Search

Wednesday, September 16, 2009

নেংটি পরা মানুষ আর নেংটি ইঁদুর, পার্থক্য কী!

আজকাল ভাবছি পত্রিকা পড়া বন্ধ করে দেব। আমার মস্তিষ্ক পত্রিকার সব খবর গ্রহন করার জন্য তৈরি হয়নি! যখন পড়ি, এতিম ছোট-ছোট ২৬টা বাচ্চা তাদের লালনকারী মহিলার কাছে অনবরত বকে যায়, 'মা আমাদের এই ইদে জামা দিবা না'? মহিলা এই বাচ্চাদের কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ান। কী তীব্র এই বাচ্চাদের চোখ- কার সাধ্যি এই বাচ্চাদের চোখে চোখ রাখে?

যখন পড়ি, ইদের একটা জামার জন্য অভিমানি বালিকা আত্মহত্যা করেছে। নিমিষেই আমার গোটা ভুবনটা এলোমেলো হয়ে যায়। তখন নিজেকে বড়ো তুচ্ছ, দীন-হীন মনে হয়।
আসলে নেংটি পরে ঘুরে বেড়ানো কোন কাজের কাজ না। নেংটি পরা মানুষ নিজেই একটা বোঝা, ও আর বোঝা টানবে কী! 'দারিদ্রতা মোরে মহান করে' এটা কোন শালা বলেছে, কোন শালা? একে হাতের নাগালে পেলে স্রেফ খুন করে ফেলতাম। ভাগ্যিস, আমার কাছে ব্রক্ষাস্ত্র নাই নইলে গোটা গ্রহটাকে উড়িয়ে দিতাম। পরে হয়তো মনখারাপ-করা শ্বাস ফেলতাম। লাভ কী, একবার ছুঁড়ে ব্রক্ষাস্ত্র তো আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না!

সব কেমন জট পাকিয়ে যায়। অদেখা ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে। সুতীব্র ইচ্ছা, সুদীর্ঘ একটা শীতনিদ্রার বড়ো প্রয়োজন। এই শীতনিদ্রা শেষ হতেই হবে এমন দিব্যি কে দিয়েছে?
 

ইদ-পুজা নামের উৎসবগুলোকে আমি আলগা চোখে দেখি। অজান্তেই মুখখানা ঢলঢলে-কমনীয় হয়ে উঠে। কেবল কী স্মৃতি কাতরতা, উঁহু? আমার কেবলই মনে হয়, এইসব উৎসব আছে বলেই এখনও আপ্রাণ চেষ্টা করেও মানুষ পুরোপুরি রোবট হতে পারছে না- তীব্র অনিচ্ছায়ও শেকড় ছেটে দিতে পারছে না। আমরা তো আর অন্য দেশের লোকজনের মত শেকড়হীন মানুষ না। আমরা যে নারকেল গাছ- শেকড় ছড়িয়ে গেছে অনেক দূর। শেকড়টা 'দেশের বাড়ি' নামের এক ছায়া-ছায়া ভুবনে; অজস্র স্মৃতি, মাটির সোঁদা গন্ধ। (ভাগ্যিস, এটা নিয়ে এখনও ব্যবসাটা জমে উঠেনি!) যেখানে অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকে স্বজন, দৌড়ে পিছিয়ে যাওয়া মানুষগুলো। ওখানে ফিরে যাওয়ার কী তীব্র আকুলতা! আহারে, যান্ত্রিক মানুষ, চাইলেই কী আর ফিরে যেতে পারে। একটা উছিসা তো প্রয়োজন। উৎসব-পার্বন সেই সুযোগটা করে দেয়। খানিকটা এ ভাবনা, সামনে বছর হয়তো আর ফিরতে পারব না। মন্দ কী- মন্দের ভালো।

কিন্তু কালে কালে বুদ্ধিমান মানুষ এটাকে কদর্যতায় পরিণত করেছে, এই দেশে তখন সবচেয়ে বেশি দু-নম্বুরি হয়। নির্বোধরা এদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠে। রেস জেতা নিয়ে কথা, উটের পিঠে-গলায় শিশু ঝুলিয়ে দাও, শিশু মরল কী বাঁচল তাতে কী আসে যায়।

প্রায়শ বেসুমার টাকাওয়ালা হতে ইচ্ছা করে। কে জানে, তখন কী বদলে যেতাম? একটা মানুষ কতটা বদলায়? আমূল বদলে যায় কী? জানি না। তবুও স্বপ্নগুলো আমায় ছাড়িয়ে যায়। স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নাই- আফসোস, আজকাল আমরা স্বপ্ন দেখাই ভুলে গেছি।

Sunday, September 13, 2009

ওরে জীবন, তোকে বলি, দূর-দূর!

এখন আমি ভারী অকাজের একজন মানুষ। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠারও তাড়া নাই। গদাইলস্করি চালে ঘুম থেকে উঠলে আমাকে জানানো হলো একজন আমাকে খুঁজে গেছেন। মানুষটার বিস্তারিত বর্ণনা শুনে থমকে যাই। হায় খোদা, আগুনমানুষটা আমাকে খুঁজে গেছেন! কেন-কেন?
এই দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আমার বেশ কিছু আলাপচারিতা হয়েছিল, প্রচলিত ভাষায় যাকে সাক্ষাৎকার বলে। মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা দিক জানতে পেরেছি এই মানুষটার কল্যাণে। যুদ্ধকালিন সময়ে মানুষটার সাহস দেখে আমার 'ব্রেভহার্ট' মুভিটার কথা মনে পড়ে যেত। একজন মানুষের এমন সাহসের উৎস কোথায়, কেমন করে পারে একজন মানুষ এমন সাহস দেখাতে? যে মানুষটার ভয়ে পাক-আর্মি থরথর করে কেঁপেছে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার কথা জড়িয়ে আসত। আমি ছল করে তাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করতাম- আমার মতো একজন ভীতু মানুষের মধ্যে যদি কোন এক উপায়ে খানিকটা সাহস সঞ্চারিত হয় যদি! কী যে লোভ আমার!
এই আগুন মানুষটা আমাকে খুঁজে গেলেন আর আমি কিনা দিব্যি ঘুমাচ্ছিলাম। কী লজ্জা!

মানুষটাকে খুজেঁ বের করি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কথা বলছি। কিন্তু মানুষটার মধ্যে খানিকটা অন্যমনস্কতা, অসঙ্গতি লক্ষ করি- কোথায় যেন সুর কেটে গেছে। আজ আগুনমানুষটাকে বড়ো ভঙ্কুর-অসহায় দেখায়। বয়সে অনেক বড়ো এই মানুষটা আমাকে আদর করে মামা বলেন। অনেকক্ষণ ইতস্তত করে বলেন, 'মামা, তুমার তো নিজেরই অনেক সমস্যা। দেড় বছর ধইরা কিছু করো না, রুজিপাতি নাই। কেমনে যে তুমারে কই। না কইয়া কী করুম কও, আর কার কাছে কমু কও, কওয়ার কুনু জায়গা নাই, বুঝলা। আচ্ছা মামা, তুমি জাকাত তো এইবার দিবা না, না? না-না, বুঝতাছি; কোত্তিকা দিবা! আচ্ছা মামা, ফিতরা থিক্যা যদি কিছু টাকা আমারে দিতা। বাচ্চাগুলা বড়ো যন্ত্রণা করতাছে...'।

তিনি বিজবিজ করে আরও কীসব বলছিলেন আমি বুঝতে পারছিলাম না কারণ আমার চোখে জল। ঝপ করে কোত্থেকে জলে চোখ ছাপাছাপি। জনসমুদ্রে আমি চোখের জল লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

.........
মানুষটার নাম বলে তাকে আর অসম্মান করি না- তাঁর এই অসহায়ত্ব আমার বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখি। এখন নিজের উপর এতটাই রেগে আছি- নিজের মুখে নিজেই থুথু দিতে ইচ্ছা করছে। কী হয় এইসব ছাতাফাতা লেখালেখি করে। আমার ধারণা, যাদের কিছুই করার সামর্থ্য নাই এরাই আমার মত লেখার চেষ্টা করে। এদের লেখালেখির নাম করে হাতি-ঘোড়া খুন করা ব্যতীত আর করার কিছুই নাই। আমি অভিশাপ দেই এদের। আমি নিশ্চিত হিজড়ারা লেখালেখি করলে ভাল করতে পারতেন!
দূর-দূর! এতো সীমাবদ্ধতা নিয়ে পৃথিবীতে আসার আদৌ প্রয়োজন ছিল না। মস্তিষ্কে গাদাগাদি করে থাকা এইসব কষ্ট বয়ে বেড়াতে হতো না।

কোন রাজাকার ভাবাপন্ন কার সঙ্গে কে খিচুড়ি খেয়েছে- কে কোন তেলের ড্রামের উপর দাড়িয়ে ঘোষণা দিয়েছে- বালকবেলায় কে বাথরুমে বসে দেশ স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখেছে, এইসব চুলচেরা বিশ্লেষন নিয়ে আমাদের জীবন কাবার। অন্যত্র তাকাবার সময় কোথায় আমাদের।
আমি আগেও লিখেছিলাম আমাদের দেশটা বড়ো বিচিত্র
বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের জন্য সমগ্র দেশের চোখের জলে পাটলুন ভিজে যাচ্ছে। অথচ এই মানুষটাই কী বেদনা নিয়েই না বলেছিলেন:
"এত সংবর্ধনা, সম্মান দিয়ে আমার কী হবে! সংবর্ধনা বিক্রি করে দিরাই বাজারে এক সের চালও কেনা যায় না"। (প্রথম আলো)

আধুনিক ইদ নামের অসভ্য এই পর্বে আপাদমস্তক অসৎ বাবার বখা মেয়ে লাখ টাকা দামের হাঙ্গা নাকি লেহাঙ্গা কিনবে এটা মিডিয়া খুব ফলাও করে জানাবে কিন্তু কত বাবার কত সন্তান একটা কাপড়ের টুকরার জন্য আত্মহত্যা করবে এটা আমাদের জানা হবে না। কারণ এইসবের তথ্য ভ্যালু নাই!

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কতই না আবেগ আমাদের! কী অবলীলায় আমরা ভুলে যাই জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনকে। হায়রে অসভ্য আমরা, যে মানুষটা স্মৃতিসৌধ নির্মান করল, উদ্বোধনের দিন তাকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি, অনুষ্ঠান চলাকালিন ঢুকতে দেয়া হয়নি।
এই মানুষটার হাত সবাই ছেড়ে দিয়েছে (এটা ২০০৬ সালের কথা, এখনকার তথ্য আমার কাছে নাই)। তখন অপ্রকৃতস্থ, পশুর মত জীবন-যাপন করছিলেন; তেমন কেউ এগিয়ে আসেনি। শ্লা, এই দেশে আই পি, ভি আই পির পল্লী হয়। ওখানে এই দেশের সেরা সন্তানদের জায়গা না হয়ে হয় কতগুলো চোরচোট্টার!

ফাদার মারিনো রিগন। যে মানুষটাকে উচিৎ ছিল মাথায় করে রাখা তাঁকে চরম অপমানিত করেছি আমরা। মানুষটা বারবার কাতর অনুরোধ করেছেন তাঁকে এই দেশের নাগরিকত্ব দিতে। ৩৭ বছরে ধরে আমরা গা করিনি, মাত্র অল্প ক-দিন পূর্বে তাঁকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে!

কী অবলীলায়ই না আমরা বিস্মৃত হই লালুর কথা , ভাগিরথীর কথা, প্রিনছা খেঁ , বীরাঙ্গনা রীনাউক্য চিং-কে ১০০ টাকার প্রাইজ বন্ড দিয়ে সম্মান জানাই! (শেরাটনের বল-রুম ব্যতীত আমরা তো আবার মুক্তিযুদ্ধের কথা গুছিয়ে বলতে পারি না!)

১৬ ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা সুরুয মিয়া আত্মহত্যা করেন এতে আমাদের কোন শোক নাই, লাজ নাই! আত্মহত্যা করায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন হবে কিনা এই নিয়ে মাথা ঘামাতে গিয়ে স্যারদের চুল যায় যায়! লজ্জায় আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে।

এই দেশেই সম্ভব তাহেরের মত অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসিতে ঝোলাবার নাম করে স্রেফ খুন করা। কোনও শারীরীক প্রতিবন্ধীকে ফাঁসি দেয়ার কোন আইন আছে? এটা জানার আমার প্রচন্ড আগ্রহ। হায় সভ্যতা, হায় সোনার বাংলা!

একজন গোলাম আযমগোলাম আযমকে আজ অবধি ১ দিনের জন্যও আটকে রেখে শাস্তি দেয়া গেল না। গোলাম আযম নাগরিকত্ব পাবেন কিন্তু ফাদার মারিনো রিগনের বেলায় যত সমস্যা! স্রেফ লম্বা লম্বা বাতচিত, এতে আমাদের ক্লান্তি নাই! মতিউর রহমান নিজামীর গাড়িতে এই দেশের পতাকা উড়ে পতপত করে এতে আমাদের কোন সমস্যা নাই- স্বাধীনতা হয়ে যায় বাদামের খোসা(!)। হায়, শুয়োরখেকো প্রিন্স হ্যারীকে সামান্য একটা পোশাকের কারণে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেও পার পেতে বেগ পেতে হয়!
জজ সাহেব কত ন্যায়ই না আমাদের দিয়েছেন। এই জজ সাহেবকে খুঁজে বের করা হয়েছে কী?

একজন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে লাথি মেরেছে যে সোনার ছেলেটি, আজ অবধি তাকে ধরা হয়েছে বলে তো শুনিনি!

মুক্তিযুদ্ধ মানেই বিশেষ দল, মুক্তিযোদ্ধা মানেই বিশেষ কিছু মানুষ- এ থেকে আমাদের মুক্তি নাই! মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জাগলিং করবেন যখন যার যেমনটা ইচ্ছা করবে। কে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ছিলেন এটা নিয়ে আগামি আরও ৩৮ বছর আমরা বাহাস করব, ইনশাল্লাহ!

গোটা বছর শীত-নিদ্রায় থেকে, নব্য মুক্তিযোদ্ধা হওয়া, বছরের বিশেষ মাসে চোখের জলে কপোল(!) ভিজিয়ে ফেলা কোন কাজের কাজ না।

Saturday, September 12, 2009

একজন ব্যর্থ পুরুষ

মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেল। নড়বড়ে সাকোটা ধরে ধরে পেরিয়ে যায় একেকটা দিন- হায় দিন! মৃত্যু এসে গা ছুঁয়ে বলবে, এই পাগল তোকে ছুঁয়ে দিলাম। এই দীর্ঘ সময় কী করলাম, কিচ্ছু না! যে ছটাকখানেক মনন নিয়ে এসেছিলাম তাও অব্যবহৃত পড়ে রইল!
আফসোস, এ নিদারুণ অপচয়ের কোন মানে হয় না। আনন্দ নারায়ন মুল্লার সুরে সুর মিলিয়ে বলতে ইচ্ছা করে:
'জীবন ছিল এক যন্ত্রণার মদ, খানিকটা চুমুক দিলাম; সবটাই গড়িয়ে গেল'।
এখনও প্রায়শ ভাবি আমি আসলে কী হতে চেয়েছিলাম? বালকবেলায় আমার বন্ধুদের দেখে দেখে কখনও মুচি হতে চাইতাম কখনও-বা ধোপা। সে বড় সুখের সময়, টলটলে পানির মত!
এখনও ইচ্ছাটা লালন করি, বড় সাধ, কোন এক অজানা শহরে যদি মুচির কাজ করতে পারতাম, অন্তত একদিনের জন্য হলেও।   
বড় হয়ে সব কেমন জট পাকিয়ে গেল। আমাদের কতশত সীমাবদ্ধতা, আমরা অনেকেই পছন্দের জীবন বেছে নিতে পারি না।
দীর্ঘ সময় এক বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে আমাকে জড়াজড়ি করে থাকতে হয়েছে, ঘোর অনিচ্ছায়। যে কোন ভাবেই হোক এই জড়াজড়িটা বাদ গেছে বলে আমি তীব্র সুখী- নইতো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এদের সংগে  ঝুলে থাকতে হতো।

শ্লা, একটা মানুষও হতে পারলাম না। পরীক্ষার পড়া পড়তে আমার ভাল লাগত না। প্রচলিত অর্থে, বলতে গেলে প্রায় অশিক্ষিত একজন মানুষ! টেনেটুনে গ্রাজুয়েশন করে কিছুদিন আইন নিয়ে পড়লাম, একগাদা মিথ্যার বেসাতি। ভাল লাগল না, ছেড়ে দিলাম। (আমি চোখ বন্ধ করে দিব্যি দেখতে পাচ্ছি, উকিল সাহেবরা দাঁত কিড়মিড় করে প্রায় ভেঙ্গে ফেলার উপক্রম করছেন)।

যখন থেকে দু-কলম লেখার চেষ্টা শুরু করলাম তখন থেকে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। এখানেও জটিলতা, আতেঁলদের সঙ্গে বনিবনা হতো না।
আসলে লিখিই বা কী ছাতাফাতা, নিজের লেখা নিজে পাঠ করে আর যাই হোক লেখক হওয়া যায় না। কিছুটা সময় কাঠপেন্সিল নিয়ে ঘসাঘসি করে আঁকার চেষ্টা করলাম। একবার কুমির আঁকলাম। একজন বললেন, 'তুমি এইটা টিকটিকি আঁকছ, রাইট'?
কী কষ্ট-কী কষ্ট! কালে কালে হয়ে গেলাম একটা 'জিরো' ক্রমশ আ বিগ জিরো...।

আমার নিজেকে কেন যেন জেমস জয়েসের সেই চরিত্রটির মত ব্যর্থ পুরুষ মনে হয়। জয়েসের 'A portrat of the Artist as a Young man'-এর নায়ক স্টিফের ডেডেলাসের জবানীতে:
"a medical student, a oarsman, a tenor, an amateur actor, a shouting politician, a small land lord, a small investor, a drinker, a good fellow, a storyteller, somebody's secretary, something in distillery, a tex gatherer, a bankrupt and at present a praiser of his own past."

Friday, September 11, 2009

সাগর ছুটে আসে...

­সেই দিন আর নাই, বাহে! দিন পাল্টেছে। সময়ের কঠিন দাবী- কুয়ার কাছে মানুষকে এখন আর যেতে হয় না, কুয়াই মানুষের কাছে চলে আসে।
বাংলা একাডেমি সারদের এতদিনে বোধোদয় হয়েছে। চলমান জ্ঞানের ভান্ড একেকজন- এঁরা যে সর্বদা সোজা হয়ে থাকতেন, কাত হতেন না। জ্ঞান গড়িয়ে পড়ে যদি। সর্বনাশ হওয়ার বাকি থাকবে বুঝি! হায়, এঁরা আজঅবধি স্পেল-চেকারসহ একটা ডিজিটাল অভিধান বের করতে পারেননি। তাহলে আমাদের মত সাধারণদের বড় উপকার হয় যে।

কাজের কাজ যেটা করেন ঘটা করে একটা বইমেলার আয়োজন। লাভের লাভ যা হয় ধুলার কল্যাণে মুফতে আমাদের গায়ের রং বদলানো যায়। মেলায় আগে মুত্রত্যাগের ব্যবস্থাও থাকত না। ভাবখানা এমন, মুত্র জমিয়ে রাখুন; আখেরে কাজ দেবে। এখন আরামই আরাম- মনের আনন্দে ব্লাডার খালি করা যায়। যাক বাবা, এখন এটলিস্ট মুত্রত্যাগ করা নিয়ে ঘিলু খরচ করতে হয় না।

এঁরা আরেকটা কাজ বিমল আনন্দের সঙ্গে করেন সেটা হচ্ছে, ফি-বছর সরকারপ্রধানকে দিয়ে বইমেলা উদ্বোধন করানো। সরকারপ্রধানকে শামসুর রাহমান পর্যন্ত অমায়িক হাসিতে সঙ্গ দিয়ে কৃতার্থ হয়েছেন।

একবার এক রাষ্ট্রপ্রধানের বই মেলায় বের হল, 'টোকাইরাও মানুষ' বা 'টোকাই বলে এরা কি মানুষ নয়' এই টাইপের কিছু একটা। কারা কারা এই বই খরিদ করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন এটা জানা যায়নি, তবে এটা নিশ্চিত আমি আত্মহত্যা করিনি। এই বিষয়ে কারও সংশয় থাকলে এসে দেখে যেতে পারেন, এই বেলা আমি কী-বোর্ড নিয়ে ধস্তাধস্তি করছি। মরি নাই...।
তো, তৎকালিন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের কাছে যখন জানতে চাওয়া হলো, সরকারপ্রধান কেন মেলা উদ্বোধন করেন থাকেন? তিনি বললেই পারতেন ক্ষমতার জোরে কিন্তু তিনি লগবগ করে বিমোহিত হয়ে পুচ্ছ আন্দোলিত করতে করতে বললেন, 'তিনি (সরকারপ্রধান) একজন বিশিষ্ট লেখক হিসাবে উদ্বোধন করছেন, এতে সমস্যা কোথায়'?

লে বাবা, তিনি দিকি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। না-না, সার, সমস্যা হবে কেন, তবে লেজটা দুপায়ের ফাঁকে লুকিয়ে রাখতে তো দোষ নাই! আহারে, দেশে আর বিশিষ্ট লেখক ছিল না, না! আফসোস, বড়ই আফসোস, বিশিষ্ট লেখকগণ তখন কী বৈদেশে গমন করিয়াছিলেন জ্যোৎস্না কপকপ করে খাওয়ার জন্য।

বাংলা একাডেমির ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা 'উত্তরাধিকার' যোগাড় করা যে কী জটিল একটা কাজ ছিল এটা যারা ঢাকার বাইরে থাকেন তারা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। একাডেমির নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র ব্যতীত পাওয়া যেত না। সারদের আবার অনেক কায়দা-কানুন। ওমুক দিন আসুন তো তমুক দিন কাশুন ইত্যাদি ইত্যাদি। আহারে, একটা 'উত্তরাধিকার' কখনও কখনও একজন মানুষকে কতটা কাতর করে দেয়!
বাংলা একাডেমীর একজন উপ-পরিচালককে
­উত্তরাধিকার ­অন্যত্র কেন পাওয়া যায় না এটা জিজ্ঞেস করলে, এটার উত্তরে তিনি দম্ভভরে যা বলেছিলেন তা আমার মোটেও পছন্দ হয়নি।

আজকাল এঁরা 'উত্তারিধাকার' অন্যত্র কেবল বিক্রয়ই করেন না, একগাদা টাকা খরচ করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেন! এঁদের দেরিতে হলেও সু-বোধের উদয় হয়েছ এই ঢের। আমার মত
­গন্ডগ্রামে থাকা ­অতি সাধারণ মানুষ কৃতার্থ বোধ করছে। সময়ে যে খোলনলচে বদলাবার প্রয়োজন হয় এটা এঁদের কে বোঝাবে! এ গ্রহে ডায়নোসর নাই, সোভিয়েট ইউনিয়ন নাই, আদমজি জুটমিল নাই বাংলা একাডেমি কোন ছার!

*ছবিঋণ: প্রথম আলো

Tuesday, September 8, 2009

শুকরিয়া ডট কম

নিজের সাইটে প্রথমে লেখা শুরু করলাম ওয়ার্ডপ্রেসে। বাহ, দু-চারজন দেখলাম কষ্ট করে এসে পড়েও যান! বেশ অনেকটা সময় এখানে লেখা হলো। কে যেন বলেছিল ব্লগার-এ লিখে নাকি টাকা-পয়সা পাওয়া যায়।
তখন আমার টাকা-পয়সার বড় প্রয়োজন। যে বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে কাজ-কারবার করতাম
তাদের সঙ্গে বিরাট ভেজাল হলো। যুদ্ধ ঘোষণা হয়ে গেল। একটা অসম যুদ্ধ! এদের কাছে লেজার গান, ব্লাস্টার, বেসুমার টাকা আর আমার কাছে গুলতি। তবুও আমি পিছ-পা হলাম না। নীতির প্রশ্ন, একজন মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন। মর্যাদাহীন একজন মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজন কী! নিজের লাশ নিজেই কাঁধে বয়ে বেড়ানো কোন কাজের কাজ না।
এই যুদ্ধ এখনও চলছে।
এই বহুজাতিক কোম্পানি এই দেশে অন্য কারও সংগে এমন অন্যায় করার আগে দ্বিতীয়বার ভাববে। অন্য দেশে, অন্যের ঘরে গিয়ে যে মাস্তানি চলে না এটা এদের বিলক্ষণ টের পাওয়ার কথা।

এমনিতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আমাদের মত হাভাতে দেশে এমন রসিয়ে রসিয়ে গলা কাটবে কেউ টেরটিও পাবে না বরং বিমলানন্দে গলাটা পেতে দেবে। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানিকে মানুষ হুদাহুদি গালি দেয়- আজকালকার বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এদের বাপেরও বাপ!

যাই হোক, টাকা-পয়সার বিরাট সমস্যায় পড়ে গেলাম, একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা।
কখনও এমনও গেছে চুল কাটাবার পয়সা নাই। একবার তো চুল হয়ে গেল ইয়া বড়। অনেকদিন পর দেখা হল এমন একজন বলেছিলেন, 'এইবার তুমারে লেখকের মত দেখা যাইতাছে'। শ্লা, এই হয়েছে এক যন্ত্রণা। লেখক হওয়ার দেখি ভারী হ্যাপা। চুল থাকতে হয় বড় বড়, গালে হাত দিয়ে পোজ দিয়ে ছবি তুলতে হয় (তিনি যে কতবড় ভাবুক এটা প্রমাণ করতে হবে না!), ওড়নার মত একটা চাদর গলায় ঝুলিয়ে রখতে হয়। এই কারণে আমি আজীবন লেখার চেষ্টাই করে যাব কখনও লেখক হতে পারব না। আফসোস...!

কী করি-কী করি! মুশকিল হয়ে গেল যে বড়, আমি দু-কলম লেখার চেষ্টা ব্যতীত আর কিছুই তো শিখিনি, পারি না।
বৈষয়িক বিষয়ে আমার উদ্যোগ উদাসিনতা গয়ংগচ্ছ-কুড়েঁমি টাইপ!
যাই হোক, ব্লগার-এ লিখলে গুগল টাকা-পয়সা দেয় যখন আমি ওয়ার্ডপ্রেস থেকে ব্লগারে লেখা শুরু করলাম। পরে জানা গেল বাংলা সাইটগুলো গুগলের দু-চোখের বিষ। এরা বড়জোর চার আনা পয়সা দিলেও দিতে পারে মুড়ি-কটকটি খাওয়ার জন্য। তবে ব্লগারের অনেক কিছুই আমার পছন্দ হল। মুড়ি খাওয়ার পয়সা না পাওয়া যাক, আমি মনের আনন্দে হাবিজাবি লিখতে খাকলাম। যখন লিখি তখন জাগতিক সব বেদনা তুচ্ছ মনে হয়। কোন সহৃদয় পাঠক পড়েন তখন মনে হয় এই মানুষটাকে যেন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারি। জনান্তিকে বলি, দেখ পাগলু, কেমন ছুঁয়ে দিলাম।
লেখার সুখ, তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা কী- চরম ভালবাসাবাসির আনন্দ কোন ছার?

ওইসময়। বড় সাধ, আকাশে উড়াই ফানুস! ইশশ, নিজের যদি একটা সাইট হত আলী মাহমেদ ডট কম। কিন্তু আমার যে কোন ক্রেডিট কার্ড নাই, কেমন কেমন করে একটা সাইট কিনতে হয় ছাতাফাতা এইসব জটিলতাও ভাল বুঝি না- থাকি ছাতার গ্রাম টাইপের একটা জায়গায়। অন্যদের সাইটগুলো দেখে লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলি- বাতাসে মিলিয়ে যায় সেই বেদনার শ্বাস।

একদিন
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মাহবুব সুমন একটা মেইল করলেন, আপনার জন্য গুগল থেকে আলী মাহমেদ ডট কমটা কিনতে চাই, ব্লগস্পটের লেখাগুলোও হুবহু অবিকল থাকবে। না করবেন না।
অরি আল্লা, মানুষটা বলে কী- মানুডা পাগলু নাকি!
তিনি ওখানে বসে বসে কি কি সব কলকাঠি নাড়লেন। একদা দেখি 'আলী মাহমেদ ব্লগস্পট' 'আলী মাহমেদ ডটকম' হয়ে গেছে। অজান্তেই আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ে, শুকরিয়া।

কেউ আমাকে কিছু দিলে অনাবশ্যক বিব্রত হই কিন্তু তখন আমি মোটেও বিব্রত হলাম না। মমতায় মাখামাখি হাত ফিরিয়ে দেয় কোন বুরবাক!
এখন শুনতে পাই ইনি
(মাহবুব সুমন) নাকি ২০১২ পর্যন্ত সাইটটা কিনে রেখেছেন! ২০১২ পর্যন্ত আমি বেঁচে থাকব কিনা জানি না কিন্তু আমার এইসব আবর্জনা থেকে যাবে- তারায় তারায় ঘুরপাক খেতে থাকবে। কেউ কোন একদিন কোন একটা লেখা পড়ে হুশ, দূর-দূর বলে পত্রপাঠ বিদায় হবে। বিচিত্র কারণে কারও হয়তো কোন একটা লাইন ভাল লেগেও যেতে পারে, তখন তাঁর মনটা অন্য রকম হবে। তখন আমি অন্য ভুবনে কোথায় থাকব এটা বলা মুশকিল- কে জানে, বাই এনি চান্স, সেই ভাল লাগার একটা অংশ হয়তো বা আমায় ছুঁয়ে যাবে।

*মাহবুব সুমন মেইল করে জানিয়েছেন, "
আমার নাম উল্লেখ করা ঠিক হয় নাই"। তাই তো! যারা এই পোস্টটা পড়বেন তাঁরা মাহবুব সুমন নামটা বাদ দিয়ে পড়বেন । হা হা হা।

Monday, September 7, 2009

কালিদাস কহিলেন...

একদিন রতিক্রিয়াকালে মহাদেব যখন প্রিয়ার (পার্বতি) মুখকমলের মধুপানে মত্ত ছিলেন তখন দেখলেন, একটি পারাবত রতিমন্দিরে প্রবেশ করছে।
...
পরক্ষণেই দেবাদিদেব মহাদেব পারাবতের অলৌকিক আকৃতি দেখে সন্দিহান হয়ে তার তথ্য জানার জন্য চিন্তা করে দেখলেন, অগ্নিদেবই এই মায়া বিহঙ্গমূর্তি ধারণ করে এসেছেন। তখন তিনি তার সম্ভোগ নিকেতনে অগ্নির গুপ্তভাবে ছদ্মবেশে প্রবেশের জন্য ক্রোধে ভ্রূভঙ্গি করে রুদ্রমূর্তি হয়ে উঠলেন।
তা দেখে দেবহুতাশন (অগ্নিদেব) নিজমূর্তি ধারণ করে ত্রাসে কম্পিত ও স্খলিত অঞ্জলিপুটে স্মরশাসন মহাদেবকে বলতে লাগলেন:
'হে প্রভু, আপনি ত্রিজগতের একমাত্র অধিশ্বর। আপনি সর্বদাই স্বর্গবাসী দেবতাদের বিপদ বিনাশ করে থাকেন।
...
আপনি প্রিয়ার প্রেমাবেশবশে থেকে নিভৃতে নির্জনে কতকাল অতিবাহিত করলেন। দেবরাজ ও অন্যান্য দেবগণ আপনার দর্শন না পেয়ে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছেন।
...
হে সর্বজ্ঞ, আপনার সেবার অবসর প্রতীক্ষা করার পর ইন্দ্রানি দেবগণ আমাকে অনুরোধ করায় আমি সময়োচিত বিহঙ্গরূপ ধারণ করে আপনার অন্বেষণে এখানে এসেছি।'
...
শঙ্কর তখন দেব হুতাশনের সেই সঙ্গত প্রার্থনা শুনে প্রসন্ন হলেন।
...
এদিকে উর্ধ্বনেত্রা মহাদেবের সুরতক্রিয়ায় ব্যাঘাত হওয়ায় যুগান্তকালাগ্নির মত অসহনীয় রেতঃ স্খলিত হলো। তখন তিনি সেই অমোঘ বীর্য অগ্নিতে নিক্ষেপ করলেন।
রুদ্রুদেবের জ্বলন্ত অনলসদৃশ অমোঘবীর্য নিক্ষেপের ফলে অগ্নির বিশুদ্ধ দেহ সহসা উষ্ণনিঃশ্বারসর বাতাসে দূষিত মুকুরের মত অতিশয় বিবর্ণ হয়ে উঠল।
(কুমারসম্ভব, নবম সর্গ)

এদিকে বহ্নি মহাদেবের নিক্ষিপ্ত মহাতীব্র রেতঃ শরীরের মেখে দেবসভা মধ্যে সুরগণপরিবৃত দেবরাজের নিকট উপস্থিত হলেন।
...
দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বহ্নি বলতে লাগলেন...:
'(মহাদেবের) কামকেলি অকস্মাৎ ভঙ্গ হওয়ায় তাঁর দুর্বিসহ অমোঘ বীর্য স্খলিত হলো। কিন্তু ত্রিজগদ্দাহক সেই অসহ্য বীর্যধারণক্ষম অন্য কোন আধার না পেয়ে উপস্থিত আমার দেহের উপর নিক্ষেপ করলেন। 
...হে বাসব, অজস্র ও অতি মহৎ সেই বীর্য দ্বারা আমি অতিশয় দগ্ধ হচ্ছি।'
...
দেবরাজ অগ্নিকে বললেন, হে হব্যবাহন, তুমি আর বিলম্ব করো না গঙ্গায় গমণ করো।
...তুমি তাঁর সলিলমধ্যে নিমগ্ন হলে তিনি তোমার উৎকট তাপ নির্বাপিত করবেন।
...
অগ্নি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সুরতরঙ্গিনীর অভিমুখে যাত্রা করলেন।
...
তখন তাপার্ত অগ্নি গঙ্গার জলে নিমগ্ন হলেন।...। অগ্নি তখন বিপদনাশিনী উত্তালতরঙ্গময়ী তাঁর অন্তর্গত তাপরূপ মহেশ্বরের (মহাদেব) তেজ (রেতঃ) সংক্রামিত করলেন।
...
এদিকে আকাশবাহিনী গঙ্গা দেবাদিদেব মহাদেবের দুর্বিসহ মহৎ তেজ ধারণ করে অতিশয় পরিতপ্ত (অতি তাপ)হয়ে উঠলেন।
...গঙ্গার মধ্যে যেসব জন্তুরা বাস করত তারা সেই অসহনীয় উত্তাপে কাতর হয়ে নদীর জল থেকে বেরিয়ে এল।
...
কৃত্তিকা নামে ছয়টি নক্ষত্র গঙ্গস্নানের জন্য সুরধুনীতে গমন করলেন।
...
গঙ্গাজলে অভগাহন স্নান করার ফলে মহাদেবের সেই অমোঘ রেতঃ ছয়জন কৃত্তিকার দেহের অভ্রন্তরে তৎক্ষণাৎ সঞ্চারিত হলো।
...
...সেই তীব্র অমোঘ শৈববীর্য তাদেঁর উদরমধ্যে সংস্থিত হওয়ায় তাঁরা গর্ভত্ব প্রাপ্ত হলেন।
...
গর্ভ হয়েছে জেনে তা বহনে অসমর্থ হয়ে স্বামীর ভয়ে ও লজ্জায় অত্যন্ত বিষণ্ন হয়ে পড়লেন।
...
তাঁরা সেই শরবনে চন্দ্রকলার মত সুকোমল সেই গর্ভ পরিত্যাগ করে ক্ষণকালমধ্যো আকাশে নিক্ষেপ করলেন।
...সেই অপরিমেয় তেজ ...ছয়টি মুখ প্রাপ্ত হয়ে জন্মগ্রহন করল (মহাদেবের সন্তান ষড়ানন কুমার)।
(দশম সর্গ, কুমারম্ভব/ কালিদাস)।

Saturday, September 5, 2009

রাজসভা এবং সেলিনার গোপন কথা

­রাজসভা বসেছে।
বর্তমানে রাজসভায় (link) রাজা নাই, রানী আছেন। রাজা যায় রানী আসে, রানী
যায় রানী ­আসে। মন্ত্রীরা অধিকাংশই উপস্থিত আছেন। এই মন্ত্রী-সেই মন্ত্রী, খাদক মন্ত্রী, কোনও মন্ত্রীরই অভাব নাই। পশু মন্ত্রী নাই কিন্তু পশু সম্পদ মন্ত্রী আছেন। এরাই দেশটার চাকা বনবন করে ঘুরাচ্ছেন।

এই পবিত্র রাজসভা (পবিত্র শব্দটি যোগ করা আবশ্যক-ফরযে আইন, নইলে এটা অপবিত্র বলে কারও ভ্রম হতে পারে) থেকেই দেশ চালাবার নীতি নির্ধারিত হয়। দেশের বিভিন্ন জটিল সমস্যা নিয়ে এখানে আলোচনা হয়। প্রতি মিনিটে হাজার-হাজার টাকা খরচ!
আলোচনার একটা সময় ব্যয় হয় যখন যে রাজা থাকেন তার বাবার, স্বামীর গুণকীর্তন করে। অধিকাংশ সময় বিরোধীদলের কুৎসা গেয়ে।
­বিরোধীদল­ দেশটার চাকা খুলে পাখা লাগাতে চাচ্ছেন, এইসব। বিরামহীনভাবে এই খেলা চলেই আসছে। আফসোস, এরা বেলের শরবত খেলে পেটের সঙ্গে সঙ্গে মাথাও ক্লিয়ার থাকত!

সেই দেশেরই এক মহিলা লেখক। ইনি একাই একশ, বিজ্ঞাপনের আবশ্যকতা কী! একটা বই লিখেছেন ‘বোরখাওয়ালী সেলিনার গোপন কথা’। এই নিয়ে বড় হইচই। কারা কারা নাকি আবিষ্কার করেছেন বোরখার বাইরে এক রং, ভেতর দিকে অন্য রং। বাইরের রং কালো তো ভেতর দিকে সবুজ- এই অঙ্গে অনেক রূপ। কী অবাক কান্ড!
'বোরখাওয়ালী সেলিনার গোপন কথা'র লেখক বিশদে লিখেছেন কারা কারা বোরখার রং দেখেছেন। এই নিয়ে সৈয়দ ভংশের (!) এক লেখক কাজীর দরবারে এগারো কোটি স্বর্ণ মুদ্রার মানহানী মামলা ঠুকেছেন, ইয়ালী! পাশের দেশেও নাকি কয়েক কোটি টাকা-টংকার মামলা হয়েছে। দুগগা-দুগগা!

'বোরখাওয়ালী সেলিনার গোপন কথা'র লেখকের এক কথা, আমরা সমস্ত শরীর বোরখায় ঢেকে রাখলেও দু-চোখ তো খোলা থাকে। আমরা পুরুষদের সব দেখতে পারব, পুরুষেরা কেন বোরখার ভেতরের রং দেখতে পারবে না? আমাদের কি ঝিনিকি ঝিনিকি মন থাকতে নেই? অন্য এক লেখককে নিয়ে এই বইটির লেখক নাকি
­ঝিনিকি-ঝিনিকি খেলা খেলেছিলেন কিন্তু তাদের মিলন হয়নি! আফসোস!
­
যথারীতি রাজসভায় এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হলো। তর্ক, কুতর্কের ঝড় বয়ে গেল। হাস্যরসেরও সৃষ্টি হলো। একেকজন বিপুল আমোদে অন্যজনের গায়ে এলিয়ে পড়ছিলেন। কী আনন্দ-কী আনন্দ!
­এখানে কিছু ভাঁড় মন্ত্রী সর্বদাই থাকেন। এদের কাজ হচ্ছে প্রজাদের হাসানো। হাসতে হাসতে ­প্রজাদের ­খানিকটা পেশাব বেরিয়ে যায় বিধায় অযু ভেঙ্গে যায়! কেন অযু ভেঙ্গে যায় এই বিষয়ে বিশদে যেতে চাচ্ছি না।

­আকবরিয়া নামের একজন মন্ত্রী ওদিন বললেন: আমার ছয় বছরের ছেলে এখনও মার দুধ খায়, আমি নিজে বার বছর পর্যন্ত মার দুধ খেয়েছি। হি হি হি।
­ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ভেঙ্গে সবজি চাষ করলে দেশের হাদ্য (খাদ্য) সমস্যার সমাধান হতো। হাক্কু হাক্কু হাক্কু।
­দূর্ঘটনায় যারা মারা গেছেন তারা ছাগল পাবেন না তবে তাদের পরিবারের লোকজনরা একটা করে ছাগল পাবেন, ফিনফিনে দাড়িসহ। রশি ফ্রি। হা-হা-হা। 


অন্য একজন মন্ত্রী মহামতি ছাফু বললেন: বিল গেটস ব্যাটা কম্পিউটার বিকরি করিয়া এই দ্যাশ থ্যিকা কুটি কুটি টাকা নিয়া যাইতেছে। হো হো হো।
­চিনির দাম বাড়াইছি তো কি হইছে, চিনি খাওয়া ভালা না? যে বেশি চিনি খায় হে পট নিয়া ডায়বেটিস রোগির পিছন পিছন ঘুরব। হোঃ হোঃ হোঃ।
দেশ উন্নতি করছে, ফকিরের হাতেও অহন মুবাইল। খিক খিক খিক।
 
কারেন্টের মন্ত্রী না তবুও বললেন, পাবলিকের হাতে হাতে মোবাইল। মোবাইল চার্জ দিয়া সব কারেন্ট শ্যাষ কইরা ফেলাইতেছে। বিকল্প উপায়ে কারেন্ট উৎপাদন করিতে হইবেক।

­মাথায় গ্রিজ মেখে অন্য-এক মন্ত্রী চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, উই লুকিং ফ শাতরু। আসো, ক্রসফায়ার-ক্রসফায়ার খেলা খেলব।

­আজ একজন আলতাফিয়া বললেন: মেথরের মল মেথর লইয়া গেলে হামি কি কারিবে? ­যার মাল ছে (সে) লইয়া গেছে। হিক হিক হিক।
­(সত্যি সত্যি এই কথাগুলো আমাদের মন্ত্রী বাহাদুররা বলেছিলেন, অতি সামান্য বদলে দেয়া হয়েছে, এই যা। ভাল কথা, মন্ত্রী বাহাদুররা আবার শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারেন না। তাদের বক্তব্য শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে, মিডল-ক্লাস।)

­আমাদের মন্ত্রী-টন্ত্রী বাহাদুররা পারেন না এমন কোন কাজ নাই, এরা চাইলে হনুমানজীকে পর্যন্ত কাজে লাগিয়ে দিতে পারেন! ইচ্ছা করলে এরা ২৫ ঘন্টায় দিন করে দিতে পারেন। ­আজকাল ­ফকিরদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যেতে হয় না, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই ছুটে যান ফকিরের কাছে! বিচিত্র কারণে এঁরা ডন কুইক্সোটের মত ভাবের জগতে থাকেন। ফ্রিগেট কেনার কথা ভাবেন কিন্তু রুস্তম-হামজার বিকল্প ভাবেন না! মুক্তিযুদ্ধের আবেগ নিয়ে জাগলিং করেন। ­
­সবই তাঁদের ইচ্ছা, আমরা শুনি কিচ্ছা!

­সেলিনার গোপন কথা নিয়ে রাজসভায় তুমুল আলোচনা হচ্ছে। একজন মন্ত্রী মহোদয় বললেন, ছেলিনা পাইছেটা কি, কেনু সে এইসব গুপুন কথা লিখবে? কেনু-কেনু-কেনু, উয়াই?
অন্যজন কটাক্ষ করে বললেন, লিখছে তো কি হইছে , গুপন কথায় আপনের
­তো আর নাম নাই, ইয়ুর ফব্লেমটা কি?
তুমুল বচসা। বইটি রাজসভায় জমা রাখা হলো পরবর্তিতে এটা খুঁটিয়ে দেখা হবে বলে। তাখলিয়া-বারখাস্ত বলে
­আজকের মত সভা মুলতবি হলো।­

সমস্যা দেখা দিল, ভয়াবহ সমস্যা। রাজসভায় জমা দেয়া ‘বোরখাওয়ালী সেলিনার গোপন কথা’ বইটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। কোথাও নাই। দ্বাররক্ষক, কতোয়াল সবাইকে ডাকা হলো। নির্দেশ দেয়া হলো, যেভাবেই হোক এই বইটা খুঁজে বের করার জন্য। খানাতল্লাসী শুরু হলো। নাই তো নাই।
­বই তো আর পায়রা না যে ডানা মেলে উড়ে যাবে। ­ভয়ের চোটে দ্বাররক্ষকের মলদ্বারের দ্বার বন্ধ হয়ে গেল।

তান্ত্রিক ডাকা হলো। তান্ত্রিক মহাশয় অসংখ্য খুলিতে ধুপ জ্বালিয়ে রাজসভা প্রায় অন্ধকার করে ফেললেন। একবার ডানে একবার বায়ে ঝাড়ু দিয়ে পেটাচ্ছেন। বিচিত্র সব মন্ত্র পড়ছেন:

­"অং-বং-চং, হং হং হং, ঠং ঠং,
­করো নাকো ভং-চং-ফং, ঞ্চঁ-ঞ্চঁ
­পাশের বাড়ির মেয়েটি খেলে কুত-কুত,
­কোথায় গেলি সেলিনার গোপন ভূত।
­আহারে চুক চুক চুক- ভুক ভুক ভুক"
­তান্ত্রিক মন্ত্র পাঠ শেষ করে অমায়িক হাসি হেসে বললেন: মুসকিল আসান। মিল গিয়া, সাব কুছ খুল গিয়া।
সবাই উদগ্রীব: পেয়েছেন তান্ত্রিক ভা। (ভা মানে ভাইয়া)
­তান্ত্রিক ভাইয়া চুকচুক করে মানুষের খুলিতে চা পান করতে করতে বললেন, ­কিতাব সেলিনা গোপন কিয়া হ্যায়।
­সবাই স্তম্ভিত। ওরি শ্লা, কুতুয়া বলে কি! সেলিনার বইটা গোপন করেছে, মানে কী! বই গেল কিভাবে ওর কাছে? বইটার কি বিশেষ 'পাতা' গজিয়েছিল যে উড়ে-উড়ে চলে গেল!
রাজপাট অচল। পরদিন শুভ সংবাদটি পাওয়া গেল। একজন মন্ত্রী সাহেব বইটা পড়ার জন্য বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন।


*লেখাটা নেওয়া হয়েছে 'সাদাকে কালো বলিব' থেকে। ছবিঋণ: বই-মেলা ডট কম
...
লেখাটার এখানেই সমাপ্তি। এখন অন্য এক প্রসঙ্গ। তসলিমা নাসরিনের 'ক' বইটা বের হওয়ার পর অনেক নাটক হয়েছিল। লেখক সৈয়দ সাহেব ১১ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেছিলেন। পরে এই মামলার গতি কী হয়েছিল এটা অবশ্য আমার জানা নাই! লেখক মিলন সাহেব বিশেষ উচ্চবাচ্য করেননি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর কান্ডটা ঘটেছিল আমাদের মহান সংসদে এই নিয়ে তুলকালাম কান্ড হয়ে গিয়েছিল। কীসব হাস্যরসই না সৃষ্টি হয়েছিল, স্পীকার-মন্ত্রী-সাংসদদের আমোদে আমরাও আমোদিত হয়েছিলাম। যখন এখানে একজন অন্যজনকে কটাক্ষ করে বলছিলেন, আপনের সমস্যা কী, বইয়ে তো আপনার নাম তো
­নাই! 

আহারে-আহারে, এঁদের নাম নাই বলে এঁদের কী চাপা কষ্ট! ঝিনিকি-ঝিনিকি রক্তে ফিনিকি-ফিনিকি। কী কষ্ট-কী কষ্ট!
স্পিকার সাহেবের কাছে বইটা জমা রাখা হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে বইটার আর হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। খোঁজ-
­খোঁজ-­খোঁজ­ । অবেশেষে জানা গেল, একজন মন্ত্রীবাহাদুর 'ক' বইখানা বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন পড়ার জন্য!­ মন্ত্রীবাহাদুররা বই পড়েন এরচেয়ে আনন্দের আর কী আছে! ধন্য মায়ের ধন্য সন্তান...!

Thursday, September 3, 2009

মহাঘাতক

মহাঘাতকের সঠিক পরিচয় কেউ জানে না। কেউ বলে যাদুকর, কেউ বা বলে ভিনগ্রহের লোক বিভিন্ন কথাবার্তা শোনা যায়। ওঁর চামড়া ধবধবে সাদা, পছন্দের একমাত্র রং কুচকুচে কালো। গায়ে যেটা দেন এটা আলখেল্লা বলা হবে, না হাতকাটা পাঞ্জাবি, এটা গবেষণার বিষয়। স্বল্প আলোয় দেখলে মনে হবে ধবধবে দুহাত আর একটা মাথা হেলেদুলে এগুচ্ছে। সে এক ভয়াবহ ব্যাপার, বেশিরভাগ লোক হার্টবিট মিস করে।
আজকাল মাথা খুব গরম থাকে। ডায়েটিং করছেন । প্রায় তিনবেলায়ই ঘাস খেয়ে থাকেন। মানে যেটা খান ঘাসের মতোই মনে হয় আর কী! প্যাচপ্যাচে কাদার মতো আঠালো জাউ, গলা দিয়ে নামতে চায় না। চিবানোর সময় মনে হয় অনন্তকাল ধরে রাবার চিবুচ্ছেন। আহ আফসোস, খেতে পারেন না; টাকা পয়সা কোনো সমস্যা না। গরীব দেশের মূর্খ জনগণ, অদৃষ্ট দেখার নাম করে যা বলা হয় তাই বিশ্বাস করে। একগাদা টাকা দেয়।

তাছাড়া কয়েকটা দৈনিক সাপ্তাহিকীতে নিয়মিত ভবিষ্যৎ বাণী করেন। কিছু নমুনা দেয়া যাক। একটি দৈনিকে সিংহ রাশির জাতকের জন্য হয়তো লিখলেন: দিনটা আপনার জন্য অশুভ, ঘাতকের সঙ্গে দেখা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। প্রতিকার: ৬ রতি রক্ত প্রবালসহ অষ্টধাতুর আংটি ডান তর্জনিতে পরিধান করুন। ঘাতকের দেখা পেলে ডান তর্জনি তাক করুন। সাবধান বাণী: বাজারে যেসব অষ্টধাতুর আংটি রয়েছে সবই ভেজাল। গ্যারান্টি দেয়া যাচ্ছে ওমুক...।
আরেকটা দৈনিকে হয়তো এই রাশির জাতকের জন্য ঐ দিনই লিখলেন: দিনটা আপনার জন্য খুবই শুভ। গায়ের উপর দিয়ে যন্ত্রদানব চলে গেলেও ধুলো ঝেড়ে দেখবেন আপনি চ্যাপ্টা হননি।

অফিসটা সাজিয়েছেন ভালোই, রীতিমতো জাঁকালো। দিন হোক রাত হোক, প্রায় অন্ধকার থাকে, ঢুকলেই গা ছমছম ভাব হয়। অসংখ্য মানুষের খুলি ছড়ানো ছিটানো।
ফুটবল মাঠের মতো টেবিলে আগুপিছু করে বারোটা খুলি সাজানো। চারকোণায় চারটা খুলিতে বিরামহীনভাবে ধূপ জ্বলে। ধোঁয়া দেখে বেশ ক’বার ফায়ার ব্রিগেড চলে এসেছিল।
‘স্যার, আপনার কাছে একজন লোক আসছে’, পিয়ন বলল ভয় চেপে। এ ঘরে ঢুকলেই তার বুক ধড়ফড় করে, হাঁটুতে জোর থাকে না। মহাঘাতক করমচার মতো চোখ তুলে কটমট করে তাকালেন। পরক্ষণেই মহাঘাতকের মনে পড়ে গেল একদিন বেশি তাকাতে গিয়ে এই নমরুদ কার্পেট নষ্ট করে ফেলেছিল। সাত হাজার টাকার পারসিয়ান কার্পেট। তাড়াহুড়ো করে চোখ নামিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, ‘পাঠিয়ে দাও।’

আগত লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে আলাভোলা ধরনের লোক। লোকটার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন যেন নর্দমার কীট দেখছেন, অসংখ্য হাড় থেকে ঘুণ ধরা হাড় (অবজ্ঞা প্রকাশ করতে এটা ব্যবহার করেন) তাক করে চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। চেয়ারে বসে লোকটা অবজ্ঞা ভরে চারপাশ দেখতে লাগল, বারবার নিচের ঠোঁট বেঁকে যাচ্ছে। মহাঘাতক বিস্মিত হলেন। তা’বড় তা’বড় লোক ঠান্ডা হয়ে গেছে, এর ভয় না পাওয়ার উৎস কী! কেন জানি মনে হচ্ছে, এ বড়ো যন্ত্রণা করবে। মাথায় ছিদ্র করা একটা খুলি এগিয়ে দিয়ে রাশভারী গলায় বললেন, ‘পাঁচশো টাকা পঁচানব্বই পয়সা।’
লোকটা খুলিতে টোকা মেরে মধুর হেসে বলল, ‘প্লাস্টিক নাকি, এটার এতো দাম! ঠকেছেন!’
মহাঘাতক স্তম্ভিত। এ মনে হয় মহাবদ। রাগ চেপে ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘
পাঁচশো টাকা পঁচানব্বই পয়সা এটা আমার ফি, ছিদ্র দিয়ে টাকাটা ফেলুন।’
‘আপনি কি ভাই বাটা নাকি! পঁচানব্বই পয়সার যন্ত্রণায় এদের জুতা কেনা ছেড়ে দিয়েছি।’
‘ঠিক আছে পাঁচশো এক টাকাই ফেলুন, ’ মহাঘাতক এবার একটু নরম হয়ে বললেন।
লোকটা চট করে একটা পাঁচশো টাকার নোট খুলিতে ফেলল। এক টাকার জন্য এ পকেট ও পকেট হাতাতে লাগল। এক ফাঁকে বলল, ‘পাঁচশো দিলে হয় না?’
‘না, হয় না। শূন্যের কাজ আমি করি না। শূন্য বড় গোলমেলে জিনিস।’

লোকটা অনেক খুঁজে চারটা সিকি বের করল। ফেলতে ইতস্তত করছে দেখে মহাঘাতক রাগী গলায় বললেন, ‘কি হলো ফেলুন।’
লোকটা বিড় বিড় করে ভাংতি পয়সাগুলো ফেলে দিল।
‘কি নাম আপনার, ’ মহাঘাতক হাসি মুখে বললেন।
‘জামাল মিয়া।’
‘জামাল মিয়া! এ কি ধরনের নাম! এর আরবী অর্থ হয় 'উট একশ'। একশ তো দূরের কথা, আপনাকে দেখে তো একটা উটও মনে হচ্ছে না।’
‘ভাই আমি উট না দুম্বা নাকি ছাগল এতে তো আপনার দরকার নাই। মহাঘাতকের আরবী অর্থ কি হয় আমার জানা নাই কিন্তু বাংলাতেই এর অর্থ মহাখুনী।’
মহাঘাতক তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, জামাল মিয়া পাত্তা না দিয়ে সহজ গলায় বলল, ‘কাজের কথা হোক।’
‘আপনার ভবিষ্যৎ জানতে চান?’
‘জ্বী না, আমার কিছু না। জাতকের হাতের ছাপ নিয়ে এসেছি।’
‘জন্ম তারিখ কতো?’ মহাঘাতকের প্রশ্ন।
‘ইয়ে তাতো জানি না।’
‘জাতকের নাম কি?’
জামাল মিয়া থেমে থেমে বলল, ‘নাম-নাম, এমনিতে শুভু বলে ডাকি আর কি।
মহাঘাতক বিরক্তি চেপে বললেন, শুভু, এটা আবার কী নাম! সম্ভবত শুভ হবে?
না শুভুই।
মহাঘাতক অনেক ছক-ফক কাটলেন, অল্প সময়ে ছত্রিশবার নিচের ঠোট টানলেন, অবশেষে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এ কুম্ভ রাশির জাতক। এর প্রতীক হচ্ছে পাত্র হতে পানি বর্ষণকারী ব্যক্তি। এরা বিজ্ঞানধর্মী, চিন্তাবিদ, অনলবর্ষী বক্তা এবং জীবনের প্রতি মানবতাতপূর্ণ। এরা শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত অত্যন্ত ভালবাসে। ’
‘আঃ, এতো ফড় ফড় করছেন কেন, এসব কে জানতে চাচ্ছে। জাতক সম্বন্ধে বলুন, ’ জামাল মিয়া অসহিষ্ণু।
‘ও আচ্ছা। জাতকের তো দেখি রাজকপাল। টাকা পয়সা এর কাছে বাদামের খোসা। দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়া বিচিত্র কিছু না। ইউরেনাস ও শনির প্রভাবে এদের ভাগ্যে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়্। ইয়ে, চার বিয়ের যোগ দেখা যাচ্ছে।’
জামাল মিয়া হাসতে হাসতে বাঁকা হয়ে লম্বা হয়ে গেলেন, সামলে নিয়ে হাসি একান ওকান করে বলল, ‘ব্যস-ব্যস, ভাই আর বলবেন না, নাইস জোক। পেট ফেটে মারা যাব। এ রকম মজার জোক বহু দিন শুনিনি। ওটা বানরের হাতের ছাপ।’

মহাঘাতক বিচলিত বোধ করলেও লুকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, যাক টাকাটা মার যায়নি।
জামাল মিয়া এবার রসিয়ে রসিয়ে বলল, ‘ভালো কথা, পাঁচশ টাকার নোটটা কিন্তু জাল। কে যেন আমাকে গছিয়ে দিয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী পুলিশকে জানানোর কথা; ধুর-ধুর কে যায়? বাঘে ছু’লে আঠারো ঘা, পুলিশ ছু’লে ছত্রিশ ঘা। যাইহোক, বেশ মজা হলো আজকে। হা হা হা।

Wednesday, September 2, 2009

ভাল পেমেন্ট পেলে উবু হয়ে পটিতেও বসবে

এইএরা ভাল পেমেন্ট পেলে উবু হয়ে পটিতেও বসবে, অন্তত বসার ভঙ্গি করে পোজ দেবে! শুধুশুধু মডেলদের দোষ দেই কেন?
প্রতিজ্ঞা করা হয় ভাঙ্গার জন্য। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম প্রথম আলোকে নিয়ে আর লিখব না, ফিজুল-অযথা কালির অপচয়, হালের কীবোর্ড নিয়ে কস্তাকস্তি। কিন্তু আফসোস...।

প্রথম আলো, ১ সেপ্টেম্বর, ২০০৯-এ ২ পৃষ্ঠা ব্যাপী গ্রামীন ফোনের ঢাউস বিজ্ঞাপন ছাপিয়েছে। তা ছাপাক। অন্তত্ এমন বিজ্ঞাপন তো আর ছাপায়নি! এই নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করার সুযোগ নাই। কিন্তু প্রথম পাতায় একটা ঘোষণা আছে:
"২১, ২২, ২৩ ও ২৪ পৃষ্ঠা সরালেই দেখতে পাবেন গ্রামীন ফোনের নিজস্ব হ্যান্ডসেট বাজারে ছাড়া-সংক্রান্ত দুই পৃষ্ঠাজুড়ে বিজ্ঞাপন। এ বিষয়ে গ্রামীনফোনের সংবাদ সম্মেলনের খবর: পৃষ্ঠা-১৩..."

এই পত্রিকার কী ধারণা, পাঠক হলুদাভ পদার্থে মাখামাখি হয়ে থাকা দুগ্ধপোষ্য শিশু? নাকি পাঠক তাদের মস্তিষ্ক প্রথম আলোর দপ্তরে জমা রেখে এই পত্রিকা পাঠ করতে বসে? এটা প্রথম পৃষ্ঠায় ঘোষণা দিয়ে ঘটা করে জানাতে হবে কেন ২১,২২,২৩,২৪ পৃষ্ঠা সরাতে হবে? ভাগ্যিস পত্রিকাটি বলে বসেনি পাঠককে ভালবাসাবাসির চরম অন্তরঙ্গ সময় কাটাবার সময় কোন কোন আবরণ উম্মুক্ত করতে হবে। তাহলে সর্বনাশ হয়ে যেত!
নাকি এদের ধারণা পাঠক চোখের মাথা খেয়েছে, চোখদ্বয় মহোদয় বিশেষ ছিদ্র বন্ধ করার কাজে লিপ্ত ছিলেন? আসলে এরা নিজেরা কখনই বদলাবে না- হারপিক সব বদলে ফেলে কিন্তু নিজের বদলানোটা সমীচীন না, যুক্তিসঙ্গত কারণেই।
আমাদের শিক্ষায় খুব বড় ধরনের গলদ আছে- যত বড় ডিগ্রি, যোগ্যতা থাকুক না কেন।

এক গোয়াল ঘরের পাঠকের আনন্দ বেদনার অপকিচ্ছা!

আমার শৈশব এতো বেশী তুচ্ছ যেটা কহতব্য, বলার মত না! অনেকের দেখি শৈশবের বাল্যবন্ধুদের মধ্যে কেউ সচীবের ছেলে তো কেউ মন্ত্রীর পুলা। আমার শৈশবের বন্ধুদের অনেকের মধ্যে একজন ছিল ধোপার ছেলে, একজন মুচির। তাদের সঙ্গে কী মাখামাখি, কী-সব সোনালী দিন!

মুচির ছেলে 'গাদুরার' ছিল ডাং-গুলিতে দুর্দান্ত হাত, এড়ি-দুড়ি-তেলকা, চুড়ি, চম্পা, ডেগ, সুতেগ (আমরা এভাবেই বলতাম)। গাদুরার কাছে প্রায়শ না অবধারিত ছিল আমার হার। খেলার নিয়ম অনুযায়ী 'এক লালে' কেনা যেত আস্ত একটা গুদাম, 'দুই লালে' নদী। গাদুরা বদটা কীভাবে-কীভাবে যেন গুদাম-টুদাম, খাল-বিল, তিতাস নদী সব কিনে ফেলত।
আমার বাপের অজান্তে তাঁর বাড়িটা... ওটাও হেরেছিলাম। এক প্রকারে দেখলে আমি যে বাড়িতে বসবাস করি এই বাড়িটা আমার শৈশবের বন্ধু গাদুরার। যাই হোক, ফলাফল, 'পো... লইয়া যা'- তখন আমার পিঠে দুমাদুম করে কিল। ইস, বদের হাড্ডি শুয়োরটা 'কিল' নামের জিনিসটা কী জোরেই না মারত!

অনেক পরে, একদিন, আমি গাদুরা বদমাইশটাকে মারতে গিয়েছিলাম। ব্যাটা ফাজিলের ফাজিল, আমাকে তুই না-বলে, আপনি-আপনি করে বলার চেষ্টা করছিল! আমি তাকে হিমশীতল গলায় বলেছিলাম, 'তুই আমাকে আপনি বলে গালি দিচ্ছিস কেন রে, কুত্তা'?
নিমিষেই তার চোখের পানিতে আটকে গিয়েছিল সূর্যটা, যেন চোখের পাতা ফেললেই হারিয়ে যাবে আস্ত সুর্যটা!
গাদুরাটা শেষ পর্যন্ত পচাই খেতে খেতে মরেই গেল। আমার শৈশবের একটা স্তম্ভ হারিয়ে গেল!
ওহ, আরেকটা খেলা ছিল মারাত্মক মারামারির, রস-কস-শিংগা-বুলবুল- মালেক-মোস্তাক। এভাবেই আমরা বলতাম 'শুদ্ধ-মুদ্ধ' জানি না!
 
অনেকেই বালকবেলায় কী অবলীলায়ই না পড়ে ফেলে মম, হার্ডি, মায়াকোভস্কি। তখন আমার তো আর সে সুযোগ ছিল না, যা পেতাম তাই পড়তাম। দস্যু বনহুর, কুয়াশা, কোনও-একটা অনুবাদ পেলে তাই সই। বিভিন্ন ভাষার গল্পের অনুবাদ, আহা! আমার পরিবারের ধারণা ছিল, এইসব 'আউট বই' পড়ে-পড়ে ক্রমশ আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, কঠিন নিষেধাজ্ঞা জারী হলো, এইসব বই আর পড়া যাবে না।
আরে, এ তো দেখি মহা এক যন্ত্রণা হলো! বই পড়তে না-পারলে আমি যে মরে যাব। পরে এক বুদ্ধি বার করলাম...!

আমার বাসার পাশেই একজন রাখাল থাকতেন। বয়সে বড়- আমার বন্ধু, সিনিয়র বন্ধু। তাঁর নাম আজ ভুলে গেছি, মনে থাকা উচিৎ ছিল। তাঁর নামটা মনে না-থাকার কারণে নিজেকে চাবকাতে ইচ্ছা করছে-নিজের প্রতি জুতা ছুঁড়ে মারতে পারলে খানিকটা আরাম পেতাম।
 
যেটা বলছিলাম, আমি স্কুলের নাম করে বই খাতা নিয়ে বের হতাম, সঙ্গে যথারীতি দু-চারটা আউট বই। সোজা গোয়াল ঘরে! সেই সদাশয় রাখাল বন্ধু, তিনি ভেতরে আমাকে রেখে গোয়াল ঘরের তালা বন্ধ করে গরু চড়াতে বেরিয়ে যেতেন। আমি আরাম করে, মহা আনন্দে তখনকার বুড়াদের ভাষায় 'আউট বই' গোগ্রাসে গিলতাম। বিকালে এসে তিনি তালা খুলে দিলে আমি স্কুলের বই-খাতা নিয়ে সোজা বাসায়।

স্কুল থেকে পুত্রধন বিদ্যার জাহাজ হয়ে এসেছে, মা’র সে কী আপ্যায়ন! এটা খা, ওটা খা বলে আমার মাথা নষ্ট করে দিতেন। আমি হাসি গোপন করতাম। ভাগ্যিস, মমতায় অন্ধ মা এই হাসি দেখতে পেতেন না!
এর পরিণাম হয়েছিল এমন, এসএসসিতে (আমরা বলতাম মেট্রিক) আমার সায়েন্স ছিল। সবগুলো পরীক্ষাই ভাল হল, খুবই ভাল! আমি ব্যাখ্যা, টিকা এই সব পড়তাম না সারাংশ পড়ে ফেলতাম।  কিন্তু অংকে আমি পেলাম বিশ। তেরো গ্রেস দিয়ে অংকে পাশমার্ক উঠেছিল।
খোদা মেহেরবান, তখনকার সময়ে তেরোর উপরে গ্রেস দেওয়ার নিয়ম ছিল না। ইন্টামিডিয়েটে দেখলাম সায়েন্স নিলে নিয়মিত ক্লাশ না-করে উপায় নেই। তো, নিলাম, কমার্স। গ্রাজুয়েশন করার সময় আরেক যন্ত্রণা! কমার্সের ক্লাশও নিয়মিত না-করে উপায় নেই। কী আর করা, নিলাম, আর্টস। 
 
গ্রাজুয়েশন করার সময়, সবাই পরীক্ষার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকে অথচ আমি বাসা থেকে গিয়ে পরীক্ষা দেই। ইশ-শ, শালার এই অভিশপ্ত বাসাটা (Click) আমায় আটকে ফেলেছে। একদিন পৌঁছলাম আধ ঘন্টা পর। তখন নৌকা-বাসে করে যেতে হত। রাস্তায় বাস নষ্ট হয়ে গেল। আমার সঙ্গে যিনি ছিলেন তিনি চট করে একটা ট্রাকের পেছনে উঠে পড়লেন। কিন্তু আমি একটু স্টাইল করতে গিয়ে ট্রাকে উঠতে পারলাম না।
আমার তখন মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম। রাস্তার মাঝখানে হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ওই রাস্তাটা তখন খুব একটা চালু না। কিচ্ছু পাই না। যাও একটা 'বেবি-টেক্সি' পেলাম ভেতরে জায়গা নেই। চালককে বললাম:
'ভাইরে, আমার পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। আমি কেবল দুই পা ভেতরে রাখছি। আমার বাকী শরীর বাইরে থাকুক। কষ্ট করে আমাকে একটু নিয়া যান'।
ওই সদাশয় চালক কেবল পৌঁছেই দেননি আমার কাছ থেকে ভাড়াও রাখেননি! তো, এরিমধ্যে প্রায় ত্রিশ মিনিট চলে গেছে। টিচার বললেন, 'এইটা পরীক্ষা, খেলা না। পরীক্ষা দিয়া কি করবা, বাসায় চইলা যাও'!
আমি কাতর হয়ে বলি, 'স্যার, বাস নষ্ট হয়া গেছিল। আসছি যখন পরীক্ষাটা দিয়াই যাই'।
টিচার নামের মানুষটা রক্তচক্ষু মেলে আমাকে খাতা দিলেন। চোখ দিয়ে পারলে ভষ্ম করে ফেলেন! অবশ্য কোন-এক বিচিত্র কারণে ইসলামি হিস্ট্রির ওই পার্টটার নাম্বার খারাপ উঠেনি!
 
এমনিতে স্কুলে সুবুৎ বণিক আমার খুবই পছন্দের শিক্ষক ছিলেন কিন্তু একবার তিনি আমার উপর খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন! ওই যে, ইশকুলে সবাই পরীক্ষার খাতায় লিখল, ইঞ্জিনিয়ার হবো, ডাক্তার হবো। আমি লিখেছিলাম, রাখাল হব। কসম, আমার তো রকেটবিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন ছিল না। মাস্টার মশাই খুবই আনন্দিত(!) হয়ে বিরাট একটা গোল্লা দিয়েছিলেন যার চালু নাম 'লাডডু' বা 'খাতালাড্ডু'।
 
যে মাস্টারমশাই খাতায় এরশাদের মাথার সমান লাড্ডু দিয়েছিলেন সুবৎ বণিক নামের সেই মাস্টার মশাই এখনো বেঁচে। কখনও দেখা হলে গাঢ় স্বরে বলেন, 'তুমার কিতা হইছে, মুখ এমুন শুকনা ক্যান'? তাঁর মমতায় আমার চোখ ভরে আসে।
কথার ফাঁকে একদিন স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম:
স্যার, মনে আছে আপনার? আমাকে যে গোল্লা দিয়েছিলেন? আমি কি ভুল লিখেছিলাম? স্যার আমি তো কখনও বড়-কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখিনি। আমি কি তাহলে মিথ্যা লিখতাম, এটা হব-সেটা হব?
এবার স্যারের চোখ ভরে আসে। থেমে-থেমে অন্য রকম কিছু অতি  উঁচুমার্গের সদাশয় কথা বলেন। লজ্জা-লজ্জা, এখানে শেয়ার করা বড় লজ্জার।
যাক সে কথা, টেনেটুনে গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর বছরখানেক আইন নিয়ে পড়লাম। টর্ট আইন পড়ে খুব মজা লাগত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধুর, আইন নিয়ে পড়তে ভাল লাগল না...। 

আর হাই-স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে আমার একটা ঘটনা দাগ কেটে আছে। বন্ধুদের মধ্যে একজন, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল প্রদীপ। ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর দেখা-সাক্ষাৎ কঠিন হয়ে পড়ল। পুজার ছুটিতে আসলে দেখা হয়, আনন্দ-মাস্তি হয়। একবার ও পুজার ছুটিতে আসল না। বিষয় কী!
বিষয় শুনে তো আমার মাথায় হাত। কি যেন একটা হাতে-কলমের কাজ আছে, ওটা বাদ দিয়ে চলে আসলে আধা নাম্বার কাটা যাবে। আমি হাসতে হাসতে শেষ- মাত্র আধা নাম্বার, বলে কী! আমি যে কত-কত নাম্বার অবলীলায় ছেড়ে দেই।
ফল যা হওয়ার তাই হলো! প্রদীপ ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট হয়ে তাক লাগিয়ে দিল, সিনেমা-টিনেমায় আমরা যে-রকম দেখি আর কী! আর এদিকে কালে-কালে আমি হলাম গিয়ে, জিরো []!  

যাই হোক, যখন কলেজে পড়ি তখন মাহবুব ভাই নামের এক অসাধারণ মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি বয়সে আমার অনেক বড়ো ছিলেন, আমার যে বছর জন্ম সেই বছর তিনি এয়ারফোর্সে জয়েন করেন! আমার জীবনে যতো সব সু বা ভালো কিছু আছে, কোন-না-কোন ভাবে তাঁর স্নেহের হাত আছে। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আসলে কি, পিতা পুত্রের, ভাইয়ের, বন্ধুত্বের? আমি কনফিউজ, বিভ্রান্ত এখনও!
এমনিতে অবলীলায় তাঁর সঙ্গে যা-তা রসিকতা করি, ধুমসে সিগারেট খাই। (সিগারেট সম্ভবত খাওয়া যায় না পান করারই নিয়ম। পান করার ওই নিয়মটা আবার আমি জানি না!)

তো, তিনি আমার এই পড়ার অদম্য আগ্রহ দেখে কানের কাছে অনবরত মন্ত্রের মতো জপে যেতেন, আপনি এতো বই পড়েন, কিছু লেখেন না কেন! তিনি নিজে বই ছুঁয়ে দেখতেন না-বলেই হয়তো তাঁর বদ্ধমূল ধারণা জন্মে গিয়েছিল পড়লেই বুঝি লেখা যায়। এহ-হ, বললেই হলো আর কি!

এক সময় তাঁর যন্ত্রণায় লেখা শুরু করলাম। গাধার মতো লিখে ফেললাম আস্ত এক উপন্যাসসম লেখা। টানা রুল করা কাগজের বাইন্ডিং খাতায় অসংখ্য ভুলভাল শব্দ-বাক্যে ভরা! লিখে তো ফেললাম, সো, হোয়াট নেক্সট? এখন এই আবর্জনা নিয়ে কি করি! নিজের লেখা, ফেলে তো আর দিতে পারি না। হোক আবর্জনা, নিজের লেখার প্রতি আছে আমার সন্তানসম মমতা! সেই উপন্যাসটা অবশ্য বাংলা একাডেমিতে ছাপা হয়েছিল। সে ভিন্ন গল্প... []!
 
* বহু বছর পর সেই সদাশয় রাখাল বন্ধুর নামটা পেয়েছিলাম। ওঁর নাম, আলীম।
১. জিরো

Tuesday, September 1, 2009

জ্ঞান উবাচ বনাম মূর্খ উবাচ

সঞ্জয় কহিলেন:
"দেখ পার্থ নিরখিয়া দেখ এইক্ষণ 
ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ আদি কুরুযোদ্ধাগণ।। 
গুরুজন সহোদর আর পিতামহ 
মাতুল শ্বশুর মিত্র পুত্রপৌত্রসহ।। 
বিপক্ষে হেরিয়া সব আত্মীয়-স্বজন 
দয়াযুক্ত মনে পার্থ বলেন বচন।।" 
(হে অর্জুন, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ আসল কুরুযোদ্ধাগণকে চাহিয়া দেখপার্থ-অর্জুন গুরুজন, পিতামহ, মাতুল, শ্বশুর এবং বন্ধুগণকে দেখিলেনতাঁহাদের সকলকে বিপক্ষে দেখিয়া দয়াযুক্ত হইয়া দু:খিত মনে শ্রীকৃষ্ণকে বলিলেন।) 
প্রথম অধ্যায়, ২৫-২৬-২৭ 

অর্জুন কহিলেন: 
"কাঁপিতেছে শরীর দেহ রোমহর্ষ হয় 
হাত থেকে খসে ধনু গাত্র জ্বালাময়।। 
মারিয়া স্বজনগণে শ্রেয়ঃ নাহি রণে 
চাহি না বিজয় কৃষ্ণ রাজ্য সুখ ধনে।।" 
(আমার শরীর কাঁপিতেছে ও রোমহর্ষ হইতেছেআমার হাত হইতে ধনু খসিয়া পড়িতেছে, গা জ্বলিতেছে) স্বজনকে মারিয়া মঙ্গল হইবে নাহে কৃষ্ণ, আমি জয় চাই না এবং রাজ্য, সুখ, ধনও চাই না 
প্রথম অধ্যায়, ২৯-৩১ 

শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন: 
"অশোচ্যের তরে শোক নাহি মুখে প্রজ্ঞাবাণী 
মৃতে বা জীবিতে শোক নাহি করে জ্ঞানী।।" 
(হে অর্জুন, যাহাদের জন্য শোক করা উচি নয় তুমি তাহাদের জন্য শোক করিতেছ; অথচ জ্ঞানীর মত কথা বলিতেছজ্ঞানী ব্যক্তি মৃত বা জীবিতের জন্য কখনও শোক করে না) 

"নাহি যদি কর এই ধর্মযুদ্ধ তবে 
স্বধর্ম ও কীর্তি ছাড়ি পাপভাগী হবে" 
(তুমি যদি এই ধর্মযুদ্ধ না কর তবে তোমার স্বধর্ম ও কীর্তি নষ্ট হইবে, তোমার পাপ হইবে।) 
দ্বিতীয় অধ্যায়, ১১-৩৩ 
... ... ...
কুরুপান্ডবদের সেই যুদ্ধে বন্ধু ও আত্মীয়দের প্রতি অস্ত্র না ধরার জন্য উদারহৃদয় হলধারী বলদেব কোন পক্ষে যোগদান না করে যে নদীতীরে মনে বৈরাগ্য নিয়ে চলে গিয়েছিলেন এবং যেখানে তাঁর স্ত্রী রেবতী বলদেবের অতি প্রিয় সুরা এনে দিলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সরস্বতি নদীতীরে গিয়ে সমাধি অবলম্বন করেছিলেন 
(মেঘদূত/ কালিদাস) 

*আলোচ্য ধর্মনুসারে তিনি-বলদেব মোটেও জ্ঞানী ছিলেন না।
(এই সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়া যায়, একজন কঠিন ধার্মিককে ধর্মের নামে কাউকে খুন করতে বলা হলে তিনি বিমলানন্দে খুন করবেন কিন্তু একজন মানবিক মানুষ স্বর্গের লোভেও এটা করতে রাজি হবেন না)।

Monday, August 31, 2009

খোদেজা: ৫

নিশি বেরিয়ে দেখল ছেলেটা গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছেকেমন গোল হয়ে শুয়েছেছেলেটা অদ্ভুতএর শোয়ার খাট আছে কিন্তু এর নাকি মাটিতে শুয়েই আরামআচ্ছা, সোহাগের ভাল নামটা যেন কি? কখনও সম্ভবত জিজ্ঞেস করা হয়নিসোহাগের সঙ্গে নিশির কথা হয় খুব কমনিশির মন ভাল থাকলে অবশ্য আলাদা কথা, তখন নিশি নিজ থেকেই একগাদা কথা বলে

নিশিকে সোহাগের ঘুম ভাঙ্গাতে বেগ পেতে হলোসোহাগ নিশিকে দেখে চোখ মেলল, ধড়মড় করে উঠে বসল

আফা, রাগ কইরেন না, বইয়া বইয়া ঘুমাই গেছিলামঅক্ষণই কাম শ্যাষ কইরা ফালামু

কাজ নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, ইচ্ছা করলে ঘুমাঘুমাবি?

না গো আফা, আর ঘুমাইতে ইচ্ছা করতাছে না

নিশি ঝোকের মাথায় বলে বসল, বাড়িতে যাবি রে, সোহাগ?

সোহাগ চোখ বড় বড় করে বলল, হেছা আফাআল্লার কিরা, মিছা কইতাছেন না

নিশির বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ঘোর কেটে গেলবাড়িতে সোহাগকে নিয়ে যাবেটা কে? জাবীরকে বললে ও ঠিক ঝাঁঝিয়ে উঠবে: তোমার কোন কান্ডজ্ঞান নাই নাকি!

নিশি হয়তো জটিলতা এড়াবার জন্য বলবে: আহা, একটা কথা বলেছি, না করলে না করবে, এ নিয়ে হইচই করার তো কিছু নাই! ছেলেটা কতদিন হলো বাড়িতে যায় নাও খুব মন খারাপ করে থাকে

হইচই-হইচইহোয়াট ডু য়্যু মীন বাই হইচই! একটা কথা বুঝে, না বুঝে বলে আমার মাথায় একটা বোঝা চাপিয়ে দিলেএমনিতেই আমার যন্ত্রণার শেষ নাই

তখন নিশির কষ্টের নিঃশ্বাস ফেলা ব্যতীত আর কোন উপায় থাকবে নানিশি প্রায়শ ভাবে, আচ্ছা এই মানুষটার সঙ্গে ও ঝুলে আছে কিভাবে? মানুষটাকে ছেড়ে যাবে ভাবলেই বুকের গহীন থেকে অজানা এক কষ্ট পাক খেয়ে উঠে কেন? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর নিশির কি কোন দিনই জানা হবে না? নিশির কি এ দ্বিধা থেকে কোন মুক্তি নেই

নিশির বিব্রত ভঙ্গি, সোহাগ, দেখব তোর ভাইজানের সঙ্গে কথা বলে

সোহাগ মিইয়ে যায়খানিকক্ষণ কি যেন আনমনে ভেবে বলে, আফা, আমি এখলা এখলা চইলা যামু, কুনু সমস্যা হইব নারাস্তাই আমারে টাইন্যা লয়া যাইব

নিশি আঁতকে উঠে, যাহ, কি বলিস, মাথা খারাপ, তুই একলা একলা যাবি কেমন করে

কুনু সমুস্যা হইব না, আফাচোক্কের নিমিষে যামু গা

নিশি আলগা গাম্ভীর্য এনে বলল, এমন পাগলামির কথা আর যেন না শুনি, আমি তোর ভাইজানের সঙ্গে কথা বলবসে কোন একটা ব্যবস্থা করবেহ্যা রে, সোহাগ, তোর লেখাপড়া কোদ্দুর হল?

সোহাগের অক্ষরপরিচয় আগে থেকেই ছিলনিশি কোন কোন দিন ওকে নিয়ে পড়তএকদিন বই-খাতা এনে দিল, ক-দিন সোহাগ পালিয়ে পালিয়ে থাকলনিরূপায় হয়ে একসময় ভাঙ্গ ভাঙ্গা বানান করে পড়া শুরু করলবিচিত্র সব ছড়া লেখা শুরু করল


পালকি চলে, রবিন্দ্রনার ঠকুর

"পালকি চলে

পালকি চলে

গান তরে

আগুন জলে

ছদু গায়ে

আদুল গায়ে

জাচে তারা

রদি সারে

মনা মদু

চখ মদু..."।


আরেকদিন লিখল:

"ফালাইননা খারাপ

ফালাইননা বানর

ফালাইননা দুষ্টামি করে

ফালাইননাকে লাতি মারব

ফালাইননাকে ঠাওয়া মেরে ফেলে দিব

ফালাইননা একটা মেতর, সে গু সাপ করে"


নিশি হাসি গোপন করে বলেছিল: সোহাগ, ফালাইন্যা কে রে?

সোহাগ কোন উত্তর দেয়নিমুখ নিচু করে কেবল হেসেছিলফালাইন্যা কি ওর প্রিয় বন্ধুর নাম? নিশি নাছোড়বান্দা: বল না সোহাগ, ফালাইন্যা কি তোর প্রিয় বন্ধু?

সোহাগ বলেছিল: ফ্রিয় কি, আফা?

ধুত, ফ্রিয় না, প্রিয়

সোহাগের মুখ নিচু হতে হতে গিয়ে হাঁটুতে ঠেকত,

ফালাইন্যা আবার কি নাম রে?

বুঝেন নাই আফা, ফালাইননার মাইনে হইল গিয়া যারে সবাই ফালাইয়া দেয়

কি বলিস, বুঝিয়ে বল

হের আগে হের ভাই ভইন হক্কলে মইরা যাইত তোএর লিগ্যা হের নাম রাখছিল ফালাইননা

রাখলে কি হয়?

অমা, জানেন না বুজি, ফালাইননা হইল ফালাইননা, হেরে তো আজরাইলও নেয় নাআজরাইল না নিলে মরব কেমনে? আফা, আফনে দেহি কুছতা জানেন না

এক্ষণ সোহাগ মুখ দিয়ে বিচিত্র শব্দ করে ছাদের টিকটিকি তাড়াবার চেষ্টা করছেবিচিত্র শব্দটা করতে করতেই বলল, আফা-আফা গো, দেখছেন নি, এইডা কেমুন লাফলালাফলি-ঝাপলাঝাপলি করতাছে?

নিশি অনেক কষ্টে হাসি গোপন করল, সোহাগ, এতদিন এখানে থেকেও তুই ভাষাটা বদলাতে পারলি না!

সোহাগ মুখ ভরে হাসল, আফা, আপনেগো কথা কইয়া শান্তি নাইফাপড় লাগে

সোহাগ, তোকে যে ছড়াগুলো শিখিয়েছিলাম, মনে আছে না, নাকি ভুলে গেছিস?

সোহাগের এই পরীক্ষা টাইপের বিষয়গুলো ভাল লাগে নাসে কথা ঘুরাবার জন্য বলল, আফা, আমাগো গেরাম দেশের একটা ছড়া কই?

বল

"আতা গাছের মাথা নাই

মাথার মইদ্যে চুল নাই

চুলের মইদ্যে উকুন নাই

উকুনের মরন নাই

মরলে কিন্তু বাছন নাই"


নিশির এবার হাসি চাপা সম্ভব হলো না

আফা, সোন্দর না?

হুঁ, সুন্দরকিন্তু তুই দেখি দুনিয়ার সব আজগুবি কথা বলিস

সোহাগের মন খারাপ হয়ে গেলসে স্পষ্ট বুঝতে পারছে আপা তার কথা খুব একটা পছন্দ করেনিআপা এমন করলে তার বুকটা ফাঁকা হয়ে যায়!

WhatsApp