Thursday, October 31, 2019

আমাদের সাকিব এবং...।




লেখক: Anupam Shaikat Shanto
"সাকিব আল হাসানকে নিয়ে করা রিপোর্টগুলো দেখলাম। ১৮ মাসের সাম্ভাব্য সাজার কথা অনেকেই হেডলাইন করেছেন! হেডলাইনে না-থাকলেও নিউজগুলোর ভেতরেই আছে সাকিব ভারতীয় জুয়াড়িদের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েছিলেন কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু যে কারণেই হোক আইসিসির এন্টি-করাপশন ইউনিটকে জানাননি। জুয়াড়িদের প্রস্তাব প্রত্যাখানের পরেও কেবল না-জানানোর অপরাধের শাস্তি ১৮ মাস হতে পারে কি না এই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছিলো বিধায়, আইসিসির কোডটা একটু ঘাটার চেষ্টা করলাম।

এই কোডের নাম হচ্ছেঃ Anti-Corruption Code for Participants সেখানে মোট ১১টা আর্টিকেলের মধ্যে ২ নাম্বার আর্টিকেলে (ARTICLE 2: OFFENCES UNDER THE ANTI-CORRUPTIONCODE) বিভিন্ন অপরাধের ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হয়েছে এবং ৬ নাম্বার আর্টিকেলে (ARTICLE 6: SANCTIONS) কোন অপরাধের জন্যে কি শাস্তি (অর্থাৎ কত বছরের জন্যে খেলা থেকে নির্বাসনে পাঠানো হবে) সেটি বর্ণিত হয়েছে।
আর্টিকেল-২ এ দুর্নীতি বিরোধী কোড অনুযায়ী যাবতীয় অপরাধকে চারটি ক্যাটেগরিতে ভাগ করা হয়েছেঃ
২.১: দুর্নীতি
২.২: বাজি
২.৩: অভ্যন্তরীন তথ্যের অপব্যবহার
২.৪: সাধারণ অপরাধ

এই সাধারণ অপরাধ ক্যাটাগরির ২.৪.২ থেকে ২.৪.৬ পর্যন্ত অপরাধগুলো হচ্ছে- আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটকে কোনরূপ বিলম্ব বাদে জানানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। সাকিবের যে অপরাধ সেটি পড়ে ২.৪.৪ এ: 'দুর্নীতি দমন কোড অনুযায়ী দুর্নীতির অপরাধে যুক্ত করার মত যেকোন আহবান বা আমন্ত্রণ কোনরকম অপ্রয়োজীয় বিলম্ব ছাড়াই দুর্নীতি দমন ইউনিটকে জানাতে ব্যর্থ হওয়া" (Failing to disclose to the ACU (without unnecessary delay) full details of any approaches or invitations received by the Participant to engage in Corrupt Conduct under the Anti-Corruption Code)।

সুতরাং, সাকিব যদি আসলেই এরকম কোন ফোনকল পেয়ে থাকে ও সেটি জানাতে ব্যর্থ হয় তাহলে সে এই অপরাধের অপরাধী। এবারে দেখি এই অপরাধের জন্যে শাস্তির মাত্রা কি? আর্টিকেল ৬-এ একটি তালিকা দেয়া আছে কোন অপরাধের জন্যে কি পরিমাণ সাজা দেয়া হতে পারে তার। এই সাজাগুলোর সবই আছে একটা রেঞ্জ হিসেবে, অর্থাৎ সর্বনিম্ন সাজা থেকে সর্বোচ্চ সাজা কি হতে পারে সে হিসেবে দেয়া আছে। প্রথম ক্যাটেগরির অপরাধ হচ্ছে, সরাসরি দুর্নীতিতে যুক্ত থাকা। ফলে তার সাজাও সর্বোচ্চ। মিনিমাম ৫ বছর থেকে ম্যাক্সিমাম আজীবন নিষিদ্ধ। দুই নাম্বার ক্যাটেগরির অপরাধ হচ্ছে বাজি। এখানে নিম্নতম সাজা ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ সাজা ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা। ৩য় ক্যাটেগরির অপরাধের মধ্যে (অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার) দুটো সাব ক্যাটেগরি আছে। প্রথম সাব-ক্যাটেগরির সাজা ১ বছর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা আর ২য় সাব ক্যাটেগরির সাজা হচ্ছে ৬ মাস থেকে ৫ বছর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা। একইভাবে ৪র্থ লেভেলের অপরাধের ক্ষেত্রেও (সাধারণ অপরাধ) দুটি সাব-ক্যাটেগরি আছে; প্রথম সাব-ক্যাটেগরির (অপরাধ ২.৪.১ থেকে অপরাধ ২.৪.৬) সাজা ৬ মাস থেকে ৫ বছর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা আর ২য় সাব-ক্যাটেগরির (অপরাধ ২.৪.৭ থেকে অপরাধ ২.৪.৯) সাজা হচ্ছে শূন্য থেকে ৫ বছর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা।

এই যে সাজার রেঞ্জ দেয়া হয়েছে, কোন ক্ষেত্রে সাজা বাড়বে আর কোন ক্ষেত্রে সাজা কমবে সেটি ৬.১ নাম্বার ধারায় (যথাক্রমে ৬.১.১ ও ৬.১.২ ধারায়) বলা হয়েছে। সাজার পরিমাণ বাড়বে যদি:
৬.১.১.১ অপরাধবোধের অভাব (ওই রিপোর্টেই জানা যাচ্ছে সাকিব ভুল স্বীকার করেছে নএবং ক্ষমাও প্রার্থণা করেছে)
৬.১.১.২ পূর্বতন রেকর্ড (সাকিব ১০ বছর আগেও একবার এরকম প্রস্তাব পেয়েছিলেন এবং সাথে-সাথে দুর্নীতি দমন ইউনিটকে জানিয়ে ছিলেন। একাধিকবার এরকম প্রলোভনের মুখে পড়েছেন কিন্তু কোনবারই টলেননি!)
৬.১.১.৩ ব্যক্তিগত ভাবে লাভের অংশ গ্রহণ করেছে প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে, গ্রহণকৃত অর্থের পরিমাণ (এটা মূলত আগের ক্যাটেগরির অপরাধগুলোর জন্যে প্রযোজ্য)

৬.১.১.৪ আন্তর্জাতিক ম্যাচের পাবলিক ইন্টারেস্ট কিংবা/এবং কমার্সিয়াল ভ্যালু ক্ষতি করলে (এটিও মূলত আগের ক্যাটেগরির অপরাধের জন্যে)

৬.১.১.৫ ম্যাচের ফলকে প্রভাবিত করলে (ঐ)

৬.১.১.৬ তার বা অন্য কারোর ওয়েলফেয়ার ব্যহত হলে (ঐ)

৬.১.১.৭ একাধিক জন একত্রে অপরাধটি করলে (সেই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে সাকিব একাই এই ফোনকল পেয়েছিলেন ফলে একাধিক জন মিলে প্রস্তাব গোপন করার প্রশ্ন নেই)
৬.১.১.৮ অন্য কোন অপরাধের অংশ হিসেবে এই অপরাধের সংশ্লিষ্টতা (সাকিবের অন্য কোন অপরাধের কথাও জানা যায়নি)

অর্থাৎ, সাকিবের অপরাধের মাত্রা (৬ মাস থেকে ৫ বছর) বাড়ার মত কোনকিছু পাওয়া যাচ্ছে না। এবারে দেখা যাক কি কি কারণে সাজার পরিমাণ কমতে পারেঃ
৬.১.২.১ ভুল স্বীকার (হ্যাঁ, সাকিব করেছে)

৬.১.২.২ পূর্বের রেকর্ড (হ্যাঁ, সাকিব এর আগে এরকম প্রস্তাবে সাড়া দেননি এবং সাথে সাথেই জানিয়ে ছিলেন)

৬.১.২.৩ অল্প বয়স/ অভিজ্ঞতার ঘাটতি (এটি সাকিবের ক্ষেত্রে নেগেটিভ! তিনি ২২ বছর বয়সে যে ভূমিকা নিতে পেরেছিলেন সেই ঘটনার ১০ বছর পরে একই ভূমিকা নিতে পারেননি। যাই হোক, এর জন্যে সাজার পরিমাণ বাড়বে-সেটি বলা হয়নি)

৬.১.২.৪ থার্ড পার্টির মাধ্যমে বা অন্য কোনভাবে জানার আগেই অপরাধ জানিয়ে দেয়া (কিভাবে দুর্নীতি দমন ইউনিট জানতে পারলো সেটি জানি না; কিন্তু সাকিব নিজে থেকে জানায়নি, সো এই পয়েন্টটাও কাজে লাগছে না)

৬.১.২.৫ অভিযুক্ত কর্তৃক দুর্নীতি দমন ইউনিটকে তদন্তে সহায়তা (হ্যাঁ, সাকিব করেছেন)

৬.১.২.৬ যেখানে অপরাধ আন্তর্জাতিক ম্যাচের কমার্সিয়াল ভ্যালু বা পাবলিক ইন্টারেস্টকে ক্ষতি করেনি (প্রযোজ্য না)
৬.১.২.৭ যেখানে অপরাধ ম্যাচের ফলাফলে প্রভাব ফেলেনি (ঐ)
৬.১.২.৮ যদি পার্টিসিপেন্ট আইসিসি, জাতীয় ক্রিকেট ফেডারেশন, কোন অপরাধ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ডিসিপ্লিনারি বডিকে যথেষ্ট সহায়তা দিয়ে থাকে (আগের ঘটনায় জানিয়ে সহায়তা করেছিলেন, তাছাড়া ক্যাপ্টেন হিসেবেও দলের ও দলের সদস্যদের ক্লিন ইমেজের কৃতিত্বও সাকিব পেতে পারেন)
৬.১.২.৯ পার্টিসিপেন্ট যদি অন্য অপরাধে অলরেডি সাজা পেয়ে থাকে (প্রযোজ্য না)
৬.১.২.১০ দুর্নীতি দমন ইউনিট তাদের বিবেচনায় যদি এমন কিছু পায় যার জন্যে সাজা কমানো উচিৎ মনে করে (দুর্নীতি দমন ইউনিটের বিবেচনা)

ফলে, এই সমস্ত ফ্যাক্টর আমলে নিলে সাকিবের সাজা কোন মতেই বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। ১৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা আসার সম্ভাবনা খুবই কম দেখি। এখন প্রশ্নটি হচ্ছে, আমাদের মিডিয়াগুলো কিভাবে এরকম সাম্ভাব্য সাজার কথা জানতে পারলো? এমন সাজার কথা আইসিসি/ এন্টি-করাপশন ইউনিট প্রকাশ করার আগে মিডিয়া, বিসিবি কিংবা এমনকি সাকিবের পক্ষেও কি জানা সম্ভব? এই প্রশ্নটি বস্তুত শুধু সাজার ব্যাপারে নয়, এরকম তদন্ত যে হচ্ছে বা আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিট যে সাজা দিতে যাচ্ছে, এটা মিডিয়া তো দূরের কথা সাকিব বাদে অন্য কারোর পক্ষে কি জানা সম্ভব? Anti-Corruption Code for Participants এর ৮ নাম্বার আর্টিকেলটি হচ্ছে জনগণের সামনে প্রকাশ এবং গোপনীয়ত (ARTICLE 8: PUBLIC DISCLOSURE AND CONFIDENTIALITY)। সেখানে ৮.১ ধারায় বলা হয়েছে: বিশেষ কোন পরিস্থিতি বাদে আইসিসি কিংবা কোন জাতীয় ফেডারেশন তদন্তাধীন কিংবা অভিযুক্ত কাউকে পাবলিকলি আইডেন্টিফাই করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না দুর্নীতি দমন ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে সাজা প্রদানের ঘোষণা দিচ্ছে!
এই যে বিশেষ পরিস্থিতির কথা যেটি বলা হচ্ছে, সেটিও নির্ধারণ করবে আইসিসি। আইসিসি যদি মনে করে খেলাটির ইন্টিগ্রিটি বা পার্টিসিপেন্টের ইন্টিগ্রিটি নষ্ট হচ্ছে এরকম ক্ষেত্র হচ্ছে- বিশেষ পরিস্থিতি (একটা উদাহরণও দেয়া আছে- যেখানে যথেষ্ট ক্ষতিকর ও অসত্য মিডিয়া স্পেকুলেশনের পরিস্থিতি)। অর্থাৎ আইসিসি বা বোর্ড তখনই কথা বলতে পারবে যখন পার্টিসিপেন্ট তথা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অসত্য- ক্ষতিকর মিডিয়া স্পেকুলেশন ছড়ানো হয়, তখন। পার্টিসিপেন্ট তথা অভিযুক্ত সেই খেলোয়াড়ের ইন্টিগ্রিটি রক্ষার উদ্দেশ্যেই বোর্ড কেবল মুখ খুলতে পারে। এছাড়া দুর্নীতি দমন ইউনিটের আনুষ্ঠানিক সাজা প্রদানের ঘোষণার আগে জাতীয় ক্রিকেট ফেডারেশন বা বোর্ডের বা আইসিসির কিছু বলার এখতিয়ার নেই।

ফলে, দেখা যাচ্ছে, গত দুদিনে আমাদের বিসিবি সভাপতি বেশ কবারই এই কোডের ৮.১ নাম্বার ধারাটি ভায়োলেট করেছেন। আফসোস এই যে, আইসিসি বা দেশের বোর্ড যদি এইসব ধারা অগ্রাহ্য করে সেক্ষেত্রে কোন সাজার কথা এই কোডে লেখা নাই। ফলে, তিনি হয়তো পার পেয়ে যাবেন কিন্তু আমাদের বোর্ড সভাপতি আইসিসির কোড বিরোধী কাজ করেছেন এতে কোন সন্দেহ নাই। এখন আবার আগের প্রশ্নে যাওয়া যাক! মিডিয়াই এই ঘটনা জানলো কিভাবে? দুর্নীতি দমন ইউনিট সাকিব বাদে এমনকি বোর্ডকেও জানায়নি, এটা কোড অনুযায়ীই তারা করতে পারে না। মিডিয়াকে জানানোর তো প্রশ্নই উঠে না! তাহলে, এই ঘটনা প্রকাশের একটাই উৎস থাকতে পারে, সেটি হচ্ছে সাকিব। এখন সাকিব কি এটা মিডিয়াকে জানিয়েছেন? সম্ভব? একটি মিডিয়ায় দেখলাম, সাকিব কয়েকদিন আগে নিজে বোর্ড সভাপতিকে এ বিষয় অবহিত করেছেন! তাহলে কি বিসিবি সভাপতি বা তার অনুগত কোন বিসিবি কর্মকর্তা এই বিষয়টিকে মিডিয়ায় জানিয়ে দিয়েছে?

সাকিবের ঘনিষ্ঠ একজনের সূত্রের বরাত দিয়ে একটি ফেসবুক পোস্টও চোখে এলো দুই বছর আগে সাকিব যখন এরকম ফোনকল পেয়েছিলেন তখনই সাকিব বিসিবি সভাপতিকে জানিয়েছিলেন, সভাপতি নাকি এনিয়ে সাকিবকে চিন্তা না করে খেলায় মনোযোগ দিতে বলেছিলো! সাকিবও ওই টুর্নামেন্টে মনোযোগ দেয় ও পরে ভুলেও যায়! এই সময়ে এসে সাকিবের উপরে ক্ষিপ্ত হয়ে বোর্ডের ভেতর থেকেই সভাপতির কোন অনুগত কর্মকর্তা দুর্নীতি দমন ইউনিটকে এই ঘটনা অবহিত করেছে; ফলে এ বিষয়ে তারা তদন্ত শুরু করেছে। এবং সাথে সাথে তারাই (অনুগত বিসিবি কর্মকর্তারাই) এ বিষয়ে মিডিয়ায় তথ্য ফাঁস করেছে।
জানি না, আসল সত্য কি! তবে, এতটুকু নিশ্চিত আজকের বোর্ড সভাপতির নেতৃত্বে আমাদের বিসিবি এবং আমাদের মিডিয়ার একটা অংশ সাকিব আল হাসানের ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছে।


সর্বশেষ: আইসিসির ওয়েব-সাইটে সাকিবের বিরুদ্ধে তিনটি চার্জের ভিত্তিতে তাকে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞার সাজা দেয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৮ সালের জিম্বাবুয়ে- শ্রীলংকা- বাংলাদেশের মধ্যকার ত্রিদেশীয় সিরিজের সময় ১ম দফা ও ২য় দফা প্রস্তাব পেয়েছিলো এবং একই বছরে আইপিএল এ হায়দারাবাদ সানরাইজ ও কিংস এলেভেন পাঞ্জাবের ম্যাচের আগে আরেকবার প্রস্তাব পেয়েছিলো। কোনবারই সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি ঠিকই, কিন্তু কোনবারই দুর্নীতি দমন ইউনিটকে জানায়নি। ফলে, নিম্নতম সাজাই তিনগুণ হয়ে দুই বছর হয়েছে। এর মধ্যে এক বছরের সাজা সাসপেণ্ডেড অর্থাৎ ভুল স্বীকার ও সাজার ব্যাপারে একমত হয়ে আকু'র শিক্ষামূলক প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে আকু'কে সহযোগিতা করতে চাওয়ায় এই সাসপেণ্ডেড সাজা সাকিবকে ভোগ করতে হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে সাকিব ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবরের পরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরতে পারবে। এই সাজার প্রেক্ষিতে কিছু কথা:

১. সাকিব যেহেতু অপরাধ করেছে, সেহেতু সাজা তার প্রাপ্য যদিও আমি মনে করি, জুয়াড়ির প্রস্তাব গ্রহণ না-করে ফিরিয়ে দেয়াটা বড় ব্যাপার। সে তুলনায় আকু'কে না জানানোটা ছোট ভুল। এরকম ভুলের জন্যে প্রতীকি সাজা হওয়া উচিৎ ছিল। ২ বছরের নিষেধাজ্ঞা অপরাধের তুলনায় অনেক বড় সাজা। এরকম ক্ষেত্রে তিন অপরাধের সাজা কিউমেলেটিভলি এড করার বা তিনগুণ সাজা প্রদানের কোন যৌক্তিকতা নেই!

২. অন্য সব স্পেকুলেশন বাদ দিলেও বিসিবি সভাপতির আচরণ, সংবাদ সম্মেলনের কথাবার্তা, সাকিবকে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে উপস্থাপন সবকিছুই প্রচণ্ড ঘৃণ্য! দেশের ক্রিকেটের সেরা সম্পদের তথা আমাদের ক্রিকেটেরই এরকম দুর্যোগপূর্ণ মুহুর্তে অভিভাবক হিসেবে পাশে না দাঁড়িয়ে বোর্ড সভাপতি সাকিবকে কালারড করার চেষ্টা করেছেন। আইসিসির কোড বরখেলাপও করেছেন।

৩. আইসিসির এরকম সাজার পেছনে ভারতের ভূমিকার ব্যাপারেও স্পেকুলেশন অনেকে করছে দেখলাম। ভারত সিরিজের আগ দিয়ে এরকম সাজা প্রদান। জুয়াড়ি ভারতীয়। আইপিএল ভারতীয়। এটি উল্লেখ করে বলা হচ্ছে আইসিসিও ভারতীয়! এইসবই স্পেকুলেশন! আসল সত্য আমরা সম্ভবত কোনদিনই জানতে পারবো না!"

Monday, October 28, 2019

আমাদের নায়ক-আমাদের কষ্ট!





জেনারেল Alm Fazlur Rahman
এই মানুষটিকে নিয়ে যে লেখাটা, আমাদের নায়ক [১] সেটা এখন বড় ম্লান, বড় খেলো! আমাদের নায়ককে আমরা এই প্রজন্ম যখন আমাদের নায়ককে উবু হয়ে পড়ে থাকতে দেখি তখন এই কষ্টের সঙ্গে তুলনা করা চলে কেবল মৃত্যুর! বড় অভাগা এই দেশ-দেশমা সে তার সেরা সন্তানদের ফেলে দেয়!
আহারে-আহারে, বড় অভিমান-বড় কষ্ট নিয়ে এই দেশেই ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে অন্য একজন মুক্তিযোদ্ধা রশিতে ঝুলে পড়েন! [২]। ভাবা যায়, একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত দেহ ১২ ঘন্টা ধরে গাছে ঝুলছে- এই দেশে, যে দেশটাই হয়েছে তাঁর জন্য...[৩]


এই লেখাটা লিখেছেন: জেনারেল Alm Fazlur Rahman. তাঁর অনুমতিক্রমে এখানে হুবহু ছাপা হলো:
"এই মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে তোলপাড় চলছে। তিনি ছেলের চাকরি খোয়া যাওয়াতে অভিমান করে ইন্তেকাল করেছেন।
এই মুক্তিযোদ্ধার গ্ৰাম আমার গ্ৰাম পুর্ব মোহনপুর থেকে ১৭ কি:মি দুরে একই উপজেলায়।
আমি অধমও দিনাজপুরের সন্তান। মুক্তিযোদ্ধা। কাটলা মুক্তিফৌজ ক্যাম্পের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ক্যাম্প ইনচার্জ ছিলাম। ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরে নিয়োজিত হয়েছিলাম। যুদ্ধের ময়দান থেকে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে ২য় বাংলাদেশ ওয়ার কোর্সে সিলেক্ট হয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে ভারতস্থ মূর্তি সামরিক এ্যাকাডেমিতে গমন করেছিলাম।

গত ২০১১ সালের ১৩ জুন থেকে আমাকে বাংলাদেশের সকল সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে যা অদ্যাবধি চলমান আছে। অর্থাৎ আমি বাংলাদেশের কোনো সেনানিবাসে প্রবেশ করতে পারি না। কারণ আমি নাকি সরকারের এবং জাতীয় সঙ্গীতের সমালোচনা করেছিলাম।
কখন, কোথায়, কার সামনে, কোন ভাষায় এই সমালোচনা করেছিলাম তার কোনো উল্লেখ না-করেই আমাকে 'সেনাসদর কোরো' থেকে একটি চিঠি দিয়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।

ঠিক একই ভাবে ২০০২ সালের ১৭ মার্চ বিনা নোটিসে আমার চাকরির সাড়ে চার বছর বাকী থাকতে আমাকে সেনাবাহিনী থেকে অকালিন বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল কোনো কারণ না জানিয়ে। ওই সময় আমি ১১ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ছিলাম মেজর জেনারেল হিসাবে।
সেনানিবাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের ফ্রি চিকিৎসা পাবার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। অবাঞ্ছিত ঘোষিত হবার কারণে আমাকে রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হয় না।

একটা অভিজ্ঞতা সবার সাথে শেয়ার করতে চাই। যেদিন আমি 'সেনাসদর কোরো' থেকে বাংলাদেশের সকল সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ঘোষিত হবার চিঠি পাই সেদিন আমার মনের অবস্থা কি হয়েছিল ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। শুধু মনে হচ্ছিল আমাকে বাংলাদেশে 'ওপেন জেল' দেওয়া হলো। মনে হচ্ছিল এদেশ আমার নয়। আমি এদেশের কেউ নই। আমার মাতৃভূমি যার মুক্তির জন্য ৭১ সালে আমি মরণপণ যুদ্ধ করেছিলাম সেই আমার মাতৃভূমি আজকে আমাকে তার সন্তান হিসাবে অস্বীকার করলো। খালি মনে হচ্ছিল আমি কোথায় যাবো? আমারতো যাবার কোনো স্থান রইলো না এই দেশে।

আমি আমার একমাত্র কন্যাকে বলেছি আমার মৃত্যুর পরে আমার মরদেহকে যেন কোনো প্রকার রাষ্ট্রীয় সম্মান না দেওয়া হয়। যেদেশে একজন জেনারেল হিসেবে আমাকে সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে, যে দেশের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় না সেদেশের এমন শত্রুর মর দেহকে কেন রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হবে? আমিই বা তা গ্ৰহন করবো কেন?
একটা অনুরোধ অবাঞ্ছিত ঘোষিত অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হয় তবে আমাকে যেন অভিমানি জেনারেল হিসাবে আখ্যায়িত না করেন। আরো একটি অনুরোধ আপনারা সবাই আমাকে ভুলে যাবেন। ভুলে যাবেন আমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। বাংলাদেশে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে এবং পরিচয় দিতে আমার খুব কষ্ট হয়।"
১. আমাদের নায়ক: https://www.ali-mahmed.com/2018/04/blog-post_24.html
২. আপনি মরে গেলেন...: https://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_28.html
৩. লাশ ঝুলে ছিল ১২ ঘন্টা...: https://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_02.html

Wednesday, October 23, 2019

আসিফার জন্মটা যদি আটকে দেওয়া যেত...!






আসিফা- আট বছরের শিশুটিকে প্রথমে অপহরণ করা হয়। তারপর ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে একসপ্তাহ বেঁহুশ করে টানা ধর্ষন করে গেল কয়েকজন মিলে, মন্দিরে! মিরাট থেকে আত্মীয় গেল ধর্ষন-উৎসবে শরীক হতে। পুলিশ অফিসারই বা বাদ যায় কেন? উত্থিত লিঙ্গ নিয়ে সেও চড়াও হলো। হ্যাঁ ততক্ষণে শিশুটি আর বেঁচে নেই। তাও লিঙ্গসুখ মেটানো হলো শেষবারের মতো। তাও... তাও!

আচ্ছা, একটা আট বছরের মেয়ে শিশুর যোনির ছিদ্র কতটুকু থাকে জানেন? বড়জোর একটা কাঠি ঢুকানোর মতো। সেখানে দিনের-পর-দিন, ঘন্টার-পর-ঘন্টা মেয়েটাকে ধর্ষণ করে গেছে শুয়োরের বাচ্চারা। রাষ্ট্রযন্ত্র নির্বিকার। সিস্টেম ধর্ষন উৎসবে সামিল।
ঘটনা গত জানুয়ারী মাসের। কিন্তু পুরো দেশ ঘটনার খবর পায় এপ্রিলে। হ্যাঁ, মেয়েটার নাম আসিফা বানু। আপনারা জানেন। তারপরও এখানে কিছু বিষয় খুব পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন। আপনারা কেউ কেউ বলছেন, 'ধর্ষকের কোনো ধর্ম হয় না'। অনেকে আরো কিছু পাশবিক ধর্ষণের ঘটনাকে তুলে এনে বলছেন এক্ষেত্রে চুপ কেন!

হ্যাঁ, সত্যি ধর্ষকের কোনো ধর্ম নেই। তার একটাই পরিচয় সে পুরুষ। অন্যান্য পাশবিক ধর্ষণ ও ততটাই পাশবিক যতটা আসিফা কেসের ক্ষেত্রে। গণধর্ষণও নতুন নয়। নির্ভয়া থেকে শুরু করে কামধুনী, বিহার থেকে হাইলাকান্দি হয়ে নগাও, সর্বত্র একই ঘটনা দিনের-পর-দিন হচ্ছে। হয়েই চলেছে। পুরো দেশ জুড়ে ধর্ষণের মহৌৎসব চলছে। কিন্তু তা সত্বেও বলব, আসিফা কেস আলাদা। আলাদা কারণ এর আগে অব্দি কোনো কেসে সিস্টেম, পুলিশ, সরকার, সাধারণ মানুষ এভাবে ধর্ষকদের বাঁচানোর চেষ্ঠা করেনি! এবং ধর্ষককে এই বাঁচানোর প্রয়াসটা, ট্রেন্ডটা সুস্থ সমাজের ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর। আর এখানেই আসিফার খুন এবং ধর্ষণ আলাদা। কিভাবে সেটা একে একে বলি -
ক) ইতিপূর্বে কোনো ধর্ষণের কেসে জাতীয় পতাকা হাতে ধর্ষকদের সাপোর্টে মিছিল বেরোয়নি। হ্যাঁ জাতীয় পতাকা। তেরাঙগা!
খ) এর আগে কোনো রেপ কেসে কেউ বলেনি ধর্ষকদের এরেস্ট করলে গায়ে আগুন দেব।
গ) এর আগে কোনো রেপ কেসে, উকিলেরা দলবদ্ধ ভাবে পুলিশকে কোর্টে চার্জশিট জমা দিতে বাধা দেয়নি, তাও 'জয় শ্রীরাম' ধ্বনি দিয়ে।
ঘ) এর আগে মন্দিরে পুরোহিত, সিস্টেম (পুলিশ) এবং অন্যান্যরা এইভাবে ধর্ষণযজ্ঞে মেতে ওঠেনি।

পুলিশ তার চার্জশিটে লিখেছে ওই অঞ্চলে ভয় এবং ত্রাস সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এবং ওই যাযাবরগোষ্ঠীকে অঞ্চল ছাড়া করতে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে এবং আসিফা ছিলো সহজ শিকার!! একটা ধর্মের, একটা কমিউনিটির, বিধর্মীদের প্রতি কতটুকু ঘৃণা, বিদ্ধেষ থাকলে এরকম ঘটনা ঘটানো যায়? আসিফার ধর্ষণও অন্যান্য ধর্ষণের মতোই ধর্ষণ কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করার জন্য এই পরিকল্পিত ধর্ষণ ঘটানো হয়েছে।
তারপরও যেসব সিউডো সেকুলার এবং সিউডো নারীবাদীগণ বলছেন যে ধর্ম জড়াবেন না, তাদের কাছে প্রশ্ন ধর্ম কারা জড়াচ্ছে? যারা ধর্ষকদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাদের সমর্থনে মিছিল মোর্চা মিটিং করছে তারা, নাকি আমরা? যারা হিন্দু একতা মঞ্চ তৈরি করছে তারা, নাকি আমরা? যে মহিলারা ধর্ষকদের সমর্থনে গায়ে আগুন দেওয়ার হুমকি দিলো তারা, নাকি আমরা? যে হিন্দু একতা মঞ্চ জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল করলো, তারা নাকি আমরা?

যখন কোর্টে চার্জশীট ফাইল করতে গেলো পুলিশ, তখন জম্মু বার এসোশিয়েশনের উকিলরা অবরোধ করে স্লোগান দিলো 'জয় শ্রী রাম'। তারও পরে কোর্টের বিচারপতিরা পুলিশকে ৬ ঘন্টা অপেক্ষা করাল। চার্জশিট তারা নেবে না। ৬ ঘন্টা অপেক্ষারত পুলিশের থেকে শেষমেষ চার্জশিট গ্রহণ করা হলো। এই গোটা সার্কাসটা যারা করলো তারা, নাকি আমরা? বলুন হে শুয়োরের অবৈধ ছানাগণ, বলুন! শুনতে চাই আমি। আপনাদের হিপোক্রেসীর লেভেলটা বুঝতে চাই!!
আর যে অবৈধ শূকরছানাগণ ক্রমাগত অমুক জায়গার তমুক ঘটনার কথা কেন বলা হচ্ছে না, ইত্যাদি-প্রভৃতি বলে জাস্টিফাই করে চলেছেন এই অপরাধের তারা আসলে এক একেকটা আস্ত কুত্তার বাচ্চা। মনে মনে এই চুড়ান্ত পাশবিক অপরাধের সমর্থক। এবং সময় সুযোগ পেলে তারাও যে এই একই ঘটনা ঘটাবে না তা নিশ্চিতরূপে বলা যায় না।

আর যে ইন্টেলেকচুয়াল পাবলিকগণ, 'All Rapist Should Be Punished' বলে সাইনবোর্ড ঝোলাচ্ছেন তাদের বলছি, অবশ্যই সব ধর্ষক শাস্তি পাক, আন্দোলন হোক, প্রতিবাদ প্রতিরোধ হোক এবং আপনিও প্রতিটা ধর্ষণের প্রতিবাদ করুন, কিন্তু আসিফা খুন এবং ধর্ষণের যে ধর্মীয়-রাজনৈতিক চরিত্র সেটা মুছে দেওয়ার জন্যে যদি আপনার 'অল রেপিস্ট শুড বি পানিশড' সাইনবোর্ড ঝুলে তাহলে আপনিও কিন্তু প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ দুইভাবেই ধর্মীয় মৌলবাদের গোড়ায় জল ঢালছেন। আপনার জানার কথা ছিলো যুগে যুগে ধর্ম, যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ধর্ষণকে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় আধিপত্যের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যে গুজরাটের বিলকিস বানুই হোক বা কাশ্মীরের আসিফা। তাই ভারত নামক রাষ্ট্রে ধর্ষকের ধর্ম হয়না কিন্তু রাজনীতির ধর্ম হয়। আর আসিফা ধর্ষণটি একটি রাজনৈতিক ধর্ষণ।
আখলাক, পেহলু খান, জুনেদ, আফরাজুল হয়ে আসিফা...। একটা কমিউনিটিকে ক্রমাগত ভয় দেখিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্ঠা করা হচ্ছে। তাই এখানে ধর্ম নেই হলে এড়িয়ে যাওয়া মানে নিজেকে 'বুদ্ধিবিচি' নামক জন্তুতে পরিণত করা।

ভাবা যায়, ধর্ষকদের পক্ষে একটা দেশের জাতীয় পতাকা মিছিলে হাঁটছে...!

বিবিসি এই প্রতিবেদনে বলছে, "...two ministers from the Hindu nationalist Bharatiya Janata Party (BJP) attended a rally in support of the accused." (The party’s MLAs from Kathua and Hiranagar constituencies, Rajeev Jasrotia and Kuldip Raj, were also present at the rally, reported The Indian Express.) কল্পনা করা যায়, একটা দেশের  দুইজন মন্ত্রী ধর্ষকদের পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন:



আহা, কল্পনা করতে চাইলে একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন না যে এই মেয়েটি আপনার-আমারও হতে পারত...।
... ... ...
অবশেষে অপরাধিদের বিচারে সাজা হয়...


Friday, October 18, 2019

দুইটি ছোট গল্প ও কূপমন্ডূক আমরা...!





লেখক: Mahmud Rayhan


"ওটিতে বসে আছি। আমাদের ওটি-ব্রাদার এসে বলছে, 'স্যার আমার এক আত্মীয় ইন্ডিয়া যাবে ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু ওর ব্যাথাই কমতেছে না। আপনি কোন একটা ঔষধ লিখে দেন যেন আর চার পাঁচটা দিন একটু সহ্য করতে পারে'।
আমিও একটু উৎসুক হয়ে জানতে চাইলাম, 'কী এমন ব্যাথা যে ইন্ডিয়া যাওয়া লাগবে'?

পরে সে ভাইবারে সব রিপোর্ট আর কাগজপত্র পাঠাল আমাকে৷ এই রোগীর একটা ম্যালিগন্যান্সি, এডভান্স কেস৷ তবে তার চেয়েও বড় সমস্যা হল তীব্র পেটে ব্যথা। এজন্য তার বাংলাদেশের মোটামুটি-সব এই বিষয় ও আশেপাশের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দেখানো সারা। কেমোথেরাপিতে খুব একটা লাভ হবে না, তবে ব্যথাটা কমালে তার আসল উপসর্গ ই চলে যায়...। শেষমেষ বাংলাদেশের এই বিষয়ের পিতৃপ্রতীম একজন তাকে বলেছেন ভারতে গিয়ে নাকি এটা ব্লক (আসলে সিলিয়াক প্লেক্সাস ব্লক) করে আনা যায়। তাই ধারকর্জ করে ভারত যাবার প্রস্তুতি।

নিজে সার্জারির ট্রেইনি হওয়ার সুবাদে কিছু মানুষকে অন্তত চিনি যারা তুলনামূলক তরুণ হলেও সব খবর রাখেন। আমার সেই স্যারের কাছ থেকেই জানলাম বাংলাদেশের একটা ইনস্টিটিউট-এ এই প্রসিডিওর নিয়মিতই হচ্ছে এবং খরচ একদম ই হাতের নাগালে! এই কথাটা ওটি-ব্রাদারকে জানালে সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। তার আত্মীয় নাকি এই টাকা জোগাড়ের জন্য দুধের গরু, চাষের জমি সব বিক্রি করেছে।

পরের রোগী এখনো আমাদের হাসপাতালে ভর্তি। তার সমস্যা ৩ বছর ধরে মাঝে-মাঝেই পেটে প্রচন্ড ব্যথা হয় আর ডায়াবেটিস একদমই কন্ট্রোলে থাকে না। রোগী মহিলা আর তিনি দুইজন স্মার্ট 'ইয়ো-ইয়ো' টাইপের ছেলের জননী। ম্যালা দিন ধরেই বিভিন্ন ডাক্তার দেখাচ্ছেন আর বিভিন্ন ঔষধ খাচ্ছেন কিন্তু যেই লাউ সেই কদু!
(আগের আল্ট্রাসাউন্ডগুলোর মধ্যে দুইটাতে পেলাম তারা অগ্নাশয়ে পাথর সন্দেহ করছেন। রোগীর আসল রোগও তাই। এই পাথরে অগ্নাশয়ের মুখ যখন বন্ধ হয়ে যায় তখনই ব্যথা আর প্রদাহ। সেইসাথে ডায়াবেটিস ফ্রি)।

রোগীর দুই পুত্রকে রুমে এনে জিজ্ঞেস করলাম, 'তোমরা দুই ভাই থাকতে তোমাদের মায়ের এই রোগ নিয়ে এখনো ঘুরছে কেন? অপারেশন করলেই তো উন্নতি হবার কথা'৷
দুই ভাই আমাকে যা জানালো তার সারমর্ম হল, তারা গুগল-টুগল ঘেঁটে দেখেছে বাংলাদেশে এইরকম অপারেশন খুব একটা হয় না তাই তারাও আগামী মাসে মায়ের জন্য ইন্ডিয়াতে এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছে। মাঝখানে হঠাৎ ব্যথা বেড়ে যাওয়াতে বিপদে পড়ে হাসপাতালে এসেছে।
তারা এও বলল যে ইন্ডিয়ানরা কতটা আন্তরিক৷ তাদের নক করার পরপরই নাকি হাসপাতাল থেকে ওরাই যোগাযোগ করেছে, ভিসা-টিসার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছে, মায় হোটেলও যে পাবে সেই ব্যবস্থাও করে রাখবে।

গতকাল সারাদিন দৌড়াদৌড়ি এর পর রাত ১২ টার কি জন্য যেন টিভি এর সামনে বসেছি। রাত ১২ টায় সংবাদপত্রের শিরোনাম নিয়ে একটা অনুষ্ঠান হয়। তাতে কোন একটা পত্রিকার একটা লীড নিউজ ছিল, বছরে ৪০০ কোটি ডলার ভারতে যাচ্ছে চিকিৎসা খাতে... [১]। ৪০০ কোটি ডলার আসলে কত টাকা? ব্যাংক রেট ধরলেও ৩৬ হাজার কোটি টাকা ! এই টাকায় একটা পদ্মা সেতু হয়ে যায়।

এটাতো গেল খালি মেডিকেল ভিসায় যারা গেছেন তাদের প্রদর্শিত অর্থ। আপনি শিওর থাকেন টুরিস্ট ভিসায় গেছেন তার দেড় গুণ। আর অপ্রদর্শিত ভাবে গেছে তারো দ্বিগুন অর্থ! কত টাকা হল তাহলে? আপনি ভাবতে থাকুন...সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বাদ ই দিলাম।
ভারত (সব সেন্টার না), সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড আমাদের থেকে জ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে আছে এটা অনস্বীকার্য৷ কিন্তু নিজে ডাক্তার হয়ে জানি যেসব চিকিৎসা নিতে মানুষ বিদেশে যায় তার ৮০% দেশেই হয়, দেশেই করা সম্ভব। কিন্তু ওই যে আমাদের কূপমন্ডূকতা।

আমাদের ১০০ রোগি দেখার সময় আছে কিন্তু ১০০০ রোগীর ফাইন্ডিংস নিয়ে একটা জার্নাল লেখার সময় নেই। আমাদের বড় স্যারেরা বড়-বড় অপারেশন করেন অবলীলায় কিন্তু সেটা মানুষকে জানাতে, সেটা নিয়ে দুই কলম লিখতে চান না। এভাবে হয় না, এভাবে হবে না। এখন এই যুগে টিকে থাকতে হলে কাজ করতে হবে, জানাতেও হবে।

আরেকটা সমস্যা হল তথ্যের বড় অভাব৷ আমরা মানি বা না-মানি সারা দুনিয়া চলে এসেছে অনলাইনে। এখন কেউ ফোন দিয়ে বা পাতা উল্টিয়ে খোঁজার চাইতে গুগল করে নিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বাংলাদেশের কয়টা সেন্টারের ওয়েবসাইটে আপনি কাংখিত তথ্য পাবেন? প্রথম রোগীর ক্ষেত্রে আমার নিজেরই সন্দেহ আছে, স্যার নিজেই জানতেন কিনা এই কাজ বাংলাদেশেও করা যায়!

আরেকটা জিনিস হল রেফারাল। একজন সব কাজ পারবেন না এটাই স্বাভাবিক আর সব সেন্টারে সব ফ্যাসিলিটি থাকবে না এটাই বাস্তবতা। তাই রোগীর ভালর জন্য অন্য কারো কাছে রেফার করে দেয়াটাতে আমি কোন লজ্জা দেখি না, বরং রোগীর ভাল চাওয়াটাতেই ভাল ডাক্তারের পরিচয়।"

সূত্র:


Thursday, October 17, 2019

মাকাল ফল এবং অন্যান্য...।

এসপি মহোদয় বললেন, আবরারের পরিবার [১] জামায়েত-শিবির:
পুলিশ যখন জামায়েত শিবির ট্যাগ লাগিয়ে দেয় তখন সেই সাবজেক্ট বাঁচলেই কী আর মরে গেলেই কী! এই নিয়ে আমরা গা করি না। পুলিশ তাও একজন এসপি যখন এমনটা বলেন তখন অবিশ্বাস করার কিছু নেই। কিন্তু জামায়েত-শিবিরের একটি পরিবারকে তো আর প্রধানমন্ত্রী বুকে টেনে নেবেন না!

পুলিশের পক্ষেই বলা সম্ভব দুই মিনিটের মধ্যে জানাজা শেষ করার জন্য:

এ-ও সত্য পুলিশ ইচ্ছা করলে কী না পারে:

এই-্ই এক দেশ!  এখানে অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা স্যারদের জরুরি অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা-সাহস-ক্ষমতা-মেরুদন্ড-ইয়ে নেই। এরা ইয়ের পানে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। যেমনটা বুয়েটের ভিসি মহোদয়!


কিন্তু সায়ীদ স্যার কেবল শাড়িতেই [২] মুগ্ধ হন না, বুয়েটের ভিসি নিয়েও:



দলবাজরা বলবেন, ওহো-আহো, কোনও ভিসি সাহেব হতে পারবেন না এমন তো কোনও নিয়ম...ব্লা-ব্লা-ব্লা। ওহো-রসো, আচ্ছা, এই স্যার যদি জগা বাবুর পাঠশালায় একটা 'উক্কা দৌড়' মারেন তাহলে কি জেল-ফাঁসি হবে! হবে না, এটা তো আমরা বিলক্ষণ জানি। কিন্তু বুঝলেন, পারা যায় না এমনটা...।

এবার অন্য প্রসঙ্গ। অবিশ্বাসের চোখে মাকাল ফল নিয়ে অনেক উদাহরণ শুনেছি। সামনাসামনি যখন দেখেছি তখন অবলীলায় বিশ্বাস করেছি...:

সহায়ক সূত্র:
১. আসেন একটু...https://www.ali-mahmed.com/2019/10/blog-post_10.html 
২. শাড়ি...https://www.ali-mahmed.com/2019/09/blog-post_9.html


...   ...   ...

লেখাটা লিখেছেন, বুয়েটের শিক্ষিক অরিক সুবহানা 
"বুয়েটে এক টার্ম যেতে না যেতেই কেমন জানি এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা আর হতাশা ভর করে স্টুডেন্টদের মাঝে। আগে মনে হতো বুয়েটে চান্স পাওয়ার আনন্দে খেই হারিয়ে ঠিকমতো পড়ালেখা করে না, যার জন্য ১-১ এর রেজাল্ট খারাপ হয়...আত্মবিশ্বাস হারিয়ে একসময় পড়ালেখাটা পুরোপুরিই ছেড়ে দেয়, শুরু হয় হতাশার দুষ্টচক্র। নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের হাতে নৃশংসভাবে আবরার খুন হওয়ার পর এভাবেই নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন বুয়েট এর ডিপার্টমেন্ট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রভাষক আরিক সুবহানা। ফেসবুকে দেওয়া তাঁর পোস্টটি তুলে ধরা হলো।

এই টার্মে প্রথমবারের মতো আমার লেভেল ১, টার্ম ১ এর থিওরি ক্লাস নেওয়ার সৌভাগ্য হয়। অন্য লেভেল টার্মের থিওরি ক্লাস নেওয়ার পর ১-১ এর ক্লাস নিয়ে একটা পার্থক্য পরিষ্কারভাবে আমার চোখে পড়ল। তা হলো ১-১ এর প্রতিটা ছাত্র-ছাত্রী ক্লাসে খুবই মনোযোগী। ক্লাসে এদের উপস্থিতি মোটামুটি ১০০% ছিল সব সময়ই, এবং ১ ঘণ্টার ক্লাসের পুরোটাই ফার্স্ট বেঞ্চার থেকে শুরু করে লাস্ট বেঞ্চার পর্যন্ত প্রত্যেকেই খুব মন দিয়ে শুনত। যেসব জায়গায় প্রশ্ন আশা করতাম, তারা প্রশ্ন করত- একজন নির্দিষ্ট মানুষই যে সব সময় প্রশ্ন করত তা নয় বরং ফার্স্ট বেঞ্চার থেকে শুরু করে লাস্ট বেঞ্চার সবাইই ক্লাসে ইন্টার‍্যাক্টিভ ছিল। সিটিগুলোর সময়ও তারা পারুক বা না পারুক, পড়াশোনা করে এসেছে এবং চেষ্টা করেছে এতটুক বোঝা যেত। অথচ এই সেইম ব্যাচটার ক্লাসই আমি যদি আবার সামনের বছর তারা ২-১ এ উঠলে নেই, পূর্ব অভিজ্ঞতা হতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে তারা ক্লাসে কতটুকু ইন্টার‍্যাক্টিভ থাকবে, সিটিগুলোতে কতটুকু প্রিপারেশান নিয়ে আসবে। বুয়েটে এক টার্ম যেতে না যেতেই কেমন জানি এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা আর হতাশা ভর করে স্টুডেন্টদের মাঝে। আগে মনে হতো বুয়েটে চান্স পাওয়ার আনন্দে খেই হারিয়ে হয়তো তারা পি এল এ ঠিকমতো পড়ালেখা করে না, যার জন্য ১-১ এর রেজাল্ট খারাপ হয়, সারাজীবন নিজেকে ভালো স্টুডেন্ট জেনে আসা ছেলেটা এই খারাপ রেজাল্ট মেনে নিতে পারে না। ফলাফলে হতাশায় পড়ে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে একসময় পড়ালেখাটা পুরোপুরিই ছেড়ে দেয়, শুরু হয় হতাশার দুষ্টচক্র।

এখন বুঝতে পারছি আমার চিন্তাভাবনায় বড় রকমের একটা লুপহোল ছিল। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর হলের অত্যাচারের অনেক ঘটনা এই ক’দিনে প্রকাশ পেয়েছে- একেকটা ঘটনা পড়ে আমি কেঁদে ফেলেছি। তারাও আবরারের মতোই পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, এ রকম মার খাওয়ার পরেও তারা যে বেঁচে গেছে এটাই আশ্চর্য। কিন্তু এভাবে মার খেয়ে বেঁচে থাকতে হলে, সেই বেঁচে থাকাকে কি আসলেই বেঁচে থাকা বলে? ইংরেজিতে বললে, তারা হয়তো survive করে গিয়েছিল কিন্ত এরপর আর কখনোই তারা তথাকথিত land of living এ live করতে পারেনি। আমি খালি ভাবছি, ওই দিন যদি আবরার survive করে যেত তাহলে কী হতো? ১০ দিন পরে অনুষ্ঠিতব্য টার্ম ফাইনালে সে আদৌ বসতে পারত কি? বসতে পারলেও পরীক্ষা প্রস্তুতি সে কিভাবে নিত? সে কি এরপর আর হলে থাকতে পারত? থাকলেও কি সেখানে পড়াশোনা কন্টিনিউ করার মতো শারীরিক বা মানসিক সুস্থতা তার থাকত? থাকার তো কোনো কারণ দেখি না আমি। যথারীতি তার রেজাল্ট ভয়াবহ খারাপ হতো। আজকে মারা গিয়ে জনতার কাছে সে মেধাবী হিসেবে সম্মান পাচ্ছে, আর বেঁচে থাকলে তার কপালে লো সিজিধারী/ ল্যাগার তকমা জুটে যেত। সারাজীবন যে ছেলেটা টপার ছিল, নিজের একাডেমিক এই অবনতি সে সহজে মেনে নিতে পারত না- নিমজ্জিত হতো ডিপ্রেশনে। ডিপ্রেশনে আক্রান্ত মানুষ অন্যদের সাথে সামাজিক সম্পর্কও সহজে টিকিয়ে রাখতে পারে না। ফলাফলে তার বন্ধুবান্ধব কমে আসত। আবার রেজাল্ট খারাপ হলে অনেক শিক্ষকই বৈষম্যমূলক আচরণ করেন। শিক্ষকরাও স্নেহ করেন না, বন্ধুও তেমন একটা নেই- এই অবস্থায় ক্লাসে যাওয়ার জন্য উৎসাহটাও সে হারিয়ে ফেলত। যেহেতু ক্লাস ঠিকমতো করে না, রেজাল্ট দিনদিন আরো খারাপ হতো, ডিপ্রেশন বাড়ত চক্রবৃদ্ধিহারে। এ যেন ডিপ্রেশনের দুষ্টচক্র পুরোপুরি। ওই দিকে সম্মানিত বড় ভাইদের শারীরিক অত্যাচারতো আছেই। সবমিলে সে পরিণত হতো একটা জীবন্ত লাশে। এ রকম শত শত জীবন্ত লাশ আজ বুয়েটের প্রতি ব্যাচে ব্যাচে।

যেখানে বুয়েটের বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী হলে থাকে সেখানে এই হলেই আমরা পড়াশোনার কোনো পরিবেশ দিতে পারছি না। ঢাকায় থাকা অল্পসংখ্যক স্টুডেন্ট যখন পি এলে বাবা মায়ের আদরে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে, রাত জেগে পড়লে মা দুধ বানিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, তখন হলে থাকা ছেলেগুলো খুব কাছেই ’পিতামাতাতুল্য’ শিক্ষকদের কোয়ার্টার থাকার পরেও চুপচাপ পশুর মতো মার খাচ্ছে। শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ জানানোর মতো সাহসটা পর্যন্ত তাদের নেই। শিক্ষকদের জানালে কোনো লাভ হবে- এই আশা তো তারা করেই না, উল্টো জানাতে গিয়ে পরে বিপদ আরো বাড়ে কি-না এই ভয়েই তারা শেষ- কী ভয়াবহ অসহায়তা!

ভাবছি, এই যে দেশ-বিদেশে বুয়েটের এত সুনাম তার কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য, প্রতিবছরই MIT, Stanford, UC Berkeley ইত্যাদিতে বুয়েটের স্টুডেন্টরা পোস্ট গ্রেডে চান্স পায় বা Google, Intel ইত্যাদিতে জব অফার পায়- তার কতটুকু ক্রেডিট আসলে বুয়েটের নিজের? বুয়েট তো শুরুতেই প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সারা দেশের ১০০০ জন ক্রিম ছাত্র-ছাত্রী আলাদা করে ফেলে। বুয়েটকে তো আসলে তখনই ক্রেডিট দেওয়া উচিত যদি এই ১০০০ জন ক্রিম ছাত্র-ছাত্রীর প্রত্যেককে সে দক্ষ গ্র‍্যাজুয়েট বানাতে পারে, কারণ ওই ১০০০ জন স্টুডেন্টের প্রত্যেকেরই যথেষ্ট যোগ্যতা আছে। অথচ বাস্তবচিত্র হচ্ছে ১০০০ জন ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে বড়জোর ১০০ জনই হয়তো দিনশেষে বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পায়, বড় বড় রিসার্চ করে, সারা পৃথিবীর মানুষ তখন বুয়েটকে চেনে। আর এই ১০০ জনের দোহাই দিয়ে আমরা দম্ভে গৌরবে নাচানাচি করি। বাকি ৯০০ জন পটেনশিয়াল স্টুডেন্টের যোগ্যতাকে আমরা যে গলাটিপে হত্যা করেছি, তা যেন আমরা দেখেও না দেখার ভান করতে চাই। অথচ ১০০০ জন মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর দায়িত্ব নিয়ে মাত্র ১০০ জনের মেধাকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি, তার মানে আমাদের এফিশিয়েন্সি মাত্র ১০%- এটা কি আমাদের সিস্টেমের বিশাল ব্যর্থতা নয়? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, খোঁজ নিলে দেখা যাবে ওই ১০০ জনের মাঝে ৯০ জনের বাসাই ঢাকাতে ছিল তাই তারা সুস্থ পরিবেশে পড়াশোনা করতে পেরেছিল। তারা যদি বুয়েটে নিয়মিত ক্লাস না-ও করত, তবু তারা দিনশেষে ভালোই করত। আফটার অল, সব টপিকের চমৎকার সব লেকচার আজকাল ইউটিউবেই অ্যাভেইলেবল।

আরেকটা ব্যাপার। হলে যারা নির্যাতনের শিকার হয়, তারাই কি শুধু আমাদের এই ত্রুটিপূর্ণ সিস্টেমের ভিকটিম? আমিতো মনে করি, যারা নির্যাতন করে তারাও আমাদের এই সিস্টেমেরই ভিক্টিম। আজকে যদি আমরা অসুস্থ লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতিকে শক্ত হাতে প্রতিহত করতাম, র‍্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতাম, হলের ছাত্রদেরকে বাবা-মায়ের মতোই শাসনে রাখতাম তাহলে ওই ছেলেগুলোও হয়তো বিপথগামী হতো না। যখন তারা বাবা-মায়ের কাছে ছিল তখন তো তারাও লক্ষ্মী আর পড়ুয়া ছাত্রই ছিল, তারাও নিজ নিজ স্কুল কলেজে টপার ছিল। বাবা-মায়ের লক্ষ্মী সন্তানদের অসুস্থ পরিবেশে এনে আমরা নিজ হাতে তাদের খুনি বানিয়েছি। আমরা আসলে আবরারের খুনিদের চেয়েও জঘন্য অপরাধী। আজ যদি আমরা প্রায়শ্চিত্ত না করি তাহলে দয়াময় খোদাও আমাদের কোনোদিন মাফ করবেন না। আজ সময় এসেছে এই ভাঙাচোরা সিস্টেমটাকে ঠিক করে ঢেলে সাজানোর। সিস্টেম ঠিক না হওয়া পর্যন্ত অন্তঃসারশূন্য একাডেমিক কার্যক্রমের আসলে কোনোই মূল্য নাই।

প্রসঙ্গত, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ঘটনায় এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে ১৬ জন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আজ মঙ্গলবার সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালাতে গিয়ে ধরা খেয়েছে আবরারের ঘটনার আরেকজন আসামী সাদাত। এ নিয়ে গ্রেফতারের সংখ্যা দাড়ালো ১৭। এর আগে গ্রেফতারকৃতরা প্রায় সকলেই স্বিকার করেছে সকলেই এবং সেই অনুযায়ী সকলেই তারা জবানবন্দী দিয়েছেন। এ দিকে আবরারের ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে এখনো চলছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।"

Friday, October 11, 2019

তেলাপোকা যেমন আছে...।






"ফাহাদ আবরার তার সর্বশেষ স্ট্যাটাসে যা লিখেছে, আমি তা লিখি নাই। কারণ আমি ভীতু, সুবিধাবাদী, এবং 'বয়েলিং ফ্রগ সিনড্রোম '-এর কারণে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া কনফর্মিস্ট। নিউক্লিয়ার ওয়রের পরেও শুয়োরের মত ঘোঁত ঘোঁত করে আমি বেঁচে থাকবো। তেলাপোকা যেমন আছে।

আমাকে মারতে পারবেন না, কারণ আমি কথা বলি না, বাসে চড়ি না, মিছিলে হাঁটি না, স্ট্যাটাস লিখি না, পেঁয়াজ খাই না, বাঁশের কেল্লা পেইজেও যাই না। চুপচাপ বিবরবাসী হয়ে আছি। মুখে জিপার আঁটা, তাই এই রিজাইমে যেমন সমস্যা নাই, অন্য রিজাইমেও বেঁচেবর্তে থাকবো সহিসালামতে। খোদা উঠায়া না-নিলে এই রাজনীতির জন্য আমি ন হন্যতে!

এমনি এক জীবন-ধারণের স্ট্র্যাটেজি নিয়েছি। তো, আমাকে মারবেন কী প্রকারে?
কিন্তু এইসব ফাহাদ আবরার যখন মরতে থাকে, আমার দেহকোষগুলো আমাকে কামড়াতে থাকে। আমার ক্রিটিক্যাল চিন্তা, আমাকে চাবকাতে থাকে। আমি তবু অবিচল থাকি। চোখ বন্ধ করে রাখি। মনে মনে বলি, এটা এক্সেপশন। র‌্যানডম একটা ঘটনা।

কিন্তু কেমন হবে যদি আমার সন্তান এমনি একটা ঘটনার র‌্যানডম স্যামপ্লিং হয়ে ওঠে? আমার বন্ধ চোখের সামনে এমন একটা অ্যানিমেটেড দৃশ্য হাজির হয়, যেখানে আমার সন্তানও বিশ্ববিদ্যালয় নামক টর্চারসেলে তার সহপাঠী নামধারী কিলারদের হাতে মরে যায়! তার লাশ রিসিভ করার জন্য আমাকে খবর দেয়া হয়। আর তখনি আমি প্রাণপণে মরতে চাইতে শুরু করি। তাৎক্ষণিকভাবে, আমার এই সুবিধাবাদী অমরতার শেল ভেঙ্গে মরে যেতে চাই। যাতে ওর লাশ আমাকে রিসিভ করতে না হয়। যাতে আমার বেদনা এইসব টিভি ক্যামেরা আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভোগ্য না হয়ে ওঠে।

ফাহাদ আবরার তো মরেছে। কিন্তু দৈত্যটাকে আবার বোতলে ভরতে পারবেন তো?"

Thursday, October 10, 2019

আসেন একটু 'গফ' করি...।

যেহেতু এটা পত্রিকা অফিস না তাই গফ-গল্প করলে খানিকটা আঞ্চলিকতার টান থাকাটা খুব একটা দোষের কিছু না। ওহ, 'গফ' করলে তো একটা টপিক লাগে, লাগে না?

বুয়েটের আবরার নামের যে ছেলেটাকে তারই সহপাঠিরা পিটিয়ে মেরে ফেলল এই নিয়ে দেশ দেখি উত্তাল। ক্যান রে ভাই, তাল-উত্তাল ক্যান! এইটা কী এই 'পরথম'? নাকি পিটাপিটি যারা করল তারা ক্ষমতাশীন দলের ছাত্রলীগের বলে? শোনেন, এইটা আপনাদের মানায় না, বুঝলেন। আপনি এই দেশের বুদ্ধিজীবী-উইটিবি হলে না-হয় একটা কথা ছিল। কারণ, এরা রঙিন একটা চশমা লাগিয়ে রাখেন- কিছু একটা হলেই বলেন: উ-ই-ই মা, এতো আগে জানতুম না। যেন বুদ্ধিজীবী নামের ওই বি...হীন মানুষটা এই দেশে না, মঙ্গলগ্রহে বসবাস করেন।

ওহো, রঙিন চশমার বিষয়টা এইখানে খানিকটা ভুল বলেছি, সাদা চশমা লাগিয়েও ওই কাজটা অবলীলায় করা যায়। এই যেমন দেখুন আমাদের দেশের একজন সাহিত্যিক মহোদয় সাদা চশমা লাগিয়েও দেশে কোন সমস্যা দেখতে পাচ্ছেন না:

মিছরি মেশানো যে লেবেনচুষ আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়, শিবির বলে যে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেল আর জঙ্গি বলে গুম। ব্যস, খেল খতম। আমরা অজান্তেই সেই খেলার আমোদপ্রিয় দর্শক হয়ে পড়ি।


তসলিমা নাসরিন যখন এমন একটা লেখা লেখেন তখন আমরা গা করি না কারণ উম্মাদের[৪] সব কথা ধরতে নেই কিন্তু ...এসপি মহোদয়ের কথার অর্থ কী! আবরারের পরিবার জামায়াত-শিবির! ধরে নিলাম, জামায়েত শিবির। তো? এই দোহাই দিয়ে আপনি একটা ছেলেকে মেরে ফেলাটা জাস্টিফাই করছেন!
ওহে এসপি, মহোদয়, নীচের এই ভিডিও ক্লিপটা, এইটা যদি আপনের বাপ হইত তখনও কী আপনার বক্তব্য এই-ই থাকত নাকি খানিকটা বদলে যেত?



আবরারের যে স্ট্যাটাসটা ফেনি নদীর পানি সংক্রান্ত... ফেনি নদীর পানি  দেওয়ার কী আছে এই নদী থেকে ভারত তো চুক্তির আগেও পানি নিত। হুদাহুদি...!
    
আর র‌্যাগিংয়ের নামে অত্যাচার করাটা তো নতুন কিছু না। এদের মন-মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বিরুদ্ধাচারণ মানেই জামায়েত-শিবির। ওইটা তখন আর একটা মানুষ না। মারো-কাটো-বাটো, কোনও সমস্যা নাই! পোলাপানরা এই-ই করে-করে হাত পাকায়। কচু গাছ কাটতে-কাটতে ডাকাত। এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাম হাতটা যথারীতি বেশি পাকায় দলীয় পান্ডারা: 




আগেও নানা সময়ে পেটানোর  ঘটনা ঘটেছে এমন প্রশ্নের উত্তরে শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ বলেন, "...কোনো শিক্ষার্থী আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ করেনি যে তারা নির্যাতিত হয়েছে"
এই এক চুতিয়ামার্কা কথাবার্তা। আমাদের দেশের বিভিন্ন পেশায় আমাদের বেতনভুক্ত কর্মচারীরা এই কথাটা খুব বলেন। ডিসি সাহেব বলেন, ওসি সাহেব বলেন, ছলিমুল্লা সাহেব বলেন...। এই যেমন অন্য এক প্রসঙ্গে দাউদকান্দি থানার ওসি বলেন, ‘বিষয়টি পুলিশের জানা ছিল না। কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে[২] 
অভিযোগ করতে হবে কেন! যেখানে অসঙ্গতি দেখা যাবে সেখানেই ব্যবস্থা নেবেন। ছদুমদুর কথা- অভিযোগ দিয়ে কল্লা হারায় আর কী! এদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো কোন ঘটনা ঘটলে অভিযোগ না-দিলে এরা কেউ নড়বেন-চড়বেন না। এখন ধরুন কেউ যদি এতিম কোন মানুষকে খুন করে ফেলে [৩] তাহলে তাকে ধরাধরির কোন বালাই নেই কারণ ব্যাটা তো এতিম তার উপর মাটির নীচে এমন ভঙ্গিতে শুয়ে আছে যে নড়াচড়ার নিয়ম নাই। অভিযোগ করবেটা কে শুনি? ব্যস, মামলা ডিসমিস।

আবরার খুন প্রসঙ্গে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর হেডলাইন, 'পুলিশ জেনেও তৎপর হয়নি''। ওয়াল্লা, এইটা কী নেপচুন গ্রহের 'পরতিকা'? এরা কী জানে না পুলিশ দুদ্দাড় করে হল-বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়লে সে যে এক আরেক কাহন। এই দেশে ক্ষমতাশীন দলের সাধারণ কোনও-এক পাতি নেতাও পুলিশ অফিসারকে চড় মারে। আইজিপিকে বলে ভাই...।
এইটা হচ্ছে আমাগো জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার টিজার। 'আবরারের মায়ের আকুতি। ভিডিও দেখতে কিউআর কোডটি স্ক্যান করুন'। মতি মিয়া স্যারের কাছে সবই পণ্য!

এই খুনের প্রসঙ্গে প্রভোস্ট-ট্রভোস্ট, প্রক্টর-ট্রক্টর গ্যাম্বলের দিকে আঙ্গুল তোলার পূর্বে অন্য একটা গফ বলি। আমাগো সমুদ্রজয়ের পর-পরই ঠিক করা হলো এটার একটা 'ছেলিব্রেশন' করা হবে। এই কর্মকান্ডে তো একটা কমিটি করা লাগে। সেই কমিটির জন্য কিছু সদস্যও তো করা লাগে। মাত্র ৫০১ জন সদস্য করা হয়েছিল। সেই সদস্যদের মধ্যে আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী মহোদয় ছিলেন[১]। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি জনাব, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক মহোদয়ও ছিলেন। আচ্ছা, কইনছেন দেহি, ২২ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর পিতা এই ভিসি মহোদয়ের এই-ই তাহলে কাজ ! এ যে এক অভূতপূর্ব!

এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের বুয়েটের উপাচার্য সাইফুল ইসলাম ছায়েব আবরারের জানাজায় পাঁচ মিনিট সময় দিতে পারেন না কারণ তখন তিনি আমাগো স্টারের স্টার মিনিস্টারের সঙ্গে 'সিটিংমিটিং'-এ ব্যস্ত ছিলেন।

আবরারকে খুন করার পর খুনিরা বসে আরামসে ফুটবল খেলা দেখছিল। চমকে গেলেন কী! আহা, এ তো বিচিত্র কিছু না। আপনের-আমার ছেলে-মেয়েটা যখন ফেসবুক ওরফে 'প্যাচবুকে' 'এস্টেটাস' প্রসব করে, "আমার মা আইসিওতে আছে তার জন্য ব্রো-সিস তুমরা প্রেয়ার করবা"। বলেই আর 'দিরং' করে না বাইরে কোথাও বসে-বসে লাইক আর কমেন্টের উত্তর দিতে গিয়ে পেছনের ঢোলা প্যান্টের ফাঁক গলে পাছা উদোম হয়ে পড়ে। কই, তখন তো আপনার-আমার গাত্রদাহ হয় না। আপনি-আমি তো তখন 'এস্মার্ট পুন' হাতে 'এস্মার্ট পুত' বলে মুত আটকে তিন উল্লাস করি। তো, লাগাইবেন ধুতরা গাছ আর ফল চাইবেন আপেল- ভাইরে, এইটা তো একটা 'ছইয়েরালি' মার্কা কথাবার্তা।
এরা যে রাগের মাথায় এই কান্ড করেছে এমন না, আগে থেকে আটঘাট বেঁধে... :

ভিন্ন মত প্রকাশে আমাদের সহিষ্ণুতার অভাব প্রকট। ভুল ম্যাসেজ কেমন করে যায় তার একটা উদাহরণ:

আমাদের দেশে দল করে-করে কেমন করে একটা মানুষ দলবাজ হয়ে পড়ে এর একটা ছোট্ট উদাহরণ:

যাই হোক, খুনিদের অনেককেই ধরা হয়েছে।
ধরা হয়েছে এ সত্য কিন্তু এ নিয়ে আমাদের মত বেকুবদের খুব একটা উচ্ছাস নেই কারণ আবু বকর খুনের মামলার রায়ে যেভাবে ছাত্রলীগের সব আসামী খালাস হয়েছিল এ ক্ষেত্রেও এমনটা হওয়া চিত্র-বিচিত্র কিছু না। সব সম্ভবের দেশ এটা! ক্যান রে ভাই, বিশ্বজিতের খুনিদের এখনকার অবস্থা জানেন না?

আসলে গোটা দেশটাই ডুবে আছে ফরমালিনে। এই তরল পদার্থটা সরিয়ে ফেলা মাত্র  বিকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে সবখানে...।    

সহা্য়ক সূত্র:
৩. এতিম: https://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_11.html
৪. তসলিমা...https://www.ali-mahmed.com/2019/08/blog-post_28.html

...
যে কথা লেখার শুরুতে বলছিলাম, এ পৈশাচিকতা নতুন না:
BUETian - বুয়েটিয়ান: "মারপিটে অংশগ্রহণকারীঃ
১। শুভ্র জ্যোতি টিকাদার (https://www.facebook.com/shuvrajyoty)
২। সিয়াম, ০৯ ব্যাচ (ডিস্ট্রাকটিভ সিয়াম নামে পরিচিত) (https://www.facebook.com/destructive.seeam)
৩। শুভম, ০৯ ব্যাচ (সিগমাইন্ড নামে এক কোম্পানি খুলেছে সে আর সিয়াম মিলে) (https://www.facebook.com/abushuvom)
(https://facebook.com/sigmindAI/)
৪। কাজল, ০৯ ব্যাচ (https://www.facebook.com/arifurkajol)
৫। রাসেল, ১০ ব্যাচ (পরবর্তীতে অনুতপ্ত হয়ে তাবলীগে যোগ দিয়েছে)
৬। কনক, ১০ ব্যাচ ( সাবেক সাধারণ সম্পাদক, শিক্ষক লাঞ্ছনার দায়ে বহিষ্কৃত) (https://www.facebook.com/konok.ahmed.5)
৭।টি আর, ১১ ব্যাচ (আসল নাম তানভির রায়হান) [https://www.facebook.com/tanvir.d.rayhan]

আমাকে তিতুমীর হলের ২শত ব্লকে '১০ ব্যাচের প্রতীকের রুমে ডেকে নিয়ে যায় ১২ ব্যাচের আনিস। আমার কোন ধারণাই ছিলনা কেন ডাকা হয়েছে। সেখানে ০৯ এর শুভ্র টিকাদার, ০৯ এর সিয়াম, ০৯ এর শুভম , ১০ ব্যাচের কনক, রাসেল আর ১১ ব্যাচের তানভীর রায়হান (টিআর নামে কুখ্যাত) আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। কোন তথ্য প্রমাণ ছাড়াই আজগুবি ভাবে আমি শিবির করি এটা প্রমাণ করার জন্য আমাকে টর্চার করে।
প্রথমে তানভীর আমাকে গালে প্রচন্ড এক থাপ্পড় মারে। আমার মাথা ঘুরে যায় এত জোড়ে থাপ্পর খেয়ে, ঠোট কেটে যায়। এটা ওদের টেকনিক। আচমকা আঘাত করে টর্চারের মুড ক্রিয়েট করে। এরপর তানভীর আমার বুকে প্রচন্ড এক লাত্থি মারে। আমি মেঝেতে পড়ে যাই। কেউ এসে তোলে আমাকে। এরপর আমাকে জোর করে স্বীকার করতে বলে যে আমি শিবির করি। স্বীকার না করলে আমার মাথায় একটা বস্তা পরিয়ে দিয়ে বেধে দেয়া হয়।
এরপর শুধু মুহুর্মুহু রডের বাড়ি পড়তে লাগল পিঠের উপরে। একজন মনে হয় টায়ার্ড হয়ে রডটা রাখতেই আরেকজন রড হাতে তুলে নেয়। এভাবে থেমে থেমে প্রায় ১ ঘন্টা বস্তাবন্দী হয়ে মার খেয়েছিলাম। এভাবে আমি যখন জ্ঞান হারানোর কাছাকাছি চলে গেছি তখন শুরু হয় আরেক টেকনিক। এবার মাথা থেকে বস্তা খুলে একজন এসে খুব আদর করে আমাকে রক্ষা করার ভান করে। বলে যে, "আমি শিবির করি" এটা বললেই ও আমাকে অন্যদের থেকে বাচিয়ে নিবে। কিন্তু আমি আল্লাহর রহমতে ঘোরের মধ্যেও বুঝতে পারি এটাও ওদের চাল।
এরপরে আবার মার দিতে থাকে। একপর্যায়ে আমাকে ক্রসফায়ারে দেয়ার হুমকি দেয়। শূভম এসে আমার পা ভেংগে ফেলার পরামর্শ দেয়। পরামর্শ শুনে কাজল আর রাসেল মিলে আবার পূর্নোদ্যমে আমার পা লক্ষ্য করে রড দিয়ে পিটানো শুরু করে। একপাশ হয়ে যাওয়ায় সব মার এসে লাগে বাম পায়ে। একপর্যায়ে আল্লাহপাক মুখ তুলে তাকায়। ওরা কোন কারণে আমার উপরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমাকে চলে যেতে বলে।
আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। যাওয়ার সময় হলের গেটে আমাকে বলে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবি রাস্তায় এক্সিডেন্ট করছিস। পাচবার আমাকে দিয়ে মিথ্যা উত্তর প্র্যাকটিস করিয়ে যখন ছেড়ে দেয় তখন রাত ৩ টা। আমি এখন কোথায় যাব হল থেকে ? কোন রিকশাও পাওয়া যাচ্ছে না। শরীরে একফোটা শক্তি অবশিষ্ট নেই। কিন্তু যত দ্রুত পারা যায় ওদের দৃষ্টির সীমানা থেকে চলে যেতে চাচ্ছিলাম, যদি আবার সেই জাহান্নামে ডাকে!
খুড়িয়ে খুড়িয়ে তিতুমীর থেকে বের হয়ে পলাশীর কাছে এসে একটা রিকশা ডাকি শরীরের সব শক্তি জড় করে। তারপর আমার চাচার বাসায় চলে যাই। এরপরের বুয়েটের বাকি সময়টা একটা ট্রমা নিয়ে কাটিয়েছি। কোন আনন্দ উল্লাস কাজ করেনি, ক্যাম্পাস লাইফ নিয়ে কোন ভালবাসা কাজ করেনি। ঘৃণা আসত নির্লিপ্ত স্বার্থপর সব বুয়েটিয়ানের দিকে তাকালে।
-বুয়েট ইউরিপোর্টার হতে"

Saturday, October 5, 2019

একটা মানুষ কেবল একটা সংখ্যা না...।





লেখক: Joynal Abedin

"রবিউল রক্তশূন্য মুখে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'স্যার আমারে কি মাইরা ফেলবেন'?
রবিউল যখন প্রশ্নটা করল তখন আমি সিগারেটে সর্বশেষ টান দিচ্ছি। প্রশ্ন শুনে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য থামলাম। তারপর আবার লম্বা করে টান দিয়ে ঠোঁট গোল করে উপর দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে সিগারেট মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে ঘষে আগুন নেভালাম। রবিউলের জবাব না দিয়েই বললাম, 'ফারুক! ওর চোখ বাঁধো'।

রবিউল নামের মধ্যবয়সী লোকটা এবার চূড়ান্ত ভয় পেয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে তার চোখে মুখে যে সামান্য আশা ছিল সেটা মুহুর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেছে। তার কপাল থেকে নিয়ে থুতনী পর্যন্ত পুরো মুখমন্ডল একটা নির্দিষ্ট ছন্দে কাঁপছে। মৃত্যুভয়ে আচ্ছন্ন মানুষকে নতুন দেখছি না। এটাই আমার জীবনের প্রথম ক্রসফায়ার নয়। তারপরও কেন জানি প্রতিবারই দৃশ্যটাকে নতুন মনে হয়।
ফারুক চোখ বাঁধার কাপড় খুঁজতে গাড়িতে চলে গেল। আমি বিরক্ত হলাম। গাড়ি থেকে নামার সময়েই জিনিষটা পকেটে করে নিয়ে আসা উচিত ছিল। সবচেয়ে ভালো ছিল গাড়িতেই চোখ বেঁধে রেখে দিতে পারলে। এসব কাজে দেরি করার কোনো মানে নেই। ঝামেলা যত দ্রুত সরানো যায় ততই মঙ্গল।

'স্যার আমারে কি মাইরা ফেলবেন'?, রবিউল দ্বিতীয়বারের মতো এই প্রশ্ন করলে আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, 'এত কথা কেন রে বাপ? উত্তর কিছুক্ষণের মধ্যে এমনিতেই পেয়ে যাবা। এখন আল্লাহ খোদার নাম নাও'।
রবিউল এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেল সে মারা যাচ্ছে। এক মুহুর্ত নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে তারপর অদ্ভূত এক কাজ করে ফেলল লোকটা। হাত হ্যান্ডকাফ বাঁধা অবস্থায় ঝপ করে কাঁটা ফলের মতো আমার পায়ের নিচে পড়ে হাউমাউ করে বলল, 'স্যার আমারে মাইরেন না। আমি নির্দোষ স্যার! ও স্যার গো! আপনার দোহাই গো'!
কে দোষী আর কে নির্দোষ সেটা ঈশ্বরের পরেই যদি কেউ জানে তবে সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই লোকটা যে আপাতমস্তক ভালো মানুষ সেই খবর তার স্ত্রীর অজানা থাকলেও আমাদের অজানা নয়। ভালো মানুষদের নাকি আয়ু কম থাকে, সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। যুগে যুগে ভালো মানুষদের এই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। কে পরাঘাতে মরে নি? সক্রেটিস? কোপার্নিকাস? বান্না? এমনকি যিশু খ্রিষ্টকেও এভাবেই মরতে হয়েছে। যুগের নিয়মই এমন। সভ্যতার রীতি এটাই। আমি নিয়ম পাল্টানোর কেউ নই।

রবিউলকে টেনে-হিঁচড়ে মাটি থেকে তোলা হলো। তার গায়ে এই বিস্তীর্ণ মাঠের কিছু ধুলো লেগে গেল। লোকটার কাঁপুনি ক্রমশই বাড়ছে। আমার জানামতে আগামী কাল জোছনা। এই পরিষ্কার আকাশে আজকের রাতটাকেই জোছনা রাত বলে মনে হচ্ছে। চাঁদের আলোয় রবিউলের চোখের কিনার ঘেষে নেমে পড়া অশ্রুর ধারা চিকচিক করছে। বিরাট আকাশের নিচে রাতের এই নির্জনতায় রবিউলকে মনে হচ্ছে সামান্য কীট-পতঙ্গ, যার জন্ম হচ্ছে কেবলই মৃত্যুর জন্য।
রবিউল আরেকবার ঝুঁকে পড়ার সুযোগ নিতে গিয়ে ব্যর্থ হলো। এবার পেছন থেকে দুইজন তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। পড়তে না পারলেও সে খানিকটা চিৎকার করে সেই একই কথা বলল, 'স্যার আমারে মাইরেন না স্যার। আমি নির্দোষ স্যার। আমার দুইটা মেয়ে আছে স্যার। তাদের দেখার কেউ নাই স্যার। আমার বউ খুব অসুস্থ স্যার'।

আমি উল্টো ঘুরে পকেট থেকে সিগারেট বের করলাম। চারপাশে বাতাস, লাইটারে আগুন ধরাতে একটু সমস্যা হচ্ছে। কাজটাতে নতুন না আমি, তারপরও প্রতিবারই একটু হলেও অস্বস্তি লাগে। সিগারেট তখন খুব কাজে দেয়। নিকোটিন রক্ত থেকে অনেকটাই উদ্বেগ কমিয়ে দেয়। যদিও এখানে উদ্বেগের মতো কিছুই নেই। লোকটা আহামরি কেউ না। ছোটখাটো ব্যবসায়ী। সরকারদলীয় এক নেতার টেন্ডারবাজীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এলাকায় হিরো হয়ে গেছে। স্থানীয় জনতার সহায়তায় নেতার ছেলেকে ধর্ষণ চেষ্টারত অবস্থায় ধরে গণধোলাইয়ের ব্যবস্থা করিয়েছে। তারপর নেতা পুত্রকে গ্রেফতারের জন্য করেছে থানা অবরোধ। লোকটার ভালো পজিশনে বেশ কিছু জমি আছে। নেতা ভদ্রলোক সেই জমি হজম করতে চাইছেন। বাংলাদেশের বাস্তব আইনে মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ দায় রবিউল জমা করে রেখেছে।

দুই মিনিট হয়ে গেছে। ফারুক আসতে এত দেরি করছে কেন? গুলি করেই কাজ শেষ না। আরো যন্ত্রযোগাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। হাত না চালিয়ে কাজ করলে কীভাবে হয়?
রবিউল ঘুরে ফিরে একই আর্তনাদ করেই যাচ্ছে। মুখে বেঁধে রাখলে ভালো হতো। সেটার অবশ্য খুব বেশি দরকার নেই। এই চিৎকার সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো কানে পৌঁছাবে না, অবশ্য সৃষ্টিকর্তা যদি শুনতে ইচ্ছুক হোন তবেই। রবিউলের ভেতরেও বোধহয় একই বোধ জাগল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, 'ও আল্লাহ গো! ও আল্লাহ গো! ও আল্লাহ গো'!
ডাকুক, বেশি করে ডাকুক। এসব বোকা মানুষগুলো ভাবে জগতে ঈশ্বরের একটাই সত্ত্বা। অথচ জগত অসংখ্য ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র ঈশ্বরে বিভক্ত। এই যে রবিউল নামের এই লোকটাকে আমি একটু পরে মারতে যাচ্ছি সেটা নিজের ইচ্ছায় নয়। আমাকে একজন ঈশ্বর আদেশ করেছেন। সেই ঈশ্বরকে আদেশ করেছেন হয়তো আরেকজন, আরেকজনকে আরেকজন, সেই আরেকজনকে অন্য আরেকজন। রবিউল নামের এই সামান্য কাপড় ব্যবসায়ীর ধারণাই নেই তাকে মারার জন্য কত নীরব আয়োজন ঘটে গেছে, কত বছর, কত যুগ আর শতাব্দি ধরে এই আয়োজন চলে আসছে। অথচ সে কেবল আমার দিকেই ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে আছে যেখানে আমার অপরাধটাই সর্বনিম্ন।

ফারুক কাপড় নিয়ে এসেছে। গাড়ির কাছে গিয়েই তার পেচ্ছাব চেপেছিল। সেই কাজ করতে গিয়ে একটু দেরি হয়েছে। এই পেচ্ছাব স্বাভাবিক না, শরীরে এনজাইটি বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন হয়েছে। ফারুকের মতো কালো কাপড়ের মানুষও যদি এনজাইটিক হয়ে যায়, রবিউল নামের মানুষটার ভেতরে এখন কি হচ্ছে কে জানে! ফারুক চোখ বেঁধে নিল। সর্বশেষ বারের মতো রবিউলের চোখের দিকে তাকালাম আমি। জোছনার আলোয় রবিউলের চোখ গড়িয়ে এখনো পানি পড়ছে। তার সাথে সমস্ত জগতের রাগ, ক্ষোভ, বিস্ময় এবং ঘৃণা।
রবিউলের সময় শেষ হয়ে এসেছে। শেষবারের মতোও সে চিৎকার করে বলল, 'স্যার, আমি দুইটা বাচ্চা মেয়ে আছে স্যার। ওরা আজকে কাঁঠাল খাইতে চাইছিল। বছরের প্রথম কাঁঠাল বাজারে উঠছে। ওরা কাঁঠালের আশায় সারা রাত বসে থাকবে স্যার। স্যার আমারে মাইরেন না। আমার দুইটা মেয়ে আছে স্যার। আমার বউ অসুস্থ স্যার। তার ডায়বেটিস, প্রেশার। তারে ডাক্তারের কাছে নেয়ার কেউ নাই'।

আমি এসব কানে দিলাম না। অভ্যস্ত হাতে হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করলাম। যেহেতু ব্যাপারটাকে বন্দুক যুদ্ধ হিসেবে চালানো হবে সুতরাং বন্দুক দিয়ে গুলি করলে ভালো হতো। এতসব যন্ত্রণায় যাওয়ার দরকার নেই। এটা ইউরোপ-আমেরিকা না যে গুলি ল্যাবে নিয়ে পরীক্ষা করা হবে। এটা বাংলাদেশ। এখানে একটা লাশের পেছনে এত সময় দেয়ার কিছু নেই। কেউ খুঁজতেই আসবে না।
আমি ট্রিগার টানলাম। 'খট' করে একটা শব্দ হলো। এই শব্দ শুনেই রবিউল একেবারে চুপ হয়ে গেল। মানুষের বিশ্বাসের অনেক দেয়াল থাকে। সম্ভবত তার সর্বশেষ দেয়াল এখন ভাঙল। একটু আগেও হয়তো সে ভেবেছে কোনো না কোনো ভাবে সে বেঁচে যাবে। তার দুই বাচ্চাকে কাঁঠাল ভেঙে খাওয়াবে। পিস্তল টানার শব্দে সে বিশ্বাস টুঁটে গেছে। তাকে কালিমা পড়তে বলা উচিত। আমি এটা বললাম না। একবার একজনকে বলেছিলাম। অর্ধ উন্মাদ লোকটা আমার মুখে থু থু দিয়ে বলেছিল: তোর কালিমা তুই পড়। তুইও মরবি।

আসলেই কথাটা চমৎকার। সবারই তো মরতে হবে। হত্যা খুব বড় কোনো অপরাধ না। এটা পূর্বনির্ধারিত একটা বস্তু। আজকে আমি এই ক্রসফায়ার না করলে অন্য কেউ করত। আমাদের চারপাশের যে সকল ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র ঈশ্বর, তাদের কাজ কখনো আটকায় না। বরং যারা আটকায়, তাদেরকেই আটকিয়ে দেয়া হয়।
রবিউল বিড়বিড় করে বলল, 'স্যার আমারে ক্যান মারবেন'?
এই প্রথমবারের মতো আমি কোনো প্রশ্নের উত্তরে বললাম, 'জন্মের অপরাধে। জন্মের অপরাধে সকলকেই মরতে হয়। তাছাড়া তুমি ঈশ্বরের দেশে বাস করে ঈশ্বরবিরোধী কর্মকান্ড করেছে। ঈশ্বরের বিচারে তোমার শাস্তি হচ্ছে। এবার আসমানের ঈশ্বরের কাছে যাও। পরের বিচারটুকু তাঁর কাছে গিয়েই দিয়ো। তিনি যদি সত্যিই থেকে থাকেন তবে হয়তো এতদিন সব বিচার করবেন'।

আমার এত জটিল কথা নেয়ার মতো অবস্থায় রবিউল যে নেই সেটা আমিও জানি। তার ঠোঁট কাঁপছে। আমি স্থির হাতে পিস্তল উঁচিয়ে ধরলাম। চোখ বাঁধার কারণে রবিউল এই দৃশ্য দেখছে না, দেখলে গা মোচড়ামুচড়ি করত। মৃত্যুর প্রতি মানুষের সীমাহীন ভয়, জীবনের প্রতি সীমাহীন আশা। শেষ মুহুর্তেও মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। কেন করে কে জানে!
তিন ফুট দূর থেকে আমি রবিউলের বাম বুক তাক করলাম। আমার দলের বাকি তিন সদস্য চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। আমি ট্রিগার চাপতে যাচ্ছি ঠিক এই মুহুর্তে রবিউল বলল, 'স্যার গো...'।
আমি থেমে গেলাম। রবিউল বলল, 'স্যারগো! আপনারও মেয়ে আছে গো স্যার'! আমার পাঁচ বছরের একটা মেয়ে আছে এটা এই লোকের জানার কথা না। লোকটা নিশ্চয়ই আন্দাজে বলে ফেলেছে। তবে আন্দাজ কিছুটা কাজ করেছে বলেই সে বাড়তি তিন সেকেন্ড সময় পেয়ে গেল। জীবনের শেষ সময়ে তিন সেকেন্ড সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। কতটা দামী সেটা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ। আমি রবিউলের বুকে পরপর তিনটি গুলি করলাম।

মানুষের মধ্যে হাজার রকম তফাৎ। ধর্মে, বর্ণে, নামে, চেহারায়, কর্মে সব মানুষই আলাদা। মৃত্যু সব মানুষকেই এক ফেরে ফেলে। গুলি করার পর সবার শরীর থেকে রক্ত বের হয়, কাঁটা ফলের মতো পড়ে যায়। সবাই শেষের দিকে এসে অপার্থিব গোঙানি দেয়। এখানে কোনো তফাৎ সৃষ্টি হয় না। রবিউল মিনিট দুয়েক 'মা গো'-'পানি পানি' এবং 'নাসিমা-ফাহিমা' বলে গোঙাচ্ছিল। একটু আগে সেটা স্থির হয়ে গেছে। নাসিমা-ফাহিমা বোধহয় তার দুই মেয়ের নাম। দুই মেয়ের জন্য আগামীকাল দিনটা ভীষণ যন্ত্রণায় যাবে। ৮ বছর আর ৬ বছরের দুই বাচ্চা হুট করেই আবিষ্কার করবে তাদের বাবা নেই। তাদের বাবা ছিল মাদক ব্যবসায়ী। তাদের বাড়ি পুলিশে আর মানুষে ভরে যাবে। দুইটা বাচ্চা হতবিহ্বল হয়ে তাদের মায়ের মুর্ছা যাওয়া দেখবে। আগামীকাল কবর খোড়া থেকে নিয়ে অশান্তি আর অনিশ্চিত প্রস্তুতির যে জীবন শুরু হবে সেটা আর কোনো দিন থামবে না।

প্রস্তুতি আমাদেরও নিতে হবে। লাশের পাশে কয়েকটা গুলির খোসা, কয়েশ পিস ইয়াবা রেখে দিতে হবে। একটা ভাঙাচোরা বন্দুক আছে, সেটা সেট করতে হবে জায়গামতো। লাশের পকেটের মোবাইল ফোনে কিছু রেকর্ড হলো কিনা দেখা দরকার। দূর থেকে কেউ ভিডিও-টিডিও করে ফেললে সাময়িক সমস্যায় পড়ে যাব। একটু ঘুরে সেটাও নিশ্চিত করা উচিত। এদেশের মানুষের কল্পনাশক্তি নিম্নশ্রেণীর জীবের চেয়েও কম। এদের চোখের আড়ালে এক লাখ ক্রসফায়ার করলেও মস্তিষ্ক সেসব দৃশ্য কল্পনা করতে পারবে না। অথচ কোনো ভিডিওতে কারো চড় মারা দেখলেই মস্তিষ্কে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে যাবে। আলোড়ন সৃষ্টি হলেও তেমন কিছু হবে না। কিছুদিন আলোচনা হবে। এক সময় দলে দলে ভাগ হবে আলোচনাকারীরা। সামনে আসবে নতুন কোনো আলোড়ন। সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে সবাই। তারপরও খুব যদি কিছু হয় তবে দেশে ঈশ্বরেরা আছেন। বাকিটুকু তারাই দেখবেন।

তারপরও অডিও, ভিডিও থেকে সাবধান থাকা ভালো। সবকিছু শেষ হলে একটা মুখস্ত প্রেস ব্রিফিং দিতে হবে। সেখানে সবকিছু আগে থেকেই টাইপ করা আছে শুধু এডিট করে রবিউলের নাম আর বয়স বসিয়ে দিলেই হয়।
আর দুই ঘন্টার মামলা। তারপর আমি নিশ্চিন্ত। শুধু আজকের জন্য না, আগামী অনেক দিনের জন্য। আসমানের ঈশ্বরই যে তার কাজে পুরষ্কৃত করেন তা না, মাটির ঈশ্বরেরাও তাদের কাজ করে দিলে পুরষ্কারের ব্যবস্থা করে দেন। আমার পুরষ্কার আছে। আসমানের ঈশ্বরের মতো এখানে সময়ক্ষেপণ নেই। এই পুরষ্কার হাতে আসবে খুব দ্রুত।

মিলি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'চা খাবে'?
আমি পত্রিকা পড়ছিলাম। মুখ না তুলেই বললাম, 'দিতে পারো'।
মিলি কিচেনের দিকে চলে গেল। আমি পত্রিকা ঘাটাঘাটি করছি। পঞ্চম পৃষ্টার সপ্তম কলামে গিয়ে কাংঙ্খিত খবরটা খুঁজে পেলাম: ক্রসফায়ারে মাদক ব্যবসায়ী নিহত।
'গতকাল রাতে রাজধানীর কেরানীগঞ্জে বন্দুকযুদ্ধে রবিউল ইসলাম (৩৮) নামের এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। নিহত রবিউল ডেমরা এলাকার আব্দুল মালিকের পুত্র। সূত্র জানায় গোপন খবরের ভিত্তিতে রবিউলকে নিয়ে মাদক উদ্ধারে বের হলে পথমধ্যে রবিউলের সহযোগীররা  লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে।  আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও গুলি চালায়। এক পর্যায়ে পালানোর সময় রবিউল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। ঘটনাস্থল থেকে একটি বন্দুক, দুই রাউন্ড গুলি এবং চারশপিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।'

খবর পড়ে বরাবরের মতোই আমার হাসি পেল। রবিউলকে ধরা থেকে নিয়ে গুলি করা এবং লাশ মর্গে পাঠানো পর্যন্ত আমাদের ব্যয় হয়েছে সর্বমোট ১১ ঘন্টা। সাংবাদিকরা এত আয়োজন করে করা একটা ঘটনাকে পঞ্চম পাতার সাত নাম্বার কলামে দেড় ইঞ্চির মধ্যেই শেষ করে ফেলেছে। তিলটা গুলি করতে আমার যতটা সময় লেগেছে এই খবর পড়তে লেগেছে তারচেয়েও কম। জীবনের দাম এখন কারো কাছেই বেশি না। না খুনীর কাছে, না সাংবাদিকের কাছে, না রাজার কাছে, না জনগণের কাছে। এককভাবে এই হত্যার দায় আমি কীভাবে নিই?

মিলি চা নিয়ে এসেছে। তার হাঁটার ভঙ্গি কেমন যেন সাপের মতো। আমাদের বিয়ের ৮ বছর হয়ে গেছে। মিলির শরীরে এই আট বছরে কয়েক কেজি মেদ জমেছে। কিন্তু শরীরটা এখনো সেই আগের মতোই আবেদনময়ী। শাড়ির ফাঁক গলে পেটের মধ্যে যে ভাঁজ দেখা যাচ্ছে সেটা এতটুকু দৃষ্টিকটু নয়।
মিলি পাশে এসে বসতেই আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। মিলি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, 'এত আহ্লাদ করার দরকার নাই'।
আমি মিলির শরীরে চাপ দিয়ে বললাম,' তাহলে কি করতে হবে'?
'সংসারের খবর রাখতে হবে। বউয়ের খবর রাখতে হবে। প্রতিদিন দেরি করে বাসায় ফিরলে বউ অন্য পুরুষ ঘরে ঢোকাবে কিনা সেটা নিয়ে ভাবতে হবে'।
'আর'?
'আর বাচ্চাটার খবর রাখা দরকার। ৫ বছরের একটা বাচ্চা, বাবা-বাবা বলে ঘুমিয়ে পড়ে। তারজন্য না একটা খেলনা এরোপ্লেন আনার কথা, সেটা কই'?

শান্তা দুইদিন আগে এরোপ্লেনের আবদার করেছিল। রবিউলের ব্যস্ততায় সেটা মনেই করতে পারিনি। আহারে, আমার মেয়েটা হয়তো এরোপ্লেনের কথা ভেবে ঘুমাতে পারেনি। এক মুহুর্তের জন্য রবিউলের দুইটা মেয়ের কথা মাথায় আসল। কি যেন নাম? নাসিমা- ফাহিমা। ওরা বাবার কাছে কাঁঠাল খাওয়ার জন্য আবদার করেছিল। বাচ্চা দুইটা কী এ জীবনে আর কোনোদিন কাঁঠাল মুখে দিতে পারবে?
অবশ্য তাদের জীবনে ঘোর অন্ধকারের এখনো অনেক বাকি। তাদের জমি দখল হবে, ব্যবসা হাতছাড়া হবে। এক সময় বানের পানির কচুরিপানার মতোই তাদেরকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো লাগবে। জীবন কতটা নিষ্ঠুর কতটা অন্ধকার তার পূর্ণ শিক্ষা এরা খুব দ্রুত পেয়ে যাবে।

মিলি বলল, 'কি ভাবছ'?
আমি বললাম, 'কিছু না'।
'কিছু তো অবশ্যই। আজকাল তুমি আমাকে অনেক কিছুই বলো না। কোথায় যে কি করে বেড়াচ্ছ কে জানে! মেয়ে-টেয়ে নিয়ে হোটেলে উঠলে কিন্তু খবর আছে। স্রেফ খুন করব। খুন করে বিধবা হয়ে যাব'।

আমি আরেকবারের জন্য রবিউলের বিধবা স্ত্রীর কথা ভাবলাম। মেয়েটার বয়স কত হবে? হয়তো মিলির বয়সীই হবে, কিংবা আরো কম। এই মেয়েটা আজীবন একা থাকবে, কত দীর্ঘ রজনী পার করতে হবে একা একা। মেয়েটার শরীর থেকে মিলির মতোই গন্ধ বেরুবে, সেই গন্ধে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসবে পতঙ্গ। দুইটা বাচ্চা মেয়েকে সামলাতে গিয়ে সে নিজে দিশেহারা হয়ে যাবে। এক সময় হয়তো ভুলেই যাবে শরীর কী, মন কী, জীবন কী? রবিউল মাত্র তিনটা গুলিতে উদ্ধার পেয়ে গেছে। এই মেয়ে সারা জীবন বুলেটবিদ্ধ হবে। রবিউলের মতো আর্তনাদ করার অধিকারটুকু সে পাবে না।

মিলি ভীষণ আদুরে গলায় বলল, 'এ্যাই...'।
আমি বললাম, 'বলো'।
'চলো না, কোথাও থেকে ঘুরে আসি'।
'কোথায় যাবা'?
'অজানাতে...।'

'সেটা কী'?
'যেখানে নদী এসে মিশে গেছে। হিহিহি'।
'হেয়ালী করছ'?
'হ্যাঁ করছি। সত্যিই ঘুরে আসি। কতদিন ঘুরি না'।
'কোথায় যাবে বলবে তো'?
'গ্রান্ড সুলতানে যাব। শ্রীমঙ্গল। চারপাশে সবুজ আর সবুজ। মাঝখানে তুমি আর আমি। সুন্দর হবে না'?
'হ্যাঁ হবে'।
'কবে যাবে'?
'আগামী সপ্তাহে'।
মিলি চিৎকার করে বলল, 'ও-মা, সত্যিই'?
আমি বললাম, 'হ্যাঁ সত্যিই। রেডি হও'।
মিলি আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে বলল, 'আমার দাবী মানার জন্য তুমি আমার কাছে পাওনাদার হয়ে গেলে। আজকে তোমার যাবতীয় ঋণ শোধ করা হবে'।

তার ঠোঁটের কোণে বাকা হাসি। এই হাসির অর্থ আমি জানি। এটা তার বিখ্যাত নিষিদ্ধ হাসি, এটা তার বিখ্যাত বিশুদ্ধ হাসি। আমি তাকে তরল গলায় কিছু বলতে যাব তখনি শান্তা ঘরে ঢুকে বলল, 'আব্বু'!
আমি বললাম, 'জ্বী মা'!
'আমার হেলিকপ্টার কই'?
'আছে। কালকেই পেয়ে যাবা'।

'তুমি আজকে আননি কেন? আজকে যদি হেলিকপ্টারওয়ালা মারা যায়'?
'মারা যাবে না। আর মারা গেলেও আমি ঠিকই নিয়ে আসব কালকে'।
'মারা গেলে তখন কীভাবে পাবে? লোকটার তো কবর হয়ে যাবে'।

আমি ঘড়ির দিতে তাকালাম। সন্ধ্যে সাতটা বাজে। হিসেব মতে আজকে রবিউলের লাশ তার বাড়িতে যাওয়ার কথা। দীর্ঘ আয়োজনের পর এতক্ষণে সম্ভবত তার কবর হয়ে গেছে। সে এখন আসল ঈশ্বরের মুখোমুখি। আসল ঈশ্বর কী তাকে তার প্রাপ্য পুরষ্কারটুকু দেবেন?

আমার ঈশ্বর অবশ্য আমার প্রাপ্যটা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। ব্যাংক একাউন্ট আরেকটু ভারী হয়ে গেছে। সেখান থেকে ক্ষুদ্র একটা অংশ দিয়ে হবে গ্রান্ড সুলতান ট্রিপ। সেখান থেকে ফিরব, ঈশ্বর থেকে চলে আসবে নতুন কোনো নির্দেশনা।
আসল আর স্থানীয় ঈশ্বরদের মধ্যে পার্থক্যটা চমৎকার। আসল ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেন, আর স্থানীয় ঈশ্বরদেরকে সৃষ্টি করি আমরাই। আসল ঈশ্বরের মতোই স্থানীয় ঈশ্বরদের নিজস্ব ভক্ত থাকে, ধর্ম থাকে। পার্থক্য হচ্ছে আসল ঈশ্বরের আজন্ম আরাধনা করেও ভক্ত ঈশ্বর হতে পারে না, ঈশ্বরকে বদলাতে পারে না। তবে এখানকে ঈশ্বর বদল আছে, চরম ভক্ত থেকে ছোটখাটো ঈশ্বরে পদন্নতির সম্ভাবনা আছে। দুই ক্ষেত্রেই ঈশ্বর বড় বেশি একরোখা। নিজেদের তৈরি আইনে তারা 'বিরোধ' পছন্দ করেন না। আমি এত কঠিন চিন্তা করছি কেন? ইদানিং কি মাথায় বেশি চাপ পড়ছে? চাপ কমানোর জন্য তাড়াতাড়ি ট্যুরটা করে ফেলতে হবে।

শান্তা দৌড়ে এসে আমার কোলে চড়ে বসল। আমি তার কপালে লম্বা করে চুমু দিলাম। বাচ্চাটা আমার আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আমি অনুভব করলাম সেই চিরন্তন বাণী: পৃথিবীতে খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু কোনো খারাপ বাবা নেই।
ঠিক তখুনি আমার কানে রবিউলের চিৎকার চলে আসল: স্যার আমারে মাইরেন না। আমার দুইটা বাচ্চা আছে। রবিউল বড় বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে তো! এভাবে আগে কেউ দেয়নি।

আমরা শ্রীমঙ্গল যাচ্ছি। মিলি বাইরে দূরে কোথাও ঘুরতে বের হলে ড্রাইভার নেয়া পছন্দ করে না। তার মতে এতে প্রাইভেসী নষ্ট হয়। সময়টুকু নিজেদের থাকে না। মিলির কারণেই তখন আমাকে ড্রাইভার হয়ে যেতে হয়। আমি ড্রাইভার হিসেবে যথেষ্ট সাবধানী। এখন পর্যন্ত ছোটখোটো কোনো দুর্ঘটনাও ঘটাইনি। তারপরও স্ত্রী সন্তান সাথে থাকলে সামান্য চাপ অনুভব করি। এত দূরের পথে ড্রাইভারকে আনলেই বোধহয় ভালো ছিল।
আমরা ভৈরব ব্রীজ পার হয়ে গেলাম। ব্রীজের পাশ ঘেষে রেলসেতু। শান্তা মুগ্ধ হয়ে চারপাশ দেখছে। মেয়েটাকে নিয়ে বাইরে বের হওয়া হয় খুবই কম। এখন থেকে একটু অভ্যেস করিয়ে নিতে হবে। মেয়ের বয়সের তুলনায় ততটা বুদ্ধি হচ্ছে না। এই বয়সের বাবা মায়ের সঙ্গ তার অনেক বেশি দরকার।
গাড়িতে রবীন্দ্র সংগীত বেজে চলেছে, 'ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে গান'। মিলি গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে তার আনন্দ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। গাড়ি ছুটে চলেছে একই গতিতে। বহুদিন পর ড্রাইভ করে আমিও আরাম পাচ্ছি।



আমরা হবিগঞ্জে ঢুকে পড়লাম। আর কিছুদূর গেলেই প্রকৃতির অপরূপ রূপ চোখে পড়বে। তারপাশে ঘন সবুজ বন, চা বাগান। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। মিলি আর শান্তা আগে কখনো এদিকে আসেনি। তারা ঠিক কতটা যে খুশি হবে ভেবেই আমি আনন্দ পাচ্ছি। তবে আমার আনন্দে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটে গেল।

সামনে বড় রকমের জ্যাম। এই রাস্তায় জ্যাম হওয়ার কথা না। আমি গাড়ি থেকে মাথা বের করে একজনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম সামনে একটা ট্রাক এক্সিডেন্ট হয়েছে। ট্রাক আটকে সাময়িক একটা জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। একটু পরেই সেটা খুলে যাবে।
গাড়ি থেকে চাইলে বের হওয়া যায়। এই মুহুর্তে বের হতে ইচ্ছে করল না। আশেপাশে দাঁড়ানোর মতো ভালো জায়গা নেই। বরং গাড়ি থামিয়ে স্ত্রী কন্যার সাথে একটু গল্প করা যায়।

আমাদের গাড়ির দুইপাশে আরো দুইটা গাড়ি এসে থেমে গেল। সবার চোখে মুখে বিরক্তি। ট্রাক এক্সিডেন্টে কেউ মারা গেছে কিনা এ খবর কেউ নিচ্ছে না। সবারই মনোযোগ কখন জ্যাম ছাড়বে তার প্রতি। আমি পেছন ঘুরে শান্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'মা মণি কেমন আছো'?
শান্তা বলল, 'ভালো আছি আব্বু। আর কতদূর'?
আমি বললাম, 'এই তো চলে এসেছি। আর সামান্য দূর। তারপরেই পৌঁছে যাব'।

শান্তা বলল, 'আমরা সেখানে গিয়ে অনেক মজা করব, তাই না'?
আমি বললাম, 'হ্যাঁ। অনেক মজা হবে'।
মিলি আমাকে বলল, 'তুমি একটু হেঁটে গিয়ে দেখো না কি সমস্যা। এভাবে কতক্ষণ বসে থাকা যায়'।
'একটু সময় বসলে খুব বেশি ক্ষতি নেই। অপেক্ষা করা ভালো। অপেক্ষা এক ধরণের পরীক্ষা'।

মিলি চুপ হয়ে গেল। আমি চোখ বন্ধ করে বসে পড়লাম। রবিউলকে ক্রসফায়ারে দেয়ার সপ্তাহখানেক হয়ে গেছে। সবকিছু পুরোপুরি শান্ত। আমার ক্রসফায়ার নিয়ে এখনো কোনো সমস্যা হয়নি অবশ্য। কারোরই সমস্যা হয় না। সমস্যা করে বসে কিছু অতি উৎসাহীরা। এরা ফটো তোলে, ভিক্টিমের আর্তনাদ ভিডিও করে মজা নেয়ার জন্য। কোনো না কোনো ভাবে এরা এক সময় ফেঁসে যায়। আমি এসব করি না, আমার সমস্যাও নেই। তারপরও প্রতিবারই সামান্য খচখচানি কাজ করে কিছুদিন। আমার মনে রবিউল ইস্যু চিরতরে ভুলে যাবার সময় চলে এসেছে।
বেলা দুইটা বিশ বাজে। জ্যাম লাগার বিশ মিনিটের মতো হয়ে গেছে। এখনো খোলার নাম নেই। একবার গাড়ি থেকে বের হয়ে খবর নেয়া উচিত। এই ভাবনা যখন এসেছে তখুনি একটা বিদঘুটে 'ঝন-ঝন-ঝন' শব্দ আমার কানে আসল। ট্রেনের সিগন্যালের শব্দ! এরমানে ট্রেন আসছে। আমি এতক্ষণে খেয়াল করে দেখলাম আমাদের গাড়ি ট্রেন লাইনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই জিনিষটা আগে কেন লক্ষ্য করিনি?

আমি গাড়ির দরজা খুলতে গেলাম। পাশের গাড়িটা আমার গাড়ির সাথে চেপে আছে। দরজা খোলা সম্ভব হচ্ছে না। দুইপাশের গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে বাইরে চলে গেছে। আমি দরজা খুলতে পারছি না। মুখ বের করে চিৎকার করলাম। আশেপাশে কেউ নেই। একটু দূরে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এদের চোখে মুখে ভীতি।
গাড়ি সরানোর কোনো উপায় নেই। সামনে পেছনে গাড়ি। আমার গাড়ি সরাসরি লাইনের উপর। পাশের দুই গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি রেখে উধাও। কানের মধ্যে অনবরত 'ঝন-ঝন-ঝন' আওয়াজ বেজেই চলেছে। আমি রক্তশূন্য মুখে মিলির দিকে তাকালাম। মিলি সমান আতংক নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। খুব সহজ একটা ফাঁদে আমরা আটকা পড়ে গেছি।
সবকিছু কেমন জানি অপার্থিব মনে হলো আমার কাছে। প্রকৃতি এত অস্বাভাবিক আয়োজন করে রেখেছিল আমার জন্য? দুইপাশে দুইটা গাড়ি কখন এসে থামল ব্যাপারটা মাথাতেই নিইনি। এভাবে গাড়ি ট্রেনের লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেও মনে কোনো ভয় জাগেনি। অথচ এক মুহুর্তের ব্যবধানে প্রতিটা পশমে মৃত্যু ভয় চলে এসেছে।

আমি পাগলের মতো দরজা ধাক্কাতে লাগলাম। তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সজোরে সামনের গাড়িকে ধাক্কা দিলাম। কিছুই হলো না।
ট্রেন খুব কাছ থেকে হুইসেল দিল। মিলি শান্তাকে জড়িয়ে ধরে 'ও আল্লাহ, ও আল্লাহ' করছে। এক পর্যায়ে সেও পাগলের মতো দরজা ধাক্কাতে লাগল এবং চিৎকার করে বলল 'আমাদের বাঁচান। কে আছেন, বাঁচান প্লিজ'।
ট্রেনের শব্দ সরাসরি কানে আসছে। আমার হাতে আর কয়েক মুহুর্ত। আমি গ্লাসে সজোরে ঘুষি বসালাম। কোন কাজ হলো না। একটা পর্যায়ে আমার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিল আমি নিজেই আজকে রবিউল। মৃত্যুকে সামনে রেখে অযথাই আর্তনাদ করে যাচ্ছি। আমার ভীত আত্মা কল্পনা করল আমার সামনে রবিউল দাঁড়িয়ে আছে আর আমি তার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইছি। এক সময় সত্যি সত্যিই আমি চিৎকার করে বললাম, 'আমারে ক্ষমা করে দেন ভাই। আমার স্ত্রী কন্যা মারা যাবে। তারা দোষ করেনি। ও আল্লাহ, ও আল্লাহ...'।

মৃত্যু মুহুর্তে যে মানুষের মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে সেটা আমি বুঝতে পারছি। আমার মস্তিষ্ক বলছে রবিউলের স্ত্রী কন্যাও দোষ করেনি। তারাও শাস্তি পাচ্ছে। একই নিয়মে হয়তো আমার স্ত্রী কন্যাও মারা যাবে। এতদিন পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে সেগুলোকে ক্রসফায়ার বলেছি। এবার জীবনে সত্যিকারের ক্রসফায়ারের মুখোমুখি হচ্ছি আমি। ঐ যে বিশাল ট্রেন এটাই হচ্ছে বুলেট। কোনো অদৃশ্য বিরাট শক্তি সমস্ত আয়োজন করে বুলেট ছুড়েছে। আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে জান্তব গুলি।
মিলি পাগলের মতো দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। শান্তা মিলিকে জড়িয়ে ধরে আছে। দৃশ্যটা দেখে আমার চোখ ফেটে গেল। সেই ফেটে যাওয়া চোখে ট্রেনটা চোখে পড়ল।

আর কয়েক সেকেন্ড!
আমি চোখ বন্ধ করলাম। কল্পনায় ধরে নিলাম ফারুক আমার চোখে কাপড় পরিয়ে দিচ্ছে। ট্রেন আরেকবার 'পোঁও-ও' করল। সেটাকে আমার কাছে ট্রিগার টানার শব্দ মনে হলো। শান্তা শেষ সময়ে 'আব্বু-আব্বু বলে চিৎকার করছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা শান্তা না। এটা শান্তা-নাসিমা-ফাহিমার সমন্বিত কণ্ঠ। আমি বুঝতে পারছি প্রতিটা মানুষই কোনো না কোনো সময়ের রবিউল। শুধু সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

ট্রেন একেবারে কাছে চলে এসেছে। প্রথমে আমার সামনের গাড়িকে ধাক্কা মারবে, তারপর আমাদেরকে। আগামীকালকে বননীতে খোঁড়া হবে পাশাপাশি তিনটি কবর। রবিউলের কবরের পাশে কান্নার মতো মানুষ আছে, আমার কেউ থাকবে না।
আমার খুব বেশি জানতে ইচ্ছে করছে, ক্রসফায়ারের শাস্তিটা কি কেবল আমার হবে? আমার ঈশ্বরেরা সে শাস্তি পাবে না?...ট্রেনের শব্দ এবার আমার কানে বিস্ফারিত হল।"
...
লেখাটা একটি কাল্পনিক গল্প। বাস্তবের সঙ্গে এবং এই 'ক্লিপটার সঙ্গেও এর কোনও প্রকারের মিল খোঁজা বৃথা...: