Monday, March 8, 2010

বতুতা এবং আরবী জানা মোল্লা সাহেব!

অসম্ভব আগ্রহ নিয়ে এইচ এ আর গিব-এর "ট্রাভেলস অব ইবনে বতুতা" (১৩০৪-১৩৬৯) পড়ছি। ইবনে বতুতাকে আমরা একজন মুসলিম পরিব্রাজক বলতে পারি- খানিকটা পক্ষপাতদুষ্ট। এ সত্য তাঁর বর্ণনায় খানিকটা অতিশয়োক্তি আছে, আছে অস্পষ্টতা কিন্তু কী সাবলীল তাঁর বর্ণনা! কী বিচিত্রসব অভিজ্ঞতা!

আজ থেকে আনুমানিক ৭০০ বছর পূর্বে মানুষটার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে কী আনন্দই না হয়! কেমন ছিলেন তখনকার মানুষ, তাদের আচরণ। একটা বর্ণনা পূর্বের লেখায় উল্লেখ করেছি। ৭০০ বছরে আমরা কতটা সভ্য হলাম?‍

এমন অজস্র অভিজ্ঞতা।
নীলনদ সম্বন্ধে জানা যায়:
"নীলনদের এক বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, গ্রীষ্মকালে যখন প্রচন্ড গরমে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়, বেশিরভাগ নদী শুকিয়ে যেতে থাকে তখন নীলনদ ফুলে-ফেঁপে উঠে।
আবার অন্য সব নদী যখন পানিতে উপচে পড়ে তখন নীলনদ শুকাতে শুরু করে।"


"ভারতীয়দের কাছে পানের মর্যাদার শেষ নাই। কেউ কারও বাড়িতে গেলে পাঁচটা পান উপহার দেয়। এব‌ং যুবরাজ বা মর্যাদাবান কারও কাছ থেকে পেলে তো কোন কথাই নাই! ...সোনা বা রূপার চেয়ে পান পেলে খুশীর সীমা থাকে না।"

"কিপচাম মরুভূমিতে কোন গাছ নেই। আগুন জ্বালাবার কাঠের বড়ো অভাব, গোবর দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। গোবর এখানেই এতই গুরুত্ব রাখে, এখানকার সবচেয়ে ধনী মানুষটিও রাস্তায় গোবর পড়ে থাকতে দেখলে পরম যত্মের সঙ্গে দামী পোশাকের কোচড়ে তুলে নেবেন!"

"মারমা নামের জায়গায় যখন এলাম, এখানে শিয়া সম্প্রদায়ের মত কিছু লোক থাকে। এরা ১০ সংখ্যাটিকে এরা তীব্র ঘৃণা করে। যেসব লোকের নাম ওমর, এমন লোকদেরও! এর কারণ সম্ভবত এটা, হযরত মুহাম্মদ (দঃ) সহচরদের মধ্যে বিশেষ ১০ জন প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, তাঁদের মধ্যে হযরত ওমরের (রাঃ) এর জন্য রয়েছে তাদের তীব্র ঘৃণা!
তারা মনে করে খলিফা হওয়ার বিষয়ে হযরত আলী (রাঃ) প্রতি হযরত ওমর (রাঃ) অন্যায় করেছেন।
এরা বাজারে কোন কিছুর নিলাম ডাকলে ভুলেও ১০ শব্দটা উচ্চারণ করবে না । ১০ না বলে বলবে ৯ এবং ১!"

মুসলিক শাসকদের ক্ররতা, হিংস্রতা আমরা দেখতে পাই:
"দামাস্কাসে প্রবেশ করলাম আমি। ...আগে এখানে গির্জা ছিল। কিন্তু মুসলমানরা দামাস্কাস দখল করার পর তাদের এক সেনাপতি খোলা তলোয়ার হাতে গির্জার মধ্যে প্রবেশ করেন। সমঝোতা অনুযায়ী গির্জার অর্ধেকটা মুসলমানদের দিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু খলিফা ওয়ালিদ ঠিক করলেন, বাকী অর্ধেকটা কিনে নেয়ার জন্য। খ্রীস্টানরা রাজী না হলে নিজেই কুড়াল দিয়ে গির্জা ভাঙ্গা শুরু করলেন খলিফা, আল্লাহর নামে।"

"ফোরাতের কাছে হিল্লা শহরে পৌঁছলাম। এদের বিশ্বস ১২তম ইমামের মধ্যে 'মাস্টার অভ দ্য এজ' হিল্লা শহরের এক গুহায় অদৃশ্য হয়ে যান। ১০০ হিল্লাবাসী খাপমুক্ত তলোয়ার হাতে ড্রাম, ট্রাম্পেট, বিউগল বাজাতে বাজাতে ওই পাহাড়ের পাদদেশে দিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, আল্লাহর কসম, হে ইমাম! হে মাস্টার অভ দ্য এজ, আল্লার দোহাই লাগে আপনি বেরিয়ে আসুন। পাপাচার-অনাচারে পৃথিবীটা ভরে গেছে...।"

"দিন-রাত যে কোন সময়েই তুর্করা তাদের ওয়াগনটানা ঘোড়া, উট খোলা ছেড়ে দেবে। চুরির ভয় নেই। কারণ যে চুরি করবে তাকে অবশ্যই ধরা হবে এবং শাস্তি হিসাবে তাকে আরও নয়টা উট দিতে হবে। দিতে না পারলে তার ছেলেকে। তাও না পারলে প্রকাশ্যে জবাই করা হবে।"

‍"নামাযের বেলায় এমন নিয়ম বিশ্বের কোথাও দেখিনি! আযান পড়ার পর কেউ মসজিতে না এলে তাহলে কাজি তাকে প্রকাশ্যে চাবুকপেটা করবে। তাই সব মসজিদে একটা করে চাবুক ঝোলানো থাকে। সঙ্গে ৫ দিনার জরিমানাও।"
(সৌদিতে এখনও কাছাকাছি নিয়মটা চালু আছে। কাউকে পেলে তাকে মুতওয়া নামের পুলিশ হিড়হিড় করে ধরে থানায় নিয়ে নামায় পড়াবে, সে পাক থাকুক বা নাপাক। 'ভবিষ্যতে নামায পড়িব' এমন মুচলেকা নিয়ে তবেই ছাড়বে)

"একদিন আসরের জামাত শুরু হওয়ার আগে সুলতানের নামায পড়ার জায়গায় জায়নামায বিছেয়ে তার অনুচর ইমামকে বললেন, সুলতান অজু করছেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার জন্য বলেছেন।
কিন্তু ইমাম মুয়াজ্জিনকে তখনই নামায শুরু করার নির্দেশ দিলেন। সুলতান যখন মসজিদে প্রবেশ করলেন তখন নামায অর্ধেক শেষ। যেহেতু এগুবার সুযোগ নেই তাই তিনি মুসল্লিদের পেছনে জুতা রাখার জায়গায় নামায পড়লেন।
...খুৎবায় ইমাম প্রকাশ্যে সুলতানের কঠিন সমালোচনা করতেন। সুলতান মাথা নীচু করে চুপ করে শুনতেন।"

একসঙ্গে কয়েকটা বই পড়ার বদ অভ্যাস আমার, পুরো বইটা এখনও পড়ে শেষ করতে পারিনি। বতুতা সাহেব মাত্র ভারতবর্ষে পা রাখলেন। পাঞ্জ আব থেকে দিল্লি যেতে লাগে ৫০ দিন, কেমন করে ৫ দিনে ডাক পৌঁছে দেয়া হতো, হাঁ করে পড়ছি! ইশ, বাংলাদেশে (তৎকালিন অখন্ড ভারতবর্ষ) এই মানুষটা আসবেন না?

কিন্তু যে বিষযটা এখন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনী নামের নোটগুলো আরবী থেকে ইংরাজীতে অনুবাদ করেছে এইচ, এ,আর গিব। আমাদের দেশে হয় আমরা গিবের অনুবাদ পড়ছি অথবা তার অনুবাদ থেকে বাংলায় কেউ অনুবাদ করলে।
একটা কথা আছে, অনুবাদক মানেই এ্যদুত্তোর এ্যদিতর- অর্থাৎ অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক। এখানে গিব সাহেব কতটা ভাবনা মিশিয়েছেন আমরা জানি না।

আমাদের দেশে কি কেউ আরবী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন? আমি জানি না। কয়েকজন প্রকাশককে ফোন করলাম, তারা প্রায় নিশ্চিত সরাসরি আরবী থেকে কেউ বাংলায় অনুবাদ করেননি।
কেন?
আমাদের দেশের আরবী জানা মোল্লা সাহেবরা কোথায়? আমাদের দেশের আরবী পন্ডিতরা অনুবাদ না করে থাকলে করলেন না কেন? লজ্জা করে না, গিব নামের মুরতাদ এই কাজটা করে দেখিয়ে দিল! এমনিতে ইনারা তো দেখি চিৎকার করে প্রলম্বিত সুরে, আরবী ব্যতীত বাতচিতই করতে চান না! সমস্ত নসিহত আরবীতে, যেন বাংলায় বললে আকাশ ভেঙ্গে পড়বে! মধ্যরাতের ওয়াজ মাহফিলে আরবীর বন্যা বয়ে যায়! ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় একেকজনের আরবী নিয়ে কী পান্ডিত্য! কী চমৎকার করে, এঁরা কী অবলীলায়ই না বের করে ফেলেন 'ইয়াওম' মানে দিন হবে না, হবে দিবস।

এঁদের মধ্যে থেকে কেউ অনুবাদ করতে আগ্রহী হলেন না কেন?
এটা তো কোন মুরতাদের বই না। এবং আমার ধারণা, আমার মত নাফরমান বান্দার কথা বাদ দিলাম; যাদের ইসলাম ধর্মের প্রতি অযাচিত আবেগ আছে তারা ১০০টা ওয়াজ মাহফিলের চেয়ে উপকৃত হবেন বতুতার এই বই পড়ে। একাডেমিক কারণে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চাইব ইংরাজি অনুবাদের চেয়ে সরাসরি আরবী থেকে বাংলা অনুবাদ পড়ার জন্য।

আমাদের মোল্লা সাহেবদের কেমন কেমন করে যেন ধারণা জন্মে গেছে, জীবনে একটা মাত্র বইই পড়বেন, এটার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন করেই যাবেন, আজীবন। আর কোন বই পড়ার প্রয়োজন নাই।

No comments: