Friday, July 30, 2010

দেশপ্রেমিক (!)

কখনও কখনও অতি বুদ্ধিমান, অতি দেশপ্রেমিককে যখন দেখি তখন স্তব্ধ হয়ে ভাবি, কী বুদ্ধিমান, কী দেশপ্রেমিক! আহা, এদের কথা লিখে শেষ করি কেমন করে?
তৎকালীন মনোহরদী থানার বিএনপি সভাপতি সিরাজুল হক মাস্টার বলেছিলেন, 
"যারা পোস্টারে-লিফলেটে 'আল্লাহ সর্বশক্তিমান' লিখেন তাদেরকে বলছি, আল্লাহ বাংলা পড়েন নাই, তাই 'সর্বশক্তিমান' কথাটা আল্লাহ বুঝেন না। এখন থেকে 'আল্লাহু আকবর' লিখবেন, আল্লাহ বুঝবেন।"
তাই তো! এটা আমাদের মাথায় এলো না কেন? আল্লা বাংলা বুঝবেন কেমন করে? আহা, মাস্টার সাহেবের মত বুদ্ধি যে আমাদের নাই। এর বুদ্ধির কাছে আইনস্টাইন [১] কোন ছার! কী বুদ্ধিমান (!)।

বাংলাদেশের ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের চেয়ারম্যান মওলানা (!) শামসুল হক জেহাদী বলেছিলেন,
"৭১-এ ৩০ লাখ মানুষ হত্যার অপরাধে গোলাম আযমসহ ৩০ লাখ জামাত-শিবির কর্মীকে জনসমক্ষে কতল করতে হবে। এ জন্যে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।"
এমন জেহাদীর মত দেশপ্রেমিকের কাছে মশিহুর রহমানের [২] মত দেশপ্রেমিক চাপা পড়ে যান। জেহাদীর সঙ্গে মশিহুর রহমানের তুলনা করাটাই ধৃষ্টতার সামিল! কী দেশপ্রেমিক(!)।
জেহাদী সাহেব উপায় বাতলে দিয়েছেন কিন্তু কিছু বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেননি। যেমন ৩০ লক্ষ মানুষকে জনসমক্ষে কতল করার সময় শিশু দুর্বলচিত্তদের কেমন করে ঘরে আটকে রাখতে হবে। এই বিপুল রক্ত, মৃত মানবদেহের কি গতি হবে? ওহে জেহাদী, এই ৩০ লক্ষ মানুষের শব পচে যে মহামারী ছড়িয়ে পড়বে এতে না আবার গোটা দেশ সাফ হয়ে যায়! জেহাদী, আপনি বাঁচবেন তো?

তেমনি ব্লগস্ফিয়ারেও এমন কিছু দেশপ্রেমিকের দেখা পেয়ে চমকে উঠি। নমুনা:
পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় ৮০ জন মারা গেছে অসংখ্য মানুষ পঙ্গু হয়ে গেছে। এই নিয়ে এই দেশপ্রেমিক (!) লেখাটা দিয়েছেন। এই লেখা নিয়ে অন্য দেশপ্রেমিকরা (!) মন্তব্য করেছেন:

 
এদের দেশপ্রেম আকাশ ছাড়িয়ে গেছে সম্ভবত এই কারণে পাকিস্তান আর্মি আমাদের উপর সীমাহীন অন্যায় করেছিল। 
এটা সত্য পাকিস্তানি আর্মিরা সৈনিক ছিল না, ছিল সাইকোপ্যাথ [৩]। কিন্তু সাইকোপ্যাথের মা-ও সাইকোপ্যাথ হবে নাকি? মা তো মা-ই, সে সাইকোপ্যাথের মা, নাকি মাছের মা [৪]; পার্থক্য কী!
প্রার্থনাস্থল, সেটা কোন ধর্মের এটা আলোচ্য বিষয় না, এটা আদিমানুষের হলেও কি আসে যায়! কেউ পাথরকে ঈশ্বরতুল্য মনে করে, করুক না; সমস্যা কোথায়! অন্যের মত, বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করতে না পারলে দানব আর মানবের মধ্যে ফারাক কোথায়!

আর মারা গেছে পশু না, মানব-সন্তান। ভাল কথা, এই দেশে কি পাকিস্তানি জনগণ এসে অত্যাচার করেছে, নাকি পাকিস্তান আর্মি? কতিপয় রাজনীতিবিদ, জেনারেল মিলে সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত পালন করে আর্মি- এদের এই শিক্ষা দিয়েই গড়ে তোলা হয়, চেইন অভ কমান্ডের পালন। 
এই দেশেরই নাগরিক আদিমানুষদের উপর বিভিন্ন সময়ে যে অন্যায়-অত্যাচার করা হয়েছে এটা কি আমরা করেছি, নাকি আর্মি? দূরত্বের কারণে পাকিস্তানি জনগণ আমাদের সঙ্গে যেটা করতে পারেনি সেটা এই দেশের কিছু জনগণ করে দেখিয়ে দিয়েছে এই আদিমানুষদের প্রতি!
আমি এক লেখায় লিখেছিলাম, যথাসময়ে সমস্ত অন্যায়, খুনের বিচার হওয়া প্রয়োজন ছিল [৫] এটা আমরা করতে পারিনি, এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমাদের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে ৭১-এর খুনিদের সঙ্গে গলাগলি করেছি। কেউ কেবল গলাগলি, কেউ-বা গলা ধরে ঝুলে ছিল; পার্থক্য এটাই। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের একটা দলও বুকে হাত দিয়ে এটা অস্বীকার করতে পারবে না।

ইসরাইলের মত দেশপ্রেম আমাদের ছিল না। যদিও এর জন্য বিশ্বব্যাপি নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছিল কিন্তু এরা গা করেনি। লক্ষ-লক্ষ খুনের সিদ্ধান্তদাতা আইকম্যানকে শাস্তি দেয়ার জন্য এরা সংবিধান পর্যন্ত বদলে ফেলেছিল। ইসরাইলের সংবিধানে মৃত্যুদন্ড দেয়ার বিধান ছিল না। আত্মগোপনকারী নাৎসি জেনারেল আইকম্যানকে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইসরাইলি মোসাদ এজেন্টরা কিডন্যাপ করে ইসরাইলে নিয়ে আসে। তখন তার বিচার শুরু করা আগে তাদের সংবিধান পর্যন্ত বদলে নেয়, সংবিধান সংশোধন করে মৃত্যুদন্ডের ব্যবস্থা চালু করে। তারপর আইকম্যানের বিচার, মৃত্যুদন্ড এবং সেই মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। একজন মানুষকে ফাঁসি দেবার জন্য একটি দেশের সংবিধান পরিবর্তন করার নজির সম্ভবত পৃথিবীতে আর নেই!

এই সব দেশপ্রেমিক, নব্য মুক্তিযোদ্ধারা [৬] কি চাইছেন, আমরাও মানব থেকে দানব [৭] হয়ে যাই? 'খোদা না খাস্তা' আমাদের মসজিদে যদি বোমা ফাটে তখন আদিমানুষরা [৮] যদি এই নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে কেমন লাগবে আমাদের...? 
(মাশাল্লা, একটা চেহারা থাকলেই বা মাথায় গামছা বাঁধলেই মাথায় ঘিলু নামের পদার্থ থাকবেই, এটা জোর দিয়ে বলা মুশকিল।)

*আদিমানুষদের নিয়ে আমার কেবলি মনে হচ্ছে, আমরা এদের সঙ্গে যা করছি, একেকটা বিষবৃক্ষ রোপণ করছি; যে ঘৃণার বীজ বপন করছি এর পরিণাম ভেবে শিউরে উঠি। আমাদের এই প্রজন্ম পাকিস্তানিদের প্রতি যে ঘৃণা নিয়ে নিয়ে বড়ো হচ্ছে তারচে আমাদের প্রতি অনেক তীব্র ঘৃণা নিয়ে আদিমানুষদের নতুন প্রজন্ম বড়ো হচ্ছে। এর পরিণাম শুভ হতে পারে না, ভয়াবহ।
সম্প্রতি জামাল ভাস্কর আদিমানুষদের এলাকা থেকে ঘুরে এসেছেন। অজানা কিছু তথ্য নিয়ে ধারাবাহিক একটা লেখা লিখেছেন। লিংক:
হেথাক তুকে মানাইছে নারে: http://www.amrabondhu.com/vashkar/1591

 সহায়ক লিংক:
১. আইনস্টাইন: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_19.html 
২. মশিহুর রহমান: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_06.html 
৩. সাইকোপ্যাথ: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_09.html 
৪. মাছের জন্য এলিজি: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_6002.html 
৫. সমস্ত খুনের বিচার: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_19.html 
৬. নব্য মুক্তিযোদ্ধা: http://www.ali-mahmed.com/2008/12/blog-post_8439.html 
৭. দানব: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_493.html 
৮. আদিমানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_23.html

2 comments:

সুব্রত said...

এই সব মহান দেশপ্রেমিকের কাছে আমার প্রশ্ন: আজ যদি আদনান সামি, কিংবা ইমরান খান অজ্ঞাত আততায়ীর গুলিতে নিহত হন, তখনও কি আপনারা ভাঙা রেকর্ড বাজাবেন: 'বেশ হয়েছে! পাকির বাচ্চা সাফ হয়েছে!'?

উত্তরটা আমি জানি। :)
আদনান সামির মৃত্যুতে দুঃখ পাবেন, কারণ, লোকটা ভাল গায়; ইমরান খান মরলে চোখের জলে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলবেন; লোকটা কী দারুণ খেলত, গো!
আশিজন পাকিস্তানির দুর্ভাগ্য, তারা সেলিব্রেটি নন!

।আলী মাহমেদ। said...

এটা একটা পয়েন্ট।

তবে, মগজ জমা রেখে, মাথায় গামছা বেঁধে দেশপ্রেমিক সাজার শর্টকাট রাস্তাটা আমরা খুঁজে নিয়েছি...। @সুব্রত