Search

Friday, October 30, 2009

হনুমানজীকে খুঁজছি হন্যে হয়ে

হোজ্জা সাহেবকে আমি বড় ইজ্জত দেই। মানুষটা প্রচলিত স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতেন না। ' জারা হাটকে '- একটু অন্য রকম! গাধার পিঠে নাকি উল্টো করে বসতেন। 
এটা শুনেছি, হোজ্জা সাহেবের  সঙ্গে দেখা হয়নি বিধায় পুরোপুরি নিশ্চিত না। এও শুনেছি, গাধা এবং হোজ্জা সাহেবের গতি নিয়ে প্রায়শ ঝামেলা হতো। গাধা উইথ হোজ্জা সাহেব রওয়ানা দিলেন মরমর কোন রোগি দেখতে। হোজ্জা সাহেব এই রোগির চল্লিশায় গিয়ে পৌঁছে শোনেন, গাধা নাকি এখানে ৪০ দিন ধরে দিব্যি লেজ নাড়াচ্ছিল! দেখো দিকি কান্ড!
 

হোজ্জার মত ডন কুইক্সোট মানুষটাকেও আমি ভাল পাই। ইনিও নাকি তার ঘোড়া রোজিন্যান্টকে নিয়ে দাবড়ে বেড়াতেন- ফুল স্পিড আ্যাহেড, কিন্তু গতি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না।

ভূতের নাকি পা উল্টা থাকে, ডাঁহা মিথ্যা কথা; ভূত-সমাজ এটা স্বীকার যায় না। এমনিতে আমাদের পা উল্টা থাকে না কিন্তু হোজ্জার উল্টা বসা দেখে-দেখে আমরাও উল্টা হাঁটা রপ্ত করেছি। হোজ্জা-ডন কুইক্সোটদের দেখাদেখি আমরাও গতি নিয়ে মাথা ঘামানো বাদ দিয়েছি।

বিদ্যুৎ এবং জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেছেন, "শীতকালে ঘড়ির কাঁটা পেছানো হবে না। ...আমাদের দেশে শীত ও গ্রীষ্মে সময়ের খুব একটা তারতম্য হয় না। ...গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ কতটা সাশ্রয় হয়েছে তা অনেকটা তুলনামূলক।"
"গ্রীষ্মে বিদ্যু কতটা সাশ্রয় হয়েছে তা অনেকটা তুলনামূলক।" তাঁর কথা সবই বুঝলাম কিন্তু এটা মাথার উপর দিয়ে গেল, কার গায়ে লাগল তাতে আমার কী!

শীতে আমাদের এখানে সূর্য-বাবাজী সকাল ৭ ঘটিকায়ও তশরিফ আনেন বলে তো আমার মনে হয় না। এতেই নাকি সূর্য-বাবাজীর বড়ো তকলীফ হয়! এখন একই সময়ে ভোর ৬ ঘটিকায় সূর্য-বাবাজীকে 'হুকুম তামিল কিয়া যায়ে'- তশরিফ আনতে বলায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছেন, হুশ-হুশ, ডিজিটাল ঘড়ি দূরের কথা আমি কোন ঘড়িই হাতে দেই না।

সামনাসামনি কথা বললে হয়তো রাজি করানোর একটা চেষ্টা করা যেত। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে সূর্য-বাবাজীর কাছে কেউ যেতে চাচ্ছে না।

আমি হন্যে হয়ে হনুমানজীকে খুঁজছি। দেখি তাঁকে বলে-কয়ে বাগে আনা যায় কিনা।
শীতে হনুমানজী ১ ঘন্টা ধরে বগলে সূর্য চেপে বসে পা নাচালেন, আমরা না-হয় তাঁর পা চেপে ধরে বসেই রইলুম। 
কী আর করা, সবই তাঁদের ইচ্ছা, এই-ই আমাদের কর্মফল! ভলতেয়ারের সেই কথাটাই আউড়াতে হয়, 'কোন দেশের নিয়তি নির্ভর করে সেই দেশের চালক কতটুকু পেটের পীড়াগ্রস্থ তার উপর'।
ভলতেয়ার সার সমস্যা তুলে ধরেছেন কিন্তু সমাধান বাতলে না-দিয়ে সটকে পড়েছেন। সার এসে পড়ার পূর্বেই দেশচালকদের জন্য বেলের শরবত... 'পেশ কিয়া যায়ে' বলে আমিও 'বাল্লে-বাল্লে' পগার পার হই।

Thursday, October 29, 2009

একখানা হিট ছলচিত্র(!) বানাবার কলা(কৌশল)


আপনি একটা হিট কমার্শিয়াল ছবি বানাতে চান? 
এ ধরনের ছবি বানাতে নিদেন পক্ষে আপনার যা লাগবে, একজন ভুঁড়িওয়ালা নায়ক, আড়াই থেকে তিন মণ ওজনের দুজন নায়িকা (একজন, যিনি একটু মোটা কম, শেষ দৃশ্যে প্রায় মিনিট পনেরো ধরে দীর্ঘ সংলাপ বলতে বলতে রক্তের সাগরে ভাসতে ভাসতে মারা যাবেন)। লাগবে কয়েক গ্যালন লাল রঙ, কয়েক লিটার খাঁটি সরিষার তেল অথবা গ্লিসারিন (সহজলভ্য যেটা), প্রচুর লাফিং গ্যাস এবং কাঁদানে গ্যাসের কিছু শেল।  

আপাতত এসব নিয়েই শুটিং শুরু হবে। প্রথম দৃশ্যে দেখা যাবে, নায়িকা এমন একটা পোশাক পরেছে, যেটা পরা, না-পরা প্রায় সমান। একটু পরেই দেখা যাবে নায়িকা সাগরের পানিতে দাপাদাপি করছে। সাগরের পানি উপচে ডাঙায় চলে এসেছে, সাগর কাদার মরুভূমি। 
এবার নায়িকা বিরক্ত হয়ে সমুদ্র নামের কাদার মরুভূমি থেকে ডাঙায় উঠে বনবাদাড়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করবে। ছোটখাটো গাছের ডালপালা সব ভেঙে ফেলবে। 
গাধার (এরা নাকি খুব ভদ্র, ওজন নিয়ে তেমন বিশেষ মাথায় ঘামায় না) পিঠে করে নায়কের আগমন। নায়ক নায়িকার আকাশ পাতাল রূপ দেখে অন্য রকম হয়ে যাবে। নায়িকাকে কোলে নিয়ে (আসলে নায়কদের সময়ের অভাব নইলে বিশ্ব অলম্পিকে ওয়েট লিফটিং-এ সবগুলো সোনা বাগিয়ে নেয়া ডাল ভাত) গান গাইতে গাইতে আরও কিছু গাছের প্রচুর বড় ডালপালা ভাঙবে। 
ওয়েল, এ ছবিতে গান থাকবে আঠারো থেকে বিশটা। প্রায় প্রতিটি গানের কথা থাকবে এরকম, বিচিত্র কারণে নায়িকার শরীরে আগুন ধরে গেছে, ফায়ার বিগ্রেড ডেকেও লাভ হচ্ছে না। ইনিয়ে-বিনিয়ে এটা নায়িকা বার বার বলতে থাকবে। আর নায়ক ঘুরে ফিরে আগুন নেভাবার প্রতিশ্রুতি তো দিবেই, বোনাস হিসাবে সে নিমিষে নায়িকার গোদা পায়ে চন্দ্র-সূর্য হাজির করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধও হবে। 

এ ছবিতে কিছু স্পেশাল এফেক্ট থাকবে। এই যেমন, নায়ক মোটর সাইকেল নিয়ে আকাশে উড়বে, রিকশা নিয়ে ফোর-হুইল ড্রাইভ গাড়ির ধাওয়া করবে। ধান ক্ষেতে অনায়াসে প্লেন নামাবে, লম্বা লম্বা চুল রেখে পুলিশ কিংবা আর্মি হয়ে যাবে। 
মারাত্মক কিছু দৃশ্য থাকবে এরকম, নায়ক একটা পিস্তল দিয়েই শ’য়ে শ’য়ে দুষ্টলোক মেরে ফেলবে। এক গুলিতে দু-তিনজন মারা যাওয়াও বিচিত্র কিছু না, গুলি কোন সমস্যা না। অথচ হাজার হাজার গুলি নায়কের গোপন কেশ দূরের কথা প্রকাশ্য কেশও স্পর্শ করতে পারবে না। বাই এনি চান্স, বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেলেও টলতে টলতে দীর্ঘ সংলাপ বলবে। কিন্তু মরবে না, নায়কদের মরার নিয়ম নাই- সবই তার ইচ্ছা! 

বিয়ের দৃশ্য: যদি মুসলমানের বিয়ে হয় তাহলে আকাশ পাতাল সাক্ষী রেখে বিয়ে হবে আর হিন্দুর বিয়ে হলে দেখা যাবে সিঁদুর নাই। তাহলে কি বিয়ে হবে না? হবে না মানে, অবশ্যই হবে। নায়ক চাকু বের করে এক পোঁচে নিজের হাত কেটে পোয়াখানেক রক্ত দিয়ে নায়িকার সিঁথি মাখামাখি করে ফেলবে।
দুঃখের দৃশ্য: ভাগ্যচক্রে রাজার মেয়ে রুজ-লিপিস্টিক মেখে থাই সিল্ক পরে মানুষের বাড়িতে ঝি-গিরি করবে। ন্যাকড়া দিয়ে ঘর মুছবে কিন্তু আলাদা পানির প্রয়োজন হবে না, চোখের জলই যথেষ্ট।
হাসির দৃশ্য: তিন-চার ফুটের কয়েকজন ভাঁড় নায়িকার সখিদের সঙ্গে রঙ-তামাশা করবে। অবশ্য এখনকার দর্শকরা আবেগশূন্য। নো প্রবলেম, সিনেমা হলে এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহার না করে হাসির দৃশ্যে লাফিং গ্যাস এবং দুঃখের দৃশ্যে কাঁদানে গ্যাস স্প্রে করে দিতে হবে। 


ও-হ্যাঁ, ছবিতে এক বা একাধিক ভিলেন থাকতে হবে, থাকতে হয়, নিয়ম। এদের একমাত্র কাজ হল ছলে-বলে-কৌশলে যে কোনো উপায়ে নায়িকাকে সতী থেকে অসতী বানিয়ে ফেলার সবিরাম চেষ্টা। আর এই অধ্যায় চলতে থাকবে আধ ঘণ্টা ধরে। 
শেষ মুহূর্তে মানে ইজ্জত যায়-যায় এমতাবস্থায় নায়ক হাজির হবে (জাস্ট টাইম, নো কমপ্লেন)। প্রথমদিকে মার খাবে। এরপর প্রতি সেকেণ্ডে চল্লিশ-পঞ্চাশটা ঘুসি মেরে ভিলেনকে এ্যায়সা ধোলাই দেবে, ঘাঘু ধোপাও লজ্জা পেয়ে যাবে। এ অবস্থায় ভিলেনের পরলোকে রওয়ানা হওয়ার কথা। কিন্তু না, উঠবে মার খাবে, আবার উঠবে আবার মার খাবে। ছবি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভিলেনের নিস্তার নাই। 

ভালো কথা, ছবিতে একজন মমতাময়ী মা থাকলে ভালো হয়। যার সামনের চুলগুলো অনেকটা ইন্দিরা গান্ধীর মতো পাকা কিন্তু গায়ের চামড়া টান-টান। যেহেতু ইনি মা, দয়ার শরীর, হাতির বাচ্চার মতো নায়ক মানে ইনার ছেলেকে গভীর বিষাদে বারবার বলতে থাকবেন, ‘আমার পুলা বাঁচতো না, শুখাইয়া চিপস হইয়া গেছে’। আর আধুনিক, হাই-ফাই মা হলে, ‘কী স্বাস্থ্য তোর, কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং, একটু জোরে বাতাস এলে চল্লিশ তলায় উড়ে যাবি’। বাংলাদেশে চল্লিশতলা নাই তাতে কি হয়েছে, ছবির বেশিরভাগ শুটিং হবে তো বিদেশে। 

এবার বিজ্ঞাপন। ইত্তেফাক (বিজ্ঞাপনের স্পেস নিয়ে এদের কোনো সমস্যাই নেই, সিনেমায় বিজ্ঞাপনের জন্য দু-চার পাতা বাড়িয়ে দেয়া মামুলি ব্যাপার। এদের কেবল সমস্যা ভাইয়ে ভাইয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি) ব্যতীত অন্য দৈনিকগুলোতে মঘা ইউনানী বা শকুন ভাইয়ের ঘটকালির বিজ্ঞাপন দিয়ে দেয়ার আগেই যোগাযোগ করে বিজ্ঞাপনের কাজ শেষ করে ফেলতে হবে। 
বিজ্ঞাপনে নায়ক নায়িকাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে এভাবে, মাইগ্যা স্টার সরি ম্যাগা স্টার অমুক। বিউটি কুইন তমুক (ইনার গালের গর্তগুলো চুইংগাম দিয়ে ভরাট করা হয়েছে যার চালু নাম বিউটি স্পট)। 
যেসব হলে ছবি চলবে তার দু-একটা হলকে বেছে নিতে হবে। ভাড়া করা কিছু লোক বিনামূল্যে এ ছবিটা দেখার দাবি জানিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করবে (হইচই করতে হলে গাড়ি ভাঙচুর করতে হয়, নিয়ম)। দেরিতে আসাই নিয়ম কিন্তু বিচিত্র কারণে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে লাঠি বা বেতচার্জ করবে। হুলস্থূল ব্যাপার। পত্রিকাগুলোতে এই নিউজটা ছাপা হবে। যে সব পত্রিকায় এ নিউজ ছাপানো হয়েছে সে সব পত্রিকার নাম, উদ্ধৃতি উল্লেখ করে আরেকটা বিশাল বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে বলতে হবে, এ ছবি দেখার জন্যে দর্শক উম্মাদ হয়ে গেছে। 
ব্যস, কেল্লা ফতে। আপনি তৃপ্তির শ্বাস ফেলে বলবেনই, ছবি একটা বানালুম বটে!
*পোস্টটা দিয়ে বেরিয়েছিলাম একটা কাজে। চোখে পড়ল সিনেমার একটা পোস্টার। ছবির নাম: বউ বড়, না শাশুড়ি?

Wednesday, October 28, 2009

পত্রিকা অফিসে অন্তত একটা দারোয়ানের চাকরি!

প্রথম শ্রেণীর (এদের দাবী মোতাবেক) একটা পত্রিকায়, সম্পাদকীয়তে একজনের কানসাট নিয়ে একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। ১০১ লাইনের সুদীর্ঘ কবিতা।
কবিতার মান আমার আলোচ্য বিষয় না বা কানসাট নিয়ে ওঁর আবেগ! আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, সম্পাদকীয়তে ১০১ লাইনের কবিতা ছাপানো এবং ওই পত্রিকার চাকুরে ওই কবি ব্যতীত এ দেশে অন্য আর কোন কবি খুঁজে না-পাওয়া!

লেখালেখি করেন এমন কারও, পত্রিকায় চাকরি করা অপার সৌভাগ্যের। বিভিন্ন ধরনের এক্সপিরিমেন্ট করা যায়, আমরা গিনিপিগরা আছি না। অমিতাভের সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপনের মতো, সাব কুছ হাজাম কারনা পারতা হ্যায় (অখাদ্য-কুখাদ্য সবকিছুই হজম করতে হয়)!

পত্রিকা অফিসে চাকরি করলে কত্তো-কত্তো সুবিধা! নিজের পত্রিকায়, বইমেলার সময়, পছন্দসই স্পেসে, নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেই বিভিন্ন প্রকাশনীর নাম দিয়ে ছাপিয়ে দেয়া যায়। বইপত্রের আলোচনায় নিজের বইয়ের নাম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনা যায়, পেস্টিংয়ের শেষ পর্যায়ে অন্য বইয়ের প্রচ্ছদ বদলিয়ে নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ ঢুকিয়ে দেয়া যায়।
নিজের নাটকের কথা কোন এক সূত্র ধরে (ধরা যাক,পরিচালকের রেফারেন্স ধরে, অথবা এই নাটকের কোন চরিত্রের মুখ দিয়ে ইত্যাদি, ইত্যাদি)। আলোচনায় নিয়ে আসা যায়। আমেরিকা থেকে হাগু করে এসে, সদ্য আমেরিকা ফেরত এই টাইটেল জুড়ে দেয়া যায়।
যায়-যায়-যায়-যায়-যায়, কত্তো যায়!

আসলে পত্রিকা অফিসে চাকরি বড়ো লোভনীয়। একজন মানুষ যে সুযোগ-লিঙ্ক খুঁজে বেড়ান আজীবন, পত্রিকা অফিসে চাকরির সুবাদে এসব সুযোগ আপনা আপনিই এসে ধরা দেয়। সুযোগটা অবিকল একটেলের সেই বিজ্ঞাপনের মতো ন্যাকা গলায় বলবে, আমাকে নেবে? 

উরি, নেব না মানে? নিয়ে নাম ফাটিয়ে চাকনাচুর করা হবে!

কী মজা, পত্রিকা অফিসে চাকুরিরত লেখক কিভাবে ডিম ভাজছেন এটা কোন এক ইলেকট্রনিক মিডিয়া দেখাবে। ভাগ্যিস, উনি পানি গরম করে দেখাননি!

ওই লেখক কিভাবে ফ্ল্যাট সাজিয়েছেন তার হা-বিতং কাহিনি। আমাদেরকে আরও জানানো হবে, ওনার বউ বৈদেশ থেকে ফিরে এসে চিল-চিৎকার দিয়ে কিভাবে বলবেন, এটা কি সাজিয়েছ, এটা কী চাইনিজ রেস্টুরেন্ট!
অথবা লেখক কোন দোকানের ফিতা কাটবেন, এটা কী ছাপা না হয়ে যায়!

আমার না, বুঝলেন, পত্রিকা অফিসে একটা চাকুরির বড়ো প্রয়োজন, হউক না দারোয়ানের চাকরি! অনেক ভেবে দেখলাম, এ ব্যতীত গতি নাই, বাহে, গতি নাই! 

কে জানে, কোন এক দিন হয়তো ওই 'পরতিকায়' দু-লাইনের আমার একটা কবিতা (মতান্তরে ছড়া) ছাপা হয়ে যাবে, অথবা চার লাইনের গদ্য (যেটা দিয়ে বাচ্চার ইয়ে পরিষ্কার করে)!

‘সবাই যখন পত্রিকা অফিসের ছাদে উড়ায় পলিথিনের ঘুড়ি,
তখন আমি দারোয়ানের টুলে বসে চিবাই ন্যাতানো মুড়ি।'


*বইয়ের বিজ্ঞাপন কেমন হয় এটা বোঝাবার জন্য লিংকটা ব্যবহার করলাম। কেউ কারও সঙ্গে বা এই পোস্টের সঙ্গে কোন মিল খুঁজে পেলে তা হবে নিছক কাকতালীয়।

Saturday, October 24, 2009

আমার ছায়া আমায় ছাড়িয়ে যায়

প্রয়োজন মনে করায় এখানে বাচ্চাটির নাম এবং ডাক্তারের নাম সরিয়ে দিলাম
একটি ছোট্ট শিশুর প্রতি করা হয়েছিল তার জানামতে, এক অজানা চরম লাঞ্চনা, ভয়াবহ অন্যায়।

ওই শিশুটির বাবা একদিন আমার হাত ধরে একটা শিশুর মত কাঁদছিলেন।
ওই বাবাটির হাতে ধরা এই রিপোর্টটি, ক্ষমতাবানরা নাকি টাকার জোরে তাদের পক্ষে নিয়ে নিয়েছে। এতে পরিষ্কার লেখা আছে হাইমেন ইনট্যাক্ট!
অথচ এই মেয়ে-শিশুটিকে ধর্ষন করা হয়েছিল, ছেলেটি পালিয়ে যাওয়ার সময়, আই-উইটনেস থাকার পরও আদালতে এই রিপোর্টটি দাখিল করলে এই মামলা ডিসমিস হয়ে যাবে এ নিশ্চিত!
(এটা ওই শিশুটির বাবার বক্তব্য-মত,
এই মতের দায়-দায়িত্ব আমার না। তাঁর লিখিত সম্মতিক্রমে ছাপানো হলো। )

ওই বাবাটির মত আমিও এক অভাগা, অক্ষম- কী করার ছিল আমার? কিন্তু আমি যেটা করতে পারিনি আমার সৃষ্ট চরিত্র ওবায়েদ সাহেব সেটা করে দেখিয়েছেন। আমার সৃষ্টি আমায় ছাড়িয়ে গেছে, এতে আমার কোন লাজ না।
ওবায়েদ সাহেব- তাঁকে আমি স্যালুট করি।
... ... ...
"জুনাব আলি (ওসি) এবং ওবায়েদ সাহেবকে ডাঃ শাহরিয়ার বসিয়ে রেখেছেন প্রায় ১৫ মিনিট হল।
জুনাব আলি ডাক্তারের প্রাইভেট চেম্বারে এসেই বলেছিলেন, ডাক্তার সাহেব, জরুরি দরকার। আপনার সঙ্গে কথা বলতে হবে। ঢাকা থেকে এক সার এসেছেন।

ডাঃ শাহরিয়ার
পাত্তা দেননি। সিভিল সার্জন, এস, পির সঙ্গে তার যথেষ্ট হৃদ্যতা আছে। হেলাফেলা ভঙ্গিতে বলেছিলেন, আপনি দেখছেন না, রোগি দেখছি।
ডাক্তার সাহেব বিষয়টা জরুরি।
আরে কি মুশকিল! এখন আমার পিক আওয়ার, সন্ধ্যায় আসেন।
ডাক্তার সাহেব, কিছু মনে করবেন না। সন্ধ্যায় তো সার থাকবেন না, ঢাকায় ফিরে যাবেন।
ডাঃ শাহরিয়ার রেগে গিয়েছিলেন, না থাকলে নাই। আপনার সার কি ঘোড়ায় চড়ে এসেছেন! যান, অপেক্ষা করতে বলেন, রোগি দেখা শেষ করে আলাপ করব।

জুনাব আলি শংকিত দৃষ্টিতে দরোজার ফাঁক দিয়ে খানিক তাকিয়েই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। ওবায়েদ সাহেব বাইরে যেখানে বসে অপেক্ষা করছিলেন, ওখানে এই কথাবার্তাগুলো না-শুনতে পাওয়ার কোন কারণ নাই। কিন্তু মানুষটার নির্বিকার ভঙ্গি, শুনেছেন কি শোনেন নাই বোঝা যাচ্ছে না।
বের হয়ে জুনাব আলি মৃদু গলায় বলেছিলেন, সার-।
ওবায়েদ সাহেব হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলেন, হুম-ম!

ভেতরের রোগি বের হয়ে এলে আরেকজন রোগি ঢুকতে যাচ্ছিল। এইবার ওবায়েদ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। হিম গলায় বললেন, জুনাব আলি, এই রোগিকে জিজ্ঞেস করেন কি সমস্যা নিয়ে এসেছে। খুব জরুরি কিছু না হলে বলেন অপেক্ষা করতে।
জুনাব আলি কথা বলে দেখলেন খুব জরুরি কিছু না। ওবায়েদ সাহেব কালমাত্র বিলম্ব না করে ভেতরে ঢুকলেন।
চেয়ারে বসতে বসতে
ডাঃ শাহরিয়ারকে বললেন, হ্যালো ডক, আপনি ভুল ভাবছেন, আমি কিন্তু ঘটক না। বিবাহের কোন সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে আসি নাই যে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকব।
ডাঃ শাহরিয়ার স্তম্ভিত। কেউ তার সঙ্গে এমন ভাষায় কথা বলছে এটা মেনে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে। সামলে নিয়ে বললেন, আপনি কে, মুখ সামলে কথা বলুন।
না বললে?
আপনি জানেন আমি আপনাকে জেলের ভাত খাওয়াতে পারি।
তাই নাকি! দু-নম্বরি করতে করতে ভাষাটাও দু-নম্বরি হয়ে গেছে আপনার। জেলের ভাত খাওয়ার আপনার শখ কেমন, শুনি?
জেলের ভাত খাওয়া আপনার জন্য অবশ্য খুব কঠিন কিছু না। কয়টা বলব?
আপনি এখানে প্র্যাকটিস করছেন অথচ আপনার এখন সরকারি হাসপাতালে থাকার কথা। খোঁজ নিয়েছি, আপনি ছুটিতেও নেই। বিষয়টা কী দাঁড়াল? সবচেয়ে ভয়াবহ কথাটা হচ্ছে, আজ আপনার ইমারর্জেন্সি ডিউটি।
এমনিতে এই প্যাথলজির সঙ্গে আপনার চুক্তি হচ্ছে, যত টেস্ট লিখবেন এর বিনিময়ে শতকরা ৪০ ভাগ কমিশন পাবেন। আরও বলব?
মাস ছয়েক আগে আপনার দোষে মেয়াদ উত্তীর্ন ইঞ্জেকশনের কারণে একটা শিশুর মৃত্যু হয়। আপনি চাল করে শিশুটির বাবার কাছ থেকে প্রেসক্রিপসনটা হাতিয়ে নিয়েছিলেন।
ভুয়া সার্টিফিকেট দিতে আপনার কোন আপত্তি থাকে না, টাকার অংকটা ভাল হলেই হয়। আরও বলব? ওহো, মাফ করবেন-মাফ করবেন, আমি যে ঘটক না এটা তো মুখে বললাম। প্রমাণ দেই, মে আই? এই যে আমার আই, ডি।

ডাঃ শাহরিয়ার
মনে হচ্ছে বুকে হাঁপ ধরে যাচ্ছে। হার্টবিটের একটা বিট কি মিস করলেন, মানুষটা যখন তার আই ডি বের করে চোখের সামনে মেলে ধরলেন।
ডাঃ শাহরিয়ার ভয় চেপে বরলেন, ক্কি-কি, চান আমার কাছে?
ওবায়েদ সাহেব তাৎক্ষণিক উত্তর দিলেন না। সময় নিয়ে রিপোর্টটা বের করলেন। এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটা ভাল করে দেখুন, চেনা মনে হচ্ছে।
ডাঃ শাহরিয়ার একনজর দেখেই ফেরত দিলেন।
সইটা আপনার?
হ্যাঁ।
হ্যাঁ না, বলুন জ্বী। আমি আপনার বন্ধু না। সইটা আপনার?
ডাঃ শাহরিয়ার থেমে থেমে বললেন, জ্বী।
রিপোর্টটা ঠিক আছে?
ঠিক না থাকলে এটা দেব কেন?
মেয়েটিকে রেপ করা হয়েছিল কিন্তু আপনি স্পষ্ট লিখেছেন, রেপড হয়নি। কিন্তু আপনার চেয়ে কে আর ভাল জানবে যে এটা ভুয়া।
ভুয়া হবে কেন?
চোপ, বেশি ফড়ফড় করবেন না। ভুয়া মানে জানেন না- সারহীন, অসার, শূন্যগর্ভ? মিথ্যা এই রিপোর্টটার জন্য ২২০০ টাকা নিয়েছেন, ভুলে গেছেন?
আমি কোন টাকা নেই নাই।
ওবায়েদ সাহেব অবজ্ঞার হাসি হাসলেন, হুম, না নিলে ভাল।

ডাঃ শাহরিয়ারের
মত মানুষরা ভাঙ্গেন কিন্তু মচকান না। তিনি ভাল করেই জানেন টাকার গায়ে কারও নাম লেখা থাকে না। বললেই প্রমাণ হয়ে যায় না। হ্যাঁ, এটা সত্য, এরা খোঁজ খবর নিয়েই এসেছে। তিনি টাকা নিয়েই এই মিথ্যা রিপোর্টটা দিয়েছিলেন, স্বীকার না করলে কচু হবে!
ওবায়েদ সাহেব খানিকক্ষণ নীরব থেকে বললেন, তাইলে আপনি টাকা নেন নাই?
বললাম তো একবার, না।
হুম, তাইলে নেন নাই?
জ্বী-ই-ই না।
হুমম।

ডাঃ শাহরিয়ারের
আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই, সামলে নিয়ে বললেন, অফিসার, আপনি অযথাই আমাকে ফাঁসিয়ে দিতে চাইছেন।
ওবায়েদ সাহেব হেলাফেলা করে হাসলেন, হুমম। ফাঁসিয়ে দেয়া। ভাল বলেছেন, ওয়েল সেইড। দেখুন শাহরিয়ার সাহেব, আপনি এমন সব কর্মকান্ড করে বেড়ান আপনাকে ফাঁসানো আমার জন্য কঠিন কিছু না। জানি-জানি, আপনি কি ভাবছেন, আপনি আইনের ফাঁকতালে অবলীলায় বের হয়ে আসবেন। আর এটা আমার যে জানা নাই এমন না। একটা কথা আছে জানেন তো, কাউকে এক হাত নিচে নামাতে হলে নিজে দুই হাত নিচে নামতে হয়। এটাই হচ্ছে আপনার সুবিধা, আমার অসুবিধা। আপনাকে একহাত নিচে নামিয়ে আমার দু-হাত নিচে নামার সুযোগ নাই! এটা আপনি ঠিকই আঁচ করেছেন, তাই না?

ডাঃ
শাহরিয়ার চুপ করে রইলেন। উত্তর দিলেন না। মনে মনে ভাবলেন, ঠিক ধরেছ ব্যাটা।
ওবায়েদ সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, শাহরিয়ার সাহেব, আমার সময় কম নইলে আমি আপনার চ্যালেজ্ঞ ঠিকই নিতাম। আপনার জীবনটা দুর্বিষহ করে দিতাম। আমি বলি কি, সত্যটা স্বীকার করে ফেলুন, আমি চলে যাব; আপনাকে আর ঘাঁটাব না, আই সয়্যার অন মাই বলস। আপনার নিজস্ব কর্মকান্ড নিয়ে আমার কোন উৎসাহ নেই।
ডাঃ শাহরিয়ারের গলা খানিকটা উঁচু হলো, এককথা কয়বার বলব!
আপনি যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন, যারা রেপ করেছে, শফিক-ফরহাদ, এরা আমার কাস্টডিতে আছে। এরা সব স্বীকার করেছে।
ডাঃ শাহরিয়ার কাঁধ ঝাঁকালেন, একজন বলে দিলেই আমাকে মানতে হবে কেন!
সায়িদ সাহেব, আপনার কাছে জোর অনুরোধ করি, এটা একটা রেপ কেস। এবং রেপড হয়েছে একটা শিশু। প্লিজ, একটু ফেভার করুন। আমি কথা দিচ্ছি, এরপর আপনার কোন প্রসঙ্গ নিয়ে-।
ওবায়েদ সাহেব পুরো কথা শেষ না করেই থেমে গেলেন। সামনে বসা মানুষটার মুখে বিজয়ীর হাসি। ওবায়েদ সাহেবের কাতরতার মানুষটা
অন্য অর্থ বুঝে বসে আছে!

ওবায়েদ সাহেব বললেন, হুমম, তা
শাহরিয়ার সাহেব, আপনার একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে, না?
অজান্তেই
ডাঃ শাহরিয়ারের কপালে ভাঁজ পড়েছে, জানেন যখন জিজ্ঞেস করছেন কেন?
না এমনি। কোন ক্লাশে উঠল, নাইন, রাইট?
হ্যাঁ, তো?
বেশ বেশ। মাশাল্লা।
ডাঃ শাহরিয়ার গলা একধাপ চড়ে গেল, এই বিষয়ে কথা বলার মানে কী!
ওবায়েদ সাহেব পলকহীন দৃষ্টিতে বললেন, না, কোন মানে নাই। আমি ভাবছিলাম আপনার মেয়ের সঙ্গে এই ঘটনাটাই ঘটলে আপনার কেমন লাগত? জাস্ট ভাবছি আর কি- ভাবতে তো আর দোষ নাই, কী বলেন?
হাউ ডেয়ার য়্যু!
তাই মনে হচ্ছে আপনার! কেন, নিজের মেয়েকে নিয়ে এমন আশংকা জাগে না বুঝি?
অফিসার, আপনি কিন্তু লিমিট ক্রস করছেন!
তাই নাকি! কই, আমার তো এমনটা মনে হচ্ছে না।
অফিসার, আপনি এবার আসুন। আমার বিরুদ্ধে যা প্রমাণ করার করুন। পারলে আমাকে কোর্টে তুলুন। লেট সী!
দাঁড়ান-দাঁড়ান, এই মুহূর্তে এখান থেকে যাওয়ার কোন ইচ্ছা নাই আমার। আরে না, কোর্ট-ফোর্টে যাওয়া নিয়ে আমার কোন ইচ্ছা নাই।

এইবার ওবায়েদ সাহেব ওসি জুনাব আলীর দিকে ফিরে বললেন, ইয়ে, জুনাব আলি, আপনার জানামতে কোন দাগী আসামী বা বদমায়েশ ক্রিমিনাল আছে?
জুনাব আলি এই মানুষটার কথার ধারা খানিকটা আঁচ করতে পারেন। উৎসাহে বললেন, তা খুঁজে বের করা যাবে, সার।
শিওর?
জ্বী সার।
কনফার্ম করেন, নইলে বাইরে থেকে আমাকে আবার পাঠাতে হবে।
না সার, সমস্যা হবে না।

ওবায়েদ সাহেব জুনাব আলির সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন
ডাঃ শাহরিয়ারকে উপেক্ষা করে।
জুনাব আলি, আপনি এমন একজন ঠিক করুন। ওকে আমরা এই কাজের বিনিময়ে সব ধরনের ছাড় দেব।
সার, এমন একজন না, কয়েকজনকেই পাওয়া যাবে। আপনি মাথায় হাত রাখলে এরা হাসতে হাসতে কাজটা করে দেবে।
আরে না জুনাব আলি, আমি তো ধরাছোঁয়ায় থাকব না। যা করার আপনিই করবেন। অবশ্য আমার সব সাপোর্ট পাবেন, কথা দিলাম।

ডাঃ শাহরিয়ার
মানুষটা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, ভয়টাকে আটকাতে। পারছেন না। এই মানুষটার হেলাফেলা ভঙ্গি ভয় ধরাবার জন্য যথেষ্ট। তিনি লক্ষ করলেন এরা তার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। একাগ্রমনে শলা করছে। সত্যি সত্যি কি এরা এটা করবে, নাকি তাকে ভয় দেখাচ্ছে।
জুনাব আলি, তাইলে আপনি কাজ শুরু করে দেন। এস, পিকে শুধু এটা আমি বলে দেব, আপনার যেন কোন সমস্যা না হয়। ভাল কথা, যাকে দিয়ে কাজটা করাবেন সে আবার স্বীকার করে ঝামেলা করবে না তো?
না সার, টাইট দিয়ে দেব।
উঁহুঁ, জুনাব আলি, এই বিষয়টা কিন্তু হেলাফেলার বিষয় না। ভাল হয় ওই পরে বদমায়েশটাও মারা গেলে। ইয়ে, বুঝতে পারছেন তো?
জ্বী সার, আপনার এই পরামর্শটা মনে ধরেছে। এটাই ভাল হবে। রিস্ক কম।
আমারও তাই মনে হয়।
সার, আপনি আমার উপর ছেড়ে দেন। দেখেন আমি কিভাবে ব্যাপারটা সামলাই।
গুড।
সার, পুরো ঘটনাটার ভিডিও করে এক কপি পাঠিয়ে দেব?
না জুনাব আলি, নেহায়েৎ বোকামি হবে। তাছাড়া এটার আদৌ প্রয়োজন নাই। কাজটা হয়ে গেলেই হয়। আমি কেবল দেখতে চাই ডাঃ সাহেব কার কাছে গিয়ে তার মেয়ের বিচারটা চান।

ডাঃ শাহরিয়ার
আর পারলেন না। দু-হাতে মুখ ঢাকলেন। অস্ফুট স্বরে বললেন, স্টপ ইট, প্লিজ স্টপ ইট।
ওবায়েদ সাহেব এবং জুনাব আলি চুপ করে গেলেন।
ডাঃ শাহরিয়ারকে সামলে নেয়ার সুযোগ দিচ্ছেন।
শাহরিয়ার সাহেব ভাঙ্গা গলায় বললেন, বলুন কি করতে হবে আমাকে?
আপনার এই রিপোর্টটা ভুল।
জ্বী।
মেয়েটা রেপড হয়েছিল এর আলামত পাওয়া গিয়েছিল?
জ্বী।
আপনি এখন যেটা করবেন নতুন করে রিপোর্টটা লেখবেন। যা ঘটেছিল তাই লিখবেন। কি লিখবেন না?
জ্বী সার।
গুড।
ফরম তো হাসপাতালে।

ওবায়েদ সাহেব অমায়িক হাসি হাসলেন, ও নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। ফরম আমরা সাথে করেই নিয়ে এসেছি।
ডাঃ শাহরিয়ার এক্ষণ পূর্ণদৃষ্টিতে মানুষটাকে দেখলেন। এতটা বিস্মিত তিনি জীবনে খুব কমই হয়েছেন। মানুষটা প্রস্তুতি নিয়েই ডাঃ শাহরিয়ার খসখস করে নতুন করে লিখে দিলেন।
ওবায়েদ সাহেব পলকে চোখ বুলিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললে,
শাহরিয়ার সাহেব, কথা দিয়েছি যখন আজকের পর আমাকে আপনি আর দেখবেন না। কিন্তু এই প্রার্থনাও করি, এমন একটা দিন যেন আপনার জীবদ্দশায় আপনাকে কখনই দেখতে না হয়। আপনার মেয়েকে আমার শুভেচ্ছা দিয়েন। বাই।"
('খোদেজা' থেকে।)

*উক্ত রিপোর্টটির সঙ্গে 'খোদেজা'- এই ফিকশনের সঙ্গে কোন যোগসূত্র নাই। সাত বছরের খোদেজা নামের অভাগা মেয়েটির সঙ্গে প্রায় একই কিন্তু আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল কিন্তু সে ভিন্ন প্রেক্ষাপট।

Wednesday, October 21, 2009

সভ্যতা কাকে বলে?

অভিধান মতে, সভ্যতার অর্থ হচ্ছে, "সভ্য জাতির জীবনযাত্রা নির্বাহের পদ্ধতি- সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম ও বিবিধ বিদ্যার অনুশীলনহেতু মন মগজের উৎকর্ষ সাধন"।

মানবতার কথা এখানে উল্লেখ নাই। অনুমান করি, এটা সম্ভবত এই সমস্ত সু-চর্চার নির্যাস বা ফল। 
 
এএফপি জানাচ্ছে, অষ্ট্রেলীয়ার আউটব্যাকে উটের সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়ে গেছে। এতে বিবিধ সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে। সৃষ্টি হয়েছে উটের খাদ্য সংকট, প্রাণ বাঁচবার তাগিদে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষদের এরা বড় যন্ত্রণা দিচ্ছে। অষ্ট্রেলীয়ার চাকা যারা বনবন করে ঘুরাচ্ছেন, তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সাড়ে ছয় লাখ উট গুলি করে মেরে ফেলা হবে। এই হত্যাযজ্ঞ চালানো হবে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে। এর জন্য আড়াই কোটি ডলার বাজেট নির্ধারন করা হয়েছে। প্রয়োজনে এরা অবলীলায় যে-কোন প্রাণ বিনস্ট করে ফেলতে দ্বিধা করে না, প্রাণটা উট, না মানুষ এটা বিবেচ্য না!
পৃথিবীর অনেক দেশেই উটের রয়েছে বিপুল চাহিদা, রয়েছে মাংসের ঘাটতি! বিনে পয়সায় না-দিলেও রফতানি করার সীমাহীন সুযোগ। কিন্তু ওয়াইল্ড লাইফ প্রিজারভেশন সোসাইটি অভ অস্ট্রেলীয়ার প্রেসিডেন্ট মার্ক পিটারসন বলেন, 'উট রপ্তানি করার পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত না'
কেন বাস্তবসম্মত না এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। স্রেফ অংকের হিসাবই না ওই যে সভ্য হওয়ার অনিচ্ছা! এই গ্রহেরই ক্ষুধার্ত সন্তানদের নিয়ে এদের কোনও মাথা ব্যথা নেই- কে যাবে এতো হ্যাপা সামলাতে। তারচেয়ে গুলি করে ল্যাঠা চুকিয়ে দিলেই হয়।
 
‘Conspiracy of Murder, the Rwandan Genocide’ নামের বইয়ে লিন্ডা মেলবার্ন লেখেন:
"১৯৯৪ সালে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে রোয়ান্ডায় প্রায় ১০ লাখ মানুষকে সুপরিকল্পিত ভাবে হত্যা-খুন করা হয়।
পৃথিবীতে এমন উদাহরণ খুব একটা নাই। নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে এর তুলনা চলে কারণ তারাও চেয়েছিল একটা জাতিকে নিচিহ্ন করে দিতে।
রোয়ান্ডাতে এটা করা হয়েছিল টুটসি (Tutsi) জাতিকে নিচিহ্ন করা এবং একটা বিশুদ্ধ হুটু (Hutu) জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্টি করা। 
এই হত্যাযজ্ঞ থামাতে জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিল পুরাপুরি ব্যর্থ হয়, যা বিংশ শতাব্দীর এক মহা কেলেংকারি। এদের কাজের খানিকটা নমুনা মানুষকে সুপরিকল্পিত ভাবে হত্যা-খুন করা হয়।
পৃথিবীতে এমন উদাহরণ খুব একটা নাই। নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে এর
পাওয়া যাবে, ওই সময়ে শান্তিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার লেফট্যানেন্ট জেনারেল রোমিও ড্যালায়ার তাগাদার পর তাগাদা দিয়েছেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠাবার জন্য।
তিনি বলেন, 'মাত্র ৫০০০ ট্রেনিংপ্রাপ্ত সৈন্য থাকলেই গণহত্যাকে অনেকটা সীমিত রাখা যেত'
যথারীতি পশ্চিমা মিডিয়া উদাসিন, গা ছাড়া ভাব দেখিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম বিবিসি। ১০ লাখ মানুষের মৃত্যুর পর এরা বিপুল আয়োজন করে 'শুটিং ডগস' (Shooting dogs) নামে একটা ডকুমেন্টরি বানিয়েছিল যার অধিকাংশই ছিল অতিরঞ্জিত, মিথ্যা।"
সভ্যতার পতাকা বহনকারি সভ্য নামের ক্ষমতাবান, এরাই খাদ্যশস্যের জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে, এরাই ঘটা করে রিলিফ পাঠায়। এরাই ওয়ার্কশপ করে আমাদেরকে মানবতা শেখায়। এদের ইচ্ছাই শেষ কথা!
আসলে এদের কাছে সবই একেকটা সংখ্য:
একটা বিয়ার।
একটি উট।
একজন মানুষ।
একটি কুকুর।
একটি শিশু!
...
১ লাখ ক্যান বিয়ার।
সাড়ে ৬ লাখ উট।
১০ লাখ মানুষ (রোয়ান্ডান)।
অসংখ্য মোটাতাজা কুকুর।
৩০ লাখ মানুষ (বাঙ্গালি)!

এই সব দাম্ভিক জাতি, এদের ঈশ্বরসুলভ আচরণ দেখে মনে হয়, এরাই বুঝি শেষ কথা। প্রকৃতি, প্রকৃতির সন্তানদের নিয়ে এরা খেলবে ইচ্ছামত। কিন্তু আফসোস! সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ধার করে বলতে হয়"
"...দু আঙুলের ফাঁক দিয়ে
কখন
খসে পড়ল তার জীবন-
লোকটা জানলই না...।"
প্রকৃতি কখন এদের ফেলে দেবে এটা এরা যখন জানবে তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে। কেবল সময়ের অপেক্ষা...।

*ছবিঋণ: বাংলার মুক্তিসংগ্রাম, আফতাব আহমদের বই থেকে।

পীর সাহেব

সন্ধ্যা হয় হয়। পীর সাহেব বিমর্ষ মুখে ওরসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঘুরে বেড়াচ্ছেন কথাটা ঠিক না অন্য ধরনের শাস্তি ভোগ করছেন। এ ওরসটা হচ্ছে ওঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে। ইনি নাকি জীবিতকালে জ্ঞাতসারে কোনো পাপ করেননি। কিন্তু ওঁর মৃত্যুর পর ওঁর কবরে যে সব অনাচার হচ্ছে এটা স্বচক্ষে দেখার জন্যই তাঁকে পাঠানো হয়েছে। এসে দেখেন, ইয়াল্লা, তিনি দেখি আস্ত পীর হয়ে বসে আছেন। সবাই তাঁর কাছে কিছু-না কিছু চাইছে! তিনি দেবেন কেমন করে, সেই ক্ষমতা কই! তিনি নিজেই আছেন বড় বিপদে, তাঁকেই বাঁচায় কে?
তাঁর এই মাজারের ওরস চলবে দশ দিন। প্রথমে গেলেন ওরস কমিটির সেক্রেটারির কাছে। পীর সাহেব হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘জনাব, ওরস উপলক্ষে কি কি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, দয়া করে বলবেন কি?’
সেক্রেটারি সাহেব চেয়ারে পা তুলে একরাশ আলগা গাম্ভীর্য এনে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বললেন, ‘আপনে কে, আপনের পরিচয়?’
‘জ্বী আমিই পীর, ইয়ে মানে, পীর বাবার একজন মুরীদ (এ মিথ্যাচারের জন্য মনে মনে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন)।’
‘অ, আচ্ছা আচ্ছা। মিয়া আগে বলবেন তো। তো ব্যবস্থা ফাস ক্লাস। এই ধরেন, ওরস চলবো দশদিন, এই দশদিনের জন্য দশমণ গাঁজার ব্যবস্থা আছে।’
‘বলেন ক্কি! দ-দশ মণ গাঁজা। গাঁজা-টাজা খেলে তো নেশা হয় শুনেছিলাম,’ পীর সাহেব বিস্ময়ে টলে উঠে, মাজারের কারুকাজ করা (সম্ভবত পৃথিবীর এমন কোনো রং বাকি নেই, যা এখানে ব্যবহার করা হয়নি) থাম ধরে সামলে নিয়ে বললেন।
‘হে হে, তা হয়। কিন্তু মিয়া, গাঁজা না খেলে দুনিয়াদারী ভুলবেন কি করে আর এসব না ভুললে বাবাকে পাবেনই বা কিভাবে! মারফতি বিষয় আর কি। আর ভাববেন না যে আজে-বাজে জিনিস, বিশুদ্ধ গাঁজা।’
‘বিশুদ্ধ গাঁজা মানে!’
‘যিনি গাঁজার সাপ্লায়ার তিনি তো আবার বাবার একজন খাদেম। ভেজাল দিলে বাবা বুঝি তাকে আস্ত রাখবেন! বুঝলেন না?’
পীর সাহেব কিছুই বোঝেননি। কিন্তু এমন একটা ভাব করলেন, বুঝে ফালা ফালা করে ফেলেছেন। একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা আরেকটা কথা। এখানে তো দেখছি পাওয়ারফুল হাজার হাজার বাল্ব জ্বলছে। এতো মোমবাতির দোকান সাজিয়ে বসে আছে, বিক্রি হয় কিছু?’
সেক্রেটারি সাহেব বিকট হাই তুলে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন, ‘হাহ! এই দশ দিনের ওরস উপলক্ষে আশপাশের জায়গা পনেরো লাখ টাকায় নিলাম হয়েছে। শুধুমাত্র এসব মোমবাতির দোকান থেকেই পাওয়া যাবে তিন লাখ টাকা। এখন বুঝে দেখেন কতো টাকার মোমবাতি বিক্রি হলে তিন লাখ টাকা দিয়েও লাভ থাকবে।’
 

পীর সাহেব গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর মৃত্যুর পর সে সময় ইলেকট্রিসিটি ছিল না। তাঁর কবরে ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোনো সদাশয় ব্যক্তি প্রদীপ জ্বালিয়ে দিলে অন্যদের কবর জিয়ারত করতে সুবিধে হতো। কিন্তু এখন এসব কী হচ্ছে! অমায়িক হেসে বললেন, ‘মানত করে যে লাখ লাখ মোমবাতি দেওয়া হচ্ছে এতো নিশ্চয়ই জ্বালানো হয় না। বাকিগুলো কি হয়?’
সেক্রেটারি সাহেব ক্ষেপে গিয়ে হাই-হুই করে লোকজন ডেকে পীর সাহেবকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে বের করে দিলেন।
পীর সাহেব মন আরো খারাপ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ওরস উপলক্ষে কী নেই! হরেক রকমের দোকানপাট,
জুয়ার বোর্ড, সার্কাস। সার্কাস নামের জিনিসটা দশ মিনিট দেখে বেরিয়ে এসেছেন, (ধুমসী মেয়েরা যখন স্বল্প পোশাকে মোটা গলায় গান ধরল: রূপে আমার আগুন জ্বলে, যৌবন ভরা অঙ্গে)।
কিছু দোকানে মৃৎ শিল্পের বেশ কিছু নমুনা দেখে মুগ্ধ হলেন। একেকটা বুড়ো আঙুলের সমান থেকে পাঁচ ব্যাটারীর টর্চলাইটের মতো, আর কী কারুকাজ! তিনি ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই শো-পিসগুলোর নাম কি ভাই?’
দোকানদার এমনভাবে তাকাল যেন মঙ্গল গ্রহের জীব দেখছে। লম্বা লম্বা চুল ঝাঁকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘হাগল কি কুনু, বাবার দরবারে আইছেন আর গাঁজার কলকি চিনেন না।’
 

পীর সাহেব লজ্জিত মুখে ওখান থেকে বেরিয়ে এলেন। দেখলেন প্রায় জায়গায় পুরুষ নারী মিলে উদ্দাম নৃত্য হচ্ছে। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় অন্ধকার। একজনকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই আপনি গাঁজা কেন খান?’
লোকটা ঢুলুঢুলু লাল চোখ তুলে বলল, ‘কেন খাই। অ, এই কথা। আমি বাবার একজন সামান্য মুরীদ। গাঁজা খেলে খোদ বাবা হয়ে যাই।’
এই প্রশ্নটাই এক কিশোরকে করলে লাজুক উত্তর দিল, ‘বড় হয়েছি না। এখন দুধ খাই না গাঁজা খাই। এক কলকি গাঁজায় মাইল পার।’
জন্মদিনের পোশাক পরা ক-জনকে ছ-হাত তফাৎ থেকে জিজ্ঞেস করলেন ‘অ্যাঁ, একি অবস্থা আপনাদের!’
ওদের মধ্যে থেকে একজন বললেন, ‘হা, হা, হা। আমি তো বাবার পাগল, লোকজনকে বাবার খোঁজ খবর দেই, পাগল বানাই।’
‘আপনি তো নিজেকেই সামলাতে পারছেন না, অন্যকে পাগল বানাবেন কেমন করে!’ কথাটা বলেই পীর সাহেব লাফিয়ে আরো চার হাত পিছিয়ে এলেন।
এখানে অনেকগুলো মহিলা জটলা করছিলেন। এদের সঙ্গে ধাক্কা খেলেন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘বোন গো, মাফ করবেন খেয়াল করিনি।’
এরা মোটা মোটা থাবা দিয়ে তালি বাজাতে বাজাতে ফাটা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘হায়-হায়, কে তোর ভইন। হায়-হায়।’
‘আপনারা মেয়ে সে জন্য বোন বললাম।’
‘যদি কিছু মনে না করস, তোরে একটা কুইজ কই, আমরা পোলাও না মাইয়াও না, ক’ছে আমরা কেডা?’
পীর সাহেব একজনকে পেলেন। ভাবে বুঁদ হয়ে আছে। থেকে থেকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলছে,

"পীর হু, পীর হু, পীর হু, হু হু হু
এইবার যামু, এইবার যামু, এইবার যামু
একবারে ফিরা আমু, একবারে ফিরা আমু।"

মানুষটার মাথা ঝাঁকাঝাঁকি কমে এলে পীর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ভাইজান এই যে হু হু করছেন, আপনি কে, বিষয় কি?
মানুষটা গা দুলিয়ে বলল, আমি রসু খাঁ। পীর সাবের দোয়া নিতে আইছি। আমি নিয়ত করছি ১০১ খুন করব এরপর একেবারে বাবার কোলে চইলা আসব।
পীর সাহেব মনের দু:খে নদিতে ঝাঁপ দিলেন। কিন্তু মরলেন না। রবীন্দ্রনাথের কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিয়াছিল সে মরে নাই আর আমাদের পীর সাহেব না-মরিয়া প্রমাণ করিলেন দ্বিতীয়বার মরার নিয়ম নাই!

Tuesday, October 20, 2009

নপুংসকদের কথা!

এক ছেলে এক স্কুলছাত্রীকে লাঞ্ছিত করেছে। মেয়ের বাবা থানায় অভিযোগ করেছেন। পুলিশ ওই সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছে। বড় সরল একটা ঘটনা। এ তো আকছার হচ্ছে, তেমন অভিনবত্ব নেই।

এই ঘটনাটার পত্রিকার খবর, "এক সন্ত্রাসী অস্ত্রের মুখে প্রকাশ্যে শত শত মানুষের সামনে এক স্কুলছাত্রীকে লাঞ্ছিত করেছে"।
পত্রিকার খবরে অতিশয়োক্তি থাকবে এ আর বিচিত্র কী!
’শত শত মানুষের সামনে’ এই কথাটায় অতিশয়োক্তি থাকলেও এই ঘটনার সময় অসংখ্য মানুষ উপস্থিত ছিলেন, এটা সত্য।

এই সন্ত্রাসী নামের চ্যাংড়া ছেলেটাকে আমি চিনি। আমি নিজে রোগা-দুবলা মানুষ কিন্তু একে একটা চড় দিলে এর অজান্তেই খানিকটা পেশাব বেরিয়ে যাবে এতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। পত্রিকার ভাষায়, ’অস্ত্রের মুখে’...। কি ধরনের অস্ত্র এটা উল্লেখ করা হয়নি। আমি নিশ্চিত বড় জোর ক্ষুর হবে। কারণ ইতিপূর্বে ছোটখাটো ছিনতাইয়ে একে ক্ষুর ব্যবহার করতে শুনেছি। অনুমান করি, এখানেও বড় জোর ক্ষুর ছিল।

এই নিয়ে গোটা এলাকা উত্তাল। পুলিশের জোর তৎপরতায় এ ধরা পড়েছে। লোকজন ঘটা করে থানায় গিয়ে কেউ থুতু দিয়ে আসছেন, কেউ কুবাক্য বলে আসছেন। মানববন্ধন হচ্ছে, ফাঁসির জোরালো দাবী উঠছে। সবই উল্লসিত হওয়ার মত ঘটনা!

কিন্তু
যে-অসংখ্য মানুষ, যে-সব বীরবর, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশাটা দেখেছেন এদের বিষয়ে কেউ টুঁ শব্দও করছেন না, কেন? কেউ এ প্রশ্ন উত্থাপন করছেন না, ঘটনার সময় এরা কী করছিলেন, সন্ত্রাসী নামের এই ছেলেটা তার মিশন শেষ করে পালালো কেমন করে! কই, এমন তো হয়নি, জনতা তাকে ধাওয়া করেছে; সে এবং তার সঙ্গিরা বোমা ফাটাতে ফাটাতে পালিয়ে গেছে। বা একা ছেলেটাই ককটেল ছুঁড়তে ছুড়তে পালিয়ে গেল!

নিয়তির উপর আমি বড় রাগ, কেন আমি ওখানে ছিলাম না? আমি নিশ্চিত, থাকলে, এ ওখান থেকে পালাতে পারত না। আমি জানি, অনেকের অট্টহাসিতে মনিটরের পর্দা কেঁপে উঠছে। এরা পাগলের মত হাসতে হাসতে বলছেন, মিয়া, নিরাপদ দূরত্বে থেকে লম্বা লম্বা বাতচিত করা আর কী-বোর্ডে ঝড় তোলা সোজা কিন্তু ব্যাটলফিল্ডে থেকে ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমার লেখালেখির কসম, লাঞ্ছিত করা দূরের কথা, পালাতেই পারত না। পরে আমার কি হতো এখনকার ভাবাভাবি থাকুক ওসময় অন্য কোন ভাবনাই আমার মাথায় খেলা করত না। জাস্ট একে রুখতে হবে, দ্যাটস অল। কি হতো বড় জোর? আমার শরীরে ক্ষুরের একটা পোঁচ, তো? প্রাণ এতো সস্তা না, বললাম আর দুম করে বেরিয়ে গেল। না-হয় এই সস্তা প্রাণটা গেলই কিন্তু আমার পরে অন্য কোথাও আরও দশজন রুখে দাঁড়াত।

ওখানে উপস্থিত বিচিহীন নপুংসক মানুষগুলো প্রকারান্তরে আমার বড়ো ক্ষতি করে দিলেন। যখন এ ঘটনা শুনি, এর পর থেকেই কেবল মনে হচ্ছে, এরা আমাকেও আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নপুংসক বানিয়ে দিয়েছেন; এ অধিকার এদের ছিল না। যেমনটা তীব্র ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই কবিকে নপুংসক বানানো হয়েছিল। কবি আজীবন এই সীমাহীন বেদনা বুকে লালন করেছেন। কাছাকাছি বেদনাটা আমারও হচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে, বড় কষ্ট...।

ছবিঋণ: যুগান্তর

Sunday, October 18, 2009

গুলতি দিয়ে অসম যুদ্ধ!

সালটা ৯২-৯৩। তখন ভোরের কাগজ-এ 'একালের রূপকথা' নামে ফি-হপ্তাহে নিয়মিত লিখছিলাম, বছর দেড়েক ধরে। প্রতিটা লেখার জন্য পেতাম ৫০ টাকা। মাসে হতো ২০০/ ২৫০ টাকা।
টাকাটা আমার নামে ডাকে পাঠিয়ে দিলেই হয়, বেঁচে যেতাম। কিন্তু না, এদের অফিসে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। লে বাবা, যে টাকা পাব তারচে বেশিই আসা-যাওয়াতেই খরচ হয়ে যাবে।
কী আর করা, কয়েক মাসের টাকা জমিয়ে নিতে যেতাম। 'উঠ ছুঁড়ি তোর বিয়া'-'উঠল বাঁই ঢাকা যাই' বলে গাট্টি-বোচকা নিয়ে মাসের যে-কোন দিন রওয়ানা দিলেই হবে না। নিয়মটা ছিল সম্ভবত এরকম, ২১ তারিখের পূর্বে গেলে হবে না, আবার ২৬ তারিখের পর গেলেও 'নাক্কো'-হবে না।

গেলাম তারিখ মিলিয়ে। ওয়াল্লা, গিয়ে শুনি এ মাসে হবে না, ফান্ড নাই! এইরকম কয়েকবার হওয়ার পর আমার মেজাজ খুব খারাপ হলো। যাকেই বলি, সেই বলে, করো লেখালেখি, তোমার এতো লালচ কেন? পত্রিকায় টাকা দেয় এই তো ঢের! তাছাড়া তুমি কি এই টাকা দিয়া চাউল কিনবা!

বটে রে, এটা আমাকে কেন জনে জনে বলতে হবে, এই টাকা দিয়ে আমি চাউল কিনব, নাকি বেশ্যালয়ে যাব। ফাজিলের দল, এটা আমার অধিকার-প্রাপ্য। আমার পাওনা নিয়ে কেন ভিক্ষুকের মত দাঁড়াতে হবে!

আমি এইসব নিয়ে এই পত্রিকার জন্যই কঠিন একটা লেখা লিখে বসলাম। কিন্তু জমা দেয়ার পর এই পাতার সম্পাদক বললেন, করেছেন কী! সম্পাদক ভাইয়া ক্ষেপে লাল! যান, সরি বলে আসেন।
আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম, যে অন্যায় আমি করিনি এটার জন্য কেন সরি বলব? বলব না।
মনে মনে বললাম, হুশ সম্পাদক, হুশ!

প্রায় ১ মাস পর লেখাটা হুবহু ছাপা হলো। আমার চোখ দিয়ে পানি চলে আসল। আমার মত মফস্বলের অখ্যাত একজন কলমচির জন্য বিশাল এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ এক অসাধারণ বিজয়!
পরে আর এখানে জমল না। আমার এই লেখাটা না-ছাপানোর কারণে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ ছিলাম। মানের কারণে না-ছাপানো হলে আমার বলার কিছু ছিল না কিন্তু আমাকে বলা হয়েছিল, এই লেখাটা নাকি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে!

আসলে এইসব বিজয় নামের নির্বোধ আচরণের কোন অর্থ হয় না। এইসব ছাতাফাতা কান্ডের জন্য ক্রমশ আমার লেখালেখির ক্যারিয়ার
হয়ে গেল টিফিন ক্যারিয়ার । টিফিন ক্যারিয়ার-ঝুলিতে কেবল রয়ে গেল ব্রেভহার্টের সেই বিখ্যাত সংলাপ, "কেউ-কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যায়, কেউ বিছানায়"।
... ... ...
ভোরের কাগজে এদের নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলাম:

"সহনশীল প্রাণী
ভূত অপ্রার্থিব গলায় বলল, ‘এই আবর্জনা লেখক, তোকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। ফাঁসি-টাসি না, জাস্ট একটানে মুণ্ডুটা ছিঁড়ে ফেলব।’

একজন লেখক অখ্যাত কুখ্যাত পরের কথা, কিন্তু কী সীমাহীন তার ক্ষমতা! ইচ্ছে হলেই একটা চরিত্র সৃষ্টি করে হাসায় কাঁদায়- বিষণ্নবোধ করলে মেরে ফেলে। কাল্পনিক সৃষ্টির মিছে স্রষ্টার এ সম্বোধন ভালো না লাগারই কথা। লেখক রাগ চেপে বললেন, ‘ভাই ভূত, আপনি সভ্য না অসভ্য দেশের ভূত?’
ভূত দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ‘পেটা গাইল্যা ফালামু (এটার অর্থ হবে সম্ভবত এরকম, অমানুষিক শক্তি প্রয়োগে নাড়ী ভুঁড়ি ভর্তা করে ফেলা হবে)। রাস্কেল, ইউ নো, আমার গায়ে নীল রক্ত বইছে।’

লেখক: আ বেগ য়্যু’ পার্ডন স্যার। নীল রক্ত, আপনি দেখি অতি সভ্য ভূত! তা আপনি স্যার একটু ভুল বললেন, এখন আপনার ধমনীতে নীল রক্ত দূরের কথা, লাল-সবুজ-সাদা-কালো কোনও রক্তই এক ফোঁটা বইছে না।
ভূত (জাঁক করে): ইয়েস-ইয়েস, সভ্য দেশের অতি সভ্য ভূত আমি।
লেখক: সভ্য দেশে মৃত্যুদণ্ড উঠিয়ে দেয়া হয়েছে, আপনি দিচ্ছেন, এটা কি ঠিক হচ্ছে? আর তুই-তোকারি করছেন এটাই বা কেমন কথা!
অতি সভ্য ভূত: তুই-তাই না করলে ভূতদের বাজার পড়ে যায়। কি বললি, মৃত্যুদন্ড? মানুষ নামধারী অমানুষদের বিচার করে মেরে ফেলতে হবে না, আশ্চর্য! পৃথিবীটাকে চমৎকার বানাতে গিয়ে মানুষকে নিষ্ঠুর হতে হয়। এই-ই নিয়ম।

লেখক: সার, আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা। কিছু বর্বর দেশ অবশ্য এ বিষয়ে বহু এগিয়ে আছে। এরা স্টেডিয়ামের মতো বিশাল জায়গায় উন্মুক্ত শিরচ্ছেদের ব্যবস্থা করে। রেডিও,
টেলিভিশনে আগাম ঘোষণা দিয়ে টেলিভিশনে ঘটা করে দেখানো হয়। অবশ্য এরা দয়ার সাগর, ঘোষণা দিয়ে দেয়, শিশু এবং অসুস্থ লোকজনকে যেন এ অনুষ্ঠান দেখতে না দেয়া হয়। দলে দলে লোকজন শিরচ্ছেদ দেখে। অপার আনন্দ লাভ করে।
অ. স. ভূত: ভালোই তো, অপরাধীদের জন্যে উদাহরণ সৃষ্টি হবে।

লেখক: ‘অপরাধীর পায়ের চেয়ে আইনের হাত লম্বা’ এটা অন্যভাবেও বোঝানো যায়। ভারতে অসংখ্য প্রাণ হরণকারী একজন ডাকাতকে ধরার জন্যে এক হাজার সামরিক, আধা-সামরিক কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। একে ধরতে গিয়ে এ পর্যন্ত পঁচিশ কোটি রুপী খরচ হয়েছে। ডাকাতের মাথার দাম ধরা হয়েছে চল্লিশ লাখ রুপী। একে আটকে মেরে ফেললে কি হবে? মৃত্যুর পর সবাই আনন্দ-বেদনার ঊর্ধ্বে? হেনরী শ্যারিয়ারের ‘প্যাপিলন’-এর প্যাপীকে ‘আইলস ডু স্যালুট’-এর নির্জন সেলে যে রকম আটকে রাখা হয়েছিল- ওরকম অন্ধকূপে চরম অপরাধীদের আজীবন আটকে রাখা উচিত। মাঝে মধ্যে এদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফলাও করে জানানো যেতে পারে। প্যাপীলনের মতো এদেরও সময় থেমে যাবে, মনে হবে এ কষ্ট পৃথিবীর কষ্ট না ।
অ. স. ভূত: দরিদ্র দেশগুলোর টাকা কই, ফটাফট মেরে ফেললেই তো সুবিধে?
লেখক: যে মানুষ তার মতো কাউকে সৃষ্টি করতে পারে না সে কোন অধিকারে একটা প্রাণ নষ্ট করবে। এসব থাক, এখন বলেন, আমাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দিলেন।
অ. স. ভূত: তুই না কি আমাদের নিয়ে যা-তা লিখিস, লোকজন হাসি-ঠাট্টা করে। জন নামের একজন ভূতকে নিয়ে লিখেছিস ‘রাম ছাগল ভূত’। এইসব কি, অন্তত ‘জন ছাগল ভূত’ বললেও তো পারতি। এসব ছাই ভস্ম লিখে মাল কামিয়ে লাল হচ্ছিস।

লেখক (বেদনাহত হয়ে): সার-সার, এমন কুৎসিত ভঙ্গিতে বলবেন না। লাল-নীল জানি না এরকম একটা লেখা লিখে পাই ৫০ টাকা।
অ. স. ভূত: ৫০ টাকা দিয়ে কি করিস?
লেখক: এটা তো সম্মানী, এ দিয়ে আবার কি করব, ছবির বাঁধিয়ে রাখি। এটা সম্মানী তো, বিশেষ দিনে গিয়ে নিয়ে আসতে হয়। ‘অসৌজন্য কপি’ কিনে নিজের লেখা নিজেই পড়ি। আসলে লেখকদের লিখতে হাত চুলকায়। মহাপুরুষ ব্যতীত অন্য কেউ চুলকানি উঠলে না-চুলকে পারেন না, লেখক কোন ছার। গিলোটিনে মাথা পেতে এরা লিখে যান। ভরপেট খাবার খেতে, চকচকে পোশাক পরতে এদের কখনোই ইচ্ছা করে না- নিয়ম নেই। তবে হ্যাঁ, পাঠকের ভালোবাসার কথা যদি বলেন, তখন পৃথিবীর সব বেদনা তুচ্ছ মনে হয়।"

এসব লেখালেখি, 'এসব নিয়েই' এবং এসব চালবাজি!


আমরা দূর থেকে লেখালেখির ভুবনটা দেখে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। ভুবনটা এক অদেখা স্বপ্নের ভুবন মনে হয়।

একজন লেখককে মনে হয় অন্য ভুবনের কেউ। এ ধারণার উৎস কী আমি জানি না। ভাবখানা এমন, একজন লেখক অন্য ভুবন থেকে এসে এই ভুবন উদ্ধার করবেন। চাড্ডি পরে উবু হয়ে লিখেই যাবেন। (এমনিতে চাড্ডি জিনিস আরামদায়ক কিনা জানি না তবে এটা পরে জনসমক্ষে বের হওয়াটা শোভন হবে না মনে হয়!)

তো, টাকা-পয়সার তার কাছে বাদামের খোসা, এর ব্যতয় হলেই চিড়বিড় করে বলা হবে, টাকা কেন আপনার প্রয়োজন? চাউল কিনবেন, নাকি বেশ্যালয়ে গমন করবেন?

কেন রে বাপু, তার জাগতিক কোন চাওয়া-পাওয়া থাকতে নেই! কস্মিনকালেও না, কেন?
একজন লেখালেখি করে তার ন্যূনতম চাহিদাও মেটাতে পারবেন না, কেন?
টাকা-পয়সা সংক্রান্ত কোন প্রসঙ্গ এলে চোখ ছোট করে তার দিকে তাকাতে হবে, কেন?
একজন মেথর গু ফেলার কাজ করে, একজন পেটকাটা রমজান পেট কেটে, এটাকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন কিন্তু একজন লেখালেখি করে লেখাকে পেশা হিসাবে নিয়ে বাঁচতে পারবেন না, কেন?
একজন লেখক লেংটি পরে, জ্যোস্নায় গোসল সেরে, জ্যোৎস্না কপকপ করে খেয়ে দিন কাবার করে দেবেন, কেন?

লেখক যেন তিনি-এর মত, তাকে কোন ভাবনা কাবু করার যো নেই!

জীবনানন্দ দাদার কথা ধার করে বলি:

"...কবিকে দেখে এলাম
দেখে এলাম কবিকে
...শীতের সকালে চামসে চাদরখানা ভালো করে জড়িয়ে নেয় গায়
ঘড়ি ঘড়ি মুখে একবার হাত বুলায়
মাজনহীন হলদে দাঁত কেলিয়ে একবার হাসে
মাইনাস এইট লেন্সের ভিতর আধমরা চুনো মাছের মতো দুটি চোখ:
বেঁচে আছে! না মরে?
কোনদিন যৌবনের স্বাদ পেয়েছিল? পায়নি?
...পৃথিবী থেকে আনন্দ সংগ্রহ করছে
সবাইকে ভরসার কথা শোনাচ্ছে
ভালোবাসার জয়গান করছে।"

বলছিলাম লেখালেখি ভুবনের অন্ধকার দিকের কথা।
'আলুয়া-ঝালুয়া' টাইপের একটা লেখা নিয়ে ’এসব নিয়েই’ নামে একটা উপন্যাস বের হয়েছিল ৯২ একুশে বইমেলায়। দাম্পত্য কলহ নিয়ে সরল একটা লেখা। এখনও গুছিয়ে লিখতে পারি এটা দাবী করি না আর তখন তো লিখতেই জানতাম না। দাম্পত্য কলহ দূরের কথা দাম্পত্য কী এটাই কী জানি ছাই!
কি কারণে জানি না এই বইটার কিছু রিভিউ বের হয়েছিল। কোথায়-কোথায় সবটা তো জানি না, 'রহস্য পত্রিকা' এবং 'উপমা ডাইজেস্ট' হাতের নাগালে পেয়েছিলাম।

রহস্য পত্রিকার সমালোচনায় জানলাম, এটা মুলত প্রেমের উপন্যাস। আমি আনন্দিত, বাহ, আমি দেখি প্রেমের উপন্যাস লিখতে পারি; প্রেম না-করেও (এটা আমার দাবী কিন্তু নিজেরই ঘোর সন্দেহ আছে)। যাগ গে, দাম্পত্য কলহ নিয়ে লেখাকে প্রেমের উপন্যাস বলে, বাহ,
বেশ তো!
ওই সমালোচনা পড়ে অন্তত এটা ধারণা করা চলে ভদ্রলোক শেষ-অবধি বইটা পড়ার জন্য যথেষ্ট ক্লেশ স্বীকার করেছেন। কেউ আমার বই শেষ করতে পেরেছেন এটা আমার জন্য অভিভূত হওয়ার মত একটা বিষয়!

কিন্তু 'উপমা ডাইজেস্ট'-এর সমালোচনা পড়ে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আমি নিজের প্রতি সন্দেহের চোখে তাকালাম। আমিই কী সেই ব্যক্তি যে 'এসব নিয়েই' নামের আবর্জনা সৃষ্টি করেছে?
সমালোচক ভদ্রলোক লিখেছেন: "এটি একটি উপন্যাস। বইটি লিখেছেন আলী মাহমেদ। আমরা প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছি বিভিন্ন সমস্যার দ্বারা। এ সমস্যা আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত বিদ্যমান আর এতসব সমস্যার মোকাবেলা করেই বেঁচে থাকে মানুষ। স্বপ্ন দেখে জীবনের। কখনও কোন সমস্যা আমাদের যন্ত্রণা দেয় ভীষণভাবে। আবার সেই সমস্যার সমাধান করতে পারলে আনন্দিত হই। আর এই সুখ-দু:খ, হাসি-বেদনা নিয়েই আমাদের প্রতিদিনের জীবন। এরই প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করেছেন লেখক তার এসব নিয়েই উপন্যাসে।”

লেখকের এবং বইয়ের নাম ব্যতীত এই সমালোচনার একটা অক্ষরও ৯২ সালে বুঝিনি, ২০০৯-এ এসেও! ইনশাল্লাহ, ২০৫০- এ এসেও বুঝব না।
হা হা হা। প্রকারান্তরে নিজের অতি লম্বা আয়ু চেয়ে নিলাম আর কী। হুদাহুদি, লম্বা সময় দূরের কথা জীবনটাই আমার কাছে ক্লান্তিকর! ব্লাস্টার দিয়ে পাখি শিকার করতে আমার ভাল লাগছে না। কেবল ঝুম বৃষ্টিতে আমি মরতে চাই না!


যাই হোক, আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, এই সমালোচক মহোদয় এই বইয়ের একটা লাইনও পড়েননি। অথচ এ আস্ত একটা বইয়ের সমালোচনা লিখে বসে আছে এবং যথারীতি তা ছাপাও হয়েছে। এইসব চালবাজি করে তিনি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পার করেছেন, অজস্র বইয়ের সমালোচনা লিখেছেন।
আফসোস, এরাই একজন লেখকের লেখার মান নির্ধারণ করে দেন। এরাই নিশ্চিত করেন কে লেখক, কে লেখক নন! বড় বিচিত্র দেশ
আমাদের, ততোধিক বিচিত্র এ দেশের মানুষ, তারচেয়েও বিচিত্র লেখালেখি ভুবনের মানুষ!

Saturday, October 17, 2009

"ক্রমিক খুনি (!)", রসু খাঁ

রসু খাঁ। এখন সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি! মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এমনটা হবে না কেন? সে যে সিরিয়াল কিলার! তার বদান্যতায় প্রথম আলো 'সিরিয়াল কিলার'-এর বাংলা করেছে "ক্রমিক খুনি"। এটা ভাল একটা উদ্যোগ, সব আমরা বাংলায় অনুবাদ করে ফেলব। ভাগ্যিস, পত্রিকাটি সফটওয়্যারের বাংলা করার চেষ্টা করেনি!

'বৈদেশি' সিরিয়াল কিলারদের কাহিনি পড়ে আমরা হিম-হিম শ্বাস ছাড়তাম, আহারে, সব বৈদেশে কেন? গরীব দেশ বলে কী আমাদের কপালে সিরিয়াল কিলার থাকতে নেই! রসুর কল্যাণে আমাদের সেই কষ্ট দূর হলো!

রসু
এখন পর্যন্ত ১১ জন নারীকে হত্যা করেছে। খুনের প্রতিজ্ঞা পূরণে ১২ বছর ধরে অপেক্ষা করেছে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সে নাকি প্রতিজ্ঞা করেছিল, ১০১ জন নারীকে হত্যা করে কোন এক পীর সাহেব-আউলিয়ার মাজারে চলে যাবে। তার মাজারে চলে যাওয়ার ভাবনাটা মন্দ না! কে জানে, একদিন সেও কোন এক আউলিয়া হয়ে যেত- রসু আউলিয়া! (সত্যি সত্যি একজন অসংখ্য মানুষকে কচুকাটা করতে করতে অবশেষে বড়ো আউলিয়া হয়ে গিয়েছিলেন।)

এই বঙ্গালদেশে মাজারের দবদবার শেষ নাই। অথচ ইসলাম ধর্মমতে, অতি বিখ্যাত গরম মানুষের মাজার ওরফে কবর এবং ছলিমুল্লা-কলিমুল্লার কবরের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। চলার পথে কোন কবর জিয়ারত করা যাবে কিন্তু জিয়ারতের উদ্দেশ্যে কোন
মাজার ওরফে কবরে যাওয়া যাবে না এবং মাজার ওরফে কবরে শুয়ে থাকা মানুষটার কাছে কোন কিছু চাওয়া ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ! মাজার ওরফে কবরবাসী মানুষটার নিজেরই নাকি দৌড়ের শেষ নাই!

ওয়াল্লা, রসু নামের মানুষটার দেখি ক্রসফায়ারের বড়ো ভয়- ক্রসফায়ারের রহস্য কী উদঘাটন করে ফেলেছে? রসু বড় অভাগা, নইলে কী আর ধরা পড়ে! আমাদের দেশে কাউকে ধরা কী এতই সহজ? কই, এই মানুষটাকে দেখি আজও ধরা গেল না!


"মরিলে শুনিয়া গীতা মহাপাপী জন
মহাপাপ দূরে যায় মুক্তিভাগী হন।"
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, শ্রীশ্রীগীতা-মাহাত্ম্যম, ৫৯)
(মৃত্যুর পূর্বে মহাপাপীও যদি গীতা শ্রবণ করে তবে তাহার মহাপাপ নষ্ট হয়, সে মুক্তিভাগী হয়।)
রসু, হিন্দু হলে, গীতা-পাঠ করে তার মহাপাপ কেটে যেত।

রায়ের পর রসুর মৃত্যুদন্ড হবে নাকি বেকসুর খালাস, সে তো পরের কথা। কিন্তু কোন উকিল রসুর পক্ষে দাঁড়াবেন না বলে ঘোষনা দিয়েছেন। এটা এঁরা কোন যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নিলেন? কোন আইনের কেতাবে এটা লেখা আছে,
এঁরাই ভাল বলতে পারবেন! রসুকে এখনও আদালত গিল্টি বলে রায় দেয়নি।

ভাগ্যিস, রসু খ্রিস্টান না, খ্রিষ্টান হলে পাল্টা মামলা করতে পারতেন।
পাভেল মির্চা। রুমানিয়ার এক আদালত, একজনের খুনের দায়ে পাভেল মির্চার ২০ বছরের সাজা হয়েছিল। কিন্তু ভদ্রলোক বেঁকে বসলেন, পাল্টা মামলা করলেন।
তিনি একা এই সাজা ভোগ করতে রাজি নন। তার এককথা, এই খুনের জন্য আমি একা দায়ি নই, সমান দায়ি ঈশ্বরও।
পাভেল মির্চার বক্তব্য, ব্যাপ্টিজমের সময় ঈশ্বরের সঙ্গে অন্য খ্রিষ্টানদের মতই আমারও চুক্তি হয়েছিল, তিনি আমাকে সমস্ত অশুভ কাজ থেকে বিরত রাখবেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। শয়তান জয়ী হয়েছে। ঈশ্বর আমার সঙ্গে চুক্তিভঙ্গ করেছেন বিধায় ঈশ্বরের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের মামলা করেছি।

ভয়াবহ সমস্যা দেখা দিল। বাদী মামলা করলে বিবাদীকে জানাতে হয়, সমন জারী করতে হয়। উকিলরা বিবাদী ঈশ্বরের নামে নোটিশ জারী করতে পারছিলেন না। তাদের বক্তব্য, অনেক চেষ্টা করেও আমরা ইশ্বরের আবাসিক ঠিকানা খুঁজে পেলাম না বিধায় সমন জারী করা গেল না।
আফসোস, ঠিকানা না-থাকার কারণে সমন জারী করা না গেলে, তাঁর-ইশ্বরের বিচার করা যাবে কেমন করে?
অতএব মামলা ডিসমিস।

*ছবিঋণ: প্রথম আলো

Thursday, October 15, 2009

চুতিয়া কাহাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি













 

আগেও লিখেছিলাম ’সোয়াইক গেল যুদ্ধে’ নাটকে নাৎসি অফিসার জিজ্ঞেস করছে, "হাগিস কেমন, শক্ত না পাতলা"?
উত্তর ছিল, "সার, আপনি যেমনটা চাইবেন, শক্ত চাইলে শক্ত, পাতলা চাইলে পাতলা"।
সোজা কথা, নাৎসি অফিসারের ইচ্ছাই শেষ কথা।

বৈদেশী লালমুখো সাহেবরা ঠিক এই সংলাপ বলেন না তবে তারা যেমনটা চান আমরা তেমনটা করে দেখিয়ে দেই। ভাল টাকা পেলে প্রয়োজনে পটিতে উবু হয়ে বসে 'পাইখানা' (সূক্ষরূচির পাঠক ইচ্ছা করলে, এই শব্দটা বাদ দিয়ে পড়লে দোষ হবে না) করার ভঙ্গি করতেও আপত্তি নাই। দেশ বেচতে হবে, নাকি মাকে তাতে কী আসে যায়!

ক্ষুধা দূর করতে কেএফসি ও পিৎজা হাট লাফিয়ে পড়েছে। রোজার সময় আবার এক ঢং হয়েছিল, আপনার ইফতার সারুন পিৎসা দিয়ে। এদের ক্ষুধার সমস্যা নিয়ে ভাবতে ভাবতে, প্রায় ১০০ টাকা দিয়ে একটা মুরগীর পিস খাওয়াতে খাওয়াতে ’আকু’ (বাচ্চারা পাইখানাকে আকু বলে) শক্ত হয়ে যাচ্ছে। ইসবগুলের ভূষি বড়ো প্রয়োজন। মহোদয়গণ-সার, ক্ষুধা বোঝার জন্য পশ্চাদদেশ উত্তোলনপূর্ব্বক ছবিটার পানে একবার দৃষ্টি দিয়ে কৃতার্থ করুন।

আক্কু সার বলেছেন, "ক্ষুধার মত সমস্যা নিয়ে সবার ভাবা উচিত"।
বটে!

ডব্লিউএফপির প্রতিনিধি জন আইলিয়েফ সার বলেছেন, "এই দেশের প্রায় ৭৫ লাখ লোক প্রতি রাতে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যায়। 'ওয়ার্ল্ড হাঙ্গার রিলিফ কর্মসূচি'র মাধ্যমে কাজ করলে বিশ্ব থেকে ক্ষুধা দূর হয়ে যাবে"।
বটে রে!

ইংল্যান্ডের রানীকে নাকি একবার বলা হয়েছিল দেশের লোকজন খাবারের কষ্টে আছে, রুটিও মেলে না।
তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, সমস্যা কী, রুটির বদলে কেক খেলেই হয়।
রানী এমনটা বলেছিলেন, কেন যেন আমার বিশ্বাস হতো না। আফসোস, রানীর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় নাই বিধায় যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু রানীর পোষ্যদের কর্মকান্ড দেখে মনে হচ্ছে, নাহ, রানী এমনটা বলতেই পারেন।

যথারীতি আমাদের দেশের সেলিব্রেটিগণ উপস্থিত ছিলেন। মহান মিডিয়া বাদ যাবে কেন! থাকতেই হবে। ওই যে বললাম, ভাল পেমেন্ট পেলে

কোন এক স্যানেটারি ন্যাপকিন কোম্পানি প্যাকেটের গায়ে ছাপিয়ে দিত, এইখান হইতে ১ টাকা অমুক দাতব্য প্রতিষ্ঠানে জমা হইবেক। বিভিন্ন আবরণে এইসব ফাজলামি চলেই আসছে।

টাইমস অভ ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, কর্নাটকের মন্ত্রিসভার ২ ঘন্টার এক বৈঠকে খরচ হয়েছে প্রায় ১ কোটি রুপি! বিষয় কী? পিছিয়ে পড়া মানুষদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে নাকি এই বৈঠক!
এমন কল্যাণে পিছিয়ে পড়া মানুষ এগুবে কিনা জানি না তবে এইসব দরদীদের সঙ্গে হাত মেলালে তার ছবিটা আসবে অনেকটা পোস্টের সঙ্গে করা দ্বিতীয় ছবিটার মত। এইসব চুতিয়াগিরির শেষ নাই...।
 


*প্রথম ছবিটা অনাহারে ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসা শিশুটির মৃত্যুর জন্য শকুনের অপেক্ষা। ছবিটা কেভিন কার্টারের তোলা। এই ছবির জন্য তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পান। ভয়াবহ এই স্মৃতি তাঁকে অবিরাম তাড়া করত। তিনি পরবর্তীতে সহ্য করতে না-পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন।
**দ্বিতীয় ছবিটির বিষয়ে বিশদ জানা নাই বলে দু:খ প্রকাশ।

প্রকাশক: দ্বিতীয় ঈশ্বর!

এই দেশে কিছু বাজার আছে- ঠাঠারী বাজার, বঙ্গবাজার, টান বাজার।
...বাজার নামে খুব চালু একটা বাজার আছে। এই বাজার চালান শত শত প্রকাশক- বই বিক্রেতা। এখান থেকে ফি-বছর হাজারও বই বের হয়। এখানে আছেন লেখক প্রকাশক, শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত প্রকাশক এবং যথানিয়মে আকাট মূর্খ প্রকাশক। কে লেখক কে লেখক নন- দুধের দুধ পানির পানি! কী অসম্ভব উপায়েই না এঁরা এ দুষ্কর কার্য সমাধা করেন।

প্রকাশক হতে কী যোগ্যতার প্রয়োজন, কোথেকে প্রকাশক সনদপত্র বিলি হয় কে জানে! পাশাপাশি এ-ও সত্য লেখক হতেও কোনো সনদপত্রের প্রয়োজন হয় না- যার একটা তিন টাকা দামের কলম আছে তিনিই লেখক।
মোদ্দা কথা, লেখক তীর্থের কাকের ন্যায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকেন কখন কোন প্রকাশক তার মনন নির্ধারন করবেন। প্রকাশক কোন এক মানব সন্তানের মনন-প্রতিভা চিহ্নিত করা মাত্র নিতল-তলাতল থেকে বেরিয়ে আসে একজন লেখকমানব! এ স্বল্প পরিসরে অল্প ক’জন মননশীল (?) প্রকাশকের কথাই বলি:

প্রকাশক এক: ’৯২ বই মেলায় ইনি আমার একটা উপন্যাস বের করেছিলেন। অভাজনের প্রতি এই ক্লেশের জন্য গুনে গুনে নগদ টংকা দেয়ার কথা। আমি টাকা পাবো কোথায়? এদেশে অখ্যাত লেখকদের টাকা হয় শত পয়সায়! তো, লেখালেখি একপাশে সরিয়ে বন্ধু-বান্ধবের দারস্ত হওয়া। কাগজের ব্যবসায়ী এক বন্ধুকে অতি সহজেই ফাঁদে ফেললাম-
ইনি আমার মতোই লম্বা, লম্বা লোকদের ব্রেন নাকি থাকে দুটা- দুই হাঁটুতে।। ওসময় বাজারে কাগজের খুব ক্রাইসিস। আমার বই ছাপার শর্তে তিনি প্রকাশককে শস্তায় কাগজ পাইয়ে দিয়েছিলেন।
নানা যন্ত্রণা করে বই বেরুল। অজস্র ভুল, পাতায় পাতায়। বইমেলা শেষ হলো।
আমি ভয়ে ভয়ে প্রকাশক মহোদয়ের কাছে জানতে চাইলাম: কেমন বিক্রি হলো?
তিনি তাচ্ছিল্য করে বললেন, চারশো!
প্রকাশকের অবজ্ঞা আমাকে স্পর্শ করল না। উথাল পাতাল আনন্দ নিয়ে ইচ্ছা হচ্ছিল আমার সমস্ত পাঠকের গা ছুঁয়ে বলি, অতি তুচ্ছ আমি কী করে এ মমতার ঋণ শোধ করি! শিশু যেভাবে প্রবলবেগে লাটিম ঘুরায়, টাকা না দিয়ে প্রকাশকও আমাকে সেই ভাবে ঘুরাতে শুরু করলেন।
দেখতে দেখতে ’ ৯৩ বই মেলা চলে এল, যথাসময়ে শেষও হলো। প্রকাশককে আবারও জিজ্ঞেস করি, সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ক’টা গেল।
প্রকাশকের নির্বিকার উত্তর: তিনশো।
আমি ভারি অবাক: গতো বছর বললেন চারশো এবার বলছেন তিনশো!
প্রকাশক মহোদয় অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন, তাই, বলেছিলাম নাকি, মনে নাই। আমার আবার কিছু মনে থাকে না, বুঝলেন।
৯৪ বইমেলা শেষে অবিকল তার উত্তর: তিনশো।

পূর্বে জানতাম একজন প্রকাশক তার প্রকাশিত বই ফেলে রাখেন না। বিক্রি না হলে অন্য প্রকাশকের বইয়ের সঙ্গে বিনিময় করেন। এখন দেখছি এ ধারণা ঠিক না! বরঞ্চ যেসব পাঠক বই কেনেন প্রথম বছর, দ্বিতীয় বছর এরা স্কুটার ভাড়া করে খুঁজে খুঁজে প্রকাশককে বই ফেরত দিয়ে আসেন। দিনে-দিনে প্রকাশকের অবিক্রিত বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়!

প্রকাশক দুই: ইনি একজন লেখক কাম প্রকাশক। বছর দুয়েক হল ছদ্ম নামে লেখালেখি শুরু করেছেন। এবং এ অল্প সময়ে প্রায় গোটা তিরিশেক বই বাজারে নামিয়ে ফেলেছেন। বেশ ক’টা বইয়ের ভালো কাটতি। কথা হচ্ছিল, ওঁর সম্বন্ধে সম্যক ধারণা আছে এমন একজনের সঙ্গে। লেখক আহমাদউল্লাহ-র কাছে ভালো মনে জানতে চাইলাম, প্রকাশনার হাজারো ঝুট ঝামেলায় এই লেখক সময় বের করেন কি করে- দশ হাতে লেখালেখি করেন নাকি!
আহমাদউল্লাহ হাসি-হাসি মুখে বললেন, এতো সব বই প্রসবের রহস্য ধরতে পারছেন না? আপনার উপন্যাস বিক্রি করবেন!
আমি তো-তো করে বললাম, বিক্রি করব মানে!
তিনি বললেন, স্বত্ব ত্যাগ করবেন। লেখকের নামের স্থলে রাম-রহিম যাই ছাপা হোক আপনার আপত্তি গ্রাহ্য হইবে না।
আমি কঠিন গলায় বললাম, হইবে না, হুম! জ্বী না, এটা স্বপ্নেও ভাবি না। আর্বজনা হোক, আমার সমস্ত লেখালেখির প্রতি রয়েছে সন্তানসম মমতা।
আহমাদউল্লাহ বললেন, হাহ, এই দেশে একজন মা দশ টাকার বিনিময়ে তার সন্তানকে বিক্রি করে দেন!
আমি
বিরক্ত, দেক, আমার কী! কু তর্ক করতে চাই না। আপনি কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দিলেন না?
তিনি হাঁই তুলে বললেন, তাহলে বললাম কি, এটাই তো কাহিনি! দুস্থ লেখকদের পান্ডুলিপি কিনে আপনিও ওই 'লেখক প্রকাশক'-এর মতো বছরে পঞ্চাশটা বই বের করতে পারবেন।

প্রকাশক তিন: এবারের বই মেলায় বেশ কিছু প্রকাশক কলকাতার জনপ্রিয় লেখকদের বই অবৈধভাবে প্রকাশ করেছেন। পূর্ব পরিচিত একজন প্রকাশককে দেখলাম একগাদা দেশ পত্রিকা নাড়াচাড়া করছেন। কাউকে অধ্যয়নরত দেখে মন ভালো হয়ে উঠে। এ ভালো লাগা ক্ষণিকের।
ওই প্রকাশক বললেন: এই লেখকের বই বের করছি। দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে ছাপা হয়েছে।
আমি বললাম, চমৎকার, অনুমতি পেয়ে গেছেন তাহলে!
তিনি বললেন: অনুমতি-টতি আবার কি, ছেপে বাজারে ছেড়ে দেবো হু হু করে বিক্রি হবে। ঘটা করে বিজ্ঞাপন দেবো, অমুক দুর্দান্ত লেখকের তমুক আনকোরা উপন্যাস, এর পূর্বে বই আকারে বের হয় নি। একমাত্র আমরাই এ দুর্লভ সম্মানের অধিকারী।
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, বলেন কী, আপনাকে ধরবে না।
তিনি হাসলেন, পাগল, আসল ঠিকানা দিলে তো! ঢাকা কাকের শহর, ওই ঠিকানায় কেউ গেলে কাক ব্যতীত কাউকে পাবে না। পাবে কিছু পক্ষীর বিষ্ঠা-কাকের গু! হা হা হা।

প্রকাশক চার: অধিকাংশ প্রকাশকদের মামুলী কথার পর যে কথাটা চলে আসে অনিবার্যভাবে, ফেলো কড়ি মাখো তেল- টাকা দাও, বই ছাপাও।
নেড়া বেলতলায় একবারের বেশী যায় কিনা জানা নাই- মাথা ভর্তি চুল নিয়েও আবারও যাওয়ার কোনও গোপন ইচ্ছা আমার ছিল না। এক প্রকাশক থেকে টাকা আদায় করতেই সাপের পাঁচ পা দর্শন হয়েছে। ভাবলাম নতুন উপন্যাস ছাপাতে কেউ চাচ্ছে না। তো এই প্রকাশককে বললাম: গতোবছর বাংলা একাডেমীর 'উত্তরাধিকার'-এ আমার একটা উপন্যাস ছাপা হয়েছিল; আপনি কি এটার বই বের করতে পারেন?
প্রকাশক বললেন: বাংলা একাডেমী, কোন বাংলা একাডেমী!
কোন জটিলতায় আমার ব্রেনে শর্ট-সার্কিট হয়ে যায়, কথা জড়িয়ে যায়, লজিক গুলিয়ে ফেলি কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দেই। আমি অসহ্য রাগ চেপে ঠান্ডা গলায় বলেছিলাম: ভাই, আমি মফস্বলে থাকি তো, ঢাকা খুব কম আসা হয়; মনে কিছু নিয়েন না, এরিমধ্যে দু-চারটা বাংলা একাডেমী খুলে থাকলে আমার ঠিক জানা নাই।
ওইদিনই লেখালেখির ভুতটার পেটা গেলে ফেলা আবশ্যক ছিল, নিদেনপক্ষে কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেললে অসমীচীন হতো না। হায়, এ এক অসুখ, রোগ! পারা যায় না, বারংবার পাঠকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে সুতীব্র ইচ্ছা জাগে। জীবনটা অনর্থক জটিল হয়- নিজের প্রিয়মানুষদের প্রতি অন্যায় করা হয়!

প্রকাশক পাঁচ: লেখক আহমাদউল্লাহ পরামর্শ দিলেন মঈনুল আহসান সাবেরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। ইনি সুলেখক এবং প্রকাশক।
গতবছর ওঁর দিব্য প্রকাশনী প্রচুর বই প্রকাশ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ইনি যেহেতু নিজে লেখক সহযোগীতা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, নিরানব্বই দশমিক নয় নয়।
তিতিবিরক্ত আমি ভাবলাম চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি! 'বিচিত্রা'য় খোঁজ তাঁকে করে পাওয়া গেল না। জানা গেল, সন্ধ্যার পর ইনি 'কাশফী'-তে বসেন। রাতের ট্রেনেই বাড়ী ফিরতে হবে, নানা যন্ত্রণা করে গেলাম ওখানে।
এখনও আসেননি। অগত্যা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করছি। আশপাশের দোকানদার সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আজকাল এই হয়েছে এক যন্ত্রণা। লোকজনের ধারণা, যুবক (৯৩-৯৫ সালে সম্ভবত যুবকই ছিলাম, সম্ভবত) মানেই কোনো একটা সমস্যা আছে- যার শুরু ‘স’ দিয়ে। সমস্ত যুবকের পকেটে থাকে গাদা গাদা ককটেল, বিষণ্ন বোধ করলেই এরা চিবানো চুইংগামের মতো ককটেল ছুঁড়ে মারে। একই রাস্তায় ঘন্টা দুয়েক হাঁটাহাঁটি করার চেয়ে সিড়ি বেয়ে হাইরাইজ বিল্ডিং-এ উঠানামা করা অতি সহজ কাজ।
অবশেষে তিনি এলেন।
শুভেচ্ছার প্রতুত্তর না দিয়ে (অখ্যাত লেখক ওরফে লেখকপশুমানবদের এতোসব নিয়ে মাথা ঘামালে চলে না), উদ্দেশ্য বলা পর্যন্ত ইনি টুঁশব্দ করলেন না। ঝিম মেরে রইলেন।
অবশেষে মঈনুল আহসান সাবের মুখ খুললেন: 'আমরা অথরের ফিন্যান্স ছাড়া বই ছাপি না'!

আমি ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম, তাহলে বাউয়া, তোমার কাছে কেন? জরিনা-মর্জিনা প্রকাশনী কী দোষ করল?

*'একালের প্রলাপ' থেকে
**ছবিঋণ: বই-মেলা ডট কম

Tuesday, October 13, 2009

কাজীদা: একজন লেখক বানাবার মেশিন!


চিঠিটা ছাপিয়ে ঠিক করলাম কিনা কে জানে? যেহেতু চিঠিটা কাজীদা প্রতিষ্ঠানের প্যাডে লিখেছেন; এটাকে অন্তত ব্যক্তিগত চিঠি বলা চলে না, এটাই ভরসা। আমার কেবল মনে হচ্ছে, কাজীদা নামের এই লেখক বানাবার মেশিনটার সমস্ত খুঁটিনাটি এই প্রজন্মের না-জানাটা অন্যায়। এই মানুষটার অসাধারণ গুণ হচ্ছে, তিনি প্রত্যেকটা পান্ডুলিপি খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়েন, প্রতিটা অক্ষর! এবং বানানের ব্যপারে অতি সাবধানী একজন মানুষ। একসময় আমি কাউকে বলতাম, অভিধান না-দেখে প্রজাপতি-সেবার কোন বই দেখে মিলিয়ে নিন।

বাংলা একাডেমীর কথা শুনলে আমরা বিনম্র শ্রদ্ধায় হাঁ করে থাকি,
গা কাঁপে। আহা, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক যখন বলেন, শেখ হাসিনা একজন বিশিষ্ট লেখক হিসাবে বই-মেলা উদ্বোধন করছেন; তখনও গা কাঁপে, অন্য কারণে। তখন আমরা গা দুলিয়ে হাসি, নইলে হাসিটা ঠিক জমে না।
বাংলা একাডেমী থেকে ৯৩ সালে আমার যে উপন্যাস ছাপা হয়েছিল ওটায় যে-কেউ খুঁজলে শতেক বানানের ভুল বের করতে পারবেন, আমি নিশ্চিত। হা ঈশ্বর, বাংলা একাডেমীর কি প্রুফ-রীডার বলতে কারও অস্তিত্ব নাই?
ভদ্রলোকের নাম বলে লজ্জা দিতে চাচ্ছি না। লেখালেখি ভুবনের একজন তুখোড় মানুষ, বাংলা একাডেমীর পরিচালককে 'কনক পুরুষ' উপন্যাসের সৌজন্য কপি দিলে; তিনি এটার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন যেন এটা একটা শুয়োঁপোকা! নিতে না পারলে বেঁচে যান এমন। এই বেট, আমি চলে আসার পর এটা তিনি ট্রাশ-ক্যানে ফেলে দিয়েছিলেন।

এ বড়ো বিচিত্র, আমাদের দেশের যারা সাহিত্য কপকপ করে চিবিয়ে খান, অন্য প্রকাশী হলে সমস্যা নাই কিন্তু এঁদের প্রজাপতি-সেবা প্রকাশনীর প্রতি আছে সীমাহীন তাচ্ছিল্য। অথচ এ দেশের অধিকাংশ প্রকাশনীর প্রকাশক মহোদয়গণ কাজী আনোয়ার হোসেনের নখের যোগ্য বলে আমি মনে করি না। কসম, একজন প্রকাশক আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কোন বাংলা একাডেমী? ভাবতে আমার গা গুলায়, এরাই নির্ধারণ করে দেন কে লেখক, কে লেখক নন!

ফাঁকতালে কাজীদাকে দেখে, আমাদের পাছাভারী প্রকাশক-সম্পাদক মহোদয়গণ যদি খানিকটা শেখার চেষ্টা করার তকলীফ-ক্লেশ স্বীকার করতেন, তাহলে বেশ হতো! আফসোস, এদের শেখা শেষ, মাদ্রাসা-পাশ হুজুরদের যেমন শেখার কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, তেমনি।

কনক পুরুষ উপন্যাসটা লিখেছিলাম খুব তাড়াহুড়া করে, ঝড়ের গতিতে। লেখা হয়েছিল সম্ভবত একরাতে। শেখ আবদুল হাকিমের উপর বিরক্ত হয়ে, ডাকে এটা কাজীদাকে পাঠালে তিনি এই চিঠিটা লিখে দেখা করতে বলেছিলেন। চিঠি পড়ে আমার কান-টান লাল! ইশরে, এটা পাঠাবার আগে পান্ডুলিপিটা খানিকটা যত্ম নিয়ে দেখে দিলাম না কেন? অবশ্য চেষ্টা করলেও বানান ভুল নিয়ে খুব বেশি কিছু করতে পারতাম না। আমার মধ্যে বড় ধরনের সমস্যা আছে! বানান এখনও আমাকে বড় ভোগায়- যে শব্দ অজস্রবার লিখেছি এটা নিয়ে এখনও কস্তাকস্তি করতে হয়। হ্রস্ব-ই কার নাকি দীর্ঘ-ই কার? দরজা, জরদা গুলিয়ে ফেলি, টপটেন নাকি টেনটপ ইত্যাদি।


কাজীদার কথা লিখেছিলাম, আমার দেখা একজন চমৎকার মানুষ- লেখক বানাবার কারিগর! তিনি আমার বই ছাপিয়েছেন বলেই তাঁর প্রতি মুগ্ধতা চুঁইয়ে পড়ে এমনটা না। তাঁর কিছু বিষয় আমার মোটেও পছন্দ না, এই প্রকাশনীর প্রচ্ছদগুলো বড়ো খেলো, যা-তা!
আরেকটা বিষয়,
তিনি লেখক হিসাবে টিংকু ওরফে কাজী শাহনুরকে সবাইকে ছাপিয়ে বড়ো বেশি সামনে নিয়ে এসেছিলেন। এই সিদ্ধান্তটা আমার কাছে বড়ো ধরনের ভুল মনে হয়, তিনি পরিবারতন্ত্রের খোলস থেকে বের হতে পারেননি- অনেক দুঁদে লেখক ছিটকে পড়লেন। এঁদের মধ্যে আমার নিজের কথা বলার স্পর্ধা দেখাচ্ছি না। আমার সঙ্গে সমস্যাটা ভিন্ন! ক্রমশ তার প্রকাশনীর দবদবা কমে এলো। যাগগে, কে কিভাবে তাঁর প্রতিষ্ঠান চালাবেন এটা তাঁর এখতিয়ার কিন্তু কষ্ট হয়!

যাগ গে, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম।
বই নিয়ে কিছু কথাবার্তা হলো। কাজীদার আগ্রহ নিউজপ্রিন্টে ছাপানো। ছাপার হিসাবটা সম্ভবত এমন; প্রজাপতি-হোয়াইট প্রিন্টে ছাপা হয় ১২০০, সেবা-নিউজপ্রিন্টে ৩৩০০। সেবা-নিউজপ্রিন্টের পাঠক বেশি, রয়্যালটির টাকাও বেশি তবুও নিউজপ্রিন্টে ছাপার বিষয়ে আমি রাজি হলাম না।
তিনি চাচ্ছিলেন লেখাটায় কিছু পরিবর্তন আনতে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে,
লেখাটায় পরিবর্তন, যোগ-বিয়োগ করার কিছু নাই এটাও বললাম। আমি কাজীদার কাছে ভারী কৃতজ্ঞ তিনি আমার মত অতি অখ্যাত একজন কলমবাজের আবদার মেনে নিয়েছিলেন। আজীবন তাঁর এই সহৃদয়তার কথা ভুলব না।
তিনি মূল লেখাটার (কনক পুরুষ) কোন পরিবর্তন করেননি। কেবল অসংখ্য ভুলভাল বানান, বাক্যরীতি সংশোধন করে দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য 'রূপবান মার্কা' প্রচ্ছদটা দেখে মন অনেকখানি বিষণ্ন হয়েছিল কিন্তু এটার ব্যাপারে আমার কোন হাত ছিল না!

'ইভার মা'-র যে অংশটুকু, 'তন্ময়'-এর অতি সংক্ষিপ্ত পরিণতি নিয়ে কাজীদার আপত্তি ছিল: কনক পুরুষের কিছু জায়গায় জামাল সাহেব নামের মানুষটার তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে মোটা দাগের কিছু রসিকতা ছিল।
এই বিষয়টা আমরা অনেক শিক্ষিত মানুষরা অহরহ করি। অবলীলায় কারও শরীরের ক্রটি নিয়ে রসিকতা, এ অন্যায়, কুৎসিত অন্যায়। এ অন্যায়ে আমি কেন যোগ দিলাম, উপন্যাসে কেন তুলে আনলাম? আমি যে কথাটা প্রায়শ বলি, একেকজন পাঠককে আমি মনে করি একেকটা চলমান ক্ষুর- তাঁদের বিবেচনা বোধের উপর আমার শ্রদ্ধা অপরিসীম। হাস যেমন ঘোলা পানি থেকে পরিষ্কার পানিটুকু বের করে নেয় তেমনি তাঁরা তাঁদের সুবুদ্ধি দিয়ে সুভালাভালি-নিরাপদ ভাবনাটা খুঁজে নেন।
আজ আমি যদি আবারও এই লেখাটাই (কনক পুরুষ) লিখতাম, কিচ্ছু পরিবর্তন করতাম না। কেবল এই লাইনটুকু যোগ করতাম: 'ইভার মা-র চোখ জলে ভরে আসে, ইভার বাবা তার পৃথুল দেহ নিয়ে এমন করেন কেন? এতে তার নিজের কী হাত!' ব্যস এইটুকুই।

আর ইভার মাকে নিয়ে খুব বেশি কিছু লেখার আমার আগ্রহ ছিল না কারণ এই ধরনের রোবট টাইপের মানুষদের জীবনে গল্প করার মত গল্প খুব একটা থাকে না। এরা নির্দিষ্ট একটা বৃত্তে অনবরত ঘুরপাক খান- এর বাইরে বেরুবোর কথা ভাবতেই পারেন না।

'তন্ময়' নামের অভাগা চরিত্রটির অতি সংক্ষিপ্ত পরিণতি:
তন্ময়ের এ পৃথিবী থেকে দুম করে সরে না-গিয়ে উপায় ছিল না, আমি ইচ্ছা করলেই তার যাওয়াটা ঠেকাতে পারতাম না। কলম আমাকে টেনে নিয়ে যায়, জিম্মি আমি; একে আটকাবার ক্ষমতার আমার নাই!
তবে এখানে ছোট্ট একটা যোগসূত্র আছে:
যোগসূত্রটা হচ্ছে, তন্ময় নামের একটা শেকড় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি অন্য একটা শেকড় ঊঁকিঝুকি মারছে।
অর্থাৎ, তন্ময় বিদায় নিচ্ছে, ইভা এবং জয় আরেকটা শেকড় ছড়িয়ে দিচ্ছে: "ইভা কান্না থামিয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল। ...। এক সময় শরীর তার নিজস্ব ভঙ্গিতে কথা বলা শুরু করল। এ ভাষার উৎস কী, কে জানে! এক সময় জয় ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে ভাবল, আসলে স্বর্গ বলে আলাদা কিছু নেই।" (কনক পুরুষ)

Monday, October 12, 2009

মওদুদী: চলমান এক হিউম্যান-বম্ব!

সাপের খোলস বদলাবার মতো নিজের মত বদলাতেন এই মানুষটি!
“পীর মোহসনিউদ্দিন দুদু মিয়া বলেন, মুওদুদী সাহেব নিজে কোন সনদপ্রাপ্ত মাওলানা নন। হায়দারাবাদ নিজামের দরবারে তদান্তিন সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের তুষ্ট করার জন্য তিনি কাজ করতেন। সেই প্রভুদের কাছ থেকেই তিনি মাওলানা খেতাব পান।”
(দৈনিক পাকিস্তান, ২০ অক্টোবর ১৯৬৯)

বড় ভাই আবুল খায়ের মওদুদীর সুপারিশে আবুল আলা (সর্বোচ্চ পিতা) মওদুদী সাহেব হায়দারাবাদের দারুত তরজমা থেকে দর্শনের একটি গ্রন্থ তরজমা করে পারিশ্রমিক পান ৫০০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে তিনি প্রকাশনা শুরু করেন, মাসিক তরজমানুল কোরআন।
তিনি সালজুক বংশ, হায়দারাবাদের ইতিহাস, হায়দারাবাদের নিজামমুলক আসিফ জাহর জীবন চরিত রচনা করে হায়দারাবাদের নিজাম শাসন পদ্ধতি তথা রাজতন্ত্রের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে শাসক গোষ্ঠীর অনুগ্রহদৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পরে তিনি কংগ্রেসে যোগদান করে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও তার দল ‘হেজবুল্লা’ এবং মিশরের শেথ হাসান বানা ও তার দল ‘ইসলামী ভ্রাতৃসংঘ’ এর প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে এদের ভাবাদর্শে একটি দল ‘জামাতে ইসলামী, হিন্দ’ গঠন করেন।

মওদুদীর মধ্যে বিভিন্ন যুগের ইসলামী চিন্তাবিদদের চিন্তাধারা ও মতামতকে নিজের করে, নিজের ভাষায় প্রকাশ করার প্রবণতা লক্ষণীয়! এবং নিজ স্বার্থে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা।

হায়দারাবাদ জীবনে তিনি 'মুসলমান' শব্দের নিম্নরুপ ব্যাখ্যা দেন: “ইসলাম জাতীয়তার যে জীবন বৃত্ত এঁকেছে, তা ঘিরে রয়েছে একটি কলেমা, লা ইলাহা ইল্লাল্লা...। এই কলেমার উপরেই বন্ধুতা এবং শত্রুতা। এটা স্বীকার করলে বন্ধু, অস্বীকার করলেই শত্রু । ”
(মওদুদীর চিন্তাধারা/ মাওলানা আবদুল আওয়াল, প্রকাশ ১৯৬৯)

কংগ্রেস ও ভারতের স্বাধীনতা সম্বন্ধে বলেন: “মুসলমানদের পক্ষে দেশের এরুপ স্বাধীনতা সংগ্রাম করা হারাম, যার পরিণামে ইউরোপিয়ান অমুসলমানদের হাত থেকে ভারতীয় অমুসলিমদের নিকট হস্তান্তর হবে।”
(মওদুদীর চিন্তাধারা/ মাওলানা আবদুল আওয়াল, প্রকাশ ১৯৬৯)

“তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে হারাম আন্দোলন এবং পাকিস্তানের জন্য যারা জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের হারাম মউত হয়েছে বলে ফতোয়া দেন।”
(দৈনিক পাকিস্তান, ২১ অক্টোবর ১৯৬৯)

কিন্তু ভারত বিভক্ত হলে তিনি পাকিস্তানে চলে আসেন। এ সময় তার দলের সংখ্যা ছিল ৫৩৩ জন।

“জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য- মুসলমান হিসাবে আমি এ নীতির সমর্থক নই।”
(মুওদুদীর চিন্তাধারা/ মাওলানা আবদুল আওয়াল, প্রকাশ ১৯৬৯)

“...মওদুদী তার প্রচারিত আদর্শে এ কথাই বারবার প্রকাশ করেছেন, যে, তলোয়ারের জোরেই ইসলাম দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, দাওয়াতে নয়...।”
(ড. মোহাম্মদ হাননান/ বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ৪র্থ খন্ড)

মওদুদী বিভিন্ন সময় প্রয়োজন অনুসারে কোরানের ভুল ব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন। তাঁর স্বকপোলকল্পিত ফতোয়ার জন্য, 'আহমেদি' মতবাদের প্রতি ভয়ংকরসব ফতোয়া-বানীর কারণে বিনষ্ট হয়েছে হাজার-হাজার প্রাণ! তাঁর স্বোপার্জিত এই সম্পদ পরবর্তীতে ব্যবহার করেছে জামাত-ই-ইসলাম।

নিজের জীবন-ভিক্ষা করে ফাঁসির রশি এড়াতে পেরেছিলেন। রাওয়ারপিন্ডি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা গোলামউল্লাহ খান এক বিবৃতিতে বলেন: “কোরআনের অপ-ব্যাখ্যা করা বইগুলো মওদুদী সাহেব প্রত্যাহার করে নেবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু তিনি তার কথা রাখেননি।"


যে কোরানকে হাতিয়ার বানিয়ে তিনি ফেৎনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করেছিলেন আমি সেই কোরান থেকেই ধার করে বলি:
”...ফিৎনা হত্যার চেয়েও মারাত্মক।”
(২ সুরা বাকারা: ১৯১)

”আল্লা তো ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদেরকে ভালোবাসেন না।”
(৫ সুরা মায়িদা: ৬৪)

”তাদেরকে যখন বলা হয়, ’পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না’, তখন তারা বলে, আমরাই তো শান্তি বজায় রাখি। সাবধান! এরাই ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, কিন্তু এরা তা বুঝতে পারে না।”
(২ সুরা বাকারা: ১১-১২)

*ছবিঋণ: গুগল

মুক্তিযুদ্ধে: একজন সিরাজুর রহমান

যুদ্ধ নামের কদাকার পশুর মুখোমুখি হলে মানুষ কোন পর্যায়ে নেমে যায় এটা আঁচ করা মুশকিল! মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়টা আজ আমরা, এই প্রজন্মের পক্ষে আঁচ করা প্রায় অসম্ভব। এটা তাঁরাই উপলব্ধি করতে পারবেন যারা সেই সময়টা অতিক্রম করে এসেছেন।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটা সত্য ঘটনা। বৃষ্টির মত বোমা পড়ছে। বাবা তার সন্তানকে নিয়ে দৌড়াচ্ছেন। বাবা তার সন্তানের মাথায় একটা হাত দিয়ে রেখেছেন। এই অবোধ বাবা হাত দিয়ে বোমা থেকে তাঁর
সন্তানকে রক্ষা করতে চাইছিলেন। ঠান্ডা মাথায় বাবার এই আচরণ নিয়ে বেদম হাসাহাসি হবে কিন্তু তখনকার সময়ের জন্য এটাই ছিল রূঢ় বাস্তবতা।

১৯৭১-এর সেই উত্তাল সময়ে কতশত মানুষের প্রিয়মানুষ কে কোথায় ছিটকে পড়েছিল তার হিসাব কে রাখে! প্রিয়মানুষের একটা খবরের জন্য কেউ তার শরীরের একটা অংশ অবলীলায় খোয়াতে রাজি হতেন এ আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি।
আজকের মত তখন তো আর ইমেইল, ফ্যাক্স, ফোনের সুবিধা ছিল না। ওই সময়ে কেউ কেউ ঠিকই অসাধারণ কাজটা করে গেছেন।

যেটা আমি বারবার বলে আসছি, একটা যুদ্ধ বিশাল ব্যাপার। একেকজনের যুদ্ধ করার ভঙ্গি একেকরকম। কেবল স্টেনগান দিয়েই যুদ্ধ হয় না, একটা ফটোগান কতটা শক্তিশালী তা সহজেই অনুমেয়!
বিশেষ-বিশেষ কাউকে নিয়ে হরদম 'নর্তন-কুর্দন' করার মানে হচ্ছে অন্যদের খাটো করা, প্রকারান্তরে নিজেকেই খাটো করা। একটা বামন-বিকলাঙ্গ হয়ে বড় হয়ে উঠা।

“সিরাজুর রহমানের (তৎকালীন বিবিসি, বাংলা বিভাগ) সাক্ষাৎকার:
১৯৭১ সালে বিবিসিতে কিছু সমস্যা ছিল। আমাদেরকে শ্রোতাদের সঠিক এবং সর্বশেষ খবর পরিবেশন করতে হবে। কোন অবস্থাতেই যেন তথ্য বিভ্রাটের আঙ্গুল না ওঠে!
আমরা বাংলা বিভাগে যারা ছিলাম, সংখ্যায় অত্যন্ত কম ছিলাম। আমাদের পক্ষে সব কিছু সামলানো কঠিন ছিল।
সৌভাগ্যবশত, তখন আশেপাশে কিছু ছাত্র ছিলেন, তাঁরা উচ্চ শিক্ষার জন্য এ দেশে এসেছিলেন। তাঁরা আমাদেরকে যথাসাধ্য সাহায্য করতেন!

আমার মনে আছে, আমার সহকর্র্মী শ্যামল লোধ, কমল বোসসহ অনেক দিন সকাল ৯টা থেকে অফিসে এসে আবার রাত ২টা, কখনো ৩টায় বাসায় ফিরতাম!

এরমধ্যে আবেগের ব্যাপারটাই প্রধান ছিল। দেশ থেকে অবিরাম খবর আসছে। দেশের জন-সাধারণের দুঃখ দুর্দশা, ভোগান্তি, মৃত্যু আমাদেরকে তাড়িত করতো!

সবচেয়ে জরুরী যে ব্যাপারটা ছিল, আমাদের হাজার হাজার বাঙ্গালী যারা পাকিস্তানে আটকা পড়ে ছিলেন, দেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার কোন উপায় ছিল না তাঁদের! আবার দেশের ওরাও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। দু’ তরফ থেকেই তারা আমাদের স্মরণাপন্ন হচ্ছিলেন।
প্রথমত, আমরা বাংলাদেশ থেকে পাওয়া কিছু চিঠি
পাকিস্তানে আটকা পড়া আত্মীয় স্বজন এবং পাকিস্তানে আটকা পড়াদের চিঠি বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। কয়েক হাজার চিঠি-পত্র এভাবে এদিক থেকে ওদিকে পাঠানো হয়েছিল।

আমাদের পর্যাপ্ত লোকবল ছিল না এগুলো দেখাশোনা করার জন্য। শেষে আমরা ‘সেতু বন্ধন, সাগর পাড়ের বাণী’ অনুষ্ঠানে তাঁদের খবরাখবর চিঠি পাঠের মাধ্যমে দেয়া শুরু করলাম।
অজস্র চিঠি পেতাম আমরা। সেই সময় আমাদের শ্রোতারা কী যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেন এই অনুষ্ঠানের জন্য এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি!

আরও মনে পড়ে, ১৬ ডিসেম্বর, যখন অমরা টের পেলাম
পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করবে তখন আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছিলাম।
আমার মনে আছে, যখন আমরা সেই অনুষ্ঠানটি প্রচার করি, ঠিক সেই সময়ে ইয়াহিয়া খান
পাকিস্তানে বেতার ভাষণ দিচ্ছিলেন।
আমি কানে ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শুনছিলাম আর মুখে আমাদের শ্রোতাদের বাংলায় খবরটা দিয়ে যাচ্ছিলাম, ইয়াহিয়া খান কি বলছেন একই সঙ্গে! অর্থাৎ ইয়াহিয়া যে সময় ইংরাজীতে ভাষণ দিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের শ্রোতারা
বাংলায় পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পনের খবরও শুনতে পাচ্ছিলেন ।
সেই মুহূর্তের কথা আমার মনে পড়ে, কান্না চেপে রাখতে পারছিলাম না তখন। অথচ বেতার সাংবাদিকের জন্য আবেগের প্রকাশ অযোগ্যতার পরিচয় কিন্তু তবুও সে দিন কান্না চেপে রাখতে পারিনি!

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৫ খন্ড