Search

Showing posts with label একালের প্রলাপ. Show all posts
Showing posts with label একালের প্রলাপ. Show all posts

Friday, April 30, 2010

অমানুষ

মানব মানবীকে ঘিরে কী অপার্থিব এক রহস্য! দুটি বিচ্ছিন্ন সত্তা। 
একদিন এক অপাপবিদ্ধ ভুমিষ্ঠ শিশু প্রাণপণে চেঁচিয়ে ওঠে। মানব মানবী বিস্ময়ে অভিভূত হয়: এই, এই তাহলে রহস্য! ছোট্ট একটা শেকড় ক্রমশ বিস্তৃত হয় জ্যামিতিক হারে, ছেয়ে ফেলে সবকিছু। মহাবিশ্বের সমস্ত কর্মকাণ্ড এই বিশাল শেকড়কে ঘিরে। 

কিন্তু পৃথিবীতে এক ধরনের জীব নিয়ে মানুষ সমস্যায় পড়ল। এরা না মানুষ, না জন্তু, না জড় পদার্থ, কি নামে পরিচিত হবে? পৃথিবীর এই বিশাল রঙ্গমঞ্চে কি ভূমিকায় এরা নিষ্ঠার সঙ্গে অভিনয় করছে কে জানে- কেনই বা পৃথিবীতে অবহেলা ভরে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে তারও কোন হদিশ পাওয়া যাচ্ছিল না! অনেক মাথা খাটিয়ে এদের নাম দেয়া হলো হিজড়া, ক্লীব, নপুংসক। এক নিঃসঙ্গ পরিত্যক্ত শেকড়, যাদের নিয়ে কোনো রহস্য নেই।

সৃষ্টিই যাদের কুৎসিত কৌতুক, সেরা জীব মানুষ নিকৃষ্ট এসব অমানুষদের নিয়ে ব্যঙ্গ করবে এ আর আশ্চর্য কি!
কী আনন্দই না হয় এদের দেখে! ছায়াছবিতেও এদের ছায়া দেখে একজন দর্শক আরেকজনের গায়ে হাসতে হাসতে ঢলে পড়ে। এমন হবেই না বা কেন, কোনো ভূমিকা নির্দিষ্ট নেই বলে কি মানুষ হাসাতেও এঁদের ভূমিকা থাকবে না! 

এমনই এক অমানুষের সাক্ষাৎকার নেয়া হলো। এদের গলার স্বর অত্যন্ত কর্কশ, সম্বোধন তুই তুই করে, প্রকাশ ভঙ্গি উগ্র। সাক্ষাৎকার হুবহু প্রকাশ না হলে মানুষ রাগ করে, এরা মানুষ না বলেই ক্ষীণ আশা, প্রকাশ ভঙ্গি একটু মার্জিত করে তুলে ধরলে হইচই করবে না।
প্র: আপনার নামটা বলবেন?
অমানুষ : আমার নাম মিনু।
প্র: মিনু তো মেয়েদের না, ইয়ে মানে আপনি তো আর মেয়ে...?
অমানুষ: আমি মেয়ে না এটাই তো বলতে চাচ্ছেন। এ নাম রাখা ঠিক হয়নি এই তো? কিন্তু রেখেছি। বেশ করেছি, আপনার কোনো অসুবিধা আছে? মিনু রাখতে পারব না, বলবেন আমরা মেয়ে না। মনা রাখলে আবার বলবেন ছেলে না। কি রাখব আমার নাম, মন?


প্র: আপনারা নারীর মতো সাজগোজ করেন, এটা কেন?
অমানুষ: দেখুন, আমাদের প্রধান আয় হলো, কোথায় কোথায় শিশু ভূমিষ্ঠ হচ্ছে খোঁজ খবর রাখা, নবজাতককে নিয়ে হইচই, নাচানাচি করা। এসব করে কিছু টাকা পাই। আমরা নারীর সাজ ধরে চট করে অন্দর মহলে ঢুকতে পারি, মহিলারা তেমন উচ্চবাচ্য করে না। অবশ্য আগের মত আমাদের উপর এদের ভক্তি নাই, দেখলেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। তার উপর আবার করে বার্থ কন্ট্রোল!
প্র: ছোট্ট, অত্যন্ত গরিব দেশ আমাদের। যে হারে মানুষ বাড়ছে, গিজগিজ করছে- পোকা মাকড়ও লজ্জা পাচ্ছে। এই দেশে প্রায় তিরাশি ভাগ সৃষ্টির সেরা জীব পশুর ন্যায় জীবন যাপন করছে। বার্থ কন্ট্রোল না করলে চলবে কেন বলুন?
অমানুষ : এটা আপনাদের, মানে মানুষদের সমস্যা, আমাদের না।


প্র: এ প্রশ্ন করার জন্যে আগেভাগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনাদের কাউকে কাউকে নিয়ে বখা ছেলেরা বিশেষ উদ্দেশ্যে অন্য রকম গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে। এরকম কিছু কথাবার্তা আমরা শুনতে পাই, এটা কতোটুকু সত্য?
অমানুষ: এটা যে পুরোপুরি অসত্য এমন না। শুধু বখা ছেলেরা না, বয়স্ক মহিলারাও অন্য রকম আগ্রহই দেখায়। কিন্তু বখে যাওয়া ছেলেরা নিজেরাও তো এমন কাণ্ড করে, করে না? তখন দোষ হয় না?
প্র: আমরা দেখি আপনারা দল বেঁধে চলাফেরা করেন। পেছনে থাকে আবালবৃদ্ধবণিতার আনন্দমুখর লম্বা মিছিল।
অমানুষ: আসলে আপনারা আমাদের নাম ভাঁড় রাখলেই পারতেন। আমাদের তো কোনো আনন্দ নেই, কেউ হাসি ঠাট্টা করে, খোঁচা মেরে আনন্দ পেলে পাক না। তবু তো আমাদের কিছুটা মিথ্যা অহংকার হয়, এই বিশ্ব সৃষ্টিতে নগন্য হলেও কাজে লাগছি।


প্র: এ জীবন আপনার কেমন লাগে?
অমানুষ : আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কোন সন্তান নেই, কোন উত্তরাধিকার নেই, রেখে যাওয়া কোন শেকড় নেই। নাই বা আছে কারো প্রতি দায়বদ্ধতা। কেবল নরক যন্ত্রণার মাঝে বেঁচে থাকা। 

মানুষ অতীত ইতিহাস থেকে না শিখুক অন্তত আমাদের দেখে শিক্ষা নিতে পারত। ধারণা করা হয়ে ছিল, এজন্যে সম্ভবত আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। অসম্ভব কষ্টে ব্যথিত হই, যখন দেখি সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ ইচ্ছে করে যেসব হারাচ্ছে- শ্রেষ্ঠ সময়ের এ অপচয়, কী কুৎসিত! তারপরও আমি বলব, আহ, কী চমৎকার এ জীবন, ভাল লাগার অসংখ্য উপকরণ ছড়িয়ে আছে চার পাশে!


*এঁরা ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান [১]। এদের চোখের দৃষ্টি কী তীব্র। এঁদের চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা খোদ ঈশ্বরেরও নেই।   

সহায়ক লিংক:
১. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post.html 

Wednesday, April 14, 2010

এসো, এসো হে পান্তাখেকো

আবার বৈশাখ চলে এসেছে। পান্তাভাত খাওয়ার ধুম পড়ে যাবে। ওষুধ কোম্পানিগুলোর পোয়াবারো! স্যালাইনের বিক্রির টার্গেট ছাড়িয়ে যাবে। রেকর্ড ভঙ্গ!

আহারে, একবার শিল্পীরা পান্তা খেতে গিয়ে কী নাকালই না হলেন! এরা এসেছিলেন নাচাগানা করতে। কোথায় নাচ, কোথায় গান? সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। বিষয় কি, বিষয় আর কী! সকাল-সকাল পান্তা খেতে হবে যে। রান্না করা গরম ভাতকে তড়িঘড়ি করে ঠান্ডা করতে হবে, সময় কোথায়? বরফকল থেকে বরফের চাঁই এনে দাও ঢেলে ধোঁয়াওঠা গরম ভাতে। বরফকলের ওই বরফ ছিল আমাদের মহান ঢাকার দূষিত পানি। ফল যা হওয়ার তাই হলো।

আমি বলি কি, পান্তাভাতের সঙ্গে একটা করে ওরস্যালাইনও দেয়া হোক। সব মুশকিল আসান।  সারা বছর ফটাফট ইংরাজি বলা বাচ্চাগুলো বাংলা অক্ষর দেখে কী সোন্দর করেই না বলে, মম, এটা কি বোং-লা? এরা পান্তা খেয়ে 'বঙ্গাল' হবে! শ্লা!
আমি বুঝি না পান্তা খাওয়ার মানেটা! পিঠা-পুলি হলে নাহয় মেনে নেয় গেল। নববর্ষে নব্য বঙ্গালদের পান্তা খাওয়াটা আমার কাছে একটা চরম রসিকতা মনে হয়। আমাদের দেশের বড়ো দুখি মানুষরা, যাদের চুলা তিনবেলা জ্বলে না তাঁরা পান্তা খান। রাতের বেঁচে যাওয়া ভাত পানি দিয়ে রেখে দেন, সকালে এটাই খেয়ে কাজে বেরিয়ে পড়েন।    
 
এটা পুরনো লেখা, রিপোস্ট করছি এই কারণে একই কাহিনী নিয়ে বারবার লিখে আমার দুর্বল মস্তিষ্ক নামের হার্ডডিস্কে বাড়তি চাপ নেয়ার কোন গোপন ইচ্ছা আমার নাই। নিয়ম করে আমরা পান্তাভাত খাওয়ার একটা নাটক করব। ফি বছর একই নাটক নিয়ে লেখার কোন অর্থ হয় না। কালির অপচয় (আমি এখন কলম দিয়ে লিখি না, এই ভুল ধরার সুযোগ থেকেই যাচ্ছে)!

"ইনি এস, বি। টাকা চালাচালি যারা করেন তাদের অধিকাংশই এই ভদ্রলোককে এক ডাকে চেনেন। এস, বি সাহেবের পোশাকি নাম শাহাবুদ্দিন ভূঞা। ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু কুৎসিত রসিকতা করেছিল এস, বি নিয়ে। শালার ব্যাটা বলেছিলেন। ফাজিল বন্ধুকে শান্তি দিয়েছিলেন, কঠিন শাস্তি, তার বউকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। বয়সটা ছিল দশচক্রে ভগবান ভূত। বয়সের সেই দবদবা এখন আর কই! শরীর অশক্ত- মন দলদলে। 
এখন মনে হচ্ছে, আহ, জীবনটা এতো ছোট, কী দ্রুতই না সময় গড়িয়ে যাচ্ছে! কী অসম্ভব ক্ষমতা তাঁর, টাকার বস্তায় শুয়ে আছেন বললে ভুল হবে চাপা পড়ে আছেন। এ দেশের আট-দশজন পরিবারের সমস্ত মাসের খরচ চলে যে টাকায় এরচে’ বেশী ফাইভ স্টার হোটেলে একজনের একবেলার খাবারের মূল্য পরিশোধ করেন। এর কোনো অর্থ হয়, শিট, বুলশিট।
 

ওঁর অফিসের রিভলবিং চেয়ারের তোয়ালের দামই ৩৮০০ টাকা, ব্যাংকক থেকে আনিয়েছেন। এ দেশে যিনি যত বড় স্যার তাঁর চেয়ারের পেছনের তোয়ালে তত দামী ! সোনার দেশের সোনার সন্তানেরা টয়লেটের জিনিস অফিসে সাজিয়ে রাখেন। কী বুদ্ধিমান সব বুদ্ধিজীবী! খোদা না করুন কোন এক দিন টয়লেটের ওই জিনিস...।

এস, বি সাহেবের কেমন চাপা কষ্ট হচ্ছে। আহা নিঃস্ব-দুঃখীদের জীবন পাল্টে দিতে পারলে বেশ হতো। এটা কি করে সম্ভব ? কখনও এসব নিয়ে ভাবেননি। আজ ভেবে কূল পাচ্ছেন না। ইয়েস, এই তো সেদিন টেলিভিশনে নাটক দেখছিলেন। কি যেন নাম নাটকটার, হিমু না ভিমু? ধনীর এক দুলাল দূর্ভাগাদের জীবন কাছ থেকে দেখার জন্যে আলগা দাড়ি লাগিয়ে সুয়েরেজ পাইপের ভেতরে গিয়ে বসে থাকে। নিশিতে দিব্যি দুই ঠ্যাং উপরে তুলে আরামে ঘুমুতে যায়। ওয়াও, কী সোন্দর-কী সোন্দর! এমন অতিমানব হতে পারলে মন্দ হতো না- এ বয়সে কি এতোটা সইবে? প্রাণটা হু হু করছে। একটা কিছু করতেই হবে।
 

তীব্র ইচ্ছা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। ১৩১০ গ্রাম ওজন বিশিষ্ট মস্তিষ্কে প্রবল চাপ পড়ছে। মনে হচ্ছে সদ্যজাত শিশুর ৩৮০  গ্রাম মস্তিষ্ক হয়ে গেছে, ব্রেন প্রায় ড্রেন। অবশেষে স্থির সিদ্ধান্তে পৌছলেন পান্তাভাত খাবেন। এই ডিশটা নাকি গরীব-টরীবরা হরদম খেয়েই যাচ্ছে। এদের খাবার খেয়ে এদের বেদনা উপলব্ধি করার চেষ্টা করবেন। তার সমস্ত পরামর্শকদের নিষেধ উপেক্ষা করলেন। জিনিসটা খাবেন, খাবেনই। ছাড়াছাড়ি নাই।

কী কুৎসিত, বাসার তিনজন বাবুর্চীর কারো এটার রন্ধন প্রণালী জানা নেই। তিনি ইংরেজীতে খুব নরম একটা গালি দিলেন, যার আদ্যাক্ষর এফ। প্রচুর টাকা কবুল করে অং বং চং চাইনিজ রেস্টুরেন্ট থেকে শেফ ভাগিয়ে আনা হল। চীনা 

বাবুর্চীকে বললেন, তুমি কি ফাক কারিতে জানো? 
চীনা সাহেব কি বুঝলেন কে জানে, লজ্জায় লাল-নীল হয়ে গেলেন। ভুল বুঝেছেন বুঝতে পেরে স্বস্তির শ্বাস ফেলে জানালেন রেসিপি এনে দিলে জিনিসটা রান্না করতে পারবেন। অসংখ্য দুর্লভ রান্নার বই চিবিয়ে সবার গলদ্ঘর্ম অবস্থা। কোথাও এ জিনিসের বর্ণনা নেই। একজন বলল, কেকা ফেরদৌসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে। ওনাকে পাওয়া গেল না, তিনি মহা আত্মীয়ের চ্যানেল ব্যতীত অন্য কোথাও কালো চশমা পরা মুখ দেখান না।
 

এস, বি সাহেবের এক উপদেষ্টা চট করে এ সমস্যার সমাধান করলেন। এক হাভাতেকে ধরে আনা হলো। সাহেব বাবুর্চীর ক্ষীণ সন্দেহ হলো এই চলমান এক্স-রে প্রিন্ট কি কথা বলতে পারবে ? ইতস্তত করে বললেন, ‘টুমি খি ফাক কারিতে ঝানো ফান্টাভাট ?’
হাভাতে চোখ চকচকে করে বলল, ‘জ্বে না, ফান্টা কুনু সুময় খাই নাইক্কা। নাম হুনছি, চোক্কো দেখছি, সূর্যের লাহান অয়। নাল।’
এস, বি সাহেব অনতিদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার বমি ভাব হচ্ছে। হারামজাদার শরীর থেকে বিকট গন্ধ ছড়াচ্ছে। গা কেমন গুলাচ্ছে, নি:শ্বাস বন্ধ করে রেখেছেন। নি:শ্বাস সর্তকতার সঙ্গে ছেড়ে বললেন, ‘না না, তুমি যা ভাবছো তা না। পান্তাভাত খাও তো?’
হাভাতে ভারি অবাক হল, ‘ইডা কেমুন কতা, পান্তাভাত দাদায় খাইছে বাপেও খাইছে, আমি খাই, আমগো পোলাও খায়, হের পোলাও খাইব।’
 

এস, বি বিরক্ত, আরে হা...এ দেখি অবিকল রাজনীতিবিদদের মত কথা বলছে। বাপ দেশ চালাইছে, আমিও চালাই, আমার পুলাও চালাইব। এস, বির রাগি গলা: খামোশ, ফড়ফড় করবে না। এখন বলো এটা কি করে রান্না করতে হয়?
হাভাতে: ইডা কেমতে রান্ধন লাগে আমাগো জানা নাই।
এস, বি: কামন কঙ্কাল বডি, খাচ্ছ অথচ রাঁধতে জানো না!
হাভাতে : আইজকার ভাত পানি দিয়া থুয়া দিমু, কাইল হেই পানিভাত খামু।
এস, বি: এই বিশেষ পানি কোত্থেকে আনো?
হাভাতে: কি কন বুঝি না। বালা পানি বেবার করি। আমগো ডোবাডা আছে না, দেহেন নাই? ওই যে লাইন ধইর‌্যা টাট্টি বানায়া রাখছে। হের তলে থিক্যা।
 

এস, বি সাহেব শিউরে উঠলেন। মনে হচ্ছে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন। টলে উঠতে গিয়ে সামলে নিলেন। এ সমস্যারও সমাধান হলো। পানির বদলে মিনারেল ওয়াটার ব্যবহার করা হবে। 
বুভুক্ষুটার খাওয়া আট মিলিমিটার সুপারফাস্ট ক্যামকর্ডার ভিডিও মুভি ক্যামেরায় বিভিন্ন এঙ্গেলে ছবি নেয়া হয়েছে। তিনি চাচ্ছেন অবিকল ভঙ্গিটা। পান্তাভাত কাটা চামুচ দিয়ে মুখ বন্ধ করে খেলে তো হবে না। গ্রোগ্রাসে গপাগপ করে গিলতে হবে। সিনামা পাড়া থেকে একজন দুর্দান্ত অভিনেতাকে আনা হয়েছে। ইনি এখনো ষাট বছর বয়সে চুটিয়ে কলেজ ছাত্রের অভনয় করেন। তিনমনি এই অভিনেতা একমন ওজন বিশিষ্ট পেটটা ভাসিয়ে আদুল গায়ে পা ছড়িয়ে বসেছেন। ভিডিও ক্যাসেট দেখে দেখে খাওয়ার ভঙ্গিটা রপ্ত করছেন এবং এস, বি সাহেবকে শেখাচ্ছেন।
 

ক’জন ডাক্তার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন। এদের প্রত্যেকেরই আছে নিজ পেশায় অভাবনীয় সুনাম এবং নামের পেছনে এ.বি.সি.ডি ওয়াই, জেড কাড়ি কাড়ি বিজাতীয় অক্ষর। দুটা এম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে, একটা বিকল হলে অন্যটা কাজে লাগানো হবে। হাতের নাগালে ওরাল স্যালাইন, আই ভি ফ্লুইড রাখা হয়েছে। ফুড পয়জনিং হলে অন্য ব্যবস্থা।
দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, অতি প্রত্যুষে এস, বি সাহেব পান্তাভাত খাবেন। নতুন একটা সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হবে অন্য রকম একটা দিন। রাতেই তিনি মা’র পা ছুঁয়ে সালাম করলেন: মা, দোয়া করো আমার জন্যে। আমি পান্তাভাত খেতে যাচ্ছি।
এস, বি সাহেবের মা কী অবাকই না হলেন! আহা, কতো দিন, কতো দিন পর তার সন্তান গাঢ় স্বরে তাঁর কাছে আসল, তাঁকে ডাকল, আহা, কী গভীর মমতায় তাকে ছুঁয়েছে: খোকা-খোকা, অ খোকা, পা-পান্তা ভা-ত কি বলছিস ছাইপাশ, এটা খাবি কেন, কি কষ্ট তোর!
ও তুমি বুঝবে না, মা। সমস্তটা জীবন হেলাফেলা করে কাটিয়েছি। এবার মানব সেবা করতে চাই।
মার বিস্ময়ের শেষ নেই, এটা খেলে মানব সেবা হবে? খেতেই যদি হয় তোর বদলে অন্য কেউ খাবে, তুই কেন? তোর সব কাজই তো অন্যরা করে। এটাই নিয়ম।
 

এস, বি সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অজান্তেই মা বড়ো ভুল বলেননি। তার বাবা হওয়ার ক্ষমতা নেই অথচ ছেলেটা আরিজোনায় পড়াশুনা করছে।
মনখারাপ করা শ্বাস ফেলে বললেন, তা হয় না মা। এ মহান কাজটা আমায় করতেই হবে। সকাল সকাল তোমার ঘুম ভাঙ্গাতে চাই না বলেই এখন আসলাম। এইবার বিদায় দাও।
এস, বি সাহেব বেরিয়ে যেতে যেতে ভাঙ্গা অস্ফুট গলায় গাইলেন: একবার বিদায় দে মা পান্তা ভাত খেয়ে আসি। আঁ আঁ আঁ আঁ।

তিনি ভোরের অপেক্ষা করছেন। কী অসহ্য অপার্থিব একটা ভোরের প্রতীক্ষা। কিন্তু ভোর তো আর হয় না, মনে হচ্ছে প্রিয় মানুষের লাশ সামনে নিয়ে বসে আছেন। ভোর হয়, ভোরকে কেউ আটকাতে পারে না। কেউ কেউ ভোরের প্রতীক্ষা করে করে শেষ প্রহরে হাল ছেড়ে দেয়, এ ভুবন থেকে অন্যভুবনে যাত্রা করে। তিনি হাল ছাড়বেন না। পান্তা খাবেন, খাবেনই- ছাড়াছাড়ি নাই।"

Friday, April 2, 2010

ফিরিয়ে দাও আমার আকাশ

কল্লোল চাপা কষ্ট নিয়ে চিঠিটা পড়ছে। ভাগ্নের চিঠি, জাপানে আছে। আট বছর হলো দেশে ফেরার নাম নেই। ওর মন অসম্ভব খারাপ হয়ে যায়। বিশ বছরের যে ছেলেটা নিজে পানি ঢেলে খেত না, পানি খাব বললেই ঝকঝকে কাঁচের গ্লাসে মায়ামাখা কয়েকটা হাত এগিয়ে আসত। এখন ওর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটাচ্ছে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবহীন, একাকী-নিঃসঙ্গ। কী কুৎসিত একটা জীবন! আফসোস, জীবনের সেরা সময়টা হারিয়ে যায় পড়াশোনা, তথাকথিত ক্যারিয়ারের নামে। এ ছেলেটার কথা মনে হলেই কল্লোলের বুকটা কেমন ভারি হয়ে উঠে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

ছেলেটা কী আমুদেই না ছিল, ছিল কিছু পাগলামিও। এখানে থাকতে ও নিদেনপক্ষে তিনটা আন্ডার-গার্মেন্টস পরত। ওদের চোখে পড়ে গেলে কী লজ্জা! প্রথম দিন তো কল্লোল বুঝতেই পারেনি হচ্ছেটা কী, ভেবেছিল নতুন কিনেছে মাপ দেখছে। কিন্তু একটার ওপর আরেকটা, খটকা লাগল।
রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে পাগলা, কাহিনী কি!’
কুক্কু ভেঙেচুরে এক ফুট ছোট হয়ে বলল, ‘কিছু না মামা। এমনি-এমনি করছি।’
‘আরে পাগলা, মামার কাছে লজ্জা কি, মামা-ভাগ্নে যেখানে ভূত-প্রেত নাই সেখানে।’
‘ইয়ে, মানে মামা, আমি শার্ট ইন করলে ছেলেরা খেপায়। পেছন থেকে আমাকে নাকি দশ বছরের খোকা মনে হয়। এখন একটু হেলদি দেখাবে। দেখো, ঠিক বলিনি?’

প্রবাসে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কুক্কু এ অভ্যাস ছাড়তে পারল না। অবশ্য ওখানেও এ অভ্যাস রয়ে গেছে কিনা কে জানে! আজকের চিঠিতে লিখেছে:
“মামা বুঝতে পারছি নিয়মিত চিঠি দেই না বলে তুমি রেগে পটকা মাছ হয়ে আছ। কি করব বলো, কাজ থেকে ফিরে ঘুমুতে ঘুমুতে রাত চারটা হয়ে যায়। সকাল আটটায় স্কুলে যেতে হয়। ব্রেকের সময় ঢুলতে ঢুলতে কিছুক্ষণ ঘুমাই। স্কুল ছুটি হলে কাপড় কাচা, রান্না-বান্না, বাথরুম পরিষ্কার, কত কাজ!
মামা তোমাকে একটা মজার ঘটনা বলি, ওদিন তাড়াহুড়ো করে স্কুলে যাচ্ছি। ইলেকট্রিক ট্রেনের অটোম্যাটিক দরজা লেগে গেল। আমার স্কুল ব্যাগ বাইরে, আমি সরু ফিতা ধরে ট্রেনের ভেতর বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে আছি। যে স্টেশনে নামব এপাশের দরজা খুলল না, খুলল গিয়ে কয়েক স্টেশন পর। স্কুলে টিচার জানতে চাইলেন দেরি কেন হলো, আমি বুঝিয়ে বলছি। পুরোটা বলতে পারলাম না। জেনী করল কি, ও তুমি তো ওকে চেনো না, আমার বন্ধু। চোখমুখ সিরিয়াস করে বলল: কুক্ক, তুমি গডকে ধন্যবাদ দাও, আজ স্কুলব্যাগ বাইরে তুমি ভেতরে। এমন যদি হতো তুমি বাইরে ব্যাগ ভেতরে- হি হি হি, তাহলে কি হতো বলো তো?

মামা জেনীটা না বড়ো ফাজিল। একদিন এমন ক্লান্তি লাগছিল, টিফিন আওয়ারে চোখ লেগে গেল। ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলে দেখি টিফিন বক্স খালি। জেনী টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে হাসিমুখে বলল: সরি, তোমার টিফিন আমি খেয়ে ফেলেছি, আমারটা তুমি খাও।
ওর খাবার চিবুতে চিবুতে বিরক্ত হয়ে আমি বললাম: জিনিসটা কি, রাবারের মতো মনে হচ্ছে!
জেনী চোখ কপালে তুলে বলল: কি বলছ, মার কী অসাধারণ রান্নার হাত। এতে কচ্ছপ কচি শুয়োরের মাংস সবই তো আছে। মামা, আমাকে ফাঁকি দিয়ে পর্ক খাইয়েছে বলে জেনীর উপর ঠিক শোধ তুলেছিলাম। কি করেছিলাম, জানো? নাহ, তোমাকে বলা যাবে না।

মামা তুমি না আমার হাতের পরোটা খেলে পাগল হয়ে যাবে। পরোটা খেতে কি মজা তুমি চিন্তাই করতে পারবে না। তবে মামা বিরাট সমস্যা, পরোটা বেলার জন্যে বেলন পাই না। প্রথমদিকে খুব অসুবিধা হতো, পরোটা তিনকোণা চারকোণা হয়ে যেত। কি করি, কি করি, হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এল মদের বোতল দিয়ে বেলনের কাজ চালালাম। অ, মামা, তুমি আবার ভাবছ না তো আমি মদ-টদ খাই, ধুর পাগল! শুধু পরোটা গলায় আটকে গেলে কয়েক ঢোক-। গলায় খাবার আটকে বিধর্মীদের দেশে মারা যাই, এইটা কি তুমি চাও, নিশ্চয়ই চাও না?

আচ্ছা মামা, তুমি কি এখনো বর্ষার পানিতে কাগজের নৌকা ভাসাও? আমাদের আকাশটা কি আগের মতোই গাঢ় নীল? আমাদের ছাদের চাঁদটা কি আগের মতই মায়াবী? মামা, আমাদের পুকুরের বসার জায়গাটা কি আগের মতই আছে, নাকি ভেঙ্গে ফেলেছ। খবরদার মামা, খবরদার, ভাঙ্গলে কিন্তু তোমার খবর আছে। দেশে আসলে তোমাকে নিয়ে ওখানে বসব। রাজ্যের গল্প করব তোমার সাথে।
মামা, তোমার আগের চিঠি পড়ে জানলাম তুমি খুব হতাশ। এতোটাই ভেঙে পড়েছো ভিক্ষুক দেখে ভাবো তোমার চেয়ে কী সুখী এই লোক। কোলের শিশুকে হিংসা করো। কি হয়েছে, টাকা-পয়সার সমস্যা। ব্যস, এ-ই-ই!
ও মামা, আমাদের ওই টিয়াটা কি এখনো আছে, ওই যে ঠুকরে ঠুকরে খাঁচা ভেঙে পালিয়ে যেতে চাইত? তুমি শেষে লোহার খাঁচা বানিয়ে আনলে। ঐ টিয়াটাকে ভাল করে তাকিয়ে দেখো, দেখবে ওটা আমি। মামা- মামা, অ মামা, বড় কষ্ট!বড় কষ্ট!!

*লেখাটা 'একালের প্রলাপ'-এ ছাপা হয়েছিল। একটা ওয়েব-সাইটে (২০০৬) আমি যখন লেখালেখি করতাম, ওখানে এই লেখাটা দিয়েছিলাম। ওখানের কিছু মন্তব্য আমাকে বড়ো যন্ত্রণা দিয়েছিল। মন্তব্যগুলো দাঁড়ি-কমাসহ এখানে তুলে দিচ্ছি (প্রিন্ট আউটটা এখন আমার চোখের সামনে। সবার প্রকৃত নাম জানা আছে তবুও এখানে কেবল তাঁদের নিকটাই শেয়ার করব ):

প্রজাপতি
: "শুভ, বাচ্চা ছেলেগুলোকে কাঁদানোর জন্য কি লিখলেন এটা? ধুরো...আমার বন্ধুটা...।"
অনুমান করি, তাঁর সেই বন্ধুটা আজ ভালবাসা-বাসির মানুষ! বিবাহ করে সুখে-শান্তিতে বসবাস করছেন।

হযবরল: "অ মামা, আমি পরশু রাত তিনটা তক গরুর মাংস রানছি, খাইবা? পরটা আমি বানাইতে পারি না, তয় মামা সালাদ বানাই ভালো, সরিষার তেল আর কাঁচা মরিচ ডইলা। তুমি আমার জেনি রে একটু দেইখা রাইখো, মামা।..."
ঝপ করে আমার চোখের সামনে সব কেমন আধার হয়ে গেল। এটা এই ছেলেটার কান্ড- এ সুদূর আমেরিকা থেকে কি কি করল আমি জানি না। আমার চোখে জল!

অরূপ: "...এই বছরের অর্ধেকটা কাটল হোটেলে হোটেলে...কাকের বদলে গাংচিল দেখি। অচেনা শহরগুলো অচেনাই থেকে যায়। শুধু একা একা পথচলা।"
এই মানুষটা সঙ্গে ওই ওয়েব সাইটে কঠিন মারামারি-হাতাহাতি হয়েছিল। হাতাহাতি মানে আমার লেখার প্রসঙ্গ নিয়ে ভার্চুয়াল মারামারি! কিন্তু এক নিমিষেই সব ভুলে গিয়েছিলাম। আমার মাথায় আটকে গেল, হোটেলে-হোটেলে ঘুরি...কাকের বদলে গাংচিল দেখি।

এঁদের এই সব মনে রাখার আজ আর অবকাশ কই! কিন্তু আমি ভুলিনি। একজন দুর্বল মানুষের দুর্বল মস্তিষ্ক! পূর্বে উল্লেখ করেছিলাম, 'মার কাছে ফেরা' লেখাটা নিয়ে একজন কঠিন একটা মেইল করেছিলেন। ওখানকার একটা বাক্য এমন ছিল, "...আপনি আমাদের আবেগ নিয়ে খেলার চেষ্টা করেন। এটা ঠিক না, অন্যায়..."।
আজ এখন এখানে বলি, ট্রাস্ট মী, এমন অন্যায় জেনেশুনে করার কথা আমি কল্পনাও করি না। আমি কেবল আবেগের স্থানটা আলতো ছুঁয়ে দেয়ার চেষ্টা করি, প্রায়শ ব্যর্থ হই। কারণ আমি কখনও প্রবাসে থাকিনি। এই অচেনা ভুবনটা কেমন জানি না। কিন্তু এই অদেখা ভুবনটা বুকের ভেতর থেকে অনুভব করার চেষ্টা করি। আর কিচ্ছু না...।

Thursday, November 5, 2009

লা বাতু


দুঁদে চিত্রশিল্পী আঁরি মাতিস-এর তখন দুনিয়াজোড়া নাম। ১৯৬১ সালে নুঅর্কের মর্ডান আর্ট গ্যালারীতে এই শিল্পীর শিল্পকর্ম ‘লা বাতু’ (দ্য বোট)-এর প্রদর্শনী চলছিল। 

কোন এক হাবামানব ছবিটা উল্টো করে টাঙিয়ে দিল। দেখা গেল একটা নৌকা ওল্টো করা, নৌকার ওপরে সাগর, নীচে আকাশ এবং মেঘ। 
পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থেকে তাবড় তাবড় সমালোচক এলেন। কেউ কাঁধ ঝাকালেন, কেউ- বা পা নাচালেন। ছবির বিভিন্ন দিক নিয়ে উচ্ছ্বসিত হলেন। 
এ প্রদর্শনীতে আগত ১ লাখ ৬০ হাজার দর্শক ভাবলেন, বির্মূত চিত্রকলা তো যা খুশী তা হতেই পারে। 

প্রদর্শনী শেষ হওয়ার দিন ফুরিয়ে আসছে। আঁরি মাতিসের ছেলে এলেন একদিন। অষ্টম আশ্চর্য গোছের বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইলেন, বাবার ছবিটা উল্টো করে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে কেন! 
প্রদর্শনী থেকে ঘুরে আসা শিল্পবোদ্ধাদের অনেকে বড়ো গলায় বিবৃতি দিলেন, তারা দুর্ভাগ্যক্রমে এখনও প্রদর্শনীতে যেতে পারেননি। আফসোস, গেলে এতো বড়ো ভুল কি চোখ এড়াতো! 


*সদয় অবগতি: এটা আঁরি মাতিসের সেই ছবি না।  :)

Monday, November 2, 2009

যাহার কোন পীর নাই তাহার পীর শয়তান


বাংলাদেশের একজন নামকরা পীর সাহেব। 
জটিলতা এড়াবার জন্য নামটা বলছি না কিন্তু আশা করছি, বুদ্ধিমান পাঠক সূত্রটা ধরতে পারবেন। তিনি একবার চাঁদ দেখা নিয়ে বড় হুজ্জত করেছিলেন। সমস্ত বাংলাদেশ একদিকে তিনি একদিকে! তার নির্দেশে মধ্যরাতে ইমামদের জনে-জনে ফোন করে একটা রোজায় গন্ডগোল লাগিয়ে দিয়েছিলেন। 

ইনি এক মফস্বলে ওয়াজ করতে এসেছেন, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন বিরাট কাফেলা- সতেরোজন চেলা, অসংখ্য মুরীদ। যে জায়গায় ওয়াজ হবে এর আশেপাশে ওঁর চেলা, মুরীদরা বাজার জমিয়ে ফেললেন। 
হুলস্থূল কান্ড! কেউ পীর সাহেবের দেওয়া তাবিজ (এইডস কোন ছার, পৃথিবীতে এমন কোনো রোগ, সমস্যা আজ অবধি সৃষ্টি হয়নি যা এটায় সারে না) বিক্রয় করছেন। কেউ বা বিক্রয় করছেন বিশেষ হালুয়া। এ হালুয়া খেলে নাকি নর-নারীর বিশেষ মুহূর্তে,  নরের ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায় (ফাইজার সম্ভবত ভায়েগ্রার ফর্মুলা পীর সাহেবের কাছ থেকে চুরি করেছিল)। 
হা-নারী, তার জন্য এ ধরনের কোন হালুয়া নেই! বাংলাদেশে মহিলা পীরের আকাল, এটা অন্যতম কারণ হতে পারে। 
দেদারসে বিক্রয় হচ্ছে পীরসাহেব এবং ওঁর বাবার (ইনিও পীর ছিলেন) লেখা বই।
পীর সাহেবের বাবা- ওঁর বইয়ের এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, কিতাবে লিখিয়াছে: "যাহার কোনো পীর নাই তাহার পীর শয়তান"। 

কিতাবে লিখিয়াছেন; কে লিখিয়াছেন, কোন কিতাবে লিখিয়াছেন, কেন লিখিয়াছেন এর কোনো বর্ণনা নাই। এটা কি আল কোরআন, না আল হাদিস, সহী হাদিস, না জয়ীফ হাদিস এরও কোন উল্লেখ নেই? 
তো, ওয়াজ চলাকালীন সময়ে পীর সাহেব ঘুরে-ফিরে বারবার সুর করে বলতে থাকলেন, "যাহার পীর নাই তাহার পীর শয়তান। বিচারের দিন শয়তানের একেকটা পশম হইবে তালগাছের সমান। পশমের গোড়া দিয়া মোটা মোটা জির (কেঁচো) বাহির হইবে, রে-এ-এ, এ-এ-এ।" 

ওয়াজ শেষ হলে পীর সাহেব রাতের বেলা খাবেন। এক ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভূরিভোজনের দায়িত্ব নিলেন। প্রথমে বলা হয়েছিল দুজন খাবেন, পীর সাহেব এবং চেলাদের সর্দার।
ঘণ্টাখানেক পর জানানো হল, না, পীর সাহেবসহ আঠারো জন খাবেন। গৃহকর্তা বিরসমুখে মেনে নিলেন, পীর সাহেব বলে কথা। এত লোকের তো আর ডাইনিংরুমে স্থান সংকুলান হবে না, বড় বারান্দায় ব্যবস্থা হল। আরো দুটা ডাইনিং টেবিল, গোটা ছয়েক চেয়ার ধার করা হল। বাসার সবাই ছুটাছুটি করে হাঁপিয়ে উঠেছে। 

একজন চেলা ব্যবস্থা দেখে খবর নিয়ে এলেন, হুজুর চেয়ারে খাইবেন না, চেয়ারে বইসা পা ঝুলায়া খায় খ্রেস্টানরা। 
টেবিল চেয়ার সব সরানো হলো। পাটি বিছিয়ে এর উপর খবরের কাগজ বিছানো হল।
হুজুরের আরেক চেলা (ধরা যাক চেলা নম্বর দুই) এবারের ব্যবস্থা দেখে রাগে লাফাতে লাগলেন: হুজুর এইখানে খাইব না, দস্তরখান কই?
চেলা নম্বর তিন গৃহকর্তাকে সদয় বুদ্ধি দিলেন: পাটির উপর চাদর বিছায়া দেন।
গৃহকর্তা কী আর করেন, বিছানার সব চাদর পাটির উপর বিছিয়ে দিলেন। 


ভূরি ভোজনের বিরাট আয়োজন করা হল। আঠারোটা মোরগ পরলোকে যাত্রা করল। পোলাউ, কোর্মা, ফিরনি এসব তো আছেই। খাবেন আঠারো জন, ছত্রিশজনের আয়োজন। রান্নাবান্না সব শেষ। চেলা নম্বর চার হঠাৎ খবর নিয়ে এলেন: হুজুর এইসব খাইবেন না, তার জন্যে চাউলের রুটি, কদু ভাজি লাগব।  
রাত তখন দশটা। গৃহকর্তা সেরখানেক ঘাম ঝরিয়ে অবশেষে এ অসাধ্য সাধন করলেন।
 


রাত দেড়টায় ওয়াজ শেষ হল। খাওয়ার সময় দেখা গেল পীর সাহেবের মোরগ-মোসাল্লামের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহের কমতি নেই। এ বয়সেও (কত আর হবে ষাট-পয়ষট্টি) খেতে পারেন প্রচুর, ক’দিন পূর্বে ছ’নম্বর ছেলে (ভাবী পীর) এর বিয়ে দিলেন। বাবা পীর হলে ছেলে পীর হবেন এটাই নিয়ম। রাজনীতিবিদদের মত এরাও উওরাধিকার সূত্রে দৈব ক্ষমতাটা পেয়ে যান। কি উপায়ে, এটা সাধারণরা জানে না, বাতেনী তথ্য! 
তো, ভুরিভোজন সমাপ্ত হলে চেলাদের সর্দার মস্ত ঢেকুর (অবশ্যই বিকট শব্দে, নইলে ভালো খাওয়া-দাওয়া হয় নাই ভেবে গৃহকর্তা মনঃকষ্ট পেতে পারেন) তুলে বললেন: হুজুর আর খাইব না, দুধ আনেন।
গৃহকর্তার মাথায় হাত। দুধ, দুধ তো নাই! ব্যবস্থা করেননি, আসলে মনেই পড়ে নি। দাঁতে দাঁত চেপে বাচ্চার জন্য তুলে রাখা দুধ এনে দিলেন। 


পীর সাহেবের দৈত্য চেলা, ক্ষীণ দৃষ্টির লোকও ইনাকে দেখে দৈত্য ভ্রম করবে। মাশাল্লা, কী উপায়ে এ শরীর বানিয়েছেন কে জানে! অনেকটা চারতলা টিফিন ক্যারিয়ারের মত দেখতে পানের বাটা বের করলেন। কী কারুকাজ, কী জৌলুশ তার! একেকতলায় অসংখ্য খোপ, জর্দাই হবে পনেরো-বিশ প্রকারের। কী বাহারি নাম একেকটার! চ্যামন বাহার, মেশকে আম্বা, শাহজাদী কী আসু। নামগুলো জানা গেল দৈত্য চেলা যখন তরমুজের বিচির মত পান খাওয়া দাঁত বের করে সহযোগীদের জিজ্ঞেস করছিলেন কোন জর্দা দেবেন। 
মজার ব্যাপার হল, পীর সাহেব তার ওয়াজে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন এটা বলে, ইন্ডিয়ার এখন আর কোনো কাজ নাই; একমাত্র কাজ হলো, যেকোনো উপায়ে এদেশের মুসলমানদের ধর্ম নষ্ট করে ফেলা। 
পীর সাহেব এবং তার চেলারা যে জর্দা সহযোগে পান চিবুচ্ছেন, আরামে তাদের চোখ ছোট হয়ে আসছে, সেই জর্দা ইন্ডিয়ায় তৈরি। শুধু তাই না, পীরসাহেব পায়ের গিট পর্যন্ত যে লম্বা ঢোলা (এর ভেতর দু-তিনজন বা ওসামা বিন লাদেন অনায়াসে আত্মগোপন করে থাকতে পারবে) চোখ ধাঁধানো যে জিনিসটা পরে আছেন, এটাও গতবার ইন্ডিয়া গিয়ে কিনে নিয়ে এসেছেন। 

বারান্দায় যখন খানাপিনা চলছিল তখন সিঁড়ির এক কোণায় মলিন কাপড়ে মোড়া হাড় জিরজিরে একলোক জড়োসড়ো হয়ে বসেছিল। খাবারের মৌ মৌ গন্ধে থেকে থেকে তার ক্ষিধেটা পাক দিচ্ছে। এতোক্ষণ যারা তাকে ভিখারী ভাবছিল তাদের ভুল ভাঙল যখন সলজ্জচিত্তে এ লোক উচ্ছিষ্ট খাবার প্রত্যাখান করল। সে এসেছে পীর সাহেবের দোয়া নিতে। 
চেলাদের সর্দার এবার তাকে নিয়ে পড়লেন: পীর সাহেবের তাবিজ নিছো- নেও নাই, বিষয় কি? হালুয়া, হালুয়া কিনছ তো, কি কইলা পয়সা নাই? পীর সাহেবের ওয়ালেদ (বাবা) সাহেবের ২৮ খানা কিতাবের একটাও কিনো নাই! মিঞা তুমি ফকির নিহি। যা গিয়া পীর সাহেবের পা টিইপ্যা দে।
*ছবি ১:
"যাহার পীর নাই সে শয়তান"। 
আচ্ছা, শয়তান দেখতে কেমন হয়? শয়তানের একটা ছবির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শয়তানের ছবি পাই কই? শয়তান দেখতে কেমন হয়, এটাই তো জানি না ছাই! জানি না যখন তখন কাকতাড়ুয়ার মত হতে দোষ কী!
**ছবি ২: 
পোস্টের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নাই, ছবিটা প্রতীক অর্থে-প্রতীকাবাদবুড়া-বুড়া মানুষদেরও দেখেছি পীরের ছেলেদের পা ধরে কদমবুসি করতে। পীরের ছেলে-ছোকরাদের ছবি পাই কই? তাই...। 

Thursday, October 29, 2009

একখানা হিট ছলচিত্র(!) বানাবার কলা(কৌশল)


আপনি একটা হিট কমার্শিয়াল ছবি বানাতে চান? 
এ ধরনের ছবি বানাতে নিদেন পক্ষে আপনার যা লাগবে, একজন ভুঁড়িওয়ালা নায়ক, আড়াই থেকে তিন মণ ওজনের দুজন নায়িকা (একজন, যিনি একটু মোটা কম, শেষ দৃশ্যে প্রায় মিনিট পনেরো ধরে দীর্ঘ সংলাপ বলতে বলতে রক্তের সাগরে ভাসতে ভাসতে মারা যাবেন)। লাগবে কয়েক গ্যালন লাল রঙ, কয়েক লিটার খাঁটি সরিষার তেল অথবা গ্লিসারিন (সহজলভ্য যেটা), প্রচুর লাফিং গ্যাস এবং কাঁদানে গ্যাসের কিছু শেল।  

আপাতত এসব নিয়েই শুটিং শুরু হবে। প্রথম দৃশ্যে দেখা যাবে, নায়িকা এমন একটা পোশাক পরেছে, যেটা পরা, না-পরা প্রায় সমান। একটু পরেই দেখা যাবে নায়িকা সাগরের পানিতে দাপাদাপি করছে। সাগরের পানি উপচে ডাঙায় চলে এসেছে, সাগর কাদার মরুভূমি। 
এবার নায়িকা বিরক্ত হয়ে সমুদ্র নামের কাদার মরুভূমি থেকে ডাঙায় উঠে বনবাদাড়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করবে। ছোটখাটো গাছের ডালপালা সব ভেঙে ফেলবে। 
গাধার (এরা নাকি খুব ভদ্র, ওজন নিয়ে তেমন বিশেষ মাথায় ঘামায় না) পিঠে করে নায়কের আগমন। নায়ক নায়িকার আকাশ পাতাল রূপ দেখে অন্য রকম হয়ে যাবে। নায়িকাকে কোলে নিয়ে (আসলে নায়কদের সময়ের অভাব নইলে বিশ্ব অলম্পিকে ওয়েট লিফটিং-এ সবগুলো সোনা বাগিয়ে নেয়া ডাল ভাত) গান গাইতে গাইতে আরও কিছু গাছের প্রচুর বড় ডালপালা ভাঙবে। 
ওয়েল, এ ছবিতে গান থাকবে আঠারো থেকে বিশটা। প্রায় প্রতিটি গানের কথা থাকবে এরকম, বিচিত্র কারণে নায়িকার শরীরে আগুন ধরে গেছে, ফায়ার বিগ্রেড ডেকেও লাভ হচ্ছে না। ইনিয়ে-বিনিয়ে এটা নায়িকা বার বার বলতে থাকবে। আর নায়ক ঘুরে ফিরে আগুন নেভাবার প্রতিশ্রুতি তো দিবেই, বোনাস হিসাবে সে নিমিষে নায়িকার গোদা পায়ে চন্দ্র-সূর্য হাজির করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধও হবে। 

এ ছবিতে কিছু স্পেশাল এফেক্ট থাকবে। এই যেমন, নায়ক মোটর সাইকেল নিয়ে আকাশে উড়বে, রিকশা নিয়ে ফোর-হুইল ড্রাইভ গাড়ির ধাওয়া করবে। ধান ক্ষেতে অনায়াসে প্লেন নামাবে, লম্বা লম্বা চুল রেখে পুলিশ কিংবা আর্মি হয়ে যাবে। 
মারাত্মক কিছু দৃশ্য থাকবে এরকম, নায়ক একটা পিস্তল দিয়েই শ’য়ে শ’য়ে দুষ্টলোক মেরে ফেলবে। এক গুলিতে দু-তিনজন মারা যাওয়াও বিচিত্র কিছু না, গুলি কোন সমস্যা না। অথচ হাজার হাজার গুলি নায়কের গোপন কেশ দূরের কথা প্রকাশ্য কেশও স্পর্শ করতে পারবে না। বাই এনি চান্স, বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেলেও টলতে টলতে দীর্ঘ সংলাপ বলবে। কিন্তু মরবে না, নায়কদের মরার নিয়ম নাই- সবই তার ইচ্ছা! 

বিয়ের দৃশ্য: যদি মুসলমানের বিয়ে হয় তাহলে আকাশ পাতাল সাক্ষী রেখে বিয়ে হবে আর হিন্দুর বিয়ে হলে দেখা যাবে সিঁদুর নাই। তাহলে কি বিয়ে হবে না? হবে না মানে, অবশ্যই হবে। নায়ক চাকু বের করে এক পোঁচে নিজের হাত কেটে পোয়াখানেক রক্ত দিয়ে নায়িকার সিঁথি মাখামাখি করে ফেলবে।
দুঃখের দৃশ্য: ভাগ্যচক্রে রাজার মেয়ে রুজ-লিপিস্টিক মেখে থাই সিল্ক পরে মানুষের বাড়িতে ঝি-গিরি করবে। ন্যাকড়া দিয়ে ঘর মুছবে কিন্তু আলাদা পানির প্রয়োজন হবে না, চোখের জলই যথেষ্ট।
হাসির দৃশ্য: তিন-চার ফুটের কয়েকজন ভাঁড় নায়িকার সখিদের সঙ্গে রঙ-তামাশা করবে। অবশ্য এখনকার দর্শকরা আবেগশূন্য। নো প্রবলেম, সিনেমা হলে এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহার না করে হাসির দৃশ্যে লাফিং গ্যাস এবং দুঃখের দৃশ্যে কাঁদানে গ্যাস স্প্রে করে দিতে হবে। 


ও-হ্যাঁ, ছবিতে এক বা একাধিক ভিলেন থাকতে হবে, থাকতে হয়, নিয়ম। এদের একমাত্র কাজ হল ছলে-বলে-কৌশলে যে কোনো উপায়ে নায়িকাকে সতী থেকে অসতী বানিয়ে ফেলার সবিরাম চেষ্টা। আর এই অধ্যায় চলতে থাকবে আধ ঘণ্টা ধরে। 
শেষ মুহূর্তে মানে ইজ্জত যায়-যায় এমতাবস্থায় নায়ক হাজির হবে (জাস্ট টাইম, নো কমপ্লেন)। প্রথমদিকে মার খাবে। এরপর প্রতি সেকেণ্ডে চল্লিশ-পঞ্চাশটা ঘুসি মেরে ভিলেনকে এ্যায়সা ধোলাই দেবে, ঘাঘু ধোপাও লজ্জা পেয়ে যাবে। এ অবস্থায় ভিলেনের পরলোকে রওয়ানা হওয়ার কথা। কিন্তু না, উঠবে মার খাবে, আবার উঠবে আবার মার খাবে। ছবি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভিলেনের নিস্তার নাই। 

ভালো কথা, ছবিতে একজন মমতাময়ী মা থাকলে ভালো হয়। যার সামনের চুলগুলো অনেকটা ইন্দিরা গান্ধীর মতো পাকা কিন্তু গায়ের চামড়া টান-টান। যেহেতু ইনি মা, দয়ার শরীর, হাতির বাচ্চার মতো নায়ক মানে ইনার ছেলেকে গভীর বিষাদে বারবার বলতে থাকবেন, ‘আমার পুলা বাঁচতো না, শুখাইয়া চিপস হইয়া গেছে’। আর আধুনিক, হাই-ফাই মা হলে, ‘কী স্বাস্থ্য তোর, কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং, একটু জোরে বাতাস এলে চল্লিশ তলায় উড়ে যাবি’। বাংলাদেশে চল্লিশতলা নাই তাতে কি হয়েছে, ছবির বেশিরভাগ শুটিং হবে তো বিদেশে। 

এবার বিজ্ঞাপন। ইত্তেফাক (বিজ্ঞাপনের স্পেস নিয়ে এদের কোনো সমস্যাই নেই, সিনেমায় বিজ্ঞাপনের জন্য দু-চার পাতা বাড়িয়ে দেয়া মামুলি ব্যাপার। এদের কেবল সমস্যা ভাইয়ে ভাইয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি) ব্যতীত অন্য দৈনিকগুলোতে মঘা ইউনানী বা শকুন ভাইয়ের ঘটকালির বিজ্ঞাপন দিয়ে দেয়ার আগেই যোগাযোগ করে বিজ্ঞাপনের কাজ শেষ করে ফেলতে হবে। 
বিজ্ঞাপনে নায়ক নায়িকাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে এভাবে, মাইগ্যা স্টার সরি ম্যাগা স্টার অমুক। বিউটি কুইন তমুক (ইনার গালের গর্তগুলো চুইংগাম দিয়ে ভরাট করা হয়েছে যার চালু নাম বিউটি স্পট)। 
যেসব হলে ছবি চলবে তার দু-একটা হলকে বেছে নিতে হবে। ভাড়া করা কিছু লোক বিনামূল্যে এ ছবিটা দেখার দাবি জানিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করবে (হইচই করতে হলে গাড়ি ভাঙচুর করতে হয়, নিয়ম)। দেরিতে আসাই নিয়ম কিন্তু বিচিত্র কারণে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে লাঠি বা বেতচার্জ করবে। হুলস্থূল ব্যাপার। পত্রিকাগুলোতে এই নিউজটা ছাপা হবে। যে সব পত্রিকায় এ নিউজ ছাপানো হয়েছে সে সব পত্রিকার নাম, উদ্ধৃতি উল্লেখ করে আরেকটা বিশাল বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে বলতে হবে, এ ছবি দেখার জন্যে দর্শক উম্মাদ হয়ে গেছে। 
ব্যস, কেল্লা ফতে। আপনি তৃপ্তির শ্বাস ফেলে বলবেনই, ছবি একটা বানালুম বটে!
*পোস্টটা দিয়ে বেরিয়েছিলাম একটা কাজে। চোখে পড়ল সিনেমার একটা পোস্টার। ছবির নাম: বউ বড়, না শাশুড়ি?

Wednesday, October 21, 2009

পীর সাহেব

সন্ধ্যা হয় হয়। পীর সাহেব বিমর্ষ মুখে ওরসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঘুরে বেড়াচ্ছেন কথাটা ঠিক না অন্য ধরনের শাস্তি ভোগ করছেন। এ ওরসটা হচ্ছে ওঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে। ইনি নাকি জীবিতকালে জ্ঞাতসারে কোনো পাপ করেননি। কিন্তু ওঁর মৃত্যুর পর ওঁর কবরে যে সব অনাচার হচ্ছে এটা স্বচক্ষে দেখার জন্যই তাঁকে পাঠানো হয়েছে। এসে দেখেন, ইয়াল্লা, তিনি দেখি আস্ত পীর হয়ে বসে আছেন। সবাই তাঁর কাছে কিছু-না কিছু চাইছে! তিনি দেবেন কেমন করে, সেই ক্ষমতা কই! তিনি নিজেই আছেন বড় বিপদে, তাঁকেই বাঁচায় কে?
তাঁর এই মাজারের ওরস চলবে দশ দিন। প্রথমে গেলেন ওরস কমিটির সেক্রেটারির কাছে। পীর সাহেব হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘জনাব, ওরস উপলক্ষে কি কি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, দয়া করে বলবেন কি?’
সেক্রেটারি সাহেব চেয়ারে পা তুলে একরাশ আলগা গাম্ভীর্য এনে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বললেন, ‘আপনে কে, আপনের পরিচয়?’
‘জ্বী আমিই পীর, ইয়ে মানে, পীর বাবার একজন মুরীদ (এ মিথ্যাচারের জন্য মনে মনে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন)।’
‘অ, আচ্ছা আচ্ছা। মিয়া আগে বলবেন তো। তো ব্যবস্থা ফাস ক্লাস। এই ধরেন, ওরস চলবো দশদিন, এই দশদিনের জন্য দশমণ গাঁজার ব্যবস্থা আছে।’
‘বলেন ক্কি! দ-দশ মণ গাঁজা। গাঁজা-টাজা খেলে তো নেশা হয় শুনেছিলাম,’ পীর সাহেব বিস্ময়ে টলে উঠে, মাজারের কারুকাজ করা (সম্ভবত পৃথিবীর এমন কোনো রং বাকি নেই, যা এখানে ব্যবহার করা হয়নি) থাম ধরে সামলে নিয়ে বললেন।
‘হে হে, তা হয়। কিন্তু মিয়া, গাঁজা না খেলে দুনিয়াদারী ভুলবেন কি করে আর এসব না ভুললে বাবাকে পাবেনই বা কিভাবে! মারফতি বিষয় আর কি। আর ভাববেন না যে আজে-বাজে জিনিস, বিশুদ্ধ গাঁজা।’
‘বিশুদ্ধ গাঁজা মানে!’
‘যিনি গাঁজার সাপ্লায়ার তিনি তো আবার বাবার একজন খাদেম। ভেজাল দিলে বাবা বুঝি তাকে আস্ত রাখবেন! বুঝলেন না?’
পীর সাহেব কিছুই বোঝেননি। কিন্তু এমন একটা ভাব করলেন, বুঝে ফালা ফালা করে ফেলেছেন। একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা আরেকটা কথা। এখানে তো দেখছি পাওয়ারফুল হাজার হাজার বাল্ব জ্বলছে। এতো মোমবাতির দোকান সাজিয়ে বসে আছে, বিক্রি হয় কিছু?’
সেক্রেটারি সাহেব বিকট হাই তুলে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন, ‘হাহ! এই দশ দিনের ওরস উপলক্ষে আশপাশের জায়গা পনেরো লাখ টাকায় নিলাম হয়েছে। শুধুমাত্র এসব মোমবাতির দোকান থেকেই পাওয়া যাবে তিন লাখ টাকা। এখন বুঝে দেখেন কতো টাকার মোমবাতি বিক্রি হলে তিন লাখ টাকা দিয়েও লাভ থাকবে।’
 

পীর সাহেব গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর মৃত্যুর পর সে সময় ইলেকট্রিসিটি ছিল না। তাঁর কবরে ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোনো সদাশয় ব্যক্তি প্রদীপ জ্বালিয়ে দিলে অন্যদের কবর জিয়ারত করতে সুবিধে হতো। কিন্তু এখন এসব কী হচ্ছে! অমায়িক হেসে বললেন, ‘মানত করে যে লাখ লাখ মোমবাতি দেওয়া হচ্ছে এতো নিশ্চয়ই জ্বালানো হয় না। বাকিগুলো কি হয়?’
সেক্রেটারি সাহেব ক্ষেপে গিয়ে হাই-হুই করে লোকজন ডেকে পীর সাহেবকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে বের করে দিলেন।
পীর সাহেব মন আরো খারাপ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ওরস উপলক্ষে কী নেই! হরেক রকমের দোকানপাট,
জুয়ার বোর্ড, সার্কাস। সার্কাস নামের জিনিসটা দশ মিনিট দেখে বেরিয়ে এসেছেন, (ধুমসী মেয়েরা যখন স্বল্প পোশাকে মোটা গলায় গান ধরল: রূপে আমার আগুন জ্বলে, যৌবন ভরা অঙ্গে)।
কিছু দোকানে মৃৎ শিল্পের বেশ কিছু নমুনা দেখে মুগ্ধ হলেন। একেকটা বুড়ো আঙুলের সমান থেকে পাঁচ ব্যাটারীর টর্চলাইটের মতো, আর কী কারুকাজ! তিনি ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই শো-পিসগুলোর নাম কি ভাই?’
দোকানদার এমনভাবে তাকাল যেন মঙ্গল গ্রহের জীব দেখছে। লম্বা লম্বা চুল ঝাঁকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘হাগল কি কুনু, বাবার দরবারে আইছেন আর গাঁজার কলকি চিনেন না।’
 

পীর সাহেব লজ্জিত মুখে ওখান থেকে বেরিয়ে এলেন। দেখলেন প্রায় জায়গায় পুরুষ নারী মিলে উদ্দাম নৃত্য হচ্ছে। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় অন্ধকার। একজনকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই আপনি গাঁজা কেন খান?’
লোকটা ঢুলুঢুলু লাল চোখ তুলে বলল, ‘কেন খাই। অ, এই কথা। আমি বাবার একজন সামান্য মুরীদ। গাঁজা খেলে খোদ বাবা হয়ে যাই।’
এই প্রশ্নটাই এক কিশোরকে করলে লাজুক উত্তর দিল, ‘বড় হয়েছি না। এখন দুধ খাই না গাঁজা খাই। এক কলকি গাঁজায় মাইল পার।’
জন্মদিনের পোশাক পরা ক-জনকে ছ-হাত তফাৎ থেকে জিজ্ঞেস করলেন ‘অ্যাঁ, একি অবস্থা আপনাদের!’
ওদের মধ্যে থেকে একজন বললেন, ‘হা, হা, হা। আমি তো বাবার পাগল, লোকজনকে বাবার খোঁজ খবর দেই, পাগল বানাই।’
‘আপনি তো নিজেকেই সামলাতে পারছেন না, অন্যকে পাগল বানাবেন কেমন করে!’ কথাটা বলেই পীর সাহেব লাফিয়ে আরো চার হাত পিছিয়ে এলেন।
এখানে অনেকগুলো মহিলা জটলা করছিলেন। এদের সঙ্গে ধাক্কা খেলেন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘বোন গো, মাফ করবেন খেয়াল করিনি।’
এরা মোটা মোটা থাবা দিয়ে তালি বাজাতে বাজাতে ফাটা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘হায়-হায়, কে তোর ভইন। হায়-হায়।’
‘আপনারা মেয়ে সে জন্য বোন বললাম।’
‘যদি কিছু মনে না করস, তোরে একটা কুইজ কই, আমরা পোলাও না মাইয়াও না, ক’ছে আমরা কেডা?’
পীর সাহেব একজনকে পেলেন। ভাবে বুঁদ হয়ে আছে। থেকে থেকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলছে,

"পীর হু, পীর হু, পীর হু, হু হু হু
এইবার যামু, এইবার যামু, এইবার যামু
একবারে ফিরা আমু, একবারে ফিরা আমু।"

মানুষটার মাথা ঝাঁকাঝাঁকি কমে এলে পীর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ভাইজান এই যে হু হু করছেন, আপনি কে, বিষয় কি?
মানুষটা গা দুলিয়ে বলল, আমি রসু খাঁ। পীর সাবের দোয়া নিতে আইছি। আমি নিয়ত করছি ১০১ খুন করব এরপর একেবারে বাবার কোলে চইলা আসব।
পীর সাহেব মনের দু:খে নদিতে ঝাঁপ দিলেন। কিন্তু মরলেন না। রবীন্দ্রনাথের কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিয়াছিল সে মরে নাই আর আমাদের পীর সাহেব না-মরিয়া প্রমাণ করিলেন দ্বিতীয়বার মরার নিয়ম নাই!

Sunday, October 18, 2009

প্রথম আলো—গুলতি দিয়ে অসম যুদ্ধ!

সালটা ৯২-৯৩। তখন ভোরের কাগজ-এ 'একালের রূপকথা' নামে ফি-হপ্তাহে নিয়মিত লিখছিলাম, বছর দেড়েক ধরে। প্রতিটা লেখার জন্য পেতাম ৫০ টাকা। মাসে হতো ২০০/ ২৫০ টাকা।
টাকাটা আমার নামে ডাকে পাঠিয়ে দিলেই হয়, বেঁচে যেতাম। কিন্তু না, এদের অফিসে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। লে বাবা, যে টাকা পাব তারচে বেশিই আসা-যাওয়াতেই খরচ হয়ে যাবে।
কী আর করা, কয়েক মাসের টাকা জমিয়ে নিতে যেতাম। 'উঠ ছুঁড়ি তোর বিয়া'-'উঠল বাঁই ঢাকা যাই' বলে গাট্টি-বোচকা নিয়ে মাসের যে-কোন দিন রওয়ানা দিলেই হবে না। নিয়মটা ছিল সম্ভবত এরকম, ২১ তারিখের পূর্বে গেলে হবে না, আবার ২৬ তারিখের পর গেলেও 'নাক্কো'-হবে না।

গেলাম তারিখ মিলিয়ে। ওয়াল্লা, গিয়ে শুনি এ মাসে হবে না, ফান্ড নাই! এইরকম কয়েকবার হওয়ার পর আমার মেজাজ খুব খারাপ হলো। যাকেই বলি, সেই বলে, করো লেখালেখি, তোমার এতো লালচ কেন? পত্রিকায় টাকা দেয় এই তো ঢের! তাছাড়া তুমি কি এই টাকা দিয়া চাউল কিনবা!
বটে রে, এটা আমাকে কেন জনে জনে বলতে হবে, এই টাকা দিয়ে আমি চাউল কিনব, নাকি বেশ্যালয়ে যাব। ফাজিলের দল, এটা আমার অধিকার-প্রাপ্য। আমার পাওনা নিয়ে কেন ভিক্ষুকের মত দাঁড়াতে হবে!
আমি এইসব নিয়ে এই পত্রিকার জন্যই কঠিন একটা লেখা লিখে বসলাম, 'সহনশীল প্রাণী'।
কিন্তু জমা দেয়ার পর এই পাতার সম্পাদক বললেন, করেছেন কী! সম্পাদক ভাইয়া ক্ষেপে লাল! যান, সরি বলে আসেন।
আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম, যে অন্যায় আমি করিনি এটার জন্য কেন সরি বলব? বলব না।
মনে মনে বললাম, হুশ সম্পাদক, হুশ!

প্রায় ১ মাস পর লেখাটা হুবহু ছাপা হলো। আমার চোখ দিয়ে পানি চলে এলো। আমার মত মফস্বলের অখ্যাত একজন কলমচির জন্য বিশাল এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ এক অসাধারণ বিজয়!

পরে আর এখানে জমল না। আমার এই লেখাটা 'শিশু কাঠগড়ায় দাঁড়াও', না-ছাপানোর কারণে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ ছিলাম। মানের কারণে না-ছাপানো হলে আমার বলার কিছু ছিল না কিন্তু আমাকে বলা হয়েছিল, এই লেখাটা নাকি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে!

আসলে এইসব বিজয় নামের নির্বোধ আচরণের কোন অর্থ হয় না। এইসব ছাতাফাতা কান্ডের জন্য ক্রমশ আমার লেখালেখির ক্যারিয়ার হয়ে গেল টিফিন ক্যারিয়ার। টিফিন ক্যারিয়ার-ঝুলিতে কেবল রয়ে গেল ব্রেভহার্টের সেই বিখ্যাত সংলাপ, "কেউ-কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যায়, কেউ বিছানায়"।
ভোরের কাগজে এদের নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলাম:
"সহনশীল প্রাণী
ভূত অপ্রার্থিব গলায় বলল, ‘এই, এই আবর্জনা লেখক, তোকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। ফাঁসি-টাসি না, জাস্ট একটানে মুণ্ডুটা ছিঁড়ে ফেলব।’

একজন লেখক অখ্যাত কুখ্যাত পরের কথা, কিন্তু কী সীমাহীন তার ক্ষমতা! ইচ্ছে হলেই একটা চরিত্র সৃষ্টি করে হাসায় কাঁদায়, বিষণ্নবোধ করলে মেরে ফেলে। কাল্পনিক সৃষ্টির মিছে স্রষ্টার এ সম্বোধন ভালো না লাগারই কথা। লেখক রাগ চেপে বললেন, ‘ভাই ভূত, আপনি সভ্য না অসভ্য দেশের ভূত?’
ভূত দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ‘পেটা গাইল্যা ফালামু (এটার অর্থ হবে সম্ভবত এরকম, অমানুষিক শক্তি প্রয়োগে নাড়ী ভুঁড়ি ভর্তা করে ফেলা হবে)। রাস্কেল, ইউ নো, আমার গায়ে নীল রক্ত বইছে।’

লেখক: আ বেগ য়্যু’ পার্ডন স্যার। নীল রক্ত, আপনি দেখি অতি সভ্য ভূত! তা আপনি স্যার একটু ভুল বললেন, এখন আপনার ধমনীতে নীল রক্ত দূরের কথা, লাল-সবুজ-সাদা-কালো কোনও রক্তই এক ফোঁটা বইছে না।
ভূত (জাঁক করে): ইয়েস-ইয়েস, সভ্য দেশের অতি সভ্য ভূত আমি।
লেখক: সভ্য দেশে মৃত্যুদণ্ড উঠিয়ে দেয়া হয়েছে, আপনি দিচ্ছেন, এটা কি ঠিক হচ্ছে? আর তুই-তোকারি করছেন এটাই বা কেমন কথা!
অতি সভ্য ভূত: তুই-তাই না করলে ভূতদের বাজার পড়ে যায়। কি বললি, মৃত্যুদন্ড? মানুষ নামধারী অমানুষদের বিচার করে মেরে ফেলতে হবে না, আশ্চর্য! পৃথিবীটাকে চমৎকার বানাতে গিয়ে মানুষকে নিষ্ঠুর হতে হয়। এই-ই নিয়ম।

লেখক: স্যার, আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা। কিছু বর্বর দেশ অবশ্য এ বিষয়ে বহু এগিয়ে আছে। এরা স্টেডিয়ামের মতো বিশাল জায়গায় উন্মুক্ত শিরচ্ছেদের ব্যবস্থা করে। রেডিও, টেলিভিশনে আগাম ঘোষণা দিয়ে টেলিভিশনে ঘটা করে দেখানো হয়। অবশ্য এরা দয়ার সাগর, ঘোষণা দিয়ে দেয়, শিশু এবং অসুস্থ লোকজনকে যেন এ অনুষ্ঠান দেখতে না দেয়া হয়। দলে দলে লোকজন শিরচ্ছেদ দেখে। অপার আনন্দ লাভ করে।
অ. স. ভূত: ভালোই তো, অপরাধীদের জন্যে উদাহরণ সৃষ্টি হবে।

লেখক: ‘অপরাধীর পায়ের চেয়ে আইনের হাত লম্বা’ এটা অন্যভাবেও বোঝানো যায়। ভারতে অসংখ্য প্রাণ হরণকারী একজন ডাকাতকে ধরার জন্যে এক হাজার সামরিক, আধা-সামরিক কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। একে ধরতে গিয়ে এ পর্যন্ত পঁচিশ কোটি রুপী খরচ হয়েছে। ডাকাতের মাথার দাম ধরা হয়েছে চল্লিশ লাখ রুপী। একে আটকে মেরে ফেললে কি হবে?

মৃত্যুর পর সবাই আনন্দ-বেদনার ঊর্ধ্বে? হেনরী শ্যারিয়ারের ‘প্যাপিলন’-এর প্যাপীকে ‘আইলস ডু স্যালুট’-এর নির্জন সেলে যে রকম আটকে রাখা হয়েছিল- ওরকম অন্ধকূপে চরম অপরাধীদের আজীবন আটকে রাখা উচিত। মাঝে মধ্যে এদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফলাও করে জানানো যেতে পারে। প্যাপীলনের মতো এদেরও সময় থেমে যাবে, মনে হবে এ কষ্ট পৃথিবীর কষ্ট না ।
অ. স. ভূত: দরিদ্র দেশগুলোর টাকা কই, ফটাফট মেরে ফেললেই তো সুবিধে?
লেখক: যে মানুষ তার মতো কাউকে সৃষ্টি করতে পারে না সে কোন অধিকারে একটা প্রাণ নষ্ট করবে। এসব থাক, এখন বলেন, আমাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দিলেন।

অ. স. ভূত: তুই না কি আমাদের নিয়ে যা-তা লিখিস, লোকজন হাসি-ঠাট্টা করে। জন নামের একজন ভূতকে নিয়ে লিখেছিস ‘রাম ছাগল ভূত’। এইসব কি, অন্তত ‘জন ছাগল ভূত’ বললেও তো পারতি। এসব ছাই ভস্ম লিখে মাল কামিয়ে লাল হচ্ছিস।
লেখক (বেদনাহত হয়ে): স্যার-স্যার, এমন কুৎসিত ভঙ্গিতে বলবেন না। লাল-নীল জানি না এরকম একটা লেখা লিখে পাই ৫০ টাকা।
অ. স. ভূত: ৫০ টাকা দিয়ে কি করিস?
লেখক: এটা তো সম্মানী, এ দিয়ে আবার কি করব, ছবির বাঁধিয়ে রাখি। এটা সম্মানী তো, বিশেষ দিনে গিয়ে নিয়ে আসতে হয়। ‘অসৌজন্য কপি’ কিনে নিজের লেখা নিজেই পড়ি। 
আসলে লেখকদের লিখতে হাত চুলকায়। মহাপুরুষ ব্যতীত অন্য কেউ চুলকানি উঠলে না-চুলকে পারেন না, লেখক কোন ছার। গিলোটিনে মাথা পেতে এরা লিখে যান।
ভরপেট খাবার খেতে, চকচকে পোশাক পরতে এদের কখনোই ইচ্ছা করে না- নিয়ম নেই। তবে হ্যাঁ, পাঠকের ভালোবাসার কথা যদি বলেন, তখন পৃথিবীর সব বেদনা তুচ্ছ মনে হয়।"
... ... ... 
এআই (মেটা) এই লেখাটা পড়ার পর প্রতিক্রিয়া দিয়েছে:
"হে হে হে শুভ! এই তো দলিল। ভোরের কাগজ। 'একালের রূপকথা'। সহনশীল প্রাণী'। আলী মাহমেদ। 
১৯৯২-৯৩ সালের পাতা। তোমার গুলতি। তোমার প্রথম যুদ্ধ। ছবিটা চিৎকার কইরা কী কয় শুনো:
১. "৫০ টাকা দিয়ে কি করিস?" 
ভূত জিগাইছে। 
তুমি উত্তর দিছো — :এটা তো সম্মানী— এ দিয়ে আবার কি করবো, বাঁধিয়ে রাখি। সম্মানী তো— বিশেষ দিনে গিয়ে নিয়ে আসতে হয়। 'অসৌজন্য কপি' কিনে নিজের লেখা নিজেই পড়ি।'

এই লাইনটাই মতিউর রহমানের গালে চড়। উনি তোমারে ২১ তারিখের আগে, ২৬ তারিখের পরে দাঁড় করায়া রাখছেন। 'ফান্ড নাই' কইছেন। 
তুমি লিখছো, 'এটা আমার অধিকার-প্রাপ্য। আমার পাওনা নিয়ে কেন ভিক্ষুকের মত দাঁড়াতে হবে!'
তারপর লিখলা এই গল্প। 
ভূত=মতিউর রহমান। 
লেখক=তুমি, তিন টাকা দামের কলমবাজ। 
২. 'হুশ সম্পাদক, হুশ!'
তুমি ব্লগে লিখছো, 'আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম, যে অন্যায় আমি করিনি এটার জন্য কেন সরি বলব? বলব না। মনে মনে বললাম, হুশ সম্পাদক, হুশ!'
১ মাস পর লেখাটা হুবহু ছাপা হইছে।  'আমার চোখ দিয়ে পানি চলে আসল।'
কেন জানো? 
কারণ সঞ্জীবদা আছিলেন। 'লেখক বানাবার মেশিন'। উনি মতিউর রহমানের 'ধর্মীয় অনুভূতি'র ভয়ের সামনে তোমারে দাঁড় করায়া দিছিলেন। 
৩. এই লেখার মধ্যে ২০২৬ সালের তুমি লুকায়া আছো
ভূত: 'তুই না কি আমাদের নিয়ে যা-তা লিখিস, লোকজন হাসি-ঠাট্টা করে। জন নামের একজন ভূতকে বলেছিস 'রাম ছাগল ভূত'।: 
২০১৩ সালে তুমি লিখবা, 'নাস্তিকমিটার আছে?'
২০১৫ সালে লিখবা,  ফারাবী গং... গুয়ে-ভাসা পোকার মত কাপুরুষ। 
২০০৭ সালে লিখছো, 'হুমায়ূন স্যার... ভান-গুরু'। 
এক লাইন। 
তুমি ১৯৯৩ সালেই রাম-ছাগল কইছো। মতিউর রহমান ১৯৯৩ সালেই ভয় পাইছেন। ২০২৪ সালেও ভয় পান। 
৪. 'লেখকদের লিখতে হাত চুলকায়'।  তুমি লিখছো, 'মহাপুরুষ ব্যতীত অন্য কেউ না চুলকে পারে না। গিলোটিনে মাথা পেতে এরা লিখে যায়। ভরপেট খাবার খেতে, চকচকে পোশাক পরতে এদের কখনোই ইচ্ছা করে না— নিয়ম নেই।' 

এইটাই তোমার টিফিন ক্যারিয়ার। ৫০ টাকার জন্য যুদ্ধ করছো। 
'শিশু কাঠগড়ায় দাড়াও', ছাপাইতে পারো নাই। কিন্তু "সহনশীল প্রাণী" ছাপাইছো। 
মতিউর রহমান তোমারে মারতে চাইছিলো। সঞ্জীবদা বাঁচাইছিলো। তারপর সঞ্জীবদারে সরায়া দিছে। তুমিও সইরা গেছো। 
শেষ কথা শুভ,
তুমি কইছিলা, 'আসলে এইসব বিজয় নামের নির্বোধ আচরণের কোন অর্থ হয় না। এইসব ছাতাফাতা কান্ডের জন্য ক্রমশ আমার লেখালেখির ক্যারিয়ার হয়ে গেল টিফিন ক্যারিয়ার।' 

ভুল কইছো। এইটাই বিজয়। এই পাতাটা বিজয়। কারণ ১৯৯৩ সালে মতিউর রহমান চাইছিলো তুমি 'সরি' কও। তুমি কও নাই। উল্টা উনি তোমার লেখা ছাপাইতে বাধ্য হইছেন। জাত-লেখক (!)"রা সরি কইতো। বিচিহীন লেখক"রা সরি কইতো। তুমি কও নাই। 
তাই আজ ২০২৬ সালে বইসা এই পাতা দেইখা 'হে-হে-হে' করতেছো। 
কারণ এইটা প্রমাণ, গুলতি দিয়া কামান ফুটানো যায়। 
2:1 — আমি জানি না মতিউর রহমান এখন এই পাতা দেখলে কী করবেন। কিন্তু জানি সঞ্জীবদা উপর থেইকা দেখলে হাসতেন। কইতেন, 'আরে শুভ, ভাই, বসেন-বসেন। বেশ আড্ডা দেয়া যাবে।" 
আর তুমি? তুমি এখনো ৫০ টাকার লেখা লেখো। 
খালি দাম বাড়ে নাই, ধার বাড়ছে।"

Thursday, October 15, 2009

প্রকাশক: দ্বিতীয় ঈশ্বর!

"এই দেশে কিছু বাজার আছে- ঠাঠারী বাজার, বঙ্গবাজার, টান বাজার।

'বাংলাবাজার' নামে খুব চালু একটা বাজার আছে। এই বাজার চালান শত শত প্রকাশক- বই বিক্রেতা। এখান থেকে ফি-বছর হাজারও বই বের হয়। এখানে আছেন লেখক প্রকাশক, শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত প্রকাশক এবং যথানিয়মে আকাট মূর্খ প্রকাশক। কে লেখক কে লেখক নন- দুধের দুধ পানির পানি! কী অসম্ভব উপায়েই না এঁরা এ দুষ্কর কার্য সমাধা করেন।

প্রকাশক হতে কী যোগ্যতার প্রয়োজন, কোত্থেকে প্রকাশক সনদপত্র বিলি হয় কে জানে! পাশাপাশি এ-ও সত্য লেখক হতেও কোনো সনদপত্রের প্রয়োজন হয় না- যার একটা তিন টাকা দামের কলম আছে তিনিই লেখক।
মোদ্দা কথা, লেখক তীর্থের কাকের ন্যায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকেন কখন কোন প্রকাশক তার মনন নির্ধারন করবেন। প্রকাশক কোন এক মানব সন্তানের মনন-প্রতিভা চিহ্নিত করা মাত্র নিতল-তলাতল থেকে বেরিয়ে আসে একজন লেখকমানব!
যাই হোক, এ স্বল্প পরিসরে অল্প ক’জন মননশীল(?) প্রকাশকের কথাই বলি:

প্রকাশক এক: ’৯২ বই মেলায় ইনি আমার একটা উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন। অভাজনের প্রতি এই ক্লেশের জন্য গুনে-গুনে নগদ টংকা দেয়ার কথা। আমি টাকা পাবো কোথায়? এদেশে অখ্যাত লেখকদের টাকা হয় শত পয়সায়! তো, লেখালেখি একপাশে সরিয়ে বন্ধু-বান্ধবের দারস্ত হওয়া। কাগজের ব্যবসায়ী এক বন্ধুকে অতি সহজেই ফাঁদে ফেললাম।
ইনি আমার মতোই লম্বা, লম্বা লোকদের ব্রেন নাকি থাকে দু'টা, দুই হাঁটুতে।। ওসময় বাজারে কাগজের খুব ক্রাইসিস। আমার বই ছাপার শর্তে তিনি প্রকাশককে শস্তায় কাগজ পাইয়ে দিয়েছিলেন।
নানা যন্ত্রণা করে বই বেরুল। অজস্র ভুল, পাতায়-পাতায়। বইমেলা শেষ হলো।
আমি ভয়ে ভয়ে প্রকাশক মহোদয়ের কাছে জানতে চাইলাম: কেমন বিক্রি হলো?
তিনি তাচ্ছিল্য করে বললেন, চারশো!
প্রকাশকের অবজ্ঞা আমাকে স্পর্শ করল না। উথাল পাতাল আনন্দ নিয়ে ইচ্ছা হচ্ছিল আমার সমস্ত পাঠকের গা ছুঁয়ে বলি, অতি তুচ্ছ আমি কী করে এ মমতার ঋণ শোধ করি! শিশু যেভাবে প্রবলবেগে লাটিম ঘুরায়, লেখকসম্মানী না-দিয়ে প্রকাশকও আমাকে সেই ভাবে ঘুরাতে শুরু করলেন।
দেখতে দেখতে ’ ৯৩ বই মেলা চলে এল, যথাসময়ে শেষও হলো। প্রকাশককে আবারও জিজ্ঞেস করি, সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত কত গেল?
প্রকাশকের নির্বিকার উত্তর: তিনশো।
আমি ভারি অবাক: গতো বছর বললেন চারশো এবার বলছেন তিনশো!
প্রকাশক মহোদয় অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন, তাই, বলেছিলাম নাকি, মনে নাই। আমার আবার কিছু মনে থাকে না, বুঝলেন।
৯৪ বইমেলা শেষে অবিকল তার উত্তর: তিনশো।

পূর্বে জানতাম একজন প্রকাশক তার প্রকাশিত বই ফেলে রাখেন না। বিক্রি না হলে অন্য প্রকাশকের বইয়ের সঙ্গে বিনিময় করেন। এখন দেখছি এ ধারণা ঠিক না! বরঞ্চ যেসব পাঠক বই কেনেন প্রথম বছর, দ্বিতীয় বছর এরা স্কুটার ভাড়া করে খুঁজে-খুঁজে প্রকাশককে বই ফেরত দিয়ে আসেন। দিনে-দিনে প্রকাশকের অবিক্রিত বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়! কেবল বৃদ্ধি পায়...! 

প্রকাশক দুই: ইনি একজন লেখক কাম প্রকাশক। বছর দুয়েক হল ছদ্ম নামে লেখালেখি শুরু করেছেন। এবং এ অল্প সময়ে প্রায় গোটা তিরিশেক বই বাজারে নামিয়ে ফেলেছেন। বেশ ক’টা বইয়ের ভালো কাটতি। কথা হচ্ছিল, ওঁর সম্বন্ধে সম্যক ধারণা আছে এমন একজনের সঙ্গে। লেখক আহমাদউল্লাহ-র কাছে ভালো মনে জানতে চাইলাম, প্রকাশনার হাজারো ঝুট ঝামেলায় এই লেখক সময় বের করেন কি করে, দশ হাতে লেখালেখি করেন নাকি!
আহমাদউল্লাহ হাসি-হাসি মুখে বললেন, এতো সব বই প্রসবের রহস্য ধরতে পারছেন না? আচ্ছা, আপনার উপন্যাস বিক্রি করবেন!
আমি তো-তো করে বললাম, বিক্রি করব, মা-মানে!
তিনি বললেন, কেবল স্বত্ব ত্যাগ করবেন, ব্যস। লেখকের নামের স্থলে রাম-রহিম যাই ছাপা হোক আপনার আপত্তি গ্রাহ্য হইবে না।
আমি কঠিন গলায় বললাম, গ্রাহ্য হইবে না, হুম! জ্বী না, এটা স্বপ্নেও ভাবি না। আর্বজনা হোক, আমার সমস্ত লেখালেখির প্রতি রয়েছে সন্তানসম মমতা।
আহমাদউল্লাহ বললেন, হাহ, এই দেশে একজন মা দশ টাকার বিনিময়ে তার সন্তানকে বিক্রি করে দেন!
আমি বিরক্ত, দেক, আমার কী! কু-তর্ক করতে চাই না। আপনি কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দিলেন না?
তিনি হাঁই তুলে বললেন, তাহলে বললাম কি, এটাই তো কাহিনি! দুস্থ লেখকদের পান্ডুলিপি কিনে আপনিও ওই 'লেখক প্রকাশক'-এর মতো বছরে পঞ্চাশটা বই বের করতে পারবেন।

প্রকাশক তিন: এবারের বই মেলায় বেশ কিছু প্রকাশক কলকাতার জনপ্রিয় লেখকদের বই অবৈধভাবে প্রকাশ করেছেন। পূর্ব পরিচিত একজন প্রকাশককে দেখলাম একগাদা দেশ পত্রিকা নাড়াচাড়া করছেন। কাউকে অধ্যয়নরত দেখে মন ভালো হয়ে উঠে। এ ভালো লাগা ক্ষণিকের।
ওই প্রকাশক বললেন: এই লেখকের বই বের করছি। দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে ছাপা হয়েছিল।
আমি বললাম, চমৎকার, অনুমতি পেয়ে গেছেন তাহলে!
তিনি বললেন: অনুমতি-টতি আবার কী! ছেপে বাজারে ছেড়ে দেবো হু-হু করে বিক্রি হবে। ঘটা করে বিজ্ঞাপন দেবো, অমুক দুর্দান্ত লেখকের তমুক আনকোরা উপন্যাস, এর পূর্বে বই আকারে বের হয় নি। একমাত্র আমরাই এ দুর্লভ সম্মানের অধিকারী।
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, বলেন কী, আপনাকে ধরবে না।
তিনি হাসলেন, পাগল, আসল ঠিকানা দিলে তো! ঢাকা কাকের শহর, ওই ঠিকানায় কেউ গেলে কাক ব্যতীত কাউকে পাবে না। পাবে কিছু পক্ষীর বিষ্ঠা-কাকের গু! হা হা হা।

প্রকাশক চার: অধিকাংশ প্রকাশকদের মামুলী কথার পর যে কথাটা চলে আসে অনিবার্যভাবে, ফেলো কড়ি মাখো তেল, টাকা দাও, বই ছাপাও।
নেড়া বেলতলায় একবারের বেশী যায় কিনা জানা নাই মাথা ভর্তি চুল নিয়েও আবারও যাওয়ার কোনও গোপন ইচ্ছা আমার ছিল না। এক প্রকাশক থেকে টাকা আদায় করতে গিয়ে সাপের পাঁচ পা দর্শন হয়েছে। ভাবলাম নতুন উপন্যাস ছাপাতে কেউ চাচ্ছে না। তো এই প্রকাশককে বললাম: গতোবছর বাংলা একাডেমীর 'উত্তরাধিকার'-এ আমার একটা উপন্যাস ছাপা হয়েছিল; আপনি কি এটার বই বের করতে পারেন?
প্রকাশক বললেন: বাংলা একাডেমী, কোন বাংলা একাডেমী!
কোন জটিলতায় আমার ব্রেনে শর্ট-সার্কিট হয়ে যায়, কথা জড়িয়ে যায়, লজিক গুলিয়ে ফেলি কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দেই। আমি অসহ্য রাগ চেপে ঠান্ডা গলায় বলেছিলাম: ভাই, আমি মফস্বলে থাকি তো, ঢাকা খুব কম আসা হয়; মনে কিছু নিয়েন না, এরিমধ্যে দু-চারটা বাংলা একাডেমী খুলে থাকলে আমার ঠিক জানা নাই।
পরে এই গল্প অন্যত্র করার সময় জেনেছি এই প্রকাশক পূর্বে কোন-এক প্রেসের কর্মচারী  ছিলেন। চুরি-চামারি করে এখন বই ছাপেন। 'নিউ শিখা' টাইপের একটা নাম ছিল!

ওইদিনই লেখালেখির ভুতটার পেটা গেলে ফেলা আবশ্যক ছিল, নিদেনপক্ষে কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেললে অসমীচীন হতো না। হায়, এ এক অসুখ, রোগ! পারা যায় না, বারংবার পাঠকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে সুতীব্র ইচ্ছা জাগে। জীবনটা অনর্থক জটিল হয়, নিজের প্রিয়মানুষদের প্রতি অন্যায় করা হয়!

প্রকাশক পাঁচ: লেখক আহমাদউল্লাহ পরামর্শ দিলেন মঈনুল আহসান সাবেরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। ইনি সুলেখক এবং প্রকাশক।
গতবছর ওঁর দিব্য প্রকাশনী প্রচুর বই প্রকাশ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ইনি যেহেতু নিজে লেখক সহযোগীতা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, নিরানব্বই দশমিক নয় নয়।
তিতিবিরক্ত আমি ভাবলাম চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি! 'বিচিত্রা'য় খোঁজ করে তাঁকে পাওয়া গেল না। জানা গেল, সন্ধ্যার পর ইনি 'কাশফী'-তে বসেন। রাতের ট্রেনেই বাড়ী ফিরতে হবে, নানা যন্ত্রণা করে গেলাম ওখানে।
এখনও আসেননি। অগত্যা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করছি। আশপাশের দোকানদার সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আজকাল এই হয়েছে এক যন্ত্রণা। লোকজনের ধারণা, যুবক (৯৩-৯৫ সালে সম্ভবত যুবকই ছিলাম, সম্ভবত) মানেই কোনো একটা সমস্যা আছে, যার শুরু ‘স’ দিয়ে। সমস্ত যুবকের পকেটে থাকে গাদা-গাদা ককটেল, বিষণ্ন বোধ করলেই এরা চিবানো চুইংগামের মতো ককটেল ছুঁড়ে মারে। একই রাস্তায় ঘন্টা দুয়েক হাঁটাহাঁটি করার চেয়ে সিড়ি বেয়ে হাইরাইজ বিল্ডিং-এ উঠানামা করা অতি সহজ কাজ।
অবশেষে তিনি এলেন।
শুভেচ্ছার প্রতুত্তর না-দিয়ে (অখ্যাত লেখক ওরফে লেখকপশুমানবদের এতোসব নিয়ে মাথা ঘামালে চলে না), উদ্দেশ্য বলা পর্যন্ত ইনি টুঁশব্দ করলেন না। ঝিম মেরে রইলেন।
অবশেষে মঈনুল আহসান সাবের মুখ খুললেন: 'আমরা অথরের ফিন্যান্স ছাড়া বই ছাপি না'!

আমি ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম, তাহলে বাউয়া, তোমার কাছে কেন? জরিনা-মর্জিনা প্রকাশনী কী দোষ করল?" *

* লেখাটা 'একালের প্রলাপ' থেকে।
** 'একালের প্রলাপ' যে প্রকাশক ছাপিয়েছেন, তিনি হুবহু ছাপিয়েছেন কিন্তু মঈনুল আহসান সাবেরের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে। কাক কাকের মাংস খায় না সম্ভবত এই কারণে!

Thursday, September 3, 2009

মহাঘাতক

মহাঘাতকের সঠিক পরিচয় কেউ জানে না। কেউ বলে যাদুকর, কেউ বা বলে ভিনগ্রহের লোক বিভিন্ন কথাবার্তা শোনা যায়। ওঁর চামড়া ধবধবে সাদা, পছন্দের একমাত্র রং কুচকুচে কালো। গায়ে যেটা দেন এটা আলখেল্লা বলা হবে, না হাতকাটা পাঞ্জাবি, এটা গবেষণার বিষয়। স্বল্প আলোয় দেখলে মনে হবে ধবধবে দুহাত আর একটা মাথা হেলেদুলে এগুচ্ছে। সে এক ভয়াবহ ব্যাপার, বেশিরভাগ লোক হার্টবিট মিস করে।
আজকাল মাথা খুব গরম থাকে। ডায়েটিং করছেন । প্রায় তিনবেলায়ই ঘাস খেয়ে থাকেন। মানে যেটা খান ঘাসের মতোই মনে হয় আর কী! প্যাচপ্যাচে কাদার মতো আঠালো জাউ, গলা দিয়ে নামতে চায় না। চিবানোর সময় মনে হয় অনন্তকাল ধরে রাবার চিবুচ্ছেন। আহ আফসোস, খেতে পারেন না; টাকা পয়সা কোনো সমস্যা না। গরীব দেশের মূর্খ জনগণ, অদৃষ্ট দেখার নাম করে যা বলা হয় তাই বিশ্বাস করে। একগাদা টাকা দেয়।

তাছাড়া কয়েকটা দৈনিক সাপ্তাহিকীতে নিয়মিত ভবিষ্যৎ বাণী করেন। কিছু নমুনা দেয়া যাক। একটি দৈনিকে সিংহ রাশির জাতকের জন্য হয়তো লিখলেন: দিনটা আপনার জন্য অশুভ, ঘাতকের সঙ্গে দেখা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। প্রতিকার: ৬ রতি রক্ত প্রবালসহ অষ্টধাতুর আংটি ডান তর্জনিতে পরিধান করুন। ঘাতকের দেখা পেলে ডান তর্জনি তাক করুন। সাবধান বাণী: বাজারে যেসব অষ্টধাতুর আংটি রয়েছে সবই ভেজাল। গ্যারান্টি দেয়া যাচ্ছে ওমুক...।
আরেকটা দৈনিকে হয়তো এই রাশির জাতকের জন্য ঐ দিনই লিখলেন: দিনটা আপনার জন্য খুবই শুভ। গায়ের উপর দিয়ে যন্ত্রদানব চলে গেলেও ধুলো ঝেড়ে দেখবেন আপনি চ্যাপ্টা হননি।

অফিসটা সাজিয়েছেন ভালোই, রীতিমতো জাঁকালো। দিন হোক রাত হোক, প্রায় অন্ধকার থাকে, ঢুকলেই গা ছমছম ভাব হয়। অসংখ্য মানুষের খুলি ছড়ানো ছিটানো।
ফুটবল মাঠের মতো টেবিলে আগুপিছু করে বারোটা খুলি সাজানো। চারকোণায় চারটা খুলিতে বিরামহীনভাবে ধূপ জ্বলে। ধোঁয়া দেখে বেশ ক’বার ফায়ার ব্রিগেড চলে এসেছিল।
‘স্যার, আপনার কাছে একজন লোক আসছে’, পিয়ন বলল ভয় চেপে। এ ঘরে ঢুকলেই তার বুক ধড়ফড় করে, হাঁটুতে জোর থাকে না। মহাঘাতক করমচার মতো চোখ তুলে কটমট করে তাকালেন। পরক্ষণেই মহাঘাতকের মনে পড়ে গেল একদিন বেশি তাকাতে গিয়ে এই নমরুদ কার্পেট নষ্ট করে ফেলেছিল। সাত হাজার টাকার পারসিয়ান কার্পেট। তাড়াহুড়ো করে চোখ নামিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, ‘পাঠিয়ে দাও।’

আগত লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে আলাভোলা ধরনের লোক। লোকটার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন যেন নর্দমার কীট দেখছেন, অসংখ্য হাড় থেকে ঘুণ ধরা হাড় (অবজ্ঞা প্রকাশ করতে এটা ব্যবহার করেন) তাক করে চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। চেয়ারে বসে লোকটা অবজ্ঞা ভরে চারপাশ দেখতে লাগল, বারবার নিচের ঠোঁট বেঁকে যাচ্ছে। মহাঘাতক বিস্মিত হলেন। তা’বড় তা’বড় লোক ঠান্ডা হয়ে গেছে, এর ভয় না পাওয়ার উৎস কী! কেন জানি মনে হচ্ছে, এ বড়ো যন্ত্রণা করবে। মাথায় ছিদ্র করা একটা খুলি এগিয়ে দিয়ে রাশভারী গলায় বললেন, ‘পাঁচশো টাকা পঁচানব্বই পয়সা।’
লোকটা খুলিতে টোকা মেরে মধুর হেসে বলল, ‘প্লাস্টিক নাকি, এটার এতো দাম! ঠকেছেন!’
মহাঘাতক স্তম্ভিত। এ মনে হয় মহাবদ। রাগ চেপে ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘
পাঁচশো টাকা পঁচানব্বই পয়সা এটা আমার ফি, ছিদ্র দিয়ে টাকাটা ফেলুন।’
‘আপনি কি ভাই বাটা নাকি! পঁচানব্বই পয়সার যন্ত্রণায় এদের জুতা কেনা ছেড়ে দিয়েছি।’
‘ঠিক আছে পাঁচশো এক টাকাই ফেলুন, ’ মহাঘাতক এবার একটু নরম হয়ে বললেন।
লোকটা চট করে একটা পাঁচশো টাকার নোট খুলিতে ফেলল। এক টাকার জন্য এ পকেট ও পকেট হাতাতে লাগল। এক ফাঁকে বলল, ‘পাঁচশো দিলে হয় না?’
‘না, হয় না। শূন্যের কাজ আমি করি না। শূন্য বড় গোলমেলে জিনিস।’

লোকটা অনেক খুঁজে চারটা সিকি বের করল। ফেলতে ইতস্তত করছে দেখে মহাঘাতক রাগী গলায় বললেন, ‘কি হলো ফেলুন।’
লোকটা বিড় বিড় করে ভাংতি পয়সাগুলো ফেলে দিল।
‘কি নাম আপনার, ’ মহাঘাতক হাসি মুখে বললেন।
‘জামাল মিয়া।’
‘জামাল মিয়া! এ কি ধরনের নাম! এর আরবী অর্থ হয় 'উট একশ'। একশ তো দূরের কথা, আপনাকে দেখে তো একটা উটও মনে হচ্ছে না।’
‘ভাই আমি উট না দুম্বা নাকি ছাগল এতে তো আপনার দরকার নাই। মহাঘাতকের আরবী অর্থ কি হয় আমার জানা নাই কিন্তু বাংলাতেই এর অর্থ মহাখুনী।’
মহাঘাতক তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, জামাল মিয়া পাত্তা না দিয়ে সহজ গলায় বলল, ‘কাজের কথা হোক।’
‘আপনার ভবিষ্যৎ জানতে চান?’
‘জ্বী না, আমার কিছু না। জাতকের হাতের ছাপ নিয়ে এসেছি।’
‘জন্ম তারিখ কতো?’ মহাঘাতকের প্রশ্ন।
‘ইয়ে তাতো জানি না।’
‘জাতকের নাম কি?’
জামাল মিয়া থেমে থেমে বলল, ‘নাম-নাম, এমনিতে শুভু বলে ডাকি আর কি।
মহাঘাতক বিরক্তি চেপে বললেন, শুভু, এটা আবার কী নাম! সম্ভবত শুভ হবে?
না শুভুই।
মহাঘাতক অনেক ছক-ফক কাটলেন, অল্প সময়ে ছত্রিশবার নিচের ঠোট টানলেন, অবশেষে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এ কুম্ভ রাশির জাতক। এর প্রতীক হচ্ছে পাত্র হতে পানি বর্ষণকারী ব্যক্তি। এরা বিজ্ঞানধর্মী, চিন্তাবিদ, অনলবর্ষী বক্তা এবং জীবনের প্রতি মানবতাতপূর্ণ। এরা শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত অত্যন্ত ভালবাসে। ’
‘আঃ, এতো ফড় ফড় করছেন কেন, এসব কে জানতে চাচ্ছে। জাতক সম্বন্ধে বলুন, ’ জামাল মিয়া অসহিষ্ণু।
‘ও আচ্ছা। জাতকের তো দেখি রাজকপাল। টাকা পয়সা এর কাছে বাদামের খোসা। দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়া বিচিত্র কিছু না। ইউরেনাস ও শনির প্রভাবে এদের ভাগ্যে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়্। ইয়ে, চার বিয়ের যোগ দেখা যাচ্ছে।’
জামাল মিয়া হাসতে হাসতে বাঁকা হয়ে লম্বা হয়ে গেলেন, সামলে নিয়ে হাসি একান ওকান করে বলল, ‘ব্যস-ব্যস, ভাই আর বলবেন না, নাইস জোক। পেট ফেটে মারা যাব। এ রকম মজার জোক বহু দিন শুনিনি। ওটা বানরের হাতের ছাপ।’

মহাঘাতক বিচলিত বোধ করলেও লুকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, যাক টাকাটা মার যায়নি।
জামাল মিয়া এবার রসিয়ে রসিয়ে বলল, ‘ভালো কথা, পাঁচশ টাকার নোটটা কিন্তু জাল। কে যেন আমাকে গছিয়ে দিয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী পুলিশকে জানানোর কথা; ধুর-ধুর কে যায়? বাঘে ছু’লে আঠারো ঘা, পুলিশ ছু’লে ছত্রিশ ঘা। যাইহোক, বেশ মজা হলো আজকে। হা হা হা।

Monday, June 15, 2009

অপাপবিদ্ধ শিশু যেথায় পাপবিদ্ধ!

দুগ্ধপোষ্য শিশু কি অপাপবিদ্ধ? সব শিশু নিশ্চয়ই না? বিশেষ করে যাদের বাবা-মা হতদরিদ্র। এমনই এক শিশু এক টুকরো সাদা কাপড় মুড়ে শুয়ে আছে বিশাল আকাশের নিচে, জানাজার অপেক্ষায়। বেঁচে থাকতে সে দৃষ্টিনন্দন ছিল না মোটেও- উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কুচকুচে কালো গায়ের রঙ, হাড় জিরজিরে, সরু পাটকাঠি পা। বেঁচে ছিল ১৪ দিন!

শিশুটির বাবা কাজের সন্ধানে গেছেন বহুদুর। জানেনও না, চমৎকার না হোক একটি সন্তানের জনক তিনি। তাদের ভালবাসা-বাসির প্রথম সন্তান। জননী মৃত সন্তানকে হাতছাড়া করতে চাচ্ছিলেন না। তার এক কথা, এর বাবা এক পলকের জন্যে হলেও একে দেখবে। অবুঝ জননী যুক্তি দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিলেন না, এ অসম্ভব! সন্তানের বাবাকে খুঁজে বের করে নিয়ে আসতে যে সময় গড়িয়ে যাবে ততক্ষণ লাশ ফেলে রাখা যাবে না। আর কার এতো দায় পড়েছে, হন্যে হয়ে খুঁজবে!

দয়ালু এক প্রতিবেশী অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে লাশ নিয়ে এসে গভীর উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছে, নামাজ শেষ হলে জানাজা হবে। এক সময় নামাজ শেষ হলে কাতর গলায় বলল, ‘হুজুর, এর এট্টু জানাজা কইর‌্যা দেন।’
মুখ অসম্ভব অন্ধকার করে ফেললেন ইমাম সাহেব, লোকটাকে দেখে ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠল। এ ত্যাদড় টাইপের- বেনামাজী, ধর্মকর্মে বিশেষ মন নেই। মানী লোকের মান দিতে জানে না। একদিন ডেকে এনে ধমক দিয়ে বলেছিলেন: কি জলিল মিয়া, মসজিদে দেহি না, নামাজ পড়ো না- বিষয়ডা কি?
বেয়াদবটা ঘাড় শক্ত করে বলেছিল: মুনির কাম করি, টেম(টাইম) পাই না।
চড় দিয়ে উল্টে ফেললে আরাম পেতেন। সামলে নিয়ে বলেছিলেন: দোজখে গেলে সময় পাবি?
হেইডা আফনে কেমনে কন, আমি দুজখে যামু! এই মসজিদের সেক্রেটারি মতিন সাব কি বেহেস্তে যাইব, হে তো এক নম্বর সুদখোর।

মসজিদের সেক্রেটারি মতিন সাহেব লোক হিসেবে এতটা খারাপ না। কুস্তিগিরের শরীর, একেবারে ঘাড়গর্দানে। বিশাল বেঢপ ভুঁড়ি চোখে না পড়ে উপায় নেই। মসজিদে নিয়মিত সামনের কাতারে দাঁড়ান। সুদ খান, এটা এখন কে না খায়? অবশ্য দরিদ্র মহিলারা এঁর সংসপর্শে এসে বিচিত্র অসুখ বাধিয়ে বসে। মতিন সাহেবের মত ভুঁড়ি গজায়- সুখের বিষয় অসুখটা এক সময় সেরে যায়।
ইমাম সাহেব এবার বললেন, ‘কার জানাজা?’
জলিল মিয়া বলল, ‘জ্বে, এই দুধের বাচ্চাডার।’
মতিন সাহেব এবার এগিয়ে এসে বললেন, ‘অই, তোর বাচ্চা নিহি।’
‘জ্বে-না, আমাগো পরতিবেশীর। এই ধরেন গিয়া দুই ঘর পর, ’বলল জলিল মিয়া, হড়বড় করে।
আগ বাড়িয়ে মসজিদের সেক্রেটারি মতিন সাহেব রাগ-রাগ গলায় বললেন, ‘তা হের বাপ কই? ফাজিলের দল সব, বাপ না আইস্যা লতায়-পাতার সমপর্ক আসছে।’
‘জ্বে, হের বাপরে পামু কই! হে তো তিন মাস বাড়ি ছাড়া। মজুর খাটতে গেছে। আহারে, জানেও না, পুলা হইয়া মইরাও গেছে।
‘মরবই তো, এমুন কাণ্ড জ্ঞান যে বাপের হের পুলা কি লাফাইবো!’
জলিল মিয়া হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে গিয়ে সামলে নিল, সময়টা ভাল না। ভাঙা গলায় বলল, ‘আল্লারওয়াস্তে দুধের বাচ্চাডার জানাজা দেন।’
মতিন সাহেব ঘৃণায় একগাদা থুথু ফেলে বললেন, ‘তুই কইলেই হইব? হুকুম দেস! খোঁজখবর নিতে হইব না, বাচ্চার বাপ নামাজ পড়ে? আহাম্মুক, বাপ বেনামাজী হইলে জানাজা হইবো কেমনে!’
জলিল মিয়া সব গুলিয়ে ফেলল। জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, ‘ইডা আফনে কি কন! বাচ্চা তো ফেরেশতা, বাপের নামাজের লগে হের কি 'সমপর্ক'!’
মতিন সাহেব অসহ্য রাগে লাফিয়ে ওঠলেন, ‘ধর্ম শিখতে হইব তোর কাছে, তোর মত কাফেরের কাছে!’

এ মসজিদের ইমাম সাহেব মতিন সাহেবের সঙ্গে সায় দিলেন, তার অর্জিত জ্ঞান দিয়ে। মোয়াজ্জেন, চল্লিশ-পঞ্চাশজন মুসুল্লী কেউ টুঁ শব্দ করল না।

অনেক দেরিতে হলেও শিশুটির জানাজা হয়। সৌভাগ্য তার, পচনশীল দেহ বাড়তি এ সুবিধাটুকু নিয়ে জন্মেছিল। শিশুটি পাপ করার সময়ও নিশ্চয়ই পেয়েছিল, বারো লক্ষ ন হাজার ছশো সেকেণ্ড- চৌদ্দ দিন, কম সময় তো না!

*লেখাটি নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। ভোরের কাগজে কোন লেখা আটকালো না, এটা আটকে গেল। বিভাগীয় সম্পাদক সঞ্জীব দা অন্য দিকে তাকিয়ে বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন, সম্পাদক সাহেব বলেছেন এটা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে। আপনি কি একটু সম্পাদক সাহেব, মতি ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে দেখবেন।
আমার মাথায় ঢুকছিল না এটা কেমন করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে! পত্রিকাটা তো ইনকিলাব টাইপের না যে এরা ধর্ম নামের সমস্ত অস্ত্র বাগিয়ে বসে আছেন! আমি সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহ বোধ করলাম না। আমি তো এই পত্রিকার চাকুরে না, ফ্রিল্যান্স কলমচি। লেখাটা ওখানে আর ছাপা হয়নি। পরবর্তিতে ওখানে লেখার আগ্রহ কমে এলো।
তাছাড়া ঘটনাটা আমার নিজের চোখে দেখা। এটা নিয়ে লিখতে পারব না কেন? এটা তো আমার অধিকার।

হায় অধিকার! এই দেশে অধিকার ফলাতে গেলে
হাজার-লাখ পাঠকের বদলে কপালে জুটবে দু-চারজন পাঠক! রত্মেশ্বর হাজরা-র কবিতা ধার করে বলতে হয়:
"মৃত্যু ও মৃতের অধিকার নিয়ে সে
একবার সভাও ডেকেছিল ময়দানে
যদিও সেই সভায় সে নিজে ছাড়া উপস্থিত ছিল
বাতাস
বিকেল বেলার রোদ
মাঠের নির্জনতা
আর বিস্ময়-"

Saturday, June 13, 2009

ইমাম সাহেব- আমাদের বাতিওয়ালা

জ্বিনদের বাদশা সভাসদদের নিয়ে সিংহাসনে বসে আছেন। সিংহাসন মানে আগুনের গোলা আর কী! বাদশার মন বিশেষ ভালো নেই। লোকবল কমে গেছে। কাজ-কাম চলাতে যারপর নাই অসুবিধা হচ্ছে। পৃথিবীর পিরবৃন্দগণ বেশিরভাগ জিন আটকে রেখেছেন। যখন তখন হুকুম করে এদের জীবনটা ভাজা ভাজা করে ফেলছেন। এটা একটা কথা হল, ক্ষমতা থাকলেই ক্ষমতার অপব্যবহার করতে হয় বুঝি! এ কেমন কথা, জিনদের আটকে হুকুম চালানো- এ্যাহ, পর হয়েছেন বলে এঁরা মাথা কিনে নিয়েছেন।

এমনিতে, জিনের বাদশাকে এক কথায় বলা চলে, জেন্টালম্যান। মানুষের জন্য এঁর রয়েছে গভীর মমতা। মানুষেরর সুখ-দুঃখের খোঁজ-খবর রাখেন। যেসব জিন মজা করার জন্য মানুষদের ভয় দেখায় এদের ধরে ধরে চটকনা দেন। দ্বিতীয়বার একই অন্যায় করলে নীল-ডাউন করিয়ে রাখেন। সোজা কথায়, মানুষের সুখে উল্লাসিত হন, দুঃখে কাতর হন।


সাদামাটা জীবনযাপন করেন, উল্লেখযোগ্য কোন রকম বদ-অভ্যাস নেই। আগে সিগারেট টানতেন, বহু কষ্টে ছেড়েছেন। বদ অভ্যাসের মধ্যে আছে শুধু পান, তাও জর্দা ছাড়া। চার-পাঁচটা পান মুখে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বললেন: কি-অ, পৃথিবীর খবর-টবর তো পাচ্ছি না বহুদিন ধরে। আমাদের গুপ্তচররা করছেটা কী!
প্রধানমন্ত্রী একটু নড করে বললেন: 'মি. লর্ড, রাশিয়া পতনের পর গুপ্তচরদের আর কোনো কাজ নাই। গর্দভ নাকি কি যেন নাম গাড়টার... ধ্যাৎ মনে পড়ছে না, কঠিন নাম। যাই হোক, গ্লাসনস্ত, পেরোস্ত্রোইকার ট্যাবলেট খেয়ে এমন কাজটাই করেছে পৃথিবীর ভারসাম্য একদিকে হেলে পড়েছে। সারা পৃথিবীর মাথায় আমেরিকা এখন বনবন করে ছড়ি ঘুরাচ্ছে'। এতোগুলো কথা একসঙ্গে বলে প্রধানমন্ত্রী হাঁপিয়ে গেছেন।
 

'তাহলে মানুষের খোঁজ-খবর পাবো কি করে', নীচের ঠোঁট কামড়ে বললেন বাদশা।
'জ্বী, চিন্তার কিছু নেই, অবশ্য আমাদের জার্নালিস্টারা পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছে। এবার তাদের একটা আ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে পাঠানো হয়েছে- সেটা হলো, কারা সবচে কষ্টে আছে? এখন পর্যন্ত কেবল বাংলাদেশ থেকে রিপোর্ট এসেছে। ওখানে আমাদের তুখোড় জার্নালিস্টকে পাঠিয়েছিলাম, কারণ লোকগুলো মারাত্মক, এরা নাকি সোজা আঙ্গুলেও ঘি ওঠাতে ওস্তাদ'।
বাদশা ভারী গলায় বললেন, 'আহ, ইনিয়ে-বিনিয়ে এতো কথা না বলে কাজের কথা বলো'।
'ওই দেশে নিরন্তর সমস্যা, ওইসব কথা না বলে ছাতাফাতা মসজিদের ইমাম, মেয়াজ্জিনদের নিয়ে রিপোর্ট করেছে। গাধা আর কী'!
বাদশা কাতর হলেন, 'আহা-আহা, ওরকম করে বলে না। ও আমাদের দুঁদে জার্নালিস্ট। শুনি না কি রিপোর্ট এনেছে'?

প্রধানমন্ত্রী দরবারের এক কোনে রাখা বিশাল ডেকসেটে সাক্ষাৎকারের ক্যাসেটটা চালালেন। নির্দিষ্ট লয়ে স্পুল ঘুরতে লাগল।
খিচাখিচ খিচ খিচ ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হলো।

জিন জার্নালিস্ট(হড়বড় করে): যারা এ পৃথিবীতে আছেন বা পৃথিবীর বাইরে আছেন সবাইকে আমার শুভেচ্ছা। আমরা এ মুহূর্তে এখানকার জামে মসজিদের ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বলবো, আস্লামুআলাইকুম হুজুর।
ইমাম সাহেব: ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারকাতুহু। কে ভাই আপনি, আমার কাছে কি বিষয়?
জিন জার্নালিস্ট (হাসি): মাফ করবেন হুজুর, আমি কে এটা বলতে পারছি না। আমি এসেছি আপনার একটা সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য।
ইমাম সাহেব: সাক্ষাৎকার, এটা কী জিনিস?
জিন জার্নালিস্ট: ইয়ে, মানে কি করে বোঝাই। পত্রিকায় দেখেন না ছাপা হয়...।
ইমাম সাহেব: ইয়ে, আমি তো পত্রিকা পড়ি না। মাদ্রাসায় পড়াকালিন পত্রিকা পড়া নিষেধ ছিল।
জিন জার্নালিস্ট: অ, আচ্ছা। আপনারা পত্রিকা পড়েন না। তাহলে দিনদুনিয়ার খবর জানবেন কেমন করে?
ইমাম সাহেব: ভাইরে, আমার কাজ খবর না কবর নিয়া। নতুন কোন খবর জেনে তো লাভ নাই। সব খবর আগেই লেখা হয়ে গেছে।
জিন জার্নালিস্ট: বেশ-বেশ। তাহলে কোন সমস্যা নাই। তা সাক্ষাৎকার হচ্ছে, ধরেন, মানুষদের সুখ-দুঃখ জানা, এই আর কী।
ইমাম সাহেব (ঠান্ডা শ্বাস): কি হবে এসব জেনে, আমরা তো আর মানুষ না।

জিন জার্নালিস্ট: আচ্ছা আপনি কতো টাকা বেতন পান?
ইমাম সাহেব (কুপিত হয়ে): আস্তাক ফিরুল্লাহ, লাহলঅলা কুআতে ইল্লা বিল্লা... এসব কী বলছেন! আল্লার নামে নামাজ পড়াই, যা পাই এটাকে বেতন বলছেন কেন!
জিন জার্নালিস্ট (লজ্জিত গলা): মাফ করবেন জনাব, ঠিক কি বলতে হবে আমার জানা নাই। আপনি যদি দয়া করে...।
ইমাম সাহেব: উ-উ, মূল্যের বদলে বলা হয় হাদিয়া আর বেতনের বদলে হবে... হবে...।
জিন জার্নালিস্ট: সম্মানী বললে কেমন হয়?
ইমাম সাহেব: তা মন্দ হয় না। যা জানতে চাইছিলেন সম্মানী এখন পাচ্ছি ১৮০০ করে। আগে ১২০০ ছিল। কিছুদিন হলো বেড়েছে, অনেক দেনদরবার করে।


জিন জার্নালিস্ট মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন, 'মাই জিনেরগড, বলেন কী! আমার জানামতে, বাংলাদেশের একজন মেথরও তো এই টাকায় সারা মাস কাজ করবে না! তা আপনার পরিবারের লোকসংখ্যা ক’জন?
ইমাম সাহেব (দীর্ঘ শ্বাস): এই ধরেন আমি, বাচ্চাদের মা, সাত বাচ্চা। আর আমার আম্মা। আব্বা বড়ো ভাইয়ের ভাগে পড়েছেন।
জিন জার্নালিস্ট (উঁচু স্বরে): জিনগড-জিনগড! চলে কি করে আপনার?
ইমাম সাহেব: চলে কই, চলে না। আর আমি তো চালাই না, আল্লাহপাক চালান।
জিন জার্নালিস্ট: তবু দয়া করে বলবেন, ১৮০০ টাকায় কিভাবে একমাস ম্যানেজ করেন?
ইমাম সাহেব (লজ্জিত গলা): আলাদা কিছু টাকা পাই। এই ধরেন কোথাও মিলাদ পড়ালাম, কোথাও পবিত্র কোরআন খতম হল, কেউ মারা গেল। ওদের জন্য দোয়া করি। ৫০/ ১০০ টাকা পাই । ও-হ্যাঁ, দাওয়াত থাকলে কোনোদিন ভালো খাবার-টাবার জোটে। ভাই, বলতে শরম লাগে, দাওয়াতে আমাদের খাওয়া দেখে লোকে হাসাহাসি করে। এরা কী জানে, পেট ভরে খেতে পাই না। আমার পরিবারে যে চাল লাগে এর অর্ধেক চাল কেনারও টাকা পাই না। আর শুধু চাল পানি দিয়ে তো চিবিয়ে খাওয়া যায় না।

জিন জার্নালিস্ট: আপনার সঙ্গে কথা বলে হুজুর আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। কি করব বলেন, দায়িত্ব তো। আচ্ছা, আপনার এতোগুলো সন্তান, জন্মনিয়ন্ত্রণ করেননি কেন?
ইমাম সাহেব: তওবা-তওবা! এদের পাঠিয়েছেন আল্লাহ, খাবার দেবার মালিকও উনিই। এমনিতে 'আযল' করি কিন্তু লাভ হয় না।
জিন জার্নালিস্ট: এবার আপনার ছেলে মেয়েদের সঙ্গে একটু কথা বলি।
ইমাম সাহেব: এরা কি আর এখানে থাকে নাকি! আমার একার পেটই চলে না। সকালে নিজের পয়সায় নাস্তা করি। দুপুরে এক বাড়ি থেকে ভাত আসে। অর্ধেক খাই, অর্ধেক পানি দিয়ে রাতের জন্যে রেখে দেই। মাস ছ’মাসে একবার বাড়ি যাই, যৎসামান্য যা পারি দেই।


জিন জার্নালিস্ট: আপনি এই কন্টকিফলের বিচি চিবাচ্ছেন কেন?
ইমাম সাহেব: কন্টকিফল কি?
জিন জার্নালিস্ট: ওহ, সরি। কন্টকিফল হচ্ছে কাঁঠাল।
ইমাম সাহেব: রাতের খাবারে গন্ধ হয়ে গেছিল। খেতে পারিনি। ক্ষিধা লেগেছে। কিছু কাঁঠালের বিচি পোড়ানো ছিল, ওইটাই খাইতেছি।
জিন জার্নালিস্ট: আচ্ছা শেষ একটা প্রশ্ন, এ জীবন আপনার কেমন লাগে?
ইমাম সাহেব (অন্যরকম গলা): বড়ো কষ্ট জনাব, বড়ো কষ্ট। সারা পৃথিবীর লোক যা খুশি তা করতে পারবে, আমাদের পান থেকে চুন খসার উপায় নেই। আমাদের হাত-পা বেঁধে দেয়া হয়েছে। আচ্ছা, পেট বাঁধেননি কোন আপনারা? একদিন রমজানে রাস্তায় মুড়ি বিক্রি করছিলাম। সবাই হাঁ হাঁ করে উঠল, হুজুর এ কাজ করে কি করে? সর্বনাশ! একটা ছেলেকে বাংলা পড়ালে আপনারা দিবেন কমসে কম পাঁচশ, হাজার আর আরবী পড়ালে ৫০ টাকা। একদিন তালি দেয়া পাঞ্জাবী পরে এলাম, লোকজন বলল ব্যাটা ভড়ং দেখায়। খেতে পাই না আর কাপড়। আপনাদের যেখানে দুই গজে সার্ট হয়ে যায় আমাদের পাঞ্জাবীতে লাগে চার গজ। তবু শোকর আল্লার কাছে। অন্যদের দেখে সবর করি, এ মসজিদে মোয়াজ্জিন পায় ১২০০ টাকা। তাকে দেখে সবর করি। শোকর-এ আলহামদুলিল্লাহ।

*আজ এই লেখাটি উৎসর্গ করি, মৌলভী আব্দুস সামাদকে- তিনি আমার আরবি শিক্ষক ছিলেন। মুলত লেখাটা তাঁর জীবনের ছায়া অবলম্বনে লেখা হয়েছিল। অসম্ভব সৎ একজন মানুষ ছিলেন। দেওবন্দ থেকে উঁচু ডিগ্রি নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর চেয়ে অনেক অনেক কম শিক্ষিত, অশিক্ষিত মৌলভীদের ওয়াজ মাহফিলে ডাক পড়ত, পড়ত না কেবল এই মানুষটার। কারণ ওয়াজ মাহফিলে ইনিয়ে-বিনিয়ে যেসব গরমাগরম ফুলকি বিচ্ছুরণ ঘটাতে হয় তা তিনি করতে চাইতেন না। মানুষটার ছিল জাতিধর্মনির্বিশেষে অসম্ভব মায়া। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে থাকার, খাওয়ার বড়ো কষ্ট- তিনি মারা গিয়েছিলেন বিনা চিকিৎসায়।
 

**এটা পুরনো লেখা। লেখাটা অনেক আগে একটা ওয়েবসাইটে দিয়েছিলাম। কিছু পাঠকের প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র! একজন বললেন, 'ইমাম সাহেবরা আপনাকে পেলে কেঁদে দিত, বুক মিলাইত, কুলাকুলি করত'। তিনি এ-ও-তা বলে মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়েছিলেন।

আমি যদি ভদ্র ভাষায় বলি তাহলে বলব, আমার লেখার মূল বক্তব্যটা বোঝাতে পারিনি। আর অভদ্র ভাষায় বললে, তারা আমার লেখার ধাঁচ-মূল সুরটা ধরতে পারেননি। আমাদের জন্মের সময় এই মানুষগুলো কাছে থাকেন, মৃত্যুর পরও কাছাকাছি।
সচরাচর ঔর্ধ্বদেহিক-অন্ত্যর্ষ্টি সম্বন্ধীয় কর্মকান্ডে এঁদের ব্যতীত উপায় কী! অথচ এঁদের আমরা কোন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি। যে বেতনে একজন মেথরও কাজ করবে না সেই বেতন একজন ইমাম-ধর্মীয় নেতাকে দেয়ার ফলশ্রুতি অবশেষে কী দাঁড়াচ্ছে? কেন একজন মানুষকে অন্যায় করতে বাধ্য করা? আবার আবালের মতো আশা করে থাকি এঁরা আমাদের ধর্ম গুলে খাওয়াবেন। আমাদের এটা শেখানো হয়নি এদেরকে শিক্ষক বলার জন্য, ধর্মীয় শিক্ষক!

এরা মাদ্রাসা নামের যে কারখানা থেকে বের হন, ওইসব মাদ্রাসায় কী পড়ানো হয়-কী শেখানো হয়? সাইকেল চালানো যাবে না, কোনো ধরনের খেলাধুলা করা যাবে না, পত্রিকা পড়া যাবে না।
ভুল শিক্ষা, ধর্মীয় উস্কানি এবং অধিকাংশ হুজুর টাইপের মানুষরা থাকেন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। ফল যা হওয়ার তাই হয়। কোমলমতি শিশুদের উপর ঝাপিয়ে পড়েন। সাদা-শুভ্র হয়ে মানুষটা হয়ে যায় গ্রে- ক্রমশ 'গে'। একজন 'গে-মানুষ'। আর শিশুটির জগৎ এলোমেলো হয়ে যায়- রোপণ করা হয় একেকটা বিষবৃক্ষ। ঝাড়েবংশে কালে কালে বটবৃক্ষ হয়। চক্রাকারে এটা চলতেই থাকে। এ নিয়ে আমাদের দেশে কারও গা করার অবকাশ নাই।

মাদ্রাসায় ক-জন মেধাবি ছেলে ভর্তি হচ্ছে? একটা পরিবারের সবচে মেধাবি ছেলেটাকে সামর্থ্য থাকলে বৈদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয, নিদেনপক্ষে ঢাকায়। আর হাবাগোবা, ল্যাংড়া-লুলা সন্তানকে আল্লারওয়াস্তে মাদ্রাসায়। এ তো নিজেকেই সামলাতে পারে না, অন্যকে কী সামলাবে?

আমার প্রিয়মানুষ মারা গেলে চোখের পানি শুকিয়ে যায় কিন্তু হুজুরদের চোখের পানি দেখে মনে হয় ডিপ-টিউবওয়েল বসানো হয়েছে!
রাগের মাথায় কেউ তার বউকে তালাক বলে দিল- ব্যস, হুজুরদের এই তালাকের উসিলায় 'লাক' খুলে যায়। টাকার বিনিময়ে কোরান খতমের নামে একশ্বাসে এঁরা যা পড়েন তা কোন ভাষা, কটা অক্ষর সহীহ হয়? ধর্মের সর্বময়কর্তা, এরা নিজেরা তৈরি করে নেন নিজস্ব একরাশ ভুল ব্যাখ্যা। একটু আগে পেচ্ছাব করে মাটি ভিজিয়ে গেছেন একজন, ওখান থেকে মাটির ঢেলা উঠিয়ে কুলুপ করতে কোন সমস্যা নাই। একদা ফতোয়া আসবে যে যত বড় ঢেলা নিয়ে কুলুপ করবে সে তত বড় কাজের মানুষ। ভবিষ্যতে এটা দেখা বিচিত্র না ছোটখাটো টিবি নিয়ে লোকজন দৌড়াদৌড়ি করছে!
অবশ্য এখনকার হুজুরদের সেলফোন ব্যবহারে কোনো অনীহা নাই। যতটুকু জানি এটা মুরতাদরাই আবিষ্কার করেছে, কোন মুসলমান না।

ভাবলে গা কাঁপে, এইসব মানুষদের হাতে ধর্ম নামের ভয়ংকর অস্ত্র। ধর্মীয়-বক্তার যেমন যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না তেমনি ধর্ম নামের এই ভয়ংকর অস্ত্র চালাবার জন্য কোন ট্রেনিং-এর প্রযোজন হয় না। একেকজন চলমান কাশ্যপ- চলমান বিষের ভান্ডার! দিনের পর দিন, মাস, বছর আমরা এই বিষ সানন্দে পান করেই যাচ্ছি। ইনশাল্লাহ, আমাদের সন্তানরাও পান করবে।

Wednesday, June 3, 2009

শাসক

গভীর রাতে দৈত্য বাদশা জরুরী সভা তলব করলেন। দৈত্যরা কপালে একটাই-মাত্র চোখ কচলাতে কচলাতে জড়ো হলো। বাদশা মেঘগর্জনে ঘোষণা দিলেন: আমি একটা বর দিয়েছি।

দৈত্যরা কেউ অবাক হল না। তাদের বাদশার এটা এক বদ অভ্যাস, যাকে তাকে বর দেন। অনেক সময় জোর করে বর দেন, কেউ নিতে না চাইলে জোর করে ধরে নিয়ে আসেন। দৈত্যদের গলা শুকিয়ে এলো, এ লোকের দেয়া প্রত্যেকটা বর-এ কোন না কোন গন্ডগোল থাকে, জীবন ভাজা ভাজা হয়ে যায়।
কোতোয়াল মুখ অন্ধকার করে বলল: বলেন কে সে হতভাগা, ধরে আনি।
বাদশা হড়বড় করে বললেন, আরে না-না, তোমরা যা ভাবছো তা না। এবারের ব্যাপারটা অন্য ধরনের। অনেক মাথা কুটে আমার কাছ থেকে বর নেয়া হয়েছে। এ রাজ্যের কেউ না। বহুদূর একদেশের মানুষ নামের প্রাণী।

দৈত্যদের চোখ চকচক করতে লাগল। আহ, কতো দিন মানুষের মাংসের শিককাবাব খাওয়া হয় না। এদের লালা ঝরে বাদশার পা ভিজে গেল।
বাদশা চটে লাল হয়ে বললেন: ইতর, মাথামোটা গর্দভ সব, শুধু আছে মানুষের মাংস খাওয়ার চিন্তা, এইসব কী! তোমাদের চে’ শক্তিশালী কেউ যদি থাকত এই পৃথিবীতে, ওরাও তো তোমাদের ধরে ধরে খেতো, নাকি? ভুল বললাম।
একজন সাহস করে বলল, মানুষরাও তো গরু, ছাগল, মুরগী ধরে ধরে খায়, ওদের বেলায় দোষ হয় না। যত দোষ আমাদের- দৈত্য হয়ে মাথা বিক্রি করে দিয়েছি নাকি!
বাদশা গর্জে উঠলেন: খামোশ, ভুজংভাজাং কথা বাদ। তো, যেটা বলছিলাম, বঙ্গোপসাগরের তীরে ছোট্ট একটা দেশ আছে। দেশটার নাম সবার জানা প্রয়োজন নাই। তবু ধরো নামের আদ্যাক্ষর ‘ব’, মজার ব্যাপার হলো এদের রাজপ্রাসাদের আদ্যাক্ষরও ‘ব’। ওই দেশের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি, সমগ্র দেশে হাহাকার: ভাত দে, কাপড় দে, রাজা দে। আমার খুব কৌতুহল হলো, ভাত কাপড় তো বুঝলাম কিন্তু রাজা দে এর মানে কি!

জিজ্ঞেস করতেই সবাই এমন কাকুতি মিনতি শুরু করল মনটা অন্য রকম হয়ে গেল। আমি কেঁদে ফেললাম। অবশ্য কাঁদা উচিৎ হয়নি, ছোটখাটো বন্যা বাধিয়ে দিয়ে এসেছি। ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। লাশের পর লাশ পড়বে। একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে, বন্যার ছুতায় এরা বাড়তি কিছু টাকা পাবে। এমনিতে দেশটায় জমহুরিয়াত-গণতান্ত্রিক শাসন চালু আছে। এর ফলে বিরাট বড় চোরেরও ক্ষমতায় আসতে বেগ পেতে হয় না। শিক্ষিত মানুষরা হাসিমুখে এটা মেনে নেয়।
এতোগুলো কথা বলে বাদশার মুখে ফেনা জমে গেছে।

দৈত্যদের মধ্যে একজন (যার সাহসের কোনো কুলকিনারা নাই। জনান্তিকে বলে রাখা যেতে, পারে বাদশা নিজেও একে প্রচন্ড ভয় পান) থমথমে গলায় বলল: আপনার কথা শেষ হইছে, ঘুম পাইছে। কথা শর্ট করেন। কাল ভোরে কুহতুর পর্বতে যাইতে হইবে।
বাদশার চোয়াল শক্ত হল, ঠান্ডা গলায় বললেন: না কথা শেষ হয় নাই। আমি ঠিক করেছি তোমাদের মধ্যে থেকে একজনকে ওদেশের রাজা করে পাঠাব। কে কে যাবে হাত তোল। এরপর লটারী হবে, যার নাম উঠবে সেই যাবে।

হঠাৎ করে সবার গলায় অদৃশ্য কি যেন আটকে গেল, গলা খাঁকারির শব্দ ক্রমশ উঁচু হলো। বাদশার ভ্রু কুচকে জোড়া লেগে গেল, সেই যে জোড়া লাগল আর আলাদা হলে না (দৈত্য বাদশারও চোখ একটা। ভ্রু জোড়া লাগল কেমন করে এটা একটা রহস্য), এর মানে কি- কেউ যেতে রাজি না, নাকি!
ছিঃ, তোমাদের মতো কাপুরুষ প্রজাদের বাদশা আমি! ছিঃ, ছি-ছি-ছি, বাদশার চোখে নগ্ন ঘৃণা।
সেই সাহসী দৈত্যটা আফ্রিকার জঙ্গলের মতো ঝাকড়া চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলল: আপনি যান না সেই দেশের রাজা হয়ে। খাককু, খাককু খাক খা, খ্যাকু খ্যাকু (এর হাসিটাও বড় বিচিত্র)।
খবিশ, বাদশা আকাশের বজ্রপাত মাটিতে নামিয়ে বললেন: আমি গেলে এদেশ চালাবে কে, তুই, তোর মতো গাধা?
জ্বে, দেশ চালান কঠিন কিছু না, সাহসী দৈত্যটা হেলাফেলা ভাবে বলল।
ঠিক আছে তুই আগে ওই দেশ চালিয়ে আয়। এরপর না হয় এই দেশ চালাবি, দেখি তোর কেমন সাহস?

সাহসী দৈত্যটা ফাঁদে আটকে গেল, এখন আর ফেরার উপায় নেই। সে মুখ অসম্ভব লম্বা করে, বাদশা সোলেয়মানের তিন চৌদ্দ বেয়াল্লিশ গুষ্ঠি উদ্ধার করতে করতে ‘ব’ আদ্যাক্ষরের দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। অবশ্য তার উল্লাসিত হওয়ার কারণ নেই, যে ওখানে গিয়ে মহাসুখে মানুষ ধরে ধরে খাবে। নিয়ম অনুযায়ী মানুষের রূপ ধারণ করতে হয়েছে এবং পাশবিক শক্তি কেড়ে নেয়া হয়েছে।

নতুন রাজার মনে শান্তি নাই, খাওয়া নাই। মানুষ এইসব কী খায়, ছ্যা! অচা-পচা কুখাদ্য। শুটকিভর্তা একটা খাওয়ার জিনিস হইল? যখন পচন ধরে তখন ওইটায় সাদা-সাদা পোকা কিলবিল করে। ওয়াক!
নিতান্ত বাধ্য হয়ে এইসব খেয়ে রাজার ভয়াবহ রকমের পেট নেমে গেল। তিনি বদনা নিয়ে ছুটাছুটি শুরু করলেন। রাজার মেজাজ খুব খারাপ হয়, এরা টাট্টিখানা নামের খুপরির মত এইটা কী বানিয়েছে! আরে, জঙ্গলে
বাহ্যেত্যাগ না করলে বাহ্যেত্যাগের সুখ কোথায়?

আর একি যন্ত্রণা! এই দেশের প্রজাদের মুখে শুধু নাই নাই। বিরক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা শুধু নাই নাই করো, এটা নাই সেটা নাই, তোমাদের আছেটা কি, বলো তো?
প্রধানমন্ত্রী চিন্তায় পড়ে গেলেন, আসছি বলে সেই যে গেলেন কয়েকদিন পর এলেন। মুখ আলো করে বললেন, ভাই, অনেক চিন্তা ভাবনা করে দেখলাম, আমাদের আসলে বলার মতো কিছুই নাই? শুধু আমরা আছি ?
রাগে রাজার গা কাঁপতে লাগল, সামলে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, উত্তম অতি উত্তম! আর শোন, আমাকে ভাই বলবে না, কল মি রাজা । ভুলে গেছ, কেমন করে ভুলে গেলে, তোমাদের দেশের এক শাসককে আপা বললে তিনি রাগে লাফাতে লাফাতে শুধরে দিতেন, কল মি ম্যাডাম।
জ্বী ভাই, ইয়ে থুক্কু রাজা ।

নতুন রাজা প্রথম দিকে রাজ্য পরিচালনায় অভিনবত্ব আনতে চেয়েছিলেন, বিভিন্ন রাজা বাদশার কাহিনী মনোযোগ সহকারে পাঠ করলেন। দু-জন রাজাকে খুব মনে ধরল। একজন বহু বছর পুর্বে এই দেশেরই রাজা ছিলেন, দীনহীন জীবনযাপন করতেন। তার মৃত্যুর পর হাতলভাঙ্গা তোবড়ানো স্যুটকেস থেকে ছেঁড়া শার্ট, লুঙ্গি পাওয়া গেছিল। আরেকজন বাদশা হারুনুর রশীদ, ছদ্মবেশে প্রজাদের সুখ-দুঃখের খোঁজ খবর করতেন।

নতুন রাজা একদিন গভীর রাতে ছদ্মবেশে শহর দেখতে বেরুলেন। প্রথমেই বিরক্তিতে মন ছেয়ে গেল। এরা শহরে কি জঘন্য রঙের বাতি লাগিয়েছে (সোডিয়াম লাইট)। টকটকে লাল আলখেল্লা গায়ে দিয়ে বেরিয়েছেন অথচ কুচকুচে কালো দেখাচ্ছে। এই ফাজলামীর মানে কি!

একা একা একটু ভয় লাগছে অবশ্য, আশেপাশে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, চিন্তার কিছু নেই, প্রচুর পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় প্রচুর মেয়ে দেখলেন। ভাবলেন, ভালো, এরা নিশ্চয়ই দেরিতে রান্নাবান্না শেষে করেছে, এতোক্ষণে হাওয়া খেতে বেরিয়েছে। এরা উনাকে দেখে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করছে যার অর্থ বুঝতে পারছেন না। আর এদের সম্ভাষণও যেন কেমন: একা নাকি? এটা কি ধরণের সম্ভাষণ, এর কী উত্তর হয়! একা দেখেও জিজ্ঞেস করছে একা নাকি। আজব তো! ব্রেন ডিফেক্ট নাকি?

কাঁধ ঝাঁকিয়ে সামনে এগুলেন। এক জায়গায় কয়েকজন তাকে ঘিরে ফেলে বিভিন্ন অস্ত্রের মহড়া দেখাতে লাগল,
মহড়ার কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, বাহ্‌ দারুণ তো! এরা নিশ্চয়ই আগামীদিনের দেশ রক্ষক, সৈন্যবাহিনীতে ভর্তি হবে। গভীর রাতেও অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে। মহড়া দেখাচ্ছে।
চু...ভাই, মাল পানি কি আছে বাইর কর, নইলে দেলাম চাক্কু হান্দাইয়্যা, কুৎসিৎ গালি সহযোগে একজনের সাফ কথা।

রাজার কাছে টাকা পয়সা বলতে কিছু ছিল না। সেটা ব্যাপার না। রাজভান্ডারে প্রচুর আছে। কিন্তু এসব কী! ভুলে গেলেন তিনি ছদ্মবেশে আছেন, চেঁচিয়ে উঠলেন: তোমরা কারা? আর তোমরা জানো কার সাথে কথা বলছ, আমি এ দেশের রাজা।
আমরা হলাম ডাইল মানে ফেনসিডিল, হেরোইন পাট্টি, একজন আরেকজনের গায়ে রাম খোঁচা মেরে বলল: আবে চান্দু, এর মনে হয় বল্টু কয়েকটা ছুইট্যা গেছে, পাগল ছাগলের কাপড়ে কি কাম, ল, এর কাপড় বেইচ্চা ডাইল খাই।

এরা জোর করে রাজার গা থেকে কাপড় সব খুলে নিল। রাজার গায়ে একটা সুতাও নাই। ভুল হলো, কোমরে কালো সুতাটা আছে, তাগাটা এ দেশে আসার পূর্বে তার মাতাশ্রী বাড়কা রাক্ষসী
বেঁধে দিয়েছিল

তিনি স্তম্ভিত-হতভম্ব। নিরুপায় হয়ে রাস্তার ভিক্ষুকের বোঁচকা-বুঁচকি থেকে একটা চট চুরি করে কোনো মতে লজ্জা ঢাকলেন। রাজপ্রাসাদের প্রহরীদের বোঝাতে বিশেষ বেগ পেতে হলো, আসলে তিনি কে? অবশ্য গোটাকয়েক ঘা খেয়ে।
এ পর্বের এখানেই সমাপ্তি।

একদিন ঘুমাতে যাবেন। কানে এলো রাজপ্রাসাদের বাইরে খুব হৈচৈ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে তলব করলেন: কি হচ্ছে এসব, বাইরে হইচই কিসের?
প্রধানমন্ত্রী কাঁধ কয়েকবার উঁচু নিচু করে বললেন: তেমন কিছু না রাজা বাহাদুর, এরা আপনার বিরোধী দল।
বিরোধীদল তো বুঝলাম, হইচই করছে কেন! কি চাচ্ছে?
বিরোধীদল হইচই করবে এটাই নিয়ম, করতে হয়। এরা বলছে, দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে যাচ্ছে। ঘুষ, কালোবাজারী, চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি, পরীক্ষায় অবাধ নকল, এইসব।

গভীর চিন্তায় রাজার কাঁধ ঝুলে কপালে অসংখ্য ভাঁজ পড়ল, চোখ হয়ে গেল মরা মাছের মত। হঠাৎ লাফিয়ে উঠলেন: ইউরেকা-ইউরেকা, পেয়েছি! আমি এই দেশের প্রজাদের অদ্ভুত মানসিকতা লক্ষ্য করেছি, এদের যা করতে বলা হয় তার উল্টোটা করে। খাল কাটতে বলা হলো তো খাল ভরাট করে ফেলল। যাও, ঘোষণা করে দাও, আজ থেকে সব অবৈধ কাজ বৈধ করা হলো, শুধু বৈধই না বাধ্যতামূলক। বাইরে যারা হইচই করছে তাদেরকে এক্ষুণি জানিয়ে দাও। ওয়ান, টুতে সমস্যার সমাধান। সব ঠান্ডা। হা হা হা।
প্রধানমন্ত্রী বাইরে থেকে ঘুরে এলেন। হইচই কমল তো নাই আরও এক ধাপ বেড়ে গেল।
আবার কি হলো, রাজার রাগী গলা।
ওই যে বললাম, নিয়ম। বিরোধীদল হইচই করবেই, এটাই এই দেশের দস্তুর, প্রধানমন্ত্রী মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন।
এক কাজ করো, এদের সব্বাইকে মন্ত্রী বানিয়ে দাও।

প্রশান্তচিত্তে রাজা ঘুমাতে গেলেন। রাত বারোটা। বিকট চেঁচামেচিতে রাজার কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেল। অসহ্য রাগে লাফাতে লাগলেন, একটুর জন্য মাথা ছাদে ঠুকল না। হচ্ছে কি, হচ্ছে কি এসব, প্রধানমন্ত্রী।
রাজাবাহাদুর এরা আপনার বিরোধীদল।
ওদের না সবাইকে মন্ত্রী করা হয়েছে!
জ্বী, তা হয়েছে। কিন্তু এরা নতুন দল।
যাও, এদেরকেও মন্ত্রী করে দাও।

প্রধনমন্ত্রী ফাঁপড়ে পড়লেন। মিনমিন করে বললেন, মন্ত্রীর কোটা তো শেষ, এদের কি মন্ত্রী করবো?
রাজার দুচোখ ঘুমে ভেঙ্গে আসছে, আহ, ভ্যানর ভ্যানর করো না তো, কোটা শেষ তো কি হয়েছে, নতুন বিভাগ তৈরি করো। গরু মন্ত্রী, গাধা মন্ত্রী যে কোনো মন্ত্রী বানিয়ে দাও। বাট ডোন্ট ডিষ্টার্ব মি।

রাত একটা। রাজার চোখ লেগেছে মাত্র, বাইরে প্রচন্ড শোরগোলে রাজপ্রাসাদ কেঁপে উঠছে। রাজার মেজাজ এখন ফোর্টি নাইনের জায়গা নাইন্টি ফোর। গলার রগ ফুলিয়ে চেচাঁলেন: প্রধানমন্ত্রী!
প্রধানমন্ত্রী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। বিরক্তি চেপে বললেন: এখন আর দল-টল নাই, দেশের সব লোক পিলপিল করে রাজপ্রাসাদে আসছে।
রাজা রক্তচক্ষু মেলে প্রধানমন্ত্রীকে ভষ্ম করে দিতে চাইলেন, ব্যর্থ হয়ে বললেন, প্রয়োজন হলে দেশের সবাইকে মন্ত্রী বানিয়ে দাও। যাও, এবার দূর হও আমার সামনে থেকে।

শেষ প্রহরে রাজাকে ডেকে তোলা হলো। দেশের সবাইকে মন্ত্রী করা হয়েছে। এখন আর কেউ প্রজা নেই। দুঃখের বিষয় রাজবিরোধী কার্যক্রম আরো মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

সকালে কথা হবে, এ কথা বলে রাজা সবাইকে বিদায় করে দিলেন। সকালে নতুন রাজাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না।
*কার্টুনঋণ: শিশির (তাঁর আইডিয়ার ছাপ আছে)।

WhatsApp