Monday, November 2, 2020

সভ্য, সভ্যতা!

কালে-কালে আমরা নাকি সভ্য হয়েছি। এই সমস্ত কেতাবি কথা বাদ দিয়ে আমি আমার কথা বলি। কীসের সভ্য, কীসের সভ্যতা!? আমি জানি না এই সব গালভরা কথার আদৌ কোন মানে রাখে কিনা! কেবল মোটাদাগের কথাটা জানি, আমরা কেবল গু-ভরা ভান্ড যেটা প্রকৃতি চামড়া দিয়ে মুড়িয়ে রাখে সেটার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উৎস যে দুইটা মুখ সামনে এবং পেছনে ওগুলো ঢেকে রাখা শিখেছি। ব্যস...। নাঙ্গাপাঙ্গা থেকে গাছের বাকল, লতাপাতা এরপর ক্রমশ বিভিন্ন চকচকে পোশাক নামের আচ্ছাদন!

অতীতের এই সমস্ত সত্য ঘটনা যখন আমরা পড়তাম তখন অবিশ্বাসের চোখে তাকাতাম। এও কী সম্ভব, একটা মানুষকে ডাইনি বলে বা যাদুটোনার লোক বলে লোকজন পুড়িয়ে মেরেছে, প্রকাশ্যে!

কিন্তু তাই বলে এখন? আমাদের দেশে! ধর্ম অবমাননার দোহাই দিয়ে!

 

এ অকল্পনীয়, এ অভাবনীয়! কাউকে-কাউকে দেখলাম বলার চেষ্টা করছেন ওই মানুষটা ভাল জীবন-যাপন করতেন ইত্যাদি...ইত্যাদি। এর মানে কী, বাহে? ধরুন, একটা মানুষ ভাল জীবন-যাপন করেন না এমনটা হলে কী প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলা যাবে? দেশে তাহলে আইন-কানুনের আর প্রয়োজন কী! আইনের বইগুলোর পাতা ছিঁড়ে-ছিঁড়ে বাচ্চার গু পরিষ্কার করলেই হয়।

ওই এলাকার ওসি একটি সংবাদ মাধ্যমে যা বলেছেন তা আরও ভয়ানক। পুলিশ-প্রশাসনের সামনেই ঘটেছে ঘটনাটা। চেষ্টা-ইচ্ছা থাকলেও এরা কিসসু করতে পারেননি!

ভিডিও ঋণ: সি-প্লাস টেলিভিশন
 
আবু ইউনুছ মোঃ সহিদুন্নবী (জুয়েল) নামের মানুষটাকে যেভাবে পেটানো হয়েছে সম্ভবত সাপকেও এমন করে পেটায় না। তারপর আগুনে পুড়িয়ে ফেলা, গোল হয়ে দাঁড়িয়ে উল্লাস করা। সেলফোনে ছবি উঠানো। কী-এক মচ্ছব, কী-এক অন্য ভুবনের আনন্দ! আহা...!
 
কারা ওই মানুষগুলো? আমরাই তো কেউ-না-কেউ! এই দেখুন:
এই হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার সোশ্যাল মানুষগুলোর একজন। এদেরই মত অনেকেরই আবার থাকে লাখ-লাখ ফলোয়ার।
'জনগণ তাদের কাজ করেছে। জনগণকে দোষ দিয়েন না', এটা দিয়ে শুরু করেছে এই আফগানি নামের লোকটা।
আওয়াজ নীচে আফগানি বাঞ্চ... এইবার খানিকটা তকলিফ করে জুয়েল নামের মানুষটাকে ফিরিয়ে দে।
 
ভাবা যায়, অঙ্গার হয়ে যাওয়া অসম্ভব ক্ষমতাবান এই জুয়েল নামের মানুষটার কী ভয়ংকর ক্ষমতা- এক নিমিষে ১৭ কোটি মানুষের গা থেকে সভ্যতা-সভ্যতা খেলার চকচকে কাপড়গুলো খসিয়ে দিয়েছেন। ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন সেই আদিম যুগে যাদের আমরা অসভ্য বলতাম। সেই তখন যখন বর্জ্য নিষ্কাশনের ফুটোগুলো মানুষ ঢেকে রাখার প্রয়োজন বোধ করত না।
 
আফগানির মত এখন অনেকে বলছেন ভুল হয়ে গেছে। বেশ-বেশ! তা তাঁর সন্তানের কাছে তাঁকে ফিরিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।

মানুষটা অসুস্থ ছিলেন। তাঁর মানসিক ভারসাম্য ঠিক ছিল না। যে ডাক্তার তাঁর চিকিৎসা করতেন সেই ডাক্তারের স্বজন এই প্রেসক্রিপশনটা শেয়ার করেছিলেন।
একজন ডাক্তার ওষুধগুলোর ধারাবাহিকতা দেখলেই চট করে বুঝে যাবেন যে এই মানুষটা মানসিক ভারসাম্য নিয়ে জটিল সমস্যা ছিল।
 
 
এসব আসলে তবলার ঠুকঠাক। মূল গান হচ্ছে ওটাই, আমরা সভ্যতার [] ভান করি কিন্তু আসলে সেই আদিম অসভ্যই রয়ে গেছি। অস্ট্রেলিয়া লাখ-লাখ উট গুলি করে মেরে ফেলবে কিন্তু এক কিনি মাংস ক্ষুধার্ত কাউকে দেবে না। এরা কীসের সভ্য? একটু পেছন ফিরে তাকান। অস্ট্রেলিয়া এই ভূমির মূল মালিকদের সঙ্গে কী করেছে? স্রেফ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে।
ফ্রান্স নাকি সভ্যতার বাপ-মা-চাচা সব। এখনও এরা কেমন শোষণ করছে এই ভিডিওটা দেখলে খানিকটা বোঝা যাবে।
 
আহা, আরেক সভ্য দেশ ব্রিটেন! স্রেফ একটা চোর-চোট্টা। চোরারা আমাদের এখান থেকে সব নিয়ে-নিয়ে জমিয়েছে। এখনও রাণীর মুকুটে যে রত্ন এটা আমাদের এখান থেকে লুট করা। লুটপাটের ছোট্ট একটা নমুনা:
 
এরা বিশেষ-একটা প্লায়ার্স তৈরি করেছিল। ওটা দিয়ে দাস নামধারী একজন মানব সন্তানের টেস্টিকল ক্রাশ করত। এরপর কেটে দিত।
কী, সভ্যদের নমুনা দেখে গা শিউরে উঠে? সো কল্ড, ইউরোপ, উন্নত দেশগুলোর একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন সবগুলোর উত্থান-পতনে একই অবস্থা।
 
আবরারের [] কথা কি মনে আছে? একজন শিক্ষার্থীর কাছে যেটা স্বপ্নের কারখানা, বুয়েট। সেই বুয়েটের ছেলেরা তাদেরই ছোট ভাইকে পিটিয়ে মেরে ফেলল, ঠান্ডা মাথায়। কেবল তাই না, পিটিয়েছে। পিটিয়ে ভাত খেতে গেছে। ভাত খেয়ে এসে আবার পিটিয়েছে।

আহ, বাক-স্বাধীনতা। এটা খুব মজার একটা জিনিস। ওয়েব-স্ফিয়ারে আমার সঙ্গে অনেকের বনাবনি হত না যে কারণে সেটা বাক-স্বাধীনতার সংজ্ঞা তারতম্যও একটা। যে সমস্ত কুৎসিত কথা এরা বাসায় বাপ-মার সামনে বলতে পারতেন না সেটা পাবলিক প্লেসে অবলীলায় বলবেন এটাই নাকি বাক-স্বাধীনতা।
ট্রুডো মানুষটাকে আমার বরাবরই পছন্দ। তাঁর এই কথাটার অর্থ ব্যাপক। মানুষে উপচেপড়া একটা সিনেমা হলে আপনি আগুন-আগুন বলে চিৎকার করলেন এটা বাক-স্বাধীনতা না! বাক-স্বাধীনতারও একটা সীমা আছে।
এই গ্রহে অসংখ্য রহস্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যার কোন ব্যাখ্যা নাই। এই যেমন ধরুন, হেফাজতে ইসলাম ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও করার কর্মসূচি দিল।
এক্ষণ এটা আমার আলোচ্য বিষয় না। আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, কোথাও ধর্মের অবমাননা হলে বিভিন্ন প্রকারে প্রতিবাদ জানাবার চেষ্টা হয় কিন্তু এই যে দেওয়ানবাগী পির নামের এই মানুষটা যে সমস্ত বয়ান করেন:
তার বিরুদ্ধে একটা মামলা দূরের কথা শত মানুষকেও লেফট-রাইট করে তার বাড়ি ঘেরাও করতে দেখলাম না। অথচ এই মানুষটার অপরাধ অবলীলায় ফ্রান্সের করা অপরাধকে ছাড়িয়ে যায়। যায় কি যায় না এই কুতর্ক করার পূর্বে এই ভিডিওটা ঠান্ডা মাথায় দেখেন। এরচেয়ে ভয়াবহ বয়ানও কিন্তু আছে তার।
এই লোকটার শরীর নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না কারণ সূক্ষ রূচির পাঠকদের আবার কী সব বডি-শেমিং টাইপের তরিকা আছে। আর মোটা রূচির পাঠকরা বলবেন: 'আল্লার দেওয়া শইল্যের উপরে তো এই বেডার হাত নাই'।
ওরে, এ তো 'বেডা' বা সাধারণ কোন লোক না। এ স্বয়ং আল্লাহকে ধমকাধমকি করে। কী অসীম ক্ষমতা তার কিন্তু  এই মাহবুব-এ-খোদার আবার চোখে চশমাও লাগে!
কী ভয়ংকর! এর ছবি সামনে রেখে লোকজন নামাজ পড়ে। এখানে একটা দু-পেয়ে আবার বলছে এটাই ঠিক আর এই দুনিয়ার তাবৎ ধর্মীয় শিক্ষক বেঠিক। এ আবার সুরা বাকারার ২৪৮ নাম্বার আয়াতের দোহাই দিয়েছে। আয়াতটা হচ্ছে এই:
"তাঁর কর্তৃত্বের লক্ষণ এই যে, তোমাদের কাছে একটা তাবুত (সিন্দুক) আসবে যাতে তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে প্রশান্তি ও কিছু জিনিস যা মুসা ও হারুনের বংশধররা রেখে গিয়েছে, ফেরেশতারা সেটা বয়ে নিয়ে আসবে। নিশ্চয়ই এতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা বিশ্বাস কর।"
এতে করে কিন্তু আমাদের দেশের লোকজন মায় সরকারেরও খুব একটা সমস্যা হয় না। বড় বিচিত্র এই দেশ!
 
বাই দ্য ওয়ে, এটা, এটা কী ধর্ম অবমাননায় পড়ে না?
এই মৌলবী সাহেব যদি প্রমাণ করতে পারেন কোন সহীহ হাদিসে ট্রাম্পের কথা এভাবে লেখা আছে তাহলে আমি লেখালেখি ছেড়ে দেব। আর ইনি প্রমাণ না-করতে পারলে তার বিরুদ্ধে সোজা মামলা করব।
 
এন্ড অভ দ্য ডে, যে মানুষটার ধর্ম আজ বিপন্ন কষ্টে তিনি বুক চেপে আছেন, আগ্নেয়গিরি হয়ে আছেন অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে এই তিনিই সীতাকুন্ড পাহাড়ে ট্রেকিং-এর সময় ইচ্ছা করে যে পাথরটায় লাথি মেরেছিলেন সেটায় পুজো করার ছাপ স্পষ্ট ছিল...।   

সহায়ক সূত্র

১. সভ্যতা: https://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_9297.html

২. আবরার...: https://www.ali-mahmed.com/2019/10/blog-post_10.html 

 

 

 

 

 

 

No comments: