Search

Showing posts with label আমাদের ইশকুল: তিন. Show all posts
Showing posts with label আমাদের ইশকুল: তিন. Show all posts

Saturday, January 22, 2011

ফরমালিন ভর্তি জার খুঁজছি

আগেও লিখেছিলাম, তিনটা স্কুলের মধ্যে [১] তিন নাম্বার স্কুলটা নিয়ে আমার আগ্রহ প্রবল কারণ এখানে কাজ করার রয়েছে বিপুল সুযোগ তেমনি আমার নিজের শেখার সুযোগও সীমাহীন। স্কুলগুলোর মধ্যে এই স্কুলটা [২] খানিকটা অন্য রকম। এখানে খুব দ্রুত শিক্ষার্থী পরিবর্তন হয়। ক-দিন আগে প্রায় ১৫জন আসা বন্ধ করে দিল। টিচারের খুব মন খারাপ। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এরা সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়েছে। টিচার বিষণ্ণ হলেও আমি আনন্দিত কারণ এরা সরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি, এও কম কী!
অন্য দুইটা স্কুলে কেবল হরিজনদের বাচ্চারা বা অন্ধদের বাচ্চারাই পড়ে। কিন্তু এই স্কুলে যেসব বাচ্চারা আসে এদের কারও বাবা নেই তো কারও মা। কারও আবার বাবা-মা কেউই নেই! অনেক শিশুর নিম্নবিত্ত বাবা-মাদের বিচিত্র সব পেশা। এর মধ্যে স্টেশনে ভাত বিক্রি থেকে শুরু করে গাঁজা বিক্রি কোনটাই বাদ নেই। আরও কিছু পেশা আছে এটা নিয়ে বিস্তারিত বলতে চাচ্ছি না। আমার আজকের লেখার সঙ্গে এর খুব একটা যোগ নেই।

এই স্কুল থেকে আমি নিজে শিখেছি বিস্তর। যেমন একদিন এদের মধ্যে জরীপ চালালাম, বড় হয়ে কার কি হওয়ার ইচ্ছা? অনেকের পছন্দ বাসায় কাজ, টেম্পু চালানো। আমরা আসলে আমাদের দেখা বৃত্ত থেকে বের হতে পারি না।
আমি গলায় হতাশা নিয়ে বলেছিলাম, কেন তোমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হতে চাও না? এদের অবিশ্বাস ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে আমি ব্যাখ্যা দেই ড. আতিউর রহমান কেমন করে রাখাল থেকে একজন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর হয়েছেন।

যাই হোক, মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে গেছি। এখান থেকে আমার বিস্তর শেখা নিয়ে অন্য কোন দিন লেখা যাবে। কিছু দিন ধরে এই স্কুলটা নিয়ে আমি অনেকখানি অস্বস্তির মধ্যে ছিলাম। যেখানে এই স্কুলটা চলছিল ওখানে আমাদেরকে কোন ভাড়া দিতে হতো না এটা সত্য কিন্তু আমি এখানে কাজ করে ঠিক আরাম পাচ্ছিলাম না। মাগনা গরুর দাঁত দেখার চেষ্টা করতে নেই এটা আমি জানি না এমন না, বিলক্ষণ জানি, তবুও। অন্য স্কুল দুটায় এই হ্যাপা নেই। একটা চলে ভাড়া ঘরে, অন্যটায় স্কুল ঘর করে দেয়া হয়েছিল।

যারা আমাদেরকে স্কুল চালাবার জন্যে জায়গা দিয়েছেন এরা হুটহাট করে একটা মিটিং দিয়ে বসেন, তখন স্কুল লাটে উঠে। অথচ এদের মিটিং-ফিটিং পূর্ব নির্ধারিত বলে এটা এই স্কুলের শিক্ষককে জানিয়ে দিলে ওই দিন আমরা স্কুল ছুটি দিয়ে দিতে পারি। এতে তো কোন সমস্যা নেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত এরা কখনই আমাদেরকে আগাম জানাননি! অথচ জানালে আকাশ ভেঙ্গে পড়ত না। ছোট-ছোট বাচ্চাদেরকে যখন মিটিং-এর নামে এখান থেকে বের করে দেয়া হয় তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ব্যতীত আমাদের করার কিছুই থাকে না। এখানে আরও কিছু জটিলতা আছে যেটা জনে জনে আলোচনা করা সমীচীন না। 
কোথাও, ভাড়ার ঘরে একটা ব্যবস্থা হয় কি না এটা বেশ কিছু দিন ধরে আমি চেষ্টা করছিলাম কিন্তু ঠিকঠাক মতো হয়ে উঠছিল না!
বাচ্চাদেরকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া, কালও তাই হলো। শেষ অবধি এই সিদ্ধান্তটা নিতেই হয় এখানে আর স্কুল রাখা যাবে না। অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হবে, এখুনি। কিন্তু কোথায়? এটার উত্তর আমার জানা নেই। আছে কেবল জেদ। জেদ পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়, এই স্কুলটা যদি আমি একদিনে দাঁড় করাতে পারি তাহলে একদিনে অন্য কোথাও স্থানান্তরও করতে পারব।

পায়ের নীচে সর্ষে- পাগলের মত ঘুরছি। কিছু-না-কিছু একটা হয়েই যাবে আমার এই ধারণায় বড়ো ধরনের ফাঁক ছিল। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম এখন ফরমালিনের জয়-জয়কার। সব কিছু এখন ফরমালিনে চুবিয়ে রাখা হয়, আমাদেরকেও। একেকটা লাশ, অবিকৃত।
একটা সরকারি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির সঙ্গে কথা বললাম, 'ভাড়া দিয়ে হলেও একটা ঘর পাই কিনা খুঁজছি, পেলেই চলে যাবে। আপনাদের স্কুল তো বিকালে ছুটি থাকে, আপাতত স্কুল চালাবার জন্য কেবল একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন? সভাপতি বললেন, 'ইউএনও সাহেবের সাথে কথা বলেন'।
আমি মনে মনে বললাম, চুভাই, তাহলে তুমি নিজের বউয়ের পতি হওয়ার পাশাপাশি সভাপতি হয়েছ কেন?
একে ধরি ওকে ধরি ফলাফল এক পরম শূণ্য- অবাক হচ্ছি বড়, কারও শোনার মত সময়টুকুও নাই! শ্লা, আমি ব্যতীত সবাই দেখি ভারী ব্যস্ত!

মাত্র ক-দিন আগে পৌরসভার নির্বাচন শেষ হলো। অরি আল্লা, তখন দেখি লোকজন জনসেবা করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলেন; পারলে গায়ের কাপড়ও খুলে দিয়ে দেন-নাংগা ঘুরে বেড়ান! 'ওই আসে জনসেবক' শত-শত মাইকে এই নিনাদে পারলে পাঁচ মাসে বাচ্চা হয়ে যায়। তখন আমাদের মাথার উপর জনসেবকদের লাখ-লাখ পোস্টার, এই পোস্টার নিঃস্ব, শীতার্তদের কী কাজে লাগেছে কে জানে! এরি নাম গণতন্ত্র! এরি নাম জনসেবা? জনসেবা জিনিসটা কী এটাই জানা হলো না এখনও।

ভাল লাগে না, ভাল লাগে না আমার; ইচ্ছা করে কাপড়-চোপড় খুলে ফরমালিনভর্তি একটা জারে ঢুকে পড়ি...।

সহায়ক সূত্র:
১. স্কুল...: http://tinyurl.com/39egrtn
২. স্কুল তিন: http://tinyurl.com/327aky3

Tuesday, November 2, 2010

বেদনা-আনন্দ, ক্রোধ-উপশম

পাক্কা ২দিন পর ল্যাপটপ হাতে পেয়েছি। ভাল কথা, ল্যাপটপের বাংলা কি? পত্রিকাওয়ালারা মোবাইল ফোনের বাংলা মুঠোফোন করলে ল্যাপটপের বাংলা কি করবেন? 'কোলশীর্ষ?
যাগগে, এমনিতে বোমা মারলেও লেখা বেরুতে চায় না কিন্তু এই ২দিন কেবলই মনে হতো, কত কি লেখা জরুরি। ভাবখানা এমন, চালু চাপকলের মত পানির বদলে লেখা বের হতো! পরশু দিন বিকেল থেকেই যন্ত্রটা বিগড়ে গেল। ডেস্কটপ হলে দু-চার ঘা মারা যেত কিন্তু অতি ক্ষুদ্র প্রাণ, বেচারা!

এখন চমৎকার কাজ করছে দেখে আনন্দ হচ্ছে কিন্তু মনটা বড়ো বিষণ্ণ হয়ে আছে। সমস্যাটা সম্ভবত অপরেটিং সিস্টেমে ছিল- আমার জন্য ভারী বিরক্তিকর একটা কাজ। তো, যার কাছে ল্যাপটপটা  দিয়েছিলাম এটা দেখে দেয়ার জন্য ওই মানুষটা আমার অতি প্রিয়।
এর পেছনের গল্পটা খানিকটা না-বললেই নয়, জানি না কেন, এই মানুষটা কেবল আমার লেখা পড়েনই নি; তাঁর দাবী, কাছা মেরে সমস্ত লেখাই নাকি পড়েছেন। বিশ্বাস করা কঠিন কিন্তু তিনি যে বানিয়ে বানিয়ে বলছেন না এটার পরীক্ষায় অবলীলায় পাশও করেছেন! কথায় কথায় তাঁকে একদিন আমি বলেছিলাম, আপনার জন্য সাতখুন মাপ। না বলে উপায় কী, আমার মতো অভাগার ভাগ্যে এমন মানুষ লাখে ক-টা মেলে? কিন্তু আজ তাঁর এই অপরাধটা ক্ষমা করতে পারছি না।

এই ২দিন তাঁর কাছে আমার এই যন্ত্রটা ছিল। তিনি আমার এই ল্যাপটপের তথ্যগুলো কেবল খুঁটিয়ে খুঁটিয়েই দেখেননি, এটাকে অযাচিত ব্যবহারও করেছেন। এমন কিছু কান্ড করেছেন যা আমার জন্য ভারী বিব্রতকর- কে বলেছে তাঁকে এই ঢোলটা আমার প্রয়োজন! এমনিতেও আমি নিরিবিলিতে থাকা মানুষ, ঢোল-ঢাল খুব একটা বাজাতে ভাল লাগে না।
তিনি কেমন করে ভাবলেন এটা আমি টের পাব না! কার কাছে এই বেদনার কথা বলি! তাঁর জানামতে আমার উপকার করার চেষ্টা...।
এটা সত্য এর পেছনে কাজ করেছে আমার প্রতি তাঁর মমতা তবুও তাঁর কি একবারও মনে হলো না কাজটা বিশ্বাস ভঙ্গের সামিল। এ যে অপরাধ, ঘোর অপরাধ। আমার প্রতি তাঁর সমস্ত মমতা ছাপিয়ে যাচ্ছে এই অপরাধ। অনুভূতিটা কাছ থেকে ছুঁরি খাওয়ার অভিজ্ঞতা।

আজ বেছে বেছে সব মনখারাপ করা ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটছে। দুপুরে একজন পুরনো পত্রিকা দেখিয়েছেন। না-দেখলেই ভাল হতো। মুনসুর আলম নামের এক ছেলে এক স্কুলছাত্রীকে কেবল উত্ত্যক্তই করে আসছিল না, রিকশায় উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। লোকজন তাকে ধরে পুলিশে দেয়। পুলিশ একে আদালতে উঠালে সে আদালতে ১০০ টাকা জরিমানা দিয়ে মুক্তি পায়। [১] (কালের কন্ঠ, ০১.১১.১০)

গুড। মিডিয়া এখন ইভ টিজিং [২] নিয়ে উত্তাল কিন্তু এরিমধ্যে একি কান্ড! এখন থেকে এমন নায়ককে পেলে পকেটে ১০০ টাকাও গুঁজে দিতে হবে কারণ বেচারাদের যে ১০০ টাকা জরিমানা দিতে হয়। আহা, নায়ককে এই সুবিধাটুকু না-দিলে কেমন করে হয়!
অভাগা দেশ, অভাগা আইন! এখনও আমরা আমাদের আইনটাই ঠিক করতে পারলাম না। ১০ টাকা দেয়া হয় একজন হাজতিকে তিনবেলা খাবার জন্যে! পূর্বে এক লেখায় আমি লিখেছিলাম:
"...এই দেশের অধিকাংশ আইন এখনো ব্রিটিশদের করা। রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ৭৫০টি আইনের মধ্যে মাত্র ৯৭টি আইন বাংলায়, বাকীসব ইংরাজিতে! আবার আমরা লম্বা-লম্বা বাতচিত করি, ভাষা আন্দোলন, শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। ছাতাফাতা!..."
আমরা আমাদের প্রভু ব্রিটিশদের এখনো ভুলতে পারি না, প্রভু বলে কথা! কাজের কথা বলি, এই যে ১০০ টাকা জরিমানা- বিষয়টা কি? আইন কি চাচ্ছে? আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নেই?


মাঝখানে শিক্ষক
এমনিতে আজ খানিকটা ভাল লাগার দিন কারণ তিনটা স্কুলের মধ্যে কেবল এই স্কুলটার ড্রেস বাকী ছিল, খানিকটা সমস্যা ছিল। আজ স্টেশনের স্কুলটার [৪] প্রায় সমস্ত বাচ্চাদের ড্রেস দেয়া হয়েছে। সবাইকে জড়ো করে ছবি উঠিয়ে বাসায় ফিরেছি মাত্র ; ভাগ্যের পরিহাস! অকল্পনীয় এক ঘটনা ঘটে যায়, অন্তত এখানকার জন্য। স্টেশনের স্কুলের টিচার তাহমিনা আমাকে ফোন করেন, ৫/ ৭জন ছেলে বাইরে থেকে এসে স্কুলের ভেতরে সিগারেট খাচ্ছে, আজেবাজে কথা বলছে, স্কুলের মেয়েদেরকে উত্ত্যক্ত করছে। ৩জনকে সে চিনতে পেরেছে।
নামগুলো শুনে আমি ধাক্কার মত খেলাম, এই ছেলে তিনটা তো এই স্কুলেই বেশ কিছুদিন পড়েছে। এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না বিধায় স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। এরা! আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

আমি যেতে যেতে সব উধাও। এই বিষয়টা জানার পর কয়েকজন আমাকে যেটা বললেন সেটা শুনে আমার ক্রোধ আরও বাড়ে। এদের বক্তব্য হচ্ছে, এটা নিয়ে এখন নাড়াচাড়ার প্রয়োজন নাই পরে আবারও সমস্যা হলে তখন না-হয় দেখা যাবে।
আমি দুর্দান্ত ক্রোধ গোপন করে বলি, তার মানে এদের আরও বড়ো অপরাধ করার জন্য সুযোগ করে দেই, নাকি? তারচেয়ে আরও সহজ করে বলেন, স্কুলটা বন্ধ করে দেই। স্কুলও নাই, উত্ত্যক্তকারীও নাই, কি বলেন?
আমি এদের সদয় পরামর্শ উপেক্ষা করি। আমি মহান কোর্ট না যে ১০০ টাকা জরিমানা নিয়ে তাদেরকে পরবর্তীতে চরম অপরাধ করার জন্য সুযোগ করে দেব। আমার এতো মহান হয়ে কাজ নেই...।

অফটপিক:
জঙ্গলে ফাস্টফুড পাওয়া যায় না। জঙ্গলে চলে জঙ্গলের কাজ-কারবার। সাপ-ব্যাঙ যা পাওয়া যায় তাই খেতে হয়। ওখানে মাই লর্ড নেই, আছে কেবল জঙ্গলের আইন।

 সহায়ক লিংক:
১. কালের  কন্ঠ: http://www.dailykalerkantho.com/epaper/pop_up.php?archiev=yes&arch_date=01-11-2010&img_name=2010/11/01/newspaper/images/01_104.jpg
২. উত্ত্যক্তকারী: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_31.html
৩. ইংরাজি আইন: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_9242.html
৪.  আমাদের ইশকুল: http://tinyurl.com/327aky3     

Wednesday, October 27, 2010

পশুটার গায়ের গন্ধ

পূর্বের কোন লেখায় আমি লিখেছিলাম, "আমাদের সবার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটা শিশু এবং একটা পশু। এদের মধ্যে মারামারি লেগেই থাকে হরদম। কখন যে কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে এটা বলা মুশকিল"।
এই পশুটাকে কাবু করার জন্য আমাদের চেষ্টার কমতি নেই। আমরা আমাদের অর্জিত সমস্ত জ্ঞান ব্যয় করি এর পেছনে, এটা অবশ্য অন্ধকারে অচেনা ঢিল ছোঁড়ারই নামান্তর!
আমাদের বলতে আমি সাধারণদের বোঝাচ্ছি। সাধু-টাধুদের এই হ্যাপা নেই কারণ এদের মধ্যে আবার লুকিয়ে থাকবে কে, এরা নিজেরাই তো থাকেন লুকিয়ে, লোকচক্ষুর অন্তরালে! 

স্টেশনের স্কুলটা [১] নিয়ে আমাকে হিমশিম খেতে হয় কারণ এখানকার কিছু শিক্ষার্থী আছে যাদের নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। তবুও আমি ঝুলে থাকি, যতদিন পর্যন্ত চেষ্টা করা যায়। টিচারের পক্ষে এদেরকে সামাল দেয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে, নিয়ম করে আমাকেও থাকতে হয়। তিনটা স্কুলের মধ্যে কেবল এই স্কুলটাতেই শেখাবার বেলায় সরাসরি যুক্ত থাকতে হয়। সত্যি বলতে কি, আমার খারাপ লাগে না; সময়টা উপভোগ করি।
আরেকটা কারণ আছে, এই স্কুলে এখন পর্যন্ত ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯২! যদিও প্রতিদিন উপস্থিতির সংখ্যা অনেক কম, গড় হবে সম্ভবত ৪০। একজনের জন্য খানিকটা কঠিন হয়ে যায়, কেবল সংখ্যার কারণে না, একেকজনের পড়া একেক রকম। কেউ অ-আ; তো কেউ সানডে-মানডে।  

এর নাম খোকন। এই ছবিটা ওর স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময়কার। তখন আমি এদের সবার ছবি উঠিয়ে একটা ডাটাবেইজের মত বানাচ্ছিলাম। কেবল এদের নাম-ধামই না, কার আচরণ কেমন, কার জন্য আলাদা করে কোনটা করা প্রয়োজন, কে নেশা করে, কে ড্যান্ডিতে আসক্ত ইত্যাদি।
খোকন নামের এই ছেলের বিরুদ্ধে এখানকার শিক্ষক আমাকে বেশ কবার বলেছেন, একে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। গতকাল এ শিক্ষকের প্রতি এমন অভব্য-অসভ্য আচরণ করেছে যেটা আমি নিজের চোখেই দেখলাম।
মাত্র এদের স্কুল ড্রেস দেয়া শুরু হয়েছিল আজই এ স্কুল ড্রেস গায়ে দিয়ে এসেছে। আমি একে বললাম, স্কুল ড্রেস রেখে স্কুল থেকে চলে যাও, আর স্কুলের আসবে না। এ স্কুল ড্রেস দিয়ে চলে গেল। আমার মতে, একে স্কুল থেকে বের করে দেয়াটা সঠিক সিদ্ধান্ত। একজন-দুজনের জন্য গোটা স্কুলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা চলে না। এটা আমি করতে পারি না তাহলে অন্য অনেক বাচ্চার সঙ্গে অন্যায় করা হয়।
ঘটনা খুবই সহজ-সরল কিন্তু..., একটা কিন্তু থেকে যায়...। ক্রোধে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম বলেই হয়তো তখন এটা লক্ষ করিনি!
পরে মাথায় আটকে গেল। একটা ছেলে খালি গায়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে আমার চোখে কেবল এই দৃশ্যটা স্থির ছবির মত জমাট বেঁধে আছে। আর কিচ্ছু না...।

গতকাল আমার জরুরি লেখাটা, 'রূপগঞ্জ' নিয়ে লেখার কথা কিন্তু লিখতে ইচ্ছা করছিল না, একদম না। বছরের-পর-বছর ধরে আমি প্রায় প্রতিদিনই কিছু-না-কিছু লিখি। বাইরে কোথাও গেলে, বা অসুস্থ, অথবা অসম্ভব মনখারাপ না-থাকলে এর ব্যত্যয় হয় না। বিগত দুই বছরে আমাকে অনেক প্রতিকূলতা সামাল দিতে হয়েছে কিন্তু নিয়ম করে লেখা হয়েছে। অনেক বড়ো বড়ো সমস্যা আমার লেখাকে কাবু করতে পারেনি। মাথার উপর ভয়াবহ বিপদ নিয়ে আমি লিখে গেছি কারণ যখন লিখি তখন জাগতিক বেদনা আমাকে স্পর্শ করতে পারে না কিন্তু গতকালের দিনটা ছিল অন্য রকম। কেবল এই দৃশ্যটা, একটা ছেলে খালি গায়ে...।
একে স্কুল থেকে বের করা নিয়ে আমি বিচলিত না, আমার ধারণা এটা সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু...।

এটা আমি কি করলাম? আমি তো এটাও বলতে পারতাম, তুমি কাল স্কুলে এসে ড্রেসটা জমা দিয়ে যাবে। আর একটা স্কুল ড্রেস একজন না-দিলেই কি? আকাশ তো আর খানিকটা নীচে নেমে আসত না!

লেখা গেল নরকে! রাত বাজে এগারোটা, আমি স্টেশনের দিকে হাঁটা ধরি। আমি জানি, এ গাড়িতে পানি বিক্রি করে। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও এর কোন হদিশ বের করতে পারি না। এ কোথায় আছে কেউ কোন খোঁজ দিতে পারল না।
আমি রাতে একে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেই। আজ সকালে তিনবার স্টেশনে চক্কর লাগিয়েও এর নাগাল পাওয়া গেল না। চতুর্থবার একে পেয়ে যাই।
আমি কোন ভনিতা না করেই বলি, কাল তুমি খুব খারাপ আচরণ করেছ, তোমাকে স্কুলে রাখা হবে না এটাই সিদ্ধান্ত কিন্তু কাল আমি তোমার ড্রেস রেখে দিয়েছি, তুমি খালি গায়ে স্কুল থেকে গেছ এর জন্য আমার মন খারাপ, খুব খারাপ। আমি এই অন্যায়ের জন্য অনুতপ্ত, তোমাকে এটা বলার জন্য কাল রাত থেকে তোমাকে খুঁজছি। আর তোমার জন্য আমি কয়েকটা কাপড় নিয়ে এসেছি এখান থেকে যেটা পছন্দ হয় তুমি বেছে নিতে পারো।

খোকন এটা বেছে নিয়ে গায়ে দেয়। নিজে থেকেই বলে, স্যার, আমারে কি সুন্দর লাগতাছে?
ঝাপসা চোখে আমি বিড়বিড় করে বলি, হ, সুন্দর, খুব সুন্দর। দাঁড়াও তুমার একটা ছবি তুইলা দেখাই। এই দেখো, কেমন, সুন্দর হইছে না?

চলে আসার সময় খোকন ইতস্তত করে বলে, আমার টেকা কি পামু না, স্যার?
আমার মনে পড়ে এ টিচারের কাছে বেশ কিছু টাকা জমিয়েছিল। ঝাপসা খোকনের দিকে তাকিয়ে আমি বলি, অবশ্যই পাবা। এটা তো তোমার টাকা। তোমার যেদিন প্রয়োজন হবে নিয়ে যাবা। দেইখো, আজেবাজে খরচ করবা না কিন্তু। তুমি না সমুসার ব্যবসা করতে চাইছিলা। এই ব্যবসাটা শুরু করো, আরও টাকা লাগলে বইলো, একটা ব্যবস্থা হইব।

খোকনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি হেঁটে হেঁটে ফিরে আসছি। যথারীতি আমার সঙ্গে পশুটাও। পশুটা অচেনা কিন্তু এর গায়ের গন্ধটা যে বড়ো চেনা। এর কাছ থেকে নিস্কৃতি নেই। পশুটার এখন নিস্তেজ চোখ কিন্তু আমি জানি অপেক্ষা করতে এর কোন ক্লান্তি নেই, এর কোন তাড়া নেই। সময়ে এ ঠিক ঠিক লাফিয়ে পড়বে, সর্বশক্তিতে...।

সহায়ক লিংক:
১. স্কুল, তিন: http://tinyurl.com/327aky3        

Sunday, September 26, 2010

নাম বিভ্রাট এবং...

মামুনকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম [১], যে ছেলেটি আমাকে চমকে দিয়েছিল। একে এক ক্রেট পানির বোতলও দেয়া হয়েছিল যেটা জিরো ক্রেডিটের [২] আওতায় পড়ে (যে টাকাটা আর ফেরত দিতে হয় না) ।
এ ঠিকই সেই পানি বিক্রি করে কিছু পুঁজিও জমিয়ে ফেলেছে এবং কিছু কিছু করে স্কুলে নিয়মিত সঞ্চয়ও করছে।

স্কুল, এক [৩] এবং স্কুল, দুই [৪], এখানকার শিক্ষার্থী প্রত্যেককে একটা করে মাটির ব্যাংক কিনে দেয়া হয়েছিল। এরা মাটির ব্যাংকে নিয়মিত পয়সা জমাচ্ছে। এদেরকে আগ্রহী করার জন্যে আমাকে খানিকটা চালবাজিও করতে হয়েছে, এদেরকে বলা হয়েছে যখন মাটির ব্যাংকগুলো ভাঙ্গা হবে তখন যার টাকা সবচেয়ে বেশী হবে তার জন্য পুরষ্কার আছে।

আমি আগেও লেখায় বলেছিলাম, আমি কেবল অক্ষর শিক্ষা দেয়ার উপরই জোর দিচ্ছি না। আমি চাচ্ছি, আমার নিজের বাচ্চারা যা যা শিখবে এরাও তাই শিখবে। আমি জটিল কথা বুঝি না, সাফ কথা, আমার নিজের বাচ্চার পড়ার-জানার সুযোগ থাকলে এদের থাকবে না কেন? এই দেশের প্রতিটি শিশুর পড়াবার দায়িত্বটা সরকারের ছিল, সরকার বেচারা পারছে না, কী আর করা!

আমি নিজে যে ভুলগুলো করেছি সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিচ্ছি, সেই শিক্ষাটাই এদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি। একজন মানুষের জীবনে সঞ্চয়ের যে কী প্রয়োজনীয়তা এটা আমি আমার দুঃসময়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। যে শিক্ষাটা একটা পিঁপড়ার আছে, দুঃসময়ের জন্য খাবার জমিয়ে রাখতে হয় সেই শিক্ষাটাই আমার ছিল না। আফসোস, কখনই আমার জীবনে কোন সঞ্চয় ছিল না!
তো, স্কুল তিন [৫] -এর বেলায় সমস্যাটা দেখা দিল কারণ এখানকার বেশিরভাগ ছেলেই ঘুমায় ওভারব্রীজে, মাটির ব্যাংক রাখবে কোথায়? এই সমস্যারও একটা সমাধান বের হয়। এরা এদের টিচারের কাছে টাকা জমাবে। এর জন্য প্রত্যেকের নাম লিখে একটা খাতাও বানিয়ে দেয়া হয়েছিল।
এদের কান্ডকারখানা দেখে দেখে আর কত হতভম্ব হব? এদের এই স্কুলটা চালু হয়েছে এক মাসও হয়নি এখনই এরা প্রায় ১৪০০ টাকার মত জমিয়ে ফেলেছে!

আজ সকাল-সকাল ফোন। মামুন নামের এই ছেলেটিকে নিয়ে 'দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন'-এ নাকি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে [৬]। ভাল, ছেলেটা জানলে খুশি হবে। প্রতিবেদনটা পড়ে একজনের নাম দেখে মেজাজ খারাপ হয়। এই মানুষটা এখানে কী করছে? মানুষটা কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে আমার কাজ পন্ড করছে! আমার বাড়া ভাত আগেভাগেই খেয়ে ফেলছে।
আবার মানুষটা আমি কি না এটাও বুঝতে পারছি না!

পত্রিকায় লিখেছে, "...আলি মাহমুদের..."।
এই আলি মাহমুদটা কে? তবলার ঠুকঠাক থাকুক আসল কথায় আসি। এটা যে এবারই প্রথম হয়েছে এমন না, এরা ইচ্ছা করে এই কাজটা করে! ব্যাটারা এই সব ফাজলামি আর কত কাল করবে? এরা কলাম্বিয়ার গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, তুরস্কের ওরহান পামুক, ফিলিস্তিনের মাহমুদ দারবিশ, ইন্দোনেশিয়ার প্রমোদিয়া অনন্ত তোয়ের লিখতে পারে; কেবল পারে না আলী মাহমেদ লিখতে! কলমের নিব ভেঙ্গে যায়!
জানি-জানি, অনেকে চোখ পাকাচ্ছেন, মিয়া, ছলিমুল্লা, কোথায় এঁরা আর কোথায় তুমি তিন টাকা দামের কলমচী, ছ্যাহ!
রসো, আগে আমার যুক্তিটা শেষ করি। অনুমান করি, যারা রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন সমস্যাটা তাদের না। এসি অফিসে যেসব পন্ডিত স্যাররা ঢাকায় বসে থাকেন, তাঁদের।
কিন্তু ভুল মনে হলে কেন মাহমেদের স্থলে এখানে আহমেদ না, কেনই বা মোহাম্মেদ না; কেনই বা এদের এটা মনে হলো মাহমুদটাই সঠিক?
কোথাও খটকা লাগলে যিনি রিপোর্টটা পাঠিয়েছেন তাকে একটা ফোন করে জেনে নিলেই হয়। পাগল, এটা করলে মান থাকে নাকি? এই চটচটে জ্ঞানের ভান্ডরা কেন যে বুঝতে চান না কোন নাম অভিধানের কোন শব্দ না যে ভুল মনে হলো আর অভিধানের পাতা চিবিয়ে খেয়ে ঠিক করে দিলুম।

এঁরা হচ্ছেন একেকটা চলমান জ্ঞানের ভান্ড, একটা ফোন করার জন্য ঘাড় কাত করলেই জ্ঞান গড়িয়ে পড়বে এই ভয়ে এতটাই কাবু যে আর ফোন করা হয়ে উঠে না।

সহায়ক লিংক:
১. মামুন: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_17.html
২. জিরো ক্রেডিট: http://tinyurl.com/2fpxq9d
৩. আমাদের ইশকুল, এক: http://tinyurl.com/3xpuov5
৪. আমাদের ইশকুল, দুই: http://tinyurl.com/2fs9j4p
৫. আমাদের ইশকুল, তিন: http://tinyurl.com/327aky3
৬. বাংলাদেশ প্রতিদিন: http://tinyurl.com/22w53un

Sunday, September 12, 2010

শৈশব, ফিরে আসে বারবার


এমনিতে ঈদ-পূজা নামের উৎসবগুলো আমি অসম্ভব সমীহের চোখে দেখি। কারণ এই উৎসবগুলো আমাদেরকে শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়- শেকড়ের কাছে ফেরা! কিন্ত খুব বেশি সময় হয়নি ঈদ নামের পর্বগুলোর পালন অশ্লীলতা-উৎকট-হারামিপনার পর্যায়ে চলে গেছে! এই দেশে সবচেয়ে বেশি দূর্নীতি হয় ঈদকে সামনে রেখে। শ্লা, সব ভিক্ষুক হয়ে যায় [১]! এই নিয়ে অন্য লেখায় আলোচনা করেছি [২], এখানে বিস্তারিত আলোচনায় যাই না।
ঈদকে সামনে রেখে উৎকট-অসভ্যতার জন্য আমাদের মিডিয়াও অনেকখানি দায়ী। জাতীয় দৈনিকগুলোর নকশা পাতায় দেড় লক্ষ টাকা দামের লেহেংগা, ৫৫০ টাকা গজ করে পাকিস্তানী কাপড়ের বিস্তারিত খবর যখন দিনের পর দিন ঘটা করে ছাপে তখন আমাদের নগ্ন-নাচ না নেচে উপায় কী!
...
বেশ ক-বছরের অভ্যাস। ঈদের দিন বের হওয়া হয় না কোথাও। দুর্জনেরা বলেন, আমি নাকি সমাধি নিয়ে নেই। নিজের রুমেই থাকি, অধিকাংশ সময় ফোন-টোন বন্ধ থাকে। ক্ষমতার কী বিপুল অপচয়!]
অথচ আমার প্রবাসী এক বন্ধু নিয়ম করে ঈদের দিন মেইল করবে, 'খাওয়াতে পারিস এক চামচ সেমাই? তোকে ১০০০ ডলার দেব'। ব্যাটা ফাজিল, কারও চশমার কাঁচ ঝাপসা করে দেয়া কোন কাজের কাজ না!

এবারে ঈদটা আমার জন্য অন্য রকম ছিল। তিনটা স্কুলের প্রায় ৮০জন বাচ্চা-কাচ্চা, কাচ্চা-বাচ্চা! দিনভর এদের নিয়ে আমার কিছু পরিকল্পনা ছিল, সবটা এখানে শেয়ার করতে চাচ্ছি না।
তিনটা স্কুলের মধ্যে 'স্কুল তিন' [৩], এটার প্রতি আমার আগ্রহ অন্য রকম, খানিকটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে। এখানকার বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ যে অপরিসীম।
যে টিচার এদের পড়ায় ওর ওখানে আজ এদের খানাপিনার আয়োজন ছিল। বিকেলে এদের ক্রিকেট খেলা। আয়োজন করে শিল্ড-মেডেল যোগাড় করা হয়েছে।

গিয়েছিলাম এদের খেলা দেখতে। আমার সঙ্গে আরও ৩জন। হঠাৎ মনে হলো এদের সঙ্গে খেলায় নেমে পড়লে তো মন্দ হয় না। আমরা দু-জন করে দুদলে। আমার দল হেরেছে :( কিন্তু দু-চোখ ভরে দেখলাম এদের উল্লাস, এদের খেলা, এদের চোখে আটকে থাকা উচ্ছ্বাস!
ছবি ঋণ: দুলাল ঘোষ
আমি জানি না, এরা বড়ো হয়ে কি কেউ ড, আতিউর রহমানের মতো হবে, নাকি চোর-চোট্টা। কিন্তু এদের জীবনে গল্প বলার মত গল্পের বড়ো অভাব! আজ থেকে এদের মস্তিষ্ক এই দেখা-অদেখা স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে খেলবে, সবিরাম।

ছবি ঋণ: সমীর চক্রবর্তী
ছবি ঋণ: সমীর চক্রবর্তী
আমি মানুষটা বড়ো স্বার্থপর টাইপের। এদের কি হবে, না হবে এটা নিয়ে এই মুহূর্তে মাথা ঘামাচ্ছি না। ঘামাচ্ছি নিজেকে নিয়ে। আমার নিজের কতটা কাল পর মাঠে বল পেটানো- আমার কেবলি মনে হচ্ছিল, শৈশবের একটা অংশ আবার ফেরত পেয়েছি। হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরে আসে, বারবার...।

সহায়ক লিংক:
১. ভিক্ষুক: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_03.html
২. এমন দেশটি কোথাও...: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_30.html
৩. আমাদের ইশকুল, : http://tinyurl.com/327aky3
৪.আমাদের কুমিল্লা: http://www.dailyamadercomilla.com/content/2010/09/14/news0865.htm  

Monday, September 6, 2010

স্কুল এবং 'ঈশ্বরের ভালবাসার সন্তান'

ওঁর নাম জসীম। ঈশ্বরের ভালবাসার সন্তানদের একজন- যাদের চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও নাই, আমি কোন ছার! অনেক আগে এঁদের নিয়ে আমি একটা লেখা লিখেছিলাম, 'অমানুষ' [১]Hermaphrodite- যাদের প্রচলিত নাম হচ্ছে হিজড়া।

পূর্বেও লিখেছিলাম, লোকজনকে খাওয়াবার জন্য আমার কাছে কিছু ফান্ড ছিল। দু-দিন আগে এঁদের দাওয়াত ছিল। এর পেছনে কয়েকটা কারণও ছিল। এঁদের প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব ব্যতীত এখানে মুগ্ধতাও কাজ করেছে। স্টেশনের কাছে এই স্কুলটা [২] যখন চালু করি তখন ছেলেপেলেদের ধরা যাচ্ছিল না, পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। প্রথম দিন এসেছিল মাত্র ৬ জন! এখন ছাব্বিশ ছাড়িয়ে গেছে। ফি-রোজ দুয়েকজন করে বাড়ছে।
স্টেশনের এই সব ছেলেপেলেদের জসীমরাই বকে-মেরে স্কুলে পাঠিয়েছেন। আমার আসা-যাওয়ার সময় এঁরা আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইতেন, 'আইজ পুলাপাইন স্কুলে গেসে তো'?
কাউসার নামের স্কুলের একটা ছেলে আছে যার ঘুম কুম্ভকর্ণকেও হার মানায়। একে ঘুম থেকে জাগাতে গিয়ে এঁদের একজন কাউসারের কাঁথা ওভারব্রীজ থেকে নীচে ফেলে দিয়েছিলেন। কাউসারের স্কুলে না-আসা পর্যন্ত এঁরা ক্ষান্ত হননি।
এই কারণেও আমি ইশ্বরের এই সব ভালবাসার সন্তান নামের হিজড়াদের প্রতি ভারী কৃতজ্ঞ ছিলাম। এঁদের যখন বললাম, আপনাদের একবেলা খাওয়াতে চাচ্ছিলাম...। আমরা উল্লাস প্রকাশ করি হাতে কিল মেরে, এরা খানিকটা অন্যভাবে। বিচিত্র ভঙ্গিতে তালি বাজিয়ে। আমাকে একজন বললেন, আমাদের আরও কয়েকজন আছে, এদেরও বলি?
আমি সানন্দে বলি, আচ্ছা।
সব মিলিয়ে এঁরা হয়েছিলেন ১২ জন। আমি অবাক হই, প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূর থেকেও কয়েকজন চলে এসেছিলেন! এমন না এঁরা একবেলা খেতে পান না কিন্তু এঁদের কাছে নিমন্ত্রণ এবং সবার সঙ্গে একত্র হওয়াটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, আনন্দের।

বিকালে আমি তখন স্কুলে। স্কুলের ছেলেরা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছে, আমি চোখ ভরে দেখছি।

বাইরে হইচই! বেরিয়ে দেখি এরা সবাই দাঁড়িয়ে। আমার বুক কেঁপে উঠে, হঠাৎ জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় এঁদের খাওয়ার সময় আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি যদিও সমস্ত আয়োজন করা ছিল। তাহলে কি খাবার পছন্দসই হয়নি? এঁরা এই জন্য কি আমার জবাবদিহি চাইতে এসেছেন?
আমি ভয়ে ভয়ে জিগেস করি, কি হয়েছে?
সম্ভবত আগে থেকেই 'শুকতারা' নামের একজনের চোখে পানি টলমল করছিল। এক্ষণ 'শুকতারা' হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। 
ঘটনাটা হয়েছে এমন, এঁরা খাওয়ার পর কয়েকজন যখন কুমিল্লায় ফেরার জন্য ট্রেনে উঠেছিলেন তখন ট্রেনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ইছু মিয়া নামের একজন, ট্রেনের দরোজায় কেন দাঁড়িয়ে আছে এই সামান্য অপরাধে শুকতারাকে লাথি মেরে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়। এরপর বেদম পেটায়।
শুকতারা যখন তাঁর হাতের পেটানোর দাগগুলো দেখাচ্ছিলেন তখন আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি- অদম্য রাগে আমার শরীর কাঁপছিল। ঈশ্বর, একজন মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয় কেমন করে!
 জিআরপি ওসি স্টেশনের বাইরে। এঁরা জিআরপি থানায়ও গিয়েছিলেন কিন্তু এদের হাঁকিয়ে দেয়া হয়।

এঁরা আমার কাছে বড়ো আশা নিয়ে এসেছেন কিন্তু আমার সেই ক্ষমতা কই? আমি চোখের পানি গোপন করে একজনের পর একজনের কাছে পাগলের মত ফোন করতে থাকি।
ইতিমধ্যে প্রায় সমস্ত জাতীয় দৈনিকের, প্রিন্ট মিডিয়ার লোকজনরা চলে এসেছেন। আমি এখন আর আগের মত অবাক হই না। অনুমান করি, সমস্ত পত্রিকার লোকজন এই খবরটা এখান থেকে পাঠিয়েছেন কিন্তু কোন দৈনিকেই এই খবরটা আসেনি। দৈনিকগুলোর এই তুচ্ছ খবর ছাপাবার সময়, স্পেস কোথায়! আমাদের 'সো কলড' বিবেক!

নিতল অন্ধকারেও কোথাও-না-কোথায় আলো থাকেই, জিআরপি ওসি নামের সহৃদয় মানুষটার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এই মানুষটা কেবল এঁদের কাছে দুঃখ প্রকাশই করেননি, অভিযুক্ত ইছু মিয়াকে শাস্তি দেয়ারও ব্যবস্থা করেছেন। কেবল কঠিন তিরস্কার করেই ক্ষান্ত হননি, ইছু মিয়াকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। ইছু মিয়ার ঈদটা ভাল কাটবে না কারণ ব্যারাকে থেকে তার ঈদের উপরি আয় বন্ধ।

এটা হিজড়া নামের মানুষদের কেবল বিজয়ই না, আমাদের নগ্নতা ঢাকার একচিলতে কাপড়ও বটে। 'শুকতারা' নামের মানুষটার শরীরে মারের দাগ শুকাতে হয়তো খানিকটা সময় লাগবে। কিন্তু তাঁর যাওয়ার সময় আমি যে হাসি দেখেছি, আমি নিশ্চিত, তাঁর মনের দাগ খানিকটা শুকিয়েছে।
'শুকতারা' নামের মানুষটার ইতিহাস জেনে আমি হতভম্ব হই। এঁ একজন আর্মি অফিসারের সন্তান এবং আর্মি অফিসার নামের বাবাটা এখনও কর্মরত। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি কিন্তু অন্য সূত্র ধরে নিশ্চিত হওয়া গেল শুকতারা মিথ্যা বলছেন না। নিজের মান বাঁচাতে যে আর্মি অফিসার নামের বাবাটা এই অভাগা সন্তানকে ত্যাগ করেছেন তার নাম-ধাম এখানে দেয়াটাই সমীচীন ছিল। শুকতারার অনুরোধে দিলাম না, আমি শুকতারাকে কথা দিয়েছি।

এঁরা যখন সবাই একজোট হয়ে থানার দিকে যাচ্ছিলেন তখন আমি ট্রেনেথাকা এবং আশেপাশের মানুষদের অভিব্যক্তি লক্ষ করি। এদের প্রায় সবার চোখেই অপার কৌতুহল। ঢলঢলে মুখে, চকচকে চোখে যেমনটা আমরা চিড়িয়াখানার পশুদের দেখে অপার আনন্দ লাভ করি, অনেকটা তেমন। কেউ কেউ অযাচিত মন্তব্যও করছিলেন। যারা বিদ্রুপের বন্যা বইয়ে দিচ্ছিলেন এদের অনেকেই আমার চেয়ে সুশ্রী, চকচকে কাপড়পরা, চোখ বন্ধ করে এও বলা চলে অনেকে আমার চেয়ে শিক্ষিতও।
আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, আমরা আসলে সেই আদিম মানুষই রয়ে গেছি। একপেট আবর্জনা ঢেকে রাখার অযথাই ব্যর্থ চেষ্টাই করি...।

সহায়ক লিংক:
১. অমানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_30.html
২. অভাগাদের স্কুল: http://tinyurl.com/327aky3    

Wednesday, September 1, 2010

অভাগাদের স্কুল: ২

আমি জানি না মনখারাপ করা দিনে ঝুম বৃষ্টি নামে কেন?

দুপুর থেকেই কেমন অস্থির-অস্থির লাগছিল, কারণটার বিশদে যেতে চাচ্ছি না। আমার সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি, তীব্র। মনখারাপ হলেও তা হয় অতি তীব্র- এর ধাক্কা সামলানো আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। মাথায় তখন হাবিজাবি ভাবনা খেলা করে। এই ভাবনাগুলোর নমুনা কেমন এই নিয়েও আলোচনার ইচ্ছা নাই। অল্প কথায় বলা যায় নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা তখন দুস্কর হয়ে পড়ে।

এমনটা হলে আমি যেটা করি সোজা হাইড-হাউজে চলে যাই, ফোন বন্ধ করে দেই। নামটা শুনতে গালভরা কিন্তু এটা তেমন উল্লেখ করার মত কিছু না। নদীর তীরে একটা টং ঘরের মত। এটার খোঁজ আমি কাউকে বলি না, খুব কাছের মানুষকেও না।
এখানে যে মানুষটা থাকেন তিনি বিচিত্র কারণে আমাকে পছন্দ করেন- টুকটাক কথা চলে। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, মানুষটা যখন দেখেন আমার কথা বলার আগ্রহ নাই তখন কোন একটা ছল করে ওখান থেকে সরে পড়েন। মুখে বলেন, শইলডা ম্যাজম্যাজ করতাছে, যাই হাইট্টা আসি।
এই মানুষটার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!

এখানে আসার সময়ই আকাশ জুড়ে মেঘ ছিল। কী অসাধারণ প্রকৃতির খেলা! মানুষের বানানো যন্ত্রের এই ক্ষমতা কই একে ধরে রাখার, তাও আবার ৩.২ মেগাপিক্সেল সেলফোন ক্যামেরার?
ওয়াল্লা, আকাশ দেখি তার সমস্ত চুল এলোমেলো করে ঢেকে ফেলে সব, ঝাঁপিয়ে পড়ে বৃষ্টি! বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে, পা ঝুলিয়ে বসার সুখটা আর রইল না। আমার ধারণা ছিল অনেকক্ষণ লাগিয়ে বৃষ্টি হবে। কিসের কী, অল্পক্ষণেই বৃষ্টির আর নাম-গন্ধও নেই। ফিরে আসতে আসতে আমার খেয়াল হয় কাল যে স্কুল চালু হয়েছে [১] এটা আজ চারটা থেকে শুরু হওয়ার কথা। চারটা বাজতে আর বেশি বাকী নাই।


হা ইশ্বর, এটা সম্ভবত এই গ্রহের অসাধারণ একটা দৃশ্য! আমি কি ঠিক দেখছি? কাল ছাত্র ছিল কেবল ছয় জন, এখন দেখছি ১৯ জন! শিক্ষক আমাকে দেখে চোখ বড়বড় করে হড়বড় করে কিসব যেন বলতে থাকে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি শিক্ষক নামের মেয়েটা হতভম্ব হয়ে গেছে। এ আশা করেনি এরা দল বেঁধে সবাই ঠিক-ঠিক সময়মতো চলে আসবে। কেবল চলেই আসেনি, সবাই মিলে প্রথমে ঘরটা পরিষ্কার করেছে। ঘরটা দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত থাকায় রাজ্যের আবর্জনায় গিজগিজ করছিল। আমি নিশ্চিত, এই সংখ্যা আরও বাড়বে। আমি আগের লেখাও বলেছিলাম, অন্য দুইটা স্কুল থেকে [২] [৩]এই স্কুলের বাচ্চারা চমৎকার করবে।
এই ফাঁকে কখন যে আমার নিতল বিষণ্নতা বাষ্পের মতো উবে গেছে আমি নিজেও জানি না!

কালকের লেখায় একজন পাঠক আপত্তি জানিয়েছিলেন, এটাকে অভাগাদের স্কুল বলায়। ওখানে আমি ব্যাখ্যা দিয়েছি তদুপরি সবিনয়ে আবারও বলি, এটা কেবল আমার জন্য। এখানে আমার লেখার পাঠককেও জড়াতে চাই না। বুকে হাত দিয়ে বলি, এদের দেখে আমার কেবল মনে হয় একেকটা চাবুকের কথা। যে চাবুকের দগদগে ঘা আমার পিঠে।
আমি পড়ার সুযোগ পেয়েছি, আমার সন্তানও। হরিজন পল্লীর বাচ্চাদের মা-বাবা আছে। চোখে দেখতে পান না এমন মানুষদের বাচ্চাদেরও কিন্তু এই স্কুলের অধিকাংশ বাচ্চাদের মা-বাবার হদিস নাই। তাই অন্য স্কুলের চেয়ে এই স্কুলটা প্রতি আমার বিশেষ পক্ষপাতিত্ব আছে। অন্য স্কুলগুলোয় মাস্টাররা পড়ান, না-বলে কোন একদিন আমি চলে আসি। কিন্তু এখানে শিক্ষকের সঙ্গে আমিও থাকি কারণ এই বাচ্চাগুলো হচ্ছে দামাল টাইপের। নমুনা:
পরশু স্টেশনে একটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাঁটছিলাম, এ আমার অতি সামান্য পেছনে ছিল। হঠাৎ মনে হলো কোন প্রতিউত্তর পাচ্ছি না যে। ফিরে দেখি ভোজবাজির মত এ উবে গেছে। নাই তো নাই- পরক্ষণেই একে খুঁজে পেলাম রেলগাড়ির ছাদে, দাঁত একটাও ভেতরে নেই!
তো, এই সব মহা বিচ্ছুদের সামাল দেয়াটা মাস্টারের জন্য খানিকটা কঠিন বটে।


আমি যখন এই স্কুলটার জন্য বেদম দৌড়াচ্ছি তখন কেউ কেউ আমাকে কঠিন কথার ফাঁদে ফেলতে চেয়েছেন। দুয়েকটার নমুনা দেই:
১. এইসব পিরাইল্লারা (এটা ভাল বাংলা হবে সম্ভবত বখা) কী পড়ব?
আগেও বলেছিলাম, এমনিতে আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না, কথা জড়িয়ে যায় কিন্তু প্রচন্ড রেগে গেলে খানিকটা গুছিয়ে কথা বলতে পারি। আমি শান্ত ভঙ্গিতে বললাম, খোদা-না-খাস্তা, আপনার বাচ্চা হারিয়ে কোথাও-না-কোথাও বড়ো হলে এদের মত যে হবে না এটা আপনাকে কে বলল?
মানুষটা আর রা কাড়েননি।
২. একজন আমাকে কঠিন আক্রমণ করলেন, এই স্কুল করে কি আপনারা টাকা-পয়সা নিবেন?
আমি বললাম, না।
তিনি বললেন, তাহলে আপনার লাভ কি?
আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, লাভ কি-লাভ কি। ঝড়ের গতিতে আমার মাথার তথ্যগুলো ওলটপালট হচ্ছে- আমার ফাঁকা মাথায় খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না। মনে পড়ে, আমি মানুষটাকে ইতিপূর্বে দেখেছি সিগারেট খেতে। আমি বলি, আচ্ছা, সিগারেট খেয়ে আপনার লাভ কি?
মানুষটার উত্তর, জানি না। ভাল লাগে।
আমি বলি, আমিও জানি না। ভাল লাগে।

এদের পড়ার নমুনা দেখে আমি হতভম্ব! এর মধ্যে কয়েকটাকে পেয়েছি, চুপচাপ বসে আছে। আমি বলি, পড়ো না কেন?
এরা উদাস হয়ে বলে, বই শেষ।
আমি নিশ্চিত, ফাজলামী করছে। খানিকটা টাইট দিতে হবে। উল্টাপাল্টা অক্ষর ধরে দেখলাম ঠিক ঠিক বলতে পারছে। যেটা জানা গেল এরা পূর্বেও স্কুলে পড়েছে।
কাল এদের জন্য বড়দের বই যোগাড় করতে হবে। অন্যদেরও যেটা দেখলাম, শেখার ক্ষমতা আমার মতো মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ঠ। আমি নাকি অল্পতে মুগ্ধ হই এই বিষয়ে আমার খানিকটা কুখ্যাতি আছে। বেশ, অল্পতে মুগ্ধ হন না এমন একজনকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দেখি না...।

সহায়ক লিংক:
১. অভাগাদের স্কুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post.html
২. আমাদের ইশকুল, এক: http://tinyurl.com/3xpuov5
৩. আমাদের ইশকুল, দুই: http://tinyurl.com/2fs9j4p

অভাগাদের স্কুল

কাল লিখেছিলাম, রেল-স্টেশনে স্কুলটা চালু করতে চাই আজই [১] কিন্তু সত্যি বলতে এটা আজই চালু হবে এমন দৃঢ় বিশ্বাস ছিল না।
এও এক বিচিত্র! কেমন কেমন করে এটা হলো আমি নিজেই বড়ো অবাক হচ্ছি। বিষয়টা খুব একটা সহজ ছিল না। কাল পর্যন্ত স্কুল-ঘরের নাম-নিশানা নেই, শিক্ষকের পাত্তা নেই, ছাত্রের হদিস নেই।
আগেকার লোকজনরা নাকি বেশি ক্ষেপে গেলে রাতারাতি পুকুর কেটে ফেলত, শুনেছি কিন্তু চোখে দেখিনি! তীব্র ইচ্ছা থাকলে একা-একা খেটেখুঁটে একটা স্কুল দাঁড় করানো সম্ভব এটা অন্তত জানলাম। বাহ, জানার দেখি শেষ নাই!

ক্লাশ চালাবার জন্য একটা জায়গা বড়ো জরুরি ছিল। শুনতে চমৎকার শোনায়, প্ল্যাটফরমে ক্লাশ শুরু করে দেয়া, বাস্তবে যা অশ্বডিম্ব! কারণ লোকজন যেমন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বান্দরের খেলা দেখে স্কুলের অবস্থাটাও হতো তথৈবচ- ছেলেপেলেদের লেখাপড়া শিকেয় উঠত। এটা বাদ দিলেও পুলিশ এসে দাদাগিরি দেখিয়ে হাঁকিয়ে দিলে কোথায় ছাত্র? পড়ে থাকত কেবল কিছু বাদামের খোসা।

এটারও কাকতালীয়ভাবে একটা ব্যবস্থা হয়। স্টেশনের পাশেই রেলের একটা বিল্ডিং-এ উদীচীর একটা অফিস আছে যেটার কথা আমার জানা ছিল না। ওই অফিসটা দীর্ঘকাল ধরে বন্ধ পড়ে ছিল অথচ এটায় চেয়ার-টেবিল, ছোটখাটো বইয়ের সংগ্রহসহ সবই আছে! বিনেপয়সায় এটা পাওয়া গেল।
শিক্ষকের ব্যবস্থাও হয়ে গেল। উদীচী করত ইন্টার পড়ুয়া এমন একটা মেয়ের খোঁজও পাওয়া গেল। স্বল্প সময়ে আমি যা দেখলাম, এই শিক্ষক চমৎকার করবে এবং এখানকার ছাত্ররাও।

স্টেশনে যেসব বাচ্চাদের জন্য এই স্কুল খোলার ভাবনা খেলা করেছিল এদের সবাইকে পাওয়া গেল না, কেবল ছয়জনকেই পাওয়া গেল। মুলত এরা পানি বিক্রি করে। গাড়িতে করে অনেকেই কোথাও চলে গেছে। তাছাড়া ছোট থেকে এরা বড়ো হয়েছে চারপাশে অবিশ্বাস দেখে। স্বভাবতই আমার কথাও এরা বিশ্বাস করেনি, ভেবেছে শুধুশুধু বলা হয়েছে।

এমনিতে 'পড়শী ফাউন্ডেশন'-এর স্কুলগুলোর নাম হচ্ছে, 'আমাদের ইশকুল' কিন্তু আমি এই স্কুলের নাম রেখেছি 'অভাগাদের স্কুল'। যাদের বাবা-মা-বাড়ির কোন খোঁজ নাই এদের আর কী নাম দেব? হো.মো এরশাদের 'পথকলি'?
এরশাদের মত মানুষদের জন্য না-হয় ওই নাম তোলা থাকুক। আমার মত হতভাগা অভাগাকে অভাগাই বলি- সাদাকে সাদা বলাই শ্রেয়।
আমি অল্প কথায় যেটা বুঝি, আমার সন্তানের পড়ার অধিকার থাকলে এদের থাকবে না কেন? এটাও আমি বিশ্বাস করি, এদের মধ্যে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মত একজন ড. আতিউর রহমান বের হয়ে আসবে না এটাও অবিশ্বাস করা চলে না।

*পোস্টে আমার লেখার অস্পষ্টতার কারণে সম্ভবত এই বিভ্রান্তিটা সৃষ্টি হয়েছে, এই জন্য দুঃখ প্রকাশ করি।
'অভাগাদের জন্য স্কুল' বা 'এরা অভাগা' এটা কখনই এদের কাছে শেয়ার করা হবে না, এটুকু সেন্স আমার আছে বলেই মনে করি। এই বক্তব্যটা কেবলমাত্র আমার জন্য এবং পাঠকের জন্য।


সহায়ক লিংক:
১. ন্যানো ক্রেডিট, ৬: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_31.html
WhatsApp