Search

Showing posts with label বইমেলা. Show all posts
Showing posts with label বইমেলা. Show all posts

Saturday, February 12, 2011

সবই পেশা কিন্তু...

আমাদের দেশে মোটা দাগে দুই ধরনের পেশা আছে, বৈধ এবং অবৈধ। দেশে আমাদের পছন্দসই পেশাগুলোর মধ্যে চুরি-ডাকাতি-ঘুষ এই সব আমাদের পছন্দের শীর্ষে থাকলেও আইনত তা অবৈধ। কসাই, রুপোপজীবিনী-বেশ্যা এদেরকে কেউ সরু চোখে দেখলেও পেশাগুলো কিন্তু বৈধ। ফলে আমাদের দেশের সরকার একজন বেশ্যা এবং অন্য যে-কোনও পেশার লোকজনকে একই অধিকার দিতে বাধ্য।

লেখক-টেখকরা নাকি আমাদেরকে আলো দেখান, আমরা আলোকিত হই। বলা হয়ে থাকে এঁরা জ্ঞানের বৃত্ত থেকে এক পা এগিয়ে থাকেন। সত্য-মিথ্যা জানি না। যাচাই করার মত বুদ্ধি, ক্ষমতা আমার নাই, থাকলে ভাল হত!
সেই আলোকিত মানুষটা যখন হাহাকার করা ভঙ্গিতে নিজেকে বিক্রি করার চেষ্টা করেন তখন বৈধ একটা পেশার বেশ্যার সঙ্গে মূলত তাঁর কোনো পার্থক্য থাকে না! একজন বেশ্যা যেমন তাঁর শরীর বিক্রি করার জন্য বিভিন্ন কায়দা-কানুন করেন তেমনি অনেক লেখকের ভঙ্গিটাও দাঁড়ায় অনেকটা তেমন।
মোড়ক উম্মোচনের নামে পেটের কাছে বই ধরে যখন একজন লেখক পোজ দেন তখন সেই কুৎসিত দৃশ্য দেখে আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলি। হড়হড় করে বমি করে দেয়াটা আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ চোখ খুললে, বইটা সরালেই দেখব ওই লেখকের পেটটা কাঁচের- লেখকের এক পেট আবর্জনা দৃশ্যমান হবে, এই ভয়ে!

আমাদের দেশটা বড়ো বিচিত্র। এখানে কাজ-কর্ম সব ভূতের উল্টো পা'র মত! যারা এই সমাজকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন তাঁদেরকেই রাখা হয় কোনঠাসা করে। এই দেশে একজন ইমাম-ধর্মীয় শিক্ষকের পেছনে সবাই নামাজ পড়বে কিন্তু অধিকাংশ ইমামকে যে বেতন দেয়া হবে ওই বেতনে কোনো মেথরও কাজ করতে রাজি হবেন না। ওই ইমাম ভুল ফতোয়া দেবে না তো কে দেবে? আমার মৃত্যুর পর আমার পরিবারের লোকজন কোনও ইমামের হাতে ২০০-৩০০ টাকা ধরিয়ে দিলে ইমাম সাহেবের চোখ দিয়ে দমকলের মত যে পানি বেরুবে এতে অন্তত আমার কোনো সন্দেহ নাই!

এই দেশে লেখালেখি করে খুব অল্প মানুষই হাওয়া না-খেয়ে ভাত-রুটি খেতে পারেন। নির্দিষ্ট সংখ্যক লেখক ব্যতীত সবাই বই ছাপান নিজের পয়সায়। এটা যে কী লজ্জার তা এই সব নির্বোধ লেখকদের কে বোঝাবে! এরমধ্যে থেকে আবার খানিকটা বইয়ের কাটতি আছে এমন অনেকের বই প্রকাশক নিজের পয়সায় প্রকাশ করেন ঠিকই কিন্তু লেখককে লেখার সম্মানী দেন না!
আহা, তবুও লেখক বেচারা লেংটি পরে উবু হয়ে বছরের-পর-বছর লিখে যান। বেচারা লেখক, তিনি যে সমাজ উদ্ধার করার ব্রত নিয়ে এসেছেন। লেখক নামের একজন স্বপ্নবাজ সবাইকে স্বপ্ন দেখিয়ে বেড়াবেন কেবল তাঁর নিজের কোনো স্বপ্ন থাকবে না, থাকতে পারে না। তাঁর ইচ্ছা করবে না চকচকে কাপড় গায়ে দিতে, ভালমন্দ খাবার খেতে। লেখক বেচারা কপকপ করে চাঁদের আলো খেয়ে চাঁদের আলোয় 'ছিনান' করে পারলে লেংটিটাও খুলে ফেলবেন। 
একজন স্বপ্নবাজকে বাঁচিয়ে রাখার মত যোগ্যতা আমাদের দেশ-সমাজের এখনও হয়ে উঠেনি। দেশ বেচারা, বেচারা দেশ!
...
অন্য প্রসঙ্গ, বইমেলা [১]। বইমেলা এখন হয়ে গেছে কর্পোরেট একটা মেলা। রাজনীতির মধ্যে যেমন পলিটিক্স ঢুকে গেছে তেমনি বইমেলা আর ঠাঠারি বাজারের মধ্যে তফাতটাও কমে গেছে! বইমেলার শুরুটাই হয় বেসুরো।
আমার সাফ কথা, বইমেলা উদ্বোধন করবেন একজন লেখক, কোনও রাজনীতিবিদ না [২]। একজন প্রধানমন্ত্রী যখন বইমেলা উদ্বোধন করেন এবং বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক বলেন, তিনি একজন বিশিষ্ট লেখক হিসাবে মেলা উদ্বোধন করছেন তখন মহাপরিচালক মানুষটাকে আমার বড়ো খেলো মনে হয়।

একজন হুমায়ূন আহমেদ প্রচুর ছেলে-মেয়েকে হলুদ কাপড় পরিয়ে মেলায় তান্ডব নৃত্য করান তখন ওই মানুষটাকে আমার স্রেফ একজন চানাচুরওয়ালা মনে হয়। যে চানাচুরওয়ালা ক্লাউনের টুপি পরে সুর করে বলেন, লাগে চা-ন্না- চ্চু-র-র-র! জানি-জানি, অনেকে বলবেন, এটা তো হুমায়ূন আহমেদ করেন না, করেন প্রকাশক। এতে যে হুমায়ূন আহমেদের গা দোলানো সায় আছে এটার জন্য গবেষণা করার প্রয়োজন হয় না, অভিসন্দর্ভ জমা দেওয়ার জন্যও ছুট লাগাতে হয় না।
এমনিতে অবশ্য বইমেলায় মানবস্রোত দেখে আমি চেপে রাখা শ্বাস ছেড়ে বলি, হুজুগে বাংগাল [৩]! বইমেলায় অধিকাংশ মানুষ কেন আসেন কে জানে!

বইমেলা আসলেই আমাদের প্রকাশক মহোদয়গণ মুক্তকচ্ছ হয়ে বই প্রকাশ করা শুরু করেন। ভাল! কীভাবে করেন তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ নব্য লেখক নামের দুপেয়েদের কাছ থেকে হয় গুণে গুণে পুরো টাকাই নেন। কখনও অনেক বেশি টাকা হাতিয়ে নেন বিশেষ করে প্রবাসীদের কাছ থেকে। আবার কাউকে এক-দেড়শ বই গছিয়ে দিয়ে।
বেচারা প্রকাশকদের জন্য আমার চোখে জল চলে আসে। এদের নাকি পোষায় না। না-পোষালে বইয়ের ব্যবসা কেন বাওয়া বাঁদর নাচাবার ব্যবসা করলে আটকাচ্ছে কে! বইমেলায় এই যে কোটি-কোটি টাকার বই বিক্রি হচ্ছে অল্প কিছু লেখক ব্যতীত আর কাউকে তো রয়্যালটির টাকা দিতে হচ্ছে না তাহলে এই কোটি-কোটি টাকা যাচ্ছে কোন চুলোয়, বাপু হে!

ক-দিন আগে এক পত্রিকায় বেশ কিছু প্রকাশকদের বাণী পড়ছিলাম, অনেক কায়দা-কানুন করে এরা বাণীতে বলছিলেন, মননশীন-রেঁনেসা-প্রগতিশীল-আমাদের দায়বদ্ধতা...। বাণী-টানী ছাপিয়ে আমার মাথায় যে ভাবনাটা ঘুরপাক খাচ্ছিল, প্রকাশক নামের এই অল্প কিছু মানুষই ঠিক করে দেবেন, কে লেখক, কে লেখক নন- দুধের দুধ পানির পানি! অথচ অধিকাংশ প্রকাশকই লেখকের পান্ডুলিপি পড়ে দেখেন কিনা এতে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। টাকা পেলে লেখার মান কোন বিষয় না! অধিকাংশ বই ছাপা হয় সম্পাদনা না করে।

যাই হোক, একসময় বইমেলায় যেতে না-পারলে অস্থির অস্থির লাগত, এখন এই অস্থিরতার অবসান হয়েছে। গতবছর বইমেলায় যাওয়া হয়েছিল বিশেষ একটা মানুষের কারণে, অপার সৌভাগ্য, আমি ব্লাডি সিভিলিয়ান তখন মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলাম [৪]। এবার আর যাওয়ার কোন গোপন ইচ্ছা নাই। 

ভাগ্যিস, এইবার বইমেলায় অন্যান্য বছরের মত আনিসুল হকের নির্লজ্জ বিজ্ঞাপন চোখে পড়েনি, অন্তত এখন পর্যন্ত। আমার আন্তরিক সাধুবাদ আনিসুল হককে। মানুষটা এতোদিনে মানুষ হলেন।
কিন্তু আনিসুল হকের এমন বিজ্ঞাপন না-থাকলে কী হবে তার অনুসারীরা রয়ে গেছেন ঠিকই। এই সব বিজ্ঞাপন যে এই লেখক নামের দুপেয়েরাই দেন এটা বোঝার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন হয় না [৫] । হুশ-হুশ, লেখকের ওড়না গলার একই ছবিসহ আট-দশটা প্রকাশন সংস্থা একই পত্রিকায় একই দিনে বিজ্ঞাপন দেবে এটা জজ মিয়ার গল্পের মতই আষাঢ়ে! আবার এই লেখকরাই পত্রিকায় ছাপিয়ে দেন, প্রথম মুদ্রণ শ্যাষ...। হুমায়ূন আহমেদের একটা বইয়ের বিজ্ঞাপন চলে গিয়েছিল, দ্বিতীয় মুদ্রণ নিঃশেষিত অথচ তখন পর্যন্ত ওই বই প্রকাশিতই হয়নি! সত্যিই একজন লেখক হতে অনেক মগজের অপচয় হয়!      

এই সব লেখকরা কেন যে বুঝতে চান না, এ বড়ো অমর্যাদার! প্রত্যেকটা পেশায় যেমন পার্থক্য আছে তেমনি পার্থক্য আছে ভঙ্গি, উপস্থাপনায়ও। খানিকটা পার্থক্য না থাকলে ভাল দেখায় না। এ সত্য পেটের দায়ে বিশেষ পেশার কেউ নগ্ন হন রাতের আধারে কিন্তু তাই বলে ঝকঝকে দিনের আলোয় কাউকে নগ্ন দেখতে ভাল লাগে না।

*ছবি ঋণ: কালের কন্ঠ 

সহায়ক সূত্র:
১. বইমেলা...: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_18.html
২. বইমেলা উদ্বোধন: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_30.html
৩.  হুজুগে বাংগাল: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_25.html
 ৪. আমি ব্লাডি সিভিলিয়ান: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_15.html
৫. বইমেলায় বিজ্ঞাপন: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_07.html     

Saturday, February 27, 2010

বন ভয়েজ, বইমেলা

২১ তারিখের বইমেলার মানবস্রোতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। অতি দ্রুত এখান থেকে বেরুতে পারলে বেঁচে যাই। আহা, আমি বেরুতে চাইলেই তো হবে না, মানবস্রোত আমায় বেরুতে দিলে তো!
তাছাড়া আমায় ফিরতে হবে কাফরুল, স্কুটারে ফেরা যাবে না। আমি নিশ্চিত, আটকে দেবে। আবারও এলিয়েন ওরফে আর্মিদের মুখোমুখি হতে চাচ্ছিলাম না। গতবার এই নিয়ে কম হেনেস্তা হতে হয়নি।

হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় থামতে বাধ্য হই, কাশেম প্রকাশনীর কাছে। এই প্রকাশনীর সবগুলো বইই একজন লেখকের! এ পর্যন্ত ওনার ৯৪টি বই বের হয়েছে। লেখক এবং প্রকাশক একই ব্যক্তি। আমি বইগুলোর নাম পড়ার চেষ্টা করি, বোরকাওয়ালীর প্রেম, প্রেমে এতো জ্বালা কেন?, প্রেম একটি ফুটন্ত গোলাপ, ইত্যাদি। আমি ওই লেখকের জরায়ুর জন্য বেদনা বোধ করে ওখান থেকে সরে আসি।

আমার বন্ধুরা বুদ্ধি দিল বাসে করে চলে যেতে, এলিয়েন-আর্মিরা নাকি বাস আটকায় না (আহা, বাস আটকালে নিজেদের চলাফেরায় খুব সমস্যা হয় বুঝি!)। ৪ নাম্বার বাসে করে গেলেই সহজেই চলে যেতে পারব। আমি চোখে অন্ধকার দেখি। বাস আমাকে কোত্থেকে কোথায় নামিয়ে দিয়ে ভুস করে চলে যাবে, তখন আমার গতি কী? পারতপক্ষে সঙ্গে কেউ না-থাকলে আমি বাসে উঠি না।

এরা আমাকে পানির মত সব বুঝিয়ে দিলেন, যথারীতি আমি কিছুই বুঝলাম না। রাসেল, মাশা এঁরা আমার সম্বন্ধে খানিকটা ওয়াকিবহাল, এঁদের মনটাও নরোম। এরা বললেন, 'ঘটনা বুজছি আর বলতে হবে না। আসেন শাহবাগ যাই, চা-চু খাই। ওখান থেকে আপনাকে বাসে উঠিয়ে দেব'।
আমি
মহা আনন্দে এদের পিছুপিছু হাঁটতে থাকি, এরা হাঁটলে আমি হাঁটি, থামলে থামি। ফাঁকতালে কথা, ভাবনা চালাচালি হতে থাকে। বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খাওয়া, সিগারেট টানার সঙ্গে অন্য আনন্দের তুলনা কোথায়?

অসম্ভব ব্যস্ত শাহবাগ চৌরাস্তা পেরুতে হবে। এদের সঙ্গে আমিও অপেক্ষা করি। এরা হাঁটা ধরলে আমিও হাঁটা ধরি, থামলে থামি। কোথাও একটা ভজকট হয়ে যায়, মাঝ রাস্তায় বেকুবের মত দাঁড়িয়ে আছি। আরেকটু হলেই স্কুটার গায়ের উপর উঠে আসত। রাসেলের চিল চিৎকার, 'আপনি নিজেও মরবেন, সাথে আমারেও মারবেন'।
রাস্তা পার হওয়ার পর রাসেল চোখ লাল করে রাগে লাফাতে থাকেন, 'আচ্ছা, বিষয়টা কী! হে, বিষয়টা কী! আর একটু হইলেই তো কাম সারছিল! বাড়িত থিক্যা কি বিদায় নিয়া আইসেন?'

আমি মুখে বোকা বোকা হাসি ঝুলিয়ে রাখি। কি বলব, এই প্রশ্নের কী উত্তর হয়!
রাসেলের রাগ কমে না, 'এইটা আপনের মফস্বল না, এইটা ঢাকা শহর। এইখানে মানুষকে প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটতে হয়'। নইলে সব শেষ'।
আমি উদাস হয়ে সিগারেট টানতে টানতে বলি, 'তাই! মন্দ কী, মাঝে মাঝে জীবনটা বড়ো ক্লান্তিকর মনে হয়'।
রাসেল নামের মানুষটা একসময় হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু রাগ কমে না, 'আপনে আর ঢাকা আইসেন না। ঢাকা শহর আপনের জন্য না। আমি লেইখা সই কইরা দিব, আপনে ঢাকা শহরে চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত-অচল'!

তিনি এই অচল মালকে মাশার কাছে হস্তান্তর করে বিদায় নেন। আমি যেদিকে যাব মাশা যাবে এর উল্টোদিকে। বাসের জন্য অপেক্ষার একশেষ! ৪ নাম্বার বাস তো আর আসে না। সব ৩ নাম্বার। আজ ৩ নাম্বাররা সব দলে-দলে বেরিয়ে পড়েছে! মাশা হচ্ছে একটা চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া- এ কেমন করে সব মুখস্ত করে বসে থাকে আমি ভেবে ভেবে সারা। দুনিয়ার তাবৎ বই পড়ে বসে আছে, জিজ্ঞেস করামাত্র গড়গড় করে বলে দেয়, এমন।
তো মাশা আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, ৩ নাম্বার বাসে গিয়ে ফার্মগেটে নেমে কেমন কেমন করে পৌঁছা যাবে। আমি হুঁ-হুঁ, ও আচ্ছা-আচ্ছা করছি কিন্তু এর বুঝতে বাকী থাকে না, এটা পন্ডশ্রম। মাশা নামের দয়াবান মানুষটা বলেন, 'চলেন, ফার্মগেট পর্যন্ত আমিও যাই'।
অবশেষে ফার্মগেটে ৪ নাম্বার বাসে উঠিয়ে কন্ডাকটরকে বলে দেন, 'মামা, অসুস্থ মানুষ একটু কাফরুল নামায়া দিয়েন'। মানুষটা বিদায় নেন।

বাসে উঠে আমি গভীর শ্বাস ফেলে বলি, প্যারাডাইস লস্ট। বন ভয়েজ, বইমেলা। আগামীতে তোমার সঙ্গে দেখা হবে এ আশা ক্ষীণ!

Thursday, February 25, 2010

হুজুগে বাংগাল (!)

পূর্বের একটা পোস্টে উল্লেখ করেছিলাম, ঠিক ২১ ফেব্রুয়ারি বইমেলায় যাওয়ার একটা উদ্দেশ্য ছিল আমার। কাছ থেকে লোকজন দেখা, এদের আবেগ-ভাবনা স্পর্শ করার চেষ্টা করা।

বইমেলায় মানব-স্রোত দেখে আমার মনে হচ্ছিল, আজ আর কেউ বাড়িতে নাই সবাই বইমেলায় চলে এসেছে! আমি কান পেতে অনেকের কথা শুনছিলাম, এদের অধিকাংশদের মধ্যেই আবেগের ছিটেফোঁটাও নেই। বিচিত্রসব উদ্দেশ্য, কোনটাই ভাষা-বইমেলার সঙ্গে যায় না।
লাভের লাভ যা হয়েছে আমাকে কষ্ট করে রাস্তা খুঁজে বইমেলায় যেতে হয়নি। এরাই আমায় নিয়ে গেছে। বহু দূরে এক জায়গায় কেবল দাঁড়িয়েছিলাম, অনেকটা সময় পর আবিষ্কার করলাম, কেমন কেমন করে যেন আমি বইমেলার ভেতরে চলে এসেছি। এই ম্যাজিক দেখে আমি মুগ্ধ!

আমি নিজে যেটা করেছিলাম, দুই হাত উপরে তুলে হ্যান্ডস আপের ভঙ্গিতে ছিলাম। না, নড়েছো কি মরেছো বলে কেউ মাথার উপর হাত তুলতে বলেনি, কাজটা ছিল ইচ্ছাকৃত। আমি আসলে নারীঘটিত কোন জটিলতায় যেতে চাইনি। এই মানবস্রোতে কোন এক তাড়কা রাক্ষসি টাইপের মহতরমা অন্যের দায় আমার উপর চাপিয়ে ফট করে বলে বসলেন, এই আমার গায়ে হাত দিলি কেন? অভিযোগ খন্ডাবার প্রমাণ কোথায়, বাওয়া? হাতি যেমন কলাগাছের ভর্তা করে ফেলে আমাদের দেশের অতি উৎসাহী আমজনতা আমাকে মানবগাছের ভর্তা করে ফেলত। একটাই প্রাণ, মরলে আর বাঁচার উপায় ছিল না আমার!

বইমেলার প্রকাশকদের জন্য শংকা বোধ করছিলাম। আজ এদের কি উপায় হবে? এই মানবস্রোত, এদের দশ ভাগের এক ভাগও যদি একটা করে বই কেনে তাহলে নিমিষেই স্টলগুলোর বইয়ের তাক খালি হয়ে যাবে। এরপর এরা কি করবেন! আহারে, বেচারা প্রকাশক!

কিন্তু কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা হলো। এরা মুখ লম্বা করে উদাস হয়ে বসে আছেন। মুখ অন্ধকার করে বললেন, অন্য দিন যা বিক্রি হয় আজ তার চেয়ে বিক্রি অনেক কম।
বই তো আর উড়ে উড়ে পাঠকের নাকের ডগায় বসে না, পাঠককে এগিয়ে আসতে হয়, বই উল্টেপাল্টে দেখতে হয়। সেই সুযোগ কোথায়, এই মানবস্রোত দাঁড়াতে দিলে তো!

আমার মোটা মাথায় এটা ঢুকছিল না, এই মানবস্রোতের এখানে আগমণের উদ্দেশ্য কী! নাকি 'হুজুগে বাংগাল' নামটার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে গিয়ে এই ক্লেশ! ভনিতাবাজি!

*আমাদের ভনিতাবাজির খানিকটা নমুনা এখানে,
"১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ আবুল বরকতের ছোট ভাই এর ছেলে আলাউদ্দিন বরকত বলেন, চাচা শহীদ হবার পর আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে একুশের অনুষ্ঠানে কিংবা বই মেলায় আমাদের কেউ কোন দিন ডাকেনি।..."
.................


Wednesday, February 24, 2010

এক কাপ চায়ে দু-কাপ চিনি

অসাধারণ ব্যক্তিগণ কিছু চালু কথা চালু করে গেছেন। 'দা থেকে আছাড় বড়ো', 'বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচী', 'দারোগার নৌকার মাঝির শালা' ইত্যাদি।
আমরা সাধারণ যারা তারা বসে থাকব বুঝি? তাই 'এক কাপ চায়ে দু-কাপ চিনি'। উপায় কী, কখনও কখনও এর বড্ডো প্রয়োজন দেখা দেয়!

কোটি-কোটি বাচ্চা প্রসব হয়, এটা কোন খবর না কিন্তু বিমানে কোন বাচ্চা প্রসব হলে তা অবশ্যই খবর। এবারের বইমেলায় হাজার-হাজার বই বেরিয়েছে, মোড়ক উম্মোচন হয়েছে কিন্তু এইসব আলোচনায় আসে না।
পত্রিকার খবর, রাজধানীর একটা হোটেলে এম আসফউদ্দৌলার প্রবন্ধ 'অব পেইনস অ্যান্ড প্যানিকস' (
'প্যানিকস' শব্দটা পড়ার সময় সতর্কতা আবশ্যক। তাড়াহুড়োয় সর্বনাশ হয়ে যাবে, বেইজ্জতির একশেষ)। বইটির মোড়ক উম্মোচন করা হয়।

রাজধানীর এই হোটেলটির নাম এখানে দেয়া হয়নি এমন কি ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও বলা হয়নি কিন্তু এই হোটেলটির কার্পেটের নকশা দেখে নিশ্চিত হয়েছি এটা ফাইভ স্টার হোটেল সোনারগাঁ।
দেশের বাঘা বাঘা সুশীলগণ এখানে তশরীফ এনেছিলেন। ভদ্রতার খাতিয়ে এঁদের জন্য নানাপ্রকার চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় এবং মুত্রত্যাগ এই সবের সুব্যবস্থা ছিল বলেই অনুমান করি।

যেখানে প্রকাশকবৃন্দ লেখকদের বাদামের খোসাও ধরিয়ে দিতে চান না সেখানে অখ্যাত এই প্রকাশনী এই লেখক বই প্রসব করামাত্র পাঁচ তারকা হোটেলে মোড়ক উম্মোচনের নামে যে মাস্তির আয়োজন করেছিলেন এ লা-জবাব। আমি এমন লেখকের জরায়ুকে সেলাম জানাই।

আমি খসড়া
একটা হিসাব করে দেখেছি, বইটার অন্তত ১ লক্ষ কপি বিক্রি হলে প্রকাশক সাহেবের এই উদ্যোগ নেয়াটা স্বাভাবিক মনে হতো। আমার জানামতে, বাংলাদেশে এখনও কোন একটা বই ১ লক্ষ কপি বিক্রি হয়নি, তাও আবার প্রবন্ধ! এই বইটা কিনতে গিয়ে মারামারি করতে গিয়ে মেলায় দু-চার জন বিচি, নিদেনপক্ষে দাঁত হারিয়েছেন এমনটাও এখনও শুনিনি। জাস্ট কৌতুহলের কারণে এই প্রকাশনীর স্টলে কয়েক দফা সময় নস্ট করেছি কিন্তু কাউকে তখন বইটা কিনতে দেখিনি। অনুমান করি, আমি ওখান থেকে সরে আসা-মাত্র হাজার-হাজার বইক্রেতা পঙ্গপালের মত বই কেনার জন্য স্টলটাতে ঝাপিয়ে পড়েছেন। আফসোস, এই দৃশ্য চাক্ষুষ করতে পারলুম না।
তাই হবে! এরাই লেখক বাকীসব তক্ষক।

Monday, February 22, 2010

আমারব্লগ, মলাটবন্দি: স্বপ্ন এবং বাস্তব


গতকাল ২১ ফ্রেব্রুয়ারি আবারও বইমেলায় যাওয়া হলো। ঠিক ২১ তারিখে যাওয়ার একটা বিশেষ কারণ ছিল। সেটার বিস্তারিত অন্যত্র, অন্য পোস্টে বলব।

সালটা ২০০৭। তখন আমি একটা ওয়েব সাইটে শুভ নিকে ব্লগিং-এর নামে লেখালেখি করি। ওখানকার পোস্টগুলো নিয়ে "শুভ'র ব্লগিং" নামে একটা বই বের হলো। বাংলায় ব্লগিং-এর উপর প্রথম বই, আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু ওই সময় অনেকখানি বিষাদগ্রস্ত ছিলাম। কারণটা এখন বললে অনেকের কাছে হয়তো বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না। না হোক, তাতে আমার আবেগের কী আসে যায়, ঘন্টা!

আমি যাদের সঙ্গে ওখানে দিনের পর দিন লেখালেখি করেছি, মন্তব্য চালাচালি করেছি। যাদের লেখার ক্ষমতা আমাকে হতভম্ব করেছে, পারলে এঁদের হাতগুলো সোনা দিয়ে বাঁধাই করে দেই! এঁদের বিচিত্র ভাবনা, লেখার ক্ষমতা দেখে আমি হিংসায় মরে যাই।
অথচ আমার আস্ত একটা বই বের হলো- আমার নিজেকে কেমন অপরাধি অপরাধি লাগছিল। আমি এটা মেনে নিতে পারছিলাম না, কেন এঁদের অন্তত একটা করে লেখা নিয়ে বই বের হবে না?

তখন চেষ্টা করেছিলাম ওখানকার অন্তত ১০০জন ব্লগারের লেখা নিয়ে একটা বই বের করতে। কিন্তু পারিনি, ব্যর্থ হয়েছিলাম। আমি এই বেদনাটা আজও ভুলিনি! তখন এইসব নিয়ে অসম্ভব মন খারাপ করে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম: একজন দুর্বল মানুষের দুর্বল মস্তিষ্ক

মেলায় এবার আমার থাকার জায়গাটা ছিল লিটল ম্যাগ চত্ত্বরে। অনেক কারণের একটা হচ্ছে জায়গাটা তুলনামূলক ফাঁকা। অন্তত শ্বাস ফেলা যায়, পরিচিত লোকজনের সঙ্গে দু-চারটে কথা বলা যায়।
প্রায় সবাই নিজ নিজ দলের সঙ্গে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ান, আমি দলছুট টাইপের মানুষ- না ঘার কা, না ঘাট কা। আমি পারতপক্ষে এখান থেকে নড়ি না কারণ বইমেলা নামের এই ব্যবসায়িক বাজারে (মতান্তরে ঠাঠারি বাজার) হারিয়ে যাব।

এখানে আবার আমার ব্লগের স্টল। আজ 'মলাটবন্দি আমারব্লগ' বইটা কিনলাম। আক্ষরিক অর্থেই মুগ্ধ। সবচেয়ে বেশি টেনেছে নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে ব্লগারদের নাম দিয়ে লেখা সাজানো- কারও ট্যাঁ ফো করাও যো নাই। আমার ব্লগের এই প্রকাশনীটা প্রায় নিখুঁত একটা কাজ হয়েছে। এখনও পড়া শুরু করিনি। এখানকার অল্প ব্লগারই আমার পরিচিত, তাতে কী! বরং এও ভাল নতুনদের ছড়াছড়ি। একজন নতুন লিখিয়ের কাছে একটা লেখা প্রকাশ হওয়ার যে কী আনন্দ এটা আমি খানিকটা বুঝি। এক সময় পত্রিকার পাতায় চিঠিপত্র কলামে আমার কয়েক লাইনের লেখা ছাপা হতো। ওই আনন্দের সঙ্গে কিসের তুলনা হয়, আজ আর সেই আনন্দ কোথায়!

আমি খানিকটা আঁচ করতে পারি এটা বার করাটা চাট্টিখানি কথা না। এর পেছনে আছে এক ঝাঁক হার-না-মানা, অদম্য তরুণ। সেইসব তরুণ যারা ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে গান গাইতে গাইতে হাঁটতে জানে! কেবল এরাই পারে সব কিছু বদলে দিতে। কাল আমার ব্লগের স্টলে আমি যখন
'মলাটবন্দি আমারব্লগ' বইটা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলাম, তাঁদের এই উচ্ছ্বাস তেমন স্পর্শ করতে পারেনি, এ আমি বিলক্ষণ জানি। কারণ এরা জানেন না, আমি যে কাজটা করতে পারিনি এঁরা তা করে দেখিয়ে দিয়েছেন। হার-মানা আমার কাছে এরচে আনন্দের আর কি হতে পারে।

*ছবি ঋণ: http://dewdropsreturn.amarblog.com/posts/99566

Thursday, February 18, 2010

ওড়নাসমগ্র এবং কলার খোসা


বইমেলায় একজন লেখকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছি।আমার বইয়ের প্রকাশকের স্টল থেকে নিরাপদ দূরত্বে। কারণ প্রকাশক আমাকে দেখলেই রে-রে করে তেড়ে আসবেন। তিনি আমার একখানা বহি বাহির করিয়াছিলেন। তাঁর বিক্রি-বাট্টার কোনো উন্নতি হচ্ছিল না। ফি-বছর সবসুদ্ধ আমার ২টা বই-ই বিক্রি হত। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, একটার ক্রেতা শুভ, অন্যটার আলী মাহমেদ। গোপনে এ-ও খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এই দুজন একই 'লুক'। নামে-বেনামে খরিদ করে।
একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বদ্দা, বই বিক্রি বাড়াবার রহস্য কি?
তিনি বলেছিলেন, 'মিয়া, তুমি আজ-অবধি তোমার বইয়ের মোড়ক উম্মোচনই করলা না! 'মল-বাক্স' (রুচিমান লোকজনেরা কানে আঙুর দেন); মল-বাক্সের (মতান্তরে পেট) কাছে বই ধরে পোজ দিতে হয়, ফটাফট ছবি উঠাতে হয়। এইসব না করলে তোমার বই শুভ এবং আলী মাহমেদ কেনে এতেই তুষ্ট থাকো। আগামীতে এরাও কিনব না। কিনলে ভোঁতা দাও দিয়া কান কাইট্যা ফেলব'।
আমি ভাবনায় পড়ে গিয়ে বললাম, 'মোড়ক উম্মোচন কি খুব জরুরি'?
তিনি রাগ চেপে বললেন, 'তুমি কলা খাও'।
আমি মিসিং ২টা দাঁত ব্যতীত সবগুলো দাঁত বের করে বললাম, 'সেতো সবাই খায়, আমি খাই এ খাই ও খায় মায় বাঁদরও'।
এইবার তিনি রাগটা আর চেপে রাখতে পারলেন না, 'কলাটা কি খোসা সহ খাও'?
আমি বললাম, 'না, তা কেন, ওইটা তো খায় ছা...ছাগ'।
তিনি লাফিয়ে উঠলেন, 'ব্যস-ব্যস। কলা যেমন খোসা সহ খাওয়া যায় না তেমনি বইয়ের খোসা-মোড়ক না সরালে বইও বিক্রি হয় না। বই আর নারী...'। (কাশি) বাকীটা ভদ্র সমাজে বলার মতো না।
পাশ থেকে কে যেন বলল, 'একটা অটোগ্রাফ দিবেন'? আমি গা করি না, গল্প চালিয়ে যাই। সাথের লেখক বিরক্ত হলেন, বিষয় কী, অটোগ্রাফ দেন না কেন? এইটা কি বেতমিজগিরি!
আমি দুম করে আকাশ থেকে পড়লাম। মানুষটা আমাকে বলছে নাকি, আমার ক্কা কাছে, অ-অট-অটোগ্রাফ! মানুষটা পাগল নাকি, দুনিয়ায় আর লোক খুঁজে পেল না! আমি ভাল করে মানুষটাকে দেখি। তাঁর সমস্যা বোঝার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই, তদুপরি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করি আমার কাছে কেন রে, বাপ! আঁচ করার চেষ্টা করি কিন্তু মানুষটাকে স্বাভাবিকই মনে হয়। ওয়াল্লা, ইনি দেখি সত্যি সত্যি আমাকেই বলছেন! অটোগ্রাফ কড়চা লেখার পর আমার ধারণা ছিল কেউ আর আমার টিকিটিও স্পর্শ করতে আসবেন না।

বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাশের লেখক তাড়া দেন, 'আরে কি মুশকিল, অটোগ্রাফ দিয়ে শেষ করেন'।
আমি চিঁ চিঁ করে বলি, 'ইয়ে, হয়েছে কি বুঝলেন, অটোগ্রাফ যে দেব আমার তো যথেষ্ঠ প্রস্তুতি নাই। আগে বুঝি নাই কাজে লাগবে, ওড়না কাম চাদরটা তো কিনি নাই'।
তিনি বললেন, 'সুমন্ত আসলামের কাছে অনেকগুলো ওড়না-চাদর আছে। তিনি যে স্টলে বসেন ওখানে পেরেকে অসংখ্য ওড়না-চাদর ঝোলানো থাকে। কিছুক্ষণের জন্য একটা ওড়না নিয়া আসেন। না-দিলে আমার কথা বইলেন'।
আমার দিকভ্রষ্ট রোগ আছে। কোথায় 'ওড়নাখ্যাত সুমন্ত আসলাম' বসেন সেটা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আমি হাল ছেড়ে মানুষটাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'আচ্ছা ভাই, আপনি তো অনেক বিখ্যাত লেখকদের অটোগ্রাফ নিয়েছেন। তো এঁরা অটোগ্রাফে আসলে কি লেখেন? ওখান থেকে ধার করে লিখে দিতাম আর কি'। 
তিনি বললেন, 'সিনিয়র, জুনিয়র বুঝে লেখা হয়। শুরুটা হয় শ্রদ্ধাস্পদেষু, শ্রদ্ধাভাজনেষু, স্নেহপুত্তলি, স্নেহার্শীবাদ ইত্যাদি'।
আমি জপ করতে থাকি, বানান মনে করার চেষ্টা করি। শ্রদ্ধা পদেশু, ভাজ-ভাজনেষু ইয়ে পুত্তলি। কী কষ্ট-কী কষ্ট, জীবন নষ্ট!

এমনিতে আমার মাথায় আসছিল না একজন লেখককে ওড়না দিয়ে বুক ঢাকতে হবে কেন? ওড়নার চল তো এমনিতেই উঠে যাচ্ছে। আজকাল মেয়েরাই ওড়না নামের জিনিসটা পছন্দ করছেন না। শখ করে কেউ পরলেও গলায় পেঁচিয়ে রাখেন বা কেউ একপাশে ফেলে রাখেন, একটা ইয়ে...। হোয়াই একটা? 'ইয়ে বাহোত না-ইনসাফি হ্যায়'!
আরেকজনকে বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, 'ভাই, আপনার নাম কি হ্রস্ব উ-কার নাকি দীর্ঘ উ-কার' দিয়ে?
তিনি ক্ষেপে গিয়ে বললেন, 'কেন, এই নামটা আপনি গুরু রবীন্দ্রনাথেরেওমুক গ্রন্থে পড়েননি'!
আমি কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, 'না, মানে কেউ রহমান লিখে কেউ রাহমান। আর ভাই, গুরুর সব লেখা পড়ব কি, আজপর্যন্ত একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতই লিখতে পারলুম না'!

যাক গে, লেখক মহোদয় মায়াকোভস্তি-দস্তয়ভস্কি-ট্রটস্কি-চমস্কিদের নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, এঁরা এই দেশে আসলে দেশটার চেহারাই পাল্টে যেত।
আমি নিরীহ মুখে বললাম, 'এঁরা সম্ভবত এই দেশে আসতেন না কারণ এখানে বরফ কোথায়? স্কি করার সুযোগ কই'!
তিনি অবাক, 'মানে কী, স্কির প্রসঙ্গ আসছে কেন'!
আমি বললাম, 'না, সবার নামের শেষে স্কি আছে তো তাই আমি ভাবলাম এরা স্কি করতে পছন্দ করেন'।
তিনি চিড়বিড় করে বললেন, 'রসিকতা করবেন না। একদম না। আপনি রসিক লোক না। আর আপনাকে দেখলাম লোকজনের সঙ্গে হা-হা হি-হি করছেন। এইসব করবেন না। একজন লেখকের এইসব মানায় না'।
আমি ম্রিয়মান হয়ে বললাম, 'লোকজন না, এঁরা সবাই আমার বন্ধু। ব্লগিং-এর নামে এঁদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় লেখালেখি করেছি, মন্তব্য চালাচালি করেছি, অনেক বিনিদ্র রাত পার করেছি। সে এক সোনালি সময়! এঁরা আমার জন্য কতটা কাতর আমি জানি না কিন্তু আমি এদেঁর জন্য বড়ো কাতর'।
তিনি বিরক্ত হলেন, 'এইসব ছাতাফাতা বললে তো হইব না। একজন লেখক হতে গেলে রাশভারী ভঙ্গি ধরে রাখবেন। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে পা ফাঁক করে এলোমেলো ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করবেন'।
আমি মন খারাপ করা শ্বাস ফেললাম। হবে না, হবে না আমাকে দিয়ে, লেখক হওয়ার দেখি অনেক হ্যাপা! আফসোস, লেখক হওয়ার বড়ো ইচ্ছা ছিল, হতে পারলাম না। আফসোস...!

*পোস্টের সঙ্গে যে জিনিসটা যুক্ত করা হয়েছে এটা নামেই জলরঙ বাস্তবে জবরজ। চেষ্টাটা করা হয়েছিল এমন, একজন মানুষের মুখ আর একজন গর্ভবতী মহিলা মিলেমিশে থাকবে...।

Tuesday, February 16, 2010

পরাবাস্তববাদ বনাম বাস্তববাদ!


আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যখন দেখি, কোন একজন প্রকাশক জাঁক করে বলছেন, 'এই দেশে ভালো পান্ডুলিপির বড়ো অভাব'।

তখন আমার ইচ্ছা করে পায়ের চটি খুলে একে আচ্ছা করে পিটাই। আফসোস, নিরাপদ দূরত্বে থেকে এই কর্ম সম্পাদনের উপায় এখনও চালু হয়নি। তাই বলে আমার দুর্দান্ত ক্রোধের কী হবে? টিস্যুতে থুথু ফেলে গোল করে বল পাকিয়ে টিভি পর্দায় ছুঁড়ে দেয়া ব্যতীত উপায় কী! ক্রোধ এবং টিভি দুইয়ের-ই একটা গতি হলো।

রফিকুল আলম। মানুষটা একজন ডক্টর। ফাইন আর্টস তাঁর বিষয়, সঙ্গীতেও। মানুষটার প্রতি এটাই আমার মুগ্ধতার কারণ না।
আমি এমন অনেক ডক্টরের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি যাদেরকে আমার ভাষায় বলি, 'পাইপ মানুষ'। এরা পৃথিবীতে এসেছেন একটা পাইপ হয়ে, যার শুরুটা খাদ্য গ্রহন দিয়ে শেষাংশটা খাদ্যের অবশিষ্টাংশ বের করে দেয়ার জন্য। এরা বিশেষ একটা বিষয়ে কোন রকম এই ডিগ্রিটা যোগাড় করেন এরপর আর কোন কাজ নাই। হর্স মাউথ- কেবল বকে যাওয়া, জানার আর প্রয়োজন নাই।

কিন্তু ড. রফিকুল আলম নামের মানুষটার অগাধ পান্ডিত্য, সরলতা, বিনয় আমাকে চমকে দেয়! সবচেয়ে বেশি যেটা আমাকে আকৃষ্ট করে সেটা হচ্ছে তাঁর সততা। এই দেশে এখন সৎ মানুষের বড়ো অভাব। যেটা আমি আমার ভাষায় বলি, "একজন ভালো ম্যানেজার, ভালো শিল্পী, ভালো সাহিত্যিক মানেই একজন ভালো মানুষ না"।

ফাইন আর্টসের উপর তাঁর গবেষণামুলক প্রচুর প্রকাশনা আছে, দেশে বিদেশে। সম্প্রতী তিনি লিখেছেন, আমাদের মত সাধারণদের বোঝার উপযোগী করে অন্য ঘরানার একটা লেখা। সুরিয়ালিজম নামের অসাধারণ একটা লেখা। এটা এবারের বইমেলায় প্রকাশ হয়নি। যে প্রকাশক ছাপাবেন তিনি কলকাতা থেকে ফিরলে হয়তো ছাপা হবে। এখানেই আমার আপত্তি। কেন এটা বইমেলায় যাবে না, কেন?
তাহলে এই বইমেলা কাদের জন্য? কারা কারা লিখছেন, কাদের কাদের বই এখানে বের হচ্ছে, কেমন কেমন করে ছাপা হচ্ছে? এই বইমেলা নামের মেলাটা চলে গেছে কতিপয় নির্লজ্জ, অমর্যাদাসম্পন্ন মানুষের হাতে। এরা কেবল লেখাই ফেরি করেন না, ফেরি করেন এমন ভঙ্গিতে যেটা করতে একজন কমার্শিয়াল সেক্স ভলান্টিয়ারও রাজি হবেন না, আই বেট।

একটা উদাহরণ দেই, প্রথম আলোতে ১৪ ফেব্রুয়ারী ছাপা হয়েছে শাহাদত সোহাগ নামের একজন লেখকের বিজ্ঞাপন। এটায় আবার ঘটা করে লেখা, "পরিবর্তন হোক লেখালেখিতেও।" বটে রে, ইনি লেখালেখিতে পরিবর্তন নিয়ে আসতে চাইছেন।
তো, এই ভদ্দরনোক একই সঙ্গে ৩টি বই প্রসব করেছেন। তা করুন, প্রসব বেদনা তার, আমার কী!
মূল ঘটনায় আসি, বিজ্ঞাপনে লেখা "বই ৩টির দ্বিতীয় মুদণ চলছে।" মুদণ কি জিনিস আমি বুঝি নাই। হয়তো আধুনিক বাংলা! হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন মুদ্রণ। বেশ-বেশ। এই বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে ১৪ তারিখ। মানে ম্যাটারটা বা বিজ্ঞাপনটা দেয়া হয়েছে ১৩ তারিখ। প্রথম আলোর নিয়মানুযায়ী ২দিন পূর্বে বিজ্ঞাপন জমা দিতে হয়। তাহলে ১১ তারিখে জানা গেল, প্রথম মুদ্রণ শ্যাষ। বাহ, কী সোন্দর!
মাত্র ১১ দিনে এই লেখকের ৩টি বইয়েরই প্রথম মুদ্রণ শেষ। বাপু রে, একই সঙ্গে যেমন ৩টা বাচ্চা যেমন প্রসব করা যায় না তেমনি ৩টা বইও শেষ হয়ে যায় না। এইসব লেখকদের জরায়ুর জন্য আমার প্রার্থনা করা ব্যতীত আর কীই বা করার আছে!

ড. রফিকুল আলম যখন আমার বইটা উল্টেপাল্টে দেখছিলেন, নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হচ্ছিল। কেবল মনে হচ্ছিল, কি লিখি আমি, কি অধিকার আছে আমার এইসব ছাইপাশ লেখার?

রফিকুল আলমের সুরিয়ালিজম, এই অসাধারণ ম্যাটারটার জন্য প্রকাশকদের প্রকাশের জন্য যেখানে প্রতিযোগীতা করা প্রয়োজন ছিল সেখানে ব্যাটারা লম্বা লম্বা বাতচিত করেন, দেশে ভালো স্ক্রিপ্ট কুতায়(!)? বটে রে, এই দেশের ক-জন প্রকাশক স্ক্রিপ্ট পড়ে দেখেন? এক প্রকাশক তো বাংলা একাডেমী কোথায় বলে আমাকে প্রচুর ঝামেলায় ফেলে দিয়েছিলেন! আফসোস, এই দেশে সমস্ত সু বা ভালো পরখ করে রায় দেন অপদার্থরা! কতিপয় প্রকাশক নামের আকাটমূর্খ নির্ধারণ করেন কে লেখক, কে লেখক নন।

একজন পাঠক হিসাবে আমি সুরিয়ালিজম বইটা আগ্রহের সঙ্গে পড়তে চাইতাম। কারণ বাংলায় এইসব বিষয় নিয়ে খুব কমই লেখা হয়েছে। সুরিয়ালিজম-এর ব্যাখ্যা দেবেন এই বিষয়ে অগাধ জ্ঞান যাদের, তাঁরা। আমি আমার অল্প জ্ঞানে, মোটাদাগে যেটা বুঝি, "সুরিয়ালিজম হচ্ছে, একটা অদেখা স্বপ্ন। যে স্বপ্ন সবাই দেখতে পায় না, কেউ কেউ দেখে। চট করে এই ছাড়া-ছাড়া স্বপ্নের ব্যাখ্যা চলে না। আপতত দৃষ্টিতে সেই স্বপ্নটা কয়েক মুহূর্তের কিন্তু ব্যাপ্তি রাতভর।"

তাঁর সুরিয়ালিজম বইটা বের হয়নি তাতে কী, আমি সাথে করে পান্ডুলিপিটা নিয়ে এসেছি। চিত্রকলাই বুঝি না তা আবার সুরিয়ালিজম! পড়ে কতটুকু বুঝলাম সেই পান্ডিত্য এখানে ফলাই না কিন্তু ইতিমধ্যে একটা অভাবনীয় কান্ড ঘটে গেছে। যে হাত কখনও তুলি ছুঁয়ে দেখেনি সেই হাতে তুলি উঠে এসেছে। যারা আমার লেখালেখির সঙ্গে পরিচিত তারা
হয়তো জানেন, কাঠপেন্সিলের সঙ্গে আমার খানিকটা সখ্যতা আছে। কাঠপেন্সিল নিয়ে কিছু একটা আঁকার চেষ্টা করি। 'ডুডল' নামের অজান্তেই আঁকাআঁকি নামের কিছু জিনিস চাল করে আমি আমার লেখার মধ্যে ঢুকিয়ে দেই। গালভরা স্কেচ নামের এই জিনিসগুলো অনেকের বিরক্তি উৎপাদন করলেও আমি নির্বিকার থাকি।

কিন্তু তুলির সঙ্গে আমি কখনও খেলার চেষ্টা করিনি কারণ আমি তুলি দিয়ে একটা সোজা লাইনও আঁকতে পারব এই ভাবনাটাই আমার ছিল না। কিন্তু সুরিয়ালিজম বইটা পড়ে, মানুষটার সঙ্গে কথা বলে আমার হাতে কেমন কেমন করে চারকোল, তুলি উঠে এলো আমি জানি না।
এই মানুষটা অসাধারণ এই একটা কাজ করেছেন আমার মতো মানুষের হাতে তুলি তুলে দিয়েছেন। একজন শিল্পী-সাহিত্যিকের কাজই সম্ভবত এটা। তাঁদের স্বপ্নগুলো অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া।

এই মানুষটা আজ খানিকটা অসুস্থ। চলাফেরায় তাঁর বেশ খানিকটা সমস্যা হয়। আমি বিশ্বাস করি, আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি, এই মানুষটা সহসাই নিজের পায়ে দাঁড়াবেন, দৌড়াতে শুরু করবেন। দাঁড়াতে তাঁকে হবেই, তিনি হাল ছেড়ে দিতে চাইলেও দেশমা তাঁকে ছাড়বে না। এই দেশে তাঁর মতো মানুষের খুব প্রয়োজন।
আমাদের দেশে স্বপ্নবাজের যে বড়ো অভাব।

আঁদ্রে ব্রেঁত, সায়মন ব্রেঁত, পল ইলুয়া, পিয়ের নাভিল, হানস আর্প, জোয়ান মিরো- এঁরা থাকুন না এঁদের মত করে, এঁদের ঘাটাচ্ছে কে?
আমার মত অতি সাধারণের চারকোল দিয়ে ঘসাঘসির যে মজা, জল-রঙে একটার পর একটা রঙ মেশাতে যে আনন্দ তা অন্যত্র কোথায়? কে বলেছে, আমার মতো অগাবগা-অ্যামেচারের টোন, টেক্সচার, রিদম, লাইন এই সব ঠিক না থাকলে মাথা কাটা যাবে! রিপিটেশন, ভেরিয়েশন, কন্ট্রাস্ট, ইউনিটি, ব্যালান্স না হলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হবে!
------------------

আগাম সতর্কীকরণ: লেখা শেষ। পরবর্তী অংশে শিল্প বোদ্ধাদের প্রবেশ নিষেধ।

এখানে আমার কিছু অপকর্ম দেব। লেখালেখি বা আমার সমস্ত অপকর্ম আমার কাছে সন্তানতুল্য। কার কার দেবশিশুর মত সন্তান আছে তাতে আমার কী, আমি আমি সন্তান নিয়েই সুখী! আমি তো আমার কালো-কালো, লিকলিকে, দুবলা সন্তানকে ফেলে দিতে পারি না।


নারী (মাধ্যম: চারকোল)




ত্রিভুজ মানুষ (মাধ্যম: জলরঙ)



গতি (মাধ্যম: জলরঙ)




মুখোমখি নারী (মাধ্যম: জলরঙ)





হয়তো মানুষ (মাধ্যম: জলরঙ)





এটা কি আমি নিজেও জানি না! (মাধ্যম: জলরঙ)

Monday, February 15, 2010

আমি ব্লাডি সিভিলিয়ান, এখনই মরতে চাই না

আমাদের বিবাহের প্রায় এক যুগ পার হলো কিন্তু কেমন কেমন করে যেন আমরা দু-জন কখনও একসঙ্গে বইমেলায় যাইনি। এবারের মেলায় যাওয়াটা তাই খানিকটা ব্যতিক্রম ছিল। সঙ্গে আমাদের দু-সন্তান। বাচ্চাগুলো কখনই বইমেলায় যায়নি। এবারই প্রথম। বাচ্চাগুলো প্রচন্ড উত্তেজনায় ছটফট করছে।

শত-শত বার ঢাকা গেছি কিন্তু ঢাকার লোকেশন আমার মনে থাকে না। বাড্ডার আগে ফার্মগেট নাকি ফার্মগেটের আগে বাড্ডা এই নিয়ে তালগোল লেগেই থাকে। কোথাও যাওয়ার হলে, ক্যাব-স্কুটার-রিকশার চালক আমাকে
যখন জিজ্ঞেস করেন, 'কোন দিগ দিয়া যামু'?
আমি রাশভারী গলায় বলি, 'যেই দিক দিয়া সুবিধা হয় হেই দিক দিয়া যান। আমারে জিগাইতাছেন কেন'!
বাহনে উঠে বসে আলাদা গাম্ভীর্য নিয়ে বসে থাকি, ব্যাটা যেন বুঝতে না পারে ঢাকার রাস্তা-ঘাট আমি কিছুই চিনি না। বুঝে ফেললে সর্বনাশ!
(এ এক বিচিত্র কান্ড! রাজশাহী-খুলনার রাস্তা, ওখানকার বিখ্যাত স্থাপনা না-চিনলে কোনো লাজ নাই কিন্তু ঢাকার ভূতের গলির নাম না-শুনলে, না-চিনলে জনে জনে জবাবদিহি করো; ওরি বাবা, ঢাকার এইটা চিনো না!)।

যাই হোক, এবারও যথারীতি স্কুটারে এদের নিয়ে বসে আছি। কাফরুল থেকে যাব শাহবাগ।
রাস্তায় আর্মি নামের দুই হাত, দুই পা-ওয়ালা একজন মানুষ আটকে দিলেন। কঠিন গলা, 'কোথায় যাবেন'?
আমি কিছু বলার আগেই আমার ছেলেটা ঝলমলে মুখে বলে বসল, 'চাচ্চু, আমরা বইমেলায় যাব'।
পাথুরে মুখটা শিশুটির দিকে না তাকিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে বলল, 'এই রাস্তা আপনার জন্য না'।
আমি শান্ত গলায় বললাম, 'দেখুন, স্কুটারওয়ালা আমাকে বলেনি যে এখান দিয়া যাওয়া যাবে না। জানলে, অবশ্যই এদিক দিয়ে আসতাম না। অনেক গাড়িই তো যেতে দিচ্ছেন, আমাদেরকেও যেতে দিন। আমাদের এখন ঘুরপথে যেতে হলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। প্লিজ...'।
পাথুরে মুখে বিন্দুমাত্র চিড় ধরল না, 'উঁহু, সেটা আপনার সমস্যা। জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে যাওয়া যাবে না। এই রাস্তা আপনার জন্য না'।

আমার পরিচিত কিছু মানুষকে ফোন করে এর এই সিদ্ধান্ত বদলাবার চেষ্টা করতে পারতাম কিন্তু আমার ইচ্ছা হলো না। আমি কথা বাড়ালাম না। বলতে পারতাম: আমাদের ট্যাক্সের টাকায় দেশ আপনাদেরকে কেবল যুদ্ধ করার জন্যই লালন-পালন করে না। আর ফাও আমাদেরকে এটা শেখাবার জন্য, এই রাস্তা আমাদের না! আজ এটা বলছেন, কাল বলে বসবেন, এই দেশ আপনাদের জন্য না! আমি ব্লাডি সিভিলিয়ান, অন্তত এটা আপনার কাছ থেকে শিখতে আগ্রহ বোধ করি না। কেন এটা বললাম না বা কেন কথা বাড়ালাম না এটা পরে বলছি।

এই মানুষটা উপরঅলার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। সবই হয়তো ঠিক ছিল কিন্তু এই কথাটা আমার বুকে গিয়ে ধাক্কার মত লাগল। যেন খুব কাছ থেকে গুলি খাওয়ার অভিজ্ঞতা। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে বুক ভেঙ্গে আসছিল, মাথায় আটকে গেল, এই রাস্তা আমার না-এই রাস্তা আমার না...! প্রকারান্তরে মনে হচ্ছে, এই দেশ আমার না-এই দেশ আমার না। এই দেশ আমার না?
স্কুটার অনেক ঘুর পথে এগুচ্ছে। আমার ছেলে বারবার বলছে, 'বাবা-বাবা, অ বাবা, আমরা কেন এই রাস্তা দিয়ে যেতে পারব না'?
আমি আমার সন্তানের চোখাচোখি বাঁচিয়ে স্কুটারের খাঁচার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখি।
আমি আমার সন্তানের চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না, কী তীব্র সেই চোখের দৃষ্টি! কি বলব আমার সন্তানকে? আমি কি এখনই তাকে অন্ধকারের ভাষা শেখাব? নাকি বলব, তোমার বাবা একটা কাপুরুষ!

কোনো সভ্য দেশে শহরের মাঝখানে ক্যান্টেনমেন্ট থাকা সমীচীন কি না এই কুতর্কে আমি যাব না। কেউ শখ করে বা নিজেদের নিরাপত্তার উদ্বেগে ক্যান্টনমেন্ট শহরে জুড়ে রাখতে চাইলে, ১০০ ফুট উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘিরে ফেললেই হয়। বা রাস্তার শুরুতে বিলবোর্ড লাগিয়ে দিলেই হয়, এই রাস্তা ব্লাডি সিভিলিয়ান এবং কুকুরের জন্য নিষিদ্ধ। সমস্যার তো কিছু নাই।
এমনিতেও ঢাকা বসবাস অযোগ্য নগরীতে পরিণত হয়েছে। ঢাকার উপর চাপ কমানো অতি জরুরি। ঢাকায় কেবল ক্যান্টনমেন্ট রেখে সমস্ত ব্লাডি সিভিলিয়ানদের এখান থেকে সরিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে! আমরাও ঢাকায় যাওয়ার যন্ত্রণা থেকে বেঁচে যাই। খোদার কসম,
আমি অন্তত মুত্রত্যাগ করার জন্যও ঢাকামুখি হবো না।

তখন আমি কথা বাড়াইনি ইচ্ছা করেই। কেন বলছি। ধরা যাক কথা কাটাকাটি শুরু হলো। কে জানে এ হয়তো তখন ফট করে বলে বসত: 'এই নীচে নাম। কান ধরে উঠবস কর'।
এই নিয়মটা এদের আছে। স্বামীর হেলমেট না থাকার অপরাধে জনবহুল রাস্তায় স্ত্রীর সামনে স্বামীকে কান ধরে উঠবস করতে বাধ্য করেছে। অথচ এরা নিজেরা স্বামীর কাছে স্ত্রীর মর্যাদা এতটাই উঁচুতে রাখে; একজন সৈনিকের সঙ্গে লেডি থাকলে জেনারেল পর্যন্ত কেয়ার করেন। বাহ, বেশ! নিজেদের লেডির জন্য এক নিয়ম অন্যদের জন্য আরেক রকম!

আজ খানিকটা বুঝি এদের জন্য দেশের লোকজনের এমন তীব্র রোষ কেন। সাধারণ মানুষ কেন এদের নিজেদের কেউ না ভেবে এলিয়েন ভাবে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, এদের ক্রাইসিসে আমার চোখের জলের সঙ্গে রক্ত মিশে ছিল। আহারে-আহারে, এরা তো আমাদেরই ভাই-বন্ধু। আমার বুক ভেঙ্গে আসত যখন দেখতাম ইন্টারনেটে এদের নিয়ে, এদের বিপক্ষে কী উল্লাস। এদের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে গিয়ে অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে আমাকে। কেউ কেউ সামরিক বাহিনীর দালালও বলেছেন আমাকে।
অবশ্য এও বুঝি, নিরামীষভোজী হলেই কাউকে ষাড় গুতাবে না এমনটা আশা করা বোকামী। এদের প্রতি সাধারণ মানুষদের ভালোবাসা-মমতা ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমাতাটাই এদের নাই আসলে।
আফসোস, এদের জন্য কেবলই অনর্থক বেদনা বোধ, কোনো মানে নাই আসলে! আজ বুঝতে পারি, কেন এরা আমাদের কেউ কখনই হতে পারবে না, পারা সম্ভব না। এরা এলিয়েন...।

আমাদের দেশে তো ফলোআপের চল নাই। পরবর্তীতে আমাদের আর জানা হয়নি সেই কান ধরে উঠবস করা স্বামীটির কি হয়েছিল? আচ্ছা, ওই স্বামীটা কী দুর্দান্ত লজ্জায়-অভিমানে আত্মহত্যা করেছিলেন? জানি না আমি। কেবল আমার নিজেরটা জানি, এ আমাকে কান ধরতে বললে আমি কান ধরতাম না। কক্ষণও না, আমার লেখালেখির কসম, আমার বাচ্চার কসম। আমি বলতাম, তারচেয়ে আমাকে মেরে ফেল। কারণ এমনটা না করলে এরপর হয়তো প্রাণে বেঁচে থাকতাম কিন্তু আমার স্ত্রী, সন্তানদের চোখে চোখ রাখতাম কেমন করে? একবার মরার চেয়ে প্রতিদিন মারা যাওয়াটা বড়ো কষ্টের, বড়ো কষ্টের।

আচ্ছা, আমি কান ধরে উঠবস করতে অস্বীকার করলে তখন কি এ সত্যি সত্যি হোলস্টার থেকে রিভলবার বের করে দুম করে আমাকে গুলি করে বসত? রক্তে ভাসতে ভাসতে রাস্তায়
আমি থেতলে যাওয়া কুকুরের মত মরে পড়ে থাকতাম, হাত পা ছড়িয়ে? আমার সন্তানরা আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকত, 'বাবা-বাবা, তোমার গায়ে এতো রক্ত কেন! বলো না, বাবা- বলো না, তোমার গায়ে এতো রক্ত কেন? বাবা-বাবা, অ বাবা...'।
হিজড়া নামের কিছু লোকজন
গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখত। হয়তো মিডিয়ায় লোকজন খুব আগ্রহ নিয়ে আমার মৃতদেহের ছবি উঠাতো। ক্লিক, ক্লিক, ক্লিক। চেষ্টা করত আমার টকটকে রক্তে সূর্যের প্রতিফলনটা আটকে ফেলতে। আমার মতো অখ্যাত একজনের পত্রিকার পাতায় ছবি ছাপা হওয়া, এও কী কম!

আমি আসলে মরতে চাইনি। আমার যে এখনও অনেক কাজ বাকী!
কতশত লেখা মাথায় ঘুরপাক খায়- লিখব লিখব করে আলস্যে আজও লেখা হয়ে উঠেনি। এখনও তো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ লেখাটাই লেখা হয়নি। আমার সন্তানকে বলি, এমন সময়ে দুম করে মরে যাওয়াটা কোনো কাজের কাজ না রে, ব্যাটা...। ব্যাটা, বড়ো হলে বুঝবি, একজন মানুষকে কেন কাপুরুষ হতে হয়...।

অফ-টপিক: মূল পোস্টের সঙ্গে এই ছবির সম্পর্ক খোঁজা বৃথা।









(কী আশ্চর্য! এলিয়েনরা কাঁদেও নাকি!
)

*ছবি পরিচিতি: বাম পাশের ছবি একজন এলিয়েনের, ডান পাশেরটা মানুষের।
**ছবি সূত্র: গুগল

Sunday, February 14, 2010

বইমেলা এবং একজন বোকা-সোকা মানুষ!

গত দুই বইমেলায় যাওয়া হয়নি। কারণ অনেক। বিস্তারিত বলি না।

এমনিতেও বইমেলায় গেলে আমি এক ধরনের অস্থিরতা বোধ করি। ধবধবে পাঞ্জাবীতে কালো কালো ছোপ সহ্য করতে পারি না। আমার পরিচিত অনেক ব্লগার নামের দুর্ধর্ষ লেখকের বই বের হয় না অথচ ছাতাফাতা অনেকে প্রসবযন্ত্রণা সহ্য করে যাচ্ছেন। জন্তুর মত গাদা গাদা বাচ্চা-বই প্রসব করছেন।
এইসব লেখকদের জরায়ুর জন্য আমি গভীর বেদনা অনুভব করি। আহা, বেচারারা, আহা। কী কষ্ট! অবশ্য যেখানে বইমেলা উদ্বাধনটাই একটা অশ্লীলতা সেখানে অন্য কথা বলার খুব একটা অবকাশ কই!

দুই সমকামী বুড়ার বিশেষ কর্মকান্ডের চেয়ে আমার কাছে অশ্লীল মনে হয় লেখকদের কিছু কাজকারবার দেখলে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া দেখলেই এঁরা মুখ দেখাবার জন্য যেমনটা কস্তাকস্তি শুরু করেন, খদ্দের ধরার জন্য একজন কমার্শিয়াল সেক্স ভলন্টিয়ারও এতটা নির্লজ্জ হন না। লেখক মহোদয়গণ চামড়ায় মুড়িয়ে রাখা মল-বাক্সের (মতান্তরে পেট) কাছে যে ভঙ্গিতে নিজের বই ধরে ফটো খিঁচান; দৃশ্যটা দেখে আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি। ইচ্ছা করে গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করি।

ভাগ্যিস, বইগুলো গলায় ঝুলিয়ে ফটোসেশন করা হয় না (অবশ্য হলে মন্দ হতো না) নইলে সন্ত্রাসীরা আপত্তি না করলেও র‌্যাব-ট্যাবরা আপত্তি করত। কারণ সন্ত্রাসীদের তো আবার গলায় ইয়ে ঝুলিয়ে ফটো 'খিঁচাবার' নিয়ম আছে।
আমার নিজের এই হ্যাপা নাই কারণ আমি নিজেকে তো লেখক বলেই স্বীকার করি না। 'লেখার রাজমিস্ত্রী' হয়ে আছি, এই বেশ। লেখক হতে গিয়ে দিগম্বর হয়ে যাওয়া কোন কাজের কাজ না। বিশেষ মুহূর্ত ব্যতীত নগ্ন হওয়াটা ভালো দেখায় না, বুঝলেন।

এবারের মেলায় না-গিয়ে উপায় ছিল না। অজ্ঞাত একজন আমার কাছে গিফট ভাউচার পাঠিয়েছেন, আমার জন্য। শর্ত একটাই, মেলায় ঘুরে-ঘুরে আমি যেন বই কিনি, নিজের জন্য। কেবল বই-ই কেনার জন্য এই টাকাটা বিপুল!
কিন্তু এই টাকায় এক ঠোঙা বাদামও কেনা যাবে না, মহা মুসিবত তো। এইটা আবার কোন দেশের আইন, বাহে!

আমার এমন একটা সময়ে এটা নেয়াটা আমার জন্য ভারী বিব্রতকর। ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না—এই সময়ে টাকা-পয়সার আমার খুব টানাটানি। কিন্তু এই ভালবাসা নিতে চাই না-বলে খুব একটা সুবিধা করতে পারলাম না। আমি যুক্তির পিঠে যুক্তি চালাচালি করতে পারি না তার উপর কঠিন সব আবেগীয় যুক্তি। ভালবাসার দাবী- হার না মেনে, না নিয়ে উপায় কী!

আরেকটা কঠিন শর্ত, মানুষটার নাম আমি জানতে চাইতে পারব না। হাহাহা, পর্দার আড়ালে থাকা এই মানুষটার পরিচয় বের করা আমার পক্ষে অসম্ভব না। কারণ এই গ্রহে আমাকে পছন্দ করে এমন মানুষের সংখ্যা খুব অল্প। খানিকটা আঁক কষলেই এই ছোট্ট বৃত্তটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসবে। তখন এই মানুষটাকে অনায়াসে চেনা যাবে।
কিন্তু আমার ইচ্ছা করছে না। থাকুন না বোকা-সোকা মানুষটা তাঁর বোকামী নিয়ে, তাঁর মত করে। অহেতুক আমাদের এই চালাক পৃথিবীতে তাঁকে এনে লাভ কী, আর কেনই বা বোকা-সোকা মুখটা ধূর্ততার চোখে দেখার চেষ্টা করা!

আহারে, এমন বোকাদের সঙ্গে থেকে থেকে এমন খানিকটা বোকামি যদি খানিকটা শিখতে পারতাম! 
WhatsApp