Monday, April 27, 2009

চাল না গান, বিদ্যুৎ না গণতন্ত্র?

 
অমৃত বচন। "...আগামী অন্তত ৩ বছরে এ যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে।"
(সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ১৫ মে ’০৬)

কেয়ারটেকার সরকার মহোদয়রা তো এই দেশের কোন বিষয় নাই যেটায় হাত দেন নাই। হর্সমাউথ- একজন উপদেষ্টা তো মুখ যে হাঁ করে রাখতেন, আর বন্ধ করতেন না। ২৪ ঘন্টাই মুখ চালু। আই বেট, ঘুমের সময়ও তার মুখ চলত, মিডিয়া থাকত না, এই যা!
তো, এরা বিদ্যুৎ নিয়ে কী ঘন্টাটা করেছেন?

টাকার সমস্যা? এই যে হাজার কোটি টাকা দুই-নম্বরিদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছিল, কাজে লাগানো হল না কেন? বগলে চেপে রাখা সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে এটা আছে, খুঁজে পাননি বুঝি?

এখন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক ডিজিটাল মন্তব্য করেছেন, "ঘূর্ণিঝড় নার্গিসকে যেমন নিয়ন্ত্রন করা যায় না, টর্নেডো, সুনামি, যেমন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না তেমনি বিদ্যমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।"
(প্রথম আলো, ২৩.০৪.০৯)

ডেসকো, ডিপিডিসির কর্মকর্তাদের উত্তর আরও ডিজিটাল, "বৃষ্টি হলে গরম কমে যাবে। গরম কমে গেলে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। তখন গভীর রাতে লোডশেডিং থাকবে না।"

সমস্যা হয়ে গেল। বৃষ্টি নামানো তো চাট্টিখানি কথা না। এজন্য এরশাদ সাহেবের সাহায্য নিতে হবে। তিনি বলেছিলেন, "পৃথিবীতে কোন রাষ্ট্রপতির প্রার্থনায় বৃষ্টি হয়েছে? আমি এরশাদের প্রার্থনায়।"

সমস্যাটা হচ্ছে, লক্ষ করুন, কোন রাষ্ট্রপ্রধান? কেবল এরশাদ বললে সমস্যা ছিল না। পায়ে ধরে নিয়ে আসতাম। কিন্তু এই জন্য যদি উনাকে রাষ্ট্রপ্রধান বানাতে হয়, তাহলে তো মুশকিল। জিল্লুর সাহেব কী রাজি হবেন?

সবাই দেখি প্রকৃতির দোহাই দিচ্ছেন। ঘুরিয়ে বললে যার যার স্রষ্টার কাছে কাজটা গছিয়ে দিচ্ছেন। বাহ, বেশ তো! এমনিতে তো সদম্ভে বলেন, এই ব্রীজ, রাস্তা আমি করেছি!

বিদ্যুৎ নিয়ে আমার একটা প্রশ্ন, কত টাকা লাগে এ সমস্যার সমাধান করতে? স্যাররা হয়তো বলবেন, মিয়া, একশতে কয় কুড়িতে হয় তাই আঙ্গুল গুনে বের করতে পারো না, তোমরা কি বুঝবা এতো বড়ো হিসাব!
ফাইন, চাঁদে যেতে পারব, কি পারব না; সে তো অন্য কথা। কিন্তু চাঁদ কত দূরে জানতে তো দোষ নাই!
আমাদের ঠিক ঠিক বলুন না, কত টাকা লাগে? কোত্থেকে টাকা আসবে তাও বাতলে দেব কিন্তু দয়া করে বলুনই না কত টাকা লাগবে? অন্তত এটা আমাদের জানতে তো দোষ নাই।
২৫ এপ্রিল, ২০০৯-এ বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ৯৫৫ মেগাওয়াট। টাকার হিসাবটা বের করা জটিল কিছু না।

সময়? তাও বলুন। আমাদের প্রয়োজন বিদ্যুৎ। দেশে এই সম্বন্ধে ভাল জ্ঞান যার, তাঁর সঙ্গে বসুন। তাঁকে জিজ্ঞেস করুন, চটজলদি এই সমস্যা সমাধানে পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে কোন মানুষটাকে উড়িয়ে নিয়ে আসতে হবে। ভাসমান বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভাসিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে আসবেন, নাকি উড়িয়ে এতো জেনে তো আমাদের কাজ নাই। আমাদের প্রয়োজন বিদ্যুৎ।

কবে নাগাদ এই সমস্যার সমাধান হবে কেউ পরিষ্কার করে বলছে না। আমরা চুতিয়া জনগণ জানতেও পারছি না।

আচ্ছা, পাওয়ার না থাকলে সমস্যা কি? আমার মতো তেলিবেলি লেখক অন-লাইনে থাকতে না পেরে, কিছু এলেবেলে লেখা পোস্ট করতে না পেরে, রাগের মাথায় ছেঁড়া চটি দিয়ে কম্পিউটারকে দু চার ঘা মারব? বেচারা কম্পিউটার, নিরীহ জান! এতো জুতা খায় কিন্তু কোন বিকার নাই!

একটা মানুষ রাতে ৬ ঘন্টাও ঘুমাতে পারছে না। দেশ চলছে কেমন করে আল্লা মালুম!
লাগবেন বাজি? এই দেশের মানুষকে এই গ্রহের ভেতর-বাইরে যেখানেই নিয়ে যান, কোন অবস্থাতেই এরা মরবে না। কচ্ছপের মত মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে। তবে ঘটা করে ভোট দিতে যাবে। আর নেতা-নেত্রীর জন্য হাসতে হাসতে প্রাণটা খুইয়ে আসবে।

এই যে লোকজনরা রাতে ৬ ঘন্টাও ঘুমাতে পারছে না, এর ফল কী দাঁড়াবে? এটা মনোবিদ, চিকিৎসাবিদ ভাল বলতে পারবেন। খানিকটা অনুমান করলে তো দোষ নাই।
কে জানে, আগামীতে এটা হয়তো গবেষণা করে বের করা হবে। এই সময়ে (সময়টার বিস্তারিত ব্যাখ্যা বুদ্ধিমান পাঠককে আগ বাড়িয়ে বলতে চাচ্ছি না) দিনের পর দিন ঘুমাতে না-পারা, চিড়চিড়ে-খিটখিটে, বাবা-মার রোপন করা সন্তানগুলো একেকটা চরম অশিষ্ট-দুর্বিনীত হয়ে জন্ম নেবে। তুচ্ছ কথায় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ঠা ঠা করে গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষদের চু্ইংগাম চিবুতে চিবুতে মেরে ফেরবে।

কেন বাপু, এটাও তো গবেষণার মাধ্যমেই বের করা হয়েছে, বয়স্ক বাবার সন্তান হাবলা হয়। তাহলে এটা হতে দোষ কোথায়?

বিদ্যুৎ না থাকার কারণে বিদ্যুৎচালিত কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্র-লাইফ সেভিং মেশিনগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। বিকল্প জেনারেটরে তেল না থাকার কারণে বন্ধ হয়ে গেলে যাদের মৃত্যু হয় এই মৃত্যু, খুনগুলো বিচার হবে না?
বার্ন ইউনিটের যেসব রোগির শরীর ৭০ ভাগ পুড়ে গেছে, বিদ্যুতের অভাবে যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রগুলো একেক করে বন্ধ হয়ে যায়। তখন সেইসব রোগীর কষ্ট দেখে একজন ডাক্তার চোখের পানি লুকিয়ে বলেছিলেন, ইচ্ছা করে এদের বিষাক্ত ইন্জেকশন দিয়ে মেরে ফেলি।

কেউ যদি দোয়া-বদদোয়ায় বিশ্বাস করে তাহলে সে যতবার হজ করুক আর উমরাহ, লাভ কী! ওই রোগীদের ভেতরের হাহাকার-জান্তব কষ্ট এঁদের পিছু ছাড়বে না, নরক অবধি।

গান ভাল জিনিস তবে ঘরে চাল না থাকলে গান কোন কাজের? গণতন্ত্র কাজের জিনিস তবে বিদ্যুৎ না থাকলে এই গণতন্ত্র ধুয়ে ধুয়ে খাওয়ার উপায় নেই। এমতাবস্থায় আমার গণতন্ত্রের চেয়ে বিদ্যুৎ-এর প্রয়োজনই বেশি।
 

*কার্টুনঋণ: শিশিরের ছাপ আছে।

No comments: