Monday, December 28, 2009

মঙ্গলের পানি দিয়া আমরা কি করিব?!

"...ঘন বন কাটিয়া আমিই এই হাস্যদীপ্ত শস্যপূর্ণ জনপদ বসাইয়াছি ছয়-সাত বৎসরের মধ্যে। সবাই কাল তাহাই বলিতেছিল- বাবুজী, আপনার কাজ দেখে আমরা পর্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছি, নাঢ়া লবটুলিয়া কি ছিল আর কি হইয়াছে! হে অরণ্যানীর আদিম দেবতারা, ক্ষমা করিও আমায়। বিদায়!..."
(আরণ্যক/ বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় )

যে মানুষটি সভ্যতার নামে নাঢ়া লবটুলিয়া নামের বনটি উজাড় করে দিয়েছিল সেই মানুষটির
"হে অরণ্যানীর আদিম দেবতারা, ক্ষমা করিও আমায়" এটা শুনে কেউ কেউ হাসি চাপবে, মানুষটার ঢং দেখে বাঁচি নে। তাঁর এই হাহাকার মোটা দাগে ধরতে পারার কোন কারণ নেই। সভ্য আমরা তাঁর নির্বোধ ভাবনায় বিরক্ত হবো কারণ এই মানুষটা সভ্যতার রূপকার!

সভ্যতা আসলে কাকে বলে আমি জানি না, তালাশে আছি। কোনটা সভ্যতা কোনটা অসভ্যতা এটাই
আমি বুঝে উঠতে পারি না। ওদিন আমার এক সিনিয়র আমাকে বলছিলেন, আচ্ছা, মঙ্গলে পানি আছে কিনা এটা আমাদের জন্য জানাটা কি জরুরি?
এই মানুষটা দুম করে একটা প্রশ্ন করে আমাকে বেকায়দায় ফেলে দেন। মাথায় অহেতুক কিছু ভাবনা ঢুকিয়ে দেন। এ এক যন্ত্রণা। ওই ভাবনা নিয়ে দিব্যি ভাবতে থাকো।
আমি তাঁর প্রশ্নের উত্তরে সতর্কতার সঙ্গে বললাম, হ্যাঁ প্রয়োজন। সভ্যতার জন্য।
তিনি আমার উত্তরে বেজায় অখুশি হয়ে বলেন, যেখানে পৃথিবীকেই আমরা তার প্রাপ্য দিতে পারছি না সেখানে পৃথিবীর বাইরে পানি আছে কিনা তা আমাদের প্রয়োজন কী?

আমি মনে মনে বললাম, তাই বলুন। আপনি অফট্র্যাক ভাবনার কথা বলতে চাইছেন তা আগে বলবেন না...! আমাদের প্রয়োজন নাই কিন্তু উন্নত বিশ্ব নামের অতি সভ্যদের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। আহা, এদের এ গ্রহে থাকতে বয়েই গেছে!

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যোগ দিতে অতি আগ্রহ নিয়ে সদলবলে রওয়ানা হন, আর দেশে বন কেটে সাফ করে ফেলছে। এদের নাকি থামানো যাচ্ছে না! দেশের সরকারী লাঠিয়াল বাহিনী কোন দিনের জন্য এটা তিনিই ভাল বলতে পারবেন!

কোপেনহেগেনে অশ্বটা যে ডিম্ব পাড়ল সেই ডিম্বের ভার সইতে পারাটা মুশকিল। গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের প্রধান কুমি নাইডু বলেন, "সমঝোতায় এত বেশি ফাঁক রয়েছে যে এর মধ্যে দিয়ে একটি বিমান উড়ে যেতে পারবে।"

এমন নিষ্ফল আলোচনায় কেবল হাঁই উঠে না প্রতিনিধিরা দিব্যি ঘুমিয়ে পড়েন!

পৃথিবীর অতি সভ্যরা কার্বন
নিঃসরণ করে পৃথিবীর নিরাপত্তা ছাতাটা শত-ছিদ্র করে ফেলবে। বাংলাদেশের মত হতদরিদ্র দেশগুলো ২০ কোটি টাকা খরচ করে আধুনিক ইটভাটা (এটাও আবার এদের কাছ থেকে কিনতে হবে) দিয়ে কার্বন নিঃসরণ কমাবে। এই বাঁচানো কার্বন এরা (অতি সভ্য) আবার কিছু টাকা দিয়ে কিনে নেবে। অতি সভ্যদের মাথার তারিফ করতে হয়!
ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেয়া হয় না এটাও এমন, খানিকটা ঘুরিয়ে আর কী। এই ফকির, তুমি আমার ড্রেনটা সাফ করে দাও, কিছু টাকা পাবা। ড্রেনও সাফ হলো ফকিরের হাত থেকে মুক্তিও পাওয়া গেল!

কেবল আমাদের দেশেই প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ প্রতিদিন রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায় সেখানে মঙ্গলের পানি আছে কি নাই এটা দিয়ে আমরা কি করিব, কোথায় রাখিব? কে বলেছে, কেবল নগ্ন বক্ষ দেখালেই অশ্লীলতা। আমি বিভ্রান্ত, মঙ্গলে পানি খোঁজা, এটাকে সভ্যতা বলব নাকি অশ্লীলতা?
অতি সভ্যদের জন্য এটা জরুরি। কারণ এই পৃথিবীকে এরা ক্রমশ বসবাস অযোগ্য করে ফেলবে, একসময় শেষ করে ফেলবে। এরা ঠিকই এই গ্রহের বাইরে অন্য কোন গ্রহে নিজের বসতি গড়ে তুলবে। আমরা বা আমাদের কন্কাল থাকবে এখানে।

*ছবিঋণ: এএফপি

No comments: