Search

Showing posts with label জীবনটাই যখন নিলামে. Show all posts
Showing posts with label জীবনটাই যখন নিলামে. Show all posts

Tuesday, March 8, 2022

আবার আসিব ফিরে...।

বেচারা শরীর! লাইনচ্যুত হল। একটা অস্ত্রাঘাত যার চালু নাম অপারেশনের প্রয়োজন হল। এখন কেউ যদি রসিকতা করেও বলে, 'কী মাঝি, ডরাইছ'? আমি সপাটে বলব, হ, ডরাইছি।

একজন জ্ঞানি মানুষ নাকি মৃতের জন্য শোক করেন না। একজন জ্ঞানি মানুষের কাছে মৃত্যু নাকি কেবল খোলস ত্যাগ করা। হবে হয়তো! আমি জ্ঞানি নই বলেই এ নিয়ম আমার বেলায় খাটে না। তাই আমি আমার মৃত মার জন্য হাহাকার করি, আপাতত জীবিত নিজের জন্য ভয় পাই।

Tuesday, October 19, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৯

লোপার চোখে ত্রাস, তুমি নাকি সৈয়দ সাহেবকে জুতা দিয়ে পিটিয়েছ?
ক্ক-কাকে?
সৈয়দ সাহেবকে।
ওইটা ফকিরন্নীর পোলা। সৈয়দ বংশের কলংক।
ফকিরন্নীর পোলা না আমিরের পোলা এটা তো আমি জানতে চাইনি। জুতা দিয়ে পিটিয়েছ কেন?
রাব্বি হাঁই তুলল, পাগল! জুতা দিয়ে পেটাব কেন! আমি কেবল বললাম ওইটা একটা ফকিন্নির পোলা। আচ্ছা, তুমি এই হাস্যকর খবর কোত্থেকে পেলে?
লোপা বিরক্তি নিয়ে বলল, সেটা আলোচনার বিষয় না, তুমি এটা করেছ কিনা জানতে চেয়েছি?
পাগল!
পাগল না ছাগল এই বিষয় নিয়ে তোমার সাথে এই আলোচনায় যেতে যাচ্ছি না।
পাগল না হলে কেউ এমন আজগুবি প্রশ্ন করে!
কথা ঘুরাবে না।


রাব্বি অবাক হতেও ভুলে যাচ্ছে সৈয়দ বাসের নামের এই মানুষটার মাথায় ষাড়ের বিষ্ঠা ছাড়া কি আর কিছুই নাই! জনে জনে কেমন করে এটা বলে বেড়াচ্ছে, এ্যা-এ্যা, আমাকে না, আমাকে না জুতা দিয়ে মেরেছে, ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা। অন্তত ঘুরিয়ে বলতে পারল না। রাব্বির মুখ এবার হাসি-হাসি, কোন জুতা দিয়ে পিটিয়েছি? চটি, না বুট জুতা, নাকি নাগরা?
ফাজলামো করবে না বলছি। খবরদার-খবরদার।
আচ্ছা যাও। তা কোথায় পিটিয়েছি?
অফিসে।
অফিসে সবার সামনে এই কান্ড করা কী সম্ভব?
সম্ভব-অসম্ভব নিয়ে তো কথা হচ্ছে না।
আজিব, কেউ দেখল না। ওই ফকিন্নির পোলা বলল আর হয়ে গেল, আজিব! হারামজাদা সবাইকে এটাই বুঝিয়েছে, বুঝলে।
তাইলে তোমার নামে থানায় জিডি করল কেন?
জিডির কপি আমার হাতে আছে। দেখাও কোথায় লেখা আছে একে জুতা দিয়ে পেটানো হয়েছে?
বেশ, লেখা নাই। কিন্তু অহেতুক তোমার নামে কেউ থানায় জিডি করবে কেন?
রাব্বির গলায় উষ্মা, আহ, বললাম না জিডির কপি আছে আমার কাছে। ওখানে লেখা আছে, বানচোত অভিযোগ করেছে, আমি নাকি তাকে প্রাণনাশের-জানে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছি। আরে বানচোত, কিভাবে তোকে প্রাণে মারার চেষ্টা করেছি এটা লিখবি না, গলায় চিপা দিয়েছি, নাকি ছাদ থেকে ফেলে দিতে গিয়েছি? এটা না বললে আইন বুঝবে কেমন করে!
লোপা বরাবরের মতই বিরক্ত হলো, রাব্বি, তোমাকে এটা বলে বলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি তোমার মুখে এই সব ভাষা শুনতে ভাল লাগে না। আমি জানতে চাইছিলাম উনি তোমার নামে জিডি করলেন কেন?
এইটা আমাকে না জিজ্ঞেস করে ওই বানচোতকে জিজ্ঞেস কর।
তুমি মুখ আবার খারাপ করছ কেন, আশ্চর্য!
মুখ খারাপ করব না তো কবিতা বলব? ‘বানচোত-বানচোত, করছো তুমি কী, এই দেখো না কত্তো সুন্দর কবিতা লিখেছি’।
মুখ খারাপ করবে না। খবরদার বলছি, খবরদার।
আচ্ছা যাও মুখ খারাপ করব না। ছাপার অক্ষরে বলি তাহলে, আসতে আজ্ঞা হউক, বসতে আজ্ঞা হউক।  সৈয়দ সাহেবকে বসতে পিঁড়ি দিতে আজ্ঞা হউক।
তুমি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছ!
আরে না। শোন, মিথ্যা জিডি করে আমাকে ফাঁসাতে চেয়েছে। সত্য হলে তো এটা নিয়ে তদন্ত হত, থানা থেকে আমাকে ডাকত। উল্টো আমি আরও নিজ থেকে থানায় যোগাযোগ করেছি। ওদের বলেছি বিষয়টা তদন্ত করে দেখতে কিন্তু থানাওয়ালারা উল্টা বলছে, যে জিডি করেছে সে নিজে তদন্ত না চাইলে আমরা অযথা এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাই না।
এবার লোপা খানিকটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল, যাক, শুনে খানিকটা ভাল লাগছে।
রাব্বি এবার খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে বলল, না, এতটা নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নাই।
কেন?
আরে বান-।

আহ, রাব্বি!
সরি।
কি বলছিলে?
ও থানায় জিডি করার পাশাপাশি র‌্যাবকেও জানিয়েছে। র‌্যাব তাদের অফিসে আমাকে ডাকিয়েছে।


লোপা ভীত চোখে তাকিয়ে আছে।
রাব্বি বলল, আহ, অমন করছ কেন?
লোপা সত্যি কথাই বলল, ভয় লাগছে।
ভয়ের কী আছে।
তোমার ভয় করছে না?
না। আমি তো কোন অন্যায় করিনি। শুধু শুধু ভয় পাব কেন!
রাব্বি, র‌্যাবের নাম শুনেই আমার বুকটা কেমন করছে!
আরে না, এরাও তো আমাদের মত মানুষ। সত্যটা বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝবে।
তারপরও।
তার আর কোন পর নাই।
কবে যাচ্ছ দেখা করতে?
কাল। ১২টায়।
বেরুবে কটায়?
হাতে সময় নিয়ে যাই। সময় ১২টায় যখন। অবশ্যই শার্প।
রাব্বি, তুমি কি সাথে একজন লইয়ারকে নিয়ে যাবে?
ধুর, হিন্দি সিনামা নাকি!
প্লিজ, অন্তত সাথে কাউকে নিয়ে যাও।
আরে না।
প্লিজ রাব্বি।
আহ-।
প্লিজ।
শোন, ডাকিয়েছে আমাকে, সাথে কাউকে নিয়ে গেলে এরা হয়তো অন্য রকম অর্থ করবে। আমার মনে তো কোন কু নাই, আমি কোন অন্যায় করিনি। একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে ওখানে যাই এটাই ভাল হবে।
লোপা চোখে এক অজানা আতংক নিয়ে তাকিয়ে রইল।

Sunday, October 17, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৮

কাঁটায় কাঁটায় ন-টা। রাব্বি নিজের চেয়ারে ভাল করে বসতেও পারেনি। হেড অফিসের লোকজন ঝড়ের গতিতে রাব্বির রুমে ঢুকে পড়ল। তখনও রাব্বি বুঝতে পারেনি ঘটনা কী! এরা নিমিষেই তার অফিস-রুমটা তছনছ করে ফেলল। এরা যখন ওর ড্রয়ারের চাবি চাইল সে হাসি মুখে এগিয়ে দিল।
ওর ড্রয়ার থেকে যখন বিপুল অংকের টাকা উদ্ধার হলো ও শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তখনও মুখের হাসি পুরোটা মিলিয়ে যায়নি! ওর ড্রয়ারে এতো টাকা থাকবে কেন? ড্রয়ারে তো কখনও টাকাপয়সা রাখে না, খুচরো পয়সাও না। ওর এই অভ্যাসটাই নাই। যা থাকে ওর ওয়ালেটে। এর মানে কী!

হেড-অফিসের লোকজনরা একেকটা টাকা গুনে দেখল, নাম্বার লিখল। একের পর এক নাম্বার বসিয়ে ফর্দ তৈরি করল। সঙ্গে নিয়ে আসা পূর্বের একটা শিটের নাম্বারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল। রাব্বিকে সই করতে বলল। রাব্বি যন্ত্রের মত সই করল।
চীফ হিসাবে সৈয়দ সাহেবও সই করলেন। রাব্বি চেয়ে চেয়ে দেখল। এই বিপুল আয়োজনে ওর করার কিছুই ছিল না কেবল যন্ত্রের মত তাকিয়ে থাকা ব্যতীত। কেউ তাকে কোন প্রশ্ন করল না, কোন ব্যাখ্যা দাবি করল না।
১ ঘন্টা পর হেড অফিসে একবার কেবল ওকে ডাকিয়ে নিয়ে টার্মিনেশন লেটারটা ধরিয়ে দেয়া হলো। রিসিভ কপিতে ওর সই রাখা হলো।
রাব্বি অবিশ্বাসের চোখে টার্মিনেশন লেটারটার দিকে তাকিয়ে ছিল। এটা ইস্যু করা হয়েছে হেড অফিস থেকেই, অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে। হায় খোদা, মাত্র ১ ঘন্টাও হয়নি, কখন এরা বসল, কখন সিদ্ধান্ত নিল! এর মানেটা কি দাঁড়াল, সিদ্ধান্তটা কি আগেই নেয়া, এটা কি আগেই টাইপ করে রাখা হয়েছিল? তাই হবে। নইলে এতো দ্রুত সব কিছু গুছিয়ে আনা সম্ভব না। কিন্তু।


সমস্তটা দিন অফিসে ঝিম মেরে বসে রইল। কারও সাথে কোন কথা বলল না। অফিসেরও কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে আসল না। গোটা অফিস চাউর হয়ে গেছে, রাব্বির কাছ থেকে বিপুল টাকা উদ্ধার করা হয়েছে এবং কঠিন প্রমাণ পাওয়া গেছে, সে একজনকে দেয়া অন্যায় সুবিধার বিনিময়ে এই টাকাটা অবৈধভাবে নিয়েছে। ওর ল্যাপটপেও আপত্তিকর তথ্য পাওয়া গেছে, অকাট্য প্রমাণ।
রাব্বির দমবন্ধ হয়ে আসছে। চিৎকার করে, গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। এরা সব কেমন করে অবলীলায় বিশ্বাস করে বসল ও এমনটা করতে পারে! পৃথিবীর ভয়ংকর অপরাধিকেও তার বক্তব্য বলার সুযোগ দেয়া হয়। এরা কেন এমন অমানুষের মত আচরণ করছে। বছরের পর বছর ধরে যাদের সংগে চাকুরি করেছে তাদের কাছ থেকে একটা ফোন কলও পাওয়ার যোগ্যতা ও হারিয়েছে। হা ঈশ্বর, মানুষ এতোটা নিষ্ঠুর হয় কেমন করেন!


কেবল মুনিম ভয়ে ভয়ে একটু পরপর উঁকি দিয়েছে। একবার অনেক সাহস করে বলেছে: স্যার একটু চা দেই।
চা খেতে রাব্বির কোন ইচ্ছাই ছিল না কিন্তু মুনিমের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য মাথা নাড়ল। এই প্রথম মুনিমের চা বিস্বাদ লাগল। এক ঢোক খেয়ে কাপ নামিয়ে রাখল। আজকের চাটা কেমন বিস্বাদ লাগছে! রাব্বি একের পর এক সিগারেট টেনে ঘর অন্ধকার করে ফেলেছে। দুপুরে খেতেও গেল না।
আবারও মুনিমের যন্ত্রণা। রাব্বি কিচ্ছু বলেনি অথচ গাধাটা প্যাকেট লাঞ্চ রেখে গেছে। প্যাকেটের জায়গায় প্যাকেট পড়ে রইল। ও ছুঁয়েও দেখল না। ওর বুদ্ধিশুদ্ধি সব গুলিয়ে গেছে। নিজের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। তালামারা ড্রয়ারে টাকা আসবে কোত্থেকে, তাও বিরাট অংকের টাকা? চাবি অবশ্য যে কেউ হাতিয়ে নিতে পারে। কিন্তু ল্যাপটপের ওই আপত্তিকর ফাইল, তথ্য কেমন করে আসল? ওদের প্রত্যেকের নিজস্ব পাসওয়ার্ড আছে। তাহলে?


এইবার রাব্বি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। মুনিম কেবল উঁকি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি। ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
আহ, কেন তুমি বারবার বিরক্ত করছ!
স্যার, একটু কথা আছিল।
এখন কোন কথা বলতে ইচ্ছা করছে না, তুমি যাও এখান থেকে।
স্যার, আপনারে চাকরি থিক্যা বাইর কইরা দিব এইটা আপনি এখন জানলেন! আমরা সকালেই জাইনা গেছি। সৈয়দ স্যার এইটা নিয়া কার সঙ্গে জানি ফোনে কথা বলতাছিল।
সৈয়দ সাহেব তাহলে এর পেছনে আছেন?
জ্বী স্যার।
রাব্বির কথা বলতে ভাল লাগছে না। মুনিম বিদায় হলে ও বাঁচে। এটা ও খানিকটা আঁচ করতে পারছিল কিন্তু মেলাতে পারছে না।
মুনিম ফিসফিস করে কী যেন বলল। রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, কি বলছ!
মুনিম গলা আরও নামিয়ে বলল, স্যার, শামসির স্যারও এর সঙ্গে আছেন।
রাব্বি চেঁচিয়ে বলল, ক্কি, কি বললা তুমি। ফাজলামি করো, থাপ্পড় দিয়া দাঁতসব ফালায়া দেব। ফাজিল কোথাকার!
স্যার, মিথ্যা বললে আপনের জুতা দিয়া পিটাইয়েন। আমার বাচ্চার কসম, আমি মিথ্যা বলতাছি না।
মুনিম, তুমি জানো, তুমি কী বলছ!
জাইনাই বলতাছি, স্যার।
আহ-।
স্যার, কাইল আপনে বিকালের আগেই বাইর হয়া গেছিলেন। আমি ভাবলাম আপনে রুমে আছেন। চা নিয়ে ঢুকলাম। দেখি, শামসির স্যার আপনার চেয়ারে বসা, আপনার ড্রয়ারে কি জানি ঘাটাঘাটি করতাছে। আমারে দেইখা চোরের মত হাত সরাইয়া ফেলল। চিক্কুর দিয়া কইল, এই স্টুপিড রুমে না জিগাইয়া ডুকলি কেন রে হারামজাদা। স্যার, আপনেই কন, অন্যদের রুমে আমি কি না জিগাইয়া ঢুকি? খালি আপনার রুমে না জিগায়া ঢুকি, আপনে কখনও কিছু মনে করেন না এই লাইগা।


রাব্বি মাথা ফেলে দিল। হে প্রভু, হে পরম করুণাময়, এটা শোনার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল ছিল। এখন সব হিসাব মিলে যাচ্ছে। তাই হবে, কেবল শামসিরের পক্ষেই সম্ভব। শামসিরই ওর পাসওয়ার্ড জানে। নিয়ম নাই কিন্তু সীমাহীন হৃদ্যতার কারণে ওরা পরস্পরের পাসওয়ার্ড সেই কবে থেকেই জানে। কেবল এই ল্যাপটপের পাসওয়ার্ডই না, চাপে থাকলে একজন অন্যজনের মেইলও চেক করে। প্রয়োজনে রিপ্লাইও দেয়।
শেষ পর্যন্ত শামসির, তুই-ও!

একজন মানুষ এতো কাছ থেকে ছুঁরি মারতে পারে কেমন করে? এই পৃথিবীতে কেন বন্ধু, কেন রোদ, কেন বৃষ্টি? কেন-কেন-কেন? রাব্বি ভেবেছিল কোম্পানির এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার সাধ্যমত লড়বে। কিন্তু এই ইচ্ছাটা এখন আর তিলমাত্র নাই। মনে হচ্ছে যেন হাত থেকে ব্রক্ষ্মাস্ত্র খসে  পড়েছে।

মুনিম শান্ত গলায় বলল, স্যার, দুপুরে যখন খাইতে বাইরে গেলাম। একটা ইটের আধলা নিয়া আসছি। আমার তো আর কেউ নাই। সাত বছরের একটাই মাইয়া। আপনে খালি কথা দেন এই মাইয়াডারে দেখবেন। বেশি কিছু করতে হইব না ওরে খালি তিনবেলা চাইরটা ভাত দিবেন। আর কিছু লাগব না। আমি এক্ষণ গিয়া ইটটা দিয়া এই দুই জানোয়ারের মাথা দুই ভাগ কইরা দিয়া আসি।
রাব্বির বুক থেকে জগদ্দল পাথরটা নেমে গেল। এখন মনে হচ্ছে ওর আর হারাবার কিছু নেই। বাঁধভাঙ্গা আবেগ গোপন করে বলল, পাগলামি করবে না, খবরদার। খবরদার বললাম, খবরদার। তাছাড়া আমার নিজের যে জেল হবে না এইটার কি ঠিক আছে। যাও, আমাকে একটু একা ছেড়ে দাও।


রাব্বি অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বে শামসিরকে খুঁজে বের করল। তাকে সৈয়দের রুমে পাওয়া গেল। রাব্বি শামসিরের নতচোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, কেউ কেউ ক্যারিয়ারের জন্য তার মাকে অন্যের বিছানায় তুলে দেয়। তুই তাদের একজন।
শামসির টুঁ-শব্দও করল না।
রাব্বি এবার বলল, শামসির তুই একটু বাইরে যা।  সৈয়দ স্যারের সাথে একটু কথা আছে।
শামসির নড়ল না।
রাব্বি এবার কাতর গলায় সৈয়দকে বলল, বস, আপনার সঙ্গে দুইটা কথা বলে চলে যাব। প্লিজ, শামসিরকে বলুন একটু আমাদের একা ছেড়ে দিতে। আমার ভুলের জন্য আপনার মনে যে কষ্ট হয়েছে এর জন্য আমি একটু কথা বলতে চাই।
শামসির তবু্‌ও অনড়।
সৈয়দ বললেন, সমস্যা তো নাই, বলুন না কি বলবেন?
রাব্বি গলায় তীব্র কাতরতা ফুটিয়ে বলল, প্লিজ, বস, এই একটা ফেভার করুন। লাস্ট ফেভার।
এইবার সৈয়দ মৃদু গলায় বললেন, শামসির, আপনি একটু পরে আসুন।
শামসির তীব্র অনিচ্ছায় কিছু না বলে বেরিয়ে গেলে, রাব্বি দরোজা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল। এবার মুখ খুলল, একেকটা শব্দ আলাদা আলাদা করে উচ্চারণ করছে, এরিমধ্যে কেবল একবার নীচু হয়ে সোজা হলো, আর সৈয়দ-। বস- শুয়োরের বাচ্চা, অনেক ভয় দেখিয়েছিস। জানিস না, একজন মানুষকে এতোটা ভয় দেখাতে নাই যেন তার ভয় কেটে যায়। কুত্তার বাচ্চা, তুই পশুরও অধম, পশুর জন্যে জঙ্গলের আইন, কেবল জঙ্গলের আইন। তুই না খুব গর্ব করে বলতি তোর গায়ে হাত দিতে পারে এমন কোন মানুষ আজ পর্যন্ত জন্ম নেয়নি, বলতি না? এই নে, এটা আমার পক্ষ থেকে তোর জন্য ছোট্ট উপহার-। যত দিন বেঁচে থাকবি এই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবি।

সৈয়দ ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, এটা কি করলেন আ-আপনি! আপনি সিক নাকি!
রাব্বি চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, সিক আমি না, তুই, তুই মাদারচোদ। ড্রাইভারের খাবার নিজের বলে বাড়িতে নিয়ে যাস আবার ডাক্তারি কপচাচ্ছিস।
রাব্বি লম্বা লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে পড়ল। পেছনে পড়ে রইল ভাঙ্গাচোরা একজন মানুষ।

Saturday, October 16, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৭

রাব্বি অফিসে এসে গুম মেরে বসে আছে। নিজের রুম থেকে বের হয়নি। আজকাল অফিসে মেজাজ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
মুনিম প্রায় নিঃশব্দে চা-র কাপ টেবিলে নামিয়ে রাখল। সাথে ঝকঝক করছে এমন একটা কাঁচের গ্লাসে পানি। চায়ে চুমুক দিয়ে বরাবরের মত রাব্বির সেই একই অনুভূতি হলো। ওর ধারণা, মুনিমের চা হচ্ছে পৃথিবীর সেরা চা। লোপাও চমৎকার চা বানায় কিন্তু মুনিমের ধারেকাছেও নেই। অজান্তেই রাব্বির মুখ থেকে তৃপ্তির অস্ফুট শব্দ বের হলো।
মুনিম ভয়ে ভয়ে বলল, স্যার, চা ভাল হয় নাই?
না, ভাল হয় নাই।
কি করুম স্যার, কন। অন্যদিন যেমন বানাই আজও তেমনি বানাইলাম।
আরে না, ভাল হয় নাই কেন বললাম, জানো। খুব, খুবই ভালো হয়েছে। আচ্ছা মুনিম, তুমি অফিসের সবার জন্য কি একই চা বানাও?


রাব্বির এই প্রশ্নটা অনেক দিন থেকে করবে করবে করেও করা হয়নি। কারণ আছে। বেশ ক-দিন ভুলে শামসিরের চা ও চুমুক দিয়ে ফেলেছিল, ওই চা-টা আহামরি কিছু ছিল না।
মুনিম থেমে থেমে বলল, জানি না, স্যার। তয় আপনার চা-টা যখন বানাই মন থিক্যা।
বলো কি!
স্যার, এই অফিসে আপনেই একজন স্যার যে আমাদের মতো ছোট মানুষদের দাম দেন।
ধুর।
আপনারে আইজ বলি, আপনারে নিয়া এই অফিসের অন্য পিয়ন, ড্রাইভার কি কয় জানেন? অনেক অফিসে অনেক সাহেব দেখছি কিন্তু রাব্বি স্যারের মত দেখি নাই। তিনি সবার ভাল-মন্দ জিগান। সবার সাথে হাত মিলান। তাইনের লগে হাত মিলায়া যেই সুখ এইটা কোন তুলনা নাই।
রাব্বির কেমন লজ্জা-লজ্জা লাগছে। বিব্রত গলায় বলল, আচ্ছা, এখন তুমি যাও।
মুনিম বেরিয়ে যেতে যেতে ইতস্তত করছে দেখে রাব্বি বলল, তুমি কি কিছু বলবে?
না স্যার।
আচ্ছা ঠিকাছে।


মুনিম প্রায় দরোজার কাছে গেয়ে ফিরে আসল।
মুনিম, কিছু বলতে চাইলে বলো?
স্যার, একটা কথা বলি, রাগ করবেন না তো?
কেন, কথাটা কি রাগ করার মত?
স্যার, ছোট মুখে বড়ো কথা হইলে মাফ কইরা দিয়েন।
আচ্ছা যাও, আগেই মাফ করে দিলাম। এখন বলো।
আপনি এই অফিসের সবাইরে বিশ্বাস কইরেন না। খুব কাছের মানুষরেও না।
রাব্বি অবাক, এটা কেন বললে?
স্যার, আপনে আগেই বলছেন রাগ করবেন না।
তা বলেছি। কিন্তু এইসব কি বলছ!
স্যার, আপনার ভালার জন্যই কইলাম। আর কিছু জিগায়েন না। যাই স্যার।


রাব্বি অবাক হয়ে ভাবছে, এটা সত্য ও সবার ভালো-মন্দ খোঁজ করে, এটা ওর সহজাত অভ্যাস। আশ্চর্য, এই সামান্য বিষয়টা এরা মনে করে বসে থাকে! এটা নিয়ে আবার আলোচনাও হয়! এতো অল্পতে মানুষজন মুগ্ধ হয়ে পড়ে। আশ্চর্য!
এখন এটা ছাড়িয়ে ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, মুনিম এমনটা কেন বলল! নিশ্চয়ই ও কিছু জানে। অযথা একটা বিষয় বলে মুনিম ওকে বিভ্রান্ত করবে এটা ও বিশ্বাস করে না। মুনিম কোন এক বিচিত্র কারণে ওকে পছন্দ করে এটায় কোন সন্দেহ নেই।
রাব্বি গুছিয়ে মেইলটা লিখল। এম.ডি বরাবর মেইলটা পাঠিয়ে দিল। বুকের ভেতর থেকে একটা অজানা ভয় পাক খেয়ে উঠল। তীর বেরিয়ে গেছে, এখন এটা নিয়ে ওর করার কিছুই না। ওর সব কিছু এখন খড়গের উপর ঝুলছে। হয় খুব ভালো কিছু ঘটবে, নয় সব কিছু ভেঙ্গে পড়বে।


হইচই করে শামসির ঢুকল। শামসির কেবল ওর কলিগই না, অসম্ভব ভালও বন্ধুও।
আরে-আরে, আমাদের রাব্বি মিয়া দেখি ল্যাপটপের উপর উঠে বসে আছে। বিষয় কী? কোন প্রেজেন্টেশন বানাচ্ছিস নাকি?
নারে।
তো, কাহিনি কী!
এম.ডি-কে একটা মেইল করলাম।
ওরি বাবা, ডরাইছি। তোর দেখি হট-লাইন। একেবারে এম.ডি। বাপ, একটু ঝেড়ে কাশো।
‘ব্যাকবোন’।
মানে!
কেন, তুই জানিস না?
মনে পড়ছে না।
আরে, মনে নাই তোর, আমাদের জন্য একটা সুযোগ রাখা হয়েছিল। অফিসিয়াল কোন বিষয়ে যে-কারো বিরুদ্ধে রং-ডুয়িং কিছু ঘটলে তার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল অভিযোগ করা যাবে।
হুম। মনে পড়েছে। তো?
একটা অভিযোগ করলাম।
কার বিরুদ্ধে?
সৈয়দ বাসের।
বলিস কী?
হুঁ।
করেছিস কী!
কি আর করা, যা করার করে ফেলেছি।
শামসিরের চোখে আতংক, কি এমন সমস্যা হলো যে তুই ফট করে এম, ডিকে মেইল করে বসলি।
শুনলে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে!
মাথা খারাপ হলে দেখা যাবে। তুই সমস্যাটা বল।


রাব্বি ড্রয়ার খুলে বিলের কপিগুলো বের করল। একে একে কাগজগুলো গুছিয়ে শামসিরের হাতে দিল।
শামসির বিলের কপিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সময় নিয়ে।
রাব্বি চেয়ারে দোল খেতে খেতে বলল, কি বুঝলি?
সবই বুঝলাম, কিন্তু-।
কি?
শামসির এবার রাগি গলায় বলল, কোম্পানির টাকা জাহান্নামে যাক, তোর সমস্যা কী!
কী বলিস! কোম্পানির টাকা সৈয়দ খেয়ে ফেললে আমার সমস্যা নাই।
তোর সমস্যা কী, তোর টাকা তো আর না। নাকি তোর বাপের টাকা!
রাব্বি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে দেখে শামসির তাড়াহুড়া করে বলল, ভাল কথা, তুই একবার আমার সাথে এই বিষয়ে কথাও বললি না।
সরি রে, আমার আসলে মাথা কাজ করছিল না।
তুই জানিস না সৈয়দের হাত কত লম্বা, জানিস না?
হুঁ।
তারপরও!
হুঁ।
মেইলটা কি পাঠিয়ে দিয়েছিস, নাকি পাঠাসনি?
না, পাঠিয়ে দিয়েছি।
ক্রাইস্ট, ঠিক বলছিস?
হুঁ।
শামসির আর কিছু না লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলতে লাগল। যাওয়ার সময় বিষণ্ন গলায় বলল, তুই ভুল করেছিস, বিরাট ভুল।
রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, হুঁ!


রাব্বির মনটা আরও বিষণ্ন হলো। শামসির যে কেবল ওর ভাল বন্ধু এটুকুই না, এমন খুব বিষয় আছে যা ওরা নিজেদের মধ্যে শেয়ার করে না। এমনও দেখা গেছে পুরো অফিস একদিকে ও এবং রাব্বি আরেক দিকে। আজ পর্যন্ত এমন কোন বিষয় নাই দুজনের মতের মিল হয়নি। অথচ আজ শামসিরের আচরণ ওর কাছে কেমন দুর্বোধ্য মনে হয়েছে। রাব্বি খানিকটা বিভ্রান্ত, এই কাজটা ঠিক হলো নাকি বেঠিক এটা শামসিনের আচরণে স্পষ্ট হয়নি। এটাই ওকে ভাবাচ্ছে...।

* জীবনটাই যখন নিলামে: http://tinyurl.com/2522ss6 

Friday, October 15, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৬

রাব্বি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। হেড অফিস থেকে যে বিলের কপিটা ফেরত এসেছে এটায় এইসব কি হাবিজাবি লেখা আছে! সইটা ওর বস সৈয়দের কিন্তু প্রত্যেকটা ভাউচার অপরিচিত মনে হচ্ছে। যেসব আইটেম এখানে উল্লেখ করা হয়েছে এগুলো তো কেনাই হয়নি! হায় খোদা, এক-দুই টাকা না, লক্ষ-লক্ষ টাকার বিল। ওর গা কাঁপছে। এসি চালু আছে তবুও কুলকুল করে ঘামছে। মাথাটা একেবারেই কাজ করছে না। অথচ এই সময় মাথা বরফের মত ঠান্ডা থাকা প্রয়োজন।
খানিকটা সামলে নিয়ে বিলের পুরো সেটটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে তালা মেরে দিল। এইবার ঠান্ডা মাথায় ভাবা যেতে পারে। বিষয়টা তাহলে কী দাঁড়াল? এই বিলের কপি অনুযায়ী মার্কেট ডেভেলপ করার জন্য লক্ষ-লক্ষ টাকার বিভিন্ন আইটেম কেনা হয়েছে যার সম্বন্ধে বিন্দুবিগর্স ওরা জানে না। অথচ সইটা সৈয়দের এতে কোন সন্দেহ নেই! কেমন করে এটা সম্ভব?


রাব্বি বুঝে উঠতে পারছে না এমন একটা বিল ওদের অগোচরে সৈয়দ পাঠিয়েছে কেন? কেন-কেন-কেন? এটা ওদের আজও জানা হতো না, যদি না বিলের হেড বদলে দেবার জন্য হেড অফিস থেকে ফেরত আসত। সৈয়দ অফিসে নেই নইলে এটা তার টেবিলেই যাওয়ার কথা। সচরাচর হেড অফিসের চিঠিগুলো ওরা সরাসরি সৈয়দের কাছেই পাঠিয়ে দেয়।
রাব্বি ড্রয়ার খুলে চিঠির সঙ্গের ভাউচারগুলো বের করল। একের পর এক উল্টে যাচ্ছে। অপিরিচিতসব আউটেম। ও ১০০ ভাগ নিশ্চিত অধিকাংশই কেনা হয়নি। ড্রাইভারকে বলল গাড়ি বের করতে। কয়েকটা দোকান থেকে একটাকে বেছে নিল। যেতে যেতে ভাবছে, কেমন করে বিষয়টা উত্থাপন করতে হবে? দোকানদারের সন্দেহ হলে ভজকট হয়ে যাবে। ব্যাটা আবার সৈয়দের লোক হলে ফট করে বলে দেবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। ও ফেঁসে যাবে।


রাব্বি দোকানে ঢুকে এটা-সেটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। এরা মুলত বিভিন্ন গিফট আইটেম বিক্রি করে। ক্যালকুলেটর, ঘড়ি, ছাতা, বালতি এইসব। এখান থেকে আউটলেটের জন্য বিভিন্ন গিফট কিনেছে সৈয়দ। প্রতিটি দোকানে যে-কোনও একটা আইটেম গিফট হিসাবে দেয়া হয়েছে এমনটাই সৈয়দ ক্লেইম করেছে। কী বিপুল অংক!
ছেলেটা রাব্বিকে বলল, আপনি কি কিছু খুঁজছেন, স্যার।
রাব্বি মুখ ভরে হাসল, আসলে আমি না, আমার কোম্পানি কিনবে। আপনাদের কাছ থেকে আগেও অনেক টাকার জিনিসপত্র আমরা নিয়েছি।
কোম্পানির নাম শুনেই ছেলেটা হাত কচলাতে শুরু করল, স্যার, আগে বলবেন না। যা লাগে নিয়ে যান, আপনাদের টাকা-পয়সা কোন বিষয় না।
রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, আচ্ছা, মেমোটা-।
স্যার, কি যে বলেন। এইটা কোন সমস্যা না। আগেও তো আস্ত মেমো বই আপনাদের দিয়ে দিয়েছি, দেই নি!
রাব্বি চেপে রাখা শ্বাস ছাড়ল। আচ্ছা, এই তাহলে বিষয়! সৈয়দ অল্প কিছু জিনিস এখান থেকে কিনেছে এরপর আস্ত মেমো নিয়ে ভুয়া বিল বানিয়ে পাঠিয়েছে। পরে যোগাযোগ করবে বলে রাব্বি এখান থেকে বেরিয়ে পড়ল।
অন্য দোকানে ঘুরে আর লাভ নেই। সব জায়গায় একই ফল হবে। দস্তুরমতো ওর মাথা ঘুরছে। কী অনাচার, কী লোভ। সৈয়দ কোম্পানি থেকে প্রায় ১ লক্ষ টাকা বেতন ড্র করে, বেসুমার সুবিধা ভোগ করে। তারপরও একজন মানুষ কেমন করে এমনটা করতে পারে, অসৎ হয়!


এটা নিয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করা ঠিক হবে না। চাকুরির খাতিয়ে অন্যরা ঠিকই সৈয়দের কানে কথাটা তুলবে। আগেভাগে সাবধান হয়ে গেলে সব ভেস্তে যাবে। হেড-অফিসে কার কাছে এটা জানানো যেতে পারে। এম.ডি-কে প্রমাণসহ জানালে কেমন হয়? এমডির নামটা বড়ো অদ্ভুত, হার্ট উইক। শুনেছে বাস্তবে হার্ট উইক না, স্ট্রং টাইপের মানুষ। কোন এক ডিপোতে নাকি কি একটা ঝামেলা হয়েছিল। এ কেমন করে যেন টের পেয়ে যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অফিস, যেখানে সচরাচর একজিকিউটিভ টাইপের কেউ যায় না সেখানে বেস্ট এয়ারের হেলিকপ্টার ভাড়া করে স্বয়ং এম.ডি গিয়ে হাজির। এ নিমিষেই সব তছনছ করে ফেলল। ওখানকার ইনচার্জ বমাল ধরা। ট্যাঁ ফোঁ করার সুযোগও রইল না!
রাব্বি মনস্থির করল সরাসরি এম.ডিকেই লিখবে। এমনিতে এই ভদ্রলোক জয়েন করার পরই কিছু নতুন নতুন নিয়ম-সুবিধা চালু করেছিলেন। ‘ব্যাকবোন’ নামে একটা অপশন চালু করেছেন। এটা হচ্ছে এমন, অফিস সংক্রান্ত কোন রং-ডুয়িং বা অসঙ্গতি কেউ খুঁজে পেলে যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে পারবে। এই অভিযোগ সরাসরি এম.ডিসহ লিগ্যাল এবং ফিন্যান্সের চীফকে নিয়ে গঠিত প্যানেল দেখবে। এবং অভিযোগ সত্য হলে কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে। এইজন্য যে অভিযোগ করবে তার চাকুরি যাওয়া দূরের কথা গায়ে আঁচড়টিও পড়বে না। এটাও বলা হয়েছে, যদি এম.ডি বা প্যানেলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তারা এই দায়িত্ব থেকে তাঁরা সরে যাবেন। অন্য কেউ, আরও কোন উঁচু পর্যায়ের কেউ এই বিষয়ে তদন্তের দায়িত্বে থাকবেন।
রাব্বি ভাবছে, কি করবে? চিঠি কি দেবে, নাকি দেবে না? সিদ্ধান্তটা নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।


অনেকবার রিঙ হওয়ার পর রাব্বি ফোন ধরল। ধরবে কি ধরবে না এটা ঠিক করতে করতেই অনেকটা সময় চলে গেছে। আজকাল সৈয়দের ফোন ধরাও বড়ো কষ্টকর মনে হয়। এই মানুষটার সামনে বা কথা বলার সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু উপায় কী, শালার পেট! আসলে পেটকে দোষ দিয়ে লাভ নাই, দোষ দিতে হবে একপেট আবর্জনাকে। এই আবর্জনাই সমস্ত কষ্টের উৎস। আচ্ছা, স্বর্গে যে নিষিদ্ধ ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল এটাই কী মানুষের খাওয়ার উপযোগি কোন খাবার, যা খেলে হাগু হয়। বিকট সমস্যটা এইজন্যই হয়েছিল কী, প্রথম মানব খেয়ে তো ফেলল এখন হাগু না হয়ে তো উপায় নেই। স্বর্গে যে আবার হাগু করার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। হলে স্বর্গের আর মান রইল কই! বাধ্য হয়ে প্রথম মানবের জন্য স্বর্গের বাইরে স্থান ঠিক করে দেয়া হলো। মানবের জানামতে কথিত পৃথিবী।

ফোনের ওপাশ থেকে সৈয়দ গলা ফাটাচ্ছে, হ্যালো, হ্যালো, হ্যাল-লো।
রাব্বি আপ্রাণ চেষ্টায় গলা স্বাভাবিক করে বলল, জ্বী বস।
কি ব্যাপার আপনার ফোনে রিঙের পর রিঙ হচ্ছে। যাও ধরলেন, কথা বলছেন না!
কি বলেন বস, আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিলেন না, আমি তো আপনার কথা স্পষ্ট শুনছিলাম। আপনি কেবল হ্যালো হ্যালো বলছিলেন। সম্ভবত নেটওয়ার্কে সমস্যা, বস।
কতবার বললাম আপনার এই সিটিসেল নাম্বার বদলান।
বস, সব সময় তো সমস্যা হয় না। কখনও কখনও-।
রাখেন আপনার কখনও কখনও, সিটিসেল ফোন কারা ব্যবহার করে জানেন, রিকশাওয়ালারা ব্যবহার করে।
রাব্বির মেজাজ ক্রমশ খারাপ হচ্ছে, জ্বী, তা করে। বস, গ্রামীনের নাম্বার আমি মেথরের হাতেও দেখেছি। ওই দিন এক মেথর ফোন করে বলছিল-।
সৈয়দের নাম্বার গ্রামীন। বলতে পেরে রাব্বির এখন মেজাজ শরীফ। ব্লাডার ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, এমতাবস্থায়
এখন মুত্র ত্যাগের ন্যায় আরাম লাগছে।
এবার সৈয়দের গলা গম্ভীর, শুনুন, ফিজুল আলাপের জন্য আপনাকে ফোন করিনি। আপনি আমার টেবিল থেকে না-বলে পার্কার কলমটা কেন নিয়েছেন? অফিসে ফিরলে পাঠিয়ে দেবেন।
রাব্বি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছে না। কাল ও সৈয়দের টেবিলে কোন একটা কলম অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে নাড়াচাড়া করেছিল এটা সত্য কিন্তু না-বলে কলম নিয়ে আসবে কেন? আজিব! অন্তত সৈয়দ এটা বললেও পারত, আপনি কি ভুলে কলমটা নিয়ে এসেছিলেন? অথচ এই চুতিয়া এমন করে বলছে যেন ও একটা দাগী চোর। কলম ওই নিয়েছে। শালার দুনিয়ায় কত ধরনের মানুষ যে পয়দা হয়েছে। ক-পাতা পড়ে ফেলেছে বলে এই কুতুয়াকে আবার লোকজন ঘটা করে চাকুরিও দেয়! হারামজাদাকে ও নিজে পিয়নের চাকুরিও দিত না। কার বরাতে যেন চাকুরি পেল? এমপি, না স্পিকার? মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো এই দেশে ব্যবসা ভালই বোঝে। কাকে ক-কেজি তেল দিতে হবে, কাকে হাতে রাখতে হবে এটা এদের চেয়ে কে ভাল জানে! শালারা এই দেশের কাঁঠাল এ দেশের লোকজনের মাথায় ভেঙ্গে খাচ্ছে কি এমনি এমনি! ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি এদের কাছে কোন ছার, নস্যি!
রাব্বির এই মুহূর্তে মনে পড়ল, সৈয়দ একবার অপারেটিং সিস্টেমের  একটা সি.ডি চেয়েছিল ওর কাছে। এর কাছে কোন জিনিস গেলে সেটা ফেরত এসেছে এমন উদাহরণ গোটা অফিসে নাই। রাব্বি সি.ডি-টার কপি করে দিয়েছিল। কাজ চালাতে কোন সমস্যা নাই। ওমা, এই হার্মাদ এই নিয়ে কী নাটকই না করল! দস্তুরমতো একটা অফিসিয়াল চিঠির মতো লিখল। হাস্যকর একটা কাজ। কী চিঠি রে বাবা!


রাব্বি চিঠিটা পেয়ে নিশ্চিত হয়েছিল এ একটা বদ্ধউম্মাদ। ল্যাংটা পাগলের চেয়েও ভয়াবহ, স্রেফ কাপড় পরে থাকে এই পার্থক্য। একে পাগলা গারদে না রেখে খুব বড়ো ভুল করা হচ্ছে।
এর বিজনেস কার্ডটা দেখলেও কারও সন্দেহ থাকবে যে এর মাথায় সমস্যা আছে। ভাঁজ করা যায় এমন দু-পাতার একটা কার্ড। প্রথম পাতায় 'হেড অভ ট্রেড' এইসব ঠিক আছে কিন্তু অন্য পাতায় হাবিজাবি কী নেই যে লিখে রাখেনি। আল্লা জানে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা!
 
সৈয়দ এই বিজনেস কার্ড আবার সবাইকে দেয় না, বেছে বেছে। অফিসের অনেকেই জানে না, বিশেষ করে বড় কর্তারা। এর বিজনেস কার্ডে এই সব বাছাল পড়ে রাব্বির হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে উল্টে পড়েছিল। কেমন চুতিয়ার চুতিয়া!
রাব্বি আরেকটা বিষয় লক্ষ করেছে,  সৈয়দ ফোনটা উঠিয়েই বলবে,  সৈয়দ সাহেব বলছি। আবার অনেক সময় এমনও হয়, কাউকে বলবে, আচ্ছা তুমি যেটা করবে, ওর কাছে গিয়ে বলবে আমাকে সৈয়দ সাহেব পাঠিয়েছেন। হা হা হা। রাব্বির বিস্ময়ের শেষ নাই একটা মানুষ এতোটা নির্বোধ হয় কেমন করে। কেউ কি নিজেই নিজেকে সাহেব বলে নাকি!
রাব্বিকে একদিন বলছে, আচ্ছা, আপনি নাকি মার্কেটে দোকানদারদের কাছে আমার নাম ধরে বলেন?
রাব্বি অবাক, কই, না তো, বস!
হ্যা বলেন, ওই আর কি, আমার ডেজিগনেশনের সঙ্গে নাম জুড়ে দেন। এটা কি ঠিক?
বস, কি বলব তাহলে?
দোকানদারদের কি বলবেন, এটাও আপনাকে শিখিয়ে দিতে হবে! পান দোকানদার ডেজিগনেশনের কি বুঝবে? বলবেন,  এটা সৈয়দ সাহেবের...।
রাব্বি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এই মানুষটার মাথায় কী এক ছটাক ঘিলুও নাই! এতো ছোট ছোট বিষয় নিয়ে কেউ এমন অস্থির হতে পারে। অজান্তেই মনখারাপ করা শ্বাস বেরিয়ে এলো, এই সব অযোগ্য মানুষরাই যোগ্য স্থানে বসে আছে।


ফোনের ওপাশে হ্যালো হ্যালো শুনে রাব্বির চমক ভাঙ্গল। রাব্বি সামলে নিয়ে হিম গলায় বলল, মি. সৈয়দ, আপনার কলম আমি নেইনি। আমি কেন না-বলে আপনার কলম নিতে যাব!
সৈয়দ সম্ভবত রাব্বির গলার উত্তাপ টের পেলেন, আপনি নেন নাই তো কলম গেল কোথায়?
রাব্বির মুখে এসে গিয়েছিল, গেল কোথায়-গেল কোথায়, হুম। এক কাজ কর চিমটা দিয়ে তোর রেকটামে খুঁজে দেখ, না পেলে আমার নাম বদলে ফেলব। মুখে বলল, আপনার কলম কোথায় এটার উত্তর তো আমার কাছে নাই। বস, এক কাজ করলে কেমন হয়, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলে?
সৈয়দ হিসহিস করে বললেন, আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন। আপনি খুব দ্রুত দৌড়াচ্ছেন, একটু আস্তে।
জ্বী বস, আস্তে, এতো আস্তে দৌড়াব পিপড়াও আমাকে ওভার-টেক করে চলে যাবে।
ওপাশের লাইন কেটে গেছে।


সহায়ক লিংক:
১. জীবনটাই যখন নিলামে: http://tinyurl.com/2522ss6 

Thursday, October 14, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৫

রাব্বি যখন ফিরল লোপা আড়চোখে লক্ষ করল রাব্বির হাত খালি। ক্ষীণ আশা ছিল, লোপার জন্য নিজ থেকে বই কিনে নিয়ে আসবে। পরক্ষণেই নিজের ভুল বুঝতে পারল। কী বোকা ও, রাব্বি যদি বই কেনার কথা ভাবত তাহলে অন্তত ফোন করে কি বই লাগবে জানার চেষ্টা করত। বই তো আর আলু-পটল না যে দুম করে একটা কিছু কিনে নিয়ে আসলাম। আসলে মানুষটার ন্যূনতম চেষ্টাও নেই, নেই খানিক অনুতাপও। মানুষটাকে প্রায়শ রোবট-রোবট মনে হয়!
জিজ্ঞেস করলে বলবে না তাই লোপা জিজ্ঞেস করল না। রাব্বির এটা বড়ো বিশ্রি অভ্যাস! ওর ইচ্ছা না-করলে কোন প্রশ্ন করলে উত্তর দেবে না। রাব্বির মতোই তার আচরণও দুর্বোধ্য কিন্তু কোন এক কারণে আজ রাব্বির মনটা ফুরফুরে।
লোপা বলল হতাশা লুকিয়ে, ভাত দেব, নাকি চা খাবে?
নাহ, একটু পর ভাত দিয়ে দাও। আজ প্রচুর চা খাওয়া হয়েছে।
তোমাদের মিটিং শেষ হলো ক-টায়?
আর বলো না, এই সৈয়দ মাদারচোদের যন্ত্রণায় আমি পাগল হয়ে যাব। একটা শেষ হলে আরেকটা মিটিং-এর এজেন্ডা ধরিয়ে দেয়।
প্লিজ রাব্বি, মুখ খারাপ করবে না।
কেন, এটা কী মসজিদ নাকি?
মসজিদ-মন্দিরের কথা আসছে কেন। প্লিজ, মুখ খারাপ করবে না। শুনতে বাল লাগে না!


লোপা বুঝতে পারছে রাব্বি খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়েছে। এ সামান্য কথাও ধরে বসে থাকে। তখন লোপার হয় বিপদ, রাব্বি কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কী কষ্ট, আগ বাড়িয়ে রাব্বির সঙ্গে সেধে সেধে কথা বলতে হয়। রাব্বি কখন ক্ষুব্ধ হলো এটা লোপাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ রাখতে হয়, কী অন্যায় আচরণ! কিন্তু আজকাল রাব্বির মুখ এমন খারাপ হয়েছে কেন? যখন-তখন মুখ খারাপ করে। ভুলটা ধরিয়ে দেয়ার পরও একে লজ্জিত হতে দেখা যায় না।
লোপা কথা ঘুরাবার জন্য বলল, আচ্ছা রাব্বি, গরুর পছন্দের রঙ কী?
হুম।
আহা, বলো না।
হুম।
আহা, বলোই না ছাই। আসলে পারবে না তো ঘন্টা!
হুম।
বলো না, প্লিজ।
লোপা, এটা একটা ফালতু প্রশ্ন, এর কোন উত্তর নাই।
উহুঁ, ফালতু না। গরুর পছন্দের রঙ সবুজ।
ধুর, সবুজ কেন? বোগাস!
আরে, ঘাসের রঙ সবুজ না!
আচ্ছা, তাইলে হলুদ না কেন?
লোপা অবাক, হলুদ হবে কেন?
তুমি বল?
পারলাম না, রাব্বি।
হলুদ এই জন্য, গরু খড়ও তো খায়।
তাই তো, তোমার দেখি অনেক বুদ্ধি।
এটাকে কি কমপ্লিমেন্টস হিসাবে নেব?
অবশ্যই।
রাব্বি ঠোঁট উল্টে বলল, ছ্যাহ বুদ্ধি, বুদ্ধিওয়ালি। গরু কালার ব্লাইন্ড-রঙকানা।
যাহ।
সত্যি।
ঠিক বলছ?
অবশ্যই।
রাব্বি, আমার মনে হয় তোমার এই তথ্যটা ঠিক না।
কেন?
কেন কি আবার। মনে হলো তাই।
লোপা, তোমার মনে হলে তো হবে না।
উহুঁ, এভাবে বললে তো হবে না। লাগবা বাজি?
কি বাজি?
তুমি হারলে যমুনা রিসোর্টে নিয়া যাবা।


রাব্বি মনখারাপ করা শ্বাস ফেলে বলল, নাহ, অফিসের ঝামেলা বেরুনো যাবে না।
নিমিষেই লোপার চোখ জলে ভরে গেল। বিয়ের ৮ বছর হল, এখনও রাব্বির সঙ্গে তেমন কোথাও যাওয়া হয়নি। ওর একটা-না-একটা ঝামেলা লেগেই থাকে। আজ এটা তো কাল ওটা।
রাব্বি বলল, কি হল?
কিছু না।
এতক্ষণ তো বেশ কথা বলছিলে!
ভাল লাগছে না কথা বলতে।
আহা, কি হয়েছে বলবে তো!
কিছু না।
লোপার কথা বলার ইচ্ছেটাই উবে গেছে।


রাব্বি সম্ভবত বিষয়টা লক্ষ করেনি। ও কখনও লক্ষ করে না। আজকাল লোপা ওর এইসব আচরণ সহ্য করতে পারে না। কীসের একটা চাকরি! ছাতার মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি, সেই সাত-সকালে বেরিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত। পরদিন আবার একই। বেছে বেছে ছুটির দিনে মিটিং, এর কোন মানে হয়! ওর কাছে স্রেফ আধুনিক দাসবৃত্তি মনে হয়! আদিম দাসবৃত্তিটাকেই আধুনিক মানুষ ঘষেমেজে আজ এমনটা দাঁড় করিয়েছে। মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশে অজস্র রোবট নামের দাস তৈরি করছে। স্রেফ দাস- একেকটা চলমান রোবট। এর পরিণতি যে কী ভয়াবহ এটা কেউ লক্ষ করছে না কেন?

সহায়ক লিংক:
১. জীবনটাই যখন নিলামে: http://tinyurl.com/2522ss6

Sunday, August 29, 2010

কাপুরুষ!

জামিকে, আড়ালে আবডালে আমরা তার বন্ধুরা ছোকরা-বালক ডাকতাম। ব্যাটা এমন পুতুপুতু! কখনও কখনও ওর আচরণ দেখে বিরক্ত হব কী, লজ্জা করত খুব!
একবার নিশুতি রাতে ফোন করল। সমস্যা কি? ওর ভাষায় গুরুতর সমস্যা।
কী হয়েছে? ও নাকি অকূল পাথারে হাবুডুবু খাচ্ছে! রাতে দাঁত ব্রাশ করে বেসিনে কুলি করতে গিয়ে দেখেন কয়েকটা কাল পিঁপড়া। ওর ভাষায়, পিঁপড়া রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা পড়ে, ওয়াকস আ মাইল... আউড়াচ্ছে আর বেদম পায়চারি করছে। এরা নাকি বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে চলে এসেছে। তো, জামি মিয়ার সমস্যা হচ্ছে, সে বেসিনে কুলি করতে পারছে না, পানি ঢেলে দিলে এরা নাকি ভেসে যাবে।


আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম, টানাটানি করে বেসিন খুলে বেসিনের পাইপে মুখ লাগিয়ে কুলি করতে। এই নিয়ে রাগ করে ক-দিন আমার এখানে আসাই ছেড়ে দিল।
পাগল-ছাগল যাই হোক জামি নামের এই মানুষটাকে আমি বিচিত্র কারণে পছন্দ করি। এর মধ্যে অদেখা এক সরলতা আছে। যেচে আমিই যাই ওর বাড়িতে। একদিনের কথা, অরি আল্লা, আজ এখানে দেখছি আরেক জটিল কাহিনী! কাকের এক বাচ্চাকে নিয়ে পড়েছে। কাকের বাচ্চাটার ডানা ভাঙ্গা, মৃতপ্রায়-মরমর অবস্থায় নাকি ছিল। একটা টুকরিতে করে কাকের বাচ্চাটাকে উঁচু একটা জায়গায় রেখেছিল, পাশে প্লাস্টিকের বাটিতে পানি। দুয়েক ফোঁটা পানি নাকি কাকের বাচ্চাটা খেয়েও ছিল। এজন্য জামিকে নাকি নানা কায়দা-কানুন করতে হয়েছিল। রাজ্যের কাক এসে কা কা করে ওর কানই কেবল ঝালাপালা করে দেয়নি, দু-চারটে ঠোকরও দিয়েছিল। লাভ হয়নি। শেষঅবধি কাকের বাচ্চাটা মরেই গেল।
জামির চোখ আর্দ্র নাকি আমার দেখার ভুল বলতে পারব না। চোখ ঘুরাবার জন্য নাকি কথা ঘুরাবার জন্য জামি হড়বড় করে বলল, চিন্তা কর, কাক কেমন বেকুব জাতি!
আমি হি হি করে বললাম, কাউয়া জাতি? আরি, বেকুব কয় কী!
জামি বিরক্ত হয়ে বলল, হাসছিস কেন? কাক বেকুব না? চিন্তা কর, মানুষ কাক খায় না তারপরও কাক মানুষকে বিশ্বাস করে না। অথচ দেখ, মানুষ কবুতর পেলেই কপ করে খেয়ে ফেলে তবুও মানুষের প্রতি কবুতরের অবিশ্বাস নাই। কেমন লেজ নেড়ে দিব্যি বাকুম-বাকুম করে।
আমি এইবার হাসি গোপন করে বললাম, আচ্ছা যা আর হাসব না, ঘাট হয়েছে। চল তোর সঙ্গে কথা আছে।
জামি বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, দাঁড়া, এইটার একটা ব্যবস্থা করি।
আমি এইবার আক্ষরিকার্থে বিরক্ত, জাস্ট ছুঁড়ে ফেল। এক মিনিটের মামলা। দে আমার কাছে, দেখ কেমন হাত ঘুরিয়ে হুই করে ছুঁড়ে ফেলি। ফুটবলের মত একটা কিক দিলেও হয়, কি বলিস?
জামি আহত চোখে তাকিয়ে রইল।


আমি বললাম, ভুল কিছু বললাম নাকি। বিষয়টা কী বল দেখি, তুই কি এইটার কবর দিবি!
না ইয়ে মানে, কবর-টবর না। অন্তত মাটি খুড়ে...।
তাহলে একটু সবুর কর, হুজুর ডেকে নিয়ে আসি।
জামি হিসহিস করে বলল, তুই যা, তোর সাথে কথা বলতে আমার ভাল লাগছে না।
আমার বিরক্তির একশেষ। তোর এখানে থাকতে আমার বয়েই গেছে। হুশ কুত্তা, হুশ।
সে-বার দুর্দান্ত রাগ নিয়ে চলে এসেছিলাম।


সুবির আর আমি আড্ডা দিচ্ছি। আড্ডা দিচ্ছি কথাটায় খানিকটা ভুল আছে। সুবির আড্ডা দিচ্ছে আমি সঙ্গ দিচ্ছি। একে জামহুরিয়াত-গণতান্ত্রিক শাসনের সময় দিব্যি দেখা যায় ক্ষমতাশীন দলের হয়ে মহড়ায় অস্ত্র ঝোলাতে। এটা শোনা কথা, যাচাই করে অবশ্য দেখা হয়নি। কিন্তু অন্য সময়-জরুরি অবস্থায় টিকিটিও চোখে পড়ে না! এমন একজন উঠতি মাস্তানকে সঙ্গ দিতে অস্বীকার করাটা মুশকিল না?
অনেক দিন পর জামিকে আমাদের বাসায় দেখে থমকালাম। এই ক-দিন যোগাযোগ করেনি। কোথায় ছিল কে জানে। জামি চুপচাপ বসে পড়ল। চশমার কাঁচ অকারণে পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে।
সুবির একমুখ হেসে বলল, কি জামি মিয়া, তুই কি কাউয়ার চল্লিশার দাওয়াত দিতে আসলি?
জামি আমার প্রতি চট করে তাকিয়ে মাথা নীচু করে নিল। তার দৃষ্টিতে বেদনা। ওর বুঝতে বাকী নাই এটা আমার কান্ড! এক্ষণ বুঝলাম কাজটা ঠিক হয়নি। সুবির এটা জনে জনে বলে বেড়াবে, অহেতুক টেনে টেনে রাবার লম্বা করবে।
জামি উত্তর না দিয়ে প্রায় নিঃশব্দে সিগারেট ধরালো।
সুবিরের মুখে ফিচেল হাসি, বললি না জামি, মুখ কি সেলাই কইরা রাখছস? তোর মা এমন একটা হিজড়া জন্ম দিল, আহারে!
জামি বিড়বিড় করে বলল, যা বলার আমাকে বল, আমার মাকে নিয়ে কিছু বলবি না, প্লিজ।
সুবির জামির সিগারেটের প্যাকেটটা চকিতে তুলে নিয়ে বলল, বললে, কি করবি হিজড়াবাবু?
কখন এরা কথা কাটাকাটির চরমে চলে গেছে এটা বুঝে উঠার আগেই সুবিরের এটা বলা শেষ, তোর মাকে আমি...। তাহলে অন্তত তোর মত হিজড়ার জন্ম হবে না এই, গ্যারান্টি দিতে পারি।
জামি ভাঙ্গা গলায় বলল, সুবির আর একটা কথা বলবি না আমার মাকে নিয়ে।
সুবির দাঁত বের করে বলল, বললে? কি করবি রে হিজড়াবাবু? তুই তো হিজড়াই। ভুল বললে প্রমাণ দে, প্যান্ট খোল।


জামি আর একটা কথাও বলল না। সুবির জামির সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ করেনি। ও ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছিল, অনবরত ভাঙ্গচুর হচ্ছিল জামির মধ্যে। চশমার পেছনে জামির যে চোখটা, এক্ষণ অবিকল মরা মানুষের চোখ! সুবির এ-ও লক্ষ করেনি, জ্বলন্ত সিগারেটটা এখন আর জামির আঙ্গুলে নাই, তালুতে চেপে রেখেছে। জামির তীব্র ক্রোধের কাছে সিগারেটের আগুন ক্রমশ পরাস্ত হচ্ছিল, একসময় হাল ছেড়ে দিল, নিবে গেল। কেবল বাতাসে ভেসে বেড়াতে থাকল সূক্ষ্ম চামড়া পোড়ার গন্ধ।
বেরিয়ে যেতে যেতে জামি হিম গলায় বলল, সুবির, তোর সঙ্গে আবার
আমার কথা হবে, ঠান্ডা মাথায়। তখন তোর প্রলাপ শুনব। প্রার্থনা করিস, তোর সঙ্গে আবারও দেখা হওয়ার আগেই যেন আমি মারা যাই।
সুবিরের তাচ্ছিল্যের হাসি উপেক্ষা করে জামি বেরিয়ে গেল। হাঁটার ভঙ্গিতে তার অজান্তেই একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে। দু-হাত শরীর থেকে বেশ খানিকটা দূরে দূরে থাকছে!
ক-দিন পর সুবিরের ক্ষতবিক্ষত উলঙ্গ লাশ পাওয়া গেল, ব্রীজ থেকে ঝুলন্ত, বিশেষ একটা অঙ্গ উধাও!
জামিকে ওর বাসায়ই পেলাম। ঘুম থেকে ডেকে তুলতে বেগ পেতে হল। খবরটা শুনে ও হাঁই তুলল। পারলে এখুনি শুয়ে পড়ে, শয়ালু ভাব! মুখে বলল, স্যাড, ভেরি স্যাড।
আমি উসখুস করে বললাম, জামি, তুই...?
পাগল, কাউকে মেরে ফেলার সাহস আমার আছে নাকি আমার। সুবির কি বলেছিল শুনিসনি? আমি নাকি হিজড়া!
মিথ্যা বলিস না, জামি!
জামি আড়মোড়া ভেঙ্গে বলল, আরে, তুই দেখি এইটা নিয়ে পড়লি। ওকে আমি মারিনি, বললাম তো। ওর ঠোঁটটা কেবল মাছ ধরার বড়শি দিয়ে সেলাই করে দিয়ে কেবল বলেছিলাম, আমার মাকে নিয়ে ওই কথাটা আবার বলতে। বুঝলি, এতবার করে বললাম, বাঞ্চোতটা বলতেই চাইছিল না। খুব নড়াচড়া করছিল, বুঝলি। কী আর করা. বল, ওর দু-হাতের কব্জি পেরেক দিয়ে টেবিলের সঙ্গে আটকে দিয়েছিলাম। আমার ... দেখিয়ে বললাম, এই দেখ, বিশ্বাস হয় আমি যে হিজড়া না। এইবার তোমার পালা বাপ, তোমায় যে প্রমাণ দিতে হয়। বুঝলি, ও ব্যাটা প্রমাণ দেতে চাইছিল না। এটা কি ঠিক, তুই-ই বল! ওই কথাটা আবার বলতে। বাঞ্চোত কথাই শুনে না। আমার খুব রাগ হল, বুঝলি। একটা মানুষকে কতবার অনুরোধ করা যায়। পরে ড্রিল মেশিন দিয়ে...।
স্টপ জামি, ফ’ গড সেক, স্টপ।
আচ্ছা যা, আর বলব না। তা তুই কি এটা পুলিশকে জানাবি?
আমি গুম হয়ে অধোবদনে বসে রইলাম। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলছি। জামির মত একজনের পক্ষে কেমন করে এটা সম্ভব! কিন্তু ওর পাথুরে চোখ, নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বর্ণনা? নাহ, দু-হাত টেবিলে আটকে থাকলে আমি লেখব কেমন করে? জামির মত আলাভোলা ছেলেটার সহজ-সরল জেনেটিক কোডের তথ্যগুলো আবারও এলোমেলো হবে না এই দিব্যি কে দিয়েছে?

Sunday, February 21, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৪


লোপার রাগ অনেকখানি উবে গেছে। রাব্বিকে কেমন অস্থির-অস্থির লাগছে। মানুষটা এমনিতে বড়ো অস্থির কিন্তু বেশ কয়েক মাস ধরে এ অনেকখানি পাল্টে গেছে। এর স্বাভাবিক জীবন-যাপন, নিজের সময় বলতে কিছু নেই। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। একটা কথা জিজ্ঞেস করলে হা-হু বলতেও বড্ড কষ্ট হয় এমন। বারবার জিজ্ঞেস করলে ঘুরেফিরে একটাই উত্তর, অফিসে খুব ঝামেলা যাচ্ছে।
কি ঝামেলা জিজ্ঞেস করলেই চিড়বিড় করে উঠে, আহ, আমি অফিসের সমস্যা নিয়ে তোমার সাথে ডিসকাস করব নাকি! কী যন্ত্রণা, আমাকে কী লিখিতাকারে তোমার কাছে রিপোর্ট করতে হবে! তুমি কি আমার বস?

লোপা অবাক হয়ে ভাবে, মানুষটা কতো বদলে গেছে। মানুষটা শেষ কবে তাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে, শেষ কবে গল্প করেছে, শেষ কবে তাকে কাছে টেনেছে মনেও পড়ে না। মানুষটা একটা রোবট হয়ে গেছে। আজ আট বছর হলো ওদের কোন সন্তান নেই। এই নিয়েও মানুষটার কোন বিকার নেই। হা-হুতাশ নেই, কোন চেষ্টা নেই। লোপার এটা আজও বোধগম্য হয় না, একটা মানুষ সন্তান নেয়ার ব্যাপারে কেমন করে এতোটা নির্বিকার থাকে। এই বিষয়ে কিছু বললেই গা-ভাসানো উত্তর, এতো অস্থির হওয়ার কী আছে। যখন হওয়ার এমনিই হবে।

এটা কেমন কথা। এতো বছর হলো, সন্তান না-হওয়ার পেছনে কোন না কোন জটিল একটা সমস্যা আছে নিশ্চয়ই। কার সমস্যা, কেন সমস্যা এটা জানাটা কি জরুরি না? অন্তত ডাক্তারের কাছে না-যাওয়ার পেছনে যুক্তি কী। চুপিচুপি লোপা ডাক্তারের কাছে যায়নি এমন না কিন্তু কিছু বিষয় আছে যার জন্য দু-জনের যাওয়াটা জরুরি। লোপা একবার বলেছিল। রাব্বি ঠোঁট উল্টে বলেছিল, তোমার প্রয়োজন হলে তুমি যাও, আমি যাব না।
লোপা নাছোড়বান্দা, আহা, ডাক্তারের কাছে গেলে তো আর দোষ নেই। মানুষ বেড়াতেও তো যায়।
বেড়ালে তুমি বেড়াও। আর এই নিয়ে হইচই করো না তো, অফিসের যন্ত্রণায় দম ফেলার ফুরসত নাই।
রাগে লোপার গা জ্বলে যায়। অফিস আর অফিস, যেন এই পৃথিবীতে আর কেউ অফিস করে না। বিয়ের পর পরই কোথাও ঘুরতে যাওয়া দূরের কথা, আত্মীয়দের বাড়িতেই যাওয়া হয়নি!

কিন্তু এখন এইসব সব ভুলে গেছে। রাব্বিকে দেখে এখন কী মায়াই না লাগছে!
রাব্বি, কি হয়েছে তোমার?
রাব্বি চুপ করে রইল।
লোপা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নরম গলায় বলল, বলো না কি হয়েছে?
কিছু না, অফিসের ঝামেলা।
তোমার এই ঘোড়ার অফিসের ঝামেলা কবে শেষ হবে! বিয়ের পর থেকে তো শুনেই আসছি এটা।
রাব্বি ক্লান্ত ভঙ্গিতে সোফায় গা এলিয়ে দিল।
লোপা রাব্বির গায়ে হাত রাখলে রাব্বি বিরক্তি ভরে হাতটা সরিয়ে দিল। লোপা কষ্টের শ্বাস গোপন করল। রাব্বি কি এটা জানে ওর এই আচরণ ওকে কতটা কষ্ট দেয়? ও কোন দিন জানার চেষ্টাও করবে না। একজন মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয় কেমন করে? এইসব মানুষরা বিয়েই বা করে কেন? এরা থাকবে একা একা, পৃথিবী থেকে বিদায়ও নেবে একা।

লোপা আবারও হাত ধরার চেষ্টা করলে রাব্বি সজোরে সরিয়ে দিল। লোপার কষ্টের শ্বাস এবার আর গোপন থাকল না। লোপা নিজেকে ধিক্কার দিল, ওর মত বেহায়া মানুষ এই পৃথিবীতে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাব্বির এতোটা তাচ্ছিল্যের পরও রাব্বির জন্য ওর এই মায়ার উৎস কমে না কেন? এই উত্তরটা ওর অজানাই থেকে যাবে। আজকাল এই উত্তরটার জন্য ওর মনে প্রশ্নটা কেবল ঘুরপাক খায়, কেন-কেন!
লোপা ম্লান গলায় বলল, চা খাবে?
হুঁ, চা খাওয়ার বিষয়ে রাব্বির কোন না নাই।
শুধু চা, সঙ্গে আর কিছু খাবে?
নাহ, চা-ই দাও।
খালি পেটে চা খাবে?
আহ, না বলতাম তো।
অফিসে সন্ধ্যায় নিশ্চয়ই কিছু খাওনি?
লোপা, তুমি বড়ো বিরক্ত করো।

লোপা আর কথা বাড়ালো না। কিন্তু চা নিয়ে আসার সময় কয়েকটা বিসু্কট নিয়ে এসেছে। রাব্বি ঠিকই আগ্রহের সঙ্গে চার-পাঁচটা বিস্কুট খেল। লোপা কাতর চোখে তাকিয়ে আছে। মানুষটার পেটে ক্ষিধে অথচ ইচ্ছা করেই সে অন্য কিছু খাচ্ছে না।
রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, লোপা, আমার না অফিসে খুব সমস্যা হচ্ছে। আমার এই চাকরিটা করতে আর ভাল লাগছে না।
চাকরি করতে কার ভালো লাগে, বলো।
জানো, আমি এখানে আর কিছুদিন চাকরি করলে ঠিক পাগল হয়ে যাব।
লোপা অজান্তেই কেঁপে উঠল। নিশ্চিত এ খুব বড়ো সমস্যায় আছে। মানুষটা শক্ত প্রকৃতির। লোপা অনেকবার দেখেছে, কেমন করে অনেক বড়ো বড়ো সমস্যা এ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। অনেক গুন্ডা-পান্ডাকে দেখেছে একে সমীহ করে কথা বলতে। অনেক জায়গায় লোপা রাব্বির বউ হওয়ার সুবাদে আলাদা খাতির পেয়েছে। অথচ আজই একে দেখল একেবারে ভেঙ্গে পড়তে।
রাব্বি, তোমার অফিস থেকে কি চাকুরি ছেড়ে দিতে বলেছে?
নাহ।
তাহলে?
আরে, সৈয়দ মাদারফাকারটার জন্য-।
প্লিজ রাব্বি, মুখ খারাপ করবে না।
মুখ খারাপ করব আবার কী, এর নাম মুখে নিলে অজু ভেঙ্গে যায়, জানো না?
না জানি না।
আজ তো জানলে।
জানলাম, বেশ। প্লিজ, তুমি মাথা গরম করো না। কুল।
ফাকিং কুল।
রাব্বি, তুমি প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে খুব মুখ খারাপ করো।
হুম।
হুম, কুল।
হুম।
হুম, কুল।
রাব্বির মুখে অজান্তেই একচিলতে হাসি ফুটে উঠল।
আচ্ছা রাব্বি, তুমি কি জানো, তোমাকে হাসলে খুব সুন্দর দেখায়?
না, জানি না।
আজ তো জানলে।
লোপা বাজে বকবে না, আমাকে সুন্দর দেখায়। আমার মা-ই এই গ্রহের একমাত্র মহিলা যিনি আমাকে সুন্দর বলে এসেছেন, তার চোখে আমার চেয়ে সুন্দর আর কেউ নাই।
লোপা হাসি চাপল। রাব্বি এটা প্রায়শ বলে ওর চেহারা নিয়ে আলোচনা করার কিছু নেই। যারা করে তারা চাটুকার ইত্যাদি ইত্যাদি। রাব্বিকে বললে বিশ্বাসই করবে না লোপা কখনও এই মানুষটার চেহারা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এটা ভেবে লোপা লাল হয়ে গেল, রাব্বিকে ওর বেশ লাগে!
কী আশ্চর্য, মানুষটা সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছে!

লোপা অবাক হতেও ভুলে গেছে, মানুষটা এতো যন্ত্রণার মধ্যেও কী অবলীলায় ঘুমিয়ে পড়েছে। লোপার কেন যেন অন্য রকম কষ্ট হতে লাগল। এই মুহূর্তে একে কী অসহায়-ভঙ্কুরই না লাগছে! মাথাটা কেমন এলিয়ে আছে, চোখ থেকে চশমাটা পর্যন্ত খুলে পড়েছে। লোপা আলগোছে চশমাটা সরিয়ে রাখল। লোপা অপেক্ষা করছে রাব্বি উঠলে একসঙ্গে খাবে বলে কিন্তু রাব্বি গাঢ় ঘুমে। সারাটা রাত ও সোফায় শুয়ে রইল। কয়েকবার জাগাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে, এই ছোট্ট সোফায় ঘুমাতে ওর কষ্ট হবে ভেবে। কেমন গোল হয়ে শুয়ে আছে, পা মুড়ে। খালি পেটে কেমন করে ঘুমাবে কে জানে! নিরুপায় হয়ে একটা চাদর ওর গায়ে দিল। এখানে এভাবে ওকে ফেলে যায় কেমন করে? লোপার রাত কাটল নির্ঘুম!

*জীবনটাই যখন নিলামে: ৩

**সুলেখক শেখ জলিল, যিনি নিজেও লিখেন চমৎকার। বইটার একটা সমালোচনা লিখেছেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা।

Thursday, February 11, 2010

উপন্যাস: জীবনটাই যখন নিলামে: ৩


শালার মিটিং। জীবনটা ভাজা ভাজা হয়ে গেল। রাব্বি মিটিং শেষ করে নিজের চেয়ারে মাত্র বসেছে মাত্র, পিয়ন মুনিম এসে বলল, স্যার, বড়ো স্যার আপনাকে এক্ষণ দেখা করতে বলছেন।

বড়ো স্যার মানে সৈয়দ। এই অফিসে ওই-ই চীফ। রাব্বি কষ্টের শ্বাস ফেলল। শালার চাকরের জীবন, খানিকটা নিজের মত চলারও কোন উপায় নাই। বড়ো ক্লান্ত লাগছে কিন্তু এখন সৈয়দ নামের এই বুড়বাকটার প্রলাপ শুনতে হবে, ক্ষণে ক্ষণে অদৃশ্য লেজটা নাড়াতে হবে। ৫টা পর্যন্ত অফিস কিন্তু এ প্রতিদিন ঠিক ১০টা বাজিয়ে ছাড়বে।
অথচ নিজে মার্কেট ভিজিটের কথা বলে সটকে পড়বে, ধাড়ি শুয়োরটাকে ঠিক-ঠিক বাসায় পাওয়া যাবে। কপাল আর কী, ওর কপালেই কিনা এমন একটা ছাগল মার্কা বস জুটল! মানুষটা ওর জীবনটা তছনছ করে ফেলল, এই চুতিয়া জীবন আর ভালো লাগে না। এমন অবস্থা নাই, নইলে এমন চাকরি লাত্থি মেরে কবেই চলে যেত। যাওয়ার আগে সৈয়দকে বলে যেত, গো ফাক ইয়্যুরসেলফ উইথ ইয়্যুর অফিস এন্ড ইয়্যুর নোংরা আন্ডারওয়্যার।

একটাই জীবন কিন্তু মানুষের জীবনে কত রকমের যে কষ্ট! রাব্বি সৈয়দ সাহেবের রুমে ঢুকতেই তিনি হাসিমুখে বললেন, বসেন-বসেন।
রাব্বি এই মানুষটাকে সবসময়ই দেখেছে মুখে একটা তেলতেলে হাসি ঝুলিয়ে রাখতে। এটা এর আরেকটা বদ-চর্চা। আচ্ছা, এর মুখটা এমন তেলতেলে থাকে কেমন করে, বাথরুমে হাত মেরে মুখে মাখে নাকি? বিষয়টা নিয়ে শামসিরের সঙ্গে আলাপ করতে হবে তো। আল্লা জানে, শুয়োরটার মাথায় এখন কী ঘুরপাক খাচ্ছে। এর মুখ দেখে আঁচ করা দুঃসাধ্য, বোঝার উপায় নেই।
চা দিতে বলি, রাব্বি?
নো থ্যাংকস, বস।
আরে খান খান। চা হচ্ছে টনিক। এক চুমুকে দেখবেন সব কান্তি উধাও। এই আমাকে দেখেন না, এত্তো এত্তো কাজ করি। দেখেছেন কখনও ক্লান্ত হতে? এক কাপ চা মেরে দেই, ব্যস। এরপরই আবার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ি।
রাব্বি বিড়বিড় করল, শালা, শজারুচো...।
কিছু বললেন?
না বস, বলছিলাম, আপনি একজন কর্মবীর।

সৈয়দ সাহেব চোখ সরু করে তাকিয়ে রইলেন। বুঝতে চেষ্টা করছেন এটা কি কমপ্লিমেন্ট নাকি অন্য কিছু। রাব্বি নিশ্চিত এর মস্তিষ্ক এখন পুরোদমে ব্যস্ত এটা নিয়ে। মানুষটা যত নির্বোধই হোক বুঝতে এর বাকি থাকবে না। এরপর এ একের পর এক ছুরি চালাবে, তেলতেলে পিচ্ছিল হাসি নিয়ে।
ইয়ে, রাব্বি, আপনার তো এম.বি.এ করা নাই, না?

রাব্বির অজান্তেই মন খারাপ করা শ্বাস বেরিয়ে এলো, এটা এ লক্ষবার জিজ্ঞেস করেছে। মানুষ এমন পশুর মত হয় কেন? জানার পরও লক্ষবার এই প্রশ্ন করে বিব্রত করার মানে কী! অথচ এ নিজেও এম. বি. এ করেনি। এরপরও একটা মানুষ কেমন করে নির্লজ্জের মত অন্যকে অপদস্ত করে?
বলবে না বলবে না করেও রাব্বির মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, না বস। ইয়ে, আপনারটা কি কমপ্লিট হয়েছে, বস?
সৈয়দ সাহেবের পরিচিত তেলতেলে হাসি উধাও হয়ে গেল। প্রাণপণ চেষ্টায় স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন। অজান্তেই মুখ লম্বা হয়ে গেছে, চোয়াল ঝুলে পড়েছে। অনেক সময় নিয়ে চশমার কাঁচ পরিষ্কার করলেন। খানিকক্ষণ রিভলবিং চেয়ারে আগুপিছু করলেন।
রাব্বি, আপনার সমস্যা কী!
আমার তো কোন সমস্যা নাই, বস।
আপনাকে আমি একটা প্রশ্ন করেছি। সাফ সাফ এর উত্তর দেবেন। এটা অফিস, আপনার বাসা না। জেন্টেলম্যান নর্ম কী গুলে খেয়ে ফেলেছেন নাকি? এমনিতেও আপনার কাজকর্ম নিয়ে অফিস বিরক্ত।
রাব্বি রাগ চেপে বলল, অফিস বিরক্ত, নাকি আপনি?
আয়্যাম নো বডি। অফিস মানে অফিস, এর সঙ্গে আমাকে জুড়ে দিচ্ছেন কেন!
বস, আমি আমার কাজে কখনও ফাঁকি দেই না। যখন যে কাজটা দেয়া হয় আমার সাধ্যমত শেষ করার চেষ্টা করি। তারপরও আপনি এটা বলছেন কেন আমি বুঝতে পারছি না। আপনি ব্যতীত আর একজনের নাম বলেন যিনি আমার কাজ নিয়ে বিরক্ত।
আমি আপনার কাছে এর ব্যাখ্যা দিতে চাইছি না।
ব্যাখ্যা না, বস, আপনি জাস্ট জানতে চাচ্ছি, কারা কারা আমার উপর বিরক্ত এবং কি কারণে? এটা জানাটা নিশ্চয়ই অপরাধ না?
সৈয়দ সাহেব মুখ শক্ত করে বললেন, সময় হলে জানবেন। এই মুহূর্তে এটা নিয়ে আপনার সঙ্গে আলাপ করার কোন আগ্রহ আমার নাই। শুনুন, যে জন্য আপনাকে ডেকেছি, রিটেল সেনসাসের কাজ কতটুকু হলো?

রাব্বি বুঝল ওর কপালে খারাবি আছে। যদিও এটা ওর দায়িত্বে পড়ে না কিন্তু ঠিক ওকে গছিয়ে দেবে। এটা হচ্ছে রাব্বিকে ঝামেলায় ফেলার সহজ উপায়। এটার দায়িত্ব নিলে দম ফেলার আর ফুরসুত থাকবে না। দোকানে দোকানে যেতে হবে, একেকটা আউটলেট সম্বন্ধে হাবিজাবি দুনিয়ার তথ্য সংগ্রহ করে এক্সেল শিটে সাজাতে হবে। এক-দুইটা আউটলেট না, প্রায় ৫০ হাজার আউটলেট। প্রচুর লোকজনের সহায়তা নেয়া যাবে কিন্তু তবু্‌ও প্রায় অসাধ্য একটা কাজ। সচরাচর এটা থার্ড পার্টিকে দিয়ে করানো হয়। কিন্তু এখন ওকে দিয়ে করানো মানে স্রেফ ওকে ফাঁসিয়ে দেয়া।
রাব্বি জানে লাভ নাই তবু্‌ও বলল, বস, এটা তো থার্ড পার্টি সুমেরার করার কথা।
থার্ড পার্টি না ফোর্থ পার্টি এটা আপনার কাছ থেকে আমায় জানতে হবে না। ওদের গতবারের কাজ আমার পছন্দ হয়নি। আমি ঠিক করেছি এবারেরটায় অফিসের কাউকে এই দায়িত্বটা দেব। আপনিই যোগ্য ব্যক্তি।

রাব্বির চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে। মনে মনে বলল, যোগ্য ব্যক্তি না বা...। আমার যোগ্য হয়ে কাজ নাই। অযোগ্য হতে পারলে বেশ হতো তোকে জুতায় গু লাগিয়ে পিটিয়ে আরাম পেতাম। ভেবেছিল, কয়েক দিন ছুটি নেবে, লোপাকে নিয়ে ঘুরবে। বেচারির বেড়াবার বড়ো শখ। ওদিন কেমন মুখ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। যমুনা রিসোর্টে ওকে নিয়ে গিয়ে চমকে দেবে। সব ভেস্তে গেল। যমুনায় যাওয়া দূরের কথা এবার সোজা যমের কাছে যেতে হবে। লাভ নাই তবু্‌ও শেষ চেষ্টা করল, বস, এটা অন্য কাউকে দিলে-।
আমি কি ম্যানেজমেন্টকে বলব আপনি অফিসের কাজ করতে অস্বীকার করছেন?
না বস, আমি কেবল বলছিলাম এবারও সুমেরা কাজটা করলে এবার যেন আপনার মনমত হয় এটার আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আমি নিজে এটা মনিটর করব।
সৈয়দ সাহেব তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন, কে চাইছে আপনার নিশ্চয়তা।

রাব্বির নিজেকে সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে। তাড়াতাড়ি এখান থেকে সরে পড়া দরকার নইলে নির্ঘাত একটা অনর্থ হয়ে যাবে। ম্লান গলায় বলল, আমি কি তাহলে এবার উঠব?
যেতে পারেন।
রাব্বি পা টেনে টেনে বেরিয়ে যেতে গিয়ে মাঝপথে বাধা পেল, শুনুন, আরেকটা কথা, ড্রাইভারের সঙ্গে মাখামাখি কম করবেন।
মানে।
প্রায় সময় দেখি আমার ড্রাইভারের সঙ্গে গুজুর-গুজুর করেন। এটা আমার পছন্দ না।
প্রায় সময় না। মাঝে-মধ্যে সে আমার সঙ্গে কথা বলে বলেই আমি বলি। কেউ কথা বললে তো এটা বলা যায় না, না আমি তোমার সঙ্গে কথা বলব না।
আমার সঙ্গে চাল করবেন না। আপনি হাঁটেন ডালে ডালে, আমি হাঁটি পাতায় পাতায়।
রাব্বির ধৈর্যর বাঁধ ভেঙ্গে গেল। পাতায় হাঁটেন, হাটেন মানা করছে কে আপনাকে। ইচ্ছা হলে পাতা চিবিয়ে খান। ভাল লাগলে চা দিয়ে চুবিয়ে চুবিয়ে খান। আমাকে জানাবার দরকার কী!
পেছন থেকে সৈয়দ সাহেবের চিল-চিৎকার ভেসে এলো, ক্কি, কি বললেন আপনি?
গায়ের জোরে দরোজা খুলতে খুলতে রাব্বিও চেঁচিয়ে বলল, ছাতাফাতা, আপনার মাথা।
দড়াম করে দরোজা লাগিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। তীর ছোড়া হয়ে গেছে ফেরাবার আর উপায় নেই। সৈয়দ ওকে ছাড়বে না। পাতা না, ওকেই চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।

*জীবনটাই যখন নিলামে: ২

Saturday, February 6, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ২

লোপার মন-খারাপ ভাবটা কাটছে না। কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। ভেবে কূল পাচ্ছে না কী করলে অস্থির ভাবটা কাটবে? খানিক্ষণ গান শুনল। ধুত, শ্রীকান্তের ‘মেঘলা আকাশ’ এটা শুনে মনটা আরও বিষণ্ন লাগছে, বুকে হাঁপ ধরে গেছে। এরা যে কেন এমন গান লেখে, গায়। যেটা শুনে মন প্রশান্ত না হয়ে আরও অশান্ত হবে, এর কোন মানে হয়!

আজ বেছে বেছে সব মন খারাপ হওয়ার ব্যাপারগুলো ঘটছে। হাতের নাগালে পড়ার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। লোপা কষ্টের শ্বাস ফেলল। ও নিজে বাংলায় মাস্টার্স করেছে, কী শখই না ছিল বই পড়ার। অথচ কী একটা মানুষের পাল্লায় পড়েছে, রাব্বি হচ্ছে একেবারে উল্টোটা!
আজিব একটা মানুষ, ভুলেও যদি একটা বই পড়ে দেখত। লোপা তো প্রথম প্রথম বুঝে উঠতেই পারত না একজন মানুষ কেমন করে বই না পড়ে থাকতে পারে! দু-এক বার জোর করে পড়াবার চেষ্টাও করেছে কিন্তু ৫ মিনিটের মাথায় মানুষটা ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকতে শুরু করেছে। অথচ ওর অফিস সংক্রান্ত মার্কেটিং-এর ঢাউস বইগুলো পড়তে তার কোন সমস্যা নাই। কেবল পড়েই ক্ষান্ত দেয় এমন না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়বে, লাইন বাই লাইন মার্কার দিয়ে আন্ডার-লাইন করবে, প্রয়োজনীয় নোট নেবে। কখনও খটকা লাগলে ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে প্রয়োজনীয় উপাত্ত খুঁজে বের করবে, ওই ঢাউস বইগুলোর মার্জিনে মন্তব্য করবে। এখানেই শেষ না, মার্জিনের মন্তব্যগুলো তার ল্যাপটপে নিয়মিত আপডেট দেবে। ক্ষণে ক্ষণে, জনে জনে ফোন করবে। সে এক দক্ষযজ্ঞ!

লোপা যে বইটা খুলে বসেছে এটায় পড়ায় মন নেই, কেন যেন এগুচ্ছে না। খুঁজে ওর নিজের ডায়েরিটা বের করল। এক সময় চুটিয়ে লিখত। সুমন এবং ওর মধ্যে একটা অলিখিত প্রতিযোগীতা চলত। সুমন অবশ্য ঝুলাঝুলি করত, আপুনি, পত্রিকা অফিসে লেখাটা পাঠিয়ে দেই। লোপা সলাজে আপত্তি করত, ধুর, আমাদের লেখা পত্রিকাওয়ালাদের ছাপাতে বয়েই গেছে। ইশ, সুমনবাবু কী এক লেখক হয়েছেন! একপাতা লিখতে দশটা বানান ভুল করে তার লেখা ছাপাবে পত্রিকা, হি হি হি।

সুমন চোখ লাল করে তাকাত। রাগে চিড়বিড় করে বলত, তুই যা লিখিস এগুলো দিয়ে বাচ্চার ইয়েও কেউ পরিষ্কার করবে না।
লোপা ফি-রোজ নিয়ম করে নিজের কোন লেখা না-লিখলেও লিখে যেত। অন্যদের মত নিজের কথাবার্তা না। যা-সব পড়ত তাই লিখত। কোন লাইন, প্যারা, কবিতা ভাল লেগে গেলে টুকে রাখত। এভাবে ওর কত ডায়েরি যে ভরে গেল! কারও বড় কোন লেখা লিখে রাখতে সমস্যা মনে হলে পাতাটা কেটে রেখে দিত। দেখা যেত ওদের বাসার পত্রিকা, ম্যাগাজিনের অনেক পাতা কাটা।
মা খুব রাগ করতেন কারণ তিনি কাগজগুলো সের দরে বেচে দিতেন। দোকানদারের কাছ থেকে কঠিন অভিযোগ আসত, খালাম্মা, আপনাগো কাগজ লয়া বড়ো দিগদারি, পাতায় পাতায় ঢুলা! ঘটনাটা কি কইনছেন, এইটা তো ইন্দুর কাটে না, বেলেইড দিয়া কাটা। বাইচ্চারে সামলান নাইলে একদিন হাত-হুত কাইটা দরবার লাগাইব।
মার সেকি রাগ। রাগের তোড়ে লোপার পিঠে গুম গুম করে কিল। ইশ, মা কী জোরেই না মারতেন! আবার চোখে জল নিয়ে মন খারাপ করে বলতেন, লোপানি, ব্যথা পাইছস?
হি হি হি। আহা, কীসব দিন! কীসব ভাল লাগা কবিতা! জীবনানন্দ দাশের কবিতাটা পড়ে মনটা আরও খারাপ হলো:
“একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব
আবার কি ফিরে আসব না পৃথিবীতে?
আবার যেন ফিরে আসি
কোনো এক শীতের রাতে
একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে
কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষূর বিছানার কিনারে।”

রত্মেশ্বর হাজরার এটাও কেমন মন উদাস করে দেয়:
“মৃত্যু ও মৃতের অধিকার নিয়ে সে
একবার সভাও ডেকেছিল ময়দানে
যদিও সেই সভায় সে নিজে ছাড়া উপস্থিত ছিল
বাতাস
বিকেল বেলার রোদ
মাঠের নির্জনতা
আর বিস্ময়।”

রনজিৎ দাসের এই কবিতাটা কী অদ্ভুত:
“শুঁয়োপোকাটির সঙ্গে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছি, ঠিক তারই মত
স্থূল ও মন্থর, ও পাখিদের খাদ্য হয়ে, আত্মবিষসহ
যদি তার মতো কোন অবিশ্বাস্য রূপান্তর পেয়ে যাই শুধু এই লোভে।”

লোপা পাতার পর পাতা উল্টে যাচ্ছে। ক্রমশ মনটা ভালো হয়ে আসছে। দুম করে নিজের অজান্তেই অনেক ক-টা বছর পেছনে চলে গেছে। কত হাবিজাবি প্রসঙ্গই না লিখে রেখেছে! হি হি হি।
লিখে রেখেছে, কী কী করলে একজনকে মহাপাতক বলা যায়? মহাপাতক:
এক, ব্রহ্মহত্যা
দুই, ব্রহ্মস্বাপহরণ
তিন, সুরাপান
চার, গুরুপত্মীহরণ
পাঁচ, মহাপাতকী সংসর্গ
আচ্ছা, ব্রহ্মহত্যা মানে কি? ব্রাক্ষণকে হত্যা করা? ব্রহ্মস্বাপহরণ, এইটারই বা অর্থ কী! সুরাপান বোঝা গেল, মদ্যপান। কিন্তু গুরুপত্মীহরণ, গুরুর পত্মীকে নিয়ে পলায়ন। সর্বনাশ, আগে কী কেউ গুরুর পত্মীকে নিয়ে ভেগে যেত নাকি? ছি-ছি, এ তো বিরাট অন্যায়! কেউ এমনটা ভাবে কেমন করে? শিক্ষকের স্ত্রীর সঙ্গে...ভাবতেই ওর গা গুলাচ্ছে।
মহাপাতকী সংসর্গ, মহাপাতকীর কাছ থেকে দূরে থাকা- উহুঁ, হবে কাছে থাকা? আচ্ছা, মহাপাতকীর সংজ্ঞা কী? এটার অর্থ এখন কোথায় পাওয়া যাবে? দূর ছাই!

রাব্বিকে ফোন করে জিজ্ঞেস করবে? মনে হয় না ও বলতে পারবে। তারচে বড় কথা, বিরক্ত হবে, চরম বিরক্ত। অফিসে ফোন করা ও একদম পছন্দ করে না। ব্যস্ত থাকলে না ধরলেই হয় তাই বলে অফিসে ফোন করা যাবে না কেন? অফিস কী ওর মাথা কিনে নিয়েছে! একজন চাকরি করলেই অফিস আওয়ারে কয়েক মিনিটের জন্যও তার নিজস্ব সময় থাকবে না? এর মানে কী! লোপা ঠিক করল ও ফোন করবেই, রাব্বি বিরক্ত হলে হবে। দেখা যাক।
অনেকবার রিঙ হওয়ার পর রাব্বি ধরল। কোন এক বিচিত্র কারণে ওর মনটা আজ তরল।
রাব্বির উৎফুল্ল গলা, হ্যালো হানি।
কি বললা?
যা শুনলা।
ফাজলামি করছ নাকি?
দূর-দূর! ফাজলামি করব কেন! কেউ কী বউয়ের সাথে ফাজলামি করে। ফাজলামো করতে হয় অন্য মেয়েদের সাথে।
লোপা বিরক্ত গলায় বলল, শস্তা রসিকতা করবে না। শুনতে ভালো লাগছে না। বস্তি-বস্তি লাগছে।
সত্য কথা বললে দোষ, এটা কি ঠিক?
হ্যা, ঠিক।
আচ্ছা যাও, বলব না। এখন বলো কেন ফোন করেছ। একটু পরে একটা মিটিং আছে।
আচ্ছা, তোমরা কী সারা দিন মিটিং-এর উপরই থাকো। কাজ করো কখন?
আরে, এ বলে কী! কাজ আবার কী! মিটিংই তো কাজ। আমাদের এখানে একটা কথা চালু আছে। কোন কাজ না থাকলে চলো একটা মিটিং ডাকি। আর আমাদের অফিসে একটা মাদারি-বস আছে, বুঝলে। এ কয়বার হাগা করবে এটার জন্যও মিটিং ডেকে বসে থাকে। মিটিং ডেকে সোজা বাথরুমে ঢুকে পড়ে। এ মনে হয় দক্ষিণহস্ত ব্যবহারে পারদর্শী।
মানে?
দক্ষিণহস্ত-। থাক, এটা তোমাকে বলা যাবে না।
কেন বলা যাবে না।
এটা একটা কুৎসিত কথা।
তোমার কুৎসিত কথা বলার প্রয়োজন কী!
ইয়ে, মানে-।
লোপার বিরক্তি বাড়ছে, তোমার মুখে বস্তি-মার্কা কথা শুনতে ভাল লাগে না।
রাব্বি বলল, আচ্ছা বেশ, বলো ফোন করেছো কেন?
তুমি মহাপাতকী কাকে বলে জানো?
আজিব, তুমি মহাপাতকী কাকে বলে এটা জানার জন্য ফোন করেছো?
হুঁ।
না, মহাপাতকী জানি না তবে মহাপাতকের খোঁজ দিতে পারি।
লোপা আগ্রহী গলায় বলল, কেমন?
আমাদের অফিসের সৈয়দ হচ্ছে একজন আপাদমস্তক মহাপাতক। আরে, ওই মাদারিটা আর কী, আমার বস!
আবারও ফাজলামো করছ।
আরে না, সত্যি। এ যদি মহাপাতক না হয় আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে গু সাফ করব। টাটকা গু।
রাব্বি, তোমার সাথে কথা বলাই ভুল।
বিশ্বাস করো, আমি বাড়িয়ে বলছি না। অফিসের পিয়নকে দিয়ে সিগারেট আনিয়ে পয়সা দেয় না। শুয়োরটার নাকি মনে থাকে না। কুত্তাটা একদিন করল কি-
রাব্বি, তোমাকে না বলেছি আমার সঙ্গে কুৎসিত কথা বলবে না, বলিনি?
আচ্ছা যাও, বলব না। আচ্ছা শোনো ওই কুত্তাটা একদিন করেছে কি-।
রাব্বি, খবরদার আর একটা ফাজিল কথা বলবে না।
আচ্ছা যাও, বলব না।
আমি কয়েকটা বইয়ের নাম বলে দেই, তুমি কি আসার সময় নিয়ে আসতে পারবে?
পাগল, আমি কোথায়-কোথায় গিয়ে বই খুঁজব। আমাদের অফিসে ঢাউস-ঢাউস প্রচুর বই আছে। চাইলে এগুলো নিয়ে আসতে পারি।
লোপা খানিকটা আগ্রহী হয়ে বলল, কি বই?
এই মার্কেট রিসার্চের উপর বিখ্যাত লেখকদের বই। দাঁড়াও তোমাকে লেখকের নামটা বলি-।

লোপা ফোন রেখে দিল। রাগে ওর শরীর চিড়বিড় করছে। রাব্বির এইসব আচরণ ওর অসহ্য লাগে। মানুষটার মধ্যে সামান্যতম ঔচিত্য বোধ নেই!
লোপা রেখে দেয়া বইটা আবার পড়া শুরু করল, পাতাটা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়নি। এতক্ষণ চুলের কাটাটা খুঁজে পাচ্ছিল না এখন বইয়ের মাঝে পেল। জমাটি গল্প কিন্তু কেন যেন পড়া এগুচ্ছে না। ওর মনটা বিক্ষিপ্ত এটা একটা কারণ হতে পারে, আবার এ-ও হতে পারে লেখায় ওকে ধরে রাখার ক্ষমতাটা লেখকের নাই।

*জীবনটাই যখন নিলামে: ১

Saturday, January 23, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: এক


বোর্ড মিটিং-এ সবাইকে ল্যাপটপ খুলে বসতে হয়।
সৈয়দ সাহেবের কঠিন নির্দেশ। তিনি যখন বকবক করবেন তখন সবাইকে তার বকবকানি নোট করতে হবে, অন্তত নোট করার ভান করতে হবে। কেউ ভুলে গেলে খরখরে গলায় বলবেন, এই জিনিসটা কি গলায় ঝুলিয়ে রাখার জন্য দেয়া হয়েছে?

শামসির আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারেনি মিটিং চলাকালিন এটা কী কাজে লাগে! সৈয়দ মানুষটা যে একজন অযোগ্য একজিকিউটিভ এতে অন্তত ওর কোন সন্দেহ নাই। শামসির আড়চোখে রাব্বির ল্যাপটপের স্ত্রীণে তাকালো। এ কি যেন একটা গেম খেলছে। সৈয়দ সাহেবের চোখে পড়লে কেয়ামত নেমে আসবে। ইশারায় কিছু একটা বলতে গিয়ে নিজের স্ত্রীণে চোখ পড়ল। অরি আল্লা, রাব্বি দেখি চ্যাটিং অপশনে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। ইউনিকোডে এখন বাংলায় লেখা যায়, ম্যাসেজ পাঠানো যায়। লিখে আরাম। নিজের ভাষায় লেখার আনন্দ অন্য কোন ভাষায় কোথায়!

শামসির সাবধানে টাইপ করল, তোর কী মাথা খারাপ? সৈয়দ কাঁচা খেয়ে ফেলবে।
রাব্বির ফিরতি ম্যাসেজ, সৈয়দের মায়েরে বাপ। হারামজাদা কি করেছে জানিস, কাল তার ড্রাইভারকে আমরা যে লাঞ্চ খেতে দিয়েছিলাম এটা সে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেছে। ড্রাইভারকে বলেছে, এটা নাকি তার জন্য দেয়া হয়েছে। চিন্তা কর, শালা কেমন চুতিয়ার ঘরে চুতিয়া।
শামসির লিখল, যাহ, বানিয়ে বানিয়ে বলছিস, এটা কী করে হয়! সৈয়দ কেন তার ড্রাইভারের লাঞ্চ নিয়ে যাবে! মানুষটাকে পছন্দ করিস না ভাল কথা, তাই বলে যা-তা বলার মানে কী!
বিশ্বাস না হলে ওর ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে দেখ। সত্য না হলে আজীবন তোর ময়লা আন্ডারওয়্যার ধুয়ে দেব, ‘সয়ার অন মাই বলস’।

শামসির ভেতর থেকে পাক খেয়ে উঠা হাসি চাপল। হেসে উঠলে বিপদ। সৈয়দ খরখরে চোখে তাকিয়েই ছেড়ে দেবে না, দাঁড় করিয়ে একগাদা প্রশ্ন করবেন। কালঘাম বের করে দেবেন। তার আগে ও কেন হেসেছে এটার একটা সদুত্তর না দেয়া পর্যন্ত ওনার প্রশ্ন চলতেই থাকবে। ত্যানা পেঁচাতে থাকবে!
এরিমধ্যে আরেকটা মেসেজ এসে হাজির, ওরি ব্রো, সৈয়দ বানচোদটাকে দেখ, কী টাইট প্যান্ট পরে এসেছে, ভেতরের আন্ডারওয়্যারের লাইনিং ভেসে উঠেছে! এ দেখি আরেক মাইকেল জ্যাকসন রে! জ্যকসন প্যান্টের উপর আন্ডারওয়্যার পরত আর খানিক পরপর ওই বিশেষ জায়গায় ওর হাত চলে যেত। আল্লা মালুম, জ্যাকসনকে কে এই বুদ্ধিটা দিয়েছিল! সৈয়দ অবশ্য প্যান্টের উপরে পরেনি কিন্তু আমি তো খুব একটা পার্থক্য দেখছি না। ইয়ে শামসির, তোর কি ধারণা আছে এ কি কালারের আন্ডারওয়্যার পরেছে? গোলাপি কি হতে পারে?
শামসির হাসি চেপে লিখল, না ধারণা নাই কারণ আমি এটা ওকে পরাইনি। শ্লা, তোর মাথা একেবারে গেছে।
এই হারামজাদার সঙ্গে চাকরি করলে আমি নিশ্চিত পাগল হয়ে যাব। ভালো কথা, তুই কি এটা জানিস, সানফ্রান্সিসকোতে নিজের আন্ডারওয়্যার দিয়ে নিজের গাড়ি পরিষ্কার করা বেআইনি?
ধুর, চাপা।
আরে না, সত্যি।
যাহ!
সয়্যার অন মাই, না-না তোর বলস। হা হা হা।
বলিস কী! শালারা পাগল নাকি!

এরিমধ্যে সৈয়দ সাহেব মার্চেন্ডাইজিং সম্বন্ধে রাব্বিকে কিসব জিজ্ঞেস করলেন। রাব্বির মুখে খই ফুটছে। শামসির মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। চ্যাটের ফাকে ঠিকই সৈয়দ সাহেবের ব্রিফিং-এর দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রেখেছে। অবশ্য সৈয়দ সাহেব আর কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করলেও রাব্বিকে ধরবেনই। রাব্বির সঙ্গে সম্পর্কটা সাপে নেউলে। রাব্বিটাও একরোখা। সৈয়দ সাহেবকে খানিকটা ছাড় দিলেই হয়। কিন্তু না, সৈয়দ সাহেবের আজগুবিসব পাগলামি অন্যরা অবলীলায় হজম করলেও রাব্বি ছেড়ে কথা বলবে না। রাব্বিটা বুঝতে চায় না চাকরি করলে মেরুদন্ড হতে হয় জেলির মত, বহুজাতিক কোম্পানি হলে তো কথাই নেই। তার উপর কোম্পানির উপর মহলে সৈয়দ সাহেবের হাত অনেক দূর, ডিসিশন মেকারদের বিশেষ পছন্দের মানুষ তিনি। তার সব কথাই ঠিক এটা ধরে নিলেই তো আর সমস্যা থাকে না।

রাব্বি খুকখুক করে কাশল। শামসির তাকালে চোখ দিয়ে ল্যাপটপ দেখাল। নতুন ম্যাসেজ, এই শোন, আমেরিকার অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডায় শজারুর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করা অবৈধ, চিন্তা কর! ভাবা যায়?
ভাগ শালা! তুই-ই চিন্তা কর।
আরে সত্যি। সত্যি না হলে ৫০০০ টাকা বাজি। নগদ, এক হাজার টাকার কড়কড়ে নোটে।
তুই কোত্থিকা এইসব আজগুবি কথা বানাস!
খোদার কসম, সত্যি এমন একটা আইন ওই দেশে চালু আছে। দেখ দেখি কান্ড, এরা নাকি শিক্ষা-দীক্ষায় অতি সভ্য!
হুম। কিন্তু মিয়া, আমার মাথায় এটা ঢুকছে না, কার এমন শখ জাগবে?
আছে-আছে, কোন-না-কোন মামু আছে নিশ্চয়ই নইলে এমন আইন চালু হবে কেন?
বলিস কী, আবার এমন আইনও চালু আছে!
হুঁ, চালু আছে। আমার কি মনে হয় জানিস, সৈয়দের মত কোন এক মানুষ কখনও এমন একটা কান্ড করেছিল, তাই বাধ্য হয়ে এই আইনটা চালু করা হয়েছিল। কে জানে, সৈয়দও এটা করে কিনা? ইশ, শজারুর সঙ্গে রমনরত অবস্থায় সৈয়দ হারামজাদাকে যদি হাতেনাতে ধরতে পারতাম। আহা, সেদিন কী আনন্দ হবে আকাশে বাতাসে। ওদিন সেলিব্রেট করব, মঙ্গলের পানি দিয়া নিজের হাগা ধোব।

শামসিরের হাসি চাপতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে হচ্ছে। হাসি চাপা দেয়ার জন্য অহেতুক নাক-টানা গলা টানার ভঙ্গি করছে। ভাগ্যিস, সৈয়দ তার প্রেজেন্টেশন নিয়ে ব্যস্ত নইলে ঠিক টের পেয়ে যেত।
রাব্বির এখন ইচ্ছা করছে সৈয়দকে ধরে একটা আছাড় দেয়। এ প্রেজেন্টেশনের নামে বিজবিজ করে কীসব জানি বকেই যাচ্ছে। খর্বাকৃতি মানুষটাকে বড়ো হাস্যকর লাগছে। মানুষটা বিচিত্রসব ভঙ্গি করছে। আবার ঢং করে হাতে একটা পয়েন্টার নিয়ে একটু পরপর বোর্ডে লাল আলো ফেলছে। খানিক পর পর পানিতে চুমুক দিচ্ছে, চায়ের কাপে মুখ রাখছে। এরিমধ্যে ওদের একটা টাস্ক দিয়ে দু-বার বাথরুম থেকে ঘুরে এসেছে অথচ ওদের বাথরুম যাওয়ার প্রয়োজন হলে বিরক্ত হয়ে বলবে, আপনারা এইসব মিটিং শুরু হওয়ার আগে সেরে ফেলতে পারেন না। মিটিং-এর সুরটাই কেটে যায়।

শোনো শালার কথা, কুতুয়া, সবাই কী তোর মতো হাত মারতে বাথরুম যায় রে। শালার চাকরি, বাথরুম চেপে বসে থাকতে হবে। রাব্বির খুব ইচ্ছা, একদিন মিটিং চলাকালীন সময়ে এখানেই বাথরুম সেরে ফেলে। সৈয়ত ওয়াক ওয়াক করবে, চিৎকার করতে থাকবে। ও মুখ শুকিয়ে বলবে, কি করব বস, হাগা-মুতা তো কারও কথা শোনে না। আপনার নির্দেশের কথা বলেছিলাম পাত্তাই দিল না।
দেখো কান্ড, এ আবার একটু পরপর বলছে, সো গাইজ বুঝতে পেরেছ তো? ব্যাটা বেতমিজ কোথাকার! বুঝতে পেরেছ না বলে বল আমি কি বোঝাতে পারলাম? এইসব নির্বোধ টাইপের মানুষরাই এদেশের সব কিছু চালাচ্ছে। রাব্বির এম.বি.এ করা নাই বলে কথায় কথায় এটা নিয়ে অপদস্ত করে অথচ এ নিজে স্রেফ বি.বি.এ করেছে। শ্লা, এই দেশে এখন এম.বি.এ করাটা আসমানি নিয়ম হয়ে গেছে- অসংখ্য রোবট বানাবার বুদ্ধি! অন্য সব ডিগ্রি একদিকে এম.বি.এ একদিকে! আচ্ছা, একটা রোবটের পশ্চাদদেশে এমবিএ ঢুকিয়ে দিয়ে অফিসে বসিয়ে দিলে কেমন হয়?

সৈয়দ নাকি এখন মার্কেট ট্যুরের কথা বলে চুপিচুপি এম.বি.এ ক্লাশ করছে। অথচ এই চালবাজির আদৌ কোন প্রয়োজন ছিল না। অফিসকে এটা জানালে অফিসই এই সুবিধাটা করে দিত। কিন্তু খাসলত যাবে কোথায়, অফিসের গাড়ির তেল পুড়িয়ে ব্যাটা করে ক্লাশ! এমনিতে খুব লম্বা লম্বা বাতচিত করে, গাইজ, তোমাদের কাছ থেকে আমি কিন্তু একশ ভাগ সততা চাই। শালা, তোর তো মামার জোরে চাকরি, কোন এমপি নাকি স্পিকার ওর কি যেন লাগে। অযথাই গোটা অফিসটা তটস্ত করে রাখে। আজ এর চাকরি খাচ্ছে তো কাল ওর।
একদিন রাত গভীর করে বাসায় ফিরে ড্রাইভারকে ছেড়েছে। বেচারা গভীর রাতে আসতে গিয়ে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ল। আরেক দিন ড্রাইভার ছিনতাইয়ের ভয়ে রাত করে আসতে চায়নি বলে তাকে বাসার ছাদে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। ড্রাইভার বেচারা সারাটা রাত মশার কামড় খেতে খেতে পায়চারি করে কাটিয়েছে। এ আবার বলে সততার কথা!
রাব্বির থেকে থেকে হাঁই উঠছে। মিটিং নামের এই যন্ত্রণার কবে সমাপ্তি হবে? কেয়ামতের আগ পর্যন্ত চলবে কিনা কে জানে!

*কিছু কথা, কিছু গান

Saturday, January 9, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে


ব্লগিং করে করে যে ক্ষতিটা হয়েছে, বড় কোন লেখা লিখতে এখন পাহাড়সম মনে হয়! উপন্যাস লেখার কথা মনে হলে এখন গা কাঁপে।

প্রকাশক সাহেব যখন বলেন, ৬ ফর্মার নিচে ছাপলে আমাদের পোষায় না, আমার মুখ শুকিয়ে আসে।
৪ ফর্মা লিখতেই আমার জান বেরিয়ে যায়।
আমি চিঁ চিঁ করে বলি, ইয়ে, এইবার ৪ ফর্মা...। আমি নিশ্চিত, প্রকাশক সাহেবের মুখ অন্ধকার হয়। দেখাদেখি আমারও মুখ ঝুলে পড়ে। ভাগ্যিস, মনিটরে তিনি আমার মুখ দেখতে পান না।

আসল লেখকেরা বই শুরুর আগে খানিকক্ষণ তবলা বাজান, প্রস্তাবনা-ভূমিকা এই সব নাম দিয়ে খানিকটা বাতচিত করেন। তবলা বাজালে গান তো হবেই। তাই আমিও লেখক হওয়ার চেষ্টায় কস্তাকস্তি করা একজন মানুষ, লেখকদের অনুকরণ করে কঠিন শব্দ প্রস্তাবনা নাম না-দিয়ে দিলাম:
"কি ছু ক থা, কি ছু গা ন!
২০০৮ সালের ঘটনা এটা। অস্ট্রেলিয়ার আয়ান ইউশার নামের এক ব্যক্তি নিজের জীবনটা নিলামে তুলে দেন। কেবল জীবনই না; তার পছন্দের সমস্ত কিছুই। বন্ধু-বান্ধব-বান্ধবী-স্ত্রী, তৈজসপত্র, জামাকাপড়, বাড়ি, গাড়ি, চাকরি সবই। কেবল তিনি পাসপোর্ট এবং ওয়ালেটটা নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন।
অনেকের কাছে হয়তো এটা রসিকতা মনে হতে পারে, এমন মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না কিন্তু আমার মাথায় কেবল ঘুরপাক খাচ্ছিল আয়ান ইউশার নামের এই মানুষটা কেন এমনটা করার কথা ভাবলেন! কেন? কেন! এটা হয়তো আমার কখনই জানা হবে না যেমনটা এখনও জানা হয়নি জীবনানন্দ দাশের ওই মানুষটা কেন এমন করেছিলেন?
“শোনা গেলো লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে-ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হ’ল তার সাধ।
বধূ শুয়ে ছিল পাশে-শিশুটিও ছিল;
...আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে।”
মানুষটার কেন এমন করে চলে যাওয়ার সাধ হলো? আহা, এমন করে চলে যাবার সময় বধূ, শিশুটিও পাশে থাকবে কেন, আহা কেন? এ অন্যায়-এ অন্যায়! এমন বিপন্ন বিস্ময় কেবল কী ওই মানুষটার রক্তেই খেলা করে, আমাদের রক্তে খেলা করে না? টের পাই না আমরা, না? কি জানি! টের পেতে দেই না, টের পেলে হয়তো আর ফিরে আসা হবে না বলে? অদেখা ভয়ে...?
নাকি শামসুর রাহমান আগেভাগেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন?
“যেদিন মরবো আমি, সেদিন কী বার হবে
বলা মুশকিল।
শুক্রবার? বুধবার? শনিবার? নাকি রবিবার?
যে বারই হোক,
সেদিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর, যেন ঘিনঘিনে কাদা
না জমে গলির মোড়ে। সেদিন ভাসলে পথ-ঘাট,
পূণ্যবান শবানুগামীরা বড়ো বিরক্ত হবেন।”

এই লেখাটার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার আয়ান ইউশার বা জীবনানন্দ দাশের নাম-না-জানা ওই মানুষটার সঙ্গে কোন যোগসূত্র নাই, এটা তাঁদের গল্প না। কিন্তু সত্যিই কী কোন যোগসূত্র নাই? আমাদের মাথায় কি কখনই এমন পাগলামি, রোখ চাপে না? অদেখা ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে- ইচ্ছা করে না লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ি?
আসলাম অনিচ্ছায়, যাবো অনিচ্ছায়; মাঝের দিনগুলোও অনিচ্ছাকৃত ভূমিকায়- সবিরাম অভিনয়! চেষ্টাকৃত অভিনয় করে করে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে মনে হয় না এমন, দূর-দূর, অসহ্য এক জীবন! অন্য একটা ভুবন নিদেনপক্ষে অন্য একটা ভুমিকার বড্ডো প্রয়োজন...।"

*জীবনটাই যখন নিলামে: এক
WhatsApp