Thursday, June 28, 2007

বীরাঙ্গনা রীনা, তোমায় স্যালুট করি

…ভেবেছিলাম যদি মুক্তি বাহিনী আমাদের কখনও পায়, মা বোনের আদরে মাথায় তুলে নেবে। কারণ আমরা তো স্বেচ্ছায় এ পথে আসিনি।
ওরা আমাদের বাড়িতে একা ফেলে রেখে দেশের কাজে গিয়েছিল এ কথা সত্যি; কিন্তু আমাদের রক্ষা করবার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল কার ওপর? একবারও কি আমাদের পরিণামের কথা ভাবেনি? আমরা কেমন করে নিজেকে বাঁচাবো, যুদ্ধের উন্মাদনায় আমাদের কথা তো কেউ মনে রাখেনি। পেছনে পড়েছিল গর্ভবতী স্ত্রী, বিধবা মা, যুবতী ভগ্নী কারও কথাই সেদিন মনে হয়নি।
অথচ তাদের আত্মরক্ষার তো কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। বৃদ্ধ পিতা-মাতা মরে বেঁচেছেন, গর্ভবতী পত্নীর সন্তান গর্ভেই নিহত হয়েছে। যুবতী স্ত্রী, তরুণী ভগ্নী পাক দস্যুদের শয্যাশায়িনী হয়েছে। অথচ আজ যখন বিজয়ের লগ্ন এসেছে, মুক্তির মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে তখনও একবুক ঘৃণা নিয়ে তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করছে সামাজিক জীবেরা।

আজ পথে পথে কতো শহীদ মিনার। কতো পথ ঘাট কালভার্ট সেতু আজ উৎসর্গিত হচ্ছে শহীদদের নামে। শহীদের পিতা, মাতা, স্ত্রী সন্তানেরা কতো রাষ্ট্রীয় সহায়তা সহানুভূতিই শুধু নয়, সম্মান পাচ্ছে কিন্তু আমরা কোথায়? একজন বীরাঙ্গনার নামে কি একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে? তারা মরে কি শহীদ হয়নি?

একটি মেয়ে তার জীবনের যা কামনা করে তার আমি সব পেয়েছি। তবুও মাঝে মাঝে বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। কিসের অভাব আমার, আমি কি চাই? হ্যাঁ একটা জিনিস, একটি মুহুর্তের আকাঙ্ক্ষা মৃত্যু পর্যন্ত রয়ে যাবে। এ প্রজন্মের একটি তরুণ অথবা তরুণী এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, বীরাঙ্গনা আমরা তোমাকে প্রণতি করি, হাজার সালাম তোমাকে।

ঋণঃ আমি বীরাঙ্গনা বলছি (নীলিমা ইব্রাহীম)

*অসাধারণ একটা বই আমি বীরাঙ্গনা বলছি। এই বইটা আমি যখন পড়ি, আমার খুব অস্থির লাগছিল। ওই সময়কার কথা বলছি, যখন আমার জানাশুনা মানুষ খুব কম। বীরাঙ্গনা রীনার তেমন কোন তথ্য কেউ দিতে পারলেন না। শেষ প্যারাটা আমার মাথায় আটকে গেল। কেবল ঘুরপাক খায় এই কথাগুলো। আমার অল্প ক্ষমতায় কীই বা করতে পারি! আমি আমার ফ্রিডম বইটা তাঁকে উৎসর্গ করেছিলাম। খানিকটা কষ্ট কমেছিল।
আমার এই বইয়ের প্রকাশক আমাকে বললেন, আপনি উৎসর্গে এইসব কি লিখেছেন।
আমি বললাম, আমি যা বিশ্বাস করি তাই লিখেছি। আপনি যদি এই মানুষটাকে বইমেলায় হাজির করতে পারেন, আমি সত্যি সত্যি এই কান্ডটা করব। হাজার হাজার মানুষের সম্মুখে- এতে আমার কোন লাজ নাই।

ফ্রিডমের উ ৎসর্গে আমি লিখেছিলাম, উ ৎসর্গঃ বীরাঙ্গনা রীনা, প্রকাশ্যে ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার পা ধরে রাখব, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি বলবেনঃ এ প্রজন্মকে ক্ষমা করেছেন।