Friday, February 19, 2010

মতিউর রহমান: আগে নিজের শপথটা সেরে ফেলুন

এখন টিভি দেখাটা এক যন্ত্রণা হয়ে গেছে। ফ্রেব্রুয়ারি মাসটা জুড়ে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নেই। একেকজনের কী কান্না, কপাল ভিজে যাচ্ছে! আমরা আবার বিশেষ আয়োজন ব্যতীত, বিশেষ দিন ব্যতীত ঘটা করে কাঁদতে পারি না। শব সামনে নিয়ে চালবাজরা যেমন ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে, লাউ দিয়া শোল মাছ খাইতে চাইছিল রে-এ-এ-এ। হেই দিন আমারে কইল, বাজারে লইয়া চল, কে রে লইয়া গেলাম না, রে-এ-এ। যাওয়ার আগে কইয়া গেলো না, রে-এ-এ।

টিভিতে কী একেকটা বিজ্ঞাপন! দেশের সেলিব্রেটিরা বুকে কালো কাপড় লাগিয়ে ভাব ধরে বলছেন, ভাষা...বিনম্র শ্রদ্ধা...'ওয়ালটন' আমাদের পণ্য। মুহাহা হা, ওয়ালটন নাকি আমাদের পণ্য। ওয়ালটনের মালিক এই দেশের নাকি? আমাদের সেলিব্রেটি, এরা ভাল পেমেন্ট পেলে পটিতে বসারও পোজ দেবেন। টাকার অংকটা ভালো হলেই হয়, ব্যস।

এই দেশের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি মায়া সেল কোম্পানীগুলোর, রক্তচোষা গ্রামীন ফোন সবার আগে মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুটছে। ১৬ কোটি মানুষ এদের গ্রাহক এটা শুনলেও আমি বিস্মিত হবো না।
এদের সঙ্গে যোগ দেন আমাদের দেশের সুশীলগণ। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এগুলোকে এরা এখন জাস্ট একটা পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। বিক্রয়যোগ্য পণ্য। হজম করার জন্য আমরা জনগণ আছি না!

১৬
ফ্রেব্রুয়ারি, মতিউর রহমান সাহেব প্রথম আলোয় লিখলেন, "দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট"।
জন রীডের বিখ্যাত একটা বই আছে "দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন"।
আমি এই ফিজুল তর্কে যাই না কিন্তু অনুমান করি, মতি সাহেব ওখান থেকে দশ দিনটাকে ৩০ মিনিট করে দিয়েছেন।
জন রীড তাঁর বইয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন কেমন করে ১০ দিনে দুনিয়াটা কেঁপে উঠেছিল।
এ সত্য, ভাষার জন্য লড়াই এটা আমাদের জন্য বিপুল, বিশাল এক ঘটনা, আমাদের অহংকার কিন্তু আমি যদি পক্ষপাতহীন-নির্মোহ দৃষ্টিতে মতিউর রহমানের এই লেখাটা পড়ি তাহলে বুঝে উঠতে পারি না কেমন করে এই ৩০ মিনিট দুনিয়াটাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল! এটা আমাদের জন্য কাঁপানো দিন, দুনিয়ার জন্য কেমন করে? মতি সাহেব জন রীডের লেখা পড়ে মাছিমারা কেরানির মতো আইডিয়া প্রসব করে ফেলেছেন নাকি? ভালো-ভালো!

এই লেখার এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, "আমরা নতুন করে শপথ নেব...জনগণের সঙ্গে নানাভাবে সংশ্লিষ্ট গ্রামীনফোন। ...।" গ্রামীনফোনের মত কোম্পানি আমাদের চোর বানাতে উস্কে দিলেও আমরা মতি সাহেবদের কল্যাণে এদের লেজ ধরে হাঁটব, ইনশাল্লাহ।
ওয়াল্লা, আবারও দেখি মতিউর রহমানের শপথ কিচ্ছা। এতো শপথ করিয়া আমরা কী করিব, কোথায় যাইব, কোথায় রাখিব? শপথ করিতে গিয়া শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জানের মত সুশীলদের কাছা খুলুক, আমার কী! মতি সাহেব দেখছি আমাদের শপথ করাইয়া করাইয়া সুশীল-মানুষ বানাইয়া দিবেন। কিন্তু একটা বিষয় আমার বোধগম্য হইতেছে না তিনি নিজে কেন শপথ নিচ্ছেন না, নাকি তিনি আকাশলোকের বাসিন্দা, তাহার শপথের প্রয়োজন নাই?

এখন
হরদম গ্রামীনের (প্রকারান্তরে মতি সাহেবের আইডিয়া) ওই বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে, "...আহারে সেই ত্রিশ মিনিট, দুনিয়া কাঁপানো ত্রিশ মিনিট"। আহারে, আমাদের মতিউর রহমানরা যা ভাবেন তাই আমাদের গিলিয়ে ছাড়েন, করপোরেট ভুবনের রাক্কসদের কাঁধে ভর করে। যথারীতি এতে যোগ দিয়েছে গ্রামীন ফোন।
আহারে, এইসব কোম্পানিগুলো কান্নাকাটি খানিকটা কমালে তাদের অন্তর্বাস ভেজার হাত থেকে বেঁচে যেত! আমাদের ক-জনই বা ভাষাসৈনিক আজ বেঁচে আছেন। যারা এখনও বেঁচে আছেন, তাঁদের একটা করে ফ্ল্যাট দিয়ে দিক না। অন্তত ভদ্রস্ত হয়ে বাঁচার জন্য ন্যূনতম সহযোগীতা।

মতিউর রহমানরা ব্যবসাটা ভালই বোঝেন, একটু বেশি বেশি। যে ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে মতিউর রহমান কাঁদতে কাঁদতে শ্যাষ, গামছা ভিজিয়ে ফেলছেন। এই ভাষা আন্দোলন যারা করেছিলেন তাঁদের প্রতি মতিউর রহমানের শ্রদ্ধা দেখে আমাদের প্যান্টলুন খুলে যাওয়ার দশা। ভাষাসৈনিক গাজিউল হকের মৃত্যু সংবাদ আমাদের মতিউর রহমান সাহেবের পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় জায়গা হয় না, ছাপা হয়েছিল শেষ পৃষ্ঠায়, সিঙ্গেল কলামে, হেলাফেলা ভঙ্গিতে। কারণ এই পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় কোথাকার কোন ভাষাসৈনিকের খবর ছাপাবার চেয়ে জরুরী জল্লাদ কোন কালারের আন্ডারওয়্যার পরেছিলেন এর বিশদ বর্ণনাসহ ঢাউস ছবি ছাপানো।

মতিউর রহমান সাহেব আমাদের মগজ ধোলাই করবেন কখন আমরা কোন শপথ নেব, কাকে কখন সম্মান করব, কখন অসম্মান। ভয়ে ভয়ে আছি, আমাদের মতি সাহেব কোন একদিন, আমরা কেমন করে বিছানায় আচরণ করব এই বিষয়ে কোন একটা শপথ আহ্বান করে বসেন। বড়ো ভয়ে ভয়ে আছি, তখন আমাদের কী হবে গো!

2 comments:

মুকুল said...

দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিটের নমুনা দেখুন টিংকু ট্রাভেলারের ব্লগে: http://www.somewhereinblog.net/blog/tinkutravelar/29102764

যে কোন ভদ্রলোকও গালি দিতে বাধ্য হবে নিশ্চিত।

।আলী মাহমেদ। said...

লিংকটা দেখলাম। এ তো হওয়ারই ছিল- ধুতুরা গাছে তো ধুতুরাই ধরবে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কালে কালে দেখেন না কি হয়...।