ছফাকে নিয়ে আমার একটা কাল্পনিক লেখা আছে [১]। লেখাটা লেখার সময় বা এখনও এটা পড়ার সময় আমার মনেই হয় না এই মানুষটার সঙ্গে আমার কখনও দেখা হয়নি! কেবল মনে হয় এই মানুষটার সঙ্গে কত গল্পই না করেছি।
যাই হোক, ছফার German Perspective পড়ার সময় জার্মানি দেশটার কথা মনে পড়ে। ছফার দেখি বার্লিন শহরটা খুব পছন্দের:
"...First I came in Berlin in 1986. It was in connection with the Bangla translation of Goethe's 'Faust'. Goethe institute provided me a scholarship of language course in Berlin. That time I visited Colongne, Heidelberg, Frankfurt...Berliners are very proud people. They are proud of being Berliners. US President John F. Kennedy in one of his visits, made a declaration, in order to show respect to the sentiment of Berlin people, ich bin ein Berliner- I am also a Berliner..." (German Perspective)
জার্মানিতে আমার অবস্থানকাল ছিল খুবই অল্প! এই সময়ে বার্লিন যাওয়ার সময়-সুযোগ আমার ছিল না। অবশ্য তেমন একটা আগ্রহ যে ছিল এমনটাও না। বন শহরটা দেখেই আমার মুগ্ধতার শেষ ছিল না। একটা আদর্শ শহর, নির্মেদ- বাড়তি কোন মেদ নাই; গুরুগম্ভীর, আলাদা সমীহ জাগানো! শহরটায় ছিল না বাড়তি কোন জৌলুশ, অহেতুক চোখ ধাঁধানো স্থাপনা- এরা এখনও রেখে দিয়েছে যে পুরনো স্থাপনাগুলো যা আমাকে অযথাই টানে। সেটা দেশে হোক বা বিদেশে তাতে কী আসে যায়! আকাশছোঁয়া জবরজঙ্গ স্থাপনা সেটা বুর্জ খলিফা হোক বা সিয়ার্স টাওয়ার আমাকে টানে না।
বার্লিন প্রসঙ্গে মনে পড়ল দাউদ হায়দারও এসেছিলেন বার্লিন থেকে। তিনিও একজন গর্বিত Berliner! কোন এক বিচিত্র কারণে নামকরা মানুষদের প্রতি আমার আগ্রহ বাড়াবাড়ি রকম কম! কিন্তু দাউদ হায়দারের প্রতি আমার আগ্রহের কারণ ছিল অন্য। আমার কেবল মনে হতো দেশে ফিরতে না-পারা মানুষটা আমি নিজে। এই অনুভূতিটা আমায় কেবল তাড়া করত। এই কারণে দাউদ হায়দারকে নিয়ে বেশ কিছু লেখা লিখেছিলাম [২]। এই নির্দোষ লেখাগুলোর সূত্র ধরে কিছু লোকজন আমার পেছনে লেগে গেলেন, মায় মিডিয়া পর্যন্ত [৩]!
কিন্তু দাউদ হায়দারে কিছু বিষয় আমার ভাল লাগেনি। অন্য একজনকে এগিয়ে নিয়ে আসার কারণে তিনি যে উষ্মা প্রকাশ করেন তা আমাকে হতভম্ব করেছিল কারণ বার্লিন থেকে বন আসার সময়ও দাউদ হায়দারকে এগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। অন্তত একজন কবির কাছ থেকে এই সংকীর্নতা আমি আশা করিনি!
আরেকটা প্রসঙ্গও আমার ভাল লাগেনি সেটা হচ্ছে, আমি যখন বললাম, দাউদ ভাই, আপনাকে নিয়ে অনেকেই লেখে, নেটে সার্চ দিলেই বুঝবেন। তিনি খানিকটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, আমি তো ওই সব লেখা পড়ি না। আমি একটা ধাক্কার মত খেলাম! একি কান্ড! গভীর ভালবাসায় অন্যের আবেগের কথা একজন মানুষ জানতে চাইবে না, গ্রাহ্য করবে না? মানুষ তো আর রোবট না!
এমনিতেও দাউদ হায়দারের মধ্যে আমি কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেছি। এই নিয়ে এখানে আর শেয়ার করি না কারণ এ বিচিত্র কিছু না। এই মানুষটার স্বাভাবিক জীবন কখনও ছিল না। জীবনের অধিকাংশ সময় তাঁর কেটেছে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। একটা থিতু জীবন, লক্ষস্থির করে ঝাড়া একটা দৌড়, সম্ভবত কোনটাই তাঁর হয়ে উঠেনি।
এসবের থাকুক, প্রয়োজনে এই মানুষটাকে নিয়ে আমি আবারও লিখব আগের আবেগ নিয়ে, যত দিন পর্যন্ত না এই মানুষটার দেশে ফেরার সুবিধে না হয়। অবশ্য তিনি এখন দেশে ফেরার জন্য উদগ্রীব কি না এই কুতর্কে আর গেলাম না।
আমি আগেও লিখেছিলাম, হিটলারের দেশ জার্মানিতে আতালি পাতালি করে খুঁজেও কোন অসঙ্গতি আমার চোখে পড়েনি। বুকে হাত দিয়ে বলি, এমনটা চোখে পড়লে খানিকটা আরাম পাওয়া যেত! আফসোস, যা পড়েছে তা আমাদের বঙ্গালদের মধ্যেই। জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে দেশকে নিচু থেকে নিচুতর দেখিয়ে ওখান থেকে এরা দেশ উদ্ধার করেন, একজন অন্যজনের পা ধরে টানাটানি করেন!
ছফা অবশ্য আমাদের দেশের এই সব বীর পুঙ্গবদের সম্বন্ধে অনেক পূর্বেই লিখেছিলেন:
"...Ninety-eight percent of them cane to Germany with the purpose of seeking political asylum. At least they mentioned this in their application forms...Among thousands of asylum seekers, there may be a few hundred genuine cases, rast fake..." (German Perspective)
সহায়ক সূত্র:
১. ছফার সঙ্গে...: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_27.html
২. দাউদ হায়দার, তোমাকে, আবারও: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_20.html
৩. মিডিয়ার খেলা: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_22.html
"ন্যানো ড্রাইভটা ফেলেছি হারিয়ে/ যেটায়—রাখা ছিল ৮০০ কোটি/ ইউনিটের স্মৃতি জড়িয়ে থাকা/ গাদা-গাদা ডিএনএ প্রোফাইল।"
Showing posts with label বৈদেশ পর্ব: ববস. Show all posts
Showing posts with label বৈদেশ পর্ব: ববস. Show all posts
Sunday, January 16, 2011
ছফার German Perspective এবং...
বিভাগ
বৈদেশ পর্ব: ববস
Wednesday, October 20, 2010
বৈদেশ পর্ব: ষোলো
জার্মানিতে আরেকটা বিষয় আমাকে খানিকটা জটিলতায় ফেলে দিয়েছিল। ওখানে যার সঙ্গেই আমার পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় তিনি একটা করে কার্ড ধরিয়ে দেন, যার চালু নাম বিজনেস কার্ড বা ভিজিটিং কার্ড। একের পর এক কার্ড জমা হতে থাকে, আমার ওয়ালেট উপচে পড়ে! সময়টা বড়ো দৌড়ের উপর- কে কোন কার্ড দিচ্ছে, কার নাম কি এটা আমার দুর্বল মস্তিষ্ক মনে রাখতে ব্যর্থ হয়। আমার মত অভাজনের জন্য এটা অতি আনন্দের সংবাদ কিন্তু সমস্যা দেখা দিল যখন কেউ আমার কাছে আমার কার্ড চাইলেন, তখন।
আমার তো কোন কার্ড নাই। আমার কার্ড থাকবে কি করে? আমি কোনো মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত না- আমি যে নটা সাতটা অফিস নামের কারাগারের কোন কয়েদিও না। তারচেয়ে বড়ো কথা আমার যে জাঁক করে বলার মত তেমন কিছুই নাই। লেখক নাম দিয়ে কার্ড করা যায় কি না এটা আমি জানি না। এখানেও সমস্যা আছে, লেখক হওয়ার জন্য তো কোথাও কোন সনদ ইস্যু হয় না। তাছাড়া আমার মত যারা দু-কলম গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করে তাদেরকে লেখক বলাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত এ নিয়ে বেদম তর্কাতর্কি চলতেই পারে। তাহলে কি লেখা যেতে পারে? আমি যেটা লিখি, 'তিন টাকা দামের কলমবাজ'?
জার্মানি থেকে ফেরার পর ভাবছিলাম, আচ্ছা কার্ডে 'সদ্য জার্মানি ফেরত' এটা কি লাগানো যেতে পারে?
আরে দাঁড়ান-দাঁড়ান, এখনই কী-বোর্ডের উপর ঝাপিয়ে পড়বেন না আমি বেচারাকে আচ্ছা করে 'শব্দ-ধোলাই' দেয়ার নিমিত্তে।
আনিসুল হক গংরা যদি ঘটা করে এটা জাতীয় দৈনিকে ছাপাতে পারেন, 'সদ্য আমেরিকা ফেরত', তাহলে আমি লাগালে দোষ কোথায়? এটাও যে একটা পদবী এটা পূর্বে আমার জানাই ছিল না! মিডিয়ার লোকজনরা আমাদেরকে শেখান, আমরা শিখি। তাহলে আমি কেন এটা লাগাতে পারব না 'সদ্য জার্মানি ফেরত'?
কিন্তু এখানেও সমস্যা রয়ে যায়। এটা নিয়ে গবেষণার অবকাশ থেকে যায় ফেরার ঠিক কত দিন পর্যন্ত এই টাইটেলটা ব্যবহার করা যায়? নাকি আমৃত্যু?
আনিসুল হক মহোদয়কে জিগেস করা যেতে পারে, স্যার, এই টাইটেল বহাল থাকার সময় কত দিন? মানে কত দিন পর্যন্ত এই 'সদ্য' পদ্য হয়ে যায় না!
ভাল কথা, আনিসুল হক তার নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেই দেন [১], এই বিজ্ঞাপনও কি নিজেই দিয়েছিলেন? এমনটাই তো হওয়ার কথা। আর কোনো বিশেষণ খুঁজে পাওয়া গেল না, না? এই যেমন, 'শপিং মলের ফিতা কাটাকাটি', বা 'ডিম ভাজাভাজি' (এক ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ওঁর ডিম ভাজাভাজি দেখে আমি হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম কারণ আমি নিজে পানি গরম করা ব্যতীত আর কিছু পারি না)?
আনিসুল হক নাকচ করে দিলে, 'সদ্য জার্মানি ফেরত' এটা ধোপে না টিকলে উপায় কী! আচ্ছা, আইন উপদেষ্টা এটা লাগালে কেমন হয়, এল.এল.বি অমুক? না মানে আমি বছরখানেক ল-কলেজে 'কেলাশ' করেছি তো, আইন পড়তে ভাল লাগেনি বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আরে, দাঁড়ান-দাঁড়ান, আমাকে শুইয়ে ফেলার অভিপ্রায়ে এখনই আবার কী-বোর্ডে নিয়ে কস্তাকস্তি শুরু করে দেবেন না। কি বললেন, বছরখানেক ক্লাশ করে এমনটা লাগাবার নিয়ম নেই। তাই নাকি!
আপনারা সব জেনে বসে আছেন বুঝি! এটা একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ভিজিটিং কার্ড। কার্ডটার হুবহু স্ক্যান করে দিলাম কেবল নীতিগত কারণে ফোন নাম্বার এবং ইমেইল বাদ দিয়ে দিলাম। ভাঁজ করা যায় এমন দু-পাতার এই কার্ডে দেখা যাচ্ছে তিনি M.Phil এবং Ph.D এই দুইটা ডিগ্রিই ব্যবহার করেছেন। তবে আমরা এটাও জানতে পারছি Self-withdrawn after one year.
আমার তো কোন কার্ড নাই। আমার কার্ড থাকবে কি করে? আমি কোনো মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত না- আমি যে নটা সাতটা অফিস নামের কারাগারের কোন কয়েদিও না। তারচেয়ে বড়ো কথা আমার যে জাঁক করে বলার মত তেমন কিছুই নাই। লেখক নাম দিয়ে কার্ড করা যায় কি না এটা আমি জানি না। এখানেও সমস্যা আছে, লেখক হওয়ার জন্য তো কোথাও কোন সনদ ইস্যু হয় না। তাছাড়া আমার মত যারা দু-কলম গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করে তাদেরকে লেখক বলাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত এ নিয়ে বেদম তর্কাতর্কি চলতেই পারে। তাহলে কি লেখা যেতে পারে? আমি যেটা লিখি, 'তিন টাকা দামের কলমবাজ'?
আরে দাঁড়ান-দাঁড়ান, এখনই কী-বোর্ডের উপর ঝাপিয়ে পড়বেন না আমি বেচারাকে আচ্ছা করে 'শব্দ-ধোলাই' দেয়ার নিমিত্তে।
আনিসুল হক গংরা যদি ঘটা করে এটা জাতীয় দৈনিকে ছাপাতে পারেন, 'সদ্য আমেরিকা ফেরত', তাহলে আমি লাগালে দোষ কোথায়? এটাও যে একটা পদবী এটা পূর্বে আমার জানাই ছিল না! মিডিয়ার লোকজনরা আমাদেরকে শেখান, আমরা শিখি। তাহলে আমি কেন এটা লাগাতে পারব না 'সদ্য জার্মানি ফেরত'?
কিন্তু এখানেও সমস্যা রয়ে যায়। এটা নিয়ে গবেষণার অবকাশ থেকে যায় ফেরার ঠিক কত দিন পর্যন্ত এই টাইটেলটা ব্যবহার করা যায়? নাকি আমৃত্যু?
আনিসুল হক মহোদয়কে জিগেস করা যেতে পারে, স্যার, এই টাইটেল বহাল থাকার সময় কত দিন? মানে কত দিন পর্যন্ত এই 'সদ্য' পদ্য হয়ে যায় না!
ভাল কথা, আনিসুল হক তার নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেই দেন [১], এই বিজ্ঞাপনও কি নিজেই দিয়েছিলেন? এমনটাই তো হওয়ার কথা। আর কোনো বিশেষণ খুঁজে পাওয়া গেল না, না? এই যেমন, 'শপিং মলের ফিতা কাটাকাটি', বা 'ডিম ভাজাভাজি' (এক ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ওঁর ডিম ভাজাভাজি দেখে আমি হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম কারণ আমি নিজে পানি গরম করা ব্যতীত আর কিছু পারি না)?
আনিসুল হক নাকচ করে দিলে, 'সদ্য জার্মানি ফেরত' এটা ধোপে না টিকলে উপায় কী! আচ্ছা, আইন উপদেষ্টা এটা লাগালে কেমন হয়, এল.এল.বি অমুক? না মানে আমি বছরখানেক ল-কলেজে 'কেলাশ' করেছি তো, আইন পড়তে ভাল লাগেনি বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আরে, দাঁড়ান-দাঁড়ান, আমাকে শুইয়ে ফেলার অভিপ্রায়ে এখনই আবার কী-বোর্ডে নিয়ে কস্তাকস্তি শুরু করে দেবেন না। কি বললেন, বছরখানেক ক্লাশ করে এমনটা লাগাবার নিয়ম নেই। তাই নাকি!
আপনারা সব জেনে বসে আছেন বুঝি! এটা একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ভিজিটিং কার্ড। কার্ডটার হুবহু স্ক্যান করে দিলাম কেবল নীতিগত কারণে ফোন নাম্বার এবং ইমেইল বাদ দিয়ে দিলাম। ভাঁজ করা যায় এমন দু-পাতার এই কার্ডে দেখা যাচ্ছে তিনি M.Phil এবং Ph.D এই দুইটা ডিগ্রিই ব্যবহার করেছেন। তবে আমরা এটাও জানতে পারছি Self-withdrawn after one year.
তাহলে কার্ডে আমার নামের সঙ্গে আইন উপদেষ্টা এলএলবি অমুক এটা লিখতে সমস্যা কোথায়! অবশ্য ব্রাকেটে Self-withdrawn after one year. বা নিয়ার এবাউট... এটা অবশ্যই উল্লেখ থাকবে। :)
*এই লেখাটা যখন লিখছি তখন চ্যানেল আইয়ে ইমদাদুল হক মিলনকে দেখছি কেকা ফেরদৌসির এক রান্নার অনুষ্ঠানে। আমাদের দেশের লেখকদের কেবল বাকী আছে বাথরুম উদ্বোধন করা [২]। ইনশাল্লাহ, এটাও দেখার ভাগ্য একদিন আমাদের হবে। মিলন এবং আমার দুজনেরই দীর্ঘ জীবন পাওয়াটা জরুরি।
কেকা ফেরদৌসির রান্নার অনুষ্ঠান দেখে মনে হয় এই মহিলার চেয়ে রান্না বিশারদ সম্ভবত এই গ্রহে আর নাই। কালো চশমা লাগিয়ে দেশ-বিদেশে এই মহিলা যেমন দাবড়ে বেড়ান এবং নিজে নিজেই অনর্গল বকে যান; অন্যের কথা বলার সুযোগ কোথায় এই সব আমাদের না-দেখে ছাড়াছাড়ি নাই। এর রহস্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এখন একজন ডাক্তার সাহেব বললেন, ইনি নাকি চ্যানেল আইনের হর্তকর্তা সাগর সাহেবের বোন! তাই তো বলি, বলিহারি!
বকবক-বকবক, তারপর বকবক, আবারও বকবক এমন ক্ষেত্রে আমি 'হর্স-মাউথ' শব্দটা ব্যবহার করি। মহিলা ঘোড়ার ইংরাজি কি এটা এখন মনে পড়ছে না। :(
*বৈদেশ পর্ব...: http://tinyurl.com/29zswc5
সহায়ক লিংক:
১. আনিসুল হকের বিজ্ঞাপন...: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_07.html
২. বাথরুম উদ্বোধন: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_20.html
*এই লেখাটা যখন লিখছি তখন চ্যানেল আইয়ে ইমদাদুল হক মিলনকে দেখছি কেকা ফেরদৌসির এক রান্নার অনুষ্ঠানে। আমাদের দেশের লেখকদের কেবল বাকী আছে বাথরুম উদ্বোধন করা [২]। ইনশাল্লাহ, এটাও দেখার ভাগ্য একদিন আমাদের হবে। মিলন এবং আমার দুজনেরই দীর্ঘ জীবন পাওয়াটা জরুরি।
কেকা ফেরদৌসির রান্নার অনুষ্ঠান দেখে মনে হয় এই মহিলার চেয়ে রান্না বিশারদ সম্ভবত এই গ্রহে আর নাই। কালো চশমা লাগিয়ে দেশ-বিদেশে এই মহিলা যেমন দাবড়ে বেড়ান এবং নিজে নিজেই অনর্গল বকে যান; অন্যের কথা বলার সুযোগ কোথায় এই সব আমাদের না-দেখে ছাড়াছাড়ি নাই। এর রহস্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এখন একজন ডাক্তার সাহেব বললেন, ইনি নাকি চ্যানেল আইনের হর্তকর্তা সাগর সাহেবের বোন! তাই তো বলি, বলিহারি!
বকবক-বকবক, তারপর বকবক, আবারও বকবক এমন ক্ষেত্রে আমি 'হর্স-মাউথ' শব্দটা ব্যবহার করি। মহিলা ঘোড়ার ইংরাজি কি এটা এখন মনে পড়ছে না। :(
*বৈদেশ পর্ব...: http://tinyurl.com/29zswc5
সহায়ক লিংক:
১. আনিসুল হকের বিজ্ঞাপন...: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_07.html
২. বাথরুম উদ্বোধন: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_20.html
বিভাগ
বৈদেশ পর্ব: ববস
Tuesday, October 19, 2010
বৈদেশ পর্ব: পনেরো
জার্মানি যাত্রায় কিছু বিষয় আমাকে বেশ খানিকটা বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিল। প্রথমটা হচ্ছে, ওখানে যাওয়ার পূর্ব থেকেই আমাকে বলা হচ্ছিল, ওখানে আমার পরিচিত কারা কারা আছে তাদের নাম দেয়ার জন্য- তাদের জন্য আমন্ত্রণপত্র তৈরি করার কারণে এটা প্রয়োজন। এদের এটাও জানা ছিল, আমি যাদের সঙ্গে লেখালেখির নামে ব্লগিং করেছি- সহযোদ্ধা; জার্মানিতে থাকেন এমন মানুষের সংখ্যা কম না। কিন্তু আমি অনেকখানি বিভ্রান্ত ছিলাম কারণ বলার মত এমন কোন নাম আমার মাথায় আসছিল না।
কেন? আমার যাওয়া নিয়ে অনেক ধরনের নাটক-জটিলতা হয়েছিল, এর বিশদে যেতে এখন আর ইচ্ছা করছে না। আমি কোন এক লেখায় লিখেছিলাম, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও দলবাজি করেন [১] আমরা কোন ছার! এদেরই তো ছাত্র আমরা- যেমন গুরু তেমনি তাঁদের শিষ্য। আমাদের দেশে দলবাজি করেন না এমন মানুষের প্রায় নাই-ই বললে চলে। যারা আছেন এদের মত অভাগা আর কেউ নাই। এখানেও দলবাজি হবে না এমনটা কী হয়, পাগল! মানুষ যেমন বাজার থেকে সদাই কেনার পূর্বে টিপেটুপে দেখে কেনেন তেমনি লোকজনরাও তখন আমাকে পরখ করা শুরু করলেন, আমি কোন দিকে কাত হয়ে আছি। জনে জনে আমাকে জ্ঞান দিলে লাগলেন আমার কি করা উচিত, কি করা উচিত না!
বিভিন্ন শ্রেণী, মিডিয়া এরা নিশ্চিত হলেন আমি তাদের কাতারে পড়ি না। অতএব 'বুশ স্টাইল'- হয় তুমি আমার দলে নইলে আমার ঘোর শত্রু! আমাদের দেশ থেকে দল বড়ো, দল থেকে ব্যক্তি! এখনও আমার যাওয়ার অপরাধে থিসিস করা চালু আছে- বেশ কিছু ডক্টর প্রসব হবে!
অল্প সময়ে কত নাটক যে দেখলাম, যে মানুষটা লিখে জানান, বস, আসার সময় ইংল্যান্ড হয়া আইসেন আপনাকে নিয়া ব্যাপক...ইত্যাদি ইত্যাদি। এই মানুষটাকেই যখন দেখি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কারণে আমাকে নিয়ে কুৎসিত লেখা দেয়া হয়, ওখানে সদর্পে পঞ্চতারকা প্রদান করেন, উল্লাস করেন। আমি জেনে সুখি হই, কত ধরনের মুখোশ থাকে এদের ড্রয়ারে!
মুখোশ নিয়ে নিশ্চয়ই তাক লাগানো একটা নাটক লিখবেন আশা করি। সেই নাটক টিভিতে প্রচারিত হলে শত কাজেও মিস করব না এটা নিজেই নিজেকে কথা দিচ্ছি।
তারপরও জার্মানিতে থাকেন এমন দু-চারজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কারও মধ্যে পেছনটা উত্তোলন করার মত শক্তির আভাষ পাওয়া গেল না। মেইলে আমার হোটেলের ঠিকানা-ফোন নাম্বারও ছিল। যদিও আমি নিজের সুবিধা এবং সময়ের স্বল্পতার কারণে হোটেলে থাকতাম না কিন্তু হোটেলের ডেস্কে ঠিকই খোঁজ নিয়েছি আমার জন্য কোন ম্যাসেজ আছে কি না? উত্তর নেগেটিভ।
আমার ধারণা ছিল, আমার তরফ থেকে সাড়া না পেয়ে কর্তৃপক্ষ হয়তো ভুলে গেছে কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর আবারও একই প্রসঙ্গ। আমার কাছে বারবার জানতে চাওয়া হয়েছিল এই অনুষ্ঠানে কেউ যোগ দেবেন কি না? অন্য ভাষার অনেকেই নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে নিজ দেশ থেকে উড়ে চলে এসেছেন অথচ জার্মানি থেকেও বাংলা ভাষায় কথা বলা কোন মানুষ আসবেন না এটা সম্ভবত এরা মানতে পারছিলেন না! একই প্রসঙ্গ বারবার আসায় আমার বিরক্তি লাগে।
কী বিচিত্র আমরা- ততোধিক বিচিত্র আমাদের আচরণ! বাংলা ভাষার জন্য বিশেষ দিনে কাঁদতে কাঁদতে কপাল (!) ভিজিয়ে ফেলি! এমনিতে প্রবাসে যারা থাকেন এঁদের অনেকের আবেগ আবার খানিক বেশি। এরা 'মহুয়া মঞ্জুলী ফেরদৌসের আমি বীরাঙ্গনা বলছি' [২] নামে বাংলা ভাষা উদ্ধার করেন। কেউ কেউ বারোটা বাজিয়ে, দেশের বিস্তর দুর্নাম করে, দেশটাকে নগ্ন করে প্রবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে প্রার্থনা করেন; সাদা চামড়ার দক্ষিণায় বেঁচে-বর্তে থাকেন। ওখান থেকে পারলে দেশটাকে বঙ্গোপসাগরে চুবিয়ে শুদ্ধ করে ফেলেন!
কেউ কেউ চমৎকার ডকুমেন্টারি বানান, ওখানে দেখান মাদ্রাসা, দেখান বন্যায় জবুথুবু এই দেশের অসহায় মানুষগুলোকে; রিলিফের এক প্যাকেট বিস্কিটের জন্য শত-শত হাত উঠে আছে। এরা দেখান এ দেশের মাকে- নগ্ন পা, দুই কোলে দুইটা অপুষ্ট বাচ্চা। এতে প্রবাসীদের কাছে আমাদের শির বড়ো উঁচু হয়! কী একেকজন দেশপ্রেমিক! দেশের ঝান্ডা তো এদেরই হাতে!
আমার জানা মতে, অন-লাইনে লেখালেখি নিয়ে এতো বড়ো পরিসরে বাংলা ভাষা আর কোথাও যায়নি এবং এখানে এই প্রথম বাংলা ভাষা যুক্ত হয়েছিল। ওখানে, বিভিন্ন ভাষা-ভাষী মানুষদের কাছে কোন মানুষটা গিয়েছিল এটা মূখ্য ছিল না, ছিল বাংলাদেশ-বাংলা ভাষা। একটা দেশের পতাকা কোন বাঁশে লাগানো হলো এই নিয়ে কুতর্ক চলে কিন্তু এতে পতাকার কিছু যায় আসে না, পতাকা সগর্বে পতপত করে উড়তে থাকে। যেমন ওখানে উড়ছিল বাংলাদেশের পতাকাটা। ওখানে পতাকার বাঁশটা কে ধরে রেখেছে তাতে কী আসে যায়!
সামহোয়্যারে এটা নিয়ে যে পোস্টটা দেয়া হয়েছিল [৩], ওখানে আমি লিখেছিলাম:
"ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ছয় হাজার ভাষার মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। লাটভিয়ায় ‘লিভোনিয়ান’ ভাষায় কথা বলেন এমন একজনই মাত্র জীবিত ছিলেন, তিনি মারা গেলে সেই ভাষারও মৃত্যু হবে। এটা ২০০৯ সালের কথা, এরিমধ্যে তিনি মারা গেছেন কিনা আমি জানি না।
আলাস্কার ‘আইয়াক’ ভাষা জানা শেষ ব্যক্তিটি মারা যান ২০০৮ সালে। তাঁর সঙ্গেই মৃত্যু হয় ‘আইয়াক’ ভাষার।
৮৫ বছর বয়সী 'বার সর' ছিলেন ভারতীয় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ৮০টি আদিবাস গোষ্ঠীর সবচেয়ে বৃদ্ধ সদস্য এবং ২০১০ সালের জানুয়ারিতে মৃত্যুর আগে তিনি ছিলেন এই আদি ভাষা জানা সর্বশেষ ব্যাক্তি!
যে আড়াই হাজার ভাষা এই গ্রহ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে আমাদের বাংলা ভাষাও থাকতে পারত কিন্তু আমাদের অপার সৌভাগ্য, আমাদের বাংলা ভাষা যে কেবল টিকেই আছে এমন না, আছে সদর্পে, সীমাহীন গৌরবে!
বাংলা নামের আমাদের মায়ের ভাষা- এটা তো আর আমরা এমনি এমনি পাইনি, কেউ আমাদেরকে এটা মুফতে-দানে দেয়নি। এর জন্য আমরা কেবল দিনের-পর-দিন, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ধরেই লড়াই করিনি; লড়াই করেছি যুগের-পর-যুগ ধরে!
এই দেশের অসংখ্য সেরা সন্তান তাঁদের রক্ত অকাতরে বিলিয়ে গেছেন আমাদের ভাষার জন্য। আমাদের লেখার কালির সঙ্গে মিশে আছে তাঁদের স্বর্গীয় রক্ত। জান্তব স্বপ্ন নামের সেই মানুষগুলোর অনেকেই আজ নেই কিন্তু তাঁদের মায়াভরা সুশীতল ছায়া ছড়িয়ে আছে আমাদের মাথার উপর। তাঁদের ছায়ার পাশে যখন আমার মত অভাজন দাঁড়াই তখন নিজেকে কী ক্ষুদ্র, লজ্জিতই না মনে হয়। নতচোখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে তখন কোন উপায় থাকে না- তাঁদের চোখে চোখ রাখি কেমন করে?
আমরা যারা ওয়েবসাইটে লেখালেখি করি তাঁদের প্রতি প্রিন্ট মিডিয়ায় কী তাচ্ছিল্য! যেন এরা একেকজন চলমান জ্ঞানের ভান্ডার হয়ে বসে আছেন। এঁরা হাঁটেন পা ফাঁক করে, বড়ো সাবধানে- জ্ঞান গড়িয়ে পড়বে এই ভয়ে।
আজ এটা আমাদের সবার বিজয়, ওয়েবসাইটে আমাদের লেখালেখির সুবাদে আন্তর্জাতিক একটা পরিমন্ডলে এই প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা দাঁড়িয়েছে দানবীয় শক্তি নিয়ে।
এই বিজয় মিছিলে আমার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে আমিও একজন, তাঁদের পাশে থাকতে পারার এই ভাললাগা আমার কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না, কক্ষণও না।
আমি হয়তো ভাল করে আমার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি কিন্তু আমার আন্তরিক বিশ্বাস, অন্য একজন অসাধারণ-চমৎকার করে পারবেন। আমি স্বপ্ন দেখি, আমি হয়তো থাকব না কিন্তু আমার স্বপ্নটা থেকে যাবে। আমার গলিত শব থেকে জন্ম নেবে সত্যিকারের একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। যে যোদ্ধা বাংলা ভাষা নামের তরবারী দিয়ে সমস্ত অন্ধকার ফালাফালা করবে, কাঁপিয়ে দেবে এই গ্রহটাকে।
আমি সেই মানুষটার অপেক্ষায় আছি...।"
*বৈদেশ পর্ব...: http://tinyurl.com/29zswc5
সহায়ক লিংক:
১. দলবাজি: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_19.html
২. আবেগ-বিবেক: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_21.html
৩. সামহোয়্যার...: http://www.somewhereinblog.net/blog/noticeblog/29183988
কেন? আমার যাওয়া নিয়ে অনেক ধরনের নাটক-জটিলতা হয়েছিল, এর বিশদে যেতে এখন আর ইচ্ছা করছে না। আমি কোন এক লেখায় লিখেছিলাম, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও দলবাজি করেন [১] আমরা কোন ছার! এদেরই তো ছাত্র আমরা- যেমন গুরু তেমনি তাঁদের শিষ্য। আমাদের দেশে দলবাজি করেন না এমন মানুষের প্রায় নাই-ই বললে চলে। যারা আছেন এদের মত অভাগা আর কেউ নাই। এখানেও দলবাজি হবে না এমনটা কী হয়, পাগল! মানুষ যেমন বাজার থেকে সদাই কেনার পূর্বে টিপেটুপে দেখে কেনেন তেমনি লোকজনরাও তখন আমাকে পরখ করা শুরু করলেন, আমি কোন দিকে কাত হয়ে আছি। জনে জনে আমাকে জ্ঞান দিলে লাগলেন আমার কি করা উচিত, কি করা উচিত না!
বিভিন্ন শ্রেণী, মিডিয়া এরা নিশ্চিত হলেন আমি তাদের কাতারে পড়ি না। অতএব 'বুশ স্টাইল'- হয় তুমি আমার দলে নইলে আমার ঘোর শত্রু! আমাদের দেশ থেকে দল বড়ো, দল থেকে ব্যক্তি! এখনও আমার যাওয়ার অপরাধে থিসিস করা চালু আছে- বেশ কিছু ডক্টর প্রসব হবে!
অল্প সময়ে কত নাটক যে দেখলাম, যে মানুষটা লিখে জানান, বস, আসার সময় ইংল্যান্ড হয়া আইসেন আপনাকে নিয়া ব্যাপক...ইত্যাদি ইত্যাদি। এই মানুষটাকেই যখন দেখি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কারণে আমাকে নিয়ে কুৎসিত লেখা দেয়া হয়, ওখানে সদর্পে পঞ্চতারকা প্রদান করেন, উল্লাস করেন। আমি জেনে সুখি হই, কত ধরনের মুখোশ থাকে এদের ড্রয়ারে!
মুখোশ নিয়ে নিশ্চয়ই তাক লাগানো একটা নাটক লিখবেন আশা করি। সেই নাটক টিভিতে প্রচারিত হলে শত কাজেও মিস করব না এটা নিজেই নিজেকে কথা দিচ্ছি।
তারপরও জার্মানিতে থাকেন এমন দু-চারজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কারও মধ্যে পেছনটা উত্তোলন করার মত শক্তির আভাষ পাওয়া গেল না। মেইলে আমার হোটেলের ঠিকানা-ফোন নাম্বারও ছিল। যদিও আমি নিজের সুবিধা এবং সময়ের স্বল্পতার কারণে হোটেলে থাকতাম না কিন্তু হোটেলের ডেস্কে ঠিকই খোঁজ নিয়েছি আমার জন্য কোন ম্যাসেজ আছে কি না? উত্তর নেগেটিভ।
আমার ধারণা ছিল, আমার তরফ থেকে সাড়া না পেয়ে কর্তৃপক্ষ হয়তো ভুলে গেছে কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর আবারও একই প্রসঙ্গ। আমার কাছে বারবার জানতে চাওয়া হয়েছিল এই অনুষ্ঠানে কেউ যোগ দেবেন কি না? অন্য ভাষার অনেকেই নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে নিজ দেশ থেকে উড়ে চলে এসেছেন অথচ জার্মানি থেকেও বাংলা ভাষায় কথা বলা কোন মানুষ আসবেন না এটা সম্ভবত এরা মানতে পারছিলেন না! একই প্রসঙ্গ বারবার আসায় আমার বিরক্তি লাগে।
কী বিচিত্র আমরা- ততোধিক বিচিত্র আমাদের আচরণ! বাংলা ভাষার জন্য বিশেষ দিনে কাঁদতে কাঁদতে কপাল (!) ভিজিয়ে ফেলি! এমনিতে প্রবাসে যারা থাকেন এঁদের অনেকের আবেগ আবার খানিক বেশি। এরা 'মহুয়া মঞ্জুলী ফেরদৌসের আমি বীরাঙ্গনা বলছি' [২] নামে বাংলা ভাষা উদ্ধার করেন। কেউ কেউ বারোটা বাজিয়ে, দেশের বিস্তর দুর্নাম করে, দেশটাকে নগ্ন করে প্রবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে প্রার্থনা করেন; সাদা চামড়ার দক্ষিণায় বেঁচে-বর্তে থাকেন। ওখান থেকে পারলে দেশটাকে বঙ্গোপসাগরে চুবিয়ে শুদ্ধ করে ফেলেন!
কেউ কেউ চমৎকার ডকুমেন্টারি বানান, ওখানে দেখান মাদ্রাসা, দেখান বন্যায় জবুথুবু এই দেশের অসহায় মানুষগুলোকে; রিলিফের এক প্যাকেট বিস্কিটের জন্য শত-শত হাত উঠে আছে। এরা দেখান এ দেশের মাকে- নগ্ন পা, দুই কোলে দুইটা অপুষ্ট বাচ্চা। এতে প্রবাসীদের কাছে আমাদের শির বড়ো উঁচু হয়! কী একেকজন দেশপ্রেমিক! দেশের ঝান্ডা তো এদেরই হাতে!
আমার জানা মতে, অন-লাইনে লেখালেখি নিয়ে এতো বড়ো পরিসরে বাংলা ভাষা আর কোথাও যায়নি এবং এখানে এই প্রথম বাংলা ভাষা যুক্ত হয়েছিল। ওখানে, বিভিন্ন ভাষা-ভাষী মানুষদের কাছে কোন মানুষটা গিয়েছিল এটা মূখ্য ছিল না, ছিল বাংলাদেশ-বাংলা ভাষা। একটা দেশের পতাকা কোন বাঁশে লাগানো হলো এই নিয়ে কুতর্ক চলে কিন্তু এতে পতাকার কিছু যায় আসে না, পতাকা সগর্বে পতপত করে উড়তে থাকে। যেমন ওখানে উড়ছিল বাংলাদেশের পতাকাটা। ওখানে পতাকার বাঁশটা কে ধরে রেখেছে তাতে কী আসে যায়!
সামহোয়্যারে এটা নিয়ে যে পোস্টটা দেয়া হয়েছিল [৩], ওখানে আমি লিখেছিলাম:
"ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ছয় হাজার ভাষার মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। লাটভিয়ায় ‘লিভোনিয়ান’ ভাষায় কথা বলেন এমন একজনই মাত্র জীবিত ছিলেন, তিনি মারা গেলে সেই ভাষারও মৃত্যু হবে। এটা ২০০৯ সালের কথা, এরিমধ্যে তিনি মারা গেছেন কিনা আমি জানি না।
আলাস্কার ‘আইয়াক’ ভাষা জানা শেষ ব্যক্তিটি মারা যান ২০০৮ সালে। তাঁর সঙ্গেই মৃত্যু হয় ‘আইয়াক’ ভাষার।
৮৫ বছর বয়সী 'বার সর' ছিলেন ভারতীয় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ৮০টি আদিবাস গোষ্ঠীর সবচেয়ে বৃদ্ধ সদস্য এবং ২০১০ সালের জানুয়ারিতে মৃত্যুর আগে তিনি ছিলেন এই আদি ভাষা জানা সর্বশেষ ব্যাক্তি!
যে আড়াই হাজার ভাষা এই গ্রহ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে আমাদের বাংলা ভাষাও থাকতে পারত কিন্তু আমাদের অপার সৌভাগ্য, আমাদের বাংলা ভাষা যে কেবল টিকেই আছে এমন না, আছে সদর্পে, সীমাহীন গৌরবে!
বাংলা নামের আমাদের মায়ের ভাষা- এটা তো আর আমরা এমনি এমনি পাইনি, কেউ আমাদেরকে এটা মুফতে-দানে দেয়নি। এর জন্য আমরা কেবল দিনের-পর-দিন, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ধরেই লড়াই করিনি; লড়াই করেছি যুগের-পর-যুগ ধরে!
এই দেশের অসংখ্য সেরা সন্তান তাঁদের রক্ত অকাতরে বিলিয়ে গেছেন আমাদের ভাষার জন্য। আমাদের লেখার কালির সঙ্গে মিশে আছে তাঁদের স্বর্গীয় রক্ত। জান্তব স্বপ্ন নামের সেই মানুষগুলোর অনেকেই আজ নেই কিন্তু তাঁদের মায়াভরা সুশীতল ছায়া ছড়িয়ে আছে আমাদের মাথার উপর। তাঁদের ছায়ার পাশে যখন আমার মত অভাজন দাঁড়াই তখন নিজেকে কী ক্ষুদ্র, লজ্জিতই না মনে হয়। নতচোখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে তখন কোন উপায় থাকে না- তাঁদের চোখে চোখ রাখি কেমন করে?
আমরা যারা ওয়েবসাইটে লেখালেখি করি তাঁদের প্রতি প্রিন্ট মিডিয়ায় কী তাচ্ছিল্য! যেন এরা একেকজন চলমান জ্ঞানের ভান্ডার হয়ে বসে আছেন। এঁরা হাঁটেন পা ফাঁক করে, বড়ো সাবধানে- জ্ঞান গড়িয়ে পড়বে এই ভয়ে।
আজ এটা আমাদের সবার বিজয়, ওয়েবসাইটে আমাদের লেখালেখির সুবাদে আন্তর্জাতিক একটা পরিমন্ডলে এই প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা দাঁড়িয়েছে দানবীয় শক্তি নিয়ে।
এই বিজয় মিছিলে আমার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে আমিও একজন, তাঁদের পাশে থাকতে পারার এই ভাললাগা আমার কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না, কক্ষণও না।
আমি হয়তো ভাল করে আমার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি কিন্তু আমার আন্তরিক বিশ্বাস, অন্য একজন অসাধারণ-চমৎকার করে পারবেন। আমি স্বপ্ন দেখি, আমি হয়তো থাকব না কিন্তু আমার স্বপ্নটা থেকে যাবে। আমার গলিত শব থেকে জন্ম নেবে সত্যিকারের একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। যে যোদ্ধা বাংলা ভাষা নামের তরবারী দিয়ে সমস্ত অন্ধকার ফালাফালা করবে, কাঁপিয়ে দেবে এই গ্রহটাকে।
আমি সেই মানুষটার অপেক্ষায় আছি...।"
*বৈদেশ পর্ব...: http://tinyurl.com/29zswc5
সহায়ক লিংক:
১. দলবাজি: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_19.html
২. আবেগ-বিবেক: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_21.html
৩. সামহোয়্যার...: http://www.somewhereinblog.net/blog/noticeblog/29183988
বিভাগ
বৈদেশ পর্ব: ববস
Wednesday, October 13, 2010
বৈদেশ পর্ব: চৌদ্দ
বৈদেশ পর্ব: ববস' নামের একটা ধারাবাহিক লেখা লিখেছিলাম [১]। বৈদেশ পর্ব: তোরোতে লিখেছিলাম: "...আমার জন্য অপেক্ষায় আছে বুড়া বাড়িটা। যার বয়স একশ ছুঁইছুঁই! অতি দ্রুত এর কাছে আমাকে ফিরতে হবে। বুড়া আমার অপেক্ষায় আছে। সবাই আমাকে ফেলে দিলেও এ আমাকে ফেলে দেবে না..."।
এই বুড়া বাড়িটা নামের অভিশপ্ত বাড়িটা আটকে ফেলেছে আমাকে। সবারই যেখানে আছে একটা করে ক্যারিয়ার সেখানে আমার হাতে টিফিন-ক্যারিয়ার। তো, এই বুড়ার নালায়েক সন্তান তিন দিনের মাথায় ঠিক ঠিক বুড়ার কাছে ফিরে এসেছিল। পরিশিষ্ট কবেই লেখা হয়ে গেছে, গল্প শেষ। এরপর বলার আর বাকী থাকে কী!
কিন্তু আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, এই লেখায় অতি প্রয়োজনীয় একটা বিষয় বাদ পড়েছে, অন্তত আমার কাছে! এমন জরুরি বিষয় কেমন করে ভুলে গেলাম এটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নাই কারণ হামেশাই দেখি ফাঁকা মস্তিষ্ক আমার সঙ্গে এই খেলাটা খেলে বড়ো আনন্দিত হয়!
লেখাটায় যেটা বাদ পড়েছে তা হচ্ছে চশমা বিষয়ক ভয়াবহ সমস্যা। চশমার বিষয়টা খানিকটা খোলাসা করি। আমি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন থেকেই আমার চোখ অসম্ভব খারাপ- মাইনাস এইট পয়েন্ট ফাইভ! আমার ভাষায় যেটা বলি, চশমা ছাড়া আমি প্রায় অন্ধ! কালে কালে বরং আমার চোখ আগের চেয়ে ভাল হয়েছে।
তো, প্রাইমারিতেই পড়ার সময় আমি ব্ল্যাকবোর্ডে টিচারদের লেখা প্রায় কিছুই দেখতাম না। এই নিয়ে বড়ো যন্ত্রণা হতো যখন টিচার বললেন, ব্ল্যাকবোর্ডে যা লিখেছি তা খাতায় লেখো। তখন আমার মেজাজ খারাপ হতো, আরে, কী মুশকিল, ব্ল্যাকবোর্ডে লেখার প্রয়োজন কি, মুখে বললে কি হয়?
আমার বাবা কেমন কেমন করে যেন টের পেয়ে গেলেন আমার চোখ খারাপ। চোখের ডাক্তার দেখালেন। ডাক্তার আঁতকে উঠে বললেন, 'আপনার ছেলের তো চোখ ভীষণ খারাপ, ভীষণ...। আর শোনেন, আপনার ছেলেকে চোখ খারাপ কোন মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেবেন না'।
তখন বিয়ে-টিয়ে নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিল না, ছিল না চোখ খারাপ নিয়েও, মাথাব্যথার কারণ ছিল অন্য। যখন আমাকে চশমা ধরিয়ে দেয়া হলো তখন আমার ইচ্ছা করছিল মট করে এটাকে দু-টুকরা করে ফেলি। এ্যাহ, চশমা ধরিয়ে দিলেই হলো, আরে, সেই সময়টায় এই বয়সের ক-জন চোখে চশমা দেয়? অন্তত আমি তো কাউকে পাইনি। কী লজ্জা-কী লজ্জা! 'চারচোইক্খা' বলে যে ছেলেপেলেরা খেপায় এটা তো আর বাবার গায়ে লাগে না! বাবাটা যে একটা কী, অমানুষ-অমানুষ!
এদিকে বাবার কঠিন নির্দেশনা, চশমা চোখে দিয়েই স্কুলে যেতে হবে। বাবাকে আমি অসম্ভব পছন্দ করতাম, ভয়ও [২] কিন্তু তাঁর এই আচরণের কারণে তখন তাঁকে রাক্ষস-রাক্ষস মনে হতো। যে মা, বাবার সমস্ত কঠিন আচরণ থেকে আমাকে রক্ষা করতেন তাঁকেও দেখলাম নির্দয় আচরণ করতে। তিনি এই বিষয়ে টুঁ-শব্দও করলেন না।
তখন আমার ব্রেন এখনকার চেয়ে ভাল ছিল, অন্তত ছিল বলেই ধারণা করি- প্রয়োজনের সময় যথেষ্ঠ সহায়তা করত। এখন ব্রেনহীন আমি সলাজে বলি, তখন খানিকটা ব্রেন ছিল বলেই মনে হয়। কালে কালে জিনিসটা নাই হয়ে গেছে, আফসোস!
যাই হোক, আমি একটা বুদ্ধি বের করলাম। স্কুলে যাওয়ার পূর্বে চশমা চোখে দিয়ে বের হই, কয়েক কদম গিয়েই চশমা পকেটে পুরে ফেলি। এই নিয়ম আমি হাইস্কুলেও চালু রাখলাম। এমনিতেও নিয়মিত স্কুলে যেতে আমার ভাল লাগত না। তারচেয়ে আমার জন্য অনেক আনন্দের ছিল গোয়াল ঘরে বসে গল্পের বই পড়তে [৩]। তখনকার ভাষায় 'আউট-বই'!
যাই হোক, এই গেল আমি এবং আমার চশমা। জার্মানি যাওয়ার পূর্বে ক-দিন ধরেই তীব্র মাথাব্যথায় ভুগছিলাম। সমস্যাটা কোথায় এটা আঁচ করতে পেরে চোখের ডাক্তারের কাছে গেলাম। যা অনুমান করেছিলাম, তাই। সমস্যাটা চশমার। কী সর্বনাশ! পূর্বে কাছে এবং দূরের কাজ একটা চশমা দিয়েই চলত এখন কাছের এবং দূরের জন্য আলাদা-আলাদা চশমা নিতে হবে। কাছের মাইনাস ফাইভ, দূরেরটা মাইনাস সেভেন। বড়ই যন্ত্রণা!
চশমার দোকানদার কাছেরটা চট করে দিয়ে দিল কিন্তু কি যেন একটা ভজকট হলো দূরেরটা দিতে পারছিল না। এদিকে আমার যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। যেদিন আমি আখাউড়া ছাড়ব সেদিন সকালে দূরের চশমাটা দেয়ার কথা। দোকানে যাওয়ার পর যখন এই ব্যাটা বলল, 'আসে নাই, আপনের চশমা কাইল ছাড়া পারুম না', তখন আমি মনে মনে ভাবছিলাম গদাম করে ঘুষিটা কোথায় মারা যায়? বিকশিত দাঁতে মারলে কেমন হয় বা নাকটা সমান করে দিলে? ব্যাটা বলে কি, আমার ট্রেন আজ এগারোটায় আর এ কিনা কাল দেবে চশমা!
কিছুই করার নেই, পড়ার জন্য যে কাছের চশমাটা এটাকেই সম্বল করেই রওয়ানা দিলাম। ক্ষীণ আশা, হয়তো ঢাকায় কোনো একটা উপায় করা যাবে। কিন্তু সময়ে কুলালো না। অধিকাংশ সময় নষ্ট হলো এমিরাটসের কারণে। দুবাই এয়ারপোর্টে আট ঘন্টা থাকতে হবে বিধায় হোটেল কূপন এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে। অবশ্য এই হোটেল কূপন এদের অসভ্যতার কারণে আমার কোনো কাজেই লাগেনি। দুবাই এয়ারপোর্টে আমার রাতটা কেটেছিল ঘুমহীন!
চুতিয়া শব্দটা এখন আর ব্যবহার করি না নইলে বলতাম এমিরাটসের এটা চুতিয়াগিরি। কারণ দুবাই ইমিগ্রেশন কোনো কারণ ব্যতীত হোটেলে যাওয়ার অনুমতি না দেয়ায়, এমিরাটসের ওখানকার ডেস্কে জানানোর পরও এরা ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এই চশমা আমাকে বড়ো ভুগিয়েছে, পদে পদে। যখন দাউদ ভাই [৪, ৫] আমাকে বলছেন, 'ওই যে দেখছ, মানুষটাকে দেখছ...'। দেখো দিকি কান্ড, বেশ দূরে দাঁড়ানো জিনিসটা মানুষ না উট এটা আমি বলি কেমন করে! মুখে বলি, 'অ, আচ্ছা, হ্যা-হ্যা'।
আমি কথা ঘুরাই, 'আচ্ছা, দাউদ ভাই, যে কবিতা লেখার কারণে আপনাকে দেশ থেকে বের করে দেয়া দিয়েছিল ওই কবিতাটা এখন পাওয়া যাবে কোথায়'?
দাউদ ভাই এর হদিশ দিতে পারেন না। আমি খানিকটা অবাক হই। জানতে চাই, 'আপনার কবিতাটার নাম যেন কি ছিল'?
এই বুড়া বাড়িটা নামের অভিশপ্ত বাড়িটা আটকে ফেলেছে আমাকে। সবারই যেখানে আছে একটা করে ক্যারিয়ার সেখানে আমার হাতে টিফিন-ক্যারিয়ার। তো, এই বুড়ার নালায়েক সন্তান তিন দিনের মাথায় ঠিক ঠিক বুড়ার কাছে ফিরে এসেছিল। পরিশিষ্ট কবেই লেখা হয়ে গেছে, গল্প শেষ। এরপর বলার আর বাকী থাকে কী!
কিন্তু আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, এই লেখায় অতি প্রয়োজনীয় একটা বিষয় বাদ পড়েছে, অন্তত আমার কাছে! এমন জরুরি বিষয় কেমন করে ভুলে গেলাম এটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নাই কারণ হামেশাই দেখি ফাঁকা মস্তিষ্ক আমার সঙ্গে এই খেলাটা খেলে বড়ো আনন্দিত হয়!
লেখাটায় যেটা বাদ পড়েছে তা হচ্ছে চশমা বিষয়ক ভয়াবহ সমস্যা। চশমার বিষয়টা খানিকটা খোলাসা করি। আমি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন থেকেই আমার চোখ অসম্ভব খারাপ- মাইনাস এইট পয়েন্ট ফাইভ! আমার ভাষায় যেটা বলি, চশমা ছাড়া আমি প্রায় অন্ধ! কালে কালে বরং আমার চোখ আগের চেয়ে ভাল হয়েছে।
তো, প্রাইমারিতেই পড়ার সময় আমি ব্ল্যাকবোর্ডে টিচারদের লেখা প্রায় কিছুই দেখতাম না। এই নিয়ে বড়ো যন্ত্রণা হতো যখন টিচার বললেন, ব্ল্যাকবোর্ডে যা লিখেছি তা খাতায় লেখো। তখন আমার মেজাজ খারাপ হতো, আরে, কী মুশকিল, ব্ল্যাকবোর্ডে লেখার প্রয়োজন কি, মুখে বললে কি হয়?
আমার বাবা কেমন কেমন করে যেন টের পেয়ে গেলেন আমার চোখ খারাপ। চোখের ডাক্তার দেখালেন। ডাক্তার আঁতকে উঠে বললেন, 'আপনার ছেলের তো চোখ ভীষণ খারাপ, ভীষণ...। আর শোনেন, আপনার ছেলেকে চোখ খারাপ কোন মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেবেন না'।
তখন বিয়ে-টিয়ে নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিল না, ছিল না চোখ খারাপ নিয়েও, মাথাব্যথার কারণ ছিল অন্য। যখন আমাকে চশমা ধরিয়ে দেয়া হলো তখন আমার ইচ্ছা করছিল মট করে এটাকে দু-টুকরা করে ফেলি। এ্যাহ, চশমা ধরিয়ে দিলেই হলো, আরে, সেই সময়টায় এই বয়সের ক-জন চোখে চশমা দেয়? অন্তত আমি তো কাউকে পাইনি। কী লজ্জা-কী লজ্জা! 'চারচোইক্খা' বলে যে ছেলেপেলেরা খেপায় এটা তো আর বাবার গায়ে লাগে না! বাবাটা যে একটা কী, অমানুষ-অমানুষ!
এদিকে বাবার কঠিন নির্দেশনা, চশমা চোখে দিয়েই স্কুলে যেতে হবে। বাবাকে আমি অসম্ভব পছন্দ করতাম, ভয়ও [২] কিন্তু তাঁর এই আচরণের কারণে তখন তাঁকে রাক্ষস-রাক্ষস মনে হতো। যে মা, বাবার সমস্ত কঠিন আচরণ থেকে আমাকে রক্ষা করতেন তাঁকেও দেখলাম নির্দয় আচরণ করতে। তিনি এই বিষয়ে টুঁ-শব্দও করলেন না।
তখন আমার ব্রেন এখনকার চেয়ে ভাল ছিল, অন্তত ছিল বলেই ধারণা করি- প্রয়োজনের সময় যথেষ্ঠ সহায়তা করত। এখন ব্রেনহীন আমি সলাজে বলি, তখন খানিকটা ব্রেন ছিল বলেই মনে হয়। কালে কালে জিনিসটা নাই হয়ে গেছে, আফসোস!
যাই হোক, আমি একটা বুদ্ধি বের করলাম। স্কুলে যাওয়ার পূর্বে চশমা চোখে দিয়ে বের হই, কয়েক কদম গিয়েই চশমা পকেটে পুরে ফেলি। এই নিয়ম আমি হাইস্কুলেও চালু রাখলাম। এমনিতেও নিয়মিত স্কুলে যেতে আমার ভাল লাগত না। তারচেয়ে আমার জন্য অনেক আনন্দের ছিল গোয়াল ঘরে বসে গল্পের বই পড়তে [৩]। তখনকার ভাষায় 'আউট-বই'!
যাই হোক, এই গেল আমি এবং আমার চশমা। জার্মানি যাওয়ার পূর্বে ক-দিন ধরেই তীব্র মাথাব্যথায় ভুগছিলাম। সমস্যাটা কোথায় এটা আঁচ করতে পেরে চোখের ডাক্তারের কাছে গেলাম। যা অনুমান করেছিলাম, তাই। সমস্যাটা চশমার। কী সর্বনাশ! পূর্বে কাছে এবং দূরের কাজ একটা চশমা দিয়েই চলত এখন কাছের এবং দূরের জন্য আলাদা-আলাদা চশমা নিতে হবে। কাছের মাইনাস ফাইভ, দূরেরটা মাইনাস সেভেন। বড়ই যন্ত্রণা!
চশমার দোকানদার কাছেরটা চট করে দিয়ে দিল কিন্তু কি যেন একটা ভজকট হলো দূরেরটা দিতে পারছিল না। এদিকে আমার যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। যেদিন আমি আখাউড়া ছাড়ব সেদিন সকালে দূরের চশমাটা দেয়ার কথা। দোকানে যাওয়ার পর যখন এই ব্যাটা বলল, 'আসে নাই, আপনের চশমা কাইল ছাড়া পারুম না', তখন আমি মনে মনে ভাবছিলাম গদাম করে ঘুষিটা কোথায় মারা যায়? বিকশিত দাঁতে মারলে কেমন হয় বা নাকটা সমান করে দিলে? ব্যাটা বলে কি, আমার ট্রেন আজ এগারোটায় আর এ কিনা কাল দেবে চশমা!
কিছুই করার নেই, পড়ার জন্য যে কাছের চশমাটা এটাকেই সম্বল করেই রওয়ানা দিলাম। ক্ষীণ আশা, হয়তো ঢাকায় কোনো একটা উপায় করা যাবে। কিন্তু সময়ে কুলালো না। অধিকাংশ সময় নষ্ট হলো এমিরাটসের কারণে। দুবাই এয়ারপোর্টে আট ঘন্টা থাকতে হবে বিধায় হোটেল কূপন এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে। অবশ্য এই হোটেল কূপন এদের অসভ্যতার কারণে আমার কোনো কাজেই লাগেনি। দুবাই এয়ারপোর্টে আমার রাতটা কেটেছিল ঘুমহীন!
চুতিয়া শব্দটা এখন আর ব্যবহার করি না নইলে বলতাম এমিরাটসের এটা চুতিয়াগিরি। কারণ দুবাই ইমিগ্রেশন কোনো কারণ ব্যতীত হোটেলে যাওয়ার অনুমতি না দেয়ায়, এমিরাটসের ওখানকার ডেস্কে জানানোর পরও এরা ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
দেশে ফিরে এমিরাটসকে এই হেনেস্তার বিস্তারিত লেখার পর, Customer Affairs থেকে Marsha Rozario নামের একজন আমাকে মেইল করে জানিয়েছে, "...I am happy to learn that you were provided with hotel accommodation within the terminal..." এই নির্বোধের উত্তর দেখে আমার হাসি চাপা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। আমি লিখলাম কি আর এ আমাকে উত্তর দিল কী!
![]() |
| মুকিত বিল্লাহ |
পূর্বের এক লেখায় মুকিত বিল্লাহ নামের মানুষটার কথা বলেছিলাম, ইউরোপিয়ান কমিশনে কাজ করেন। আমি যাব ডুজলডর্ফ আর তিনি ফ্রান্কফুট।
তাঁরও একই গতি, তাঁকেও এয়ারপোর্ট থেকে বেরুতে দেয়া হয়নি। আমার অবশ্য খানিকটা শান্তি-শান্তি লেগেছিল, যাক, আমার চেহারার মধ্যে হয়তো ড্রাগ ডিলারের ছাপ আছে বলে কেবল আমাকেই আটকায়নি, মুকিত বিল্লাহকেও আটকিয়েছে।
মুকিত বিল্লাহ নামের মানুষটার কারণে দুবাই এয়ারপের্টের অসহ্য সময়টা পার হয়েছিল কিন্তু এই মানুষটার যে সহায়তার কথা আমি ভুলব না সেটাই উল্লেখ করা হয়নি! আমার চোখের চশমাটা কাছের, দূরের যা দেখি সব অস্পষ্ট-তমোময়। সবচেয়ে কষ্টকর মনে হতো, ডিসপ্লেতে যখন ফ্লাইট শিডিউল দেখতে হতো, তখন।
কপাল! আমার ফ্লাইটে যেন কী একটা ঝামেলা হলো। সব গেট একের পর এক ওপেন হচ্ছে, আমারটা বাদ দিয়ে। আমি খানিক পর পর বলি, 'মুকিত, দেখেন তো ফ্লাইটের কি অবস্থা'? মুকিত দেখে জানান। একটু পর আমি আবারও বলি, মুকিত, দেখেন তো...। তাঁর ফ্লাইট আবার অন্যটা। কখনও তিনি রগড় করতে ছাড়েন না, 'আপনার ফ্লাইট তো যাবে না'।
আমি চেপে রাখা ভয় প্রকাশ করি না, সর্বনাশ, এই কুখ্যাত এয়ারপোর্টে কি আমি আটকা পড়ব, যেখানে সহায়তা করার জন্য কেউ নেই। আমার মনে পড়ে 'টার্মিনাল' মুভির কথা। এমন কি এখানে এয়ারলাইন্সের লোকজনরাও বিচিত্র কারণে অসহযোগিতা করছে। অথচ জার্মানিতে এই এয়ারলাইন্সের লোকজনকেই আমি দেখেছি সহৃদয় আচরণ করতে!
আমার কেবল মনে পড়ছিল মাহাবুব আহমাদ নামের করপোরেট ভুবনের মানুষটার কথা, যিনি অফিসের কাজে হামেশা পায়ে চাকা লাগিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ান। দুবাই হয়ে যাচ্ছি শুনে তিনি বলেছিলেন, 'দুবাই এয়ারপোর্ট কুখ্যাত, গেলে বুঝবা'।
দুবাই ছেড়ে যাওয়ার পর হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। একবার ডুজলডর্ফ পৌঁছে গেলে আর চিন্তার কিছু নেই কারণ এয়ারপোর্ট থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। কপালের ফের, ডুজলডর্ফ এয়ারপোর্টে লাগেজ নিয়ে আরেক সমস্যা। লাগেজ খুঁজে পাচ্ছি না, ভুল বেল্টে লাগেজ চলে গেছে! এয়ারপোর্টের লোকজনকে জানাবার পর এরা আমাকে আশ্বস্ত করল, চিন্তার কিছু নেই, ব্যবস্থা হবে। আমাকে অপেক্ষা করতে বলে চার-পাঁচজন বিভিন্ন দিকে গিয়ে খোঁজ নেয়া শুরু করল। অল্পক্ষণেই আমাকে জানানো হলো, 'তোমার সমস্যার সমাধান হয়েছে। তুমি ওই ডিসপ্লেবোর্ডে...'। আমি মনখারাপ করা শ্বাস ফেললাম, আবারও ডিসপ্লে বোর্ড, আবারও আমার চশমা! হায়, এখন তো আর মুকিত বিল্লাহ নেই।
এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আর সমস্যা হয়নি। যে সহৃদয় মানুষরা আমাকে নিতে এসেছিলেন আমি এঁদের পিছু পিছু- এঁরা ডানে গেলে আমি ডানে, বাঁয়ে গেলে বাঁয়ে...।
![]() |
| দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে |
আমি কথা ঘুরাই, 'আচ্ছা, দাউদ ভাই, যে কবিতা লেখার কারণে আপনাকে দেশ থেকে বের করে দেয়া দিয়েছিল ওই কবিতাটা এখন পাওয়া যাবে কোথায়'?
দাউদ ভাই এর হদিশ দিতে পারেন না। আমি খানিকটা অবাক হই। জানতে চাই, 'আপনার কবিতাটার নাম যেন কি ছিল'?
দাউদ ভাই বলেন, 'কবিতাটার নাম হচ্ছে, কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নার কালো বন্যায়। অনেক বড়ো কবিতা। লিখেছিলাম রাত জেগে'।
আমি বিড়বিড় করি, কালো সূর্যের, কালো জ্যোৎস্নার...।
আমি বিড়বিড় করি, কালো সূর্যের, কালো জ্যোৎস্নার...।
সহায়ক লিংক:
২. দুম করে মরে যাওয়া...: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_21.html
৩. অপকিচ্ছা: http://www.ali-mahmed.com/2009/09/blog-post_02.html
৪. দাউদ হায়দার, ১: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_21.html
৫. দাউদ হায়দার, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_7633.html
৪. দাউদ হায়দার, ১: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_21.html
৫. দাউদ হায়দার, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_7633.html
বিভাগ
বৈদেশ পর্ব: ববস
Saturday, July 10, 2010
সদয় অবগতি
গতকাল (৯ জুলাই, ২০১০) প্রথম আলোয় আমাকে নিয়ে একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, 'আখাউড়া থেকে বন'। এই প্রতিবেদনের কিছু অংশ পাঠককে অনেকখানি বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
এই প্রতিবেদনের এক অংশে বলা হচ্ছে, "...আর এবারই প্রথম এ প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছিল বাংলা ব্লগ। প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে—‘বাংলাদেশ বাঁচলেই বিশ্ব বাঁচবে’..."[১]।
আমার সাইটে এই নিয়ে কয়েকজন জানতে চেয়েছেন এবং আলাদা আলাদা করে আমাকে মেইলও করেছেন। বারবার একই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার সমস্যা হচ্ছে বিধায় বিস্তারিত এখানে দিয়ে দিচ্ছি।
ডয়চে ভেলে (১৫ এপ্রিল, ২০১০) প্রথম যে ঘোষণা দেয়, তাদের সাইটে জানাচ্ছে, "...আর আলী মাহমেদ-এর ব্লগ উঠে এলো শ্রেষ্ঠ বাংলা ব্লগ হিসেবে...বিশ্বের ইতিহাসে তিনিই প্রথম বাঙালি ব্লগার, যিনি ডয়চে ভেলের সেরা ব্লগ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলেন৷... "[২]।
ডয়চে ভেলে (২২ জুন, ২০১০) পুরস্কার প্রদানের পরও [৩] যে প্রতিবেদন ছাপে সেখানেও বলা হয়েছে, "ডয়চে ভেলের সেরা বাংলা ব্লগ পুরস্কার জিতেছেন আলী মাহমেদ শুভ৷ এটা কোন নতুন খবর নয়, কিন্তু সেই পুরস্কারটি মঙ্গলবার তিনি গ্রহণ করলেন গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম থেকে৷...মঙ্গলবার গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে শুভসহ ১১টি ভাষার এবং আরো কয়েকটি ক্যাটেগরির বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়৷ এসময় আরো অনেকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মসুদ মান্নান, প্রতিযোগিতার বাংলা অংশের জুরি সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা এবং ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগের প্রধান আব্দুল্লাহ আল-ফারূক..."৷
এবং পাঠকের অবগতির জন্য বলি, এই প্রতিযোগিতাটা ছিল বাংলা ভাষার উপর, কেবল বাংলাদেশকেই ধরা হয়নি, ভারতসহ। গ্লোবাল ভয়েসেস [৪] এর মতে, "Deutsche Welle's 2010 The Best Of Blogs (BOBs) international award has a significance for the Bangla (Bengali) bloggers in Bangladesh, India and the Bengali diaspora around the world. In its 6th round of blogging competition Bangla language blogs have been included in the BOBs [bn] for the first time. With approximately 230 million speakers, Bangla is one of the most spoken languages in the world. This award is significant in a sense that we have not seen any successful nationwide best of Bangla blogs competition in Bangladesh or in India till-to-date. ...।"
মোদ্দা কথা, জলবায়ু বিষয়ক প্রতিযোগিতাটা ছিল অন্য ক্যাটাগরীতে। এটার সঙ্গে বেস্ট ওয়েবলগ বাংলার সঙ্গে কোন সম্পর্ক নাই।
অন্য ক্যাটাগরিতে The BOBs আয়োজিত "Special Topic Award Climate Change" এই বিভাগে "Bangladesh Banchlei Bishwa Bachbe" এই সাইটটি প্রতিযোগিতা করেছিল [৫]।
এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনার এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশেরই আরেকজন ব্লগার মোঃ মোস্তফা কামাল, এই অন্য ক্যাটাগরিতে হেরে যান অতি অল্পের জন্য। আমার নিজেকে বড়ো ছোট মনে হয় যখন এটা ভেবে বুকের ভেতর থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসে, আমরা খানিকটা চেষ্টা করলেই জলবায়ু বিষয়ক পুরস্কারটাও আমাদের দেশেই থাকত!
মজার বিষয় হচ্ছে, এই প্রথম আলোতেই [৬] ছাপা হয়েছিল, "...সম্প্রতি জার্মান বেতারকেন্দ্র ডয়েচে ভেলের বিচারক এবং পাঠকদের ভোটে সেরা বাংলা ব্লগ নির্বাচিত হয়েছে ব্লগার আলী মাহমেদের ব্লগসাইট..."।
*এওয়ার্ডটা স্বচ্ছ কাঁচের। লেখাগুলো আবার সাদা! আল্লা জানে কার মাথা থেকে এই আইডিয়া বেরিয়েছে! ব্যাকগ্রাউন্ডে কালো কিছু না রেখে ছবি উঠাবার কোন উপায় ছিল না। এই কারণে দুঃখ প্রকাশ করি!
সহায়ক লিংক
১. প্রথম আলো, ৯ জুলাই, ২০১০: http://prothom-alo.com/detail/date/2010-07-09/news/77162
২. ডয়চে ভেলে, ১৫ এপ্রিল, ২০১০: http://www.dw-world.de/dw/article/0,,5473377,00.html
৩. ডয়চে ভেলে, ২২ জুন, ২০১০: http://ht.ly/21Z7s
৪. গ্লোবাল ভয়েসেস: http://globalvoicesonline.org/2010/04/11/bangladesh-bangla-blogs-at-the-bobs-meet-ali-mahmed/
৫. বাংলাদেশ বাঁচলে বিশ্ব বাঁচবে: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_18.html
৬. প্রথম আলো, ২৪ এপ্রিল, ২০১০: http://prothom-alo.com/detail/date/2010-04-24/news/58454
এই প্রতিবেদনের এক অংশে বলা হচ্ছে, "...আর এবারই প্রথম এ প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছিল বাংলা ব্লগ। প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে—‘বাংলাদেশ বাঁচলেই বিশ্ব বাঁচবে’..."[১]।
আমার সাইটে এই নিয়ে কয়েকজন জানতে চেয়েছেন এবং আলাদা আলাদা করে আমাকে মেইলও করেছেন। বারবার একই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার সমস্যা হচ্ছে বিধায় বিস্তারিত এখানে দিয়ে দিচ্ছি।
প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল জলবায়ু পরিবর্তন এই তথ্য প্রথম আলো কোথায় পেয়েছে এটা এরাই ভাল বলতে পারবেন। আমার অন্তত জানা নেই। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি এই নিয়ে আমার সাইট প্রতিযোগিতায় কখনও ছিল না। লজ্জার মাথা খেয়ে এও স্বীকার যাই, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ভাল জ্ঞান আমার নাই!
ডয়চে ভেলে (১৫ এপ্রিল, ২০১০) প্রথম যে ঘোষণা দেয়, তাদের সাইটে জানাচ্ছে, "...আর আলী মাহমেদ-এর ব্লগ উঠে এলো শ্রেষ্ঠ বাংলা ব্লগ হিসেবে...বিশ্বের ইতিহাসে তিনিই প্রথম বাঙালি ব্লগার, যিনি ডয়চে ভেলের সেরা ব্লগ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলেন৷... "[২]।
ডয়চে ভেলে (২২ জুন, ২০১০) পুরস্কার প্রদানের পরও [৩] যে প্রতিবেদন ছাপে সেখানেও বলা হয়েছে, "ডয়চে ভেলের সেরা বাংলা ব্লগ পুরস্কার জিতেছেন আলী মাহমেদ শুভ৷ এটা কোন নতুন খবর নয়, কিন্তু সেই পুরস্কারটি মঙ্গলবার তিনি গ্রহণ করলেন গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম থেকে৷...মঙ্গলবার গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে শুভসহ ১১টি ভাষার এবং আরো কয়েকটি ক্যাটেগরির বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়৷ এসময় আরো অনেকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মসুদ মান্নান, প্রতিযোগিতার বাংলা অংশের জুরি সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা এবং ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগের প্রধান আব্দুল্লাহ আল-ফারূক..."৷
এবং পাঠকের অবগতির জন্য বলি, এই প্রতিযোগিতাটা ছিল বাংলা ভাষার উপর, কেবল বাংলাদেশকেই ধরা হয়নি, ভারতসহ। গ্লোবাল ভয়েসেস [৪] এর মতে, "Deutsche Welle's 2010 The Best Of Blogs (BOBs) international award has a significance for the Bangla (Bengali) bloggers in Bangladesh, India and the Bengali diaspora around the world. In its 6th round of blogging competition Bangla language blogs have been included in the BOBs [bn] for the first time. With approximately 230 million speakers, Bangla is one of the most spoken languages in the world. This award is significant in a sense that we have not seen any successful nationwide best of Bangla blogs competition in Bangladesh or in India till-to-date. ...।"
মোদ্দা কথা, জলবায়ু বিষয়ক প্রতিযোগিতাটা ছিল অন্য ক্যাটাগরীতে। এটার সঙ্গে বেস্ট ওয়েবলগ বাংলার সঙ্গে কোন সম্পর্ক নাই।
অন্য ক্যাটাগরিতে The BOBs আয়োজিত "Special Topic Award Climate Change" এই বিভাগে "Bangladesh Banchlei Bishwa Bachbe" এই সাইটটি প্রতিযোগিতা করেছিল [৫]।
এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনার এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশেরই আরেকজন ব্লগার মোঃ মোস্তফা কামাল, এই অন্য ক্যাটাগরিতে হেরে যান অতি অল্পের জন্য। আমার নিজেকে বড়ো ছোট মনে হয় যখন এটা ভেবে বুকের ভেতর থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসে, আমরা খানিকটা চেষ্টা করলেই জলবায়ু বিষয়ক পুরস্কারটাও আমাদের দেশেই থাকত!
মজার বিষয় হচ্ছে, এই প্রথম আলোতেই [৬] ছাপা হয়েছিল, "...সম্প্রতি জার্মান বেতারকেন্দ্র ডয়েচে ভেলের বিচারক এবং পাঠকদের ভোটে সেরা বাংলা ব্লগ নির্বাচিত হয়েছে ব্লগার আলী মাহমেদের ব্লগসাইট..."।
*এওয়ার্ডটা স্বচ্ছ কাঁচের। লেখাগুলো আবার সাদা! আল্লা জানে কার মাথা থেকে এই আইডিয়া বেরিয়েছে! ব্যাকগ্রাউন্ডে কালো কিছু না রেখে ছবি উঠাবার কোন উপায় ছিল না। এই কারণে দুঃখ প্রকাশ করি!
সহায়ক লিংক
১. প্রথম আলো, ৯ জুলাই, ২০১০: http://prothom-alo.com/detail/date/2010-07-09/news/77162
২. ডয়চে ভেলে, ১৫ এপ্রিল, ২০১০: http://www.dw-world.de/dw/article/0,,5473377,00.html
৩. ডয়চে ভেলে, ২২ জুন, ২০১০: http://ht.ly/21Z7s
৪. গ্লোবাল ভয়েসেস: http://globalvoicesonline.org/2010/04/11/bangladesh-bangla-blogs-at-the-bobs-meet-ali-mahmed/
৫. বাংলাদেশ বাঁচলে বিশ্ব বাঁচবে: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_18.html
৬. প্রথম আলো, ২৪ এপ্রিল, ২০১০: http://prothom-alo.com/detail/date/2010-04-24/news/58454
বিভাগ
বৈদেশ পর্ব: ববস
Monday, July 5, 2010
বৈদেশ পর্ব: তেরো
আজ আমি জার্মানি ছেড়ে যাচ্ছি। আবারও আরাফাত-মায়াবতী দম্পতির হ্যাপা। আমাকে ডুজলডর্ফ এয়ারপোর্টে রেখে আসতে হবে। আমার মনে হয় এই দম্পতি হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। এই দুই দিনে আমার কারণে এঁদের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। মানুষ কাঁহাতক সহ্য করতে পারে!
লাগেজ গোছানো আমার জন্য বিরাট এক ঝামেলার কাজ। কোথাও গেলে, সচরাচর আমি দু-একদিন আগে থেকেই গোছানো শুরু করি, ক্রমশ এর পরিধি বাড়তে থাকে। ছোটখাটো একটা ইস্ত্রিও আমি সর্বদা বহন করি কিন্তু এটা আমার কখনো কাজে লেগেছে বলে মনে পড়ে না! ব্যাগ যখন উপচে পড়ে তখন ব্যাগ নিয়ে টানাটানি করতে গিয়ে জান বেরিয়ে যায়। পরে একটা সহজ বুদ্ধি বের করলাম। ব্যাগের চেইন লাগাবার পূর্বে কিছুক্ষণ এটার উপর বসে থাকা। অল কোয়ায়েট অন...সব ঠান্ডা, এরপর চেইন বাবাজীর না লেগে উপায় থাকে না!
এখন এখানে এতো সময় কোথায়? কিছুই কেনা হয়নি কিন্তু আরাফাত দম্পতি আমার বাচ্চাদের জন্য হাবিজাবি কি কি যেন দিয়ে দিয়েছে। তো, ব্যাগ উপচে পড়ার ঝামেলাটা যাবে কোথায়? আমি আরাফাতকে বলি, এটা তো মুশকিল হয়ে গেল দেখছি! এবার তো বসে কাজ হবে না, এটার উপর দাঁড়িয়ে গেলে কেমন হয়?
এঁরা আমাকে সরিয়ে নিজেরাই ব্যাগ গোছাতে লেগে যান। এঁরা কি কি করেন আমি জানি না দেখি ব্যাগ দিব্যি সুবোধ বালক!
আমি যেতে যেতে আবারও যতটুকু পারি দেশটাকে দেখার চেষ্টা করি, এখানকার লোকজনদের বোঝার চেষ্টা করি। আমার নতুন উপাধি 'ছিদ্রান্বেষি' চোখ দিয়ে অসঙ্গতি খুঁজে বেড়াই। বলার মত, লেখার মত তেমন কোন অসঙ্গতি আমার চোখে পড়ে না। ব্যাড, টু ব্যাড- হিটলারের দেশে এমনটা যে আমার কাম্য না। কেউ কেউ বলতে পারেন, মিয়া, তুমি মাত্র দুই দিনে কী ছাতাফাতা দেখলা? এদের সঙ্গে কুতর্কে আমি যাব না। যে লেখাটা আমি এক ঘন্টায় লিখি সেই লেখাটা বছরখানেক লাগিয়ে লিখলে চমৎকার একটা জিনিস দাঁড়াবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।
এদের যে বিষয়টা আমাকে খুব টেনেছে সেটা হচ্ছে, 'ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের' [১] [২] জন্যে এদের ভাবনা, ভালবাসা। বাস-ট্রামে দেখেছি এঁদের বসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা, পারতপক্ষে এখানে কেউ বসে না। এঁদের সুবিধার্থে এমন কি বিশেষ ব্যবস্থায় বাসের কিছু অংশ কাতও করা যায়।
কিছু সীট দেখলাম ডাবল। আরাফাত আমাকে বলছিলেন, এটা খুব মোটা কোন মানুষ যদি উঠেন তাঁর জন্যে। রাস্তা পারাপারেরর সময় কেবল যে বাতির ব্যবহারই শেষ এমন না, নির্দিষ্ট লয়ে শব্দও হতে থাকে। আর এসব হবে না কেন? এই দেশের লোকজন তাঁর বেতনের ৪৫ ভাগ ট্যাক্স খাতে জমা দেয়।
অহেতুক দবদবা, অর্থ অপচয়ের নমুনা আমার চোখে পড়েনি। যেটা টেনেছে পুরনো স্থাপনার ছড়াছড়ি। কী চমৎকার করেই না এরা যত্ন করে ধরে রেখেছে এদের শেকড়কে। প্রত্যেকটা জায়গায় একটা ছন্দ আছে, সব নির্দিষ্ট ছন্দে চলছে। অতিশয়োক্তি নাই।
আমাদের যেমন বিশেষ বিশেষ দিনে, সময়ে উচ্ছ্বাসের চোটে প্রাণ বেরিয়ে যায় এমনটা না। ওহ, মনে পড়ল, আমার গায়ে ভাষাসংক্রান্ত ফতুয়া দেখে কেউ একজন বলছিলেন, আরে, আপনি দেখি শোকের মাস, ফেব্রুয়ারির জিনিস গায়ে দিয়ে বসে আছেন!
আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমার অল্প জ্ঞানে আমি যেটা বুঝি, ভাষা হচ্ছে হৃদপিন্ড, সর্বদা ধুকধুক করে সচল থাকবে, বিশেষ মাস কী আবার! আর শোকের মাস কি, এটা তো অহংকারের মাস- এই দেশের সেরা সন্তানরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন কেমন করে ভাষার জন্য, দেশের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে অহংকার করার সুযোগ দিতে হয়।
তবে এটা আমি এখন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে, যে কোন ভাবেই হোক, যে কোন কারণেই হোক, এই অনুষ্ঠানে না আসাটা বুদ্ধিমানের কাজ হতো না। অন্তত বাংলা ভাষার অপকার বৈ উপকার হতো না।
ডয়চে ভেলে ৩০টা ভাষা নিয়ে কাজ করে, বিশেষ একটা ভাষা নিয়ে আদেখলা দেখাবার সময় জার্মানদের নাই। বাংলা ভাষাটা ভালো পারলে এরা বাংলা বিভাগটাও নিজেদের লোক দিয়েই চালাতো। এরা যেটা ভাল মনে করে সেটাই করে কারও ধার ধারে না।
আমাদের অনেকের ধারণা, বাংলা বিভাগ বুঝি এখানকার হর্তকর্তা, বাংলা বিভাগ বললেই ডয়চে ভেলে কাত হয়ে যায়। ভুল, এমনটা না। ছোট-ছোট বিষয়েও আমি দেখেছি বাংলা বিভাগের লোকজনকে ছুটাছুটি করতে। এর ফল যে খুব একটা ফলপ্রসূ হয়েছে এমনটা আমার মনে হয়নি!
ডুজলডর্ফ এয়ারপোর্টে ঢুকে যাওয়ার আগে আমার কেবলি মনে হচ্ছিল, এখান নিয়ে টুকরো-টুকরো সুখ-স্মৃতিগুলো নিয়ে যাচ্ছি। এই স্মৃতিগুলো হয়তো আমি ভুলে যাব কিন্তু আমার মস্তিষ্ক ভুলবে না, ঠিকই মনে রাখবে। আমি চাই, বিভিন্ন সময়ে আমার এই সব জমানো সুখ-স্মৃতিগুলোর ক্রমশ ভারী হোক। আমি এও চাই, আমার মৃত্যুর সময় আমার মস্তিষ্ক সচল থাকুক, তখন এই সুখ-স্মৃতিগুলো একেক করে ভিড় করতে থাকুক। ওরা ওদের খেলা খেলতে থাকুক, আমি নিশ্চিন্তে অন্য ভুবনে যাত্র করি।
এয়ারক্রাফটে আমার পাশে আবারও একজন জার্মান। এর বয়স অনেক কম। ছটফটে। ফ্রেডরিক নামের এই ছেলেটা প্রথমেই আমাকে বলে নেয়, আমার ইংরাজি কিন্তু খুব খারাপ। আমি হেসে বলি, আমার ইংরাজি তোমার চেয়েও খারাপ। ফ্রেডরিকের সঙ্গে দুবাই পৌঁছার আগ পর্যন্ত বকবক চলতে থাকে। এ যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ঘুরতে। আমি তাকে বলি, ধুর মিয়া, অস্ট্রেলিয়া কেন, বাংলাদেশে আসো। পৃথিবীর দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত এখানে, এখানে সুন্দরবন। তুমি আসলে আমি তোমার গাইড হবো।
ফ্রেডরিক চকচকে চোখে বলে, সত্যি, তাহলে নেক্সট ভেকেশনে তোমার দেশে আসব। ফ্রেডরিক হয়তো আসবে, হয়তো আসবে না; সেটা মূখ্য না।
এবার আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত কারণ দুবাই এয়ারপোর্টে আমাকে থাকতে হবে মাত্র ২ ঘন্টা। চেক-ইন, চেক-আউট করতেই এই সময়টা চলে যাবে। এই নরকে [৩] আমার খুব বেশি সময় থাকার আগ্রহ নাই!
ঢাকায় আমি চলে আসি ২৪ জুন, সকাল নটায়, অনেকটা চোরের মত। ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। যেহেতু আমি একা তাই ভয়ে ভয়ে আছি, স্কুটারঅলা না আমাকে ফেলে দিয়ে আমার বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে উধাও হয়। আমি চোখ খুলে রাখতে পারছি না তবুও একটা বুদ্ধি বের করলাম, ব্যাটাকে বুঝতে দেয়া চলবে না যে আমি একটু পর পর ঘুমিয়ে যাচ্ছি। ঘুমটা একটু কাটলেই রাশভারী গলায় বলি, আহ, একটু দেইখ্যা চালাও, এক্সিডেন্ট করবা ।
ট্রেন ৩টায়। জার্মানি যাওয়ার পূর্বেই আমি ট্রেনের টিকেট কেটে নিয়ে গিয়েছিলাম। কাজটা বুদ্ধিমানের কারণ ঝটিকা সফরের পর ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে যেত।
আমার জন্য অপেক্ষায় আছে বুড়া বাড়িটা [৪]। অতি দ্রুত এর কাছে আমাকে ফিরতে হবে। বুড়া আমার অপেক্ষায় আছে। সবাই আমাকে ফেলে দিলেও এ আমাকে ফেলে দেবে না...।
বৈদেশ পর্ব, বারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_05.html
সহায়ক লিংক:
১. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post.html
২. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের জন্য আমরা কি প্রস্তুত: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_03.html
৩. বৈদেশ পর্ব, সাত: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_3252.html
৪. বুড়া বাড়িটা: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_24.html
লাগেজ গোছানো আমার জন্য বিরাট এক ঝামেলার কাজ। কোথাও গেলে, সচরাচর আমি দু-একদিন আগে থেকেই গোছানো শুরু করি, ক্রমশ এর পরিধি বাড়তে থাকে। ছোটখাটো একটা ইস্ত্রিও আমি সর্বদা বহন করি কিন্তু এটা আমার কখনো কাজে লেগেছে বলে মনে পড়ে না! ব্যাগ যখন উপচে পড়ে তখন ব্যাগ নিয়ে টানাটানি করতে গিয়ে জান বেরিয়ে যায়। পরে একটা সহজ বুদ্ধি বের করলাম। ব্যাগের চেইন লাগাবার পূর্বে কিছুক্ষণ এটার উপর বসে থাকা। অল কোয়ায়েট অন...সব ঠান্ডা, এরপর চেইন বাবাজীর না লেগে উপায় থাকে না!
এখন এখানে এতো সময় কোথায়? কিছুই কেনা হয়নি কিন্তু আরাফাত দম্পতি আমার বাচ্চাদের জন্য হাবিজাবি কি কি যেন দিয়ে দিয়েছে। তো, ব্যাগ উপচে পড়ার ঝামেলাটা যাবে কোথায়? আমি আরাফাতকে বলি, এটা তো মুশকিল হয়ে গেল দেখছি! এবার তো বসে কাজ হবে না, এটার উপর দাঁড়িয়ে গেলে কেমন হয়?
এঁরা আমাকে সরিয়ে নিজেরাই ব্যাগ গোছাতে লেগে যান। এঁরা কি কি করেন আমি জানি না দেখি ব্যাগ দিব্যি সুবোধ বালক!
আমি যেতে যেতে আবারও যতটুকু পারি দেশটাকে দেখার চেষ্টা করি, এখানকার লোকজনদের বোঝার চেষ্টা করি। আমার নতুন উপাধি 'ছিদ্রান্বেষি' চোখ দিয়ে অসঙ্গতি খুঁজে বেড়াই। বলার মত, লেখার মত তেমন কোন অসঙ্গতি আমার চোখে পড়ে না। ব্যাড, টু ব্যাড- হিটলারের দেশে এমনটা যে আমার কাম্য না। কেউ কেউ বলতে পারেন, মিয়া, তুমি মাত্র দুই দিনে কী ছাতাফাতা দেখলা? এদের সঙ্গে কুতর্কে আমি যাব না। যে লেখাটা আমি এক ঘন্টায় লিখি সেই লেখাটা বছরখানেক লাগিয়ে লিখলে চমৎকার একটা জিনিস দাঁড়াবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।
এদের যে বিষয়টা আমাকে খুব টেনেছে সেটা হচ্ছে, 'ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের' [১] [২] জন্যে এদের ভাবনা, ভালবাসা। বাস-ট্রামে দেখেছি এঁদের বসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা, পারতপক্ষে এখানে কেউ বসে না। এঁদের সুবিধার্থে এমন কি বিশেষ ব্যবস্থায় বাসের কিছু অংশ কাতও করা যায়।
কিছু সীট দেখলাম ডাবল। আরাফাত আমাকে বলছিলেন, এটা খুব মোটা কোন মানুষ যদি উঠেন তাঁর জন্যে। রাস্তা পারাপারেরর সময় কেবল যে বাতির ব্যবহারই শেষ এমন না, নির্দিষ্ট লয়ে শব্দও হতে থাকে। আর এসব হবে না কেন? এই দেশের লোকজন তাঁর বেতনের ৪৫ ভাগ ট্যাক্স খাতে জমা দেয়।
অহেতুক দবদবা, অর্থ অপচয়ের নমুনা আমার চোখে পড়েনি। যেটা টেনেছে পুরনো স্থাপনার ছড়াছড়ি। কী চমৎকার করেই না এরা যত্ন করে ধরে রেখেছে এদের শেকড়কে। প্রত্যেকটা জায়গায় একটা ছন্দ আছে, সব নির্দিষ্ট ছন্দে চলছে। অতিশয়োক্তি নাই।
আমাদের যেমন বিশেষ বিশেষ দিনে, সময়ে উচ্ছ্বাসের চোটে প্রাণ বেরিয়ে যায় এমনটা না। ওহ, মনে পড়ল, আমার গায়ে ভাষাসংক্রান্ত ফতুয়া দেখে কেউ একজন বলছিলেন, আরে, আপনি দেখি শোকের মাস, ফেব্রুয়ারির জিনিস গায়ে দিয়ে বসে আছেন!
আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমার অল্প জ্ঞানে আমি যেটা বুঝি, ভাষা হচ্ছে হৃদপিন্ড, সর্বদা ধুকধুক করে সচল থাকবে, বিশেষ মাস কী আবার! আর শোকের মাস কি, এটা তো অহংকারের মাস- এই দেশের সেরা সন্তানরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন কেমন করে ভাষার জন্য, দেশের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে অহংকার করার সুযোগ দিতে হয়।
তবে এটা আমি এখন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে, যে কোন ভাবেই হোক, যে কোন কারণেই হোক, এই অনুষ্ঠানে না আসাটা বুদ্ধিমানের কাজ হতো না। অন্তত বাংলা ভাষার অপকার বৈ উপকার হতো না।
ডয়চে ভেলে ৩০টা ভাষা নিয়ে কাজ করে, বিশেষ একটা ভাষা নিয়ে আদেখলা দেখাবার সময় জার্মানদের নাই। বাংলা ভাষাটা ভালো পারলে এরা বাংলা বিভাগটাও নিজেদের লোক দিয়েই চালাতো। এরা যেটা ভাল মনে করে সেটাই করে কারও ধার ধারে না।
আমাদের অনেকের ধারণা, বাংলা বিভাগ বুঝি এখানকার হর্তকর্তা, বাংলা বিভাগ বললেই ডয়চে ভেলে কাত হয়ে যায়। ভুল, এমনটা না। ছোট-ছোট বিষয়েও আমি দেখেছি বাংলা বিভাগের লোকজনকে ছুটাছুটি করতে। এর ফল যে খুব একটা ফলপ্রসূ হয়েছে এমনটা আমার মনে হয়নি!
ডুজলডর্ফ এয়ারপোর্টে ঢুকে যাওয়ার আগে আমার কেবলি মনে হচ্ছিল, এখান নিয়ে টুকরো-টুকরো সুখ-স্মৃতিগুলো নিয়ে যাচ্ছি। এই স্মৃতিগুলো হয়তো আমি ভুলে যাব কিন্তু আমার মস্তিষ্ক ভুলবে না, ঠিকই মনে রাখবে। আমি চাই, বিভিন্ন সময়ে আমার এই সব জমানো সুখ-স্মৃতিগুলোর ক্রমশ ভারী হোক। আমি এও চাই, আমার মৃত্যুর সময় আমার মস্তিষ্ক সচল থাকুক, তখন এই সুখ-স্মৃতিগুলো একেক করে ভিড় করতে থাকুক। ওরা ওদের খেলা খেলতে থাকুক, আমি নিশ্চিন্তে অন্য ভুবনে যাত্র করি।
এয়ারক্রাফটে আমার পাশে আবারও একজন জার্মান। এর বয়স অনেক কম। ছটফটে। ফ্রেডরিক নামের এই ছেলেটা প্রথমেই আমাকে বলে নেয়, আমার ইংরাজি কিন্তু খুব খারাপ। আমি হেসে বলি, আমার ইংরাজি তোমার চেয়েও খারাপ। ফ্রেডরিকের সঙ্গে দুবাই পৌঁছার আগ পর্যন্ত বকবক চলতে থাকে। এ যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ঘুরতে। আমি তাকে বলি, ধুর মিয়া, অস্ট্রেলিয়া কেন, বাংলাদেশে আসো। পৃথিবীর দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত এখানে, এখানে সুন্দরবন। তুমি আসলে আমি তোমার গাইড হবো।
ফ্রেডরিক চকচকে চোখে বলে, সত্যি, তাহলে নেক্সট ভেকেশনে তোমার দেশে আসব। ফ্রেডরিক হয়তো আসবে, হয়তো আসবে না; সেটা মূখ্য না।
এবার আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত কারণ দুবাই এয়ারপোর্টে আমাকে থাকতে হবে মাত্র ২ ঘন্টা। চেক-ইন, চেক-আউট করতেই এই সময়টা চলে যাবে। এই নরকে [৩] আমার খুব বেশি সময় থাকার আগ্রহ নাই!
ঢাকায় আমি চলে আসি ২৪ জুন, সকাল নটায়, অনেকটা চোরের মত। ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। যেহেতু আমি একা তাই ভয়ে ভয়ে আছি, স্কুটারঅলা না আমাকে ফেলে দিয়ে আমার বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে উধাও হয়। আমি চোখ খুলে রাখতে পারছি না তবুও একটা বুদ্ধি বের করলাম, ব্যাটাকে বুঝতে দেয়া চলবে না যে আমি একটু পর পর ঘুমিয়ে যাচ্ছি। ঘুমটা একটু কাটলেই রাশভারী গলায় বলি, আহ, একটু দেইখ্যা চালাও, এক্সিডেন্ট করবা ।
ট্রেন ৩টায়। জার্মানি যাওয়ার পূর্বেই আমি ট্রেনের টিকেট কেটে নিয়ে গিয়েছিলাম। কাজটা বুদ্ধিমানের কারণ ঝটিকা সফরের পর ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে যেত।
আমার জন্য অপেক্ষায় আছে বুড়া বাড়িটা [৪]। অতি দ্রুত এর কাছে আমাকে ফিরতে হবে। বুড়া আমার অপেক্ষায় আছে। সবাই আমাকে ফেলে দিলেও এ আমাকে ফেলে দেবে না...।
বৈদেশ পর্ব, বারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_05.html
সহায়ক লিংক:
১. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post.html
২. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের জন্য আমরা কি প্রস্তুত: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_03.html
৩. বৈদেশ পর্ব, সাত: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_3252.html
৪. বুড়া বাড়িটা: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_24.html
বিভাগ
বৈদেশ পর্ব: ববস
বৈদেশ পর্ব: বারো
পুরস্কার প্রদানের মূল পর্ব শেষ হলে আমরা কয়েকজন চলে আসি আরাফাত-মায়াবতীদের বাসায়। নৈশভোজের দাওয়াত। বাংলা বিভাগের প্রধান ফারুক ভাইকে ডাক্তারের নিয়ম মেনে চলতে হয় তারপরও এই মানুষটা চলে এসেছেন, আগামীকাল আমি চলে যাচ্ছি বলে। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা।
সঞ্জীব বর্মন দাউদ ভাইকে নিয়ে পড়েন। 'আচ্ছা, দাউদ ভাই, আপনি রাত দুইটার দিকেই সব সময় মেইল করেন কেন'?
আমি খানিকটা শুনেছিলাম দাউদ ভাইয়ের কম্পিউটারের সঙ্গে তেমন সখ্যতা নাই। তিনি এখনও তাঁর লেখা লেখেন কাগজ-কলমে।
আমি খানিকটা শুনেছিলাম দাউদ ভাইয়ের কম্পিউটারের সঙ্গে তেমন সখ্যতা নাই। তিনি এখনও তাঁর লেখা লেখেন কাগজ-কলমে।
দাউদ ভাই অবাক হন, 'তুমি এটা জানলে কেমন করে, মানে সময়টা'?
সঞ্জীব বর্মন হেলাফেলা ভঙ্গিতে বলেন, 'এটা জানব না মানে? মেইল পাঠালে ওখানে সময় থাকে না, সব থাকে'?
দাউদ ভাই আরও অবাক, 'বলো কী'!
সঞ্জীব বর্মনের মুখে ফিচেল হাসি, 'আরে, কেবল মেইল পাঠাবার সময়ই না, ওই সময় মানুষটা কি-কি করছে তাও দেখা যায়। দাউদ ভাই চিন্তা করে দেখেন, সময়টা কিন্তু বিপদজনক, রাত দু'টো। তখন আপনি কি-কি করেন, না করেন সব কিন্তু দেখা যায়'।
এবার তিনি বলটা পাঠিয়ে দেন আমার দিকে, 'এই যে শুভকেই জিজ্ঞেস করেন না। এই শুভ, আপনি স্কাইপি-তে তিন ঘন্টা আটকে ছিলেন না'?
আমি হাসি গোপন করে বলি, 'না, ঠিক তিন ঘন্টা না, আড়াই ঘন্টা হবে'।
দাউদ ভাই চিন্তিত, 'শুভ, তাই নাকি'!
আমি মুখ যথাসম্ভব গম্ভীর করে বলি, 'না, দাউদ ভাই, ঠিক আড়াই ঘন্টাও না, দুই ঘন্টা বিশ-পচিঁশ মিনিট হবে'।
দাউদ ভাই আরও অবাক, 'বলো কী'!
সঞ্জীব বর্মনের মুখে ফিচেল হাসি, 'আরে, কেবল মেইল পাঠাবার সময়ই না, ওই সময় মানুষটা কি-কি করছে তাও দেখা যায়। দাউদ ভাই চিন্তা করে দেখেন, সময়টা কিন্তু বিপদজনক, রাত দু'টো। তখন আপনি কি-কি করেন, না করেন সব কিন্তু দেখা যায়'।
এবার তিনি বলটা পাঠিয়ে দেন আমার দিকে, 'এই যে শুভকেই জিজ্ঞেস করেন না। এই শুভ, আপনি স্কাইপি-তে তিন ঘন্টা আটকে ছিলেন না'?
আমি হাসি গোপন করে বলি, 'না, ঠিক তিন ঘন্টা না, আড়াই ঘন্টা হবে'।
দাউদ ভাই চিন্তিত, 'শুভ, তাই নাকি'!
আমি মুখ যথাসম্ভব গম্ভীর করে বলি, 'না, দাউদ ভাই, ঠিক আড়াই ঘন্টাও না, দুই ঘন্টা বিশ-পচিঁশ মিনিট হবে'।
দাউদ ভাই মহা চিন্তিত। তিনি তাঁর পছন্দের কোন একজনকে (মানুষটার পরিচয়ের বিশদে যাচ্ছি না) ফোন করেন। ফোনে কথা বলার সময় আমরা দাউদ ভাইয়ের এপাশের কথা বলা শুনতে পাই, 'না-না, আমি তো কেবল মেইল ব্যবহার করি। স্কাইপি ব্যবহার করি না'।
ফোনে কথা বলা শেষ হলে তিনি পরম আনন্দে বলেন, 'তোমরা আমাকে বোকা বানিয়েছে। ধ্যাত, খামোখা 'ডুমকফ' শুনতে হলো'।
আমি জানতে চাই, 'দাউদ ভাই, 'ডুমকফ' কি'?
তিনি হা হা করে হাসতে হাসতে বলেন, 'ডুমকফ' মানে হচ্ছে নির্বোধ।
আমি অবাক হয়ে দাউদ হায়দার নামের শিশুটিকে দেখি! হয়তো তিনি আমাদের এই নির্দোষ খেলায় উল্টো আমাদেরকেই বোকা বানিয়েছেন। সবটাই তাঁর ভান কিন্তু তাতে কী আসে যায়!
ফোনে কথা বলা শেষ হলে তিনি পরম আনন্দে বলেন, 'তোমরা আমাকে বোকা বানিয়েছে। ধ্যাত, খামোখা 'ডুমকফ' শুনতে হলো'।
আমি জানতে চাই, 'দাউদ ভাই, 'ডুমকফ' কি'?
তিনি হা হা করে হাসতে হাসতে বলেন, 'ডুমকফ' মানে হচ্ছে নির্বোধ।
আমি অবাক হয়ে দাউদ হায়দার নামের শিশুটিকে দেখি! হয়তো তিনি আমাদের এই নির্দোষ খেলায় উল্টো আমাদেরকেই বোকা বানিয়েছেন। সবটাই তাঁর ভান কিন্তু তাতে কী আসে যায়!
সুপ্রিয়দা ফোন করেন। কাজে আটকে পড়ার কারণে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। দীর্ঘ সময় ফোনে সদাশয় কিছু কথা বলেন।
ডিনার শেষ হলে একে একে সবাই, জানা, সঞ্জীব বর্মন, ফারুক ভাই বিদায় নেন। ফারুক ভাই বুকে জড়িয়ে বলেন, 'শুভ, ভাল থেকো'।
আমার মনটা অন্য রকম হয়। আমি জার্মানি থেকে কালই চলে যাব কিন্তু এই মানুষগুলোর আন্তরিকতা বিস্মৃত হবো না। আমি ভুলে গেলেও আমার মস্তিষ্ক ভুলবে না।
ডিনার শেষ হলে একে একে সবাই, জানা, সঞ্জীব বর্মন, ফারুক ভাই বিদায় নেন। ফারুক ভাই বুকে জড়িয়ে বলেন, 'শুভ, ভাল থেকো'।
আমার মনটা অন্য রকম হয়। আমি জার্মানি থেকে কালই চলে যাব কিন্তু এই মানুষগুলোর আন্তরিকতা বিস্মৃত হবো না। আমি ভুলে গেলেও আমার মস্তিষ্ক ভুলবে না।
থেকে যাই আমি এবং দাউদ ভাই। বেচারা আরাফাত-মায়াবতীদের মোমের আলোয় স্নিগ্ধ ঘরটা সিগারেটের ধোঁয়ায় অন্ধকার করতে ইচ্ছা করে না। বাইরে হিম-হিম ঠান্ডা। আমরা বাইরের ঝুল-বারান্দায় সিগারেট ধরাই। মানুষটার সঙ্গে কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে কথা হয়।
মানুষটার সঙ্গে সাবধানে কথা বলতে হবে এটা আমি ভুলে যাই। আমি আমার বই থেকে 'মুখবন্ধ' শব্দটা ভুল উচ্চারণ করায় বিকেলেই তাঁর তোপের মুখে পড়েছিলাম। আরে, কী মুশকিল! আমি কি লেখক নাকি? যে মানুষটা লোককে বলে 'লুক', পেয়ারাকে বলে 'গয়াম', এই মানুষটা ভুল উচ্চারণ করবে নাতো কে করবে? অবশ্য আমি এখনও অধ্যাপক কাম প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে [১] ছাড়িয়ে যেতে পারিনি।
মানুষটার সঙ্গে সাবধানে কথা বলতে হবে এটা আমি ভুলে যাই। আমি আমার বই থেকে 'মুখবন্ধ' শব্দটা ভুল উচ্চারণ করায় বিকেলেই তাঁর তোপের মুখে পড়েছিলাম। আরে, কী মুশকিল! আমি কি লেখক নাকি? যে মানুষটা লোককে বলে 'লুক', পেয়ারাকে বলে 'গয়াম', এই মানুষটা ভুল উচ্চারণ করবে নাতো কে করবে? অবশ্য আমি এখনও অধ্যাপক কাম প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে [১] ছাড়িয়ে যেতে পারিনি।
দাউদ হায়দারকে নিয়ে আমি কিছু লেখা লিখেছিলাম [২] [৩] [৪]। এই মানুষটাকে এবং আমাকে জড়িয়ে কিছু নাটকও হয়েছিল। প্রথম আলোর মত মিডিয়া টাইকুনও [৫] সেই নাটকের নাট্যকার ছিল। প্রথম আলো গং আমাকে খাটো করতে গিয়ে দাউদ হায়দারকে কেবল খাটোই করেনি, তাঁর প্রতি ভয়াবহ অন্যায়ও করেছিল!
আমি ববস প্রতিযোগীতা জেতার জন্য দাউদ হায়দারকে তৈল মর্দন করেছি ইত্যাদি। প্রথম আলোর অন-লাইন পত্রিকায় [৬]। এরা নিজেরাই এমন মন্তব্য করেছে এটা বোঝার জন্য রকেট বিজ্ঞানী হতে হয় না। মিডিয়ার লোকজন ব্যতীত একজন সাধারণ পাঠকের পক্ষে এটা জানাটা অবাক হওয়ার মতই ঘটনা যে দাউদ হায়দার ডয়চে ভেলের সঙ্গে জড়িত। এবং দু-জন পাঠকেরই মন্তব্যের টোনও একই রকম। একজন তবলা ধরেছেন, অন্যজন ধরেছেন গান।
এখানে অবিশ্বাস্য যেটা, সেটা হচ্ছে, এটা কিন্তু প্রথম আলোর ব্লগ ছিল না, ছিল প্রথম আলো পত্রিকা। এখানে ইচ্ছা করলেই কোন মন্তব্য করা যায় না। মন্তব্য যাচাই-বাছাই করেই ছাপানো হয়। না-হলে আমি যদি মন্তব্য করি যে, আসলে প্রথম আলোর সম্পাদক মোসাদের মি. ভক্স, এটা কি প্রথম আলো ছাপাবে?
আমি ববস প্রতিযোগীতা জেতার জন্য দাউদ হায়দারকে তৈল মর্দন করেছি ইত্যাদি। প্রথম আলোর অন-লাইন পত্রিকায় [৬]। এরা নিজেরাই এমন মন্তব্য করেছে এটা বোঝার জন্য রকেট বিজ্ঞানী হতে হয় না। মিডিয়ার লোকজন ব্যতীত একজন সাধারণ পাঠকের পক্ষে এটা জানাটা অবাক হওয়ার মতই ঘটনা যে দাউদ হায়দার ডয়চে ভেলের সঙ্গে জড়িত। এবং দু-জন পাঠকেরই মন্তব্যের টোনও একই রকম। একজন তবলা ধরেছেন, অন্যজন ধরেছেন গান।
এখানে অবিশ্বাস্য যেটা, সেটা হচ্ছে, এটা কিন্তু প্রথম আলোর ব্লগ ছিল না, ছিল প্রথম আলো পত্রিকা। এখানে ইচ্ছা করলেই কোন মন্তব্য করা যায় না। মন্তব্য যাচাই-বাছাই করেই ছাপানো হয়। না-হলে আমি যদি মন্তব্য করি যে, আসলে প্রথম আলোর সম্পাদক মোসাদের মি. ভক্স, এটা কি প্রথম আলো ছাপাবে?
অথচ দাউদ হায়দারকে নিয়ে আমি প্রথম লেখাটা লিখি ২১ ফ্রেব্রুয়ারি, ২০০৯-এ। তখন ববসের প্রতিযোগীতায় বাংলা ভাষা যোগ হবে কি না এটাই সম্ভবত ঠিক হয়নি। আর আমি যে তখন থেকেই লবিং করা শুরু করেছি এটা আমার নিজেরও জানা ছিল না!
সত্যি বলতে কি আমার এটাও জানা ছিল না দাউদ হায়দার ডয়চে ভেলের সঙ্গে জড়িত। এটা আমি জেনেছি এই সেদিন। তারপরও প্রথম আলো যে নিম্ন রূচির আচরণ করল এটা দেখে কমিউনিটি ব্লগের ঈর্ষাম্বিত চিকিৎসার বাইরের লোকজনকে দোষ দেই কোন মুখে!
পূর্বে দাউদ হায়দারকে নিয়ে আমি যে-সমস্ত লেখা লিখেছিলাম ওই সব লেখাগুলো তো তাঁর জন্য ছিল না, ছিল আমার জন্যে। তাঁর জায়গায় আমি নিজেকে কল্পনা করলে নিজেকে পাগল-পাগল লাগত।
পূর্বে দাউদ হায়দারকে নিয়ে আমি যে-সমস্ত লেখা লিখেছিলাম ওই সব লেখাগুলো তো তাঁর জন্য ছিল না, ছিল আমার জন্যে। তাঁর জায়গায় আমি নিজেকে কল্পনা করলে নিজেকে পাগল-পাগল লাগত।
তো, দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে রাজ্যের বিষয় নিয়ে আলাপ হতে থাকে। আমি তাঁর জন্য কিছু উপহারের সঙ্গে দেশের খানিকটা মাটি নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম এটা বললে তিনি বললেন, আরে, না-না, খানিকটা মাটি আছে তো আমার কাছে। অনেক পূর্বেই তিনি নাকি তাঁর জন্য দেশের একটু মাটি নিয়ে একজনকে আসার জন্য বলেছিলেন।
যাক, আমার মনের বিষণ্নতা খানিকটা কেটে গেল। আরাফাতের একটা ছোট্ট অনুরোধ ছিল আমি যেন আসার সময় দাউদ ভাইয়ের জন্য খানিকটা দেশের মাটি নিয়ে আসি। আমি আমার বাসা থেকে বেরুবার পূর্বে তাঁর জন্য খানিকটা মাটি নিয়েও ছিলাম। আমি মেইলে এই সন্দেহও প্রকাশ করেছিলাম এটা আনতে দেবে কি না। সোয়াইন ফ্লুর পর থেকে এই সব নিয়ে খুব কড়াকড়ি।
যাক, আমার মনের বিষণ্নতা খানিকটা কেটে গেল। আরাফাতের একটা ছোট্ট অনুরোধ ছিল আমি যেন আসার সময় দাউদ ভাইয়ের জন্য খানিকটা দেশের মাটি নিয়ে আসি। আমি আমার বাসা থেকে বেরুবার পূর্বে তাঁর জন্য খানিকটা মাটি নিয়েও ছিলাম। আমি মেইলে এই সন্দেহও প্রকাশ করেছিলাম এটা আনতে দেবে কি না। সোয়াইন ফ্লুর পর থেকে এই সব নিয়ে খুব কড়াকড়ি।
পরে আরাফাতই নিষেধ করেছিলেন: শুভ, অহেতুক এরা আপনাকে ঝামেলায় ফেলে দেবে। বাধ্য হয়ে ঢাকায় সেই মাটি আমাকে ফেলে দিতে হয়েছিল। দেশের মাটি প্রসঙ্গে আমার একটা লেখা ছিল, মাটি বিক্রি করব [৭]। পরে ঠিক করলাম, বাতাস বিক্রি করব [৮]। দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে এই সব হাবিজাবি বিষয় নিয়ে কথা চলতে থাকে। মানুষটা হয়তো মনে মনে ভাবছিলেন, আরে, এইটা আবার কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম!
রাত গড়ায়। আমার আবার সকালে ফ্লাইট ধরার জন্য ছুটতে হবে। দাউদ ভাই বলেন, 'শুভ, তুমি শুয়ে পড়ো। তোমাকে তো আবার সকাল সকাল উঠতে হবে। আমার কিছু লেখালেখির কাজ শেষ করতে হবে'।
আমি মনে করে দাউদ ভাইয়ের আমাকে দেয়া তাঁর বই, 'নদীর উৎস ছিল এখানে' গুছিয়ে রাখি। সকালে তাড়াহুড়োয় না-আবার বইটা ফেলে আসি। তাঁর কবিতার এই অংশ পড়ে দম আটকে আসে:
আমি মনে করে দাউদ ভাইয়ের আমাকে দেয়া তাঁর বই, 'নদীর উৎস ছিল এখানে' গুছিয়ে রাখি। সকালে তাড়াহুড়োয় না-আবার বইটা ফেলে আসি। তাঁর কবিতার এই অংশ পড়ে দম আটকে আসে:
"দোহারপাড়ার ভূগোল বলতে কিছু নেই আর-বাঁশবাগান, পঞ্চবটীর মাঠ, দিগন্তহীন পদ্মারগান, গাজনের উৎসব, এখন স্মৃতির অস্পষ্ট কোলাজ...।"
আমি মনে মনে বলি, কবি, নদীর উৎস ছিল এখানে। কোন নদীর, কবি? তোমাকে তো আমরা কোন নদী দেইনি! কোন দোহারপাড়া? তোমার জন্য আমরা তো কোন দোহারপাড়া রাখিনি!
এ বড়ো বিচিত্র দেশ! এখানে ধর্মের দোহাই দিয়ে একজন মানুষকে তাঁর মার কাছে, তাঁর দেশমার কাছে ফিরতে দেয়া হয় না। আমাদের দেশের যেসব মানুষ ধর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, এঁরা অবলীলায় কতোসব তুচ্ছ বিষয়ে ফতোয়া দেন কিন্তু দুজন নারী বছরের-পর-বছর ধরে দেশ শাসন করছেন এই বিষয়ে ফতোয়া দেয়া থেকে বিরত থাকেন। কেন যেন তখন এদের ফতোয়া ফুরিয়ে যায়!
পারতপক্ষে আমি কারও বিশ্বাস, ধর্ম নিয়ে কুতর্কে যেতে চাই না, অসম্মান করতে চাই না। কিন্তু আমরা কেন এটাও মনে রাখি না, শত-শত বছর ধরে একেকটা ধর্ম সুতীব্র বিশ্বাসের উপর টিকে আছে। কারও ধর্ম তো কাঁচের বাসন না যে হাত থেকে পড়ল আর ভেঙে চাকনাচুর হয়ে গেল! কারও নিজ ধর্মের প্রতি এমন অহেতুক ভয় থাকলে সেটা অবশ্যই দুর্বল একটা ধর্ম। সেই ধর্ম নিয়ে অযথা বড়াই করার কিছু নেই।
পারতপক্ষে আমি কারও বিশ্বাস, ধর্ম নিয়ে কুতর্কে যেতে চাই না, অসম্মান করতে চাই না। কিন্তু আমরা কেন এটাও মনে রাখি না, শত-শত বছর ধরে একেকটা ধর্ম সুতীব্র বিশ্বাসের উপর টিকে আছে। কারও ধর্ম তো কাঁচের বাসন না যে হাত থেকে পড়ল আর ভেঙে চাকনাচুর হয়ে গেল! কারও নিজ ধর্মের প্রতি এমন অহেতুক ভয় থাকলে সেটা অবশ্যই দুর্বল একটা ধর্ম। সেই ধর্ম নিয়ে অযথা বড়াই করার কিছু নেই।
দাউদ ভাই জেগে থাকেন। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। এক ঘুমে সকাল। ঘুম ভাঙে আরাফাতের কোমল ডাকে, 'শুভ উঠেন'।
আমার উঠতে ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু হোটেলে আমার লাগেজ পড়ে আছে এলোমেলো। গুছিয়ে ছুটতে হবে এয়ারপোর্টে। তীব্র অনিচ্ছায় উঠতে হয়। দাউদ ভাইকে পাই গভীর ঘুমে, মানুষটা রাতে কখন ঘুমিয়েছেন আমি জানি না। মানুষটা ঘুমের মধ্যে বিচিত্র শব্দ করছেন, শব্দগুলো ভারী বেদনার- কেমন একটা হু-হু-করা শব্দ!। কানে আটকে আছে এখনো আমার। আমি জানি না, ঘুমের মধ্যে দাউদ ভাই যে অপার্থিব শব্দ করেন এটা কী তাঁর জানা আছে! কেন করেন? তাঁর কি ফেলে আসা জন্মস্থান 'দোহারপাড়ার' কথা মনে পড়ে যায়? আমি জানি না।
আমার উঠতে ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু হোটেলে আমার লাগেজ পড়ে আছে এলোমেলো। গুছিয়ে ছুটতে হবে এয়ারপোর্টে। তীব্র অনিচ্ছায় উঠতে হয়। দাউদ ভাইকে পাই গভীর ঘুমে, মানুষটা রাতে কখন ঘুমিয়েছেন আমি জানি না। মানুষটা ঘুমের মধ্যে বিচিত্র শব্দ করছেন, শব্দগুলো ভারী বেদনার- কেমন একটা হু-হু-করা শব্দ!। কানে আটকে আছে এখনো আমার। আমি জানি না, ঘুমের মধ্যে দাউদ ভাই যে অপার্থিব শব্দ করেন এটা কী তাঁর জানা আছে! কেন করেন? তাঁর কি ফেলে আসা জন্মস্থান 'দোহারপাড়ার' কথা মনে পড়ে যায়? আমি জানি না।
টেবিলে তাঁর কবিতার বই, 'কেউ প্রতীক্ষায় নেই', পাশেই তাঁর সদ্য সমাপ্ত লেখার খসড়া। মানুষটার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য তাঁর ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছা করে না। ছোট্ট একটা চিরকূট তাঁর বইয়ে রেখে আসি, "দাউদ ভাই, গেলাম। আপনার সঙ্গে দেশে দেখা হবে, সহসাই"।
আমার মন খারাপ হয়ে যায়, কেন লিখে এলাম এই কথাটা? দেশে দেখা হবে, সহসাই। কবির সঙ্গে কী চাতুরি করলাম? না, আমার লেখালেখির শপথ, এতে এক ফোঁটা ভান ছিল না, ছিল না মিথ্যাচারের ছিটেফোঁটাও। ছিল কেবল অকল্পনীয় ভাবনা। এই গ্রহে কতশত অবাস্তব ঘটনা ঘটে আর একটা ঘটলে কী প্রলয় নেমে আসবে....!
*দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার কিছু ছবি আছে কিন্তু তাঁর নিরাপত্তাজনিত কারণে জার্মান সরকারের আপত্তি থাকায় ছবিগুলো এখানে দেয়া সম্ভব হলো না।
*বৈদেশ পর্ব, এগারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_03.html
সহায়ক লিংক:
১. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8885.html
২. দাউদ হায়দার, শুভ জন্মদিন বলি কোন মুখে: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_21.html
৩. দাউদ হায়দার, তোমার কাছে খোলা চিঠি: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_7633.html
৪. দাউদ হায়দার, তোমাকে, আবারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_20.html
৫. পরম করুণাময়, এদের ক্ষমা করো: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_22.html
৬. প্রথম আলোর চালবাজি: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-04-20/news/57539
৭.মাটি বিক্রি করব: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_15.html
৮. বাতাস বেচব: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post.html
সহায়ক লিংক:
১. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8885.html
২. দাউদ হায়দার, শুভ জন্মদিন বলি কোন মুখে: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_21.html
৩. দাউদ হায়দার, তোমার কাছে খোলা চিঠি: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_7633.html
৪. দাউদ হায়দার, তোমাকে, আবারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_20.html
৫. পরম করুণাময়, এদের ক্ষমা করো: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_22.html
৬. প্রথম আলোর চালবাজি: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-04-20/news/57539
৭.মাটি বিক্রি করব: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_15.html
৮. বাতাস বেচব: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post.html
বিভাগ
বৈদেশ পর্ব: ববস
Saturday, July 3, 2010
বৈদেশ পর্ব: এগারো
পুরস্কার দেয়ার অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। অনুষ্ঠানের কারণে এই সময়টায় ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগে অলিখিত তালা। কাজ গুছিয়ে, কাজ জমিয়ে সবাই চলে এসেছেন এখানে। বাংলা বিভাগের প্রধান আবদুল্লাহ আল ফারূক, হক, সঞ্জীব বর্মন, সাগর সরওয়ারসহ প্রায় সবাই।
সুদূর বার্লিন থেকে চলে এসেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ মান্নান, কবি দাউদ হায়দার। এসেছেন সাংবাদিক নাজমুন নেসা, সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা। আরও হয়তো অনেকে আছেন, এখন আমার নাম মনে পড়ছে না বলে ক্ষমা প্রার্থনা করি।
যে মানুষটির অনেক গল্প আজকের এই আয়োজনের পেছনে জড়িয়ে আছে, সেই দেবারতি গুহ নাই। ভাইয়ের বিয়েতে কলকাতা গেছেন। মিস করছিলাম তাঁকে।
কি বলা হবে এটা আমরা আলোচনা করে ঠিক করি। সময় মাত্র এক মিনিট, এরিমধ্যে গুছিয়ে যতটা বলা যায়। লিখে দেন দাউদ ভাই, কম্পোজ করে দেন সঞ্জীব বর্মন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
সুদূর বার্লিন থেকে চলে এসেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ মান্নান, কবি দাউদ হায়দার। এসেছেন সাংবাদিক নাজমুন নেসা, সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা। আরও হয়তো অনেকে আছেন, এখন আমার নাম মনে পড়ছে না বলে ক্ষমা প্রার্থনা করি।
যে মানুষটির অনেক গল্প আজকের এই আয়োজনের পেছনে জড়িয়ে আছে, সেই দেবারতি গুহ নাই। ভাইয়ের বিয়েতে কলকাতা গেছেন। মিস করছিলাম তাঁকে।
কি বলা হবে এটা আমরা আলোচনা করে ঠিক করি। সময় মাত্র এক মিনিট, এরিমধ্যে গুছিয়ে যতটা বলা যায়। লিখে দেন দাউদ ভাই, কম্পোজ করে দেন সঞ্জীব বর্মন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
সবাই হাসিখুশি। সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে আজ এখানে ঈদ-পূজা। কেবল আমি সিটিয়ে আছি, ভয়ে কাঠ। আমার বলার পালা যখন আসবে তখন বলতে গিয়ে কোনো একটা ভজকট করে ফেলব না তো? ঝামেলা একটা হয়ে গেলে আমার আর কী হবে, কচু? কিন্তু আমার কারণে যে দু-দেশের মাথা নীচু হবে! তখন এই লজ্জা কোথায় রাখব, কার কাছে বলব? কোথায় গিয়ে ডুবে মরব?
খানিকটা সাহস পাই, যথারীতি আরাফাত আমাকে আগলে রাখেন। নিয়ম ভেঙে আমার পাশে এসে বসেন। তিনি ননস্টপ আমার কানের পাশে অনবরত বকে যান, 'শুভ, কুল। কুল। মাথা ঠান্ডা রাখেন। একদম ঠান্ডা। দেখবেন সব ঠিকঠাক হবে, কোনো সমস্যা হবে না'।
তিনি কাগজ ঘেঁটে বের করেন আমার বলার পালা আসবে অনেকের পর অতএব খানিকটা সময় পাওয়া যাবে। আরাফাত নরোম করে বলেন, 'আরে, দেখেন না অন্যরা কি করে...'।
এরপর একেক দেশের একেকজন আসেন। এঁদের সামান্য কোন খুঁত পেলেই আরাফাত চাপা উল্লাসে বলেন, 'দেখলেন-দেখলেন, বলেছিলাম না'।
পারলে আরাফাত নিজের হাতে কিল মেরে বসেন। এখানে বসেই আমি বলার মূল অংশের সঙ্গে জার্মানি ভাষায় 'ডাংকেসুন' যার বাংলা অর্থ ধন্যবাদ যোগ করি। উপস্থাপিকার বলা বাংলায় 'দোননোবাদ' এর মতই হয়তো-বা আমার বলা ভুলভাল 'ডাংকেসুন' শোনায় কিন্তু তাতে কী!
এরপর একেক দেশের একেকজন আসেন। এঁদের সামান্য কোন খুঁত পেলেই আরাফাত চাপা উল্লাসে বলেন, 'দেখলেন-দেখলেন, বলেছিলাম না'।
পারলে আরাফাত নিজের হাতে কিল মেরে বসেন। এখানে বসেই আমি বলার মূল অংশের সঙ্গে জার্মানি ভাষায় 'ডাংকেসুন' যার বাংলা অর্থ ধন্যবাদ যোগ করি। উপস্থাপিকার বলা বাংলায় 'দোননোবাদ' এর মতই হয়তো-বা আমার বলা ভুলভাল 'ডাংকেসুন' শোনায় কিন্তু তাতে কী!
আমার পালা যখন আসে। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আমি হোঁচট খাই। দোষটা আমার না, মেঝের অদেখা অপ্রয়োজনীয় বাড়তি উচ্চতার কারণে এই সমস্যাটা হয়েছে। কিন্তু আমি এতোটাই বিব্রত হয়ে পড়ি যে আমার মাথায় সব কেমন জট পাকিয়ে যায়।
এখনো আমার কানে ভাসে আরাফাতের কথা, 'শুভ, এইটা কোন ব্যাপার না। বাংলা ভাষাও অনেকবার হোঁচট খেয়েছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে'।
আমার ঘোরলাগা এক অনুভূতি। শত-শত বিভিন্ন ভাষার মানুষদের সামনে এখানে বারবার উঠে আসছিল বাংলাদেশ, বাংলা ভাষার কথা। তখন আমার কেবল মনে হচ্ছিল, আজ আমার মৃত্যু হলেও সেটা হবে এক গভীর প্রশান্তির ঘুম। আমার মত অতি সামান্য একজন মানুষ বাংলা ভাষার জন্যে একটা ন্যানো ফোঁটা যোগ করতে পারলাম এরচেয়ে বড়ো পাওনা জীবনে আর কী হতে পারে?
আমার চোখে জল, আমি সব কেমন ঝাপসা দেখছি। আপ্রাণ চেষ্টা করছি নিজেকে সামলাতে। আমি দুর্বলচিত্তের একজন মানুষ, কাজটা আমার জন্যে বড়ো কঠিন।
এটা কেবল আমার অর্জন ছিল না, ছিল সবার। কিন্তু আমি জানি না অনেকে কেন এটাকে কেবল আমার অর্জন হিসাবেই দেখেন! হা ঈশ্বর, কেন দেখেন? প্রয়োজনে মধ্য-রাস্তায় আমাকে চাবুক মারেন কিন্তু ভাষাটাকে সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেন। এটা একটা টিম-ওয়র্ক, এখানে অনেক মানুষের মেধা-শ্রম-আবেগ-চেষ্টা-ভালাবাসা-শুভাশিস-রাতজাগা ভোর-অবহেলা-অবজ্ঞা-অপমান-অদম্য রাগ-চোখের জল মিশে আছে।
এখানে আমি কেউ না-আমি কেউ না...কেউ না...।
এটা কেবল আমার অর্জন ছিল না, ছিল সবার। কিন্তু আমি জানি না অনেকে কেন এটাকে কেবল আমার অর্জন হিসাবেই দেখেন! হা ঈশ্বর, কেন দেখেন? প্রয়োজনে মধ্য-রাস্তায় আমাকে চাবুক মারেন কিন্তু ভাষাটাকে সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেন। এটা একটা টিম-ওয়র্ক, এখানে অনেক মানুষের মেধা-শ্রম-আবেগ-চেষ্টা-ভালাবাসা-শুভাশিস-রাতজাগা ভোর-অবহেলা-অবজ্ঞা-অপমান-অদম্য রাগ-চোখের জল মিশে আছে।
এখানে আমি কেউ না-আমি কেউ না...কেউ না...।
(সবার মাঝখানে জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ মান্নান, সস্ত্রীক। কেবল একজন রাষ্ট্রদূত হিসাবে না, চমৎকার একজন মানুষ হিসাবে [১] তাঁর প্রতি আছে আমার মুগ্ধতা)
*বৈদেশ পর্ব, দশ: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_8079.html
***পুরস্কার গ্রহন নিয়ে ডয়চে ভেলের রেডিও অনুষ্ঠান: http://www.dw-world.de/popups/popup_single_mediaplayer/0,,5721397_type_audio_struct_11977_contentId_5721306,00.html
সহায়ক লিংক:
১. মাসুদ মান্নান: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_01.html
সহায়ক লিংক:
১. মাসুদ মান্নান: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_01.html
বিভাগ
বৈদেশ পর্ব: ববস
Friday, July 2, 2010
বৈদেশ পর্ব: দশ
সকালে উঠে যে একটু আয়েশ করে চায়ে চুমুক দেব সে যো নেই, সময়ের পাগলা ঘোড়া ঘাড়ের উপর বসে আছে। এখুনি ছুটতে হবে আমাকে হোটেলে, ঝাড়া দুই দিন হয়ে গেছে আমার গোসল করা হয়নি। তাছাড়া জরুরি যেটা, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে আমার খানিকটা শ্বাসকষ্টও হচ্ছিল। শ্বাসকষ্টের ওষুধ-টষুধ সব হোটেলে, গাঁটরি-বোঁচকায়।
আরাফাতেরও অফিসের তাড়া। হক নামের সদাশয় মানুষটা আমাকে হোটেলে ড্রপ করবেন। পরে হোটেল থেকে ডয়চে ভেলের অফিসে আমার যাওয়ার জন্য কেউ একজন আবারও কষ্ট করবেন। আমার ভারী লজ্জা করছিল, আমার মত একজন যাচ্ছেতাই মানুষের জন্য এঁদের কী ঝামেলাটাই না যাচ্ছে! কী করব, এতে আমার হাত কি? কারও শরীরের কোন অংশ থাকে না, আমারও একটা অংশ নাই। আমার ব্রেন নাই। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন, তাহলে তোমার লেখাগুলো কে লিখে দেয়? কেন কলম, হালের কী-বোর্ড', আমি কি আর লিখি, ছাই!
অনেকের কাছে এটা বড়ো হাস্যরসের যোগান দেয় কিন্তু আমার প্রাণ যায়। জার্মানি আসার পূর্বে দেশে আমার কিছু কেনাকাটা ছিল। ওখানেও সময়ের স্বল্পতা। আমার এক জুনিয়র বন্ধু জাকির। তার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল না কিন্তু সিনেমার মতই রাস্তায় দেখা হয়ে গিয়েছিল। তখন আমি একটা স্কুটার খুঁজছিলাম, ঢাকার স্কুটার যারা চালান তাঁরা একেকজন লাটসাহেব। জাকিরের সঙ্গে গাড়ি থাকায় অসম্ভব সুবিধে হলো। সে বলল, আলী ভাই, আজিজ মার্কেটে গেলে আপনাকে আমি নিয়ে যাই?
যাই মানে, বলে কী ব্যাটা! আমি তাকে বললাম, আমার কিছু জিনিস কিনতে হবে, তুমি সাথে থাকলে আমার সুবিধা হয়।
বেচারা মুখ শুকিয়ে বলল, আলী ভাই, আমার বউকে অফিস থেকে নিয়ে আসতে হবে। আপনি আমাকে ১ ঘন্টা সময় দেন, এই যাব আর আসব। এরিমধ্যে আপনি যা কেনার কিনে ফেলেন। রাতে কিন্তু আমরা একসাথে ডিনার করব।
আমি মনে মনে ঠান্ডা শ্বাস ফেলি, এই ১ ঘন্টা মানে তো আটটা, আটটায় তো আজিজের সমস্ত দোকান বন্ধ হয়ে যায়। তখন ওখানে আমি গিয়ে কী ঘণ্টাটা করব? আমার লেখালেখির সুবাদে আজিজ মার্কেটে আমাকে অসংখ্যবার যেতে হয়েছে কিন্তু এখানকার সব আমি গুলিয়ে ফেলি। অতীতে এই নিয়ে অনেক কেলেংকারী হয়েছে [১]।
সে আমাকে এখানে নামিয়ে দেয়ার পর সব কেমন গোলমাল হয়ে যায়। সাড়ে সাতটা বাজে, হাতে সময় মাত্র ত্রিশ মিনিট। এই অল্প সময়ে আমি কি করব, বড়ো অসহায় লাগে নিজেকে। বেরিয়ে যাওয়ার সময় দোকানদার আমাকে জানান, এই গেট এখন বন্ধ হয়ে গেছে আপনি ওই গেট দিয়ে নীচে যেতে পারবেন। আমি তাকে কাতর অনুরোধ করি, ভাইরে, কোন গেট, কি গেট বুঝতে পারছি না। আমার সঙ্গে একজন কাউকে দেন, সে কেবল আমাকে নীচে নামার রাস্তা দেখিয়ে দেবে। সেই মানুষটার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
যাই হোক, হোটেলে ফিরে খানিকটা আরামের শ্বাস ফেলি। হোটেলটাকে হোটেল-হোটেল মনে হয় না কেমন বাড়ি-বাড়ি ভাব! হোটেলটা কী নীরব! আমার ধারণা ছিল, তেমন কোন গেস্ট নেই। আমার ধারণটা ভুল, গেস্ট উপচে পড়ছে কিন্তু বাড়তি কোন শব্দ নাই। এরা দেখলাম শব্দের বিষয়ে ভারী সচেতন। কেউ গাড়ির হর্ণ বাজাচ্ছে না, বাজালে ধরে নিতে হবে সামনের গাড়িটার চালকের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করল, গালি দিল। পারতপক্ষে যেটা এরা করতে চায় না।
হোটেলের বাইরে বসার জায়গাটাও দেখলাম চমৎকার গুছিয়ে রেখেছে।
আমি আয়েশ করে বসে সিগারেট ধরাই। এখানে বসে সিগারেট খেতে কোন মানা নেই। বসে বসে চারপাশ দেখি। হঠাৎ নজর পড়ে আমার নিজের হাতের উপর। হায়-হায়, একি অবস্থা! আমি মানুষটা কালো কিন্তু এমন ঝিক কালো তো না! ঝিক কালো না বলে আলকাতরা বললে আমার জন্য বোঝাতে সুবিধে হয় কিন্তু তাই বলে আলকাতরা, ছ্যা।
চামড়া কেমন কুঁকড়ে আছে, রঙ হয়েছে আবলুশ কাঠের মত (আবলুশ কাঠ জিনিসটা আমি কখনও দেখিনি কিন্তু লেখার সময় কুচকুচে কালো বোঝাতে হলে এটা লেখার চল আছে)।
সমস্যটা খানিকটা বুঝতে চেষ্টা করি, সম্ভবত আবহাওয়ার কারণে এমনটা হয়েছে।
একটা পাখি এসে বসে। অবাক হই, যাক, এই দেশে তাহলে এখনও পাখি-টাখি আছে! দেশটা তাহলে পুরোপুরি যান্ত্রিক হয়ে উঠেনি! এই দেশে পাখি যখন আছে তখন মানুষগুলোর মনও নিশ্চয়ই পাথরসদৃশ হয়নি।
পাখিটা আমার সঙ্গে ফাজলামি শুরু করে, আমি এর ছবি উঠাবার জন্য চেষ্টা করলেই এ অন্যদিকে গিয়ে বসে।
আমি মনে মনে বলি, রসো, তুমি জার্মানির পাখি, ভাবছো তোমার বুদ্ধি বঙাল দেশের মানুষের চেয়ে বেশি?
লুকোচুরি খেলার সমাপ্তি ঘটে, পাখিটা ছবিতে আটকা পড়ে, আটকা পড়ি আমিও, দরোজার কাঁচে!
আমার মধ্যে গা-ছাড়া ভাব। তাড়া নেই। কারণ আরাফাত বলেছে, আমাকে নিয়ে যাবে। আর আমি মনে মনে বলি, আরাফাত আজ কাজের চাপে আটকা পড়ুক। অন্তত ট্রেন মিস করুক, বাস মিস করুক তবুও যেন এখুনি হোটেলে এসে না পৌঁছে। অন্য কারও কি দায় পড়েছে আমাকে নিয়ে যাওয়ার। আমি খানিকটা আলস্যে গা ভাসিয়ে দেই।
কপালের ফের, আরাফাত কাজের চাপে ঠিকই আটকা পড়েছে কিন্তু ব্যবস্থা একটা ঠিকই করেছে। মায়াবতী এসে হাজির, এই সব জটিলতায় ওর আজ ক্লাশ বাদ পড়েছে। মায়াবতী তাড়া দেয়, এখুনি আমাকে ডয়চে ভেলের অফিসে যেতে হবে।
আবারও ছুট। যেতে যেতে. হাঁটতে হাঁটতে আমি বন শহরটাকে দেখি। দেখি এখানকার লোকজনকে। কোথাও কোন অসঙ্গতি চোখে পড়ে না, চোখে পড়লে আরাম পেতাম।
আবারও চরম বিরক্তি আসে, মিডিয়া ফোরামের উপর। এরা কোন বুদ্ধিতে এতো স্বল্প সময়ের জন্য টিকেট দিল? নাকি এদের বীমা কোম্পানির সঙ্গে আঁতাত আছে? আমাকে যে আসার সময় ত্রিশ হাজার ইউরোর বীমা করতে হয়েছিল কি এই জন্যে; আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসাখাতে ব্যয় হবে! :)
এই সব পুরনো স্থাপনা আমাকে খুব টানে। আমি নিজেও থাকি প্রায় ১০০ বছরের পুরনো একটা বাড়িতে। বাড়িটা বুড়া হয়ে গেছে, অনেক যন্ত্রণা দেয় কিন্তু আমি আমৃত্যু এই বুড়ার সঙ্গে থাকতে ইচ্ছা প্রকাশ করি। আমার কেবল মনে হয়, এই বুড়ার দিকে যে রাস্তাটা গেছে এটা স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা [২]। তীব্র ইচ্ছা, এই বুড়ার কোলে মরতে চাই।
আমাদের নিজেদের কত স্থাপনা অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। পানাম নগরীতে [৩] গিয়ে আমার কান্না পেয়েছিল, হাতে ধরে আমরা আমাদের শেকড়গুলোকে কেমন করে নষ্ট করছি।
নাচঘরে আমি দেখেছিলাম গরু চড়তে। এই কষ্ট কাকে বলি, কোথায় রাখি। ময়নামতির হাজার বছর পূর্বের ইট দিয়ে দেখেছি গরুর খুঁটা বসাতে!
যাও অল্প স্থাপনাগুলো আছে সেইসব দেখার অনুমতি আমাদের মত সাধারণ মানুষদের নাই, এ এক অসভ্যতারই নামান্তর [৪]।
ব্রিটিশদের করা রেলওয়ের এই সব চমৎকার বাংলোগুলো [৫] সহসাই ভেঙে ফেলা হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
মায়াবতী আমাকে ডয়চে ভেলের অফিসে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নেন। এখানে মডারেশন নিয়ে জানা এবং আমার একটা রেডিও সাক্ষাৎকার [৬] ছিল। এই সাক্ষাৎকার নিয়ে আমি খুব একটা আরাম বোধ করছিলাম না। কারণ কমিউনিটি ব্লগে আমি দীর্ঘ সময় লেখালেখি করি না। কারণ বিবিধ। দলাদলি বিষয়টা আমার ভারী অপছন্দের। যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত [৭] দলবাজি করেন সেখানে আমার মত দলহীন একজন মানুষ এবং একটা কলাগাছের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। তাছাড়া কমিউনিটি ব্লগে একজনের অন্যজনের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা বোধ না থাকা। নো মডারেশনের নামে যা খুশি তা বলার স্বাধীনতা। কিন্তু এটা আমরা মনে রাখার চেষ্টা করি না, কলম হচ্ছে ছুঁরির মত। এখন ছুঁরিটা কার হাতে এটাও মূখ্য বিষয়। বানরের হাতে ছুঁরি থাকলে যা হওয়ার তাই হয়!
যাই হোক, যারা কমিউনিটি ব্লগে ব্লগিং করেন তাঁরা মডারেশন বিষয়ে আরও ভালো বলতে পারবেন। এবং কমিউনিটি ব্লগে যেটা আমরা মনে রাখার চেষ্টা করি না সেটা হচ্ছে ভলতেয়ারের চমৎকার সেই কথাটা:
"আমি তোমার সঙ্গে একমত না কিন্তু তোমার মত প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু লড়ব"।
*বৈদেশ পর্ব, এগারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_03.html
সহায়ক লিংক:
১. হায় ঢাকা: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_9358.html
২. বুড়া বাড়িটা: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_24.html
৩. পানাম নগর: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_10.html
৪. অসভ্যতারই নামান্তর: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_04.html
৫. 'গরিবারোগ': http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_14.html
৬. মডারেশন নিয়ে রেডিও সাক্ষাৎকার: http://ht.ly/22gl0
৭. স্যাররা, দলবাজি বন্ধ করেন: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_19.html
আরাফাতেরও অফিসের তাড়া। হক নামের সদাশয় মানুষটা আমাকে হোটেলে ড্রপ করবেন। পরে হোটেল থেকে ডয়চে ভেলের অফিসে আমার যাওয়ার জন্য কেউ একজন আবারও কষ্ট করবেন। আমার ভারী লজ্জা করছিল, আমার মত একজন যাচ্ছেতাই মানুষের জন্য এঁদের কী ঝামেলাটাই না যাচ্ছে! কী করব, এতে আমার হাত কি? কারও শরীরের কোন অংশ থাকে না, আমারও একটা অংশ নাই। আমার ব্রেন নাই। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন, তাহলে তোমার লেখাগুলো কে লিখে দেয়? কেন কলম, হালের কী-বোর্ড', আমি কি আর লিখি, ছাই!
অনেকের কাছে এটা বড়ো হাস্যরসের যোগান দেয় কিন্তু আমার প্রাণ যায়। জার্মানি আসার পূর্বে দেশে আমার কিছু কেনাকাটা ছিল। ওখানেও সময়ের স্বল্পতা। আমার এক জুনিয়র বন্ধু জাকির। তার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল না কিন্তু সিনেমার মতই রাস্তায় দেখা হয়ে গিয়েছিল। তখন আমি একটা স্কুটার খুঁজছিলাম, ঢাকার স্কুটার যারা চালান তাঁরা একেকজন লাটসাহেব। জাকিরের সঙ্গে গাড়ি থাকায় অসম্ভব সুবিধে হলো। সে বলল, আলী ভাই, আজিজ মার্কেটে গেলে আপনাকে আমি নিয়ে যাই?
যাই মানে, বলে কী ব্যাটা! আমি তাকে বললাম, আমার কিছু জিনিস কিনতে হবে, তুমি সাথে থাকলে আমার সুবিধা হয়।
বেচারা মুখ শুকিয়ে বলল, আলী ভাই, আমার বউকে অফিস থেকে নিয়ে আসতে হবে। আপনি আমাকে ১ ঘন্টা সময় দেন, এই যাব আর আসব। এরিমধ্যে আপনি যা কেনার কিনে ফেলেন। রাতে কিন্তু আমরা একসাথে ডিনার করব।
আমি মনে মনে ঠান্ডা শ্বাস ফেলি, এই ১ ঘন্টা মানে তো আটটা, আটটায় তো আজিজের সমস্ত দোকান বন্ধ হয়ে যায়। তখন ওখানে আমি গিয়ে কী ঘণ্টাটা করব? আমার লেখালেখির সুবাদে আজিজ মার্কেটে আমাকে অসংখ্যবার যেতে হয়েছে কিন্তু এখানকার সব আমি গুলিয়ে ফেলি। অতীতে এই নিয়ে অনেক কেলেংকারী হয়েছে [১]।
সে আমাকে এখানে নামিয়ে দেয়ার পর সব কেমন গোলমাল হয়ে যায়। সাড়ে সাতটা বাজে, হাতে সময় মাত্র ত্রিশ মিনিট। এই অল্প সময়ে আমি কি করব, বড়ো অসহায় লাগে নিজেকে। বেরিয়ে যাওয়ার সময় দোকানদার আমাকে জানান, এই গেট এখন বন্ধ হয়ে গেছে আপনি ওই গেট দিয়ে নীচে যেতে পারবেন। আমি তাকে কাতর অনুরোধ করি, ভাইরে, কোন গেট, কি গেট বুঝতে পারছি না। আমার সঙ্গে একজন কাউকে দেন, সে কেবল আমাকে নীচে নামার রাস্তা দেখিয়ে দেবে। সেই মানুষটার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
যাই হোক, হোটেলে ফিরে খানিকটা আরামের শ্বাস ফেলি। হোটেলটাকে হোটেল-হোটেল মনে হয় না কেমন বাড়ি-বাড়ি ভাব! হোটেলটা কী নীরব! আমার ধারণা ছিল, তেমন কোন গেস্ট নেই। আমার ধারণটা ভুল, গেস্ট উপচে পড়ছে কিন্তু বাড়তি কোন শব্দ নাই। এরা দেখলাম শব্দের বিষয়ে ভারী সচেতন। কেউ গাড়ির হর্ণ বাজাচ্ছে না, বাজালে ধরে নিতে হবে সামনের গাড়িটার চালকের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করল, গালি দিল। পারতপক্ষে যেটা এরা করতে চায় না।
হোটেলের বাইরে বসার জায়গাটাও দেখলাম চমৎকার গুছিয়ে রেখেছে।
আমি আয়েশ করে বসে সিগারেট ধরাই। এখানে বসে সিগারেট খেতে কোন মানা নেই। বসে বসে চারপাশ দেখি। হঠাৎ নজর পড়ে আমার নিজের হাতের উপর। হায়-হায়, একি অবস্থা! আমি মানুষটা কালো কিন্তু এমন ঝিক কালো তো না! ঝিক কালো না বলে আলকাতরা বললে আমার জন্য বোঝাতে সুবিধে হয় কিন্তু তাই বলে আলকাতরা, ছ্যা।
চামড়া কেমন কুঁকড়ে আছে, রঙ হয়েছে আবলুশ কাঠের মত (আবলুশ কাঠ জিনিসটা আমি কখনও দেখিনি কিন্তু লেখার সময় কুচকুচে কালো বোঝাতে হলে এটা লেখার চল আছে)।
সমস্যটা খানিকটা বুঝতে চেষ্টা করি, সম্ভবত আবহাওয়ার কারণে এমনটা হয়েছে।
একটা পাখি এসে বসে। অবাক হই, যাক, এই দেশে তাহলে এখনও পাখি-টাখি আছে! দেশটা তাহলে পুরোপুরি যান্ত্রিক হয়ে উঠেনি! এই দেশে পাখি যখন আছে তখন মানুষগুলোর মনও নিশ্চয়ই পাথরসদৃশ হয়নি।পাখিটা আমার সঙ্গে ফাজলামি শুরু করে, আমি এর ছবি উঠাবার জন্য চেষ্টা করলেই এ অন্যদিকে গিয়ে বসে।
আমি মনে মনে বলি, রসো, তুমি জার্মানির পাখি, ভাবছো তোমার বুদ্ধি বঙাল দেশের মানুষের চেয়ে বেশি?
লুকোচুরি খেলার সমাপ্তি ঘটে, পাখিটা ছবিতে আটকা পড়ে, আটকা পড়ি আমিও, দরোজার কাঁচে!
আমার মধ্যে গা-ছাড়া ভাব। তাড়া নেই। কারণ আরাফাত বলেছে, আমাকে নিয়ে যাবে। আর আমি মনে মনে বলি, আরাফাত আজ কাজের চাপে আটকা পড়ুক। অন্তত ট্রেন মিস করুক, বাস মিস করুক তবুও যেন এখুনি হোটেলে এসে না পৌঁছে। অন্য কারও কি দায় পড়েছে আমাকে নিয়ে যাওয়ার। আমি খানিকটা আলস্যে গা ভাসিয়ে দেই।
কপালের ফের, আরাফাত কাজের চাপে ঠিকই আটকা পড়েছে কিন্তু ব্যবস্থা একটা ঠিকই করেছে। মায়াবতী এসে হাজির, এই সব জটিলতায় ওর আজ ক্লাশ বাদ পড়েছে। মায়াবতী তাড়া দেয়, এখুনি আমাকে ডয়চে ভেলের অফিসে যেতে হবে।
আবারও ছুট। যেতে যেতে. হাঁটতে হাঁটতে আমি বন শহরটাকে দেখি। দেখি এখানকার লোকজনকে। কোথাও কোন অসঙ্গতি চোখে পড়ে না, চোখে পড়লে আরাম পেতাম।
আবারও চরম বিরক্তি আসে, মিডিয়া ফোরামের উপর। এরা কোন বুদ্ধিতে এতো স্বল্প সময়ের জন্য টিকেট দিল? নাকি এদের বীমা কোম্পানির সঙ্গে আঁতাত আছে? আমাকে যে আসার সময় ত্রিশ হাজার ইউরোর বীমা করতে হয়েছিল কি এই জন্যে; আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসাখাতে ব্যয় হবে! :)
এই সব পুরনো স্থাপনা আমাকে খুব টানে। আমি নিজেও থাকি প্রায় ১০০ বছরের পুরনো একটা বাড়িতে। বাড়িটা বুড়া হয়ে গেছে, অনেক যন্ত্রণা দেয় কিন্তু আমি আমৃত্যু এই বুড়ার সঙ্গে থাকতে ইচ্ছা প্রকাশ করি। আমার কেবল মনে হয়, এই বুড়ার দিকে যে রাস্তাটা গেছে এটা স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা [২]। তীব্র ইচ্ছা, এই বুড়ার কোলে মরতে চাই।
আমাদের নিজেদের কত স্থাপনা অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। পানাম নগরীতে [৩] গিয়ে আমার কান্না পেয়েছিল, হাতে ধরে আমরা আমাদের শেকড়গুলোকে কেমন করে নষ্ট করছি।নাচঘরে আমি দেখেছিলাম গরু চড়তে। এই কষ্ট কাকে বলি, কোথায় রাখি। ময়নামতির হাজার বছর পূর্বের ইট দিয়ে দেখেছি গরুর খুঁটা বসাতে!
যাও অল্প স্থাপনাগুলো আছে সেইসব দেখার অনুমতি আমাদের মত সাধারণ মানুষদের নাই, এ এক অসভ্যতারই নামান্তর [৪]।
ব্রিটিশদের করা রেলওয়ের এই সব চমৎকার বাংলোগুলো [৫] সহসাই ভেঙে ফেলা হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
মায়াবতী আমাকে ডয়চে ভেলের অফিসে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নেন। এখানে মডারেশন নিয়ে জানা এবং আমার একটা রেডিও সাক্ষাৎকার [৬] ছিল। এই সাক্ষাৎকার নিয়ে আমি খুব একটা আরাম বোধ করছিলাম না। কারণ কমিউনিটি ব্লগে আমি দীর্ঘ সময় লেখালেখি করি না। কারণ বিবিধ। দলাদলি বিষয়টা আমার ভারী অপছন্দের। যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত [৭] দলবাজি করেন সেখানে আমার মত দলহীন একজন মানুষ এবং একটা কলাগাছের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। তাছাড়া কমিউনিটি ব্লগে একজনের অন্যজনের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা বোধ না থাকা। নো মডারেশনের নামে যা খুশি তা বলার স্বাধীনতা। কিন্তু এটা আমরা মনে রাখার চেষ্টা করি না, কলম হচ্ছে ছুঁরির মত। এখন ছুঁরিটা কার হাতে এটাও মূখ্য বিষয়। বানরের হাতে ছুঁরি থাকলে যা হওয়ার তাই হয়!
যাই হোক, যারা কমিউনিটি ব্লগে ব্লগিং করেন তাঁরা মডারেশন বিষয়ে আরও ভালো বলতে পারবেন। এবং কমিউনিটি ব্লগে যেটা আমরা মনে রাখার চেষ্টা করি না সেটা হচ্ছে ভলতেয়ারের চমৎকার সেই কথাটা:
"আমি তোমার সঙ্গে একমত না কিন্তু তোমার মত প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু লড়ব"।
*বৈদেশ পর্ব, এগারো: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_03.html
সহায়ক লিংক:
১. হায় ঢাকা: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_9358.html
২. বুড়া বাড়িটা: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_24.html
৩. পানাম নগর: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_10.html
৪. অসভ্যতারই নামান্তর: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_04.html
৫. 'গরিবারোগ': http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_14.html
৬. মডারেশন নিয়ে রেডিও সাক্ষাৎকার: http://ht.ly/22gl0
৭. স্যাররা, দলবাজি বন্ধ করেন: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_19.html
বিভাগ
বৈদেশ পর্ব: ববস
Subscribe to:
Posts (Atom)






