Search

Monday, July 11, 2022

অদেখা স্বর্গ...!

লেখক: Symon Abdullah (লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)
"কাশ্মির বেড়ানোর প্ল্যান ছিলো ২০১৯ এ। ইন্ডিগো এয়ারের টিকেট কাটা ছিলো, শ্রীনগরে একরাতের জন্য হোটেলও বুক করেছিলাম। মোটামুটি ছক আঁকা ছিলো কোথায় বেড়াবো, কি করবো। সে সময়েই খবর এলো ৩৭০ ধারা রদের। সব ফ্লাইট ক্যান্সেল, কাশ্মির সবার জন্য নিষিদ্ধ! সেবার আর কাশ্মির যাওয়া হয়নি। ঘুরে এসেছিলাম শিমলা, মানালি। এরপর এলো করোনাকাল। ২ বছর সমস্ত ঘোরাঘুরি বন্ধ।
এবছরের শুরুতে যখন সবকিছু মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে এলো, তখনই ভেবে রেখেছিলাম এবার কাশ্মির দিয়েই বেড়ানো শুরু করবো। ২/৩ বছর আগের বেড়ানোর প্ল্যান তখন আর মনে নেই, তাই নতুন করেই সব শুরু করতে হলো।
ইচ্ছে ছিলো, কাশ্মিরের এমন কোথাও যাওয়া যেখানে সচরাচর কেউ যায়না। সেই চিন্তা থেকেই গুগল করলাম 'অফবিট ট্রাভেল ডেস্টিনেশান্স অফ কাশ্মির' লিখে। প্রথমেই যে নামটি এলো তা ছিলো 'Chatpal' (পরে জেনেছিলাম স্থানীয়রা বলে ছাতাপাল/ছাটপাল)। গুগল ম্যাপ সার্চ করে মাত্র একটা রিভিউ পেলাম জায়গাটার। তবে রিভিউটা বেশ ডিটেইল ছিলো। সেখানে পেয়ে গেলাম স্থানীয় এক ট্যুরিস্ট পুলিশের ফোন নাম্বার। ভদ্রলোকের নাম আলতাফ। কি ভেবে তাকে হোয়াটসএপে নক করলাম। রিপ্লাই পাবো আশা করিনি। কিন্তু আমাকে অবাক করে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই রিপ্লাই দিলেন।
এমন রিমোট প্লেসে ফরেনারস এলাউড কিনা সে ব্যাপারে আমার মনে খটকা ছিলো। তাই প্রথমে এটাই জানতে চাইলাম তাঁর কাছে। তিনি জেনে জানাবেন বলে আমাকে আশ্বস্ত করলেন। তখনই বুঝে গেলাম যে জায়গাটা আসলেই রিমোট প্লেস এবং বিদেশি ট্যুরিস্টের আনাগোনা একেবারেই নেই।
দু'দিন পরে আলতাফ ভাই নিজেই হোয়াটসএপে নক করে জানালেন যে ফরেন ট্যুরিস্ট এলাউড। আমরা চাইলে আসতে পারি।
 
ভ্রমণের সময় হয়ে এলো। শ্রীনগরে পৌঁছে চলে এলাম বুক করে রাখা হোটেলে। শ্রীনগরে বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে স্থানীয় অনেককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম এই ছাতাপালের ব্যাপারে। মজার ব্যাপার হলো, কেউই বলতে পারলো না জায়গাটা কোথায়। কিভাবে যাবো সেটা তো পরের ব্যাপার। মনে মনে যখন ভাবছি, আলতাফ ভাইকে নক করতে হবে, তখনই প্রথম লিড পেলাম। হোটেলের ওউনার ইলহাম ভাইকে বলতেই তিনি বলে উঠলেন তোমরা এই জায়গার নাম কিভাবে পেলে! আমাদের উল্টো প্রশ্ন, আপনি জানেন তাহলে এটা কোথায়? কথায়-কথায় জানলাম ২০১৪/১৫ সালের দিকে সুইডিশ এক গেস্ট এসেছিলো তাঁর হোটেলে, সে গিয়েছিলো ছাতাপাল। বললো আমরা যেনো ট্যুরিস্ট রিসেপশান সেন্টারে যোগাযোগ করি। ওরা হেল্প করবে।
 
চলে গেলাম ট্যুরিস্ট রিসেপশান সেন্টারে। ততদিনে শ্রীনগরে আমাদের ৩/৪ দিন থাকা হয়ে গেছে। মোটামুটি কি লোকেশন/পয়েন্ট গুলো চেনা হয়ে গেছে। টিআরসিতে অনেকগুলো ডেস্ক। একেক ডেস্কে একেকজন বসে আছেন ট্যুরিস্টদের ইনফরমেশান দেয়ার জন্য। একটা ডেস্কে গিয়ে ছাতাপালের ব্যাপারে জানতে চাইলাম। তার চোখের শূন্য দৃষ্টি দেখে বুঝলাম সে জানে না। সে আমাকে আরেকটা ডেস্ক দেখিয়ে দিলো। সেই ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্ক। কিন্তু এবারের ডেস্ক ফাঁকা। কেউ নেই। কিঞ্চিৎ সন্দেহ হল, এরা আসলেই জানে তো? নাকি না-জেনে ইচ্ছে করে ফাঁকা ডেস্কে পাঠিয়েছে। হা হা হা। যাই হোক, অপেক্ষা করলাম। রিসেপশান সেন্টারটি চমৎকার। বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ম্যাগাজিন, প্যামফ্লেট দিয়ে ঠাসা।
 
১৫/২০ মিনিট অপেক্ষার পর সেই ডেস্কের অফিসার এলো। তাকে বলতেই সে জানতে চাইলো আমরা কয়দিন থাকতে চাই ওখানে। মনে খুশির বাজনা বেজে উঠলো, যাক, সঠিক যায়গায় এসেছি। আমাদের সামনেই তিনি ফোন করলেন, আচাবাল টিআরসিতে। বললেন বাংলাদেশ থেকে গেস্ট যাবে, তারা যেনো প্রিপারেশান নিয়ে রাখে। আমাকে একটা নাম্বার দিয়ে বললেন ওই নাম্বারে যেনো কমিউনিকেট করি।
টিআরসি থেকে বের হয়ে কল করলাম ওই নাম্বারে। কথা হলো বিলাল সাহেবের সাথে, আচাবাল টিআরসির তত্ত্বাবধায়ক। তাকে জানালাম আমরা আসছি কালই।
 
তখন পর্যন্ত জানিনা ওখানে কিভাবে যাবো। শুধু জানি দুই ভাবে যাওয়া যায়। ইজি ওয়ে, কার রেন্টাল, ডিফিকাল্ট (আসলে মোটেও ডিফিকাল্ট না) কিন্তু এডভেঞ্চারাস ওয়ে, পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট। নক করলাম আলতাফ ভাইকে। এবারে জানতে চাইলাম পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে কিভাবে ছাতাপাল আসা যায়? আলতাফ ভাই আমাদেরকে চমৎকার করে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে আসতে হবে। লালচক থেকে আনন্তনাগ, আনন্তনাগ থেকে চিতারগুল, চিতারগুল থেকে ছাতাপাল। এরপর আলতাফ ভাই বললেন, আমরা চাইলে তিনি আনন্তনাগে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবেন। শ্রীনগরে তিন-চার দিন থেকে আমাদের যে অভিজ্ঞতা, তাতে আমরা বুঝে গেছি যে উনি কথার কথা বলছেন না। আমরা চাইলে তিনি সত্যিই আনন্তনাগে চলে আসবেন আমাদেরকে রিসিভ করার জন্য। কাশ্মিরিদের এই ভালোবাসা, অতিথিপরায়নতা, আর হেল্পিং এটিটিউড আমরা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেছি।
 
পরদিন রওনা হলাম। নভো ট্যাক্সিতে ( কাশ্মিরের উবার/ওলা) রাজবাগ থেকে লালচক। লালচক থেকে শেয়ার্ড ট্যাক্সিতে (এটাই পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট, ১০ সিটের টাটা ট্রাভেরা) করে আনন্তনাগ। ৫২ কিলোমিটারের জার্নি। সহযাত্রীদের সাথে গল্প করতে করতে দেড়/দু'ঘন্টার মধ্যে চলে এলাম আনন্তনাগ ডিস্ট্রিক্ট-এ। কাশ্মিরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশান পেহেলগামে যেতে হলেও এ দিক দিয়েই আসতে হয়।
এবার চিতারগুলের গাড়ি খোঁজার পালা। এক বয়স্ক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতেই তিনি দেখিয়ে দিলেন সামনের দিকে। হেঁটে এগুতেই তিনিও আমার সাথে এগুতে লাগলেন। বুঝে গেলাম উনি আমাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেবেন। এই ছোট ছোট জেসচার গুলোই কাশ্মিরিদের আর অন্য সবার চেয়ে আলাদা করেছে। উনার তো ওদিকে যাবার কথাই না। কিন্তু আমরা যেহেতু অতিথি, তিনি একেবারে হাতে ধরে আমাদেরকে চিতারগুল ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে নিয়ে গেলেন। ধন্যবাদ দিয়ে উঠে বসলাম আরেকটা শেয়ার্ড জিপে। এখান থেকে চিতারগুল হয়ে ছাতাপাল আরও ৪৫ কিলো।
এর মধ্যে আলতাফ ভাইয়ের সঙ্গে হোয়াটসএপে যোগাযোগ হচ্ছে। আলতাফ ভাই বললেন, চিতারগুল পৌঁছে যেনো তাঁকে কল করি, উনি শেয়ার্ড জিপের ড্রাইভারের সাথে কথা বলবেন।
গাড়ি ছেড়ে দিলো। কে পি রোড ধরে ছুটে চলেছে আমাদের শেয়ার্ড জিপ। এই রোড ধরে এগিয়ে গেলে শেষ মাথায় পড়বে পেহেলগাম। আমরা কিছুদূর গিয়ে রাইট টার্ন নিলাম। শুরু হল পাহাড়ি উঁচু নীচু রাস্তা। রাস্তা চমৎকার কিন্তু প্রচুর টার্ন। আর তাই দূরত্ব খুব বেশি না হলেও চিতারগুল পৌঁছতে প্রায় ঘন্টা তিনেক লেগে গেলো। চিতারগুল ছোট একটা পাহাড়ি বাজার। এখান থেকে আমাদের গাড়ি চেঞ্জ করে আরেক গাড়িতে ওঠার কথা। কিন্তু অন্য কোন গাড়ি চোখে পড়লো না। এ সময়ে মনে পড়লো আমার তো আলতাফ ভাইকে ফোন করার কথা। কল দিলাম। উনি আমাদের শেয়ার্ড জিপের ড্রাইভারের সাথে কথা বললেন। তারপর আমাকে জানালেন, এই গাড়িই আমাদের ছাতাপাল পর্যন্ত নিয়ে যাবে। চিতারগুল থেকে ছাতাপাল ৮/১০ কিলোমিটার।
অবশেষে পৌঁছে গেলাম ছাতাপাল। ছবির মত একটা জায়গা। একটা মিডোতে টিআরসির তিনটা কটেজ। চারিদিকে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়, পাহাড়ের চুড়োয় সাদা বরফ আর মাঝখানে এই মিডো। কটেজের পেছনে পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফগলা পানির তীব্র ধারা। এ এক অন্য জগত।
ছাতাপাল পৌঁছে দেখা হলো গুলজার ভাই আর রায়েস ভাইয়ের সাথে। দুজনেই ট্যুরিস্ট পুলিশ। আমরা আসবো বলে তাদেরকে এখানে ডেপ্লয় করা হয়েছে। আলতাফ ভাইও আসবেন তবে একদিন পর। দেখা হলো কাদের খান্ডের সাথে। উনি এখানকার তত্ত্বাবধায়ক কাম চিফ কুক। তার হাতের রান্না ভুলবো না কখনই :D ।
ছাতাপালে আমরা দু'দফায় সাত দিনের মত ছিলাম। পায়ে হেঁটে ঘুরে বেরিয়েছি আশেপাশের তিনটে গ্রাম, দারদপোড়া, চাকলিপোড়া আর থিমরান। আতিথেয়তা পেয়েছি প্রতিটি গ্রামেই। বরফগলা পানির আপস্ট্রিম ধরে বরফের টুপিপড়া পাহাড়ের পায়ের কাছে গিয়েছি। উপরে ওঠার সাহস হয়নি যদিও।
আনটাচড নেচার যে কতটা ব্রেথটেকিং হতে পারে তা ছাতাপাল না আসলে অজানাই থেকে যেতো হয়তো।"

1 comment:

রায়হান said...

সম্ভব হলে দয়া করে আলতাফ ভাইয়ের হোয়াটসাপ নাম্বার জোগাড় করে রাখবেন। লেখকের জন্য ভালবাসা।