Saturday, March 6, 2010

ডাক্তার নামের মানুষটা!

এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার কতশত ভয়াবহ অন্যায় করেন তার লেখাজোঁকা নাই। এইসব নিয়ে অসংখ্য পোস্ট দেয়া সম্ভব। আমার পূর্বের একটা পোস্টে এর খানিকটা আঁচ করা যাবে। ডাক্তারদের প্রতি আমার রাগের শেষ নাই।
অনেক সময় আমরা নিজেদের বিকিয়ে দেই ক্ষিধার জ্বালায়। একজন আল মাহমুদ কেন তার কলম বিক্রি করে দেন তা আমি খানিকটা বুঝি, বেচারার জন্য মায়া হয়।

কিন্তু একজন ডাক্তার পুরোপুরি সৎ থেকেও ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। এই দেশের জন্য টাকার অংকটা বিপুল- এই দেশে সরকারী চাকুরে ওরফে পাবলিক সার্ভেন্ট এখনও ৫০ হাজার টাকার উপরে বেতন পান না। তারপরও এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার,
দ্বিতীয় ঈশ্বর নামের এই মানুষগুলো কেন অমানুষ হয়ে যান এটা আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জানতে পারব এই ভরসা নাই। এই একটা পেশাকে আমি ঈর্ষা করি

আমি বারবার যে কথাটা বলে আসছি একজন ভালো ডাক্তার, ভালো লেখক মানেই একজন ভাল মানুষ না। ভাল মানুষ বলতে আমার অল্প জ্ঞানে বুঝি, যার আছে প্রকৃতির জন্য এবং প্রকৃতির সন্তানদের জন্য অগাধ ভালোবাসা।

ভাল ডাক্তার তো আছেন কিন্তু ডাক্তার নামের ভালো মানুষ কী নাই! থাকবেন না কেন, আছেন। কুমিল্লার মুরাদনগরের একজন ডাক্তার ইনি প্রতিদিন বিনা ফি-তে শত শত রোগি দেখেন। সকালে অন্তত ২০/৩০ জন রোগি না দেখে নাস্তা করেন না। আশ্রমে থাকেন, আশ্রমে ঘুমান, আশ্রমের কাপড় গায়ে দেন- মহাআনন্দেই আছেন।

মানুষটার কাছে আমি অনেকবার চিকিৎসার জন্য গিয়েছি। কোন এক বিচিত্র কারণে মানুষটা আমাকে পছন্দ করেন। তাঁকে ফি দিতে আমাকে বেগ পেতে হতো। খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার যেভাবে টাকা আয় করেন সেভাবে চইলে এই মানুষটা অন্তত দেড় লক্ষ টাকা মাসে বাড়তি আয় করতে পারতেন। কিন্তু এই নিয়ে তাঁর কোন বিকার, উদ্বেগ নেই।

বাংলাদেশে খুব কম ডাক্তার আছেন যারা প্যাথলজি থেকে কমিশন খান না। সাফ হিসাব, ডাক্তার সাহেব যত টাকা টেস্ট লিখবেন তার ৪০ থেকে ৫০ ভাগ টাকা ডাক্তার সাহেব পেয়ে যাবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা যে টেষ্টগুলো লেখেন তা কেবল টাকার লোভে, সীমাহীন লোভ! ওষুধ কোম্পানি থেকে পান নিম্নমানের ওষুধ চালাবার জন্য মাসে মাসে মাসোহারা। ওষুধ কোম্পানীগুলো স্যাম্পলের নামে যেসব ওষুধ দেয় তা বস্তা ভরে বাজারে বিক্রি করে দেন। ওষুধ কোম্পানিগুলো হেন কোন জিনিস নাই যা ডাক্তারকে উপহার দেন না।
আমার জানার খুব আগ্রহ, ডাক্তার সাহেবরা যে আন্ডারওয়্যার পরে থাকেন এটাও কি ওষুধ কোম্পানির দেয়া? অথবা তাঁদের ইস্তারি সাহেবার...?
যে মা-র নরমাল ডেলিভারী করা সম্ভব ডাক্তার সাহেব তার পেট কেটে ফেলবেন কারণ এখান থেকে বড়ো অংকের টাকা তিনি পাবেন। এইসব খুব কমন প্র্যাকটিস।
কোন কোন ডাক্তার বাড়তি যেটা করেন, ট্রলি থেকে পশুর মত ছটফট করতে থাকা মাকে মেঝেতে নামিয়ে দেন টাকা দিতে দেরি হচ্ছিল বলে। ওই মাটা সারারাত আধ-জবাই পশুর মত ছটফট করতে করতে ভোরে হাল ছেড়ে দিয়ে মারা যান। এই পৃথিবীর মুখ দেখার আগেই হারিয়ে যায় একটি শিশু। আইন-সিস্টেম বলে, এই ডাক্তার সাহেবের গোপন কেশও কেউ স্পর্শ করতে পারবেন না। আর আমরা বলি, সবই আল্লাহর ইচ্ছা, মা-বাচ্চাটার হায়াত আছিল না।

আমি প্রায় দু-বছর ধরে ডাক্তার নামের মানুষটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আজ পর্যন্ত তিনি প্যাথলজি থেকে ১ পয়সা কমিশন নেননি, কোন ওষুধ কোম্পানি থেকে ওষুধ চালিয়ে দেয়ার নাম করে মাসোহারা নেননি, স্যাম্পল দাবি করেননি। কোন কোম্পানি জোর করে স্যাম্পলের নামে ওষুধ দিয়ে গেলে তা একটা বাক্সে জমান। পরবর্তীতে যাদের অষুধ কেনার টাকা নেই তাদের বিনা পয়সায় দিয়ে দেন।
যাদের ফি দেয়ার সামর্থ্য নাই তাদের এমনিতেই দেখে দেন। এবং ওই মানুষটাকে দেখেন যথাসম্ভব প্রথমে যেন তার এটা ধারণা না হয়, বিনা পয়সায় দেখাচ্ছেন বলে ডাক্তার তাকে অবহেলা করছেন।
একজন রোগীকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত দেখেন যতক্ষণ পর্যন্ত না রোগটা বের করতে পারেন। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ১ ঘন্টা ১০ মিনিট দেখার রেকর্ড তাঁর আছে! অভ্যাস নেই বলে প্রায়শ রোগী বিরক্ত হয়, ডাক্তার সাব, ছাইড়া দেন, কাজ আছিল।
খুব শান্ত খর্বাকৃতির এই মানুষটা তখন ক্ষেপে যান, আপনি কি আমার কাছে চিকিৎসার জন্য এসেছেন, নাকি বেড়াতে!

তো, তাঁকে আমার চিকিৎসার জন্য ফি দিলে তিনি নিতে না চাইলে,
আমি বলতাম, আমার কাছ থেকে ফি না নেয়ার পেছনে আপনার যুক্তি, কি বলেন তো শুনি?
তিনি মিনমিন করে বলতেন, আপনি..., তাছাড়া আপনার সঙ্গে...। ইত্যাদি।
তাঁকে আমি সাফ সাফ জানিয়ে দিলাম, আমার কাছ থেকে ফি না-নিতে চাওয়ার পেছনে আপনার যুক্তি আমার পছন্দ হলো না। এমনটা করলে পরবর্তীতে আপনাকে দেখাব না। আপনি যদি এই ফেভারটাই কোন মুক্তিযোদ্ধাকে করেন সেটা একটা কাজের কাজ হয়। এই দেশের সেরা সন্তান এরাই, আমরা না।
আমি সীমা ছাড়াই, আপনি আমাকে কথা দেন, কোন মুক্তিযোদ্ধা এলে আপনি বিনা ফি-তে
তাঁর চিকিৎসা করবেন।
আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। তিনি কথা দিয়েছিলেন।

সেই কথার ভরসা করে আমি মুক্তিযোদ্ধা নৌকমান্ডো ফযু ভাইকে তাঁর ওখানে পাঠিয়েছিলাম। কারণ ফযু ভাই প্রচন্ড শ্বাস কষ্টে ভুগছেন। তিনি ফযু ভাইয়ে কেবল যত্ম করে দেখেই দেননি। তাঁর জমানো ওষুধ বদলে দামী সব ইনহেলারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, বিনা মূল্যে!
পরে ফযু ভাই একটা শিশুর লাফাতে লাফাতে আমার কাছে এসেছিলেন, চোখ-মুখ আলোয় ঝলমল, এতো বড়ো একজন ডাকতর আমারে কি কইল, জানেন?
আমি নিরীহ মুখ করে বলি, কি কইলো?
কইলো, আপনাগো সেবার লাইগাই আমরা বয়া আছি। দরকার হইলেই চইলা আইবেন, কুনু সমস্যা নাই।

আমি নিজের অজান্তেই শ্বাস ফেলি, আসলে প্রয়োজন কেবল আমাদের একটু সদিচ্ছার। এই ডাক্তারের মত মানুষগুলো যদি খানিকটা এগিয়ে আসেন তাহলে দেশের এইসব সেরা সন্তানদের মৃত্যুর পূর্বে আমাদের মুখে একরাশ, ঘৃণা-থুথু ফেলে মরতে হয় না।

10 comments:

কনফুসিয়াস said...

শুভ,
কেমন আছেন?
লেখাটা ফেইসবুকে শেয়ার করলাম, আপনার অনুমতি ছাড়াই। :)

।আলী মাহমেদ। said...

চলছে।
আপনার সঙ্গে সালুন দিয়ে ধোঁয়াওঠা ভাত খাওয়া হলো না,আফসোস!

শেয়ার করার জন্য শুকরিয়া @কনফু

zhsoykot said...

আপনার লেখাগুলো আমি নিয়মিত পড়্ এই লেখাটা বেশ ভাল লাগল। যদিও বিষয়টা অপ্রাসঙ্গিক তার পরও জানতে চাইছি আপনার আবাস কোথায়?
জেড এইচ সৈকত

।আলী মাহমেদ। said...

আপনি নিয়মিত আমার লেখা পড়েন, কোনটা ভাল লাগে এটা জেনে আমারও ভাল লাগছে। ভাইরে, আমার প্রোফাইলে বিস্তারিত লেখা আছে। ভাল থাকুন, অনেক। @জেড এইচ সৈকত

Rabu said...

post ta pore khub bhalo laglo. bisesh kore emon ekjon doctor o amader desh e acchen jene bhalo laglo. personal life e doctor niye tikto ekta experience acche .. jodio.

shorna

Anonymous said...

Doa roilo apnar sai daktar manustar jonno....jano bacha thaken aaro kichudin...bhalo manus koma jacha dindin

।আলী মাহমেদ। said...

"তিক্ত অভিজ্ঞতা..."।
এই দেশে সবচেয়ে বেশী অন্যায় করেন ডাক্তাররা। আমরা অনেকে অন্যায় করি ক্ষিধার জ্বালায়, এরা করেন সীমাহীন লোভের জ্বালায়। @shorna

।আলী মাহমেদ। said...

"bhalo manus koma jacha dindin..."
আসলেই...।@Anonymous

Anonymous said...
This comment has been removed by a blog administrator.
Anonymous said...
This comment has been removed by a blog administrator.