Search

Thursday, March 11, 2010

দাউদ হায়দার, তোমার কাছে খোলা চিঠি

(আজকাল আমার মস্তিষ্ক নামের হার্ডডিস্ক সম্ভবত গার্বেজ দিয়ে ভরে গেছে নইলে ২১ ফেব্রুয়ারি দাউদ হায়দারের জন্মদিন এটা ভুলে গেলাম কেমন করে!)
অ অভাগা কবি,

ফি বছর তোমার জন্মদিনে লিখব এতোটা সময় কোথায়, বলো? এবার ঠিক ঠিক ২১ ফেব্রুয়ারিতেই বইমেলায় গিয়েছিলাম, বুঝলে। দেখলে কবি, আমার মত '৩ টাকা দামের কলমবাজ' বইমেলায় যেতে পারে, আমার পাশ দিয়ে যে দু-জন বয়স্ক মানুষ উর্দুতে বাতচিত করতে করতে হেঁটে যান, তারাও পারে!
 
না কবি, তারা হিন্দিতে কথা বলছিলেন না, উর্দুতে কথা বলছিলেন। হিন্দি উর্দুর ফারাকটা আমি বুঝি। না-না, এই নিয়ে আমি হাঙ্গামা করতে চাচ্ছি না। কোনো পাকিস্তানি এসে মেলায় যেতে পারবে না এমন কোনো আইন তো নাই। কই, বানিজ্যমেলায় কি পাকিস্তানি স্টল থাকে না, থাকে? তারা কি আর বাংলাতে কথা বলে? বলে না, তাহলে! আর যে দুজন মানুষ হেঁটে গেলেন তাদের মধ্যে একজন যে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ না তাই বা বলি কেমন করে? এটা জোর দিয়ে বলতে পারিনা, আমি সবার মুখ মুখস্ত করে বসে আছি বুঝি!

কবি, তুমি বিশ্বাস করবে না, পরমাণু কেন্দ্রের পাশটায় আমি একটা কুকুরও দেখেছিলাম। আহা, বইমেলায় এতো লোকজন, কুকুরের বুঝি কৌতুহল থাকতে নেই! দেখো দিকি কান্ড, বইমেলায় ফাঁকতালে কুকুরও ঢুকে পড়তে পারে! আমরা বইমেলায় নিয়ম ভেঙ্গে সিগারেট টানতে পারি, কামসূত্র কিনতে পারি। কারও কিসসু বলার নাই!
কতজনকে দেখলাম, বইমেলার ধুলো নিয়ে কী রাগ! কবি, মেলায় ধুলোর জন্য কেবল এদের একজনের দেয়া গালি এখানে লিখে দিলে যে দু-চারজন পাঠক এখনও
এখানে ঝুলে আছেন, এরা ভোঁতা দা নিয়ে আমায় তাড়া করবেন! এমনিতেই আজকাল লোকজন বলে, আমার নাকি মুখ খারাপ হয়ে গেছে। কী করব, বলো, কিছু কাজ-কারবার দেখলে মেজাজ ঠিক রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে।

কবি, আমি চোখ বুজে বলে দিতে পারি, বইমেলার এই ধুলো মাখার জন্য তুমি তোমার একটা হাত হারাতে দ্বিধা করবে না। বাড়িয়ে বললাম বলে তুমি হা-হা করে হাসছ বুঝি। আচ্ছা, বেশ, তুমি বুকে হাত দিয়ে বলো, শপথ করে বলো তোমার কলমের নামে, কি চোখ নামিয়ে নিলে যে বড়ো? কবি, চশমাটা মোছে, তোমার চোখে জল!

জানো কবি, তোমাকে নিয়ে যে ভাববে আমাদের সুশীলদের সেই সময়টা কোথায়? কত বড়ো-বড়ো কাজ আমাদের সুশীলদের। ভাষা, গণতন্ত্র কত্তো-কত্তো কাজ! তুমি তো দেশে থাকো না, বুঝবে কেমন করে! কোনো একটা সুযোগ পেলেই পাজামা পরে এরা স্টেজে উঠে যান। ফেব্রুয়ারি মাস, এদের দম ফেলার অবকাশ আছে বুঝি, পাগল!
এবারই দেখো না, ভাষার জন্য একেকজনের কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে যাচ্ছিল! মতি ভাইয়ারা ৩০ মিনিটে ... কাঁপাচ্ছে। টক-শো তে একেকজনের কী কান্না! বিজ্ঞাপনে বিনম্র শ্রদ্ধায় শ্রদ্ধা দেখাতে দেখাতে প্রাণ যায় না কিন্তু পাতলুন খুলে যায়।
শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চেহারা দেখাবার জন্য প্রয়োজনে আমরা শহীদ মিনার খুবলে ফেলব।

আরে, তুমি জানো না কবি, বাংলার জন্য
আমরা কতটা কাতর। রাষ্ট্রীয় ৭৫০টি আইনের মধ্যে ৯৭টি বাংলায়, বাকী সব ইংরাজিতে! কী যে দরদ আমাদের নিজের ভাষার জন্য। ভাষা-ভাষা বলে আমরা মুখে ফেনা তুলে ফেলি...।
তুমি কিচ্ছু জানো না, এই দেশের প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন বলো বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এঁরা এখনও বাংলা ভাষাটাই শুদ্ধরূপে বলতে পারেন না! এই নিয়ে কিন্তু আমাদের কোনো লাজ নাই।

আচ্ছা কবি, যাদের নিয়ে কবিতা লেখার অপরাধে তোমায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে একজন, সেই মানুষটারই না সহিষ্ণুতার শেষ নাই! অথচ সেই মানুষটার অনুসারীরাই এমন অসহিষ্ণু হলো কেমন করে! আমি কি মনে করিয়ে দেব? *
 
তোমার প্রতি এমন অন্যায়, এত বড়ো শাস্তি! একজন তার মার-দেশমার শরীর স্পর্শ করতে পারবে না, তাঁকে ধরে কেঁদে বুকটা হালকা করতে পারবে না? স্বজনদের ছুঁয়ে কাঁদতে পারবে না এরচেয়ে যে গুলি করে মেরে ফেলা অনেক শ্রেয়। তোমাকে যে শাস্তি দেয়া হয়েছে এর বদলে আমি হেমলকের পেয়ালা চাইতাম।
ও কবি, তুমি নাকি এখনও বাংলায় কথা বলো, বাংলায় লেখো, বাংলায় স্বপ্ন দেখো, সত্যি নাকি, সত্যি? আহা, বাংলাটা ভুলতে পারোনি বুঝি? তুমি এই কবিতাগুলো কী দিয়ে লেখো, কালির বদলে রক্ত?
"এত দিনে স্মৃতিতে ধুলো জমেছে, মনের ভেতর জমিয়ে
রাখা ছবি মলিন হয়ে এসেছে, কিন্তু প্রতিক্ষার অবসান হয়নি।
কেটে গেল তিরিশ বছর
এখনো নির্বাসনে।...।" (দাউদ হায়দার)
আমি বলি কি, কবি: "যে হাত পদ স্পর্শ করে, সে হাত চোখ খুবলে নেয়ারও শক্তি রাখে..."। কবি, অনেক তো হলো তবলার ঠুকঠাক, আসো এইবার গলা ছেড়ে গান গাই।
বুঝলে, মানুষ মানুষই, কচ্ছপ না। আর কত-আর কত প্রহর, কেটে গেছে ৩৬টা বছর! দেশমা, তোমার জন্য আর কতোটা কাল অপেক্ষা করবে?
এইসব পুতুপুতু কবিতা লেখা ছাড়ো, কবি। সব সময় পুরুষ হয়ে লাভ নাই, কখনও কাপুরুষ হওয়ার প্রয়োজনও দেখা দেয়। কেউ মারা যায় বিছানায়; গু-মুতে মাখামাখি হয়ে তো কেউ যুদ্ধে- পার্থক্য কী!
আচ্ছা, তুমি যেখানে থাকো ওখানে বাংলাদেশ হাই-কমিশনারের অফিস নেই? আছে? থাকলে, ওটার সামনে গিয়ে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দাও। বিশ্ব জানুক আমরা কেমন নগ্ন জাতি! ছোট-ছোট বাচ্চারাও দেখুক, আমাদের দেশ- এই রাষ্ট্র নামের নগ্ন পিতা এক চিলতে কাপড়ের জন্য কেমন ছোটাছুটি করছে। তুমি একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করো তো কী ভয়ানক এক দৃশ্য!
কী, সাহসে কুলাচ্ছে না, কবি? হা হা হা। যে হাত কবিতা লিখতে পারে সেই হাত বুঝি নিজের গলা চেপে ধরতে পারে না, না?
 
* "আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, এক বদু (বেদুইন) নবী (সাঃ)-এর মসজিদে আসিয়া এক কোনে বসিয়া প্রস্রাব করিতে লাগিল। সকলেই বদুকে ধমক দিতে আরম্ভ করিলে নবী (সাঃ) তাহাদিগকে নিষেধ করিলেন এবং বলিলেন, এই অবস্থায় তাহাকে বাধা দিও না।
বদুর প্রস্রাব করা শেষ হইলে তিনি তাহাকে নিকটে ডাকিয়া বুঝাইয়া দিলেন, মসজিদ পবিত্র স্থান, এখানে মল-মূত্র ত্যাগ করা সমীচীন নহে।
তাহার পর সাহাবীগণকে আদেশ করিলেন, পানি আনিয়া জায়গাটি পরিস্কার করো। তোমরা (মুসলিম জাতি) পৃথিবীর প্রতি আদর্শরূপে আবির্ভূত হইয়াছ, কর্কশ ব্যবহারেরর জন্য নহে।
" (বোখারী শরীফ)
 
 
**www.newsagency24.com চোরের এক আস্তানার নাম: https://www.facebook.com/ali.mahmed1971/posts/10151517933607335?notif_t=like  

**দাউদ হায়দার, তোমার কাছে চিঠি, আবারও: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_20.html

ছবি সূত্র: গুগল। অনেক চেষ্টা করেও যিনি ছবিটা উঠিয়েছেন তার নাম পেলাম না। অজানা মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

খালেদা জিয়া যাহা বলিলেন...

খালেদা জিয়া বলেছেন, "এ সরকারের আমলে ২০ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার।... সরকারদলীয় সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ দ্বারাই বেশির ভাগ নারী নির্যাতিত।"

আমি গভীর ভাবনায় তলিয়ে গিয়েছিলাম, অংকে আমি বড়ো কাঁচা- আঁক কষতে না পারার কারণে মাস্টার মশাই আমার উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। পারলে ডাস্টার ছুঁড়ে মারেন!

ম্যাট্রিকে খালেদা জিয়া গণিতে ৫০ পেয়েছিলেন। তাই কি নিখুঁত ২০ শতাংশ বললেন? হিসাবটা কেন ১৯ শতাংশ না, কেনই বা ২১ শতাংশ না?
বিষয়টা অনেকটা এমন কেউ প্রতিদিন ৫০০ টাকা নিয়ে বাজারে যায়। ৫০০ টাকাই খরচ হয়; ৫০১ টাকা না, ৪৯৯-ও না!
আচ্ছা, ২০ শতাংশ হিসাবটা কি এমন? ১৯.৫১ হওয়ায় ২০ ধরা হয়েছে? বা ২০.৪৯ হওয়ায় ২০ না ধরে উপায় ছিল না?

সৈয়দ আশরাফ মানুষটার প্রতি আমার আলাদা সমীহ আছে। এই দলে যে অল্প ক-জন চমৎকার মানুষ আছেন, তিনি তাঁদের একজন। সৈয়দ আশরাফ এই প্রসঙ্গে পাল্টা উত্তরে বলেছেন, "২০ ভাগ নারী অর্থাৎ ১ কোটি ৬০ লাখ নির্যাতিতা নারীর নাম-ঠিকানা আমাদের জানান...।"
তাঁর এই বক্তব্যে আমি হাতে কিল মেরে বলি, কিস্তি মাত! সৈয়দ আশরাফ এই একটা চালেই দাবার ছক পাল্টে দিলেন। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, বাহ, এই মানুষটা দেখি আমাদের মতোই ভাবছেন!
খালেদা জিয়ার কথা মতে, ১ কোটি ৬০ লাখ নির্যাতিতা নারী, তাও ছাত্রলীগের দ্বারা? ভাবতেই গা দুলে উঠে; হাসার কারণে নাকি গা শিউরে উঠার কারণে কে জানে!

আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, বাহ, সৈয়দ আশরাফ এই মানুষটা দেখি আমাদের মতোই ভাবছেন! কিন্তু তিনি অতি দ্রুতই আমাদের থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। এরপর খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলা শুরু করলেন, আপনি মহিলা হাই-কমিশনারদের নিয়া চা টা খাবেন উল্টাপাল্টা যা খুশি বলে দেবেন। এটুকু বললে হয়তো সমস্যা ছিল না। এরপর তিনি লম্বা ফিরিস্তি দেয়া শুরু করলেন, খালেদা জিয়ার আমলে কতজন নারী, কোন কোন নারী নির্যাতিত হয়েছেন। আরও অনেক কথা।

আমি বুঝি না, যেখানে একটা চাল দিয়েই তিনি পাশার ছক পাল্টে দিলেন সেখানে অহেতুক-অনাবশ্যক কথার কী প্রয়োজন ছিল?
সাধারণ জনগণকে এঁরা মগজ খরচ করার সুযোগ দেন না, সব বলে ফেলেন। জনগণ, অব্যবহৃত মগজ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়! বেচারা জনগণ!

Wednesday, March 10, 2010

শাবাশ, কদমবুসি করি তোমাদের!

খবরটা অতি সামান্য টমেটোর কেজি ১ টাকা। আমাদের আনন্দিত হওয়ার কথা। সেখানে ১ কেজি টমেটো মাত্র ১ টাকা, কোথাও ৫০ পয়সা। ৫০ পয়সা আজকাল ফকিরও নিতে চায় না!
ভাগ্যিস, মইন সাহেব নাই নইলে বলতেন, বেশি করে টমেটো খান, ভাতের উপর চাপ কমান।

কিন্তু বিষয়টা আমাদের দেশের চাকা যারা বনবন করে ঘোরান, সেইসব কৃষক-টমেটোচাষিদের ভালো লাগে নাই। তাঁরা সরকারের লোকজনের মুখের উপর টমেটো ফেলে এসেছেন, শালীন ভঙ্গিতে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ৩৫০০ কেজি টমেটো ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আমি আরও খুশি হতাম, টমেটোগুলো পচিয়ে আমাদের মুখে ছুঁড়ে মারলে।

কী ভয়াবহ একটা ঘটনা! এই দেশের কেউ কী এটা আঁচ করতে পারছেন না এই ক্ষুব্ধ টমেটোচাষিরা এর ঠিক শোধ নেবেন। আগামি বছর এঁরা টমেটো চাষে আগ্রহী হবেন না, এই টমেটোরই দাম হবে ন্যূনতম ১০০ টাকা কেজি! আমি নিশ্চিত, তখন বৈদেশ হতে টমেটো আমদানি হবে। আমাদের দেশের সুশীল লোকজন ওই টমেটো তাদের পশ্চাদদেশে রেখে, লম্বা লম্বা বাতচিত করবেন! আমাদের শেখাবেন, কেমন করে বৈদেশিদের পদলেহন করতে হয়।

আমাদের দেশের নব্য ধনীরা ১২০ টাকা কেজি আপেল খাবে কিন্তু টমেটো খাবে না। কোনটার পুষ্টিগুণ কত এটা জানার প্রয়োজন নাই, কারা কারা যেন এইসব শালাদের বুঝিয়েছে আপেল খেলে জাতে উঠা যায়।

পুষ্টিগুণের মূল্য বিচার করলে
৩০০ টাকার একটা হরলিক্সের বোতলে আছে ৫ টাকা মূল্যমানের পুষ্টিগুণ। এইসব চুতিয়াদের মাথায় আটকে গেছে হরলিক্স না খেলে চুতিয়াদের বাচ্চারা টলার-লংগার-স্ট্রংগার হবে না। শ্লা, বাপ ৫ ফুট, মা সাড়ে চার ফুট, আশা করে বসে থাকবে এদের বাচ্চা হবে সাড়ে ছয় ফিট!

টমেটোচাষিদের এই প্রতিবাদের ঘটনাটা ঘটেছে সিলেটে। আহ, সিলেট, এখানে আমার একটু বলার আছে। সিলেট বিভাগের লোকজন, প্রতি পরিবার থেকে কেউ না কেউ প্রবাসে আছেন। এরা দু-হাতে বললে ভুল হবে, অজস্র হাতে (অদৃশ্য আরও কিছু হাত থাকতে পারে, অবশ্য ঠিক কোথায় এ সম্বন্ধে আমার ধারণা নাই)
টাকা কামাচ্ছেন। তা কামাক, এতে আমাদের হিংসা করে কী আছে!

এরা দেশে দূরের থাকুক, নিজের এলাকায় কি করেন? আলিশান যে বাড়িটা করেন, দেশে ফিরে কয়েক দিন সেখানে থাকেন। এমন উদাহরণও আছে বাড়ির একটা গেইটের পেছনেই খরচ করেছেন কোটি টাকা। তো, বছরের অন্য সময়ে ওই আলিশান বাড়িতে গরু চড়তে আমি নিজের চোখে দেখেছি। আর করেন কমিউনিটি সেন্টার, শপিং মল।
এরা কটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি করেছেন, কটা হিমাগার? আজ ওখানে হিমাগারের ছড়াছড়ি থাকলে এরি মধ্যে কোন-না-কোন একটা উপায় বেরিয়ে আসত।
এরা যেটা ভালো পারেন সেটা হচ্ছে, ব্যংকে অলস টাকা ফেলে ফেলে ব্যংক ধসিয়ে দেয়া, কয়েক স্ত্রীর গর্ভে বাচ্চা পয়দা করা, পান চাবানো (যুবক, ধামড়া ধামড়া ছেলেদের দেখেছি বেদম পান চিবিয়ে যাচ্ছে) আর আঞ্চলিকতার লেজ ধরে বসে থাকা।

এই দেশে একটা প্রাণ কোম্পানি যা করে দেখিয়ে দিচ্ছে, গোটা সিলেটের লোক মিলেও তা করতে পারেননি। যতটুকু মনে পড়ে ফি বছর এরা কৃষকের কাছ থেকে কেবল আমই কেনে ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। নইলে ঠিক আমচাষিরাও একদিন আমাদের মুখে পচা আম ছুঁড়ে মারতেন!

Tuesday, March 9, 2010

কালের কন্ঠ: বোধোদয়


দৈনিক কালের কন্ঠে মারাত্মক একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে 'আসাদ গেটে এখনো উর্দু ফলক' নিয়ে।

'মিডিয়া ওয়াচ' নামের একটি পত্রিকা এই ভুলটা তুলে ধরে। অবশ্য মিডিয়া ওয়াচ পত্রিকাটি ভুল ধরায় এতটাই ব্যস্ত ছিল আসাদ গেটে লাগানো পোস্টার এদের চোখে পড়েনি!

ফিরোজ চৌধুরী ছবিটা উঠিয়েছেন। আলোকচিত্রি, রিপোর্টার, বিভাগীয় সম্পাদক মায় এই পত্রিকার "বোধ হয়" সম্পাদক আবেদ খান, কেউ এটা লক্ষ করলেন না, আশ্চর্য!
মনে হচ্ছে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে থাকা একদল কিশোরের এক বালখিল্য আচরণ!
উর্দু এবং আরবীর মূল পার্থক্য হচ্ছে, উর্দুতে জের-যবর-পেশ নাই। এটা একটা বালকেরও জানার কথা।


ভাগ্যিস, "বোধ হয়" সম্পাদক আবেদ খান আবার বলে বসেননি এটাই আমার এস্টাইল- যাহা উর্দু তাহাই আরবী। তাহলে বড়ো মুশকিল হয়ে যেত।
আমি কোথাও লিখেছিলাম, প্রিন্ট মিডিয়ার শক্তি অকল্পনীয়- আজ আমাদের দেশের কয়েকজন সম্পাদক মিলে যদি ঠিক করেন আমরা পাঠক বিশেষ মুহূর্তে অন্তরঙ্গ সময় কেমন করে কাটাব, আমরা অজান্তেই তা করব।
আপনার নিজের চোখে দেখা একটা ঘটনাই আপনি পত্রিকায় পড়ে বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন আপনার দেখায় ভুল ছিল! রাতকে দিন করা এদের পক্ষেই সম্ভব!

আচ্ছা, আবেদ খানের ওই ফোনালাপ (
এটাই আমার এস্টাইল) আমি যদি এখানে আপলোড করে দেই, কেমন হয়? জানি-জানি, অনেকে ভোঁতা দা নিয়ে রে রে করে তেড়ে আসবেন। অনেকে কঠিন স্বরে আমাকে এথিকস নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বুলি কপচাবেন। আপনাদের রাগ আমার 'সার আখো পে'- মাথায় তুলে নিলাম।
ভাল, কিন্তু পত্রিকাওয়ালারা পারলে এই যে অন্তর্বাসের লাইনিং এর সেলাইয়ের সুতোটারও খবর ছেপে দেয়, তখন নীতিবিরুদ্ধ হয় না, তখন এথিকস কোথায় থাকে? কী ভাষা, জল্লাদ তাকে কোলে করে নিয়ে গেলেন! নাকি এরা বড়ো বড়ো মানুষ বলে এদের এথিকস ...-এর আড়ালে থাকে!

কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে 'কালের কন্ঠ' সংশোধনী ছাপিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে। অবাক হয়েছি এই কারণে আমাদের দেশে ভুল করে ভুল স্বীকার করার চল নাই। বিশেষ করে পত্রিকাওয়ালারা তো আরেক কাঠি সরেস! অন্তত কালের কন্ঠের কাছ থেকে এমন দায়িত্বশীল আচরণ আশা করিনি! সত্যিই অবাক হয়েছি, পত্রিকাটির প্রতি অজান্তেই খানিকটা সমীহ চলে আসে।
কী আর করা! প্রতিযোগীতায় টেকার কথা মাথায় রেখে প্রথম আলোর মত ফাজিল হতে চাচ্ছে না সম্ভবত! প্রথম আলোর একের পর এক ভুলের মিছিল কিন্তু এদের ভুল স্বীকার করার, এ পথ মাড়াবার কোন গোপন ইচ্ছাই নাই। কারণ এরা বুঝে গেছে এদের ব্যতীত আমাদের গতি নাই।

যাগ গে, যেটা বলছিলাম, আসাদ গেটের এই ছবি নিয়ে চমৎকার
একটা প্রতিবেদন হতে পারত। এটায় অসংখ্য পোস্টার লাগিয়ে রাখা হয়েছে। যা অসভ্যতারই নামান্তর! আমাদের দেশে যত্রতত্র পোস্টার লাগিয়ে দিলে কারও কোন বিকার নাই। একজন আজ তার দেয়াল রঙ করিয়েছেন, আজই একজন এসে পোস্টার লাগিয়ে দিচ্ছে। দ-খ-ল লিখে তার দেয়ালের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে, কিচ্ছু বলার নাই!
ভ্রাম্যমান আদালত কেবল ভেজালই ধরবে কেন, কেন ধরছে এদেরকে, যারা এই পোস্টার নামের আবর্জনাগুলো লাগাচ্ছে? কঠিন কিছু না, যার পোস্টার পাওয়া যাবে তাকেই ধরে জরিমানা।

আমরা এখান থেকেই শিখি। যখন বেশি শিখে ফেলি তখন স্বাধীনতা সৌধের গায়ে কুৎসিত কথা লিখি, ততোধিক কুৎসিত ছবি আঁকি।


*ছবি সূত্র: মিডিয়া ওয়াচ

Monday, March 8, 2010

বতুতা এবং আরবী জানা মোল্লা সাহেব!

অসম্ভব আগ্রহ নিয়ে এইচ এ আর গিব-এর "ট্রাভেলস অব ইবনে বতুতা" (১৩০৪-১৩৬৯) পড়ছি। ইবনে বতুতাকে আমরা একজন মুসলিম পরিব্রাজক বলতে পারি- খানিকটা পক্ষপাতদুষ্ট। এ সত্য তাঁর বর্ণনায় খানিকটা অতিশয়োক্তি আছে, আছে অস্পষ্টতা কিন্তু কী সাবলীল তাঁর বর্ণনা! কী বিচিত্রসব অভিজ্ঞতা!

আজ থেকে আনুমানিক ৭০০ বছর পূর্বে মানুষটার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে কী আনন্দই না হয়! কেমন ছিলেন তখনকার মানুষ, তাদের আচরণ। একটা বর্ণনা পূর্বের লেখায় উল্লেখ করেছি। ৭০০ বছরে আমরা কতটা সভ্য হলাম?‍

এমন অজস্র অভিজ্ঞতা।
নীলনদ সম্বন্ধে জানা যায়:
"নীলনদের এক বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, গ্রীষ্মকালে যখন প্রচন্ড গরমে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়, বেশিরভাগ নদী শুকিয়ে যেতে থাকে তখন নীলনদ ফুলে-ফেঁপে উঠে।
আবার অন্য সব নদী যখন পানিতে উপচে পড়ে তখন নীলনদ শুকাতে শুরু করে।"


"ভারতীয়দের কাছে পানের মর্যাদার শেষ নাই। কেউ কারও বাড়িতে গেলে পাঁচটা পান উপহার দেয়। এব‌ং যুবরাজ বা মর্যাদাবান কারও কাছ থেকে পেলে তো কোন কথাই নাই! ...সোনা বা রূপার চেয়ে পান পেলে খুশীর সীমা থাকে না।"

"কিপচাম মরুভূমিতে কোন গাছ নেই। আগুন জ্বালাবার কাঠের বড়ো অভাব, গোবর দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। গোবর এখানেই এতই গুরুত্ব রাখে, এখানকার সবচেয়ে ধনী মানুষটিও রাস্তায় গোবর পড়ে থাকতে দেখলে পরম যত্মের সঙ্গে দামী পোশাকের কোচড়ে তুলে নেবেন!"

"মারমা নামের জায়গায় যখন এলাম, এখানে শিয়া সম্প্রদায়ের মত কিছু লোক থাকে। এরা ১০ সংখ্যাটিকে এরা তীব্র ঘৃণা করে। যেসব লোকের নাম ওমর, এমন লোকদেরও! এর কারণ সম্ভবত এটা, হযরত মুহাম্মদ (দঃ) সহচরদের মধ্যে বিশেষ ১০ জন প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, তাঁদের মধ্যে হযরত ওমরের (রাঃ) এর জন্য রয়েছে তাদের তীব্র ঘৃণা!
তারা মনে করে খলিফা হওয়ার বিষয়ে হযরত আলী (রাঃ) প্রতি হযরত ওমর (রাঃ) অন্যায় করেছেন।
এরা বাজারে কোন কিছুর নিলাম ডাকলে ভুলেও ১০ শব্দটা উচ্চারণ করবে না । ১০ না বলে বলবে ৯ এবং ১!"

মুসলিক শাসকদের ক্ররতা, হিংস্রতা আমরা দেখতে পাই:
"দামাস্কাসে প্রবেশ করলাম আমি। ...আগে এখানে গির্জা ছিল। কিন্তু মুসলমানরা দামাস্কাস দখল করার পর তাদের এক সেনাপতি খোলা তলোয়ার হাতে গির্জার মধ্যে প্রবেশ করেন। সমঝোতা অনুযায়ী গির্জার অর্ধেকটা মুসলমানদের দিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু খলিফা ওয়ালিদ ঠিক করলেন, বাকী অর্ধেকটা কিনে নেয়ার জন্য। খ্রীস্টানরা রাজী না হলে নিজেই কুড়াল দিয়ে গির্জা ভাঙ্গা শুরু করলেন খলিফা, আল্লাহর নামে।"

"ফোরাতের কাছে হিল্লা শহরে পৌঁছলাম। এদের বিশ্বস ১২তম ইমামের মধ্যে 'মাস্টার অভ দ্য এজ' হিল্লা শহরের এক গুহায় অদৃশ্য হয়ে যান। ১০০ হিল্লাবাসী খাপমুক্ত তলোয়ার হাতে ড্রাম, ট্রাম্পেট, বিউগল বাজাতে বাজাতে ওই পাহাড়ের পাদদেশে দিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, আল্লাহর কসম, হে ইমাম! হে মাস্টার অভ দ্য এজ, আল্লার দোহাই লাগে আপনি বেরিয়ে আসুন। পাপাচার-অনাচারে পৃথিবীটা ভরে গেছে...।"

"দিন-রাত যে কোন সময়েই তুর্করা তাদের ওয়াগনটানা ঘোড়া, উট খোলা ছেড়ে দেবে। চুরির ভয় নেই। কারণ যে চুরি করবে তাকে অবশ্যই ধরা হবে এবং শাস্তি হিসাবে তাকে আরও নয়টা উট দিতে হবে। দিতে না পারলে তার ছেলেকে। তাও না পারলে প্রকাশ্যে জবাই করা হবে।"

‍"নামাযের বেলায় এমন নিয়ম বিশ্বের কোথাও দেখিনি! আযান পড়ার পর কেউ মসজিতে না এলে তাহলে কাজি তাকে প্রকাশ্যে চাবুকপেটা করবে। তাই সব মসজিদে একটা করে চাবুক ঝোলানো থাকে। সঙ্গে ৫ দিনার জরিমানাও।"
(সৌদিতে এখনও কাছাকাছি নিয়মটা চালু আছে। কাউকে পেলে তাকে মুতওয়া নামের পুলিশ হিড়হিড় করে ধরে থানায় নিয়ে নামায় পড়াবে, সে পাক থাকুক বা নাপাক। 'ভবিষ্যতে নামায পড়িব' এমন মুচলেকা নিয়ে তবেই ছাড়বে)

"একদিন আসরের জামাত শুরু হওয়ার আগে সুলতানের নামায পড়ার জায়গায় জায়নামায বিছেয়ে তার অনুচর ইমামকে বললেন, সুলতান অজু করছেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার জন্য বলেছেন।
কিন্তু ইমাম মুয়াজ্জিনকে তখনই নামায শুরু করার নির্দেশ দিলেন। সুলতান যখন মসজিদে প্রবেশ করলেন তখন নামায অর্ধেক শেষ। যেহেতু এগুবার সুযোগ নেই তাই তিনি মুসল্লিদের পেছনে জুতা রাখার জায়গায় নামায পড়লেন।
...খুৎবায় ইমাম প্রকাশ্যে সুলতানের কঠিন সমালোচনা করতেন। সুলতান মাথা নীচু করে চুপ করে শুনতেন।"

একসঙ্গে কয়েকটা বই পড়ার বদ অভ্যাস আমার, পুরো বইটা এখনও পড়ে শেষ করতে পারিনি। বতুতা সাহেব মাত্র ভারতবর্ষে পা রাখলেন। পাঞ্জ আব থেকে দিল্লি যেতে লাগে ৫০ দিন, কেমন করে ৫ দিনে ডাক পৌঁছে দেয়া হতো, হাঁ করে পড়ছি! ইশ, বাংলাদেশে (তৎকালিন অখন্ড ভারতবর্ষ) এই মানুষটা আসবেন না?

কিন্তু যে বিষযটা এখন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনী নামের নোটগুলো আরবী থেকে ইংরাজীতে অনুবাদ করেছে এইচ, এ,আর গিব। আমাদের দেশে হয় আমরা গিবের অনুবাদ পড়ছি অথবা তার অনুবাদ থেকে বাংলায় কেউ অনুবাদ করলে।
একটা কথা আছে, অনুবাদক মানেই এ্যদুত্তোর এ্যদিতর- অর্থাৎ অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক। এখানে গিব সাহেব কতটা ভাবনা মিশিয়েছেন আমরা জানি না।

আমাদের দেশে কি কেউ আরবী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন? আমি জানি না। কয়েকজন প্রকাশককে ফোন করলাম, তারা প্রায় নিশ্চিত সরাসরি আরবী থেকে কেউ বাংলায় অনুবাদ করেননি।
কেন?
আমাদের দেশের আরবী জানা মোল্লা সাহেবরা কোথায়? আমাদের দেশের আরবী পন্ডিতরা অনুবাদ না করে থাকলে করলেন না কেন? লজ্জা করে না, গিব নামের মুরতাদ এই কাজটা করে দেখিয়ে দিল! এমনিতে ইনারা তো দেখি চিৎকার করে প্রলম্বিত সুরে, আরবী ব্যতীত বাতচিতই করতে চান না! সমস্ত নসিহত আরবীতে, যেন বাংলায় বললে আকাশ ভেঙ্গে পড়বে! মধ্যরাতের ওয়াজ মাহফিলে আরবীর বন্যা বয়ে যায়! ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় একেকজনের আরবী নিয়ে কী পান্ডিত্য! কী চমৎকার করে, এঁরা কী অবলীলায়ই না বের করে ফেলেন 'ইয়াওম' মানে দিন হবে না, হবে দিবস।

এঁদের মধ্যে থেকে কেউ অনুবাদ করতে আগ্রহী হলেন না কেন?
এটা তো কোন মুরতাদের বই না। এবং আমার ধারণা, আমার মত নাফরমান বান্দার কথা বাদ দিলাম; যাদের ইসলাম ধর্মের প্রতি অযাচিত আবেগ আছে তারা ১০০টা ওয়াজ মাহফিলের চেয়ে উপকৃত হবেন বতুতার এই বই পড়ে। একাডেমিক কারণে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চাইব ইংরাজি অনুবাদের চেয়ে সরাসরি আরবী থেকে বাংলা অনুবাদ পড়ার জন্য।

আমাদের মোল্লা সাহেবদের কেমন কেমন করে যেন ধারণা জন্মে গেছে, জীবনে একটা মাত্র বইই পড়বেন, এটার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন করেই যাবেন, আজীবন। আর কোন বই পড়ার প্রয়োজন নাই।

Sunday, March 7, 2010

৭০০ বছরে আমরা কতটা সভ্য হয়েছি?

(অতি সূক্ষ রূচির পাঠক লেখাটা না পড়লেই ভাল করবেন)

সভ্য, সভ্যতা এই বিষয়গুলো আজও আমি ভালো বুঝি না! আমরা নাকি কালে কালে জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিরাট কামাল দেখাচ্ছি, সভ্য থেকে অতি সভ্য হচ্ছি। তাই হবে!

এইচ এ আর গিব-এর "ট্রাভেলস অব ইবনে বতুতা" (১৩০৪-১৩৬৯) থেকে অনেকটা আঁচ করা যায়, আজ থেকে আনুমানিক ৭০০ বছর পূর্বে মানুষ কেমন ছিল। একটা বর্ণনা এমন:‍
"...আমরা শহরে প্রবেশ করার সময় একটা বাজার পড়ল। আমাদের দেখেই অনেকে ছুটে এসে ঘিরে, ঘোড়ার লাগাম ধরে ফেলল। অন্যরাও এসে হইচই বাঁধিয়ে দিল, ঘোড়ার লাগাম ধরার চেষ্টা করতে লাগল। এই নিয়ে বিরাট বচসা। কেউ কেউ প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ছুঁরিও বের করে ফেলল। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম, আমরা কী ডাকাতদের কবলে পড়লাম?
আল্লার ইচ্ছায়, একজন আরবী জানা লোক এসে আমাদের বুঝিয়ে দিলেন, এরা স্থানীয় এবং এরা সবাই চাইছেন আমাদেরকে তাদের এখানে আতিথ্য গ্রহন করাবার জন্য। শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম!
পরিশেষে ভোটাভুটি হলো, ভোটে যে দলের নাম উঠবে আমরা তাদের এখানেই থাকব।...(এদের আতিথেয়তার কথা ভোলা অসম্ভব!)"

এরিমধ্যে প্রায় ৭০০ বছর চলে গেছে। এইসব বেদুইনদের চেয়ে আমরা অনেক শিক্ষিত-সভ্য হয়েছি। আজ আমরা মঙ্গলে পানি আছে কিনা এই নিয়ে বড়ো কাতর- আমাদের সে খোঁজ কতটা জরুরী কে জানে! আমার একটা রাগী চরিত্র রাব্বির ভাষায়, "...মঙ্গলের পানি দিয়া নিজের হাগা ধোব..."।

অন্য একটা পোস্টে উল্লেখ করেছিলাম, একটা মামলার তদ্বিরে মাসে দুবার আমাকে কোর্টে চক্কর লাগাতে হয়। এখানে বিচিত্রসব অভিজ্ঞতা হয়। আস্ত একটা উপন্যাস নামিয়ে ফেলা যায়।
থ্রিলার বই-টই যখন পড়তাম তখন নায়কদের দুর্ধর্ষসব কর্মকান্ড পড়ে মুগ্ধ হতাম কিন্তু এইসব নায়কদের একটা বিষয়ে উদাসীনতা আমার ভাল লাগত না সেটা হচ্ছে, বাথরুম বিষয়ক। পরে আমার মনে হলো এরা অতিমানব তো তাই এদের পেশাব-টেশাব করার প্রয়োজনই নাই!


তো, কোর্টের কাজে দীর্ঘ সময় আমাকে থাকতে থাকতে হয় এবং আমি অতিমানব না বলেই ব্লাডারের সঙ্গে আমায় কস্তাকস্তি করতে হয়।
হাজার-হাজার মানুষ পিলপিল করে এখানে আসেন কিন্তু টাট্টিখানা, হালের 'ওয়শরুম', খানিকটা পরিষ্কার করে বললে পেশাব করার কোন ব্যবস্থা আমার চোখে পড়েনি। প্রতি তলায় যেসব বাথরুম নামের জায়গায় মুত্রত্যাগ করা যায় সবগুলো তালা মারা থাকে। ভাবখানা এমন, বডি নিয়া আসছ, বডি নিয়া ফেরত যাবা, সঙ্গে নিয়া যাবা থলিভর্তি মুত্র। আইডিয়াটা মন্দ না!

আমার মনে পড়ছে, বছর চারেক আগের কথা। ওয়ারেন্টি ছিল বিধায় ঢাকায় এক সার্ভিসিং সেন্টারে
সেল ফোন নিয়ে গিয়েছিলাম। ১৫/ ১৬ তলায়, চোখ ধাঁধানো পশ একটা অফিস। গেছি রাতের ট্রেনে, সময় কম ছিল বলে সোজা এদের অফিসে। এদের অফিসের একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনাদের এখানে ওয়শরুমটা কোন দিকে?
তিনি বললেন, কি করবেন?
রাগ চেপে আমি খাস গ্রামের ভাষায় বলি, মুতব।
তিনি বললেন, আমাদের এখানে তো ব্যবস্থা নাই।
আমি বললাম, তা আপনারা কোথায় যান?
তিনি জানালেন, তাদের জন্য লাগোয়া বাথরুম আছে কিন্তু কাস্টমারের (মতান্তরে গেস্ট) জন্য না।
এমনিতে আমার কথা জড়িয়ে যায় কিন্তু খুব রেগে গেলে ঠান্ডা মাথায় গুছিয়ে বলতে পারি। আমি অমায়িক ভঙ্গিতে বললাম, ইয়ে আপনাদের ছাদে যাওয়া যায়?
তিনি হাসিমুখে বললেন, যায় তো। কেন?
আমি বললাম, ছাদে গিয়ে মুতব।
মানুষটা হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমার মুত্র ত্যাগ না করেও মুত্র ত্যাগের আনন্দ হচ্ছিল।

তো, আমার মাথায় আসছিল না এই কোর্টে, এখানে হাজার-হাজার মানুষ আসছে কিন্তু এদের জন্য অন্তত এই ব্যবস্থাটা রাখা হয়নি, কেন? পরে বাইরে দেখলাম, আরে কাহিনী তো অন্য!

আরে, এইটার দেখি আবার উদ্বোধনও করা হয়েছিল! বাথরুম
উদ্বোধন কেমন করে হয় এটা দেখার আমার বড়ো ইচ্ছা। জানি না এই বিরল সৌভাগ্য আমার হবে কিনা!
আমার শেষ ইচ্ছার কেউ তালিকা চাইলে এর মধ্যে এটাও থাকবে এতে আমার দ্বিমত নাই।
প্রফেসর সাহেবরা বাথরুম উদ্বোধন করেন। আমরা শিখি। শেখার কোন শেষ নাই!

এখন কেউ যদি রাস্তায় জিপার খুলে বসে যান, ভাসিয়ে দেন তাহলে আমাদের খুব চোখে লাগে বুঝি? সূক্ষ রূচি প্রচন্ড আহত হয়, না?
পুরুষদের যাও এই বাড়তি সুবিধা আছে কিন্তু মহিলাদের কথা ভেবে আমি শিউরে উঠি। কোন ডাক্তারের সঙ্গে কথা না বলেও বলে দিতে পারি বাংলাদেশের মহিলাদের ইউরিন ইনফেকশন সংক্রান্ত সমস্যার অন্যতম কারণ এটাও।

একটা শহর-নগরে কেউ গেলে এরা সেই শহরের অতিথি। অতি সভ্য আমরা অতিথিদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয় এটাই এখনও শিখিনি। এদের বসতে দেব না (হা ঈশ্বর, রাস্তার পাশে বসার জায়গায় রশি দিয়ে টব বেঁধে দিয়েছে যেন কেউ বসতে না পারে এই শহরে বসে ক্ষণিকের জন্য শ্বাসও ফেলতে পারব না, আকাশ দেখতে পারব না?), মুততে দেব না। আজিব, এটা কোথাকার মানবতা?
এইবার বাস্তবতাটা বলি, একজন যখন কোন শহরে যান তাকে যেতে দিয়ে কেউ মাথা কিনে নিচ্ছে না। ওই মানুষটা ওই শহরে বিভিন্ন উসিলায় গাদা-গাদা টাকা খরচ-খুইয়ে আসেন। শহরটার চাকা বনবন করে ঘোরে অতিথিদের টাকার কল্যাণে।

এইবার সূক্ষ রূচির পাঠক বিদায় নেন। আল্লাহ হাফেজ (খোদা হাফেজ এখন আর বলি না কারণ এটা নিয়ে অনেকে আপত্তি করেন। যেমনটা করেন গোশত না বলে মাংস বললে।)
...

এইবার কঠিন কিছু কথা বলি, কোর্টে কেউ হাওয়া খাওয়ার জন্য যায় না। মামলাটা করার পূর্বেই আমাকে সরকারী কোষাগারে গুনে গুনে ৪০ হাজার টাকা জমা দিতে হয়েছিল (যেখানে মাত্র ২০০ টাকা জমা দিয়ে একটা মামলা করা যায় সেখানে এই বিপুল টাকা আমাকে জমা দিতে হয়েছিল মামলার বিশেষ প্রকৃতির কারণে)। এখন আমাকে ৪০ ফোঁটা মুত্রত্যাগের সুযোগ না দেয়ার কারণ কি?!

Saturday, March 6, 2010

ডাক্তার নামের মানুষটা!

এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার কতশত ভয়াবহ অন্যায় করেন তার লেখাজোঁকা নাই। এইসব নিয়ে অসংখ্য পোস্ট দেয়া সম্ভব। আমার পূর্বের একটা পোস্টে এর খানিকটা আঁচ করা যাবে। ডাক্তারদের প্রতি আমার রাগের শেষ নাই।
অনেক সময় আমরা নিজেদের বিকিয়ে দেই ক্ষিধার জ্বালায়। একজন আল মাহমুদ কেন তার কলম বিক্রি করে দেন তা আমি খানিকটা বুঝি, বেচারার জন্য মায়া হয়।

কিন্তু একজন ডাক্তার পুরোপুরি সৎ থেকেও ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। এই দেশের জন্য টাকার অংকটা বিপুল- এই দেশে সরকারী চাকুরে ওরফে পাবলিক সার্ভেন্ট এখনও ৫০ হাজার টাকার উপরে বেতন পান না। তারপরও এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার,
দ্বিতীয় ঈশ্বর নামের এই মানুষগুলো কেন অমানুষ হয়ে যান এটা আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জানতে পারব এই ভরসা নাই। এই একটা পেশাকে আমি ঈর্ষা করি

আমি বারবার যে কথাটা বলে আসছি একজন ভালো ডাক্তার, ভালো লেখক মানেই একজন ভাল মানুষ না। ভাল মানুষ বলতে আমার অল্প জ্ঞানে বুঝি, যার আছে প্রকৃতির জন্য এবং প্রকৃতির সন্তানদের জন্য অগাধ ভালোবাসা।

ভাল ডাক্তার তো আছেন কিন্তু ডাক্তার নামের ভালো মানুষ কী নাই! থাকবেন না কেন, আছেন। কুমিল্লার মুরাদনগরের একজন ডাক্তার ইনি প্রতিদিন বিনা ফি-তে শত শত রোগি দেখেন। সকালে অন্তত ২০/৩০ জন রোগি না দেখে নাস্তা করেন না। আশ্রমে থাকেন, আশ্রমে ঘুমান, আশ্রমের কাপড় গায়ে দেন- মহাআনন্দেই আছেন।

মানুষটার কাছে আমি অনেকবার চিকিৎসার জন্য গিয়েছি। কোন এক বিচিত্র কারণে মানুষটা আমাকে পছন্দ করেন। তাঁকে ফি দিতে আমাকে বেগ পেতে হতো। খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। এই দেশের অধিকাংশ ডাক্তার যেভাবে টাকা আয় করেন সেভাবে চইলে এই মানুষটা অন্তত দেড় লক্ষ টাকা মাসে বাড়তি আয় করতে পারতেন। কিন্তু এই নিয়ে তাঁর কোন বিকার, উদ্বেগ নেই।

বাংলাদেশে খুব কম ডাক্তার আছেন যারা প্যাথলজি থেকে কমিশন খান না। সাফ হিসাব, ডাক্তার সাহেব যত টাকা টেস্ট লিখবেন তার ৪০ থেকে ৫০ ভাগ টাকা ডাক্তার সাহেব পেয়ে যাবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা যে টেষ্টগুলো লেখেন তা কেবল টাকার লোভে, সীমাহীন লোভ! ওষুধ কোম্পানি থেকে পান নিম্নমানের ওষুধ চালাবার জন্য মাসে মাসে মাসোহারা। ওষুধ কোম্পানীগুলো স্যাম্পলের নামে যেসব ওষুধ দেয় তা বস্তা ভরে বাজারে বিক্রি করে দেন। ওষুধ কোম্পানিগুলো হেন কোন জিনিস নাই যা ডাক্তারকে উপহার দেন না।
আমার জানার খুব আগ্রহ, ডাক্তার সাহেবরা যে আন্ডারওয়্যার পরে থাকেন এটাও কি ওষুধ কোম্পানির দেয়া? অথবা তাঁদের ইস্তারি সাহেবার...?
যে মা-র নরমাল ডেলিভারী করা সম্ভব ডাক্তার সাহেব তার পেট কেটে ফেলবেন কারণ এখান থেকে বড়ো অংকের টাকা তিনি পাবেন। এইসব খুব কমন প্র্যাকটিস।
কোন কোন ডাক্তার বাড়তি যেটা করেন, ট্রলি থেকে পশুর মত ছটফট করতে থাকা মাকে মেঝেতে নামিয়ে দেন টাকা দিতে দেরি হচ্ছিল বলে। ওই মাটা সারারাত আধ-জবাই পশুর মত ছটফট করতে করতে ভোরে হাল ছেড়ে দিয়ে মারা যান। এই পৃথিবীর মুখ দেখার আগেই হারিয়ে যায় একটি শিশু। আইন-সিস্টেম বলে, এই ডাক্তার সাহেবের গোপন কেশও কেউ স্পর্শ করতে পারবেন না। আর আমরা বলি, সবই আল্লাহর ইচ্ছা, মা-বাচ্চাটার হায়াত আছিল না।

আমি প্রায় দু-বছর ধরে ডাক্তার নামের মানুষটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আজ পর্যন্ত তিনি প্যাথলজি থেকে ১ পয়সা কমিশন নেননি, কোন ওষুধ কোম্পানি থেকে ওষুধ চালিয়ে দেয়ার নাম করে মাসোহারা নেননি, স্যাম্পল দাবি করেননি। কোন কোম্পানি জোর করে স্যাম্পলের নামে ওষুধ দিয়ে গেলে তা একটা বাক্সে জমান। পরবর্তীতে যাদের অষুধ কেনার টাকা নেই তাদের বিনা পয়সায় দিয়ে দেন।
যাদের ফি দেয়ার সামর্থ্য নাই তাদের এমনিতেই দেখে দেন। এবং ওই মানুষটাকে দেখেন যথাসম্ভব প্রথমে যেন তার এটা ধারণা না হয়, বিনা পয়সায় দেখাচ্ছেন বলে ডাক্তার তাকে অবহেলা করছেন।
একজন রোগীকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত দেখেন যতক্ষণ পর্যন্ত না রোগটা বের করতে পারেন। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ১ ঘন্টা ১০ মিনিট দেখার রেকর্ড তাঁর আছে! অভ্যাস নেই বলে প্রায়শ রোগী বিরক্ত হয়, ডাক্তার সাব, ছাইড়া দেন, কাজ আছিল।
খুব শান্ত খর্বাকৃতির এই মানুষটা তখন ক্ষেপে যান, আপনি কি আমার কাছে চিকিৎসার জন্য এসেছেন, নাকি বেড়াতে!

তো, তাঁকে আমার চিকিৎসার জন্য ফি দিলে তিনি নিতে না চাইলে,
আমি বলতাম, আমার কাছ থেকে ফি না নেয়ার পেছনে আপনার যুক্তি, কি বলেন তো শুনি?
তিনি মিনমিন করে বলতেন, আপনি..., তাছাড়া আপনার সঙ্গে...। ইত্যাদি।
তাঁকে আমি সাফ সাফ জানিয়ে দিলাম, আমার কাছ থেকে ফি না-নিতে চাওয়ার পেছনে আপনার যুক্তি আমার পছন্দ হলো না। এমনটা করলে পরবর্তীতে আপনাকে দেখাব না। আপনি যদি এই ফেভারটাই কোন মুক্তিযোদ্ধাকে করেন সেটা একটা কাজের কাজ হয়। এই দেশের সেরা সন্তান এরাই, আমরা না।
আমি সীমা ছাড়াই, আপনি আমাকে কথা দেন, কোন মুক্তিযোদ্ধা এলে আপনি বিনা ফি-তে
তাঁর চিকিৎসা করবেন।
আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। তিনি কথা দিয়েছিলেন।

সেই কথার ভরসা করে আমি মুক্তিযোদ্ধা নৌকমান্ডো ফযু ভাইকে তাঁর ওখানে পাঠিয়েছিলাম। কারণ ফযু ভাই প্রচন্ড শ্বাস কষ্টে ভুগছেন। তিনি ফযু ভাইয়ে কেবল যত্ম করে দেখেই দেননি। তাঁর জমানো ওষুধ বদলে দামী সব ইনহেলারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, বিনা মূল্যে!
পরে ফযু ভাই একটা শিশুর লাফাতে লাফাতে আমার কাছে এসেছিলেন, চোখ-মুখ আলোয় ঝলমল, এতো বড়ো একজন ডাকতর আমারে কি কইল, জানেন?
আমি নিরীহ মুখ করে বলি, কি কইলো?
কইলো, আপনাগো সেবার লাইগাই আমরা বয়া আছি। দরকার হইলেই চইলা আইবেন, কুনু সমস্যা নাই।

আমি নিজের অজান্তেই শ্বাস ফেলি, আসলে প্রয়োজন কেবল আমাদের একটু সদিচ্ছার। এই ডাক্তারের মত মানুষগুলো যদি খানিকটা এগিয়ে আসেন তাহলে দেশের এইসব সেরা সন্তানদের মৃত্যুর পূর্বে আমাদের মুখে একরাশ, ঘৃণা-থুথু ফেলে মরতে হয় না।

Friday, March 5, 2010

অভাগা মানুষটা দেখবেন আমার চোখ দিয়ে

আমি বিভিন্ন সাইটে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শত-শত পোস্ট দিয়েছি। আমার লেখাগুলো ছিল অনেকটা, চালু ভাষায় খাপছাড়া। এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যাদের নাম শুনতে শুনতে কানে তালা লেগে যায় তাঁদের নিয়ে লিখতে আমি উৎসাহ বোধ করতাম না। এদের নিয়ে লেখার লোকের তো অভাব নাই, আমি কেন?

আমার আগ্রহ ছিল, এই দেশে অতি সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অবদান নিয়ে: মুক্তিযুদ্ধে একজন সুইপার, একজন আদিবাসী নারী; আদিবাসি একজন কমান্ডার, একজন সাধারণ হিন্দু বালিকা, একজন বালক, একজন কৃষক, একজন অন্যদেশি, একজন ক্যামেরাবাজ, একজন সাধারণ নেতা(!), একজন কথাবাজ, বীরাঙ্গনাদের কথা; এইসব অজস্র মানুষ।
কেমন কেমন করে যেন আমাদের ধারণা দেয়া হয়েছে, গুটিকয়েক মানুষই এই দেশটা স্বাধীন করে ফেলেছেন, অন্য আর কারও অবদান ছিল না। এবং ওইসব মানুষদের ছায়াতলে আমাদের আজীবন নতজানু হয়ে থাকতে হবে। বুশ ইস্টাইল, হয় তুমি আমার দলে নইলে তুমি খেলা থেকে বাদ, রাজাকার।

আমার অফ-ট্র্যাকের লেখার ভঙ্গি অনেকেই পছন্দ করতেন না, কেন আমি অতি বিখ্যাতদের নিয়ে লিখি না এই নিয়ে পারলে আমাকে শূলে চড়ান, এমন। কখনও কখনও এটাও বলতে ছাড়তেন না, আমি একজন রাজাকার ভাবপন্ন, বয়সে কুলাতে রাজাকার উপাধি দিয়ে দিতেন।
তখন মুক্তিযুদ্ধের উপর ওইসব লেখায় অসংখ্য মন্তব্য পেয়েছি, ভাল লাগল, প্লাসাইলাম, মাইনাইসিলাম, স্যালুট ইত্যাদি। অবশ্য এইসব প্রতিক্রিয়া আমাকে লেখা চালিয়ে যেতে জোর তাগিদ দিত, লেখা তরতর করে লেখা এগুতো। এমনও দেখা গেছে, টাইপ করতে করতে ভোর হয়ে গেছে, নিজের অজান্তেই কখন গাল ভিজে গেছে টেরটিও পাইনি! লিখতে গিয়ে সত্যি সত্যি তখন দমবন্ধ হয়ে আসত। তখন মাথায় কেবল ঘুরপাক খেত, আহারে, কেমন করে এইসব মানুষদের ঋণ খানিকটা শোধ করার চেষ্টা করি।

সুরুয মিয়া (তাঁর প্রতি সালাম), যিনি ২০০৫ সালে ঠিক ১৬ ডিসেম্বর ভোরে আত্মহত্যা করেন। সুরুয মিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে যখন আলাপ করি তখন আমার মধ্যে খানিকটা পরিবর্তন আসে। কেন, আজ বলি:
এই ভদ্রমহিলার ছেলেও বিয়ে করে তাঁকে ছেড়ে গেছে, তিনি কেমন করে সংসার চালান আমি জানি না- তিনবেলা আদৌ খেতে পান বলে আমার মনে হয়নি! তিনি যখন তাঁর গাছের আম-পেপে কেটে আমাকে খেতে জোরাজুরি করছিলেন তখন আমার কেবলই মনে হচ্ছিল এখান থেকে ভোজবাজির মত উধাও হয়ে যেতে পারতাম যদি। না খেলে মানুষটা বড়ো কষ্ট পাবেন। কিন্তু খাবার গলা দিয়ে কী নামতে চায় শালার, আমার কেবল মনে হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে খাবারগুলো চিবুচ্ছি। কী দীর্ঘ সেই খাওয়ার সময়- মনে হচ্ছিল এই মহিলার মাংস চিবুচ্ছি।

আমার অন্য রকম কষ্ট হচ্ছিল, মুক্তিযুদ্ধটাকে আমরা সবাই মিলে একটা ব্যবসা বানিয়ে ফেলেছি। কেউ এটা থেকে টাকা কামাচ্ছি, কেউ নাম! কিন্তু এই মানুষগুলোর মুখে সামান্য হাসি আনার কোন চেষ্টা আমাদের নাই। কেবল প্লাসাইলাম আর মাইনাইসিইলাম, ব্যস, একেকজন অনেক বড়ো বড়ো দেশপ্রেমিক হয়ে বসে রইলাম! লম্বা-লম্বা বাতচিত সার, সরকার কেন কিছু করছে না? সরকার এসে রাস্তার কলার ছিলকাটা সরিয়ে দিলে আমরা হাঁটব!
ফাঁকতালে আমারও দেশপ্রেমিকের একটা তকমা জোটার সম্ভাবনা দেখা দিল!
শ্লা, প্রবাসে আমরা কয়েক ক্যান বিয়ার খেয়ে পেশাবের সঙ্গে যে টাকা বের করে দেই এই টাকা দিয়ে অন্তত একজন মুক্তিযোদ্ধার ঘরে ঈদ নিয়ে আসা যায়, অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্য!

এরপর থেকে অন্য কোন ওয়েব সাইটে লেখা আমি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলাম। ওখানে লিখলে অনেক পাঠক পড়ল, অনেক হিট হলো, অনেক মন্তব্য আসল। কী লাভ, কার লাভ-
তাতে দেশের এইসব সেরা সন্তানদের কী আসে যায়! এটা একজন নৌকমান্ডো, ফজু ভাইয়ের ঠেলা চালাবার জন্য কী কাজে লাগবে? কী কাজে লাগবে সুরুয মিয়ার স্ত্রীর? কেবল ওনাদের লাল সেলাম লিখে খালাশ! এই লাল সেলাম জিনিসটা কি? কি করে এইটা দিয়ে?
তারচেয়ে নিজের সাইটে লিখে খুব আরাম পাই। যে দু-চারজন পাঠক পড়েন এতেই আমার ভারী সুখ। বাড়তি কোন চাপ নাই।

ক-দিন পূর্বে প্রবাসী একজন দুম করে আমাকে বেশ কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেন। এর একটা অংশ মুক্তিযোদ্ধা নৌকমান্ডোকে দেয়ার জন্য। মানুষটার
টাকার অংক এবং নাম প্রকাশে অনীহা বিধায় এই প্রসঙ্গটা আপাতত উহ্য থাকুক।
কিন্তু
ফজু ভাইকে খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়। অবশেষে পাওয়া যায়, অসুস্থ, প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট তাঁর। তাঁর হাতে টাকা দিলে তিনি তাঁর শীর্ণ হাতে আমার হাত খামচে ধরে রাখেন। এখনও ফজু ভাইয়ের গায়ে কী জোর! আমি তাঁকে বলি, বিদেশ থেকে একজন মানুষ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।
ফজু ভাইয়ের যে অভিব্যাক্তি আমি দেখেছি এটা কি কুবরিক তাঁর ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন? বা মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতি তাঁদের লেখার মাধ্যমে? আমি জানি না, জানি না আমি।
আমি এর ছবি উঠিয়ে রাখতে পারতাম। ইচ্ছা করেনি। পৃথিবীর সব ছবি কি উঠানো যায়, নাকি উঠানো উচিৎ?

প্রবাসী ওই মানুষটি এই টাকা খরচ করার জন্য আমাকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন। এখনও তাঁর টাকা থেকে কিছু টাকা আছে,
আমি ঠিক করেছি সুরুয মিয়ার স্ত্রীকে এটা দেব। শেষবার আসার সময় এই মহিলা তাঁর দুর্বল হাত দিয়ে আমার হাত ধরে বলেছিলেন, কথা দেও, তুমি আমারে আবার দেখতে আইবা।
আমি কথা দিয়েছিলাম। কিন্তু কথা রাখিনি। যাইনি, গিয়ে কি করতাম? আবারও কি তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম, আইচ্ছা, কইনছেন দেহি, আপনের সোয়ামি যুদ্ধ যাওয়ার আগে কেমুন স্বপ্ন দেখছিল? শোনো কথা, যুদ্ধে যাওয়ার আগে আবার স্বপ্ন দেখে নাকি, এইসব স্বপ্ন তো দেখতেন আমাদের বড়ো বড়ো ন্যাতারা!

আমার মনটা অনেকখানি খারাপ হলো, আহা, যে প্রবাসী মানুষটা ফযু ভাইয়দের জন্য এই উপহার পাঠিয়েছেন সেই মানুষটা কী অভাগা, প্রবাসে থাকার কারণে এই দুর্লভ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হলেন, আহা!
কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে, প্রবাস থেকে যখন কেউ বরফ পড়া নিয়ে লেখেন, অন্য ভুবনের আনন্দ নিয়ে বরফের বল একজন অন্যজনের গায়ে ছুঁড়ে দিচ্ছেন, আমি সেইসব বর্ণনা পড়ে যেমন তার চোখ দিয়ে এটা দেখি তাহলে ওই মানুষটা কেন আমার চোখ দিয়ে এমন দৃশ্য দেখতে পাবেন না?

Thursday, March 4, 2010

এ অসভ্যতারই নামান্তর

কখনও কোন নগরে গেলে আমি প্রথমেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, পুরনো স্থাপনা। আমার কেবলি মনে হয়, আমার পূর্বপুরুষদের কেউ ডেকে ডেকে বলছে, কাছে আয়, গায়ে হাত বুলিয়ে দেই। এই অনুভূতিটা আমার নিজস্ব, কেউ হা হা করে হাসলে এতে আমার বয়েই গেছে!

শেকড়হীন, বৈদেশি সাহেবরা, যাদের পূর্বপুরুষ, বাবা-মা নিয়ে কোন বাড়তি আবেগ নাই তারাও আপ্রাণ চেষ্টা করে শেকড়-পুরনো স্থাপনাগুলো যথাসম্ভব সংরক্ষণ করার। আমাদের শেকড় ছড়িয়ে থাকে নারকেল গাছের মত কিন্তু এ নিয়ে আমাদের বিকার নেই!
পূর্বপুরুষদের ছায়া ধরে রাখার আগ্রহ আমাদের নাই, আজিব!

আমাদের দেশে এখনও যেসব পুরনো স্থাপনাগুলো টিকে আছে সাধারণ মানুষদের দেখার যো নেই। কেউ-না-কেউ, কোন-না-কোন উপায়ে দখল করে রেখেছে। কোনটাকে স্কুল বানানো হয়েছে, কোনটা কলেজ, ডিসি সাহেবের অফিস, কালেক্টর সাহেবের অফিস। নয়েতো সরকার বাহাদুরের খাস কোন অফিস, 'দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি' কেন জনসাধারণের জন্য উম্মুক্ত থাকবে না? কেন আমি 'কার্জন হল' ঘুরে ঘুরে দেখতে পারব না? এটা দেখার জন্য কেন আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতে হবে?

আমার স্পষ্ট মনে আছে, ময়মনসিংহে এক রাজবাড়ি দেখার জন্য গিয়েছিলাম। ঢুকতেই পারিনি। এটাকে মহিলা কলেজ বানানো হয়েছিল। উল্টো এক লক্ষ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল, কেন আমি না বলে মহিলা কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। নিশ্চয়ই আমার মনে কু আছে, আমি হয়তো বা কোন ছাত্রীকে 'আগওয়া'-অপহরণ করার মতলবে এসেছি।
আমি ভীতু টাইপের মানুষ কিন্তু ওদিনের পর থেকে আমার খানিকটা সাহস জন্মাল, যাক, লোকজন যখন এমনটা ভাবছে আমি ছাত্রী অপহরণ করতে পারি তাহলে মানুষটা আমি একেবারে পুতুপুতু না।



১৯২৭ সালের এই নয়নাভিরাম, সুরম্য স্থাপনাটিকে এখানকার সবাই চেনে পূবালী ব্যাংক বিল্ডিং নামে! কে এদের সঙ্গে তর্কে যাবে ১৯২৭ সালে পূবালী ব্যাংক ছিল, কি ছিল না।
বাইরে মানুষ এবং পোস্টারে সয়লাব। স্থাপনাটার ভেতরে ঘুরে দেখার ইচ্ছা ছিল, একেকটা জানালাই দেখছি ৬ ফুটের উপর। কিন্তু ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগে আটকা পড়তে চাইনি এবং আটকা পড়লে আজ পোস্ট দেয়া সম্ভব হতো না এই ভাবনায় সোজা লম্বা দিলাম।



'রানীর কুঠি' বিশাল ধর্মসাগরেই পাশে। ছবি উঠাবো কি ছাই, সাইনবোর্ডের আড়ালে কুঠিটা দেখা গেল তো! এটার ভেতরেও যাওয়া সম্ভব হলো না কারণ এটা দখল করে রেখেছে 'বার্ড'। এটা তাদের অতিথিশালা। আচ্ছা, 'অতিথি শালা' এই জিনিসটা কি, অতিথিশালায় কারা কারা থাকে? না, নামটার সঙ্গে শালা শব্দটা আছে তাই গুলিয়ে ফেলেছি। আমি আরেক অভাগা, ইস্তিরি সাহেবার সন্তানের আপন মামা নাই কিনা! আহা, এই অতিথিশালায় থাকার কোন উপায় আমার নাই, আহারে!

'ড. আখতার হামিদ খান স্মারক বাসগৃহ' এটার দেখি আরেক কাহিনী। রানীর দিঘীর সংলগ্ন পুরনো একটা বাড়িতে ঠিক এমন একটা কথাই লেখা দেখলাম। ইনি কী পুরনো বিখ্যাত স্থাপনা বেছে বেছে কিছু কাল বাস করতেন নাকি? হতে পারে এগুলো ওনার আত্মীয়দের ছিল। তাই হবে।
গুগলে সার্চ দিলে ওনার সম্বন্ধে জানা যাবে কিন্তু আগ্রহ বোধ করছি না। এই দেশের নামী-দামী মানুষদের প্রতি আমার আগ্রহ কম। কারণ এদের মনন স্পর্শ করার ক্ষমতা, এদের সঙ্গে কথা বলার যোগ্যতা, এদর নিয়ে ভাবার মত যথেষ্ঠ ঘিলু আমার নাই।
আফসোস, থাকলে ভালো হতো।

Wednesday, March 3, 2010

মুক্তিযুদ্ধে, একজন ট্যাংক-মানব!

মুক্তিযোদ্ধা এম এ জব্বার।
এই মানুষটা আমার জন্য অসাধারণ এক উপহার নিয়ে এসেছেন। ১৯৭১ সালের গুলির বাক্স।
(আমার জীবনে এমনিতেই জটিলতার শেষ নাই। তাই জটিলতা এড়াবার জন্য আমাদের দেশের চৌকশ গোয়েন্দাদের আগাম বলে রাখি, এই গুলির বাক্সটা খালি।)
 
১৯৭১ সালে এই মানুষটাই পাকিস্তান থেকে আস্ত একটা রাশিয়ান T-55 ট্যাংক নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। জিটি রোড, ওয়াগা সেক্টরে ট্যাংক চালিয়ে পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সীমান্তে চলে এসেছিলেন। 
জব্বার ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব, হানিফ, জহির, হাবিব, তরিকুল ইসলাম চিনু সহ ৬ জন। কিন্তু পালাবার সময় যে ঝামেলাটা হলো তাঁদের কাছে বের হবার পাসওয়ার্ড নাই, তখন বাঙালিদেরকে পাসওয়ার্ড দেয়া নিষেধ ছিল। পাসওয়ার্ড বলতে না-পারলে গেইটে আটকে দেবে! এরপর পরিণাম কোর্ট-মার্শাল। সামরিক আইনে বিচার!
এরপর চিনু ভাই একটা বুদ্ধি বের করলেন। মুলতান রোডে যে অ্যামুনেশন ডিপো ছিল ওখানে সবাই লুকিয়ে রইলেন।
যখন অবাঙালি অফিসার জিপে করে আসলেন গেটের সেন্ট্রি যথারীতি তাকেও আটকে দিল, পাসওয়ার্ড জানতে চাইল? তখন সে অফিসার বলল, 'আসমান জমিন'। এভাবেই জব্বার ভাইরা পাসওয়ার্ড জেনে গেলেন।
কী এক পাগলামী, কী অকল্পনীয় এক কান্ড! একটা রগরগে মুভিকেও হার মানায়! ভারতীয় সেনার কাছে আত্মসমর্পণ করার পর চলে বিরামহীন জিজ্ঞাসাবাদ- মানুষটা কি পাকিস্তানী চর? ভারতীয় সেনার হাত থেকে ছাড়া পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে

মানুষটা বলে যাচ্ছেন। আমি শ্বাস আটকে শুনি সেইসব আগুন দিনের কথা, তাঁর অসম সাহসীকতার কথা। কতশত অজানা কথা! আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধা হোমো এরশাদ সাহেবের বীরত্বের(!) কাহিনী। তিনি এবং রওশন এরশাদ যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে। ওখানে ওনারা উর্দুতে বাতচিত করতেন। যারা পালিয়ে আসার জন্য ফাঁকফোকর খুঁজতেন তাদের প্রতি এরশাদ মারাত্মক উষ্মা প্রকাশ করতেন, উর্দুতে:
'শালে, তুমলোগ কে লিয়ে আমলোগ কা জিনা হারাম হো যাতা। ইন্ডিয়া তুমলোগ কা দিমাগ ঘুমা দিয়া'। 
এরশাদ সাহেবের এইসব বাতচিত বাংলাতে অনুবাদ করলে অনেকটা দাঁড়াবে এমন: 'শালারা, তোমাদের জন্য আমাদের জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে গেছে। ভারত তোমাদের মাথা এলোমেলো করে দিয়েছে'।
 
মানুষটা এখন একজন সুখি মানুষ। তার আছে ভদ্রস্থ জীবন-যাপন করার সুযোগ। শুনে ভালো লাগে। তার গোলায় আছে ধান, পুকুরে মাছ, চলে যায়। তবুও মানুষটার কী এক হাহাকার! তাঁর সাহসীকতার জন্য তাঁকে বীরপ্রতীক খেতাব দেয়া হয়েছিল। লিখিতাকারেও আছে কিন্তু পরবর্তীতে তিনি প্রবাসে চলে গেলে এই বীরপ্রতীক খেতাবটা গেজেটে উঠেনি তদ্বিরের অভাবে। আজ তিনি একজন খেতাববিহীন মানুষ! সোজা বাংলায় রাষ্ট্র তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকার করে না!
তাঁর আক্ষেপ আমার কানে তালা লাগিয়ে দেয়:
"কেন আমাকে খেতাবের জন্য তদ্বির করতে হবে? কেন? আমি কি এই জন্য আস্ত একটা ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান থেকে দেশে চলে এসেছিলাম?ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান একটা T-33 বিমান নিয়ে পালিয়ে আসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, তিনি এই দেশের বীরশ্রেষ্ঠ। তাঁকে আমি স্যালুট করি। আর আমি ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসতে সফল হই কিন্তু আমাকে তদ্বির না করার অপরাধে একজন খেতাব বিহীন মানুষ হয়ে থাকতে হবে, কেন?"
আমি ক্রমশ নগ্ন হয়ে পড়ি- এক চিলতে কাপড়ের যে বড় প্রয়োজন! এইসব ক্ষেত্রে আমি চুপ করে থাকি, আকাশ দেখি। ভুলেও সামনের মানুষটার চোখে চোখ রাখি না।

 
*বক্তব্যগুলো জনাব এম, এ, জব্বারের নিজস্ব। তাঁর এইসব বক্তব্যর সপক্ষে প্রমাণ এবং সচিত্র-চলমান চিত্র (যার চালু নাম ভিডিও ক্লিপ) আমার কাছে সংরক্ষিত।
**আমার মাথায় নতুন এক ভূত আসন গেড়েছে। এখন থেকে এইসব আগুন-মানুষদের আনন্দ-বেদনা ভিডিও করে রাখব। এঁদের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে, পাল্লা দিয়ে কমছে আমার আয়ু। এ ব্যতীত আমার গতি কী! সুরুয মিয়ার (তাঁর প্রতি সালাম), যে মানুষটা ২০০৫ সালে, ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে আত্মহত্যা করেন। ওইসব অজানা কথা তখন সেলফোনে ধারণ করে না রাখলে আজ কোথায় পেতাম?
জনাব, এম, এ, জব্বারকে নিয়ে একটা সিরিজ লেখার ইচ্ছা আছে, দেখা যাক।


*** হালনাগাদ তথ্য: অবশেষে দেশ তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
 

Tuesday, March 2, 2010

বাংলালিংক, তবুও তোমায় ধন্যবাদ

'বাংলালিংক' সেল কোম্পানিটি অসাধারণ একটা কাজ করে ফেলেছে। 'বাংলালিংক এ্যাডভান্স' নামে দুর্দান্ত এক অফার চালু করেছে। কারও ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে সে ৫ টাকা আগাম ব্যালেন্সের সুবিধা ভোগ করতে পারবে।
অতি সংকটময় মুহূর্তে কারও টাকা শেষ হয়ে গেলে অন্তত ফোন করে কাউকে বলতে পারবে, ভাইরে, আমি বড়ো বিপদে আছি। এটা ভুক্তভোগি ব্যতীত অন্য কেউ বুঝবেন না, যেমনটা বুঝবেন না পোস্ট-পেইড গ্রাহক।

বিজ্ঞাপনটা দেখে আমার মনটা ভারী বিষণ্ন হয়।
ক-মাস আগের কথা। মাহাবুব ভাই নামে আমার একজন সিনিয়র আছেন। মানুষটা বিচিত্র কারণে আমাকে পছন্দ করেন, আমার যাবতীয় প্রলাপ শোনেন, আমাকে আশার বাণী শোনান। আমার নিজেকে যখন পুরোপুরি বাতিল মানুষ মনে হতো, এই মানুষটার সঙ্গে কথা বলে ক্ষীণ আশা জন্মাত, হয়তো এখনও পুরোপুরি বাতিল হইনি। মানুষটার এই ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না।
তো, তাঁর সঙ্গে দুনিয়ার হাবিজাবি প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হতো, এখনও হয়- কতশত আইডিয়া আমার মাথায় ঘুরপাক খায়। কয়েক মাস পূর্বে কথা প্রসঙ্গে তাঁকে বলেছিলাম, এই আইডিয়াটার কথা। এটার সঙ্গে জুড়ে অসম্ভব মানবিক একটা বিজ্ঞাপনের প্লটও।
তিনি উল্লসিত হয়ে বলেছিলেন, বাহ, বেশ তো!

আমি যখন থেকে সেল ফোন ব্যবহার করি তখন থেকেই প্রি-পেইড গ্রাহক। বেকায়দা অবস্থায় যখন ব্যালেন্স শেষ হয়ে যায় তখন কতটা অসহায় বোধ হয় এটা আমার চেয়ে কে ভালো জানে।
বেশ ক-বছর আগের কথা। আমাদের ভালবাসা-বাসির প্রথম সন্তান আসি আসি করছে। আসি আসি বাবুর মার তখন উথাল-পাতাল জ্বর। গভীর রাতে আমি ডাক্তারের কাছে যখন ফোন করলাম, সমস্যা বলার আগেই আমার ব্যালেন্স শেষ। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, সেই রাতটা, কী দীর্ঘ একটা রাত!

পরবর্তীতে আমি আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করতাম, কোম্পানিগুলো কেন এমন কোন সুযোগ দেয় না যেন গ্রাহক চরম জরুরী সময়ে ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলেও অন্তত দু-চার মিনিট ফোন করতে পারে। পরবর্তীতে রিচার্জ করার সঙ্গে সঙ্গে আগাম টাকাটা কেটে নিলেই হয়, সমস্যার তো কিছু নাই। সেই অপেক্ষা আর শেষ হয় না।

এইসব নিয়ে তখন মাহাবুব ভাইয়ের সঙ্গে আইডিয়া শেয়ার করছিলাম। এমন কোন সেল কোম্পানি পাওয়া গেলে এই আইডিয়া নিয়ে চমৎকার একটা ক্যাম্পেইন শুরু করা যায়।
তিনি কিছু সুবিধা-অসুবিধার কথা বললেন। অনেক হিসাব-কিতাবের বিষয় এখানে জড়িত। ইত্যাদি।
আমি বলেছিলাম, এমনিতে সেল কোম্পানিগুলো কত ছাতাফাতা অফার তো দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু লিজেন্ড হলে গেলে নতুন কোন আইডিয়ার বিকল্প নাই। এবং পাশাপাশি ধামাকা বিজ্ঞাপন অন্য কোম্পানিকে শুইয়ে ফেলার জন্য।
আমি চাচ্ছিলাম, গ্রামীন ব্যতীত অন্য কোন কোম্পানি। প্রয়োজনে অন্য সেল কোম্পানিকে বিনে পয়সায় আগ্রহের সঙ্গে আইডিয়া দেব কিন্তু গ্রামীন টাকা দিলেও না। আমি চোখ বুজে এখনই বলে দিতে পারি গ্রামীন নামের এই দানব কালে কালে এই দেশের প্রায় সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে, এমন কী আমরা বিছানায় কেমন কেমন করে সময় কাটাবো, এটাও! এদের সাথে থাকুক প্রথম আলোর মতি ভাইয়া, ওনারা দুনিয়া কাঁপালেন, নাকি বিছানা তাতে আমার কী!
এমন একটা দানবের সঙ্গে জড়াজড়ি থাকতে আগ্রহ বোধ করি না- কামসূত্র আছে কোন দিনের জন্য!

বিজ্ঞাপনটা দেখে
কাল যখন মন খারাপ করে মাহাবুব ভাইকে ফোন দেই, তিনি কঠিন বকা দেন, লিখে রাখেন, আপনার কিসসু হবে না।
আমি মন খারাপ করা শ্বাস ফেলি, লিখে আর কি করব! আমাকে দিয়ে কিসসু হবে না এটা জানার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না, এ তো আমি বিলক্ষণ জানি।
তিনি আমাকে ছাড় দেন না, আপনি কি মনে করে বসে রইলেন!
এর কি উত্তর হয়, এই দেশে যারা আইডিয়া ভাজাভাজি করেন তাদের কাউকে তো আমি চিনি না।
এবার
হয়তো তাঁরও মন খারাপ হয়, আপনি অন্তত ওয়েব সাইটে লিখতে পারতেন।
মানুষটাকে কেমন করে বোঝাই ওয়েব সাইট হচ্ছে গণিমতের মাল, নন-কমার্শিয়াল সেক্স ভলন্টিয়ারের সঙ্গে এর খুব একটা ফারাক নাই। অন্যদের দোষ দেই কোন মুখে! আমাদের দেশের প্রথম শ্রেণীর পত্রিকাগুলো ওয়েব সাইট থেকে হরদম চুরি-চামারি করেই যাচ্ছে। চোট্টামি সমাপ্ত করে,
লিকারের প্রভাবে মনটা খানিকটা উৎফুল্ল থাকলে বদনা হাতে টাট্টিখানায় যাওয়ার পূর্বে লিখে দেয়, 'ওয়েব সাইট অবলম্বনে'।

এই দেশে চুরি-চামারিটা চলে গেছে শিল্পের পর্যায়ে। একজন ডলি সায়ন্তনি একবেলা ভাত খাইয়ে ১০০ টাকা ধরিয়ে
কাঙালিনী সুফিয়ার গান হাপিস করে দেন, একজন মাহমুদুজ্জামান বাবু অতুল বাবুর গান অনায়াসে নিজের বলে চালিয়ে দেন। অতুল বাবু প্রতিবাদ করলে খোঁড়া যুক্তি দেখান, আমি তো ওঁকে গিয়ে পাইনি। বাহ, বেশ!
সেলিব্রেটিরা আমাদের শেখান কেমন করে অন্যের মাল নিজের বলে চালিয়ে দিতে হয়।

যাগ গে, এই আইডিয়া অন্য একজন বাস্তবায়িত করে দেখিয়ে দিয়েছেন, আমি বিমর্ষমুখে তাঁকে স্যালুট করি। অনেকের কাছে বিষয়টা অতি তুচ্ছ মনে হবে কিন্তু আমার বুকের গভীর থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসে, এমন কেন হবে? আমার ভাবনা-আইডিয়া নামের সন্তানগুলো বিকলাঙ্গ হবে কেন? আমি হেরে যাই তাতে ক্ষতি নাই কিন্তু আমার আইডিয়াগুলোর ভ্রুণাবস্থায় মৃত্যু হবে কেন?

কোথাও শেয়ার করলে তা চুরি হয়ে যাবে, মাথায় লুকিয়ে রাখলে তাও কেউ-না-কেউ আগেভাগেই ভেবে বসে থাকবে। কতশত আইডিয়া মাথায় ঘুরপাক খায়। এইগুলো নিয়ে কী করব! আহারে, বাথরুমে ফ্ল্যাশ করার ব্যবস্থা নাই, থাকলে ভালো হতো।

একবার একজন আসলেন, রিয়েলিটি শো করবেন। তিনি আমাকে বাতলে দিচ্ছিলেন, আমি কেমন কেমন করে তার ভাবনাগুলো ভাবব- পেইড রাইটাররা যা করেন আর কী! ভালো পয়সা পেলে পেইড রাইটাররা তাঁদের যন্ত্র দিয়েও লিখে দেবেন, আই বেট!
আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, কেন রে বাপু, আকাশ ছোঁয়া নারকেল গাছে একজন মানুষ তরতর করে উঠে যাচ্ছে এটা কী রিয়েলিটি শো না?
মানুষটা পশ্চাদদেশ দোলাতে দোলাতে চলে গিয়েছিলেন। তা যাক, পুরুষদের পশ্চাদদেশ দোলানো আমায় টানে না।

সফট-ড্রিংকস নিয়ে একটা চমৎকার আইডিয়া আছে, অপেক্ষায় আছি, কবে, কার মাথা থেকে এটা বের হয় তা দেখার জন্য। শ্লা, সব সময় দর্শক হতে ভালো লাগে আর। চুতিয়া আমি, আমার উপর নিজেই বিরক্ত! হুশ! দূর হ মরদুদ, না ফাতেহা, না দরুদ!

Monday, March 1, 2010

কবি নজরুল, আপনি মরে বেঁচে গেলেন

কবি নজরুল। আমার অসম্ভব পছন্দের কবি এটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না। কিন্তু "খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে, বি-রা-ট শিশু..." তাঁর এই অমর সৃষ্টি যখন অনুপ জালোটার গলায় শুনি তখন মনে হয় এটা গান না, অসাধারণ এক প্রার্থনা। এটা লেখার পর নজরুল আর এক লাইনও না লিখলে সমস্যা ছিল না। এমনিতেই অমর হয়ে থাকতেন।

আমাদের দেশে অনেকে কখনও কখনও নজরুলকে নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে অনাবশ্যক বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। প্রতিপক্ষ হিসাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দাঁড় করিয়ে আরাম পান কারণ রবিদাদা হিন্দু। অনেক শিক্ষিত মানুষের মুখে যখন এইসব শুনি তখন মনে হয়, গোবর খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করার পরামর্শ না দিয়ে গতি কী!

নজরুল বেশ কিছু দিন কুমিল্লায় ছিলেন। এটা ভাসা ভাসা জানতাম।
এবার রাণীর দিঘীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, আচ্ছা,
মানুষটা যখন এখানে এসে বসতেন, লিখতেন, আড্ডা দিতেন তখন কি মানুষটার বাবরি চুল ছিল? ছিল কি মানুষটা ভাবুলতায় মাখামাখি দু-চোখ?
আচ্ছা, মানুষটা কি এই দিঘীতে পা ডুবিয়ে বসতেন? আচ্ছা, এখানে কি মাধবী লতার গাছ ছিল? আচ্ছা, প্রমিলাকে যখন চিঠি লিখতেন তখন তাঁর মনে কি ভাব খেলা করত? আচ্ছা, তিনি কি ভুল করেও কখনও
প্রমিলাকে চিঠিতে লিখে ফেলেছিলেন, প্রাণসখি চুম্বন লইয়ো...। লিখে ফেলে ভারী বিব্রত হয়ে ওই কাগজটা কুচিকুচি করে দিঘীর জলে ফেলে দিয়েছিলেন? আচ্ছা, ...?

এই ছবিগুলো উঠাতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে কারণ এর নীচে বসে কেউ-না-কেউ ব্লাডার খালি করছে, যার চালু নাম পেশাব করা।
এই কুৎসিত দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে আগ্রহ হয়নি কারণ এদের দোষে দেই কেমন করে! পেছনে অতি নিকটে কালো যে দেয়ালটা দেখা যাচ্ছে এটা হচ্ছে এই শহরের সভ্য মানুষদের বানানো পাকা ডাস্টবিন! রাজ্যের আবর্জনা ফেলা হয় এখানে।
আমরা বড়ো বিচিত্র জাতি, এ দেশের সেরা সন্তানদের কত রকমে অসম্মান করা যায় এই নিয়ে আমাদের প্রতিযোগীতার শেষ নাই!

ভিক্টোরিয়া কলেজের আয়ত্বের ভেতর নজরুলের এই স্তম্ভটা। যে কলেজ নামের কারখানা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে বের হচ্ছে, এরা স্বাধীনতার সৌধে কুৎসিত কথাবার্তা লিখবে, ততোধিক কুৎসিত ছবি আঁকবে এতে বিস্মিত হওয়ার কী আছে! ধুতুরা গাছে ধুতুরাই তো ধরবে, কেন এটায় স্ট্রবেরি ধরে না এ নিয়ে ফিজুল অস্থির হওয়ার মত বোকামী আর কিছু নাই।

Sunday, February 28, 2010

আমাদের সূর্য-সন্তান, লহ মোর সালাম!

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, পরে উচ্চতর শিক্ষাদানের সঙ্গেও যুক্ত হয়। কবি নজরুলের কারণেও বিখ্যাত রাণীর দিঘীর পাড়ে অবস্থিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি একদা গ্রেটার কুমিল্লার গর্ব, এখনও।

কোথাও গেলে প্রথমেই আমাকে টানে পুরনো স্থাপনাগুলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। খানিকটা আঁচ করা সম্ভব হয় তখনকার মানুষগুলো কতটা এগিয়ে ছিলেন।


এর প্রতিষ্ঠাতা রায় বাহাদুর আনন্দ মোহন রায়। আমি কুমিল্লাবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ, মূর্তি নামের ভাস্কর্যটি এখনও অটুট আছে।


কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শহীদদের স্মরণে প্রতীকটির কারুকাজ দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় কী!


গুটিকয়েক শহীদদের নাম।



স্বাধীনতা সৌধ নামের এই স্থাপনার গায়ে অসংখ্য অশ্লীল ছবি, কথা! আমার তোলা অসংখ্য কুৎসিত ছবি থেকে বেছে বেছে খানিকটা সহনীয় ছবি এখানে যোগ করলাম। কখনও ছবি এমন জান্তব হয় উপরের এই ছবিটা না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। আমি যখন ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন মনে হচ্ছিল পেশাবের ছিটা আমার গায়ে এসে পড়ছে!

আমার মাথায় কেবল ঘুরপাক খায় আসলে সূর্য-সন্তান কারা? যাঁরা এখানে শুয়ে আছেন, তাঁরা? উঁহু। যারা এই ছবিগুলো, কথা এখানে লিখেছে, তারা? উঁহু, আমার মনে হয় না। কারণ ভুল ইতিহাস নিয়ে বড়ো হওয়া এই প্রজন্মকে খুব একটা দোষ আমি দেই না।
তাহলে কারা? এই ব্যস্ততম রাস্তার মাঝ দিয়ে অসংখ্য মানুষ চলাচল করেন। এটা কারও-না-কারও চোখে পড়েনি এ আমি বিশ্বাস করি না! তাছাড়া এই ভিক্টোরিয়া কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েই আছেন সিকি-আধুলী (আমার আবার সহকারী, সহযোগী অধ্যাপক এইসব মনে থাকে না) পরফেসর (!) সাহেবরা! এইসব সূর্য-সন্তানরা আসলে ভাবেননি এটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু। কারণ তারা যে সূর্য-সন্তান, আমাদের দেশের সেরা সন্তান!

ডিসেম্বর, হালের ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে যে কান্নাটা আমরা কেঁদেছি, ওই কান্নার পানি সরে না গেলে দেশে অকাল বন্যা বয়ে যেত এতে অন্তত আমার কোন সন্দেহ নাই। আজ ১৬ ফাল্গুন যার চালু নাম ২৮ ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারি মাস প্রায় শেষ, আগামী বছরের ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি মাসে জাতি বিনম্র শ্রদ্ধার নামে আবারও কাঁদার জন্য প্রস্ত্তত হবে, ইনশাল্লাহ। কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেছে...।

Saturday, February 27, 2010

বন ভয়েজ, বইমেলা

২১ তারিখের বইমেলার মানবস্রোতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। অতি দ্রুত এখান থেকে বেরুতে পারলে বেঁচে যাই। আহা, আমি বেরুতে চাইলেই তো হবে না, মানবস্রোত আমায় বেরুতে দিলে তো!
তাছাড়া আমায় ফিরতে হবে কাফরুল, স্কুটারে ফেরা যাবে না। আমি নিশ্চিত, আটকে দেবে। আবারও এলিয়েন ওরফে আর্মিদের মুখোমুখি হতে চাচ্ছিলাম না। গতবার এই নিয়ে কম হেনেস্তা হতে হয়নি।

হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় থামতে বাধ্য হই, কাশেম প্রকাশনীর কাছে। এই প্রকাশনীর সবগুলো বইই একজন লেখকের! এ পর্যন্ত ওনার ৯৪টি বই বের হয়েছে। লেখক এবং প্রকাশক একই ব্যক্তি। আমি বইগুলোর নাম পড়ার চেষ্টা করি, বোরকাওয়ালীর প্রেম, প্রেমে এতো জ্বালা কেন?, প্রেম একটি ফুটন্ত গোলাপ, ইত্যাদি। আমি ওই লেখকের জরায়ুর জন্য বেদনা বোধ করে ওখান থেকে সরে আসি।

আমার বন্ধুরা বুদ্ধি দিল বাসে করে চলে যেতে, এলিয়েন-আর্মিরা নাকি বাস আটকায় না (আহা, বাস আটকালে নিজেদের চলাফেরায় খুব সমস্যা হয় বুঝি!)। ৪ নাম্বার বাসে করে গেলেই সহজেই চলে যেতে পারব। আমি চোখে অন্ধকার দেখি। বাস আমাকে কোত্থেকে কোথায় নামিয়ে দিয়ে ভুস করে চলে যাবে, তখন আমার গতি কী? পারতপক্ষে সঙ্গে কেউ না-থাকলে আমি বাসে উঠি না।

এরা আমাকে পানির মত সব বুঝিয়ে দিলেন, যথারীতি আমি কিছুই বুঝলাম না। রাসেল, মাশা এঁরা আমার সম্বন্ধে খানিকটা ওয়াকিবহাল, এঁদের মনটাও নরোম। এরা বললেন, 'ঘটনা বুজছি আর বলতে হবে না। আসেন শাহবাগ যাই, চা-চু খাই। ওখান থেকে আপনাকে বাসে উঠিয়ে দেব'।
আমি
মহা আনন্দে এদের পিছুপিছু হাঁটতে থাকি, এরা হাঁটলে আমি হাঁটি, থামলে থামি। ফাঁকতালে কথা, ভাবনা চালাচালি হতে থাকে। বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খাওয়া, সিগারেট টানার সঙ্গে অন্য আনন্দের তুলনা কোথায়?

অসম্ভব ব্যস্ত শাহবাগ চৌরাস্তা পেরুতে হবে। এদের সঙ্গে আমিও অপেক্ষা করি। এরা হাঁটা ধরলে আমিও হাঁটা ধরি, থামলে থামি। কোথাও একটা ভজকট হয়ে যায়, মাঝ রাস্তায় বেকুবের মত দাঁড়িয়ে আছি। আরেকটু হলেই স্কুটার গায়ের উপর উঠে আসত। রাসেলের চিল চিৎকার, 'আপনি নিজেও মরবেন, সাথে আমারেও মারবেন'।
রাস্তা পার হওয়ার পর রাসেল চোখ লাল করে রাগে লাফাতে থাকেন, 'আচ্ছা, বিষয়টা কী! হে, বিষয়টা কী! আর একটু হইলেই তো কাম সারছিল! বাড়িত থিক্যা কি বিদায় নিয়া আইসেন?'

আমি মুখে বোকা বোকা হাসি ঝুলিয়ে রাখি। কি বলব, এই প্রশ্নের কী উত্তর হয়!
রাসেলের রাগ কমে না, 'এইটা আপনের মফস্বল না, এইটা ঢাকা শহর। এইখানে মানুষকে প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটতে হয়'। নইলে সব শেষ'।
আমি উদাস হয়ে সিগারেট টানতে টানতে বলি, 'তাই! মন্দ কী, মাঝে মাঝে জীবনটা বড়ো ক্লান্তিকর মনে হয়'।
রাসেল নামের মানুষটা একসময় হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু রাগ কমে না, 'আপনে আর ঢাকা আইসেন না। ঢাকা শহর আপনের জন্য না। আমি লেইখা সই কইরা দিব, আপনে ঢাকা শহরে চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত-অচল'!

তিনি এই অচল মালকে মাশার কাছে হস্তান্তর করে বিদায় নেন। আমি যেদিকে যাব মাশা যাবে এর উল্টোদিকে। বাসের জন্য অপেক্ষার একশেষ! ৪ নাম্বার বাস তো আর আসে না। সব ৩ নাম্বার। আজ ৩ নাম্বাররা সব দলে-দলে বেরিয়ে পড়েছে! মাশা হচ্ছে একটা চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া- এ কেমন করে সব মুখস্ত করে বসে থাকে আমি ভেবে ভেবে সারা। দুনিয়ার তাবৎ বই পড়ে বসে আছে, জিজ্ঞেস করামাত্র গড়গড় করে বলে দেয়, এমন।
তো মাশা আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, ৩ নাম্বার বাসে গিয়ে ফার্মগেটে নেমে কেমন কেমন করে পৌঁছা যাবে। আমি হুঁ-হুঁ, ও আচ্ছা-আচ্ছা করছি কিন্তু এর বুঝতে বাকী থাকে না, এটা পন্ডশ্রম। মাশা নামের দয়াবান মানুষটা বলেন, 'চলেন, ফার্মগেট পর্যন্ত আমিও যাই'।
অবশেষে ফার্মগেটে ৪ নাম্বার বাসে উঠিয়ে কন্ডাকটরকে বলে দেন, 'মামা, অসুস্থ মানুষ একটু কাফরুল নামায়া দিয়েন'। মানুষটা বিদায় নেন।

বাসে উঠে আমি গভীর শ্বাস ফেলে বলি, প্যারাডাইস লস্ট। বন ভয়েজ, বইমেলা। আগামীতে তোমার সঙ্গে দেখা হবে এ আশা ক্ষীণ!

Friday, February 26, 2010

ঘুষ দিতে আমার মোটেও আপত্তি নাই

দুর্নীতির প্রধান একটা স্তম্ভ, ঘুষ। এই দেশে সুযোগ পেলে ঘুষ কে খান না এটা গবেষণার বিষয়! খানিকটা ঘুরিয়ে বললে ঘুষ খান না, বেশ, কত টাকা খান না? অবশ্য একটা অংশ আছে যাদের সুযোগ এবং সাহসের অভাব।
খুব অল্প মানুষই আছেন যারা তাঁদের নীতিতে অটল- মরে যাবেন তবুও ঘুষের টাকা ছুঁয়েও দেখবেন না।

একজন আমলা সাহেব ৩ কোটি টাকা খরচ করে এম, পি পদে দাঁড়ান। এই খরচ কেমন করে যুগিয়েছেন, একজন শিক্ষিত মানুষকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, ইনি ম্যালা টাকা বেতন পান। এই ম্যালা টাকা কত?
এই দেশে, এই পদমর্যাদার সরকারী চাকুরে কেউ ৫০ হাজার টাকার উপরে বেতন পান বলে আমার জানা নাই।

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, গড়ে তিনি ৫০ হাজার টাকা করে বেতন পেতেন। পুরো টাকাটাই জমাতেন। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, ইনি অতি হিসাব করে চলতেন। ইনার ইস্তিরি সাহেবার মাত্র দুইটা কাপড় ছিল। একটা গায়ে দিতেন অন্যটা শুকাতে। ওনার ছাওয়াল-বাচ্চারা ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে, ফ্রি হাই-স্কুলে, ফ্রি কলেজে, ফ্রি ভার্সিটিতে নেকাপড়া (!) করে তাবড়- তাবড় ডিগ্রি বাগিয়েছেন। তর্কের খাতিরে আরও ধরে নিলাম, ইনি আলু চাষ করতেন, তিন বেলায়ই আলু খেতেন (সাবেক সেনাপ্রধান আলু খাওয়ার আইডিয়াটা সম্ভবত এখান থেকেই বাগিয়েছিলেন)। বেলায় বেলায় আলুর জুস, আলুর সরবত, আলুর নুডুলস, আলু ফ্রাই, হট ডগের বদলে আলুডগ, আলুর সুরুয়া ইত্যাদি।

এইসব করেও ৩ কোটি টাকা জমাতে মাত্র ৫০ বছর লাগবে। মাত্র ৫০ বছর। এবং আমরা এটাও জেনে আনন্দিত হবো, যেহেতু ৫০ বছর ধরে চাকুরীতে থাকতে হবে তাই ওনাকে বালকবেলায় (যখন মানুষ ঢোলা-ঢোলা হাফ-প্যান্ট পরে এবং বসলে ইয়ে দেখা যায়) চাকুরিতে যোগ দিতে হবে এবং তখনই ৫০ হাজার টাকা মহিনা-বেতন পেতে হবে।

ঘুষ না দেয়ার কারণে জীবনে আমাকে অনেক যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফিরিস্তি অনেক লম্বা। সাধারণ একটাই বলি, বাড়তি টাকা-ঘুষ দিতাম না বলে আসনবিহীন টিকেট পেতাম। ট্রেনে উঠার পর সবাই ঘুষ দিয়ে ফাঁকতালে খালি আসন ম্যানেজ করে ফেলত। আর চুতিয়া আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করেছি। অবশ্য বই পড়তে পড়তে সময়টা কেটেই যেত।

স্রোতের বিপরীতে গিয়ে লাভ নাই, এই ক্ষমতাও আমার নাই।
এখন থেকে ঠিক করেছি ঘুষ দেব, দেবো না কেন? আমি দেব। কেবল চাহিদা মাফিক ঘুষের টাকাই দেব না, বোনাসও দেব।
তবে...।
ঠিক করেছি, বিভিন্ন টাকার মাপে কাগজ কেটে নিজস্ব টাকা বানাব। গভর্নরের স্বাক্ষরের জায়গায় আমার স্বাক্ষর থাকবে। কাউকে চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিলে সরকারের ছাপানো আসল টাকার সঙ্গে আমার টাকাও দেব। একদম ফ্রি!
আগাম সতর্কতা: পোস্ট এখানেই শেষ।

(পরের অংশটুকু সূক্ষরূচির পাঠকেদের জন্য না। যাদের রূচি আমার মত ভোঁতা তাদের জন্য)।

আমার টাকাগুলোর মাপের কাগজগুলোর নমুনা এমন। ৫০ টাকার সমান নোটে লেখা থাকবে 'আবর্জনা খা'। ১০০ টাকার নোটে 'গু খা'। ৫০০ টাকার নোটে 'কাচা গু খা'। ১০০০ টাকার নোটে...। 


*ঘুষখোর ব্যাংকের গভর্নর: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_3654.html

Thursday, February 25, 2010

হুজুগে বাংগাল (!)

পূর্বের একটা পোস্টে উল্লেখ করেছিলাম, ঠিক ২১ ফেব্রুয়ারি বইমেলায় যাওয়ার একটা উদ্দেশ্য ছিল আমার। কাছ থেকে লোকজন দেখা, এদের আবেগ-ভাবনা স্পর্শ করার চেষ্টা করা।

বইমেলায় মানব-স্রোত দেখে আমার মনে হচ্ছিল, আজ আর কেউ বাড়িতে নাই সবাই বইমেলায় চলে এসেছে! আমি কান পেতে অনেকের কথা শুনছিলাম, এদের অধিকাংশদের মধ্যেই আবেগের ছিটেফোঁটাও নেই। বিচিত্রসব উদ্দেশ্য, কোনটাই ভাষা-বইমেলার সঙ্গে যায় না।
লাভের লাভ যা হয়েছে আমাকে কষ্ট করে রাস্তা খুঁজে বইমেলায় যেতে হয়নি। এরাই আমায় নিয়ে গেছে। বহু দূরে এক জায়গায় কেবল দাঁড়িয়েছিলাম, অনেকটা সময় পর আবিষ্কার করলাম, কেমন কেমন করে যেন আমি বইমেলার ভেতরে চলে এসেছি। এই ম্যাজিক দেখে আমি মুগ্ধ!

আমি নিজে যেটা করেছিলাম, দুই হাত উপরে তুলে হ্যান্ডস আপের ভঙ্গিতে ছিলাম। না, নড়েছো কি মরেছো বলে কেউ মাথার উপর হাত তুলতে বলেনি, কাজটা ছিল ইচ্ছাকৃত। আমি আসলে নারীঘটিত কোন জটিলতায় যেতে চাইনি। এই মানবস্রোতে কোন এক তাড়কা রাক্ষসি টাইপের মহতরমা অন্যের দায় আমার উপর চাপিয়ে ফট করে বলে বসলেন, এই আমার গায়ে হাত দিলি কেন? অভিযোগ খন্ডাবার প্রমাণ কোথায়, বাওয়া? হাতি যেমন কলাগাছের ভর্তা করে ফেলে আমাদের দেশের অতি উৎসাহী আমজনতা আমাকে মানবগাছের ভর্তা করে ফেলত। একটাই প্রাণ, মরলে আর বাঁচার উপায় ছিল না আমার!

বইমেলার প্রকাশকদের জন্য শংকা বোধ করছিলাম। আজ এদের কি উপায় হবে? এই মানবস্রোত, এদের দশ ভাগের এক ভাগও যদি একটা করে বই কেনে তাহলে নিমিষেই স্টলগুলোর বইয়ের তাক খালি হয়ে যাবে। এরপর এরা কি করবেন! আহারে, বেচারা প্রকাশক!

কিন্তু কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা হলো। এরা মুখ লম্বা করে উদাস হয়ে বসে আছেন। মুখ অন্ধকার করে বললেন, অন্য দিন যা বিক্রি হয় আজ তার চেয়ে বিক্রি অনেক কম।
বই তো আর উড়ে উড়ে পাঠকের নাকের ডগায় বসে না, পাঠককে এগিয়ে আসতে হয়, বই উল্টেপাল্টে দেখতে হয়। সেই সুযোগ কোথায়, এই মানবস্রোত দাঁড়াতে দিলে তো!

আমার মোটা মাথায় এটা ঢুকছিল না, এই মানবস্রোতের এখানে আগমণের উদ্দেশ্য কী! নাকি 'হুজুগে বাংগাল' নামটার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে গিয়ে এই ক্লেশ! ভনিতাবাজি!

*আমাদের ভনিতাবাজির খানিকটা নমুনা এখানে,
"১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ আবুল বরকতের ছোট ভাই এর ছেলে আলাউদ্দিন বরকত বলেন, চাচা শহীদ হবার পর আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে একুশের অনুষ্ঠানে কিংবা বই মেলায় আমাদের কেউ কোন দিন ডাকেনি।..."
.................


Wednesday, February 24, 2010

এক কাপ চায়ে দু-কাপ চিনি

অসাধারণ ব্যক্তিগণ কিছু চালু কথা চালু করে গেছেন। 'দা থেকে আছাড় বড়ো', 'বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচী', 'দারোগার নৌকার মাঝির শালা' ইত্যাদি।
আমরা সাধারণ যারা তারা বসে থাকব বুঝি? তাই 'এক কাপ চায়ে দু-কাপ চিনি'। উপায় কী, কখনও কখনও এর বড্ডো প্রয়োজন দেখা দেয়!

কোটি-কোটি বাচ্চা প্রসব হয়, এটা কোন খবর না কিন্তু বিমানে কোন বাচ্চা প্রসব হলে তা অবশ্যই খবর। এবারের বইমেলায় হাজার-হাজার বই বেরিয়েছে, মোড়ক উম্মোচন হয়েছে কিন্তু এইসব আলোচনায় আসে না।
পত্রিকার খবর, রাজধানীর একটা হোটেলে এম আসফউদ্দৌলার প্রবন্ধ 'অব পেইনস অ্যান্ড প্যানিকস' (
'প্যানিকস' শব্দটা পড়ার সময় সতর্কতা আবশ্যক। তাড়াহুড়োয় সর্বনাশ হয়ে যাবে, বেইজ্জতির একশেষ)। বইটির মোড়ক উম্মোচন করা হয়।

রাজধানীর এই হোটেলটির নাম এখানে দেয়া হয়নি এমন কি ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও বলা হয়নি কিন্তু এই হোটেলটির কার্পেটের নকশা দেখে নিশ্চিত হয়েছি এটা ফাইভ স্টার হোটেল সোনারগাঁ।
দেশের বাঘা বাঘা সুশীলগণ এখানে তশরীফ এনেছিলেন। ভদ্রতার খাতিয়ে এঁদের জন্য নানাপ্রকার চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় এবং মুত্রত্যাগ এই সবের সুব্যবস্থা ছিল বলেই অনুমান করি।

যেখানে প্রকাশকবৃন্দ লেখকদের বাদামের খোসাও ধরিয়ে দিতে চান না সেখানে অখ্যাত এই প্রকাশনী এই লেখক বই প্রসব করামাত্র পাঁচ তারকা হোটেলে মোড়ক উম্মোচনের নামে যে মাস্তির আয়োজন করেছিলেন এ লা-জবাব। আমি এমন লেখকের জরায়ুকে সেলাম জানাই।

আমি খসড়া
একটা হিসাব করে দেখেছি, বইটার অন্তত ১ লক্ষ কপি বিক্রি হলে প্রকাশক সাহেবের এই উদ্যোগ নেয়াটা স্বাভাবিক মনে হতো। আমার জানামতে, বাংলাদেশে এখনও কোন একটা বই ১ লক্ষ কপি বিক্রি হয়নি, তাও আবার প্রবন্ধ! এই বইটা কিনতে গিয়ে মারামারি করতে গিয়ে মেলায় দু-চার জন বিচি, নিদেনপক্ষে দাঁত হারিয়েছেন এমনটাও এখনও শুনিনি। জাস্ট কৌতুহলের কারণে এই প্রকাশনীর স্টলে কয়েক দফা সময় নস্ট করেছি কিন্তু কাউকে তখন বইটা কিনতে দেখিনি। অনুমান করি, আমি ওখান থেকে সরে আসা-মাত্র হাজার-হাজার বইক্রেতা পঙ্গপালের মত বই কেনার জন্য স্টলটাতে ঝাপিয়ে পড়েছেন। আফসোস, এই দৃশ্য চাক্ষুষ করতে পারলুম না।
তাই হবে! এরাই লেখক বাকীসব তক্ষক।
WhatsApp