Wednesday, June 24, 2020

জ্বী দাদা, আমরা এমনই!

চীন বাংলাদেশকে শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে। এই দুনিয়ায়, দুনিয়ার বাইরেও সবাই নিজের বন্দনা খুব ভাল বোঝে, ইশ্বরও! এখন চীন কেন বাংলাদেশকে এই সুবিধা দিল-ল-ই এই নিয়ে আমাদের ভারত মহোদয়ের মারাত্মক গাত্রদাহ হচ্ছে। হতেই পারে। এই সব লুকিয়ে রাখারই নিয়ম কিন্তু দাদারা পারে না।
ওয়াল্লা, আমি যে দাদা বলে ফেললুম। এখন আমার কী হপে গো, গোবর খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে? দাদাদের দাদা বললে আমাদের  দেশের কারও-কারও গায়ে খুব লাগে! একবার এক বুদ্ধিজীবী টাইপের পোলা এক লেখায় দাদার উল্লেখ থাকায় খুব নাগ করলেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় আমি ইয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছি বলে বিরাট 'লিকচার' দিলেন। অথচ এই 'লুকই' ম্যাসেন্জারে আমার অর্জনের কিছু তথ্য শেয়ার করলেন।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওই কৌতুকটা জানে কি না? এক বুড়া বাইকের পেছনে 'লাড়কি' নিয়ে বেরিয়েছেন। অথচ লাইসেন্স বাড়িতে। সার্জেন্ট বিরক্ত হয়ে বললেন, যেটা বাড়িতে রাখার কথা সেটা নিয়ে বেরিয়েছেন আর যেটা নিয়ে বের হওয়া কথা...।
তো, এরপর থেকে এই সব 'জিপি' ('ঘোলা পানি' যারা খায়, গাধা) ফিল্টারে আটকে যাওয়া মানুষদের সঙ্গে বাতচিতে যাই না। 

যাই হোক, মূল প্রসঙ্গে আসি। ভারতের একটা পত্রিকা দুম করে ছাপিয়ে দিল:

মোদ্দা কথা  আমরা 'খয়রাতি লুক'! 'অনন্দবজর'-এর (এরা আবার আমাদের দেশের লোকজনের নামগুলো ঠিক মত উচ্চারণ করতে পারেন না, তোতলান। দেখে-ঠেকে আমরাও শিখেছি। আমরাও তোতলাই) বাংলাদেশে প্রতিনিধি ২জন। অন্জন রায় এবং কুদ্দুস আফ্রাদ কিন্তু এরা সবেগে মাথা নেড়ে বলেছেন, নেহি-নেহি, কাভি নেহি- আমরা এই নিউজ পাঠাইনি!
অন্জন বলিলেন:
কুদ্দুস বলিলেন:

'অনন্দবজর' আমাদেরকে নিয়ে খেলে এটা নতুন কিছু না। না গদ্য-না কবিতা, না প্রবন্ধ, না আবর্জনা তসলিমার 'লজ্জা' বইটা নিয়ে [১] এরা যা করেছিলেন তা নোংরামির শামিল!
"আনন্দবাজার তসলিমাকে ঘটা করে পুরষ্কার দিল। আনন্দবাজার গং তসলিমার 'লজ্জা' বইটা ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করল। এর পেছনে আনন্দবাজার গং এমন মেধা খরচ করল যে সেই বইটার লক্ষ-লক্ষ কপি বিক্রি হলো। চারদিকে আগুন লেগেই ছিল বইটা প্রকাশ করে কেবল আগুনটা উসকে দেয়ার অপেক্ষায় ছিল।" 

'অনন্দবজর'-এর দাদাগিরি নতুন না। আমাদের দেশের 'বুদ্ধিধোঁয়াজীবী'রা কুৎ করে একটা বই প্রসব করেই অনন্দবজরের সর্দারদের প্রণামি দিয়ে আসতেন। 'প্লেনে জায়গা না-পেলেও দাঁড়িয়েও চলে গেছেন'।
আফসোস, সেই বইয়ের গতি হত ট্র্যাশ ক্যান!

ভারত ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা করেছে। আমরা কৃতজ্ঞ, আমরা নতজানু। আমি অবশ্য সেই কু-তর্কে যাই না ভারতের কী লাভ হয়েছিল বা হয়েছে। আমরা দেখব মুদ্রার এই ভঙ্গি। দাতার হাত উপরে গ্রহীতার হাত নীচে। 
কেউ-কেউ বলে বেড়ান ১৯৭১ সালে মহান ভারত আমাদের কাছ থেকে সুতাটি পর্যন্ত নিয়ে গেছে। ওরা এও বলে, পাকিস্তানের আটক ৯৩০০০ হাজার সৈনিকদের যে অস্ত্রগুলো তা-ও হাপিস হয়ে গেছে। আহা, এই রকম করে বলাটা আমি সমীচীন মনে করি না। আমি দুঃখ প্রকাশ করি। এখনও তো আমরা খাল-বিলে কখনও-সখনওদু -একটা মরচেপড়া শেল-টেল খুঁজে পাই তো!

থাকুক সেইসব কথা 'আকথা-কুকথা'! তবে আমরা খুবই ভাগ্যবান। ট্রাম্প এবং মোদিকে পেয়েছি। 'বাহুত বাড়া গণতান্ত্রিক কান্ট্রি' এই দেশদ্বয় সঠিক দিশাতেই আছেন। গুজরাট দাঙ্গার কারিগর কেবল দাঙ্গাতেই পারদর্শী না [২]:
"দেখা যেতো, মোদি যে শহরেই যান, সেই শহরেই কিছু মানুষ তাঁকে ঘিরে জটলা তৈরি করে এবং তাঁর পক্ষে স্লোগান দেয়। জার্মান গোয়েন্দারা সেসব জটলায় বেশ কিছু কমন ফেস আবিষ্কার করেছিল। সহজেই বোধগম্য, সেসবও ছিল খানিকটা তৈরি করা। দেখানো যে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়।"

ভারত বাদ দেয়নি সীমিত আকারে আমাদের নদ-নদি, রাস্তাঘাট। তিতাসের বুক চিরে রাস্তা হয়েছে [৩]:
"হা ঈশ্বর! এরা এই তিতাসের এ কী অবস্থা করেছে? লেখার শুরুতে যেটা বলেছিলাম, এখন ওই শিরোনামটাই বুকের ভেতর থেকে পাক খেয়ে উঠছে, 'তিতাস এক ধর্ষিতার নাম'! 'তিতাস একটি নদীর নাম'- কে বলে? এখন তিতাস একটি খালের নাম!"

আহা, আমাদের সুন্দরবন []:
"Suicidal deal with Indian company must be scrapped:
"Language does not always express the truth. It also hides the truth and even glorifies falsehood. For example, Bangladesh and India have recently taken up a joint venture to set up a $1.5 billion 1, 320MW coal-fired power plant at Rampal near the Bangladesh part of Sundarban while the joint venture has been named as Bangladesh-India Friendship Power Company..."

ভারতের রেললাইনও লাগবে। তাতে বিশাল সাশ্রয় হবে ভারতের পরিবহণ খরচ। বেশ! আমরাও চাই যোগাযোগ উন্নত হোক কিন্তু এখানেও ছোট্ট একটা কিন্তু আছে। আজমপুর দিয়ে পাকিস্তান আমলেই ভারতের সঙ্গে রেল যুক্ত করার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু ওদিক দিয়ে রেল বসলে ভারতের আগরতলা এয়ারপোর্টের হয়তো খানিকটা সমস্যা হয়। তো, উপায়?
'হামলোগ হ্যায় না'- আমরা আছি তো! এখন রেলের জন্য বাংলাদেশের ১০ কিলোমিটার জমি প্রয়োজন। সরাও স্থাপনা, ফসলি জমি। আর ভারতের আগরতলায় মাত্র ৫ কিলোমিটার। তাও আবার ওরা ওদের জমি নষ্ট করবে না অধিকাংশ রেল বসবে মাথার উপর মানে ফ্লাইওভার টাইপের।

আহ-হ, শুটিং প্র্যাকট্রিসের কথা আমরা নাই-বা বললাম। বিএসএফ বাংলাদেশের হাজার-হাজার মানুষ মেরে তাঁর হাতের টিপ ঠিক রাখে। অথচ [৫]:
"বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান গতকাল বিবিসিকে বলেছেন, "বিএসএফ মাঠপর্যায়ের নিয়মনীতি (গ্রাউন্ড রুল) বারবার ভঙ্গ করছে। গ্রাউন্ড রুলে এ জাতীয় অনুপ্রবেশের ঘটনায় কোনো অবস্থায় গুলি ছোড়া যাবে না...।"
চীনাদের সঙ্গে ভারতের যে সীমিত আকারে মারামারি হল। ভুল বললাম, মারামারি না হাতাহাতি হল ওখানে নিয়ম অনুযায়ী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। তাহলে বাংলাদেশের বেলায় এরা গুলি করে কী দিয়ে! গুলতি দিয়ে?

ভারত চীনকে বলছে আমাদের জায়গা ফেরত দাও। ওদিকে আবার মোদি মহোদয় বলছেন ভিন্ন কথা। চীন নাকি ভারতে ঢুকেইনি। তা বাবা, মারামারি হলো কোথায়:

মোদি মহোদয় এই কারণে আনন্দিত হলেও খোদ ভারতের চৌকশ যোদ্ধারা মন খারাপ করে বসে আছেন:

ভারত ছাড় দেয়নি আমাদের শিশুদেরকেও []:
"সীমান্ত থেকে পাঁচ শিশুকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ"। এদের মধ্যে একজনের বয়স সাত, আরেকজনের আট!...এ খবর লেখা পর্যন্ত অনুরোধ করার পরও বিএসএফ পতাকা বৈঠকে সাড়া দেয়নি।"

এরা আমাদের লোকজনকে কেবল পেটায় না, উলঙ্গ করে পেটায়। শরীরে পেট্রল পুশ করে [৭]:
"এটা (ভিডিও) দেখার পর কোনো মানুষের পক্ষে সুস্থ থাকা সম্ভব না। মানুষটা যখন এদের পা জড়িয়ে মা-মা বলে চিৎকার করছিল তখন আমার কেবল মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল ইচ্ছামৃত্যু থাকলে বেশ হতো..."

এদের দেশের কারখানার গু-মুতে ভাসিয়ে দেয় সব[]
"ভারতের ত্রিপুরার রাজ্যে যে সমস্ত কারখানা আছে ওই সব কারখানার সমস্ত রাসায়নিক বর্জ্য দাদারা সবটা ঢেলে দেন বাংলাদেশে। এই বিপুল ফেনার উৎস সেই সমস্ত রাসায়নিক বর্জ্য।"

নো-ম্যনস ল্যান্ডে কাঁটা তারের বেড়া জোর করে বসাবার অজস্র উদাহরণ আছে ভারতের।

বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে লোকজন ধরে নিয়ে যাওয়া:

আমাদের আভ্যন্তরীন বিষয়ে আপনাদের দেশের লোকজনেরা যে প্রকারে মার্চ করে আমাদের এখানে চলে আসতে চান:
"এই দেশ যেমন একজন মুসলমানের তেমনি একজন হিন্দুরও। কারও প্রতি কারো অন্যায়-রাগ-ক্ষোভ-অভিমান থাকলে সেটা আমরা নিজেরাই নিজেরা ঠিক করব।
আপনারা কে? আপনাদের এখানে কী কাজ! ভাগ্যিস, আপনারা আসার সুযোগ পাননি"

অথচ আসিফা নামের বাচ্চাটার সঙ্গে যা করা হয়েছে তা এই বিশ্বে বিরল [১০]:
"ক) ইতিপূর্বে কোনো ধর্ষণের কেসে জাতীয় পতাকা হাতে ধর্ষকদের সাপোর্টে মিছিল বেরোয়নি। হ্যাঁ জাতীয় পতাকা। তেরাঙগা!
খ) এর আগে কোনো রেপ কেসে কেউ বলেনি ধর্ষকদের এরেস্ট করলে গায়ে আগুন দেব।
গ) এর আগে কোনো রেপ কেসে, উকিলেরা দলবদ্ধ ভাবে পুলিশকে কোর্টে চার্জশিট জমা দিতে বাধা দেয়নি, তাও 'জয় শ্রীরাম' ধ্বনি দিয়ে।
ঘ) এর আগে মন্দিরে পুরোহিত, সিস্টেম (পুলিশ) এবং অন্যান্যরা এইভাবে ধর্ষণযজ্ঞে মেতে ওঠেনি।"

কেমন করে খেলতে হয় মাঠে এটাও কী চমৎকার করেই না শিখিয়েছেন:

দেখুন না, আমরা কত উদার জাতি আপনাদের প্রেসিডেন্টের সামনে আমাদের সবাই কেমন দাঁড়িয়ে থাকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত!

আসলে প্রতিবেশীদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখাবার কোন প্রকার আগ্রহ নাই ভারতের। এই নেপালি ভদ্রলোকের কথা শুনলে খানিকটা বোঝা যাবে। ভাগ্যিস, এই আগুনমানুষটা চোখে দেখতে পান না:


নেপালেও যে ঘটনাটা ঘটেছে:


এমনিতে ইন্ডিয়ান আর্মির বুদ্ধির নমুনা দেখে আমরা 'অভাক'!



'খয়রাতির টাকা' বলায় আমাদের দেশের অনেকে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আমি বিনয়ে সঙ্গে বলি, যে দেশ আপনাদেরকে এত কিছু দিচ্ছে, দিতে-দিতে এরা তো গরীব হয়ে যেতেই পারে। গরীব হয়ে গেলে খয়রাতি টাকা নিতে দোষ কোথায়, বলুন?
তবে এটা দেখেও ভাল লাগছে আমরা এমন বড়লুকের প্রতিবেশী:
কী সাহস আপনাদের, মনে করেন বাংলাদেশ আপনাদেরই একটা প্রদেশ! খুলনা-সিলেটের একটা অংশ আপনাদেরকে ছেড়ে দিতে হবে [১১]।
তারপরও আমি আশাবাদী মানুষ। আশা করছি ভারত তার ভুল বুঝতে পারবে এবং প্রতিবেশীদের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখাবে। আফসোস, বড়ই আফসোস! লেখাটা যখন শুরু করেছি ঠিক তখনই ভারত গুলি করে মেরেছে আমাদের লোককে:


আপডেট: ০৩.০৭.২০২০
আসলেই আমরা বড় বিচিত্র জাতি! এমন একটা জাতি এই গ্রহে বিরল!
অথচ ভারত আমাদের দেশের লোকজনকে স্রেফ পাখির মত গুলি করে মারছে। এটার জাস্ট মানববন্ধনের আগের ঘটনা:

মানববন্ধনের ঘটনাটা ছিল দিনাজপুরের!! কিন্তু তারচেয়েও ভয়ংকর ঘটনা হচ্ছে এটা:
আমাদের মিডিয়া। ওরা দিনাজপুরের ঘটনাটাই ছাপিয়েছে কিন্তু শিরোনাম করেছে, "ভারতের সমর্থনে জেলায় জেলায় মানববন্ধন।" মোদ্দা কথা, কোন জেলাই বাদ নাই। কিন্তু বাস্তবে দিনাজপুর ব্যতীত অন্য কোন জেলায় এই ঘটনা ঘটেনি। ঘটলে আমি ওই জেলার নামটা জানতে আগ্রহী।

শুয়োর প্রাণীটা কুৎসিত কিন্তু ছাল ছাড়াবার পর বড়ই মোহনীয়- চর্বিতে চকচক করে। এবার নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা গল্পের কথা বলি। গল্পের নাম হচ্ছে, 'একটি এডভেঞ্চার কাহিনী'। গল্পের শুরুটা হয়েছে এমন, "...ব্যাপারটা এত গম্ভীর আর গুরুতর যে, অতি সাবধানে চলতে হবে আমাকে। সামনে যে দুঃসাধ্য কর্মযোগ, তাতে যদি সিদ্ধিলাভ করতে পারি- তাহলে এক অক্ষয় কীর্তির অধিকারী হব আমি।"
গা ছমছমে এক এডভেঞ্চার কাহিনী। পাঠক ক্ষণে-ক্ষণে শিহরিত হন। গল্পটা শেষ হয়েছে এভাবে, "আমি একটা ইলিশ মাছ কিনতে গিয়েছিলুম।"
এই গল্পের প্রসঙ্গ নিয়ে আসার কারণটা এই, যে ইলিশ মাছ এমন মহার্ঘ  সেই মাছ আমরা মাথায় করে দিয়ে আসি। তো, নিজের ইয়ে নিজে দিয়ে আসলে কী আর করা...।

সহায়ক সূত্র:

No comments: