Friday, June 29, 2007

‘কয়েদি’ থেকে অংশবিশেষ

"কাঁটায় কাঁটায় বারোটা।
থাই এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী বিমান যথাসময়ে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করল।

যাত্রীদের মধ্যে একজন রিউনোসুকে আকুতাগাওয়া, জাপানী ব্যবসায়ী। লম্বা জার্নি ওঁকে অনেকখানি কাবু করে ফেলেছে। প্রচন্ড মাথা ব্যথা হচ্ছে। থেকে থেকে গা কেমন গুলাচ্ছে। হোটেলের বরফ-ঠান্ডা বাথটাবের পানিতে গা ডুবিয়ে চিল্ড বিয়ারে চুমুক দিতেই অবসাদ অনেকখানি কেটে যাবে এটা ভাবতেই শরীরে ঝিরঝিরে একটা স্বস্তির একটা পরশ বয়ে গেল।

ঘোষণা দেয়ার মতো কিছু নেই বলেই গ্রিনচ্যানেল দিয়ে গুটিগুটি পায়ে পেরিয়ে আসতেই পেটমোটা একজন কাষ্টমস অফিসার হড়বড় করে ইংরাজীতে কি সব বলতে লাগল। আকুতাগাওয়া ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে বিনীত ভাবে বললেন, ‘মাফ করবে, তোমার কথা বুঝতে পারছি না, দয়া করে একটু বুঝিয়ে বলবে?’
কাষ্টমস অফিসার ঝড়ের গতিতে একগাদা কথা বললেন, আকুতাগাওয়া এবারও বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারলেন না। ভারী লজ্জিত হয়ে বিনয়ে গলে গিয়ে বললেন, 'মার্জনা করো, আমার ইংরাজী জ্ঞান খুব সীমিত তবে শব্দগুলো আলাদা-আলাদাভাবে বললে আমি বুঝতে পারব।'
কাষ্টমস অফিসার এবার থেমে থেমে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘আয়্যাম নট আ ব্লাডি টিচার, ইউ নো, কাষ্টমস অফিসার আয়্যাম।’

আকুতাগাওয়া হকচকিয়ে গেলেন। এমনিতেই ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়েতে চাইছে, এই ভদ্রলোক এমন অভব্য আচরণ করছেন কেন? অলক্ষ্যে গালে হাত বুলালেন তার কি দাড়ি বড়, তাকে কি ড্রাগ স্মাগলারদের মতো দেখাচ্ছে।

আকুতাগাওয়া নিচুস্বরে বললেন, ‘আমি বড় ক্লান্ত, কি জানতে চাইছ দয়া করে বলো?’
‘তুমি যে বড় গটগট করে গ্রিন চ্যানেল পেরিয়ে এলে!’
আকুতাগাওয়া গটগট শব্দটার মানে বুঝতে পারলেন না তবে মূল বক্তব্য বোধগম্য হল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, ‘কেন চ্যানেল ব্যবহার করা নিষেধ নাকি, অফিসার?’

‘অবশ্যই নিষেধ, যদি তুমি ঘোষণা না দিয়ে এবং যথার্থ ট্যাক্স না দিয়ে কোন দ্রব্য নিয়ে আসো,’ কাষ্টমস অফিসারের গলা একধাপ চড়ে গেল।
আকুতাগাওয়া এতক্ষণে হাসলেন, ‘তেমন কিছুই আমার কাছে নেই।’
কাস্টমস অফিসারের কথা এবার হুমকির মতো শোনাল, ‘বেশ, সেটা দেখা যাবে। তোমার সঙ্গের জিনিসপত্র আমি দেখব।’
‘অবশ্যই, আনন্দের সঙ্গে।’
কাস্টমস অফিসার আকুতাগাওয়ার নামিয়ে রাখা একটি মাত্র হাত ব্যাগ দু-মিনিটেই তছনছ করে রাগী গলায় বললেন, ‘তোমার আর লাগেজ কোথায়?’
‘এই-ই।’
‘এই-ই’, কাস্টমস অফিসার গভীর সন্দেহ পোষণ করলেন!
‘বিশ্বাস না হলে দয়া করে খোঁজ নিয়ে দেখো।’

এতক্ষণে কাস্টমস অফিসারের মুখের কঠিন রেখাগুলো নরোম হয়ে এল। একদৃষ্টে পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে আছেন। আসলে অন্য কিছু দেখছেন না ঠোঁট না নাড়িয়ে নাম মুখস্ত করছেন। কী কঠিন নাম রে বাবা!
‘সো, আকুতাগাওয়া, এ দেশে আগমনের উদ্দেশ্য কি?’
আকুতাগাওয়া এবার অসহ্য রাগে ফেটে পড়লেন, ‘লিসেন অফিসার, তুমি ভব্যতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছ এ দেশে কেন এসেছি এটা তোমার কাছে বলতে আমি বাধ্য নই। উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে যথার্থ কাগজপত্র ভিসা নিয়ে আমি এসেছি। ভাল কথা, আবার যখন আমার নাম ধরে সম্বোধন করবে তখন নামের পূর্বে জনাব যোগ করবে। আমাদের দেশে তো আমরা যে কাউকে যা-তা লোককেও জনাব ছাড়া সম্বোধন করার কথা ভাবতেই পারি না।’

হইচই-এ লোক জমে গেল। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নম্রভঙ্গিতে বললেন, ‘সার, দয়া করে বলো সমস্যাটা কি?’
আকুতাগাওয়া আদ্যোপান্ত সব খুলে বললেন, ওই ভদ্রলোক গভীর মনোযোগ নিয়ে শুনলেন, শুনতে শুনতে ওঁর চোখ মুখ কেমন শক্ত হয়ে গেল।

যে কাস্টমস অফিসারের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল তাকে পরিস্কার ইংরাজিতে বললেন, ‘তুমি যখন গায়ের এই পোষাকটা পরে এখানে দাঁড়াও তখন একটা দেশ, গোটা জাতির প্রতিনিধিত্ব করো। বাইরের গেষ্টদের সামনে তোমার একটা অসভ্য আচরণে তোমার পোশাক গায়ে থাকে ঠিকই কিন্তু আমরা তেরো কোটি মানুষ নগ্ন হয়ে পড়ি। তোমার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল পদক্ষেপ অবশ্যই নেয়া হবে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব তোমার যেন কঠিন শাস্তি হয়,’ এবার আকুতাগাওয়ার দিকে ফিরে বললেন, ‘সার, সব কিছুর জন্য আমি ওর হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করি প্লিজ সার, প্লিজ।’

আকুতাগাওয়া এই বাঙালী কর্মকর্তার আচরণে অভিভূত হয়ে পড়লেন। সামনে অনেকখানি মাথা ঝুকিয়ে সশ্রদ্ধ বো করলেন।

কাস্টমস ব্যারিয়ারের বাইরে জটলার মধ্যে একজন বাঙালীকে দেখে হাত নাড়লেন। ইংরাজি ক্যাপিটাল লেটারে বড় বড় করে তার নাম লেখা প্লাকার্ড উঁচিয়ে রেখেছে। আকুতাগাওয়া লম্বা-লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেলেন।
তিনি লোকটার দিকে সহাস্যে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘আমি কি জনাব আহমেদের সঙ্গে কথা বলছি?’

পরিচিতি এবং সৌজন্য বিনিময় চলাকালে তিনি খানিকটা অস্বস্তি বোধ করছিলেন আহমেদ ভদ্রলোকের ভাবভঙ্গি কেমন যেন একটু অন্যরকম। কেমন ভীত সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে।

কোথায় যেন ভারি একটা অসঙ্গতি আছে। এমন তো হওয়ার কথা না, তিনি মূলত বাংলাদেশে এসেছেন কাপড় কেনার জন, দু-একটা কাপড় না লক্ষ লক্ষ কাপড়। চলতি ভাষায় তিনি একজন বায়ার। জামিল আহদের জোর আমন্ত্রণে এই দেশে এসেছেন।
জামিল আহমেদের ঢাউস কটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো কাপড়ের নমুনা দেখে তিনি চমত্কৃত- এমন কাপড় এই দেশে তৈরী হয় বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। স্বচক্ষে দেখাই আসার মূল উদ্দেশ্য। তিনি যথাসম্ভব প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন কথাবার্তা চুড়ান্ত হলে এগ্রিমেন্ট সই করে ফিরে যাবেন।

কিন্তু সমস্যটা কী! আসার পূর্বে যথারীতি ফ্যাক্স চালাচালি হয়েছে। কোথায় উঠবেন তাও ঠিক করা হয়েছে। জামিল আহমেদ চাচ্ছিলেন সোনারগাঁয়ে রিজার্ভেশন করার জন্য। এই পাঁচতারা হোটেলটার ব্যাপারে আকুতাগাওয়ার প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। ক-দিন আগে হোটেলের লোকজনরা নিজেরাই ভাংচুর করেছে। এই হোটেল তাকে কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারবে এতে ঘোর সন্দেহ আছে। যদিও এ হোটেলে ওঁর দেশের স্বার্থ আছে তবু যে কান্ড কদিন আগে হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আই টি টির শেরাটনকে বেছে নেয়া হল।


আকুতাগাওয়া লজ্জিত হয়ে বললেন, ‘কিছু মনে করো না বড় ক্লান্ত লাগছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হোটেলে যেতে চাচ্ছি।’
কথাটা বলেই তিনি ভারি কুন্ঠিত হলেন। ভদ্রলোক আহমেদ এমন হাঁ করে তাকিয়ে আছে কেন- তিনি কী কোনো বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন? তার আচরণে কী কোনো অসৌজন্য আচরণ প্রকাশ পেয়েছে? নাকি এই ভদ্রলোক তার ভাঙা ভাঙা ইংরাজি বুঝতে পারছেন না। অবশ্য তিনি প্রথমেই বলে রেখেছিলেন তাঁর ইংরাজি বুঝতে খানিকটা জটিলতা দেখা দিতে পারে, পাশাপাশি এ অনুরোধও করেছিলেন দ্রুত কথা না বলার জন্য। এই কথাটাই গুছিয়ে আবারও বললেন।

জামিল আহমেদ ইতস্তত করে বললেন, ‘ইয়ে, ব্যাপারটা হলো গিয়ে তোমার-।’
‘তুমি প্লিজ আমার নাম ধরে বলো বন্ধুরা আমাকে আকু বলে, প্লিজ আহমেদ। আর তোমার নামটা কি আমি ঠিকভাবে বলতে পারছি?’
জামিল আহমেদের মধ্যে এতক্ষণে সহজভাব ফিরে এসেছে। ‘ধন্যবাদ আকু, ভালই বলেছ। বিদেশিরা আমাদের নাম সঠিকভাবে বলে না সম্ভবত ইচ্ছা করেই।’

আকুতাগাওয়া লাজুক হাসলেন, তার ঝুলিতে আরও কটা চমক আছে। জাপানে জামিল আহমেদের যেসব ফ্যাক্স পেতেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন, নাম-ধাম, এমন কি ফ্যাক্টরী ম্যানেজারের নাম পর্যন্ত। যে দেশের সঙ্গে ব্যবসা করবেন সে দেশ, মানুষ, এদের সম্বদ্ধে না জানলে চলবে কেন?
‘তোমাকেও ধন্যবাদ আহমেদ, আকু উচ্চারণটাও তোমার চমত্কার হয়েছে।’

জামিল আহমেদের নাম ভুলে যাওয়ার সমস্যা আছে কিন্তু এ নাম ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চুলের পেছনে ঝুঁটি বাধে এমন একজনের নাম প্রায়শ খবরের কাগজে চোখে পরে অবশ্য ওই লোকের নাম আকু না আক্কু। একটা বাড়তি ক আছে।
‘ওয়েল, আহমেদ, চলো যাওয়া যাক।’
জামিল আহমেদ অসম্ভব বিব্রত গলায় বললেন, ‘আকু, একটা সমস্যা হয়ে গেছে, বিরাট সমস্যা। আমাদের দেশে এখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে, অনির্দিষ্টকালের জন্য।’
আকুতাগাওয়া নির্বিকারভঙ্গিতে কাধ ঝাঁকালেন, ‘এত টেনস হচ্ছ কেন! ব্যাপারটা কি একটু বুঝিয়ে বলো তো।’
'সমগ্রদেশে সমস্ত ধরনের কাজকর্ম বন্ধ কিছুই চলবে না। তুমি নিশ্চই লক্ষ করোনি টার্মিনাল ফাঁকা একটা গাড়িও নেই।'
আকুতাগাওয়ার মুখ ঝুলে পড়ল, ‘তুমি এসব কী প্রলাপ বকছ। সব কিছু বন্ধ?’
জামিল আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘হ্যাঁ, কেবল মাত্র আকাশ পথ খোলা আছে; এটা খোলা থাকা না-থাকা সমান। কারণ আকাশপথ ব্যবহার করতে হলে রাজপথ ব্যবহার করতে হবে।'
‘হোটেল এখান থেকে কত দূর?’
‘হেঁটে-হেঁটে গেলে বহু দূর।’
‘আশে-পাশে কোনো হোটেল নেই,’ আকুতাগাওয়ার মুখ ক্রমশ অন্ধকার হচ্ছে।
‘দুঃখিত, আমি খোঁজ নিয়ে এসেছি, গেষ্ট উপচে পড়ছে, কোনো সম্ভাবনাই নেই।’
‘তোমার গাড়ি থাকলে ফোন করিয়ে আনিয়ে নাও।’
‘আকু, পরিস্থিতি বুঝতে পারছ না, কোন অবস্থাতেই গাড়ি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না, অলৌকিক কোন উপায়ে যদি পৌঁছেও আমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারব না। গাড়ি ভেঙেচুরে আগুন তো ধরাবেই আমাদেরকেও প্রাণে মেরে ফেলবে।’

আকুতাগাওয়ার থমথমে মুখ। এবার ক্ষুব্ধ গলায় বললেন, ‘এবার তুমি বলো কোন বুদ্ধিতে এমন নরকে আমাকে আসতে বললে। বলো, চুপ করে থেকো না।’
জামিল আহমেদ ম্লান গলায় বললেন, ‘আমার বক্তব্য শুনে যা ইচ্ছা তা বলো। তোমাকে আমি যখন আসতে ফ্যাক্স করেছিলাম তখন অবস্থা এমন ছিল না। সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে মনে করা হচ্ছিল। যখন নিশ্চিত হলাম অসংখ্যবার তোমাকে ফ্যা করার চেষ্টা করেছি, ফোন করেছি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। অবশেষে তোমার এমব্যাসীকে অনুরোধ করেছি তোমার আসা পিছিয়ে দেয়ার জন্য। আমার দুর্ভাগ্য কোনভাবেই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি।’

আকুতাগাওয়ার চুল ছিড়তে ইচ্ছা করছে। এই কদিন ছুটি কাটাতে গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। ওখানে মাত্র দুদিন ছিলেন, কী শখ চাপল, ফুজি মাউন্টেন দেখতে চলে গেলেন। এরপর ডমেষ্টিক ফ্লাইট ধরে নারিতা, নারিতা থেকে সরাসরি এখানে। ভারি লজ্জিত হলেন, ছি-ছি, কী লজ্জা-কী লজ্জা!
লজ্জিত দু-হাতে জামিল আহমেদকে ধরে বললেন, ‘তোমার প্রিয় মানুষের দোহাই আমাকে ক্ষমা করো, ভুলটা আমারই। তুমি এলে কিভাবে?’
‘হেঁটে-হেঁটে কিছুদুর তারপর রিকশায়,’ জামিল আহমেদ ভাবছিলেন অসহযোগ আন্দোলনে রিকশাকে এবার ছাড় দেয়া হয়েছে এটাই ভরসা। যে রিকশা নিয়ে এয়ারপোর্ট এসেছিলেন মোটা টাকার লোভ দেখিয়েও ওই লোককে রাখা সম্ভব হয়নি।

আকুতাগাওয়া এখন বুঝতে পারছেন কেন বোয়িংটা ছিল ফাঁকা-ফাঁকা। হাত-পা ছড়িয়ে শুতে ইচ্ছা করছিল বলে এয়ার হোস্টেসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আসন পরিবর্তন করা যাবে কিনা? এয়ার হোস্টেস মুচকি হেসে বলেছিলঃ যেখানে তোমার পছন্দ হয়, ভাল করে বিশ্রাম নাও আমি নিশ্চিত আগামী সময়টা তোমার জন্য হবে কষ্টকর।

প্রচন্ড মাথাব্যথা হচ্ছিল বলে কথা বাড়াননি। নয়তো তখই জেনে যেতেন, অবশ্য আগাম জেনেও অবস্থার খুব একটা হেরফের হত না।

জামিল আহমেদ ছুটাছুটি করায় গা থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে। কিচ্ছু নেই, একটা রিকশাও না! রাস্তার পাশে ঠেলাগাড়ি জাতীয় একটা ভ্যানে গাছের ছায়ায় একজন মহা আরামে ঘুমাচ্ছে।

জামিল আহমেদ নিচু গলায় ডাকলেন, ‘এই-এই।’
কাজ হচ্ছে না দেখে গা ধরে ঝাঁকুনি দিলেন। লোকটা ধড়মড় করে উঠে বসল। ট্রাফিক পুলিশ না দেখে বিকট হাই তুলে উপুড় হল।

জামিল আহমেদ নাছোড়বান্দার মতো বললেন, ‘এই-এই।’
‘এই-এই, হেই মিয়া বিষয়ডা কী।
‘যাবে?’
‘জ্বে না, এইবার যান গিয়া ঘুমাইতে দেন।'
‘চলো না, ভাল টাকা পাবে।’
লোকটা এবার উঠে বসল, কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘এই মিয়া হুনেন নাই, একবার যে কইলাম যামু না আবার টেকার গরম দেখায়। আপনার টেকায় আমি হাগি।’

জামিল আহমেদ হতভম্ব। দেশের অস্থির-অসুস্থ পরিবেশ সবাইকে কেমন বদলে দিচ্ছে। মাথা গরম করলে হবে না। মুহুর্তে ভোল পাল্টে ফেললেন, ‘ভাই, সঙ্গে বিদেশি মেহমান আছে, বিপদে পড়েছি, একটু কষ্ট করে পৌছে দাও না।’
‘কোন জায়গায় যাইবেন?’
হোটেলের নাম বললে চিনতে পারল না, লোকেশন বলা মাত্রই হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিল, ‘হ-হ চিনছি, ওই বড় বড় ঢুলাওয়ালা হঢলডা তো। তয় হেইডা তো বিআইবি রোড যাইতে দিব না।’
জামিল আহমেদ চকচকে চোখে বললেন, ‘আচ্ছা সে দেখা যাবে।’
‘ওরি আল্লা, ম্যালা দূর পাঁচশো টেকা লাগব। দরদাম নাই। এইডা মাছ বাজার না।’
জামিল আহমেদ থ মেরে গেলেন। এ বলে কী, পাঁচশো টাকা!

সমস্যা দেখা দিল বসা নিয়ে। আকুতাগাওয়া উবু হয়ে বসেছিল বলে কেমন হাস্যকর দেখাচ্ছিল। জামিল আহমেদ দেখিয়ে দিলেন পা ঝুলিয়ে কেমন করে ভ্যানে বসতে হয়।
‘সরি, আকু, তোমার কষ্ট হচ্ছে, রিকশা পেলে আরাম করে বসতে পারতে। ও দুঃখিত, তুমি তো আর আমাদের রিকশা দেখো নি।
‘দেখি নি তবে এ সম্বন্ধে পত্রপত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছিল প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল। আমাদের জাপানে ১৯৯৪ সালে ‘ফুফুওকা’ শহরে Rickshaw Painting- Traffic Art in Bangladesh আর্ট শো হওয়ার কথা ছিল।

ঠেলাওয়ালা ঝড়ের গতিতে দৌড়াতে দৌড়াতে গলা ছেড়ে গান ধরেছে। জামিল সাহেবের গা কাঁপছে, রাগ হচ্ছে, ভয়াবহ রাগ। রাগ সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যত বদ দেখেছেন এদের মধ্যে এই ঠেলাওয়ালা হারামজাদা হচ্ছে বদের হাড্ডি। হারামজাদা ওদের নিয়ে রসিকতা করছে।
ঘুরে ফিরে একটাই গান গাইছে ‘ফান্দে পরিয়া বগা কান্দে রে-এ-এ।’

রাস্তায় যে দু-চারজনকে দেখা যাচ্ছে এরা দাঁত বের করে হাসছে। জামিল আহমেদ মনে মনে বললেন, ‘ধরণী ····’ ।

আকুতাগাওয়া আনন্দিত। গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছেন। এক পর্যায়ে বললেন, ‘আহমেদ, ভাষা না বুঝলেও ওর গান শুনে আমি মুগ্ধ, তুমি কি গানের কথাগুলো ইংরেজীতে অনুবাদ করতে পারো?’ জামিল আহমদে উদাস হলে বললেন, ‘এই আকাশ বাতাস দেখে আমাদের ড্রাইভার সাহেবের মাথা আউলা-ঝাউলা হয়ে গেছে। এরই বর্ণনা এ গানের মূল ভাবার্থ। আমি সম্ভবত তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারলাম না। আসলে অনুবাদ কাজটা খুব জটিল কিনা।’

আকুতাগাওয়া খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, ‘আহমেদ, প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ব্যাপারটা তোমাদের নেহায়েত ব্যক্তিগত তাই তোমার ইচ্ছা না করলে এই উত্তর দিয়ো না। এই যে তোমরা দেশ অচল করে দিচ্ছ, এটা কেন?’
‘সরকার দেশ ঠিকভাবে চালাতে পারছে না এই বিষয়ে বিরোধীদলের প্রবল আপত্তি আছে, এর ফলাফল এই।’
‘দেখো, হুজ রাইট হুজ রং আ ডোন্ট নো, আমার ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে কোনও মন্তব্যও করতে চাচ্ছি না। কিন্তু এভাবে গোটা দেশ অচল থাকলে ক-বছরের জন্য পিছিয়ে যাচ্ছ সেটা নিশ্চয়ই জানো? জাপানের চেয়েও ধনী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ লুক্সেমবার্গ যাদের মাথাপিছু আয় প্রায় চল্লিশ হাজার ডলার, ওরাও তো এভাবে একদিনের জন্যও দেশ অচল করে দেয়ার কথা কল্পনাও করবে না। তেমাদের মাথাপিছু আয় কত এখন?’
জামিল আহমেদ ক্ষীণ গলায় বললেন ‘আমি ঠিক জানি না। কিন্তু এক পর্যায়ে হরতাল না করে উপায় থাকে না। ক্ষমতাবান কেউ যখন কোন কথাই শুনবে না তখন তো জনগণের শেষ অস্ত্র হরতাল।’
‘প্লিজ আহমেদ, দয়া করে ভুল তথ্য দেবে না। আজই প্রথম এ দেশে হরতাল হচ্ছে না, পূর্বেও বহুবার হয়েছে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে। আমাদের পত্র-পত্রিকায়ও কিছু লেখালেখি হয়েছে। তুমি বললে জনগনের ইচ্ছায় এ হরতাল, এই দেশের বেশিরভাগ জনগণ কি এটা চাচ্ছে? তোমরা মাঝে মধ্যে সমীক্ষা করো হরতালের পক্ষে-বিপক্ষে । সেখানে তো হরতালের বিপক্ষের পাল্লাই ভারী। আর যে-সব সমীক্ষা করা হয় এদের মধ্যে কারা থাকে? একজন কৃষক, একজন মজুর, নিম্ন আয়ের এইসব মানুষ কি চাচ্ছে হরতাল হোক? এরাই তো এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ, নাকি ভুল বললাম? আহমেদ তুমিই কি চাও?
জামিল আহমেদ মুখ নিচু করে বললেন, ‘না।’

‘আহমেদ একটা অন্যায় হলে প্রতিবাদ হবে অবশ্যই কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা কি এই-ই! একটা ক্রাইমকে থামানোর জন্য ক্ষমার অযোগ্য আরেকটা ক্রাইম করা কি সমর্থনযোগ্য? যখন খুশি, যে- কারোর একটা মুখের কথায় কোটি-কোটি শ্রম ঘন্টা নষ্ট করবে আমরা এটা স্বপ্নেও ভাবি না। সাম্প্রতিক একটা ঘটনা তুমি নিশ্চয়ই পড়েছ, ফ্রান্সে পরমাণু বিরোধী কর্মীরা পরমাণু চুল্লি সুপার ফিনিক্স বন্ধের দাবিতে চুল্লিটির বাইরে প্রায় দশ হাজার জোড়া পুরনো জুতা জড়ো করে রাখে। প্রতি জোড়া জুতার ভেতর একটি করে কাগজ। ওই কাগজে লেখা সুপার ফিনিক্স বন্ধ কর। এ নিয়ে সমগ্র বিশ্বে তোলপাড় পড়ে গেছে। যুগোশ্লাভিয়া একবার কি হল শোনো, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিবাদ জানালেন এভাবে এঁরা ওইদিন পড়াবেন ঠিকই কিন্তু একদিনের বেতন নেবেন না, এ নিয়ে হই হই পড়ে গেল।’
‘আকু, আমি বিস্মিত হচ্ছি এটা ভেবে তুমি কোন যুক্তিতে ওইসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করছ?’
‘কেন তোমরাই তো বলো তোমরা পৃথিবীর সেরা জাতি। তোমাদের রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অতুলনীয় ইতিহাস। ওয়েল, তোমরা খোঁজ হরতালের বিকল্প তোমাদের দেশের সেরা সন্তানরা কোথায়? তোমাদের দেশেও তো অসম্ভব প্রতিভাবান সন্তান আছে যারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন, এই মুহুর্তে আমার মনে পড়ছে একজনকে মি. ইউনুস, ওঁরা আজ কোথায়?’

জামিল আহমেদ চুপ করে রইলেন। কথা বাড়াতে ইচ্ছা করছে না। প্রখর রৌদ্র চামড়া পুড়িয়ে দেবে মনে হচ্ছে। এই জাপানি ভদ্রলোক কি উপায়ে নির্বিকার আছেন এর রহস্য বুঝতে পারছেন না।
এবার আকুতাগাওয়া বললেন, ‘তুমি সম্ভবত আমার কথায় আহত হয়েছ, এ জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। কী আশ্চর্য, আমার ঘড়ির সময় এখন ছটা, তোমার ঘড়িতে এখন সময় কত?’
‘তিনটা।’
জামিল আহমেদ এইবার ঠেলাভ্যান থামাতে বললেন। ঠেলাওয়ালা অবাক হয়ে বলল, ‘হোডল তো এইহানো না।’
‘চুপ থাক ব্যাটা,’ রাগ চেপে রাখতে পারছেন না। ভাড়া মিটিয়ে বললেন,‘সরি, আকু, কিছু দূর হাঁটতে হবে।’
‘কেন, এটা কি শেরাটন পর্যন্ত যাবে না?’
‘দুঃখিত, না, এটা ভি আই পি রোড, ধীরগতির যানবাহন চলা নিষেধ।’

এই কপটতা জামিল আহমেদ ইচ্ছা করেই করলেন। এমনিতেই সমস্তটা রাস্তায় নিজেকে কেমন বাঁদর-বাঁদর মনে হচ্ছিল। সবই কেমন হাঁ করে তাকাচ্ছিল। একটা ঠেলাভ্যান শেরাটনে পার্ক করল এর চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে!

ভাগ্য ভাল রিকশা পেয়ে গেলেন। টিমেতালে রিকশা এগুচ্ছে।
‘আহমেদ তুমি কি দয়া করে এই ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করবে ইনি আসলেই হরতাল চাচ্ছেন কি না?’ এই ভদ্রলোক মানে রিকশাওয়ালা। জামিল আহমেদ এইবার অসন্তুষ্ট হলেন, এই জাপানি ভদ্রলোকের এই দেশ নিয়ে এত কৌতুহল কেন? তিনি মুখের ভাব অপরিবর্তিত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, কি-ও, কি বুঝতেছেন দেশের অবস্থা এই হরতাল···’
রিকশাওয়ালা মুখ না ফিরিয়েই বলল, ‘আমারে কন?’
‘জ্বী’ ।
‘দুই টেকার আকিজ বিড়ি অখন হইল গিয়া দশ টেকা, কি বুঝবার পারলেন? এইবার আল্লার কুদরতে হরতালের সময় রিকশা চালাইবার পারতাছি অন্যবার তো রিকশা ভাইঙা ফালাইত। হেছা কই, এইবার হরতালে আল্লার রহমতে রুজি রুজগার ভালা খুব ভালা, তয় মনে শান্তি নাই, জীবনের কুনু গিরান্টি নাই এই দেখছেন বাইচা আছি এই দেখছেন নাই, মইরা গেছি। অহন জেবনডা হইল কচু পাতার পানি। চামার কি করে জানেননি যতজন মরা গরু দেখব ততজনের ভাগ। এই দেশডা হইল গিয়া আপনের মরা গরু।’
বলতে গিয়ে জামিল আহমেদের চোখের পাতা কেঁপে গেল, ‘আকু, এ বলছে গণতন্ত্রের জন্য এইসব হরতাল-টরতালের প্রয়োজন আছে।’

আকুতাগাওয়া তাঁর পাসপোর্টের সঙ্গে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে রিসেপশনিষ্টকে বললেন, ‘আমার যাবতীয় বিল এই ক্রেডিট কার্ডে চার্জ হবে। আশা করি ভিসা ক্রেডিট কার্ডে আপনাদের সমস্যা হবে না?’

জামিল আহমেদের শত-অনুরোধেও কান দিলেন না, বিনীত ভাবে তার অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন। জামিল আহমেদ ক্রমাগত বোঝাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেনঃ তুমি আমার গেষ্ট, তোমার সেবা করার সুযোগ দিলে আমার আনন্দের শেষ থাকবে না। এ জাতীয় বাক্য আকুতাগাওয়াকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারল না।

জামিল আহমেদের একগাদা টাকা বেঁচে যাচ্ছে তাতে আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু তাকে ভারি হতাশ দেখাল। ব্যবসায়ীদের মধ্যে অলিখিত একটা নিয়ম প্রচলিত আছে যাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হবে তাঁর যাবতীয় ব্যয়ভার আমন্ত্রণকারী বহন করবে। জামিল আহমেদ পরবর্তীতে জাপান গেলে তাঁরও সমস্ত খরচাপাতি বহন করতেন আকুতাগাওয়া। জামিল আহমেদের মনে হল এই জাপানি ভদ্রলোক আগ বাড়িয়ে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে তাঁকে একটা ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্ট করছেন।
হা ইশ্বর, এ ডিলটার উপর তাঁর ভবিষ্যত নির্ভর করছে। দয়া করো ইশ্বর, দয়া করো। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছাটাই করতে হবে অন্তত এদের কথা ভেবে দয়া করো।

আকুতাগাওয়া এরি মধ্যে কোথায় কোথায় যেন ফোন করছে।
চেক-ইন পর্ব সমাপ্ত হলে আকুতাগাওয়া গাঢ় গলায় বললেন, ‘আহমেদ, আমার প্রিয় বন্ধু তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা আমার নেই। তুমি যেভাবে কষ্ট করে আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছ তোমার এ আতিথেয়তার কথা আমি ভুলব না। ওয়েল, এমব্যাসীকে ফোন করেছি হরতাল চলাকালীন এরা আমাকে হোটেল থেকে বের হতে নিষেধ করেছে। এয়ারপোর্ট থেকে ওদের ফোন করলে ওরা নাকি কোনও একটা ব্যবস্থা করত। যাই হোক হরতাল শেষ হলে তুমি এখানে যোগাযোগ কোরো। প্লিজ আহমেদ, প্রাণের ঝুকি নিয়ে হরতালের মধ্যে তুমি কিন্তু আসবে না এমন হলে আমি কিন্তু খুব রাগ করব।’

বিদেশিরা যে কাজ সচরাচর করে না আকুতাগাওয়া তাই করলেন। জামিল আহমেদকে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে বিদায় দিলেন, হোটেলের টেরেস পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। তাঁকে ভারি বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। বারবার জানতে চাইছিলেন, জামিল আহমেদ ফিরতে পারবেন তো বাসায় ফিরতে কোনো সমস্যা হবে না তো?

.................
আজ ২৬ শে মার্চ। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী আজ। চারদিকে উত্সব উত্সব ভাব। জামিল আহমেদেরও দু-চোখে আনন্দ উপচে পড়ছে। ৯ মার্চ থেকে যে টানা অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল আজ এবং আগামীকাল দু-দিনের জন্য শিথিল করা হয়েছে। এই ক-দিন তাঁর সমস্ত ফ্যাক্টরীতে তালা ঝুলেছে। মেশিনের সুতা থেকে এক ইঞ্চি সুতাও খরচ হয় নি, একটা কাপড়ও তৈরি হয়নি।

জামিল আহমেদ এই ক-দিন বাসা থেকে বের হননি, সম্পূর্ণ বন্দি জীবন যাপন করেছেন। কিছুটা নিরাপত্তার অভাব, কিছুটা স্বেচ্ছায়। এক ধরনের অভিমানও কার উপর তিনি জানেন না। সন্ধ্যায় অবশ্য নিয়মিত তার ফ্যাক্টরির ম্যানেজাররা আসতেন তারা গোল হয়ে বি,বি,সি শুনতেন।
এই দেশ যখন ইংরেজদের কাছে পরাধীন ছিল তখন ইংরেজদের সব কথাই অবিশ্বাসের চোখে দেখা হত আজ এদের কথাই বেদবাক্য মনে হয়। একটা স্বাধীন দেশের নাগরিকেরকে নির্ভর করতে হয় অন্য দেশের তথ্য মাধ্যমের উপর। এ যে কি নিদারুন অপমান।

প্রতিদিন তারা তীব্র উৎকন্ঠায় খবর শুনতেন এই বুঝি বিবিসি থেকে বলা হবে আগামীকাল থেকে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করা হল। আগামীকাল থেকে তাঁরা পূর্ণ উদ্যমে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েবেন। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি।

একদিন তার এক ব্যবসায়ী বন্ধুকে অসম্ভব মন খারাপ করে ফোন করেছিলেনঃ রশিদ, আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার লোকসান না-হয় মেনে নিলাম, কিন্তু হাজার হাজার শ্রমিক বেতন পাচ্ছে না, এদের যে কিভাবে দিন চলছে?
রশিদ সাহেব বলেছিলেন: তোর ইচ্ছা হলে এদের বেতন দিলেই তো পারিস।
কোত্থেকে দিব বল, হাজার হাজার পিস তৈরি কাপড় বিক্রির অপেক্ষায় পড়ে আছে। ভেবেছিলাম বিক্রি হলে এদের বোনাস দেব জাপানি একজন বায়ার এসে শেরাটনে বসে আছে। কিছুই হচ্ছে না।
রশিদ হাসতে হাসতে বলেছিলেন: তোর শ্রমিক মানে তো মেয়ে?
তো!
আরে, এরা বসে আছে নাকি দেহ ব্যবসায় নেমে পড়েছে না!
জামিল আহমেদ প্রচন্ড ক্রোধে থরথর করে কাঁপছিলেন: রশিদ, তুই যদি কুত্তার বাচ্চা না হোস আমার সঙ্গে কোন দিন কথা বলবি না।
টেলিফোন আছড়ে ফেলেছিলেন। তাতেও স্বস্তি পাননি। ফোনের প্লাগ খুলে ফেলেছিলেন।

জামিল আহমেদ নিজেই গাড়ি চালাচ্ছেন। পাথ ফাইন্ডারটা ইচ্ছা করেই বের করেননি। অসহযোগ আন্দোলন শিথিল করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু ঝামেলা বাঁধতে কতক্ষণ। গাড়ি ভেঙে ফেলা আগুন লাগিয়ে দেয়া একটা নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে। একটা গন্ডগোল হলেই সরকারী-বেসরকারী সম্পদ নষ্ট করা এখনকার নষ্ট রাজীতির ফসল। দেশের অস্থির অবস্থা সব কিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে। অসংখ্য ফ্রাঙ্কেষ্টাইন তৈরি হচ্ছে। এখন চোখের সামনে একজন মানুষকে মরে যেতে দেখলে গা গুলায় না।
জনসমুদ্রের মাঝে ইচ্ছা করলেই একজন মানুষকে উলঙ্গ করে ফেলা যায়। সেই উলঙ্গ মানুষটার ছবি আবার ঘটা করে পত্রিকায় ছাপানো হয়। সেই মানুষটার অপরাধ এটুকুই ছিল হরতালের দিনে তিনি অফিস করতে যাচ্ছিলেন। জনগণ স্বতস্ফুর্ত হরতাল পালন করেছে এর নমুনা এই!
একটা সভ্য দেশের অসভ্য এমন কান্ডের জন্য মরে যেতে ইচ্ছা করে।

জামিল আহমেদের প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে দম বন্ধ হয়ে এল। রিসেপশনে দাঁড়ানো লোকটা পাগলের মত কী সব বলছে। আকুতাগাওয়া প্রথম সুযোগেই বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন, তার জন্য মেসেজ ছেড়ে গেছেন। জামিল আহমেদ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে অনেকক্ষণ ম্যানিলা এনভেলাপ নাড়াচাড়া করলেন খোলার কথা মনেই রইল না। এক সময় খাম ছিঁড়ে ফেললেন। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা:
“প্রিয় বন্ধু আহমেদ,
তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না তবুও ক্ষমা চাই তোমার সঙ্গে দেখা না করে, না জানিয়েই দেশে ফিরে যাচ্ছি। প্লিজ, চিঠি সবটা না পড়ে ফেলে দিয়ো না। আমরা বিদেশীরা চট করে মুগ্ধ হই না। তোমাকে আজ আমার খুশি করার প্রয়োজন নেই তাই বলি অল্প সময়ে তোমাকে আমার অসম্ভব পছন্দ হয়েছিল- কেন, এটা ঠিক আমি বলত পারব না। তুমি ঠিকভাবে বাসায় পৌছলে কিনা এ নিয়ে আমি খুব দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম। তুমি হোটেল থেকে রওয়ানা হওয়ার একঘন্টা পর থেকে প্রতি দশ মিনিট অন্তর তোমার বাসায় ফোন করেছি। যেই মাত্র তুমি বললে জামিল আহমেদ স্পিকিং তখন আমি টেলিফোন রেখে দিলাম। কেন, বলছি। ওই অল্প সময়েই তুমি আমাকে যথেষ্ঠ মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছিলে আমি মায়া বাড়াতে চাচ্ছিলাম না।

আহমেদ, আমরা ব্যবসায়ী, আবেগ এবং ব্যবসা গুলিয়ে ফেলা ঠিক না। যে জন্য তোমার সঙ্গে দেখা করে আসিনি, এমন করলে হয়তো আমি দুর্বল হয়ে যেতাম। এ দেশে আসার উদ্দেশ্য ব্যবসা সেখানে আবেগপ্রবণ হওয়ার স্থান কোথায় বলো? এক নাগাড়ে যে হরতাল চলছিল পনের দিন পর্যন্ত আমি বাংলাদেশেই ছিলাম। বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত হরতাল চলছিল। কখন এ দুঃসহ অবস্থার অবসান হবে কেউ জানে না।

এই পনের দিন মূলত আমি নিজেকে একজন প্রিজনার ছাড়া কিছুই ভাবতে পারিনি। অতিথিদের জন্য জুয়া খেলা ছাড়া হোটেলে সমস্ত সুবিধাই ছিল। তাতে কী। আমার সমস্ত জীবনে কখনোই এত শ্রমঘন্টা নষ্ট করিনি!
আহমেদ, বন্ধু আমার, জীবনটা একটা লম্বা দৌড় এখানে থমকে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। পনের দিন কাজের মানুষ কোনো কাজ করবে না এ-ও কী সম্ভব! যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান সেখানে প্রায় তেরো লক্ষ সেকেন্ড একজন মানুষ ঝিম মেরে বসে থাকবে!

এটা লিখতে ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে, আমি নিরুপায় আহমেদ, সব কিছু মিলিয়ে দেখলাম তোমার সঙ্গে ব্যবসা করা সম্ভব না। তোমাকে বলিনি, এ কপটতার জন্য ক্ষমা করো, বাংলাদেশে আসার আগে বাংলার ভাষার উপর একটা শর্ট কোর্স করেছিলাম। এই দেশের উপর যথাসম্ভব পড়াশুনা করেছি। তুমি একজন ব্যবসায়ী বলেই বুঝতে পারবে যে দেশে আমি মিলিয়ন-মিলিয়ন ইয়েন ইনভেষ্ট করব সেই দেশ সম্বন্ধে কিছুই জানব না তা তো হয় না।
তোমাদের দেশের অবস্থা খারাপ এটা জানতাম কিন্তু এমন শোচনীয় অবস্থা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।

রিকশাওয়ালার সঙ্গে তোমার যখন বাংলায় কথা হচ্ছিল কিছু কিছু বুঝতে পারছিলাম যে তোমাদের অবস্থা কতটা শোচনীয়। তুমি কিন্তু আমাকে মিথ্যা বললে।
আমি অবাক হয়ে ভালছিলাম তোমরা দেশকে এত ভালবাসো। তুমি আমি আমরা এশীয়ান এ টান তো আছেই এছাড়াও তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বাবা তোমাদের দেশে জাপানি দুতাবাসে কিছুদিন চাকরি করেছেন। ফিরে এসে বাবা তোমাদের কত গল্পই না করেছেন। সব মিলিয়ে তোমাদের দেশের প্রতি একটা টান অনুভব করতাম। তোমাদের দেশের প্রতি ভালবাসার ছোট্ট একটা নমুনা দেবো। জাপানের কোবো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়োশিতাকা মাসুদা তোমাদের জাতীয় সঙ্গীত অনুবাদ করেন। গোটা জাতীয় সঙ্গীত আমার মুখস্ত। তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করছ না? বেশ ভুলচুক হলে ক্ষমা করো-

‘ওয়াগা ওউগুন নো বেংগাল ইয়ো,
আই সরু ওয়াগা সোকোকু ।
আতাকামো ফুরুতো নো নেইরো নো ইয়োনা
সোরা ইয়া কুকি ইয়ো এইএননি।
আ ওয়াগা সোকোকু কিয়ো,
হারু নিওয়া, ম্যাংগো নো কাওরিগা ওতাশি ও
ইয়োরোকোবি দে ওয়াইল দো নি সাসেতে কুরেরু ।
আ নান তো ইউ কানগোকি দা।'
বিদায় বন্ধু, বিদায়।”

জামিল আহমেদের চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে গেছে তিনি আর পড়তে পারছিলেন না। তিনি কাঁদতে কাঁদতে নিজের অজান্তেই গাইতে শুরু করলেন “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।”
হোটেলের সিকিউরিটির লোকজন ছুটে এসেছে। লবিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লোকজন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।

সিকিউরিটির একজন চেষ্টাকৃত কঠোর হয়ে বলল, আপনি এরকম করছেন কেন আপনার সমস্যাটা কী?’
জামিল আহমেদ ভেজা চোখে হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘নাথিং, কেন তোমাদের হোটেলে কি জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নিষেধ আছে?’

*কয়েদী: ২

No comments: