(কি যেন একটা গান ছিল, "হাজার মনের কাছে প্রশ্ন করে..."। হাজার মন আর হাজার বছর এর মধ্যে ফারাক দেখি খুব বেশি না।)
বইয়ের মোড়ক উম্মোচনের বিষয়টা আজও আমার বোধগম্য হয় না। অবশ্য আমার না-বোঝার জন্য কিছুই যায় আসে না, হয়তো এর প্রয়োজন আছে। লেখকদের এই কান্ড নিয়ে আমি একটা লেখা দিয়েছিলাম [১]।
কিন্তু যখন কেউ কারও জীবনী লেখেন তখন হয়তো বইয়ের মোড়ক উম্মোচন জরুরি হয়ে পড়ে। সিদ্ধেশ্বর মজুমদার (আমার পড়াশোনা কম, নামটা আগে শুনিনি) লিখেছেন 'হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ', বইটার মোড়ক উম্মোচন করা হয়েছে। এটা এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু পুরস্কার-২০০৯ নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম।
মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন (প্রথম আলো, ১৪ আগস্ট ২০১০), "...বাঙালি জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমান বাঙালির গৌরব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিল্প-সাহিত্যসহ যাবতীয় কৃষ্টির ধারক ও বাহক। আর সহস্র বছরের বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাঙালির ইতিহাস অলীক, অবাস্তব..."।
প্রধান বিচারপতি এমন একটা পদ যেখানে চোখ বুজে আস্থা রাখা চলে। আমাদের শেষ ভরসাস্থল। তিনি যখন বলেছেন তখন এই নিয়ে বিতর্ক চলে না।
তবে সবিনয়ে বলি, এমন অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতির উপস্থিত থাকাটা কী অতি জরুরি? প্রধান বিচারপতি যখন চাইছেন তখন ধরে নিলাম জরুরি। কিন্তু যেখানে সমস্যাটা দাঁড়ায়, যাকে নিয়ে তিনি বক্তব্যটা দিচ্ছেন তাঁর দল এখন ক্ষমতায়। প্রধান বিচারপতি যখন এমন বক্তব্য রাখেন তখন জনসাধারণের মধ্যে এক ধরনের শংকা কাজ করে, এতে জনগণকে কতটা দোষ দেয়া চলে সেটা ভাবার বিষয়। বিভিন্ন অফিসে ছবি ঝোলাবার নিয়ম চালু হয়েছে; খোদা-না-খাস্তা, এই নিয়মটা যদি আদালতেও চালু হয়? তখন আমাদের মত সাধারণ মানুষদের দোষ দিলে লাভ কী!
আরেকটা কথা। এখানে তিনি বলেছেন, "...আর সহস্র বছরের বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান"। এটা তিনি কোন সূত্রে বলেছেন, বিবিসির সূত্রে? তাহলে ঠিক আছে। এটা সত্য, বিবিসি নামের একটা বিতর্কিত [২] মিডিয়া এই সংক্রান্ত একটা জরিপ করেছিল। জরিপটা আমরা জানি তবে তাদের গবেষণাটা পদ্ধতিটা জানি না। হাজার বছরের তথ্য উপাত্ত ঘেঁটে এরা কেমন করে বের করেছিল! এখন কালই যদি বিবিসি একটা নতুন জিনিস চালু করে ৫০ বছরের শ্রেষ্ঠ অন-লাইন লেখক। বিবিসি বলে কথা, কার দায় পড়েছে বিবিসির সঙ্গে এই কু-তর্ক করার তখন লোকজন কম্পিউটারে লিখত, নাকি স্লেটে?
বেশ, ওই সব হুজ্জতে গেলাম না। কিন্তু যখনই এই বাক্যটা ব্যবহার করা হয় তখন কোথাও এটা কেন উল্লেখ করা হয় না, এটা বিবিসির জরিপের ফল! তাহলেই তো আর সমস্যা থাকে না।
সৈয়দ শামসুল হকরা যখন এটা বলেন তখন আমরা গা করি না কারণ আমরা জানি তাঁরা এমনটাই বলবেন, কেন বলেন এটাও অবোধ্য না। কিন্তু মাননীয় প্রধান বিচারপতিও যখন এমনটা বলেন তখন আমাদের আর দাঁড়াবার জায়গা থাকে না, আমরা বড়ো অসহায় হয়ে পড়ি...।
সহায়ক লিংক:
১. মোড়ক উম্মোচন: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_18.html
২. বিবিসি: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_6509.html
"ন্যানো ড্রাইভটা ফেলেছি হারিয়ে/ যেটায়—রাখা ছিল ৮০০ কোটি/ ইউনিটের স্মৃতি জড়িয়ে থাকা/ গাদা-গাদা ডিএনএ প্রোফাইল।"
Thursday, August 19, 2010
হাজার বছর ধরে...
Wednesday, August 18, 2010
২০০ স্কয়ার ফিটের স্বপ্ন
ছোট্ট একটা টিনের ঘর। দশ ফিট বাই ২০ ফিট। ২০০ স্কয়ার ফিট। এটা কেবল ২০০ স্কয়ার ফিটের একটা টিনের ঘরই না। আনুমানিক ২৫টা পরিবার, প্রায় ২০০ মানুষের স্বপ্ন।
আমি পূর্বের লেখায় [১] উল্লেখ করেছিলাম, ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান, যারা চোখে দেখতে পান না (অবশ্য এঁদের সন্তানদের অধিকাংশই চোখে দেখতে পায়)। এঁরা দীর্ঘ দিন ধরে যে স্বপ্নটা লালন করছিলেন, একটা ছোট্ট ঘরের জন্য, যেটা দশ ফিট বাই বিশ ফিটের। সেই ঘরটার মাধ্যমে এটার সমাপ্তি হলো। ঘরের কাজ প্রায় শেষ, মাটি দিয়ে মেঝে করা এবং টুকটাক কাজ এঁরা নিজেরাই শেষ করতে পারবেন।
এটা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম কারণ কথা দেয়া হয়ে গিয়েছিল, কাজও শুরু করে দেয়া হয়েছিল কিন্ত এটার জন্য যথেষ্ঠ ফান্ড ছিল না। এ এক বিচিত্র, অন্যদের জন্য আমার প্লাসিবো বিষয়টা ভালই কাজ করে- শেষঅবধি কেমন কেমন করে যেন হয়েই যায়! বা হতে পারে শহীদ কাদরীর কথাই ঠিক:
সহায়ক লিংক:
১. অদেখা এক স্বপ্ন: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_15.html
*আমার দেশ: http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/08/22/40362
আমি পূর্বের লেখায় [১] উল্লেখ করেছিলাম, ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান, যারা চোখে দেখতে পান না (অবশ্য এঁদের সন্তানদের অধিকাংশই চোখে দেখতে পায়)। এঁরা দীর্ঘ দিন ধরে যে স্বপ্নটা লালন করছিলেন, একটা ছোট্ট ঘরের জন্য, যেটা দশ ফিট বাই বিশ ফিটের। সেই ঘরটার মাধ্যমে এটার সমাপ্তি হলো। ঘরের কাজ প্রায় শেষ, মাটি দিয়ে মেঝে করা এবং টুকটাক কাজ এঁরা নিজেরাই শেষ করতে পারবেন।
এটা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম কারণ কথা দেয়া হয়ে গিয়েছিল, কাজও শুরু করে দেয়া হয়েছিল কিন্ত এটার জন্য যথেষ্ঠ ফান্ড ছিল না। এ এক বিচিত্র, অন্যদের জন্য আমার প্লাসিবো বিষয়টা ভালই কাজ করে- শেষঅবধি কেমন কেমন করে যেন হয়েই যায়! বা হতে পারে শহীদ কাদরীর কথাই ঠিক:
"আমার মতো ভীরু সাঁতারু- না জানা লোক
পার হ'লো নদী-
এটাই নিয়তি।
অন্যরকম পরিণামও যে দেখিনি এমন নয়
সাঁতারু জাঁদরেল ক্যাপ্টেন এক
জাহাজ শুদ্ধ ডুবে গেলো
ঊর্ধ্বকাশ থেকে বোয়িং- ৭০৭ অজগ্রাম পুকুরে তলালো।"
(একবার দূর বাল্যকালে/ শহীদ কাদরী)
কাজটা শেষ করতে পারার পেছনের গল্পটা না বললে অন্যায় হয়। সিংহভাগ টাকার যোগান দিয়েছেন জাপান প্রবাসী একজন মানুষ, নাম প্রকাশে যার রয়েছে তীব্র অনীহা। তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
এবং কৃতজ্ঞতা পড়শী ফাউন্ডেশনের প্রতিও। বাকী অর্থের যোগান দিতে গিয়ে এদের নিয়মিত কার্যক্রমের ব্যাঘাত ঘটেছে। এই জন্য দুঃখ প্রকাশ করা ব্যতীত বলার কিছুই নাই।
এবং কৃতজ্ঞতা পড়শী ফাউন্ডেশনের প্রতিও। বাকী অর্থের যোগান দিতে গিয়ে এদের নিয়মিত কার্যক্রমের ব্যাঘাত ঘটেছে। এই জন্য দুঃখ প্রকাশ করা ব্যতীত বলার কিছুই নাই।
সহায়ক লিংক:
১. অদেখা এক স্বপ্ন: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_15.html
*আমার দেশ: http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/08/22/40362
বিভাগ
আমাদের ইশকুল: দুই
Tuesday, August 17, 2010
কনক পুরুষ: ৭
জয়ের ঘুম ভাঙল পাঁচটা দশে। ভোর হয়-হয়। কী অবাক কান্ড, কাকডাকা ভোরে কখনই ওর ঘুম ভাঙে না। ভোর দেখার সৌভাগ্য অল্পই হয়েছে কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়েছে, আহ, বেঁচে থাকা কী আনন্দের!
অবাক হয়ে ভাবল, ও সোফায় কেন; বিছানা কি হয়েছে? বিছানার দিকে তাকিয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল, একটা মেয়ে গুটিসুটি মেয়ে শুয়ে আছে, এ কে! মাথা ঝাঁকিয়ে মনে মনে হাসল, কি বোকা, এ মেয়েটার সঙ্গেই তো কাল বিয়ে হয়েছে। ও কেমন গোল হয়ে শুয়ে আছে। ওর কি শীত করছে? সোফার চাদর উঠিয়ে গায়ে দিতেই ইভা ঘুম-ঘুম চোখে তাকাল। কী টলটলে ওর চোখ!
জয় বিব্রত হয়ে বলল, ‘কিছু না, তোমার শীত করছিল সম্ভবত, চাদর দিলাম।’
ইভা চাদর ভাল করে জড়িয়ে উঠে বসল।
জয় বলল, ‘ঘুম হয়েছে?’
‘হুঁ।’
উঁহুঁ, আমার ধারণা তুমি ভাল ঘুমুতে পারোনি। কি ইভা, এখনও আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না?’
ইভা কিছু বলল না, এমনভাবে হাসল যেন একটা সূর্য হেসে উঠল।
জয় কান পেতে কি যেন শোনার চেষ্টা করছে। গেট খোলার শব্দ হচ্ছে মনে হল। জয় বলল, ‘থ্যাঙ্ক গড, বুড্ডি যাচ্ছে তাহলে।’
ইভা অবাক হয়ে বলল, ‘বুড্ডি কে?’
‘অ, তুমি তো জানো না, আমার দূর সম্পর্কের দাদি। আমি ওনাকে সহ্য করতে পারি না। যতবার দেখা হয় ততবার মনে মনে বলি, বুড্ডি-বুড্ডি-বুড্ডি। বলো তো কি জঘণ্য একটা ব্যাপার, ভাবলেই নিজেকে চড় দিতে ইচ্ছা করে। অথচ জানো, আমার দাদি চান আমি হেসে হেসে ওনার সঙ্গে কথা বলি, গল্প করি। ছোটবেলায় কিন্তু ইনি বাচ্ছাকাচ্চা মানে আমাদের মোটেও পছন্দ করতেন না। মা’র কাছে শুনেছি কোনদিন আমাকে কোলে নেননি। একটু বড় হয়ে দাদির পেছনে ঘুরঘুর করলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতেন। বড় হয়ে সম্ভবত এরই ছাপ পড়েছে আমার মধ্যে।’
ইভা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। মানুষটা কেমন হড়বড় করে একগাদা কথা বলছে। অসম্ভব লজ্জিত হলো, বয়স্ক একটা মানুষ সম্বন্ধে বলা কথাগুলো শুনতে ভাল লাগছে না, অথচ এর কথা কান পেতে শুনতে ইচ্ছা করছে।
জয় সচেতন হয়ে লাজুক গলায় বলল, ‘ছি-ছি, কি অবস্থা বলো তো, বাচালের মত কিসব বলছি। এমনিতে আমি কিন্তু খুব একটা কথা বলি না, আশ্চর্য, তোমার সঙ্গে কেন যে বলছি। তোমাকে বিব্রত করে ফেলেছি, সরি।’
ইভার খুব ইচ্ছা হলো বলে, তুমি বলো শুনতে ইচ্ছা করছে। বলতে পারল না। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ভাবল, আহ, জীবনটা এত জটিল কেন, যা বলতে চাই বলতে পারি না কেন আমরা? আনমনা হয়ে ছিল বলেই বুক থেকে চাদরটা খসে গেছে। পাতলা রেশমের মত শোবার পোষাকটায় চড়াই উৎড়াই ফুটে উঠেছে। জয় চোখে রাজ্যের মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে রইল। কী অসহ্য একটা দৃশ্য, তাকিয়ে থাকলে চোখ ধাঁধিয়ে যায় আবার চোখ ফিরিয়ে নিতেও ইচ্ছা করে না। কী কান্ড, ভেতরে কিছু পরেনি নাকি!
লজ্জার শেষ রইল না যখন দেখল ইভা গলা পর্যন্ত চাদর টেনে হাত আড়াআড়ি করে রেখেছে। জয় বিড়বিড় করে বলল, ‘চা খাওয়া দরকার। ইয়ে, তুমি চা খাবে তো, তোমার জন্যে নিয়ে আসি এককাপ।’ লম্বা লম্বা পা ফেলে এগুতে নিয়ে জয় দরজায় হোঁচট খেলো। চশমা ঠিক করে এগুতে গিয়ে আড়চোখে দেখল ইভা ঘুম-ফোলা মুখে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। কিচেনে উঁকি দিল, মা ডুমো-ডুমো করে আলু কাটছেন।
‘মা, চা হবে নাকি? অসুবিধে হলে থাক।’
জয়ের মা বিরক্ত গলায় বললেন, ‘থাক মানে, কোনদিন তোকে চা করে দেইনি!
এ ছেলেটা কেমন অদ্ভুত হয়েছে! মা’র সঙ্গেও এর বিনয়ের শেষ নেই। সেদিন চড় দিতে ইচ্ছে করছিল। রাতে চোখ লেগে গিয়েছিল, ফ্রিজে তরকারি-টরকারি সব ছিল অথচ ছেলেটা ঠান্ডা কড়কড়ে ভাত শুধু ডাল মেখে খেয়ে ঘুমিয়ে গেল। পরদিন সকালে থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করেছিলেন: কি রে তুই আমাকে ডাকলি না যে।
ডাকব কি, তুমি ঘুমুচ্ছিলে না!
মরে তো যাইনি, ঘুমিয়ে ছিলাম।
ছি, মা!
চুপ, ফাজিল, তাই বলে তুই না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বি!
কি বলছ, খেলাম না!
জয় আবারও বলল, ‘মা, দু’কাপ বানিয়ো।’
জয়ের মা গরম পানিতে চা পাতা ছেড়ে বললেন, ‘বৌমা উঠেছে নাকি রে?’
‘হুঁ , ওর চা-টা বুয়াকে দিয়ে পঠিয়ে দিয়ো।’
‘তুই নিয়ে যা, ও বাথরুম পরিষ্কার করছে।’
‘থাক তাহলে, ওকে দিতে হবে না, কেবল আমার চা-টাই দাও।’
‘কি বলছিস পাগলের মত! এই না বললি বৌমা চা খাবে?’
‘বলেছি নাকি, ভুল বলেছি।’
পেছন থেকে ইভার গলা ভেসে এল, ‘মা, আমার চা-টা আমাকেই দিন।’
জয় বিচিত্র ভঙ্গিতে অতি দ্রুত ওখান থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল ইভার হাসি এবং মার বিস্ময়ভরা চোখ...।
*আগের পর্ব: http://www.ali-mahmed.com/2007/07/blog-post_02.html
*কনক পুরুষ: http://tinyurl.com/29uf4s
অবাক হয়ে ভাবল, ও সোফায় কেন; বিছানা কি হয়েছে? বিছানার দিকে তাকিয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল, একটা মেয়ে গুটিসুটি মেয়ে শুয়ে আছে, এ কে! মাথা ঝাঁকিয়ে মনে মনে হাসল, কি বোকা, এ মেয়েটার সঙ্গেই তো কাল বিয়ে হয়েছে। ও কেমন গোল হয়ে শুয়ে আছে। ওর কি শীত করছে? সোফার চাদর উঠিয়ে গায়ে দিতেই ইভা ঘুম-ঘুম চোখে তাকাল। কী টলটলে ওর চোখ!
জয় বিব্রত হয়ে বলল, ‘কিছু না, তোমার শীত করছিল সম্ভবত, চাদর দিলাম।’
ইভা চাদর ভাল করে জড়িয়ে উঠে বসল।
জয় বলল, ‘ঘুম হয়েছে?’
‘হুঁ।’
উঁহুঁ, আমার ধারণা তুমি ভাল ঘুমুতে পারোনি। কি ইভা, এখনও আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না?’
ইভা কিছু বলল না, এমনভাবে হাসল যেন একটা সূর্য হেসে উঠল।
জয় কান পেতে কি যেন শোনার চেষ্টা করছে। গেট খোলার শব্দ হচ্ছে মনে হল। জয় বলল, ‘থ্যাঙ্ক গড, বুড্ডি যাচ্ছে তাহলে।’
ইভা অবাক হয়ে বলল, ‘বুড্ডি কে?’
‘অ, তুমি তো জানো না, আমার দূর সম্পর্কের দাদি। আমি ওনাকে সহ্য করতে পারি না। যতবার দেখা হয় ততবার মনে মনে বলি, বুড্ডি-বুড্ডি-বুড্ডি। বলো তো কি জঘণ্য একটা ব্যাপার, ভাবলেই নিজেকে চড় দিতে ইচ্ছা করে। অথচ জানো, আমার দাদি চান আমি হেসে হেসে ওনার সঙ্গে কথা বলি, গল্প করি। ছোটবেলায় কিন্তু ইনি বাচ্ছাকাচ্চা মানে আমাদের মোটেও পছন্দ করতেন না। মা’র কাছে শুনেছি কোনদিন আমাকে কোলে নেননি। একটু বড় হয়ে দাদির পেছনে ঘুরঘুর করলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতেন। বড় হয়ে সম্ভবত এরই ছাপ পড়েছে আমার মধ্যে।’
ইভা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। মানুষটা কেমন হড়বড় করে একগাদা কথা বলছে। অসম্ভব লজ্জিত হলো, বয়স্ক একটা মানুষ সম্বন্ধে বলা কথাগুলো শুনতে ভাল লাগছে না, অথচ এর কথা কান পেতে শুনতে ইচ্ছা করছে।
জয় সচেতন হয়ে লাজুক গলায় বলল, ‘ছি-ছি, কি অবস্থা বলো তো, বাচালের মত কিসব বলছি। এমনিতে আমি কিন্তু খুব একটা কথা বলি না, আশ্চর্য, তোমার সঙ্গে কেন যে বলছি। তোমাকে বিব্রত করে ফেলেছি, সরি।’
ইভার খুব ইচ্ছা হলো বলে, তুমি বলো শুনতে ইচ্ছা করছে। বলতে পারল না। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ভাবল, আহ, জীবনটা এত জটিল কেন, যা বলতে চাই বলতে পারি না কেন আমরা? আনমনা হয়ে ছিল বলেই বুক থেকে চাদরটা খসে গেছে। পাতলা রেশমের মত শোবার পোষাকটায় চড়াই উৎড়াই ফুটে উঠেছে। জয় চোখে রাজ্যের মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে রইল। কী অসহ্য একটা দৃশ্য, তাকিয়ে থাকলে চোখ ধাঁধিয়ে যায় আবার চোখ ফিরিয়ে নিতেও ইচ্ছা করে না। কী কান্ড, ভেতরে কিছু পরেনি নাকি!
লজ্জার শেষ রইল না যখন দেখল ইভা গলা পর্যন্ত চাদর টেনে হাত আড়াআড়ি করে রেখেছে। জয় বিড়বিড় করে বলল, ‘চা খাওয়া দরকার। ইয়ে, তুমি চা খাবে তো, তোমার জন্যে নিয়ে আসি এককাপ।’ লম্বা লম্বা পা ফেলে এগুতে নিয়ে জয় দরজায় হোঁচট খেলো। চশমা ঠিক করে এগুতে গিয়ে আড়চোখে দেখল ইভা ঘুম-ফোলা মুখে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। কিচেনে উঁকি দিল, মা ডুমো-ডুমো করে আলু কাটছেন।
‘মা, চা হবে নাকি? অসুবিধে হলে থাক।’
জয়ের মা বিরক্ত গলায় বললেন, ‘থাক মানে, কোনদিন তোকে চা করে দেইনি!
এ ছেলেটা কেমন অদ্ভুত হয়েছে! মা’র সঙ্গেও এর বিনয়ের শেষ নেই। সেদিন চড় দিতে ইচ্ছে করছিল। রাতে চোখ লেগে গিয়েছিল, ফ্রিজে তরকারি-টরকারি সব ছিল অথচ ছেলেটা ঠান্ডা কড়কড়ে ভাত শুধু ডাল মেখে খেয়ে ঘুমিয়ে গেল। পরদিন সকালে থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করেছিলেন: কি রে তুই আমাকে ডাকলি না যে।
ডাকব কি, তুমি ঘুমুচ্ছিলে না!
মরে তো যাইনি, ঘুমিয়ে ছিলাম।
ছি, মা!
চুপ, ফাজিল, তাই বলে তুই না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বি!
কি বলছ, খেলাম না!
জয় আবারও বলল, ‘মা, দু’কাপ বানিয়ো।’
জয়ের মা গরম পানিতে চা পাতা ছেড়ে বললেন, ‘বৌমা উঠেছে নাকি রে?’
‘হুঁ , ওর চা-টা বুয়াকে দিয়ে পঠিয়ে দিয়ো।’
‘তুই নিয়ে যা, ও বাথরুম পরিষ্কার করছে।’
‘থাক তাহলে, ওকে দিতে হবে না, কেবল আমার চা-টাই দাও।’
‘কি বলছিস পাগলের মত! এই না বললি বৌমা চা খাবে?’
‘বলেছি নাকি, ভুল বলেছি।’
পেছন থেকে ইভার গলা ভেসে এল, ‘মা, আমার চা-টা আমাকেই দিন।’
জয় বিচিত্র ভঙ্গিতে অতি দ্রুত ওখান থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল ইভার হাসি এবং মার বিস্ময়ভরা চোখ...।
*আগের পর্ব: http://www.ali-mahmed.com/2007/07/blog-post_02.html
*কনক পুরুষ: http://tinyurl.com/29uf4s
বিভাগ
কনক পুরুষ
Monday, August 16, 2010
ফ্রিডম: ২
আলীম আহমেদ ডা. কবীরের সেই ঘরটায় ফিরে এসেছেন। ডা. কবীর মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে আলীমকে সরাসরি এখানে নিয়ে এসেছেন। ইরা বুকিন এরা একটু আগে গেল। কবীর তার সন্তানদের সঙ্গে আলীম আহমেদকে বেশ কিছুক্ষণ একা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ইরার সঙ্গে কথা হয়েছে কম। ও কেঁদে না ফেলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলেছিল, তুমি বেশ শুকিয়ে গেছ!
আলীম লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন: বড় কষ্ট। বলেই ভুলটা বুঝতে পারলেন।
ইরা ঝরঝর করে বাচ্চার মত কেঁদে ফেলল। বুকিনও মাকে ভয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল, মামাইন্যা, মামাইন্যা...।
আলীম আহমেদের অসহ্য লাগছিল যখন বুকিন চোখ বড় বড় করে বলল, বাবাইন্যা, বাসায় যাবা না।
এদের বিদায় করে ছোট একটা কটে চুপ করে শুয়ে রইলেন। কবীর অবশ্য নিষেধ করে রেখেছে খুব বেশীক্ষণ মন খারাপ করে না থাকতে। বললেই হলো! এই মুহুর্তে কিছু একটা করা খুব জরুরী। আচ্ছা, কবীরের এই ঘরটা নিমিষেই এলোমেলো করে দিলে কেমন হয়? এই যেমন ধরা যাক, বাঁশের চেয়ারগুলো উল্টিয়ে দিলেন। ১৪ ইঞ্চি যে টিভিটা যেটার উপর রাখা আছে- আচ্ছা, গ্রামে এটাকে কি বলে, ছিয়া-ছেকেট, চাল গুড়ি করে যেটা দিয়ে? ওইটাই উল্টিয়ে টিভিটা রাখা আছে। এখন টিভিটা নীচে নামিয়ে টিভির ওপরে এই জিনিসটা রেখে দিলে? কবীর হাঁ হয়ে থাকবে। নাকি ক্ষেপে চিংড়ি মাছের মত লাফাতে থাকবে!
এ ঘরটায় একটা হাসিমুখ শিশুর ছবি আছে, ক্যাপশন দেয়া- কি যেন লেখা ছোট ছোট অক্ষরে পড়া যাচ্ছে না। আচ্ছা, ওটা বদলে একটা কাগজে এটা লিখে লাগিয়ে দিলে কেমন হয়: “বাবা মার আনন্দের ফসল নিরানন্দ অসফল আমি”। উহুঁ, বাক্যটা একটা শিশুর ছবির সঙ্গে ঠিক মিশ খাচ্ছে না! এটা লিখলে কেমন হয়: “বৌন অভ মাই বৌন, ফ্লেস অভ মাই ফ্লেস”।
আলীম শোয়া থেকে উঠে বসলেন। পাশের টেবিলেই কাগজ কলম, একসময় লিখতে না পারলে পাগল-পাগল লাগত। অনেকক্ষণ কাগজে আঁকিবুঁকি আঁকলেন, একটা লাইনও লিখতে পারলেন না। কী কষ্ট- এই কষ্টটা কেউ বুঝবে না, একজন লেখকের লিখতে না পারার কষ্টটা! এক সময় তিনি অপার বিস্ময়ে লক্ষ করলেন, কাগজে তিনি অসংখ্যবার লিখেছেন মুক্তি...মুক্তি...! কাগজটা দলামুচড়া করে বীনে ফেলে দিলেন।
শখের বশে একসময় পেন্সিল স্কেচ করতেন। ভয়ংকর একটা ভূত আঁকলে কেমন হয়, যেটা দেখামাত্র গা ছমছম করবে। তিনি গভীর আনন্দে আঁকা শুরু করলেন। কতক্ষণ কেটে গেছে কে জানে! ভূতটাকে দেখে বিষণ্ন হাসি হাসলেন। ভূতটার সঙ্গে ডা. কবীরের অনেক মিল! আশ্চর্য, তার চিন্তার গন্ডিটা কত ছোট হয়ে এসেছে! ভূত আঁকলেন তাও ডা. কবীর ভূত! ধুর, কাগজ কলম ফেলে উঠে দাঁড়ালেন।
ক্ষিধে লেগেছে। কলবেল চাপতে ইচ্ছা করছে না। কবীর যে ছেলেটিকে রেখেছেন কিছু প্রয়োজন হলে বললেই এনে দেয়, খাবার-টাবার ওই দিয়ে যায়। এ মূহুর্তে ওকে ডাকতে ইচ্ছে করছে না। ফ্রীজটা খুলে অবাক হলেন না। কবীরের ফ্রিজ সম্ভবত এমনই হওয়া উচিত। একদম ঠাসা। এ মূহুর্তে কেউ যদি একটা আলুও রাখতে যায় আঁটবে না।
ফ্রিজের দরজায় লাগানো স্টিকারটা পড়লেন, "Relish Food: It will stay in your mouth for a few minutes, In your stomach for a few hours and in your hip for the rest of your life".
হা পরম করুণাময়! ভাল লাগার সঙ্গে সঙ্গে একটা ধাক্কাও খেলেন। ফ্রীজের উপরে ছোট্ট একটা কাঁচের বয়াম। বাদাম ভর্তি, চিনা বাদামগুলোর খোসা ছাড়ানো।
আলীম এ জন্য ইরার কম খোঁচা খাননি। মা আলীমের জন্য ঠিক এমনই করে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে বয়াম ভর্তি করে রাখতেন। আলীমের বাদাম খাওয়ার ঠিক-ঠিকানা ছিল না। বই পড়ছেন, ভাত খাচ্ছেন, বাদাম খাচ্ছেন- কখনও ভাতের সঙ্গেও খেতেন।
ইরা রাগে চিড়বিড় করত: তোমার মত 'বাদাম-ভাত' কাউকে খেতে দেখিনি। আর এসব কি, খাওয়ার সময় বই পড়া! প্রায়ই দেখি তুমি বুঝতেই পার না কোন তরকারী দিয়ে ভাত খেলে। তুমি কি বলতে পারবে কাল কি দিয়ে ভাত খেয়েছ?
আলীম আহমেদের মনে পড়ত না, মুখ কাঁচুমাচু করে বলতেন: যাহ, জানব না কেন, সব্জী ছিল ইয়ের...।
ইরা চোখে আগুন নিয়ে বলত: ফাজলামো কর! এক সপ্তাহের ভেতর সব্জী খেয়েছ, তুমি সব্জী খাও?
আলীম আহমেদ বিপন্নবোধ করতেন: কি করব বলো, বদভ্যাস, খাওয়ার সময় না-পড়লে ঠিক স্বস্তি পাই না।
ডা. কবীর ইরার কাছ থেকে জেনে ঠিক-ঠিক মনে রেখেছেন। আলীম আহমেদ মন খারাপ করা নিঃশ্বাস ফেললেন, কবীরের মতো হতে পারলে বেশ হতো। কে জানে, এঁরও হয়তো কিছু অন্ধকার দিক আছে। সবাই তো আমরা এক পেট আবর্জনা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। বেশ কিছুটা প্রকৃতি ঢেকে রাখে, খানিকটা মানুষ।
ডা. কবীর আলীম আহমেদকে কিছু মুভি দেখার জন্য জোর অনুরোধ করেছেন। কেন কে জানে! নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। কবীর শুধু শুধু কোন কাজ করবেন না। কিন্তু তাঁর চিকিৎসার সঙ্গে মুভি দেখার কি সম্পর্ক? কবীর মুভিগুলো আলাদা করে দিয়ে গেছে। আলীম নেড়েচেড়ে দেখছেন। মেল গিবসনের ‘ব্রেভ হার্ট’, রাসেল ক্রোর ‘গ্লাডিয়েটর’, স্টিভ ডাসটিনের ‘প্যাপিলন’, ইংরেজীতে ডাব করা বিদেশী ভাষায় একটা মুভি ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’, তামিল একটা মুভি- হিন্দিতে ডাব করা ‘টেররিষ্ট’। আলীম প্রথমেই ব্রেভ হার্ট বেছে নিলেন। হেলাফেলা ভঙ্গিতে দেখা শুরু করলেন। অল্পক্ষণেই জমে গেলেন। নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছেন। তাঁর ভাবনার জগতে মস্ত একটা উলটপালট হয়ে গেছে।
সহায়ক লিংক:
১. ফ্রিডম, ১: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_14.html
আলীম লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন: বড় কষ্ট। বলেই ভুলটা বুঝতে পারলেন।
ইরা ঝরঝর করে বাচ্চার মত কেঁদে ফেলল। বুকিনও মাকে ভয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল, মামাইন্যা, মামাইন্যা...।
আলীম আহমেদের অসহ্য লাগছিল যখন বুকিন চোখ বড় বড় করে বলল, বাবাইন্যা, বাসায় যাবা না।
এদের বিদায় করে ছোট একটা কটে চুপ করে শুয়ে রইলেন। কবীর অবশ্য নিষেধ করে রেখেছে খুব বেশীক্ষণ মন খারাপ করে না থাকতে। বললেই হলো! এই মুহুর্তে কিছু একটা করা খুব জরুরী। আচ্ছা, কবীরের এই ঘরটা নিমিষেই এলোমেলো করে দিলে কেমন হয়? এই যেমন ধরা যাক, বাঁশের চেয়ারগুলো উল্টিয়ে দিলেন। ১৪ ইঞ্চি যে টিভিটা যেটার উপর রাখা আছে- আচ্ছা, গ্রামে এটাকে কি বলে, ছিয়া-ছেকেট, চাল গুড়ি করে যেটা দিয়ে? ওইটাই উল্টিয়ে টিভিটা রাখা আছে। এখন টিভিটা নীচে নামিয়ে টিভির ওপরে এই জিনিসটা রেখে দিলে? কবীর হাঁ হয়ে থাকবে। নাকি ক্ষেপে চিংড়ি মাছের মত লাফাতে থাকবে!
এ ঘরটায় একটা হাসিমুখ শিশুর ছবি আছে, ক্যাপশন দেয়া- কি যেন লেখা ছোট ছোট অক্ষরে পড়া যাচ্ছে না। আচ্ছা, ওটা বদলে একটা কাগজে এটা লিখে লাগিয়ে দিলে কেমন হয়: “বাবা মার আনন্দের ফসল নিরানন্দ অসফল আমি”। উহুঁ, বাক্যটা একটা শিশুর ছবির সঙ্গে ঠিক মিশ খাচ্ছে না! এটা লিখলে কেমন হয়: “বৌন অভ মাই বৌন, ফ্লেস অভ মাই ফ্লেস”।
আলীম শোয়া থেকে উঠে বসলেন। পাশের টেবিলেই কাগজ কলম, একসময় লিখতে না পারলে পাগল-পাগল লাগত। অনেকক্ষণ কাগজে আঁকিবুঁকি আঁকলেন, একটা লাইনও লিখতে পারলেন না। কী কষ্ট- এই কষ্টটা কেউ বুঝবে না, একজন লেখকের লিখতে না পারার কষ্টটা! এক সময় তিনি অপার বিস্ময়ে লক্ষ করলেন, কাগজে তিনি অসংখ্যবার লিখেছেন মুক্তি...মুক্তি...! কাগজটা দলামুচড়া করে বীনে ফেলে দিলেন।
শখের বশে একসময় পেন্সিল স্কেচ করতেন। ভয়ংকর একটা ভূত আঁকলে কেমন হয়, যেটা দেখামাত্র গা ছমছম করবে। তিনি গভীর আনন্দে আঁকা শুরু করলেন। কতক্ষণ কেটে গেছে কে জানে! ভূতটাকে দেখে বিষণ্ন হাসি হাসলেন। ভূতটার সঙ্গে ডা. কবীরের অনেক মিল! আশ্চর্য, তার চিন্তার গন্ডিটা কত ছোট হয়ে এসেছে! ভূত আঁকলেন তাও ডা. কবীর ভূত! ধুর, কাগজ কলম ফেলে উঠে দাঁড়ালেন।
ক্ষিধে লেগেছে। কলবেল চাপতে ইচ্ছা করছে না। কবীর যে ছেলেটিকে রেখেছেন কিছু প্রয়োজন হলে বললেই এনে দেয়, খাবার-টাবার ওই দিয়ে যায়। এ মূহুর্তে ওকে ডাকতে ইচ্ছে করছে না। ফ্রীজটা খুলে অবাক হলেন না। কবীরের ফ্রিজ সম্ভবত এমনই হওয়া উচিত। একদম ঠাসা। এ মূহুর্তে কেউ যদি একটা আলুও রাখতে যায় আঁটবে না।
ফ্রিজের দরজায় লাগানো স্টিকারটা পড়লেন, "Relish Food: It will stay in your mouth for a few minutes, In your stomach for a few hours and in your hip for the rest of your life".
হা পরম করুণাময়! ভাল লাগার সঙ্গে সঙ্গে একটা ধাক্কাও খেলেন। ফ্রীজের উপরে ছোট্ট একটা কাঁচের বয়াম। বাদাম ভর্তি, চিনা বাদামগুলোর খোসা ছাড়ানো।
আলীম এ জন্য ইরার কম খোঁচা খাননি। মা আলীমের জন্য ঠিক এমনই করে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে বয়াম ভর্তি করে রাখতেন। আলীমের বাদাম খাওয়ার ঠিক-ঠিকানা ছিল না। বই পড়ছেন, ভাত খাচ্ছেন, বাদাম খাচ্ছেন- কখনও ভাতের সঙ্গেও খেতেন।
ইরা রাগে চিড়বিড় করত: তোমার মত 'বাদাম-ভাত' কাউকে খেতে দেখিনি। আর এসব কি, খাওয়ার সময় বই পড়া! প্রায়ই দেখি তুমি বুঝতেই পার না কোন তরকারী দিয়ে ভাত খেলে। তুমি কি বলতে পারবে কাল কি দিয়ে ভাত খেয়েছ?
আলীম আহমেদের মনে পড়ত না, মুখ কাঁচুমাচু করে বলতেন: যাহ, জানব না কেন, সব্জী ছিল ইয়ের...।
ইরা চোখে আগুন নিয়ে বলত: ফাজলামো কর! এক সপ্তাহের ভেতর সব্জী খেয়েছ, তুমি সব্জী খাও?
আলীম আহমেদ বিপন্নবোধ করতেন: কি করব বলো, বদভ্যাস, খাওয়ার সময় না-পড়লে ঠিক স্বস্তি পাই না।
ডা. কবীর ইরার কাছ থেকে জেনে ঠিক-ঠিক মনে রেখেছেন। আলীম আহমেদ মন খারাপ করা নিঃশ্বাস ফেললেন, কবীরের মতো হতে পারলে বেশ হতো। কে জানে, এঁরও হয়তো কিছু অন্ধকার দিক আছে। সবাই তো আমরা এক পেট আবর্জনা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। বেশ কিছুটা প্রকৃতি ঢেকে রাখে, খানিকটা মানুষ।
ডা. কবীর আলীম আহমেদকে কিছু মুভি দেখার জন্য জোর অনুরোধ করেছেন। কেন কে জানে! নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। কবীর শুধু শুধু কোন কাজ করবেন না। কিন্তু তাঁর চিকিৎসার সঙ্গে মুভি দেখার কি সম্পর্ক? কবীর মুভিগুলো আলাদা করে দিয়ে গেছে। আলীম নেড়েচেড়ে দেখছেন। মেল গিবসনের ‘ব্রেভ হার্ট’, রাসেল ক্রোর ‘গ্লাডিয়েটর’, স্টিভ ডাসটিনের ‘প্যাপিলন’, ইংরেজীতে ডাব করা বিদেশী ভাষায় একটা মুভি ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’, তামিল একটা মুভি- হিন্দিতে ডাব করা ‘টেররিষ্ট’। আলীম প্রথমেই ব্রেভ হার্ট বেছে নিলেন। হেলাফেলা ভঙ্গিতে দেখা শুরু করলেন। অল্পক্ষণেই জমে গেলেন। নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছেন। তাঁর ভাবনার জগতে মস্ত একটা উলটপালট হয়ে গেছে।
সহায়ক লিংক:
১. ফ্রিডম, ১: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_14.html
বিভাগ
ফ্রিডম
Sunday, August 15, 2010
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি: ২
একটা লেখা লিখেছিলাম, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। লেখাটার মূল বক্তব্য ছিল, এই দেশটার মত বিচিত্র দেশ আর কোথাও নাই। দুনিয়ার যতসব আজব কাজগুলো না করে আমরা আরাম পাই না রমজানে, সংযমের নমুনা হিসাবে আমরা শুরু করে দেই সৃষ্টিছাড়া সমস্ত কাজ, সীমাহীন অন্যায় [১]।
সত্যিই এ বড়ো বিচিত্র দেশ। ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়া ঘটা করে পালন করেন নিজের জন্মদিন! এটা বলার অপেক্ষা রাখে না তাঁর জন্মদিন এই দিনে না। এটা প্রমাণ করা কঠিন কোন কাজ না। তবুও তিনি পালন করছেন সাড়ম্বরে। কেন? ১৫ আগস্ট প্রয়াত একজন রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর পরিবারের লোকজনের মৃত্যুদিবস বলে? এঁদের প্রতি তাঁর ঘৃণা থেকে? একজনের প্রতি ঘৃণা-অবজ্ঞা-তাচ্ছিল্য থাকলেই কি এমন একজন নেতা যিনি এই দেশটা চালাবার দুই চালকের একজন, তিনি এমন অমানবিক কাজ করতে পারেন! আমি শিউরে উঠি, চোখ বন্ধ করে ফেলি।
আমার কাছে ছবিটা স্রেফ অশ্লীল মনে হচ্ছে। কে বলেছে, নগ্ন দেহই কেবল অশ্লীল?
একজন নেতার পক্ষে কেমন করে এটা সম্ভব? আমরা আবার ঘটা করে এই মানুষটাকে মাথায় তুলে রাখি, তাঁর জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেই!
আমি মনে করি, এই অভব্যতার সমাপ্তি হওয়া প্রয়োজন। খালেদা জিয়া প্রমাণ করুন, তাঁর জন্মদিন ১৫ আগস্ট। প্রয়োজনে এটার জন্য হাইকোর্টের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। কুমিরের ছানার মত বছরের পর বছর ধরে একই কু-দৃশ্য দেখতে ভাল লাগে না। একজন পাঠক চমৎকার একটা কথা বলেছেন, খালেদা জিয়া তাঁর ছেলে, নাতিপুতির জন্মদিন পালন না করে নিজেরটা নিয়ে অস্থির হয়ে থাকেন। ( Faysal said, "...নিজের ছেলে ও নাতি নাতনিদের জন্মদিন নিয়েও যিনি ও যার দল আগ্রহ দেখান না...")।
আসলেই তো! আমাদের দেশে ৬৬ বছরের একজন ভদ্রমহিলা ঘটা করে, ৬৬ পাউন্ডের ৪টা কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেন। এটা আবার আমাদের মিডিয়া ফলাও করে ছাপায়ও!
পাশাপাশি যে খেলা শুরু হয় তা দেখে হাঁ হয়ে থাকি। কেমন করে বিশ্বাস করা যায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এই সব কথা বলতে পারেন?
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বক্তব্য এগুলো! এইচ টি ইমাম বলছেন, "...এই ইসলামের প্রবর্তক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান..."।
এঁরা কেন এই সব কথা বলেন, এঁরা কি কখনও বুঝতে চেষ্টা করেছেন এই দেশের লোকজনের কাছে এমন বক্তব্যের গ্রহনযোগ্যতা কতটুকু?
আমার এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, একজন দায়িত্বশীল শিক্ষিত মানুষ এমনটা বলতে পারেন!
এই বেচারাকে দোষ দিয়ে লাভ কী! একজন মানুষকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় এর নমুনা হচ্ছে, প্রথম আলো (১৫ আগস্ট ২০১০)। ভাল-ভাল! তা মশিহুর রহমান [২] নামের এই সব মানুষদের কি সাগরে ফেলে দিতে হবে?
ভাল কথা, ১৫ আগস্ট ছুটি না রাখলে কী এমন ক্ষতি হতো? শুক্র-শনি বন্ধ, এর সঙ্গে যোগ হলো আজ রবিবার। অন্তত রবিবারের পূর্বে দুই দিন ছুটি এটা বিবেচনা করে আজ ছুটিটা বাতিল করার ভাবনা এলে এটা হতো অসাধারণ একটা উদাহরণ। এই দেশের জন্য হয়ে থাকত একটা সু-উদাহরণ।এই দলের মুকুটে যোগ হতো আরেকটি পালক।
আরেকটা বিষয় আমার মাথায় আসে না সেটা হচ্ছে, 'হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি' এই বিষয়টা বিবিসির মাথায় এলো কেমন করে? এ এক বিস্ময়, এ এক 'কাংগা'। কাংগার অর্থ আমি জানি না, ভাষা খুঁজে না-পাওয়ার জন্য এই দশা, খেই হারিয়ে ফেলেছি।
যে কারও, 'দশকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি' এটা নিয়েই তো হিমশিম খাওয়ার কথা, 'শত বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি' এটা ভাবাটাও দুঃসাহস; সেখানে হাজার বছর...? আমাদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়!
বিবিসি, সাহেব-মিডিয়া বলে কথা! এরা চুরি-চামারি করলেও সেটা হয় মিসটেক, তাও আজ পর্যন্ত এরা কোথাও ভুল স্বীকার করেছে বলে তো শুনিনি...। মুসা ইব্রাহিমের সাক্ষাৎকার নিয়ে কী খেলাটাই না এরা খেলল [৩] । বলিহারি বটে, কত বুদ্ধি ঘটে!
হালে জনাব শাহনূর নামের একজন বিবিসির বিরুদ্ধে কঠিন একটা অভিযোগ এনেছেন, সূত্র উল্লেখ না-করে ছবির ব্যবহার করা, প্রকারান্তরে যা চুরিরই নামান্তর। বিবিসির সাইটে গিয়ে আমি দেখেছি পরে এরা সংশোধন করেছেন।
অন্য একজন পাঠকের কঠিন একটা প্রশ্ন ছিল, "Agni ( হবে apni) ki bolte chan tini ki hajar bosorer sresto bangale na?"
বিশ্বাস করব না কেন, করি! বিবিসি নামের একটা মিডিয়া একটা জরিপ করেছিল, সেই জরিপের ফসল এটা। যদিও বিবিসির এই উদ্ভটসম জরিপের বিষয়বস্তু আমার বোধগম্য হয় না যেটা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। দশক না, শতক না, এক ধাক্কায় হাজার বছর। বেশ, মেনে নিলাম কিন্তু কখনও এই প্রসঙ্গ আসলে অবশ্যই এটা উল্লেখ করতে হবে, বিবিসির জরিপমতে, হাজার বছরের...।
সৈয়দ শামসুল হকের মত মানুষ যখন আলাদা ভাব ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন, 'হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি' তখন কেবল বলার থাকে, মাছের পচন শুরু হয় তার মাথা থেকে, মানুষের...।
*ছবি, সৌজন্যে: প্রথম আলো, গুগল , সচলায়তন
সহায়ক লিংক:
১. এমন দেশটি কোথাও খুঁজে, ১: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_30.html
২. মশিহুর রহমান: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_06.html
৩. বিবিসি: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_27.html
সত্যিই এ বড়ো বিচিত্র দেশ। ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়া ঘটা করে পালন করেন নিজের জন্মদিন! এটা বলার অপেক্ষা রাখে না তাঁর জন্মদিন এই দিনে না। এটা প্রমাণ করা কঠিন কোন কাজ না। তবুও তিনি পালন করছেন সাড়ম্বরে। কেন? ১৫ আগস্ট প্রয়াত একজন রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর পরিবারের লোকজনের মৃত্যুদিবস বলে? এঁদের প্রতি তাঁর ঘৃণা থেকে? একজনের প্রতি ঘৃণা-অবজ্ঞা-তাচ্ছিল্য থাকলেই কি এমন একজন নেতা যিনি এই দেশটা চালাবার দুই চালকের একজন, তিনি এমন অমানবিক কাজ করতে পারেন! আমি শিউরে উঠি, চোখ বন্ধ করে ফেলি।
আমার কাছে ছবিটা স্রেফ অশ্লীল মনে হচ্ছে। কে বলেছে, নগ্ন দেহই কেবল অশ্লীল?
একজন নেতার পক্ষে কেমন করে এটা সম্ভব? আমরা আবার ঘটা করে এই মানুষটাকে মাথায় তুলে রাখি, তাঁর জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেই!
আমি মনে করি, এই অভব্যতার সমাপ্তি হওয়া প্রয়োজন। খালেদা জিয়া প্রমাণ করুন, তাঁর জন্মদিন ১৫ আগস্ট। প্রয়োজনে এটার জন্য হাইকোর্টের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। কুমিরের ছানার মত বছরের পর বছর ধরে একই কু-দৃশ্য দেখতে ভাল লাগে না। একজন পাঠক চমৎকার একটা কথা বলেছেন, খালেদা জিয়া তাঁর ছেলে, নাতিপুতির জন্মদিন পালন না করে নিজেরটা নিয়ে অস্থির হয়ে থাকেন। ( Faysal said, "...নিজের ছেলে ও নাতি নাতনিদের জন্মদিন নিয়েও যিনি ও যার দল আগ্রহ দেখান না...")।
আসলেই তো! আমাদের দেশে ৬৬ বছরের একজন ভদ্রমহিলা ঘটা করে, ৬৬ পাউন্ডের ৪টা কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেন। এটা আবার আমাদের মিডিয়া ফলাও করে ছাপায়ও!
পাশাপাশি যে খেলা শুরু হয় তা দেখে হাঁ হয়ে থাকি। কেমন করে বিশ্বাস করা যায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এই সব কথা বলতে পারেন?
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বক্তব্য এগুলো! এইচ টি ইমাম বলছেন, "...এই ইসলামের প্রবর্তক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান..."।
এঁরা কেন এই সব কথা বলেন, এঁরা কি কখনও বুঝতে চেষ্টা করেছেন এই দেশের লোকজনের কাছে এমন বক্তব্যের গ্রহনযোগ্যতা কতটুকু?
আমার এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, একজন দায়িত্বশীল শিক্ষিত মানুষ এমনটা বলতে পারেন!
এই বেচারাকে দোষ দিয়ে লাভ কী! একজন মানুষকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় এর নমুনা হচ্ছে, প্রথম আলো (১৫ আগস্ট ২০১০)। ভাল-ভাল! তা মশিহুর রহমান [২] নামের এই সব মানুষদের কি সাগরে ফেলে দিতে হবে?
ভাল কথা, ১৫ আগস্ট ছুটি না রাখলে কী এমন ক্ষতি হতো? শুক্র-শনি বন্ধ, এর সঙ্গে যোগ হলো আজ রবিবার। অন্তত রবিবারের পূর্বে দুই দিন ছুটি এটা বিবেচনা করে আজ ছুটিটা বাতিল করার ভাবনা এলে এটা হতো অসাধারণ একটা উদাহরণ। এই দেশের জন্য হয়ে থাকত একটা সু-উদাহরণ।এই দলের মুকুটে যোগ হতো আরেকটি পালক।
আরেকটা বিষয় আমার মাথায় আসে না সেটা হচ্ছে, 'হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি' এই বিষয়টা বিবিসির মাথায় এলো কেমন করে? এ এক বিস্ময়, এ এক 'কাংগা'। কাংগার অর্থ আমি জানি না, ভাষা খুঁজে না-পাওয়ার জন্য এই দশা, খেই হারিয়ে ফেলেছি।
যে কারও, 'দশকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি' এটা নিয়েই তো হিমশিম খাওয়ার কথা, 'শত বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি' এটা ভাবাটাও দুঃসাহস; সেখানে হাজার বছর...? আমাদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়!বিবিসি, সাহেব-মিডিয়া বলে কথা! এরা চুরি-চামারি করলেও সেটা হয় মিসটেক, তাও আজ পর্যন্ত এরা কোথাও ভুল স্বীকার করেছে বলে তো শুনিনি...। মুসা ইব্রাহিমের সাক্ষাৎকার নিয়ে কী খেলাটাই না এরা খেলল [৩] । বলিহারি বটে, কত বুদ্ধি ঘটে!
হালে জনাব শাহনূর নামের একজন বিবিসির বিরুদ্ধে কঠিন একটা অভিযোগ এনেছেন, সূত্র উল্লেখ না-করে ছবির ব্যবহার করা, প্রকারান্তরে যা চুরিরই নামান্তর। বিবিসির সাইটে গিয়ে আমি দেখেছি পরে এরা সংশোধন করেছেন।
অন্য একজন পাঠকের কঠিন একটা প্রশ্ন ছিল, "Agni ( হবে apni) ki bolte chan tini ki hajar bosorer sresto bangale na?"
বিশ্বাস করব না কেন, করি! বিবিসি নামের একটা মিডিয়া একটা জরিপ করেছিল, সেই জরিপের ফসল এটা। যদিও বিবিসির এই উদ্ভটসম জরিপের বিষয়বস্তু আমার বোধগম্য হয় না যেটা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। দশক না, শতক না, এক ধাক্কায় হাজার বছর। বেশ, মেনে নিলাম কিন্তু কখনও এই প্রসঙ্গ আসলে অবশ্যই এটা উল্লেখ করতে হবে, বিবিসির জরিপমতে, হাজার বছরের...।
সৈয়দ শামসুল হকের মত মানুষ যখন আলাদা ভাব ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন, 'হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি' তখন কেবল বলার থাকে, মাছের পচন শুরু হয় তার মাথা থেকে, মানুষের...।
*ছবি, সৌজন্যে: প্রথম আলো, গুগল , সচলায়তন
সহায়ক লিংক:
১. এমন দেশটি কোথাও খুঁজে, ১: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_30.html
২. মশিহুর রহমান: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_06.html
৩. বিবিসি: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_27.html
অদেখা এক স্বপ্ন
যাতায়তে সমস্যা তবুও ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের স্কুলে সুযোগ পেলেই আমি চলে যাই। এটার প্রতি আমার আলাদা বাড়তি টান আছে কারণটা পূর্বেও বলেছিলাম, এখানকার বাচ্চারা অল্প সময়ে আমাকে যথেষ্ঠ বিভ্রান্ত করছে। দাবা একটা কঠিন খেলা, আমি নিজেও ভাল পারি না। স্কুলের বাচ্চাদের জন্য ফুটবল, লুডু, লাফাবার দড়ির সঙ্গে একটা দাবা কিনে দেয়া হয়েছিল, দাবাটা এখানকার দু-চারজন ভালই রপ্ত করে ফেলেছে, হাতি-ঘোড়া-মন্ত্রী-রাজা নিয়ে মারামারি করে।
এখানকার বয়স্ক মানুষদের আমি এড়িয়ে চলি, ঘটনাটা খানিকটা অন্য রকম। এখানকার লোকজনের একটা অদেখা স্বপ্ন আছে; সেটা হচ্ছে, একটা মসজিদ। এখানে আশেপাশে কোন মসজিদ নেই, চোখে দেখতে না-পাওয়ার কারণে দূরের মসজিদে যাওয়াটা এঁদের জন্য বড়ো কঠিন।
বেশ ক-বার একটা মসজিদের ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা আমাকে বলার পর আমি চেষ্টাকৃত খানিকটা কঠিন করে বলেছিলাম, আমার পক্ষে এটা সম্ভব না।
এমন না মসজিদ করার বিষয়ে আমার কোন অনীহা আছে। আমি নিজে কতটুকু ধর্মীয় আচার পালন করি, কি করি না এই নিয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করতে আগ্রহ বোধ করি না। কিন্তু কারও ধর্ম-বিশ্বাসের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অটুট। তাঁদের বিশ্বাস কোনটা ঠিক-বেঠিক এই নিয়েও আমার মাথা ঘামাবার প্রয়োজনও দেখি না।
একটা মসজিদ ভেঙ্গে ফেললে আমি যে কাতরতা অনুভব করি তেমনই আদিমানুষদের কোন প্রার্থনাস্থল ভেঙ্গে ফেললেও [১]।
এই গ্রহে এটা একটা জঘণ্য অপরাধ, প্রার্থনা করার সময় কাউকে মেরে ফেলা। কারণ তখন সেই মানুষটা মনে-প্রাণে-শরীরে সমর্পিত অবস্থায় থাকেন, তাঁর মধ্যে একটা পিপড়াকেও প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকে না। তখন কাউকে মেরে ফেলার মত কাপুরুষতা আর নাই! যে পাকিস্তানী আর্মি প্রার্থরনারত [২] দানবীর নতুনচন্দ্রকে মেরে ফেলেছিল আমি যেমন ওই পাকিস্তানি আর্মিদের শাস্তি মৃত্যু চাইব তেমনি যে দানব পাকিস্তানি মসজিদে বোমা মেরে শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে, তাকেও। এবং আমি সেই দানবদেরও তাচ্ছিল্য করব যারা এই অন্যায়ে উল্লসিত হয় [৩]।
বিশ্বাস। কারও বিশ্বাসটাকে আমি প্রচন্ড গুরুত্ব দেই কারণ আমি মনে করি, বিশ্বাস বিষয়টার শক্তি অসাধারণ, দানবীয়। আমি কোন একটা লেখায় লিখেছিলাম, প্লাসিবো এবং নসিবোর কথা [৪]। প্লাসিবোটা আসে তীব্র বিশ্বাস থেকে, অদেখা স্রষ্টার কাছে একজন যখন তাঁর শরীর-মন-ভাবনা শিথিল করে বারবার একটাই জিনিস চাইছে তখন ওই মানুষটার সমগ্র সত্ত্বা প্রস্তুত হচ্ছে জিনিসটা পাওয়ার জন্য। হতে পারে এটা জটিল কোন রোগ। ফলশ্রুতিতে উপশম না-হওয়ার কোন কারণ দেখি না।
কোন রোগির যদি ডাক্তারের উপর আস্থা না-থাকে বা সেই রোগি যদি হাল ছেড়ে দেন, এই গ্রহের সমস্ত ডাক্তার গুলে খাইয়ে দিলেও তিনি সেরে উঠবেন এমনটা আমি মনে করি না। আমি এও মনে করি, আমাদের মত দেশগুলোতে অস্ত্রপচার অসফল হওয়ার হার বেশি হওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে ডাক্তাররা রোগির সঙ্গে মানসিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন না, রোগি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগ পর্যন্ত একটার বেশি দুটা কথা জানতে চাইলেই ডাক্তার বাবু ধমকে থামিয়ে দেন, 'আপনে কি ডাক্তার'?
আরে শ্লা, আমরা ডাক্তার হলে তোকে জিজ্ঞেস করতাম কেন? আমরাই তো তোর ঠ্যাং কাটতাম।
বিশ্বাসের খারাপ দিকও আছে। বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে একটা মানুষকে অনায়াসে তৈরি করা যায় একটা 'হিউম্যান বম্ব'-এ। এর একটা উদাহরণ হতে পারে তামিল, এলটিটিই-এর ৭৫ জন নারী যোদ্ধা গ্রেনেড বিস্ফোরন ঘটিয়ে একেক করে নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কী ভয়াবহ, কী দানবীয় এই বিশ্বাসের ক্ষমতা!
যাক সে প্রসঙ্গ। পরে এরা বয়স্কদেরকে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিলেন। এখন বয়স্কদের মুখের উপর ফট করে কঠিন কথা বলা যায় না, তাই আমি এঁদের এড়িয়ে চলতাম। আমি পা টিপে টিপে গেলেও কেমন করে যেন এঁরা টের পেয়ে যেতেন, 'কে যায়-কে যায়'। বাধ্য হয়েই বলতে হতো, আমি। ব্যস, শুরু হয়ে যেত সেই মসজিদের কথা। কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়!
হপ্তাখানেক আগে ওখানে আমাকে বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছিল। ওঁদের ওখানে থাকেন রমজান নামের একজন মানুষ। চোখে দেখতে না-পাওয়া এই মানুষটার প্রতি আমার আলাদা টান আছে, এঁর কারণেই আমি এঁদের খোঁজ পাই এবং অবশেষে স্কুল করা হয় [৬]।
রমজান পায়ে কুড়ালের কোপে আহত, এই ডাক্তারকে [৫] দেখাবার কথা বলে এসেছিলাম কিন্তু রমজান আসেননি।
আজ গিয়ে দেখি এঁর পায়ের অবস্থা ভয়াবহ। আমি ডাক্তার না কিন্তু চোখ বুজে বলে দেয়া যায় এর সঠিক চিকিৎসা না হলে পা-টা কেটে ফেলতে হবে। অথচ মানুষটা হাতুড়ে ডাক্তার দেখিয়ে এরিমধ্যে হাজারখানেক টাকা খরচ করে ফেলেছেন। মেজাজ খারাপ হয় কিন্তু এঁদের উপর রাগ করা বৃথা। এক প্রকার চ্যাংদোলা করে নিয়ে আসতে হয়েছিল এঁকে।
সেদিন বাঁচা গেল না! সবাই মিলে আমাকে কোণঠাসা করে ফেললেন। এঁরা বারবার বলতে থাকেন, মসজিদ এখন আমরা চাই না, আপনি খালি বলেন, হবে। আমি নির্বোধের মত বলি, আচ্ছা হবে। ইয়ে, কত লাগে মসজিদের জন্য একটা ঘর করতে?
এঁরা হিসাব দেন, টিন-বাঁশ দিয়ে দশ ফুট বাই বিশ ফুট একটা ঘর করতে আনুমানিক বিশ হাজার টাকা লাগবে। আমি বলি, আচ্ছা কাজ শুরু করেন কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে সেটা হচ্ছে, আপনারা এখানে নামাজ পড়েন, কোরান পড়েন, জিকির করেন কোন সমস্যা নেই কেবল এক ঘন্টার জন্য বাচ্চারা এখানে পড়বে।
এরা একটা ধাক্কার মত খান। মসজিদ হচ্ছে আল্লার ঘর এখানে বাচ্চারা পড়বে কেমন করে? আমি বলি, দেখেন আগে কিন্তু মসজিদ কেবল নামাজ পড়ার জন্যই ব্যবহৃত হত না, শিক্ষা দেয়ার জন্যও। বোঝাবার পর এঁদের আর আপত্তি থাকে না।
আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু মনখারাপ করা শ্বাস ফেলি, আমার কাছে এখন এই বাড়তি খরচ করার মত টাকা নেই। যারা আমাকে আর্থিক সহায়তা করেন তাঁদের কোন মুখে বলব? কিন্তু তাঁদের কেমন করে বোঝাব, ব্যাটলফিল্ডে থাকা আর নিরাপদ দুরত্বে থাকার মধ্যে অনেক ফারাক। এঁদের সঙ্গে কাজ করতে হয় আমাকে, এঁদের চোখে চোখ রাখতে হয় আমাকে, আপনাদের না।
পরে ভাবছিলাম, আচ্ছা, আহাম্মকের মত এটা কেন বলতে গেলাম, আমি কি আহাম্মক? নাকি এঁদের অদেখা স্বপ্ন এঁরা আমার মধ্যে সঞ্চারিত করতে সফল হয়েছিলেন? হতে পারে। কে বলেছে, যারা চোখে দেখেন না তাঁরা স্বপ্ন দেখতে পারবেন না, কে মাথার দিব্যি দিয়েছে তাঁদের স্বপ্নটা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারবেন না? আমার মত দুর্বল মানুষকে কাবু করা যাবে না...!
*ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_05.html
সহায়ক লিংক:
১. আদিমানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_23.html
২. দানবীর নতুনচন্দ্র: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_4432.html
৩. দেশপ্রেমিক: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_30.html
৪. প্লাসিবো, নসিবো: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_20.html
৫. ডাক্তার: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_06.html
৬. রমজান মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_3014.html
এখানকার বয়স্ক মানুষদের আমি এড়িয়ে চলি, ঘটনাটা খানিকটা অন্য রকম। এখানকার লোকজনের একটা অদেখা স্বপ্ন আছে; সেটা হচ্ছে, একটা মসজিদ। এখানে আশেপাশে কোন মসজিদ নেই, চোখে দেখতে না-পাওয়ার কারণে দূরের মসজিদে যাওয়াটা এঁদের জন্য বড়ো কঠিন।
বেশ ক-বার একটা মসজিদের ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা আমাকে বলার পর আমি চেষ্টাকৃত খানিকটা কঠিন করে বলেছিলাম, আমার পক্ষে এটা সম্ভব না।
এমন না মসজিদ করার বিষয়ে আমার কোন অনীহা আছে। আমি নিজে কতটুকু ধর্মীয় আচার পালন করি, কি করি না এই নিয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করতে আগ্রহ বোধ করি না। কিন্তু কারও ধর্ম-বিশ্বাসের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অটুট। তাঁদের বিশ্বাস কোনটা ঠিক-বেঠিক এই নিয়েও আমার মাথা ঘামাবার প্রয়োজনও দেখি না।
একটা মসজিদ ভেঙ্গে ফেললে আমি যে কাতরতা অনুভব করি তেমনই আদিমানুষদের কোন প্রার্থনাস্থল ভেঙ্গে ফেললেও [১]।
এই গ্রহে এটা একটা জঘণ্য অপরাধ, প্রার্থনা করার সময় কাউকে মেরে ফেলা। কারণ তখন সেই মানুষটা মনে-প্রাণে-শরীরে সমর্পিত অবস্থায় থাকেন, তাঁর মধ্যে একটা পিপড়াকেও প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকে না। তখন কাউকে মেরে ফেলার মত কাপুরুষতা আর নাই! যে পাকিস্তানী আর্মি প্রার্থরনারত [২] দানবীর নতুনচন্দ্রকে মেরে ফেলেছিল আমি যেমন ওই পাকিস্তানি আর্মিদের শাস্তি মৃত্যু চাইব তেমনি যে দানব পাকিস্তানি মসজিদে বোমা মেরে শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে, তাকেও। এবং আমি সেই দানবদেরও তাচ্ছিল্য করব যারা এই অন্যায়ে উল্লসিত হয় [৩]।
বিশ্বাস। কারও বিশ্বাসটাকে আমি প্রচন্ড গুরুত্ব দেই কারণ আমি মনে করি, বিশ্বাস বিষয়টার শক্তি অসাধারণ, দানবীয়। আমি কোন একটা লেখায় লিখেছিলাম, প্লাসিবো এবং নসিবোর কথা [৪]। প্লাসিবোটা আসে তীব্র বিশ্বাস থেকে, অদেখা স্রষ্টার কাছে একজন যখন তাঁর শরীর-মন-ভাবনা শিথিল করে বারবার একটাই জিনিস চাইছে তখন ওই মানুষটার সমগ্র সত্ত্বা প্রস্তুত হচ্ছে জিনিসটা পাওয়ার জন্য। হতে পারে এটা জটিল কোন রোগ। ফলশ্রুতিতে উপশম না-হওয়ার কোন কারণ দেখি না।
কোন রোগির যদি ডাক্তারের উপর আস্থা না-থাকে বা সেই রোগি যদি হাল ছেড়ে দেন, এই গ্রহের সমস্ত ডাক্তার গুলে খাইয়ে দিলেও তিনি সেরে উঠবেন এমনটা আমি মনে করি না। আমি এও মনে করি, আমাদের মত দেশগুলোতে অস্ত্রপচার অসফল হওয়ার হার বেশি হওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে ডাক্তাররা রোগির সঙ্গে মানসিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন না, রোগি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগ পর্যন্ত একটার বেশি দুটা কথা জানতে চাইলেই ডাক্তার বাবু ধমকে থামিয়ে দেন, 'আপনে কি ডাক্তার'?
আরে শ্লা, আমরা ডাক্তার হলে তোকে জিজ্ঞেস করতাম কেন? আমরাই তো তোর ঠ্যাং কাটতাম।
বিশ্বাসের খারাপ দিকও আছে। বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে একটা মানুষকে অনায়াসে তৈরি করা যায় একটা 'হিউম্যান বম্ব'-এ। এর একটা উদাহরণ হতে পারে তামিল, এলটিটিই-এর ৭৫ জন নারী যোদ্ধা গ্রেনেড বিস্ফোরন ঘটিয়ে একেক করে নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কী ভয়াবহ, কী দানবীয় এই বিশ্বাসের ক্ষমতা!
যাক সে প্রসঙ্গ। পরে এরা বয়স্কদেরকে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিলেন। এখন বয়স্কদের মুখের উপর ফট করে কঠিন কথা বলা যায় না, তাই আমি এঁদের এড়িয়ে চলতাম। আমি পা টিপে টিপে গেলেও কেমন করে যেন এঁরা টের পেয়ে যেতেন, 'কে যায়-কে যায়'। বাধ্য হয়েই বলতে হতো, আমি। ব্যস, শুরু হয়ে যেত সেই মসজিদের কথা। কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়!
হপ্তাখানেক আগে ওখানে আমাকে বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছিল। ওঁদের ওখানে থাকেন রমজান নামের একজন মানুষ। চোখে দেখতে না-পাওয়া এই মানুষটার প্রতি আমার আলাদা টান আছে, এঁর কারণেই আমি এঁদের খোঁজ পাই এবং অবশেষে স্কুল করা হয় [৬]।
রমজান পায়ে কুড়ালের কোপে আহত, এই ডাক্তারকে [৫] দেখাবার কথা বলে এসেছিলাম কিন্তু রমজান আসেননি।
আজ গিয়ে দেখি এঁর পায়ের অবস্থা ভয়াবহ। আমি ডাক্তার না কিন্তু চোখ বুজে বলে দেয়া যায় এর সঠিক চিকিৎসা না হলে পা-টা কেটে ফেলতে হবে। অথচ মানুষটা হাতুড়ে ডাক্তার দেখিয়ে এরিমধ্যে হাজারখানেক টাকা খরচ করে ফেলেছেন। মেজাজ খারাপ হয় কিন্তু এঁদের উপর রাগ করা বৃথা। এক প্রকার চ্যাংদোলা করে নিয়ে আসতে হয়েছিল এঁকে।
সেদিন বাঁচা গেল না! সবাই মিলে আমাকে কোণঠাসা করে ফেললেন। এঁরা বারবার বলতে থাকেন, মসজিদ এখন আমরা চাই না, আপনি খালি বলেন, হবে। আমি নির্বোধের মত বলি, আচ্ছা হবে। ইয়ে, কত লাগে মসজিদের জন্য একটা ঘর করতে?
এঁরা হিসাব দেন, টিন-বাঁশ দিয়ে দশ ফুট বাই বিশ ফুট একটা ঘর করতে আনুমানিক বিশ হাজার টাকা লাগবে। আমি বলি, আচ্ছা কাজ শুরু করেন কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে সেটা হচ্ছে, আপনারা এখানে নামাজ পড়েন, কোরান পড়েন, জিকির করেন কোন সমস্যা নেই কেবল এক ঘন্টার জন্য বাচ্চারা এখানে পড়বে।
এরা একটা ধাক্কার মত খান। মসজিদ হচ্ছে আল্লার ঘর এখানে বাচ্চারা পড়বে কেমন করে? আমি বলি, দেখেন আগে কিন্তু মসজিদ কেবল নামাজ পড়ার জন্যই ব্যবহৃত হত না, শিক্ষা দেয়ার জন্যও। বোঝাবার পর এঁদের আর আপত্তি থাকে না।
আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু মনখারাপ করা শ্বাস ফেলি, আমার কাছে এখন এই বাড়তি খরচ করার মত টাকা নেই। যারা আমাকে আর্থিক সহায়তা করেন তাঁদের কোন মুখে বলব? কিন্তু তাঁদের কেমন করে বোঝাব, ব্যাটলফিল্ডে থাকা আর নিরাপদ দুরত্বে থাকার মধ্যে অনেক ফারাক। এঁদের সঙ্গে কাজ করতে হয় আমাকে, এঁদের চোখে চোখ রাখতে হয় আমাকে, আপনাদের না।
পরে ভাবছিলাম, আচ্ছা, আহাম্মকের মত এটা কেন বলতে গেলাম, আমি কি আহাম্মক? নাকি এঁদের অদেখা স্বপ্ন এঁরা আমার মধ্যে সঞ্চারিত করতে সফল হয়েছিলেন? হতে পারে। কে বলেছে, যারা চোখে দেখেন না তাঁরা স্বপ্ন দেখতে পারবেন না, কে মাথার দিব্যি দিয়েছে তাঁদের স্বপ্নটা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারবেন না? আমার মত দুর্বল মানুষকে কাবু করা যাবে না...!
*ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_05.html
সহায়ক লিংক:
১. আদিমানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_23.html
২. দানবীর নতুনচন্দ্র: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_4432.html
৩. দেশপ্রেমিক: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_30.html
৪. প্লাসিবো, নসিবো: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_20.html
৫. ডাক্তার: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_06.html
৬. রমজান মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_3014.html
বিভাগ
আমাদের ইশকুল: দুই
Saturday, August 14, 2010
ফ্রিডম: ১
আলীম আহমেদ কার্যত বন্দী জীবন-যাপন করছেন। কয়েদী। এই মাদক নিরাময় কেন্দ্রে এসেছেন মাত্র দশ দিন হয়েছে। অথচ মনে হচ্ছে কয় যুগ কেটে গেছে! তাঁর চার বছরের শিশুটির গায়ের গন্ধ- আহা, আসার সময় ওর একটা জামা নিয়ে এলে হতো।
তার সন্তানের শেষ ডাক কবে শুনেছেন: 'এই বাবাইন্যা-এই বাবাইন্যা। মামাইন্যা আমাকে বকা দিয়েছে'। তাঁর শরীর এখানে আটকে আছে কিন্তু মনটা পড়ে আছে বাইরে। তীব্র রোদ কখনই পছন্দ করতেন না। এখন সুতীব্র ইচ্ছা হচ্ছে, ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে হাঁটতে। মনে করার চেষ্টা করছেন শেষ কবে ইরাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন। আহা, বেচারীর বেড়াবার বড় শখ। এ বছর ওঁর এক বন্ধু ফোন করার পর জানলেন ইরার আজ জন্মদিন!
আচ্ছা, দশ দিনে কয় সেকেন্ড হয়...?
এদের এখানকার নিয়ম কানুনে হাঁপিয়ে উঠেছেন। চেষ্টা করেছেন নির্দেশগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে। এখনকার চীফ তাঁর উপর পুরোপুরি সন্তষ্ট। ভদ্রলোক এক সময় আর্মির ক্যাপ্টেন ছিলেন। ড্রাগ এডিক্ট হওয়ার কারণে তার সোনালী ক্যারিয়ার হারিয়েছেন। ওদিন রসিকতা করে বলছিলেন: আমার ক্যারিয়ার এখন টিফিন ক্যারিয়ার হয়ে গেছে। আর্মিতে আপনি কেন জয়েন করলেন এটা জিজ্ঞাসা করলে হাসতে হাসতে বলেন: 'দোজ হু জয়েন দ্য আর্মি নাইন আউট অব টেন আর ফুলস, এন্ড রিমেইনিং ওয়ান ইজ ম্যাড'।
আর্মির নিয়ম কিছু কিছু এখানেও চালু রেখেছেন। প্রথম সাক্ষাতেই আলীম আহমেদ ভড়কে গিয়েছিলেন। রাশভারি গলায় এই মানুষটা বলেছিলেন: হোয়ার দ্যা হেল ডু য়্যু কাম ফ্রম?
আরেক দিন আলীম আহমেদ পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি হুংকার দিলেন: হোয়াই ডোন্ট য়্যু উইস।
এখানকার খাবার জঘন্য। খাবারের কষ্ট কেন এটা কাউকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছেন। অবশ্য তমিজ বলছিল, খাবার অপচয়ের শিক্ষাটা দেয়ার জন্য নাকি এই ব্যবস্থা। সপ্তাহে একদিন মাছ একদিন মাংস। পানির মতো পাতলা ঝোল, মাংস সাইজে একটা তেলাপোকার চেয়ে বড়ো হবে না। তিন বেলা খাবার, দু-বেলা চা-নাস্তা। প্রতিদিন নয়টা সিগারেট। কমদামী। খাবার এবং চা-নাস্তার পর পাঁচটা ক্লাসের ফাঁকে দুইটা সিগারেট খাওয়া যাবে এবং বিনোদন, টিভি দেখার সময় দুইটা। কোন একবেলা না খেলে সিগারেট ফেরত দিতে হয়। সবার সঙ্গে খেতে হবে, নিয়ম। সিগারেট শেয়ার করা বা আধ খাওয়া সিগারেট খাওয়া গুরুতর অপরাধ। যুক্তি হচ্ছে, বাইরে অন্য সময়ে কেউ সিগারেটে ড্রাগ ঢুকিয়ে দিতে পারে।
আলীম আহমেত মনে মনে হাসলেন, বিনোদনের কী বহর! টিভিতে প্রায়ই যা-তা হিন্দি ছবি দেখায়। ওদিন ধর্মেন্দ্রর একটা ছবি দেখাচ্ছিল। ধর্মেন্দ্রর নাম "হাতড়া ইন্সপেক্টর"। কী সর্বনাশ, এ ব্যাটা হাতের মুঠোয় রিভলবারে গুলি ধরে ফেলে!
আলীম আহমদ তার ডাক্তার কবীরের উপর বেশ খানিকটা ক্ষুব্ধ। তিনি আশা করেছিলেন, ডা. কবীর প্রভাব খাটিয়ে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করবেন। কবীর টুঁ-শব্দও করেননি। আলীম আহমেদকে চারজনের সঙ্গে একটা ছোট্ট ঘরে ঘুমাতে হয়। পূর্বে তিনি কখনই কারো সঙ্গে রুম শেয়ার করেননি। এও এক যন্ত্রণা, নয়টার পর সমস্ত লাইট অফ। কী কষ্ট-কী কষ্ট! কী দীর্ঘ একেকটা রাত! এখানে আসার পর থেকেই কিছু ওষুধ দেয়া হচ্ছে। ড্রাগ বন্ধ করে দেয়ার পর শরীরে তীব্র ব্যথা হতো। পেইন কিলার টাইপের এবং সিডেটিভ জাতীয় কিছু অষুধ।
তাঁর রুম পার্টনাররা অবশ্য তাঁকে বেশ খানিকটা সমীহ করে। একদিন সাইফুল তার জামা পর্যন্ত ধুয়ে দিয়েছে। সাইফুল অসম্ভব মজার একটা ছেলে। একদিন বলছে: জানেন আলীম ভাই, আজকে দাওয়াত খেয়েছি স্বপ্নে- রোষ্ট, পোলাও, কোরমা, সালাদ, লবন, পানি কত কী।
আরেকদিন চোখ নাচিয়ে বলছে: আলীম ভাই, বলেন তো কোন জিনিস খাবার যোগাড়ের জন্য জাল বুনে, তাকে কি বলে?
আলীম বলেছিলেন: মাকড়সা।
সাইফুল হি হি করে হাসতে হাসতে বলেছিল: উঁহু, জেলে।
আরেকটা ছেলে সুকুমার। কিছু হলেই বলবে: আমি হিন্দুর পুত, আগুন হাতে লইয়া কিরা কাটলাম। কথার কথায় বলে ইয়ো বুজছনি, ইয়ো বুজছনি করে আর গন্ধকে বলে 'বুই' করে। অদ্ভুত সব কথা বলে: বাইট্টা বেডার চাইট্টা ঠ্যাং, লাফ দিয়া উডে ঘাউয়া ব্যাঙ। কিরা কাটার সময় বলবে, বিদ্যা কইলাম আমি এইটা করি নাই।
হা হা হা, একদিন কী বলছিল, গরমে মশার দাত হিড়হিড় করে। আলীম মনে করার চেষ্টা করছেন মশার কী দাঁত থাকে?
আলীম আহমেদের রুম পার্টনারদের আরেকজন তমিজ। ভারী চশমা পরা ছিপছিপে একটা ছেলে। কী মায়াকড়া চেহারা। কোন একটা স্কুলে মাষ্টারী করত। স্কুলের মজার সব গল্প বলত: ওর স্কুলে কোন এক ছাত্রী নাকি স্কুল কামাইয়ের দরখাস্ত লিখেছিল, ডায়েরিয়ার সমস্যা। ছুটির দরখাস্তের সঙ্গে চার-পাঁচটা খাবার স্যালাইনের খালি প্যাকেট সুতো দিয়ে আটকে দিয়েছিল। আরেক ছাত্রী আষাঢ়ে গল্প লিখেছিল, বৃষ্টি পড়িতেছে, ব্যাঙ ডাকিতেছে, নৌকা চলিতেছে, হুই-হুই, কী মজা!
তমিজের মাথায়ও উদ্ভট সব আইডিয়ায় ভরা। ক-দিন আগে খুব গম্ভীর হয়ে বলছে: আমার চক্ষু লজ্জা কম কারণ হলো, চোখের পাওয়ার মাইনাস ৭.৫। একদিন সিগারেটে ধরাতে গিয়ে বলছে: আলীম ভাই, আজ না আমার জন্মদিন। আগুন ধরায়া জন্মদিন পালন করতাছি।
ছেলেটা হা হা করে হাসছিল কিন্তু আলীমের চোখে জল।
আচ্ছা ভাই, 'তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে' তাহলে ডাবগাছ কি দু-পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে? ওদিন সাইফুল চকচকে একটা শার্ট গায়ে দিয়ে আগ্রহের সঙ্গে জানতে চেয়েছিল: তমিজ শার্টটা কেমন হইছে?
তমিজ নিরীহ মুখে বলেছিল: সোন্দর, তর চামড়ার সঙ্গে ম্যাচ করছে। ব্যস, মাথা ফাটাফাটি!
আলীম আহমেদের ছেলেগুলোকে বেশ লাগত। কখনো হস্টেলে থাকেননি বলেই হয়ত ওঁর কষ্টটা বেশী হচ্ছিল। মাঝে মাঝে মনে হত স্কুল জীবনের কথা। তাঁর প্রাইমারী স্কুলের সময়টা বেশ ছিল! প্রিয় বন্ধুদের একজন ছিল মুচির ছেলে, একজন ধোপার । মুচির ছেলের সঙ্গে কী মাখামাখি। ডাংগুলিতে ওর ছিল অসম্ভব পাকা হাত! এড়ি, দুড়ি, তেলকা, চুড়ি, চম্পা, ডেগ, সুতেগ। এক লাল, দুই লাল। এক লালে আস- একটা গুদাম কেনা যেত। দুই লালে নদী। এ একে একে বাজার নদী সব কিনে ফেলত। আলীম আহমেদ নিঃস্ব। ফলাফল পিঠে দুমদুম করে কিল। আরেকটা খেলা ছিল: রস, কস, শিঙা, বুলবুল, মালেক, মোসতাক। মাঞ্জা দেয়া সুতার ঘুড়ি- ঘ্যাচ, ঘ্যাচ, ঘ্যাচ। ইস, কীসব দিন!
আলীম আহমেদের শৈশব-কৈশোর এর কাছে অনেকখানি ঋণী। হারামজাদাটা পচাই খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত মরেই গেল।
মানুষ চলে যায় থেকে যায় স্মৃতি, পাখি উড়ে যায় রেখে যায় পালক। আলীম আহমেদ অপেক্ষা করছেন মুক্তির। অপেক্ষার চেয়ে কষ্টের আর কিছু নাই! ওয়েডিং ফর গডো!
তার সন্তানের শেষ ডাক কবে শুনেছেন: 'এই বাবাইন্যা-এই বাবাইন্যা। মামাইন্যা আমাকে বকা দিয়েছে'। তাঁর শরীর এখানে আটকে আছে কিন্তু মনটা পড়ে আছে বাইরে। তীব্র রোদ কখনই পছন্দ করতেন না। এখন সুতীব্র ইচ্ছা হচ্ছে, ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে হাঁটতে। মনে করার চেষ্টা করছেন শেষ কবে ইরাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন। আহা, বেচারীর বেড়াবার বড় শখ। এ বছর ওঁর এক বন্ধু ফোন করার পর জানলেন ইরার আজ জন্মদিন!
আচ্ছা, দশ দিনে কয় সেকেন্ড হয়...?
এদের এখানকার নিয়ম কানুনে হাঁপিয়ে উঠেছেন। চেষ্টা করেছেন নির্দেশগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে। এখনকার চীফ তাঁর উপর পুরোপুরি সন্তষ্ট। ভদ্রলোক এক সময় আর্মির ক্যাপ্টেন ছিলেন। ড্রাগ এডিক্ট হওয়ার কারণে তার সোনালী ক্যারিয়ার হারিয়েছেন। ওদিন রসিকতা করে বলছিলেন: আমার ক্যারিয়ার এখন টিফিন ক্যারিয়ার হয়ে গেছে। আর্মিতে আপনি কেন জয়েন করলেন এটা জিজ্ঞাসা করলে হাসতে হাসতে বলেন: 'দোজ হু জয়েন দ্য আর্মি নাইন আউট অব টেন আর ফুলস, এন্ড রিমেইনিং ওয়ান ইজ ম্যাড'।
আর্মির নিয়ম কিছু কিছু এখানেও চালু রেখেছেন। প্রথম সাক্ষাতেই আলীম আহমেদ ভড়কে গিয়েছিলেন। রাশভারি গলায় এই মানুষটা বলেছিলেন: হোয়ার দ্যা হেল ডু য়্যু কাম ফ্রম?
আরেক দিন আলীম আহমেদ পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি হুংকার দিলেন: হোয়াই ডোন্ট য়্যু উইস।
এখানকার খাবার জঘন্য। খাবারের কষ্ট কেন এটা কাউকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছেন। অবশ্য তমিজ বলছিল, খাবার অপচয়ের শিক্ষাটা দেয়ার জন্য নাকি এই ব্যবস্থা। সপ্তাহে একদিন মাছ একদিন মাংস। পানির মতো পাতলা ঝোল, মাংস সাইজে একটা তেলাপোকার চেয়ে বড়ো হবে না। তিন বেলা খাবার, দু-বেলা চা-নাস্তা। প্রতিদিন নয়টা সিগারেট। কমদামী। খাবার এবং চা-নাস্তার পর পাঁচটা ক্লাসের ফাঁকে দুইটা সিগারেট খাওয়া যাবে এবং বিনোদন, টিভি দেখার সময় দুইটা। কোন একবেলা না খেলে সিগারেট ফেরত দিতে হয়। সবার সঙ্গে খেতে হবে, নিয়ম। সিগারেট শেয়ার করা বা আধ খাওয়া সিগারেট খাওয়া গুরুতর অপরাধ। যুক্তি হচ্ছে, বাইরে অন্য সময়ে কেউ সিগারেটে ড্রাগ ঢুকিয়ে দিতে পারে।
আলীম আহমেত মনে মনে হাসলেন, বিনোদনের কী বহর! টিভিতে প্রায়ই যা-তা হিন্দি ছবি দেখায়। ওদিন ধর্মেন্দ্রর একটা ছবি দেখাচ্ছিল। ধর্মেন্দ্রর নাম "হাতড়া ইন্সপেক্টর"। কী সর্বনাশ, এ ব্যাটা হাতের মুঠোয় রিভলবারে গুলি ধরে ফেলে!
আলীম আহমদ তার ডাক্তার কবীরের উপর বেশ খানিকটা ক্ষুব্ধ। তিনি আশা করেছিলেন, ডা. কবীর প্রভাব খাটিয়ে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করবেন। কবীর টুঁ-শব্দও করেননি। আলীম আহমেদকে চারজনের সঙ্গে একটা ছোট্ট ঘরে ঘুমাতে হয়। পূর্বে তিনি কখনই কারো সঙ্গে রুম শেয়ার করেননি। এও এক যন্ত্রণা, নয়টার পর সমস্ত লাইট অফ। কী কষ্ট-কী কষ্ট! কী দীর্ঘ একেকটা রাত! এখানে আসার পর থেকেই কিছু ওষুধ দেয়া হচ্ছে। ড্রাগ বন্ধ করে দেয়ার পর শরীরে তীব্র ব্যথা হতো। পেইন কিলার টাইপের এবং সিডেটিভ জাতীয় কিছু অষুধ।
তাঁর রুম পার্টনাররা অবশ্য তাঁকে বেশ খানিকটা সমীহ করে। একদিন সাইফুল তার জামা পর্যন্ত ধুয়ে দিয়েছে। সাইফুল অসম্ভব মজার একটা ছেলে। একদিন বলছে: জানেন আলীম ভাই, আজকে দাওয়াত খেয়েছি স্বপ্নে- রোষ্ট, পোলাও, কোরমা, সালাদ, লবন, পানি কত কী।
আরেকদিন চোখ নাচিয়ে বলছে: আলীম ভাই, বলেন তো কোন জিনিস খাবার যোগাড়ের জন্য জাল বুনে, তাকে কি বলে?
আলীম বলেছিলেন: মাকড়সা।
সাইফুল হি হি করে হাসতে হাসতে বলেছিল: উঁহু, জেলে।
আরেকটা ছেলে সুকুমার। কিছু হলেই বলবে: আমি হিন্দুর পুত, আগুন হাতে লইয়া কিরা কাটলাম। কথার কথায় বলে ইয়ো বুজছনি, ইয়ো বুজছনি করে আর গন্ধকে বলে 'বুই' করে। অদ্ভুত সব কথা বলে: বাইট্টা বেডার চাইট্টা ঠ্যাং, লাফ দিয়া উডে ঘাউয়া ব্যাঙ। কিরা কাটার সময় বলবে, বিদ্যা কইলাম আমি এইটা করি নাই।
হা হা হা, একদিন কী বলছিল, গরমে মশার দাত হিড়হিড় করে। আলীম মনে করার চেষ্টা করছেন মশার কী দাঁত থাকে?
আলীম আহমেদের রুম পার্টনারদের আরেকজন তমিজ। ভারী চশমা পরা ছিপছিপে একটা ছেলে। কী মায়াকড়া চেহারা। কোন একটা স্কুলে মাষ্টারী করত। স্কুলের মজার সব গল্প বলত: ওর স্কুলে কোন এক ছাত্রী নাকি স্কুল কামাইয়ের দরখাস্ত লিখেছিল, ডায়েরিয়ার সমস্যা। ছুটির দরখাস্তের সঙ্গে চার-পাঁচটা খাবার স্যালাইনের খালি প্যাকেট সুতো দিয়ে আটকে দিয়েছিল। আরেক ছাত্রী আষাঢ়ে গল্প লিখেছিল, বৃষ্টি পড়িতেছে, ব্যাঙ ডাকিতেছে, নৌকা চলিতেছে, হুই-হুই, কী মজা!
তমিজের মাথায়ও উদ্ভট সব আইডিয়ায় ভরা। ক-দিন আগে খুব গম্ভীর হয়ে বলছে: আমার চক্ষু লজ্জা কম কারণ হলো, চোখের পাওয়ার মাইনাস ৭.৫। একদিন সিগারেটে ধরাতে গিয়ে বলছে: আলীম ভাই, আজ না আমার জন্মদিন। আগুন ধরায়া জন্মদিন পালন করতাছি।
ছেলেটা হা হা করে হাসছিল কিন্তু আলীমের চোখে জল।
আচ্ছা ভাই, 'তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে' তাহলে ডাবগাছ কি দু-পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে? ওদিন সাইফুল চকচকে একটা শার্ট গায়ে দিয়ে আগ্রহের সঙ্গে জানতে চেয়েছিল: তমিজ শার্টটা কেমন হইছে?
তমিজ নিরীহ মুখে বলেছিল: সোন্দর, তর চামড়ার সঙ্গে ম্যাচ করছে। ব্যস, মাথা ফাটাফাটি!
আলীম আহমেদের ছেলেগুলোকে বেশ লাগত। কখনো হস্টেলে থাকেননি বলেই হয়ত ওঁর কষ্টটা বেশী হচ্ছিল। মাঝে মাঝে মনে হত স্কুল জীবনের কথা। তাঁর প্রাইমারী স্কুলের সময়টা বেশ ছিল! প্রিয় বন্ধুদের একজন ছিল মুচির ছেলে, একজন ধোপার । মুচির ছেলের সঙ্গে কী মাখামাখি। ডাংগুলিতে ওর ছিল অসম্ভব পাকা হাত! এড়ি, দুড়ি, তেলকা, চুড়ি, চম্পা, ডেগ, সুতেগ। এক লাল, দুই লাল। এক লালে আস- একটা গুদাম কেনা যেত। দুই লালে নদী। এ একে একে বাজার নদী সব কিনে ফেলত। আলীম আহমেদ নিঃস্ব। ফলাফল পিঠে দুমদুম করে কিল। আরেকটা খেলা ছিল: রস, কস, শিঙা, বুলবুল, মালেক, মোসতাক। মাঞ্জা দেয়া সুতার ঘুড়ি- ঘ্যাচ, ঘ্যাচ, ঘ্যাচ। ইস, কীসব দিন!
আলীম আহমেদের শৈশব-কৈশোর এর কাছে অনেকখানি ঋণী। হারামজাদাটা পচাই খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত মরেই গেল।
মানুষ চলে যায় থেকে যায় স্মৃতি, পাখি উড়ে যায় রেখে যায় পালক। আলীম আহমেদ অপেক্ষা করছেন মুক্তির। অপেক্ষার চেয়ে কষ্টের আর কিছু নাই! ওয়েডিং ফর গডো!
বিভাগ
ফ্রিডম
Friday, August 13, 2010
শেখার কোন শেষ নেই
অশ্লীলতার ঠিক সংজ্ঞাটা আমি জানি না [১]। আমার কাছে যেটা মনে হয় এর সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেক রকম। আমাদের দেশে টাট্টিখানা হালের ওয়শরুমের দরোজা নাই এটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কোন জেনারেলকে যদি কেউ দেখে ফেলে উবু হয়ে জরুরী কাজটা সারছেন ওই জেনারেলের জেনারেলগিরি হয়তো যাবে না কিন্তু সৈনিক তাঁর কমান্ড কতটা গ্রহন করতে পারবেন এটা গবেষণার বিষয়। কে জানে, হয়তো ওই সৈনিক জরুরি মুহূর্তে গুলি ছোঁড়ার পূর্বে ওই দৃশ্য কল্পনা করে হাসতে হাসতে বুকের বাম পাশের বদলে গুলিটা গিয়ে বিঁধবে হয়ত টার্গেটের ফেলে যাওয়া জুতায়!
কিন্তু এই গ্রহেরই অনেক দেশে ওয়শরুম ওরফে টাট্টিখানায় দরোজার বালাই নাই। যার খুশি কাজকাম সারছে, এই নিয়ে বাড়তি কারও কোন কৌতূহলও নাই। কে জেনারেল, কে ফকির উঁকি মেরে এটা দেখতেও এদের বড়ো আলস্য।
এখন এটা কার দৃষ্টিতে শ্লীল, কোনটা অশ্লীল এই কুতর্ক চলতে থাকুক; অন্য প্রসঙ্গে যাই।
পাজেরো শব্দটা এখন আমার কাছে একটা অশ্লীল শব্দ মনে হয়। আমাদের দেশে মটরসাইকেল বলতেই আমরা যেমন হন্ডা বুঝি তেমনি যাদের পশ্চাদদেশ নরোম তাদের কাছে গাড়ি মানেই পাজেরো। এরা অবশ্য গাড়ি বলেন না বলেন জীপ- জীপ যে একটা ব্রান্ড এই নিয়ে এদের সঙ্গে কস্তাকস্তিতে যাই না। নব্য ধনী থেকে শুরু করে আমাদের দেশের গামলা (টাইপিং মিসটেক এখানে পড়তে হবে আমলা) কেউ বাদ থাকেন না। পাজেরো ব্যতীত এঁরা হাঁটতেই পারেন না (এখানেও খানিকটা ভুল হলো, হাঁটতেই পারেন না এটা না হয়ে হবে, পা ফাঁক করতে পারেন না)।
এবার ভিন্ন প্রসঙ্গ। প্রথম আলোর (১৩ আগস্ট ২০১০) সঙ্গে নৌপরিবহণমন্ত্রীর পিএস সোহরাব হোসেন চমৎকার একটা কথা বলেছেন, "মন্ত্রীর পিএসরা গাড়ি ব্যবহার করেন, রাস্তায় হেঁটে বেড়ান না। এর আগে যারা ছিলেন তারাও এই গাড়ি (পাজেরো) ব্যবহার করেছেন। ...শুধু যে আমি এতো দামি গাড়ি ব্যবহার করছি, তা নয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়, এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের পিএস-এপিএস সবাই দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন।"
কেবল তিনি পাজেরো (একেকটার দাম ৫০ লক্ষ টাকা। কোন শালা বলে, আমরা দরিদ্র দেশ। হাতের নাগালে পেলে থাপড়াইয়া কানপট্টি ফাটিয়ে ফেলতাম) ব্যবহারই করছেন না পারিবারিক গাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। ছুটির দিনেও বেদম হাঁকাচ্ছেন। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বন্দরের আরও চারজন, এঁরাও পাজেরো হাঁকাচ্ছেন অথচ এগুলো একটাও এঁদের জন্য কেনা হয়নি এবং এদের প্রত্যেকের জন্যই গাড়ি বরাদ্দ ছিল।
যাদের জন্য এই পাজেরো কেনা হয়েছে তাঁরা কাজ চালাচ্ছেন ভাড়া গাড়িতে। এদের মধ্যে একটা গাড়ি কেনা হয়েছিল ভ্রাম্যমান আদালতের প্রয়োজনে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে আরও চমৎকার কথা বলেন, "এটা বন্দরের রেওয়াজ...।"
আচ্ছা, সোহরাব হোসেন কি অন্যায় কিছু বলেছেন? আমি তা মনে করি না। এঁরা এটা শিখেছেন আমরা মানে জনগণের কাছ থেকে। জনগণ মানেই হচ্ছেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। পিএস সোহরাব হোসেন কি বলেছেন? "...এর আগে যিনি ছিলেন..."। ভুল বলেছেন?
এটা তিনি শিখেছেন আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে। যেমন আমাদের রাজনীতিবিদগণ যেমনটা বলেন, এর আগে যিনি করেছিলেন। পূর্বের লোকজনদের শিক্ষা দেন [২], একে একে স্থাপনাগুলোর নাম পরিবর্তন করতে থাকেন। আবার তাঁকে শিক্ষা দেবেন আরেকজন এসে। এদের এই খেলাটা বুঝি অন্যরা শিখবেন না? সহজ হিসাব, তমুক এটা করেছে বলে অমুকও এটা করবে, এখানে ন্যায় অন্যায়ের প্রশ্ন আসছে কেন?
চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভুলটা কি বললেন, শুনি? রেওয়াজ কি চালু থাকতে নেই? এমন কত রেওয়াজই তো চালু আছে। শেখ হাসিনাকে একজন এক কোটি টাকা দামের গাড়ি উপহার দিয়ে দেন, খালেদা জিয়াকে আস্ত একটা বাড়ি! আহা, এরকম উপহার নেয়ার রেওয়াজ চালু আছে তো। এঁরা হচ্ছেন এই দেশের চালিকাশক্তি, গোটা দেশ ঘুরপাক খাচ্ছে এঁদেরকে ঘিরে। এদের দেখে দেখে সোহরাব হোসেন-নজরুল ইসলামরা শিখবেন, তাঁদের দেখাদেখি অন্যরা। অন্যদের দেখে শিখব আমরা। এটা চলতেই থাকবে। শেখার কোন শেষ নেই!
সহায়ক লিংক:
১. অশ্লীলতার সংজ্ঞা: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_22.html
২. রেওয়াজ: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_11.html
কিন্তু এই গ্রহেরই অনেক দেশে ওয়শরুম ওরফে টাট্টিখানায় দরোজার বালাই নাই। যার খুশি কাজকাম সারছে, এই নিয়ে বাড়তি কারও কোন কৌতূহলও নাই। কে জেনারেল, কে ফকির উঁকি মেরে এটা দেখতেও এদের বড়ো আলস্য।
এখন এটা কার দৃষ্টিতে শ্লীল, কোনটা অশ্লীল এই কুতর্ক চলতে থাকুক; অন্য প্রসঙ্গে যাই।
পাজেরো শব্দটা এখন আমার কাছে একটা অশ্লীল শব্দ মনে হয়। আমাদের দেশে মটরসাইকেল বলতেই আমরা যেমন হন্ডা বুঝি তেমনি যাদের পশ্চাদদেশ নরোম তাদের কাছে গাড়ি মানেই পাজেরো। এরা অবশ্য গাড়ি বলেন না বলেন জীপ- জীপ যে একটা ব্রান্ড এই নিয়ে এদের সঙ্গে কস্তাকস্তিতে যাই না। নব্য ধনী থেকে শুরু করে আমাদের দেশের গামলা (টাইপিং মিসটেক এখানে পড়তে হবে আমলা) কেউ বাদ থাকেন না। পাজেরো ব্যতীত এঁরা হাঁটতেই পারেন না (এখানেও খানিকটা ভুল হলো, হাঁটতেই পারেন না এটা না হয়ে হবে, পা ফাঁক করতে পারেন না)।
এবার ভিন্ন প্রসঙ্গ। প্রথম আলোর (১৩ আগস্ট ২০১০) সঙ্গে নৌপরিবহণমন্ত্রীর পিএস সোহরাব হোসেন চমৎকার একটা কথা বলেছেন, "মন্ত্রীর পিএসরা গাড়ি ব্যবহার করেন, রাস্তায় হেঁটে বেড়ান না। এর আগে যারা ছিলেন তারাও এই গাড়ি (পাজেরো) ব্যবহার করেছেন। ...শুধু যে আমি এতো দামি গাড়ি ব্যবহার করছি, তা নয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়, এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের পিএস-এপিএস সবাই দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন।"
কেবল তিনি পাজেরো (একেকটার দাম ৫০ লক্ষ টাকা। কোন শালা বলে, আমরা দরিদ্র দেশ। হাতের নাগালে পেলে থাপড়াইয়া কানপট্টি ফাটিয়ে ফেলতাম) ব্যবহারই করছেন না পারিবারিক গাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। ছুটির দিনেও বেদম হাঁকাচ্ছেন। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বন্দরের আরও চারজন, এঁরাও পাজেরো হাঁকাচ্ছেন অথচ এগুলো একটাও এঁদের জন্য কেনা হয়নি এবং এদের প্রত্যেকের জন্যই গাড়ি বরাদ্দ ছিল।
যাদের জন্য এই পাজেরো কেনা হয়েছে তাঁরা কাজ চালাচ্ছেন ভাড়া গাড়িতে। এদের মধ্যে একটা গাড়ি কেনা হয়েছিল ভ্রাম্যমান আদালতের প্রয়োজনে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে আরও চমৎকার কথা বলেন, "এটা বন্দরের রেওয়াজ...।"
আচ্ছা, সোহরাব হোসেন কি অন্যায় কিছু বলেছেন? আমি তা মনে করি না। এঁরা এটা শিখেছেন আমরা মানে জনগণের কাছ থেকে। জনগণ মানেই হচ্ছেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। পিএস সোহরাব হোসেন কি বলেছেন? "...এর আগে যিনি ছিলেন..."। ভুল বলেছেন?
এটা তিনি শিখেছেন আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে। যেমন আমাদের রাজনীতিবিদগণ যেমনটা বলেন, এর আগে যিনি করেছিলেন। পূর্বের লোকজনদের শিক্ষা দেন [২], একে একে স্থাপনাগুলোর নাম পরিবর্তন করতে থাকেন। আবার তাঁকে শিক্ষা দেবেন আরেকজন এসে। এদের এই খেলাটা বুঝি অন্যরা শিখবেন না? সহজ হিসাব, তমুক এটা করেছে বলে অমুকও এটা করবে, এখানে ন্যায় অন্যায়ের প্রশ্ন আসছে কেন?
চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভুলটা কি বললেন, শুনি? রেওয়াজ কি চালু থাকতে নেই? এমন কত রেওয়াজই তো চালু আছে। শেখ হাসিনাকে একজন এক কোটি টাকা দামের গাড়ি উপহার দিয়ে দেন, খালেদা জিয়াকে আস্ত একটা বাড়ি! আহা, এরকম উপহার নেয়ার রেওয়াজ চালু আছে তো। এঁরা হচ্ছেন এই দেশের চালিকাশক্তি, গোটা দেশ ঘুরপাক খাচ্ছে এঁদেরকে ঘিরে। এদের দেখে দেখে সোহরাব হোসেন-নজরুল ইসলামরা শিখবেন, তাঁদের দেখাদেখি অন্যরা। অন্যদের দেখে শিখব আমরা। এটা চলতেই থাকবে। শেখার কোন শেষ নেই!
সহায়ক লিংক:
১. অশ্লীলতার সংজ্ঞা: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_22.html
২. রেওয়াজ: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_11.html
বিভাগ
অসভ্য কান্ড
Thursday, August 12, 2010
জিরো ক্রেডিট+ন্যানো ক্রেডিট=
নুরুন নাহার।
অনেকটা ঠিক তেমনই যেমনটা আমাদের সো কলড বিবেক ওরফে মিডিয়া বৈদেশে এই দেশের মার যেমন ছবি তুলে ধরেন। অপুষ্টিতে ভোগা খালি পায়ের একজন মহিলা; কোলে হাড়-জিরজিরে দু-একটা সন্তান।
আমাদের বিবেক নামের মিডিয়া লালমুখো সাহেবদের কাছে এই দেশের একজন মাকে এমন করে উপস্থাপন করতে ভারী আমোদ বোধ করেন। বা রিলিফের এক প্যাকেট বিস্কিটের জন্য শত-শত হাত উঠে আছে এই ছবিটা।
নুরুন নাহারের মা-বাবা অন্ধ। স্বামীর কোন খোঁজ নেই। একটা বিষয় আমি লক্ষ করেছি, এই দেশের নিম্নবিত্ত পুরুষদের নিষ্ঠুরতার অভাব নেই। একটা বিয়ে করে বউ-বাচ্চা ফেলে চলে গেলেই হলো, আরেক জায়গায় গিয়ে আরেকটা বিয়ে করবে; কেউ কিচ্ছু বলে না। আমার মনে হয়, এই দেশের সরকার বাহাদুরের এটা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন, কেমন করে এই হারটা কমানো যায়।
নুরুন নাহার বাবা-মার সঙ্গে থেকে ভিক্ষা করত। কিছুদিন চড়া সুদে টাকা নিয়ে বাচ্চাদের কাপড়ও বিক্রি করেছে। আমি যখন বলেছিলাম, আপনার তো অভিজ্ঞতা আছে, কাপড় দিলে বিক্রি করতে পারবেন? নুরুন নাহার এক কথায় রাজি।
প্রথমে ৫০টার মতো বাচ্চাদের কাপড় দেয়া হয়েছিল, বাচ্চাদের কিছু কাপড় এমনও আছে যার দাম পড়েছে সাড়ে তিন টাকা, ভাবা যায়? যা অনায়াসে পনেরো টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। চমৎকার করে তিনি কেনা-বেচার কাজ চালিয়ে গেছেন। এখন আরও টাকা হলে সুবিধে হয়।
নুরুন নাহারকে যেটা বলা হয়েছে, যে কাপড়গুলো দেয়া হয়েছিল এটার টাকা তাকে ফেরত দিতে হবে না কিন্তু যে বাড়তি টাকা দেয়া হবে তা মাসে মাসে শোধ দিতে হবে। যার হিসাব রাখবে এদের স্কুলের টিচার।
এখন আমি পড়েছি এক জটিল সমস্যায়। জিরো ক্রেডিট [১] এবং ন্যানো ক্রেডিট [২] নামে আলাদা বিভাগ করেছি। এটা জিরো ক্রেডিটেও খাপ খায় না আবার ন্যানো ক্রেডিটেও মিশ খায় না। এ দেখি বড়ো যন্ত্রণা হলো...।
সহায়ক লিংক
১. জিরো ক্রেডিট: http://tinyurl.com/2fpxq9d
২. ন্যানো ক্রেডিট: http://tinyurl.com/39dkbhh
অনেকটা ঠিক তেমনই যেমনটা আমাদের সো কলড বিবেক ওরফে মিডিয়া বৈদেশে এই দেশের মার যেমন ছবি তুলে ধরেন। অপুষ্টিতে ভোগা খালি পায়ের একজন মহিলা; কোলে হাড়-জিরজিরে দু-একটা সন্তান।
আমাদের বিবেক নামের মিডিয়া লালমুখো সাহেবদের কাছে এই দেশের একজন মাকে এমন করে উপস্থাপন করতে ভারী আমোদ বোধ করেন। বা রিলিফের এক প্যাকেট বিস্কিটের জন্য শত-শত হাত উঠে আছে এই ছবিটা।
নুরুন নাহারের মা-বাবা অন্ধ। স্বামীর কোন খোঁজ নেই। একটা বিষয় আমি লক্ষ করেছি, এই দেশের নিম্নবিত্ত পুরুষদের নিষ্ঠুরতার অভাব নেই। একটা বিয়ে করে বউ-বাচ্চা ফেলে চলে গেলেই হলো, আরেক জায়গায় গিয়ে আরেকটা বিয়ে করবে; কেউ কিচ্ছু বলে না। আমার মনে হয়, এই দেশের সরকার বাহাদুরের এটা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন, কেমন করে এই হারটা কমানো যায়।
নুরুন নাহার বাবা-মার সঙ্গে থেকে ভিক্ষা করত। কিছুদিন চড়া সুদে টাকা নিয়ে বাচ্চাদের কাপড়ও বিক্রি করেছে। আমি যখন বলেছিলাম, আপনার তো অভিজ্ঞতা আছে, কাপড় দিলে বিক্রি করতে পারবেন? নুরুন নাহার এক কথায় রাজি।
প্রথমে ৫০টার মতো বাচ্চাদের কাপড় দেয়া হয়েছিল, বাচ্চাদের কিছু কাপড় এমনও আছে যার দাম পড়েছে সাড়ে তিন টাকা, ভাবা যায়? যা অনায়াসে পনেরো টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। চমৎকার করে তিনি কেনা-বেচার কাজ চালিয়ে গেছেন। এখন আরও টাকা হলে সুবিধে হয়।
নুরুন নাহারকে যেটা বলা হয়েছে, যে কাপড়গুলো দেয়া হয়েছিল এটার টাকা তাকে ফেরত দিতে হবে না কিন্তু যে বাড়তি টাকা দেয়া হবে তা মাসে মাসে শোধ দিতে হবে। যার হিসাব রাখবে এদের স্কুলের টিচার।
এখন আমি পড়েছি এক জটিল সমস্যায়। জিরো ক্রেডিট [১] এবং ন্যানো ক্রেডিট [২] নামে আলাদা বিভাগ করেছি। এটা জিরো ক্রেডিটেও খাপ খায় না আবার ন্যানো ক্রেডিটেও মিশ খায় না। এ দেখি বড়ো যন্ত্রণা হলো...।
সহায়ক লিংক
১. জিরো ক্রেডিট: http://tinyurl.com/2fpxq9d
২. ন্যানো ক্রেডিট: http://tinyurl.com/39dkbhh
Wednesday, August 11, 2010
স্থাপনার নাম পরিবর্তন না করে গোটা দেশটার নামই পাল্টে দিন
এই দেশে যখন যারা ক্ষমতায় আসেন তাঁরা একটা খেলা নিয়ম করে খেলেন সেটা হচ্ছে, স্থাপনাগুলোর নাম পরিবর্তনের খেলা।
রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ-কালভার্ট থেকে শুরু করে কোন কিছুই বাদ থাকে না এবং এটা এঁরা করেন জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করেই। এঁরা ভাবেন, এতে জনগণ খুবই উল্লসিত হয়। আল্লা মালুম, কারা এঁদের এই সব পরামর্শ দেন, কোত্থেকে মাথায় এই পোকাটা প্রবেশ করে!
কখনও নামের কাঙ্গালপনা এমন পর্যায়ে যায়, কেবল নামের জন্য অহেতুক একটা স্থাপনা স্থাপন করা হয়। ট্যাক্স দেয় জনগণ নাম হয় রাজনীতিবিদদের। এই রাস্তা অমুক স্যার করেছেন, ওই এয়ারপোর্ট তমুক মহোদয় করেছেন। ভাব দেখে মনে হয়, এই টাকাগুলো স্যাররা তাঁদের পকেট থেকে দিচ্ছেন নতুবা নিজস্ব তালুক বিক্রি করে!
'নামের কাঙ্গালপনা অথবা ভিক্ষুকদের অমর হওয়ার বাসনা' শিরোনামে জাহেদ সরওয়ার একটা লেখা লিখেছেন, "...দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিমান বন্দরের নাম (জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) আর কোনো দেশে একজন সামরিক শাসকের নামে নেই। কিন্তু এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তখন, যখন এই নামটা পরিবর্তন করে 'শাহজালাল' নামের এক বিদেশি ফকিরের নামে রাখা হয়। কেন এই হতভাগ্য দেশটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরটার নাম 'জিয়া' রাখা হয়েছিল, আর তা পরিবর্তন করে 'শাহজালাল' রাখা হলো। এর মনস্তত্ত্ব কী...?" (মিডিয়াওয়াচ, ৫ জুলাই ২০১০/ পৃ: ৩৭)
এই বিমানবন্দরটার নাম পরিবর্তন করার আদৌ প্রয়োজন কি ছিল এটা আমাদের বোধগম্য হয় না। তারচেয়ে আরও অবোধ্য প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি, প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দেয়ার জন্য এটা করা হয়েছে।
আমি অবাক হই, একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ এমনটা বলতে পারেন এটা আমার বিশ্বাস হয় না। কসম, পত্রিকায় না-পড়লে এটা আমি বিশ্বাসই করতাম না! পত্র-পত্রিকায় এসেছিল, এই নাম বদল করতে নাকি ১২০০ কোটি টাকা খরচ হবে। আসলে কতো খরচ হয়েছে আমরা জানি না, এও জানি না বিদেশের লোকজনরা এটা নিয়ে কি বেদম হাসাহাসি করেছে। ঝানু যারা এরা হয়তো চার বছরের পরের ক্যালেন্ডারে নোটও লিখে রেখেছে, এই সালে আবারও বাংলাদেশে নামের হতদরিদ্র দেশটার বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করার জরুরি চিঠি আসবে।
প্রধানমন্ত্রী কেবল একটা দলকে শিক্ষা দেয়ার জন্য যে খেলাটা খেললেন, যে বিপুল টাকার অপচয় হলো এটা কার পকেট থেকে যাবে? জনগণের। তিনি কি একবারও জানতে চেয়েছেন জনগণ এটা চাচ্ছে কি না? তিনি যদি জনগণ বলতে তাঁর লোকদেরই কেবল গোণায় ধরেন তাহলে ভিন্ন কথা। টাকা জনগণের, শিক্ষা দেবেন তিনি, বাহ বেশ তো! আফসোস, তিনি এই খেলাটার নিয়ম ভুলে গেছেন- সোজা তীরের বদলে বুমেরাং বেছে নিলেন। এই বুমেরাং, শিক্ষাটা ঠিক ফিরে আসবে তাঁর কাছে। না-চাইতেই জলের মত নিরস্ত্র একজন মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দিলেন।
'পদ্মা সেতু' ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের নামে করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আমরা জানি সুপারিশ হচ্ছে তবলার ঠুকঠাক। বাদ্যের সঙ্গে গানও হবে- সুপারিশের পর এটা বাস্তবায়িতও হবে।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন হল বঙ্গবন্ধু পরিবারের তিন সদস্যের নামে রাখা হয়েছে। ভাসানী নভোথিয়েটার, এমন কতশত উদাহরণ! লিখে শেষ করা যাবে না!
এমন না এটা কেবল এরাই করছেন, যখন যারা ক্ষমতায় থাকেন তাঁরাই করেন। আগের সরকারও করেছেন বলেই এই সরকারও করার অর্থ হলো আগের সরকারের পর্যায়ে নেমে আসা- এতে আগের সরকারের জয়, এই সরকারের পরাজয়। মোটা দাগে বললে, একজন আমাকে গালি দিল, আমিও দিলাম মানেই আমাকে মানুষটা তার মত করতে সফল হলো। আর এই সব করে করে দরিদ্র দেশের দরিদ্র জনগণের কষ্টার্জিত টাকা বানের জলে ভেসে যায়।
আমি বলি কি, এই স্থাপনার নাম বদলের ছোট খেলাটা দোহাই আর খেলবেন না। খেলতে চাইলে বড়ো খেলা খেলুন, গোটা দেশটার নামই ক্ষমতাকাল অনুযায়ী খানিকটা পাল্টে দিন। তাহলে আর ছোটখাটো স্থাপনা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয় না। যেমন ধরুন, পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের নাম পাল্টে 'আওয়ামি বাংলাদেশ' রাখা হলো অথবা 'জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ'।
অন্য দলগুলোকে আমি গোণায় ধরছি না কারণ ঘুরেফিরে এই দুই দলই এই দেশ শাসন করবেন কেয়ামতের আগ পর্যন্ত। এই-ই আমাদের নিয়তি। আমরা আমাদের নিয়তি মেনে নিয়ে এই আবেদনই জানাই, দোহাই আপনাদের খেলা আপনারা খেলুন কিন্তু আমাদের কষ্টার্জিত টাকা নর্দমায় ফেলবেন না। 'রামের সুমতির' মতো দেরিতে হলেও আপনাদের সুমতি হোক। আমীন।
ছবি সূত্র: গুগল
রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ-কালভার্ট থেকে শুরু করে কোন কিছুই বাদ থাকে না এবং এটা এঁরা করেন জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করেই। এঁরা ভাবেন, এতে জনগণ খুবই উল্লসিত হয়। আল্লা মালুম, কারা এঁদের এই সব পরামর্শ দেন, কোত্থেকে মাথায় এই পোকাটা প্রবেশ করে!
কখনও নামের কাঙ্গালপনা এমন পর্যায়ে যায়, কেবল নামের জন্য অহেতুক একটা স্থাপনা স্থাপন করা হয়। ট্যাক্স দেয় জনগণ নাম হয় রাজনীতিবিদদের। এই রাস্তা অমুক স্যার করেছেন, ওই এয়ারপোর্ট তমুক মহোদয় করেছেন। ভাব দেখে মনে হয়, এই টাকাগুলো স্যাররা তাঁদের পকেট থেকে দিচ্ছেন নতুবা নিজস্ব তালুক বিক্রি করে!
'নামের কাঙ্গালপনা অথবা ভিক্ষুকদের অমর হওয়ার বাসনা' শিরোনামে জাহেদ সরওয়ার একটা লেখা লিখেছেন, "...দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিমান বন্দরের নাম (জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) আর কোনো দেশে একজন সামরিক শাসকের নামে নেই। কিন্তু এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তখন, যখন এই নামটা পরিবর্তন করে 'শাহজালাল' নামের এক বিদেশি ফকিরের নামে রাখা হয়। কেন এই হতভাগ্য দেশটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরটার নাম 'জিয়া' রাখা হয়েছিল, আর তা পরিবর্তন করে 'শাহজালাল' রাখা হলো। এর মনস্তত্ত্ব কী...?" (মিডিয়াওয়াচ, ৫ জুলাই ২০১০/ পৃ: ৩৭)
এই বিমানবন্দরটার নাম পরিবর্তন করার আদৌ প্রয়োজন কি ছিল এটা আমাদের বোধগম্য হয় না। তারচেয়ে আরও অবোধ্য প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি, প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দেয়ার জন্য এটা করা হয়েছে।
আমি অবাক হই, একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ এমনটা বলতে পারেন এটা আমার বিশ্বাস হয় না। কসম, পত্রিকায় না-পড়লে এটা আমি বিশ্বাসই করতাম না! পত্র-পত্রিকায় এসেছিল, এই নাম বদল করতে নাকি ১২০০ কোটি টাকা খরচ হবে। আসলে কতো খরচ হয়েছে আমরা জানি না, এও জানি না বিদেশের লোকজনরা এটা নিয়ে কি বেদম হাসাহাসি করেছে। ঝানু যারা এরা হয়তো চার বছরের পরের ক্যালেন্ডারে নোটও লিখে রেখেছে, এই সালে আবারও বাংলাদেশে নামের হতদরিদ্র দেশটার বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করার জরুরি চিঠি আসবে।
প্রধানমন্ত্রী কেবল একটা দলকে শিক্ষা দেয়ার জন্য যে খেলাটা খেললেন, যে বিপুল টাকার অপচয় হলো এটা কার পকেট থেকে যাবে? জনগণের। তিনি কি একবারও জানতে চেয়েছেন জনগণ এটা চাচ্ছে কি না? তিনি যদি জনগণ বলতে তাঁর লোকদেরই কেবল গোণায় ধরেন তাহলে ভিন্ন কথা। টাকা জনগণের, শিক্ষা দেবেন তিনি, বাহ বেশ তো! আফসোস, তিনি এই খেলাটার নিয়ম ভুলে গেছেন- সোজা তীরের বদলে বুমেরাং বেছে নিলেন। এই বুমেরাং, শিক্ষাটা ঠিক ফিরে আসবে তাঁর কাছে। না-চাইতেই জলের মত নিরস্ত্র একজন মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দিলেন।
'পদ্মা সেতু' ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের নামে করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আমরা জানি সুপারিশ হচ্ছে তবলার ঠুকঠাক। বাদ্যের সঙ্গে গানও হবে- সুপারিশের পর এটা বাস্তবায়িতও হবে।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন হল বঙ্গবন্ধু পরিবারের তিন সদস্যের নামে রাখা হয়েছে। ভাসানী নভোথিয়েটার, এমন কতশত উদাহরণ! লিখে শেষ করা যাবে না!
এমন না এটা কেবল এরাই করছেন, যখন যারা ক্ষমতায় থাকেন তাঁরাই করেন। আগের সরকারও করেছেন বলেই এই সরকারও করার অর্থ হলো আগের সরকারের পর্যায়ে নেমে আসা- এতে আগের সরকারের জয়, এই সরকারের পরাজয়। মোটা দাগে বললে, একজন আমাকে গালি দিল, আমিও দিলাম মানেই আমাকে মানুষটা তার মত করতে সফল হলো। আর এই সব করে করে দরিদ্র দেশের দরিদ্র জনগণের কষ্টার্জিত টাকা বানের জলে ভেসে যায়।
আমি বলি কি, এই স্থাপনার নাম বদলের ছোট খেলাটা দোহাই আর খেলবেন না। খেলতে চাইলে বড়ো খেলা খেলুন, গোটা দেশটার নামই ক্ষমতাকাল অনুযায়ী খানিকটা পাল্টে দিন। তাহলে আর ছোটখাটো স্থাপনা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয় না। যেমন ধরুন, পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের নাম পাল্টে 'আওয়ামি বাংলাদেশ' রাখা হলো অথবা 'জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ'।
অন্য দলগুলোকে আমি গোণায় ধরছি না কারণ ঘুরেফিরে এই দুই দলই এই দেশ শাসন করবেন কেয়ামতের আগ পর্যন্ত। এই-ই আমাদের নিয়তি। আমরা আমাদের নিয়তি মেনে নিয়ে এই আবেদনই জানাই, দোহাই আপনাদের খেলা আপনারা খেলুন কিন্তু আমাদের কষ্টার্জিত টাকা নর্দমায় ফেলবেন না। 'রামের সুমতির' মতো দেরিতে হলেও আপনাদের সুমতি হোক। আমীন।
ছবি সূত্র: গুগল
Tuesday, August 10, 2010
শিক্ষার সমতুল্য কিছু নাই
হরিজন পল্লীতে কাজ করতে গিয়ে বিচিত্রসব বিষয় জানার সুযোগ হচ্ছে। এই বাচ্চাগুলোর যিনি মা, তিনি আবার আনন্দের মার বোন [১]। এঁরা দু-বোন দেখতে প্রায় একই রকম, প্রায়শ আমি গুলিয়ে ফেলতাম। এবং দুজনেরই সুখি-সুখি চেহারা, বাইরে থেকে দেখে কেউ আঁচ করতে পারবে না এঁদের কোন দুঃখ স্পর্শ করতে পারে!
এই পরিবারের বাচ্চাগুলো পিংকি, প্রিয়াংকা, পিয়াস। এদের মধ্যে দু-বোনের একজন পড়ে ক্লাশ নাইনে, অন্যজন সিক্সে। দু-ভাইয়ের একজন ফোরে, অন্যটা ছোট, 'আমাদের ইশকুল' [২]-এ পড়ে (ওর নামটা এখন মনে পড়ছে না)।
এই বাচ্চাগুলোর স্কুল ফি জমে গিয়েছিল। গতবার যখন 'পড়শী ফাউন্ডেশন'-এর লোকজন এসেছিলেন তখনই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল এদের ফির টাকা দিয়ে দেয়া হবে। সমস্যা এটা না।
এই পরিবারের লোকজন একদিন আমাকে ধরে বসলেন, পরিবারের কর্তাকে বোঝাবার জন্য। তিনি বড় মেয়েটা, যে ক্লাশ নাইনে পড়ে তার পড়া বন্ধ করে দিতে চাচ্ছেন। আমি যেন মেয়ের বাবাকে একটু বুঝিয়ে বলি। শোনার পর থেকে মেয়েটা খুব মনখারাপ করে আছে।
মনে মনে আমি বলি, হায়রে দুনিয়া, ঘরের মানুষকেই বোঝাতে পারি না বাইরের লোকজনকে কি বোঝাব!
আবার এই শংকাও কাজ করে, দেখা গেল মানুষটা ক্ষেপে গেল, তখন?
মুশকিল হচ্ছে মানুষটার নাগাল পাই না। আমি তক্কে তক্কে থাকি। সুভাষ চন্দ্র দাস নামের মানুষটাকে একদিন ঠিক-ঠিক পাকড়াও করি। তার সঙ্গে কথাবার্তা নিম্নরূপ:
আমি বলি, আপনি নাকি মেয়েটার লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে চাইছেন, সমস্যা কি?
তিনি বলেন, হাদে (শুধুশুধু) কি পড়া বন্ধ করতাম চাই, মেটরিকে ম্যালা টেকা লাগে।
অনেক দিন পর এসএসসির বদলে মেট্রিক শব্দটা শুনলাম। আমি অবাক হয়ে বলি, ম্যালা টেকা মানে কত টাকা লাগে?
তিনি মাথা চুলকে বলেন, হুনছি দশ হাজার টেকা লাগে। আপনেই কন, কোত্থিকা পামু এতো টেকা?
আমি বলতে গিয়ে সামলে নেই, কোন হা...। আমি অবাক হয়ে ভাবি, মানুষের জন্য শিক্ষা যে কত জরুরি, শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। মানুষটা শিক্ষিত হলে অন্তত সামান্য হলেও খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করতেন। 'কর্তাতান্ত্রিক' সমাজ আমাদের- এই পরিবারের অন্যরাও খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেনি। মেয়েটাও মাথা ঘামায়নি।
আমি সামলে নিয়ে বলি, কে বলেছে আপনাকে দশ হাজার টাকা লাগে! আমি ঠিক জানি না তবে হাজার দুয়েকের বেশি হওয়ার কথা না। আর এ তো এখন কেবল নাইনে পড়ছে। পরীক্ষার তো এখনও অনেক দেরী, এখনই আপনি মেয়েটার পড়া বন্ধ করে দেবেন এটা কেমন যুক্তি! আপনি মেয়েটাকে 'মেটরিক' পরীক্ষা দিতে দেন আর আপনার কাছ থেকে কেউ দুই হাজার টাকার বেশি চাইলে আমাকে আটকে রাখবেন। তাছাড়া আপনাকে তখন ফির টাকা নিয়ে যেন মাথা না ঘামাতে হয় সেটাও আমরা দেখব। আপনি কেবল বলেন, মেয়েটার পড়া বন্ধ করবেন না।
মানুষটা মাথা ঝাকান, আইচ্ছা।
আমি এবার চেষ্টাকৃত গম্ভীর হয়ে বলি, না আইচ্ছা না। আপনি আপনার বউ-বাচ্চার সামনে আমাকে কথা দেন।
মানুষটা এবার মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলেন, আইচ্ছা, সবার সামনেই কইলাম। আইচ্ছা।
আমি হাসি চেপে বলি, আইচ্ছা, ঠিক আছে।
সহায়ক লিংক
১. আনন্দ: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_10.html
২. আমাদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_9016.html
এই পরিবারের বাচ্চাগুলো পিংকি, প্রিয়াংকা, পিয়াস। এদের মধ্যে দু-বোনের একজন পড়ে ক্লাশ নাইনে, অন্যজন সিক্সে। দু-ভাইয়ের একজন ফোরে, অন্যটা ছোট, 'আমাদের ইশকুল' [২]-এ পড়ে (ওর নামটা এখন মনে পড়ছে না)।
এই বাচ্চাগুলোর স্কুল ফি জমে গিয়েছিল। গতবার যখন 'পড়শী ফাউন্ডেশন'-এর লোকজন এসেছিলেন তখনই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল এদের ফির টাকা দিয়ে দেয়া হবে। সমস্যা এটা না।
এই পরিবারের লোকজন একদিন আমাকে ধরে বসলেন, পরিবারের কর্তাকে বোঝাবার জন্য। তিনি বড় মেয়েটা, যে ক্লাশ নাইনে পড়ে তার পড়া বন্ধ করে দিতে চাচ্ছেন। আমি যেন মেয়ের বাবাকে একটু বুঝিয়ে বলি। শোনার পর থেকে মেয়েটা খুব মনখারাপ করে আছে।
মনে মনে আমি বলি, হায়রে দুনিয়া, ঘরের মানুষকেই বোঝাতে পারি না বাইরের লোকজনকে কি বোঝাব!
আবার এই শংকাও কাজ করে, দেখা গেল মানুষটা ক্ষেপে গেল, তখন?
মুশকিল হচ্ছে মানুষটার নাগাল পাই না। আমি তক্কে তক্কে থাকি। সুভাষ চন্দ্র দাস নামের মানুষটাকে একদিন ঠিক-ঠিক পাকড়াও করি। তার সঙ্গে কথাবার্তা নিম্নরূপ:
আমি বলি, আপনি নাকি মেয়েটার লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে চাইছেন, সমস্যা কি?
তিনি বলেন, হাদে (শুধুশুধু) কি পড়া বন্ধ করতাম চাই, মেটরিকে ম্যালা টেকা লাগে।
অনেক দিন পর এসএসসির বদলে মেট্রিক শব্দটা শুনলাম। আমি অবাক হয়ে বলি, ম্যালা টেকা মানে কত টাকা লাগে?
তিনি মাথা চুলকে বলেন, হুনছি দশ হাজার টেকা লাগে। আপনেই কন, কোত্থিকা পামু এতো টেকা?
আমি বলতে গিয়ে সামলে নেই, কোন হা...। আমি অবাক হয়ে ভাবি, মানুষের জন্য শিক্ষা যে কত জরুরি, শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। মানুষটা শিক্ষিত হলে অন্তত সামান্য হলেও খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করতেন। 'কর্তাতান্ত্রিক' সমাজ আমাদের- এই পরিবারের অন্যরাও খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেনি। মেয়েটাও মাথা ঘামায়নি।
আমি সামলে নিয়ে বলি, কে বলেছে আপনাকে দশ হাজার টাকা লাগে! আমি ঠিক জানি না তবে হাজার দুয়েকের বেশি হওয়ার কথা না। আর এ তো এখন কেবল নাইনে পড়ছে। পরীক্ষার তো এখনও অনেক দেরী, এখনই আপনি মেয়েটার পড়া বন্ধ করে দেবেন এটা কেমন যুক্তি! আপনি মেয়েটাকে 'মেটরিক' পরীক্ষা দিতে দেন আর আপনার কাছ থেকে কেউ দুই হাজার টাকার বেশি চাইলে আমাকে আটকে রাখবেন। তাছাড়া আপনাকে তখন ফির টাকা নিয়ে যেন মাথা না ঘামাতে হয় সেটাও আমরা দেখব। আপনি কেবল বলেন, মেয়েটার পড়া বন্ধ করবেন না।
মানুষটা মাথা ঝাকান, আইচ্ছা।
আমি এবার চেষ্টাকৃত গম্ভীর হয়ে বলি, না আইচ্ছা না। আপনি আপনার বউ-বাচ্চার সামনে আমাকে কথা দেন।
মানুষটা এবার মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলেন, আইচ্ছা, সবার সামনেই কইলাম। আইচ্ছা।
আমি হাসি চেপে বলি, আইচ্ছা, ঠিক আছে।
সহায়ক লিংক
১. আনন্দ: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_10.html
২. আমাদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_9016.html
বিভাগ
আমাদের ইশকুল: এক
ন্যানো ক্রেডিট: ৫
এর নাম আনন্দ। পড়ে ক্লাশ সেভেনে।
'হরিজন কলোনি'র স্কুলে বাচ্চাদের সঙ্গে আমি ব্যস্ত।
আনন্দের মা যখন বললেন, এর স্কুলের ড্রেসের ব্যবস্থা করা যায় কি না সত্যি বলি, আমি তখন আমি খানিকটা বিরক্তই হয়েছিলাম। ৩টা স্কুলের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে!
বের হওয়ার সময় আবারও একই প্রসঙ্গ। আমি বিরক্তি চেপে বলি, আনন্দ, তোমার আগের স্কুলের ড্রেস নাই?
আনন্দ বলে, আছে।
তাহলে? সমস্যা কি?
আনন্দ থেমে থেমে বলে, আগেরটা ছোট হয়া গেছে।
মানুষের প্রতি অবিশ্বাস আমাদের মজ্জাগত। আমার রক্তেও অবিশ্বাস খেলা করবে না এটা কেমন কথা! আমি সেই অবিশ্বাসে ভাসতে-ভাসতে বলি, আনন্দ, দেখি তোমার স্কুল ড্রেসটা নিয়া আসো তো।
আনন্দ যে স্কুল ড্রেসটা নিয়ে আসে সেটা দেখে আমি হতভম্ব! এই ড্রেসটা সে কত বছর আগে বানিয়েছিল? এটা তার গায়ে আঁটে কেমন করে? আমার বিরক্তি বেদনায় মিশে একাকার হয়ে যায়। আপাতত তার এই সমস্যার একটা সমাধান হয় কিন্তু আনন্দের মার সঙ্গে কথা বলে মন আরও খানিকটা বিষণ্ন হয়।
আনন্দের বাবা নেই। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে তার মা তাঁর এক সন্তানকে অন্য এক আত্মীয়'র কাছে রেখেছেন। এখানকার লোকজনরা মিলে আনন্দের মাকে একটা দোকানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখানে, এদের এলাকায় কিছু দোকান দেখেছি বলেই মনে পড়ল।
আমাকে এটাও বড়ো লজ্জা দিল, হরিজনরা অন্তত এই কাজটা তো করে দিয়েছেন, তাঁদেরই স্বজাতি, অসহায় এই পরিবারটিকে একটা দোকানের ব্যবস্থা। এই উদারতা আমাদের মধ্যে কোথায়? ছোটবেলায় বেম্বাইয়াদের কথা শুনতাম, এরা নাকি এদের সম্প্রদায়দের কাউকে ভেসে যেতে দিতেন না। সবাই মিলে কোন-না-কোন একটা ব্যবস্থা করে দিতেন। অসহায় মানুষটাকে দাঁড় করিয়ে ছাড়তেন।
আনন্দের মার সমস্যা হচ্ছে, দোকানে জিনিস-পত্র কেনার জন্য পুঁজি নাই, এবং একা দোকান চালাতে পারেন না। কথা বলে ঠিক হয়, আপাতত ১০০০ টাকা তাঁকে দেয়া হবে। তিনি মাসে-মাসে ১০০ টাকা করে ১০০০ টাকাটা শোধ দিয়ে দেবেন। হরিজন স্কুলের মাস্টারের কাছে টাকা জমা দেবেন, তিনি এটার হিসাব রাখবেন।
স্কুলের পর আনন্দ তার মাকে দোকানে সহায়তা করবে। আনন্দের মার একটাই চাওয়া, টাকাটা একটু তাড়াতাড়ি দিলে ভাল হয় কারণ এখানে এখন খরমপুরে 'ওরস' শুরু হচ্ছে, বাইরে থেকে যথেষ্ঠ লোকজন আসা শুরু করবেন। বিক্রি ভাল হবে বলেই তাঁর ধারণা। এটা কোন সমস্যা না, আজই টাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। আনন্দ বিপুল উৎসাহে ছুটছে জিনিসপত্র কেনার জন্য, আমি চোখ ভরে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখি।
গত মাসে যত জনকে 'ন্যানো ক্রেডিট' দেয়া হয়েছে প্রত্যেকেই ঠিক-ঠিক সময় মতো তাদের টাকা জমা করেছেন। আমি নিশ্চিত, আনন্দের মার বেলায়ও এর ব্যত্যয় হবে না।
*ন্যানো ক্রেডিট: http://tinyurl.com/39dkbhh
আপডেট: ১২ আগস্ট, ২০১০
স্কুলের কাজে আমাকে প্রায়ই এখানে, এই হরিজন পল্লিতে আসতে হয়।
আনন্দদের দোকানটাও এখানেই। অন্য দিন বন্ধ পেতাম, আজ দেখি মা-ছেলে দিব্যি দোকান খুলে বসে আছে। এদের আনন্দ দেখার সময় কোথায় আমার? নিজের আনন্দ ছেড়ে অন্যেরটা দেখতে বয়েই গেছে আমার।
বিভাগ
ন্যানো ক্রেডিট
Monday, August 9, 2010
কনক পুরুষ: ৬
তন্ময় তার রূমে ঢুকে রায় দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘তোর পুতুপুতু ভাব আমার একদম পছন্দ না। তোর মনে কু আছে।’
‘আচ্ছা যা, আমার মনে কু আছে। এখন একটা সিগারেট দে।’
তন্ময় প্যাকেট ছুঁড়ে বলল, ‘দাগ দেয়া সিগারেটগুলো কিন্তু চরস ভরা।’
‘মাই গড, বলিস কী! দাগ এলোমেলো হয়ে যায়নি তো আবার?’
‘একটা খেয়ে ফেললে তো আর পটল তুলবি না।’
জয় খুব সাবধানে একটা দাগ ছাড়া সিগারেট বের করে ধরাল। অখন্ড মনোযোগ রিঙ বানাতে চেষ্টা করল। তন্ময় চোখ ছোট করে বলল, ‘তুই হঠাৎ এলি যে। আর তো কখনও আসিসনি?’
‘ইচ্ছা করল, আসলাম। কেন বাংলাদেশে এমন কোন আইন পাশ হয়েছে তোর এখানে আসা যাবে না?’
‘আরে নাহ, আমি ভাবছিলাম, মাত্র বিয়ে করলি, বউ ছেড়ে বেরিয়ে এলি যে।'
'ছাগল, বিয়ে করলে লোকজন কী ঘর আর ছেড়ে বার হয় না!'
'সৌদিদের একটা জিনিস আমার খুব পছন্দ, জানিস। বিয়ের পর জামাই-বউ সাত ঘর ছেড়ে বেরোয় না। আনুষাঙ্গিক সবকিছু ওদের ঘরে পৌঁছে দেয়া হয়। আমি হলে তাই করতাম।’
জয় হাসি চেপে বলল, 'কোত্থেকে এই সব আজগুবি খবর পাস!'
‘সত্যি। শোন, বউকে বিছানা ছাড়তেই দিতাম না। আমরা দুজন-দুজন দু’জনার। বিছানায়-’
‘আহ, তন্ময়!’
তন্ময় অবিকল কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করে উঠল, ‘শালা, লজ্জায় মরে যাচ্ছে। ন্যাকামী, নাক নিপলে দুধ বেরোয়। বউয়ের সঙ্গে শুতে লজ্জা করে না, শুনলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়।’
জয় লাল নীল হয়ে বাধো বাধো গলায় বলল, ‘ওসব কিছু আদৌ হয়নি আমাদের এখনও।’
‘কি-ক-কি বললি তুই!’
‘যা শুনেছিস তাই।’
‘এটা বিশ্বাস করতে বলছিস?’
‘হুঁ।’
‘তোর যন্ত্রপাতি ঠিক আছে তো? আমার ধারণা ঠিক নেই।’
‘তোকে বলে মহা ভুল করেছি, সব সময় কুৎসিত কথা। শুনতে ভাল লাগে না।’
তন্ময় অবিকল গরুর মত বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ পর বলল, ‘এ রকম হলো কেন?’
‘আমি তোর সঙ্গে কথা বলব না।’
‘প্লীজ, বল না।’
জয় কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, ‘বিয়ের রাতে ও বলল, “আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে ছোঁবেন না।” আমি সোফায় শুলাম। এই আর কি।’
‘এই!’
‘হুম। ওর সম্ভবত কিছু সমস্যা আছে। কিছুটা আঁচ করতে পারছি অবশ্য।’
‘জয়, লিখে রাখ, এক নম্বর গাধা পৃথিবীতে আর নাই। যা আছে সব দু’নম্বর। একটাই আছে, সে তুই। বললাম, লিখে রাখ।’
‘ক্যাঁচক্যাঁচ করিস না, লিখতে হবে না; যা তোরটাই ঠিক।’
জয় খানিকটা উদ্বিগ্ন ছিল, সমস্যা কি এটা তন্ময় জিজ্ঞস করে বসবে না তো আবার। না করাতে বেঁচে গেল। ও কখনোই বলতে পারত না। তন্ময় চা’র কথা বলতে ভেতরে গেলে জয় চারপাশে নজর দেয়ার সময় পেল। রাজ্যের জিনিসপত্রে ঠাসা, এগুলোর সম্ভবত সৃষ্টিছাড়া দাম। কিন্তু যে জিনিসটা যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই। মেঝেতে সুন্দর একটা ডায়েরী গড়াগড়ি খাচ্ছে দেখে হাতে নিয়ে রেখে দিতে গিয়েও কি মনে করে পাতা ওল্টাতে লাগল। একজায়গায় চোখ আটকে গেল। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা-
তন্ময় চারতলা ট্রলিতে করে দুনিয়ার সব খাবার নিয়ে এলো। একটা দৈত্য কুঁজো হয়ে ঠেলাগাড়ির মত একটা জিনিস ঠেলছে, দেখার মত ব্যাপার বটে। জয় হাসতে হাসতে বলল, ‘এত খাবার, ফেরি করতে বেরুবি নাকি!’
তন্ময় কিছু বলল না, কি যেন ভাবছে।
‘কিরে, কোন সমস্যা?’
তন্ময় গম্ভীর হয়ে বলল, ‘বুঝতে পারছি না। আমার মা’র স্বামী কি এক ভঙ্গিতে যেন আজ তাকাচ্ছে। দেখে হার্টবিট মিস হচ্ছে।’
‘ছি, তন্ময়, ছি! মা’র স্বামী এই সব কি!’
‘আরে এ বলে কী! হুশ কুত্তা, হুশ! তো যেটা বলছিলাম, মা’র স্বামী-।’
‘আমি উঠি, তন্ময়। ’
‘আহ, রাগ করছিস কেন। আচ্ছা যা, আমার বাব। তো ইনি দুপুরে ফিরে অফিসে আর যাননি, কি রকম অস্বাভাবিক আচরণ করছেন।’
‘অস্বাভাবিক আচরণ মানে?’
‘এই ধর। কি করে তোকে বোঝাই, হিন্দি ছবিতে আমরা দেখি না ভাল বাবারা সন্তানদের সঙ্গে বন্ধু-বন্ধু খেলা খেলেন। ওই রকম একটা কিছু আর কি।’
‘এটাকে অস্বাভাবিক আচরণ বলছিস কেন!’
‘বলছি। তুই খাবারে হাত লাগা। যা পারা যায় শেষ করে ফেলতে হবে, নইলে নষ্ট হবে।’
জয় বলল, ‘এত খাওয়া সম্ভব নাকি? আর নষ্ট হবে কি, তুলে রাখলেই হয়।’
‘ধুর, বেঁচে যাওয়া খাবার তুলে রাখলে ভুঁইফোড় বড়লোকদের মান থাকে নাকি। ফেলে দিতে হয়।’
‘ফেলে দিবি?’
জয়ের মনে হলো শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। অসহ্য রাগে ইচ্ছে করছে সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। তন্ময় ওর বিবর্ণভাব লক্ষ করে বলল, ‘এটা শুনে তোর খুব রাগ হচ্ছে? মনে হচ্ছে না আমাকে খুন করে ফেললে আরাম পাবি?’
‘হ্যাঁ, হচ্ছে।’
‘এটাই সত্য, মিথ্যা বলতে আমার ভাল লাগে না।’
জয় কেবল এই কথাটার জন্যে মনে মনে ওকে ক্ষমা করে দিল। অবশ্য একে ক্ষমা না করেও উপায় নেই। বদরঙ বদমজা একটা জিনিস চিবাতে চিবাতে বলল, ‘হ্যা রে, তুই দশজনের চেয়ে অন্যরকম হলি কেন রে?’
‘অন্যরকম মানে কি, মানুষের মত মনে হয় না? এই, এই দেখ, এটা হাত। এটা পা। আর এইটা হলো গিয়ে- থাক, তুই আবার রেগে যাবি। তোর তো আবার শরীরে রাগের উথাল পাতাল ঢেউ।’
‘তোর সঙ্গে কথা বলাই সমস্যা। ভাল কথা, তোর ডায়েরিতে দেখলাম কিসব লিখে রেখেছিস, “বললে নিমিষেই হও”।’
‘লিখে রেখেছি বেশ করেছি, তো সমস্যাটা কি। চায়ে ক’চামচ চিনি দেব?’
‘কম কম করে এক চামচ দে।’
‘তুই শালা ডায়বেটিস রোগী নাকি।’
‘আবার আজেবাজে কথা বলছিস! ভাল করেই জানিস আমার ডায়বেটিস নেই।’
'থাকবে কোত্থেকে! তোর তো যন্ত্রই নেই। হা হা হা।’
জয় চুপ করে রইল। এর সঙ্গে কথা বলার মানে হয় না। কথা বললেই কথার পিঠে কথা বলবে। তন্ময় বিশাল মগে এমন ভঙ্গিতে লম্বা লম্বা চুমুক দিচ্ছে, মনে হচ্ছে চা না সরবত খাচ্ছে। অথচ একই রকম চায়ে জয় মুখ দিয়ে জিব পুড়িয়ে ফেলেছে। এর তাড়াহুড়া দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে আর বিলম্ব নেই। 'লাস্ট সাপার'-এর মত এটাও ‘লাস্ট টি’।
তন্ময় রকিং চেয়ারে পা উঠিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে দোল খেতে খেতে বলল, ‘আমার মা’র স্বামী- আহা, ওভাবে চোখ লাল করে তাকাসনে। আমার বাবার মনে হয় মাথার ঠিক নেই, বুঝলি। আমার সঙ্গে যে লোক গুণে গুণে কথা বলে নোটবুকে লিখে রাখে, কোন মাসে দু’একটা কথা বেশি বললে অন্য মাসে কম বলে পুষিয়ে নেয়। ওরিআল্লা, আমার চক্ষু তো চড়কগাছ। কী কান্ড, খাওয়ার পর থেকে অনর্গল কথা বলছে আমার সঙ্গে। কথা বলে মনে হয় খুব আরাম পাচ্ছে। নমুনা দেই:
‘বাবা বললেন, তন্ময়, দেশটা যাচ্ছে কোথায়।
আমি বললাম, কই, যাচ্ছে না তো কোথাও। আগের জায়গাতেই আছে।
বাবা দেশ কোথায় যাচ্ছে এ নিয়ে যে মাথা ঘামান এটা আমার জানা ছিল না। আর এ নিয়ে সুযোগ্য পুত্রের সঙ্গে ডিসকাস করবেন এটা অস্টম আশ্চর্য গোছের কিছু একটা। ওনার ধারণা ছেলের সঙ্গে বেশি মাখামাখি হলে বাবারা বাবা থাকবেন না, হাবা হয়ে যাবেন। তারপর বাবা বললেন, তা না, কিন্তু দেশটা যাচ্ছেটা কোথায়!
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, জ্বী, একবার বলেছি, আগের জায়গায়ই আছে। দেখ দেখি কান্ড, মাস তিনেকের কথা। আমার এক বন্ধু, বুঝলি, বহুদিন ছুটি পায় না। আমাকে অনুরোধ করল, আমি যেন টেলিগ্রাম করি, ছুটি পেতে সুবিধে হবে। ওর হাতে টেলিগ্রাম গিয়ে পৌঁছল তিনদিন পর। চিন্তা কর, অথচ অর্ডিনারি চিঠি চট্টগ্রাম পৌঁছে এক দিনে।
আমি বললাম, চিন্তা করার সময় কই। সহজ বুদ্ধি হলো: অর্ডিনারি চিঠির ভেতর টেলিগ্রাম ভরে পাঠিয়ে দেয়া। বাবা অবাক হলেন, চিঠি দিলেই হয়, এর ভেতর টেলিগ্রাম দেয়ার মানে কী।
অ, এইটা বুঝলে না। ধরো, তুমি চিঠিতে লিখলে আমার এখন-তখন অবস্থা। বাতাসের আগে আসো। যে চিঠিটা পাবে সে কি খুব একটা গুরুত্ব দেবে, না অন্যরা? কিন্তু চিঠি খুলে এই কথাটাই টেলিগ্রামে লেখা থাকলে। ঢিং । সেই লোক তোমার প্রিয়জন হলে প্যান্ট নষ্ট করে ফেলবে না? অবশ্য তুমি বেঁচে গেছ, তোমার তেমন কেউ নেই।
জানিস জয়, অন্য সময় এভাবে কথা বললে বাবা তুলকালাম করে ফেলতেন, কাঁচা ডিম মাথায় রাখলে সেদ্ধ হয়ে যেত। আজ কেমন নির্বিকার ভঙ্গিতে বাসে রইলেন।’
জয় বিব্রত গলায় বলল, ‘বাবাকে নিয়ে কেউ-।’
‘জানি, জানি, তুই কি বলবি। বাবার সঙ্গে কেউ এভাবে কথা বলে না, এই তো? তাদের বাবারা কি নিজ থেকে ছেলেকে একবার হ্যালো বলারও প্রয়োজন বোধ করে না। মাসের পর মাস দেশের বাইরে পড়ে থাকে! ছেলে কোথায় যাচ্ছে কি খাচ্ছে-।’
‘ভুল তো সবাই করে। তাই বলে তোর মত ড্রাগ নেয় না। এভাবে আত্মহত্যা করে না।’
‘আসলে তোকে ঠিক বোঝাতে পারব না। ড্রাগ নিলে কি পরিণতি হবে এটা যে জানতাম না এমন না। তখন কি মনে হত জানিস, আমি যেভাবে বেঁচে আছি এটা কোন বেঁচে থাকা নয়। এভাবে না মরে ওভাবে মরলাম, কি আসে যায়।’
‘যা হয়েছে হয়েছে, চিকিৎসা হলেই সেরে উঠবি।’
তন্ময় উদাস হয়ে বলল, ‘কি লাভ, এই তো ভাল।’
জয় এবার রাগী গলায় বলল, ‘মামদোবাজী করবি না। এ পৃথিবীতে নিজ থেকে আসিসনি, মরে যাওয়ার কোন অধিকার তোর নাই। তোর ওপর সৃষ্টিকর্তার, তোর বাবারও অধিকার আছে।’
তন্ময় রাগে এমন লাফিয়ে উঠল জয় ভয় পেয়ে আধ হাত পিছিয়ে গেল। তন্ময় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চেঁচাচ্ছে, ‘তুমি শালা এ দেশের প্রধানমন্ত্রী না প্রেসিডেন্ট, খুব যে ভাষণ দিচ্ছ। আমাকে পৃথিবীতে পাঠানোর আগে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আমি আসতে চাই কি না? হাত পা ধরে সাধছিলাম, পাঠাও-পাঠাও? কেউ বলেছিল, আমাকে তুমি যে পৃথিবীতে পাঠাচ্ছ, এই হলো এর অবস্থা। অ্যাহ, অধিকার! ইচ্ছের বিরুদ্ধে এসেছি, ইচ্ছা হলে থাকব, না হলে থাকব না।’
‘প্লীজ, তুই-।’
‘শান্ত হব? আমার মাথায় খুন চেপে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে তোর মাথাটা ফট করে-।’
‘আজই বলেছিস দু’তিনবার, ডিমের খোসার মত ভেঙে ফেলবি।’
বিদায় নেয়ার সময় জয় তন্ময়ের হাত ধরে আবেগঘন গলায় বলল, তন্ময়, একটা জিনিস চাইব, দিবি?’
‘কি পাগল, না জেনে প্রমিজ করব কি! তুই আমার ওইটা চাইলি, দিয়ে দিতে হবে? হা হা হা।’
‘ফর গড সেক, তন্ময়, কখনও তো সিরিয়াস হ’!’
‘ধানাই-পানাই বাদ দিয়ে কি বলবে বলো, চান্দু।’
জয় গোঁয়ারের মত বলল, ‘তুই আগে প্রমিজ কর। ’
‘আচ্ছা, প্রমিজ করলাম। এবার বল।’
‘তোর চিকিৎসার ব্যাপারে যা করার আমি করব। তুই টুঁ-শব্দও করবি না।’
তন্ময় অন্যরকম গলায় বলল, ‘লাভ নেই রে, আমি শেষ।’
‘এসব বুঝি না, তুই কথা দিয়েছিস । আর শোন, ইভা বলেছে তোকে যেন অবশ্যই বলি ওর সঙ্গে দেখা করতে। কাল আয়।’
‘তুই থাকলে যাব, না কি না থাকলে যাব, এটা বলে যা। হা হা হা।'
*কনক পুরুষ, ৫: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_08.html
**উপন্যাস, কনক পুরুষ: http://tinyurl.com/29uf4sq
‘আচ্ছা যা, আমার মনে কু আছে। এখন একটা সিগারেট দে।’
তন্ময় প্যাকেট ছুঁড়ে বলল, ‘দাগ দেয়া সিগারেটগুলো কিন্তু চরস ভরা।’
‘মাই গড, বলিস কী! দাগ এলোমেলো হয়ে যায়নি তো আবার?’
‘একটা খেয়ে ফেললে তো আর পটল তুলবি না।’
জয় খুব সাবধানে একটা দাগ ছাড়া সিগারেট বের করে ধরাল। অখন্ড মনোযোগ রিঙ বানাতে চেষ্টা করল। তন্ময় চোখ ছোট করে বলল, ‘তুই হঠাৎ এলি যে। আর তো কখনও আসিসনি?’
‘ইচ্ছা করল, আসলাম। কেন বাংলাদেশে এমন কোন আইন পাশ হয়েছে তোর এখানে আসা যাবে না?’
‘আরে নাহ, আমি ভাবছিলাম, মাত্র বিয়ে করলি, বউ ছেড়ে বেরিয়ে এলি যে।'
'ছাগল, বিয়ে করলে লোকজন কী ঘর আর ছেড়ে বার হয় না!'
'সৌদিদের একটা জিনিস আমার খুব পছন্দ, জানিস। বিয়ের পর জামাই-বউ সাত ঘর ছেড়ে বেরোয় না। আনুষাঙ্গিক সবকিছু ওদের ঘরে পৌঁছে দেয়া হয়। আমি হলে তাই করতাম।’
জয় হাসি চেপে বলল, 'কোত্থেকে এই সব আজগুবি খবর পাস!'
‘সত্যি। শোন, বউকে বিছানা ছাড়তেই দিতাম না। আমরা দুজন-দুজন দু’জনার। বিছানায়-’
‘আহ, তন্ময়!’
তন্ময় অবিকল কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করে উঠল, ‘শালা, লজ্জায় মরে যাচ্ছে। ন্যাকামী, নাক নিপলে দুধ বেরোয়। বউয়ের সঙ্গে শুতে লজ্জা করে না, শুনলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়।’
জয় লাল নীল হয়ে বাধো বাধো গলায় বলল, ‘ওসব কিছু আদৌ হয়নি আমাদের এখনও।’
‘কি-ক-কি বললি তুই!’
‘যা শুনেছিস তাই।’
‘এটা বিশ্বাস করতে বলছিস?’
‘হুঁ।’
‘তোর যন্ত্রপাতি ঠিক আছে তো? আমার ধারণা ঠিক নেই।’
‘তোকে বলে মহা ভুল করেছি, সব সময় কুৎসিত কথা। শুনতে ভাল লাগে না।’
তন্ময় অবিকল গরুর মত বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ পর বলল, ‘এ রকম হলো কেন?’
‘আমি তোর সঙ্গে কথা বলব না।’
‘প্লীজ, বল না।’
জয় কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, ‘বিয়ের রাতে ও বলল, “আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে ছোঁবেন না।” আমি সোফায় শুলাম। এই আর কি।’
‘এই!’
‘হুম। ওর সম্ভবত কিছু সমস্যা আছে। কিছুটা আঁচ করতে পারছি অবশ্য।’
‘জয়, লিখে রাখ, এক নম্বর গাধা পৃথিবীতে আর নাই। যা আছে সব দু’নম্বর। একটাই আছে, সে তুই। বললাম, লিখে রাখ।’
‘ক্যাঁচক্যাঁচ করিস না, লিখতে হবে না; যা তোরটাই ঠিক।’
জয় খানিকটা উদ্বিগ্ন ছিল, সমস্যা কি এটা তন্ময় জিজ্ঞস করে বসবে না তো আবার। না করাতে বেঁচে গেল। ও কখনোই বলতে পারত না। তন্ময় চা’র কথা বলতে ভেতরে গেলে জয় চারপাশে নজর দেয়ার সময় পেল। রাজ্যের জিনিসপত্রে ঠাসা, এগুলোর সম্ভবত সৃষ্টিছাড়া দাম। কিন্তু যে জিনিসটা যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই। মেঝেতে সুন্দর একটা ডায়েরী গড়াগড়ি খাচ্ছে দেখে হাতে নিয়ে রেখে দিতে গিয়েও কি মনে করে পাতা ওল্টাতে লাগল। একজায়গায় চোখ আটকে গেল। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা-
‘বললে নিমিষেই হও
অপাপবিদ্ধ ভূমিষ্ঠ শিশু আমি।
বললে হোক আলোকিত-
চারদিক ফুলে ছেয়ে গেল সব।
বললে কি কুৎসিত আনন্দ
শিশুটি কাঁদল শিশির-অঝোরে।
বললে হাই চেপে: দূর হ,
নিজের লাশ কাঁদে বয়ে-
তুমিই সব, আমি কিছু না।’
জয় কবিতা-টবিতা বোঝে না তেমন। বুঝতে চেষ্টা করছে তন্ময় কি বিশেষ কোন কারণে এটা টুকে রেখেছে। এসবে ওকে মাথা ঘামাতে কখনও দেখেনি। অপাপবিদ্ধ ভূমিষ্ঠ শিশু আমি।
বললে হোক আলোকিত-
চারদিক ফুলে ছেয়ে গেল সব।
বললে কি কুৎসিত আনন্দ
শিশুটি কাঁদল শিশির-অঝোরে।
বললে হাই চেপে: দূর হ,
নিজের লাশ কাঁদে বয়ে-
তুমিই সব, আমি কিছু না।’
তন্ময় চারতলা ট্রলিতে করে দুনিয়ার সব খাবার নিয়ে এলো। একটা দৈত্য কুঁজো হয়ে ঠেলাগাড়ির মত একটা জিনিস ঠেলছে, দেখার মত ব্যাপার বটে। জয় হাসতে হাসতে বলল, ‘এত খাবার, ফেরি করতে বেরুবি নাকি!’
তন্ময় কিছু বলল না, কি যেন ভাবছে।
‘কিরে, কোন সমস্যা?’
তন্ময় গম্ভীর হয়ে বলল, ‘বুঝতে পারছি না। আমার মা’র স্বামী কি এক ভঙ্গিতে যেন আজ তাকাচ্ছে। দেখে হার্টবিট মিস হচ্ছে।’
‘ছি, তন্ময়, ছি! মা’র স্বামী এই সব কি!’
‘আরে এ বলে কী! হুশ কুত্তা, হুশ! তো যেটা বলছিলাম, মা’র স্বামী-।’
‘আমি উঠি, তন্ময়। ’
‘আহ, রাগ করছিস কেন। আচ্ছা যা, আমার বাব। তো ইনি দুপুরে ফিরে অফিসে আর যাননি, কি রকম অস্বাভাবিক আচরণ করছেন।’
‘অস্বাভাবিক আচরণ মানে?’
‘এই ধর। কি করে তোকে বোঝাই, হিন্দি ছবিতে আমরা দেখি না ভাল বাবারা সন্তানদের সঙ্গে বন্ধু-বন্ধু খেলা খেলেন। ওই রকম একটা কিছু আর কি।’
‘এটাকে অস্বাভাবিক আচরণ বলছিস কেন!’
‘বলছি। তুই খাবারে হাত লাগা। যা পারা যায় শেষ করে ফেলতে হবে, নইলে নষ্ট হবে।’
জয় বলল, ‘এত খাওয়া সম্ভব নাকি? আর নষ্ট হবে কি, তুলে রাখলেই হয়।’
‘ধুর, বেঁচে যাওয়া খাবার তুলে রাখলে ভুঁইফোড় বড়লোকদের মান থাকে নাকি। ফেলে দিতে হয়।’
‘ফেলে দিবি?’
জয়ের মনে হলো শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। অসহ্য রাগে ইচ্ছে করছে সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। তন্ময় ওর বিবর্ণভাব লক্ষ করে বলল, ‘এটা শুনে তোর খুব রাগ হচ্ছে? মনে হচ্ছে না আমাকে খুন করে ফেললে আরাম পাবি?’
‘হ্যাঁ, হচ্ছে।’
‘এটাই সত্য, মিথ্যা বলতে আমার ভাল লাগে না।’
জয় কেবল এই কথাটার জন্যে মনে মনে ওকে ক্ষমা করে দিল। অবশ্য একে ক্ষমা না করেও উপায় নেই। বদরঙ বদমজা একটা জিনিস চিবাতে চিবাতে বলল, ‘হ্যা রে, তুই দশজনের চেয়ে অন্যরকম হলি কেন রে?’
‘অন্যরকম মানে কি, মানুষের মত মনে হয় না? এই, এই দেখ, এটা হাত। এটা পা। আর এইটা হলো গিয়ে- থাক, তুই আবার রেগে যাবি। তোর তো আবার শরীরে রাগের উথাল পাতাল ঢেউ।’
‘তোর সঙ্গে কথা বলাই সমস্যা। ভাল কথা, তোর ডায়েরিতে দেখলাম কিসব লিখে রেখেছিস, “বললে নিমিষেই হও”।’
‘লিখে রেখেছি বেশ করেছি, তো সমস্যাটা কি। চায়ে ক’চামচ চিনি দেব?’
‘কম কম করে এক চামচ দে।’
‘তুই শালা ডায়বেটিস রোগী নাকি।’
‘আবার আজেবাজে কথা বলছিস! ভাল করেই জানিস আমার ডায়বেটিস নেই।’
'থাকবে কোত্থেকে! তোর তো যন্ত্রই নেই। হা হা হা।’
জয় চুপ করে রইল। এর সঙ্গে কথা বলার মানে হয় না। কথা বললেই কথার পিঠে কথা বলবে। তন্ময় বিশাল মগে এমন ভঙ্গিতে লম্বা লম্বা চুমুক দিচ্ছে, মনে হচ্ছে চা না সরবত খাচ্ছে। অথচ একই রকম চায়ে জয় মুখ দিয়ে জিব পুড়িয়ে ফেলেছে। এর তাড়াহুড়া দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে আর বিলম্ব নেই। 'লাস্ট সাপার'-এর মত এটাও ‘লাস্ট টি’।
তন্ময় রকিং চেয়ারে পা উঠিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে দোল খেতে খেতে বলল, ‘আমার মা’র স্বামী- আহা, ওভাবে চোখ লাল করে তাকাসনে। আমার বাবার মনে হয় মাথার ঠিক নেই, বুঝলি। আমার সঙ্গে যে লোক গুণে গুণে কথা বলে নোটবুকে লিখে রাখে, কোন মাসে দু’একটা কথা বেশি বললে অন্য মাসে কম বলে পুষিয়ে নেয়। ওরিআল্লা, আমার চক্ষু তো চড়কগাছ। কী কান্ড, খাওয়ার পর থেকে অনর্গল কথা বলছে আমার সঙ্গে। কথা বলে মনে হয় খুব আরাম পাচ্ছে। নমুনা দেই:
‘বাবা বললেন, তন্ময়, দেশটা যাচ্ছে কোথায়।
আমি বললাম, কই, যাচ্ছে না তো কোথাও। আগের জায়গাতেই আছে।
বাবা দেশ কোথায় যাচ্ছে এ নিয়ে যে মাথা ঘামান এটা আমার জানা ছিল না। আর এ নিয়ে সুযোগ্য পুত্রের সঙ্গে ডিসকাস করবেন এটা অস্টম আশ্চর্য গোছের কিছু একটা। ওনার ধারণা ছেলের সঙ্গে বেশি মাখামাখি হলে বাবারা বাবা থাকবেন না, হাবা হয়ে যাবেন। তারপর বাবা বললেন, তা না, কিন্তু দেশটা যাচ্ছেটা কোথায়!
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, জ্বী, একবার বলেছি, আগের জায়গায়ই আছে। দেখ দেখি কান্ড, মাস তিনেকের কথা। আমার এক বন্ধু, বুঝলি, বহুদিন ছুটি পায় না। আমাকে অনুরোধ করল, আমি যেন টেলিগ্রাম করি, ছুটি পেতে সুবিধে হবে। ওর হাতে টেলিগ্রাম গিয়ে পৌঁছল তিনদিন পর। চিন্তা কর, অথচ অর্ডিনারি চিঠি চট্টগ্রাম পৌঁছে এক দিনে।
আমি বললাম, চিন্তা করার সময় কই। সহজ বুদ্ধি হলো: অর্ডিনারি চিঠির ভেতর টেলিগ্রাম ভরে পাঠিয়ে দেয়া। বাবা অবাক হলেন, চিঠি দিলেই হয়, এর ভেতর টেলিগ্রাম দেয়ার মানে কী।
অ, এইটা বুঝলে না। ধরো, তুমি চিঠিতে লিখলে আমার এখন-তখন অবস্থা। বাতাসের আগে আসো। যে চিঠিটা পাবে সে কি খুব একটা গুরুত্ব দেবে, না অন্যরা? কিন্তু চিঠি খুলে এই কথাটাই টেলিগ্রামে লেখা থাকলে। ঢিং । সেই লোক তোমার প্রিয়জন হলে প্যান্ট নষ্ট করে ফেলবে না? অবশ্য তুমি বেঁচে গেছ, তোমার তেমন কেউ নেই।
জানিস জয়, অন্য সময় এভাবে কথা বললে বাবা তুলকালাম করে ফেলতেন, কাঁচা ডিম মাথায় রাখলে সেদ্ধ হয়ে যেত। আজ কেমন নির্বিকার ভঙ্গিতে বাসে রইলেন।’
জয় বিব্রত গলায় বলল, ‘বাবাকে নিয়ে কেউ-।’
‘জানি, জানি, তুই কি বলবি। বাবার সঙ্গে কেউ এভাবে কথা বলে না, এই তো? তাদের বাবারা কি নিজ থেকে ছেলেকে একবার হ্যালো বলারও প্রয়োজন বোধ করে না। মাসের পর মাস দেশের বাইরে পড়ে থাকে! ছেলে কোথায় যাচ্ছে কি খাচ্ছে-।’
‘ভুল তো সবাই করে। তাই বলে তোর মত ড্রাগ নেয় না। এভাবে আত্মহত্যা করে না।’
‘আসলে তোকে ঠিক বোঝাতে পারব না। ড্রাগ নিলে কি পরিণতি হবে এটা যে জানতাম না এমন না। তখন কি মনে হত জানিস, আমি যেভাবে বেঁচে আছি এটা কোন বেঁচে থাকা নয়। এভাবে না মরে ওভাবে মরলাম, কি আসে যায়।’
‘যা হয়েছে হয়েছে, চিকিৎসা হলেই সেরে উঠবি।’
তন্ময় উদাস হয়ে বলল, ‘কি লাভ, এই তো ভাল।’
জয় এবার রাগী গলায় বলল, ‘মামদোবাজী করবি না। এ পৃথিবীতে নিজ থেকে আসিসনি, মরে যাওয়ার কোন অধিকার তোর নাই। তোর ওপর সৃষ্টিকর্তার, তোর বাবারও অধিকার আছে।’
তন্ময় রাগে এমন লাফিয়ে উঠল জয় ভয় পেয়ে আধ হাত পিছিয়ে গেল। তন্ময় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চেঁচাচ্ছে, ‘তুমি শালা এ দেশের প্রধানমন্ত্রী না প্রেসিডেন্ট, খুব যে ভাষণ দিচ্ছ। আমাকে পৃথিবীতে পাঠানোর আগে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আমি আসতে চাই কি না? হাত পা ধরে সাধছিলাম, পাঠাও-পাঠাও? কেউ বলেছিল, আমাকে তুমি যে পৃথিবীতে পাঠাচ্ছ, এই হলো এর অবস্থা। অ্যাহ, অধিকার! ইচ্ছের বিরুদ্ধে এসেছি, ইচ্ছা হলে থাকব, না হলে থাকব না।’
‘প্লীজ, তুই-।’
‘শান্ত হব? আমার মাথায় খুন চেপে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে তোর মাথাটা ফট করে-।’
‘আজই বলেছিস দু’তিনবার, ডিমের খোসার মত ভেঙে ফেলবি।’
বিদায় নেয়ার সময় জয় তন্ময়ের হাত ধরে আবেগঘন গলায় বলল, তন্ময়, একটা জিনিস চাইব, দিবি?’
‘কি পাগল, না জেনে প্রমিজ করব কি! তুই আমার ওইটা চাইলি, দিয়ে দিতে হবে? হা হা হা।’
‘ফর গড সেক, তন্ময়, কখনও তো সিরিয়াস হ’!’
‘ধানাই-পানাই বাদ দিয়ে কি বলবে বলো, চান্দু।’
জয় গোঁয়ারের মত বলল, ‘তুই আগে প্রমিজ কর। ’
‘আচ্ছা, প্রমিজ করলাম। এবার বল।’
‘তোর চিকিৎসার ব্যাপারে যা করার আমি করব। তুই টুঁ-শব্দও করবি না।’
তন্ময় অন্যরকম গলায় বলল, ‘লাভ নেই রে, আমি শেষ।’
‘এসব বুঝি না, তুই কথা দিয়েছিস । আর শোন, ইভা বলেছে তোকে যেন অবশ্যই বলি ওর সঙ্গে দেখা করতে। কাল আয়।’
‘তুই থাকলে যাব, না কি না থাকলে যাব, এটা বলে যা। হা হা হা।'
*কনক পুরুষ, ৫: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_08.html
**উপন্যাস, কনক পুরুষ: http://tinyurl.com/29uf4sq
বিভাগ
কনক পুরুষ
Sunday, August 8, 2010
কনক পুরুষ: ৫
জয় তন্ময়দের বাড়ি দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। এটাই কী এদের বাড়ি! এ দেখি হুলস্থূল ব্যাপার। মাত্র দু’জনের এ রাজ প্রাসাদের প্রয়োজন কি? যে দেশের অধিকাংশ লোক খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায়, সে দেশে মাত্র দু’জনের জন্যে এ জিনিসটার মানে কি! এই বাড়িটায় ক’টা রুম কে জানে। গোটা ত্রিশেক হলেও একেকজনের জন্যে পনেরোটা করে, কোন অর্থ হয়! আমি এক এক কাঠি ওপরে, আমারটাই সেরা, আমার মত কারও নেই, এই-ই কি কারণ?
বিশাল গেট বন্ধ। ডানপাশে ছোট্ট গার্ডরুম। পুরোদস্তুর পোশাকপরা চোয়াড়ে টাইপের এক লোক এমন ভঙ্গিতে বসে আছে, এখুনি বুঝি গোলাগুলি শুরু হয়ে যাবে। কাউবয়দের মত আবার কায়দা করে পিস্তল ঝুলিয়েছে। সামনের টেবিলে টকটকে লাল ইন্টারকম।
জয় অস্বস্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ইয়ে, এটা তন্ময়দের বাসা তো?’
লোকটা কথা বলে কৃতার্থ করছে এমন ভাব করে বলল, ‘ইশতিয়াক সাহেবের কথা বলছেন কি?’
জয় একটু থমকাল। গার্ড শ্রেণীর লোকরা এভাবে গুছিয়ে কথা বলে ওর জানা ছিল না। থেমে থেমে বলল, ‘হ্যাঁ, ওর ডাক নাম তো তন্ময়।’
‘ডাক নাম টাম কি, ভাল নাম বললেই হয়।’
‘আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছিলাম।’
‘উনি কি বলেছেন আপনাকে আসতে?’
সামনের রেজিস্টারে চোখ বুলিয়ে বিরক্ত গলায় বলল, ‘কই, কেউ দেখা করবে এরকম কোন নোট তো দেখতে পাচ্ছি না?’
জয়ের গা রাগে জ্বলে যাচ্ছে। রাগ চেপে বলল, ‘আমি বলিনি দেখা করতে বলেছে। আপনি বলুন ও আছে কি না।’
‘আরে, আপনি তো বড় ঝামেলা করছেন, উনি আছেন কিনা বলতে পারছি না।’
জয়ের মাথায় ভোঁতা যন্ত্রণা হচ্ছে। পয়সাঅলারা অন্যদের অপমান করার কত যে ফন্দি-ফিকির বের করেছে এই ইয়ত্তা নেই। ছোট্ট নি:শ্বাস ফেলে ভাবল, তন্ময়ের জন্যেই চলে যাওয়া উচিত হবে না। রূঢ় গলায় বলল, ‘আমি তন্ময়ের বন্ধু। দেখুন ও বাসায় আছে কিনা। ও দেখা করতে না চাইলে যাব।’
লোকটা শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কি যেন ভাবল। ইন্টারকমে ভেতরে তার সমপর্যায়ের কারও সঙ্গে চার-পাঁচবার শুধু হুঁ-হুঁ করল। কথা শেষ করে চেয়ার পেছনে হেলিয়ে বেশ ক’বার দোল খেয়ে বলল, ‘ঘুমাচ্ছেন।’
‘ওকে একটু খবর দিলে-।’
‘ঘুম না ভাঙা পর্যন্ত খবর দেয়া যাবে না।’
'তাহলে এখন আমি কি করব?'
‘কি করবেন তার আমি কি জানি। পরে আসেন।’
‘আমি তাহলে এখানে বসে অপেক্ষা করি?’
‘এখানে অপেক্ষা করবেন কি, বাইরে থেকে ঘুরে আসেন।’
জয় রাগে জ্বলতে জ্বলতে একবার ভাবল জিজ্ঞেস করে দেখবে ফারুকী সাহেব আছেন কিনা। ভাবনাটা বাতিল করে দিল। তন্ময় ওর বাবার সঙ্গে ওকে দেখে ফেললে দুয়ে-দুয়ে চার মিলিয়ে ফেলবে।
আচ্ছা, এ মুহূর্তে ওকে কি গ্যাং স্টারদের মত দেখাচ্ছে? অলক্ষে মুখে হাত বুলালো, আজ অবশ্য শেভ করা হয়নি। ও যখন শেভ করবে ভাবছিল তখন বাথরুমে ইভা ঢুকে গেল, আধঘন্টা লাগিয়ে গোসল করল। পরে আর শেভ করার কথা মনেই রইল না।
গার্ড লোকটার ভাব দেখে মনে হচ্ছে গোটা বিশ্ব এর পদতলে। এ সম্ভবত অপরিচিতদের সঙ্গে জঘন্য আচরণ করে সুখ পায়। কে জানে, একে হয়তো রাখাই হয়েছে এসব শিখিয়ে।
‘দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন, যান ঘুরে আসেন।’
জয় আর একটাও কথা না বলে বেরিয়ে এলো। বিড়বিড় করে বলতে থাকল, তন্ময়ের সঙ্গে দেখা না করে যাব না-যাব না। আশেপাশে একটা চা-র দোকানও নেই। এক কাপ চা খেয়ে অনেকক্ষণ সময় কাটানো যেত। সিগারেট ধরিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে থাকল। ঘড়ি দেখল, প্রায় চারটা। চারটা বিশ পর্যন্ত হেঁটে ফিরে আসবে, এরিমধ্যে সাড়ে চারটা বেজে যাবে। তখনও তন্ময়ের ঘুম না ভাঙলে আবার ‘কম্বল প্যারেড’। বারিধারার এ পাশে চারদিকে মহা উৎসাহে কন্সট্রাকশনের কাজ হচ্ছে। এসব বিলাসবহুল বাড়ি শেষ না করেই অনেকে মারা যাবে। কেউবা কাজ শেষ করতে গিয়ে গোল্ড স্মাগলার হয়ে যাবে। এ দেশ এখন কোটিপতি বানানোর মেশিন হয়ে গেছে। পাকিস্তান আমলে শুনত বাইশ পরিবারের কথা। চুরাশির দিকে জানল, চারশো জন। ওই দিন পত্রিকায় পড়ল, গত বছর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী কোটিপতির সংখ্যা আঠারোশো জন। আরও কত আছে কে জানে!
এদের মধ্যে কি পঞ্চাশ জনও পাওয়া যাবে যে সৎ উপায়ে কোটিপতি হয়েছে? সৎ থেকে কি আদৌ সম্ভব? একজন লোকের বেঁচে থাকার জন্যে কত টকা প্রয়োজন? পাশ থেকে একজন রিকশাঅলা জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইজান, যাইবেন?’
জয় নিঃশব্দ হাসিতে মুখ ভরিয়ে মাথা নাড়ল। লোকটা যেতে যেতে ফিরে তাকাল। অপুষ্ট কালো মুখে কৃতজ্ঞতা চুঁইয়ে পড়ছে। এরা কত অল্প পেয়ে তুষ্ট হয়, সুখী হতে যেটা প্রথম শর্ত। এরা কি সুখী? কে জানে!
জয় ভাবল, এদের সম্বন্ধে আমরা কত কম জানি! ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে দেখি আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় অথচ সংখ্যায় এরাই বেশি, এদের সম্বন্ধে কিছুই জানা হয় না। লেখকরা এদের নিয়ে লিখতে গিয়ে এমন জটিল করে লিখবেন, পাঠক আগ্রহ নিয়ে পড়বে না। এটা সম্ভবত এসব লেখকরা ইচ্ছা করেই করেন। আর্ট ফিল্মগোছের কিছু একটা বানাতে গিয়ে লেজে-গোবরে করে ফেলেন।
চারটা পঁচিশ। জয় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে ফিরতে লাগল।
গার্ড হড়বড় করে বলল, ‘কোথায় গেছিলেন? কে খোঁজ করল ছোট সাহেব জানতে চাইছিলেন। নাম বলেন নাই কেন?’
জয় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘জিজ্ঞেস করেন নাই, সেজন্য বলিনি।’
‘কি নাম আপনার?’
‘আপনাকে বলার প্রয়োজন দেখি না, তন্ময়কে দিন কথা বলব।’
গার্ড নিতান্ত অনিচ্ছায় রিসিভারটা এগিয়ে দিল।
‘তন্ময়, জয় বলছিলাম।’
‘ওরে হারামজাদা, তুই!’
‘থ্যাঙ্ক গড, তোর ঘুম ভাঙল তাহলে!’
‘মানে, এখুনি এসে তুই জানলি কেমন করে রে বেটা!'
'এইমাত্র না, চারটায় এসেছি। গার্ড বলল, তুই ঘুমিয়ে আছিস এখন ডাকা যাবে না। এখানে অপেক্ষা করতে চাইলাম, নিষেধ করল। ভবঘুরের মত রাস্তায় ঘুরে এইমাত্র ফিরলাম। এই সব শিখিয়ে লোকজন রাখিস নাকি?’
ওপাশে কবরের নিস্তব্ধতা। জয় উঁচু গলায় বলল, ‘হ্যালো, তন্ময়, হ্যালো।’
তন্ময় হিমশীতল গলায় বলল, ‘গার্ড যে বলল একজন দেখা করতে চাইছিল, সে তাহলে তুই। হাত দিয়ে দেখ তো তোর চোখে চশমা আছে কিনা?’
জয় বিরক্ত হলো, ‘আজেবাজে কথা বলছিস কেন!’
‘খামোশ শুয়ার! হাত দিয়ে দেখ চশমা আছে কিনা!'
‘হাত দিয়ে দেখতে হবে না, আছে। ঘুমানোর সময় ছাড়া সব সময়ই পরি।’
‘তুই যখন গার্ডের সঙ্গে কথা বলছিলি তখনও কি চশমা ছিল?’
‘আহ তন্ময়, কি ছেলেমানুষী, বললাম না ঘুমানোর সময় ছাড়া...!’
‘চোপ রাও, শুয়ার কাহিকা, যা বলেছি তার উত্তর দে।’
‘আরে পাগল, আমি কি চশমা ছাড়া কিছু দেখি? ছিল, তো কি হয়েছে?’
‘হয়নি কিছু। কেউ খোঁজ করছে জেনে আমার মনে হলো তুই হতে পারিস। কেউ তো আর আসে না। শুয়োরের বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করলাম, নাম বলতে পারল না। জিজ্ঞেস করলাম চোখে চশমা ছিল কিনা, কুত্তার বাচ্চা বলল, ছিল না।’
‘বাদ দে তো এসব।’
তন্ময় গরগর করে উঠল, ‘একচুল নড়বি না, জাষ্ট লাইটপোস্ট। আমি আসছি।’
জয় আড়চোখে দেখল লোকটা কেমন বিবর্ণ হয়ে গেছে, এপাশের কথাগুলো শুনেছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, ‘বসেন এখানে।’
জয় বসল না। দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করতে লাগল। দড়াম করে গেটের ছোট খুপরি আছড়ে মারার শব্দ হলো। ছোট হাফপ্যান্ট, ঢোলা গেঞ্জিপরা তন্ময়কে দেখে এ মুহূর্তে অবিকল বাংলা ছবির দৈত্য লাগছে। পোশাক-আশাক অন্যরকম এই যা। গেঞ্জিটা কোত্থেকে জোগাড় করেছে কে জানে! দেখে মনে হচ্ছে মশারীতে দু’টা হাতা লাগানো হয়েছে। হাসি পাচ্ছে। হাসতে গিয়েও হাসল না। দৈত্যর ভাবসাব সুবিধের না। চোখ মুখ দিয়ে ভাপ বেরুচ্ছে।
‘এই, গার্ডের বাচ্চা গার্ড, এর চোখে চশমা দেখা যাচ্ছে?’
‘ভুল হয়ে গেছে, স্যার।’
‘ভুল হয়েছে বলছিস, ভাল। আমাকে ডেকে দেস নাই কেন?’
‘স্যার, ভু-।’
‘আচ্ছা আচ্ছা, এটাও তাহলে ভুল হয়েছে।’
এর কান্ড কারখানা দেখে জয় বিব্রত হয়ে বলল, তন্ময়, বাদ দে তো।’
‘চোপ! কথার মাঝে কথা বললে ফট করে মাথাটা ভেঙে ফেলব। তো, গার্ড সাহেব, এ এখানে অপেক্ষা করতে চেয়েছিল, হাঁকিয়ে দিলি কেন?’
গার্ড তো-তো করে বলল, ‘সা-স্যার, অপরিচিত লোক... আমার সঙ্গে আর্মস আছে, সিকিউরিটির একটা ব্যাপার-।’
‘এ তোকে বলে নাই, এ আমার বন্ধু?’
‘বলেছেন, স্যার, আপনি মানে আমি ভাবলাম-।’
তন্ময় ঘর কাঁপিয়ে বলল, ‘ভেবেছেন সিকিউরিটি তো? এই আর্মস আমি তোর পেছন দিয়ে ঢুকিয়ে দেব। তাহলে দেখবি সিকিউরিটি ঠিক থাকবে।’
জয় গায়ের জোরে সরিয়ে নিয়ে এলো। একটা দৈত্যকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিয়ে আসা চাট্টিখানি কথা না, প্রচুর কাঠ-খড় পোহাতে হলো। এরই মধ্যে ঘেমে গোসল হয়ে গেছে। তন্ময় পাগলের মত বিড়বিড় করছে, ‘বানচোত, আর্মস-এ মরিচ মাখিয়ে দিলে টের পাবি!’
‘ছি, কিসব বলছিস, এই সব বিশ্রী কথা বলতে নেই। তাছাড়া আমাকে চেনে না ঠিকই তো বলেছে। শুধু ধুধু লজ্জায় ফেলে দিলি। ছি!’
এবার রাগ গিয়ে পড়ল জয়ের ওপর। তন্ময় হিসহিস করে বলল, ‘তোকে আমার পছন্দ না। তুই মেয়েমার্কা ছেলে, আরবের শেখরা...।’
জয় হাসি চাপল। ‘আজ সকালেই একবার বলেছিস। আমার মনে আছে, লালা ঝরবে। এবার দয়া করে ঠান্ডা হ।’
দৈত্যটার ঠান্ডা হওয়ার কোন নমুনাই দেখা যাচ্ছে না। থেকে থেকে এর গা কাঁপছে। একে আটকে রাখতে জয়ের বেগ পেতে হচ্ছে।
*কনক পুরুষ, ৬: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_09.html
বিশাল গেট বন্ধ। ডানপাশে ছোট্ট গার্ডরুম। পুরোদস্তুর পোশাকপরা চোয়াড়ে টাইপের এক লোক এমন ভঙ্গিতে বসে আছে, এখুনি বুঝি গোলাগুলি শুরু হয়ে যাবে। কাউবয়দের মত আবার কায়দা করে পিস্তল ঝুলিয়েছে। সামনের টেবিলে টকটকে লাল ইন্টারকম।
জয় অস্বস্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ইয়ে, এটা তন্ময়দের বাসা তো?’
লোকটা কথা বলে কৃতার্থ করছে এমন ভাব করে বলল, ‘ইশতিয়াক সাহেবের কথা বলছেন কি?’
জয় একটু থমকাল। গার্ড শ্রেণীর লোকরা এভাবে গুছিয়ে কথা বলে ওর জানা ছিল না। থেমে থেমে বলল, ‘হ্যাঁ, ওর ডাক নাম তো তন্ময়।’
‘ডাক নাম টাম কি, ভাল নাম বললেই হয়।’
‘আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছিলাম।’
‘উনি কি বলেছেন আপনাকে আসতে?’
সামনের রেজিস্টারে চোখ বুলিয়ে বিরক্ত গলায় বলল, ‘কই, কেউ দেখা করবে এরকম কোন নোট তো দেখতে পাচ্ছি না?’
জয়ের গা রাগে জ্বলে যাচ্ছে। রাগ চেপে বলল, ‘আমি বলিনি দেখা করতে বলেছে। আপনি বলুন ও আছে কি না।’
‘আরে, আপনি তো বড় ঝামেলা করছেন, উনি আছেন কিনা বলতে পারছি না।’
জয়ের মাথায় ভোঁতা যন্ত্রণা হচ্ছে। পয়সাঅলারা অন্যদের অপমান করার কত যে ফন্দি-ফিকির বের করেছে এই ইয়ত্তা নেই। ছোট্ট নি:শ্বাস ফেলে ভাবল, তন্ময়ের জন্যেই চলে যাওয়া উচিত হবে না। রূঢ় গলায় বলল, ‘আমি তন্ময়ের বন্ধু। দেখুন ও বাসায় আছে কিনা। ও দেখা করতে না চাইলে যাব।’
লোকটা শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কি যেন ভাবল। ইন্টারকমে ভেতরে তার সমপর্যায়ের কারও সঙ্গে চার-পাঁচবার শুধু হুঁ-হুঁ করল। কথা শেষ করে চেয়ার পেছনে হেলিয়ে বেশ ক’বার দোল খেয়ে বলল, ‘ঘুমাচ্ছেন।’
‘ওকে একটু খবর দিলে-।’
‘ঘুম না ভাঙা পর্যন্ত খবর দেয়া যাবে না।’
'তাহলে এখন আমি কি করব?'
‘কি করবেন তার আমি কি জানি। পরে আসেন।’
‘আমি তাহলে এখানে বসে অপেক্ষা করি?’
‘এখানে অপেক্ষা করবেন কি, বাইরে থেকে ঘুরে আসেন।’
জয় রাগে জ্বলতে জ্বলতে একবার ভাবল জিজ্ঞেস করে দেখবে ফারুকী সাহেব আছেন কিনা। ভাবনাটা বাতিল করে দিল। তন্ময় ওর বাবার সঙ্গে ওকে দেখে ফেললে দুয়ে-দুয়ে চার মিলিয়ে ফেলবে।
আচ্ছা, এ মুহূর্তে ওকে কি গ্যাং স্টারদের মত দেখাচ্ছে? অলক্ষে মুখে হাত বুলালো, আজ অবশ্য শেভ করা হয়নি। ও যখন শেভ করবে ভাবছিল তখন বাথরুমে ইভা ঢুকে গেল, আধঘন্টা লাগিয়ে গোসল করল। পরে আর শেভ করার কথা মনেই রইল না।
গার্ড লোকটার ভাব দেখে মনে হচ্ছে গোটা বিশ্ব এর পদতলে। এ সম্ভবত অপরিচিতদের সঙ্গে জঘন্য আচরণ করে সুখ পায়। কে জানে, একে হয়তো রাখাই হয়েছে এসব শিখিয়ে।
‘দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন, যান ঘুরে আসেন।’
জয় আর একটাও কথা না বলে বেরিয়ে এলো। বিড়বিড় করে বলতে থাকল, তন্ময়ের সঙ্গে দেখা না করে যাব না-যাব না। আশেপাশে একটা চা-র দোকানও নেই। এক কাপ চা খেয়ে অনেকক্ষণ সময় কাটানো যেত। সিগারেট ধরিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে থাকল। ঘড়ি দেখল, প্রায় চারটা। চারটা বিশ পর্যন্ত হেঁটে ফিরে আসবে, এরিমধ্যে সাড়ে চারটা বেজে যাবে। তখনও তন্ময়ের ঘুম না ভাঙলে আবার ‘কম্বল প্যারেড’। বারিধারার এ পাশে চারদিকে মহা উৎসাহে কন্সট্রাকশনের কাজ হচ্ছে। এসব বিলাসবহুল বাড়ি শেষ না করেই অনেকে মারা যাবে। কেউবা কাজ শেষ করতে গিয়ে গোল্ড স্মাগলার হয়ে যাবে। এ দেশ এখন কোটিপতি বানানোর মেশিন হয়ে গেছে। পাকিস্তান আমলে শুনত বাইশ পরিবারের কথা। চুরাশির দিকে জানল, চারশো জন। ওই দিন পত্রিকায় পড়ল, গত বছর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী কোটিপতির সংখ্যা আঠারোশো জন। আরও কত আছে কে জানে!
এদের মধ্যে কি পঞ্চাশ জনও পাওয়া যাবে যে সৎ উপায়ে কোটিপতি হয়েছে? সৎ থেকে কি আদৌ সম্ভব? একজন লোকের বেঁচে থাকার জন্যে কত টকা প্রয়োজন? পাশ থেকে একজন রিকশাঅলা জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইজান, যাইবেন?’
জয় নিঃশব্দ হাসিতে মুখ ভরিয়ে মাথা নাড়ল। লোকটা যেতে যেতে ফিরে তাকাল। অপুষ্ট কালো মুখে কৃতজ্ঞতা চুঁইয়ে পড়ছে। এরা কত অল্প পেয়ে তুষ্ট হয়, সুখী হতে যেটা প্রথম শর্ত। এরা কি সুখী? কে জানে!
জয় ভাবল, এদের সম্বন্ধে আমরা কত কম জানি! ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে দেখি আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় অথচ সংখ্যায় এরাই বেশি, এদের সম্বন্ধে কিছুই জানা হয় না। লেখকরা এদের নিয়ে লিখতে গিয়ে এমন জটিল করে লিখবেন, পাঠক আগ্রহ নিয়ে পড়বে না। এটা সম্ভবত এসব লেখকরা ইচ্ছা করেই করেন। আর্ট ফিল্মগোছের কিছু একটা বানাতে গিয়ে লেজে-গোবরে করে ফেলেন।
চারটা পঁচিশ। জয় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে ফিরতে লাগল।
গার্ড হড়বড় করে বলল, ‘কোথায় গেছিলেন? কে খোঁজ করল ছোট সাহেব জানতে চাইছিলেন। নাম বলেন নাই কেন?’
জয় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘জিজ্ঞেস করেন নাই, সেজন্য বলিনি।’
‘কি নাম আপনার?’
‘আপনাকে বলার প্রয়োজন দেখি না, তন্ময়কে দিন কথা বলব।’
গার্ড নিতান্ত অনিচ্ছায় রিসিভারটা এগিয়ে দিল।
‘তন্ময়, জয় বলছিলাম।’
‘ওরে হারামজাদা, তুই!’
‘থ্যাঙ্ক গড, তোর ঘুম ভাঙল তাহলে!’
‘মানে, এখুনি এসে তুই জানলি কেমন করে রে বেটা!'
'এইমাত্র না, চারটায় এসেছি। গার্ড বলল, তুই ঘুমিয়ে আছিস এখন ডাকা যাবে না। এখানে অপেক্ষা করতে চাইলাম, নিষেধ করল। ভবঘুরের মত রাস্তায় ঘুরে এইমাত্র ফিরলাম। এই সব শিখিয়ে লোকজন রাখিস নাকি?’
ওপাশে কবরের নিস্তব্ধতা। জয় উঁচু গলায় বলল, ‘হ্যালো, তন্ময়, হ্যালো।’
তন্ময় হিমশীতল গলায় বলল, ‘গার্ড যে বলল একজন দেখা করতে চাইছিল, সে তাহলে তুই। হাত দিয়ে দেখ তো তোর চোখে চশমা আছে কিনা?’
জয় বিরক্ত হলো, ‘আজেবাজে কথা বলছিস কেন!’
‘খামোশ শুয়ার! হাত দিয়ে দেখ চশমা আছে কিনা!'
‘হাত দিয়ে দেখতে হবে না, আছে। ঘুমানোর সময় ছাড়া সব সময়ই পরি।’
‘তুই যখন গার্ডের সঙ্গে কথা বলছিলি তখনও কি চশমা ছিল?’
‘আহ তন্ময়, কি ছেলেমানুষী, বললাম না ঘুমানোর সময় ছাড়া...!’
‘চোপ রাও, শুয়ার কাহিকা, যা বলেছি তার উত্তর দে।’
‘আরে পাগল, আমি কি চশমা ছাড়া কিছু দেখি? ছিল, তো কি হয়েছে?’
‘হয়নি কিছু। কেউ খোঁজ করছে জেনে আমার মনে হলো তুই হতে পারিস। কেউ তো আর আসে না। শুয়োরের বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করলাম, নাম বলতে পারল না। জিজ্ঞেস করলাম চোখে চশমা ছিল কিনা, কুত্তার বাচ্চা বলল, ছিল না।’
‘বাদ দে তো এসব।’
তন্ময় গরগর করে উঠল, ‘একচুল নড়বি না, জাষ্ট লাইটপোস্ট। আমি আসছি।’
জয় আড়চোখে দেখল লোকটা কেমন বিবর্ণ হয়ে গেছে, এপাশের কথাগুলো শুনেছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, ‘বসেন এখানে।’
জয় বসল না। দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করতে লাগল। দড়াম করে গেটের ছোট খুপরি আছড়ে মারার শব্দ হলো। ছোট হাফপ্যান্ট, ঢোলা গেঞ্জিপরা তন্ময়কে দেখে এ মুহূর্তে অবিকল বাংলা ছবির দৈত্য লাগছে। পোশাক-আশাক অন্যরকম এই যা। গেঞ্জিটা কোত্থেকে জোগাড় করেছে কে জানে! দেখে মনে হচ্ছে মশারীতে দু’টা হাতা লাগানো হয়েছে। হাসি পাচ্ছে। হাসতে গিয়েও হাসল না। দৈত্যর ভাবসাব সুবিধের না। চোখ মুখ দিয়ে ভাপ বেরুচ্ছে।
‘এই, গার্ডের বাচ্চা গার্ড, এর চোখে চশমা দেখা যাচ্ছে?’
‘ভুল হয়ে গেছে, স্যার।’
‘ভুল হয়েছে বলছিস, ভাল। আমাকে ডেকে দেস নাই কেন?’
‘স্যার, ভু-।’
‘আচ্ছা আচ্ছা, এটাও তাহলে ভুল হয়েছে।’
এর কান্ড কারখানা দেখে জয় বিব্রত হয়ে বলল, তন্ময়, বাদ দে তো।’
‘চোপ! কথার মাঝে কথা বললে ফট করে মাথাটা ভেঙে ফেলব। তো, গার্ড সাহেব, এ এখানে অপেক্ষা করতে চেয়েছিল, হাঁকিয়ে দিলি কেন?’
গার্ড তো-তো করে বলল, ‘সা-স্যার, অপরিচিত লোক... আমার সঙ্গে আর্মস আছে, সিকিউরিটির একটা ব্যাপার-।’
‘এ তোকে বলে নাই, এ আমার বন্ধু?’
‘বলেছেন, স্যার, আপনি মানে আমি ভাবলাম-।’
তন্ময় ঘর কাঁপিয়ে বলল, ‘ভেবেছেন সিকিউরিটি তো? এই আর্মস আমি তোর পেছন দিয়ে ঢুকিয়ে দেব। তাহলে দেখবি সিকিউরিটি ঠিক থাকবে।’
জয় গায়ের জোরে সরিয়ে নিয়ে এলো। একটা দৈত্যকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিয়ে আসা চাট্টিখানি কথা না, প্রচুর কাঠ-খড় পোহাতে হলো। এরই মধ্যে ঘেমে গোসল হয়ে গেছে। তন্ময় পাগলের মত বিড়বিড় করছে, ‘বানচোত, আর্মস-এ মরিচ মাখিয়ে দিলে টের পাবি!’
‘ছি, কিসব বলছিস, এই সব বিশ্রী কথা বলতে নেই। তাছাড়া আমাকে চেনে না ঠিকই তো বলেছে। শুধু ধুধু লজ্জায় ফেলে দিলি। ছি!’
এবার রাগ গিয়ে পড়ল জয়ের ওপর। তন্ময় হিসহিস করে বলল, ‘তোকে আমার পছন্দ না। তুই মেয়েমার্কা ছেলে, আরবের শেখরা...।’
জয় হাসি চাপল। ‘আজ সকালেই একবার বলেছিস। আমার মনে আছে, লালা ঝরবে। এবার দয়া করে ঠান্ডা হ।’
দৈত্যটার ঠান্ডা হওয়ার কোন নমুনাই দেখা যাচ্ছে না। থেকে থেকে এর গা কাঁপছে। একে আটকে রাখতে জয়ের বেগ পেতে হচ্ছে।
*কনক পুরুষ, ৬: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_09.html
বিভাগ
কনক পুরুষ
Saturday, August 7, 2010
ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: ৩
আমাকে খুব ভুগিয়েছে যেটা সেটা হচ্ছে, এই শিশুদের চিকিৎসা সমস্যা। কোন ডাক্তার মহোদয় যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। এতগুলো বাচ্চাকে ওখান থেকে নিয়ে এসে এখানে দেখানোটা কঠিন। ডাক্তার মহোদয়দের কেজি-কেজি তৈল মর্দন করেও কোন লাভ হচ্ছিল না। এমন না তিনি বিনে পয়সায় দেখে দেবেন। একটা সম্মানি তাদের দেয়া হবে এটাও জানানো হয়েছিল।
একজন এমবিবিএস ডাক্তার সাহেবকে অনেক বলে-কয়ে রাজি করানো হয়েছিল। ওনাকে অন্যরা এবং আমি সবাই প্রাণপণে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম এই স্কুলগুলো চলছে কষ্টেসৃষ্টে। যাওয়ার পূর্বে তিনি জানিয়ে দিলেন, ওনাকে আনা-নেয়ার পর এক হাজার টাকা দিতেই হবে। এই দাবী করলে আমার মনটাই খারাপ হয়ে যায়। এই দেশের বেশিরভাগ ডাক্তাররাই নীচ-লোভী, এঁদের সীমাহীন লোভ! এবং এঁরা অমর!
অথচ আমি এঁদেরকে বলি, দ্বিতীয় ঈশ্বর। মুমূর্ষু কোন মানুষ যখন আধ-জবাই পশুর মত ছটফট করতে থাকে ঠিক সেই মুহূর্তে একজন ডাক্তারের উপস্থিতিকে মনে হয় উপরে ঈশ্বর আর নীচে দ্বিতীয় ঈশ্বর।
ব্যতিক্রমও আছেন অনেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইফুলের যখন দু-পা কাটা যায় তখন তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। সেই মুহূর্তে পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসক আরিফ আনোয়ার তাঁর নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে সাইফুলকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
পূর্বের একটা লেখায় লিখেছিলাম [১], এই একটা পেশার প্রতি আমার ঈর্ষা আছে। আমি কিছুই হতে পারিনি এই নিয়ে আমার কখনও হা-হুতাশ ছিল না কেবল মনে হতো ডাক্তার হতে পারলে বেশ হতো। অন্তত হাঁটতে-শুতে-বসতে মানুষের জন্য কিছু একটা করা যেত। অসুস্থ একটা মানুষ যখন শেষ আশাটা-হাল ছেড়ে দেয় তখন তার পাশে দাঁড়াতে পারাটা যে আনন্দের এটা লিখে কেমন করে বোঝাই?
ডাক্তার নামের মানুষটাকে [২] ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুলে নিয়ে যাই। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছি তখনও স্কুল শুরু হওয়ার সময় হয়নি। বাচ্চারা দেখলাম, রিকশার টায়ার দিয়ে চমৎকার গাড়ি চালাচ্ছে। আফসোস হলো, সঙ্গে একটা ফুটবল নিয়ে আসলে মন্দ হতো না, বাচ্চারা খেলত! ফুটবলে দু-চার লাথি আমিও দিলে আটকাত কে!
ডাক্তার এখানে বাচ্চাদের যতটুকু দেখার দেখে দিয়েছেন।
আমার তীব্র আগ্রহ ছিল নার্গিস নামের মেয়েটিকে দেখানো। বাচ্চাদের মধ্যে এই কেবল চোখে দেখতে পায় না। এই মেয়েটার কখনও দেখতে পারবে কি না এটা জানাটা আমার বড়ো জরুরি। এই ডাক্তার যদিও চোখের ডাক্তার না তবুও খানিকটা হলেও তো ধারণা পাওয়া যাবে। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা যায়, খানিকটা হলেও সম্ভাবনা আছে। আমি চেষ্টা করব এই মেয়েটাকে ভাল একটা চোখের ডাক্তার দেখাতে।
এই বাচ্চাদের বাবা-মা, যাদের সমস্যা প্রবল এদেরকে তিনি যে ক্লিনিকে বসেন সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে। একবারে সবাইকে দেখা তো সম্ভব না, ঠিক হয়েছে প্রতি সপ্তাহে দু-তিনজন করে দেখে দেবেন। কারণ এখানে তিনি আসেনই সপ্তাহে একদিন।
আমাকে খুব বেগ পেতে হয় ডাক্তার নামের মানুষটার ছবি উঠাতে কারণ এতে তাঁর বড়ো অনীহা। কিন্তু আমার চিন্তা অন্য, অন্য ডাক্তাররা অন্তত এটা দেখে খানিকটা লজ্জা পাক, অন্তত লজ্জা স্থানটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করুক।
*ইশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_05.html
সহায়ক লিংক:
১. মা এবং তার অদেখা সন্তান: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_10.html
২. ডাক্তার নামের মানুষটা: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_06.html
... ... ...
আজ হুট করে মনে হলো একটা চক্কর দিয়ে আসি। ছাত্র-ছাত্রী ছিল ২৬ জন। আজ দেখছি আরেকজন বেড়েছে! চোখে দেখতে পায় না এমন আরেকটা ছেলে বিড়বিড় করছিল, আমিও পড়তাম।
আমি তাকে বলি, তুমি টিচারের সঙ্গে কথা বলো, তোমাকেও পড়াবে। সব মিলিয়ে দাঁড়াল ২৮ জন! আমি খানিকটা শংকিত, এই ২৮ জন ছাত্র-ছাত্রীকে টিচার পড়াতে পারবে তো, খুব বেশি চাপ হয়ে যাচ্ছে না?
আজ সঙ্গে ফুটবল নিতে ভুল হয় না। বলটা এদের দেখানো মাত্র স্কুলের সমস্ত শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এরা যে আচরণ করে মনে হচ্ছিল এটা বিশ্বকাপ!
পরে এদের কাছে আমি জানতে চাই, এটা দিয়ে কি কেবল তোমরাই খেলবা, মেয়েরা খেলব না?
ছেলেদের সাফ উত্তর, মেয়েরা খেলব না, এইটা মেয়েদের খেলা না।
আমি জানতে চাই, কেন? মেয়েরা তোমাদের সাথে পড়লে সমস্যা নাই কিন্তু খেললে সমস্যা হবে কেন? তোমরা যদি মেয়েদেরকে একেবারেই খেলায় না নাও তাহলে খেলা বন্ধ।
এরা মুখ শুকিয়ে রাজি হয়। দেখা যাক, কেবল কি ছেলেরাই খেলে নাকি মেয়েদেরকেও খেলায় নেয়...।
আপডেট: ১৮ আগস্ট, ২০১০
আজ এখানে এসেছি অন্য কাজে। উঁচু এক টিলা থেকে যখন ছবি উঠাচ্ছি, মেয়েদের কাউকে এখানে খেলতে দেখলাম না! ছেলেরা কী দাদাগিরি দেখানো শুরু করে দিল?
পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ঘটনা এটা না, মেয়েরা তখন সেলাইয়ের কাজ শিখছিল।
একজন এমবিবিএস ডাক্তার সাহেবকে অনেক বলে-কয়ে রাজি করানো হয়েছিল। ওনাকে অন্যরা এবং আমি সবাই প্রাণপণে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম এই স্কুলগুলো চলছে কষ্টেসৃষ্টে। যাওয়ার পূর্বে তিনি জানিয়ে দিলেন, ওনাকে আনা-নেয়ার পর এক হাজার টাকা দিতেই হবে। এই দাবী করলে আমার মনটাই খারাপ হয়ে যায়। এই দেশের বেশিরভাগ ডাক্তাররাই নীচ-লোভী, এঁদের সীমাহীন লোভ! এবং এঁরা অমর!
অথচ আমি এঁদেরকে বলি, দ্বিতীয় ঈশ্বর। মুমূর্ষু কোন মানুষ যখন আধ-জবাই পশুর মত ছটফট করতে থাকে ঠিক সেই মুহূর্তে একজন ডাক্তারের উপস্থিতিকে মনে হয় উপরে ঈশ্বর আর নীচে দ্বিতীয় ঈশ্বর।
ব্যতিক্রমও আছেন অনেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইফুলের যখন দু-পা কাটা যায় তখন তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। সেই মুহূর্তে পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসক আরিফ আনোয়ার তাঁর নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে সাইফুলকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
পূর্বের একটা লেখায় লিখেছিলাম [১], এই একটা পেশার প্রতি আমার ঈর্ষা আছে। আমি কিছুই হতে পারিনি এই নিয়ে আমার কখনও হা-হুতাশ ছিল না কেবল মনে হতো ডাক্তার হতে পারলে বেশ হতো। অন্তত হাঁটতে-শুতে-বসতে মানুষের জন্য কিছু একটা করা যেত। অসুস্থ একটা মানুষ যখন শেষ আশাটা-হাল ছেড়ে দেয় তখন তার পাশে দাঁড়াতে পারাটা যে আনন্দের এটা লিখে কেমন করে বোঝাই?
ডাক্তার নামের মানুষটাকে [২] ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুলে নিয়ে যাই। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছি তখনও স্কুল শুরু হওয়ার সময় হয়নি। বাচ্চারা দেখলাম, রিকশার টায়ার দিয়ে চমৎকার গাড়ি চালাচ্ছে। আফসোস হলো, সঙ্গে একটা ফুটবল নিয়ে আসলে মন্দ হতো না, বাচ্চারা খেলত! ফুটবলে দু-চার লাথি আমিও দিলে আটকাত কে!
ডাক্তার এখানে বাচ্চাদের যতটুকু দেখার দেখে দিয়েছেন।
আমার তীব্র আগ্রহ ছিল নার্গিস নামের মেয়েটিকে দেখানো। বাচ্চাদের মধ্যে এই কেবল চোখে দেখতে পায় না। এই মেয়েটার কখনও দেখতে পারবে কি না এটা জানাটা আমার বড়ো জরুরি। এই ডাক্তার যদিও চোখের ডাক্তার না তবুও খানিকটা হলেও তো ধারণা পাওয়া যাবে। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা যায়, খানিকটা হলেও সম্ভাবনা আছে। আমি চেষ্টা করব এই মেয়েটাকে ভাল একটা চোখের ডাক্তার দেখাতে।
এই বাচ্চাদের বাবা-মা, যাদের সমস্যা প্রবল এদেরকে তিনি যে ক্লিনিকে বসেন সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে। একবারে সবাইকে দেখা তো সম্ভব না, ঠিক হয়েছে প্রতি সপ্তাহে দু-তিনজন করে দেখে দেবেন। কারণ এখানে তিনি আসেনই সপ্তাহে একদিন।
আমাকে খুব বেগ পেতে হয় ডাক্তার নামের মানুষটার ছবি উঠাতে কারণ এতে তাঁর বড়ো অনীহা। কিন্তু আমার চিন্তা অন্য, অন্য ডাক্তাররা অন্তত এটা দেখে খানিকটা লজ্জা পাক, অন্তত লজ্জা স্থানটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করুক।
*ইশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_05.html
সহায়ক লিংক:
১. মা এবং তার অদেখা সন্তান: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_10.html
২. ডাক্তার নামের মানুষটা: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_06.html
... ... ...
আজ হুট করে মনে হলো একটা চক্কর দিয়ে আসি। ছাত্র-ছাত্রী ছিল ২৬ জন। আজ দেখছি আরেকজন বেড়েছে! চোখে দেখতে পায় না এমন আরেকটা ছেলে বিড়বিড় করছিল, আমিও পড়তাম।
আমি তাকে বলি, তুমি টিচারের সঙ্গে কথা বলো, তোমাকেও পড়াবে। সব মিলিয়ে দাঁড়াল ২৮ জন! আমি খানিকটা শংকিত, এই ২৮ জন ছাত্র-ছাত্রীকে টিচার পড়াতে পারবে তো, খুব বেশি চাপ হয়ে যাচ্ছে না?
আজ সঙ্গে ফুটবল নিতে ভুল হয় না। বলটা এদের দেখানো মাত্র স্কুলের সমস্ত শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এরা যে আচরণ করে মনে হচ্ছিল এটা বিশ্বকাপ!
পরে এদের কাছে আমি জানতে চাই, এটা দিয়ে কি কেবল তোমরাই খেলবা, মেয়েরা খেলব না?
ছেলেদের সাফ উত্তর, মেয়েরা খেলব না, এইটা মেয়েদের খেলা না।
আমি জানতে চাই, কেন? মেয়েরা তোমাদের সাথে পড়লে সমস্যা নাই কিন্তু খেললে সমস্যা হবে কেন? তোমরা যদি মেয়েদেরকে একেবারেই খেলায় না নাও তাহলে খেলা বন্ধ।
এরা মুখ শুকিয়ে রাজি হয়। দেখা যাক, কেবল কি ছেলেরাই খেলে নাকি মেয়েদেরকেও খেলায় নেয়...।
আপডেট: ১৮ আগস্ট, ২০১০
আজ এখানে এসেছি অন্য কাজে। উঁচু এক টিলা থেকে যখন ছবি উঠাচ্ছি, মেয়েদের কাউকে এখানে খেলতে দেখলাম না! ছেলেরা কী দাদাগিরি দেখানো শুরু করে দিল?
পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ঘটনা এটা না, মেয়েরা তখন সেলাইয়ের কাজ শিখছিল।
বিভাগ
আমাদের ইশকুল: দুই
Subscribe to:
Posts (Atom)























