Search

Loading...

Thursday, October 21, 2010

কবি নজরুল সিফিলিসে আক্রান্ত, এই বিষয়ক মূর্খতা

ছবি ঋণ: আফতাব আহমদ
কাজী নজরুলের এই রোগ নিয়ে আলোচনায় দুই ধরনের মূর্খ আছেন। অশিক্ষিত মূর্খ এবং শিক্ষিত মূর্খ। অশিক্ষিত মূর্খরা বলে বেড়াতেন ইংরেজরা বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দিয়ে নজরুলকে পাগল বানিয়ে দিয়েছে কারণ তিনি ইংরেজদের জন্য একটা ভয়াবহ সমস্যা ছিলেন।

শিক্ষিত মূর্খরা চালু করলেন, নজরুল সিফিলিসে আক্রান্ত ছিলেন, 'নিউরো-সিফিলিস'। নিউরো সিফিলিসের শেষ পর্যায় হচ্ছে ব্রেনকে আক্রান্ত করা। যেটা কবির হয়েছিল বলে বলা হতো!
অনেকে এর সূত্র ধরে কবির সৃষ্টিকে খাটো করার প্রয়াস পেতেন। সৃষ্টি-স্রষ্টাকে গুলিয়ে ফেলার অবকাশ নাই- সৃষ্টির জন্য স্রষ্টা ধোয়া তুলসি পাতা হয়ে যান না তেমনি স্রষ্টার জন্য সৃষ্টিও নর্দমায় ভেসে যায় না। তদুপরি এমনটা যদি হয়ে থাকত তাহলে না হয় এই নিয়ে তর্কাতর্কি চলতে থাকত কিন্তু মিথ্যাকে কেন বারবার সত্য বলা হবে?
দিনের-পর-দিন, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ধরে কবি নজরুলের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে এই অন্যায়ের শোধ আমরা দেব কেমন করে? এতে কবি নজরুলের কিছুই যায় আসে না কিন্তু আমরা যারা বেঁচে আছি আমাদের উপর এই অন্যায়টা বর্তায়।
এই লেখাটা লেখার পূর্বে ব্লগস্ফিয়ারে আমি পাগলের মত চক্কর লাগিয়েছি অনেক সাইটে নজরুলকে নিয়ে কুতর্ক করতে দেখলাম। অসংখ্য মন্তব্য থেকে কেবল একটা মন্তব্য নিয়ে আলোচনা করি। তিনি লিখেছেন, 'নজরুল দেখি একটা বদমাইশ'। আমি এই নিকের পেছনের মানুষটাকে চিনি। ইনি বহু পূর্বেই পিএইচডি সমাপ্ত করেছেন।

নজরুল বদমাইশ হলে কেউ কেউ তো বদমাইশেরও বাপ, ওস্তাদেরও ওস্তাদ! নিয়ম মেনে পতিতালয়ে গমন করা যেমন আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ না তেমনি মেয়ের বান্ধবীকে বৈধ বিয়ে করলেও। কিন্তু সমস্যাটা অন্যত্র। এঁরা 'তেলিবেলি' মানুষ না, অসম্ভব শক্তিশালীসব মানুষ। যারা তাঁদের লেখার মাধ্যমে কমবয়সী পাঠকের অপরিণত মন নিয়ে খেলা করছেন, বছরের-পর-বছর ধরে।

আমাদের যে মূল শক্তি অপরের প্রতি বিশ্বাস এটা তিনি নড়বড়ে করে দিয়েছেন। অতি প্রিয় বন্ধুর স্ত্রীর হাত ধরলেই যদি আমাদের মাথায় ঘুরপাক খায় ছলে-বলে-কৌশলে, প্রকারান্তরে বিয়ে নামের বৈধতার মোড়কে,  তাকে নিজের করে পাওয়ার; এটাও প্রচলিত আইনের আওতায় অপরাধ না কিন্তু ওই যে বললাম বিশ্বাস। তাহলে আমরা দাঁড়াব কোথায়, পায়ের নীচে যে মাটি থাকে না!
আমাদের সম্পর্কের মাঝে সূক্ষ একটা আবরণ থাকে, আ থিন লেয়ার; মায়ের সঙ্গে সন্তানেরও একটা সূক্ষ আবরণ আছে। মায়ের পেট থেকে বেরিয়েছি বলেই আমরা ধামড়া সন্তান তাঁর সামনে নগ্ন হয়ে যাই না; ওই যে বললাম সূক্ষ আবরণ।
আমরা তো শেকড়হীন ইয়াংকি না, আমাদের শেকড় ছড়িয়ে আছে বহু দূরে। বিশ্বাস-শ্রদ্ধায় জড়াজড়ি করে।

আজ থেকে ১৪/ ১৫ বছর পূর্বে একজন এমবিবিএস ডাক্তারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। তিনি আমাকে এই তথ্যটা জানিয়েছিলেন, নজরুল নিউরো-সিফিলিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কেবল এটুকুই না, তিনি এটাও আমাকে জানিয়েছিলেন, রোগের নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে মেডিকেল কলেজে ছাত্রদেরকে এটা পড়ানো হয়, নজরুলের প্রসঙ্গ চলে আসে।
একজন ডাক্তার যখন বলছেন, এটা তাদেরকে পড়ানো হয় এখানে আমি অবিশ্বাস করার কিছু দেখিনি! কিন্তু পড়ানো হয়...? এর মানে দাঁড়াচ্ছে, পূর্বেও পড়ানো হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে, আগামীতেও হবে? যেমন আর্কিমিডিসের সূত্র নিয়ম করে পড়ানো হবেই, অনেকটা এমন?
আজ আমার মনে হচ্ছে, এই ডাক্তার হয় কদর্য একজন মানুষ, বোমা ফাটানো নিয়ে জজ মিয়ার যেমন আষাঢ়ে গল্প আমরা শুনেছি তেমনি একটা আষাঢ়ে গল্প তিনিও ফেঁদেছিলেন। আর তিনি সত্যবাদী হয়ে থাকলে তাঁর শিক্ষক নামের অধ্যাপক স্যাররা ছিলেন নিরেট গবেট!

আর একজন অধ্যাপক হলেই তিনি এই গ্রহের সমস্ত জ্ঞানের পাতা চিবিয়ে বসে আছেন এমনটা আমি মনে করি না।

এটা সত্য এরা বড়ো বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদেরকে শেখান কিন্তু এদেরও যে শেখার অনেক কিছু বাকী থেকে যায় এর উদাহরণে এই একটা ছবিই যথেষ্ঠ! এখানে গবেট অধ্যাপক স্যাররা একজন মানুষের হাড়-গোড় পরীক্ষা করছেন। তারা অবলীলায় বিস্মৃত হয়েছেন এটা কোনো পশুর হাড় না, মানুষের হাড়! মৃত মানুষদের প্রতি যে ন্যূনতম সম্মান দেখাতে হয় এটাই এরা এখনও শেখেননি!
এই সব 'পরফেসর' সাহেবদের জন্য [১] একটা ইশকুল খুললে মন্দ হয় না!

নজরুল যে নিউরো সিফিলিসে ভুগছিলেন না, ভুগছিলেন Pick's disease-এ এটা আমি প্রথমে জানতে পারি ডা. গুলজার হোসেন-এর কাছ থেকে। তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। তিনি আমাকে একটা ভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
আমি পূর্বে কোন একটা লেখায় লিখেছিলাম, "কবি নজরুল যে অসুখে ভুগছিলেন তা জনসমক্ষে আলোচনা করাটা বিব্রতকর"। এটা লেখার জন্যে আমি কবির কাছে হাঁটু ভেঙ্গে মার্জনা প্রার্থনা করি।

কবি নজরুলের এই উপসর্গ নিয়ে 'newworldencyclopedia' সাইট [২] থেকে জানা যাচ্ছে:
"...In 1952, he was transferred to a mental hospital in Ranchi. With the efforts of a large group of admirers who called themselves the "Nazrul Treatment Society" as well as prominent supporters such as the Indian politician Syama Prasad Mookerjee, the poet travelled to London  for treatment. Eminent physicians in London and later Vienna stated that he had received poor medical care. Dr. Hans Hoff, a leading neurosurgeon in Vienna, diagnosed Nazrul as suffering from Pick's Disease. His condition judged to be incurable, Nazrul returned to India in December 1953. ..." 

উইকি বলছে [৩]:
"...the treatment society sent Nazrul and Promila to London, then to Vienna  for treatment. Examining doctors said he had received poor care, and Dr. Hans Hoff, a leading neurosurgeon in Vienna, diagnosed that Nazrul was suffering from Pick's disease. His condition judged to be incurable, Nazrul returned to Calcutta on 15 December 1953. ..." 

Pick's disease রোগটার নামটা এসেছে Arnold Pick-এর নাম থেকে। এই প্রসঙ্গে আমরা helpguide [৪] থেকে জানতে পারি: 
"...According to Arnold Pick, who first described the disease in 1892, Pick's disease causes an irreversible decline in a person's functioning over a period of years. Although it is commonly confused with the much more prevalent Alzheimer's disease, Pick's disease is a rare disorder that causes the frontal and temporal lobes of the brain, which control speech and personality, to slowly atrophy. It is therefore classified as a frontotemporal dementia, or FTD. ..." 

কবিকে নিয়ে যখন কোন প্রতিবেদন লেখা হয় সেখানেও নিরন্তর অন্যায় করা হয়েছে। যেমন bdnews24.com- এ তাঁকে নিয়ে হা বিতং করে বিশাল লেখা আছে, সেই লেখায় কী নেই! সেখানে এটাও লেখা হয়েছে:
"...তাঁকে ততদিনে সিফিলিস রোগাক্রান্ত, পাগল ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা হয়ে গেছে..." [৫] 
বেশ-বেশ, তারপর? এই বিশেষণ লিখেই দায়িত্ব শেষ! এদেরই কি জ্ঞানপাপি বলে?

আমি খানিকটা সময় চোখ বন্ধ করে এটা ভেবে শিউরে উঠি, কবির পরিবারের লোকজনরা এই অনর্থক অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে বয়ে বেড়িয়েছেন, অনিচ্ছায়, দিনের-পর-দিন, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ধরে।
মৃত একজন মানুষের প্রতি আমাদের এই অন্যায় নগ্ন করে দেয় আমাদেরকে। ঈশ্বর, এক টুকরো কাপড় খুঁজছি হন্যে হয়ে...!
...
আমরা খুবই আবেগপ্রবণ জাতি! হঠাৎ হঠাৎ করে আমাদের আবেগ চাগিয়ে উঠে, বিশেষ বিশেষ দিনে আমাদের চোখের জলে কপাল(!) ভিজে যায়! কবি নজরুলের জন্মবার্ষিকী-মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের সো-কলড বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া ভায়ারা মুখে ফেনা তুলে ফেলেন; ওদিকে নজরুলের স্মৃতিস্তম্ভে পাশে আমরা পাকা ডাস্টবিন বানাই, তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ পেশাবের ফেনা দিয়ে ভরে যায় [৬], এতে আমাদের কোন লাজ নাই। কবি নজরুল, বেচারা, মরে বেঁচে গেলেন...!

সহায়ক লিংক:
১. 'পরফেসর' স্যাররা...: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_09.html 
২. newworldencyclopedia: http://www.newworldencyclopedia.org/entry/Kazi_Nazrul_Islam
৩. wikipedia: http://en.wikipedia.org/wiki/Kazi_Nazrul_Islam
৪. helpguide: http://helpguide.org/elder/picks_disease.htm
৫. bdnews24.com: http://arts.bdnews24.com/?p=3029
৬. নজরুল, আপনি মরে বেঁচে গেলেন: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post.html 

18 comments:

রাতমজুর said...

শিক্ষিতদের মূর্খ বলার তীব্র ধিক্কার! শিক্ষিতদের মূর্খ ডাকাতে মূর্খরা অপমানিত হতেই পারে। কারন মূর্খরা অশিক্ষিত বলেই মূর্খ, তাই না?

শিক্ষিত মূর্খদেরকে আমরা জ্ঞানপাঁঠা অথবা জ্ঞানীগাধা বলে ডাকি।

।আলী মাহমেদ। said...

:D @রাতমজুর

Dukhu said...

nazrul ke je oshikkhito borbor 'bodmaish' bolte pare,take r jai bola jak na keno vodrolok bola jayna!khub boro maper deshodrohi na hole amon kotha koshshinkaleo bola shomvob na!r tini jodi akjon Phd degreedhari keo hon tobe ami tar shomosto shikkha bishoyok ganner pap theke dure thakte chai!he ishshor, ai shoytaner dhoka theke jatike mukto rakhun!!!!

যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ said...

Neurosyphilis......! bangali gujob chhoranor bapare voyaboho rokom shrijonshil.

মুকুল said...

আমি নিজেও ভুলটাই জানতাম। :(

নুরুজ্জামান মানিক said...

ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা ।

বোহেমিয়ান said...

অসামান্য শুভ ভাই :)

।আলী মাহমেদ। said...

'শিক্ষিত মূর্খ'শব্দটা আসলে অর্থহীন! কিন্তু আমি এই সব জ্ঞানপাপিদের জন্য সঠিক শব্দটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

এদের 'শিক্ষিত মূর্খ' ব্যতীত আর কী বলা চলে- এই সব উচ্চ শিক্ষা কোন কাজের...! @Dukhu

।আলী মাহমেদ। said...

"bangali gujob chhoranor bapare voyaboho rokom shrijonshil"
হা হা হা, ভাল বলেছেন। পাশাপাশি কৃতজ্ঞতাটাও জানিয়ে রাখলাম। @যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ

।আলী মাহমেদ। said...

ডাক্তারদেরকে আমি দ্বিতীয় ঈশ্বর বলি। এটা নিয়ে কুতর্কে যাব না- প্রিয় মানুষ যখন মুমূর্ষু অবস্থায় আধ জবাই পশুর মত ছটফট করতে থাকে তখন এমনটা মনে না-হওয়ার কোন কারণ নাই।

সেই ডাক্তার নামের অপদার্থ যখন আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে তখন তাকে চুতিয়া বললেও চুতিয়ার অপমান হয়। @মুকুল

।আলী মাহমেদ। said...

আপনাকেও ধন্যবাদ পড়ার জন্য @নুরুজ্জামান মানিক

।আলী মাহমেদ। said...

ধন্যবাদ। :D @বোহেমিয়ান

রুবাইয়্যাত said...

আমি এতদিন দেখি ভুলই জেনে আসছি। আমাদের বইগুলোতেও এই ভুলগুলোই লেখা হচ্ছে।

।আলী মাহমেদ। said...

...আমাদের বইগুলোতেও এই ভুলগুলোই লেখা হচ্ছে...।
এ অন্যায়, ঘোর অন্যায়! এই সব জ্ঞানপাপীদের চাবকানো উচিত।

একটা অনুরোধ করি, সম্ভব হলে কোন বইয়ে লেখা হচ্ছে, এটার রেফারেন্স দিয়েন। এই পোস্টের সঙ্গে জুড়ে দেব। @রুবাইয়্যাত

Anonymous said...

Hey, I can't view your site properly within Opera, I actually hope you look into fixing this.

রুবাইয়্যাত said...

জ্বী অবশ্যই।

।আলী মাহমেদ। said...

ফায়ারফক্স, ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার, গুগল ক্রোম এই সব ব্রাউজারে আমি কোন সমস্যা খুঁজে পাইনি। এবং অপেরা মিনিতেও।

ওপেরা সম্বন্ধে আমার জানা নেই বিধায় এই বিষয়ে কোন পরামর্শ দিতে পারছি না বলে দুঃখ প্রকাশ করি। @Anonymous

।আলী মাহমেদ। said...

ধন্যবাদ, অপেক্ষায় রইলাম। @রুবাইয়্যাত

Facebook Share