Search

Loading...

Sunday, March 21, 2010

মা'র কাছে ফেরা



(এটা পুরনো লেখা, একজনের অনুরোধে রিপোস্ট)

মার হাতের চুড়ি কেবল এই বাক্যটা পড়েই কেমন বুকটা ধক করে উঠল। সুতীব্র ইচ্ছা হল, মাকে নিয়ে একটা লেখা দেই।

যাই হোক, অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল। সালটা সম্ভবত ৯০। একজন মার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। বয়স ষাটের কাছাকাছি। তিনি হাত ভরে কাঁচের চুড়ি পরতেন যা অনেকের চোখে বৈসাদৃশ্য ঠেকত। তাঁর স্বামী নাকি খুব পছন্দ করতেন, কখনও খুলতে দিতেন না। চুড়ির প্রসঙ্গ ধরেই তাঁর প্রতি আমার আগ্রহটা সৃষ্টি হয়েছিল।

স্বামী নিরুদ্দেশ হওয়ার পর একমাত্র সন্তানকে তিল তিল করে বড় করেছিলেন। সন্তানটা ছিল মেধাবী। কালে কালে সে একটা বহুজাতিক কোম্পানির বড় কর্তা হয়। ঝাঁ চকচকে বাড়ি, অফিস, পুতুলের মত বউ। বাড়িতে ককটেল পার্টি, কিটি পার্টি হরদম লেগেই থাকে। অল্প-শিক্ষিত মাকে নিয়ে বড় যন্ত্রণা। সন্তানটা বেড়ালের মত মাকে দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের এখানে ফেলে দেয়। ওই মাটা দিনের পর দিন তাঁর স্বামীর অপেক্ষায় থেকে থেকে ক্লান্ত যখন, তখন আশায় বুক বাঁধেন, সন্তান তাকে এখান থেকে একদিন নিয়ে যাবে।

এতসব আমার জানা হত না। চুড়ির প্রসঙ্গ ধরেই জানা। আসার সময় তাঁর শীর্ণ হাত দিয়ে আমার হাত ধরে কথা আদায় করে নিয়েছিলেন, আবার আসলে যেন তাঁর সন্তানকে নিয়ে আসি। আমি কথা রাখতে পারিনি!
তাঁর সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি যে কথাগুলো বলেছিলেন, তা সীসার চেয়ে ভারী। মোদ্দা কথা, আমার মার চেয়ে মাসীর দরদ বেশি, ইত্যাদি ইত্যাদি।

ফিরে আসার পর এই স্কেচটা করেছিলাম। আমি জানি ওই মার আদলের সঙ্গে হয়তো এর কোন মিল নাই। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? এ গ্রহের সব মার চেহারাই কী এক না?
আজও আমি এই কষ্টটা লালন করি। এবং অভিশাপ দেই, এমন সন্তান হওয়ার চেয়ে আমার নিজের সন্তানের যেন শৈশবেই মৃত্যু হয়। ওই অন্ধকার দিক নিয়ে এখন আর লিখতে ইচ্ছা করছে না।

'মার কাছে ফেরা' এটা পুরনো কিন্তু আমার পছন্দের লেখা। এই লেখাটা উৎসর্গ করি সেই দুখি মাকে। তাঁর সন্তানকে তাঁর কাছে নিতে পারিনি, নতজানু হয়ে মাটার কাছে ক্ষমা চাইছি...।

-----------------------

:মার কাছে ফেরা: (শুভর ব্লগিং থেকে)
"আমাদের সৃষ্টির পেছনেও একটা ছক আছে। আমরা তো আর ভার্চুয়াল বেবী না! বাবার কাছ থেকে ধার করে, মার গর্ভে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পরম নির্ভাবনায় শুয়ে থাকা। ন্যানো ডট থেকে ক্রমশ ভ্রুণ। ‘বৌন অভ মাই বৌন, ফ্লেশ অভ মাই ফ্লেশ’- মার শরীরটা নিংড়ে, ছোবরা বানিয়ে ক্রমশ বেড়ে ওঠা!

সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত মাকে সহ্য করতে হয় অমানুষিক যন্ত্রণা তবুও তাঁর আনন্দের শেষ নেই, এইটুকুন মাংস পিন্ডটাকে দেখে কী অপার্থিব আনন্দই না হয় তাঁর! কোথায় উধাও হয় আধ-জবাই পশুর সেই অপার্থিব কষ্ট!
ঈশ্বর নাকি তাঁর মমতা বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, "আমি আমার সমস্ত মমতা মাদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছি।"

একজন মানুষ প্রথমে তার পরিবারের জন্য, একটা পরিবার তার গোত্রের জন্য, গোত্র তার দেশের জন্য। আর এই দেশ হচ্ছে সবার মা। আমরা চট করে বলে ফেলি, এই দেশ আমাকে কি দিয়েছে কিন্তু দেশ তো কখনই জানতে চায় না তুমি আমার জন্যে কি করেছ? যেমন জানতে চান না আমাদের মা- খোকা, তুই আমার লাইগা কি করলি?
আমরা দুম করে বলে ফেলি, কী সব ছাতাফাতা স্বাধীনতা! আসলে স্বাধীনতা কি, এটা জানতে হবে কোন প্যালেস্টানী, ইরাকীর কাছ থেকে! মা কি, এটা জানতে হবে যার মা নাই তার কাছ থেকে!

আমাদের দেশটা ভারী নোংরা, হরেক রকম কষ্ট। দেশমাটাও বড় আটপৌরে, ভারী অসহায়। তবুও এই দেশেই আমরা বুক ভরে শ্বাস নেই। খাবার জোগাবার জন্য দেশমার কী প্রাণান্তকর চেষ্টা। একটা আমের বড়া চুষে চুষে সাদা করে ফেলি, অবহেলায় আমরা দিগ্বিদিক ছুঁড়ে ফেলি। কী অনায়াসেই না এর মধ্যে থেকেও তরতর করে একটা গাছ বেড়ে উঠে! চারদিক সবুজ আর সবুজ- শস্য, ফলে ছেয়ে থাকে সব। কিন্তু বজ্জাত সন্তানগুলো সবার মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নিলে মার তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ব্যতীত কীই বা করার থাকে? কিন্তু তাই বলে কি কেউ তার গ্রাম্য দেশমা-র সঙ্গে বিদেশী ধপধপে মা অদল-বদল করতে সম্মত হবে?

দেশে মার শরীরের গন্ধে আমাদের দমবন্ধ ভাব হয়। কখনও কখনও অমানুষের মত অস্ফুটে মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, 'তুমি যে কী মা, শরীরে পেয়াজ-রসুনের গন্ধ। ছি'!
মা অজান্তে শ্বাস চাপেন। তাঁর আর্দ্র চোখে আটকে থাকে গোটা সূর্যটা, পলক ফেললেই উপচে পড়বে। জান্তব চোখে তিনি পলকহীন তাকিয়ে থাকেন।
প্রবাসিরা গায়ে কত কিছু মাখেন, সুগন্ধের মৌতাত হপ্তাহ ছাড়িয়ে যায়, জামা ধুলেও। কিন্তু কী এক বিচিত্র কারণে মার গায়ের গন্ধের জন্য পাগল হয়ে থাকেন। পাগলসব!

মুদ্রার অন্য পিঠ। একজনের মা একটা কিছু (বলার মত কিছু না, নারকেলের নাড়ু) সাথে দেয়ার কথা বলতেই সু-পুত্র হড়বড় করে বলে উঠেন, 'আরে না, দরকার নাই-দরকার নাই'।
তবুও তার মা মৃদু স্বরে বলেন, 'না মানে...তোর লাইগা...'।
'আরে, জ্যাকসন হাইটসে সব পাওয়া যায়। সব-সব'।
আজকাল বাইরের শপিং-মলগুলোয় মার আবেগও বিক্রি হওয়া শুরু হয়ে গেছে! বেশ-বেশ!

যে মায়াভরা মুখটা কেবল অনর্থক বকেই মরত, "খোকা এইটা খাস নে-ওইটা খাস নে। রোদে ঘুরতাছিস ক্যান রে, বান্দর! চামড়াডা পুইড়া কেমুন ছালি-ছালি হইছে। তোর শইলের রঙ দেইখা কাউয়াও হাসব। পাগলা, না-খায়া যাস নে, গেলে তুই কিন্তুক আমার মাথা খাস। তুই এমন হইলি ক্যান- তুই না, তুই না, তুই একটা পাগলু।"
বোকা মা তার সন্তানকে কত চিঠিই না লিখেছে, চিঠির মধ্যে অসংখ্য গোল গোল বৃত্ত এঁকে দিয়েছে! পাগলীটা আবার লিখেছে, "খোকা, আমি তোর জন্যে কান্না করি, দেখ না, চিঠিতে এই যে গোল গোল দাগ, এখানে আমার চোখের পানি পড়েছে।"
মাটা এমন বোকা!

মা তার সন্তানের পথ চেয়ে বসে আছে, এই পথ দিয়েই তার সন্তান ফিরবে। আহারে, খোকা এতটা পথ হেটে আসবে কি ভাবে? আচ্ছা, হুট করে রাতে যদি চলে আসে? আমি ঘুমিয়ে পড়লে, খোকার ডাক শুনব তো? পাগলীটা আবার সন্তানের সেই ছোটবেলার জামাগুলো নাকে শুঁকে, সে নাকি তাঁর বাবুটার-তাঁর পাগলু খোকাটার গায়ের গন্ধ পায়!
মাটা এমন বোকা কেন!
মা’টা ভাবে, আহারে-আহারে, এই মাটির টুকরাটা দিয়ে ছোটবেলায় বাবুটা কি খেলাই না খেলত! জলভরা চোখে মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, একটা লাল টুকটুকে বলের জন্য বাবুটা কতবার গাল ফুলিয়ে বসে থেকেছে! কিনি দিতে পারিনি।

মা এবং আমাদের দেশমা, আমাদের অপেক্ষায় আছেন। আমরা ফিরব কি ফিরব না, এ সিদ্ধান্ত আমাদের!


*www.newsagency24.com চোরের এক আস্তানার নাম: https://www.facebook.com/ali.mahmed1971/posts/10151517933607335?notif_t=like  


**ছবি-স্বত্ব: আলী মাহমেদ

2 comments:

সুমন said...

কাউকে বলা হয়নি, আজ বলছি। আমি দেশে ফীরে যাচ্ছি কমাস বাদেই।

।আলী মাহমেদ। said...

আসেন-আসেন, এক সাথে বিড়ি খাই না ম্যালা দিন...।