Search

Showing posts with label ফ্রিডম. Show all posts
Showing posts with label ফ্রিডম. Show all posts

Monday, August 16, 2010

ফ্রিডম: ২

আলীম আহমেদ ডা. কবীরের সেই ঘরটায় ফিরে এসেছেন। ডা. কবীর মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে আলীমকে সরাসরি এখানে নিয়ে এসেছেন। ইরা বুকিন এরা একটু আগে গেল। কবীর তার সন্তানদের সঙ্গে আলীম আহমেদকে বেশ কিছুক্ষণ একা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ইরার সঙ্গে কথা হয়েছে কম। ও কেঁদে না ফেলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলেছিল, তুমি বেশ শুকিয়ে গেছ!
আলীম লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন: বড় কষ্ট। বলেই ভুলটা বুঝতে পারলেন।
ইরা ঝরঝর করে বাচ্চার মত কেঁদে ফেলল। বুকিনও মাকে ভয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল, মামাইন্যা, মামাইন্যা...।

আলীম আহমেদের অসহ্য লাগছিল যখন বুকিন চোখ বড় বড় করে বলল, বাবাইন্যা, বাসায় যাবা না।

এদের বিদায় করে ছোট একটা কটে চুপ করে শুয়ে রইলেন। কবীর অবশ্য নিষেধ করে রেখেছে খুব বেশীক্ষণ মন খারাপ করে না থাকতে। বললেই হলো! এই মুহুর্তে কিছু একটা করা খুব জরুরী। আচ্ছা, কবীরের এই ঘরটা নিমিষেই এলোমেলো করে দিলে কেমন হয়? এই যেমন ধরা যাক, বাঁশের চেয়ারগুলো উল্টিয়ে দিলেন। ১৪ ইঞ্চি যে টিভিটা যেটার উপর রাখা আছে- আচ্ছা, গ্রামে এটাকে কি বলে, ছিয়া-ছেকেট, চাল গুড়ি করে যেটা দিয়ে? ওইটাই উল্টিয়ে টিভিটা রাখা আছে। এখন টিভিটা নীচে নামিয়ে টিভির ওপরে এই জিনিসটা রেখে দিলে? কবীর হাঁ হয়ে থাকবে। নাকি ক্ষেপে চিংড়ি মাছের মত লাফাতে থাকবে!

এ ঘরটায় একটা হাসিমুখ শিশুর ছবি আছে, ক্যাপশন দেয়া- কি যেন লেখা ছোট ছোট অক্ষরে পড়া যাচ্ছে না। আচ্ছা, ওটা বদলে একটা কাগজে এটা লিখে লাগিয়ে দিলে কেমন হয়: “বাবা মার আনন্দের ফসল নিরানন্দ অসফল আমি”। উহুঁ, বাক্যটা একটা শিশুর ছবির সঙ্গে ঠিক মিশ খাচ্ছে না! এটা লিখলে কেমন হয়: “বৌন অভ মাই বৌন, ফ্লেস অভ মাই ফ্লেস”।
আলীম শোয়া থেকে উঠে বসলেন। পাশের টেবিলেই কাগজ কলম, একসময় লিখতে না পারলে পাগল-পাগল লাগত। অনেকক্ষণ কাগজে আঁকিবুঁকি আঁকলেন, একটা লাইনও লিখতে পারলেন না। কী কষ্ট- এই কষ্টটা কেউ বুঝবে না, একজন লেখকের লিখতে না পারার কষ্টটা! এক সময় তিনি অপার বিস্ময়ে লক্ষ করলেন, কাগজে তিনি অসংখ্যবার লিখেছেন মুক্তি...মুক্তি...! কাগজটা দলামুচড়া করে বীনে ফেলে দিলেন।


শখের বশে একসময় পেন্সিল স্কেচ করতেন। ভয়ংকর একটা ভূত আঁকলে কেমন হয়, যেটা দেখামাত্র গা ছমছম করবে। তিনি গভীর আনন্দে আঁকা শুরু করলেন। কতক্ষণ কেটে গেছে কে জানে! ভূতটাকে দেখে বিষণ্ন হাসি হাসলেন। ভূতটার সঙ্গে ডা. কবীরের অনেক মিল! আশ্চর্য, তার চিন্তার গন্ডিটা কত ছোট হয়ে এসেছে! ভূত আঁকলেন তাও ডা. কবীর ভূত! ধুর, কাগজ কলম ফেলে উঠে দাঁড়ালেন।
ক্ষিধে লেগেছে। কলবেল চাপতে ইচ্ছা করছে না। কবীর যে ছেলেটিকে রেখেছেন কিছু প্রয়োজন হলে বললেই এনে দেয়, খাবার-টাবার ওই দিয়ে যায়। এ মূহুর্তে ওকে ডাকতে ইচ্ছে করছে না। ফ্রীজটা খুলে অবাক হলেন না। কবীরের ফ্রিজ সম্ভবত এমনই হওয়া উচিত। একদম ঠাসা। এ মূহুর্তে কেউ যদি একটা আলুও রাখতে যায় আঁটবে না।


ফ্রিজের দরজায় লাগানো স্টিকারটা পড়লেন, "Relish Food: It will stay in your mouth for a few minutes, In your stomach for a few hours and in your hip for the rest of your life". 
হা পরম করুণাময়! ভাল লাগার সঙ্গে সঙ্গে একটা ধাক্কাও খেলেন। ফ্রীজের উপরে ছোট্ট একটা কাঁচের বয়াম। বাদাম ভর্তি, চিনা বাদামগুলোর খোসা ছাড়ানো।
আলীম এ জন্য ইরার কম খোঁচা খাননি। মা আলীমের জন্য ঠিক এমনই করে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে বয়াম ভর্তি করে রাখতেন। আলীমের বাদাম খাওয়ার ঠিক-ঠিকানা ছিল না। বই পড়ছেন, ভাত খাচ্ছেন, বাদাম খাচ্ছেন- কখনও ভাতের সঙ্গেও খেতেন।
ইরা রাগে চিড়বিড় করত: তোমার মত 'বাদাম-ভাত' কাউকে খেতে দেখিনি। আর এসব কি, খাওয়ার সময় বই পড়া! প্রায়ই দেখি তুমি বুঝতেই পার না কোন তরকারী দিয়ে ভাত খেলে। তুমি কি বলতে পারবে কাল কি দিয়ে ভাত খেয়েছ?
আলীম আহমেদের মনে পড়ত না, মুখ কাঁচুমাচু করে বলতেন: যাহ, জানব না কেন, সব্জী ছিল ইয়ের...।
ইরা চোখে আগুন নিয়ে বলত: ফাজলামো কর! এক সপ্তাহের ভেতর সব্জী খেয়েছ, তুমি সব্জী খাও?
আলীম আহমেদ বিপন্নবোধ করতেন: কি করব বলো, বদভ্যাস, খাওয়ার সময় না-পড়লে ঠিক স্বস্তি পাই না।


ডা. কবীর ইরার কাছ থেকে জেনে ঠিক-ঠিক মনে রেখেছেন। আলীম আহমেদ মন খারাপ করা নিঃশ্বাস ফেললেন, কবীরের মতো হতে পারলে বেশ হতো। কে জানে, এঁরও হয়তো কিছু অন্ধকার দিক আছে। সবাই তো আমরা এক পেট আবর্জনা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। বেশ কিছুটা প্রকৃতি ঢেকে রাখে, খানিকটা মানুষ।
ডা. কবীর আলীম আহমেদকে কিছু মুভি দেখার জন্য জোর অনুরোধ করেছেন। কেন কে জানে! নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। কবীর শুধু শুধু কোন কাজ করবেন না। কিন্তু তাঁর চিকিৎসার সঙ্গে মুভি দেখার কি সম্পর্ক? কবীর মুভিগুলো আলাদা করে দিয়ে গেছে। আলীম নেড়েচেড়ে দেখছেন। মেল গিবসনের ‘ব্রেভ হার্ট’, রাসেল ক্রোর ‘গ্লাডিয়েটর’, স্টিভ ডাসটিনের ‘প্যাপিলন’, ইংরেজীতে ডাব করা বিদেশী ভাষায় একটা মুভি ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’, তামিল একটা মুভি- হিন্দিতে ডাব করা ‘টেররিষ্ট’। আলীম প্রথমেই ব্রেভ হার্ট বেছে নিলেন। হেলাফেলা ভঙ্গিতে দেখা শুরু করলেন। অল্পক্ষণেই জমে গেলেন। নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছেন। তাঁর ভাবনার জগতে মস্ত একটা উলটপালট হয়ে গেছে।


সহায়ক লিংক:
১. ফ্রিডম, ১: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_14.html 

Saturday, August 14, 2010

ফ্রিডম: ১

আলীম আহমেদ কার্যত বন্দী জীবন-যাপন করছেন। কয়েদী। এই মাদক নিরাময় কেন্দ্রে এসেছেন মাত্র দশ দিন হয়েছে। অথচ মনে হচ্ছে কয় যুগ কেটে গেছে! তাঁর চার বছরের শিশুটির গায়ের গন্ধ- আহা, আসার সময় ওর একটা জামা নিয়ে এলে হতো। 
তার সন্তানের শেষ ডাক কবে শুনেছেন: 'এই বাবাইন্যা-এই বাবাইন্যা। মামাইন্যা আমাকে বকা দিয়েছে'। তাঁর শরীর এখানে আটকে আছে কিন্তু মনটা পড়ে আছে বাইরে। তীব্র রোদ কখনই পছন্দ করতেন না। এখন সুতীব্র ইচ্ছা হচ্ছে, ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে হাঁটতে। মনে করার চেষ্টা করছেন শেষ কবে ইরাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন। আহা, বেচারীর বেড়াবার বড় শখ। এ বছর ওঁর এক বন্ধু ফোন করার পর জানলেন ইরার আজ জন্মদিন! 
আচ্ছা, দশ দিনে কয় সেকেন্ড হয়...?

এদের এখানকার নিয়ম কানুনে হাঁপিয়ে উঠেছেন। চেষ্টা করেছেন নির্দেশগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে। এখনকার চীফ তাঁর উপর পুরোপুরি সন্তষ্ট। ভদ্রলোক এক সময় আর্মির ক্যাপ্টেন ছিলেন। ড্রাগ এডিক্ট হওয়ার কারণে তার সোনালী ক্যারিয়ার হারিয়েছেন। ওদিন রসিকতা করে বলছিলেন: আমার ক্যারিয়ার এখন টিফিন ক্যারিয়ার হয়ে গেছে। আর্মিতে আপনি কেন জয়েন করলেন এটা জিজ্ঞাসা করলে হাসতে হাসতে বলেন: 'দোজ হু জয়েন দ্য আর্মি নাইন আউট অব টেন আর ফুলস, এন্ড রিমেইনিং ওয়ান ইজ ম্যাড'।
আর্মির নিয়ম কিছু কিছু এখানেও চালু রেখেছেন। প্রথম সাক্ষাতেই আলীম আহমেদ ভড়কে গিয়েছিলেন। রাশভারি গলায় এই মানুষটা বলেছিলেন: হোয়ার দ্যা হেল ডু য়্যু কাম ফ্রম?
আরেক দিন আলীম আহমেদ পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি হুংকার দিলেন: হোয়াই ডোন্ট য়্যু উইস।


এখানকার খাবার জঘন্য। খাবারের কষ্ট কেন এটা কাউকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছেন। অবশ্য তমিজ বলছিল, খাবার অপচয়ের শিক্ষাটা দেয়ার জন্য নাকি এই ব্যবস্থা। সপ্তাহে একদিন মাছ একদিন মাংস। পানির মতো পাতলা ঝোল, মাংস সাইজে একটা তেলাপোকার চেয়ে বড়ো হবে না। তিন বেলা খাবার, দু-বেলা চা-নাস্তা। প্রতিদিন নয়টা সিগারেট। কমদামী। খাবার এবং চা-নাস্তার পর পাঁচটা ক্লাসের ফাঁকে দুইটা সিগারেট খাওয়া যাবে এবং বিনোদন, টিভি দেখার সময় দুইটা। কোন একবেলা না খেলে সিগারেট ফেরত দিতে হয়। সবার সঙ্গে খেতে হবে, নিয়ম। সিগারেট শেয়ার করা বা আধ খাওয়া সিগারেট খাওয়া গুরুতর অপরাধ। যুক্তি হচ্ছে, বাইরে অন্য সময়ে কেউ সিগারেটে ড্রাগ ঢুকিয়ে দিতে পারে।

আলীম আহমেত মনে মনে হাসলেন, বিনোদনের কী বহর! টিভিতে প্রায়ই যা-তা হিন্দি ছবি দেখায়। ওদিন ধর্মেন্দ্রর একটা ছবি দেখাচ্ছিল। ধর্মেন্দ্রর নাম "হাতড়া ইন্সপেক্টর"। কী সর্বনাশ, এ ব্যাটা হাতের মুঠোয় রিভলবারে গুলি ধরে ফেলে!
আলীম আহমদ তার ডাক্তার কবীরের উপর বেশ খানিকটা ক্ষুব্ধ। তিনি আশা করেছিলেন, ডা. কবীর প্রভাব খাটিয়ে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করবেন। কবীর টুঁ-শব্দও করেননি। আলীম আহমেদকে চারজনের সঙ্গে একটা ছোট্ট ঘরে ঘুমাতে হয়। পূর্বে তিনি কখনই কারো সঙ্গে রুম শেয়ার করেননি। এও এক যন্ত্রণা, নয়টার পর সমস্ত লাইট অফ। কী কষ্ট-কী কষ্ট! কী দীর্ঘ একেকটা রাত! এখানে আসার পর থেকেই কিছু ওষুধ দেয়া হচ্ছে। ড্রাগ বন্ধ করে দেয়ার পর শরীরে তীব্র ব্যথা হতো। পেইন কিলার টাইপের এবং সিডেটিভ জাতীয় কিছু অষুধ।


তাঁর রুম পার্টনাররা অবশ্য তাঁকে বেশ খানিকটা সমীহ করে। একদিন সাইফুল তার জামা পর্যন্ত ধুয়ে দিয়েছে। সাইফুল অসম্ভব মজার একটা ছেলে। একদিন বলছে: জানেন আলীম ভাই, আজকে দাওয়াত খেয়েছি স্বপ্নে- রোষ্ট, পোলাও, কোরমা, সালাদ, লবন, পানি কত কী।
আরেকদিন চোখ নাচিয়ে বলছে: আলীম ভাই, বলেন তো কোন জিনিস খাবার যোগাড়ের জন্য জাল বুনে, তাকে কি বলে?
আলীম বলেছিলেন: মাকড়সা।
সাইফুল হি হি করে হাসতে হাসতে বলেছিল: উঁহু, জেলে।
আরেকটা ছেলে সুকুমার। কিছু হলেই বলবে: আমি হিন্দুর পুত, আগুন হাতে লইয়া কিরা কাটলাম। কথার কথায় বলে ইয়ো বুজছনি, ইয়ো বুজছনি করে আর গন্ধকে বলে 'বুই' করে। অদ্ভুত সব কথা বলে: বাইট্টা বেডার চাইট্টা ঠ্যাং, লাফ দিয়া উডে ঘাউয়া ব্যাঙ। কিরা কাটার সময় বলবে, বিদ্যা কইলাম আমি এইটা করি নাই।
হা হা হা, একদিন কী বলছিল, গরমে মশার দাত হিড়হিড় করে। আলীম মনে করার চেষ্টা করছেন মশার কী দাঁত থাকে?


আলীম আহমেদের রুম পার্টনারদের আরেকজন তমিজ। ভারী চশমা পরা ছিপছিপে একটা ছেলে। কী মায়াকড়া চেহারা। কোন একটা স্কুলে মাষ্টারী করত। স্কুলের মজার সব গল্প বলত: ওর স্কুলে কোন এক ছাত্রী নাকি স্কুল কামাইয়ের দরখাস্ত লিখেছিল, ডায়েরিয়ার সমস্যা। ছুটির দরখাস্তের সঙ্গে চার-পাঁচটা খাবার স্যালাইনের খালি প্যাকেট সুতো দিয়ে আটকে দিয়েছিল। আরেক ছাত্রী আষাঢ়ে গল্প লিখেছিল, বৃষ্টি পড়িতেছে, ব্যাঙ ডাকিতেছে, নৌকা চলিতেছে, হুই-হুই, কী মজা!
তমিজের মাথায়ও উদ্ভট সব আইডিয়ায় ভরা। ক-দিন আগে খুব গম্ভীর হয়ে বলছে: আমার চক্ষু লজ্জা কম কারণ হলো, চোখের পাওয়ার মাইনাস ৭.৫। একদিন সিগারেটে ধরাতে গিয়ে বলছে: আলীম ভাই, আজ না আমার জন্মদিন। আগুন ধরায়া জন্মদিন পালন করতাছি।
ছেলেটা হা হা করে হাসছিল কিন্তু আলীমের চোখে জল।
আচ্ছা ভাই, 'তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে' তাহলে ডাবগাছ কি দু-পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে? ওদিন সাইফুল চকচকে একটা শার্ট গায়ে দিয়ে আগ্রহের সঙ্গে জানতে চেয়েছিল: তমিজ শার্টটা
কেমন হইছে?
তমিজ নিরীহ মুখে বলেছিল: সোন্দর, তর চামড়ার সঙ্গে ম্যাচ করছে। ব্যস, মাথা ফাটাফাটি!


আলীম আহমেদের ছেলেগুলোকে বেশ লাগত। কখনো হস্টেলে থাকেননি বলেই হয়ত ওঁর কষ্টটা বেশী হচ্ছিল। মাঝে মাঝে মনে হত স্কুল জীবনের কথা। তাঁর প্রাইমারী স্কুলের সময়টা বেশ ছিল! প্রিয় বন্ধুদের একজন ছিল মুচির ছেলে, একজন ধোপার । মুচির ছেলের সঙ্গে কী মাখামাখি। ডাংগুলিতে ওর ছিল অসম্ভব পাকা হাত! এড়ি, দুড়ি, তেলকা, চুড়ি, চম্পা, ডেগ, সুতেগ। এক লাল, দুই লাল। এক লালে আস- একটা গুদাম কেনা যেত। দুই লালে নদী। এ একে একে বাজার নদী সব কিনে ফেলত। আলীম আহমেদ নিঃস্ব। ফলাফল পিঠে দুমদুম করে কিল। আরেকটা খেলা ছিল: রস, কস, শিঙা, বুলবুল, মালেক, মোসতাক। মাঞ্জা দেয়া সুতার ঘুড়ি- ঘ্যাচ, ঘ্যাচ, ঘ্যাচ। ইস, কীসব দিন!
আলীম আহমেদের শৈশব-কৈশোর এর কাছে অনেকখানি ঋণী। হারামজাদাটা পচাই খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত মরেই গেল।


মানুষ চলে যায় থেকে যায় স্মৃতি, পাখি উড়ে যায় রেখে যায় পালক। আলীম আহমেদ অপেক্ষা করছেন মুক্তির। অপেক্ষার চেয়ে কষ্টের আর কিছু নাই! ওয়েডিং ফর গডো!

Friday, June 29, 2007

আমি জানোয়ার, ভাগীরথী মনে করিয়ে দেয়!

 
ফ্রিডম বইটিতে আমি প্রচুর উপাত্ত, লেখা নিয়েছি, মুক্তিযুদ্ধের উপর কিছু অসাধারণ গ্রন্থ থেকে। ওগুলোর মাঝ থেকে, এটা আমার অসম্ভব পছন্দের একটি লেখা। এ লেখাটি আমাকে ভাবায়, আমি যে একটা জানোয়ার এটা বারংবার মনে করিয়ে দেয়! কী অবলীলায় আমরা ভুলে যাই এই বালিকাটির আত্মত্যাগের কথা। কেমন করে বিস্মৃত হই অসমসাহসী ১০ বছরের বালকযোদ্ধা লালুর কথা!
তোতা পাখির মতো ক্রমাগত আউড়ে যাই গুটিকয়েক মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের কথা।

বিশেষ একটা মাসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাতর হই, মুখে ফেনা তুলে ফেলি। মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে হৃদপিন্ড, অনবরত ধুকধুক করে চলতেই থাকবে। যে দিন আমরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পুরাপুরি বিস্মৃত হবো, সেই দিন আমরা পরিণত হবো একটা লাশে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা বই লেখা ছিল আমার স্বপ্ন। প্রচলিতভাবে আমি লেখতে চাইনি। আমি চেয়েছি এই প্রজন্মের চোখ দিয়ে দেখতে। কোন উঁচুমাপের লোক এটা পড়লেন, না কোন সাহিত্য সম্পাদক এর আলোচনা করলেন, এতে আমার কিছুই যায় আসে না। আমি তীব্র সুখী হই এ প্রজন্মের একজন পড়লে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে খানিকটা আবেক্রান্ত হলে।

প্রবাসী আমার এক বন্ধুর অনুরোধে আমি ফ্রিডম থেকে খানিকটা এখানে তুলে দিচ্ছি:
"…বর্বরতার রেকর্ড (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অষ্টম খন্ড)
মহাদেবের জটা থেকে নয় বাংলা মায়ের নাড়ী থেকে ছিঁড়ে জন্ম নিয়েছিলেন যে সোনার মেয়ে, সে ভাগীরথীকে ওরা জ্যান্ত জীপে বেঁধে শহরের রাস্তায় টেনে টেনে হত্যা করেছে। খান দস্যুরা হয়তো পরখ করতে চেয়েছিল ওরা কতখানি নৃশংস হতে পারে। বলতে হয় ওরা শুধু সফলই হয়নি, বর্বরতার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

অষ্টাদশী ভাগীরথী ছিল বরিশাল জেলার পিরোজপুর থানার বাঘমারা কদমতলীর এক বিধবা পল্লীবালা। বিয়ের এক বছর পর একটি পুত্র সন্তান কোলে নিয়েই তাকে বরণ করে নিতে হয় সুকঠিন বৈধব্য। স্বামীর বিয়োগ ব্যথা তার তখনও কাটেনি। এরই মধ্যে দেশে নেমে এল ইয়াহিয়ার ঝটিকা বাহিনী। গত মে মাসের এক বিকালে ওরা চড়াও হলো ভাগীরথীদের গ্রামে। হত্যা করলো অনেককে যাকে যেখানে যেভাবে পেলো।

এ নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের মধ্যে ভাগীরথীকে ওরা মারতে পারলোনা। ওর দেহলাবণ্য দস্যুদের মনে যে লালসা জাগিয়েছিল তাতেই হার মানল তাদের রক্ত পিপাসা। ওকে ট্রাকে তুলে নিয়ে এল পিরোজপুরে। তারপর ক্যাম্পে তার উপর চালানো হলো হিংস্র পাশবিক অত্যাচার।
সতী নারী ভাগীরথী। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যুকে তিনি একমাত্র পরিত্রাণের উপায় বলে ভাবতে লাগলেন। ভাবতে ভাবতেই এক সময় এল নতুন চিন্তা- হ্যাঁ মৃত্যুই যদি বরণ করতে হয় ওদেরই বা রেহাই দেব কেন? ভাগীরথী কৌশলের আশ্রয় নিল এবার।
এখন আর অবাধ্য মেয়ে নয় দস্তরমত খানদের খুশী করতে শুরু করল, ওদের আস্থা অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগলো। বেশীদিন লাগলোনা, অল্প কদিনেই নারী লোলুপ ইয়াহিয়া বাহিনী ওর প্রতি দারুণ আকর্ষণ অনুভব করল। আর এই সুযোগে ভাগীরথী ওদের কাছে থেকে জেনে নিতে শুরু করল পাক বাহিনীর সব গোপন তথ্য। এক পর্যায়ে বিশ্বাস ভাজন ভাগীরথীকে ওরা নিজের ঘরেও যেতে দিল। আর কোন বাঁধা নেই। ভাগীরথী এখন নিয়মিত সামরিক ক্যাম্পে যায় আবার ফিরে আসে নিজ গ্রামে।

এরই মধ্যে চতুরা ভাগীরথী তাঁর মূল লক্ষ্য অর্জনের পথেও এগিয়ে গেল অনেকখানি। গোপনে মুক্তি বাহিনীর সাথে গড়ে তুলল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। এরপরই এল আসল সুযোগ। জুন মাসের একদিন ভাগীরথী খান সেনাদের নিমন্ত্রণ করলো তাঁর নিজ গ্রামে।
এদিকে মুক্তি বাহিনীকেও তৈরী রাখা হলো যথারীতি। ৪৫ জন খান সেনা হাসতে হাসতে বাগমার কদমতলা নিমন্ত্রণ খেতে এসেছিল কিন্তু তার মধ্যে ৪/৫ জন ক্যাম্পে ফিরতে পেরেছে বুলেটের ক্ষত নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে। বাকিরা ভাগীরথীর গ্রামেই শিয়াল কুকুরের খোরাক হয়েছে।

এরপর আর ভাগীরথী ওদের ক্যাম্পে যায়নি। ওরাও বুঝেছে, এটা তারই কীর্তি। পাক আর্মিরা তাই হুকুম দিল জীবিত অথবা মৃত ভাগীরথীকে যে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে নগত এক হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। কিন্ত ভাগীরথী তখনও জানতো না ওর জন্য আরও দুঃসহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। একদিন রাজাকারদের হাতে ধরা পড়লো ভাগীরথী। তাকে নিয়ে এল পিরোজপুর সামরিক ক্যাম্পে।

খান সেনারা এবার ভাগীরথীর উপর তাদের হিংস্রতার পরীক্ষার আয়োজন করলো। এক হাটবারে তাকে শহরের রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হলো জনবহুল চৌমাথায়। সেখানে প্রকাশ্যে তার অঙ্গাবরণ খুলে ফেলল কয়েকজন খান সেনা। তারপর দু’গাছি দড়ি ওর দু’পায়ে বেঁধে একটি জীপে বেঁধে জ্যান্ত শহরের রাস্তায় টেনে বেড়াল ওরা মহাউৎসবে। ঘন্টাখানেক রাজপথ পরিক্রমার পর আবার যখন ফিরে এল সেই চৌমাথায় তখনও ওর দেহে প্রাণের স্পন্দন রয়েছে। এবার তারা দুটি পা দুটি জীপের সাথে বেঁধে নিল এবং জীপ দুটিকে চালিয়ে দিল বিপরীত দিকে। ভাগীরথী দুভাগ হয়ে গেল।
সেই দু-ভাগে দু-জীপে আবার শহর পরিক্রমা শেষ করে জল্লাদ খানরা আবার ফিরে এল সেই চৌমাথায় এবং এখানেই ফেলে রেখে গেল ওর বিকৃত মাংসগুলো। একদিন দু’দিন করে সে মাংসগুলো ঐ রাস্তার মাটির সাথেই একাকার হয়ে গেল এক সময়। বাংলামায়ের ভাগীরথী এমনি ভাবে আবার মিশে গেল বাংলার ধুলিকণার সাথে…।"

*ভাষারীতি অবিকল রাখা হয়েছে।

Thursday, June 28, 2007

একমাত্র আদিবাসি বীর বিক্রম, উক্য চিং

(এই লেখাটা আগেও পোস্ট করেছি কিন্তু টাইমলাইনে এখন নাই। রিপোস্ট।) 

ওখানে মিসেস রাবেয়া খাতুনকে নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলাম:
ওখানে তাঁর বর্ণনার সবটা আমি কিন্তু দেইনি কেবল "এদের উপর শুধু চরম শারীরিক অত্যাচারই করেই এরা থেমে থাকেনি- অবলীলায় কেটে ফেলেছে, ছিঁড়ে ফেলেছে শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো...!" 
এটা লিখে মেয়েদের উপর নির্যাতনের ভয়াবহতা, বীভৎসতা বোঝাবার চেষ্টা করেছি। আমাদের নারীদের প্রতি পাক-বাহিনীর আচরণ এমন বীভৎস ছিল যার বর্ণনা লিখতেও বুকের জোর লাগে। সেই জোর আমার নাই! এসব পড়ার জন্যও আসলে শক্ত নার্ভ দরকার! আমি যেটা আগেও বলেছি, পাক-আর্মি, এরা আসলে যোদ্ধা ছিল না, ছিল সাইকোপ্যাথ! এই সাইকোপ্যাথদের পুরুষাঙ্গ কেটে রাস্তায় শুইয়ে রাখার মত প্রতিবাদ করেছিলেন, 'উক্য চিং'। 
জঙ্গলে চলে কেবল জঙ্গলের আইন...।
একমাত্র আদিবাসি উক্য চিং বীর বিক্রম। তিন পার্বত্য জেলার একমাত্র আদিবাসি বীর বিক্রম। তিনি বাংলাদেশের ১৭৫ জন বীর বিক্রমের একজন।
৭১ এর ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যার হাতে এলএমজি, গ্রেনেড, মর্টার গর্জে উঠেছে বারবার। মাতৃভূমিকে বর্বর পাক-হানাদার বাহিনীর কবল থেকে স্বাধীন করতে মরণপণ যুদ্ধে যিনি ১৩ জন সদস্য নিয়ে অংশগ্রহন করেছেন। দুঃসাহসী এ যোদ্ধার প্রতিটি অভিযান শত্রুসেনার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। একের পর এক বর্বর পাকিস্তানি সেনারা লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে।

কেবল একটা ঘটনার কথা বলি: ভুরুঙ্গমারীর যুদ্ধে উক্য চিংদের সাফল্য ছিল অন্যদের জন্য অহংকার করার মত! মুক্তাঞ্চল থেকে স্বয়ং মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ছুটে এসেছিলেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যুদ্ধের সাফল্যের কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেন, উক্য চিংদের বান্কারের মুখে একটা এলএমজির ট্রিগারে রশি বেঁধে সেই রশিটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অনেক দূরে। সেখান থেকে রশিতে টান দিয়ে অনেকটা রিমোট কন্ট্রোলের মত এলএমজি ব্যবহার করা হয়েছে!
উক্য চিং একবার একটি ছোট্ট ব্রিজের নীচে সার্চ করে দেখেন সাত-সাতটি রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন নারীদেহ। তখনও কারো জামায় শোভা পাচ্ছে ঝকঝকে ফাউন্টেন পেন। বুঝতে সমস্যা হয় না এরা স্কুল-কলেজের ছাত্রী, বয়স ১৬ থেকে ১৮। পাক বাহিনী দ্বারা চরম পৈশাচিক নির্যাতনের পর এদের হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এই উক্য চিং, যিনি বাঙালী নারীদের ওপর পাক সৈন্যদের বর্বর নির্যাতনের প্রতিবাদে পাক বাহিনীর এক কমান্ডারসহ সাত সেনাকে ধরে তাদের পুরুষাঙ্গ কেটে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে রেখেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার যে অল্প পড়াশোনা কিন্তু তারপরও আর কোথাও এমন প্রতিবাদ আর কেউ করেছিলেন বলে অন্তত আমার জানা নাই। অথচ এই অগ্নিপুরুষকে এক বিজয় দিবসে বান্দরবান টাউন হলে ১০০ টাকার প্রাইজ বন্ড দিয়ে সম্মানিত (!) করা হয়েছিল!
অশ্রুসজল চোখে উক্য চিং বীর বিক্রম তখন প্রশ্ন রেখেছিলেন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ২০০০-এর কাছে:
'কেন এই প্রাইজ বন্ড দিয়ে আমাদের লজ্জা দেয়া'?  
উক্য চিং বীর বিক্রম বললেন, ‘দ্যাখেন, করাচি থেকে পূর্ব পাকিস্তানে এসে ‘৭১ সালে কেমন গোল খেয়ে গেল পাকিস্তানিরা! বলেই হা-হা- করে হেসে উঠলেন। কথা বলছেন আর বুকে ঝোলানো মেডেলগুলো ঝন ঝন করে উঠছে।
এডামুই পাইং সংঘ থেকে গত তিন বছর ধরে উক্য চিং এর নামে মেধা বৃত্তি চালু হয়েছে। প্রথম শ্রেণীর স্কুল-ছাত্র ‘অনীক’ জানে না কার নামে এ বৃত্তি, কেন এ বৃত্তি কী তার ভূমিকা?
অনীকের দোষ দিয়ে লাভ কী! আমরা স্বাধীনতার এতো বছর পরও বেমালুম ভুলে গেছি আরেকজন আদিবাসি-আদিনারি প্রিনছা খেঁ-র কথা। ভাগিরথীর কথা। কী অবলীলায় ভুলে যাই, লালু'র কথা।) ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধঅ সুরুয মিয়া আত্মহত্যা করলে এতে আমাদের কোন লাজ নাই! আসলে ভুলে যেতে হয় কারণ এখন  মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে একটা বিক্রয়যোগ্য পণ্য! যে যেভাবে পারছে বিক্রি করছে!

*একজন একবার এক পত্রিকায় চিঠি লিখেছিলেন। উক্য চিং পাকসেনাদের পুরুষাঙ্গ কেটে হত্যা করে রাস্তায় শুইয়ে রেখেছিলেন এই বিষয় নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। তার দৃষ্টিতে এটা নৃশংসতা, জেনেভা কনভেনশন ইত্যাদি...। বটে রে! পাক আর্মিদের সীমাহীন নৃশংসতা কয়টা উদাহরণ দেব? কেবল এই একটাই কী যথেষ্ঠ না?
WhatsApp