Wednesday, September 2, 2009

আমার আনন্দ বেদনার অপকিচ্ছা

আমার শৈশব এতো বেশী তুচ্ছ যেটা কহতব্য- বলার মত না! অনেকের দেখি শৈশবের বাল্যবন্ধুদের মধ্যে কেউ সচীবের ছেলে তো কেউ মন্ত্রীর পুলা। আমার শৈশবের বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল ধোপার ছেলে, একজন মুচির।
কী মাখামাখি, কী সব সোনালী দিন!

মুচির ছেলে 'গাদুরার' ছিল ডাং-গুলিতে দুর্দান্ত হাত এড়ি, দুড়ি, তেলকা...। গাদুরার কাছে প্রায়শ না, অবধারিত ছিল আমার হার। খেলার নিয়ম অনুযায়ী 'এক লালে' কেনা যেত আস্ত একটা গুদাম, 'দুই লালে' নদী। গাদুরা বদটা কিভাবে কিভাবে যেন গুদাম-টুদাম, খাল-বিল, তিতাস নদী সব কিনে ফেলত। ফলাফল, ... লইয়া যা- আমার পিঠে দুমদুম করে কিল। ইস, বদের হাড্ডি শুয়োরটা কী জোরেই না মারত!

অনেক পরে, একদিন, আমি গাদুরা বদমাইশটাকে মারতে গিয়েছিলাম। ব্যাটা ফাজিলের ফাজিল, আমাকে তুই না-বলে, আপনি-আপনি করে বলার চেষ্টা করছিল! আমি তাকে হিমশীতল গলায় বলেছিলাম, 'তুই আমাকে আপনি বলে গালি দিচ্ছিস কেন'?
নিমিষেই তার চোখের পানিতে আটকে গেল গোটা সূর্যটা, যেন চোখের পাতা ফেললেই হারিয়ে যাবে আস্ত সুর্যটা! গাদুরাটা শেষ পর্যন্ত পচাই খেতে খেতে মরেই গেল। আমার শৈশবের একটা স্তম্ভ হারিয়ে গেল!

অনেকেই বালকবেলায় কী অবলীলায়ই না পড়ে ফেলেন মম, হার্ডি, মায়াকোভস্কি। আমার তো আর সে সুযোগ ছিল না, যা পেতাম তাই পড়তাম। দস্যু বনহুর, কুয়াশা, কোনো একটা অনুবাদ পেলে তাই সই। আমার পরিবারের ধারণা ছিল, এইসব 'আউট বই' পড়ে-পড়ে ক্রমশ আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, কঠিন নিষেধাজ্ঞা জারী হলো, এইসব পড়া যাবে না। এ তো দেখি মহা যন্ত্রণা হলো! বই পড়তে না-পরলে আমি যে মরে যাব।

আমার বাসার পাশেই একজন রাখাল থাকতেন। আমার সিনিয়র বন্ধু। তাঁর নাম আজ ভুলে গেছি, মনে থাকা উচিৎ ছিল। তাঁর নামটা মনে না-থাকার কারণে নিজেকে চাবকাতে ইচ্ছা করছে-নিজের প্রতি জুতা ছুঁড়ে মারতে পারলে খানিক আরাম পেতাম।
তো, আমি স্কুলের নাম করে বই খাতা নিয়ে বের হতাম, সঙ্গে যথারীতি দু-চারটা আউট বই, সোজা গোয়াল ঘরে। সেই সদাশয় রাখাল বন্ধু, তিনি ভেতরে আমাকে রেখে, গোয়াল ঘরের তালা বন্ধ করে গরু চড়াতে বেরিয়ে যেতেন। আমি আরাম করে, মহা আনন্দে আউট বই গোগ্রাসে গিলতাম। বিকালে এসে তিনি তালা খুলে দিলে, আমি স্কুলের বই খাতা নিয়ে সোজা বাসায়।

স্কুল থেকে পুত্রধন বিদ্যার জাহাজ হয়ে এসেছে, মা’র সে কি আপ্যায়ন! এটা খা, ওটা খা বলে মাথা নষ্ট করে দিতেন। আমি হাসি গোপন করতাম। ভাগ্যিস, মমতায় অন্ধ মা এই হাসি দেখতে পেতেন না!
এর পরিণাম হয়েছিল এমন, এসএসসিতে (আমরা বলতাম মেট্রিক) আমার সায়েন্স ছিল। ইন্টামিডিয়েটে দেখলাম সায়েন্স নিলে নিয়মিত ক্লাশ না-করে উপায় নেই। তো, নিলাম, কমার্স। গ্রাজুয়েশন করার সময় আরেক যন্ত্রণা কমর্সের ক্লাশও নিয়মিত না-করে উপায় নেই। কী আর করা, নিলাম, আর্টস। টেনেটুনে গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর বছরখানেক আইন নিয়ে পড়লাম। ধুর, ভাল লাগল না...। 

আর হাই-স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে আমার একটা ঘটনা দাগ কেটে আছে। বন্ধুদের মধ্যে একজন, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল প্রদীপ। ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর দেখা-সাক্ষাৎ কঠিন হয়ে পড়ল। পুজার ছুটিতে আসলে দেখা হয়, আনন্দ-মাস্তি হয়। একবার ও পুজার ছুটিতে আসল না। বিষয় কী!
বিষয় শুনে তো আমার মাথায় হাত। কি যেন একটা হাতে-কলমের কাজ আছে, ওটা বাদ দিয়ে চলে আসলে আধা নাম্বার কাটা যাবে। আমি হাসতে হাসতে শেষ- মাত্র আধা নাম্বার, বলে কী! আমি তো কত-কত নাম্বার অবলীলায় ছেড়ে দেই।
ফল যা হওয়ার কাই হলো! আমি ভুল না-করে থাকলে ও সম্ভবত ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট হয়ে তাক লাগিয়ে দিল, সিনেমা-টিনেমায় আমরা যে-রকম দেখি আর কী!   

যাই হোক, যখন কলেজে পড়ি তখন মাহবুব ভাই নামের এক অসাধারণ মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি বয়সে আমার অনেক বড়ো ছিলেন, আমার যে বছর জন্ম সেই বছর তিনি চাকরিতে জয়েন করেন! আমার জীবনে যতো সব সু বা ভালো কিছু আছে, কোন না কোন ভাবে তাঁর স্নেহের হাত আছে। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আসলে কি, পিতা পুত্রের, ভাইয়ের, বন্ধুত্বের? আমি কনফিউজ, বিভ্রান্ত এখনও! এমনিতে অবলীলায় তাঁর সঙ্গে যা-তা রসিকতা করি, ধুমসে সিগারেট খাই।

তো, তিনি আমার এই পড়ার অদম্য আগ্রহ দেখে কানের কাছে অনবরত মন্ত্রের মতো জপে যেতেন, আপনি এতো বই পড়েন, কিছু লেখেন না কেন। তিনি নিজে বই ছুঁয়ে দেখতেন না বলেই হয়তো তাঁর বদ্ধমূল ধারণা জন্মে গিয়েছিল পড়লেই বুঝি লেখা যায়। এহ, বললেই হলো আর কি!

এক সময় তাঁর যন্ত্রণায় লেখা শুরু করলাম। গাধার মতো লিখে ফেললাম আস্ত এক উপন্যাসসম লেখা। টানা রুল করা কাগজের বাইন্ডিং খাতায় অসংখ্য ভুলভাল শব্দ-বাক্যে ভরা! লিখে তো ফেললাম, সো হোয়াট নেক্সট। এখন এই আবর্জনা নিয়ে কি করি! নিজের লেখা, ফেলে তো আর দিতে পারি না। হোক আবর্জনা, নিজের লেখার প্রতি আছে আমার সন্তানসম মমতা!
আমার আনন্দ-বেদনার অপকিচ্ছা: ২

No comments: