Friday, June 29, 2007

মুক্তিযুদ্ধ, বিদেশী মিডিয়ার চোখেঃ ১

*শকুনে শকুনে ছেয়ে গেছে আকাশ। ইতিমধ্যে আড়াই লাখ বাঙ্গালীকে পেয়েছে খাদ্য হিসাবে। কচুরীপানার মাঝে শিশুর চোখের সামনে ভাসছে তার পিতা-মাতার লাশ পচে যাওয়া লাশ।
(এপি/ ১২ মে, ১৯৭১)

*ঈশ্বর আর অখন্ড পাকিস্তানের দোহাই দিয়ে ঢাকাকে পরিণত করা হয়েছে বিধ্বস্ত ও সন্ত্রস্ত নগরে। পাকিস্তানী সেনাদের ২৪ ঘন্টা শেল নিক্ষেপে নিহত হয়েছে ৭ হাজার মানুষ আর ধ্বংস হয়েছে বিস্তৃত জনপদ। ছাত্ররা বিছানায়, অগ্নিদগ্ধ বাড়িতে অজস্র শিশু এবং মহিলার লাশ পাওয়া গেছে। 

ইকবাল হলে হত্যা করেছে ২০০ ছাত্রকে। ২দিন পরেও দেখেছি অগ্নিদগ্ধ ছাত্রদের লাশ ধিকিধিকি জ্বলছে, কিছু ছাত্রের লাশ পচে গিয়ে ভাসছে পার্শবর্তী পুকুরের পানিতে। অন্য একটি ছাত্রাবাসে সৈন্যরা মৃত ছাত্রদের কোনমতে খোঁড়া গর্তে গণকবরে মাটি চাপা দিয়ে তার উপর দিয়ে ট্যাংক চালিয়ে দেয়।
(দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফস/ ৩০ মার্চ, ১৯৭১)

*পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে। এদের লক্ষ্য হচ্ছে, এই দেশের রাজনৈতিক শক্তি ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে সমূলে ধ্বংস করা।
(দ্য টাইমস লন্ডন/ ২ এপ্রিল ১৯৭১) 


*রাথোর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের একজন মেজর হাসতে হাসতে আমার চোখের সামনেই একজন দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষকে পেছন থেকে গুলি করে মেরে ফেলে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, শুধু শুধু ওকে মারলেন কেন?
মেজর বলল, কারণ সে হিন্দু হতে পারে।
আমি বললাম, কিভাবে বুঝলেন ও হিন্দু? আর হিন্দু হলেই মেরে ফেলতে হবে কেন?
মেজর এবার রেগে গিয়ে বলল, আপনি জানেন না ওরা কিভাবে পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে চেয়েছে? আমরা ওদের শেষ করে ফেলব।
(সানডে টাইম লন্ডন/ ১৩ জুন, ১৯৭১)

*আমি যে সব পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের পরিবারের কোন না কোন আপনজন নিহত হয়েছেন এবং স্ত্রী বা কন্যার শ্লীলতাহানী হয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই সাড়ে সাত কোটি মানুষের উপর পাকিস্তানী সেনারা নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে।
(জন পিলগার, ডেইলি মিরর লন্ডন/ ১৬ জুন, ১৯৭১)

*বিশ্ববাসী হিটলারের নৃশংসতার পর সমমাত্রায় আর এক নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করছে পাকিস্তানে। লাখ লাখ বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
(সম্পাদকীয়, ওয়াশিংটন পোস্ট/ ৩০ জুলাই, ১৯৭১)

*পাকিস্তানের সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের মাটিতে স্থাপিত ক্যাম্প ও অস্থায়ী হাসপাতালগুলো একবার ঘুরে আসলে বোঝা যাবে পাকিস্তানী আর্মীদের নিষ্ঠুরতা! আমি গুলিবিদ্ধ শিশুকে দেখেছি আধকাটা পশুর মতো কাতরাতে। দেখেছি সেইসব নির্বাক হয়ে যাওয়া মানুষদের, যাদের চোখের সামনে প্রকাশ্যে হত্যা অথবা ধর্ষন করা হয়েছে তার কোন প্রিয় মানুষকে।
(নিউজ উইক/ ২৮ জুন, ১৯৭১)

*মৃতের কোন হিসেব নেই। কতো বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়েছে এর সরকারী হিসেব কর্তৃপক্ষ এখনো প্রকাশ করেনি। একজন পাকিস্তানের কমান্ডারের উক্তি, শত্রুর লাশ গণনা করে সময় নষ্ট করার মতো সময় আমাদের নেই। মেরে পানিতে ভাসিয়ে দিলেই আমাদের কাজ শেষ।
(দ্য নিউইয়র্ক টাইমস/ ৯ মে, ১৯৭১)

তথ্য ঋণঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, কিছু ঋণঃ বিচিন্তা/ ১৩.১২.১৯৯১