ওস্তাদের নাতনি, স্কুলে গান শেখায়, আর ওস্তাদের চোদ্দ পুরুষের বিদ্যার একমাত্র ওয়ারিশ। কথার মাঝখানে গলিতে একটা রিকশা বেল বাজাতে বাজাতে গেল। সুরাইয়া এমনভাবে মুখ কোঁচকাল 'শুনছেন? বেলটা গত সপ্তাহ থেইকা বেসুরা। কমা খানিক নাইমা গেছে। রোজ শুনি আর রোজ মেজাজ খারাপ হয়'।

'আশ্চর্য, রিকশার বেলেরও সুর থাকে'?

'সব কিছুর সুর থাকে'। সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল। 'সাইনবোর্ড পড়েন নাই'?

যাওয়ার সময় সে বললো, 'একটা কথা। দাদাজানের সব কথা বিশ্বাস কইরেন না'।

আমি হেসে বললাম, 'আবার সব অবিশ্বাসও করব না'?

সুরাইয়া প্রথমবারের মতো হাসল। বলল, 'ভালই তো চিনছেন তারে'।

এরপর থেকে সুর ঘরে আমার যাওয়ার কারণ দুইটা হয়ে গেল। এই তথ্যটা আমি ওস্তাদকে কোনোদিন বলিনি। বলার দরকারও ছিল না। বুড়া জানে না, বুঝে না এমন কিছুই মনে হয় নাই।

সুরাইয়ার সাথে আমার সবচেয়ে বড় তর্কটা হয়েছিল এক সন্ধ্যায়, দোকানে, ওস্তাদ তখন মসজিদে। ও হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, 'আপনি স্টুডিওতে কী-কী বানান'?

আমি গর্ব করে বললাম, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড, আইটেম গান।

সুরাইয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'আপনি জানেন আপনি আসলে কী বানান? আপনি হিপনোটিস্ট, সুরকার সাহেব। মানুষের অজান্তে মানুষের মন চালানোর যন্ত্র বানান। খালি জানেন না'।

আমি উদাস হয়ে বলি, 'বাড়ায়া বলতেছো'।

'একটা দুঃখের গান ছাড়েন, তারপর নিজেরে খেয়াল কইরেন। পাঁচ মিনিট পরে দেখবেন কাঁধটা কখন নুইয়া গেছে, মুখের হাসিটা কখন মিলাইছে, আপনি নিজেও টের পান নাই। কেউ আপনারে কয় নাই, দুঃখী হন। এইটারে কী কয়? হুকুম মানা। মস্তিষ্কে ডোপামিন বইলা একটা জিনিস আছে, আনন্দের কেমিক্যাল। মাপজোক কইরা দেখা গেছে, প্রিয় গান শুনলে মগজ ঠিক ততটুকু ডোপামিন ছাড়ে যতটুকু ছাড়ে প্রেমে পড়লে। বোঝলেন? আপনার হাতের মিক্সিং কনসোলটা মানুষের মগজের কেমিস্ট্রি বদলানোর মেশিন'।

খানিকটা অবাক হই, 'ভালো কথা। তাতে ক্ষতিটা কী'?

'ক্ষতি'? সুরাইয়ার গলা নেমে গেল। 'আমেরিকায় এক কনসার্টে দশটা মানুষ মারা গেছে, পায়ের নিচে চাপা পইড়া, শুনছেন? সবাই কয় ভিড়ের দুর্ঘটনা। ভিড়টা বানাইলো কে? হাজার-হাজার মানুষ এক বিটে মাথা নাড়তেছিল, এক কাঁপনে শরীর দুলাইতেছিল। হার্টের তালটারে টাইনা নিজের তালে নেয়। তখন মানুষের যুক্তিবুদ্ধি কমে, নিজের উপর দখল কমে, ভিড়ের লগে মিশা যাওয়ার টান বাড়ে। মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না, ঢেউ হয়া যায়। আর ঢেউয়ের কোনো বিবেক নাই'।

খানিক্ষণ চুপ থেকে বলল, 'হিটলার যুদ্ধের সময় এই বিদ্যা জানতো। মশাল, এক ছন্দের স্লোগান, এক কাঁপনে লাখ মানুষের গলা। ওই কাঁপন মানুষরে ব্যক্তি থেইকা দল বানাইতো। আর দল তখন যা করছে, একলা মানুষ জীবনেও করত না। ইতিহাস পড়েন নাই'?

আমি হাসি, আপনার মত সবজান্তা দাদা তো আমার নাই। আমি কেমনে জানবো এগুলা'।

সুরাইয়া বলেই যাচ্ছে, দাদা নাতনির একই স্বভাব, লেকচার শুরু করলে সহজে থামে না, 'শব্দ দিয়া মানুষরে এক করা যায়, আবার শব্দ দিয়াই মানুষ ভাঙা যায়। যে জাতিরে শেষ করতে চাও, আগে তার গান নষ্ট করো। গান হইলো জাতির সবচেয়ে গভীরের শিরা'।

আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। কারণ আমার মনে পড়ছিল, স্টুডিওতে ক্লায়েন্ট প্রায়ই বলে, ভাই, বিটটা আরও অ্যাগ্রেসিভ করেন, মানুষ যেন বইসা থাকতে না পারে।

'তাইলে করণীয় কী'? আমি জিজ্ঞেস করলাম। 'কানে তুলা দিয়া ঘুরবো'?

'না'। সুরাইয়া হাসল। 'বাছবেন। মানুষ মুখে কী ঢুকাইবো দশবার দেখে, আর কানে সারাদিন যা আসে তা-ই ঢালে। পচা খাবারে পেট খারাপ হয় একদিনে, টের পাওয়া যায়। পচা শব্দে মন খারাপ হয়, সহজে টেরও পাওয়া যায় না। যেই গান শোনার পরে আপনার ভিতরটা অস্থির লাগে, রাগ-রাগ লাগে, ওই গান আপনার খাদ্য না, ওইটা বিষ, যত মিঠাই লাগুক। আর যেই শব্দ শোনার পরে ভিতরটা শান্তি পায়, ওইটা ওষুধ।প্রকৃতির শব্দগুলো'। ও জানালার দিকে তাকাল। 'বৃষ্টির শব্দে ঘুম আসে ক্যান জানেন? ওই কাঁপন মগজরে কয়, বিপদ নাই, শুইয়া পড়ো। বৃষ্টির রাইতে বাঘও শিকারে বাইর হয় না। পাখির ডাকে সকালে মন ফুরফুরা লাগে, কারণ পাখি ডাকে খালি নিরাপদ ভোরে, মগজ এইটা লাখ বছর ধইরা জানে। আর সাগরের ঢেউয়ের শব্দ মানুষরে মনে করাইয়া দেয়, সে নিজের চাইতে বড় কিছুর অংশ। খেয়াল করছেন কোনোদিন, বন, নদী, বৃষ্টি, পাখি, প্রকৃতির সব শব্দ ওই চারশো বত্রিশের ঘরের আশেপাশে? আর আমরা থাকি সারাদিন চল্লিশে বান্ধা শহরের ভিতরে। পাহাড়ে গেলে মনে হয় এতদিনে শ্বাস নিতে পারতেছি, সাগরপাড়ে গেলে মনে হয় কতদিন পরে নিজেরে খুঁইজা পাইলাম। আসলে আমরা কিছু খুঁইজা পাই না।আমরা ফিরা যাই। যেই কাঁপনে আমরা বানানো, সেই কাঁপনে'। একনাগাড়ে কথা বলে এবার থামে!

সেই সন্ধ্যার পর থেকে আমার কাজ করার হাতটা বদলে গেল। কনসোলে বসলেই মনে হতো, সুরাইয়া আর তার দাদা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সুরের টিউন ৪৩২ এ নামিয়ে দিতাম। ক্লায়েন্ট টের পেত না।

ওস্তাদ একদিন বললেন, 'আজান শুনলে বুকে টান লাগে ক্যান জানো? ওই শব্দ তুমি শুনছ জন্মের পর থেইকা, দিনে পাঁচবার। শব্দ বারবার শুনলে সে মগজের ভিতরে রাস্তা কাইটা নেয়। যত শুনবা, রাস্তা তত গভীর। সুরা ফাতিহা রোজ প্রতি নামাজে পড়ায় ক্যান? বিপদের দিন যখন মাথা কাম করবো না, তখন ওই রাস্তা দিয়াই শব্দ নিজে নিজে বাইর হয়া আসবো। আর মুসলমানের ঘরে বাচ্চা জন্মাইলে সবার আগে ডাইন কানে আজান দেয় ক্যান, কোনোদিন ভাবছ? দুনিয়ায় আইসা বাচ্চাটা পয়লা যেই শব্দ শুনবো, সেইটা যাতে ঠিক সুরে বান্ধা থাকে। মানুষের টিউনিং শুরু হয় জন্মের পয়লা মিনিটে। আরেকটা জিনিস কই, বিজ্ঞানীরা মাইপা দেখছে। বুকের ভিতর দিয়া একটা লম্বা রগ নামছে, কইলজা ছুঁইয়া, পেট পর্যন্ত। আরবি মাখরাজের কাঁপন, ধীরলয়ে তিলাওয়াতের গুনগুন, ওই রগটারে জাগাইয়া দেয়। আর ওই রগ জাগলে বুক ধীর হয়, পেট শান্ত হয়। দোয়া পড়লে বুকটা হালকা লাগে ক্যান, এতদিনে বুঝলা? এইটা খালি সওয়াব না-রে, ভাই। এইটা শরীর। খোদা মানুষের শইলের ভিতরেই তার নিজের কমান্ডের লাইন বসাইয়া রাখছেন'।

এই পর্যন্ত পড়ে আপনার মনে হতে পারে, ভালোই তো, এক জ্ঞানী বুড়ার সাথে এক যুবকের আলাপের গল্প। মনে হওয়ারই কথা। আসল গল্পটা আমি ইচ্ছা করে শেষের জন্য রেখেছি।

এক বিকালে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'ওস্তাদ, আপনার সাইনবোর্ডে লেখা, এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়। সব কিছু মানে কী'?

ওস্তাদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর উঠে ভেতরের ঘর থেকে একটা পুরনো টিনের বাক্স আনলেন। বাক্সের ভেতরে কাপড়ে মোড়া একটা বাঁশের বাঁশি। কালো হয়ে যাওয়া, মাথায় রুপার কাজ।

'আমার ওস্তাদের ওস্তাদের ওস্তাদের… হিসাব রাখি নাই কত পুরুষ। এই বাঁশি বাজে না। মানে, আমরা বাজাই না'। 

উনি বাঁশিটা ছুঁলেনও না, শুধু তাকিয়ে রইলেন। 'জার্মানিতে একটা শহর আছে। হ্যামেলিন। সাতশো বছর আগে ওই শহরে এক বাঁশিওয়ালা আসছিলো। প্রথমে এক সুর বাজাইলো, শহরের সব ইন্দুর নদীতে গিয়া ডুবল। শহরের লোকেরা তারে ওয়াদামত টাকা দিলো না। সে তখন আরেক নতুন সুর বাজাইলো। এইবার বাইর হয়া আসলো শহরের একশো তিরিশটা বাচ্চা। ঘুমঘুম চোখে, মা বাপের ডাক, নিষেধ কিছুই কানে যায় না, খালি সুরটাই কানে যায়। পাহাড়ের ভিতরে ঢুইকা গেল। আর ফিরে নাই। মানুষ কয় রূপকথা। ওই শহরের পুরানা দলিলে ঘটনাটা লেখা আছে, তারিখসহ। এই জিনিস যে আইজও চলতেছে না তুমি কেমনে জানবা'?

উনি আমার দিকে তাকালেন। 'এইবার আসল কথাটা শোনো। এক বাঁশি। ইন্দুরের লাইগা এক সুর, মানুষের লাইগা আরেক সুর। মানে বোঝো? প্রত্যেক জিনিসের একটা নিজের কাঁপন আছে, আর ওই কাঁপনটা খুঁইজা পাইলে জিনিসটারে যেদিকে ইচ্ছা টানা যায়। সাপুড়ের বীণ সাপরে টানে। মাজারের জিকির মানুষরে ঘোরায়। প্রশ্ন হইলো, সবচেয়ে উপরের সুরটা কী? যেই সুরে সব বান্ধা'?

আমি চুপ করে রইলাম।

তিনি বলে যাচ্ছেন, 'আল্লাহ দুনিয়া বানাইছেন ক্যামনে, কোরানে আছে। কুন ফায়াকুন। হও, আর হইয়া গেল। খেয়াল কইরো, উনি হাত দিয়া বানান নাই, মাটি দিয়া শুরু করেন নাই। শুরু করছেন একটা শব্দ দিয়া। আর শেষটা হইবো ক্যামনে তাও তো জানো? সেইটাও শব্দ। ইস্রাফিল ফেরেশতা সৃষ্টির পয়লা দিন থেইকা শিঙা ঠোঁটে লাগাইয়া খাড়াইয়া আছেন। এক ফুঁয়ের অপেক্ষায়। চিন্তা কইরা দেখো ব্যাপারটা। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বাদক, অনন্তকাল ধইরা রেডি হইয়া আছেন, খালি হুকুম আসে নাই বইলা বাজান নাই। তাইলে দুনিয়াটা কী দাঁড়াইলো? দুই নোটের মাঝখানের একটা গান। পয়লা নোটটা বাইজা গেছে, শেষ নোটটা এখনো বাজে নাই। আমরা সবাই ওই মাঝখানের সুরটার তালেই দুলতে থাকি। এইবার বুঝলা, সাইনবোর্ডে ক্যান লেখছি এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়? সব কিছু আসলেই সুরে বান্ধা। শুরু থেইকা শেষ পর্যন্ত। এখন চিন্তা করো, ওই পয়লা শব্দটার কাঁপন কত আছিল'?

আমি শুধুই হাঁ হয়ে শুনছি ওনার কথাবার্তা। আমার মাথায় সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে!

ওস্তাদের গলা নেমে ফিসফিসে ঠেকল। 'আমার ওস্তাদ মরনের আগে একবার, খালি একবার, ওই সুরের ষোলো ভাগের এক ভাগ খুঁজে পাইছিলেন। তার নিজের গলায়, বাদ্যযন্ত্রে না। আমি পাশে বসা। আমি তোমারে কসম কইরা কইতাছি, ঘরের বাতাস ভারি হয়া গেছিল, দেয়ালের চুন ঝরছিল, আর আমার মনে হইছিল আমি জন্মের আগের কোনো জায়গার কথা মনে করতে পারতাছি। তারপর ওস্তাদ থাইমা গেলেন। কইলেন, বাকিটা বাজাইলে ফেরত আসন যাইবো না'।

আমার মুখ ঝুলে পড়ে, 'ফেরত আসা যাবে না মানে'?

'মানে ওই বাচ্চাগুলার মতো'। উনি হামেলিনের দিকে ইশারা করলেন, যেন শহরটা পাশের ঘরে। 'সুর যখন ডাকে, তখন যাইতে হয়। যেই সুররে আমরা মানা করতে পারি না। রাইত বারোটার পরে দুনিয়া চুপ হয়া নিজের জিকিরে ফিরা যায়। তখন তুমি যেই সুর বাজাইবা, সেই সুর বহুদূর যায়। এবং,' উনি থামলেন, 'সব কান দুনিয়ার না'।

'জ্বীন'?

'নাম দিয়া কী করবা।” ওস্তাদ বাক্সটা বন্ধ করলেন। 'যে শোনে, সে শোনে। আর যে শোনে, সে মাঝে-মাঝে কাছেও আসে'।

এই ঘটনার মাস দুয়েক পরের কথা। বৃহস্পতিবার রাত। স্টুডিওতে কাজ শেষ হতে হতে অনেক দেরি হয়ে গেল। বাসায় ফেরার পথে মনে পড়ল, ওস্তাদ আমার জন্য একটা পুরনো ম্যান্ডোলিন ঠিক করে রেখেছেন, নিতে বলেছিলেন। ঘড়িতে তখন বারোটা বেজে দশ।

গলিতে ঢুকে আমি থমকে গেলাম।

গলিটা নিস্তব্ধ। শুধু নিস্তব্ধ না, অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। ঢাকা শহর রাত বারোটায়ও এতটা চুপ হয় না। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে, কি যে অপূর্ব বিষন্ন সুর ঘরের বন্ধ দরজার ফাঁক গলে ভেসে আসছিলো।

এবং সুরটা একা ছিল না। একটা যন্ত্র বাজছিল, বাঁশির মতো, অথচ বাঁশি না। আর তার সাথে, খুব নিচু, প্রায় ফিসফিসের মতো, একটা মানুষের গলা মিশে ছিল। মেয়েলি মোলায়েম গলা। খুব চেনা ধাঁচের, অথচ ধরতে পারছিলাম না কার।

আমি জীবনে বহু গান শুনেছি। পেশাই আমার শোনা। ওই সুরের সাথে কোনো কিছুর তুলনা আমি দিতে পারব না। শুধু বলতে পারি, সুরটা শুনে আমার একইসাথে মনে হচ্ছিল মায়ের কথা, মনে হচ্ছিল দাদির কথা, মনে হচ্ছিল এমন সব জায়গার কথা যেখানে আমি কোনোদিন যাইনি অথচ চিনি। আমার পা মাটিতে গেঁথে গিয়েছিল। এবং তখন আমি জিনিসটা দেখলাম।

গলির ইঁদুরগুলি। ড্রেনের ধার থেকে, ডাস্টবিনের পাশ থেকে, ওরা বেরিয়ে এসেছে। কেউ দৌড়াচ্ছে না। ওরা বসে আছে। সার বেঁধে, চুপ করে, সুর ঘরের দরজার দিকে মুখ করে, যেভাবে মসজিদে মানুষ সারি বেধে বসে।

সুরটা থেমে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলল। ওস্তাদ দাঁড়িয়ে। ওনার মুখ দেখে আমার বুক ধক করে উঠল। উনি কাঁদছিলেন, এবং একইসাথে ওনার মুখে এমন একটা আলো, যেটার কোনো নাম আমি জানি না।

উনি আমাকে দেখে চমকালেন না। শুধু বললেন, 'শুনছো'?

আমি মাথা নাড়লাম।

'কতখানি শুনছো'?

আমি খানিকটা ভেবে বললাম, গলির মাথা থেকে'।

উনি কী যেন হিসাব করলেন মনে মনে। তারপর বললেন, 'যাও। বাড়িত যাও। দৌড়ায়া যাইবা না, হাঁইটা যাইবা, তয় পিছে ফিরবা না'।” আমি ঘুরে হাঁটা দিতেই পেছন থেকে ডাকলেন, 'শোনো'। আমি থামলাম, ফিরলাম না। উনি বললেন, 'তোমার দাদি ঠিক আছিলেন। মুরুব্বিগো কথা ফালাইও না'।

ওইটাই শেষ কথা।

পরের শুক্রবার গিয়ে দেখি সুর ঘর তালাবন্ধ। তার পরের শুক্রবারও। পাশের দোকানদার বলল, 'ওস্তাদের খবর জানি না ভাই। তয় একটা জিনিস আপনের লাইগা রাইখা গেছে'।

সে ভেতর থেকে আমার সেই ম্যান্ডোলিনটা আনলো, সাথে একটা ভাঁজ করা কাগজ। কাগজে কাঁপা হাতে লেখা:

'সুরটা এতদিন আমি খুঁজতাম। কয়দিন ধইরা টের পাইতেছিলাম, সেই সুরটাও আমারে খুঁজে। বৃহস্পতিবার রাইতে আমরা দুইজন দুইজনরে পাইছি। চিন্তা কইরো না। যেই সুরের ডাকে, হ্যামেলনের বাচ্চারা হাসতে-হাসতে গেছিলো, সেই ডাক খারাপ কিছু হইতে পারে না। খালি আফসোস, তোমারে পুরাটা শোনাইতে পারলাম না। তোমার হারমোনিয়াম, ম্যান্ডোলিন চারশো বত্রিশে বান্ধা। ওইটারে কোনোদিন চল্লিশে তুইলো না। রোজ বাজাইও, দুনিয়া তোমারে সারাদিন যেই সুরে বান্ধে, রাইতে ঘরে ফিরা নিজেরে নিজের সুরে টিউনে ফিরাইয়া নিও'।

সুর ঘর অবশ্য বেশিদিন বন্ধ থাকেনি! মাস খানেক পর গলি দিয়ে যাচ্ছি, দেখি দরজা খোলা। ভেতরে জলচৌকিতে বসে আছে সুরাইয়া। দাদার জায়গায়, দাদার ভঙ্গিতে। আমাকে দেখে মুখ তুলল। চোখ দুটো লাল, তবে শান্ত।

মুখ তুলে বলল, 'দোকান তো বন্ধ করা যাইবো না, এমন ভঙ্গিতে বলল, যেন আমি প্রশ্ন করেছি। 'শহর ভরা বেসুরা জিনিস। কেউরে তো সুরে বান্ধন লাগবো'।

আমি অনেকদিন কথাটা জিজ্ঞেস করব করব করে করিনি। সেদিন করলাম। 'সুরাইয়া। ওই রাতে যন্ত্রের সাথে একটা গলাও ছিল। মেয়ের গলা। তুমি ছিলা'?

সে বেহালার ধুলা মুছছিল। হাতটা থেমে গেল। অনেকক্ষণ পর বলল, 'আমি ওই রাইতে চিটাগাংয়ে। খালার বাসায়'।

'তাহলে গলাটা কার'?

'দাদাজান একটা কথা কইতেন', সুরাইয়া মুখ তুলল না। 'সুরটা যখন কাউরে নিতে আসে, একলা আসে না। চেনা গলা ধইরা আসে। যেই গলা শুনলে মানুষ আর না-কইতে পারে না। দাদাজানের কাছে মনে হয় গেছিল ওনার মায়ের গলায়। দাদাজানের মা গান গাইতেন, জানেন তো'।

তারপর সে মুখ তুলল, এবং আমার সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আপনার কাছে যেদিন আসবো, কার গলায় আসবো, ভাবছেন কোনোদিন'?

গলির ভেতর দিয়ে একটা রিকশা বেল বাজিয়ে গেল। সেই বেসুরা বেল। আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম, তারপর দুজনেই হেসে ফেললাম। ভয়ের পরের হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি হাসি।

এই গল্পের বাকি অংশে একটা বিয়ে আছে। সুরাইয়ার সাথে আমার। প্রেমের অংশটুকু আমি ইচ্ছা করে বাদ দিলাম। কিছু সুর সবাইকে শোনাতে নেই।

শুধু এটুকু বলি, কাবিনের দিন সুরাইয়া তার দাদার সেই টিনের বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলো, 'এইটা এখন আমাদের সংসারের জিনিস। শর্ত একটাই। ঢাকনা খোলা যাইবো না'।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'কোনোদিনই না'?

সে বলেছিল, 'যেদিন খোলার দিন আসবো, সেদিন আপনারে জিগানো লাগবো না। বাক্স নিজেই জানান দিবো'।

এরপর দুই বছর কেটে গেছে। আমি এখনো স্টুডিওতে সারাদিন চার শো চল্লিশে অন্যের গান বাঁধি। পেট চালাতে হয়। কিন্তু রোজ রাতে বাসায় ফিরে মায়ের হারমোনিয়ামটা বাজাই। সুরাইয়া পাশে বসে গলা মেলায়। দুনিয়া আমাদের সারাদিন যে সুরে চালায়, রাতে আমরা নিজেদের নিজেদের টিউনে ফিরিয়ে নিই।

আর গত মাসে আমাদের মেয়ে হয়েছে।

হাসপাতালের কেবিনে, নিয়ম মতো, আমি ওর ডান কানে আজান দিলাম। এবং একটা আশ্চর্য জিনিস হলো। আজানের প্রথম শব্দে বাচ্চাটার কান্না থেমে গেল। এক সেকেন্ডে। নার্স হেসে বলল, 'মাশাল্লাহ, কী শান্ত বাচ্চা'। সুরাইয়া আমার দিকে তাকাল, আমি সুরাইয়ার দিকে। 

বাচ্চাটা শান্ত হয়নি। বাচ্চাটা শুনছিল। মন দিয়ে, পেশাদার কানে শুনছিল। ওর টিউনিং হচ্ছিল, জীবনের প্রথম মিনিটে, ওর বড়দাদার ওস্তাদের কথামতো।

মেয়ের নাম রেখেছি আয়াত।

কাল রাতের কথা। শহর একদম চুপ হয়ে গিয়েছিল এবং সেই নীরবতার ভেতরে মায়ের হারমোনিয়ামের রিডটা কেঁপে উঠল। সাথে সেই বক্সে রাখা বাদ্যযন্ত্র।

আর বিছানায়, ঘুমের ভেতরে, আমার এক মাসের মেয়ে সেই একই সুরে গুনগুন করে উঠল। এক চুল এদিক ওদিক না।

সুরাইয়ার হাত অন্ধকারে আমার হাত খুঁজে নিল। ও ফিসফিস করে বলল, 'শুনছো'?

আমি বললাম, 'হুঁ'।

ও বলল, 'ভয় পাইছ'?

আমি অনেকক্ষণ ভেবে সত্যি উত্তরটা দিলাম। 'না'।

সত্যিই ভয় পাইনি। কারণ ততদিনে আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি।

এই সব জানার পর থেকে আমার একটাই অভ্যাস বদলেছে। আমি এখন শব্দ বাছি। যেভাবে মানুষ খাবার বাছে। আপনি পেটে কী ঢালেন তার হিসাব রাখেন, ক্যালরি গোনেন, ভেজাল দেখেন। কানে সারাদিন কী ঢালছেন, তার হিসাব শেষ কবে করেছেন? যেই শব্দ শুনে ভেতরটা তেতে ওঠে, সেটা বিনোদন না, সেটা ডোজ। আর যেই শব্দ শুনে ভেতরটা শান্ত হয়, বৃষ্টি, তিলাওয়াত, মায়ের গলা, ভালো একটা গান, সেটার দাম ওষুধের চেয়ে বেশি। মহাবিশ্ব সবসময়ই কথা বলছে, সুরে চালাচ্ছে, ওস্তাদ বলতেন। প্রশ্ন হলো আমরা কী শুনছি, আর কারটা শুনছি।

তবে দাদির নিয়মটা আমি এখনো মানি। রাত বারোটার পর আমাদের বাসায় কেউ গান বাজায় না।

সমস্যা একটাই। মাঝে মাঝে, খুব গভীর রাতে, সুর নিজেই আমাদের বাসায় বেজে ওঠে।

ওইটা তো আর আমার হাতে না।"

লেখক:  Uday Rahman

Tuesday, May 19, 2026

One Reason Why Bangladesh Is Becoming More Violent?

The Invisible Poison: 

লেখক: Sadman Fakid: https://www.facebook.com/share/1ayx6hX1nS/

(লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)

"ইউএস-এ আসার পর আমি আর আনিকা একটা জিনিস খেয়াল করলাম।

Friday, January 9, 2026

অপারেশন অয়েলহেভেন!

লেখক: Ratul Khan

"অন্ধকার হতেই চারদিক ঘিরে ফেলল ডেল্টা-সীল ফোর্সের ১২ জন চৌকষ কমান্ডো।

অত্যাধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত মার্কিন এলিট ফোর্স ডেল্টা'র ৮ জন এবং সীল'র ৪ জনের সমন্বয়ে গঠিত ১২ সদস্যের চৌকষ এই দলটির নেতৃতে আছেন মেজর জেমস রোলিন্স, যার কোডনেম 'ডেল্টা ওয়ান'। তাঁরা যে টপ সিক্রেট মিশনে এসেছেন তার কোড নেম 'অপারেশন অয়েলহেভেন', পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তেলক্ষেত্র দখলের কমান্ডো মিশন! 

তেলের জন্য একের পর এক দেশ আক্রমণ করে তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোলান ট্রাম  নতুন কৌশল নিয়েছেন। পুরো দেশ আক্রমণ না করে শুধু্মাত্র বৃহৎ তেলক্ষেত্রটি দখলে নেবেন। 

মেজর  রোলিন্স তাঁর দলের কমান্ডোদের সাথে শেষ মুহুর্তের যোগাযোগ সেরে নেয়ার উদ্দেশ্যে হাতের সাথে লাগানো কমিউনিকেশন ডিভাইস মুখের কাছে নিয়ে আসলেন।

- ডেল্টা ওয়ান কলিং ডেল্টা সেভেন। ডু ইউ কপি?

- কপি ডেল্টা ওয়ান।

- ইজ এভরিওয়ান ইন পজিশন?

- পজিটিভ, ডেল্টা ওয়ান।

- গুড। ঠিক আটটা বাজতেই আমরা আক্রমণ করব। ওভার।

- রাইট স্যার। ওভার অ্যান্ড আউট।

অন্ধকারে লুমিনাস ঘড়িটার দিকে তাকালেন মেজর, আটটা বাজতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। মেজর রোলিন্স স্বস্তি বোধ করলেন, এভরিথিং ইজ গোয়িং অ্যজ প্ল্যানড। তেলক্ষেত্রের নিরাপত্তা ব্যাবস্থা দেখে এই পরিস্থতিতিতেও হাসি পেল মেজরের, পুরো সিকিউরিটি সিস্টেম অ্যানালাইসিস করে নিশ্চিত হওয়া গেছে দশ জনের একটা সুদক্ষ কমান্ডো ইউনিটই যথেষ্ট তেলক্ষেত্রটি দখলের জন্য। বাড়তি সতর্কতা হিসেবে আরও দুজনকে দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আরেকবার ঘড়ির দিকে তাকালেন মেজর রোলিন্স, আটটা বাজতে এক মিনিট বাকি। ঘড়িটার একটা সুইচে চাপ দিলেন মেজর, সাথে সাথে প্রত্যেক কমান্ডোর হাতের ঘড়িতে সিগন্যাল পৌছে গেল।

অন্ধকারে কমান্ডোরা ভুতের মত নিঃশব্দে একে একে দেয়াল টপকে ঢুকে পরল তেলক্ষেত্রের সীমানায়, চোখে বিশেষ নাইট গ্লাস থাকায় প্রায় দিনের মতই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে তাঁরা। প্রথমেই মূল গেটের কাছে থাকা চারজন নিরাপত্তারক্ষীকে নিরস্ত্র করে ফেলল দুজন কমান্ডো, বাধা দেয়ার কোন সুযোগই তাঁরা পেল না। তারপর ছুটলো মূল ভবনের দিকে। নিতান্ত বাধ্য নাহলে রক্তপাতের কোন ইচ্ছে নেই কমান্ডোদের।

অপারেশন শুরুর মাত্র আড়াই মিনিটের মাথায় প্রায় বিনা বাধায় এবং সম্পূর্ন বিনা রক্তপাতে দখল হয়ে গেল তেলক্ষেত্র। দশ মিনিটের মধ্যেই তেলক্ষেত্রে কর্মরত বেশির ভাগ কর্মীকেই একটা বড় রুমে এনে ঢোকানো হল। হাতে একটা স্মিথ এন্ড ওয়েসন পিস্তল হাতে মেজর রোলিন্স পায়চারী করতে লাগলেন।

তার মুখ অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর, বিজয়ের আনন্দ ঠিক যেন উপভোগ করতে পারছেন না। 'এটা পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম তেলক্ষেত্র'— এরকম ইনফরমেশন কনফার্ম করার পরই এই মিশনটা চালানো হয়েছে, অথচ চারদিকের পরিবেশ দেখে এটাকে মোটেই কোন তেলক্ষেত্র বলে মনে হচ্ছে না! বরং...' একজন তরুন কমান্ডো কথা বলে ওঠায় চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল মেজরের।

- স্যার, তেল পাওয়া গেছে!

- গুড! কোথায়? আমাকে নিয়ে চল সেখানে!

- যেতে হবে না স্যার! আমি সাথে করে নিয়ে এসেছি! --- দুহাত তুলে দুটো প্লাস্টিকের ট্যাঙ্কি দেখাল তরুন কমান্ডো। একটা তেলে পরিপূর্ন, আরেকটা প্রায় খালি।

- হোয়াট! আর ইউ কিডিং মি সোলজার! হোয়াট ডু ইউ থিঙ্ক, আমরা এই টপ সিক্রেট অপারেশন চালিয়েছি এই পৌণে দুই ট্যাঙ্কি তেলের জন্য!

- আর তো কোথাও পেলাম না স্যার, জেনারেটর রুমে এই ট্যাঙ্কি দুটো পেলাম, মিনমিন করে জানাল তরুন কমান্ডো।

- কিন্তু..., রেগে গিয়ে কিছু বলতে চাইলেন মেজর, কিন্তু থেমে গেলেন রুমের ভেতর সেলফোন হাতে আরেকজন কমান্ডো প্রবেশ করায়।

- স্যার, মিস্টার ডোলান ট্রাম লাইনে আছেন। মিশনের সফলতার জন্য আপনাকে ব্যাক্তিগত ভাবে অভিনন্দন জানাতে চান!

বিরস মুখে ফোনটা হাতে নিলেন মেজর, তারপর মুখে জোর করে হাসি টেনে এনে বললেন,

- মিস্টার প্রেসিডেন্ট?

- কংগ্রাচুলেশনস মেজর অন ইয়োর ব্রিলিয়ান্ট সাকসেস!

- থ্যাঙ্কস, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। ইটস আওয়ার সাকসেস, স্যার।

- অফকোর্স, মেজর! বাট তোমার কন্ঠ এরকম শোনাচ্ছে কেন? ইজ দেয়ার এনি প্রোবলেম মাই বয়?

- স্যার, একচুয়ালি উই হ্যাভ ওয়ান! তেলক্ষেত্র দখল করেও দেড় ট্যাঙ্কির বেশি তেল পাওয়া যায়নি কোথাও!

- হোয়াট! ওনলি ওয়ান এন্ড হাফ টেঙ্কিস! তোমরা ঠিক তেলক্ষেত্রটাই দখল করেছ তো? বিএনপি কার্যালয়, গুলশ্যান, ড্যাকা, ব্যাংলাড্যাশ?

- পজিটিভ স্যার! আমরা এখন বিএনপি কার্যালয়ের রিসিপশন রুমে।

- এন্ড ইউ সি নো অয়েল? আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড মাই বয়? হ্যাভ ইউ সার্চড দ্য ভারপ্রাপ্টো চেয়ারপার্সন’স রুম? বিএনপির ভারপ্রাপ্টো চেয়ারপার্সন গেস্টদের সঙ্গে দেখা করেন যেখানে?

- নো, স্যার!

- ওহ পুওর বয়! গো রাইট নাও, এন্ড সি হু ইজ গিভিং হিম অয়েল। তবে সাবধানে পা রেখ, তেলে পিছলা খেয়ে আছাড় খেলে মাজা ভাঙতে পারে! হা হা হা!

মোবাইল কানে ধরে রেখেই প্রায় হতভম্ব অবস্থায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সনের রুমে উঁকি দিলেন মেজর। দেখতে পেলেন  চেয়ারপার্সনকে বসুন্ধরা গ্রুপ তেল দিচ্ছে। মাত্র এক মিনিট দেখেই উচ্ছসিত হয়ে উঠলেন মেজর রোলিন্স,

- ইউ আর ড্যাম রাইট মিস্টার প্রেসিডেন্ট! রীতিমত তেলের বন্যা বইছে। জাস্ট লাইক আওয়ার নায়াগ্রা ফলস!

- হা হা হা! বলেছিলাম না, আমার কাছে তথ্য আছে! নাউ টেল মি মেজর, হাউ মেনি ব্যারেলস ক্যান উই গেট ডেইলি?

(সমাপ্ত) "

লেখক: Ratul Khan

...

* লেখক বলছেন লেখাটা 'শ্যাষ' ওরফে সমাপ্ত! কিন্তু আমরা পাঠক মনে করি এর শেষ নেই। 'বাংগুরাদেশে' এমন তেলের খনি আবিষ্কার হতেই থাকবে এবং বিভিন্ন পরাশক্তি  হামলা চালাতেই থাকবে! বেচারা বাংগুরাদেশ []!

১. তেলের খনিhttps://www.ali-mahmed.com/2025/12/blog-post_27.html?m=1

Sunday, December 14, 2025

জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি...

লেখক: Ibrahim khalil Sobak (সবাক): (https://www.facebook.com/share/1BbMt6XzyB/) [লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে]

"জরুরি সংবাদপত্র বহনকারী সিএনজিতে করে ফিরছিলাম। ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়াতেই দু'পাশে দু'টি মোটরসাইকেল এসে থামে। তারপর গুলি করে। আমি সিটের ওপর ঢলে পড়ি। উপস্থিত সাধারণ মানুষ এসে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার আমাকে মৃত ঘোষণা করেন। ব্যাপারটা নিশ্চয় আপনি জানেন?

তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, জানি-জানি। ঘটনা দুপুরে ঘটেছে, তাই তো'?

আমি বলি, 'জ্বি'।

'সেক্ষেত্রে তোমার জন্য জুরাইনে দাফনের জায়গা করা হয়েছে, তুমি সেখানে চলে যাও'?

'এখনই যেতে পারবো না। আমার একটা জরুরী কাজ আছে'।

তিনি আবারও বলেন, 'সব কাজ শেষ না-করে এভাবে মরতে গেলে কেন? এখনতো ঝামেলা হয়ে যাবে'!

আমি কাতর হয়ে বলি, 'দেখুন, আমার ছেলে জানালা দিয়ে খেলনা কবুতর ফেলে দিয়েছে। কেউ তাকে সেটা তুলে এনে দেয়নি! এখন সে কান্না করছে। ...আচ্ছা, আমার ছেলের নামটা যেন কী? না থাক, আপনি বরং আমার বাসার ঠিকানাটা বলুন, আমি বাসায় যাব। বিশ্বাস করুন তাকে খেলনা কবুতরটা তুলে এনে দিয়েই সোজা জুরাইন চলে যাব। কসম'!

তার চোখে খানিকটা অবিশ্বাস, 'কিন্তু, তুমি যে ঠিকঠাক জুরাইনে গিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়বে, তার গ্যারান্টি কী? রেকর্ড দেখে তো তখন মনে হয় না পৃথিবীতে তোমার কোনো কাজকর্ম আছে; সবসময় একজন কর্তব্যহীন দাসের মতো গায়ে বাতাস লাগিয়ে হাঁটতে। এখন এসব বলে কোনো লাভ হবে না, বলো'!

'কিন্তু, আমার বাসার ঠিকানা তো এত দীর্ঘ না। ঠিকানার আগে পরে কোনো প্রশ্ন অথবা আশ্চর্যবোধক চিহ্ন নেই। আপনি কি আমার সাথে প্রতারণা করছেন'?

তার কন্ঠে খানিকটা উষ্মা, 'কথা না বাড়িয়ে তুমি এখনই জুরাইন চলে যাও—যত দ্রুত সম্ভব। শহরের মানুষজন টের পেলে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। মৃত্যুর পর এভাবে টং দোকানে বসে চা খাওয়া যায় না, বুঝলে! এটা উচিত না!

'দেখুন, আমাকে বাসায় যেতেই হবে। আমার ছেলের সাথে ওই কবুতরের টান আছে। কবুতরের ঠোঁটে সে চুমু খায়, বুকে নিয়ে ঘুমায়। আমি না-গেলে আর কেউ বাসার পেছন থেকে তার এই ভালোবাসার কবুতরটা এনে দেবে না। কবুতর এনে না-দিলে আমার ছেলেটা ঠিকমতো খাবে না, ঘুমাবে না। অনিয়ম করতে করতে সে শুকিয়ে যাবে, শরীর নষ্ট হয়ে যাবে।

তার বড় তাড়া, ' শোনো, এখান থেকে ...ওই যে লাল বাসটায় উঠলে তোমাকে জুরাইন নামিয়ে দেবে। বাসের কেউ তোমাকে দেখবে না, কন্ডাক্টরও ভাড়া চাইবে না। কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি নতুন কবরের পাশে নেমে যেও'।

আমি বিরক্তি গোপন করে বলি, 'আমার বাসার ঠিকানা না-দিয়ে আপনি চায়ের অর্ডার দিচ্ছেন কেন? এই... এই... আপনি চা খাবেন না, বাসায় যাওয়ার জন্য আমাকে কোন রঙের বাসে উঠতে হবে বলুন, আমি পাশাপাশি দুটি জারুল ফুলের গাছ দেখে আমার বাসা চিনে নেব; আপনি শুধু বাসটা ধরিয়ে দিন'।

'লাল বাস! জুরাইন যাওয়ার জন্য লাল বাসে উঠতে হবে'।

'আহা, প্রতারণা করবেন না। আপনি সিগারেট ধরাবেন না। কোন রঙের বাসে উঠে বাসায় যাব, বলুন। এক্ষুনি বলুন'!

তিনি এবার নরোম গলায় বলেন,  'জুরাইনগামী লাল রঙের বাসটি দাঁড়িয়ে আছে, তুমি যাও। আরে, যাও তো'!

'এই, এ-এ-এই..., আপনি কিন্তু এখনই দোকানদারের টাকা শোধ করবেন না। দোকানদারকে টাকা দিয়ে চলে যাবেন না। দয়া করে আপনি আরও এক কাপ চা খান, আরও একটি সিগারেট ধরান। আরও এক দণ্ড... এই যে, এখানটায়... এখানটায় বসুন। আর আমার বাসার ঠিকানাটা দিন।দোহাই লাগে, এভাবে চলে যাবেন না। বাসার ঠিকানাটা দিয়ে যান।

দেখুন, আমাকে বাসায় যেতেই হবে। আমার ছেলের সাথে ওই কবুতরের প্রেম আছে। কবুতরের ঠোঁটে সে চুমু খায়, বুকে নিয়ে ঘুমায়। আহা, আমি না-গেলে আর কেউ বাসার পেছন থেকে তার ভালোবাসার কবুতর এনে দেবে না। কবুতরটা এনে না-দিলে আমার ছেলে ঠিকমতো খাবে না, ঘুমাবে না। অনিয়ম করতে করতে সে শুকিয়ে যাবে, নষ্ট হয়ে যাবে।

বুঝলেন, আমাকে বাসায় যেতেই হবে। আমার ছেলের সাথে ওই কবুতরের প্রেম আছে। কবুতরের ঠোঁটে সে চুমু খায়, বুকে নিয়ে...।"

(২০১৩ সালে যখন মৃত্যু তাড়া করে ফিরতো, তখন লেখা)

-লেখক: Ibrahim khalil Sobak (সবাক): (https://www.facebook.com/share/1BbMt6XzyB/)

Sunday, December 7, 2025

স্মরণে, আবুল হাসান।

লেখক: মুহম্মদ নিজাম (লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে)

"একবার খুব মদ খেয়ে মাতাল হয়ে নর্দমায় পড়ে গিয়ে বাজখাঁই গলায় কৈফিয়ত চেয়েছিল:

"আকাশ এত নোংরা কেন রে, বাঞ্চোৎ?"

গালিটা সে কাকে দিয়েছিল, জিজ্ঞেস করেনি কেউ। উত্তরটা তাই অজানাই রয়ে গেলো!

আবুল হাসান নামে এক আশ্চর্য নীলকন্ঠ কবি এসেছিল একবার আমাদের শহরে। সে বলতো: 

"..মানুষ 

যদিও বিরহকামী, 

কিন্তু তার মিলনই মৌলিক।"

আবুল হাসান মারা গিয়েছিল আমাদের চেয়েও কম বয়সে। বেঁচে থাকলে এখন নিশ্চয়ই কেউ তাঁকে পাকিস্তানের দালাল বলতাম; কেউ বলতাম, ভারতের দালাল। 

ডানে গেলে বামের কামড়, বামে গেলে ডানের। 

মরে গিয়ে বেঁচে গেলো 'মালটা'!

সেও হয়তো গুণের মতো পুরষ্কার ভিক্ষা চেয়ে নিন্দিত হতো, কিংবা 'তুই রাজাকার' শ্লোগান দিয়ে 'শাহবাগী তুই গোসল কর', জাতীয় উষ্মাভস্মে চাপা পড়ে যেতো। 

কিংবা আমীর হামজার মতো রসময় সুরে 'রেশমিকা মান্দানা' বাজাইতো। হয়তো আগস্টের সেই দিনগুলিতে মেট্রো ভাঙার কিংবা বিটিভি পুড়ানো দুঃখে কাতর হয়ে উঠতো—কিংবা মাজারভাঙা এনার্কিস্টদের দিকে তাকিয়ে তীব্রস্বরে বলে উঠতো, 'আবার তোরা মানুষ হ'!

বেঁচে থাকলে কি হতো, আমরা জানি না। তবে যাই হতো, মন্দ-ই হতো এইটা নিশ্চিত জানি!

শুনেছি, লোকটা খুব সুর করে কোরআন পড়তে জানতো। প্রায়ই শোনাতো নাগিরক জলসায়, এখানে-সেখানে..., এমনকি ওর প্রিয়তম মেয়েটির বাবাকেও! 

মানুষ যদিও জীবনেই অমরত্ব খোঁজে, কিন্তু একমাত্র মৃত্যুই তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

মরে গিয়ে বেঁচে গেলো লোকটা?

'যাই' শীর্ষক ওঁর একটা কবিতা ছিল। একাত্তরের কবিতা। দূরসঞ্চারী এক বিষাদের সুরে বলেছিল,

'যাই, এখন তাদের শরীরে শস্যের আভা ঝরে পড়ছে যাই...

মৃত্যু আর মৃত্যু আর মৃত্যুর আঁধারে যাই,

বিবর্ণ ঘাসের ঘরে ফিরে যাই, যাই

সেখানে বোনের লাশ, আমার ভাইয়ের লাশ খুঁজে নিতে হবে যাই,

আমি যাই-'

শুনেছি,  একাত্তরের সেই ঘাতক-হানা রাতে ঢাকা মেডিকেলের কোন-একটা নোনাধরা কামরায় শুয়ে-শুয়ে অসুখের সাথে সংসার করছিল। কিন্তু অসুখটা সারে নাই। এই অসুখেই পঁচাত্তরে মারা গেলো। তখনই কতই বা ওর বয়স? মাত্র আটাশ!

আটাশে নিঃসঙ্গ যুবক জেনে গিয়েছিল, 

"মানুষ একা 

মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ একা!"

চেয়েছিল, পাখি হয়ে যাক প্রাণ।তারপর পাখি হয়েই উড়ে গেলো অনন্ত আলোকের দেশে। 

গতকাল আমার এক বন্ধুকে ওঁর একটা ছবি দেখালাম। সে বললো, 'শাহাবাগীদের মতো লাগে'! তারপর ওঁর কিন্নরী সুরে কোরআন পাঠের কাহিনী শুনালাম, সে বললো, 'তাইলে, নিশ্চয়ই শাপলা ছিল'!"

চিন্তা করেন অবস্থা!

গতরাতে, অনেক রাতে, বৃষ্টিতে কাকভেজা, ভিজে-ভিজে ফেরার পথে পড়ছিলাম আবুল হাসানের অমৃত অসুখের কথা, 

'ঝিনুক নীরবে সহো 

ঝিনুক নীরবে সয়ে যাও

ভেতরে বিষের বালি

মুখ বুঁজে মুক্তো ফলাও!' 

আর ভাবছিলাম, 'মরে গিয়ে বেঁচে গেলে, হে মহান প্রতিভা'!"

- লেখক: মুহম্মদ নিজাম 

বাংলাভূমি, সেপ্টেম্বর ২০২৫"

Thursday, November 27, 2025

তবলার ঠুকঠাক—গুমের আগমনী বার্তা!

লেখক: মিজানুর রহমান সোহেল (লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)

"আলহামদুলিল্লাহ! বিনা অপরাধে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা ডিবি হেফাজতে থাকার পর তারা আমাকে স্বসম্মানে মাত্র বাসায় পৌঁছে দিয়েছে।

গত রাত ১২টার দিকে ডিবি প্রধান আমার সঙ্গে কথা বলবেন, এই অজুহাতে ৫/৬ জন ডিবি সদস্য জোর করে আমাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। ডিবিতে নিয়ে আসামীর খাতায় আমার নাম লেখা হয়। জুতা-বেল্ট খুলে রেখে গারদে আসামীদের সাথে আমাকে রাখা হয়। কিন্তু কেন আমাকে আটক করা হলো? তা আমি যেমন জানতাম না, তেমনি যারা আমাকে তুলে এনেছিলেন বা ডিবির উর্দ্ধতন কর্মকর্তারাও কিছু বলতে পারেননি!

দীর্ঘ সময় পর বুঝতে পারলাম, সরকারের একজন উপদেষ্টার ইশারায় মাত্র ৯ জন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে মনোপলি ব্যবসা করার সুযোগ দেয়ার জন্যই আমাকে আটক করা হয়েছিল। আমার সাথে সংগঠনের সেক্রেটারি আবু সাঈদ পিয়াসকেও আটক করা হয়। তিনি এখনও ডিবি কার্যালয়ে আছেন।

আজ (বুধবার) ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর) নিয়ে ডিআরইউতে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)-এর প্রেস কনফারেন্স করার কথা ছিল। আমি সেখানে ছিলাম মিডিয়া পরামর্শক। সেই প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করাই তাদের প্রধান টার্গেট ছিল। কিন্তু তাদের জন্য আফসোস, যে উদ্দেশ্যে তারা প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতে চাইলো সেটা দেশের সবাই জেনে গেলো।

দেশের মুক্ত বাণিজ্য নীতির সঙ্গে এনইআইআর স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক। প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে দেশে প্রতিযোগিতা কমিশনও রয়েছে। অথচ মাত্র ৯ জন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে সারাদেশে ২৫ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে পথে বসানোর গভীর চক্রান্ত চলছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে গ্রামের সাধারণ মানুষ, প্রবাসীসহ অনেকেই বিপদে পড়বেন। একটা চেইন ভেঙ্গে পড়বে। অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে যাবে। জেনে রাখা ভালো, এই ৯ জনের একজন ওই উপদেষ্টার স্কুল-বন্ধু।

একটা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে সরকার কেন ভয় পায়? শুধুমাত্র প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতেই কি আমাকে গভীর রাতে জোর করে তুলে নিতে হলো? যারা মুখে ‘বাকস্বাধীনতা’র বুলি আওড়ান, তারাই কি আমাকে বাকরুদ্ধ করতে এই আয়োজন করলেন? মগের মুল্লুকে এই কি তবে বাকস্বাধীনতার বাস্তব চিত্র?

আমাকে আটক করার ঘটনা জানাজানি হতেই বহু শুভাকাঙ্ক্ষী, ভাই, বন্ধু, সহকর্মী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অনেকেই খবর নিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দিয়েছেন, বিবৃতি দিয়েছেন, সংবাদ প্রকাশ করেছেন। তাদের এই সমর্থন ও আওয়াজের কারণেই আমি দ্রুত মুক্তি পেয়েছি বলে বিশ্বাস করি। যারা আমার পাশে ছিলেন তাদের সবার প্রতি আমার অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা।

...

ডিবিতে আমার খাবার মেন্যুতে কী ছিল?


১৯ নভেম্বরের গভীর রাত। শীত ঠিক পুরোপুরি নামেনি, তবু বাতাসে একটা ঠান্ডা খচখচে ভাব। শহরটা যেন ঘুমের ভিতরেও ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলছে। এমন সময় হঠাৎ আমার দরজায় অচেনা কড়া। প্রথমে ভাবলাম হয়ত ভুল দরজা। কিন্তু দ্বিতীয় কড়া আরো কঠিন, আরো স্পষ্ট। বুঝিয়ে দিল, এ রাতের ছন্দ বদলে গেছে। দরজা খুলতেই দেখি কয়েকজন অপরিচিত মুখ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ডিবি পরিচয়ে আমাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের কঠোর নির্দেশ ও নিয়ম অনুযায়ী কাউকে আটক করতে হলে স্থানীয় থানাকে জানানো বা আইডি কার্ড প্রদর্শনের যে বিধান রয়েছে, তার কোনোটিই মানা হয়নি। উল্টো ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম আমার সঙ্গে কথা বলবেন, এমন একটি প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঘড়ির কাঁটা এক জায়গায় আটকে থাকার মতো সময় যেন থমকে গেল। প্রশ্ন, নীরবতা, অপেক্ষা সবকিছু মিশে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা ডিবি হেফাজতে স্তব্ধ থাকলাম।

এসব গল্প এখন পুরনো। তবে ডিবি থেকে বাসায় ফেরার পর একটি অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করলাম। সবার মুখে একটাই কৌতূহলী প্রশ্ন, ‘ডিবিতে আপনার খাবার মেন্যুতে কী ছিল'? বিদেশি একটি গণমাধ্যম আমার সাক্ষাৎকার নেয়ার সময়ও এই প্রশ্ন করেছে। গতকাল একটি টেলিভিশনের টক-শোতেও দেখলাম আমার খাবার মেন্যু নিয়ে বিজ্ঞজনরা আলোকপাত করছেন!

এমনকি ফেসবুকের জনপ্রিয় পেজ ‘ইয়ার্কি’ পর্যন্ত রসিকতা করে লিখেছে ‘ভাতের হোটেল সার্ভিস বন্ধ, ডিবি এখন 'উঠাও' সার্ভিস চালু করেছে।’ আসলে আমরা বাঙালিরা বড্ড ভোজনরসিক। সুখে খাই, দুঃখে খাই, প্রেমে পড়লে খাই, ছ্যাঁকা খেলে খাই, কেউ জন্ম নিলে খাই, মারা গেলেও খাই... শুধু খাই আর খাই। হয়তো এই সাইকোলজি বুঝেই ডিবি হারুন ‘ভাতের হোটেল’ খুলেছিলেন। তাই আমার আটকের পর সবার আগ্রহ ছিল, হারুনের হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ হওয়ার পর নতুন মেন্যুতে কী যোগ হলো?

মেন্যু আইটেম ১, পানি:

বাসা থেকে ডিবি কার্যালয়ের দূরত্ব খুব বেশি না, কিন্তু অনুভূতিতে সেটা যেন একটা যুগ। কারণ অন্ধকার রাতে অজানা যাত্রা সবসময় বুকের ভেতর একটা শূন্যতা তৈরি করে। আমাকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর পরই ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। তড়িঘড়ি করে আসামির খাতায় নাম তুলে, বেল্ট-জুতা খুলে শরীর তল্লাশি করে আসামিদের গারদে ঢোকানো হয়। ডিবির লোকজনের রুক্ষ ব্যবহার আর ধমকে আমি তখন রীতিমতো চোখে সরষে ফুল দেখছি। গারদের ভেতরে অচেনা মুখ। কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই, কী মামলায় আইছেন?’ আমি তো জানিই না কেন এসেছি!

আমার অজ্ঞতা দেখে আরেক বন্দি রায় দিলেন, ‘তাইলে নিশ্চিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হবে আপনার নামে।’

ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ, কথা বের হচ্ছে না। আমি পানি চাইলাম। কেউ একজন পানির বোতল এগিয়ে দিলেন। ডিবিতে আমার প্রথম খাবার, এক চুমুক পানি।

কিছুক্ষণ পর ডিবির প্রধান এসে আমার সঙ্গে কথা বললেন। এরপর আবার আমাকে তার রুমে ডেকে পাঠালেন। দ্বিতীয়তলায় তার রুমে যাওয়ার পর আমাকে দাঁড় করিয়ে পরেরদিন প্রেস কনফারেন্সের বিষয়ে জানতে চাইলেন। তখন আমি আসল কারণ জানতে পারলাম কেন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। আমন্ত্রণপত্রে আমার নাম্বার নাকি ভুলভাবে দেয়া হয়েছে এ জন্য আমাকে ডেকেছেন।

ডিএমপি মিডিয়া সেল থেকে আরো একধাপ এগিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, আমার নাম্বার নাকি সংবেদনশীল জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছিল বলে আমাকে রাতের অন্ধকারে উঠিয়ে আনা হয়েছিল। যদিও আমি তাদের বলেছিলাম, ভুল করে আমার নাম্বার ব্যবহার হয়নি, আমি জেনে, বুঝে, সুস্থ মস্তিষ্কে এই নাম্বার আমন্ত্রণপত্রে দিয়েছিলাম, যাতে কোনো সাংবাদিক চাইলে প্রেস কনফারেন্স ইস্যুতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। এটা যে আমার পাবলিক রিলেশনস এজেন্সি টাইমস পিআর-এর ইনভাইটেশন সেটা আমন্ত্রণপত্রের উপরে আমার প্রতিষ্ঠানের লোগো থাকার পরেও হয়তো তারা বুঝতে পারেনি।  

মূলত তারা এই প্রেস কনফারেন্স করতে দিতে চান না। একটি সিন্ডিকেটকে মনোপলি ব্যবসা করার সুযোগ দেয়ার জন্য নীতিগত যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তাতে বিরাট সংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথে বসে যাবেন। যারা দেশের আইন মেনে, লাইসেন্স নিয়ে, সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে প্রকাশ্যে ব্যবসা করেন। এমনকি সরকারি ব্যাংক তাদের ব্যবসার বৈধতা যাচাই-বাছাই করে ঋণও দেয়। তারা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর)-এর বিরুদ্ধে না। শুধু এনইআইআর বাস্তবায়নে অন্য বড় ব্যবসায়ীদের মতো নিজেদের ব্যবসা করার সমান সুযোগ চান।

এ বিষয়ে নিজেদের মতামত, প্রস্তাবনা ও দাবির কথা সাংবাদিকদের বলবেন, সেটা উপর মহল নিতে পারবেন না কেন? এ দেশের মানুষকে কথা বলার অধিকার তো সংবিধানই দিয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট করে এই কথা বলার অধিকার হরণ করেছিল। সেটা এই সরকার বাতিল করেছে বলে দাবি করলেও একই কায়দায় কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা কার স্বার্থে করা হচ্ছে? শুধু মতামত দিবে বলে তাদের মুখ চেপে ধরতে হবে? তাদের কথা বলতে দেয়া যাবে না? এই যে ডিবির নতুন প্রধান বা যে বিশেষ সহকারীর দিকে অভিযোগের তীর যাচ্ছে, তারাও এসব পদে এসেছেন আগের সরকারের সময়ে কেউ কথা বলতে চাইলে তাদের মুখ চেপে ধরতো বলে। অথচ গদিতে বসেই তারা সব ভুলে গেলেন! 

ডিবির প্রধানের সঙ্গে আমার কথা বলা শেষ হওয়ার পর তিনি একজন ডিসিকে বললেন, ‘উনাকে ভাত-টাত খাওয়ায়ে ছেড়ে দিয়েন।’ এটা শুনে আমার মাথায় সঙ্গে সঙ্গে ডিবি হারুনের সেই ‘ভাতের হোটেল’ ভর করল। ডিবি হারুনের ভাতের হোটেল কি তাহলে এখনও খোলা? ভাতের হোটেলে মেন্যুতে কি কি আছে? এত রাতেও কি গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত পাওয়া যাবে? এসব ভাবতে ভাবতে হেঁটে ডিসির রুমে পৌঁছে গেলাম। ডিসি আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেছেন। কী খাবেন? জানতে চাইলেন তিনি। আমার গলা তখনও শুকনো। শুধু পানি চাইলাম। আরেক দফা পানি খেলাম। তবে আমি ডিনার করতে একদম আগ্রহ দেখালাম না। 

মেন্যু আইটেম ২, চীনা বাদাম:  

ডিসি আমাকে জানালেন তিনি অনেক ক্ষুধার্ত। একজনকে ডেকে ভাত আনতে বললেন। সে বললো, ‘স্যার এখন তো ভাত পাওয়া যাবে না। তবে মগবাজারে খিচুড়ি পাওয়া যাবে।’

ডিসি তাকে দুই প্যাকেট খিচুড়ি আনতে বললেন। আমার ক্ষুধা থাকলেও একদম খাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছিল না বলে বিনয়ের সাথে আমার খাবার আনতে না করলাম। খাবার এলো। ডিসি ডিনার করলেন। অনেকটা সময় ধরে আমার সঙ্গে নানান বিষয়ে গল্প করলেন। তিনি আগের রাতেও নাকি ঘুমান নাই। খুবই ক্লান্ত, কিন্তু আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য ভোর রাত পর্যন্ত আমার পাশে ছিলেন। রাত তিনটার দিকে একটা চীনা বাদামের কৌটা ধরিয়ে দিলেন। তিনি কয়েকবার বলার পর কিছুটা বাদাম নিলাম। 

এই সময়ে আমি মনে করিয়ে দিলাম আমাকে ছাড়া হবে কখন? তিনি একবার বললেন, ‘মোবাইল ব্যবসায়ীদের একজনকে ধরতে পারলে আপনাকে ছেড়ে দিবো।’ কিছুক্ষণ পর স্মার্টফোন ও গ্যাজেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)-এর সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াসকে ডিবি নিয়ে আসলো। আমি বললাম এবার আমাকে ছাড়ুন। তিনি বললেন, ‘সংগঠনের সভাপতি মো. আসলামকে পাওয়া যায়নি। উনি হলে আপনাকে ছাড়তে পারতাম।’

এর আধা ঘণ্টা পর তিনি আবার বললেন, ‘আপনাকে একটা মুচলেকায় স্বাক্ষর করিয়ে ছেড়ে দিবো। সেখানে লেখা থাকবে আপনাকে কোনো টর্চার করা হয়নি, ভুল বোঝাবুঝির কারণে আপনাকে নিয়ে আসা হয়েছিল।’

একজনকে ডেকে এই মুচলেকা লিখতে বললেন। আরো আধা ঘণ্টা পর মুচলেকা এলো। কিন্তু এবার ডিবির প্রধান ফোন ধরছেন না। ঘুমিয়ে গেছেন বলে এটা সম্ভব হচ্ছে না। এরপর তিনি আমাকে অন্য একজনের জিম্মায় দিয়ে ফজর আজানের পর বাড়ি গেলেন।

মেন্যু আইটেম ৩, কফি:

সারা রাত নানা নাটকীয়তা শেষে দিনের আলো ফুটে গেল। আশরাফুল নামের যে পুলিশ সদস্য আমাকে তুলে এনেছিলেন, তিনি বাসা থেকে ফ্রেশ হয়ে এখন ডিবি কার্যালয়ে আসলেন। ততক্ষণে অনেক গণমাধ্যমে আমাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। আশরাফুলের নামও এসেছে। তার মুখে অস্বস্তির ছাপ। তিনি বললেন, ‘আমি তো শুধু অর্ডার পালন করেছি, কিন্তু আমার নামও চলে এলো’, সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো।

‘কিছু খাবেন কিনা? কফি খাওয়াই?’ ক্লান্ত লাগছিল, তাই আমি আর না করলাম না। সে নিজের হাতে ধোঁয়া-ওঠা কফি বানিয়ে আনলো। সে ভালো কফি বানাতে পারে এটা স্বীকার করতেই হবে। 

এরপর দেখলাম আশরাফুলের কাছে একের-পর-এক কল আসছে তার ঊর্ধ্বতন থেকে। আমাকে দ্রুত ছাড়ার তাগিদ দিচ্ছে। তবে সেটা ফর্মালিটি মেনে মুচলেকা লিখে আমার স্বাক্ষর করে এরপর ছাড়তে হবে। এই মুচলেকা রেডি করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগলো। একবার মুচলেকায় একটা লাইন যোগ করতে বলে তো আবার পরের কলে সেটা ফেলে দিতে বলে। এভাবে অনেক সময় নিয়ে মুচলেকা রেডি করলো। আমাকে আটকের সময় কোনো স্থানীয় থানাকে জানানো বা আইডি কার্ড প্রদর্শনের যে বিধান রয়েছে, তার কোনোটিই মানা হয়নি। কিন্তু আমাকে ছাড়ার সময় ফর্মালিটি মানতে দুটি মুচলেকায় (একটি আমার, অন্যটি জিম্মাদারের) বাধ্যতামূলক স্বাক্ষর করতে হয়েছে। 

এবার গাড়ি দরকার। কিন্তু গাড়ি চাওয়ার পরেও আশরাফুল ঠিক মতো সাপোর্ট পাচ্ছে না। দেরিও হয়ে যাচ্ছে। পরে সে ডিবি প্রধানকে ফোন করে বললে তাৎক্ষণিক বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা হয়। এরপর দ্রুত কালো গ্লাসের গাড়ি রেডি হলো। আমি যদিও এখান থেকে নিজে থেকেই বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাইরে অনেক সাংবাদিক দাঁড়িয়েছিলেন বলে সেই রিস্ক তারা নিতে চায়নি। খুব তাড়াহুড়ো করে আমাকে গেট থেকে বের করা হয়। আমার বন্ধু তানভীর খন্দকার ও সাবেক সহকর্মী শুভ সারারাত গেটের বাইরে অপেক্ষা করছিল, তাদের সাথে নিয়ে বাসার দিকে রওনা হলাম।

সাড়ে ১০ ঘণ্টার এই রুদ্ধশ্বাস জার্নিতে আমার পেটে পড়েছিল শুধুই পানি, চীনা বাদাম আর এক কাপ কফি। বাকি গল্প না হয় আরেকদিন হবে। ডিবিতে ভাতের হোটেল বন্ধ হয়েছে কি না জানি না, তবে আমার কপালে জুটেছিল এটুকুই!

লেখক: মিজানুর রহমান সোহেল https://www.facebook.com/share/1AGVQikgYB/ (শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৫)"

...

* ক্রমশ, শেখ হাসিনার ক্ষমতা পরির্বতনের পর কুশাসনের সমস্ত পর্বই ফিরে এসেছে! বাকী ছিল 'গুম-পর্ব'—কেবল এই একটা কারণে আমরা বড়ই আনন্দিত ছিলাম। কিন্তু তবলার ঠুকঠাক শুরু হয়ে গেছে, এবার গান গাওয়ার পালা! এটা হচ্ছে, গুমের প্রাথমিক পর্ব!

Monday, November 10, 2025

ডাক্তার নামের এক প্রতারক!

লেখক: ডা. মো: মারুফুর রহমান (লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)

"এটি একজন সেলিব্রিটি ইনফ্লুয়েন্সার চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন। সবাই তাকে চেনেন, 'অর্গানিক জাহাঙ্গীর', 'কিটো জাহাঙ্গীর', 'জেকে', ইত্যাদি অনেক নামে। সেই চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের এই অবস্থা!

ন্যুনতম স্ট্যান্ডার্ডে প্রেসক্রিপশনে অবশ্যই সম্ভাব্য রোগের নাম, রোগীর সমস্যা, ভাইটাল সাইন, জেনারেল ফাইন্ডিং এগুলো থাকতে হয়। এই প্রেসক্রিপশন দেখে বোঝার উপায় নেই কি সমস্যায় এসব ওষুধ দেয়া হয়েছে। ফলে ওষুধগুলো আসলেই প্রয়োজনীয় কিনা তা যাচাই করার সুযোগ নেই।

তারচেয়ে বড় কথা এখানের ৭টি ওষুধের মাঝে ৭টিই নানা ধরনের ভিটামিন/ফুড সাপ্লিমেন্ট যা উপযুক্ত খাবারের মাধ্যমেই পুরণ করা সম্ভব। মুলত এই প্রেসক্রিপশনটি ফুড সাপ্লিমেন্ট-এর ব্যবসা বর্ধক ফর্মুলা ছাড়া কিছুই না এবং এ কারণেই ওষুধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুসারে চিকিৎসকদের ফুড সাপ্লিমেন্ট লেখা নিষেধ।

চলুন দেখি কি কি 'ওষুধ' লেখা হয়েছে।

১. প্রথমটি Cap Acteria, এটি একটি প্রোবায়োটিক। এতে মূলত কয়েক ধরণের উপকারী বাক্টেরিয়া থাকে যার অধিকাংশ ল্যাক্টোব্যাসিলাস গ্রুপের, যা প্রচুর পরিমাণে থাকে দইয়ে। এই ওষুধের প্রতি ক্যাপসুলে ৪ বিলিয়ন ব্যাটেরিয়া আছে।

যার প্রতিটার দাম ৪৫ টাকা, দিনে ২টা করে ৩ মাসে মোট খরচ ৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে ১ চামচ দইয়ে গড়ে ১-১০ বিলিয়ন বাক্টেরিয়া থাকে। এবার হিসাব করুন এ চামচ দই এর দাম কত?

উল্লেখ্য কোন নির্দিষ্ট রোগ সারাতে এর সরাসরি ব্যবহার উপযোগীতা নেই বরং স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস-এর অংশ হিসেবে নানাবিধ রোগের ঝুঁকি ও উপসর্গ কমাতে নিয়মিত এ ধরণের উপকারী ব্যাক্টেরিয়া খাবারের সংগে গ্রহন করা বেশি উপকারী।

২. ২য় ওষুধ 'ভিটামিন ডি'। সূর্যের আলোর ভিটামিন অর্থাৎ আমাদের চামড়ায় সূর্য্যের আলো পড়লে এই ভিটামিন শরীরে তৈরি হয়। এছাড়াও নানাবিধ খাবারে ভিটামিন ডি থাকে যেমন তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম, কলিজা ইত্যাদি।

তবে বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষেরই শরীরে ভিটামিন ডি কম। তাই এই সাপ্লিমেন্ট এর অনেকের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হতে পারে যদি খাবার ও সূর্যের আলোর মাধ্যমে পুরণ না হয়। দাম হিসাব করলে প্রতি  ক্যাপসুল ৩৫ টাকা, সপ্তাহে ১টা করে ৬ সপ্তাহে ২১০ টাকা।

৩. ৩য় ওষুধ Santogen A-Z, মাল্টিভিটামিন, ১১টাকা পিস, দিনে ১টা করে ৬ মাসে, প্রায় ২০০০ টাকা। মানুষের কোন রোগের জন্যই মাল্টিভিটামিন খাওয়ার কথা চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোন বই বা গবেষণাপত্রে লেখা নেই। মানুষের শরীরে একই সাথে সব ভিটামিন এর অভাব কখনোই হয় না।

যেগুলোর অভাব নেই সেগুলো খেলে মল মুত্রের সাথে বেরিয়ে যায় (কিছু কিছু লিভারে জমা হয়)। ফলে এই ওষুধের বেশিরভাগ উপাদানই শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। কারও যদি কোন একটি দুটি ভিটামিন বা মিনারেলের অভাব থেকেও থাকে তারও উপকার হবে না কেননা এই মাল্টিভিটামিন এর বড়িতে সব ভিটামিন এত কম মাত্রায় যা অভাবজনিত প্রয়োজনীয় ডোজ এর তুলনায় অনেক কম।

৪. ৪র্থ ওষুধ, Carniten, এটি মানবদেহে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া একটি এমাইনো এসিড এবং প্রায় সব ধরনের প্রাণিজ খাবারে এটি পাওয়া যায়। যাদের লিভার বা কিডনি মারাত্নক ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা খিচুনী রোগের কারণে বিশেষ ওষুধ খাচ্ছেন বা রেয়ার কিছু জেনেটিক রোগ ব্যতীত এই জিনিসের অভাব মানবদেহে হয় না।

কিডনি ড্যামেজ হওয়া ডায়ালাইসিস রোগীদের ক্ষেত্রে এটি সাধারনত ব্যবহার হতে দেখা যায়। প্রেসক্রিপশনটি যে রোগি বা যার নামে করা হয়েছে তার এ ধরনের রোগ আছে কিনা তা জানা যায়নি। কারণ রোগের বিবরন লেখা নেই প্রেসক্রিপশনে। আর যদি কিডনি বা লিভার ড্যামেজ থাকে তাহলে অন্য যেসব ডিব্বা খাওয়ানো হচ্ছে সেগুলো তার জন্য আরও ক্ষতিকর হবে। প্রতি পিস ৫ টাকা করে ৩মাসে এর পেছনে খরচ ৯০০ টাকা। 

৫. পরের ওষুধ Algecal Dx, ক্যালসিয়াম (600g)+ভিটামিন ডি। অর্থাৎ উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি ক্যাপসুল আলাদা করে দেয়ার পরেও এই ক্যালসিয়ামের সাথে ভিটামিন ডি আবারও দেয়া হচ্ছে। বড়ি প্রতি ১৬ টাকা করে ৬ মাসে খরচ ২৮৮০ টাকা। এই স্পেসিফিক ক্যালসিয়াম বড়ির বিশেষত্ব হলো এটি ক্যালসিয়াম কার্বোনেট যা সামুদ্রিক শেওলা থেকে বের করা।

ক্যালসিয়াম বড়ি কম খরচে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট রূপে পাওয়া যায় ৫০০ গ্রাম ৫ টাকায়। ওষুধ কোম্পানি কিছুদিন পর-পর নতুন নতুন ক্যালসিয়াম বড়ি নিয়ে আসে শেওলার ক্যালসিয়াম, ঝিনুকের ক্যালসিয়াম ইত্যাদি ইত্যাদি। দাবী করে এগুলো সাধারন ক্যালসিয়াম এর চেয়ে বেশি শোষণ হয় শরীরে অথচ এর পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, যেটুকু আছে তাতে শোষনের পার্থক্য খুব বেশি নয়। সুতরাং ৫ টাকার স্থলে ১৬ টাকার বড়ির কোন মানে নেই। এছাড়ায় দুধ, ডিম, হাড়, গাঢ় সবুজ শাক, কলিজা, মাছ, মাংশ ইত্যাদিতেও ক্যালসিয়াম থাকে। বাংলাদেশের মানুষের শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব জনিত রোগের প্রকোপ বেশি, তাই এটি জরুরী। 

৬. ৬ নাম্বার ওষুধ, Ubi Q, এটি একটি এনজাইম CoQ10 এর একটি রূপ যা আমাদের শরীর নিজেই তৈরি করে। একবারে সুনির্দিষ্ট কিছু হৃদরোগ ছাড়া বাইরে থেকে এই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পক্ষে কোন শক্ত ক্লিনিক্যাল এভিডেন্স নেই। ওষুধ কোম্পানি এটাকে 'দুর্বলতা কমানো, 'বয়স ধরে রাখা', 'ইমিউনিটি বুস্টার' ইত্যাসি চটকদার উপায়ে প্রমোট করে।

এসবের পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। শরীর এটাকে নিজেই তৈরি করে। এই প্রেসক্রিপশনে ১০০ মিলিগ্রাম Ubi Q, ৪৫ টাকা পিস দরে, দিনে ২টা করে ৬ মাসে খরচ ১৬,২০০ টাকা! ওদিকে গরুর হার্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ১০ মিলিগ্রাম, মাংসে ৩-৪ মিলিগ্রাম, মুরগিতে ২-৩ মিলিগ্রাম, তৈলাক্ত মাছে ৪-৮ মিলিগ্রাম, ডিমের কুসুমে ১-২ মিলিগ্রাম এই এনজাইম থাকে। 

৭. ফাইনালি, ৭ নাম্বার হলো ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, ১০০০ মিলিগ্রাম। মাছের তেল ও ভেষজ তেল (সরিষা, সয়াবিন, চিয়া সিড, বাদাম)-এ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। ১০০ গ্রাম সরিষা তেলে ৫০০০ মিলিগ্রামের বেশি ওমেগা-৩ থাকে। ১০০ গ্রাম রুই মাছে ৬০০ মিগ্রা, ১০০ গ্রাম পাঙ্গাসে ১২০০ মিগ্রা ওমেগা-৩ পাওয়া যায়। এই বড়িতে ১১ টাকা প্রতি পিসে ৩মাসে ৩৩০ টাকা খরচ।

এই সাপ্লিমেন্টও ওষুধ কোম্পানি ইমিউনিটি বুস্টার, বলকারক, প্রদাহ নিবারক, হৃদরোগ থেকে সুরক্ষা ইত্যাদি নানা দাবী করে বিক্রি করে। আপাত সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এসব দাবীর পক্ষে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমান নেই। সুনির্দিষ্ট কিছু রোগ যেমন উচ্চ মাত্রার ট্রাউগ্লিসারাইড কমাতে এই সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের পক্ষে কিছু প্রমাণ আছে। 

সুতরাং সব মিলিয়ে এই প্রেসক্রিপশনে খরচ ৩০ হাজার টাকার বেশি! অথচ কি রোগ, কি বৃত্তান্ত কিছুই লেখা নেই। সব ক'টি ওষুধই ফুড সাপ্লিমেন্ট যা নিয়মিত খাবারের মাধ্যমেই অনেক অনেক কম খরচে গ্রহন করা সম্ভব আরও অনেক বেশি পুষ্টি উপাদান সহ। ওষুধ প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পুরো প্রেসক্রিপশন ভরে শুধুমাত্র ফুড সাপ্লিমেন্ট লিখে যাচ্ছে এই লোক! একদিকে অন্যান্য চিকিৎসকদের নিয়মিত বিষোদগার করছে আবার নিজেই ৩০ হাজার টাকার সাপ্লিমেন্ট ধরিয়ে দিচ্ছে।

এই প্রতারণা নিয়ে অনেকে অনেকবার লিখেছেন কিন্তু তার সেলিব্রিটি স্ট্যাটাস তাকে ইমিউন করে রাখে আইনের হাত থেকে। সম্ভবত এই রোগীর কাছ থেকে তিনি কোন ভিজিট রাখেন নি, কোন টেস্ট দেননি, ৩০ হাজার টাকা ধোঁকাবাজি বড়ি বিক্রি করেছেন শুধু। তাতেই রোগি শতভাগ খুশি হয়ে এই প্রেসক্রিপশন শেয়ার করেছেন ফেসবুকে।

পাঠক, আপনাকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে পারেন আপনি নিজেই। বাংলাদেশের কোন আইন আদালত এইসব সেলিব্রিটিদের কখনো স্পর্শ করে না। চটকদার প্রচারনায় বিভ্রান্ত না-হয়ে যাচাই করুন, প্রশ্ন করুন, উত্তর খুঁজুন উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ, বা গবেষণাপত্র অথবা সহজ উপায়ে চ্যাটজিপিটি থেকেও। শতভাগ না হলেও অন্তত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ ধরনের প্রতারণা ধরতে পারবেন ও সাবধান হতে পারবেন।"

লেখক: ডা. মো: মারুফুর রহমান

চিকিৎসক ও গবেষক 'দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ড', যুক্তরাজ্য। (সিনিয়র পারফর্মেন্স মিজারমেন্ট স্পেশালিস্ট, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সাস্কাচুয়ান, কানাডা)

Friday, August 22, 2025

আমার ঢাকার জীবন এবং বিচিত্র এক মানুষ!

লেখক: Syed Saiful Alam Shovan (https://www.facebook.com/share/1GH823Ybmb/

"আমি এক ভদ্রলোককে ঢাকায় খুঁজে পেয়েছিলাম। উনার ব্যবসা ভাংগারির। তবে উনার অন্যতম প্রধান কাজ ছিল তার নিজস্ব লোকজন দিয়ে সিটি করপোরেশনের ম্যানহোলের ঢাকনা আর সড়কের লোহার গ্রিল চুরি করানো।

Monday, August 4, 2025

জুলাই-যোদ্ধা এক মাওলানা!

লেখক: দিপ্র হাসান (https://www.facebook.com/share/1AG3Shrf55/)

"এই মাওলানাকে চিনেন নিশ্চয়ই?


Sunday, July 20, 2025

এন্টার্কটিকায় একজন অভিযাত্রী!

লেখক: Eng. Naim Uddin

(ইঞ্জিনিয়ার নাঈম উদ্দিন, বাংলাদেশের অল্প মানুষদের মধ্যে একজন, যিনি এন্টার্কটিকা ঘুরে এসেছেন, বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা নিয়ে।)

Saturday, July 5, 2025

আস্কারা এবং এর অকল্পনীয় ফল!

লেখক: Kamrul Hassan Mamun

(https://www.facebook.com/share/16jaJmFZ4f/) [লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত]

"চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতির জন্য সাক্ষাৎকার দিতে আসা শিক্ষককে বরখাস্তের দাবিতে একদল শিক্ষার্থী ভিসির রুমে ঢুকে যায় এবং সেখানে যেভাবে হট্টগোল করেছে তা অকল্পনীয়!

Wednesday, July 2, 2025

এক যোদ্ধা: ক্যামেরার পেছনের কুশীলব!

লেখক: শাফকাত রাব্বী অনীক (https://www.facebook.com/share/1D28Vv2eDL/) [লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত]

"ছবিটি হচ্ছে শেখ হাসিনার পালানোর দিন, আগস্ট ৫, ২০২৪ সালের গণভবনের দুপুরের পূর্বে অপ্রকাশিত স্যাটেলাইট ইমেজ।

Sunday, June 29, 2025

এক অন্য রকম লড়াই!

লেখক: Ahmed Noor

(https://www.facebook.com/share/15jxDnKNtW/ ) [ ফেসবুক থেকে লেখকের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত] 

" 'দৈনিক কালের কণ্ঠ’র প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সাড়ে ১২ বছর সিলেট ব্যুরো প্রধান ছিলাম।

নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিতে কখনও কার্পণ‍্য  করিনি। সিলেট বসে যুক্তরাজ্যের দু দুটো নির্বাচন কভার করেছি। যখন অন্য পত্রিকাগুলো যুক্তরাজ্যে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে।

Thursday, June 19, 2025

এক লড়াকু যোদ্ধা!

(https://www.facebook.com/share/1BkzeStupG/) [লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত]

"আমার নাম নীলা ইস্রাফিল। আমি এনসিপির সদস্যা হই বা না-হই, আমি একজন যোদ্ধা।
আমি আমার শ্বশুরবাড়িতে লেক্সাসে চড়তাম। ২৬ জন কাজের লোক ছিল। আরাম-আয়েশের কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু খারাপ প্রস্তাব পাওয়ার পর আমার শ্বশুর  প্রয়াত  উপদেষ্টা  সুফি চেহারার আড়ালে বিভৎস এক দানব হাসান আরিফকেও আমি ছাড় দেই নাই!

Saturday, June 14, 2025

আমাদের একজন 'বাবর আলী!

(লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)
"অনন্য এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন আমাদের বাবর আলী! ভ্রমণে মূল ঝামেলা থেকেই বাঁচিয়ে দিয়েছে বাবর আলী। আমার কাছে সাধারণত অপরিচিত লোকজনেরা প্রথমেই জানতে চান ঘোরাঘুরির টাকা ম্যানেজ করা যায় কী করে? আমি চট করে হাতের কাছে থাকা বাবর আলীর উদাহরণটা দিয়ে দিই!
অনেকে বলে থাকেন, 'টাকা জমাতে পারছি না বলে দেশ ঘুরতে বের হতে পারছি না'।
ইয়ে,‌আপনার পকেটে কি পাঁচ হাজার টাকা আছে? কিংবা পাঁচ হাজার টাকা কি আগামী কয়েক মাসে জমানো সম্ভব?

Monday, May 12, 2025

একটি জুতা এবং এক টাকার পানি!

লেখক: সাইফুল বাতেন টিটো (https://saifulbaten.blogspot.com/?m=1), https://www.facebook.com/share/1LJjnqmFwJ/

"সম্ভবত ২০১৪ সালের কথা। চ্যানেল আই আমাকে দিয়ে দ্বিতীয় নাটক বানাবে এই জন্য আমি ইবনে হাসান খানের সঙ্গে মিটিং শেষ করে কবি নির্মলেন্দু গুণদা'র মেয়ে প্রডিউসার মৃত্তিকা গুণের সামনে বাজেট নিয়ে কথা বলছি আর চা খাচ্ছি। সঙ্গে সম্ভবত Hassan Shantonu ছিলেন। কবিকন্যা  মৃত্তিকা বললেন:

Thursday, March 20, 2025

বিচারপতি সাহাবুদ্দিন: এ দেশে এক অভূতপূর্ব, বিরল...!

লেখক: Shariful Hasan: (https://www.facebook.com/share/1BPXYjYD18/)

"অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ পেলেও কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বা প্রয়োজন ছাড়া তিনি রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনে আসেননি! রাষ্ট্রপতির জন্য নির্ধারিত কোনো কিছু তিনি গ্রহণ করেননি। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে বিদেশি অতিথিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপহার তিনি সরকারি তোষাখানায় জমা দিয়েছেন। সাধারণ পোশাক-পরিচ্ছদই তাঁর সবসময় পছন্দ ছিল। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেকেই তাঁকে নতুন কিছু জামাকাপড় বা স্যুট তৈরির কথা বলেছিলেন। সেসব কথাকে তিনি আমল দেননি।

Saturday, November 2, 2024

ডিয়ার, জামাতে আমির, সমীপেষু...!

লেখক: Farjana Mahbuba (https://www.facebook.com/Ms.SunshineInTheRain)
"আমীরে জামাত মেয়েদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে যমুনা টিভিকে বলেছেন:
'আফগানিস্তানে একচুয়ালি কী হচ্ছে, এটা আপনিও চোখে দেখছেন না, আমিও দেখছিনা, শুধু মিডিয়ার মাধ্যমে খন্ডচিত্র আমাদের কাছে যেটুকু আসে তাই নিয়ে আমাদের ধারণা।'

Wednesday, September 4, 2024

গণভবন হোক গণমানুষের!

লেখক: Ridwan Anam (https://www.facebook.com/ridwan.anam)
 
"জুলাই-অগাস্ট ছাত্র জনতার বিপ্লবের স্মৃতি চির অম্লান রাখতে একটা আন্তর্জাতিক মানের জাদুঘর গড়ে তোলা অবশ্যই প্রয়োজন। এবং সে জাদুঘর যদি শেখ হাসিনার ১৬ বছরের ভয়াবহ অপশাসনের কেন্দ্রবিন্দু, দুর্ভেদ্য গণভবনে হয়, তার চেয়ে সুন্দর পোয়েটিক জাস্টিস আর হয় না।

Wednesday, July 3, 2024

বিহঙ্গ হয়েছে অন্ধ, বন্ধ করেছে পাখা

লেখক: Najmul Albab Opu
"চল্লিশ পেরুলে বয়েস পরস্পরের আলাপের বিষয় হয় ওষুধের তালিকা। কোন কবি বলেছিলেন এই কথা? কোন কবিতায় আছে এই কথা? নাকি কোন গদ্যে?
কথাটা মিথ্যে নয়। নির্দিষ্ট বয়েস পেরুলে পরে বন্ধুদের আলাপেও ঢুকে পড়ে সাম্প্রতিক স্বাস্থ্যবার্তা। আমরা সিনেমা নিয়া কথা বলি। তত্ত্ব বা তথ্য থাকে না সেখানে। নিজেদের মধ্যে কার হৃদয়ে ছুরি চিকিৎসা হলো তার গল্প করতে করতে মান্নাদা বলে, সিনেমাটা খারাপ না। দেখতে পারিস।
WhatsApp