Search

Showing posts with label নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না. Show all posts
Showing posts with label নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না. Show all posts

Sunday, May 2, 2010

নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না: ৩

সাবা বলল, ভাইয়া, যুনিপা এসেছে।
রেজা বিরক্ত মুখে বসার ঘরে বসতে বললেও মনের চাপা আনন্দ লুকিয়ে রাখতে পারছে না। এর মানে কী! এমন হবে কেন? প্রত্যেকবার কঠিন প্রতিজ্ঞা করে যুনিকে কঠিন কিছু কথা বলবে কিন্তু ও সামনে এলে সব কেমন গুলিয়ে যায়! কেন হয় এমন? কী আশ্চর্য, তখন পৃথিবীর সমস্ত বিধিনিষেধ তুচ্ছ মনে হয়। 


যুনির সঙ্গে পরিচয়টা হয়েছিল খানিকটা অন্য সূত্রে। ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে রেজা পড়াশোনাটাও চালিয়ে যাচ্ছিল। সেবার ও প্রাইভেটে মাস্টার্স ফাইনাল দিচ্ছে। একদিন বাসায় অপরিচিত একজন মানুষ এলেন। ফর্সা, চোখে কালো চশমা, হাঁটেন লাফিয়ে লাফিয়ে, যেন কাউবয়! হড়বড় করে বললেন, আপনিই রেজা সাহেব?
রেজা বলল, জ্বী।
আপনি এবার প্রাইভেটে মাস্টার্স দিচ্ছেন? 
রেজা এবার খানিকটা বিরক্ত। বিরক্তি চেপে বলল, জ্বী।

এইবার ওই মানুষটা রেজার হাত ধরে বললেন, ভাই, আমাকে একটা ফেভার করবেন। না বলবেন না, প্লিজ। আমার বউও এবার মাস্টার্স দিচ্ছে। আমি খোঁজ নিয়েছি আপনাদের প্রায় সাবজেক্টই কমন। আপনি যদি দয়া করে নোট-টোট দিয়ে সহায়তা করতেন। না-না, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না, ওই এসে আপনার এখান থেকে যা যা লাগে নিয়ে যাবে, আবার সময় করে ফেরত দিয়ে যাবে। না করবেন না, প্লিজ। আমার তো কঠিন অফিস, ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায় নইলে আপনাকে কষ্ট দিতাম না।

ওই মানুষটার বউ হচ্ছে, যুনি। এরপর থেকে যুনি সহজ ভঙ্গিতে আসা-যাওয়া শুরু করল। একটুও জড়তা নেই। মাকে অবলীলায় খালাআম্মাজান ডাকা শুরু করল। সাবার সঙ্গে খুব খাতির। রেজাকে তুমি বলা শুরু করল। একবার আসলে আর যাওয়ার নাম নেই। 
একদিন বেশ একটু রাত হয়ে গেল। সাবা না খাইয়ে ছাড়বে না। রেজার মার চোখে স্পষ্ট বিরক্তি। তিনি বিরক্তি নিয়েই বললেন, একা একা যাবে কেমন করে, তুই রিকশায় করে দিয়ে আয়।

যুনি রিকশার হুড উঠিয়ে দিল। সরে বসার জায়গা নেই, উরু ছুঁয়ে আছে। তারপরও রেজা সরে বসার চেষ্টা করতে গেলে যুনি খসখসে গলায় বলল, আহ, নড়াচড়া করছো কেন!
ঢিমেতালে রিকশা এগুচ্ছে। প্রচন্ড ঠান্ডা হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে। জমাট কুয়াশা। তিন হাত দূরের কিছুও দেখা যাচ্ছে না। যুনি তার সমস্ত শরীর দিয়ে ধরে রেখেছে। ক্রমশ যুনির শরীরের উত্তাপ রেজার শরীরে ছড়াচ্ছে। রেজা ঘোরলাগা চোখে কাঠ হয়ে বসে রইল। ওর মাথা কাজ করছিল না, শরীরে এক অন্য রকম ভাঙ্গচুর।

যুনি রিকশা থেকে নেমে গটগট করে বাসার ভেতর চলে গেল। রেজাকে ভেতরে আসতে বলা দূরের কথা ফিরেও তাকাল না। 
পরদিন রাস্তায় যুনির স্বামী জুবায়ের সাহেবের সঙ্গে দেখা। তিনি মুখ হাসি-হাসি করে বললেন, ভাই, আমি কিন্তু আপনার উপর রাগ করেছি। ওদিন বাসায় এসেও ভেতরে আসলেন না। এতো রাতে কষ্ট করে ওকে দিয়ে গেলেন কিন্তু আমাকে একটা ধন্যবাদ দেয়ার সুযোগও দিলেন না।
রেজা পূর্ণদৃষ্টিতে মানুষটাকে দেখার চেষ্টা করছিল। এই মানুষটা কী ওকে অন্য কিছু বলার চেষ্টা করছেন, মিয়া, তুমি এতো রাতে আমার বৌকে পৌঁছে দিয়ে পালিয়ে গেলে কেন? নিশ্চয়ই তোমার মনে কু আছে!

এখন বসার ঘরে যুনিকে দেখে রেজা ধাক্কার মত খেল। কামিজ পরাতেই কিনা কে জানে একে কিশোরী-কিশোরী লাগছে। কিন্তু চোখের নীচে গাঢ় কালি, অসুখ করেছে নাকি? কী ভাঙ্গাচোরাই না দেখাচ্ছে! রেজা দুঃখিত হয়ে বলল, যুনি!
যুনি ম্লান গলায় বলল, উঁ।
কি হয়েছে তোমার?
কিছু না।
বললেই হলো, তোমাকে ঝড়ো কাকের মতো দেখাচ্ছে।
দেখাক। আমি দেখতে কুৎসিত, আরও কুৎসিত দেখালে তোমার তো কোন সমস্যা নাই।
এবার রেজা হাসল, তুমি যে অসম্ভব রূপবতী এটা সম্ভবত জানো না, তোমার কেবল দোষ দেই কেমন করে। বেশীরভাগ রূপবতীই অবশ্য এটা জানে না।

যুনি এবার কঠিন গলায় বলল, এই সব কথা বলে আমাকে বোকা বানাবার চেষ্টা করবে না। আমি খুকি না। এইবার বলো এতোবার তোমাকে খবর দিলাম, তুমি দেখি একবার যাওয়া দূরের কথা, খোঁজও নিলে না, আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি এটাও জানার চেষ্টা করলে না!
রেজা বিব্রত হলো, আমি সরি, যুনি। খুব ঝামেলা গেল ক-দিন। প্লিজ মনে কষ্ট পুষে রেখো না। সরি এগেইন। তা তুমি আমাকে খুঁজছিলে কেন?

যুনি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, রেজা-রেজা, আমি আর পারছি না। এখানে আর কিছুদিন থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব। 
রেজা অবাক, কিসব বলছ, কিছুই তো বুঝতে পারছি না!
যুনি থেমে থেমে বলল, রেজা, আমি-আমি, আমি না, জুবায়েরের সঙ্গে থাকতে পারছি না। সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওকে ডিভোর্স দেব।
রেজার অজান্তেই গলার স্বর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, ক্কি, কি, কি বলছ এই সব পাগলের মতো। গড!
ঠিকই বলছি। আ ওয়্ন্ট আ বেবি, জুবায়ের কোন দিন এটা আমাকে দিতে পারবে না। আমি এখন আর ওকে সহ্য করতে পারছি না। দেখো, কোন একদিন ভয়ংকর কোন একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলব।

রেজার এটা জানা ছিল না। শুনে খানিকটা অবাকই হলো যদিও কারণ যুনি কখনও এই বিষয়ে বলেনি, আভাসও দেয়নি। তাছাড়া অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে ওর আগ্রহ খুব কম। ওর ধারণা ছিল, অনেকেই তো দেরী করে বাচ্চা নেয় এরাও হয়তো দেরী করছে। আসলে এ নিয়ে তেমন করে কখনো ভাবেনি।
সামলে নিয়ে রেজা বলল, ধুর পাগল, তাই বলে ডিভোর্স দিতে হবে বুঝি, পৃথিবীতে এমন কতই তো হয় যাদের সন্তান হয় না, নিঃসন্তান।
রেজা শোনো, অন্যরা কি করছে এ নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই, যা খুশী করুক। আমি একটা বাচ্চা চাই, ব্যস।
যুনি, তুমি এক কাজ করো না কেন, একটা শিশু দত্তক নিয়ে নাও না কেন। একটা পূণ্যও হলো, তোমারও একটা গতি হলো। 
যুনি চেঁচিয়ে বলল, চুপ, আমার নিজের সন্তান আর রাস্তার ছেলে এক হলো!
আহা, শান্ত হও, কুল। 

যুনি এবার স্থির গলায় বলল, আচ্ছা শোন, আমি তোমাকে যে জরুরী কথাটা বলতে এসেছিলাম, ফাজলামী না করে মন দিয়ে শুনবে। জুবায়েরকে আমি ডিভোর্স দেব এটা ক্লিয়ার। এখন তোমার কি মত বলো?
রেজা অবাক হলো, এটা তোমাদের পারিবারিক বিষয় এখানে আমার মতের কথাটা আসছে কেন?
কেন আসছে তুমি জানো না?
না, জানি না! প্লিজ, আমাকে বুঝিয়ে বলো।
রেজা, তুমি বাচ্চা না। দয়া করে বাচ্চার মতো আচরণ করবে না। তোমার মতটা বলো।
আমার আবার কী মত, আশ্চর্য!

যুনি এইবার পাগলের মত হয়ে গেল, না, তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত কিছু না বলবে আমি ততক্ষণ এখান থেকে একচুল নড়বো না।
প্লিজ যুনি, বাসায় যাও। কোন কারণে তোমার মন বিক্ষিপ্ত...।
যাওয়ার আগে যুনি রগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ইয়্যু ডার্টি কাওয়ার্ড, আর কখখনো আমার বাসায় আসবে না। আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করবে না। তোমাকে দেখে আমার বমি আসছে।


যুনি যাওয়ার পর রেজা হাত পা ছড়িয়ে বসে রইল। ওর মাথা এই মুহূর্তে কাজ করছে না। যুনির স্বামীটি বেকুব নাকি, এর কী এই সব জটিলতা চোখে পড়ছে না! এ কেন এখান থেকে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে না। নাকি...?

সহায়ক লিংক: 
নিষিদ্ধ জোৎস্না, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_9463.html

নিষিদ্ধ জোৎস্না,১: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_5922.html

Tuesday, April 6, 2010

নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না: ২

জুবায়ের আহমেদের বয়স চল্লিশ, দেখায় পঞ্চাশ! চুলে এখন নিয়মিত কলপ দিতে হয়। বিয়ের আগে রীতিমত সুপুরুষ ছিলেন। যুনির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে আট বছর হবে। তাদের কোন সন্তান নেই।
যুনিকে ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন হয়নি। সমস্যাটা ওর নিজের। সৃষ্টিকর্তা এমন ভয়াবহ শাস্তি কেন দিলেন, কেন-কেন? 

এ বিষয়ে যুনির সঙ্গে সরাসরি কোন কথা হয়নি। ডাক্তারের রিপোর্টটা সহজেই চোখে পড়ে এমন জায়গায় রেখে দিয়েছিলেন। বুঝতে পেরেছেন, যুনি এটা নিয়ে কোন লেডি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছে। এ নিয়ে একটা কথাও বলেনি, বললে ভালো হতো!

এরপর থেকে যুনি অবহেলা দেখাচ্ছে। এ বেদনার কথা কাউকে বলা যায় না, যুনিকেও না। কী কষ্ট, বেঁচে থাকাটা কী কষ্টের! শরীর ক্রমশ ভেঙ্গে যেতে থাকল। এখন আয়নায় নিজের ভাঙ্গাচোরা অবয়ব দেখে কাকতাড়ুয়া বলে ভ্রম হয়!
ক-দিন ধরে যুনি যাচ্ছেতাই রেগে আছে। কারণটা ঠিক ধরতে পারছেন না। যুনির সব সেরে ঘুমাতে রাত হয়, ওর আবার পরিষ্কার বাতিক আছে। জুবায়ের রাত জাগতে পারেন না, সকালে অফিসও থাকে। ঘুম আসছিল না বলে শুয়ে শুয়ে বই পড়ছেন।

যুনি শোবার ঘরে ঢুকেই চোখ-মুখ শক্ত করে বলল, কি ব্যাপার, জেগে আছে যে বড়ো?
ঘুম আসছে না।
কিছু চাও?
নাহ, তোমার কাজ শেষ?
যুনির কাটা-কাটা গলা, আমার কাজ শেষ না শুরু এটা জেনে তো তোমার কোন লাভ নাই। মুখ ফুটে বলো, লজ্জার কিছু নেই। বলো তো এখুনি কাপড় খুলি?
জুবায়ের ভাঙ্গা গলায় বললেন, না।

না বলতে তাকে মনের সঙ্গে যুজতে হয়েছে। নির্লজ্জের মতো হ্যাঁ বলে ফেললে কী হয়! বলা যায় না, প্রবল জৈবিক চাহিদা কর্পূরের মত উবে যায়।
যুনি নির্বিকার, শোন, তোমার যখন প্রয়োজন হবে, বলবে, বুঝলে। চাইলেই কাপড় খুলব, সমস্যা নাই। এটা বলার অধিকার তোমার আছে। তুমি তো আমার সোয়ামি। কি ঠিক বলিনি?
জুবায়ের মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, চোখ ভরে আসছে। বুকে কেমন চাপা কষ্ট, পুরোটা শ্বাস নিতে পারছেন না। এমন একটা গোপন জায়গায় আঘাত, সহ্যাতীত মনে হচ্ছে।

যুনি চেঁচিয়ে বলল, চুপ করে আছো কেন, কি, ঠিক বলিনি?
জানি না।
জানো না, তুমি দেখি কচি খোকা, নাক টিপলে দুধ বের হয়।
প্লিজ যুনি, চুপ করো।
তুমি চুপ করো। এ্যাহ, আমাকে আবার ধমক দেয়।
কি হয়েছে তোমার, কোন কারণে আমার উপর রেগে আছ?
যুনি হিসহিস করে বলল, রাগ করব তোমার উপর। দুনিয়ায় কী আর কুকুর-বেড়াল নাই!
কোন কারণে তুমি উত্তেজিত হয়ে আছে, প্লিজ শুয়ে পড়ো।
খবরদার লেকচার দেবে না। আমার ইচ্ছা হলে ঘুমাব, ইচ্ছা না হলে ঘুমাব না। তোমায় বলতে হবে নাকি!

জুবায়ের কম্বলে মুখ ঢেকে অন্য পাশে শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদলেন। এক খাটে শুয়েও দু-জন দু-ভুবনের বাসিন্দা। বিয়ের পর যুনি এমন ছিল না। ওর জন্য ছিল গাঢ় ভালোবাসা। একটা সন্তানের তীব্র আকাঙ্খা ওকে এমন হৃদয়হীন, ঝগড়াটে বানিয়ে দিয়েছে। বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো, পৃথিবীতে কত অনাকাঙ্খিত শিশু জন্ম নিচ্ছে। কত শিশুকে পাথর হৃদয়ে আবর্জনায় ফেলে দেয়া হচ্ছে। নিয়তির কী পরিহাস, এ পরিবারে কোন শিশু আসবে না। কি হয় একটা শিশু এলে? হোক না অসুন্দর, বিকলাঙ্গ। এই সব আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছেন, এক ফোঁটা ঘুম নেই। ঘুমের এ সমস্যাটা নতুন। একবার ঘুম না এলে আর ঘুম আসতে চায় না।

শোবার ঘরে নরোম আলো। সব কিছু কেমন তমোময়-অবছা দেখাচ্ছে। মাঝখানে প্রচুর জায়গা ছেড়ে অন্য পাশে যুনি ঘুমাচ্ছে। একে এখন কেমন অন্য ভুবনের মেয়ে মনে হচ্ছে। পেছন ফিরে আছে বলে মুখ দেখা যাচ্ছে না। ছায়া-ছায়া অন্ধকারেও ওর শরীরের চড়াই-উৎরাই গোপন থাকেনি। জুবায়ের নিঃশব্দে ঢোক গেলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। কেন যেন মনে হচ্ছে তার এই ঢোক গেলার শব্দ এ শহরেরর সব কটা মানুষ জেনে গেছে!
ঘোরলাগা চোখ ফিরিয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এসেছে। ভেতরের অপার্থিব শক্তিটা স্পষ্ট টের পাচ্ছেন।

জুবায়ের যুনির গায়ে হাত রাখলেন। কী আশ্চর্য, এ জেগে ছিল নাকি! যুনি এদিক না ফিরেই বলল, চোরের মত গায়ে হাত দিচ্ছ কেন? তোমাকে তো বলেছিই যখন চাইবে তখনই। কি বলিনি?

জুবায়ের অন্য রকম গলায় বললেন, প্লিজ যুনি, প্লিজ।
যুনি সাড়াশব্দ করছিল না। যুনির একবার মনে হচ্ছিল বিপদজনক আদরে ভেসে যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে ভাবতে চেষ্টা করছিল নিরীহ এই লোকটার অন্য এক অবয়ব। এ কে, কদাকার একটা পশু। যে ছিন্নভিন্ন করবে ওকে, খুবলে অনাদরে ফেলে দেবে। লোকটার মন খারাপ করা আকুতি মস্তিষ্ক অন্যভাবে গ্রহন করবে কি, করুক-করুক, অবশ্যই করবে, করতেই হবে। জুবায়ের সরে যেতে যুনি হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।

যুনি কেমন শক্ত হয়ে আছে। জুবায়ের মনে হচ্ছে একটা ঠান্ডা লাশ ধরে আছেন। শিরদাঁড়ায় বরফ ঠান্ডা ঘাম, অপার্থিব শক্তি মিইয়ে গেছে। এমন একটা লাশের সঙ্গে আর যাই হোক ভালোবাসা-বাসি চলে না।
অন্য একটা প্রলয়ঙ্করী শক্তি মাথা চাড়া দিচ্ছে, ভয়াবহ একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে! এভাবে বেঁচে থাকার কোন মানে হয় না!



*নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না: ১

Sunday, April 4, 2010

নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না: ১


যুনি একগাদা কাপড়ে সাবান লাগাচ্ছে। এগুলো ধোয়ার প্রয়োজন ছিল না, করার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছিল না, মাথায় কেমন ভোঁতা যন্ত্রণা হচ্ছে। শরীর খারাপ-টারাপ কিছু না, রাগ করে নাস্তা বানায়নি। জুবায়ের যে বাজার থেকে নাস্তা নিয়ে এসেছে তা টেবিলেই পড়ে আছে, ছোঁয়ও নি!

কি করবে বুঝে উঠতে পারছে ন, কেরোসিন ঢেলে সব জ্বালিয়ে দেবে, নিজেকেও? কোথায় গেলে খানিকটা শান্তি পাওয়া যাবে? ওর যাওয়ার যে কোন জায়গাও নাই। জন্মের পরই মা মারা গেলেন, বাবাও ওর বিয়ের পর মার পিছু পিছু চলে গেলেন! আপনজন বলতে বড় ভাই। ও বাড়িতে যেতে ইচ্ছা করে না। ভাবি অসমান দাঁতের ফাঁক দিয়ে এমনসব জঘণ্য কথা বলেন, দমবন্ধ হয়ে আসে। ওর বিয়ের পর একবার বেড়াতে এসেছিলেন। আসার দু-মিনিটের মধ্যেই বললেন, এই মেয়ে, তোমার পোলাপাইন হয় না ক্যান?
যুনি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিল। ওর কল্পনাতেও আসছিল না কেউ এভাবে বলতে পারে!
ভাবি আবারও বললেন, কথা কও না ক্যান, তুমি বাঁজা নিহি?
যুনি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ভাবি, আপনি এই সব কী বলছেন!
মিছা কইলাম? এত্তো বছর হইল একটা পোলাপাইন হইল না, মিছা কইলাম, বাঁজা না তো কী!
ভাবি, চুপ করেন।
চোখ রাঙায়ো না। বাঁজা মাইয়্যা আমার দুই চোকখের বিষ। হেগো মুখ দেখলে দিনডাই মাডি।
আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, এক মুহূর্ত না, এক্ষুণী চলে যান।
মহিলা নির্বিকার, এই কথা তুমি কইলে তো হইব না। বানের জলে ভাইসা আসি নাই, তুমার জামাই দাওয়াত দিয়া আনছে। দুই দিন পর তুমার ভাই আইসা লইয়া যাইব তখন যামু গা। যাওয়ার আগে ছ্যাপ দিয়া যামু, আমার ঠ্যাঙডাও তুমার এইহানে আইত না। বাঁজা মানু দেখনের হাউস আমার নাই।

ওই দু-দিন যুনির জন্য ছিল নরকবাস! বাবা বড়ো শখ করে গ্রামের মাদ্রাসা পাশ নিরক্ষর মেয়েকে বউ করে এনেছিলেন। এর নমুনা হচ্ছে ভাবি।

জুবায়েরের কথা মনে হতেই যুনির চোখে জল এসে পড়ে, এই মানুষটার উপর বড়ো অবিচার করা হচ্ছে। লোকটার জন্য কী মায়াই না হয়, অথচ সামনে এলে সব কেমন এলোমেলো হয়ে যায়, তখন মাথায় সমস্ত রক্ত জমা হয়!
জমিলা বেগম হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বললেন, বৌমা, কাপড় ধুচ্ছো! তোমার না শরীর খারাপ, এইটুকুন পথ আসতেই তাঁর বুকে হাঁপ ধরে গেছে।
যুনি মুখ না তুলেই বলল, দেখতেই তো পাচ্ছেন।

যুনির রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। অসুখের কথা জিজ্ঞেস করছেন হাসি-হাসি মুখ করে। যেন এতে তিনি ভারী আনন্দিত।
জমিলা বেগম আবারও বললেন, হয়েছে কি তোমার, গা গুলাচ্ছে?
আমার কিছু হয়নি, যান এখান থেকে।
তুমি ভাল মুখ করে কথা বলতে পারো না?
আম্মা, আপনি খুব যন্ত্রণা করেন। আমার মুখ খারাপ, ভাল করে কথা বলতে পারি না, হয়েছে! যান এবার এখান থেকে।

জমিলা বেগম পা টেনে টেনে নিজের ঘরে ঢুকলেন। অনেকক্ষণ দ্রুত নিঃশ্বাস ফেললেন। শরীর গেছে। এভাবে বেঁচে থাকার কোন মানে হয় না, আর বাঁচার সাধও নাই। কিন্তু এই-ই নিয়তি, শকুনের মতো বেঁচে থাকতে হবে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত! কালই ধর্মপুস্তকে একাগ্রতা নিয়ে পড়ছিলেন, এমন একটা সময় আসবে মানুষ তীব্র আকাঙা নিয়ে মৃত্যু চাইবে কিন্তু তাকে তখন মৃত্যু দেয়া হবে না।
বউয়ের সঙ্গে রাগারাগি করে চলে আসা ঠিক হয়নি। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে পাকা খবরটা নিয়ে আসা প্রয়োজন ছিল।
ওঁর দৃঢ় বিশ্বাস এতো দিনে আল্লাহ মুখ তুলে চেয়েছেন। সকালে জুবায়ের বউয়ের শরীর খারাপ বলে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছিল বলে তখনই তার মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। তিনি হড়বড় করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিরে, বউ কি বমি-টমি করছে নাকি? জুবায়ের তাড়াহুড়োয় কি বলে গেল, হ্যাঁ-ই তো বলল। জুবায়ের যাওয়ার পর দু-রাকাত নফল নামাজ পড়েছেন।

দুপুরে যুনি খাবার নিয়ে এলো। তিনবেলার খাবার এই ঘরেই দেয়া হয়। জমিলা বেগম স্নিগ্ধ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, শরীর খারাপ নিয়ে রান্না করেছো, বউ। কাউকে পাঠিয়ে বাজার থেকে কিছু আনিয়ে নিতে।
যুনি উত্তর দিল না। কথা বললেই এই মহিলা একগাদা কথা বলবেন। কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। ক্লান্ত লাগছে, বড়ো ক্লান্ত!
বৌমা, একটু বস না আমার কাছে।
কি বলবেন বলেন, কাজ ফেলে এসেছি।
ঘরে তেঁতুল আছে?
জ্বী না।
কাউকে পাঠিয়ে বাজার থেকে আনাও তো।
তেঁতুল দিয়ে কি করবেন!
আচার বানাবো।
কেউ ভুলেও টক খায় না, কি করবেন আচার দিয়ে? আপনি খাবেন?
না গো মা, তুমি খাবে। তোমার না গা গুলাচ্ছে।
কেন মা, বানিয়ে বানিয়ে বলেন। কে বলেছে আমার গা গুলাচ্ছে, আমি বলেছি?
অমা, বমি-বমি ভাব হচ্ছে না!
যুনি এবার তীক্ষ্ণ গলায় বলল, মানে! অ, এই ব্যাপার! এই জন্যই ইনিয়ে-বিনিয়ে ফেনাচ্ছেন। আপনার তাহলে ধারণা দাদি হচ্ছেন?
জমিলা বেগম ভাঙা গলায় বললেন, তাহলে কি বৌমা-?
জ্বে না আম্মাজান, কোন দিন হতে পারবেন না। কেন? এটা আপনার ছেলেকে জিজ্ঞেস করবেন।

জমিলা বেগম স্তব্ধমুখে বসে রইলেন। কী বোকা তিনি, সকাল থেকেই কী আনন্দই না হচ্ছিল। আজই মনে হচ্ছিল: যে শিশুটা আসছে তার জন্য সীমাহীন শারীরিক যন্ত্রণা নিয়েও, ওকে দেখার জন্য কিছুদিন বেঁচে থাকা যেতে পারে।
বৌমা, তোমরা কষ্ট পাবে বলে কোন দিন জানতে চাইনি, তাহলে কি, তাহলে কি-। না-না, তা কি করে হয়!
যুনি কাঁপতে কাঁপতে বলল, জে আম্মাজান, তাই হয়! দোষটা আপনার ছেলের। পুরুষ মানুষের আবার দোষ কী, পুরুষ মানুষ হচ্ছে বটগাছ। সোনার আঙটি বাঁকা হলেও সোনার আঙটি! ছেলের আরেকটা বিয়ে দেন, ছেলে তো সোনার হাস!
জমিলা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন, এই সব বলো, বলো না। আহ, কী কষ্ট!
যুনি থামল না, আপনিই পৃথিবীর সব কষ্ট নিয়ে বসে আছেন। আমার কোন কষ্ট নাই। আমি খুব আনন্দে আছি, না? কী আনন্দ আমার, নেচে নেচে গাইতে ইচ্ছা করে।

যুনি আরও শক্ত কথা বলার জন্য প্রস্তত হচ্ছিল। শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারল না। এই মহিলার কী অপরাধ- সত্যিই তো, ভুলেও কোন দিন এই নিয়ে কটু কথা দূরে থাক, জানতেও চাননি।
যুনি বিছানায় ঝাপিয়ে অঝোরে কাঁদল। হোক বিকলাঙ্গ, তবুও একটা শিশু আসুক।
WhatsApp