Search

Sunday, July 27, 2014

পিটার-পেপে-পাপিতা।

পিটারকে আমি বললাম এটা আমার গাছের। তখনই পিটার আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, 'তোমার আপত্তি না-থাকলে আমি ওই গাছটার একটা ছবি তুলতে চাই'। ওই গাছ মানে পেপে-গাছ। ওর নাকি পেপে মানে "পাপিতা" খেতে খুবই মজা লেগেছে। আমি রগড় করি, 'গাছটা উঠিয়ে  সঙ্গে দিয়ে দেই তোমাকে'!
পরে অবশ্য আমি ভুলে গিয়েছিলাম। এটা যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এটা আমার মোটেও মনে হয়নি! কিন্তু পিটার ঠিকই মনে রেখেছিল! পিটার কিন্তু ঠিকই হাবিজাবি ঠেলে পেপে গাছটার সঙ্গে ছবি ওঠায় যেটার চালু নাম সেলফি। আমাকেও ডেকেছিল। আমি মাথা নেড়েছিলাম এদিক-ওদিক কিন্তু মুখে-মুখে বলেছিলাম, মাফও চাই, দোয়াও চাই। দুনিয়ার এত কিছু থাকতে পেপে-গাছের সঙ্গে আমার মত এক বঙ্গাল ছবি উঠালে মুখ দেখাব কেমন করে, লোকেই বা বলবে কী! "ইজ্জতের ফালুদা" নামের একটা শব্দ বাজারে চালু আছে আমার বেলায় হত, "ইজ্জতের পাপাইয়া"।
কী-এক প্রসঙ্গে পিটার বলল, 'বলো তো আমার বয়স কত হবে'?
আমি পিটারের মুখের ভাঁজ-টাজ গুণে বললাম, 'ষাটের কাছাকাছি হবে'।
পিটার হাসি লুকিয়ে বলে, 'বাড়াবা না কমাবা'?
আমি বলি, 'তাহলে ২ বছর কম'।
পিটার হা-হা করে হাসে, 'আমার এখন বাহাত্তুর চলছে'।
পিটারের নিবাস সুইজারল্যান্ডে। আমি বলি,
'তোমাদের সুইজারল্যান্ডের বাতাসেও কী বাটার-টাটার ভেসে বেড়ায় নাকি। এখনও দেখছি তোমার চামড়া বাটার-চকচকে'।
পিটার এটা-সেটা কথার ফাঁকে আমাকে বলে, 'তা আমাকে একজন সুখি মানুষ বলতে পার। এক ছেলে এক মেয়ে। ওরা যার-যার জীবন নিয়ে সুখি। হাত-পা ঝাড়া...'।
আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ে, 'তোমার বউ'?
পিটার বলে, 'ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে'।
আমি দুঃখিত হয়ে বলি, 'সরি,  তাহলে তো তোমাকে লাকি ডগ বলা যাচ্ছে না'।
পিটারের অমায়িক হাসি, 'আরে না-না, আমার গার্ল ফ্রেন্ড আছে তো'।

শোনো কথা! আর আমাদের দেশে বাহাত্তুর বছর বয়সে কেউ বেঁচে থাকলে তাকে আশেপাশের লোকজনেরা পারলে জীবিতই কবরস্থ করার চেষ্টা করবে।

কোণায় রাখা ছিল ওটা। কেমন করে এর চোখে পড়ে। আমার কাছে জানতে চাইল, 'এটা কি, এটা দিয়ে কী করো? এটা কি সিলভারের'?


আসলে এর ভাল নাম আমি জানি না। মুচিরা এটাকে বলে, তিন ঠেইংগা। আমি বললাম, 'এটা দিয়ে জুতা সেলাই-টেলাইয়ের কাজ হয়। আর এটা আমার বালকবেলার এক বন্ধুর যে জুতা সেলাইয়ের কাজ করত। ও বেঁচে নেই আমি স্মৃতি হিসাবে এটা রেখে দিয়েছি'।

এবার আমি রগড় করে বলি, 'আর শোনো, এটা সিলভার না, আসলে কিন্তু গোল্ড। আমি সিলভার কালারের রং করে রেখেছি এই কারণে যেন কেউ বুঝতে না-পারে। দেখো, তুমি কিন্তু আবার কাউকে বলবে না যেন যে এটা গোল্ড তাহলে কিন্তু আমার জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যাবে'।
পিটার রসিকতায় হা-হা করে হাসে, 'বেশ-বেশ, তা খানিকটা গোল্ড আমার গার্লফ্রেন্ডের জন্য দিয়ে দাও'। পরক্ষণেই অবাক হয়ে বলে, 'বলো কী! তুমি এত বছর ধরে এটা আগলে বসে আছ'!

আমি গভীর শ্বাস ফেলে বলি, 'পিটার বিষয়টা তুমি বুঝবে না কারণ তোমরা হচ্ছো টবের গাছ। আজ এখানে তো কাল ওখানে। আর আমরা হচ্ছি নারকেলগাছ—আমাদের শেকড়-স্মৃতি অনেক, অনেক দূরে ছড়িয়ে থাকে। ওই যে তুমি বললে না তোমার সন্তানেরা যার-যার জীবন নিয়ে আছে তুমিও হাত-পা ঝাড়া। আমরা কিন্তু নতুন-পুরাতন হাড় বুকে জাপটে ধরে রাখি, আমৃত্যু। এই যে ব্যাগটা দেখছো এটা আমার মার। সে মারা গেছে ক-বছর হলো কিন্তু আমি এখনও আমার মার পুরনো কয়েকটা হাড়ের জন্য হিংস্র কুকুরের মত লড়ব'।

পিটার বেশ কিছুক্ষণ ঝিম মেরে রইল তারপর বলল, 'সুইজারল্যান্ড আসো, তোমার একটা ভাল চিকিৎসা হওয়া প্রয়োজন'।
চিকিৎসাটা যে আমার মাথার পিটার এটা সম্ভবত ভদ্রতা করে বলেনি...!

* পিটারকে আমি স্টেশনে এগিয়ে দিতে যাচ্ছি। আমি এবং পিটার রিকশায়। স্টেশনের অনেক আগেই পুলিশ আমাদেরকে নামিয়ে দিল। পিটার আমার কাছে জানতে চাচ্ছিল, ল-অফিসার (কন্সটেবল) কেন রিকশা যেতে দিচ্ছে না!
আমি মিথ্যা খুব কম বলি কিন্তু চোখের পলক না-ফেলে মিথ্যা বললাম, 'সামনে একটা ঝামেলা হয়েছে তোমার নিরাপত্তার কারণে...'!

আমি পিটারকে কেমন করে বলি, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ট্রেনে আসা উপলক্ষে স্টেশনে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যে পিটারের দেশে প্রধানমন্ত্রীকে লাইনে দাঁড়িয়ে কফি নিতে হয় সেখানে একজন মন্ত্রীর জন্য স্টেশনে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ!
আমি মনে-মনে প্রমাদ গুনছি, পিটার যেন কোন প্রকারেই আসল ঘটনা না জানে। আসলে এখানে আমি কেউ না—একজন ভীনদেশীর সামনে গোটা বাংলাদেশের পক্ষে আমি দাঁড়িয়ে আছি। ভাগ্যিস, আইনমন্ত্রীর ট্রেন আসার পূর্বেই পিটারের ট্রেন চলে এলো।  
আমি চেপে রাখা শ্বাস ছাড়লাম!
... ... ...
পিটার পরে আমাকে মেইলে জানিয়েছিল সুন্দরবন দেখে তার নাকি মুগ্ধতার শেষ নেই। তার নাকি ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না।

পিটার আমার কাছে জানতে চেয়েছিল: তুমি নিশ্চয়ই অনেকবার সুন্দরবন গেছো? তবুও বলব, চলে এসো। হোয়াডা লাইফ, ম্যান!

আমি হে-হে করে এমন একটা উত্তর দিয়েছিলাম যে, তা-বটে, তা-বটে জীবনে এতবার সুন্দরবন গেছি যে আমার সুুন্দরবন দেখলে বুকে হাঁপ উঠে। কিন্তু আমি মারাত্মক ব্যস্ত এই গ্রহ নিয়ে ভাবাভাবি শেষ হচ্ছে না বিধায় যেতে পারছি না।
পাগল, আমি কী পিটার যে জীবনের গাল টিপে বলব, জীবন তোকে চাবকে দিলাম। ভাগ্যিস, পিটার বঙ্গালদেশের ভাষা জানে না নইলে এটা বিলক্ষণ জেনে যেত যে আমি জীবনেও সুন্দরবন যাইনি! আমার মত বাতিল একজন মানুষের কোথাও যাওয়া হয় না আসলে...!


No comments:

WhatsApp