Tuesday, July 21, 2020

তাঁহাদের ইশকুল!

লেখক: Hassan Bipul  (লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)

"আমি চাইলে ওই ডাক্তারের নাম খুঁজে বের করতে পারতাম। এই পোস্টে ওই নাম উল্লেখ করে এক হাত নিতে পারতাম। হাসপাতালের নামও বলতে পারতাম। কিন্তু সেটা করবো না। কারণ পরে বলছি।

আমার এক সহকর্মী তার ক্যান্সার আক্রান্ত মাকে ভর্তি করিয়েছেন হাসপাতালে। পরিস্থিতি হঠাৎ খারাপ হয়েছে। ডাক্তারী ভাষায় ফোর্থ স্টেজ। আজ সকালে তিনি কান্নাকাতর গলায় ফোন করে বললেন ছোট ভাই আর বাবার সঙ্গে তিনি হাসপাতালে আছেন। ষাটোর্ধ বাবা আর বছর বিশেক বয়সের ছোট ভাইটি এইরকম বিপর্যয়ে কখনো পড়েনি। তার নিজের মাথাও কাজ করছে না। মাকে নেওয়া হয়েছে আইসিইউতে। আমি কি একটু হাসপাতালে আসতে পারবো কি না।

হাসপাতালে পৌঁছে দেখি আমার সহকর্মী মেয়েটি অঝোরে কাঁদছেন। বাবা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তিনি আমাকে বললেন, 'ভাই, তুমি একটু আইসিইউয়ের ডিউটি ডাক্তারের কাছ থেকে শুনে আসবা কী অবস্থা এখন'? আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। গেলাম।
ডিউটি ডাক্তার আমাকে তার রুমে ঢুকতে দেখেই বললেন, 'একজন রোগীর জন্য এতোবার বলতে হবে কেন? আপনারা কেন বারবার আসতেছেন'?
আমি বললাম: তাদের কথা বলার মতো মানসিক অবস্থা নেই। সেজন্যই আমি আবার জানতে এসেছি।
তিনি বললেন, 'রোগী এখন লাইফ সাপোর্টে আছে। সিনিয়র ডাক্তার এসে সিদ্ধান্ত নেবেন। এখানে আর আসবেন না'।
ঘটনা এইটুকুই। বাড়তি যেটুকু বলতে পারি সেটা হচ্ছে তিনি আমার সঙ্গে ধমকের সুরে কথা বলেছেন। আমার এই ফিরিস্তির কারণ সেটাই। ডিউটি ডাক্তার রুমে একাই ছিলেন। কোনোরকম ছুটোছুটির মধ্যে ছিলেন না। তিনি চাইলে সহজ ভাষায় ওই কথাটুকুই আমাকে বলতে পারতেন। তিনি সেটা করেননি।
না, আমি সেজন্য ডাক্তারকে দোষ দিচ্ছি না। হ্যাঁ, ডাক্তারের কাছ থেকে দুঃখজনক অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহার পাওয়ার পরও ওই ডাক্তারকে আমি দোষ দেই না। সে কারণেই ডাক্তার বা হাসপাতালের নাম আমি বলছি না। আমি নিজে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছি, সেটি শেয়ার করার জন্যই এই লেখা।
আমাদের দেশের ডাক্তাররা অসম্ভব পরিশ্রম করেন, আামার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই ডাক্তার আছেন, সরকারি বা অসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। আমি জানি তারা একজন রোগীর জন্য সংসারের সময়, সন্তানের জন্য রাখা সময় স্যাক্রিফাইস করে হাসপাতালে ছোটেন। তাদের প্রাত্যহিক জীবনের স্বাক্ষী আমি।

সমস্যা হলো, আমাদের মেডিক্যাল কলেজগুলোর কালিকুলামে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, কমিউনিটি মেডিসিন, ফরেনসিক মেডিসিন, ফার্মাকোলজি, প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, মেডিসিন আর সার্জারির মতো বিষয় থাকলেও সেখানে এমপ্যাথি বা হিউম্যানিটির মতো বিষয় নেই। আমরা সম্ভবত ধরেই নেই লোকজন এই মানবিক বিষয়গুলো প্রকৃতি থেকে শিখবেন।
কেবল ডাক্তার নন, যে পেশার লোকদের কাছেই সাধারণ মানুষ বিপদে পড়ে যান সেসব পেশার মানুষদেরই এই মানবিক দিকগুলো অন্যান্য বিষয়ের সমান গুরুত্ব দিয়েই পড়ানো জরুরী। সেটা ডাক্তার হোক, পুলিশ হোক, উকিল হোক বা সাংবাদিক হোক।
মনে রাখা দরকার, ওই ডিউটি ডাক্তার হয়তো একই কথা দশজনকে পঞ্চাশবার বলেছেন, বলে বলে বিরক্ত হয়েছেন, কিন্তু রোগীর কাছে ওই মুহূর্ত তাঁর জননীর জীবনমরণ সঙ্কট। এমন বিপদে সে কোনোদিন পড়েনি। এমন অসহায়ও সে কোনোদিন বোধ করেনি।"

... ... ... ... ...     
(লেখক হাসান বিপুলের সঙ্গে খানিকটা যোগ করতে চাই, একজন ডাক্তার বা পুলিশের কাছে, মোদ্দা কথা যাদের হাতে নির্ভর করে একটা প্রাণ- সেই প্রাণটাকে হয়তো অনেকে দেখেন একটা সাবজেক্ট বা সংখ্যা হিসাবে কিন্তু ওই একটা সংখ্যা কারও-না-কারও স্বজন। ওই প্রাণটা সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গোটা একটা পরিবার। অসংখ্য আনন্দ-বেদনা। অনেকের কাছে যেটা কয়েকটা পুরনো হাড় সেটা তাঁর স্বজনের কাছে যক্ষের ধন! তার শেকড়...।
 
এখানে যারা আছেন তাঁরা সবাই তাদের ক্ষেত্রে মাস্টার মানুষ। এখান পর্যন্ত আসতে তাদের কোটি-কোটি শব্দ শিখতে-পড়তে হয়েছে, কিন্তু...। একটা কিন্তু থেকে যায়! কেবল একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন এই হাড়গুলো আপনার-আমার কোনও স্বজনের, মার! তাঁদের অজান্তেই যে ঘটনাটা ঘটে গেল এটা চরম অসভ্য অমানবিক, নির্দয় একটা আচরণ। এখানে একটা, কেবল একটা টেবিলের প্রয়োজন ছিল।
ওই কারণেই একটা বিশেষ ইশকুলের প্রয়োজন...।)

No comments: