Thursday, July 30, 2020

আমার 'হাই-ভোল্টেজ' বন্ধু!

প্রবাসে থাকেন এমন একজন মানুষ দুম করে আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি কিনা? ইয়েস-ইয়েস-ইয়েস বলতে পারলে বেশ অনেকখানি আরাম পেতাম। কারণ তাহলে জ্ঞানের টুকরিটা মাথায় নিয়ে খানিকটা পা ফাঁক করে হাঁটতে আমার সুবিধা হত। কে জানে, হয়তো ভারতীয় দূতাবাস আমাকে কাছে টেনে নিত। বা বাংলাদেশের উপর নজরদারি করার জন্য আমাকে বেছে নিত। আফসোস...!

যিনি আমার কাছে এটা জানতে চাইলেন ওই ভদ্রলোকের এই ধারণা হওয়ার পেছনে কারণ কী! এমন না যে আমার চেহারা জ্ঞান-তেলতেলে। কেবল আমার মা ব্যতীত [] এমনটা কেউ বলেছে বলে তো মনে পড়ছে না।
তা ওই মানুষটা কেন এই প্রশ্ন করলেন? আমাকে কি খাটো করার জন্য? না। ঘটনার সূত্রপাত এখান থেকে:
যে মানুষটা আমাকে ওই প্রশ্নটা করেছিলেন তিনি জানেন আমি ছবির ভদ্রলোকের সঙ্গে পড়াপড়ির খেলা খেলেছি। এই যে ভদ্রলোক ইনি এবং আমি-আমি এবং ইনি আমরা একসঙ্গেই পড়ালেখা-লেখাপড়া করেছি। এখন তিনি বলছেন, তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। এই করে তিনি আমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছেন! এখন আমি যাই কই! আমার গতি কী- 'না ঘার কা, না ঘাটকা...'!

কারণ আমি আমার অনেক লেখায়, এমন-কি আমার বইয়েও ছাপা হয়ে গেছে যে আমার লেখাপড়ার দৌড় কচ্ছপের মত। আমি আমার অনেক লেখায় বলেছি, সবাই যখন রেসের ঘোড়ার মত দৌড়াচ্ছে ইশকুলে যাচ্ছে তখন আমি ইশকুল ফাঁকি দিয়ে গোয়ালঘরে বসে হাবিজাবি বই পড়ি [], []। আমার কিশোরবেলা অনেকের মত জৌলুষময় না! কোন সচীবের পোলা বা মন্ত্রীর পোলার সঙ্গে মাখামাখি ছিল না। এই দিল্লিওয়ালার মত অল্প কিছু হাই-ভোল্টেজ বন্ধু যেমন ছিল তেমনি আমার বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল মুচির ছেলে:
'গাদুরার' এই স্মৃতিটা আমার কাছে এখনও আছে। এটা দেখে পিটারের [] খুব পছন্দ হয়েছিল। ভাগ্যিস চেয়ে বসেনি। সুইজারল্যান্ডে এটা দিয়ে ও কী করত কে জানে।
আরেকজন ছিল ধোপার ছেলে, সেন্টু। তার বড় ভাই অনিল দার সঙ্গেও ভাল খাতির ছিল কারণ ওখানে দিনভর বসে-বসে বই পড়লে আমার বাসার লোকজনেরা কেউ খুঁজে পেত না। দস্যু বনহুরের শত-শত বই এই মানুষটা আগ্রহ করে আমার কাছ থেকে নিয়ে ছিলেন পড়ার জন্য কিন্তু একবার বানের জলে সব ভেসে গেল। আহারে...! তিনি অবশ্য এটা আমাকে দান করে পুষিয়ে দিয়েছিলেন:
 
যাই হোক, আমার দিল্লিওয়ালা বন্ধুর কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। ওনার ভাল নাম প্রদীপ কুমার ঘোষ। আমরা ডাকতাম, 'পইদ্যা'। এই মানুষটার কাছে আমি ঋণী কারণ আমার উপন্যাসের একটা চরিত্রের কিছু কর্মকান্ড এখান থেকে নেওয়া। যেমন পইদ্যা বাবুর গোল্ড-মার্চেন্ট এক আত্মীয় ছিলেন। ওই ভদ্রলোকের নাকি প্রতিদিন আধ মনের উপর ফল-ফ্রুটস লাগত। পরিবারে লোক খুব বেশি এমন না তাই ওদের বাথরুম কয়টা এটা নিয়ে আমি চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। সারাটা দিন তো হাগার উপরই থাকার কথা।
আরেকটা ঘটনা এমন। আমাদের সময় তো চার্জ লাইট-ফাইট টাইপের বিশেষ কিছু ছিল না। ইলেট্রিসিটি চলে গেলে হ্যারিকেনই ভরসা। একবার এক বন্ধুর বাসায় আমরা আড্ডা দিচ্ছি। পইদ্যা বাবুও আছেন। যথারীতি পাওয়ার চলে গেলে হ্যারিকেনের আগমণ। হ্যারিকেনের আলো আমার চোখে লাগছিল। কি করব এটা বলিনি, আমি হোস্টের কাছে একটা কাগজ চাইলাম। তড়িঘড়ি করে পইদ্যা বাবু একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। ওসময় তিনি তার ওই গোল্ড-মার্চেন্ট আত্মীয়ের কার্ড ব্যবহার করতেন কলম দিয়ে আত্মীয়ের নাম কেটে নিজের নাম লিখে। তো, আমি ওই কার্ডটা হ্যারিকেনে গুঁজে দিলে পইদ্যা বাবু খুব আহত হয়েছিলেন।

যাই হোক, পরে একদিন শুনলাম ওনার নাম নাকি, পৃথিবী কুমার ঘোষ। সে  না-হয় হল, হয়তো হতেই পারে! লেখালেখির কারণে আমার নিজেরই নাম বদলাতে হয়েছিল। প্রথম দিকে নিরাপত্তার বিষয়টাও ছিল। পরে যখন ওই নামে অনেক লেখা লিখে ফেললাম তখন আর আসল নামে ফিরে আসার উপায় ছিল না আর।

ওয়াল্লা, এখন শুনি ওনার নাম 'প্রিয় কৃষ্ণ দাস'। ওনার ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল যারা ইসকনে দীক্ষা নেন তাদের নাম পরিবর্তন করা লাগে। যেমন ওনার বড় ভাইয়ের নাম, পরিমল ঘোষ এখন নাকি ওনার নাম, প্রাণেশ্বর কেশব দাস। সবাই দাস। কৃষ্ণের দাস। ওনার ভাইও ইসকন করেন। এবং এই ভদ্রলোকের কাছেই জানা গেল ওনার ছোট ভাই (আমাদের পইদ্যা বাবু) দিল্লিতে পড়াশোনা করেননি তবে গুরু ধরার জন্য ভারতে যেতে পারে।
তা বেশ, সবই বুঝলুম কিন্তু আমার এখন কী হবে? আমার তো দিল্লিতে না-পড়লে বা পড়া শেষ করলে চলছে না।
এটা একজন সরকারী কর্মকর্তার ভিজিটিং কার্ড। অসাধারণ! ২ পাতার এমন কার্ড আমি আগে আর কখনও দেখিনি! তো, এখানে কয়েকবারই বলা হয়েছে, Self-withdrawn after one year.
তো, এখন থেকে আমিও আমার নামের সঙ্গে ল-অফিসার (কারণ আমি এক বছর আইন পড়ে ছেড়ে দিয়েছি) এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছত্র (এখানে বানান ভুল আছে) এটা লিখতে পারব। সবাইকে এটা মেনে নিতে হবে নইলে একটা খুনোখুনি হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত একটা ঘাতক [] হয়ে যাব...।
 

সহায়ক সূত্র:
১. জননী: https://www.ali-mahmed.com/2020/07/blog-post_20.html
২. অপকিচ্ছা ১: https://www.ali-mahmed.com/2009/09/blog-post_02.html
৩.অপকিচ্ছা ২: https://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post.html
৪.পিটার-: https://www.ali-mahmed.com/2014/07/blog-post_27.html
৫. ঘাতক: https://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_03.html




1 comment:

মনির said...

প্রদিপরা সাইকেল ঠিক করত।