Search

Tuesday, March 16, 2010

নিশিগন্ধা


লুসীর কল্পনাতেও এটা ছিল না তাকে এভাবে পরিবারের অমতে বিয়ে করতে হবে। স্কুটার এগুচ্ছে। লুসী নরম হাতে শক্ত করে তুষারকে ধরে আছে।

তুষারের খুব অবাক লাগছে, কী থেকে কী হয়ে গেল। পণ করে গিয়েছিল লুসীর সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলবে। বিয়ে ব্যাপারটা তাহলে এতই সহজ! এখন থেকে এই মেয়েটি সারা জীবন তার সঙ্গে থাকবে! ক্ষীণ আলোয় তুষার লুসীর দিকে তাকাল। কী পরম নির্ভাবনায় ওর হাত ধরে আছে। তুষারের কেবল মনে হচ্ছে মেয়েটি বড় ভুল করেছে। তুষার বিড়বিড় করে বলল, ‘লুসী, তুমি বড় ভুল করেছ।’

তন্নী দরজা খুললে তুষার হাসিমুখে বলল, ‘তন্নী, তুই আমার চায়ে চিনি বেশি দিস, তাই তোর ভাবিকে নিয়ে এলাম।’
লুসী সহজভাবে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘তুমি তাহলে আমাকে চা বানাতে নিয়ে এসেছ? আমি কিন্তু চা বানাতে পারি না। তন্নী আমাকে তোমার একটা কাপড় ধার দেবে, গোসল করব।’
তন্নী চোখ বড় বড় করে লুসীর দিকে তাকিয়ে রইল।
লুসী গলায় মুগ্ধতা নিয়ে বলল, ‘আরে তন্নী, তোমার চোখ দারুণ তো! এই রে, ছোট করে ফেললে।’
তন্নী লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিল। চোখ তুলে বলল, ‘ধ্যাৎ ভা-ভাব-ভাবি, তুমি বানিয়ে বলছ। ভাইয়া যে বলে আমার চোখ হাঁসের ডিমের মতো!’
লুসী বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তোমার ভাইয়া তো একটা অপদার্থ। ভালো কিছু দেখার মতো ওর চোখ আছে নাকি!’

তুষার এবার ভয় ভয় গলায় বলল, ‘তন্নী, মা কোথায় রে?’
তন্নী ঠোঁট ভেঙে হাসল, ‘মা গেছেন পাশের বাড়িতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ‘বিশেষ অজ্ঞ’ মারুফা খালার ওখানে। ভোয়া শুনবেন। এর পর তারা বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করবেন।’
তুষার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মা কি যুদ্ধের খবর শোনেন?’
তন্নী লুসীর হাত ধরল, ‘আসুন ভাবি, আপনার গোসলের ব্যবস্থা করি।’

তুষারের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এই হয়েছে এক জ্বালা। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এখন শুধু যুদ্ধের খবর। এসব আলোচনায় শুঁটকি ব্যাপারী, গরু ব্যাপারী কেউ বাদ থাকে না। এদের কথাবার্তা শুনে মন হয়, সাদ্দাম-বুশের সাথে হটলাইনে মিনিটে মিনিটে যোগাযোগ আছে।
দু-দিন আগে তুষার রিকশায় করে মগবাজারের দিকে যাচ্ছিল। রিকশা চালাতে চালাতে লোকটা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, আইচ্ছ্যা, কইনছেন-গণ্ডগোলডার হবর কী।
তুষার একটু অন্যমনস্ক ছিল। চমকে জিজ্ঞেস করল, কিসের গণ্ডগোল?
ও ভেবেছিল রাস্তার কোনো ঝামেলার কথা জিজ্ঞেস করছে। লোকটা ঝড়ের গতিতে রিকশা চালাতে চালাতে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ইরাকের গণ্ডগোলডার কথা জিগাইতাছি। সাদ্দাইম্যা অইল গিয়া বাপের বেডা।
তুষার তিতিবিরক্ত হয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, ধুস শালা। পরক্ষণেই জমে গেল। একটা ট্রাক গায়ের উপর ওঠে এসেছিল প্রায়। তুষারের মনে হচ্ছিল ওই মুহ�র্তে তার হৃৎপিণ্ড বুঝি থেমে ছিল। একটু ধাতস্থ হয়ে লোকটাকে বলেছিল, যুদ্ধের কোনো খবর আমি জানি না। সামনে দেখে রিকশা চালাও। আর একটা কথা বললে একটা চটকনা দিব।
লোকটা মুখ ঘুরিয়ে তুষারের দিকে তাকাল। অল্পক্ষণ আগের এত বড় ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করেনি। তার চেয়ে এত বড় পাজি ছেলেটা যুদ্ধের খবর জানে না এটা তাকে আহত করেছে।

কাল সকালে দোকানে চা খাচ্ছিল, সেখানেও তুমুল বচসা। দুপক্ষের মধ্যে খুব কথা কাটাকাটি হচ্ছে। সাদ্দামপন্থীরা সংখ্যায় বেশি। এদের মধ্যে একজন নিবিষ্টচিত্তে দু-পক্ষের আলোচনা শুনছিলেন আর দাঁত খোঁচাচ্ছিলেন। তিনি কাজটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন! গভীর আগ্রহ নিয়ে তুষার লক্ষ করছিল। অল্পক্ষণেই মুগ্ধ হয়ে গেল, খোঁচাখুঁচির কাজ এতভাবে করা যায়? অল্পক্ষণেই তার গা গুলিয়ে উঠল। খুঁচিয়ে জিনিসটা শেষ পর্যন্ত ভদ্রলোক বের করে আনলেন। নাকের কাছে নিয়ে শুঁকলেন। ...। তুষার চোখ ফিরিয়ে নিল।
ভদ্রলোক চিবুতে চিবুতে বললেন, আরে মিয়া রাহেন, আমেরিকা যে এত্তোগুলা বুমা ফালাইছে, ইরাকের কী কিছু অইছে? বুড়ো আঙুল ডানে-বাঁয়ে করে বললেন, কিসস্যু অয় নাই, একটা বুমাও ফাডে নাই। বড় পীরছাবের মাজার-মারাত্মক জাগা রে ভাই!
এবার বুশপন্থী একজন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন, আচ্ছা, তাই নাকি! তাহলে তো ইরাকের সব মিসাইল সৌদির ওপর দিয়ে যাবে। এটা তো আরো মারাত্মক জায়গা।
ইরাকপন্থী আরেকজন টেবিলে চাপড় মেরে গ্লাস উল্টে ফেললেন, আজাইরা কথা রাহেন। আপনারা আসল খবরাই জানেন না, ইরাকের সবটা মাটির নিচে। বাড়িঘর যেগুলো আছে সব ফলস। দোতলা বাড়িকে বানিয়েছে বিশতলা। মিসাইল সব ওপরে লাগবে, নিচে কিছুই হবে না।
অন্য একজন এক ঢোকে চা গিলতে গিয়ে মুখ পুড়িয়ে ফেললেন, ইরাকিরা হইল গিয়া বাঘের জাত। ইরাকের পাঁচ হাজার পাইলটের সবাই যুদ্ধে শহীদ হইতে চায়। সাদ্দাম বলল, রাখো, এভাবে না, লটারি হবে।
দোকানের বয় এতক্ষণ ধরে চুপচাপ এদের কথাবার্তা শুনছিল। ন্যাকড়া দিয়ে টেবিল পরিষ্কার করতে করতে বলল, আপনেরা একটা খবর হুনছেননি, চিটাগাং-সিলেট মাজরের সব কাছিম আর কবুতর বোলে ইরাক গেছে গা!

জরুরি কাজ ছিল বলে তুষার বেরিয়ে এসেছিল। থাকতে পারলে অবশ্য বেশ হতো। অদ্ভুত অদ্ভুত সব খবর জানা যেত।
লুসীকে বাথরুম দেখিয়ে তন্নী বলল, ‘ভাবি, তুমি কি টিকটিকিকে ভয় পাও?’
লুসী চুলের ক্লিপগুলো খুলতে খুলতে বলল, ‘না, কেন?’
‘আমাদের বাথরুমে একটা টিকটিকি আছে।’
লুসী হেসে ফেলল, ‘টিকটিকি তো আর ভয়ানক কিছু না।’
‘ওসব না, ভাবি। এই টিকটিকিটা গৃহপালিত। প্লিজ, তুমি একে মারবে না।’
‘তাই! তা আমি এটাকে মারব কেন?’
‘ওটা বড় ফাজিল। গোসল করার সময় ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে।’ বলেই তন্নী মাথা নিচু করল।
‘তন্নী, তুমি পাগল নাকি! এসব কী সৃষ্টিছাড়া কথা!’

তন্নী মন খারাপ করে ফেলল ফেলল। কথা ঘুরাবার জন্য লুসীর হাত থেকে ক্লিপগুলো নিয়ে বলল, ‘জানো ভাবি, ভাইয়া না ছ-সাত দিনে একবার গোসল করে। ও একটা বনখাটাশ। এ জন্যই তো ওর শরীরে বোটকা গন্ধ।’
‘আমার কাছে তো ভালোই লাগে।’ বলেই লুসীর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
তন্নী চোখ বড় বড় করে বলল,
‘অরি আল্লাহ, বলো কী!’
‘তোমার যখন এমন কেউ হবে, দেখবে তোমার কাছেও ভালো লাগবে।’
‘যাও, ভালো হবে না বলছি। ভাবি, সত্যিই তুমি এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়ে এসেছ?’
‘হুঁ।’
তন্নী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘আচ্ছা সব ছেড়ে আসতে তোমার খারাপ লাগেনি?’
লুসী বিষণ্ন হয়ে বলল, ‘তোমার ভাইয়াকে আমি খুব পছন্দ করি। এ ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না।’
‘সরি ভাবি, তোমার মন খারাপ করে দিলাম।’ তন্নী সিরিয়াস মুখ করে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইয়ার মাঝে তুমি এমন কী দেখলে একেবারে ফট করে বিয়ে করে ফেললে!’

লুসী তন্নীর চুল টেনে বাথরুমে ঢুকল।

কল বেলের শব্দে তন্নী ছুটে গেল, ‘মা এসেছে সম্ভবত।’
লুসী সহজ ভঙ্গিতে রাহেলা বেগমকে পা ছুঁয়ে সালাম করল। তুষার হড়বড় করে বলল, ‘মা, এর নাম লুসী। তোমার বউ।’
রাহেলা বেগম স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন। থেকে থেকে শ্বাস ফেলতে লাগলেন। নিস্তেজ গলায় লুসীকে বললেন, ‘আজ তোমার বিয়ের প্রথম রাত, তাই এখন তোমাকে কিছু বলতে চাই না। তোমার সাথে কাল কথা বলব।’
লুসী সহজভাবে বলল, ‘মা, আপনি যেসব কঠিন কঠিন কথা বলবেন, এখনই বলতে পারেন।’

রাহেলা বেগম চুপ করে রইলেন।
লুসী কোমল গলায় বলল, ‘আসুন মা, খেয়ে নিন। আপনি না খেলে আমরা খাব না।’
রাহেলা বেগম কিছু না বলে খেতে বসলেন। তন্নীকে লবণ এগিয়ে দিতে বললেন। সে ফিক করে হেসে ফেলল, ‘আমার চেয়ে তো ভাবি কাছে, তাকে বলো না!’
রাহেলা বেগম কঠিন দৃষ্টিতে তন্নীর দিকে তাকালেন।
তন্নী হাসতে হাসতে বলল, ‘রাগ করছ কেন মা। ভাবির সব কথা শুনলে তোমার রাগ থাকবে না। ভাবি সব ছেড়ে...।’
‘চুপ কর, তন্নী।’
তন্নী ক্ষেপে গেল, ‘না, চুপ করব না। আমার সব কথা তোমায় শুনতে হবে মা।’
তন্নী আবার প্রথম থেকে বলতে লাগল।

রাহেলা বেগম চুপচাপ খেতে লাগলেন। তুষারের মনে হলো মায়ের দৃষ্টি যেন ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছে। হাত ধুয়ে সহজভাবে লুসীকে বললেন, ‘তোমার জন্য দুঃখ হয়। গাধাটার মধ্যে যে কী দেখলে! তোমার হাত-গা দেখি একদম খালি। আমার ঘরে একটু আসো তো।’
লুসী ক্ষীণ গলায় বলল, ‘মা, আপনি আমাকে বৌমা না বললে আমি কিন্তু যাব না!’
রাহেলা বেগম হেসে বললেন, ‘আসো।’
লুসী আর কথা না বাড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে পিছু নিল।

তুষার এতক্ষণে স্বস্তি�র নিঃশ্বাস ফেলল। তুষারের রুমটা তন্নী অল্প সময়ে গুছিয়ে দিয়েছে। ঢুকেই লুসী নাক সিটকাল, ‘একি অবস্থা! এভাবে কোনো মানুষ থাকে? একটা জিনিসও দেখি জায়গায় নেই!’
‘এটা তো আর তোমাদের বাড়ি না যে।’
‘দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে ঠাণ্ডা শ্বাস ফেলছ কেন? বাজে কথা বলবে না। আধ খাওয়া চায়ের কাপকে বানিয়েছ অ্যাশট্রে, ফুলদানিতে ছাই ঝেড়েছ। এই সব কী!’
তুষার কিছু না বলে চুপচাপ সিগারেট টানতে লাগল।
‘একের পর এক সিগারেট ধরিয়ে রুমটা দেখি একেবারে অন্ধকার করে ফেলেছ!’
‘আমি এমনিতে বেশি সিগারেট টানি না। টেনশন হলে বেশি হয়ে যায়।’
‘এখন তোমার আবার কিসের টেনশন!’

তুষার মাথা নিচু করে হাসল।
ঘরের বাতি কমিয়ে লুসী সহজ ভঙ্গিতে বিছানায় শুয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ পর তুষার আমতা আমতা করে বলল, ‘ইয়ে, আমি ঘুমুব কোথায়?’
‘তুমি মেঝেতে শোও।’
তুষার বুঝতে চেষ্টা করছে, লুসী কি ওর সঙ্গে ঠাট্টা করল! তুষার উঠে গভীর ভালোবাসায় লুসীর গায়ে হাত রাখল।
‘আহ্‌, গায়ে হাত দিচ্ছ কেন?’
লুসী তুষারের হাত সরিয়ে দিল না। তুষার একটু ইতস্ত�ত করল, হাত সরাল না।

অনেক রাত। কয়টা বাজে তুষার জানে না। পাশে লুসী ঘুমিয়ে কাদা। কোথায় যেন নিশিগন্ধা ফুটেছে। জানালার বাইরে ফকফকা জ্যোৎস্নার অজানা রহস্য, পাশে রহস্যময়ী এক নারী। সম্ভবত পৃথিবীতে রহস্য বলতে কিছু নেই। এ জ্যোৎস্না, এ নারী এক সময় তুষারের কাছে রহস্য মনে হবে না।

*তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল এটা বলতে পারলে আমার চেয়ে সুখী কেউ হতো না কিন্তু...।
তুষার, লুসীর ভালবাসা-বাসির সন্তান, গদ্য। গদ্য নামের কিশোরটি ছাদে একা। বিষণ্ন-কুৎসিত এক বিকেল। এমন একটা বিকেলে অযথাই ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ার তীব্র আকা�ঙ্খা জাগে। কিশোরটি অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। মাথায় কেবল ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে বাবা-মা একসঙ্গে থাকলে কি হয়!

Sunday, March 14, 2010

শৈশব!


নঈম সাহেব দোকানে বসে খুশি মনে পান চিবুচ্ছেন। এ ক-দিন ওঁর মনে ভারী আনন্দ! কনফেকশনারীর ব্যবসাটা এখন জমজমাট। দু’জন মিলেও বিক্রি করে কূল পাওয়া যাচ্ছে না। পাশেই বেশ কটা বাচ্চাদের স্কুল চালু হয়েছে। টিফিন টাইমে বাচ্চারা সব সাফ করে দিচ্ছে। পেটিস, সিঙ্গারা এইসব আবার বিকেলে কিনে আনতে হচ্ছে। ওদিন বেশ ক’টা সিঙ্গারা থেঁতলে গিয়েছিল, কাঁচের বাক্সের এক কোনায় পড়ে ছিল।
ছোট একটা ছেলে কী চমৎকার করেই না বলল: কাকু, একটা সিঙ্গারা দেন তো।
নাঈম সাহেব লজ্জিত হয়ে বলেছিলেন: সিঙ্গারা তো নাই খোকা।
ওই তো, দেন না, কাকু।
ওগুলো ভেঙ্গে গেছে, খাওয়া যাবে না যে।
কিছু হবে না। দেন না, খুব খিদে লেগেছে।

তিনি সীমাহীন বিব্রত হয়ে যতটুকু সম্ভব টিপেটুপে ঠিক করে দিলেন। মুখ মুছে ছেলেটি টাকা দিলে হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন: ওকি, টাকা কেন।
কাকু সিঙ্গারার দাম নিবেন তো।
না-না, ঠিক আছে। ওগুলো এমনিতেই ফেলে দিতাম।
ফেলে দিলে অন্য কথা। আমি খেয়েছি, টাকা দিতে হবে না বুঝি।
ছি-ছি, টাকা লাগবে না।
উহুঁ, মা বলেন কিছু খেলে টাকা দিতে হয়।
তোমার মা বলেছেন বুঝি, ঠিক বলেছেন। আচ্ছা তুমি অন্য দিন দিয়ো।
উহুঁ-উহুঁ, আজ নিতে হবে।

নঈম সাহেব অপার বিষ্ময়ে শিশুটির দিকে তাকিয়েছিলেন। ওঁর চোখ থেকে মুগ্ধতা চুঁইয়ে পড়ছিল। এখনকার শিশুরা কী সৎ, অমায়িকই না হচ্ছে। ওঁর ছেলেবেলার কথা মনে করে হাসলেন। তখন ফোর-ফাইভে পড়েন। এক দোকান থেকে আধসের জিলাপী কিনলেন।
দোকানি বলেছিল: খোকা বাবু পয়সা দেও।
তিনি ডাহা মিথ্যা বললেন, কি বলেন, পয়সা না দিলাম!
হই হই-এ লোক জমে গেল। সবাই দোকানিকে বকা দিল। জলিল মিঞা তোমার কী মাথা খারাপ। এই দুধের শিশু মিথ্যা বলবে, এরা হল ফেরেশতার জাত।
অন্য একজন বলল, জলিল, তোমাকে কতদিন নিষেধ করেছি দিনের বেলা গাঁজায় টান দেবে না।
জলিল মিঞা অসহ্য রাগে লাফিয়ে উঠেছিলেন: তাহলে-তাহলে, আমি কি মিথ্যা বলছি। হুলস্থূল কান্ড, বয়স্ক একলোক হাত উঠিয়ে সবাইকে থামতে বললেন, এই ছেলে, যাও, বাড়ি যাও। জলিল, কত হয়েছে, দাম আমি দেব।
জলিল মিঞা মুখ লম্বা করে বললেন: দাম লাগবো না।
এই ব্যাটা, দাম লাগবো না এটা এখন বলছিস কেন। এতক্ষণ তো আকাশ ফাটিয়ে ফেলছিলি।

নঈম সাহেব গুটিগুটি পায়ে সরে পড়ছিলেন। জলিল মিঞা পেছন থেকে চেঁচাতে থাকল: এ্যাই, এ্যাই পুলা, জিলাপীর পোটলা ফালাইয়া কই যাও।
নঈম সাহেব মহা সুখে জিলাপী চিবুতে চিবুতে বাবার সামনে পড়ে গেলেন। মুখ রসে মাখামাখি। বাবাকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন প্রায়। একটুর জন্যে ধরা পড়ে গেলেন!
বাবা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, কি খাচ্ছিস?
জিলাপী।
পেলি কোথায়?
নঈম সাহেব ঝড়ের গতিতে চিন্তা করছিলেন। বাসার কেউ দিয়েছে এটা বলে পার পাওয়া যাবে না, সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে যাবেন। মাথায় যা এল তাই বললেন: একজন দিল।
বাবার এবার হিম গলা, এমনি দিল?
নঈম সাহেব বুঝতে পারছিলেন ফাঁদে পা দিচ্ছেন। তখন আর ফেরার উপায় নেই।
জ্বি।
হুম, যে দিল সে তোর কি লাগে, মামা-ফুফা-চাচা? বল, চুপ করে আছিস কেন?
এই মুহূর্তে আকাশের সমস্ত তারা ঝপ করে নঈম সাহেবের চোখে নেমে এসেছে। একেকটা তারার কী রঙের ছঁটা! জাড়িয়ে জড়িয়ে বললেন: জ্বি, এক দোকানী দিল। আমি নিতে চাই নি, জোর করে দিয়ে দিল। বলল, না নিলে খুব রাগ করবে।
বাবা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, পয়সা না নিয়েই দিল?
জ্বি, বলল, না নিলে রাগ করবে।
আহা, তাহলে তো নিতেই হয় নইলে রাগ করবে যে। আয় আমিও আধ মন মাগনা জিলাপী নিয়ে আসি। চ-ল!

বাবা ঘাড় ধরে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে চললেন। এখন কোন সংশয় নেই, পেটের জিলাপীগুলো বাবা বের করে ফেলবেন। এজন্য বাবাকে খানিকটা ফ্রিহ্যান্ড এক্সসারসাইজ করতে হবে। মাদ্রাসায় যা দোয়া-দরুদ শিখেছিলেন সব কয়েকবার রিভিশন দিয়ে ফেললেন। জলিল মিয়া নামের লোকটা অসম্ভব শান্ত গলায় বলেছিলেন: জ্বি, আমি দিছি।
বাবার তখন চন্ডাল রাগ: কেন, কেন দিলেন!
জলিল মিয়া বাবার চোখে চোখ রেখে বললেন, ছেলেপুলে নাই তো, মায়ায় পইড়া দিছি। ভুল হইছে, মাফ কইর‌্যা দেন।

ঠিক তখনি রোগামত কাল-কাল একটা ছেলে, দোকানের ভেতর থেকে উচুঁ গলায় বলল: বাজান, চুলা নিভাই ফেলমু।
জলিল মিয়ার রক্তশূন্য মুখ। বাবা হতভম্ব। টুঁ-শব্দও করলেন না। ঘোরলাগা ভঙ্গিতে জলিল মিঞাকে হাত বাড়িয়ে ছুঁলেন। বিড়বিড় করে কীসব বলতে থাকলেন।

একটা ভিক্ষুক গলা ফাটিয়ে ভিক্ষা চাচ্ছে।
নঈম সাহেব কড়া কথা বলতে গিয়েও বললেন না। বয়স্ক অন্ধ একটা লোক, সঙ্গে মৌ’র বয়সী একটা মেয়ে। এই মেয়েটা ঠোঁট কী ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। নঈম সাহেবের চোখ ভিজে এল, কী অনিশ্চিত একটা জীবন! এই শিশুটি অন্ধ লোকটার হাত ধরে কোথায় কোথায় ঘুরবে, কতদিন ঘুরবে? পাঁচটা টাকা দিলেন। মেয়েটি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সমস্ত মুখ কৃতজ্ঞতায় ভিজে আছে। আশ্চর্য, এর জীবনরেখার সীমা এই! মাত্র পাঁচ টাকা পেয়ে এ অন্য জগতের আনন্দ অনুভব করছে। মেয়েটা ভিক্ষে করতে বেরিয়েছে সম্ভবত খুব বেশিদিন হয় নি। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা এর প্রবল।

নঈম সাহেব এইসব নিয়ে ভাবার সুযোগ পেলেন না। টিফিন টাইম হয়ে গেছে। শিশুরা দল বেঁধে কলকল করে ঢুকছে। একা হাঁপিয়ে উঠলেন। দোকানের ছেলেটা এত দেরি করছে আজ। কল্লোলকে ঢুকতে দেখে চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘তুই।’
কল্লোল তেমন দোকানে আসে না। কল্লোল হাসিমুখে বলল, ‘কি বাবা, ঝামেলা। এরা দেখি বাজার জমিয়ে ফেলেছে।’
‘ছি, এইসব বলতে নেই। এরা খরিদ্দার, লক্ষী। হোক শিশু, আমরা যে খাবারটা খাই, পোশাকটা গায়ে দেই এতে এদের অবদান কম না।’
‘মাইগড, বাবা, তুমি দেখি একেবারে পাকা ব্যবসায়ীর মত কথা বলছ।’
‘তোদের ধারণা, ব্যবসায়ী মানেই অবজ্ঞার বিষয়, এটা ঠিক না। ব্যবসায়ী মানেই বুদ্ধিমান। এমন না হলে কেউ পিচ্ছিল টাকা আটকাতে পারে।’
‘সরি, বাবা। তুমি খালি কথার উল্টা অর্থ কর। ইয়ে বাবা, আমি তোমাকে সাহায্য করি?’
‘পাগল, তুই সাহায্য করবি, তুই! এক গ্লাস পানি ঢেলে খেতে পারিস না। এইসব পারবি না।’
‘ফুঃ, এটা কোন কাজ, শিশুরাও পারে।’

অল্পক্ষণেই দেখা গেল শিশুরা নঈম সাহেবকে পাত্তা দিচ্ছে না। যা বলার কল্লোলকেই বলছে, আংকেল এটা দেন, ওটা দেন, পানি দেন। একজন তো বলল, আংকেল দেখেন তো মুখে খাবার লেগে আছে কিনা।
কল্লোলের কী আনন্দই না হচ্ছে, বাবাকে খানিকটা সাহায্য করতে পেরে।
‘বাবা এখন থেকে আমি কিন্তু সময় পেলেই আসব।’
নঈম সাহেব আঁতকে উঠলেন, ‘না-না, তোর পড়াশোনার ক্ষতি হবে।’ কল্লোল কথা বাড়াল না। প্রায় রোজই দোকানে আসতে থাকল।

*পিতা ও পুত্র

Saturday, March 13, 2010

পিতা ও পুত্র


সোয়া এগারটা বাজে। নঈম সাহেব এখনও রাতের খাবার খাননি। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন, কল্লোল আজ কী দেরীই না করছে। ছেলেটা যে কোথায় কোথায় থাকে, কী খায়, কে জানে! ও বড় লক্ষী ছেলে।

অবশ্য এতে ওঁর নিজের অবদানও কম না। কিছু সূক্ষ্ণ চাল দেন। এই যে এখনও খাননি, একসঙ্গে খাবেন বলে অপেক্ষা করছেন। ও বিপন্ন বোধ করবে। ওর বিব্রত মুখ দেখতে ভালো লাগে। কল্লোলের মা সম্ভবত ঘুমিয়ে কাদা। মহিলা জীবনটা ভাজা ভাজা করে ফেলল। কিভাবে স্বামীকে অপদস্ত করা যাবে-নিচু দেখানো যাবে, এ ভাবনা ছাড়া এর মাথায় অন্য কিছুই খেলা করে না! অল্প কথায়, অসাধারণ রাঁধুনি এবং দুর্দান্ত ঝগড়া বিশারদ।

ওদিন কল্লোল খেতে বসে থু-থু করে বলেছিল: ডালে কী বিশ্রী গন্ধ, মুখে দেয়া যাচ্ছে না! ওয়াক!
ফাতেমা বেগম কঠিন ভঙ্গিতে বললেন: তোর বাবাকে নতুন একটা চশমা এনে দে।
মা কী বলছ-বলছি ডালে গন্ধ, তুমি বলছ চশমার কথা!
বেচারা, তোর বাবা এই চশমায় ভাল দেখতে পায় না। দশ বছরের পচা ডাল আগ্রহ করে কিনে নিয়ে এসেছে।
নাঈম সাহেব হা হা করে হেসে বলেছিলেন: চশমা ঠিকই আছে। ওই তো তোমার ভুরুর নিচে তিলটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
চুপ, আবার আহাম্মকের মতো ফ্যা-ফ্যা করে হাসে। পচা ডাল কিনেছ পয়সা বাঁচাতে, তুমি তো আবার ডাল খাও না। আসলে আমরা মরে যাই তাই চাও, ভেবেছ, আমি বুঝি না কিছু, না!
কল্লোলের মা, দয়া করে এখন আরাম করে খেতে দাও, কাল ডাল ফেরত দিয়ে আসব।
ফিরাফিরি পরের কথা, তুমি এ কান্ডটা কেন করলে?

কল্লোল লজ্জায় মরে যাচ্ছিল, মা ওর জন্যে হূলস্থুল কান্ড করছেন। তাছাড়া বাবা ডাল খান না কথাটা ঠিক না, খান, কম খান। মিনমিন করে বলল: বাদ দাও তো, মা।
বাদ দেব কেন, এই না বললি মুখে দেয়া যাচ্ছে না!
ভুল বলেছি, খেতে অসুবিধা হচ্ছে না।
বললেই হল, ওই ভাত সরিয়ে অন্য ভাত নে।
আঃ মা, লাগবে না।
উহুঁ, ওই ভাত সরিয়ে ফেল!

কল্লোল অল্পক্ষণ পলক না ফেলে মা’র দিকে তাকিয়ে পুরো ডালের বাটি নিজের পাতে ঢেলে দিল। প্লেট উঠিয়ে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে নির্বিকার ভঙ্গিতে খেতে লাগল। ফাতেমা বেগম হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। নঈম সাহেব চোখ বড় বড় করে কল্লোলকে দেখার চেষ্টা করছিলেন। কল্লোলকে কেমন অস্পষ্ট-ঝাপসা দেখাচ্ছিল। ছেলেটা এমন পাগলু হয়ে কেন?

কলিং বেলের শব্দে চমকে উঠলেন। যাক, শেষ পর্যন্ত ফিরল! কল্লোল মাথা নিচু করে ঢুকে অস্ফুটে বলল,‘সরি বাবা, একটু দেরি হয়ে গেল।’
নঈম সাহেব নিঃশব্দে দরজা লাগালেন।
‘সরি বাবা।’
নঈম সাহেব চেষ্টাকৃত যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘এক কথা দু’বার বলছিস কেন! কই, তোকে বকা দিয়েছি।’
‘বকাবকি করো না বলেই তো আরও খারাপ লাগে।’
‘আয় খেয়েনি।’
‘এসব কী বাবা, তুমি এখনও খাওনি!’

নঈম সাহেব খাবার টেবিলে বসে কল্লোলের প্লেটে ভাত বেড়ে অল্প ভাত নিজেও নিলেন। খাবার সব কেমন ঠান্ডা মেরে গেছে।
‘বাবা, এটা কিন্তু মোটেও ঠিক হচ্ছে না। এ বয়সে না খেয়ে বসে থাকো শুধু শুধু।’
‘এটা তুই এখন বুঝবি না, ছেলে-মেয়ের বাবা হলে তখন বুঝবি।’
কল্লোল বেসিনে সশব্দে নাক ঝাড়ল। নঈম সাহেব তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। বলবেন না ভেবেও বললেন,‘এই-এই ছোকরা।’
‘কী, অ, এই ব্যপার নাক ঝাড়া!’
‘দেখ-দেখ কান্ড ছেলের, কী অবহেলা করে বলছে, অ-এই ব্যপার। মার্জিত আচরণ বলে একটা ব্যাপার আছে, না কি?’
‘হুঁহ, মার্জিত আচরণ আমাদের মতো হাভাতের! এসব দিয়ে কী করব!’
‘কীসব কথা, ভালো আচরণ কী কেবলমাত্র খুব পয়সাঅলাদেরই থাকবে! শোন, মজার একটা কথা বলি। এক লোক ট্রেনে মহা আনন্দে পান চিবুচ্ছে। যেখানে সেখানে পানের পিক ফেলে নোংরা করছে। এক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে ব্যাপারটা লক্ষ করছিলেন। শেষ পর্যন্ত কড়া করে ধমক দিলেন। লোকটা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল: গরীব মানুষ মাফ করে দেন। কী বুঝলি?’
‘গরীব হওয়া বড় লজ্জা, বড় কষ্ট, বাবা। এর চেয়ে জঘন্য কিছু এ পৃথিবীতে হতে পারে না।’
‘খুবই সত্য কথা কিন্তু তাই বলে তাইরে-নাইরে করে দিন কাটালে তো হবে না। আয়, খেতে আয়।’

কল্লোল চেয়ার টেনে বসল। ভাতে তরকারী মাখতে মাখতে বলল, ‘মৌ, মা, এরা কী সব ঘুমিয়ে গেছে?’
‘হুঁ, মৌ জেগে থাকতে চেয়েছিল। ন’টা থেকেই আমার কানের কাছে ঘেনঘেন করছিল, তুই এলে এক সঙ্গে খাবে বলে। তোর মা চড় দিয়ে ওর গালে আঙ্গুলের দাগ বসিয়ে দিল। তোর মা যে কী জিনিস, খারাপ ছাড়া ভালো কিছুই নেই।’
নঈম সাহেব চেষ্টা করেও গভীর শ্বাস আটকাতে পারলেন না। কল্লোল মুখ তুলে তাকাতেই বাবার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। কেউই চাচ্ছিল না তাকাতাকির পর্বটা অন্তত এ মুহূর্তে হোক, তবুও হল। বাবার চোখ পানিতে ছাপাছাপি অবস্থা। কল্লোলের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, কী করুণই না দেখাচ্ছে বাবাকে!
‘বাবা, প্লিজ মন খারাপ করো না, শেষে আমি কিন্তু কেঁদে ফেলব।’

নঈম সাহেব বিচিত্র উপায়ে নিমিষেই মুখ হাসি-হাসি করে ফেললেন। এখন কেউ দেখলে ভাববে এতোক্ষণ খুব হাসির কথা হচ্ছিল। যেন হাসির দমকে ওঁর চোখ খানিকটা ভিজে গেছে। বাবার নিয়ন্ত্রণ দেখে কল্লোল মুগ্ধ হল।
‘হ্যাঁ রে, কল্লোল, তোর পড়াশোনা, ইউনিভার্র্সিটির কথা বল।’
‘কি বলব, বলো। ভার্সিটি বছরে তিনশো পয়ষট্রি দিনে তিনশো দিন বন্ধ থাকে। চোখের সামনে মেধাবী ছেলেগুলো লাশ হয়ে যায়। কেউ কেউ কী নিষ্ঠুর ভঙ্গিতেই না বলে, আজ কটা কলাগাছ পড়ল? ওয়াল্লা, একটাও পড়ে নাই! ধুর, ছেলেগুলো সব একেকটা ভেবাগঙ্গারাম। পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে ফার্নিচারের মতো। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী নিহত ছাত্রের পরিবার-পরিজনকে ধরে কাঁদার মতো একটা ভাব করেন। ওই ছবি পরদিন দেশের প্রায় সমসত পত্রিকায় বিশাল আকারে ছাপা হয়। থু, এসবের কোনো মানে হয়, বাবা।’
নঈম সাহেব কাতর গলায় বললেন, ‘তোকে নিয়ে বড়ো ভয় রে, কল্লোল।’
কল্লোল হেলাফেলা ভাবে হাসল, ‘ফুঃ, গুলি লেগে লাশ হয়ে যাই কী না এ জন্যে?’
‘এভাবে বলিস না। আমি আর কয় দিন, বল। আমার পর মৌ, তোর মাকে তুইই তো দেখবি।’
‘বাবা, মার জন্যে তোমার এতো ভাবনা!’
‘বলিস কী পাগল, ত্রিশ বছর এক সঙ্গে ঘর করলাম! এ দীর্ঘ সময় কাঠের সঙ্গে থাকলেও তো মায়া পড়ে যায়, ও তো একটা মানুষ।’
কল্লোল এঁটো থালা একপাশে সরিয়ে বলল, ‘বাবা, হাত ধুয়েনি?’
‘না।’
‘তুমি খাও না ধীরেসুস্থে। এমনিতেও তোমার ভালো করে চিবিয়ে খাওয়া উচিত। আমি হাত ধুয়েনি?’
‘অনুমতি দিলাম না। আচ্ছা যা, ধুয়ে নে। আর শোন, বেসিনে গিয়ে গলা খাঁকারি দিবি না খবরদার, টান মেরে কান ছিঁড়ে ফেলব।’

বাবার খাওয়া হয়ে গেলে কল্লোল এঁটো বাসন রান্না ঘরে জড়ো করে একে একে সব ধুয়ে ফেলল। বাবা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘আহ, চা হলে মন্দ হত না।’
কল্লোল লাজুক ভঙ্গিতে বলল, ‘বাবা, আমি বানাব?’
‘তুই বানাবি কী রে, চা করতে পারিস?’
‘চেষ্টা করে দেখতে পারি, তুমি খেতে পারবে কী না বুঝতে পারছি না।’
বাবা কী শিশুর মতোই না হাত পা ছুঁড়ছেন! এ মুহূর্তে দেখে মনে হচ্ছে ওঁর চেয়ে সুখী কেউ আর এ পৃথিবীতে নেই। অতি তুচ্ছ ব্যাপারগুলো এ মানুষটাকে কী প্রভাবিতই না করে!
‘আরে ছোকরা বলে কী! কর, চা কর।’

চা নামের যে জিনিসটা শেষ পর্যন্ত দাঁড়াল, এর নমুনা দেখে কল্লোল একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আনেকটা পাতলা সিরাপের মতো। রং টা অবশ্য ঠিক ধরতে পারছে না। এমন রং আগে কখনও দেখেছে? কই, মনে পড়ছে না তো। বাবার সামনে চা’র কাপটা রেখে ভাবছিল চট করে সরিয়ে ফেলব কী না। বাবা সেই সময়টুকু দিলেন না। লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আহ, অসাধারণ।’
কল্লোল নিজের কাপে ভয়ে ভয়ে চুমুক দিল। নিমিষেই মুখে প্রচুর ভাংচুর হল, কপালে ভাঁজ পড়ল, মুখ কুঁচকে গেল, ‘অসাধারণ! চা না, বাবা, তোমার অভিনয়। এ দেশে পড়ে আছ কী মনে করে- হলিউড চলে যাও, ওরা তোমায় লুফে নেবে।’
নঈম সাহেব হা হা করে হাসলেন, ‘তুই কী কম অভিনেতা। ওদিন ওই নষ্ট ডাল খেয়ে তোর পেট নেমে গেল। সবার চোখ বাঁচিয়ে টয়লেটে ছুটাছুটি করছিস। একবার আমার সামনে পড়ে গেলি। হড়বড় করে বললি: কী কান্ড দেখো, বাবা, তোমার ডায়বেটিস আমাকে ধরে ফেলেছে। একটু পর পর যেতে হচ্ছে।
কল্লোল খসখস করে গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘যা-ও বাবা।’
বাবা চোখ সরু করে ওর ক’দিনের না-কামানো দাড়ি লক্ষ করছেন দেখে কল্লোল তাড়াহুড়া করে বলল, ‘বাবা, আমি তোমাকে হাজার দশেক টাকা দিতে পারি।’
‘এত টাকা কোথায় পেলি?’
‘যেখান থেকেই পাই, ছিনতাই করি নি।’
‘তা না, কিন্তু এত টাকা!’
‘আঃ বাবা, সব জানা চাই। জামির কাছ থেকে, হল তো?’
‘ছি, তুই চেয়েছিলি?’
‘উহুঁ, কোথেকে আমার একাউন্ট নাম্বার জোগাড় করে জমা দিয়েছে। আগে জানতাম না। আজ জানলাম।’
‘বলিস কী!’
‘হুঁ, তাই। পরে সময় করে ওকে ফেরত দেব।’
নঈম সাহেব বিড়বিড় করতে লাগলেন ‘আশ্চর্য, কী আশ্চর্য!’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘তবু কল্লোল, বন্ধুর কাছ থেকে টাকা নেয়া ঠিক না। তুই টাকা ফিরিয়ে দে।’
কল্লোল একটু উষ্ণ হয়ে বলল, ‘তোমরা বুড়োরা আসলে জীবনটাকে বড় জটিল করে ফেলো। এবং তোমাদের মতো আমাদেরকেও ভাবতে বাধ্য করো। দুঃসময়ে বন্ধু পাশে এসে না দাঁড়ালে, বন্ধু আর রাজনৈতিক নেতার মধ্যে পার্থক্য কী?’ এবার ধীর গলায় বলল, ‘তাছাড়া বাবা, এ টাকা এক্ষুনি ফেরত দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। এটা করলেই ও যে কী অনর্থ করবে ভাবতেও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। কাল তোমাকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে দেব।’
‘টাকা দিয়ে আমি কী করবো, তুই রেখে দে।’
‘না বাবা। তোমার ভালো কোনো জামা-কাপড় নেই, হররোজ একই কাপড় পরে দোকানে যাও। মা’রও ভালো কোনো শাড়ি নেই। মৌকেও কিছু কিনে দিয়ো।’

নঈম সাহেব মন খারাপ করা নিঃশ্বাস ফেললেন। মগবাজারে কনফেকশনারীর দোকান ভালোই চলছিল। হুট করে কী যে হল, বাজারে প্রচুর ধার-দেনা হয়ে গেল। একের পর এক শখের জিনিস গুলো বিক্রি করলেন। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে কালার টিভি, ভিডিও বাঁধাছাঁদা করছিলেন। চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। অসম্ভব লজ্জাও হচ্ছিল। এসব তুচ্ছ জিনিসের এত মায়া!
কল্লোল ওঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিল: ভালোই হল, বাবা, পরের বার আমরা লেটেষ্টটা দেখে কিনব।
মৌ ঠোঁট উল্টে তার ভাইকে কটাক্ষ করে বলেছিল: ভাইয়া রাত-দিন ছবি দেখে বলে আমি পড়তে পারতাম না। এখন কী মজা-আরাম করে পড়ব। আমি বড়ো ডিস্টার্ব হইতাম।

নঈম সাহেবের বড় বোন কার কাছে যেন খবর পেয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে এসেছিলেন। এই অসম্ভব মমতাময়ী ছোটখাটো মহিলাটি ওঁর হাত চেপে ধরেছিলেন। আর্দ্র গলায় বলেছিলেন: তোর শখের জিনিস বিক্রি করতে হবে না। আমি তো এখনও মারা যাই নাই। কত টাকা দরকার আমাকে বল, আমি দেব।
নঈম সাহেব আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন কেঁদে না ফেলতে। গাল-টাল ভাসিয়ে বলেছিলেন: তা হয় না, আপা।
কেন হয় না, আমি কী তোর কেউ না।
প্লিজ, তুমি অনুরোধ করো না। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। অন্যকিছু শুনব না।
বড় আপা আহত চোখে তাকিয়ে ছিলেন। ওঁর অজানা নেই- ছোট ভাইটা পাগলা ধরনের, খুব একরোখা। একবার না বললে হ্যাঁ করানো যাবে না। অস্ফুটস্বরে শুধু বলেছিলেন: তোর আসলে কার উপর রাগ আমি জানি।
নঈম সাহেব ব্যাপারটা এড়াতে চাইছিলেন বলেই উত্তর দিলেন না।

চমক ভাঙ্গল কল্লোলের কথায়, ‘বাবা একটা বাজে, ঘুমুবে না?’
‘আচ্ছা কল্লোল, জামি তোর কী রকম বন্ধু?’
‘হঠাৎ এ কথা!’
‘এমনি জানতে চাচ্ছিলাম।’
‘অল্প কথায় বোঝানো অসম্ভব, বাবা। আমি ওকে ভালো বুঝতে পারি না। অনেকের সঙ্গে ওর আচরণ দেখে ইচ্ছে করবে খুন করে ফেলতে অথচ আমি যদি বলি: জামি, চোখ বুজে এখান থেকে লাফিয়ে পড়, ও লাফিয়ে পড়বে। আমি ঠিক তোমাকে বোঝাতে পারলাম না।’
‘হুম-ম, এই তাহলে কাহিনী!’
‘তুমি শোবে না?’
‘এই সিগারেটটা শেষ করে যাচ্ছি।’
‘বাবা, আজকাল খুব সিগারেট খাচ্ছ।’
‘সিগারেট তোরও খুব কম লাগে না, আই বেট। যা, ঘুমুতে যা। আর শোন, নো নাক ডাকাডাকি...।’

Thursday, March 11, 2010

দাউদ হায়দার, তোমার কাছে খোলা চিঠি

(আজকাল আমার মস্তিষ্ক নামের হার্ডডিস্ক সম্ভবত গার্বেজ দিয়ে ভরে গেছে নইলে ২১ ফেব্রুয়ারি দাউদ হায়দারের জন্মদিন এটা ভুলে গেলাম কেমন করে!)
অ অভাগা কবি,

ফি বছর তোমার জন্মদিনে লিখব এতোটা সময় কোথায়, বলো? এবার ঠিক ঠিক ২১ ফেব্রুয়ারিতেই বইমেলায় গিয়েছিলাম, বুঝলে। দেখলে কবি, আমার মত '৩ টাকা দামের কলমবাজ' বইমেলায় যেতে পারে, আমার পাশ দিয়ে যে দু-জন বয়স্ক মানুষ উর্দুতে বাতচিত করতে করতে হেঁটে যান, তারাও পারে!
 
না কবি, তারা হিন্দিতে কথা বলছিলেন না, উর্দুতে কথা বলছিলেন। হিন্দি উর্দুর ফারাকটা আমি বুঝি। না-না, এই নিয়ে আমি হাঙ্গামা করতে চাচ্ছি না। কোনো পাকিস্তানি এসে মেলায় যেতে পারবে না এমন কোনো আইন তো নাই। কই, বানিজ্যমেলায় কি পাকিস্তানি স্টল থাকে না, থাকে? তারা কি আর বাংলাতে কথা বলে? বলে না, তাহলে! আর যে দুজন মানুষ হেঁটে গেলেন তাদের মধ্যে একজন যে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ না তাই বা বলি কেমন করে? এটা জোর দিয়ে বলতে পারিনা, আমি সবার মুখ মুখস্ত করে বসে আছি বুঝি!

কবি, তুমি বিশ্বাস করবে না, পরমাণু কেন্দ্রের পাশটায় আমি একটা কুকুরও দেখেছিলাম। আহা, বইমেলায় এতো লোকজন, কুকুরের বুঝি কৌতুহল থাকতে নেই! দেখো দিকি কান্ড, বইমেলায় ফাঁকতালে কুকুরও ঢুকে পড়তে পারে! আমরা বইমেলায় নিয়ম ভেঙ্গে সিগারেট টানতে পারি, কামসূত্র কিনতে পারি। কারও কিসসু বলার নাই!
কতজনকে দেখলাম, বইমেলার ধুলো নিয়ে কী রাগ! কবি, মেলায় ধুলোর জন্য কেবল এদের একজনের দেয়া গালি এখানে লিখে দিলে যে দু-চারজন পাঠক এখনও
এখানে ঝুলে আছেন, এরা ভোঁতা দা নিয়ে আমায় তাড়া করবেন! এমনিতেই আজকাল লোকজন বলে, আমার নাকি মুখ খারাপ হয়ে গেছে। কী করব, বলো, কিছু কাজ-কারবার দেখলে মেজাজ ঠিক রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে।

কবি, আমি চোখ বুজে বলে দিতে পারি, বইমেলার এই ধুলো মাখার জন্য তুমি তোমার একটা হাত হারাতে দ্বিধা করবে না। বাড়িয়ে বললাম বলে তুমি হা-হা করে হাসছ বুঝি। আচ্ছা, বেশ, তুমি বুকে হাত দিয়ে বলো, শপথ করে বলো তোমার কলমের নামে, কি চোখ নামিয়ে নিলে যে বড়ো? কবি, চশমাটা মোছে, তোমার চোখে জল!

জানো কবি, তোমাকে নিয়ে যে ভাববে আমাদের সুশীলদের সেই সময়টা কোথায়? কত বড়ো-বড়ো কাজ আমাদের সুশীলদের। ভাষা, গণতন্ত্র কত্তো-কত্তো কাজ! তুমি তো দেশে থাকো না, বুঝবে কেমন করে! কোনো একটা সুযোগ পেলেই পাজামা পরে এরা স্টেজে উঠে যান। ফেব্রুয়ারি মাস, এদের দম ফেলার অবকাশ আছে বুঝি, পাগল!
এবারই দেখো না, ভাষার জন্য একেকজনের কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে যাচ্ছিল! মতি ভাইয়ারা ৩০ মিনিটে ... কাঁপাচ্ছে। টক-শো তে একেকজনের কী কান্না! বিজ্ঞাপনে বিনম্র শ্রদ্ধায় শ্রদ্ধা দেখাতে দেখাতে প্রাণ যায় না কিন্তু পাতলুন খুলে যায়।
শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চেহারা দেখাবার জন্য প্রয়োজনে আমরা শহীদ মিনার খুবলে ফেলব।

আরে, তুমি জানো না কবি, বাংলার জন্য
আমরা কতটা কাতর। রাষ্ট্রীয় ৭৫০টি আইনের মধ্যে ৯৭টি বাংলায়, বাকী সব ইংরাজিতে! কী যে দরদ আমাদের নিজের ভাষার জন্য। ভাষা-ভাষা বলে আমরা মুখে ফেনা তুলে ফেলি...।
তুমি কিচ্ছু জানো না, এই দেশের প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন বলো বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এঁরা এখনও বাংলা ভাষাটাই শুদ্ধরূপে বলতে পারেন না! এই নিয়ে কিন্তু আমাদের কোনো লাজ নাই।

আচ্ছা কবি, যাদের নিয়ে কবিতা লেখার অপরাধে তোমায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে একজন, সেই মানুষটারই না সহিষ্ণুতার শেষ নাই! অথচ সেই মানুষটার অনুসারীরাই এমন অসহিষ্ণু হলো কেমন করে! আমি কি মনে করিয়ে দেব? *
 
তোমার প্রতি এমন অন্যায়, এত বড়ো শাস্তি! একজন তার মার-দেশমার শরীর স্পর্শ করতে পারবে না, তাঁকে ধরে কেঁদে বুকটা হালকা করতে পারবে না? স্বজনদের ছুঁয়ে কাঁদতে পারবে না এরচেয়ে যে গুলি করে মেরে ফেলা অনেক শ্রেয়। তোমাকে যে শাস্তি দেয়া হয়েছে এর বদলে আমি হেমলকের পেয়ালা চাইতাম।
ও কবি, তুমি নাকি এখনও বাংলায় কথা বলো, বাংলায় লেখো, বাংলায় স্বপ্ন দেখো, সত্যি নাকি, সত্যি? আহা, বাংলাটা ভুলতে পারোনি বুঝি? তুমি এই কবিতাগুলো কী দিয়ে লেখো, কালির বদলে রক্ত?
"এত দিনে স্মৃতিতে ধুলো জমেছে, মনের ভেতর জমিয়ে
রাখা ছবি মলিন হয়ে এসেছে, কিন্তু প্রতিক্ষার অবসান হয়নি।
কেটে গেল তিরিশ বছর
এখনো নির্বাসনে।...।" (দাউদ হায়দার)
আমি বলি কি, কবি: "যে হাত পদ স্পর্শ করে, সে হাত চোখ খুবলে নেয়ারও শক্তি রাখে..."। কবি, অনেক তো হলো তবলার ঠুকঠাক, আসো এইবার গলা ছেড়ে গান গাই।
বুঝলে, মানুষ মানুষই, কচ্ছপ না। আর কত-আর কত প্রহর, কেটে গেছে ৩৬টা বছর! দেশমা, তোমার জন্য আর কতোটা কাল অপেক্ষা করবে?
এইসব পুতুপুতু কবিতা লেখা ছাড়ো, কবি। সব সময় পুরুষ হয়ে লাভ নাই, কখনও কাপুরুষ হওয়ার প্রয়োজনও দেখা দেয়। কেউ মারা যায় বিছানায়; গু-মুতে মাখামাখি হয়ে তো কেউ যুদ্ধে- পার্থক্য কী!
আচ্ছা, তুমি যেখানে থাকো ওখানে বাংলাদেশ হাই-কমিশনারের অফিস নেই? আছে? থাকলে, ওটার সামনে গিয়ে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দাও। বিশ্ব জানুক আমরা কেমন নগ্ন জাতি! ছোট-ছোট বাচ্চারাও দেখুক, আমাদের দেশ- এই রাষ্ট্র নামের নগ্ন পিতা এক চিলতে কাপড়ের জন্য কেমন ছোটাছুটি করছে। তুমি একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করো তো কী ভয়ানক এক দৃশ্য!
কী, সাহসে কুলাচ্ছে না, কবি? হা হা হা। যে হাত কবিতা লিখতে পারে সেই হাত বুঝি নিজের গলা চেপে ধরতে পারে না, না?
 
* "আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, এক বদু (বেদুইন) নবী (সাঃ)-এর মসজিদে আসিয়া এক কোনে বসিয়া প্রস্রাব করিতে লাগিল। সকলেই বদুকে ধমক দিতে আরম্ভ করিলে নবী (সাঃ) তাহাদিগকে নিষেধ করিলেন এবং বলিলেন, এই অবস্থায় তাহাকে বাধা দিও না।
বদুর প্রস্রাব করা শেষ হইলে তিনি তাহাকে নিকটে ডাকিয়া বুঝাইয়া দিলেন, মসজিদ পবিত্র স্থান, এখানে মল-মূত্র ত্যাগ করা সমীচীন নহে।
তাহার পর সাহাবীগণকে আদেশ করিলেন, পানি আনিয়া জায়গাটি পরিস্কার করো। তোমরা (মুসলিম জাতি) পৃথিবীর প্রতি আদর্শরূপে আবির্ভূত হইয়াছ, কর্কশ ব্যবহারেরর জন্য নহে।
" (বোখারী শরীফ)
 
 
**www.newsagency24.com চোরের এক আস্তানার নাম: https://www.facebook.com/ali.mahmed1971/posts/10151517933607335?notif_t=like  

**দাউদ হায়দার, তোমার কাছে চিঠি, আবারও: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_20.html

ছবি সূত্র: গুগল। অনেক চেষ্টা করেও যিনি ছবিটা উঠিয়েছেন তার নাম পেলাম না। অজানা মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

খালেদা জিয়া যাহা বলিলেন...

খালেদা জিয়া বলেছেন, "এ সরকারের আমলে ২০ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার।... সরকারদলীয় সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ দ্বারাই বেশির ভাগ নারী নির্যাতিত।"

আমি গভীর ভাবনায় তলিয়ে গিয়েছিলাম, অংকে আমি বড়ো কাঁচা- আঁক কষতে না পারার কারণে মাস্টার মশাই আমার উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। পারলে ডাস্টার ছুঁড়ে মারেন!

ম্যাট্রিকে খালেদা জিয়া গণিতে ৫০ পেয়েছিলেন। তাই কি নিখুঁত ২০ শতাংশ বললেন? হিসাবটা কেন ১৯ শতাংশ না, কেনই বা ২১ শতাংশ না?
বিষয়টা অনেকটা এমন কেউ প্রতিদিন ৫০০ টাকা নিয়ে বাজারে যায়। ৫০০ টাকাই খরচ হয়; ৫০১ টাকা না, ৪৯৯-ও না!
আচ্ছা, ২০ শতাংশ হিসাবটা কি এমন? ১৯.৫১ হওয়ায় ২০ ধরা হয়েছে? বা ২০.৪৯ হওয়ায় ২০ না ধরে উপায় ছিল না?

সৈয়দ আশরাফ মানুষটার প্রতি আমার আলাদা সমীহ আছে। এই দলে যে অল্প ক-জন চমৎকার মানুষ আছেন, তিনি তাঁদের একজন। সৈয়দ আশরাফ এই প্রসঙ্গে পাল্টা উত্তরে বলেছেন, "২০ ভাগ নারী অর্থাৎ ১ কোটি ৬০ লাখ নির্যাতিতা নারীর নাম-ঠিকানা আমাদের জানান...।"
তাঁর এই বক্তব্যে আমি হাতে কিল মেরে বলি, কিস্তি মাত! সৈয়দ আশরাফ এই একটা চালেই দাবার ছক পাল্টে দিলেন। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, বাহ, এই মানুষটা দেখি আমাদের মতোই ভাবছেন!
খালেদা জিয়ার কথা মতে, ১ কোটি ৬০ লাখ নির্যাতিতা নারী, তাও ছাত্রলীগের দ্বারা? ভাবতেই গা দুলে উঠে; হাসার কারণে নাকি গা শিউরে উঠার কারণে কে জানে!

আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, বাহ, সৈয়দ আশরাফ এই মানুষটা দেখি আমাদের মতোই ভাবছেন! কিন্তু তিনি অতি দ্রুতই আমাদের থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। এরপর খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলা শুরু করলেন, আপনি মহিলা হাই-কমিশনারদের নিয়া চা টা খাবেন উল্টাপাল্টা যা খুশি বলে দেবেন। এটুকু বললে হয়তো সমস্যা ছিল না। এরপর তিনি লম্বা ফিরিস্তি দেয়া শুরু করলেন, খালেদা জিয়ার আমলে কতজন নারী, কোন কোন নারী নির্যাতিত হয়েছেন। আরও অনেক কথা।

আমি বুঝি না, যেখানে একটা চাল দিয়েই তিনি পাশার ছক পাল্টে দিলেন সেখানে অহেতুক-অনাবশ্যক কথার কী প্রয়োজন ছিল?
সাধারণ জনগণকে এঁরা মগজ খরচ করার সুযোগ দেন না, সব বলে ফেলেন। জনগণ, অব্যবহৃত মগজ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়! বেচারা জনগণ!

Wednesday, March 10, 2010

শাবাশ, কদমবুসি করি তোমাদের!

খবরটা অতি সামান্য টমেটোর কেজি ১ টাকা। আমাদের আনন্দিত হওয়ার কথা। সেখানে ১ কেজি টমেটো মাত্র ১ টাকা, কোথাও ৫০ পয়সা। ৫০ পয়সা আজকাল ফকিরও নিতে চায় না!
ভাগ্যিস, মইন সাহেব নাই নইলে বলতেন, বেশি করে টমেটো খান, ভাতের উপর চাপ কমান।

কিন্তু বিষয়টা আমাদের দেশের চাকা যারা বনবন করে ঘোরান, সেইসব কৃষক-টমেটোচাষিদের ভালো লাগে নাই। তাঁরা সরকারের লোকজনের মুখের উপর টমেটো ফেলে এসেছেন, শালীন ভঙ্গিতে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ৩৫০০ কেজি টমেটো ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আমি আরও খুশি হতাম, টমেটোগুলো পচিয়ে আমাদের মুখে ছুঁড়ে মারলে।

কী ভয়াবহ একটা ঘটনা! এই দেশের কেউ কী এটা আঁচ করতে পারছেন না এই ক্ষুব্ধ টমেটোচাষিরা এর ঠিক শোধ নেবেন। আগামি বছর এঁরা টমেটো চাষে আগ্রহী হবেন না, এই টমেটোরই দাম হবে ন্যূনতম ১০০ টাকা কেজি! আমি নিশ্চিত, তখন বৈদেশ হতে টমেটো আমদানি হবে। আমাদের দেশের সুশীল লোকজন ওই টমেটো তাদের পশ্চাদদেশে রেখে, লম্বা লম্বা বাতচিত করবেন! আমাদের শেখাবেন, কেমন করে বৈদেশিদের পদলেহন করতে হয়।

আমাদের দেশের নব্য ধনীরা ১২০ টাকা কেজি আপেল খাবে কিন্তু টমেটো খাবে না। কোনটার পুষ্টিগুণ কত এটা জানার প্রয়োজন নাই, কারা কারা যেন এইসব শালাদের বুঝিয়েছে আপেল খেলে জাতে উঠা যায়।

পুষ্টিগুণের মূল্য বিচার করলে
৩০০ টাকার একটা হরলিক্সের বোতলে আছে ৫ টাকা মূল্যমানের পুষ্টিগুণ। এইসব চুতিয়াদের মাথায় আটকে গেছে হরলিক্স না খেলে চুতিয়াদের বাচ্চারা টলার-লংগার-স্ট্রংগার হবে না। শ্লা, বাপ ৫ ফুট, মা সাড়ে চার ফুট, আশা করে বসে থাকবে এদের বাচ্চা হবে সাড়ে ছয় ফিট!

টমেটোচাষিদের এই প্রতিবাদের ঘটনাটা ঘটেছে সিলেটে। আহ, সিলেট, এখানে আমার একটু বলার আছে। সিলেট বিভাগের লোকজন, প্রতি পরিবার থেকে কেউ না কেউ প্রবাসে আছেন। এরা দু-হাতে বললে ভুল হবে, অজস্র হাতে (অদৃশ্য আরও কিছু হাত থাকতে পারে, অবশ্য ঠিক কোথায় এ সম্বন্ধে আমার ধারণা নাই)
টাকা কামাচ্ছেন। তা কামাক, এতে আমাদের হিংসা করে কী আছে!

এরা দেশে দূরের থাকুক, নিজের এলাকায় কি করেন? আলিশান যে বাড়িটা করেন, দেশে ফিরে কয়েক দিন সেখানে থাকেন। এমন উদাহরণও আছে বাড়ির একটা গেইটের পেছনেই খরচ করেছেন কোটি টাকা। তো, বছরের অন্য সময়ে ওই আলিশান বাড়িতে গরু চড়তে আমি নিজের চোখে দেখেছি। আর করেন কমিউনিটি সেন্টার, শপিং মল।
এরা কটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি করেছেন, কটা হিমাগার? আজ ওখানে হিমাগারের ছড়াছড়ি থাকলে এরি মধ্যে কোন-না-কোন একটা উপায় বেরিয়ে আসত।
এরা যেটা ভালো পারেন সেটা হচ্ছে, ব্যংকে অলস টাকা ফেলে ফেলে ব্যংক ধসিয়ে দেয়া, কয়েক স্ত্রীর গর্ভে বাচ্চা পয়দা করা, পান চাবানো (যুবক, ধামড়া ধামড়া ছেলেদের দেখেছি বেদম পান চিবিয়ে যাচ্ছে) আর আঞ্চলিকতার লেজ ধরে বসে থাকা।

এই দেশে একটা প্রাণ কোম্পানি যা করে দেখিয়ে দিচ্ছে, গোটা সিলেটের লোক মিলেও তা করতে পারেননি। যতটুকু মনে পড়ে ফি বছর এরা কৃষকের কাছ থেকে কেবল আমই কেনে ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। নইলে ঠিক আমচাষিরাও একদিন আমাদের মুখে পচা আম ছুঁড়ে মারতেন!

Tuesday, March 9, 2010

কালের কন্ঠ: বোধোদয়


দৈনিক কালের কন্ঠে মারাত্মক একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে 'আসাদ গেটে এখনো উর্দু ফলক' নিয়ে।

'মিডিয়া ওয়াচ' নামের একটি পত্রিকা এই ভুলটা তুলে ধরে। অবশ্য মিডিয়া ওয়াচ পত্রিকাটি ভুল ধরায় এতটাই ব্যস্ত ছিল আসাদ গেটে লাগানো পোস্টার এদের চোখে পড়েনি!

ফিরোজ চৌধুরী ছবিটা উঠিয়েছেন। আলোকচিত্রি, রিপোর্টার, বিভাগীয় সম্পাদক মায় এই পত্রিকার "বোধ হয়" সম্পাদক আবেদ খান, কেউ এটা লক্ষ করলেন না, আশ্চর্য!
মনে হচ্ছে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে থাকা একদল কিশোরের এক বালখিল্য আচরণ!
উর্দু এবং আরবীর মূল পার্থক্য হচ্ছে, উর্দুতে জের-যবর-পেশ নাই। এটা একটা বালকেরও জানার কথা।


ভাগ্যিস, "বোধ হয়" সম্পাদক আবেদ খান আবার বলে বসেননি এটাই আমার এস্টাইল- যাহা উর্দু তাহাই আরবী। তাহলে বড়ো মুশকিল হয়ে যেত।
আমি কোথাও লিখেছিলাম, প্রিন্ট মিডিয়ার শক্তি অকল্পনীয়- আজ আমাদের দেশের কয়েকজন সম্পাদক মিলে যদি ঠিক করেন আমরা পাঠক বিশেষ মুহূর্তে অন্তরঙ্গ সময় কেমন করে কাটাব, আমরা অজান্তেই তা করব।
আপনার নিজের চোখে দেখা একটা ঘটনাই আপনি পত্রিকায় পড়ে বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন আপনার দেখায় ভুল ছিল! রাতকে দিন করা এদের পক্ষেই সম্ভব!

আচ্ছা, আবেদ খানের ওই ফোনালাপ (
এটাই আমার এস্টাইল) আমি যদি এখানে আপলোড করে দেই, কেমন হয়? জানি-জানি, অনেকে ভোঁতা দা নিয়ে রে রে করে তেড়ে আসবেন। অনেকে কঠিন স্বরে আমাকে এথিকস নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বুলি কপচাবেন। আপনাদের রাগ আমার 'সার আখো পে'- মাথায় তুলে নিলাম।
ভাল, কিন্তু পত্রিকাওয়ালারা পারলে এই যে অন্তর্বাসের লাইনিং এর সেলাইয়ের সুতোটারও খবর ছেপে দেয়, তখন নীতিবিরুদ্ধ হয় না, তখন এথিকস কোথায় থাকে? কী ভাষা, জল্লাদ তাকে কোলে করে নিয়ে গেলেন! নাকি এরা বড়ো বড়ো মানুষ বলে এদের এথিকস ...-এর আড়ালে থাকে!

কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে 'কালের কন্ঠ' সংশোধনী ছাপিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে। অবাক হয়েছি এই কারণে আমাদের দেশে ভুল করে ভুল স্বীকার করার চল নাই। বিশেষ করে পত্রিকাওয়ালারা তো আরেক কাঠি সরেস! অন্তত কালের কন্ঠের কাছ থেকে এমন দায়িত্বশীল আচরণ আশা করিনি! সত্যিই অবাক হয়েছি, পত্রিকাটির প্রতি অজান্তেই খানিকটা সমীহ চলে আসে।
কী আর করা! প্রতিযোগীতায় টেকার কথা মাথায় রেখে প্রথম আলোর মত ফাজিল হতে চাচ্ছে না সম্ভবত! প্রথম আলোর একের পর এক ভুলের মিছিল কিন্তু এদের ভুল স্বীকার করার, এ পথ মাড়াবার কোন গোপন ইচ্ছাই নাই। কারণ এরা বুঝে গেছে এদের ব্যতীত আমাদের গতি নাই।

যাগ গে, যেটা বলছিলাম, আসাদ গেটের এই ছবি নিয়ে চমৎকার
একটা প্রতিবেদন হতে পারত। এটায় অসংখ্য পোস্টার লাগিয়ে রাখা হয়েছে। যা অসভ্যতারই নামান্তর! আমাদের দেশে যত্রতত্র পোস্টার লাগিয়ে দিলে কারও কোন বিকার নাই। একজন আজ তার দেয়াল রঙ করিয়েছেন, আজই একজন এসে পোস্টার লাগিয়ে দিচ্ছে। দ-খ-ল লিখে তার দেয়ালের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে, কিচ্ছু বলার নাই!
ভ্রাম্যমান আদালত কেবল ভেজালই ধরবে কেন, কেন ধরছে এদেরকে, যারা এই পোস্টার নামের আবর্জনাগুলো লাগাচ্ছে? কঠিন কিছু না, যার পোস্টার পাওয়া যাবে তাকেই ধরে জরিমানা।

আমরা এখান থেকেই শিখি। যখন বেশি শিখে ফেলি তখন স্বাধীনতা সৌধের গায়ে কুৎসিত কথা লিখি, ততোধিক কুৎসিত ছবি আঁকি।


*ছবি সূত্র: মিডিয়া ওয়াচ

Monday, March 8, 2010

বতুতা এবং আরবী জানা মোল্লা সাহেব!

অসম্ভব আগ্রহ নিয়ে এইচ এ আর গিব-এর "ট্রাভেলস অব ইবনে বতুতা" (১৩০৪-১৩৬৯) পড়ছি। ইবনে বতুতাকে আমরা একজন মুসলিম পরিব্রাজক বলতে পারি- খানিকটা পক্ষপাতদুষ্ট। এ সত্য তাঁর বর্ণনায় খানিকটা অতিশয়োক্তি আছে, আছে অস্পষ্টতা কিন্তু কী সাবলীল তাঁর বর্ণনা! কী বিচিত্রসব অভিজ্ঞতা!

আজ থেকে আনুমানিক ৭০০ বছর পূর্বে মানুষটার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে কী আনন্দই না হয়! কেমন ছিলেন তখনকার মানুষ, তাদের আচরণ। একটা বর্ণনা পূর্বের লেখায় উল্লেখ করেছি। ৭০০ বছরে আমরা কতটা সভ্য হলাম?‍

এমন অজস্র অভিজ্ঞতা।
নীলনদ সম্বন্ধে জানা যায়:
"নীলনদের এক বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, গ্রীষ্মকালে যখন প্রচন্ড গরমে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়, বেশিরভাগ নদী শুকিয়ে যেতে থাকে তখন নীলনদ ফুলে-ফেঁপে উঠে।
আবার অন্য সব নদী যখন পানিতে উপচে পড়ে তখন নীলনদ শুকাতে শুরু করে।"


"ভারতীয়দের কাছে পানের মর্যাদার শেষ নাই। কেউ কারও বাড়িতে গেলে পাঁচটা পান উপহার দেয়। এব‌ং যুবরাজ বা মর্যাদাবান কারও কাছ থেকে পেলে তো কোন কথাই নাই! ...সোনা বা রূপার চেয়ে পান পেলে খুশীর সীমা থাকে না।"

"কিপচাম মরুভূমিতে কোন গাছ নেই। আগুন জ্বালাবার কাঠের বড়ো অভাব, গোবর দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। গোবর এখানেই এতই গুরুত্ব রাখে, এখানকার সবচেয়ে ধনী মানুষটিও রাস্তায় গোবর পড়ে থাকতে দেখলে পরম যত্মের সঙ্গে দামী পোশাকের কোচড়ে তুলে নেবেন!"

"মারমা নামের জায়গায় যখন এলাম, এখানে শিয়া সম্প্রদায়ের মত কিছু লোক থাকে। এরা ১০ সংখ্যাটিকে এরা তীব্র ঘৃণা করে। যেসব লোকের নাম ওমর, এমন লোকদেরও! এর কারণ সম্ভবত এটা, হযরত মুহাম্মদ (দঃ) সহচরদের মধ্যে বিশেষ ১০ জন প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, তাঁদের মধ্যে হযরত ওমরের (রাঃ) এর জন্য রয়েছে তাদের তীব্র ঘৃণা!
তারা মনে করে খলিফা হওয়ার বিষয়ে হযরত আলী (রাঃ) প্রতি হযরত ওমর (রাঃ) অন্যায় করেছেন।
এরা বাজারে কোন কিছুর নিলাম ডাকলে ভুলেও ১০ শব্দটা উচ্চারণ করবে না । ১০ না বলে বলবে ৯ এবং ১!"

মুসলিক শাসকদের ক্ররতা, হিংস্রতা আমরা দেখতে পাই:
"দামাস্কাসে প্রবেশ করলাম আমি। ...আগে এখানে গির্জা ছিল। কিন্তু মুসলমানরা দামাস্কাস দখল করার পর তাদের এক সেনাপতি খোলা তলোয়ার হাতে গির্জার মধ্যে প্রবেশ করেন। সমঝোতা অনুযায়ী গির্জার অর্ধেকটা মুসলমানদের দিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু খলিফা ওয়ালিদ ঠিক করলেন, বাকী অর্ধেকটা কিনে নেয়ার জন্য। খ্রীস্টানরা রাজী না হলে নিজেই কুড়াল দিয়ে গির্জা ভাঙ্গা শুরু করলেন খলিফা, আল্লাহর নামে।"

"ফোরাতের কাছে হিল্লা শহরে পৌঁছলাম। এদের বিশ্বস ১২তম ইমামের মধ্যে 'মাস্টার অভ দ্য এজ' হিল্লা শহরের এক গুহায় অদৃশ্য হয়ে যান। ১০০ হিল্লাবাসী খাপমুক্ত তলোয়ার হাতে ড্রাম, ট্রাম্পেট, বিউগল বাজাতে বাজাতে ওই পাহাড়ের পাদদেশে দিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, আল্লাহর কসম, হে ইমাম! হে মাস্টার অভ দ্য এজ, আল্লার দোহাই লাগে আপনি বেরিয়ে আসুন। পাপাচার-অনাচারে পৃথিবীটা ভরে গেছে...।"

"দিন-রাত যে কোন সময়েই তুর্করা তাদের ওয়াগনটানা ঘোড়া, উট খোলা ছেড়ে দেবে। চুরির ভয় নেই। কারণ যে চুরি করবে তাকে অবশ্যই ধরা হবে এবং শাস্তি হিসাবে তাকে আরও নয়টা উট দিতে হবে। দিতে না পারলে তার ছেলেকে। তাও না পারলে প্রকাশ্যে জবাই করা হবে।"

‍"নামাযের বেলায় এমন নিয়ম বিশ্বের কোথাও দেখিনি! আযান পড়ার পর কেউ মসজিতে না এলে তাহলে কাজি তাকে প্রকাশ্যে চাবুকপেটা করবে। তাই সব মসজিদে একটা করে চাবুক ঝোলানো থাকে। সঙ্গে ৫ দিনার জরিমানাও।"
(সৌদিতে এখনও কাছাকাছি নিয়মটা চালু আছে। কাউকে পেলে তাকে মুতওয়া নামের পুলিশ হিড়হিড় করে ধরে থানায় নিয়ে নামায় পড়াবে, সে পাক থাকুক বা নাপাক। 'ভবিষ্যতে নামায পড়িব' এমন মুচলেকা নিয়ে তবেই ছাড়বে)

"একদিন আসরের জামাত শুরু হওয়ার আগে সুলতানের নামায পড়ার জায়গায় জায়নামায বিছেয়ে তার অনুচর ইমামকে বললেন, সুলতান অজু করছেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার জন্য বলেছেন।
কিন্তু ইমাম মুয়াজ্জিনকে তখনই নামায শুরু করার নির্দেশ দিলেন। সুলতান যখন মসজিদে প্রবেশ করলেন তখন নামায অর্ধেক শেষ। যেহেতু এগুবার সুযোগ নেই তাই তিনি মুসল্লিদের পেছনে জুতা রাখার জায়গায় নামায পড়লেন।
...খুৎবায় ইমাম প্রকাশ্যে সুলতানের কঠিন সমালোচনা করতেন। সুলতান মাথা নীচু করে চুপ করে শুনতেন।"

একসঙ্গে কয়েকটা বই পড়ার বদ অভ্যাস আমার, পুরো বইটা এখনও পড়ে শেষ করতে পারিনি। বতুতা সাহেব মাত্র ভারতবর্ষে পা রাখলেন। পাঞ্জ আব থেকে দিল্লি যেতে লাগে ৫০ দিন, কেমন করে ৫ দিনে ডাক পৌঁছে দেয়া হতো, হাঁ করে পড়ছি! ইশ, বাংলাদেশে (তৎকালিন অখন্ড ভারতবর্ষ) এই মানুষটা আসবেন না?

কিন্তু যে বিষযটা এখন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনী নামের নোটগুলো আরবী থেকে ইংরাজীতে অনুবাদ করেছে এইচ, এ,আর গিব। আমাদের দেশে হয় আমরা গিবের অনুবাদ পড়ছি অথবা তার অনুবাদ থেকে বাংলায় কেউ অনুবাদ করলে।
একটা কথা আছে, অনুবাদক মানেই এ্যদুত্তোর এ্যদিতর- অর্থাৎ অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক। এখানে গিব সাহেব কতটা ভাবনা মিশিয়েছেন আমরা জানি না।

আমাদের দেশে কি কেউ আরবী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন? আমি জানি না। কয়েকজন প্রকাশককে ফোন করলাম, তারা প্রায় নিশ্চিত সরাসরি আরবী থেকে কেউ বাংলায় অনুবাদ করেননি।
কেন?
আমাদের দেশের আরবী জানা মোল্লা সাহেবরা কোথায়? আমাদের দেশের আরবী পন্ডিতরা অনুবাদ না করে থাকলে করলেন না কেন? লজ্জা করে না, গিব নামের মুরতাদ এই কাজটা করে দেখিয়ে দিল! এমনিতে ইনারা তো দেখি চিৎকার করে প্রলম্বিত সুরে, আরবী ব্যতীত বাতচিতই করতে চান না! সমস্ত নসিহত আরবীতে, যেন বাংলায় বললে আকাশ ভেঙ্গে পড়বে! মধ্যরাতের ওয়াজ মাহফিলে আরবীর বন্যা বয়ে যায়! ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় একেকজনের আরবী নিয়ে কী পান্ডিত্য! কী চমৎকার করে, এঁরা কী অবলীলায়ই না বের করে ফেলেন 'ইয়াওম' মানে দিন হবে না, হবে দিবস।

এঁদের মধ্যে থেকে কেউ অনুবাদ করতে আগ্রহী হলেন না কেন?
এটা তো কোন মুরতাদের বই না। এবং আমার ধারণা, আমার মত নাফরমান বান্দার কথা বাদ দিলাম; যাদের ইসলাম ধর্মের প্রতি অযাচিত আবেগ আছে তারা ১০০টা ওয়াজ মাহফিলের চেয়ে উপকৃত হবেন বতুতার এই বই পড়ে। একাডেমিক কারণে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চাইব ইংরাজি অনুবাদের চেয়ে সরাসরি আরবী থেকে বাংলা অনুবাদ পড়ার জন্য।

আমাদের মোল্লা সাহেবদের কেমন কেমন করে যেন ধারণা জন্মে গেছে, জীবনে একটা মাত্র বইই পড়বেন, এটার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন করেই যাবেন, আজীবন। আর কোন বই পড়ার প্রয়োজন নাই।

Sunday, March 7, 2010

৭০০ বছরে আমরা কতটা সভ্য হয়েছি?

(অতি সূক্ষ রূচির পাঠক লেখাটা না পড়লেই ভাল করবেন)

সভ্য, সভ্যতা এই বিষয়গুলো আজও আমি ভালো বুঝি না! আমরা নাকি কালে কালে জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিরাট কামাল দেখাচ্ছি, সভ্য থেকে অতি সভ্য হচ্ছি। তাই হবে!

এইচ এ আর গিব-এর "ট্রাভেলস অব ইবনে বতুতা" (১৩০৪-১৩৬৯) থেকে অনেকটা আঁচ করা যায়, আজ থেকে আনুমানিক ৭০০ বছর পূর্বে মানুষ কেমন ছিল। একটা বর্ণনা এমন:‍
"...আমরা শহরে প্রবেশ করার সময় একটা বাজার পড়ল। আমাদের দেখেই অনেকে ছুটে এসে ঘিরে, ঘোড়ার লাগাম ধরে ফেলল। অন্যরাও এসে হইচই বাঁধিয়ে দিল, ঘোড়ার লাগাম ধরার চেষ্টা করতে লাগল। এই নিয়ে বিরাট বচসা। কেউ কেউ প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ছুঁরিও বের করে ফেলল। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম, আমরা কী ডাকাতদের কবলে পড়লাম?
আল্লার ইচ্ছায়, একজন আরবী জানা লোক এসে আমাদের বুঝিয়ে দিলেন, এরা স্থানীয় এবং এরা সবাই চাইছেন আমাদেরকে তাদের এখানে আতিথ্য গ্রহন করাবার জন্য। শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম!
পরিশেষে ভোটাভুটি হলো, ভোটে যে দলের নাম উঠবে আমরা তাদের এখানেই থাকব।...(এদের আতিথেয়তার কথা ভোলা অসম্ভব!)"

এরিমধ্যে প্রায় ৭০০ বছর চলে গেছে। এইসব বেদুইনদের চেয়ে আমরা অনেক শিক্ষিত-সভ্য হয়েছি। আজ আমরা মঙ্গলে পানি আছে কিনা এই নিয়ে বড়ো কাতর- আমাদের সে খোঁজ কতটা জরুরী কে জানে! আমার একটা রাগী চরিত্র রাব্বির ভাষায়, "...মঙ্গলের পানি দিয়া নিজের হাগা ধোব..."।

অন্য একটা পোস্টে উল্লেখ করেছিলাম, একটা মামলার তদ্বিরে মাসে দুবার আমাকে কোর্টে চক্কর লাগাতে হয়। এখানে বিচিত্রসব অভিজ্ঞতা হয়। আস্ত একটা উপন্যাস নামিয়ে ফেলা যায়।
থ্রিলার বই-টই যখন পড়তাম তখন নায়কদের দুর্ধর্ষসব কর্মকান্ড পড়ে মুগ্ধ হতাম কিন্তু এইসব নায়কদের একটা বিষয়ে উদাসীনতা আমার ভাল লাগত না সেটা হচ্ছে, বাথরুম বিষয়ক। পরে আমার মনে হলো এরা অতিমানব তো তাই এদের পেশাব-টেশাব করার প্রয়োজনই নাই!


তো, কোর্টের কাজে দীর্ঘ সময় আমাকে থাকতে থাকতে হয় এবং আমি অতিমানব না বলেই ব্লাডারের সঙ্গে আমায় কস্তাকস্তি করতে হয়।
হাজার-হাজার মানুষ পিলপিল করে এখানে আসেন কিন্তু টাট্টিখানা, হালের 'ওয়শরুম', খানিকটা পরিষ্কার করে বললে পেশাব করার কোন ব্যবস্থা আমার চোখে পড়েনি। প্রতি তলায় যেসব বাথরুম নামের জায়গায় মুত্রত্যাগ করা যায় সবগুলো তালা মারা থাকে। ভাবখানা এমন, বডি নিয়া আসছ, বডি নিয়া ফেরত যাবা, সঙ্গে নিয়া যাবা থলিভর্তি মুত্র। আইডিয়াটা মন্দ না!

আমার মনে পড়ছে, বছর চারেক আগের কথা। ওয়ারেন্টি ছিল বিধায় ঢাকায় এক সার্ভিসিং সেন্টারে
সেল ফোন নিয়ে গিয়েছিলাম। ১৫/ ১৬ তলায়, চোখ ধাঁধানো পশ একটা অফিস। গেছি রাতের ট্রেনে, সময় কম ছিল বলে সোজা এদের অফিসে। এদের অফিসের একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনাদের এখানে ওয়শরুমটা কোন দিকে?
তিনি বললেন, কি করবেন?
রাগ চেপে আমি খাস গ্রামের ভাষায় বলি, মুতব।
তিনি বললেন, আমাদের এখানে তো ব্যবস্থা নাই।
আমি বললাম, তা আপনারা কোথায় যান?
তিনি জানালেন, তাদের জন্য লাগোয়া বাথরুম আছে কিন্তু কাস্টমারের (মতান্তরে গেস্ট) জন্য না।
এমনিতে আমার কথা জড়িয়ে যায় কিন্তু খুব রেগে গেলে ঠান্ডা মাথায় গুছিয়ে বলতে পারি। আমি অমায়িক ভঙ্গিতে বললাম, ইয়ে আপনাদের ছাদে যাওয়া যায়?
তিনি হাসিমুখে বললেন, যায় তো। কেন?
আমি বললাম, ছাদে গিয়ে মুতব।
মানুষটা হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমার মুত্র ত্যাগ না করেও মুত্র ত্যাগের আনন্দ হচ্ছিল।

তো, আমার মাথায় আসছিল না এই কোর্টে, এখানে হাজার-হাজার মানুষ আসছে কিন্তু এদের জন্য অন্তত এই ব্যবস্থাটা রাখা হয়নি, কেন? পরে বাইরে দেখলাম, আরে কাহিনী তো অন্য!

আরে, এইটার দেখি আবার উদ্বোধনও করা হয়েছিল! বাথরুম
উদ্বোধন কেমন করে হয় এটা দেখার আমার বড়ো ইচ্ছা। জানি না এই বিরল সৌভাগ্য আমার হবে কিনা!
আমার শেষ ইচ্ছার কেউ তালিকা চাইলে এর মধ্যে এটাও থাকবে এতে আমার দ্বিমত নাই।
প্রফেসর সাহেবরা বাথরুম উদ্বোধন করেন। আমরা শিখি। শেখার কোন শেষ নাই!

এখন কেউ যদি রাস্তায় জিপার খুলে বসে যান, ভাসিয়ে দেন তাহলে আমাদের খুব চোখে লাগে বুঝি? সূক্ষ রূচি প্রচন্ড আহত হয়, না?
পুরুষদের যাও এই বাড়তি সুবিধা আছে কিন্তু মহিলাদের কথা ভেবে আমি শিউরে উঠি। কোন ডাক্তারের সঙ্গে কথা না বলেও বলে দিতে পারি বাংলাদেশের মহিলাদের ইউরিন ইনফেকশন সংক্রান্ত সমস্যার অন্যতম কারণ এটাও।

একটা শহর-নগরে কেউ গেলে এরা সেই শহরের অতিথি। অতি সভ্য আমরা অতিথিদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয় এটাই এখনও শিখিনি। এদের বসতে দেব না (হা ঈশ্বর, রাস্তার পাশে বসার জায়গায় রশি দিয়ে টব বেঁধে দিয়েছে যেন কেউ বসতে না পারে এই শহরে বসে ক্ষণিকের জন্য শ্বাসও ফেলতে পারব না, আকাশ দেখতে পারব না?), মুততে দেব না। আজিব, এটা কোথাকার মানবতা?
এইবার বাস্তবতাটা বলি, একজন যখন কোন শহরে যান তাকে যেতে দিয়ে কেউ মাথা কিনে নিচ্ছে না। ওই মানুষটা ওই শহরে বিভিন্ন উসিলায় গাদা-গাদা টাকা খরচ-খুইয়ে আসেন। শহরটার চাকা বনবন করে ঘোরে অতিথিদের টাকার কল্যাণে।

এইবার সূক্ষ রূচির পাঠক বিদায় নেন। আল্লাহ হাফেজ (খোদা হাফেজ এখন আর বলি না কারণ এটা নিয়ে অনেকে আপত্তি করেন। যেমনটা করেন গোশত না বলে মাংস বললে।)
...

এইবার কঠিন কিছু কথা বলি, কোর্টে কেউ হাওয়া খাওয়ার জন্য যায় না। মামলাটা করার পূর্বেই আমাকে সরকারী কোষাগারে গুনে গুনে ৪০ হাজার টাকা জমা দিতে হয়েছিল (যেখানে মাত্র ২০০ টাকা জমা দিয়ে একটা মামলা করা যায় সেখানে এই বিপুল টাকা আমাকে জমা দিতে হয়েছিল মামলার বিশেষ প্রকৃতির কারণে)। এখন আমাকে ৪০ ফোঁটা মুত্রত্যাগের সুযোগ না দেয়ার কারণ কি?!

Saturday, March 6, 2010

ডাক্তার নামের মানুষটা!

এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার কতশত ভয়াবহ অন্যায় করেন তার লেখাজোঁকা নাই। এইসব নিয়ে অসংখ্য পোস্ট দেয়া সম্ভব। আমার পূর্বের একটা পোস্টে এর খানিকটা আঁচ করা যাবে। ডাক্তারদের প্রতি আমার রাগের শেষ নাই।
অনেক সময় আমরা নিজেদের বিকিয়ে দেই ক্ষিধার জ্বালায়। একজন আল মাহমুদ কেন তার কলম বিক্রি করে দেন তা আমি খানিকটা বুঝি, বেচারার জন্য মায়া হয়।

কিন্তু একজন ডাক্তার পুরোপুরি সৎ থেকেও ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। এই দেশের জন্য টাকার অংকটা বিপুল- এই দেশে সরকারী চাকুরে ওরফে পাবলিক সার্ভেন্ট এখনও ৫০ হাজার টাকার উপরে বেতন পান না। তারপরও এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার,
দ্বিতীয় ঈশ্বর নামের এই মানুষগুলো কেন অমানুষ হয়ে যান এটা আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জানতে পারব এই ভরসা নাই। এই একটা পেশাকে আমি ঈর্ষা করি।

আমি বারবার যে কথাটা বলে আসছি একজন ভালো ডাক্তার, ভালো লেখক মানেই একজন ভাল মানুষ না। ভাল মানুষ বলতে আমার অল্প জ্ঞানে বুঝি, যার আছে প্রকৃতির জন্য এবং প্রকৃতির সন্তানদের জন্য অগাধ ভালোবাসা।

ভাল ডাক্তার তো আছেন কিন্তু ডাক্তার নামের ভালো মানুষ কী নাই! থাকবেন না কেন, আছেন। কুমিল্লার মুরাদনগরের একজন ডাক্তার ইনি প্রতিদিন বিনা ফি-তে শত শত রোগি দেখেন। সকালে অন্তত ২০/৩০ জন রোগি না দেখে নাস্তা করেন না। আশ্রমে থাকেন, আশ্রমে ঘুমান, আশ্রমের কাপড় গায়ে দেন- মহাআনন্দেই আছেন।

মানুষটার কাছে আমি অনেকবার চিকিৎসার জন্য গিয়েছি। কোন এক বিচিত্র কারণে মানুষটা আমাকে পছন্দ করেন। তাঁকে ফি দিতে আমাকে বেগ পেতে হতো। খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার যেভাবে টাকা আয় করেন সেভাবে চইলে এই মানুষটা অন্তত দেড় লক্ষ টাকা মাসে বাড়তি আয় করতে পারতেন। কিন্তু এই নিয়ে তাঁর কোন বিকার, উদ্বেগ নেই।

বাংলাদেশে খুব কম ডাক্তার আছেন যারা প্যাথলজি থেকে কমিশন খান না। সাফ হিসাব, ডাক্তার সাহেব যত টাকা টেস্ট লিখবেন তার ৪০ থেকে ৫০ ভাগ টাকা ডাক্তার সাহেব পেয়ে যাবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা যে টেষ্টগুলো লেখেন তা কেবল টাকার লোভে, সীমাহীন লোভ! ওষুধ কোম্পানি থেকে পান নিম্নমানের ওষুধ চালাবার জন্য মাসে মাসে মাসোহারা। ওষুধ কোম্পানীগুলো স্যাম্পলের নামে যেসব ওষুধ দেয় তা বস্তা ভরে বাজারে বিক্রি করে দেন। ওষুধ কোম্পানিগুলো হেন কোন জিনিস নাই যা ডাক্তারকে উপহার দেন না।
আমার জানার খুব আগ্রহ, ডাক্তার সাহেবরা যে আন্ডারওয়্যার পরে থাকেন এটাও কি ওষুধ কোম্পানির দেয়া? অথবা তাঁদের ইস্তারি সাহেবার...?
যে মা-র নরমাল ডেলিভারী করা সম্ভব ডাক্তার সাহেব তার পেট কেটে ফেলবেন কারণ এখান থেকে বড়ো অংকের টাকা তিনি পাবেন। এইসব খুব কমন প্র্যাকটিস।
কোন কোন ডাক্তার বাড়তি যেটা করেন, ট্রলি থেকে পশুর মত ছটফট করতে থাকা মাকে মেঝেতে নামিয়ে দেন টাকা দিতে দেরি হচ্ছিল বলে। ওই মাটা সারারাত আধ-জবাই পশুর মত ছটফট করতে করতে ভোরে হাল ছেড়ে দিয়ে মারা যান। এই পৃথিবীর মুখ দেখার আগেই হারিয়ে যায় একটি শিশু। আইন-সিস্টেম বলে, এই ডাক্তার সাহেবের গোপন কেশও কেউ স্পর্শ করতে পারবেন না। আর আমরা বলি, সবই আল্লাহর ইচ্ছা, মা-বাচ্চাটার হায়াত আছিল না।

আমি প্রায় দু-বছর ধরে ডাক্তার নামের মানুষটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আজ পর্যন্ত তিনি প্যাথলজি থেকে ১ পয়সা কমিশন নেননি, কোন ওষুধ কোম্পানি থেকে ওষুধ চালিয়ে দেয়ার নাম করে মাসোহারা নেননি, স্যাম্পল দাবি করেননি। কোন কোম্পানি জোর করে স্যাম্পলের নামে ওষুধ দিয়ে গেলে তা একটা বাক্সে জমান। পরবর্তীতে যাদের অষুধ কেনার টাকা নেই তাদের বিনা পয়সায় দিয়ে দেন।
যাদের ফি দেয়ার সামর্থ্য নাই তাদের এমনিতেই দেখে দেন। এবং ওই মানুষটাকে দেখেন যথাসম্ভব প্রথমে যেন তার এটা ধারণা না হয়, বিনা পয়সায় দেখাচ্ছেন বলে ডাক্তার তাকে অবহেলা করছেন।
একজন রোগীকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত দেখেন যতক্ষণ পর্যন্ত না রোগটা বের করতে পারেন। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ১ ঘন্টা ১০ মিনিট দেখার রেকর্ড তাঁর আছে! অভ্যাস নেই বলে প্রায়শ রোগী বিরক্ত হয়, ডাক্তার সাব, ছাইড়া দেন, কাজ আছিল।
খুব শান্ত খর্বাকৃতির এই মানুষটা তখন ক্ষেপে যান, আপনি কি আমার কাছে চিকিৎসার জন্য এসেছেন, নাকি বেড়াতে!

তো, তাঁকে আমার চিকিৎসার জন্য ফি দিলে তিনি নিতে না চাইলে,
আমি বলতাম, আমার কাছ থেকে ফি না নেয়ার পেছনে আপনার যুক্তি, কি বলেন তো শুনি?
তিনি মিনমিন করে বলতেন, আপনি..., তাছাড়া আপনার সঙ্গে...। ইত্যাদি।
তাঁকে আমি সাফ সাফ জানিয়ে দিলাম, আমার কাছ থেকে ফি না-নিতে চাওয়ার পেছনে আপনার যুক্তি আমার পছন্দ হলো না। এমনটা করলে পরবর্তীতে আপনাকে দেখাব না। আপনি যদি এই ফেভারটাই কোন মুক্তিযোদ্ধাকে করেন সেটা একটা কাজের কাজ হয়। এই দেশের সেরা সন্তান এরাই, আমরা না।
আমি সীমা ছাড়াই, আপনি আমাকে কথা দেন, কোন মুক্তিযোদ্ধা এলে আপনি বিনা ফি-তে
তাঁর চিকিৎসা করবেন।
আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। তিনি কথা দিয়েছিলেন।

সেই কথার ভরসা করে আমি মুক্তিযোদ্ধা নৌকমান্ডো ফযু ভাইকে তাঁর ওখানে পাঠিয়েছিলাম। কারণ ফযু ভাই প্রচন্ড শ্বাস কষ্টে ভুগছেন। তিনি ফযু ভাইয়ে কেবল যত্ম করে দেখেই দেননি। তাঁর জমানো ওষুধ বদলে দামী সব ইনহেলারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, বিনা মূল্যে!
পরে ফযু ভাই একটা শিশুর লাফাতে লাফাতে আমার কাছে এসেছিলেন, চোখ-মুখ আলোয় ঝলমল, এতো বড়ো একজন ডাকতর আমারে কি কইল, জানেন?
আমি নিরীহ মুখ করে বলি, কি কইলো?
কইলো, আপনাগো সেবার লাইগাই আমরা বয়া আছি। দরকার হইলেই চইলা আইবেন, কুনু সমস্যা নাই।

আমি নিজের অজান্তেই শ্বাস ফেলি, আসলে প্রয়োজন কেবল আমাদের একটু সদিচ্ছার। এই ডাক্তারের মত মানুষগুলো যদি খানিকটা এগিয়ে আসেন তাহলে দেশের এইসব সেরা সন্তানদের মৃত্যুর পূর্বে আমাদের মুখে একরাশ, ঘৃণা-থুথু ফেলে মরতে হয় না।

Friday, March 5, 2010

অভাগা মানুষটা দেখবেন আমার চোখ দিয়ে

আমি বিভিন্ন সাইটে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শত-শত পোস্ট দিয়েছি। আমার লেখাগুলো ছিল অনেকটা, চালু ভাষায় খাপছাড়া। এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যাদের নাম শুনতে শুনতে কানে তালা লেগে যায় তাঁদের নিয়ে লিখতে আমি উৎসাহ বোধ করতাম না। এদের নিয়ে লেখার লোকের তো অভাব নাই, আমি কেন?

আমার আগ্রহ ছিল, এই দেশে অতি সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অবদান নিয়ে: মুক্তিযুদ্ধে একজন সুইপার, একজন আদিবাসী নারী; আদিবাসি একজন কমান্ডার, একজন সাধারণ হিন্দু বালিকা, একজন বালক, একজন কৃষক, একজন অন্যদেশি, একজন ক্যামেরাবাজ, একজন সাধারণ নেতা(!), একজন কথাবাজ, বীরাঙ্গনাদের কথা; এইসব অজস্র মানুষ।
কেমন কেমন করে যেন আমাদের ধারণা দেয়া হয়েছে, গুটিকয়েক মানুষই এই দেশটা স্বাধীন করে ফেলেছেন, অন্য আর কারও অবদান ছিল না। এবং ওইসব মানুষদের ছায়াতলে আমাদের আজীবন নতজানু হয়ে থাকতে হবে। বুশ ইস্টাইল, হয় তুমি আমার দলে নইলে তুমি খেলা থেকে বাদ, রাজাকার।

আমার অফ-ট্র্যাকের লেখার ভঙ্গি অনেকেই পছন্দ করতেন না, কেন আমি অতি বিখ্যাতদের নিয়ে লিখি না এই নিয়ে পারলে আমাকে শূলে চড়ান, এমন। কখনও কখনও এটাও বলতে ছাড়তেন না, আমি একজন রাজাকার ভাবপন্ন, বয়সে কুলাতে রাজাকার উপাধি দিয়ে দিতেন।
তখন মুক্তিযুদ্ধের উপর ওইসব লেখায় অসংখ্য মন্তব্য পেয়েছি, ভাল লাগল, প্লাসাইলাম, মাইনাইসিলাম, স্যালুট ইত্যাদি। অবশ্য এইসব প্রতিক্রিয়া আমাকে লেখা চালিয়ে যেতে জোর তাগিদ দিত, লেখা তরতর করে লেখা এগুতো। এমনও দেখা গেছে, টাইপ করতে করতে ভোর হয়ে গেছে, নিজের অজান্তেই কখন গাল ভিজে গেছে টেরটিও পাইনি! লিখতে গিয়ে সত্যি সত্যি তখন দমবন্ধ হয়ে আসত। তখন মাথায় কেবল ঘুরপাক খেত, আহারে, কেমন করে এইসব মানুষদের ঋণ খানিকটা শোধ করার চেষ্টা করি।

সুরুয মিয়া (তাঁর প্রতি সালাম), যিনি ২০০৫ সালে ঠিক ১৬ ডিসেম্বর ভোরে আত্মহত্যা করেন। সুরুয মিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে যখন আলাপ করি তখন আমার মধ্যে খানিকটা পরিবর্তন আসে। কেন, আজ বলি:
এই ভদ্রমহিলার ছেলেও বিয়ে করে তাঁকে ছেড়ে গেছে, তিনি কেমন করে সংসার চালান আমি জানি না- তিনবেলা আদৌ খেতে পান বলে আমার মনে হয়নি! তিনি যখন তাঁর গাছের আম-পেপে কেটে আমাকে খেতে জোরাজুরি করছিলেন তখন আমার কেবলই মনে হচ্ছিল এখান থেকে ভোজবাজির মত উধাও হয়ে যেতে পারতাম যদি। না খেলে মানুষটা বড়ো কষ্ট পাবেন। কিন্তু খাবার গলা দিয়ে কী নামতে চায় শালার, আমার কেবল মনে হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে খাবারগুলো চিবুচ্ছি। কী দীর্ঘ সেই খাওয়ার সময়- মনে হচ্ছিল এই মহিলার মাংস চিবুচ্ছি।

আমার অন্য রকম কষ্ট হচ্ছিল, মুক্তিযুদ্ধটাকে আমরা সবাই মিলে একটা ব্যবসা বানিয়ে ফেলেছি। কেউ এটা থেকে টাকা কামাচ্ছি, কেউ নাম! কিন্তু এই মানুষগুলোর মুখে সামান্য হাসি আনার কোন চেষ্টা আমাদের নাই। কেবল প্লাসাইলাম আর মাইনাইসিইলাম, ব্যস, একেকজন অনেক বড়ো বড়ো দেশপ্রেমিক হয়ে বসে রইলাম! লম্বা-লম্বা বাতচিত সার, সরকার কেন কিছু করছে না? সরকার এসে রাস্তার কলার ছিলকাটা সরিয়ে দিলে আমরা হাঁটব!
ফাঁকতালে আমারও দেশপ্রেমিকের একটা তকমা জোটার সম্ভাবনা দেখা দিল!
শ্লা, প্রবাসে আমরা কয়েক ক্যান বিয়ার খেয়ে পেশাবের সঙ্গে যে টাকা বের করে দেই এই টাকা দিয়ে অন্তত একজন মুক্তিযোদ্ধার ঘরে ঈদ নিয়ে আসা যায়, অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্য!

এরপর থেকে অন্য কোন ওয়েব সাইটে লেখা আমি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলাম। ওখানে লিখলে অনেক পাঠক পড়ল, অনেক হিট হলো, অনেক মন্তব্য আসল। কী লাভ, কার লাভ-
তাতে দেশের এইসব সেরা সন্তানদের কী আসে যায়! এটা একজন নৌকমান্ডো, ফজু ভাইয়ের ঠেলা চালাবার জন্য কী কাজে লাগবে? কী কাজে লাগবে সুরুয মিয়ার স্ত্রীর? কেবল ওনাদের লাল সেলাম লিখে খালাশ! এই লাল সেলাম জিনিসটা কি? কি করে এইটা দিয়ে?
তারচেয়ে নিজের সাইটে লিখে খুব আরাম পাই। যে দু-চারজন পাঠক পড়েন এতেই আমার ভারী সুখ। বাড়তি কোন চাপ নাই।

ক-দিন পূর্বে প্রবাসী একজন দুম করে আমাকে বেশ কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেন। এর একটা অংশ মুক্তিযোদ্ধা নৌকমান্ডোকে দেয়ার জন্য। মানুষটার
টাকার অংক এবং নাম প্রকাশে অনীহা বিধায় এই প্রসঙ্গটা আপাতত উহ্য থাকুক।
কিন্তু
ফজু ভাইকে খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়। অবশেষে পাওয়া যায়, অসুস্থ, প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট তাঁর। তাঁর হাতে টাকা দিলে তিনি তাঁর শীর্ণ হাতে আমার হাত খামচে ধরে রাখেন। এখনও ফজু ভাইয়ের গায়ে কী জোর! আমি তাঁকে বলি, বিদেশ থেকে একজন মানুষ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।
ফজু ভাইয়ের যে অভিব্যাক্তি আমি দেখেছি এটা কি কুবরিক তাঁর ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন? বা মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতি তাঁদের লেখার মাধ্যমে? আমি জানি না, জানি না আমি।
আমি এর ছবি উঠিয়ে রাখতে পারতাম। ইচ্ছা করেনি। পৃথিবীর সব ছবি কি উঠানো যায়, নাকি উঠানো উচিৎ?

প্রবাসী ওই মানুষটি এই টাকা খরচ করার জন্য আমাকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন। এখনও তাঁর টাকা থেকে কিছু টাকা আছে,
আমি ঠিক করেছি সুরুয মিয়ার স্ত্রীকে এটা দেব। শেষবার আসার সময় এই মহিলা তাঁর দুর্বল হাত দিয়ে আমার হাত ধরে বলেছিলেন, কথা দেও, তুমি আমারে আবার দেখতে আইবা।
আমি কথা দিয়েছিলাম। কিন্তু কথা রাখিনি। যাইনি, গিয়ে কি করতাম? আবারও কি তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম, আইচ্ছা, কইনছেন দেহি, আপনের সোয়ামি যুদ্ধ যাওয়ার আগে কেমুন স্বপ্ন দেখছিল? শোনো কথা, যুদ্ধে যাওয়ার আগে আবার স্বপ্ন দেখে নাকি, এইসব স্বপ্ন তো দেখতেন আমাদের বড়ো বড়ো ন্যাতারা!

আমার মনটা অনেকখানি খারাপ হলো, আহা, যে প্রবাসী মানুষটা ফযু ভাইয়দের জন্য এই উপহার পাঠিয়েছেন সেই মানুষটা কী অভাগা, প্রবাসে থাকার কারণে এই দুর্লভ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হলেন, আহা!
কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে, প্রবাস থেকে যখন কেউ বরফ পড়া নিয়ে লেখেন, অন্য ভুবনের আনন্দ নিয়ে বরফের বল একজন অন্যজনের গায়ে ছুঁড়ে দিচ্ছেন, আমি সেইসব বর্ণনা পড়ে যেমন তার চোখ দিয়ে এটা দেখি তাহলে ওই মানুষটা কেন আমার চোখ দিয়ে এমন দৃশ্য দেখতে পাবেন না?

Thursday, March 4, 2010

এ অসভ্যতারই নামান্তর

কখনও কোন নগরে গেলে আমি প্রথমেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, পুরনো স্থাপনা। আমার কেবলি মনে হয়, আমার পূর্বপুরুষদের কেউ ডেকে ডেকে বলছে, কাছে আয়, গায়ে হাত বুলিয়ে দেই। এই অনুভূতিটা আমার নিজস্ব, কেউ হা হা করে হাসলে এতে আমার বয়েই গেছে!

শেকড়হীন, বৈদেশি সাহেবরা, যাদের পূর্বপুরুষ, বাবা-মা নিয়ে কোন বাড়তি আবেগ নাই তারাও আপ্রাণ চেষ্টা করে শেকড়-পুরনো স্থাপনাগুলো যথাসম্ভব সংরক্ষণ করার। আমাদের শেকড় ছড়িয়ে থাকে নারকেল গাছের মত কিন্তু এ নিয়ে আমাদের বিকার নেই!
পূর্বপুরুষদের ছায়া ধরে রাখার আগ্রহ আমাদের নাই, আজিব!

আমাদের দেশে এখনও যেসব পুরনো স্থাপনাগুলো টিকে আছে সাধারণ মানুষদের দেখার যো নেই। কেউ-না-কেউ, কোন-না-কোন উপায়ে দখল করে রেখেছে। কোনটাকে স্কুল বানানো হয়েছে, কোনটা কলেজ, ডিসি সাহেবের অফিস, কালেক্টর সাহেবের অফিস। নয়েতো সরকার বাহাদুরের খাস কোন অফিস, 'দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি' কেন জনসাধারণের জন্য উম্মুক্ত থাকবে না? কেন আমি 'কার্জন হল' ঘুরে ঘুরে দেখতে পারব না? এটা দেখার জন্য কেন আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতে হবে?

আমার স্পষ্ট মনে আছে, ময়মনসিংহে এক রাজবাড়ি দেখার জন্য গিয়েছিলাম। ঢুকতেই পারিনি। এটাকে মহিলা কলেজ বানানো হয়েছিল। উল্টো এক লক্ষ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল, কেন আমি না বলে মহিলা কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। নিশ্চয়ই আমার মনে কু আছে, আমি হয়তো বা কোন ছাত্রীকে 'আগওয়া'-অপহরণ করার মতলবে এসেছি।
আমি ভীতু টাইপের মানুষ কিন্তু ওদিনের পর থেকে আমার খানিকটা সাহস জন্মাল, যাক, লোকজন যখন এমনটা ভাবছে আমি ছাত্রী অপহরণ করতে পারি তাহলে মানুষটা আমি একেবারে পুতুপুতু না।



১৯২৭ সালের এই নয়নাভিরাম, সুরম্য স্থাপনাটিকে এখানকার সবাই চেনে পূবালী ব্যাংক বিল্ডিং নামে! কে এদের সঙ্গে তর্কে যাবে ১৯২৭ সালে পূবালী ব্যাংক ছিল, কি ছিল না।
বাইরে মানুষ এবং পোস্টারে সয়লাব। স্থাপনাটার ভেতরে ঘুরে দেখার ইচ্ছা ছিল, একেকটা জানালাই দেখছি ৬ ফুটের উপর। কিন্তু ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগে আটকা পড়তে চাইনি এবং আটকা পড়লে আজ পোস্ট দেয়া সম্ভব হতো না এই ভাবনায় সোজা লম্বা দিলাম।



'রানীর কুঠি' বিশাল ধর্মসাগরেই পাশে। ছবি উঠাবো কি ছাই, সাইনবোর্ডের আড়ালে কুঠিটা দেখা গেল তো! এটার ভেতরেও যাওয়া সম্ভব হলো না কারণ এটা দখল করে রেখেছে 'বার্ড'। এটা তাদের অতিথিশালা। আচ্ছা, 'অতিথি শালা' এই জিনিসটা কি, অতিথিশালায় কারা কারা থাকে? না, নামটার সঙ্গে শালা শব্দটা আছে তাই গুলিয়ে ফেলেছি। আমি আরেক অভাগা, ইস্তিরি সাহেবার সন্তানের আপন মামা নাই কিনা! আহা, এই অতিথিশালায় থাকার কোন উপায় আমার নাই, আহারে!

'ড. আখতার হামিদ খান স্মারক বাসগৃহ' এটার দেখি আরেক কাহিনী। রানীর দিঘীর সংলগ্ন পুরনো একটা বাড়িতে ঠিক এমন একটা কথাই লেখা দেখলাম। ইনি কী পুরনো বিখ্যাত স্থাপনা বেছে বেছে কিছু কাল বাস করতেন নাকি? হতে পারে এগুলো ওনার আত্মীয়দের ছিল। তাই হবে।
গুগলে সার্চ দিলে ওনার সম্বন্ধে জানা যাবে কিন্তু আগ্রহ বোধ করছি না। এই দেশের নামী-দামী মানুষদের প্রতি আমার আগ্রহ কম। কারণ এদের মনন স্পর্শ করার ক্ষমতা, এদের সঙ্গে কথা বলার যোগ্যতা, এদর নিয়ে ভাবার মত যথেষ্ঠ ঘিলু আমার নাই।
আফসোস, থাকলে ভালো হতো।

Wednesday, March 3, 2010

মুক্তিযুদ্ধে, একজন ট্যাংক-মানব!

মুক্তিযোদ্ধা এম এ জব্বার।
এই মানুষটা আমার জন্য অসাধারণ এক উপহার নিয়ে এসেছেন। ১৯৭১ সালের গুলির বাক্স।
(আমার জীবনে এমনিতেই জটিলতার শেষ নাই। তাই জটিলতা এড়াবার জন্য আমাদের দেশের চৌকশ গোয়েন্দাদের আগাম বলে রাখি, এই গুলির বাক্সটা খালি।)
 
১৯৭১ সালে এই মানুষটাই পাকিস্তান থেকে আস্ত একটা রাশিয়ান T-55 ট্যাংক নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। জিটি রোড, ওয়াগা সেক্টরে ট্যাংক চালিয়ে পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সীমান্তে চলে এসেছিলেন। 
জব্বার ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব, হানিফ, জহির, হাবিব, তরিকুল ইসলাম চিনু সহ ৬ জন। কিন্তু পালাবার সময় যে ঝামেলাটা হলো তাঁদের কাছে বের হবার পাসওয়ার্ড নাই, তখন বাঙালিদেরকে পাসওয়ার্ড দেয়া নিষেধ ছিল। পাসওয়ার্ড বলতে না-পারলে গেইটে আটকে দেবে! এরপর পরিণাম কোর্ট-মার্শাল। সামরিক আইনে বিচার!
এরপর চিনু ভাই একটা বুদ্ধি বের করলেন। মুলতান রোডে যে অ্যামুনেশন ডিপো ছিল ওখানে সবাই লুকিয়ে রইলেন।
যখন অবাঙালি অফিসার জিপে করে আসলেন গেটের সেন্ট্রি যথারীতি তাকেও আটকে দিল, পাসওয়ার্ড জানতে চাইল? তখন সে অফিসার বলল, 'আসমান জমিন'। এভাবেই জব্বার ভাইরা পাসওয়ার্ড জেনে গেলেন।
কী এক পাগলামী, কী অকল্পনীয় এক কান্ড! একটা রগরগে মুভিকেও হার মানায়! ভারতীয় সেনার কাছে আত্মসমর্পণ করার পর চলে বিরামহীন জিজ্ঞাসাবাদ- মানুষটা কি পাকিস্তানী চর? ভারতীয় সেনার হাত থেকে ছাড়া পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে।

মানুষটা বলে যাচ্ছেন। আমি শ্বাস আটকে শুনি সেইসব আগুন দিনের কথা, তাঁর অসম সাহসীকতার কথা। কতশত অজানা কথা! আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধা হোমো এরশাদ সাহেবের বীরত্বের(!) কাহিনী। তিনি এবং রওশন এরশাদ যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে। ওখানে ওনারা উর্দুতে বাতচিত করতেন। যারা পালিয়ে আসার জন্য ফাঁকফোকর খুঁজতেন তাদের প্রতি এরশাদ মারাত্মক উষ্মা প্রকাশ করতেন, উর্দুতে:
'শালে, তুমলোগ কে লিয়ে আমলোগ কা জিনা হারাম হো যাতা। ইন্ডিয়া তুমলোগ কা দিমাগ ঘুমা দিয়া'। 
এরশাদ সাহেবের এইসব বাতচিত বাংলাতে অনুবাদ করলে অনেকটা দাঁড়াবে এমন: 'শালারা, তোমাদের জন্য আমাদের জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে গেছে। ভারত তোমাদের মাথা এলোমেলো করে দিয়েছে'।
 
মানুষটা এখন একজন সুখি মানুষ। তার আছে ভদ্রস্থ জীবন-যাপন করার সুযোগ। শুনে ভালো লাগে। তার গোলায় আছে ধান, পুকুরে মাছ, চলে যায়। তবুও মানুষটার কী এক হাহাকার! তাঁর সাহসীকতার জন্য তাঁকে বীরপ্রতীক খেতাব দেয়া হয়েছিল। লিখিতাকারেও আছে কিন্তু পরবর্তীতে তিনি প্রবাসে চলে গেলে এই বীরপ্রতীক খেতাবটা গেজেটে উঠেনি তদ্বিরের অভাবে। আজ তিনি একজন খেতাববিহীন মানুষ! সোজা বাংলায় রাষ্ট্র তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকার করে না!
তাঁর আক্ষেপ আমার কানে তালা লাগিয়ে দেয়:
"কেন আমাকে খেতাবের জন্য তদ্বির করতে হবে? কেন? আমি কি এই জন্য আস্ত একটা ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান থেকে দেশে চলে এসেছিলাম?ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান একটা T-33 বিমান নিয়ে পালিয়ে আসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, তিনি এই দেশের বীরশ্রেষ্ঠ। তাঁকে আমি স্যালুট করি। আর আমি ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসতে সফল হই কিন্তু আমাকে তদ্বির না করার অপরাধে একজন খেতাব বিহীন মানুষ হয়ে থাকতে হবে, কেন?"
আমি ক্রমশ নগ্ন হয়ে পড়ি- এক চিলতে কাপড়ের যে বড় প্রয়োজন! এইসব ক্ষেত্রে আমি চুপ করে থাকি, আকাশ দেখি। ভুলেও সামনের মানুষটার চোখে চোখ রাখি না।

 
*বক্তব্যগুলো জনাব এম, এ, জব্বারের নিজস্ব। তাঁর এইসব বক্তব্যর সপক্ষে প্রমাণ এবং সচিত্র-চলমান চিত্র (যার চালু নাম ভিডিও ক্লিপ) আমার কাছে সংরক্ষিত।
**আমার মাথায় নতুন এক ভূত আসন গেড়েছে। এখন থেকে এইসব আগুন-মানুষদের আনন্দ-বেদনা ভিডিও করে রাখব। এঁদের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে, পাল্লা দিয়ে কমছে আমার আয়ু। এ ব্যতীত আমার গতি কী! সুরুয মিয়ার (তাঁর প্রতি সালাম), যে মানুষটা ২০০৫ সালে, ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে আত্মহত্যা করেন। ওইসব অজানা কথা তখন সেলফোনে ধারণ করে না রাখলে আজ কোথায় পেতাম?
জনাব, এম, এ, জব্বারকে নিয়ে একটা সিরিজ লেখার ইচ্ছা আছে, দেখা যাক।


*** হালনাগাদ তথ্য: অবশেষে দেশ তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
 

Tuesday, March 2, 2010

বাংলালিংক, তবুও তোমায় ধন্যবাদ

'বাংলালিংক' সেল কোম্পানিটি অসাধারণ একটা কাজ করে ফেলেছে। 'বাংলালিংক এ্যাডভান্স' নামে দুর্দান্ত এক অফার চালু করেছে। কারও ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে সে ৫ টাকা আগাম ব্যালেন্সের সুবিধা ভোগ করতে পারবে।
অতি সংকটময় মুহূর্তে কারও টাকা শেষ হয়ে গেলে অন্তত ফোন করে কাউকে বলতে পারবে, ভাইরে, আমি বড়ো বিপদে আছি। এটা ভুক্তভোগি ব্যতীত অন্য কেউ বুঝবেন না, যেমনটা বুঝবেন না পোস্ট-পেইড গ্রাহক।

বিজ্ঞাপনটা দেখে আমার মনটা ভারী বিষণ্ন হয়।
ক-মাস আগের কথা। মাহাবুব ভাই নামে আমার একজন সিনিয়র আছেন। মানুষটা বিচিত্র কারণে আমাকে পছন্দ করেন, আমার যাবতীয় প্রলাপ শোনেন, আমাকে আশার বাণী শোনান। আমার নিজেকে যখন পুরোপুরি বাতিল মানুষ মনে হতো, এই মানুষটার সঙ্গে কথা বলে ক্ষীণ আশা জন্মাত, হয়তো এখনও পুরোপুরি বাতিল হইনি। মানুষটার এই ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না।
তো, তাঁর সঙ্গে দুনিয়ার হাবিজাবি প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হতো, এখনও হয়- কতশত আইডিয়া আমার মাথায় ঘুরপাক খায়। কয়েক মাস পূর্বে কথা প্রসঙ্গে তাঁকে বলেছিলাম, এই আইডিয়াটার কথা। এটার সঙ্গে জুড়ে অসম্ভব মানবিক একটা বিজ্ঞাপনের প্লটও।
তিনি উল্লসিত হয়ে বলেছিলেন, বাহ, বেশ তো!

আমি যখন থেকে সেল ফোন ব্যবহার করি তখন থেকেই প্রি-পেইড গ্রাহক। বেকায়দা অবস্থায় যখন ব্যালেন্স শেষ হয়ে যায় তখন কতটা অসহায় বোধ হয় এটা আমার চেয়ে কে ভালো জানে।
বেশ ক-বছর আগের কথা। আমাদের ভালবাসা-বাসির প্রথম সন্তান আসি আসি করছে। আসি আসি বাবুর মার তখন উথাল-পাতাল জ্বর। গভীর রাতে আমি ডাক্তারের কাছে যখন ফোন করলাম, সমস্যা বলার আগেই আমার ব্যালেন্স শেষ। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, সেই রাতটা, কী দীর্ঘ একটা রাত!

পরবর্তীতে আমি আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করতাম, কোম্পানিগুলো কেন এমন কোন সুযোগ দেয় না যেন গ্রাহক চরম জরুরী সময়ে ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলেও অন্তত দু-চার মিনিট ফোন করতে পারে। পরবর্তীতে রিচার্জ করার সঙ্গে সঙ্গে আগাম টাকাটা কেটে নিলেই হয়, সমস্যার তো কিছু নাই। সেই অপেক্ষা আর শেষ হয় না।

এইসব নিয়ে তখন মাহাবুব ভাইয়ের সঙ্গে আইডিয়া শেয়ার করছিলাম। এমন কোন সেল কোম্পানি পাওয়া গেলে এই আইডিয়া নিয়ে চমৎকার একটা ক্যাম্পেইন শুরু করা যায়।
তিনি কিছু সুবিধা-অসুবিধার কথা বললেন। অনেক হিসাব-কিতাবের বিষয় এখানে জড়িত। ইত্যাদি।
আমি বলেছিলাম, এমনিতে সেল কোম্পানিগুলো কত ছাতাফাতা অফার তো দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু লিজেন্ড হলে গেলে নতুন কোন আইডিয়ার বিকল্প নাই। এবং পাশাপাশি ধামাকা বিজ্ঞাপন অন্য কোম্পানিকে শুইয়ে ফেলার জন্য।
আমি চাচ্ছিলাম, গ্রামীন ব্যতীত অন্য কোন কোম্পানি। প্রয়োজনে অন্য সেল কোম্পানিকে বিনে পয়সায় আগ্রহের সঙ্গে আইডিয়া দেব কিন্তু গ্রামীন টাকা দিলেও না। আমি চোখ বুজে এখনই বলে দিতে পারি গ্রামীন নামের এই দানব কালে কালে এই দেশের প্রায় সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে, এমন কী আমরা বিছানায় কেমন কেমন করে সময় কাটাবো, এটাও! এদের সাথে থাকুক প্রথম আলোর মতি ভাইয়া, ওনারা দুনিয়া কাঁপালেন, নাকি বিছানা তাতে আমার কী!
এমন একটা দানবের সঙ্গে জড়াজড়ি থাকতে আগ্রহ বোধ করি না- কামসূত্র আছে কোন দিনের জন্য!

বিজ্ঞাপনটা দেখে
কাল যখন মন খারাপ করে মাহাবুব ভাইকে ফোন দেই, তিনি কঠিন বকা দেন, লিখে রাখেন, আপনার কিসসু হবে না।
আমি মন খারাপ করা শ্বাস ফেলি, লিখে আর কি করব! আমাকে দিয়ে কিসসু হবে না এটা জানার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না, এ তো আমি বিলক্ষণ জানি।
তিনি আমাকে ছাড় দেন না, আপনি কি মনে করে বসে রইলেন!
এর কি উত্তর হয়, এই দেশে যারা আইডিয়া ভাজাভাজি করেন তাদের কাউকে তো আমি চিনি না।
এবার
হয়তো তাঁরও মন খারাপ হয়, আপনি অন্তত ওয়েব সাইটে লিখতে পারতেন।
মানুষটাকে কেমন করে বোঝাই ওয়েব সাইট হচ্ছে গণিমতের মাল, নন-কমার্শিয়াল সেক্স ভলন্টিয়ারের সঙ্গে এর খুব একটা ফারাক নাই। অন্যদের দোষ দেই কোন মুখে! আমাদের দেশের প্রথম শ্রেণীর পত্রিকাগুলো ওয়েব সাইট থেকে হরদম চুরি-চামারি করেই যাচ্ছে। চোট্টামি সমাপ্ত করে,
লিকারের প্রভাবে মনটা খানিকটা উৎফুল্ল থাকলে বদনা হাতে টাট্টিখানায় যাওয়ার পূর্বে লিখে দেয়, 'ওয়েব সাইট অবলম্বনে'।

এই দেশে চুরি-চামারিটা চলে গেছে শিল্পের পর্যায়ে। একজন ডলি সায়ন্তনি একবেলা ভাত খাইয়ে ১০০ টাকা ধরিয়ে
কাঙালিনী সুফিয়ার গান হাপিস করে দেন, একজন মাহমুদুজ্জামান বাবু অতুল বাবুর গান অনায়াসে নিজের বলে চালিয়ে দেন। অতুল বাবু প্রতিবাদ করলে খোঁড়া যুক্তি দেখান, আমি তো ওঁকে গিয়ে পাইনি। বাহ, বেশ!
সেলিব্রেটিরা আমাদের শেখান কেমন করে অন্যের মাল নিজের বলে চালিয়ে দিতে হয়।

যাগ গে, এই আইডিয়া অন্য একজন বাস্তবায়িত করে দেখিয়ে দিয়েছেন, আমি বিমর্ষমুখে তাঁকে স্যালুট করি। অনেকের কাছে বিষয়টা অতি তুচ্ছ মনে হবে কিন্তু আমার বুকের গভীর থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসে, এমন কেন হবে? আমার ভাবনা-আইডিয়া নামের সন্তানগুলো বিকলাঙ্গ হবে কেন? আমি হেরে যাই তাতে ক্ষতি নাই কিন্তু আমার আইডিয়াগুলোর ভ্রুণাবস্থায় মৃত্যু হবে কেন?

কোথাও শেয়ার করলে তা চুরি হয়ে যাবে, মাথায় লুকিয়ে রাখলে তাও কেউ-না-কেউ আগেভাগেই ভেবে বসে থাকবে। কতশত আইডিয়া মাথায় ঘুরপাক খায়। এইগুলো নিয়ে কী করব! আহারে, বাথরুমে ফ্ল্যাশ করার ব্যবস্থা নাই, থাকলে ভালো হতো।

একবার একজন আসলেন, রিয়েলিটি শো করবেন। তিনি আমাকে বাতলে দিচ্ছিলেন, আমি কেমন কেমন করে তার ভাবনাগুলো ভাবব- পেইড রাইটাররা যা করেন আর কী! ভালো পয়সা পেলে পেইড রাইটাররা তাঁদের যন্ত্র দিয়েও লিখে দেবেন, আই বেট!
আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, কেন রে বাপু, আকাশ ছোঁয়া নারকেল গাছে একজন মানুষ তরতর করে উঠে যাচ্ছে এটা কী রিয়েলিটি শো না?
মানুষটা পশ্চাদদেশ দোলাতে দোলাতে চলে গিয়েছিলেন। তা যাক, পুরুষদের পশ্চাদদেশ দোলানো আমায় টানে না।

সফট-ড্রিংকস নিয়ে একটা চমৎকার আইডিয়া আছে, অপেক্ষায় আছি, কবে, কার মাথা থেকে এটা বের হয় তা দেখার জন্য। শ্লা, সব সময় দর্শক হতে ভালো লাগে আর। চুতিয়া আমি, আমার উপর নিজেই বিরক্ত! হুশ! দূর হ মরদুদ, না ফাতেহা, না দরুদ!

Monday, March 1, 2010

কবি নজরুল, আপনি মরে বেঁচে গেলেন

কবি নজরুল। আমার অসম্ভব পছন্দের কবি এটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না। কিন্তু "খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে, বি-রা-ট শিশু..." তাঁর এই অমর সৃষ্টি যখন অনুপ জালোটার গলায় শুনি তখন মনে হয় এটা গান না, অসাধারণ এক প্রার্থনা। এটা লেখার পর নজরুল আর এক লাইনও না লিখলে সমস্যা ছিল না। এমনিতেই অমর হয়ে থাকতেন।

আমাদের দেশে অনেকে কখনও কখনও নজরুলকে নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে অনাবশ্যক বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। প্রতিপক্ষ হিসাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দাঁড় করিয়ে আরাম পান কারণ রবিদাদা হিন্দু। অনেক শিক্ষিত মানুষের মুখে যখন এইসব শুনি তখন মনে হয়, গোবর খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করার পরামর্শ না দিয়ে গতি কী!

নজরুল বেশ কিছু দিন কুমিল্লায় ছিলেন। এটা ভাসা ভাসা জানতাম।
এবার রাণীর দিঘীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, আচ্ছা,
মানুষটা যখন এখানে এসে বসতেন, লিখতেন, আড্ডা দিতেন তখন কি মানুষটার বাবরি চুল ছিল? ছিল কি মানুষটা ভাবুলতায় মাখামাখি দু-চোখ?
আচ্ছা, মানুষটা কি এই দিঘীতে পা ডুবিয়ে বসতেন? আচ্ছা, এখানে কি মাধবী লতার গাছ ছিল? আচ্ছা, প্রমিলাকে যখন চিঠি লিখতেন তখন তাঁর মনে কি ভাব খেলা করত? আচ্ছা, তিনি কি ভুল করেও কখনও
প্রমিলাকে চিঠিতে লিখে ফেলেছিলেন, প্রাণসখি চুম্বন লইয়ো...। লিখে ফেলে ভারী বিব্রত হয়ে ওই কাগজটা কুচিকুচি করে দিঘীর জলে ফেলে দিয়েছিলেন? আচ্ছা, ...?

এই ছবিগুলো উঠাতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে কারণ এর নীচে বসে কেউ-না-কেউ ব্লাডার খালি করছে, যার চালু নাম পেশাব করা।
এই কুৎসিত দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে আগ্রহ হয়নি কারণ এদের দোষে দেই কেমন করে! পেছনে অতি নিকটে কালো যে দেয়ালটা দেখা যাচ্ছে এটা হচ্ছে এই শহরের সভ্য মানুষদের বানানো পাকা ডাস্টবিন! রাজ্যের আবর্জনা ফেলা হয় এখানে।
আমরা বড়ো বিচিত্র জাতি, এ দেশের সেরা সন্তানদের কত রকমে অসম্মান করা যায় এই নিয়ে আমাদের প্রতিযোগীতার শেষ নাই!

ভিক্টোরিয়া কলেজের আয়ত্বের ভেতর নজরুলের এই স্তম্ভটা। যে কলেজ নামের কারখানা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে বের হচ্ছে, এরা স্বাধীনতার সৌধে কুৎসিত কথাবার্তা লিখবে, ততোধিক কুৎসিত ছবি আঁকবে এতে বিস্মিত হওয়ার কী আছে! ধুতুরা গাছে ধুতুরাই তো ধরবে, কেন এটায় স্ট্রবেরি ধরে না এ নিয়ে ফিজুল অস্থির হওয়ার মত বোকামী আর কিছু নাই।

WhatsApp