Saturday, August 2, 2008

একালের নাইট, একালের যুদ্ধাপরাধি।

­ডন কুইক্সোট অভ লা মানচা মরেও শান্তি পাচ্ছেন না। তাঁর মতো সৎ, দূঃসাহসিক-ডাকাবুকো নাইট জীবিত নেই বলেই সম্ভবত পৃথিবীটা ভরে গেছে অনাচার, দুঃশাসনে। উহু, আড়মোড়া ভেঙ্গে হুড়মুড় করে জেগে উঠতেই হয়, মরে গা ভাসিয়ে থাকা চলে না। অবশ্য ডন কুইক্সোটের মত নাইটরা নাকি কখনও মৃত্যু বরণ করেন না, খোলস বদলান মাত্র।

বাংলাদেশে আসবেন মনস্থ করলেন। এ সিদ্ধান্তের পেছনে লুকিয়ে আছে বিশাল এক ক্ষুব্ধতা। শুনেছেন এ জাতি অতিশয় পাজি। প্রকাশ্যে বীরবর একজন বয়স্ত মানুষকে তার সন্তানসম কেউ লাথি মারে আর লক্ষ-লক্ষ মানুষ তা অবলোকন করে। অথচ ওই অতি দুষ্টকে শায়েস্তা করতে, তার কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতা নাকি কারও নাই! ধিক, ধিক-ধিক। নাহ, এর একটা বিহিত করা আবশ্যক।

ডন কুইক্সোট তার শালপ্রাংশু-কিসমিস টাইপের শরীর অদ্ভুত ভঙ্গিতে বাঁকিয়ে বিকট হাই তুললেন। লাফিয়ে উঠতে গিয়ে সামলে নিলেন যখন বুঝতে পারলেন এই বজ্রপাতের উৎস তিনি নিজেই। তাঁর পার্শ্বচর, পৃথুল-থলথলে শরিরের সাংকো পানযাকে বললেন: সাংকো, জীবনটা এক যুদ্ধ, নিরন্তর যুদ্ধ- তৈরি হও, আমি যুদ্ধে বের হব।
সাংকো চোখ কচলাতে কচলাতে ভাবল, যন্ত্রণা, আবার যুদ্ধের ভূত চেপেছে। লোকটার মাথা কি আবারও এলোমেলো হয়ে গেল! হাই চেপে ভূঁড়িতে হাত বুলিয়ে বলল: স্যার নাইট, খেয়ে-দেয়ে একটু গড়িয়ে নিলে হতো না।
ডন কুইক্সোট গাঁকগাঁক করে উঠলেন: আরে এ গাধা বলে কি, চারদিকে এতো অন্যায়-অবিচার, তুই কি খেয়ে ঘুমিয়ে রসাতলে যেতে চাস- তোর কি আঠারো মাসে বছর!
সাজ-সাজ রব পড়ে গেল, ডন কুইক্সোট তাঁর বর্শা, অসি শাণ দিতে বসলেন। অবশ্য এ তরবারি দিয়ে মুরগির গলা দু-ভাগ হবে কি না সন্দেহ! তার বর্শাটা দিয়ে কলাগাছ এফোঁড়-ওফোঁড় করতে , তা প্রায় ঘন্টাখানেক তো লাগতেই পারে।
ডন কুইক্সোট তার লজঝড় মার্কা পুরোদস্তুর যুদ্ধের পোশাকে, তাঁর প্রিয় দুর্ধর্ষ ঘোড়া রোজিন্যান্ট-এ চাপলেন। সাংকো পানযা তার গাধা ড্যাপল নিয়ে অনিচ্ছা সত্বেও পিছু নিল।

বঙ্গাল দেশের মহা সুন্দরীদের হাবভাব নাইট ডন কুইক্সোটকে তিলমাত্র প্রভাবিত করছে না। টকটকে লাল রঙের প্রলেপ মাখানো হাত পায়ের লম্বা-লম্বা নখ দেখে মনে হচ্ছে শকুনের রক্তাক্ত পা। উৎকট লিপস্টিক-রুজে মাখামাখি ঠোঁট, গাল দেখে বিড়বিড় করলেন: ড্রাকুলী।
স্যার নাইট একটু গুলিয়ে ফেলেছেন। ড্রাকুলী না বলে বলতে পারতেন ড্রাকুলার মেয়ে অথবা মহিলা ড্রাকুলা। অভিজাত মহিলাদের কামানো ভ্রু দেখে আঁতকে উঠলেন মড়ার খুলি ভেবে।
ধনুর্ভঙ্গ পণ করায় কিনা কে জানে ডন কুইক্সোট-এর সমস্ত মন ছেয়ে আছে ইনার প্রেমিকা ডালসিনিয়া দেল টোবাসো। দেল টোবাসোর আকাশ পাতাল রূপ ছিল কি না সেটা আলোচ্য বিষয় না কিন্তু ইনার চোখে অন্যরা নস্যি। আসলে লাইলীকে দেখতে হয় মজনুর চোখ দিয়ে- দেল টোবাসোকে দেখতে হবে ডন কুইক্সোটের চোখে।

ঘোড়া রোজিন্যান্ট তার হাড্ডিসার শরীর নিয়ে পূর্ণ গতিতে ছুটছে (সত্য বলতে কি গতি গাধার চেয়ে কম) ভিআইপি রোড ধরে। ঘোড়া মধ্যরাস্তা পেরুতে গিয়ে দুহাত উঁচু আইল্যান্ডে মাথা বাঁধিয়ে চার পা আকাশে তুলে দিল। ডন কুইক্সোটকে গড়াগড়ি খেতে দেখে সাংকো টেনে তুলল। ধুলায় ধবলীভূত নাইট ব্যাথায় কুঁইকুঁই করে গা ঝাড়া দিলেন। থসথসে দেহের হাড় গুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
রাগ চেপে একজনকে জিঞ্জেস করলেন: এইসব কি!
লোকটা অবঞ্জাভরে বলল, অ, এইটা আইল্যান্ড। ক-দিন পর পর এটার নমুনা আমরা বদল করি। একবার গাছ লাগালাম তো পরের বার কেটে ফেললাম। সিরামিক ইট বসিয়ে রেলিং দিয়ে ক-দিন পর ওটা গুঁড়িয়ে রঙ দিয়ে দিলাম। ইচ্ছে হলে আবার গাছ লাগালাম। ইনফ্যাক্ট, আমরা ভাংচুর না করে থাকতে পারি না, পরিশ্রমী জাতি তো। আপনি হয়তো ক-দিন পর দেখবেন দুহাত উঁচু এ দেয়ালের চিহ্নমাত্র নেই। শোভা পাচ্ছে দশ হাত গভীর ড্রেন, ওটাই আইল্যান্ড।

ডন কুইক্সোট এগুচ্ছেন, ক্রমশ মন খারাপ হচ্ছে, স্পষ্ট দৈববাণী (রেডিও, টেলিভিশনকে দৈববাণী ভাবছেন) শুনছেন, বারংবার: পূর্বে এ দেশে অযুত-নিযুত সমস্যা ছিল, এখন কোন সমস্যা নাই। ভবিষ্যৱ হবে আরো চমৎকার।
ডন কুইক্সোট একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, তুমি কি আমায় মুক্তিযোদ্ধা ওই মানুষটার খোঁজ দিতে পার, খুনিদের বিচার চাইলে গেলে যাকে প্রকাশ্যে লাথি মারা হয়েছিল?
যাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলেন সে বিরক্ত হয়ে বলল, ওই মানুষটাকে তো সবাই খুঁজছে, মোস্ট ওয়ান্টেড পারসন। ১৯৭১-এ স্বাধিনতার নামে গন্ডগোল লাগিয়ে দেশটার বারোটা বাজিয়েছিল। এইসব যুদ্ধাপরাধিদের এখন খুঁজে বের করে বিচারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আসলে ডন কুইক্সোট তার ধীরগতির কারণে এই দেশে পৌঁছতে অনেক দেরি করে ফেলছেন। দাবার ছক পাল্টে গেছে।
ডন কুইক্সোট গভীর বিষাদে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন: সাংকো, এখানে আমার অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই, চলো অন্য কোথাও।


*চরিত্রগুলোর নাম নেয়া হয়েছে: Cervantes-এর Don Quixote থেকে

No comments: