Thursday, October 17, 2019

মাকাল ফল এবং অন্যান্য...।

এসপি মহোদয় বললেন, আবরারের পরিবার [১] জামায়েত-শিবির:
পুলিশ যখন জামায়েত শিবির ট্যাগ লাগিয়ে দেয় তখন সেই সাবজেক্ট বাঁচলেই কী আর মরে গেলেই কী! এই নিয়ে আমরা গা করি না। পুলিশ তাও একজন এসপি যখন এমনটা বলেন তখন অবিশ্বাস করার কিছু নেই। কিন্তু জামায়েত-শিবিরের একটি পরিবারকে তো আর প্রধানমন্ত্রী বুকে টেনে নেবেন না!

পুলিশের পক্ষেই বলা সম্ভব দুই মিনিটের মধ্যে জানাজা শেষ করার জন্য:

এ-ও সত্য পুলিশ ইচ্ছা করলে কী না পারে:

এই-্ই এক দেশ!  এখানে অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা স্যারদের জরুরি অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা-সাহস-ক্ষমতা-মেরুদন্ড-ইয়ে নেই। এরা ইয়ের পানে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। যেমনটা বুয়েটের ভিসি মহোদয়!


কিন্তু সায়ীদ স্যার কেবল শাড়িতেই [২] মুগ্ধ হন না, বুয়েটের ভিসি নিয়েও:


এবার অন্য প্রসঙ্গ। অবিশ্বাসের চোখে মাকাল ফল নিয়ে অনেক উদাহরণ শুনেছি। সামনাসামনি যখন দেখেছি তখন অবলীলায় বিশ্বাস করেছি...:


সহায়ক সূত্র:
১. আসেন একটু...https://www.ali-mahmed.com/2019/10/blog-post_10.html 
২. শাড়ি...https://www.ali-mahmed.com/2019/09/blog-post_9.html

Friday, October 11, 2019

তেলাপোকা যেমন আছে...।






"ফাহাদ আবরার তার সর্বশেষ স্ট্যাটাসে যা লিখেছে, আমি তা লিখি নাই। কারণ আমি ভীতু, সুবিধাবাদী, এবং 'বয়েলিং ফ্রগ সিনড্রোম '-এর কারণে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া কনফর্মিস্ট। নিউক্লিয়ার ওয়রের পরেও শুয়োরের মত ঘোঁত ঘোঁত করে আমি বেঁচে থাকবো। তেলাপোকা যেমন আছে।

আমাকে মারতে পারবেন না, কারণ আমি কথা বলি না, বাসে চড়ি না, মিছিলে হাঁটি না, স্ট্যাটাস লিখি না, পেঁয়াজ খাই না, বাঁশের কেল্লা পেইজেও যাই না। চুপচাপ বিবরবাসী হয়ে আছি। মুখে জিপার আঁটা, তাই এই রিজাইমে যেমন সমস্যা নাই, অন্য রিজাইমেও বেঁচেবর্তে থাকবো সহিসালামতে। খোদা উঠায়া না-নিলে এই রাজনীতির জন্য আমি ন হন্যতে!

এমনি এক জীবন-ধারণের স্ট্র্যাটেজি নিয়েছি। তো, আমাকে মারবেন কী প্রকারে?
কিন্তু এইসব ফাহাদ আবরার যখন মরতে থাকে, আমার দেহকোষগুলো আমাকে কামড়াতে থাকে। আমার ক্রিটিক্যাল চিন্তা, আমাকে চাবকাতে থাকে। আমি তবু অবিচল থাকি। চোখ বন্ধ করে রাখি। মনে মনে বলি, এটা এক্সেপশন। র‌্যানডম একটা ঘটনা।

কিন্তু কেমন হবে যদি আমার সন্তান এমনি একটা ঘটনার র‌্যানডম স্যামপ্লিং হয়ে ওঠে? আমার বন্ধ চোখের সামনে এমন একটা অ্যানিমেটেড দৃশ্য হাজির হয়, যেখানে আমার সন্তানও বিশ্ববিদ্যালয় নামক টর্চারসেলে তার সহপাঠী নামধারী কিলারদের হাতে মরে যায়! তার লাশ রিসিভ করার জন্য আমাকে খবর দেয়া হয়। আর তখনি আমি প্রাণপণে মরতে চাইতে শুরু করি। তাৎক্ষণিকভাবে, আমার এই সুবিধাবাদী অমরতার শেল ভেঙ্গে মরে যেতে চাই। যাতে ওর লাশ আমাকে রিসিভ করতে না হয়। যাতে আমার বেদনা এইসব টিভি ক্যামেরা আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভোগ্য না হয়ে ওঠে।

ফাহাদ আবরার তো মরেছে। কিন্তু দৈত্যটাকে আবার বোতলে ভরতে পারবেন তো?"

Thursday, October 10, 2019

আসেন একটু 'গফ' করি...।

যেহেতু এটা পত্রিকা অফিস না তাই গফ-গল্প করলে খানিকটা আঞ্চলিকতার টান থাকাটা খুব একটা দোষের কিছু না। ওহ, 'গফ' করলে তো একটা টপিক লাগে, লাগে না?

বুয়েটের আবরার নামের যে ছেলেটাকে তারই সহপাঠিরা পিটিয়ে মেরে ফেলল এই নিয়ে দেশ দেখি উত্তাল। ক্যান রে ভাই, তাল-উত্তাল ক্যান! এইটা কী এই 'পরথম'? নাকি পিটাপিটি যারা করল তারা ক্ষমতাশীন দলের ছাত্রলীগের বলে? শোনেন, এইটা আপনাদের মানায় না, বুঝলেন। আপনি এই দেশের বুদ্ধিজীবী-উইটিবি হলে না-হয় একটা কথা ছিল। কারণ, এরা রঙিন একটা চশমা লাগিয়ে রাখেন- কিছু একটা হলেই বলেন: উ-ই-ই মা, এতো আগে জানতুম না। যেন বুদ্ধিজীবী নামের ওই বি...হীন মানুষটা এই দেশে না, মঙ্গলগ্রহে বসবাস করেন।

ওহো, রঙিন চশমার বিষয়টা এইখানে খানিকটা ভুল বলেছি, সাদা চশমা লাগিয়েও ওই কাজটা অবলীলায় করা যায়। এই যেমন দেখুন আমাদের দেশের একজন সাহিত্যিক মহোদয় সাদা চশমা লাগিয়েও দেশে কোন সমস্যা দেখতে পাচ্ছেন না:

মিছরি মেশানো যে লেবেনচুষ আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়, শিবির বলে যে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেল আর জঙ্গি বলে গুম। ব্যস, খেল খতম। আমরা অজান্তেই সেই খেলার আমোদপ্রিয় দর্শক হয়ে পড়ি।


তসলিমা নাসরিন যখন এমন একটা লেখা লেখেন তখন আমরা গা করি না কারণ উম্মাদের[৪] সব কথা ধরতে নেই কিন্তু ...এসপি মহোদয়ের কথার অর্থ কী! আবরারের পরিবার জামায়াত-শিবির! ধরে নিলাম, জামায়েত শিবির। তো? এই দোহাই দিয়ে আপনি একটা ছেলেকে মেরে ফেলাটা জাস্টিফাই করছেন!
ওহে এসপি, মহোদয়, নীচের এই ভিডিও ক্লিপটা, এইটা যদি আপনের বাপ হইত তখনও কী আপনার বক্তব্য এই-ই থাকত নাকি খানিকটা বদলে যেত?



আবরারের যে স্ট্যাটাসটা ফেনি নদীর পানি সংক্রান্ত... ফেনি নদীর পানি  দেওয়ার কী আছে এই নদী থেকে ভারত তো চুক্তির আগেও পানি নিত। হুদাহুদি...!
    
আর র‌্যাগিংয়ের নামে অত্যাচার করাটা তো নতুন কিছু না। এদের মন-মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বিরুদ্ধাচারণ মানেই জামায়েত-শিবির। ওইটা তখন আর একটা মানুষ না। মারো-কাটো-বাটো, কোনও সমস্যা নাই! পোলাপানরা এই-ই করে-করে হাত পাকায়। কচু গাছ কাটতে-কাটতে ডাকাত। এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাম হাতটা যথারীতি বেশি পাকায় দলীয় পান্ডারা: 




আগেও নানা সময়ে পেটানোর  ঘটনা ঘটেছে এমন প্রশ্নের উত্তরে শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ বলেন, "...কোনো শিক্ষার্থী আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ করেনি যে তারা নির্যাতিত হয়েছে"
এই এক চুতিয়ামার্কা কথাবার্তা। আমাদের দেশের বিভিন্ন পেশায় আমাদের বেতনভুক্ত কর্মচারীরা এই কথাটা খুব বলেন। ডিসি সাহেব বলেন, ওসি সাহেব বলেন, ছলিমুল্লা সাহেব বলেন...। এই যেমন অন্য এক প্রসঙ্গে দাউদকান্দি থানার ওসি বলেন, ‘বিষয়টি পুলিশের জানা ছিল না। কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে[২] 
অভিযোগ করতে হবে কেন! যেখানে অসঙ্গতি দেখা যাবে সেখানেই ব্যবস্থা নেবেন। ছদুমদুর কথা- অভিযোগ দিয়ে কল্লা হারায় আর কী! এদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো কোন ঘটনা ঘটলে অভিযোগ না-দিলে এরা কেউ নড়বেন-চড়বেন না। এখন ধরুন কেউ যদি এতিম কোন মানুষকে খুন করে ফেলে [৩] তাহলে তাকে ধরাধরির কোন বালাই নেই কারণ ব্যাটা তো এতিম তার উপর মাটির নীচে এমন ভঙ্গিতে শুয়ে আছে যে নড়াচড়ার নিয়ম নাই। অভিযোগ করবেটা কে শুনি? ব্যস, মামলা ডিসমিস।

আবরার খুন প্রসঙ্গে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর হেডলাইন, 'পুলিশ জেনেও তৎপর হয়নি''। ওয়াল্লা, এইটা কী নেপচুন গ্রহের 'পরতিকা'? এরা কী জানে না পুলিশ দুদ্দাড় করে হল-বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়লে সে যে এক আরেক কাহন। এই দেশে ক্ষমতাশীন দলের সাধারণ কোনও-এক পাতি নেতাও পুলিশ অফিসারকে চড় মারে। আইজিপিকে বলে ভাই...।
এইটা হচ্ছে আমাগো জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার টিজার। 'আবরারের মায়ের আকুতি। ভিডিও দেখতে কিউআর কোডটি স্ক্যান করুন'। মতি মিয়া স্যারের কাছে সবই পণ্য!

এই খুনের প্রসঙ্গে প্রভোস্ট-ট্রভোস্ট, প্রক্টর-ট্রক্টর গ্যাম্বলের দিকে আঙ্গুল তোলার পূর্বে অন্য একটা গফ বলি। আমাগো সমুদ্রজয়ের পর-পরই ঠিক করা হলো এটার একটা 'ছেলিব্রেশন' করা হবে। এই কর্মকান্ডে তো একটা কমিটি করা লাগে। সেই কমিটির জন্য কিছু সদস্যও তো করা লাগে। মাত্র ৫০১ জন সদস্য করা হয়েছিল। সেই সদস্যদের মধ্যে আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী মহোদয় ছিলেন[১]। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি জনাব, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক মহোদয়ও ছিলেন। আচ্ছা, কইনছেন দেহি, ২২ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর পিতা এই ভিসি মহোদয়ের এই-ই তাহলে কাজ ! এ যে এক অভূতপূর্ব!

এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের বুয়েটের উপাচার্য সাইফুল ইসলাম ছায়েব আবরারের জানাজায় পাঁচ মিনিট সময় দিতে পারেন না কারণ তখন তিনি আমাগো স্টারের স্টার মিনিস্টারের সঙ্গে 'সিটিংমিটিং'-এ ব্যস্ত ছিলেন।

আবরারকে খুন করার পর খুনিরা বসে আরামসে ফুটবল খেলা দেখছিল। চমকে গেলেন কী! আহা, এ তো বিচিত্র কিছু না। আপনের-আমার ছেলে-মেয়েটা যখন ফেসবুক ওরফে 'প্যাচবুকে' 'এস্টেটাস' প্রসব করে, "আমার মা আইসিওতে আছে তার জন্য ব্রো-সিস তুমরা প্রেয়ার করবা"। বলেই আর 'দিরং' করে না বাইরে কোথাও বসে-বসে লাইক আর কমেন্টের উত্তর দিতে গিয়ে পেছনের ঢোলা প্যান্টের ফাঁক গলে পাছা উদোম হয়ে পড়ে। কই, তখন তো আপনার-আমার গাত্রদাহ হয় না। আপনি-আমি তো তখন 'এস্মার্ট পুন' হাতে 'এস্মার্ট পুত' বলে মুত আটকে তিন উল্লাস করি। তো, লাগাইবেন ধুতরা গাছ আর ফল চাইবেন আপেল- ভাইরে, এইটা তো একটা 'ছইয়েরালি' মার্কা কথাবার্তা।
এরা যে রাগের মাথায় এই কান্ড করেছে এমন না, আগে থেকে আটঘাট বেঁধে... :

ভিন্ন মত প্রকাশে আমাদের সহিষ্ণুতার অভাব প্রকট। ভুল ম্যাসেজ কেমন করে যায় তার একটা উদাহরণ:

আমাদের দেশে দল করে-করে কেমন করে একটা মানুষ দলবাজ হয়ে পড়ে এর একটা ছোট্ট উদাহরণ:

যাই হোক, খুনিদের অনেককেই ধরা হয়েছে।
ধরা হয়েছে এ সত্য কিন্তু এ নিয়ে আমাদের মত বেকুবদের খুব একটা উচ্ছাস নেই কারণ আবু বকর খুনের মামলার রায়ে যেভাবে ছাত্রলীগের সব আসামী খালাস হয়েছিল এ ক্ষেত্রেও এমনটা হওয়া চিত্র-বিচিত্র কিছু না। সব সম্ভবের দেশ এটা! ক্যান রে ভাই, বিশ্বজিতের খুনিদের এখনকার অবস্থা জানেন না?

আসলে গোটা দেশটাই ডুবে আছে ফরমালিনে। এই তরল পদার্থটা সরিয়ে ফেলা মাত্র  বিকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে সবখানে...।    

সহা্য়ক সূত্র:
৩. এতিম: https://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_11.html
৪. তসলিমা...https://www.ali-mahmed.com/2019/08/blog-post_28.html

...
যে কথা লেখার শুরুতে বলছিলাম, এ পৈশাচিকতা নতুন না:
BUETian - বুয়েটিয়ান: "মারপিটে অংশগ্রহণকারীঃ
১। শুভ্র জ্যোতি টিকাদার (https://www.facebook.com/shuvrajyoty)
২। সিয়াম, ০৯ ব্যাচ (ডিস্ট্রাকটিভ সিয়াম নামে পরিচিত) (https://www.facebook.com/destructive.seeam)
৩। শুভম, ০৯ ব্যাচ (সিগমাইন্ড নামে এক কোম্পানি খুলেছে সে আর সিয়াম মিলে) (https://www.facebook.com/abushuvom)
(https://facebook.com/sigmindAI/)
৪। কাজল, ০৯ ব্যাচ (https://www.facebook.com/arifurkajol)
৫। রাসেল, ১০ ব্যাচ (পরবর্তীতে অনুতপ্ত হয়ে তাবলীগে যোগ দিয়েছে)
৬। কনক, ১০ ব্যাচ ( সাবেক সাধারণ সম্পাদক, শিক্ষক লাঞ্ছনার দায়ে বহিষ্কৃত) (https://www.facebook.com/konok.ahmed.5)
৭।টি আর, ১১ ব্যাচ (আসল নাম তানভির রায়হান) [https://www.facebook.com/tanvir.d.rayhan]

আমাকে তিতুমীর হলের ২শত ব্লকে '১০ ব্যাচের প্রতীকের রুমে ডেকে নিয়ে যায় ১২ ব্যাচের আনিস। আমার কোন ধারণাই ছিলনা কেন ডাকা হয়েছে। সেখানে ০৯ এর শুভ্র টিকাদার, ০৯ এর সিয়াম, ০৯ এর শুভম , ১০ ব্যাচের কনক, রাসেল আর ১১ ব্যাচের তানভীর রায়হান (টিআর নামে কুখ্যাত) আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। কোন তথ্য প্রমাণ ছাড়াই আজগুবি ভাবে আমি শিবির করি এটা প্রমাণ করার জন্য আমাকে টর্চার করে।
প্রথমে তানভীর আমাকে গালে প্রচন্ড এক থাপ্পড় মারে। আমার মাথা ঘুরে যায় এত জোড়ে থাপ্পর খেয়ে, ঠোট কেটে যায়। এটা ওদের টেকনিক। আচমকা আঘাত করে টর্চারের মুড ক্রিয়েট করে। এরপর তানভীর আমার বুকে প্রচন্ড এক লাত্থি মারে। আমি মেঝেতে পড়ে যাই। কেউ এসে তোলে আমাকে। এরপর আমাকে জোর করে স্বীকার করতে বলে যে আমি শিবির করি। স্বীকার না করলে আমার মাথায় একটা বস্তা পরিয়ে দিয়ে বেধে দেয়া হয়।
এরপর শুধু মুহুর্মুহু রডের বাড়ি পড়তে লাগল পিঠের উপরে। একজন মনে হয় টায়ার্ড হয়ে রডটা রাখতেই আরেকজন রড হাতে তুলে নেয়। এভাবে থেমে থেমে প্রায় ১ ঘন্টা বস্তাবন্দী হয়ে মার খেয়েছিলাম। এভাবে আমি যখন জ্ঞান হারানোর কাছাকাছি চলে গেছি তখন শুরু হয় আরেক টেকনিক। এবার মাথা থেকে বস্তা খুলে একজন এসে খুব আদর করে আমাকে রক্ষা করার ভান করে। বলে যে, "আমি শিবির করি" এটা বললেই ও আমাকে অন্যদের থেকে বাচিয়ে নিবে। কিন্তু আমি আল্লাহর রহমতে ঘোরের মধ্যেও বুঝতে পারি এটাও ওদের চাল।
এরপরে আবার মার দিতে থাকে। একপর্যায়ে আমাকে ক্রসফায়ারে দেয়ার হুমকি দেয়। শূভম এসে আমার পা ভেংগে ফেলার পরামর্শ দেয়। পরামর্শ শুনে কাজল আর রাসেল মিলে আবার পূর্নোদ্যমে আমার পা লক্ষ্য করে রড দিয়ে পিটানো শুরু করে। একপাশ হয়ে যাওয়ায় সব মার এসে লাগে বাম পায়ে। একপর্যায়ে আল্লাহপাক মুখ তুলে তাকায়। ওরা কোন কারণে আমার উপরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমাকে চলে যেতে বলে।
আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। যাওয়ার সময় হলের গেটে আমাকে বলে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবি রাস্তায় এক্সিডেন্ট করছিস। পাচবার আমাকে দিয়ে মিথ্যা উত্তর প্র্যাকটিস করিয়ে যখন ছেড়ে দেয় তখন রাত ৩ টা। আমি এখন কোথায় যাব হল থেকে ? কোন রিকশাও পাওয়া যাচ্ছে না। শরীরে একফোটা শক্তি অবশিষ্ট নেই। কিন্তু যত দ্রুত পারা যায় ওদের দৃষ্টির সীমানা থেকে চলে যেতে চাচ্ছিলাম, যদি আবার সেই জাহান্নামে ডাকে!
খুড়িয়ে খুড়িয়ে তিতুমীর থেকে বের হয়ে পলাশীর কাছে এসে একটা রিকশা ডাকি শরীরের সব শক্তি জড় করে। তারপর আমার চাচার বাসায় চলে যাই। এরপরের বুয়েটের বাকি সময়টা একটা ট্রমা নিয়ে কাটিয়েছি। কোন আনন্দ উল্লাস কাজ করেনি, ক্যাম্পাস লাইফ নিয়ে কোন ভালবাসা কাজ করেনি। ঘৃণা আসত নির্লিপ্ত স্বার্থপর সব বুয়েটিয়ানের দিকে তাকালে।
-বুয়েট ইউরিপোর্টার হতে"

Saturday, October 5, 2019

একটা মানুষ কেবল একটা সংখ্যা না...।





লেখক: Joynal Abedin

"রবিউল রক্তশূন্য মুখে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'স্যার আমারে কি মাইরা ফেলবেন'?
রবিউল যখন প্রশ্নটা করল তখন আমি সিগারেটে সর্বশেষ টান দিচ্ছি। প্রশ্ন শুনে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য থামলাম। তারপর আবার লম্বা করে টান দিয়ে ঠোঁট গোল করে উপর দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে সিগারেট মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে ঘষে আগুন নেভালাম। রবিউলের জবাব না দিয়েই বললাম, 'ফারুক! ওর চোখ বাঁধো'।

রবিউল নামের মধ্যবয়সী লোকটা এবার চূড়ান্ত ভয় পেয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে তার চোখে মুখে যে সামান্য আশা ছিল সেটা মুহুর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেছে। তার কপাল থেকে নিয়ে থুতনী পর্যন্ত পুরো মুখমন্ডল একটা নির্দিষ্ট ছন্দে কাঁপছে। মৃত্যুভয়ে আচ্ছন্ন মানুষকে নতুন দেখছি না। এটাই আমার জীবনের প্রথম ক্রসফায়ার নয়। তারপরও কেন জানি প্রতিবারই দৃশ্যটাকে নতুন মনে হয়।
ফারুক চোখ বাঁধার কাপড় খুঁজতে গাড়িতে চলে গেল। আমি বিরক্ত হলাম। গাড়ি থেকে নামার সময়েই জিনিষটা পকেটে করে নিয়ে আসা উচিত ছিল। সবচেয়ে ভালো ছিল গাড়িতেই চোখ বেঁধে রেখে দিতে পারলে। এসব কাজে দেরি করার কোনো মানে নেই। ঝামেলা যত দ্রুত সরানো যায় ততই মঙ্গল।

'স্যার আমারে কি মাইরা ফেলবেন'?, রবিউল দ্বিতীয়বারের মতো এই প্রশ্ন করলে আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, 'এত কথা কেন রে বাপ? উত্তর কিছুক্ষণের মধ্যে এমনিতেই পেয়ে যাবা। এখন আল্লাহ খোদার নাম নাও'।
রবিউল এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেল সে মারা যাচ্ছে। এক মুহুর্ত নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে তারপর অদ্ভূত এক কাজ করে ফেলল লোকটা। হাত হ্যান্ডকাফ বাঁধা অবস্থায় ঝপ করে কাঁটা ফলের মতো আমার পায়ের নিচে পড়ে হাউমাউ করে বলল, 'স্যার আমারে মাইরেন না। আমি নির্দোষ স্যার! ও স্যার গো! আপনার দোহাই গো'!
কে দোষী আর কে নির্দোষ সেটা ঈশ্বরের পরেই যদি কেউ জানে তবে সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই লোকটা যে আপাতমস্তক ভালো মানুষ সেই খবর তার স্ত্রীর অজানা থাকলেও আমাদের অজানা নয়। ভালো মানুষদের নাকি আয়ু কম থাকে, সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। যুগে যুগে ভালো মানুষদের এই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। কে পরাঘাতে মরে নি? সক্রেটিস? কোপার্নিকাস? বান্না? এমনকি যিশু খ্রিষ্টকেও এভাবেই মরতে হয়েছে। যুগের নিয়মই এমন। সভ্যতার রীতি এটাই। আমি নিয়ম পাল্টানোর কেউ নই।

রবিউলকে টেনে-হিঁচড়ে মাটি থেকে তোলা হলো। তার গায়ে এই বিস্তীর্ণ মাঠের কিছু ধুলো লেগে গেল। লোকটার কাঁপুনি ক্রমশই বাড়ছে। আমার জানামতে আগামী কাল জোছনা। এই পরিষ্কার আকাশে আজকের রাতটাকেই জোছনা রাত বলে মনে হচ্ছে। চাঁদের আলোয় রবিউলের চোখের কিনার ঘেষে নেমে পড়া অশ্রুর ধারা চিকচিক করছে। বিরাট আকাশের নিচে রাতের এই নির্জনতায় রবিউলকে মনে হচ্ছে সামান্য কীট-পতঙ্গ, যার জন্ম হচ্ছে কেবলই মৃত্যুর জন্য।
রবিউল আরেকবার ঝুঁকে পড়ার সুযোগ নিতে গিয়ে ব্যর্থ হলো। এবার পেছন থেকে দুইজন তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। পড়তে না পারলেও সে খানিকটা চিৎকার করে সেই একই কথা বলল, 'স্যার আমারে মাইরেন না স্যার। আমি নির্দোষ স্যার। আমার দুইটা মেয়ে আছে স্যার। তাদের দেখার কেউ নাই স্যার। আমার বউ খুব অসুস্থ স্যার'।

আমি উল্টো ঘুরে পকেট থেকে সিগারেট বের করলাম। চারপাশে বাতাস, লাইটারে আগুন ধরাতে একটু সমস্যা হচ্ছে। কাজটাতে নতুন না আমি, তারপরও প্রতিবারই একটু হলেও অস্বস্তি লাগে। সিগারেট তখন খুব কাজে দেয়। নিকোটিন রক্ত থেকে অনেকটাই উদ্বেগ কমিয়ে দেয়। যদিও এখানে উদ্বেগের মতো কিছুই নেই। লোকটা আহামরি কেউ না। ছোটখাটো ব্যবসায়ী। সরকারদলীয় এক নেতার টেন্ডারবাজীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এলাকায় হিরো হয়ে গেছে। স্থানীয় জনতার সহায়তায় নেতার ছেলেকে ধর্ষণ চেষ্টারত অবস্থায় ধরে গণধোলাইয়ের ব্যবস্থা করিয়েছে। তারপর নেতা পুত্রকে গ্রেফতারের জন্য করেছে থানা অবরোধ। লোকটার ভালো পজিশনে বেশ কিছু জমি আছে। নেতা ভদ্রলোক সেই জমি হজম করতে চাইছেন। বাংলাদেশের বাস্তব আইনে মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ দায় রবিউল জমা করে রেখেছে।

দুই মিনিট হয়ে গেছে। ফারুক আসতে এত দেরি করছে কেন? গুলি করেই কাজ শেষ না। আরো যন্ত্রযোগাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। হাত না চালিয়ে কাজ করলে কীভাবে হয়?
রবিউল ঘুরে ফিরে একই আর্তনাদ করেই যাচ্ছে। মুখে বেঁধে রাখলে ভালো হতো। সেটার অবশ্য খুব বেশি দরকার নেই। এই চিৎকার সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো কানে পৌঁছাবে না, অবশ্য সৃষ্টিকর্তা যদি শুনতে ইচ্ছুক হোন তবেই। রবিউলের ভেতরেও বোধহয় একই বোধ জাগল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, 'ও আল্লাহ গো! ও আল্লাহ গো! ও আল্লাহ গো'!
ডাকুক, বেশি করে ডাকুক। এসব বোকা মানুষগুলো ভাবে জগতে ঈশ্বরের একটাই সত্ত্বা। অথচ জগত অসংখ্য ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র ঈশ্বরে বিভক্ত। এই যে রবিউল নামের এই লোকটাকে আমি একটু পরে মারতে যাচ্ছি সেটা নিজের ইচ্ছায় নয়। আমাকে একজন ঈশ্বর আদেশ করেছেন। সেই ঈশ্বরকে আদেশ করেছেন হয়তো আরেকজন, আরেকজনকে আরেকজন, সেই আরেকজনকে অন্য আরেকজন। রবিউল নামের এই সামান্য কাপড় ব্যবসায়ীর ধারণাই নেই তাকে মারার জন্য কত নীরব আয়োজন ঘটে গেছে, কত বছর, কত যুগ আর শতাব্দি ধরে এই আয়োজন চলে আসছে। অথচ সে কেবল আমার দিকেই ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে আছে যেখানে আমার অপরাধটাই সর্বনিম্ন।

ফারুক কাপড় নিয়ে এসেছে। গাড়ির কাছে গিয়েই তার পেচ্ছাব চেপেছিল। সেই কাজ করতে গিয়ে একটু দেরি হয়েছে। এই পেচ্ছাব স্বাভাবিক না, শরীরে এনজাইটি বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন হয়েছে। ফারুকের মতো কালো কাপড়ের মানুষও যদি এনজাইটিক হয়ে যায়, রবিউল নামের মানুষটার ভেতরে এখন কি হচ্ছে কে জানে! ফারুক চোখ বেঁধে নিল। সর্বশেষ বারের মতো রবিউলের চোখের দিকে তাকালাম আমি। জোছনার আলোয় রবিউলের চোখ গড়িয়ে এখনো পানি পড়ছে। তার সাথে সমস্ত জগতের রাগ, ক্ষোভ, বিস্ময় এবং ঘৃণা।
রবিউলের সময় শেষ হয়ে এসেছে। শেষবারের মতোও সে চিৎকার করে বলল, 'স্যার, আমি দুইটা বাচ্চা মেয়ে আছে স্যার। ওরা আজকে কাঁঠাল খাইতে চাইছিল। বছরের প্রথম কাঁঠাল বাজারে উঠছে। ওরা কাঁঠালের আশায় সারা রাত বসে থাকবে স্যার। স্যার আমারে মাইরেন না। আমার দুইটা মেয়ে আছে স্যার। আমার বউ অসুস্থ স্যার। তার ডায়বেটিস, প্রেশার। তারে ডাক্তারের কাছে নেয়ার কেউ নাই'।

আমি এসব কানে দিলাম না। অভ্যস্ত হাতে হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করলাম। যেহেতু ব্যাপারটাকে বন্দুক যুদ্ধ হিসেবে চালানো হবে সুতরাং বন্দুক দিয়ে গুলি করলে ভালো হতো। এতসব যন্ত্রণায় যাওয়ার দরকার নেই। এটা ইউরোপ-আমেরিকা না যে গুলি ল্যাবে নিয়ে পরীক্ষা করা হবে। এটা বাংলাদেশ। এখানে একটা লাশের পেছনে এত সময় দেয়ার কিছু নেই। কেউ খুঁজতেই আসবে না।
আমি ট্রিগার টানলাম। 'খট' করে একটা শব্দ হলো। এই শব্দ শুনেই রবিউল একেবারে চুপ হয়ে গেল। মানুষের বিশ্বাসের অনেক দেয়াল থাকে। সম্ভবত তার সর্বশেষ দেয়াল এখন ভাঙল। একটু আগেও হয়তো সে ভেবেছে কোনো না কোনো ভাবে সে বেঁচে যাবে। তার দুই বাচ্চাকে কাঁঠাল ভেঙে খাওয়াবে। পিস্তল টানার শব্দে সে বিশ্বাস টুঁটে গেছে। তাকে কালিমা পড়তে বলা উচিত। আমি এটা বললাম না। একবার একজনকে বলেছিলাম। অর্ধ উন্মাদ লোকটা আমার মুখে থু থু দিয়ে বলেছিল: তোর কালিমা তুই পড়। তুইও মরবি।

আসলেই কথাটা চমৎকার। সবারই তো মরতে হবে। হত্যা খুব বড় কোনো অপরাধ না। এটা পূর্বনির্ধারিত একটা বস্তু। আজকে আমি এই ক্রসফায়ার না করলে অন্য কেউ করত। আমাদের চারপাশের যে সকল ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র ঈশ্বর, তাদের কাজ কখনো আটকায় না। বরং যারা আটকায়, তাদেরকেই আটকিয়ে দেয়া হয়।
রবিউল বিড়বিড় করে বলল, 'স্যার আমারে ক্যান মারবেন'?
এই প্রথমবারের মতো আমি কোনো প্রশ্নের উত্তরে বললাম, 'জন্মের অপরাধে। জন্মের অপরাধে সকলকেই মরতে হয়। তাছাড়া তুমি ঈশ্বরের দেশে বাস করে ঈশ্বরবিরোধী কর্মকান্ড করেছে। ঈশ্বরের বিচারে তোমার শাস্তি হচ্ছে। এবার আসমানের ঈশ্বরের কাছে যাও। পরের বিচারটুকু তাঁর কাছে গিয়েই দিয়ো। তিনি যদি সত্যিই থেকে থাকেন তবে হয়তো এতদিন সব বিচার করবেন'।

আমার এত জটিল কথা নেয়ার মতো অবস্থায় রবিউল যে নেই সেটা আমিও জানি। তার ঠোঁট কাঁপছে। আমি স্থির হাতে পিস্তল উঁচিয়ে ধরলাম। চোখ বাঁধার কারণে রবিউল এই দৃশ্য দেখছে না, দেখলে গা মোচড়ামুচড়ি করত। মৃত্যুর প্রতি মানুষের সীমাহীন ভয়, জীবনের প্রতি সীমাহীন আশা। শেষ মুহুর্তেও মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। কেন করে কে জানে!
তিন ফুট দূর থেকে আমি রবিউলের বাম বুক তাক করলাম। আমার দলের বাকি তিন সদস্য চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। আমি ট্রিগার চাপতে যাচ্ছি ঠিক এই মুহুর্তে রবিউল বলল, 'স্যার গো...'।
আমি থেমে গেলাম। রবিউল বলল, 'স্যারগো! আপনারও মেয়ে আছে গো স্যার'! আমার পাঁচ বছরের একটা মেয়ে আছে এটা এই লোকের জানার কথা না। লোকটা নিশ্চয়ই আন্দাজে বলে ফেলেছে। তবে আন্দাজ কিছুটা কাজ করেছে বলেই সে বাড়তি তিন সেকেন্ড সময় পেয়ে গেল। জীবনের শেষ সময়ে তিন সেকেন্ড সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। কতটা দামী সেটা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ। আমি রবিউলের বুকে পরপর তিনটি গুলি করলাম।

মানুষের মধ্যে হাজার রকম তফাৎ। ধর্মে, বর্ণে, নামে, চেহারায়, কর্মে সব মানুষই আলাদা। মৃত্যু সব মানুষকেই এক ফেরে ফেলে। গুলি করার পর সবার শরীর থেকে রক্ত বের হয়, কাঁটা ফলের মতো পড়ে যায়। সবাই শেষের দিকে এসে অপার্থিব গোঙানি দেয়। এখানে কোনো তফাৎ সৃষ্টি হয় না। রবিউল মিনিট দুয়েক 'মা গো'-'পানি পানি' এবং 'নাসিমা-ফাহিমা' বলে গোঙাচ্ছিল। একটু আগে সেটা স্থির হয়ে গেছে। নাসিমা-ফাহিমা বোধহয় তার দুই মেয়ের নাম। দুই মেয়ের জন্য আগামীকাল দিনটা ভীষণ যন্ত্রণায় যাবে। ৮ বছর আর ৬ বছরের দুই বাচ্চা হুট করেই আবিষ্কার করবে তাদের বাবা নেই। তাদের বাবা ছিল মাদক ব্যবসায়ী। তাদের বাড়ি পুলিশে আর মানুষে ভরে যাবে। দুইটা বাচ্চা হতবিহ্বল হয়ে তাদের মায়ের মুর্ছা যাওয়া দেখবে। আগামীকাল কবর খোড়া থেকে নিয়ে অশান্তি আর অনিশ্চিত প্রস্তুতির যে জীবন শুরু হবে সেটা আর কোনো দিন থামবে না।

প্রস্তুতি আমাদেরও নিতে হবে। লাশের পাশে কয়েকটা গুলির খোসা, কয়েশ পিস ইয়াবা রেখে দিতে হবে। একটা ভাঙাচোরা বন্দুক আছে, সেটা সেট করতে হবে জায়গামতো। লাশের পকেটের মোবাইল ফোনে কিছু রেকর্ড হলো কিনা দেখা দরকার। দূর থেকে কেউ ভিডিও-টিডিও করে ফেললে সাময়িক সমস্যায় পড়ে যাব। একটু ঘুরে সেটাও নিশ্চিত করা উচিত। এদেশের মানুষের কল্পনাশক্তি নিম্নশ্রেণীর জীবের চেয়েও কম। এদের চোখের আড়ালে এক লাখ ক্রসফায়ার করলেও মস্তিষ্ক সেসব দৃশ্য কল্পনা করতে পারবে না। অথচ কোনো ভিডিওতে কারো চড় মারা দেখলেই মস্তিষ্কে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে যাবে। আলোড়ন সৃষ্টি হলেও তেমন কিছু হবে না। কিছুদিন আলোচনা হবে। এক সময় দলে দলে ভাগ হবে আলোচনাকারীরা। সামনে আসবে নতুন কোনো আলোড়ন। সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে সবাই। তারপরও খুব যদি কিছু হয় তবে দেশে ঈশ্বরেরা আছেন। বাকিটুকু তারাই দেখবেন।

তারপরও অডিও, ভিডিও থেকে সাবধান থাকা ভালো। সবকিছু শেষ হলে একটা মুখস্ত প্রেস ব্রিফিং দিতে হবে। সেখানে সবকিছু আগে থেকেই টাইপ করা আছে শুধু এডিট করে রবিউলের নাম আর বয়স বসিয়ে দিলেই হয়।
আর দুই ঘন্টার মামলা। তারপর আমি নিশ্চিন্ত। শুধু আজকের জন্য না, আগামী অনেক দিনের জন্য। আসমানের ঈশ্বরই যে তার কাজে পুরষ্কৃত করেন তা না, মাটির ঈশ্বরেরাও তাদের কাজ করে দিলে পুরষ্কারের ব্যবস্থা করে দেন। আমার পুরষ্কার আছে। আসমানের ঈশ্বরের মতো এখানে সময়ক্ষেপণ নেই। এই পুরষ্কার হাতে আসবে খুব দ্রুত।

মিলি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'চা খাবে'?
আমি পত্রিকা পড়ছিলাম। মুখ না তুলেই বললাম, 'দিতে পারো'।
মিলি কিচেনের দিকে চলে গেল। আমি পত্রিকা ঘাটাঘাটি করছি। পঞ্চম পৃষ্টার সপ্তম কলামে গিয়ে কাংঙ্খিত খবরটা খুঁজে পেলাম: ক্রসফায়ারে মাদক ব্যবসায়ী নিহত।
'গতকাল রাতে রাজধানীর কেরানীগঞ্জে বন্দুকযুদ্ধে রবিউল ইসলাম (৩৮) নামের এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। নিহত রবিউল ডেমরা এলাকার আব্দুল মালিকের পুত্র। সূত্র জানায় গোপন খবরের ভিত্তিতে রবিউলকে নিয়ে মাদক উদ্ধারে বের হলে পথমধ্যে রবিউলের সহযোগীররা  লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে।  আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও গুলি চালায়। এক পর্যায়ে পালানোর সময় রবিউল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। ঘটনাস্থল থেকে একটি বন্দুক, দুই রাউন্ড গুলি এবং চারশপিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।'

খবর পড়ে বরাবরের মতোই আমার হাসি পেল। রবিউলকে ধরা থেকে নিয়ে গুলি করা এবং লাশ মর্গে পাঠানো পর্যন্ত আমাদের ব্যয় হয়েছে সর্বমোট ১১ ঘন্টা। সাংবাদিকরা এত আয়োজন করে করা একটা ঘটনাকে পঞ্চম পাতার সাত নাম্বার কলামে দেড় ইঞ্চির মধ্যেই শেষ করে ফেলেছে। তিলটা গুলি করতে আমার যতটা সময় লেগেছে এই খবর পড়তে লেগেছে তারচেয়েও কম। জীবনের দাম এখন কারো কাছেই বেশি না। না খুনীর কাছে, না সাংবাদিকের কাছে, না রাজার কাছে, না জনগণের কাছে। এককভাবে এই হত্যার দায় আমি কীভাবে নিই?

মিলি চা নিয়ে এসেছে। তার হাঁটার ভঙ্গি কেমন যেন সাপের মতো। আমাদের বিয়ের ৮ বছর হয়ে গেছে। মিলির শরীরে এই আট বছরে কয়েক কেজি মেদ জমেছে। কিন্তু শরীরটা এখনো সেই আগের মতোই আবেদনময়ী। শাড়ির ফাঁক গলে পেটের মধ্যে যে ভাঁজ দেখা যাচ্ছে সেটা এতটুকু দৃষ্টিকটু নয়।
মিলি পাশে এসে বসতেই আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। মিলি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, 'এত আহ্লাদ করার দরকার নাই'।
আমি মিলির শরীরে চাপ দিয়ে বললাম,' তাহলে কি করতে হবে'?
'সংসারের খবর রাখতে হবে। বউয়ের খবর রাখতে হবে। প্রতিদিন দেরি করে বাসায় ফিরলে বউ অন্য পুরুষ ঘরে ঢোকাবে কিনা সেটা নিয়ে ভাবতে হবে'।
'আর'?
'আর বাচ্চাটার খবর রাখা দরকার। ৫ বছরের একটা বাচ্চা, বাবা-বাবা বলে ঘুমিয়ে পড়ে। তারজন্য না একটা খেলনা এরোপ্লেন আনার কথা, সেটা কই'?

শান্তা দুইদিন আগে এরোপ্লেনের আবদার করেছিল। রবিউলের ব্যস্ততায় সেটা মনেই করতে পারিনি। আহারে, আমার মেয়েটা হয়তো এরোপ্লেনের কথা ভেবে ঘুমাতে পারেনি। এক মুহুর্তের জন্য রবিউলের দুইটা মেয়ের কথা মাথায় আসল। কি যেন নাম? নাসিমা- ফাহিমা। ওরা বাবার কাছে কাঁঠাল খাওয়ার জন্য আবদার করেছিল। বাচ্চা দুইটা কী এ জীবনে আর কোনোদিন কাঁঠাল মুখে দিতে পারবে?
অবশ্য তাদের জীবনে ঘোর অন্ধকারের এখনো অনেক বাকি। তাদের জমি দখল হবে, ব্যবসা হাতছাড়া হবে। এক সময় বানের পানির কচুরিপানার মতোই তাদেরকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো লাগবে। জীবন কতটা নিষ্ঠুর কতটা অন্ধকার তার পূর্ণ শিক্ষা এরা খুব দ্রুত পেয়ে যাবে।

মিলি বলল, 'কি ভাবছ'?
আমি বললাম, 'কিছু না'।
'কিছু তো অবশ্যই। আজকাল তুমি আমাকে অনেক কিছুই বলো না। কোথায় যে কি করে বেড়াচ্ছ কে জানে! মেয়ে-টেয়ে নিয়ে হোটেলে উঠলে কিন্তু খবর আছে। স্রেফ খুন করব। খুন করে বিধবা হয়ে যাব'।

আমি আরেকবারের জন্য রবিউলের বিধবা স্ত্রীর কথা ভাবলাম। মেয়েটার বয়স কত হবে? হয়তো মিলির বয়সীই হবে, কিংবা আরো কম। এই মেয়েটা আজীবন একা থাকবে, কত দীর্ঘ রজনী পার করতে হবে একা একা। মেয়েটার শরীর থেকে মিলির মতোই গন্ধ বেরুবে, সেই গন্ধে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসবে পতঙ্গ। দুইটা বাচ্চা মেয়েকে সামলাতে গিয়ে সে নিজে দিশেহারা হয়ে যাবে। এক সময় হয়তো ভুলেই যাবে শরীর কী, মন কী, জীবন কী? রবিউল মাত্র তিনটা গুলিতে উদ্ধার পেয়ে গেছে। এই মেয়ে সারা জীবন বুলেটবিদ্ধ হবে। রবিউলের মতো আর্তনাদ করার অধিকারটুকু সে পাবে না।

মিলি ভীষণ আদুরে গলায় বলল, 'এ্যাই...'।
আমি বললাম, 'বলো'।
'চলো না, কোথাও থেকে ঘুরে আসি'।
'কোথায় যাবা'?
'অজানাতে...।'

'সেটা কী'?
'যেখানে নদী এসে মিশে গেছে। হিহিহি'।
'হেয়ালী করছ'?
'হ্যাঁ করছি। সত্যিই ঘুরে আসি। কতদিন ঘুরি না'।
'কোথায় যাবে বলবে তো'?
'গ্রান্ড সুলতানে যাব। শ্রীমঙ্গল। চারপাশে সবুজ আর সবুজ। মাঝখানে তুমি আর আমি। সুন্দর হবে না'?
'হ্যাঁ হবে'।
'কবে যাবে'?
'আগামী সপ্তাহে'।
মিলি চিৎকার করে বলল, 'ও-মা, সত্যিই'?
আমি বললাম, 'হ্যাঁ সত্যিই। রেডি হও'।
মিলি আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে বলল, 'আমার দাবী মানার জন্য তুমি আমার কাছে পাওনাদার হয়ে গেলে। আজকে তোমার যাবতীয় ঋণ শোধ করা হবে'।

তার ঠোঁটের কোণে বাকা হাসি। এই হাসির অর্থ আমি জানি। এটা তার বিখ্যাত নিষিদ্ধ হাসি, এটা তার বিখ্যাত বিশুদ্ধ হাসি। আমি তাকে তরল গলায় কিছু বলতে যাব তখনি শান্তা ঘরে ঢুকে বলল, 'আব্বু'!
আমি বললাম, 'জ্বী মা'!
'আমার হেলিকপ্টার কই'?
'আছে। কালকেই পেয়ে যাবা'।

'তুমি আজকে আননি কেন? আজকে যদি হেলিকপ্টারওয়ালা মারা যায়'?
'মারা যাবে না। আর মারা গেলেও আমি ঠিকই নিয়ে আসব কালকে'।
'মারা গেলে তখন কীভাবে পাবে? লোকটার তো কবর হয়ে যাবে'।

আমি ঘড়ির দিতে তাকালাম। সন্ধ্যে সাতটা বাজে। হিসেব মতে আজকে রবিউলের লাশ তার বাড়িতে যাওয়ার কথা। দীর্ঘ আয়োজনের পর এতক্ষণে সম্ভবত তার কবর হয়ে গেছে। সে এখন আসল ঈশ্বরের মুখোমুখি। আসল ঈশ্বর কী তাকে তার প্রাপ্য পুরষ্কারটুকু দেবেন?

আমার ঈশ্বর অবশ্য আমার প্রাপ্যটা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। ব্যাংক একাউন্ট আরেকটু ভারী হয়ে গেছে। সেখান থেকে ক্ষুদ্র একটা অংশ দিয়ে হবে গ্রান্ড সুলতান ট্রিপ। সেখান থেকে ফিরব, ঈশ্বর থেকে চলে আসবে নতুন কোনো নির্দেশনা।
আসল আর স্থানীয় ঈশ্বরদের মধ্যে পার্থক্যটা চমৎকার। আসল ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেন, আর স্থানীয় ঈশ্বরদেরকে সৃষ্টি করি আমরাই। আসল ঈশ্বরের মতোই স্থানীয় ঈশ্বরদের নিজস্ব ভক্ত থাকে, ধর্ম থাকে। পার্থক্য হচ্ছে আসল ঈশ্বরের আজন্ম আরাধনা করেও ভক্ত ঈশ্বর হতে পারে না, ঈশ্বরকে বদলাতে পারে না। তবে এখানকে ঈশ্বর বদল আছে, চরম ভক্ত থেকে ছোটখাটো ঈশ্বরে পদন্নতির সম্ভাবনা আছে। দুই ক্ষেত্রেই ঈশ্বর বড় বেশি একরোখা। নিজেদের তৈরি আইনে তারা 'বিরোধ' পছন্দ করেন না। আমি এত কঠিন চিন্তা করছি কেন? ইদানিং কি মাথায় বেশি চাপ পড়ছে? চাপ কমানোর জন্য তাড়াতাড়ি ট্যুরটা করে ফেলতে হবে।

শান্তা দৌড়ে এসে আমার কোলে চড়ে বসল। আমি তার কপালে লম্বা করে চুমু দিলাম। বাচ্চাটা আমার আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আমি অনুভব করলাম সেই চিরন্তন বাণী: পৃথিবীতে খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু কোনো খারাপ বাবা নেই।
ঠিক তখুনি আমার কানে রবিউলের চিৎকার চলে আসল: স্যার আমারে মাইরেন না। আমার দুইটা বাচ্চা আছে। রবিউল বড় বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে তো! এভাবে আগে কেউ দেয়নি।

আমরা শ্রীমঙ্গল যাচ্ছি। মিলি বাইরে দূরে কোথাও ঘুরতে বের হলে ড্রাইভার নেয়া পছন্দ করে না। তার মতে এতে প্রাইভেসী নষ্ট হয়। সময়টুকু নিজেদের থাকে না। মিলির কারণেই তখন আমাকে ড্রাইভার হয়ে যেতে হয়। আমি ড্রাইভার হিসেবে যথেষ্ট সাবধানী। এখন পর্যন্ত ছোটখোটো কোনো দুর্ঘটনাও ঘটাইনি। তারপরও স্ত্রী সন্তান সাথে থাকলে সামান্য চাপ অনুভব করি। এত দূরের পথে ড্রাইভারকে আনলেই বোধহয় ভালো ছিল।
আমরা ভৈরব ব্রীজ পার হয়ে গেলাম। ব্রীজের পাশ ঘেষে রেলসেতু। শান্তা মুগ্ধ হয়ে চারপাশ দেখছে। মেয়েটাকে নিয়ে বাইরে বের হওয়া হয় খুবই কম। এখন থেকে একটু অভ্যেস করিয়ে নিতে হবে। মেয়ের বয়সের তুলনায় ততটা বুদ্ধি হচ্ছে না। এই বয়সের বাবা মায়ের সঙ্গ তার অনেক বেশি দরকার।
গাড়িতে রবীন্দ্র সংগীত বেজে চলেছে, 'ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে গান'। মিলি গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে তার আনন্দ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। গাড়ি ছুটে চলেছে একই গতিতে। বহুদিন পর ড্রাইভ করে আমিও আরাম পাচ্ছি।



আমরা হবিগঞ্জে ঢুকে পড়লাম। আর কিছুদূর গেলেই প্রকৃতির অপরূপ রূপ চোখে পড়বে। তারপাশে ঘন সবুজ বন, চা বাগান। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। মিলি আর শান্তা আগে কখনো এদিকে আসেনি। তারা ঠিক কতটা যে খুশি হবে ভেবেই আমি আনন্দ পাচ্ছি। তবে আমার আনন্দে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটে গেল।

সামনে বড় রকমের জ্যাম। এই রাস্তায় জ্যাম হওয়ার কথা না। আমি গাড়ি থেকে মাথা বের করে একজনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম সামনে একটা ট্রাক এক্সিডেন্ট হয়েছে। ট্রাক আটকে সাময়িক একটা জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। একটু পরেই সেটা খুলে যাবে।
গাড়ি থেকে চাইলে বের হওয়া যায়। এই মুহুর্তে বের হতে ইচ্ছে করল না। আশেপাশে দাঁড়ানোর মতো ভালো জায়গা নেই। বরং গাড়ি থামিয়ে স্ত্রী কন্যার সাথে একটু গল্প করা যায়।

আমাদের গাড়ির দুইপাশে আরো দুইটা গাড়ি এসে থেমে গেল। সবার চোখে মুখে বিরক্তি। ট্রাক এক্সিডেন্টে কেউ মারা গেছে কিনা এ খবর কেউ নিচ্ছে না। সবারই মনোযোগ কখন জ্যাম ছাড়বে তার প্রতি। আমি পেছন ঘুরে শান্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'মা মণি কেমন আছো'?
শান্তা বলল, 'ভালো আছি আব্বু। আর কতদূর'?
আমি বললাম, 'এই তো চলে এসেছি। আর সামান্য দূর। তারপরেই পৌঁছে যাব'।

শান্তা বলল, 'আমরা সেখানে গিয়ে অনেক মজা করব, তাই না'?
আমি বললাম, 'হ্যাঁ। অনেক মজা হবে'।
মিলি আমাকে বলল, 'তুমি একটু হেঁটে গিয়ে দেখো না কি সমস্যা। এভাবে কতক্ষণ বসে থাকা যায়'।
'একটু সময় বসলে খুব বেশি ক্ষতি নেই। অপেক্ষা করা ভালো। অপেক্ষা এক ধরণের পরীক্ষা'।

মিলি চুপ হয়ে গেল। আমি চোখ বন্ধ করে বসে পড়লাম। রবিউলকে ক্রসফায়ারে দেয়ার সপ্তাহখানেক হয়ে গেছে। সবকিছু পুরোপুরি শান্ত। আমার ক্রসফায়ার নিয়ে এখনো কোনো সমস্যা হয়নি অবশ্য। কারোরই সমস্যা হয় না। সমস্যা করে বসে কিছু অতি উৎসাহীরা। এরা ফটো তোলে, ভিক্টিমের আর্তনাদ ভিডিও করে মজা নেয়ার জন্য। কোনো না কোনো ভাবে এরা এক সময় ফেঁসে যায়। আমি এসব করি না, আমার সমস্যাও নেই। তারপরও প্রতিবারই সামান্য খচখচানি কাজ করে কিছুদিন। আমার মনে রবিউল ইস্যু চিরতরে ভুলে যাবার সময় চলে এসেছে।
বেলা দুইটা বিশ বাজে। জ্যাম লাগার বিশ মিনিটের মতো হয়ে গেছে। এখনো খোলার নাম নেই। একবার গাড়ি থেকে বের হয়ে খবর নেয়া উচিত। এই ভাবনা যখন এসেছে তখুনি একটা বিদঘুটে 'ঝন-ঝন-ঝন' শব্দ আমার কানে আসল। ট্রেনের সিগন্যালের শব্দ! এরমানে ট্রেন আসছে। আমি এতক্ষণে খেয়াল করে দেখলাম আমাদের গাড়ি ট্রেন লাইনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই জিনিষটা আগে কেন লক্ষ্য করিনি?

আমি গাড়ির দরজা খুলতে গেলাম। পাশের গাড়িটা আমার গাড়ির সাথে চেপে আছে। দরজা খোলা সম্ভব হচ্ছে না। দুইপাশের গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে বাইরে চলে গেছে। আমি দরজা খুলতে পারছি না। মুখ বের করে চিৎকার করলাম। আশেপাশে কেউ নেই। একটু দূরে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এদের চোখে মুখে ভীতি।
গাড়ি সরানোর কোনো উপায় নেই। সামনে পেছনে গাড়ি। আমার গাড়ি সরাসরি লাইনের উপর। পাশের দুই গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি রেখে উধাও। কানের মধ্যে অনবরত 'ঝন-ঝন-ঝন' আওয়াজ বেজেই চলেছে। আমি রক্তশূন্য মুখে মিলির দিকে তাকালাম। মিলি সমান আতংক নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। খুব সহজ একটা ফাঁদে আমরা আটকা পড়ে গেছি।
সবকিছু কেমন জানি অপার্থিব মনে হলো আমার কাছে। প্রকৃতি এত অস্বাভাবিক আয়োজন করে রেখেছিল আমার জন্য? দুইপাশে দুইটা গাড়ি কখন এসে থামল ব্যাপারটা মাথাতেই নিইনি। এভাবে গাড়ি ট্রেনের লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেও মনে কোনো ভয় জাগেনি। অথচ এক মুহুর্তের ব্যবধানে প্রতিটা পশমে মৃত্যু ভয় চলে এসেছে।

আমি পাগলের মতো দরজা ধাক্কাতে লাগলাম। তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সজোরে সামনের গাড়িকে ধাক্কা দিলাম। কিছুই হলো না।
ট্রেন খুব কাছ থেকে হুইসেল দিল। মিলি শান্তাকে জড়িয়ে ধরে 'ও আল্লাহ, ও আল্লাহ' করছে। এক পর্যায়ে সেও পাগলের মতো দরজা ধাক্কাতে লাগল এবং চিৎকার করে বলল 'আমাদের বাঁচান। কে আছেন, বাঁচান প্লিজ'।
ট্রেনের শব্দ সরাসরি কানে আসছে। আমার হাতে আর কয়েক মুহুর্ত। আমি গ্লাসে সজোরে ঘুষি বসালাম। কোন কাজ হলো না। একটা পর্যায়ে আমার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিল আমি নিজেই আজকে রবিউল। মৃত্যুকে সামনে রেখে অযথাই আর্তনাদ করে যাচ্ছি। আমার ভীত আত্মা কল্পনা করল আমার সামনে রবিউল দাঁড়িয়ে আছে আর আমি তার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইছি। এক সময় সত্যি সত্যিই আমি চিৎকার করে বললাম, 'আমারে ক্ষমা করে দেন ভাই। আমার স্ত্রী কন্যা মারা যাবে। তারা দোষ করেনি। ও আল্লাহ, ও আল্লাহ...'।

মৃত্যু মুহুর্তে যে মানুষের মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে সেটা আমি বুঝতে পারছি। আমার মস্তিষ্ক বলছে রবিউলের স্ত্রী কন্যাও দোষ করেনি। তারাও শাস্তি পাচ্ছে। একই নিয়মে হয়তো আমার স্ত্রী কন্যাও মারা যাবে। এতদিন পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে সেগুলোকে ক্রসফায়ার বলেছি। এবার জীবনে সত্যিকারের ক্রসফায়ারের মুখোমুখি হচ্ছি আমি। ঐ যে বিশাল ট্রেন এটাই হচ্ছে বুলেট। কোনো অদৃশ্য বিরাট শক্তি সমস্ত আয়োজন করে বুলেট ছুড়েছে। আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে জান্তব গুলি।
মিলি পাগলের মতো দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। শান্তা মিলিকে জড়িয়ে ধরে আছে। দৃশ্যটা দেখে আমার চোখ ফেটে গেল। সেই ফেটে যাওয়া চোখে ট্রেনটা চোখে পড়ল।

আর কয়েক সেকেন্ড!
আমি চোখ বন্ধ করলাম। কল্পনায় ধরে নিলাম ফারুক আমার চোখে কাপড় পরিয়ে দিচ্ছে। ট্রেন আরেকবার 'পোঁও-ও' করল। সেটাকে আমার কাছে ট্রিগার টানার শব্দ মনে হলো। শান্তা শেষ সময়ে 'আব্বু-আব্বু বলে চিৎকার করছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা শান্তা না। এটা শান্তা-নাসিমা-ফাহিমার সমন্বিত কণ্ঠ। আমি বুঝতে পারছি প্রতিটা মানুষই কোনো না কোনো সময়ের রবিউল। শুধু সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

ট্রেন একেবারে কাছে চলে এসেছে। প্রথমে আমার সামনের গাড়িকে ধাক্কা মারবে, তারপর আমাদেরকে। আগামীকালকে বননীতে খোঁড়া হবে পাশাপাশি তিনটি কবর। রবিউলের কবরের পাশে কান্নার মতো মানুষ আছে, আমার কেউ থাকবে না।
আমার খুব বেশি জানতে ইচ্ছে করছে, ক্রসফায়ারের শাস্তিটা কি কেবল আমার হবে? আমার ঈশ্বরেরা সে শাস্তি পাবে না?...ট্রেনের শব্দ এবার আমার কানে বিস্ফারিত হল।"
...
লেখাটা একটি কাল্পনিক গল্প। বাস্তবের সঙ্গে এবং এই 'ক্লিপটার সঙ্গেও এর কোনও প্রকারের মিল খোঁজা বৃথা...:

Friday, October 4, 2019

আহা, কান পেতে রই!




কখনও-কখনও আমরা থমকে যাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকি এ যেন এক হিমালয়, এ যেন এক আগ্নেয়গিরি। মানুষ মরণশীল এ-ও কী আর বলা লাগে! তাহলে কি অমর বলে কিছু নেই, হওয়ার উপায়ই-বা কী!

কিন্তু এই মানুষটাকে দেখে মনে হচ্ছে আছে নিশ্চয়ই কোনও-না-কোনও একটা উপায়। এই মুক্তো তুলে এনেছেন, অনির্বাণ বন্দোপাধ্যায় 




Wednesday, October 2, 2019

JU Corruption: Behind the Screen !





"আমি কিছুটা বিস্মিত হলাম প্রথম আলো পত্রিকায় প্রতিবেদনের প্রথম বাক্যটি এরকম, প্রধানমন্ত্রী শোভন-রাব্বানীকে সরিয়ে দেবেন। আমি বুঝতে পারি না, প্রধানমন্ত্রী একটি রাষ্টে্র নির্বাহী প্রধান। এক হিসেবে রাষ্ট্রের সব ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একই রকম হবার কথা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধু একটি ছাত্র সংগঠনের নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সরিয়ে দেবেন কিভাবে? এমন সামান্য ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্ত থাকবে কেনো!

অবশ্য দলনেত্রী হিসাবে তার কিছু অধিকার থাকে। তারপরও যারা এদেরকে নির্বাচিত করেছে, তারাই শুধুই সরিয়ে দিবার গণতান্ত্রিক অধিকার রাখে। অন্য কেউ তা পারে কি? আসলে এটা বুঝায় যে, তাদের নেতা হবার প্রক্রিয়াটি অগণতান্ত্রিক গোয়েন্দা নির্ভর ছিল। বিদায়ের প্রক্রিয়াতে তা স্পষ্ট হল। অনেক রকম চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে তাদেরকে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রিয় স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে তারা দেশের প্রচলিত আইনের উর্ধে ছিল, দলের ও দেশের কাউকেই নায্য গুরুত্ব দেয়া দরকার মনে করতো না। কোন পর্যায়ে নিয়ে গেলে, এরা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালযের ভিসির বাসায় গিয়ে, তার কাছে 'ন্যায্য পাওনা' হিসাবে একশো কোটি টাকা দাবী করার ক্ষমতা রাখে এবং না-পেয়ে, বোঝা যায়, ভিসিকে গালমন্দ করেছে। তারা অসুস্থ ভিসির হাসপাতালে গিয়েছেন ‘ন্যায্য পাওনার'  চাপ দেবার জন্য। সম্ভবত অতীষ্ঠ হয়ে ভিসি ফারজানা ইসলাম অভিযোগ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

কিন্তু স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কি প্রধানমন্ত্রীর অধীনস্ত কোনো পদ? আইনত রাষ্ট্রপতি চ্যান্সেলরের  কাছে তার অভিযোগ জানানোর কথা, যদ্দুর ‍জানি। আর ভিসির নিকট ঠিকাদারির টাকা দাবি করলে সেটার জন্য সাভার থানার ওসিকে জানাবার কথা সবার আগে। আইনের অনুশাসন থাকলে সেটাই যথেষ্ট ছিলো। এতক্ষণ আইনসঙ্গত কথা বলছিলাম। আসলে এদেশটা তলিয়ে গেছে। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে এত নিচুস্তরের সমস্যা হয় না। হলে সেগুলোকে আর বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় না।

জানা গেলো, ভিসি ফারজানা ইসলাম অলরেডি প্রায় দেড় কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন, স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাদেরকে। কেন দিলেন? ভিসি থাকতে হলে তা করতে হয়, এজন্য? ফারজানা ইসলাম সম্পর্কে বিরূপ কিছু বলা আমার জন্য মুশকিল। ফারজানা ইসলাম আমার ক্লাসমেট। ঢাবি সমাজবিজ্ঞান বিভাগে আমরা সহপাঠি ছিলাম। ব্যবহারে বেশ মার্জিত, ছাত্র থাকতেই। তবে সেই সময়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে দুটি ঘরানায় বিভক্ত ছিল, একটা বিএনপি অন্যটা জামাত ঘরানার। আর একটা প্রগতিশীল ঘরানা। প্রথম ঘরানার অনুগত ছিলেন ফারজানা। তিনি ড. আনোয়াউল্লাহ চৌধুরীর অনুগ্রহভাজন, পরে যিনি বিতকির্ত ভিসি হন ও বিতাড়িত হন এবং যিনি আমার ছাত্রত্ব বাতিল করতে চেয়েছিলেন। আমি যে প্রগতিশীল ঘরানার। আসলে আমি সারা জীবন পরীক্ষায় প্রথম/দ্বিতীয় হওয়া ছাত্র। আমার ধারণা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবো। কিন্তু পরীক্ষার পর আশাহত হলাম। এক ঘরানার শিক্ষকের খাতায় পাই ৭০ বিপরীত ঘরানায় পাই ৫০। ফারজানা ফাষ্ট হলো। ফলাফল তলিয়ে দেখার জন্য আমি অভিযোগ জানাই বিভাগীয় প্রধানের কাছে। জানিয়ে আসার পর রাইটিষ্ট ঘরানার অধ্যাপক কামরুল আহসান, শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও চাকুরি পেয়েছিলেন। তিনি একটু মাস্তান টাইপ ছিলেন, বললেন, 'তুমি আমার বিরুদ্ধে, আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছো। তোমাকে যেনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর না দেখি'।

বলে কী! আমি বললাম, অভিযোগ থাকলে তো বিভাগের চেয়ারম্যানের কাছেই জানাতে হয়, আমি তাই করেছি, অন্যায়টা করলাম কোথায়। তিনি কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে আমার শার্টের কলার ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকলেন, কলাভবনের বারন্দায় সেটা। আমি বললাম, 'স্যার ছেড়ে দেন, ভালো হবে না'। ছাড়লেন না। অগত্যা আমিও তাঁর সার্টের কলার চেপে ধরলাম। আমি ক্ষুব্ধ ছিলাম। কলা ভবনের নিচতলায় তখন ক্লাশ চলছিলো। সকাল ১০ টায় এ কান্ড দেখে অসংখ্য ছাত্র জমায়েত হল, হৈ চৈ। তার সমর্থকরা ঘুষি টুসি চালাতে লাগলেন। সব কথা বলা যাবে না, সে সময়ের পত্রিকায় সেসব এসেছে।

অধ্যাপক এমাজউদ্দিন তখন প্রক্টর। তিনি দৌড়ে এসে আমাকে পেছন থেকে জাপটে ধরলেন, 'বাবা-বাবা, থামো-থামো'। আমি বললাম, 'আপনি আমাকে এভাবে ধরলে আমি তো মার খাবো। আপনি আপনার মাস্তান সহকর্মীকে  ধরেন'।
এনএসএফ সমর্থক ওই অধ্যাপক নিজস্ব কিছু ছাত্রকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। আমি ভালো ছাত্র হলেও নিরীহ টাইপ নই, ছাত্ররাজনীতি করি। অতএব, মার খাবার পর হজম করলাম না। পাল্টা মার দিলাম। মুহুর্তে ঢাকা বিশ্বদ্যালয়ের কলাভবন খালি হয়ে গেল। আমি, আমরা কাউকে আঘাত করিনি। তবু ভয়ে মেয়েদের চেঁচামেচিতে কলাভবন জনশুন্য হযে গেলো। পুলিশ এল। আমি তখন দেয়াল ডিঙিয়ে (দেয়ালটা তখন নিচু ছিল ওদিকটায়) আজিজ মার্কেটে এলাম। এরপর বাড্ডায় চাচির বাসায় আশ্রয় নিলাম। পরদিন ইত্তেফাকে দেখলাম, বিরাট একখান সাব এডিটরিয়াল।

আমার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা- এমন অনেক কথা। হায় কপাল, পড়ুয়া টাইপ ছাত্র আমি। অসচ্ছল পরিবারের সন্তান। সারা বছর দিনরাত বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেীতে কাটাতাম। একদিনের এই প্রতিবাদে মাস্তান হয়ে গেলাম! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার সনদ বাতিল করার ঘোষণা দিলো। সে ঘোষণা পত্রিকার খবরে দেখলাম। সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটিকে শো-কজের জবাবে আমি যে লিখিতপত্র দিয়েছিলাম, সেটা ছিল অকাট্য ও ঐতিহাসিক- এঁরা বুঝল এটা মাস্তানের হাতে লেখা নয়। আমাকে নিয়ে কী করবে, কর্তৃপক্ষ খেই হারিয়ে ফেললেন। সিনিয়র অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক সাদউদ্দিনসহ প্রগতিশীল শিক্ষকেরা আমার ক্ষোভটা বুঝতে পেরেছিলেন। আমার মহসীন হলের প্রভোষ্ট আবু হেনা মোস্তফা কামাল বললেন, 'ও তো ভালো ছাত্র'। মহসীন হলমেট সলিমুল্লাহ খান বললেন, 'তোমার কথা প্রভোস্ট আমাকে জিগায়, আমি কি তো তোমাকে খারাপ বলতে পারি'? আসলে সে সমযে আমরা সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। সব মিলিয়ে বেঁচে গেলাম। একজন শিক্ষক হয়ে তিনি আমার গাযের জামা ধরে টানটানি করলেন আমাকে এর কী জবাব দেবেন আপনারা? বললাম, হু ইগনাইটেড দ্য ফায়ার? সেই প্রশ্নটাই সামনে চলে আসলো।

ঢাবি ইতিহাসে আলোচিত ঘটনার মধ্যে এটা একটা। অনেকের মনে আছে, অনেকে ভুলে গেছেন। বললাম এ জন্য যে, সেই প্রতিবাদের কারনে ওই বছর ঢাবি সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ফারজানা ইসলাম, আমি কিংবা কাউকেই শিক্ষক হিসাবে গ্রহন করা হল না। ফারজানা শিক্ষকতা পেল জাবি নৃবিজ্ঞান বিজ্ঞানে। আমি অত্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও সিভিল সার্ভিসে ঢুকে ম্যাজিস্ট্রেট হলাম। তবু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, অধ্যাপক এমাজউদ্দিন স্যার তখনও বোধহয় প্রক্টর। অধ্যাপক সাদউদ্দিন আমাকে দেখিয়ে বলেন, 'ওই দেখেন, আপনার সেই ছাত্র এখন ম্যাজিস্ট্রেট, বিচার করবেন কিভাবে'? অধ্যাপক এমাজউদ্দিন মেধায় ধারালো মানুষ ছিলেন না কিন্তু আমার ফাদার্লি মনে হত। সে সময় অনেকের মধ্যে সেটা ছিল।

আমার শিক্ষক হতে না পাবার কষ্টটা রয়ে গেলো। আমি সরকারি চাকুরি করার লোক নই। ফলে, আমি সুযোগ পেয়ে সিভিল সার্ভিস থেকে পিএইচডি করার জন্য স্টেট ইউনির্ভারসিটি অব নিউ ইয়র্কে চলে গেলাম। ফারজানা তখন ক্যামব্রিজে ডক্টরেট প্রোগ্রামে গেলো। ফোনে কথা হয় দুই মহাদেশে। দেশে ফিরে এসেও আমি জাবিতে গেলে নৃবিজ্ঞান কিভাবে যেন ওর সঙ্গে দেখা হযেছে। সৌজন্য বিনিময়ে কোনো ঘাটতি ছিল না। আসলে ঢাকা ও সাভারের ম্যাজিস্টেট হিসাবেও আমি জাবির আভ্যন্তরীন পরিস্তিতি সম্পর্কে অবগত এবং জরুরি অবস্থায় পুলিশসহ ভেতরে ঢুকেছি, ভেতরের কিছু খবর জানি।

ভিসি ফারাজানা ইসলাম কেনো দেড় কোটি টাকা বখরা দিতে গেলেন, তার কোনো ভালো ব্যাখ্যা নেই। আরো যে সব পারিবারিক অভিযোগ সেসব নিয়েও সন্দেহ দূর করা প্রয়োজন। এমন নৈতিক অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করা অনুচিত মনে করি। আসলে বিশ্ববিদ্যায়লের ভিসি পদটিকে, এমন পর্যায়ে অবনমিত করা হয়েছে এবং প্রতিদিন ভিসি প্রজাতির এমন খবর পাওযা যাচ্ছে, তাতে এটা আর সম্মানজক পদ নয়। ক্ষমতার কানেকশন চলে গেলে ভিসিরা ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়েই ঢুকতে পারবেন কি না সন্দেহ আছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকরদের ভিসি হবার কথা। তারা স্তব্ধ হয়ে সাইড লাইনে সরে গেছেন। প্যানেল থেকে সবচেয়ে নতজানুকে বেছে নেয়া হয়। তারা ছাত্র নেতাদের সঙ্গে মিলে ‘উন্নয়ন’ ভাগাভাগি করেন। যেখানে বা যে পর্যায়ে গেলে ভাগ মেলে না, তখন খবর হয়। এর আগে আনোয়ার ভাই (কর্ণেল তাহেরের ভাই) জাবির ভিসি থাকতে পারলেন না। আমরা তো দুরে সরে গেছি, বন্ধুরা অনেক জায়গায় ভিসি আছেন। কী কারণে একটা জাতির বাতিঘর নিভছে কারো না বোঝায় কথা নয়। সেটা মোকাবেলা করার দায় আপনাদের সকলের।"

Tuesday, October 1, 2019

সব সম্ভবের দেশ!



ছবি ঋণ: বাংলা ট্রিবিউন এবং...।

"লোকদের ঘরে-ঘরে গিয়ে লিখে দেওয়া হচ্ছে, 'মাদক ব্যবসায়ী'র বাড়ি। এই কাজটা করছে খোদ সরকারের আধা সামরিক একটি বাহিনী। কিসের ভিত্তিতে তারা মাদক ব্যবসায়ী বলে চিহ্নিত হলেন? কোনও আদালতের রায়ের ভিত্তিতে নয় বরং সেই বাহিনীর নিজেদের সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে।
অর্থাৎ তারাই অভিযোগকারী এবং তারাই বিচারক। কী ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপার- এ রাষ্ট্রে বাদীই বিচারক হয়ে উঠছে! অথচ এই রাষ্ট্রের সংবিধান নাগরিককে এইরকম অবিচার থেকে সুরক্ষা দেয়।

সংবিধান বলে উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের অবাধ সুযোগ দিয়েই কেবলমাত্র অভিযোগকারীকে যথাযথ প্রমাণের মধ্য দিয়ে অপরাধী সাব্যস্ত করতে হবে। অধিকন্তু আদালতের মাধ্যমে যদিও অপরাধ প্রমাণিত হয় তবুইও কারো বাড়িতে এই ধরনের বিজ্ঞাপন সাঁটানো যাবে না৷ এই যে, বাড়িতে গিয়ে লিখে দেওয়া 'মাদককারবারী' এটা তো কালেক্টিভ পানিশমেন্ট।
একটা বাড়িতে একজন ব্যক্তিই থাকে না। অভিযুক্তের নিরপরাধ সন্তান-সন্ততি, বৃদ্ধ বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী প্রত্যেককেই প্রকারন্তরে সামাজিক শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। একঘরে করে রাখার মত।

আপনি চিন্তা করুন, সে বাড়ির যে নিরপরাধ কিশোরটি স্কুলে খেলার মাঠে এই নিয়ে বুলিংয়ের শিকার হবে, প্রহসনের মুখোমুখি হবে তার মানসিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এ দেশের কোনও মানুষই নিশ্চয়ই সরকারি সাইনবোর্ডে মাদককারবারী লেখা কারো বাড়িতে বিয়ে করতে চাইবে না। ফলে সে বাড়ির অবিবাহিত ছেলে-মেয়েদের জীবন কোথায় গিয়ে ঠেকবে? শুধু বিয়ে কেন, কোনও সামাজিক সম্পর্ক কিম্বা লেনদেনেই জড়াবে না। একবার নিজেকে সেই স্থানে দাঁড় করিয়ে চিন্তা করুন। এটা তো ভয়াবহ জুলুম।

কোর'আন বলছে, ' وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰকোনও ব্যক্তির অপরাধের দায় কেবলমাত্র তারই- অন্য কেউ এর দায় বহন করবে না। (৬ঃ১৬৪) আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও বলছেন, 'কেউ তার পিতা বা ভাইয়ের অপরাধের জন্য কোনও শাস্তিভোগ করবে না'। (আন-নাসাঈ)

এটা তো ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি। এর বাইরে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, 'আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার'।
একই অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে, 'আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে'।

উপরন্তু এই সংবিধান 'লজ্জাজনক' শাস্তি থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দেয়৷ কিন্তু এই ঘটনায় যেমন, 'আইনানুগ ব্যবহার' থেকে অভিযুক্তকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তেমনই 'সুনামে'রও  হানি হচ্ছে। ফলত এই পুরো প্রক্রিয়াটিই অসাংবিধানিক ও অমানবিক একইসাথে অনৈসলামিক। এটা অসমর্থনযোগ্য। নাগরিক হিসেবে এই অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।

এই সংস্কৃতি সর্বত্র চালু হলে কাল কেউ হয়ত ফোন করে বলবে, বান্ডেল নিয়ে হাজির হতে। নইলে পরশু এসে আপনার ঘরের সামনে লিখে দিয়ে যাবে, 'মাদক ব্যবসায়ী', 'চোরা কারবারী', 'খুনী', 'ধর্ষক'-এর বাড়ি কিম্বা যা ইচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন শক্তিশালী একটা ব্যাপার৷ এখনই আওয়াজ তুলুন। এই নয়া অবিচারের সংস্কৃতি রুখতে হবে। নইলে খোদা না করুন আমাদেরই কাউকে নতুন সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হবে।"