Monday, February 8, 2010

জাস্টিস ডিলে...

৩১ জানুয়ারী ছিল আমার জন্মদিন। দুঃখের এই দিনটা (বাবা-মার আনন্দের ফসল নিরানন্দ-আসফল, আমি) আমি নিজের মত করে কাটাই। কেমন করে? বিস্তারিত বলে পাগলের কুখ্যাতি আর বাড়াই না!
সকাল থেকেই মেজাজ তিরিক্ষি। দিনটাই মাটি! আজই মামলার তারিখ, মামলার তদ্বিরে আজ কোর্টে ছুটতে হবে। কপাল, বেছে বেছে আজকের দিনটাই!

এই দুর্দশাটা অবশ্য আমি নিজেই ডেকে নিয়ে এসেছি। একটা বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছিলাম। তা প্রায় বছর দেড়েক হলো। যে দেশে প্রধানমন্ত্রী হত্যা মামলার রায় পেতে ৩৪ বছর অপেক্ষা করতে হয় সেই দেশে আমার মত অগাবগার মামলার রায়, কবে নাগাদ এর সুরাহা হবে কে জানে! মানুষ তো আর কচ্ছপ না, দেড়-দুশো বছর অনায়াসে বাঁচবে। দুষ্টদের এটাই শক্তি- মামলা করলে আমার ইয়ে হবে। কেউ এ বিষয়ে গা করছে না,
বিচিত্র দেশ!

এমনটা হবে জানতাম না এমন না, জানতাম। আমার বইয়ের সৃষ্ট চরিত্র জানে, "একটি বেড়ালের জন্য গাভী হারানোর নাম হচ্ছে মামলা" আর আমি জানব না; তা কী হয়? তারপরও আমি কেন এমন বোকামি করলাম? কারও কথা শুনিনি কারণ কেবল বিপুল টাকার ক্ষতিপূরনই না, এটা ছিল মর্যাদা, ন্যায়েরও একটা দিক।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অন্য দেশে এসে দেশটাকে তাদের তালুক মনে করে। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ঈশ্বরগোছের মনোভাব থেকে এখনও এরা বের হতে পারেনি। এদের জন্য একটা ম্যাসেজ দেয়া প্রয়োজন ছিল, নিজের দেশে ল্যাংটা হয়ে হাঁটো বলেই অন্য দেশে গিয়ে ইচ্ছা হলেই 'নাংগাপাংগা' হয়ে যাওয়া যায় না।

আমি যখন এদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য ল-অফিসারের কাছে গেলাম তখনও অনেক যন্ত্রণা করতে হয়েছে। জুনিয়র এই ল-অফিসার আমাকে বয়স বা যেকোন কারণে খানিকটা সমীহ করেন বলেই মিনমিন করে বলেছিলেন, ইয়ে, ভাই, এই মামলাটা না করলে হয় না?
আমি বলেছিলাম, কেন?
এরা হচ্ছে ডায়নোসর, আপনি এদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারবেন না। ডায়নোসরের বিরুদ্ধে গুলতি। আপনি গুলতি নিয়ে লড়াই করার চেষ্টা করছেন, এটা একটা অসম যুদ্ধ!
আমি অবাক, কেমন?
তিনি বললেন, এরা হাজার-হাজার কোটি টাকা ট্যাক্স দেয় বিষয়টা আপনি বুঝতে চাইছেন না কেন! সরকার এরা উঠায়, নামায়। গোটা দেশটাই তো এদের...(আর বিস্তারিত এখানে বলা যাবে না)।
আমি মেজাজ খারাপ করে বললাম, সো? ট্যাক্স তো আমরাইও দেই। প্রত্যক্ষ ট্যাক্স বাদ দিলেও আমরা যে কনডম কিনি পরোক্ষ ট্যাক্স তো আমাদেরকেও দিতে হয়। তা অসুবিধা কোথায়? আর সরকার কার কাছ থেকে কত টাকা ট্যাক্স পায় তাতে আমার কাজ কী! তাছাড়া আমি ন্যায় চাচ্ছি কোর্টের কাছে, সরকারের কাছে না। আর এটা কেমন কথা, এই দেশে কি দাঁড়াবার কোন জায়গা থাকবে না?

এই ভদ্রলোকের আগে থেকেই অনেকখানি ধারণা ছিল আমার মাথা
খানিকটা এলোমেলো। তিনি আর কথা বাড়ালেন না। এই পরামর্শ দিয়ে বিদায় দিলেন, যেহেতু আপনি জায়ান্ট একটা কোম্পানির বিরুদ্ধে লাগতে যাচ্ছেন, ভালো হবে খুব সিনিয়র একজন ল-অফিসারের কাছ থেকে এই মামলার আর্জিটা লেখালে।
পরামর্শটা আমার মনে ধরল।

এরপর তারিখের পর তারিখ, লাটিমের মত ঘুরপাক খাওয়া। বহুজাতিক কোম্পানিটি বিচিত্র সব অজুহাতে মামলাটা পিছিয়ে দিতে লাগল।
এরা আমার মুখোমুখি হতে চাচ্ছিল না কেন? একেকবার একেক অজুহাত-চালবাজি। একবার একটা সময় চাইল কোর্টের কাছে, এদের এম.ডি নাকি দেশে নাই। হা হা হা, এম.ডি দেশে না থাকার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক! অনেকটা এমন, দেশে প্রধানমন্ত্রী নাই বিধায় একজন বয়স্ক ভাতা উঠাতে পারছে না!
এদের কাতরতা, হাস্যস্পদ কান্ড, নীচতা দেখে মজাই লাগত। আমার দুঃসহ সময়ে এও কম অর্জন না, ঈশ্বরগোছের মানুষদের আমার মত অভাজনকে কেয়ার করার প্রয়োজন পড়ছে! আহারে, কেবল টাকা-পয়সা দিয়ে মানুষ কী করে?

যাক, যেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম। ঠান্ডা মাথায় একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার ৮ বছরের সন্তানকে আজ সাথে নিলাম। ল-অফিসার, মুহুরি, পেশকার এদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম।
আমি বিমলানন্দে বললাম, আমার ছাওয়াল। একে সব দেখিয়ে দেয়ার জন্য নিয়ে আসলাম। যে গতিতে মামলা চলছে আমার জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব এমনটা ভরসা করি না। আমার পরে এই সামলাবে।

মানুষগুলো হাঁ! এঁদের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, এরা সম্ভবত আগে এমন পাগলের পাল্লায় পড়েননি। এই মামলার উকিল অনেক সিনিয়র, তিনি চিড়বিড় করে উঠেননি বলে বাচোঁয়া। ক্ষেপে গিয়ে দুম করে বলে বসলে সমস্যা হয়ে যেত, এইটা পাগলা গারদ না, যান মিয়া, আপনের মামলাই আর করুম না। ভাগেন।
এই ল অফিসার-উকিল মানুষটা অন্য সব উকিলের মতই কিন্ত বিশেষ একটা কারণে মানুষটাকে আমি শ্রদ্ধা করি। এতো বড় কোম্পানির বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াতে সাহস করছিল না, তিনি করেছেন।

যাই হোক, আমি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমার সন্তানকে সব দেখালাম। ওই যে ব্যাটা দেখছ উঁচু জায়গায় চেয়ারটা ওখানে জজ সাহেব বসে ন্যায় করেন। সে হয়তো খানিকটা বুঝল খানিকটা বুঝল না, তাতে কিছুই যায় আসে না।
হায় ন্যায়-হায় সময়! সময় হচ্ছে গড়িয়ে যাওয়া পানি- হয়তো একদা আমি ন্যায় পাব, কী লাভ? আমার অসহ্য কষ্টগুলো কোর্ট ফিরিয়ে দিতে পারবে না, কখনই না।

তবুও...। আমরা যেখানে শেষ করব পরবর্তী প্রজন্ম সেখান থেকে শুরু করবে। কতটা সময় গেল তাতে কী আসে যায়।

1 comment:

suza said...

কনডমের Tax! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ