Thursday, December 31, 2009

২০০৯: সালতামামি এবং

২০০৯। নড়বড়ে সাঁকোটা ধরে ধরে পেরিয়ে গেল। পানি চলে যায় থেকে যায় দাগ, বছরটা চলে গেছে রেখে গেছে ক্ষত!
এ বছরটায় কি করেছি? কিছুই করিনি! বলতে গেলে শুয়ে-বসে কাটিয়েছি। একজন ব্যর্থ মানু। এটা একাধারে আনন্দের-কষ্টের। অনুভূতিটা মিশ্র। কখনও মনে হয়েছে এমন জীবন দেখছি মন্দ না, কখনও মনে হতো কেন এই জীবন?
চন্দ্রগ্রস্ত কিছু-কিছু মানুষ আমার হাত ধরে রেখেছিল বলে নিজেকে খানিকটা মানুষ-মানুষ মনে হতো, নইলে নিজেকে শব বলে ভ্রম হতো। কখনও কখনও এমন ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করা হয় আমায়, এড়াতে থাকি আপ্রাণ।

কিছুই করিনি কথাটা ঠিক না। আমার এই সাইটে লিখে গেছি, সবিরাম। অবশ্য প্রায়শ মনে হতো এইসব ছাতাফাতা লিখে লাভ কি? কিন্তু এও মনে হতো একদিন আমি থাকব না লেখাগুলো থেকে যাবে। পরের প্রজন্মের কেউ না কেউ পড়বে। আমার অদেখা স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত করে দেখাবে। হতে পারে না এমন, বেশ পারে? অন্তত এমন একটা স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নাই!
ডিজিটাল তথ্য ভান্ডারে আমার এইসব আবর্জনা না-বাড়ালে কি চলত না? কী জানি! কার কি উপকার হয়েছে জানি না কিন্তু এই লেখার কারণেই প্রকারান্তরে আমি বেঁচে ছিলাম। নইলে হয়তো কোন একটা ভয়ংকার কান্ড করে ফেলতাম। আমি এই লেখার কাছে কৃতজ্ঞ, আমায় বাঁচিয়ে রেখেছে বলে। ক্রদ্ধও, এর আদৌ কোন প্রয়োজন ছিল না।

আর লিখিই কী ছাই! লিখতেও যন্ত্রণা, যে বানান হাজারবার লিখেছি এটা লেখার আগে মনে হয় এটা কি হ্রস্ব উ-কার দিয়ে হবে, না দীর্ঘ উ-কার? আমাদের মহান বাংলা একাডেমি স্যাররা এখনও
প্রমিত বাংলায় একটা ডিজিটাল অভিধান বের করতে পারলেন না। ইংরাজি শব্দগুলো সব নাকি হ্রস্ব-ই কার দিয়ে কিন্তু নিজেরা একাডেমি লিখেন দীর্ঘ-ই কার দিয়ে।
তার উপর আমার দরজা-জরদা, চিকেন-কিচেন এইসব অহেতুক গুলিয়ে যায়। ওই দিন একজনকে ফোনে বলছিলাম, মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেছেন, টেনটপ দেশের মধ্যে...। আসলে আমার বলা প্রয়োজন ছিল টপটেন- কপালের ফের। ভাগ্যিস, ফোনে মানুষের হাসি দেখা যায় না নইলে ঠিক আমার মন খারাপ হতো।
একজন ডাক্তার সাহেব, ইনি আবার বিচিত্র কারণে আমার লেখালেখি পছন্দ করেন। একদিন বলছিলেন, আচ্ছা, 'শেষের কবিতা' আপনার কেমন লাগে? আমি বললাম, আমি তো কবিতা ভাল বুঝি না। মানুষটার চোখ কপালে দেখে আমার মনে পড়ল, অমিত, লাবণ্যর কথা। এখন আর এইসব নিয়ে মন খারাপ করি না, এই-ই নিয়তি; আমৃত্যু আমার পিছু ছাড়বে না।

এখন উপন্যাস টাইপের বড়ো লেখা লিখতে বড়ো আলস্য লাগে। আমার মস্তিষ্ক জমে গেছে। তাছাড়া ব্লগিং-এর নামে এইসব ছোট-ছোট লেখা লিখে বড়ো লেখা আর হয়ে উঠে না, নাকি ক্ষমতাটা নষ্ট হয়ে গেছে, জানি না! ভোরের কাগজে (৯২-৯৩) 'একালের রূপকথা' যখন লিখছিলাম তখনও এই সমস্যাটা হতো। যে থিমটা নিয়ে একটা আস্ত উপন্যাস লেখা যায় সেটা গিয়ে দাঁড়ায় গিয়ে কৃশকায় একটা লেখায়। একালের রূপকথায় লেখা কিটি মাস্ট ডাই, ভূত দিবস, লাইফ-এচিভমেন্ট-সেক্রিফাইস এই লেখাগুলো নিয়ে বড়ো আকারের লেখার ইচ্ছা ছিল কিন্তু আর হলো কই!

যখন পা ছড়িয়ে আমার বাসার সিড়িতে বসে এলোমেলো ভাবি, 'মঙ্গলের পানি দিয়া আমরা কি করিব' তখন মাথার উপর দিয়ে দ্রুতগামি যান চলে যায়। চারপাশের গতির সঙ্গে নিজেকে তুলনা করলে নিজেকে বড়ো হীন, ম্রিয়মান মনে হয়।
অসভ্য আমি সভ্যতার সন্তান আর হতে পারলাম না। তখন কি মনটা বিষণ্ণ হয়?
হয়। এই দ্রুত গতির যুগে ভিমরুল মৌমাছি এদের নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার অবকাশ কোথায়? আমার মতো অকাজের একজন মানুষের অকাজের এইসব ভাবনার কি মূল্য? বটে। ভিমরুল, মৌমাছি, গরু এরা কি প্রকৃতির সন্তান না? গরুর একটা চোখ কি একজন মানুষকে বদলে দেয়? কাউকে না দিক আমাকে দেয়। কুত্তার প্রতি মমতা দেখালে সে কুত্তা জহির হয়ে যায়, আজিব! আমার যে কুত্তা জহিরের হাত ধরতে বড়ো ইচ্ছা করে।

প্রকৃতি ব্যত্যয় পছন্দ করে না, সে ঠিকই তার শোধ নিয়ে নেয়। আমার বাড়ির সিড়ির সামনে ছড়ানো উঠোন হাতছাড়া হয়ে যায়। আমার উত্তরাধিকারের দৌড়-ঝাঁপ করার আর জায়গা থাকল না। আমি নিজের নির্বোধ ভাবনা ঢাকার জন্য এমন খোড়া অজুহাত খুঁজে নেই, সভ্যতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে না-চলার ফল।
কিন্তু এটা আমি বিনয়ের সঙ্গে কাকে কাকে বোঝাবো ৯টা ৫টা অফিস করা আমার কাজ না। সেই যোগ্যতাও আমার নাই, সেই মনও নাই। আগেও বলেছি, এ এক বিচিত্র, এই দেশে একজন মেথরও গু সাফ করে এটা দিয়ে রুটিরজির ব্যবস্থা করতে পারবে কিন্তু একজন লেখালেখি করে পারবে না। ফল হয় ভয়াবহ, একজন আল মাহমুদের আজকের এই নগ্নতার জন্য এটাও কি অনেকখানি দায়ি না?

আমি মানুষের ভালবাসা পেয়েছি এটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না। কিন্তু আমার প্রতি এদের ভালবাসায় কোন খাদ ছিল না। হাস্যকর মনে হবে কিন্তু এটা সত্য শত-শত মৌমাছি আমার মাথার উপর ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি বসে কীবোর্ডে ঝড় তুলছি অথচ একটা কামড়ও আমায় দেয়নি। অথচ শুনতে পেতাম কার কার উপর নাকি ঝাপিয়ে পড়েছে। ভিমরুলের বাসার অতি নিকটে আমি মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করতাম, এরা কেউ কিচ্ছু বলত না। অথচ ভিমরুলের কামড়ে একটা মানুষ অনায়াসে মারা যায়।

প্লাসিবো-তীব্র সুইচ্ছা কি আসলেই সত্য? আমার মৌমাছির বাসা এবং ভিমরুলের বাসা সংগ্রহে রাখার সুতীব্য ইচ্ছা ছিল। এরা বাসাগুলো আমায় উপহার দিয়ে গেল!
আমাকে সবাই এতদিন বলে এসেছে ভিমরুলের বাসা
মাটির মত কিছু একটা হয়।
ওরিআল্লা, এ যে দেখছি একেবারেই ঠুনকো, মলাট কাগজের মত অনেকটা! ভেতরে থাক থাক অসংখ্য খোপ। এটায় যে হাজার-হাজার ভিমরুল নাতি-পুতি নিয়ে বসবাস করত এতে কোন সন্দেহ নাই। আমি অন্য কারণেও আনন্দিত এরা আমাকে খুনি হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

বাবুই পাখির একটা বাসা পাওয়ার কী ইচ্ছা! কত লোকজনকে কেজিখানেক তেল দিয়েছি কেউ যোগাড় করে দিতে পারেনি, আছে বলে ফাজিলের দল তালগাছের নিচে নিয়ে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিত। অথচ দেখো দিকি কান্ড, আমার এখানেই টুপ টুপ করে আসমান (আসলে ডাবগাছ) থেকে একটার পর একটা পড়তে থাকে!
যেখানে সাপের একটা খোলস পেলেই বর্তে যাই সেখানে সাপ ৩টা খোলস আমায় দান করে দিয়ে যায়। থ্যাংকু, সাপ ভাইয়া।

একজন আমায়
পাকিস্তানি বলে গালি দিল। আমাদের বড়ো ঢং হয়েছে, চুতিয়াগিরি হয়েছে; ইচ্ছা হলো তো কাউকে পাকিস্তানি বলে দিলাম কাউকে রাজাকার ভাবাপন্ন বলে দিলাম। ইচ্ছা হলেই কাউকে রাজাকার, রাজাকার ভাবাপন্ন বলা যায় না এটা এই নির্বোধদের কে বোঝাবে!

কেউ কেউ বলেন, আপনি ওমুক সাইটে লেখেন না কেন? তমুক সাইটে একটা লেখা দিলেই ন্যূনতম ১০০ হিট। অন্য সাইটে এখন আর লিখতে ইচ্ছা করে না, অনেকে এটাকে আমার দুর্বিনীত আচরণ ভাবেন। বিনয়ের সঙ্গে বলি, এখানে লিখেই আরাম পাই, হাত খুলে লিখতে পারি। বাড়তি চাপ নেই। অনেকে হাসি চাপেন তবুও বলি, বাড়তি চাপ আমি নিতে পারি না। একটা লেখা লিখে জনে জনে ব্যাখ্যা দেয়াটা আমার জন্য সুকঠিন। তাও না-হয় দেয়া গেল কিন্তু কেউ চাবুক নিয়ে ব্যাখ্যার জন্য তাড়া করলে তো সমস্যা। এমনিতে প্লাস-মাইনাসের খেলা, অন্যের পিঠ চুলকে দেয়া, পান্ডিত্যের ছটা এসব ভাল লাগে না। আরে বাবা, আমার লেখায় কোন ভুল থাকলে ধরিয়ে দিলেই হয়। ভুল স্বীকার করতে আমার কোন লাজ নাই, আছে কৃতজ্ঞতা। পারলে ভুল ধরিয়ে দেয়া মানুষটার গা ছুঁয়ে বলি, ভাইরে, আপনার এই ঋণ আমি শোধ করি কেমন করে?

মন খারাপ, বাড়িতে মুখ খারাপ করতে পারি না তো চলো ব্লগে গিয়ে গালি দেই। তাছাড়া আমরা এটা কবে শিখব ওপেন ফোরামে যা খুশি বলা যায় না, লেখা যায় না। একজন কমার্শিয়াল সেক্স ভলান্টিয়ার-বেশ্যারও কিছু অধিকার থাকে। ভীম যখন যুদ্ধের নিয়ম ভঙ্গ করে দুর্যোধনের কোমরের নিচে আঘাত করেন তখন এটা শ্রীকৃষ্ণ-এর কাছে যথাযথ মনে হলেও আমার কাছে ঘোর অন্যায় মনে হয়। বলদেব নামের মানুষটা, যে অন্যায় যুদ্ধ থেকে পালিয়ে গেলেন তাঁকে সবাই ধিক্কার দিলেও আমার কাছে মানুষটাকে ন্যায়বান মনে হয়। কি আর করা!

আর দলবাজি কথা এখানে উল্লেখ না-করলেই ভাল হতো, এদের দোষ দেই কেমন করে স্যাররা দলবাজি শেখান আমরা শিখব না? আমরা কি বেয়াদব ছাত্র?
একেবারে বুশ স্টাইল, হয় তুমি আমার দলে নইলে খেলা থেকে বাদ। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, যে সাইটে আমরা অনেকটা সময় লিখেছি (প্রায় বছর দেড়েক) সেখানে যখন তিনি পুরনো ব্লগারদের কথা বলেন তখন আমার কথা বেমালুম ভুলে যান। বিষয় আর কিচ্ছু না, ওই যে বললাম দলবাজি। আমি ওনার দলে ছিলাম না এই অপরাধ।

দলবাজি ভাল লাগে না। অসাধারণ একজন মানুষ ড. জাফর ইকবাল যখন এমন লেখা লেখেন ভাল লাগে না! দাঁড়াবার আর জায়গা থাকে না।

আর এটাও আমরা বুঝতে চাই না, এখানে কেউ লেখালেখি করে যেমন মাথা কিনে নেয় না, তেমনি কেউ পড়েও। এখানে জাস্ট ভাবনা চালাচালি। মুক্তিযুদ্ধ+আস্তিক, নাস্তিক=গালিবাজি। ভাল লাগে না একদম। ক্রমশ দলছুট হয়ে যাই, বেচারা অভাগা!

মুক্তিযুদ্ধের কিছু বিষয় নিয়েও অনেকের সঙ্গে আমার মতের মিল নাই। সমস্তটা বছর ঝিম মেরে থেকে ডিসেম্বরে জেগে উঠব এই অশ্লীলতায় আমি নাই। ডিসেম্বরে মিডিয়ার কান্নায় টেলিভিশন সেট থেকে পানি চুঁইয়ে ডুবে মরার অবস্থা হয়, পত্রিকার পাতাগুলো চোখের জলে লেপ্টে থাকে, পড়া যায় না।

আমার স্পষ্ট কথা, রাজাকারকে রাজাকার বলব,
ঘুষখোরকে ঘুষখোর, খুনিকে খুনি। আমি সমস্ত অন্যায়ের বিচার চাইব, অন্যায় মৃত্যুরও। ৩৮ বছর গেল নাকি ৩৮০ তাতে কী আসে যায়, রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না। কেউ অন্যায় করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। কোন মুক্তিযোদ্ধাও যদি অন্যায় করে থাকেন, তাঁকেও।

দলছুট আমার জন্য এইই ভাল, নিজের সাইটে আরাম করে লিখে যাওয়া। দু-চারজন পাঠক পড়লেই আমি খুশি। আর কেউ না-পড়লে মনিটরে পা তুলে আয়েশ করে নিজের লেখা নিজেই পড়া...। মন্দ কী!

Tuesday, December 29, 2009

মুক্তিযোদ্ধা আল মাহমুদ, নগ্নগাত্র ঢাকুন!

আচ্ছা, টিভি-মিডিয়ায় মেয়েদের নগ্ন বক্ষ, একজন নগ্ন মানুষ দেখালে সমস্যা কোথায়? ও আচ্ছা, ওটা অশ্লীলতা তাহলে!

আচ্ছা-আচ্ছা, তাহলে কবিবর আল মাহমুদকে দেখালে অশ্লীলতা হবে না? তিনি যে পোশাকেই শরীর মুড়িয়ে হাজির হন না কেন,
অন্যদের কথা জানি না আমার চোখে মানুষটার আর কিছুই যে গোপন থাকবে না।
আমার গা রিরি করবে। ঈশ্বর, এই কুৎসিত দৃশ্য আমি দেখতে চাই না। আমি লজ্জায়-ঘৃণায় চোখ বন্ধ করে ফেলব। আমার সন্তানদের টিভির কাছ থেকে সরিয়ে নেব, নইলে টিভি বন্ধ করে দেব। ক্ষণিকের জন্য দেখালে অন্তত হাত দিয়ে তাদের চোখ ঢেকে দেব।
বুঝলেন, অশ্লীলতা নিয়ে অনেক দিন ধরে বোঝার চেষ্টায় আছি। কোনটা যে শ্লীল, কোনটা যে অশ্লীল প্রায়শ গুলিয়ে ফেলি। কিন্তু এখানে এসে স্পষ্ট করে বলি এখন আর ধন্ধ নাই, ল্যাংটা আল মাহমুদকে দেখা সমীচীন না, এটা অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়বে এতে কোন সন্দেহ নাই! আমার স্পষ্ট কথা, প্রকাশ্যে নারীর নগ্ন বুক দেখাতে সমস্যা বোধ করলে আল মাহমুদের বেলাও এটা হওয়া সমীচীন।

আজ আমরা জানলাম, ইনি কেবল কবিই নন এই দেশের বিরাট একজন মুক্তিযোদ্ধাও! জামায়েতে ইসলামীর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ আল মাহমুদকে সম্মাননা দেয়ার সময় আল মাহমুদ বলেন, "'এ সম্মাননা গ্রহণকে নিজের জন্য ন্যায়সংগত ভেবেছি'। তিনি আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, 'এ সংবর্ধনা ইতিহাসের অনিবার্য'।" (প্রথম আলো ২৮ ডিসেম্বর, ২০০৯)
হায়রে মুক্তিযুদ্ধ! অমি যখন বলি, 'মুক্তিযুদ্ধ এখন একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য' তখন লোকজন আমার উপর ঝাপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধ শিশুর হাতের মোয়া হয়ে গেছে, যে যেভাবে পারছে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। কখনও মোয়ায় গুড় মাখিয়ে, কখনও চিনি, কখনও-বা ধুতুরার বিষ! আমার বিমলানন্দে হাত বাড়িয়ে দেই।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই দেশের অনেক লেখক-কবিদের সম্বন্ধে যখন শুনতাম, তারা কলকাতার হোটেলে মদ-নারি নিয়ে ফুর্তি করে বেড়াতেন তখন আমরা এইসব খানিকটা উদাস দৃষ্টিতে দেখতাম। থাক, কবি-লেখকদের তো আবার মদ-নারি ব্যতীত সাহিত্য প্রসব হয় না। তাই তো ফরহাদ মযহার
যখন অবলীলায় মুক্তিযুদ্ধের টাকা মেরে দেন, তখন এটা আমরা উদাসিন চোখে দেখি। ফরহাদ মযহাদের বাণী না হলে আমাদের যে আবার চলে না। মননশীল বলে কথা!

*কবিবর আল মাহমুদের কেবল মুখের ছবিই দিলাম। নগ্ন শরীরের ছবি দিয়ে অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট হতে চাই না!
**কবিবর আল মাহমুদ কী বিশাল মাপের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তার খানিকটা নমুনা পাওয়া যাবে আরিফ জেবতিকের এই পোস্টে এবং হাসিবের টুকে নেয়া আল মাহমুদ

Monday, December 28, 2009

মঙ্গলের পানি দিয়া আমরা কি করিব?!

"...ঘন বন কাটিয়া আমিই এই হাস্যদীপ্ত শস্যপূর্ণ জনপদ বসাইয়াছি ছয়-সাত বৎসরের মধ্যে। সবাই কাল তাহাই বলিতেছিল- বাবুজী, আপনার কাজ দেখে আমরা পর্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছি, নাঢ়া লবটুলিয়া কি ছিল আর কি হইয়াছে! হে অরণ্যানীর আদিম দেবতারা, ক্ষমা করিও আমায়। বিদায়!..."
(আরণ্যক/ বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় )

যে মানুষটি সভ্যতার নামে নাঢ়া লবটুলিয়া নামের বনটি উজাড় করে দিয়েছিল সেই মানুষটির
"হে অরণ্যানীর আদিম দেবতারা, ক্ষমা করিও আমায়" এটা শুনে কেউ কেউ হাসি চাপবে, মানুষটার ঢং দেখে বাঁচি নে। তাঁর এই হাহাকার মোটা দাগে ধরতে পারার কোন কারণ নেই। সভ্য আমরা তাঁর নির্বোধ ভাবনায় বিরক্ত হবো কারণ এই মানুষটা সভ্যতার রূপকার!

সভ্যতা আসলে কাকে বলে আমি জানি না, তালাশে আছি। কোনটা সভ্যতা কোনটা অসভ্যতা এটাই
আমি বুঝে উঠতে পারি না। ওদিন আমার এক সিনিয়র আমাকে বলছিলেন, আচ্ছা, মঙ্গলে পানি আছে কিনা এটা আমাদের জন্য জানাটা কি জরুরি?
এই মানুষটা দুম করে একটা প্রশ্ন করে আমাকে বেকায়দায় ফেলে দেন। মাথায় অহেতুক কিছু ভাবনা ঢুকিয়ে দেন। এ এক যন্ত্রণা। ওই ভাবনা নিয়ে দিব্যি ভাবতে থাকো।
আমি তাঁর প্রশ্নের উত্তরে সতর্কতার সঙ্গে বললাম, হ্যাঁ প্রয়োজন। সভ্যতার জন্য।
তিনি আমার উত্তরে বেজায় অখুশি হয়ে বলেন, যেখানে পৃথিবীকেই আমরা তার প্রাপ্য দিতে পারছি না সেখানে পৃথিবীর বাইরে পানি আছে কিনা তা আমাদের প্রয়োজন কী?

আমি মনে মনে বললাম, তাই বলুন। আপনি অফট্র্যাক ভাবনার কথা বলতে চাইছেন তা আগে বলবেন না...! আমাদের প্রয়োজন নাই কিন্তু উন্নত বিশ্ব নামের অতি সভ্যদের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। আহা, এদের এ গ্রহে থাকতে বয়েই গেছে!

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যোগ দিতে অতি আগ্রহ নিয়ে সদলবলে রওয়ানা হন, আর দেশে বন কেটে সাফ করে ফেলছে। এদের নাকি থামানো যাচ্ছে না! দেশের সরকারী লাঠিয়াল বাহিনী কোন দিনের জন্য এটা তিনিই ভাল বলতে পারবেন!

কোপেনহেগেনে অশ্বটা যে ডিম্ব পাড়ল সেই ডিম্বের ভার সইতে পারাটা মুশকিল। গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের প্রধান কুমি নাইডু বলেন, "সমঝোতায় এত বেশি ফাঁক রয়েছে যে এর মধ্যে দিয়ে একটি বিমান উড়ে যেতে পারবে।"

এমন নিষ্ফল আলোচনায় কেবল হাঁই উঠে না প্রতিনিধিরা দিব্যি ঘুমিয়ে পড়েন!

পৃথিবীর অতি সভ্যরা কার্বন
নিঃসরণ করে পৃথিবীর নিরাপত্তা ছাতাটা শত-ছিদ্র করে ফেলবে। বাংলাদেশের মত হতদরিদ্র দেশগুলো ২০ কোটি টাকা খরচ করে আধুনিক ইটভাটা (এটাও আবার এদের কাছ থেকে কিনতে হবে) দিয়ে কার্বন নিঃসরণ কমাবে। এই বাঁচানো কার্বন এরা (অতি সভ্য) আবার কিছু টাকা দিয়ে কিনে নেবে। অতি সভ্যদের মাথার তারিফ করতে হয়!
ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেয়া হয় না এটাও এমন, খানিকটা ঘুরিয়ে আর কী। এই ফকির, তুমি আমার ড্রেনটা সাফ করে দাও, কিছু টাকা পাবা। ড্রেনও সাফ হলো ফকিরের হাত থেকে মুক্তিও পাওয়া গেল!

কেবল আমাদের দেশেই প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ প্রতিদিন রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায় সেখানে মঙ্গলের পানি আছে কি নাই এটা দিয়ে আমরা কি করিব, কোথায় রাখিব? কে বলেছে, কেবল নগ্ন বক্ষ দেখালেই অশ্লীলতা। আমি বিভ্রান্ত, মঙ্গলে পানি খোঁজা, এটাকে সভ্যতা বলব নাকি অশ্লীলতা?
অতি সভ্যদের জন্য এটা জরুরি। কারণ এই পৃথিবীকে এরা ক্রমশ বসবাস অযোগ্য করে ফেলবে, একসময় শেষ করে ফেলবে। এরা ঠিকই এই গ্রহের বাইরে অন্য কোন গ্রহে নিজের বসতি গড়ে তুলবে। আমরা বা আমাদের কন্কাল থাকবে এখানে।

*ছবিঋণ: এএফপি

Sunday, December 27, 2009

আলো অন্ধকারের খেলা!

আসলে দূর থেকে সবই আলো এর পেছনের ছায়া-অন্ধকার আমাদের চোখে পড়ে না। শিশুটিকে নিয়ে আমার দেয়া পোস্ট পড়ে অনেকের ধারণা হবে, আরে, এই পোস্টদাতা মানুষটা তো মন্দ না। তাঁদের মুখের সামনে বুড়ো আঙ্গুল তুলে আমি বলি, কচু!

এই শিশুটি আমার এখানে খুব একটা আরামে নাই। বেশ খানিকটা অন্য রকম (মানসিক প্রতিবন্ধী) এই শিশুটির ভাষা আমরা বুঝি না, এ কথা বলতে পারে না। কেবল এর যখন খুব কষ্ট হয় তখন মুখ দেখে খানিকটা আঁচ করা যায়।
এর পেছনে পুরোটা সময় আমরা দিতে পারছি না। আজ সকালে দেখলাম, এর দাঁতে রক্ত; কোন ভাবে ব্যথা পেয়েছে কিন্তু এক ফোঁটা কাঁদেনি। কোথায় কিভাবে ব্যথা পেয়েছে এটাও বলতে পারেনি।

এর আচরণে অনুমান করি, শিশুটি বাবা-মার কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর বেশ কিছুটা সময় একে দিয়ে ভিক্ষা করানো হয়েছে। এর ভুবনটা পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে আছে।

এখন এ আমাদেরকে এলোমেলো করে দেয়ার চেষ্টা করছে।
এর পায়খানা-পেশাবের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নাই, গভীর রাতে জামা-কাপড় সব ভরিয়ে ফেলছে। মাঝরাতে কাউকে না কাউকে এই বাচ্চাটার গু পরিষ্কার করতে হচ্ছে। এ কখনো গু-মুত সহ হাঁটাহাটিঁ করতে গিয়ে ঘরময় নোংরা করছে। এভাবে কয় দিন?
সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হচ্ছে অস্বাভাবিক এমন একটা শিশুকে লালন-পালন করার পর্যান্ত জ্ঞান আমাদের নাই! যা আছে তা কেবল একগাদা অর্থহীন আবেগ!
এর জন্য প্রয়োজন আলাদা একটা আবাস, সার্বক্ষণিক পরিচর্যাকারি। এটা এফোর্ট করার মতো ক্ষমতা আমাদের নাই।

একটা শিশু আমাদের সাজানো সময়টাকে তছনছ করে দিচ্ছে। তারচেয়েও ভয়াবহ ব্যাপারটা হচ্ছে, শিশুটি আমাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে! এই শিশুটি আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা পশুটাকে বার করা জন্য আপ্রাণ চালিয়ে যাচ্ছে। পশুটা বার হলে কি হবে? অনর্থ হবে! তখন কি আমি একে স্টেশনে রেখে আসব? এই জায়গায় এসে পৃথিবীর বড়ো বড়ো মানুষরা চিল চিৎকারে আরশ কাঁপিয়ে ফেলতেন, না-আ-আ-আ, আমি এটা কখনই করব না। কাভি নেহি!
কিন্তু আমি অতি সামান্য একজন মানুষ বলেই আমি স্পষ্ট বলতে চাই, আমি জানি না। সময় আমাকে নিয়ে কী খেলা খেলবে এটা আমার জানা নাই। আসলে আমরা কেবল আলোর খোঁজই রাখি, অন্ধকারের খোঁজ রাখার ক্ষমতা কই আমাদের!


*ছবিটা কী চমৎকার, না? দেখে অনেকের মনে হতে পারেন শিশুটিকে মখমল দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। সদয় অবগতি, এটা একটা বাতিল জ্যাকেট। জ্যাকেটটা ফেলে দিতে পারলে বেঁচে যাই ,এমন।
(কেউ বলছিলেন, আমি নাকি প্রথম আলো বিদ্বেষী। তার এটা বলার কারণ হচ্ছে প্রথম আলোকে নিয়ে আমি বেশ কিছু পোস্ট দিয়েছি। এই পত্রিকাটির প্রতি অহেতুক আমার বিদ্বেষ আছে এমন না। বাসায় প্রথম আলো রাখা হয়, বিবিধ কারণে। 'নকশা' পাতাটা আমি সর্দি মুছে ফেলে দেই কিন্তু একজনের আবার এটা না হলে চলে না।

এক-দু পয়সা না, ৮০০ পয়সা ফি-রোজ ঢালা হয় পত্রিকাটার পেছনে; ৮০০ পয়সা উসুল না-হলে এ নিয়ে বলা যেতেই পারে। পাঞ্জাবিটা যখন নিজের তখন এটায় ছোপ ছোপ দাগ সহ্য হবে কেন, এই পত্রিকাটা পড়া হয় বলে এর অসঙ্গতিগুলো বড়ো চোখে পড়ে। এদের অসহ্য কিছু ফাজলামি সহ্য হয় না।
আজকের 'ছুটির দিনে' সুমনা শারমিন 'ক্ষিধে পেটে ঘুম' শিরোনামে মর্মস্পর্শি একটা লেখা লিখেছেন। অন্য কোন এক দিন প্রথম আলোতে ছাপা একটা ছবি নিয়ে, মাটিতে এক শিশু শুয়ে আছে। যতটুকু জানি সুমনা শারমিন প্রথম আলোর বড়ো কর্তাগোছের একজন‍।
টাচি কথাবার্তা। সুমনা শারমিনের আবেগ নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নাই। তবে এই লেখাটা সাধারণ পাঠক পড়ে আহা-উহু না করে থাকাটা তাদের জন্য দায় হয়ে পড়বে। মনে মনে এটা না বলেও তাদের উপায় থাকবে না, আহা রে, এই পরতিকাটার পাতায় পাতায় কী মায়া গো ! আহারে মায়া, চোখের জলে ভিজে যায় পাতা, ভেজা পাতা উল্টানো যায় না এমন! 


৪ বছরের শিশুটিকে নিয়ে লিখেছিলাম। এই শিশুটির নিখোঁজ সংবাদ ছাপাবার জন্য এলাকার প্রথম আলোর প্রতিনিধিকে অনুরোধ করেছিলাম। যথারীতি অন্য পত্রিকায় ছাপা হলেও এটায় ছাপা হয়নি। প্রতিনিধি ছেলেটির দোষ দেই না, এর ক্ষমতাই কতটুকু! এ প্রথম আলো অফিসে পাঠিয়েছে কিন্তু অফিস গা করেনি। আমি খুব একটা হতাশ হইনি কারণ এমনটিই হওয়ার কথা। একটা মানব সন্তানের জন্য এই পত্রিকায় স্পেস কোথায়? কোন নেতা কী রঙ্গের শাড়ি পরেছেন, কালার কি এটা ছাপানো যে খুব জরুরি! ব্যাঙ বাবাজীর বিয়ের খবর প্রথম পাতায় চলে আসে, স্পেস কোথায় বাওয়া?
ম্যান, বিজিনেস, নাথিং এলস!
কিন্তু যখন 'ক্ষিধে পেটে ঘুম' টাইপের লেখাটা পড়লাম তখন কেবলই মনে হচ্ছিল গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করে দিতে পারলে আরাম পেতাম। ফাজলামির একটা সীমা থাকা প্রয়োজন।)

Friday, December 25, 2009

রক্ত+তেল=

হোয়াইট হাউজের সামনে নাকি একটা আপেল গাছ ছিল। এখন নাই। নাই কেন, এর ইতিহাস খানিকটা বিচিত্র! জঙ্গল সাহেব ওরফে বুশ একদিন ব্যালকনিতে বসে মানুষের খুলিতে চা পান করছিলেন। হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, আপেল গাছে লাদেনের মত একজন মানুষ পা ঝুলিয়ে কচকচ করে কি যেন চিবুচ্ছে। বুশের অভ্যন্তরীন হালুয়া টাইট হয়ে গেল। বুশের ধারণা হলো লাদেন ওনার গ্রে মেটার চিবুচ্ছে।

বুশের মস্তিষ্কই নাই, গ্রে-মেটার আসবে কোত্থেকে? বুশ আসলে জানতেন না ব্রেন বলে কোন জিনিস আদৌ তার নাই। এক জটিল অপারেশনে সার্জন ভুল করে তার ব্রেন ফেলে দিয়েছিলেন। সার্জন অপারেশনের পরপরই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে এ রহস্য রহস্যই থেকে যায়। সিআইএ সাদ্দামের পশ্চাদদেশ শুঁকতে এতই ব্যস্ত ছিল এ রহস্য নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় কোথায়!

যাই হোক, বুশ রাইসকে "আ নিড আ বাথরুম ব্রেক" বলে সেই যে বাথরুমে ঢুকলেন আর তো বের হন না। কিছুক্ষণ পরেই হাউজ ফোনে নির্দেশ দিলেন, আপেল গাছটি কেটে ফেলার জন্য, যথারীতি গাছটা কেটে ফেলা হলো। গাছটি না-কাটা পর্যন্ত বাথরুম থেকে বেরই হলেন না।
সম্প্রতি এক গাছ বিশেষজ্ঞ ওই আপেল গাছটির শেষ সংলাপ উদ্ধার করেছেন। আপেলদের খা-খু, খি-খা ভাষা বাংলায় রুপান্তর করে এখানে দেয়া হলো:
১ নং আপেল: আমাদের সামনে বড়ো সুদিন রে, এই পৃথিবী হবে সোনার আপেল পৃথিবী!
২ নং আপেল: ক্যামনে কী!
১ নং আপেল: দেখ, ওই যে সাদা বাড়িতে একটা গাধা থাকে এ অচিরেই এই পৃথিবীটা শেষ করে ফেলবে, মানুষের নাম-গন্ধ থাকবে না। পৃথিবীতে থাকব কেবল আমরা গাছেরা। তখন আমরাই পৃথিবী শাসন করব। সাদা বাড়িটায় গিয়ে উঠব। কী মজা, খিক-খিক!
২ নং আপেল: হুম, খুব মজা হবে কিন্তু শাসন করবে কে? কাঁচা আপেল, না পাকা আপেল?

গল্পটা বলার কারণ হচ্ছে, বুশের নৃশংসতা আলাদা করে কিছু না। মূল বিষয় হচ্ছে, রক্ত+তেল=ব্যবসা। এক্সন-মবিল, রয়্যাল ডাচ শেল, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, ক্রমশ এরা ইরাকের সমস্ত তেল নিয়ে নিচ্ছে, হালাল পদ্ধতিতে। এরা তো আবার সভ্য জাতি, দু-নম্বুরিতে নাই। তেলের সঙ্গে রক্ত মেশাবার কারণেই এটা হালাল হয়েছে- যুদ্ধটা না লাগিয়ে উপায় ছিল না। এদের পরিশোধনাগারে তেল থেকে রক্তগুলো ছেঁকে ফেলার কতো আধুনিক যন্ত্রপাতিই না আছে!
এদের সব কিছুই অতি উঁচু মানের। পারফিউমও লাগান অত্যন্ত দামি, এই পারফিউম সালফারের (বোমা তৈরির প্রধান উপাদান) গন্ধ ছড়ায়। তাই তো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পাশে বসলেই এটা টের পাওয়া যায়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পাশে বসেই চিল-চিৎকারে বলেন, "আমি এখানে সালফারের গন্ধ পাচ্ছি"!

তো, হালাল খেলাটা খেলার জন্য একজন গ্রহবাবা ওরফে আমেরিকার কাঁধে বন্দুকটা তো রাখতে হবে, উপায় কী! যিনি পৃথিবীতে শান্তির বুলি কপচিয়ে বিশ্ববাসিকে তাক লাগিয়ে দেবেন। কেউ যদি ভাবেন, কেবল শান্তির বুলি কপচিয়েই কাজ সারা তাহলে ভুল ভাবছেন।
এখানে খানিকটা অংকের খেলাও আছে। প্রথমেই তেল উৎপাদনকারী প্রধান ৩টি দেশ ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরবের মধ্যে সৌদি আরবকে বেছে নেয়া হবে। (আরব শেখরা, এরা যোদ্ধা জাতি ছিল কিন্তু কালে কালে এরা বন্দুকের নলের চেয়ে চামড়ার নলই সমস্ত ক্ষমতার উৎস এই মতবাদে এরা ব্রেন ড্রেনে ফেলে দিল)।
গ্রহবাবার কল্যাণে তার পুত্র সাদ্দাম নানাপ্রকার চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় দ্বারা এমন মোটাতাজা হলো, অনায়াসে কুয়েতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সৌদি শেখদের হাগু বন্ধ, লম্বা হয়ে পড়ল গ্রহবাবার পায়ে। ক্রমশ লম্বা হলো কুয়েত, ইরাক।

ফাঁকতালে আর্মস ডিলারদেরও একটা গতি হলো। অস্ত্র অসম্ভব লাভজনক পণ্য। এতো সব হাইটেক মারণাস্ত্র যে বানানো হচ্ছে এইসবের লাইভ মহড়া করার উপায় কী? আগে একটা ক্লাস্টার বোমায় ৫০ জনের মৃত্যু হতো এখনকার ক্লাস্টার বোমায় আনুমানিক ৫০০ জনের মৃত্যু হয়। নির্জন মরুভূমিতে এর মহড়া করলে বোঝা যাবে কেমন করে? কী আর করা, তো যুদ্ধ লাগাও। শ্যাম্পেনে চুমুক দিয়ে পরস্পরের স্বাস্হ্য পান করতে করতে যুদ্ধের লাইভ ভিডিও ফুটেজ দেখো, দরদাম করো, ডিল। ব্যস...।

এতে আমাদের লাজের কিছু নাই, এই গ্রহের গ্রহবাবা হচ্ছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। কখনও বুশ, কখনও জুনিয়র বুশ। কাঁচা আপেল পাকা আপেলের মত সাদা মানুষ, এখন কালো মানুষ। একজন কালো মানুষ বারাক ওবামাকে নিয়ে আমার আশা অনেক (ওবামা ইউনিলিভারের ফেয়ার এন্ড লাভলী কেন যে মাখেন না এই রহস্য আজও ভেদ করতে পারলাম না)।

কিন্তু দৈনিক প্রথম আলো আমার সেই আশায় পানি ঢেলে দিয়েছে। ১১ ডিসেম্বর এরা লিখেছে, "বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের হাইওয়েতে জন্ম নিয়েছেন!" যে প্রেসিডেন্টের জন্ম হাইওয়ে-রাজপথে তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাটা কঠিন হয়ে পড়ে!
হাওয়াই হয়ে গেছে হাইওয়ে, হা হা হা!
তবুও ক্ষীণ আশা, তিনি বুশের হবেন না।

বুশ, এই মানসিক রোগিটাকে কিছু বলাও বিপদ। কেউ বলল, বুশ, সারফেসটা উঁচু করো তো, বাপ। এ করবে কী, নিমিষেই লোকজন সব মেরে কবর বানিয়ে সারফেসটা উঁচু করে ফেলবে।
এদের বাবা-মা কে এটাই জানা নাই অথচ মাদারল্যান্ড নাকি ফাদারল্যান্ড রক্ষার্থে যুদ্ধ! বুশ গাধাটা তেলের সঙ্গে রক্ত মিশিয়ে নতুন একটা জ্বালানী আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিল এটা প্রকাশ্যে না-বলার জন্য আমি বুশকে খানিকটা সমীহ করি, শ্রদ্ধা করি। যাক, সার্জন অপারেশনে তার ব্রেন ফেলে দিলেও ছিটেফোঁটা ব্রেনের লেগে ছিল তাহলে।

*ছবিসূত্র: বুশের এই ছবিটির সূত্র আপাতত আমার জানা নাই বলে ক্ষমা প্রার্থনা। যিনিই এই ছবিটা বানিয়েছেন তার তারিফ না-করে উপায় নেই। বুশের এই ছবিটা বড়ো করলে অসংখ্য মুখ ভেসে উঠবে। এঁরা হচ্ছেন, ইরাক যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনা।
**ছবি ২: scrapetv.com

Thursday, December 24, 2009

অভিশাপ দেই নিজেকে

কখনও কখনও কিছু বিষয় আমাকে বিভ্রান্ত করে দেয়, ভেবাচেকা খেয়ে যাই। তীব্র ঝাঁকুনি কাবু করে ফেলে, নতুন করে ভাবতে শেখায়। ভ্রুকুঞ্চন করে আজ যে প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, আমার কাজটা কি আসলে? কেন আমার এ গ্রহে ভ্রমন? আসলাম অনিচ্ছায়, যাবো অনিচ্ছায়; মাঝের যাপিত দিনগুলোও অনিচ্ছায়। ভুল রোলে অভিনয় করে করে ক্লান্ত হয়ে গেছি, ব ক্লান্ত।
নড়বড়ে সাঁকোটা ধরে ধরে পেরিয়ে যায়
একেকটা দিন, অমসৃণ।
আমি বুঝি না, এ কী অবিচার! আমি যেখানে থাকি, এখানে কয়েক লক্ষ মানুষ বাস করে; আমি কেন! হোয়াই? এইসব যন্ত্রণার আমাকে কেন মুখোমুখি হতে হবে?

মানসিক প্রতিবন্ধী ৪ বছরের এই শিশুটি নাকি রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সমস্ত শরীরের মারের দাগ। লোকজন দু-কলম লেখালেখির সুবাদে আমাকে ধরে বসেছে পত্রিকায় নিখোঁজ সংবাদ ছাপাবার ব্যবস্থা করে দিতে। অথচ এই কাজটা এরা অনায়াসেই করতে পারে, এর সঙ্গে লেখালেখির কোন যোগসূত্র নাই। পত্রিকার সঙ্গে জড়িত জুনিয়র কিছু ছেলেপেলেকে ধরে এই ব্যবস্থা করে দিলাম।
কেউ আসেনি এই শিশুটির খোঁজে!

এখন কী? লোকজনের স্পষ্ট বক্তব্য, একে রেলস্টেশনে ছেড়ে দিয়ে আসা হোক। বলে কী! এ কি কুকুর, না বেড়াল যে দূরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসলেই হলো!

কেউ বললেন, একে রাখলে পুলিশি ঝামেলা পোহাতে হবে। এটাও নাকি বিচিত্র না, অভিযোগ উঠবে, এর কিডনি খুলে রেখে দেয়া হয়েছে।
শ্লা, এই দেশটা বড়ো বিচিত্র! কোন একজন মানুষ রাস্তায় দুর্ঘটনায় রক্তে ভাসতে থাকলেও কেউ এগিয়ে আসবে না পুলিশি ঝামেলার ভয়ে। সাহস করে কেউ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও ডাক্তার তাকে ছোঁবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না পুলিশকে ইনফর্ম করা হবে। আজিব!

থানাওয়ালা এই শিশুটির বিষয়ে কোন দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না, চাচ্ছেন না এলাকার জননেতাও। অথচ এই জননেতার নিয়ন্ত্রণে আছে সমাজ-কল্যাণ অধিদপ্তর, গন্ডায়-গন্ডায় অধিদপ্তর। এতো দপ্তর মিলে একটা শিশুর দায়িত্ব নিতে না পারলে আমরা গাদাগাদা ট্যাক্স দিচ্ছি কেন, বেহুদা।

বাস্তবতায় আবেগের স্থান কোথায়? আমার এখানে শিশুটিকে রেখে দেয়াটা চাট্টিখানি কথা না।
ঝড়ে আমার নিজের ঘর সামলাতেই আমাকে যথেষ্ঠ বেগ পেতে হচ্ছে। মানসিক প্রতিবন্ধী (খানিকটা অন্য রকম) এই শিশুটিই যখন গু-পেশাবে মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকবে বাসার লোকজনরা ক্রমশ বিরক্ত হবেন। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আমার লেখার কাগজপত্র যখন ছিঁড়ে কুটিকুটি করবে তখন আমিই কি বিরক্ত হবো না?
আমার পরিচিত মানুষরা আমাকে একজন হৃদয়হীন মানুষ হিসাবেই জানেন। এরা কখনই জানবেন না, কাঁদে সবাই; কেউ প্রকাশ্যে, কেউ বাথরুমে। কেউবা কাঁদতে পারে না, এদের মত অভাগা আর কেউ নাই!

আমি শিশুটির চোখে চোখ রাখতে চাই না, কী তীব্র সেই চোখের দৃষ্টি! তার চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা কই আমার! এইসব শিশুদের জন্য একটা হোম করতে মিলনিয়র হতে হয় না। মাসে ১০ হাজার টাকা খরচ করলে ১০/১৫ জন শিশুকে অনায়াসে রাখা যায়। আমি নতচোখে নিজেকে ধিক্কার দেই। আফসোস, আমার মত মানুষরা কেবল মুখ আর রেকটাম নিয়ে এসেছে, আর কিচ্ছু না। নিজের সীমাবদ্ধতার উপর আজ আমার দুর্দান্ত রাগ। অভিশাপ দেই নিজেকে।

অন্যদের মত মানুষ হতে
আমার ইচ্ছা করে না বুঝি। অপেক্ষায় আছি, সেই দিন কবে যেদিন আমি এই শিশুটিকে স্টেশনে ফেলে দিয়ে আসব...।

*ছবিটা উঠিয়েছে ৫ বছরের আরেক শিশু, লামিয়া। কাজটা আমার ইচ্ছাকৃত, রোবটিক যুগে তাকে কঠিন বাস্তবের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। আমার এই উত্তরাধিকারের শরীরে আমি আমার শরীরের উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে চাই। এতে আমি কতটা সফল হলাম, কি ব্যর্থ; তা
তে কিছুই আসে যায় না। অন্তত আমার চেষ্টায় কোন খাদ নাই।

Wednesday, December 23, 2009

ষাটজনের সাক্ষ্য এবং আমার ভাষ্য

এই দেশ বড়ো বিচিত্র ততোধিক বিচিত্র এই দেশের মানুষ। এখানে মদের দামে ছাড় আছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের উপর ছাড় নাই!
লাগাম ছাড়া দামের মুক্তিযুদ্ধের বইগুলো কী তথাকথিত আঁতেলদের জন্য- এঁরা তো আবার সৌজন্য কপি পেয়ে থাকেন। এঁদের যে আবার সৌজন্য কপি না-দিলে জাতেই উঠা যাবে না!
বাহ রে, এঁরাই কেবল জানবেন, এরপর লম্বা-লম্বা বুলি কপচাবেন, আমরা ঘিলু অন্যত্র জমা রেখে হাঁ করে শুনব বুঝি! আর এঁরা না-পড়লে, দু-একটা কিনে ড্রয়ংরুমে ঘটা করে সাজিয়ে রাখবেন।

আমার ক্ষোভের বিস্তর কারণ আছে। মুক্তিযুদ্ধের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সম্ভবত আমার কয়েক শ লেখা-পোস্ট আছে। এই লেখাগুলো লিখতে গিয়ে কখনও এমনও হয়েছে, ইচ্ছা করত পা ছড়িয়ে বসে কাঁদি। আগুনছোঁয়া এইসব বই কেমন করে কিনব? কী যে দাম একেকটা বইয়ের!

এদিক দিয়ে আমি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে টুপি খুলে অভিবাদন জানাই, মাত্র ১০ টাকায় তিনি এক অসাধারণ কাজ করে ফেলেছিলেন।

প্রথম আলো ১৯৭১ সালের, বাংলা প্রতিলিপি 'ষাটজনের সাক্ষ্য' নামের ২৪ পৃষ্ঠার একটা জিনিস হামবড়া বিজ্ঞাপন দিয়ে বের করেছে। হ্যান-ত্যান, ম্যাট নাকি ফ্যাট কাগজ; এরা হয়তো বলবে, এটা মখমল দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাই দাম ধাম করে বেড়ে গেছে। আরে, এর প্রয়োজন কী, এটা তো আসমানি কিতাব না যে এটাকে মখমল দিয়ে মুড়িয়ে তাকে রেখে দিলুম। মাঝে-মাঝে নামিয়ে চুমু খেলুম।
 

২৪ পৃষ্ঠার এই জিনিসটাকে চটি বলা যাবে না, না? কী বলব, চটা? ২৪ পৃষ্ঠার এই বেঢপ সাইজের জিনিসটাকে আসলে কী বলা যাবে এ নিয়ে ধন্ধে আছি। এই বেঢপ সাইজের জিনিস রাখব কোথায় এটা নিয়েও বড়ো বিপদে আছি, এটাকে কি কম্বলের মত গোল করে রাখব?
আমি তো চোরাই কাঠের ব্যাপারি না যে এই জিনিস রাখার জন্য এই সাইজের বেঢপ একটা বইয়ের তাক বানিয়ে ফেলব। আমি তো নব্য ধনি না যে ওই বেঢপ সাইজের তাকের বইয়ের আলমিরাটা রাখার জন্য ঘরের দেয়ালগুলোকে খানিকটা করে পিছিয়ে সরিয়ে দেব। যাগ গে, এই নিয়ে কস্তাকস্তি করে লাভ নাই, কোন উপায় না-পেলে এই বেঢপ জিনিসটা মাথায় নিয়ে বসে থাকব!

মুক্তিযুদ্ধের ধারক-বাহক প্রথম শ্রেণীর পত্রিকা, নাইব উদ্দিন আহমেদ এদের দৃষ্টিতে মুক্তিযোদ্ধা না কারণ তিনি প্রথম আলোর কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেননি। মুক্তিযুদ্ধের ধারক-বাহক, এরা মুক্তিযুদ্ধের বই বের করেছেন দাম নিয়ে উচ্চবাচ্য করার যো কই! ২৪ পৃষ্ঠার এই জিনিসটার দাম ৫০ টাকা হতে পারে কিনা এই নিয়ে যারা বই-টই ছাপেন এরা ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু আমি আমার অল্প জ্ঞান নিয়ে বুঝি এটার দাম কোনক্রমেই ৫০ টাকা হতে পারে না। হলেও, প্রথম আলো দামটা কেন শেয়ার করতে পারল না? এদের মাথায় কি একবারও এই ভাবনা খেলা করল না, বইটার দাম ২০-২৫ টাকায় রাখি। ছাপার সংখ্যা বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসি? আসলে এই ভাবনা ভাবার এদের প্রয়োজন নাই:

"কুমিরের চোখের জলে ভেসে যায় গাল
গায়ে যে তার কুৎসিত লোভের ছাল।"


আহা, এদের যে আবার নাক-উঁচু, বেজায় লম্বা নাক! 'মিডিয়াওয়াচ' নামের ৩২ পৃষ্ঠার একটা নিউজপ্রিন্টের চমৎকার ম্যাগাজিন বের হয়। দাম কত শুনবেন? মাত্র ২ টাকা! তাও আবার ১ লাইন বিজ্ঞাপন নেই!

Tuesday, December 22, 2009

অশ্লীলতার সংজ্ঞা

ছাপার অক্ষরে, আভিধানিক অর্থে অশ্লীলতার সংজ্ঞা কি এটা এখানে আমার আলোচ্য বিষয় না।
আমার মনে হয় অবস্থান, সময়, ভঙ্গি, রুচি বোধ, একেকজনের কাছে অশ্লীলতার একেক অর্থ দাঁড় করায়। বৈদেশে অনেক টাট্টিখানার দরোজার বালাই নেই এটা তাদের কাছে কোন বিষয় না, কিন্তু আমরা কল্পনাও করতে পারি না, চেঁচিয়ে দেশ মাত করে ফেলব, অছলীল-অছলীল(!)।
অনেকের কাছে ন্যূড ক্লাবে কাপড় পরে যাওয়া অশ্লীলতা। অবশ্য দিগম্বর হওয়াটা শ্লীল না অশ্লীল এটা নিয়ে এদের সঙ্গে তর্ক চালিয়ে যেতে সমস্যা নেই।

কারও কাছে পাবে (যেখানে পাগলা পানি বিক্রি হয়) দুধ চাওয়াটা অশ্লীলতা। মুখ গম্ভীর করে এরা বলবে, বাওয়া, তুমি জানো এখানে লিকার বিক্রি হয় এখানে দুধ চাইতে এসেছে কেন? তারচেয়ে একটা ফিডার কিনে নিয়ে বাড়িতে বসে চুকচুক করে দুধ খাও।

একবার একটা ওয়েব-সাইটে একজন, দুর্ধর্ষ একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, 'আমি একজন যৌনসঙ্গি খুঁজছি' এটা কি অশ্লীল?
কথাটা কোথায় বলা হচ্ছে এটা জানাটা বড়ো জরুরী। আমার মনে হয়, কোন হট-হাউজে কোন সেক্স-ভলন্টিয়ারকে বললে এটা অবশ্যই অশ্লীল না, অতি শ্লীল। কিন্তু অন্যত্র বললে এটা নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকতেই পারে।

জনসমক্ষে হুজুররা যে নিমের ডাল দিয়ে দাঁত ঘসাতে ঘসাতে দাঁত খুলে ফেলার চেষ্টা করেন এটা আমার দৃষ্টিতে বড়ো অরুচিকর, অশ্লীল মনে হয়! নব্য আধুনিকগণ পিছিয়ে থাকবেন কেন? ভোর বেলায় একটা ব্রাশ নিয়ে জনসমক্ষে বেরিয়ে দাঁতের সঙ্গে দাঁতাদাঁতি(!) করে মনে করেন ভারী একটা কাজের কাজ হলো। মুখ পেস্ট-থুথুতে মাখামাখি; গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে, দৃশ্যটা দেখে অন্যরা আনন্দে পশ্চাদদেশ দোলালেও আমার গা গুলায়। মনে হয় গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করে দিতে পারলে আরাম পেতাম!

কোন পুরুষ পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত মহিলাদের চকচকে-পিচ্ছিল কাপড় পরে ধর্মানন্দে ঘুরে বেড়ান, আমাদের উদ্ধার করেন। কিন্তু বিষাদের সঙ্গে বলি, পোশাকটা আমার কাছে স্রেফ অশ্লীল মনে হয়। আরে এ মহিলাদের পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেন! তেমনি মনে হয় কোন পুরুষ মহিলাদের পারফিউম মাখলেও।

সজীব ওয়াজেদ এবং তারেক জিয়াকে নিয়ে দলের সিনিয়র বয়স্ক মানুষরা যখন কথা চালাচালিতে জড়িয়ে পড়েন তখন এটা আমার কাছে জাস্ট অশ্লীল মনে হয়। আমার বোধগম্য হয় না,
এই বিষয় নিয়ে এইসব বুড়া-বুড়া ঝানু মানুষদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে কেন? সজীব ওয়াজেদ এবং তারেক জিয়া, এঁরা এখন পর্যন্ত এই দেশের জন্য কী এমন করেছেন যার জন্য বুড়া-বুড়া নেতারা নিজেরা তো জড়াবেনই গোটা জাতিকে বিভক্ত করে জড়াবার চেষ্টা করবেন। কারণ কী!
কারও বিরুদ্ধে ( নেতাদের পুত্রধন) কোন অন্যায় অভিযোগ উঠলে দলের ল-অফিসার এটা নিয়ে বক্তব্য দেবেন, খন্ডন করার চেষ্টা করবেন, প্রয়োজনে আইনি লড়াই লড়বেন। আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন- দুধের দুধ, পানির পানি প্রমাণ করে ছাড়বেন। ব্যস, সমস্যাটা কোথায়, কে আটকাচ্ছে!

অবদানের কথা উঠলে বলা চলে এঁদের মত অবদান এই দেশের লক্ষ-লক্ষ তরুণ রেখে যাচ্ছেন, নাথিং নিউ। জানি-জানি, অনেকে বলার চেষ্টা করবেন, সজীব ওয়াজেদ দেশের বাইরে থাকেন তাঁকে কোন হুজ্জত পোহাতে হয়নি কিন্তু তারেক জিয়া জেল-জুলুম খেটেছেন। তারেক জিয়ার জেলের যথার্থতা নিয়ে আমি এখানে আলোচনা করতে চাচ্ছি না। তবে জেল-জুলুমের কথা বলা হলে তখন এই দেশে এমন অনেকের উপর দিয়েই এমন ঝড় বয়ে গেছে। আমাদের টাকায় পোষা আর্মিরা নিজেদেরকে প্রায় ঈশ্বরের পর্যায়ে ভাবছিলেন।

আমি মনে করি, অন্যায়-জুলুমের কথা যদি উঠে তাহলে কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানের সঙ্গে অন্য কেউ নস্যি। ড. মো: আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে এই ছেলেটির জেলখানায় দেখা হয়েছিল। অল্পবয়সী অভাগা এই ছেলেটি (ছোটবেলায় তার বাবা-মার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়) কার্টুন প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার পর সে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে আসে। প্রথম আলো পত্রিকার আলপিনের জন্য কার্টুন আঁকা শুরু করে। যে কার্টুনের (ওই কার্টুনের মাধ্যমে সে নাকি ইসলাম ধর্ম বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দিচ্ছিল) জন্য তাকে অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল (জেলখানায় এক কয়েদী তার মুখে লাঠির আগায় করে গু লাগিয়ে দিয়েছিল পর্যন্ত) অথচ এই কার্টুনের সংলাপগুলো তার না। তার না বলতে (এটা অনেক পুরনো কৌতুক, 'কিশোরকন্ঠ' নামের ইসলামের ধারক-বাহক মহতরামদের পত্রিকায় বহু পূর্বেই ছাপা হয়েছিল) আমি বলতে চাইছি এই সংলাপগুলো সে ঠিক করেনি, প্রথম আলো থেকে নির্বাচন করে দেয়া হয়েছিল।
এর দায় বর্তায় বিভাগীয় সম্পাদক, সম্পাদকের উপর। অথচ এঁরা বহাল তবিয়তেই আছেন, যথারীতি বনবন করে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন; গোটা দেশবাসীকে শপথ করাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে প্রকারান্তরে আমার কাছে এইসব অশ্লীলতারই নামান্তর। অনেকের অমত থাকতে পারে, কিন্তু আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি, অনেক অন্যায় আছে যার প্রকাশ ভঙ্গির কারণে আমার কাছে অন্যায় এবং অশ্লীলতা সমার্থক মনে হয়।

দুধ থেকে আমরা যেমন মাছি ফেলে দেই, প্রথম আলো ঠিক তেমনি এই অভাগা ছেলেটার হাত ছেড়ে দিয়েছিল, তাকে অতি নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ছুঁড়ে ফেলেছিল। তার প্রতি করা এই অন্যায়ের অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা হয় বলে আমি মনে করি না। আমার কাছে প্রথম আলোর এই অশ্লীলতার সঙ্গে তুলনা করলে কোন দুই বুড়ার সমকামিতার দৃশ্যও অনেকটা সহনীয় মনে হবে...!

Monday, December 21, 2009

অপার সৌন্দর্য এবং একপেট আবর্জনা!

বাড়ির কাছেই ছোট্ট একটা রেলের পুল। আগেও দেখেছি কিন্তু আজ দেখে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। কী এক অপরূপ দৃশ্য- মনে হয় এটা এ গ্রহের কোন অংশ না, হলেও অপরিচিত কোন এক স্থানের, অন্য ভুবনের! কী বিপুল ফেনা! দেখো দিকি ঢং, এই ফেনার উপর আবার সূর্যের আলো পড়ে আলোর খেলা, ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। ইচ্ছা করে এই শ্বেত-শুভ্র ফেনায় গা ভাসিয়ে দেই। অন্তত পেঁজা-পেঁজা এই শুভ্র ফেনা গায়ে মেখে শুয়ে থাকি।

এই অপার সৌন্দর্যের পেছনের কথা জেনে গা শিউরে উঠে। প্রকৃতি এবং মানুষ অনেক কসরত করে শরিরের একপেট আবর্জনা ঢেকে রাখে। নইলে মিস ওয়ার্ল্ড এবং কদাকার জরিনার মধ্যে কোন ফারাক থাকত না।
এই বিপুল ফেনার উৎস হচ্ছে, ভারত থেকে যে পানি বাংলাদেশে নামছে ওই পানির সঙ্গে মেশা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান,বর্জ্য। যা মানুষের জন্য ভয়াবহ রকম ক্ষতিকর।- ক্ষতিটা কি কি হচ্ছে এটাও আমাদের জানা নাই। আমাদের দেশে কেউ এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে বলে মনে হয় না, ঘামালেও লাভ কী- দাদা বলে কথা!

আমরা দাদাদের দয়ায় বেঁচে আছে। দাদারা তাদের বর্জ্য আমাদের এখানে পাঠিয়ে দেন, সেই বর্জ্য থেকে উৎপন্ন সৌন্দর্যে আমরা কবিতা লিখি।
দাদারা আমাদের এখান থেকে মাছ, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যান, কিন্তু তারা মেয়াদ উত্তীর্ণ সামগ্রী পাঠিয়ে দেন।
তারকাঁটার বেড়া গলে কিছুই এদিক-ওদিক হবার যো নাই ভুলক্রমে একটা গরু চরতে চরতে এদের সীমানায় চলে গেলে, গরুটাকে ফিরিয়ে আনতে যাওয়া মানুষটাকে পাখির মতো গুলি করে মারেন। কিন্তু স্রোতের মত ফেন্সিডিল আসতে কোন সমস্যা নাই। দাদাদের পাঠানো ফেন্সিডিল নামের কফের সিরাপ খেয়ে আমরা ঝিমাই, সাহিত্য রচনা করি। ঝিমুনি কমে এলে ক্ষুর চালাই, মার গলা থেকে হারটা ছিঁড়ে নিয়ে যাই।
দাদা বলে কথা...।

ছবিস্বত্ব: সংরক্ষিত

Sunday, December 20, 2009

উদ্বোধক আবশ্যক

আমি থাকি পুরনো ধাঁচের একটা বাড়িতে। বাড়িটা বুড়া হয়ে গেছে, বয়স ১০০ ছুঁই ছুঁই! এই বুড়ার কাছে ফিরে আসার মায়াটা কেউ ভালো চোখে দেখেন না।
বাচ্চার মার স্পষ্ট বক্তব্য, এটা ভূতের বাড়ি। বাড়িটার ছাদ বিশাল কিন্তু তিনি যেতে আগ্রহ বোধ করেন না, ছাদে নাকি ভূত-প্রেত তাশ খেলে। কী যন্ত্রণা, খেললে খেলুক না, টাকা দিয়ে জুয়া তো আর খেলছে না! সমস্যা কোথায়!

কারা কারা নাকি ছাদেও পরীও দেখেছেন। একদিন এক গেস্ট সকালে উঠে বলছিলেন, ছাদে তিনি নাকি নুপুরের শব্দ শুনেছেন। অতএব আমার বাড়িতে তিনি আর পদকাদা (সময়টা বর্ষাকাল ছিল বিধায় পদধূলি দুর্লভ) দিতে চান না।
বেশ, কিন্তু আমি তো কোন সমস্যা দেখি না। পরী নাচলে সমস্যা কী, পরীর নাচ দেখার ভাগ্য ক-জনের হয়! আর খোদা-না-খাস্তা পরী
আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলে আমার আপত্তি করার তো কিছু দেখছি না। অবশ্য পরীরাজ্যে নেটের লাইন না-থাকলে আগ্রহ খানিকটা কমে আসবে।

আগেকার দিনে, ব্রিটিশরা বাড়ি বানাবার সময়, টাট্টিখানা-লেট্রিন-বাথরুম-টয়লেট-রেস্টরুম যে নামেই ডাকা হোক না কেন পরিচয় তো একটাই, বৃক্ষ তোমার পরিচয় কি...। তো, এটা লাগোয়া করা হতো না। বাড়ি থেকে দূরে থাকত।
এই বাড়িটাতেও এই ব্যবস্থাই ছিল। শীতের সময় বড়ো ঝামেলা হয়ে যেত। দাস্তের কথা আর বললাম না...।

বিট্রিশ সাহেবরা বাইরে লোটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করুক, আমার কী!
সালটা সম্ভবত ৮৪-৮৫ হবে। ঠিক করলাম, লাগোয়া একটা টাট্টিখানা বানাব। কষ্টেসৃষ্টে বানাবার পর মনে হলো, আমাদের দেশে উদ্বোধন করার চল চালু আছে- এই কাতারে রাস্তা, ব্রীজ হেনতেন কী নেই! একটা কিছু পেলেই হলো আর কী। তাহলে টাট্টিখানা কি দোষ করল, এর উদ্বোধন করাই সমীচীন?

আমি এটা উদ্বোধনের জন্য উদ্বোধক খুঁজতে লাগলাম। নামি-দামি মানুষের সঙ্গে পরিচয় নাই বিধায় যেনতেন একজন হলেই হয় এমন একটা ভাব। কিন্তু কেউ রাজি হলেন না। টাট্টিখানা উদ্বোধন করলেই তো হবে না, টাট্টির বেগও চাপতে হবে। যেমন চল- দস্তুরমতো কাজকাম করে উদ্বোধন করা।
এই দেশের উদ্বোধকের প্রতি আমার ভালবাসার কারণে এই ফানটা অনেকেই ভালো চোখে দেখলেন না। আশেপাশে ছড়িয়ে গেল, কারা কারা নাকি ছাদে আমাকে আকাশের সঙ্গে বাতচিত করতে
দেখেছেন। দেখতে আপত্তি নাই কিন্তু আমার গায়ে নাকি সুতাও ছিল না। শোনো কথা, সুতা থাকবে কেন, আমি কী সুতার বেপারি?

আমার দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হতো, ওহে, বঙ্গালদেশের উদ্বোধকগণ, আপনার মধ্যে এমন কেক্ক (কেহ-এর কোমল রূপ) নাই বাথরুম উদ্বোধন করে এই অভাজনের প্রতি দয়া করবেন। প্লাসিবো এবং নসিবো এই দুই বোধ-চিন্তাই নাকি মানুষকে চালায়। প্লাসিবো- পজিটিভ চিন্তাই নাকি প্রকারান্তরে মানুষকে সফল করায়, নসিবো- নেগেটিভ চিন্তা অসফল। আমার মধ্যে এখানে প্লাসিবোটা কাজ করেছে ভালই।

ওয়াল্লা, আছে-আছে, বাথরুম উদ্বোধন করার যোগ্য লোকও আছেন দেশে। দেখি বলেকয়ে রাজি করাতে পারি কিনা। ধার-দেনা করে বাথরুমটা খানিকটা অদলবদল করে 'পুনঃউদ্বোধন হইবে' এমন একটা ফলক লাগিয়ে ল্যাট্রিনে যাওয়ার জন্য লোটা ধরিয়ে দেব। স্যার ডেলিভারি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা হাততালি দেব। স্যারও বেরিয়ে ঝলমলে মুখে বলবেন, কী শান্তি! এমন উদ্বোধন করার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হয় না!
*ছবিঋণ: জাহাঙ্গীর কবির জুয়েল, ময়মনসিংহ/ প্রথম আলো

Saturday, December 19, 2009

স্যাররা, দলবাজি বন্ধ করেন

আগেও লিখেছিলাম, চর্বিতচর্বণ করি। আমাদের জন্মের পর থেকেই বিভাজন শুরু হয়। এটা মানুষের বাচ্চা, না পশুর বাচ্চা? মানুষের বাচ্চা, বেশ। এটা কি ছেলে বাচ্চা, না মেয়ে বাচ্চা? ধর্ম কি? হিন্দু, মুসলমান, খ্রীস্টান, নাকি নাস্তিক? এরপর দেশের বাড়ি কই? তবলার ঠুকঠাকের পর আসল কথা, মানুষটা কোন দল করে?
এই দেশে দল করেন না এমন মানুষ খুঁজতে বেগ পেতে হয় বৈকি! জাদুঘরে খোঁজ করলে অন্য কথা।

মুক্তিযোদ্ধাদেরও দল আছে। বিএনপি মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধা; হালে জামাতের মুক্তিযোদ্ধাও আত্মপ্রকাশ করেছেন! রেলওয়ে মুক্তিযোদ্ধাও আছেন (বাস্তবে এটা এখন একটা চা-র দোকান। রেলস্টেশনে রাতারাতি গজিয়ে উঠেছে)! কালে কালে ২০ বছর বয়সের মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গেও আমরা পরিচিত হব। ইনশাল্লাহ!

ড. মো: আনোয়ার হোসেনের 'রিমান্ড ও কারাগারের দিনলিপি' বইটা পড়ছিলাম। পড়ছিলাম বললে ভুল হবে, গোগ্রাসে গিলছিলাম। মানুষটার চোখ দিয়ে কত অজানা বিষয়ের সঙ্গে যে পরিচিত হচ্ছিলাম। 

ড. আনোয়ার হোসেন কেবল কর্নেল তাহেরের ভাই হিসাবেই পরিচিত না। প্রজ্ঞাবান একজন মানুষ এবং অসম্ভব সাহসি। তাঁর সঙ্গে আটক শিক্ষকগণ এবং অন্য শিক্ষক অমর্যাদার সঙ্গে যখন আত্মসমর্পন করতে চাইছিলেন তখন মানুষটা একাই লড়াই চালিয়ে গেছেন। আমি যে কী মুগ্ধ হয়েছিলাম!

কিন্তু আমি ধাক্কাটা খেলাম তখন যখন মানুষটা নীল জামা গায়ে চড়িয়ে এলেন! অর্থাৎ মানুষটা নীল দল করেন। শিক্ষকদের যে নীল, সাদা, গোলাপি দল আছে এটা আমার জানা ছিল না। আমি হতভম্ব হয়ে ভাবছিলাম, শিক্ষক হচ্ছেন পিতাসম, সমস্ত ছাত্র তাদের সন্তান। বিশ্ববিদ্যালয়ের, সরকারে কোন সিদ্ধান্তে তাঁদের অমত থাকলে তাঁরা এর প্রতিবাদ করবেন, সমস্যা তো নাই কিন্থু এর জন্য দলবাজী করার আবশ্যকতা কী! শিক্ষকরূপি পিতা তার সন্তান ছাত্রদের দলবাজি শেখাবেন এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে!
আচ্ছা, বিচারপতিদের দল নাই? এই যেমন হলুদ, কালো, লাল। না-থাকলে চালু হওয়া আবশ্যক

সেই দিন আর দূরে নাই মসজিদেও এর সুচর্চা হবে। নামাজ শুরু করার পূর্বে মাইকে বলা হবে, সামনের কাতারে কেবল লাল দল থাকবেন হলুদ দল পেছনের কাতারে লাল।
 

অবশ্য জুতাজুতির মাধ্যমে এর আগমনি বার্তা দেয়া হয়ে গেছে এখন আমরা প্রকাশ্যে এর বাস্তবায়ন চাই। 
আমিন!

Friday, December 18, 2009

মিডিয়ার শক্তি এবং আয়োজন করে কান্না!

দুলা মিয়ার (তাঁর প্রতি সালাম) প্রথম খোঁজ পাওয়ার ছোট্ট একটা কাহিনী আছে। তাঁকে নিয়ে প্রথম পড়ি, 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ' ১৬ খন্ডের ১০ম খন্ডে। 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ' ১ম থেকে ১৬ খন্ড যোগাড় করতে আমাকে খানিকটা তকলীফ করতে হয়েছিল। যেখানে এই খন্ডগুলো পাই ওটা ছাপা হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। সরকারী পাঠাগারের সম্পদ এই বইগুলোর অবস্থা যা-তা, পাতা সব আলাদা হয়ে গেছে।
এখানকার দায়িত্বে থাকা মানুষটাকে আমি যখন বললাম, আমি কি এগুলো ফটোকপি করতে পারি? তিনি আমাকে হাইকোর্ট-সুপ্রীমকোর্ট দেখাতে লাগলেন। এটা সরকারী সম্পদ, ফটোকপি করা যাবে না ইত্যাদি। আমি পড়ার নাম করে একেকটা খন্ড আনি, ফটোকপি করি এরপর ফেরত দিয়ে আরেক খন্ড এনে আবারও ফটোকপি। এভাবে প্রায় ১৫০০০ পৃষ্ঠা ফটোকপি করলাম, খাস বাংলায় চোর হলাম। এই নিয়ে আজ আমার কোন অনুশোচনা নাই।

'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ'-এর ১০ম খন্ডে যখন দুলা মিয়ার খোঁজ পাই, মানুষটার সাহস দেখে আমি হতভম্ব। একজন মানুষের পক্ষে কেমন করে এমন সাহস দেখানো সম্ভব? একজন কোত্থেকে পান এমন সাহস, কী তাঁর উৎস!
দুলা মিয়াকে নিয়ে প্রথম একটা পোস্ট দিলাম 'মুক্তিযুদ্ধে একজন অখেতাবধারী দুলা মিয়া'। ওই লেখায় পড়েছিলাম, দুলা মিয়ার যুদ্ধে যাওয়ার পেছনে ছোট্ট একটি মেয়ে আছে। আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল এই মেয়েটা আজ কোথায়, দুলা মিয়াই কি জীবিত আছেন? কোথাও কোন তথ্য পাই না কারণ এই মানুষটাকে যুদ্ধে কোন খেতাব দেয়া হয়নি। আপাততদৃষ্টিতে বাতিল একজন মানুষ, কার দায় পড়েছে তাঁর খোঁজ রাখার!

তাঁর সম্বন্ধে কিছুই না-জেনে গাধার মত বেরিয়ে পড়ি। খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মত। এমন একজন অগ্নিপুরুষকে নিয়ে কেউ কিচ্ছু জানে না। তার উপর আরেক জ্বালা, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে পাল্টা জানতে চায়, আপনে কি সাম্বাদিক, কোন পরতিকার?
আমি যখন বলি, না আমি সাংবাদিক না তখন তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অন্য দিকে তাকিয়ে দাঁত খোঁচাতে থাকেন, অথচ এই মানুষটা শেষ কবে মাংস খেয়েছে এটা মনেও করতে পারবেন না।

যাই হোক, অনেক যন্ত্রণা করে দুলা মিয়াকে খুঁজে বের করি কিন্তু মৃত দুলা মিয়াকে। এখানে এসে অনেকক্ষণ আমি হাত-পা ছড়িয়ে বসে ছিলাম। এমন একজন অগ্নিপুরুষকে এমন অবহেলায় ফেলে রেখেছে। অন্তত তার কবর পাকা-কাঁচা দূরের কথা, কোন চিহ্নও নাই। জাস্ট জঙ্গল! অথচ পাশেই এক অখ্যাত ফকিরের কবর চমৎকার করে বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে। ফিরে এসে পোস্টটা টাইপ করছিলাম, ঝাপসা মনিটরে, 'আমরা দুধ বিক্রি করে শুটকি খাওয়া জাতি'।

তখন পত্রিকার লোকজনকে অনুরোধ করেছিলাম, দুলা মিয়াকে নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য। এঁদের বক্তব্য, 'ডিসেম্বরে করব। এখন করলে পত্রিকা নিউজটা ধরবে না।'
আমার বোধগম্য হচ্ছিল না, ডিসেম্বরে কেন? বাকি মাসগুলো কী দোষ করেছে?
ওহো, ভুলেই গিয়েছিলাম, বিশেষ একটা মাস ব্যতীত আমরা তো আবার কান্নাকাটি করতে পারি না। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের ছেলে চায়ের দোকানে পানি টেনে দিন-গুজরান করেন, এটা আমরা আবিষ্কার করব ডিসেম্বরে! দুলা মিয়ার কবরের চিহ্ন নাই এটাও আমরা আবিষ্কার করব ডিসেম্বরে। কত কত আবিষ্কার যে আমরা ডিসেম্বর এলে করব এর ইয়াত্তা নাই।


১১ মাস আমরা ঘুমিয়ে দিন কাবার করে, প্রত্যেক ডিসেম্বরে হুড়মুড় করে জেগে উঠি। আমাদের আবেগে মৃত মুক্তিযোদ্ধারা পর্যন্ত জেগে উঠেন এবং জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ ডিসেম্বরে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের একেকজনের কী কান্না, তহবন ভিজে যায়। বীরশ্রেষ্ঠর কবরে সারাটা বছর গু-মুতের কাথা শুকায়, ডিসেম্বরে গিয়ে আমরা তোপ দাগি। ভাল-ভাল! আমাদের খাসিলতই এটা, সমস্তটা জীবন চলব এলোমেলো, শেষ বয়সে হজ করে এসে দাড়ি-টাড়ি ছেড়ে ভালুমানুষ(!) হয়ে যাই!

তো, কালে কালে দুলা মিয়ার সমাধিস্থল নামের জায়গাটা আরও জঙ্গল হয়েছে, পাশাপাশি ফকিরের সমাধির জৌলুশ ক্রমশ বেড়েছে। এখন এটা পাকা করা হচ্ছে। আবার লিখলাম, 'আমরা চাউল বিক্রি করে কফের সিরাপ খাওয়া জাতি'।
আচ্ছা, এইসব লিখে আদৌ কোন ফায়দা হয়? তবে একটা অসাধারণ কাজ হয়, নিজের কাছে শান্তি শান্তি লাগে। এর কোন তুলনা নাই। নিজের আনন্দে নিজেই মাখামাখি হয়ে থাকা।

আমি যখন 'মুক্তিযুদ্ধের আবেগও একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য' পোস্ট দিলাম অনেকে খুব ক্ষুব্ধ হলেন, ফোন করে অনেকে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। বেশ-বেশ! ২০০৯ সালে এসে অনেকের মনে পড়ে যাচ্ছে, তারা ১৯৭১-এ মরনপণ যুদ্ধ করেছিলেন। মাথায় শেল লাগার কারণে স্মৃতিভ্রষ্ট হয়েছিলেন, ২০০৯ সালে ব্রেন মানে স্মৃতি ফেরত পেয়েছেন। একজন সচীব সুনীল কান্তি বোস যখন ২০০৯ সালে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য আবেদন করেন চাকরির বয়স দু-বছর বাড়বে বলে তখন আমি এমন পোস্ট দিলে খুব দোষ হয়! আমাকে শূলে চড়াতে ইচ্ছা করে, না?


মিডিয়া আমাদের যা শেখাবে আমরা তাই শিখব, এর ব্যত্যয় হওয়ার যো নাই। ঠিক-ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে দুলা মিয়াকে নিয়ে প্রথম আলো একটা রিপোর্ট করলে, অনেকে তাঁর কবর পাকা করার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে আজ ফলোআপ ছাপা হয়েছে। মিডিয়ার শক্তি বলে কথা! আমরা ছাপার অক্ষর ব্যতীত অন্য কোন অক্ষরের গুরুত্ব দেই না। মিডিয়ার শক্তির কাছে আমি সমর্পণ করি, ছাপার অক্ষরকে আসমানি কিতাব বলে স্বীকার করে নেই।

যাক, তবুও যদি দুলা মিয়ার একটা গতি হয়, পদক দিয়ে কী হয়...। মানুষটা শান্তিতে ঘুমাক।

Thursday, December 17, 2009

অভিনন্দন বাংলাদেশ, আবারও বিশ্ব-রেকর্ড!

বাংলাদেশ যখন বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, বুকটা তখন ভরে যায়, বুঝলেন। আল্লা রে, ভাঙ্গা ঘরে চাঁদের আলো না, স্বয়ং চাঁদ- কোথায় যে বসতে দেই ভেবে কূল পাই না! সমগ্র বিশ্বে একবার বিশ্ব-রেকর্ড করলেই আমরা বর্তে যাই সেখানে আবারও বিশ্ব-রেকর্ড! এ আনন্দ কোথায় রাখি?

এমন নজির বিশ্বের আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নাই। এই রেকর্ড অন্য কোন দেশ কখনও ভাঙ্গতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি না, গলায় ভোঁতা ছুরি ধরলেও। কেউ আমাকে লক্ষ করে তোপ দাগুক, ইরান হালের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলেও না, কাভি নেহি।

"...হাইকোর্টে...মিনিটে অন্তত একটি করে জামিন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে আবারও। ২দিনে দন্ডপ্রাপ্তদের জামিনের আবেদন ছিল এক হাজার একটি। এর মধ্যে অন্তত ২ দিনে যদি ৭০০ আবেদনের আদেশ হয়, তাহলে কমপক্ষে ৭০০ দন্ডিত ব্যক্তি অবশ্যই জামিন পেয়েছেন। ...৩৭টি ক্ষেত্রে (সবগুলোর তথ্য জানা সম্ভব হয়নি) খুনের দায়ে যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত অপরাধীরা যে জামিন পেয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়েছে। ...বিচারপতি এ এফ এম আবদুর রহমান এবং বিচারপতি ইমদাদুল হক আজাদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এসব জামিন দেন।" (প্রথম আলো/ ০২.১২.০৯)

এই বেঞ্চের বিচারপতিদের লাল গোলাপ শুভেচ্ছা! তাঁদের মস্তিষ্কের তারিফ না করে উপায় নাই! আমাদের দাবী, এহেন মস্তিস্ক অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। সরকার, আমাদের দাবী মানতে হবে, মেনে নাও; নইলে আগুন জ্বলবে ঘরে ঘরে।

মিনিটে একটি করে জামিন দেয়ার ঘটনা আগেও একবার ঘটেছিল। যেটা নিয়ে এই পোস্টটা দিয়েছিলাম। আমি কল্পনাও করিনি আমি বেঁচে থাকতে থাকতে আবারও এটা নিয়ে পোস্ট দেয়ার দূর্লভ ভাগ্য আমার ঘটবে। আমার জীবন সার্থক- এখন মরে গেলেও অন্যরা কাঁদলেও আমি নিজে কাঁদব না!

বছরখানেক আমি আইনের কিলাশ(!) করেছিলাম। ভাসা ভাসা মনে পড়ে, আমাদের পড়ানো হতো: আইন অন্ধ। হাতে ধরে ধরে (অকাট্য প্রমাণ দিয়ে) তাকে চেনাতে হয়, এ বাদী, এ বিবাদী, এটা চেয়ার, এটা টেবিল ইত্যাদি ইত্যাদি। আগের একটা পোস্টে লিখেছিলাম হাইকোর্টে একটা রিটের সুবাদেও খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। চাহিদামত একগাদা প্রয়োজনীয় কাগজ দেয়ার পরও এই কাগজ লাগছিল, ওই কাগজ লাগছিল। আমার কালো ঘাম বেরিয়ে যাচ্ছিল! একটা বেঞ্চ কাগজপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে 'নট-প্রেস' করে দিলেন। পরে আমরা অন্য একটা বেঞ্চে গেলাম। বিস্তর সময় লেগেছিল।

একেকটা মামলা ঝড়ের গতিতে উঠাও, নামাও করলেও মিনিটে একটি মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব কিনা জানি না কিন্তু এই অসাধ্য কাজটা হয়েছে বলেই বিশ্বে আমরা রেকর্ডটা করতে পেরেছি! আফসোস, এহেন ঝড়ের গতিতে কাজ হওয়ার পরও একজন প্রেসিডেন্টের বিচার নিষ্পত্তি হতে ৩৪ বছর লাগে। রাহেলা মামলার আজও কোন গতি হয়নি!

অফ-টপিক: জানি না কেন আমার চার্লস ডিকেন্সের 'আ টেল অভ টু সিটিজ'-এর কথা মনে পড়ছে:
"...প্রথম বন্দীকে ওঠানো হলো গিলোটিনে।
ঘ্যাচ!
প্রথমবারের মত নেমে এলা ভারি ধারালো ফলাটা। দর্শকরা গুণলো 'এক'।
দর্শকরা গুণলো 'দুই'।
ঘ্যাচ! ঘ্যাচ! ঘ্যাচ!
'তিন...চার...পাঁচ' বিরামহীনভাবে দর্শকরা গুণছে। নিমিষেই প্রথম গাড়ি শূণ্য হয়ে গেল। দ্বিতীয় গাড়ি থেকেও বন্দীদের নামানো শুরু হলো। অল্পক্ষণেই শূণ্য হয়ে গেল সেটাও। এবার পালা তৃতীয় গাড়ির বন্দীদের।..."

Wednesday, December 16, 2009

হে পতাকা, আমি নতজানু হয়ে ক্ষমা চাইছি


আজ বাসা ফাঁকা। সবাই গেছে বেড়াতে। সারাটা দিনই আমি আমার লেখা নিয়ে ব্যস্ত। বাসার সবার ফিরতে ফিরতে রাত।

এখন রাত বাজে সাড়ে ১০টা। আমার মেয়েটা বয়স ৫। আমার মেয়ে কানে কানে কি যেন বলার চেষ্টা করছিল। আমি চরম বিরক্ত, আমার লেখালেখি নামের জিনিসটার ব্যাঘাত ঘটছে বলে। মেয়েটা খুব নেওটা, ও বলবেই। ওর কথা শুনে আমার গা কাঁপতে থাকে। ও বলছিল, বাবা, পতাকা এখনও নামানো হয়নি।

বাসায় বিজয়দিবসে লাগানো পতাকা এখনও নামানো হয়নি! এ আমি কী করলাম! কেমন করে ভুলে গেলাম! এই অমার্জনীয় ভুলের জন্য নিজেকে চাবকাতে ইচ্ছা করছিল। এমন ভুল কেমন করে করলাম। ভাগ্যিস, আজ বাসায় কিছু মেহমান আসার কথা ছিল, আসেনি। আসলে, কী জবাব দিতাম তাদের কাছে? ওদের কাছ থেকে না-হয় বাঁচলাম কিন্তু আমি নিজের চোখেই চোখ রাখি কেমন করে।

বুড়া শেয়াল ফাঁদে পড়লে মৃত্যু ভয়ের চেয়ে লজ্জায় মরে যায়, আমিও লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম। পাশাপাশি আমার চোখ আনন্দের পানিতে ভরে গিয়েছিল। ক-দিন আগেই আমার সন্তানদের বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধিস্থলে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন এদের সঙ্গে টুকরা-টুকরা কথা হচ্ছিল: যুদ্ধ, বীরশ্রেষ্ঠ, পতাকাকে সম্মান, সূর্যাস্তের সময় নামিয়ে ফেলা ইত্যাদি। আমার মেয়েটা ঠিকই মনে রেখেছে। আমরা এই প্রজন্ম যে-ভুলগুলো করছি আগামী প্রজন্ম তা শুধরে দেবে।

আমরা চাউল বিক্রি করে কফের সিরাপ খাওয়া জাতি!

অসমসাহসি দুলা মিয়া (তাঁর প্রতি সালাম)-কে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি লিখেছিলাম, আমরা দুধ বিক্রি করে শুটকি খাওয়া জাতি। এখন বলি, আমরা চাউল বিক্রি করে কফের সিরাপ (ফেন্সিডিল) খাওয়া জাতি!

দুলা মিয়াকে নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলাম, আমার ক্ষীণ আশা ছিল, কেউ-না-কেউ এগিয়ে আসবেন। অন্তত তাঁর কবরটা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা করবেন। ক-কোটি টাকা লাগে একজন অগ্নিপুরুষের কবর চিহ্নিত করতে? কোটি লাগে না? তাহলে লাখ, বেশি হয়ে যায়? হাজার?



এই ভিডিও ক্লিপিংস-এর শেষে এক অখ্যাত ফকিরের সমাধি আছে। তখন আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছিলাম, দুলা মিয়ার নিচিহ্ন হয়ে যাওয়া কবরের পাশেই এই অখ্যাত ফকিরের কবর টিন-বেড়া দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।

এখন সেই অখ্যাত ফকিরের কবরটা বাঁধাই করা হচ্ছে। এটা আরও সুদৃশ্য হবে। কালে কালে এটা কোন এক বিখ্যাত মাজারে রুপান্তরিত হবে এতে আর কোন সন্দেহ নাই। হায় মাজার, রসু মিয়াদের জন্য মাজারের বড়ো প্রয়োজন!

*কথিত মাজারের ছবিঋণ: দুলাল ঘোষ
**দুলা মিয়ার ছবিঋণ (সাদা-কালো): তিতাসের কাগজ, আখাউড়া

Tuesday, December 15, 2009

ফটোগান বনাম স্টেনগান: নাইব উদ্দিন আহমেদ



একবার আমি একটা পোস্ট দিয়েছিলাম, সব যুদ্ধ স্টেনগান দিয়ে হয় না। একেকজনের একেক ভূমিকা- একেকজনের যুদ্ধ করার ভঙ্গি একেক ধরনের। সময় ঠিক করে দেয় কার ভূমিকা কতটা প্রবল।

পাকআর্মি ধর্মের দোহাই দিয়ে এহেন কোন অন্যায় নেই যা যুদ্ধের সময় করেনি। ধর্মের দোহাই দিয়ে আমাদের মধ্যে বিভাজন করা হয়েছিল। পাকআর্মির সহায়তাকারী, তারা আজও মনে করে তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তর্কের খাতিরে ধরে নেই, ঠিক, তারা ধর্ম-রক্ষা করেছেন। অফ-টপিক এই উদাহরণটা আমি টানতে চাই, কে সঠিক?
যে অন্যায় যুদ্ধ না-করে পালিয়ে গেল, সে? নাকি ধর্মের নামে যে অন্যায় যুদ্ধ চালিয়ে গেল!

আমি মনে করি, এই ২টা ছবিই নাইব উদ্দিন আহমেদকে অমর করে রাখবে।

সব যুদ্ধ স্টেনগান দিয়ে হয় না, ওই পোস্টে আমি উল্লেখ করেছিলাম, এই ধর্ষিতার ভয়াবহ ছবিটা তুলতে দিতে অন্যরা চাননি; কিন্তু এই ধর্ষিতার মা তাঁকে ছবিটা তোলার জন্য অনুরোধ করেন। যেন বিশ্ববাসি জানতে পারে পাক আর্মিরা কী ভয়ংকর অনাচার করছে এই দেশে, যুদ্ধের নামে।
আজ আমরা এই প্রজন্ম সেই মা-টার ওই অনুভূতিটা স্পর্শ করতে পারি নাইব উদ্দিন আহমেদের কল্যাণে। নাইব উদ্দিনের এই ছবিটা তোলার পর সহ্য করতে পারছিলেন না, তাঁর হার্ট এ্যাটাক হয়ে যায়। যেমনটা হয়েছিল কেভিন কার্টারের বেলায়, তিনি সইতে না-পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন।

পত্রিকা সময় করে পড়া হয় না, পড়া হয় না খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। এই যেমন এখন রাত ৯টা। এখন পত্রিকায় (প্রথম আলো) চোখ বুলাচ্ছিলাম। খবরটা এড়িয়েই যেত প্রায়, ১৯ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে: 'আলোকচিত্রি নাইব উদ্দিন আহমেদ আর নেই'।
আলোকচিত্রি নাইব উদ্দিন আহমেদ? আমি যে নাইব উদ্দিন মানুষটার কথা ভাবছিলাম এই মানুষটা কি তিনি নন? পুরো খবরটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লাম। নিজেকে কেমন বিভ্রান্ত-বিভ্রান্ত লাগছে! কোথাও লেখা নেই মুক্তিযুদ্ধে এই মানুষটার অবদানের কথা। মুক্তিযুদ্ধ দূরের কথা মনে হচ্ছে 'ম' শব্দটাও নেই।

কেন এই খবরটা ফলাও করে ছাপানো হলো না এই নিয়ে প্রশ্ন তুলি না, কোন নেতা বলেছেন, "শহীদের স্বপ্ন পূরনে..." এইসব বাছাল(!) ছাপিয়ে কুমিরের অশ্রুতে প্যান্টলুন ভিজে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের সেরা সন্তানদের নিয়ে এদের তাচ্ছিল্য নতুন কোন সংবাদ না। আমি প্রথম আলোকে ধন্যবাদ দেই, অন্তত অগ্নিপুরুষ লালুর মত বিজ্ঞপ্তি আকারে এই খবরটা ছাপানো হয়নি। যাক, এদের এতোটা আক্কেল তো হয়েছে...কিন্তু বড়ো দেরিতে আক্কেল-দাঁত উঠল!
এখন এদের ইন্টারনেট ভার্সানে (ই-প্রথম আলো) খুঁজতে গিয়ে দেখি ওখানে এই খবরটাও নাই। নাই মানে নাই! হে আল্লাহ, একি রহস্য! চুতিয়াদের কী ব্রেনে শর্ট-সার্কিট হয়ে গেল?

নাইব উদ্দিন আহমেদ, চুতিয়ারা তোমাকে ভুলে গেলেও আমরা এই প্রজন্ম তোমাকে ভুলিনি।
এই প্রজন্ম মাথা নীচু করে হাটু গেড়ে তোমার শিয়রে বসে থাকে।
তুমি ঘুমাও, শান্তিতে। বিদায়, হে প্রিয়মানুষ...


*মুক্তিযুদ্ধে তাঁর আরেকটি অনবদ্য ছবি, এটা মুক্তি মন্ডলের ব্লগ থেকে নেয়া:

ব্যবচ্ছেদ

একবার এলাকার একজন আমাকে বললেন, 'আজ আপনার খুব আনন্দের দিন, না'?
আমি অবাক, 'কেন'?
সে বলল, 'আজ পাকিস্তান খেলায় জিতেছে'।
 

মানুষটাকে খুন করে ফেললে আরাম পেতাম। আফসোস, সব ইচ্ছা আমরা পূরণ করতে পারি না।
আমি অসহ্য রাগ সামলে বললাম, 'আমাদের সঙ্গে সীমাহীন অন্যায় করার কারণে পাকিস্তানিদের আমি তীব্র ঘৃণা করি। তারা খেলায় জিতলে আমার আনন্দ হবে এরকম মনে হলো কেন আপনার'?
সে বলল, 'আপনারা নন-বেঙ্গলি, বিহারী, পাকিস্তানি, তাই আমি ভাবলাম...'।
আমি তাকে কঠিন গলায় বললাম, 'পাকিস্তানি মানে কী? আমার বাবা এই দেশে এসেছিলেন ভারত থেকে। বাংলাদেশে লক্ষ-লক্ষ মানুষ ভারত থেকে এসেছেন তাদের বেলায় সমস্যা হয়নি, আমাদের বেলায় সমস্যা কেন? মৌলানা ভাসানী কোত্থেকে এসেছিলেন, জানেন আপনি? আর আপনি পাকিস্তানের সঙ্গে কেন গুলিয়ে ফেলছেন?
ঝেড়ে কাশেন, স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় আমার বাবার দ্বারা কারও শারীরিক, আর্থিক, মানসিক ক্ষতি হয়েছে?
বলেন? বরং এই এলাকার লোকজন তাঁকে অসম্ভব সম্মান করত। তিনি বহু বছর এখানকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন। তখন এঁদের বলত, প্রেসিডেন্ট।
আর আমার জানা মতে, তাঁর উপলক্ষে ৭১-এ অজস্র মানুষের প্রাণরক্ষা হয়েছে। আরেকটা কথা, ১৯৭১ সালের পর তিনি কী পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন? তিনি তো এলাকাতেই ছিলেন। আর কারও ক্ষতি হয়ে থাকলে বলেন। আমি তার সন্তান হিসাবে তার সমস্ত অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করব, শাস্তি মাথা পেতে নেব। আমি এই চ্যালেঞ্জ কেবল আপনাকে না, সমগ্র দেশের লোকজনের প্রতি ছুঁড়ে দিলাম।"
মানুষটা বেত্রাহত কুকুরের মত সরে পড়েছিল। 
 
আমার বাবা এ দেশে এসেছিলেন ৫১ সালে। তিনি থাকতেন লক্ষৌ'র কানপুরের ইস্তেখারাবাদে। বিহারের যে প্রসঙ্গ উঠল- শ্লা, কোথায় বিহার আর কোথায় লক্ষৌ (লখনৌ)! দূরত্বও কম না, প্রায় ৭০০ কিলোমিটার!
একবার বিহারের উপর দিয়ে নেপাল যাচ্ছিলাম। রিজারর্ভেশন ছিল। বিহারের এক স্টেশনে হুড়মুড় করে লোকজন উঠা শুরু করল। যারা শুয়ে ছিল সবাইকে উঠিয়ে দিয়ে যে যেভাবে পারল বসে গেল। আপার বার্থে এক অস্ট্রেলিয়ান ছিল। সে খানিকাটা গাইগুঁই করার চেষ্টা করেছিল। চারদিক থেকে আওয়াজ উঠল, 'শালা, লাল বান্দার কো বাহার ফেক দো। হাওয়া খাকে আয়ে'-শালা লাল বান্দরটাকে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দে। বাইরের বাতাস খেয়ে আসুক।
 
এই হচ্ছে বিহার। অসভ্য, অমার্জিত। আর লক্ষৌ? চুলায় বেড়াল ঘুমালেও এরা আছে অপার আনন্দে। গানাবাজানা, মুশায়রা, গজল...।
যাই হোক, লক্ষৌতে আমার বাবা ভালই ছিলেন, বাড়াবাড়ি রকমের ভাল (কতটা ভাল? খানিকটা অহং প্রকাশ পায় বিধায় এখানে বিস্তারিত বলতে ইচ্ছা করছে না। এই প্রসঙ্গ থাকুক)।
এমনিতে মানুষটা ছিলেন খানিকটা খেয়ালিও! ১৯৭১ সালে তাঁর যে গাড়িটা ছিল মরিস মাইনর এটা দিয়ে তিনি শেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কুমিল্লা গিয়েছিলেন। ড্রাইভার কাকুর সঙ্গে পরে আমার কথা হয়েছিল। অবিকল নাকি সিনেমার মত। বৃষ্টির মত বোমা পড়ছে এরিমধ্যে গাড়ি এগুচ্ছে। বাবা সেই গাড়ি কুমিল্লায় মন্নান শেখ কাকার ওখানে সেই যে ফেলে রাখলেন এটা না-কাউকে দিলেন, না-বিক্রি করলেন। তার এক কথা এই গাড়ির উপলক্ষে তাঁর প্রাণ রক্ষা হয়েছে।
বাবাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম: ভারতে সব ফেলে আপনি এ দেশে কেন এলেন কেন?
তার সোজাসাপটা উত্তর ছিল: আমার ইচ্ছা ছিল একটা মুসলিম দেশে থাকার।
তাঁর এই সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত এটা তিনিই ভাল বলতে পারবেন। আজ তিনি জীবিত নাই, এই নিয়ে নতুন করে জানারও উপায় নাই। 

মানুষটা পড়তেন প্রচুর। আমার নিজের পড়ার অদম্য আগ্রহটা সম্ভবত তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছি। তাঁর হিন্দি, আরবি, ফারসি, উর্দুতে ছিল অসাধারণ দখল কারণ ওখানে এসবই পড়ানো হত, তখন এইসব না-পড়া মানে হচ্ছে মূর্খ থাকা! কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন ওখানে বাংলা কেন পড়ানো হতো না তার সঙ্গে বাহাস করার কোন গোপন ইচ্ছা আমার নাই।
আমি যখন খানিকটা পড়া শিখছি তখন আমার প্রধান কাজ ছিল নিয়ম করে আমার বাবার বাংলাটা দেখিয়ে ঠিক করে দেয়া। এই একটা ক্ষেত্রে আমি তাঁর শিক্ষক ছিলাম। তবে আমি তাঁকে বাবা হিসাবে যতটা না মনে রাখব তারচে একজন অসাধারণ শিক্ষকরূপে [] মনে রাখব। মুচির ছেলের সঙ্গে একসঙ্গে পড়তে বাধ্য করেছেন। সে সময় এর কারণ বুঝিনি, এখন বুঝি বলে তাঁর প্রতি আমার অগাধ ভালবাসা।

তাঁর মৃত্যুর ৩৭ বছর পরও এলাকায় এখনও তাকে যতটা মানুষ চেনে তার ৫ ভাগও আমায় চেনে না। মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ ভালবাসা।
কী হয়েছে? সাইকেলের জন্য বিয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে, দাও কিনে তাকে (জামাই) একটা সাইকেল। কী, রাস্তা নাই? চলো রাস্তা করি। সরকারী অনুদান নাই? তাতে কী! আমার কাছ থেকে নাও টাকা। মৃত্যু আগ-পর্যন্ত এই মানুষটা এইসব যন্ত্রণা করে গেছেন। যথারীতি আমাদের গোটা পরিবারকে ভাসিয়ে দিয়ে।
 
৭১-এ তাঁর উপলক্ষে যেসব মানুষের প্রাণরক্ষা হয়েছিল এঁদের অনেকে এখনও দেখা হলে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন, কৃতজ্ঞচিত্তে বাবার অবদানের কথা স্মরণ করেন। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, এমন কতসব মানুষ।
অনেকে এত বছর পরও যখন বলেন, আরে, আপনি ওই মানুষটা ছেলে, তিনি তো...। এখনও কোন গ্রামে গেলে বয়স্ক একজন কৃষক যখন বলেন, ওয়াল্লা, আপনে তাইনের ছাওয়াল, তাইনে তো আমার অনেক ভালা বন্ধু মানুষ আছিল। শোনো কথা, হেন মানুষ নেই যে তাঁর বন্ধু না! বুকটা ভরে যায় তখন, আমাদের পরিবারের প্রতি করা তাঁর সমস্ত অন্যায় বিস্মৃত হই। দু-হাতে টাকা কামিয়েছেন বৈধ ব্যবসা করে কিন্তু মৃত্যুর সময় তিনি বিস্তর ঋণ রেখে যান। তবুও আমার বাবার প্রতি আমার অন্তত কোন ক্ষোভ নেই। আছে কেবল ভালবাসা আর ভালবাসা!

এই দেশে আমার জন্ম, এই দেশের মাটি-জল মেখে-মেখে বুক ভরে শ্বাস নিতে-নিতে দেশের প্রতি একগাদা মমতা নিয়ে বড়ো হয়েছি।
বাংলায় পড়াশোনা করেছি। লক্ষ-লক্ষ শব্দ লিখেছি, বাংলায়। যা এখনও প্রিন্ড মিডিয়ায়, ওয়েবস্ফিয়ারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আন্তর্জাতিক একটা পরিমন্ডলে দাঁড়িয়েছি বাংলা ভাষার প্রতিনিধি হয়ে []।
এ দেশের মেয়েকে বিয়ে করেছি। আমার সন্তানও এদেশের জল-মাটিতে বড়ো হচ্ছে। এখনও কী এই দেশ আমার না? একটা দেশ একজনের হতে কয় শত বছর লাগে? এরচেয়ে মরে যাওয়াটা অনেক কম বেদনার। ঈশ্বর, আমার বাবা এদেশে আসার ৬৯ বছর চলে গেছে এখনও আমাকে শুনতে হয়, আপনারা নন-বেঙ্গলি! বড়ো কষ্ট হয় তখন। 
যুদ্ধের আঁচ আমার গায়ে লাগেনি কিন্তু এখনও আমি মানসচক্ষে এই দেশের সেরা সন্তানদের লড়াই, বীরত্ব, ত্যাগ স্পষ্ট দেখতে পাই। নিজের জাগতিক প্রয়োজন তুচ্ছ করে খুঁড়ে-খুঁড়ে বের করার চেষ্টা করি এঁদের বেদনা, এঁদের অবদান। 
দুলা মিয়ার [] মত অসমসাহসী মানুষটার প্রতি চরম অবহেলা দেখে, তাঁর নিচিহ্ন হয়ে যাওয়া কবর দেখে আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। 
সুরুয মিয়া [] ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে যে পেয়ারা গাছটায় [] ফাঁসিতে ঝুলে পড়েছিলেন সেই গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদি।  
ফযু ভাই [] নামের ওই অগ্নিপুরুষটা গা ছুঁয়ে আবেগে কাঁপি। কতশত এমন সত্য ঘটনা...।
মুক্তিযুদ্ধে যে মানুষটা আস্ত ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছিলেন []।
 
মানুষ হিসাবে প্রচুর খাদ আছে আমার। কেবল এই দেশ, এই দেশের সেরা সন্তানদের প্রতি ভালবাসায় কোন খাদ নাই। এই দেশের প্রতিটি বেদনায় কাতর হই, আনন্দে উল্লসিত। এই দেশ আমার কাছ থেকে কী চায়, একবার চেয়ে দেখুক না। কসম, পিছ-পা হবো না। তবুও এই দেশ আমার না এই গালিটা শুনতে চাই না, প্লিজ। আহ, বড়ো কষ্ট হয় যখন এখনও শুনি আপনারা তো নন-বেঙ্গলি। বড়ো কষ্ট হয়, বড়ো কষ্ট...।

শোনেন, অনেক হল তবলার ঠুকঠাক। পুতুপুতু কথা একপাশে সরিয়ে আজ আমি আপনাদের চোখে চোখ রেখে সটান বলতে চাই, আমার বাবা হিসাবে না একজন মানুষ হিসাবে, নিজাম উদ্দিন আহমেদ নামের মানুষটা কারও প্রতি কোন অন্যায়-অবিচার সম্বন্ধে কারও জানা থাকলে নিঃসন্কোচে জানান তথ্য-উপাত্তসহ। তাঁর সম্পদ, সুনামের অধিকারী আমি হয়ে থাকলে সন্তান হিসাবে তাঁর অন্যায়ের দায়ও আমার। শপথ আমার লেখালেখির, লিখব। তাঁর বিরুদ্ধে গেলেও লিখব, নির্মোহ দৃষ্টিতে। লিখব, এরপর এই কারণে তাঁর কবরে গিয়ে গড়াগড়ি করে কাঁদব কিন্তু লিখব...।
 
'ভেজা মে'-মস্তিষ্কের গোবর সরিয়ে খানিকটা গ্রে-মেটার ঢুকিয়ে নিলে ভাল হয়, কেবল স্টেনগান দিয়েই যুদ্ধ হয় না। একেজনের যুদ্ধ করার ভঙ্গি একেক রকম। নিজাম উদ্দিন আহমেদ নামের মানুষটাকে ১৯৭১ সালের সীমাহীন অবদানের জন্য সম্মান না-দেখান অন্তত অসম্মান করবেন না, প্লিজ।
আরেকটা কথা, এই দেশটা কারও বাপ-দাদার না। দিস ইজ মাই ল্যান্ড...।
 
তিন তিনবারের উপজেলা আওয়ামিলীগের নির্বাচিত সভাপতি এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এস কে বোরহান উদ্দিন আহমেদ। ১৯৭১ সালে যখন তুমুল স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে তখন তিনি নিজে কেমন করে প্রাণে বেঁচেছিলেন, কার জন্য? এখানে চলে আসে নিজাম উদ্দিন আহমেদের কথা। আমরা একটু শুনি তাঁরই মুখে:


ইমাম ভাওয়ানি স্টেট-এর ২টা চা-বাগানের দায়িত্বে আছেন যিনি, জনাব ফখরুল ইসলাম অকপটে জানান ১৯৭১ সালে তাঁর বাবার প্রাণে বাঁচার কথা। আবারও চলে আসে নিজাম উদ্দিন আহমেদের প্রসঙ্গ:

বরিশল গ্রামের সম্মনিত একজন মানুষ জনাব, অহিদ চৌধুরি জানান তাঁর বাপ-চাচাসহ কেমন করে মান্দাইলের ৭০ জন মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছিল। কীভাবে? আহা, উপলক্ষ যে নিজাম উদ্দিন আহমেদ:
 
আখাউড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি আলহাজ রফিকুল ইসলাম, নিজাম উদ্দিন আহমেদ সম্বন্ধে বলেন:
 
আখাউড়ার বর্ষীয়ান একজন মানুষ যার বয়স ১০০ ছুই ছুই, জনাব, মন্নান শেখ তাঁর কাছ থেকে জানা যাক নিজাম উদ্দিন আহমেদকে নিয়ে খানিকটা:

* এই লেখাটা ২০০৯ সালে লিখেছিলাম কিন্তু কিছু তথ্য-উপাত্ত, ভিডিও পরে যোগ করেছি।
 
১. বাবা দিবসে: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_21.html
২. জয় হোক বাংলা ভাষার...: https://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_22.html
৩. দুলা মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_05.html
৪. সুরুয মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_28.html
৫. ১৬ ডিসেম্বরে... ফাঁসি...: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_02.html
৬. নৌ কমান্ডো ফযু ভাই: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_18.html
৭. ট্যাংক-মানব: https://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_03.html
 
 
 

Sunday, December 13, 2009

মি. প্রাইম মিনিস্টার, ঝেড়ে কাশেন

সরল রেখা এবং বৃত্তের ফারাক বিস্তর। জ্ঞান হচ্ছে, সরল রেখা। অর্জিত জ্ঞান নিয়ে কেবল এগিয়ে যাওয়া, এখানে থামাথামির কোন উপায় নেই। যারা অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাবেন না তারা সরল রেখাকে বৃত্ত বানিয়ে অনবরত ঘুরপাক খেতে থাকেন, আমৃত্যু।

আগের পোস্টে লিখেছিলাম, আমাদের দেশের কান্ডারিরা অতীত থেকে কিছুই শেখার প্রয়োজন বোধ করেননি।
প্রাইম মিনিস্টারের প্রতি আমার যথেষ্ঠ আগ্রহ ছিল। আফসোস, বছর গড়ালো কিন্তু বিশেষ কোন চমক দেখতে পাইনি যে চমকে উঠব। সেই চিরাচরিত! ক্রসফায়ার নামের এক দানব! সেই দেশের বাইরে যাওয়ার সময়, ফেরার সময় ভি, আই, পিদের হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা। আচ্ছা, এর প্রয়োজনটা কী! তিনি কি যাওয়ার পূর্বে সবার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে যান? তাই হবে! বিদুৎ নিয়ে দেশের মানুষের সঙ্গে এত বড়ো প্রতারণা করা হলো অথচ তিনি এই টুঁ-শব্দ করেছেন বলে তো শুনিনি। সেই লঞ্চ ডুবে, লাশ ভেসে যায়- ফ্রিগেট কেনা হয় কিন্তু রুস্তম-হামজা নামের দুই বুড়া গাধাকে বদলানো হয় না। এইসব অন্যায় বিচারের কোন সুরাহা হয়নি, অন্তত শুরু হয়েছে এমনটাও বলা যাবে না।

এদিকে (৯ ডিসেম্বর, ২০০৯) পত্রিকায় দেখলাম, দুই দিনব্যাপী অর্থায়ন মেলার উদ্বোধনকালে প্রাইম মিনিস্টার তাঁর সিংহাসন মার্কা চেয়ার বদলেছেন। এমন কতশত অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী ক্রমশ ছুঁড়ে ফেলতে পারতেন যদি।

সাধারণ একজন ইউ, এন ও পর্যন্ত এই রাজসিক চেয়ার ব্যতীত বসতে চান না। রাজসিক চেয়ারে না বসলে কী সমস্যা হয় এটা আমার বোধগম্য হয় না। আশা করছি, আমলারা এটা থেকে শিখবেন।
আমলা, এরা আবার আরেক কাঠি বাড়া, চেয়ারের পেছনে তোয়ালে না থাকলে পশ্চাদদেশের সমস্যা হয়, বসে আরাম পান না। এই বাথরুমের জিনিস চেয়ারে সাজিয়ে রাখার বুদ্ধিটা কার মাথা থেকে বেরিয়েছিল আল্লা তাকে হেদায়ত করুন।
অর্থায়ন মেলায় প্রাইম মিনিস্টার বলেছেন, "ঢাকার বাইরে শিল্প স্থাপনে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে"।
মি. প্রাইম মিনিস্টার, এভাবে ভাসা ভাসা বললে তো হবে না। আপনি স্পষ্ট করে বলুন। কেউ ঢাকার বাইরে শিল্প স্থাপন করতে চাইলে সে কি কি সুবিধা পাবে? বলুন, তাঁকে আর্থিক কতটা ছাড় দেয়া হবে? তাঁকে কতভাবে সম্মান দেখানো হবে? একজন শিল্পপতিকে আপনি এমন অফার দিন যেন সে 'না' শব্দটা বলতে না পারে। ঢাকার বাইরে শিল্প স্থাপন করার জন্য কাছা খুলে দৌড়াতে থাকে। এতে কতশত সমস্যার যে সমাধান হয়ে যাবে এর ইয়াত্তা নাই। অন্য জেলা থেকে ঢাকায় নিম্নবিত্তদের আসা রোধ হবে। মঙ্গা ঠোঙ্গায় আটকে থাকবে।
বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি ৮২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০টি ঢাকায়।
৩৮টি মেডিকেল কলেজের ৩২ টি ঢাকায়।
তৈরি পোশাকশিল্পের ১৮ লাখ শ্রমিক ঢাকায়।
১৫ লাখ নির্মানশ্রমিক এবং রিকশাচালক ঢাকায়।
প্রতিদিন ২১৩৬ জন মানুষ ঢাকায় ঢুকছে আর বের হচ্ছে না।

আগের একটা পোস্টে আমি লিখেছিলাম, কোন এক লেখায় আমি লিখেছিলাম: "আমরা সব লাটিম বনবন করে ঘুরাচ্ছি ঢাকাকে কেন্দ্র করে! এটা দ্রুত বন্ধ করতে হবে। ঢাকার উপর থেকে যত দ্রুত সম্ভব চাপ কমানো অতি আবশ্যক। এখান থেকে সরাতে হবে ক্যান্টনমেন্ট, সরকারি যত আপিস। তারচেয়ে জরুরি হচ্ছে কল-কারখানাগুলো সরানো। সরানো মানে নতুন করে হতে না দেয়া, সরিয়ে নিতে লোভ দেখানো। জোর করে তো এটা করা যাবে না। 
এ জন্য মোটা মাথা থেকে চিকন বুদ্ধি প্রসব করতে হবে। যেসব উদ্যোক্তা ঢাকার বাইরে রংপুর, খুলনায় শিল্প-প্রতিষ্ঠান করবেন তাদের জন্য থাকবে ট্যাক্সসহ অন্যান্য বিভিন্ন কর দেয়ার বেলায় বিরাট ছাড়। এবং রাষ্ট্রীয় বিশেষ সম্মান থাকবে এদের জন্য। আমার ধারণা, এরা প্রয়োজনে বায়ারকে হেলিকপ্টার ভাড়া করে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ওই বায়ার লাফাতে লাফাতে রাজি হবে। না-হওয়ার কোন কারণ দেখি না। এই বায়ার মহোদয় শত-শত বার প্লেনে চড়েছেন কিন্তু হয়তো বা হেলিকপ্টারে চড়া হয়নি। তিনি বিমলানন্দে দেশে গিয়ে গল্প করবেন, হেই ম্যান, গেসিলাম বেংলাদেশে... ইমাজিন, হোল হেলিকাপ্টার হামার জইন্যে।"

ঢাকা কলাপস করছে এটা বলতে পারলে ভাল লাগত, অলরেডি ঢাকা মারা গেছে, পচন শুরু হওয়া সময়ের দাবি মাত্র। সুশীল সমাজ, কারও এ নিয়ে খুব একটা উদ্বেগ আছে বলে তো মনে হয় না। শাহাদুজ্জামানের মত অল্প মানুষরাই অনুমান করতে পারছেন ঢাকা কলাপস করছে।
মুহম্মদ জাফর ইকবালের চমৎকার একটা গল্প আছে, '২০৩০ সালের একদিন'। ২০৩০ সালে বাংলাদেশ কেমন হবে এটার অসাধারণ বর্ণনা। তিনি আশাবাদী মানুষ, ২০৩০ সাল বলেছেন। আমি হলে আরও ১০ সাল কমিয়ে দিতাম।

একা জাফর ইকবাল যে কাজটা করছেন কোটি-কোটি মানুষ সেটা পারছেন না। এই দেশের কোটি-কোটি মানুষের স্বপ্ন, ঢাকায় একটা বাড়ি, ঢাকায় একটা চাকরি, ঢাকায় বাচ্চাদের পড়াশুনা। মায় ঢাকায় পেচ্ছাব করেও সুখ। অথচ জাফর ইকবাল ইচ্ছা করলেই অনায়াসে ঢাকায় বসবাস করার সুযোগ নিতে পারতেন। আপাততদৃষ্টিতে তাঁর জীবনটা অনেক সহজ হতো! তাঁর এই একটা উদাহরণ তথাকথিত সুশীলরা ছড়িয়ে দিতে পারত যদি, আফসোস! এই একটা কারণে এই মানুষটা খুন করে ফেললেও অবলীলায় ক্ষমা করে দেব, আমার লেখালেখির কসম। স্যালুট, হে মানুষ, একজন স্বপ্নবাজ মানুষ।