Saturday, July 18, 2020

জনক

লেখক: Hassan Bipul (লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)
"একজন আদর্শ বাবা বলতে যে ছবিটি সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আমার বাবা সম্ভবত তেমন কেউ ছিলেন না।
আজ যখন তাকে নিয়ে ভাবি, আমার সামনে বরং এমন একটি জীবন ভেসে ওঠে যার মধ্যে নানামুখী বৈপরিত্য দেখতে পাই।  অনেকের বাবা অনেক কিছু করেছেন, সন্তানদের গর্ব করে অনেক কথা বলতে শুনি।

Image may contain: 1 person
‌'বীর মুক্তিযোদ্ধা' কথাটি আমি তার বেলায় বলতে পারব না, তিনি সশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দেননি। তবে এটাও ঠিক, করাচিতে '৭১ সালের আগে যে কয়বছর তার পোস্টিং ছিল, মা'র কাছে শুনেছি, সরকারি চাকুরিতে তার মুখ দিয়ে এক অক্ষর উর্দুও বের করা যায়নি। উর্দুভাষী কোনো সিনিয়র অফিসারের সঙ্গেও নয়। সমস্যা হয়েছিল, কিন্তু টলেননি।

খুব ছোট বেলায়, তখন স্কুলে ভর্তিও হইনি, কোনো এক আত্মীয় আমাকে বললেন, 'তোর বাবাকে জিজ্ঞেস কর তো তার ডাক নাম কি'?
শিখিয়ে দেওয়া কথামতো তাকে প্রশ্ন করলে প্রথমে তিনি জবাব দিতে চাননি। কয়েকবার একই প্রশ্ন করার পর গালে একটি প্রচণ্ড চড় খেয়ে কাঁদতে-কাঁদতে ফিরে এসেছিলাম। বাবার হাতে চড় খাওয়ার সেইটি আমার প্রথম স্মৃতি। তার ডাকনামটি উর্দু শব্দ থেকে নেওয়া ছিল। চড় খেয়ে জেনেছিলাম, ১৯৫২ সালের পর ওই নাম তিনি ত্যাগ করেছিলেন।
১৯৮৬ সালে সম্ভবত তিনি সরকারি চাকুরি থেকে অবসরে যান, ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন। ওই সময় প্রথম আমাদের বাসার জন্য টিভি কেনা হল। ন্যাশনাল টিভি, সাদা-কালো। অসম্ভব টেকসই বলে মোটামুটি এটি সে সময় জাতীয় টিভি সেট হয়ে উঠেছিল। সেই টেকসই টিভি আমাদের বাসায় বেশিদিন টিকল না।
কারণ কী? কারণ হল বাবা রাত ৮টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে টিভিতে খবর দেখতে বসতেন। সংবাদ শিরোনাম শেষ হওয়ামাত্র বাদবাকী খবর যখন শুরু হতো, তার প্রথম লাইনটিই হতো- ‍‍'রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ বলেছেন...', এই লাইন যেন শুনতে না হয় সেজন্য তিনি টিভির নব ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন আর অসম্ভব জোরে মুচড়িয়ে টিভি অফ করতেন। ওই টিভি অফ করতে হত ভলিউম কমিয়ে শেষ মাথায় এনে। বছরখানেকের মধ্যে টিভির অন-অফ সুইচের দফারফা।

অসম্ভব হিসেবি এই মানুষটি সারাজীবন টাকাপয়সা যেন 'অপচয়' না-হয় সেই চেষ্টা করে গেছেন। সেই হিসেবি ছেলেবেলায় আমার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত ছিল অফিস থেকে বাবার বাসায় ফেরার সময়টি। শার্টের পকেটে হয় কখনো ৫-৬টি নাবিস্কো ক্যান্ডি যেটা সে সময় পাইনঅ্যাপল লজেন্স নামে পরিচিত ছিল অথবা গোটা দশেক সুপার বিস্কিট পাওয়া যেত। আমাদের পাশের বাসার এক ভাড়াটে বাবার বেতন জিজ্ঞেস করলে বলেছিলাম ১০০ টাকা। প্রতি মাসের শুরুতে বেতনের টাকা থেকে ১টাকার একটি চকচকে বান্ডল বাসায় আসত যা আমার জন্য ছিল অসম্ভব লোভনীয়। আর আমার চোখে ওটাই ছিল তার বেতনের একমাত্র নিদর্শন।
খুব ছোটবেলায় আমার একটি খেলা ছিল তার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে যাওয়া এবং নামাজে বসলে পেছন থেকে তার গলা ধরে পিঠে ঝুলে থাকা। সেজদায় যখন যেতেন, আমার পজিশন থাকত তার পিঠের ওপর লম্বলম্বি শোয়া অবস্থায়। সারাজীবন দেখে এসেছি দিনে পাঁচবার প্রার্থনায় বসেছেন। অথচ ধর্ম নিয়ে তিন ছেলের কারো ওপরই কখনো তার কোনো কঠোর নির্দেশনার কথা মনে পড়ে না। কেবল একটা নির্দেশ ছিল তার- 'পড়, ভাল করে পড়ালেখা কর, নইলে কপালে দুঃখ আছে'।

প্রাইমারি স্কুলে পড়ার বয়সেই পিতৃমাতৃহীন হওয়ায় তার জীবনের শুরুটা হয়েছিল অর্থকষ্টে আর সীমাবদ্ধতার মধ্যে। শেষের দিকে লেখাপড়া করেছেন অন্যের বাড়িতে লজিং থেকে। সম্ভবত জীবনের সেই কষ্টের স্মৃতি সবসময়ই তাকে তাড়িয়েছে, যার কারণে ওই সাবধানবাণী- 'কপালে দুঃখ আছে'। আবার অতীতে ফিরে তাকিয়ে দেখি তিন ছেলের কাউকেই তিনি পড়ালেখার বিষয় নিয়ে নিজের মত চাপিয়ে দেননি।  ছেলেবেলায় কখনো মনে পড়ে না আদর করে দু'একটি কথা তিনি বলেছেন।
গোটা ছোটবেলায় তার জন্য যে অনুভূতি মনের মধ্যে কাজ করত তার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল ভয়। অথচ কী সবালীলভাবে প্রতি বিকেলে তার হাত ধরে রেললাইন বরাবর হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছি মহাখালী পর্যন্ত!  রাজ্যের ম্যাপ আর অ্যাটলাস ছিল বাসায়, এখনও আছে। সারা দুনিয়ার কোথায় কোন দেশের রীতিনীতি কেমন তা ছিল তার জানা। ভূগোল হজম করে থাকা এই ভদ্রলোক কখনো কোনো দেশে বেড়াতে গিয়েছেন এমন কোনো নজীর নেই, কেবল বুড়ো বয়সে বড় ছেলের কাছে নিউ ইয়র্কে যাওয়া ছাড়া। আবার গল্প জমে উঠলে বোঝা যেত তার প্রাণ পড়ে আছে ওয়াইল্ড ওয়েস্টে, টেক্সাসের র‌্যাঞ্চে আর ইওরোপে আল্পসের চুড়ায়।

একসময় মনে হত পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর মানুষ সম্ভবত আমার বাবা। চলে যাওয়ার ক'দিন আগে হসপিটালের বিছানায় সারারাত আধো ঘুমে থাকা মানুষটির মাথার কাছে বসে থেকে মনে হচ্ছিল এমন নরম চেহারায় তাকে কখনো দেখিনি। বিছানার পাশে টাইলস লাগানো দেওয়ালে হেলান দিয়ে আমি বসা। আমার এক হাত তার মাথায় চুলে বিলি কাটছে। যখনই আমার হাতের নড়াচড়া কমে যাচ্ছে অমনি তার চোখ খুলে যাচ্ছে। মাথার দিকে তাকিয়ে তিনি যেন আমাকে খুঁজছেন। আবার বিলি কাটতে শুরু করলে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। একটু কি আরাম পাচ্ছিলেন তখন? আমার কখনো জানা হবে না।

আজ এত বছর পরে যখন ভাবি বাবা কী দিয়ে গেছেন আমাদের, একটু একটু করে যেন পরিষ্কার হয় জবাবটি। ভদ্রলোক তার গোটা জীবন দিয়ে স্রেফ একটি উদাহরণ তৈরি করে গেছেন।  শূন্য থেকে শুরু করে কীভাবে কোনো আদিখ্যেতা, আড়ম্বর আর আফসোস ছাড়া একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায় তার নিদর্শন সম্ভবত তৈরি করে গেছেন ভদ্রলোক।
লেখা: ১৮ জুলাই, ২০১৬ ছবি: জানুয়ারি ২০০৫, সম্ভবত টিভিতে টেস্ট ক্রিকেট দেখার সময়। "

1 comment:

সাব্বির said...

আহা, কোত্থেকে কোত্থেকে আপনি সোনা ছেকে আনেন!