Search

Wednesday, September 15, 2010

মৌসুমি লেখক: ২

লেখক সাহেবের লেখা এগুচ্ছিল তরতর করে কিন্তু এখন কলম চিবুচ্ছেন। লেখা আটকে গেছে। ডান হাতে লেখকদের আঙুল নাকি ছয়টা, কলমসহ- অন্য আঙুলগুলো চিবুলে ব্যথা হয় বলে ‘কলম আঙুল’ চিবুচ্ছেন।
যে  হরতাল লেখককে অখন্ড অবসর এনে দিয়েছে সেই হরতালের জন্য বেনাপোল সীমান্তে চার হাজার ট্রাক আটকে আছে, পচনশীল দ্রব্য সব পচে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে রপ্তানীযোগ্য চিংড়ি দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, এ নিয়ে লেখক মাথা ঘামাচ্ছেন না। লেখক-টেখকদের এই সব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামালে চলে না। লেখকদের অনেক বড়ো বড়ো সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়। চাঁদ থেকে কতটা জ্যোৎস্নার ছটা ছিটকে পড়ল, মগ দিয়ে কেমন করে জ্যোৎস্না ঢেলে গোসল করতে হয় এই সব।

মোদ্দা কথা, হরতালের কারণে, অবসরে তিনি লিখতে পেরে আনন্দিত, এই মুহূর্তে জটিল সমস্যা তাঁকে কাবু করে ফেলেছে। যে উপন্যাসটা লিখছেন এটা একটা রাজনৈতিক উপন্যাস। একজন খারাপ মানুষ কী এক বিচিত্র কারণে ভালোমানুষ- ভালোমানুষ খেলা খেলে, কু ছাপিয়ে সু উঠে আসার সেই চেষ্টা আর কী! উপন্যাসের নাম ... উহু, এখন যেটা দিয়েছেন সেটায় জোর আছে কিন্তু পতিতার মত বহুভোগ্যা বহুল ব্যবহারে... তিনি চাচ্ছেন উপন্যাসের নামটা অন্যভাবে দিতে।
আচ্ছা, ওই জায়গাটার  নামটা যেন কী, স্বর্গ নরকের মাঝামাঝি জায়গাটা...এইখানেই লেগেছে গেরো। স্বর্গ নরকের মাঝামাঝি জায়গাটার চমৎকার একটা নাম আছে। এই মুহূর্তে মনে করতে পারছেন না। ঝড়ের গতিতে অভিধান-শব্দকোষের পাতা উল্টাচ্ছেন। ফলাফল শূণ্য। দিন যায়, রাত যায়! লেখকের দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়। লেখা আটকে গেছে- লেখা আটকে যাওয়ার এই কষ্টটা অন্য কেউ বুঝবে না। অন্যভাবে লিখে দিলেই হয় কিন্তু তা তিনি করবেন না।

তিনি মনে করেন অশিক্ষিত নারী এবং জন্তু প্রসব করে বেশি। কিন্তু এই অখ্যাত নির্বোধ লেখক বুঝতে চাচ্ছেন না তিনি বিখ্যাত লেখক মিরোশ্লাফ হোলুব না, যে তাকে মোটা অংকের স্কলারশীপ দিয়ে সসম্মানে বার্লিন নিয়ে যাওয়া হবে। হোলুব ঘুরে বেড়াবেন, আলস্য কাটিয়ে উঠলে ইচ্ছা হলে লিখবেন। লিখবেন, যা-খুশী! হোলুব এক বছরে মাত্র একটি কবিতা লিখবেন দয়া করে, যে-কবিতা  ঘষামাজা করতে লাগবে আরও বছরখানেক। অবশেষে লেখকের মনে পড়ল, লেখা এখন এগুলো দুর্দান্ত গতিতে। রক্ত চাই-রক্ত চাই টাইপের লেখা:

“আমি, আমি কে? আমি কেউ না এটা জাঁক করে বলতে পারলে বেশ হত। বেশ একটা সাহিত্যি-সাহিত্যি ভাব চলে আসত কিন্তু ব্রাদার আমি তো আর সাহিত্যিক-টাহিত্যিক না, ছা-পোষা একজন সন্ত্রাসী। ছা-পোষা অবশ্য বিনয় করে বললাম কারণ বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় আমাকে একডাকে চেনে। আমার নাম? উঁহু, এটা আপনাদের বলব? 'পাগাল, কাভি নেহি'। কইমাছের প্রাণ এমন কাউকে কাউকে ‘ইন্নালিল্লাহ ’ বা ‘রাম নাম সাত্য হ্যায়’ অথবা ‘জিশু তার আত্মাকে শান্তি দিক’ এইসব দুর্লভ ভূষণে যদি কাউকে ভূষিত করতে চান তো সোজা চলে আসুন এই অভাজনের কাছে। ইয়ে, টাকাকড়ি সঙ্গে নিয়ে আসবেন এটা বলে আপনাদের সূক্ষ্মবুদ্ধি খর্ব করতে চাচ্ছি না। কলাগাছ ফেলবেন অথচ খালি হাতে আসবেন এ তো আর মামা বাড়ির আবদার না। ক্ষমা করবেন, আপনাদের সঙ্গে একটু উঁচু গলায় কথা বলে ফেললাম। আহা, আপনারাই তো আমার 'মাই বাপ'। কী অবলীলায়, কী অনায়াসেই না আমার হাতে অস্ত্র তুলে দিলেন, আমার লম্বা লম্বা শিল্পীর আঙুলে ট্রিগার পেঁচিয়ে মায়াভরা গলায় বলেছিলেন, ডোন্ট টক, শ্যূট-শ্যূট! প্লিজ-প্লিজ, হইচই করবেন না, বেশ বুঝতে পারছি আপনারা বুক ঠুকে সদম্ভে বলছেন: আমরা, আমরা কেন, আমরা তো ভালমানুষ। এই দেখুন, কী যন্ত্রণা, ভালমানুষের কথা ভাবতেই মুখে একগাদা থুথু জমেছে। ভাই, থুতু নিয়ে তো কথা বলতে পারব না। হোল্ড অন প্লিজ, থুথুটা ফেলে দেই- থু, থু!

তো কি বলছিলাম? কিরুপে হামার খোঁজ পাইবেন? কেন ভাই, এখনি কি কাউকে ফেলে দিতে চান? চাইলে প্রয়োজন হলেই চলে আসবেন। ও হ্যা, আমি বলছিলাম আপনাদের ভালমানুষির কথা। আপনারা তো আবার ভারি অহংকার নিয়ে বলেন, আমার সোনার বাংলা...ই ই ই। আমি ভাই ছা-পোষা সন্ত্রাসী বিনয় করেই বলি, আমার প্রাণপ্রিয় সোনার বাংলা নামের মাটির বাংলাকে নিয়ে এ-ও-সে যেভাবে খুশি যেভাবে ইচ্ছা বলৎকার করছে আর আপনারা উচ্ছ্বসিত দর্শক গোল হয়ে দাড়িয়ে-বসে-ঘুমিয়ে 'আহা কী আনন্দ আজি এ আকাশে' গাইছেন। কী বললেন? ধর্ষণ যখন অবধারিত তখন উপভোগ করাই শ্রেয়। তা বেশ, গা বাঁচিয়ে মন্দ বলেননি, একপাল শকুন মাংস খুবলে খুবলে ডিনার সারবে আর আমরা যারপরনাই বিস্মিত হয়ে বলব: শকুনের বাচ্চা শকুন, মাংসটা সিরকায় ডুবিয়ে নরোম করে নিবি, তা-না অনন্তকাল ধরে চিবিয়েই যাচ্ছিস। হ্যা-রে, তোর চোয়াল ব্যথা করে না?

আপনাদের প্রিয় মানুষ জনতার সেবক এ দেশকে কিছুই দিতে পারেননি এটা আমি মন্দমানুষও বলি না। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে জনবহুল দেশ হওয়ার সম্ভবনা, এ বিরল সৌভাগ্য এনে দিয়েছেন। এই যে টানা এতদিন সমগ্র দেশ অচল করে দেয়া হয়েছে নো-কাজ, নো-কাম। ধর্মে ভরাপেটে অবশ্য ওইসব করা নিষেধ আছে; ভাগ্যিস, বিশাল একটা কারাগারে আটকে এ অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাজারে আগুন, পাকস্থলি ভরো-ভরো থাকার সম্ভাবনা নেই যখন তো দিনরাত বাচ্চা পয়দা করো । বুঝলেন, দেশের এহেন অগ্রগতিতে আপনাদের সঙ্গে আমার কোনো সহযোগীতা নেই ভাবলেই মনটা ভার-ভার হয়। কি করব বলুন, আমার তো আর আপনাদের মতো দু-একটা বউ নেই। অবশ্য আমার বউ এর প্রয়োজনই বা কী বলুন, পরিচিত সবারই তো একটা করে বউ আছে। আমি যে মহান জনসেবকের ছত্রছায়ায় নিরুদ্বিগ্ন জীবন যাপন করছি, ওঁর সমস্ত কাজই তো অন্য কেউ করে দেয়। ওঁর বাবা হওয়ার ক্ষমতা আল্লাহপাক ওনাকে দেননি অথচ ওনার একমাত্র ছেলে আরিজোনায় পড়াশুনা করছে। তো, জনসেবকের বেগব সাহেবা আবার কখনো-সখনো তাঁর বিছানাটা এই অধমকে ধার দেন। অথবা ধরুন গিয়ে ‘মহিলা কসাই’, এই যারা ঘুরে ঘুরে নোংরা কটা কাগজের বিনিময়ে মাংস বিক্রি করেন। আফসোস, এরা কেউই আমার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাতে চান না। আফসোস, বড়ই আফসোস! এইসবে এখন আর মজা পাই না বুঝলেন, বিশ্বাস করুন, একেকটা 'ঠান্ডা গোসত'। বুঝলেন, ভেজা বারুদে আগুন ধরাতে ভাল্লাগে না।

হা হা হা। ফানি! হুটহাট করে আপনাদেরই কেউ কেউ গরুর মতো মায়া-মায়া চোখে বলেন: ফিরে এসো খোকা। মাইন্ড ইয়োর ল্যাংগুয়েজ সার, আমি তো আর এখন ছোট্ট খোকা না, আপাদমস্তক দানব। আপনাদের এইসব মূর্খতা দেখে যারপরনাই বিস্মিত হই। মানব চট করে দানব হয়, দানব থেকে বাচ্চা-দানব হতে পারে বড় জোর কিন্তু দানব থেকে মানব হওয়া যায় না। আভূমিনত প্রণাম গ্রহন করুন মহান মনুষ্যজাতি, কী অপরিসীম ক্ষমতা আপনাদের- আমার নিউক্লিয়াসের তথ্য পর্যন্ত গোলমাল করে দিয়েছেন। এখন যা খুশি তাই করতে পারি। চুইংগাম চিবুতে চিবুতে মেরে ফেলতে পরি আমার প্রিয় সৃষ্টিকর্তাকে যিনি গভীর মমতায় এই আমাকে দানব বানিয়েছিলেন। হাসি-হাসি মুখে লাশ ফেলে দিতে পারি আপনারও। কী বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে তো ভাই আপনাকে মরিয়া প্রমাণ করিতে হইবে সত্যি-সত্যি মরিয়া গিয়াছেন।
এ দেশের জনসেকদের মতো আমারও মৃত্যু নাই- সিন্দাবাদের ভূতপ্রেতের মতো জনতার ঘাড়ে চেপে বসে থাকব। জনসেবক যেখানে, আমি আছি সেখানে।


কার্ল সাগান সাহেব তাঁর The Dragons of Eden-এ বলেছেন: 'আমরা যাকে কখনো কখনো মন বলি তা হচ্ছে ব্রেন। আর এই ব্রেনের কাজ কর্ম হচ্ছে শরীরের যাবতীয় নাট-বল্টুর নড়াচড়ার ফলাফল'। মাফ করবেন, অনুবাদটা কাজ-চলা গোছের হল। বেশ বুঝতে পারছি বিস্ময়ে আপনাদের চোখ বড় হয়ে এসেছে। অজান্তেই বলে ফেলেছেন: ওই মা, ব্যাটা দেখি, ‘শিকখিত’ আছে। এ তো ক-অক্ষর গোমাংস অকাট মূর্খ না, এ-বি-সি-ডি ছাড়াও কিছু জানে! হোয়াট ননসন্স, ফাজলামো নাকি? প্রায় দশ-পনের বছর ধরে ছাত্রনেতার জোব্বা গায়ে দিয়ে নিরলশ অধ্যয়ন করছি না বিশ্ববিদ্যালয়ে! এ কিন্তু ভারি অন্যায়, নিজেরা মূর্খ বলে সব্বাইকে মূর্খ ভাবেন। কী ভাই, মূর্খকে কি মূর্খ বলতে নাই! কিন্তু ভাই, নারকেল গাছ কিসে তোমার পরিচয়, নারকেলে? আপনি যদি নেহায়েৎ গোঁ ধরে বলেন না-না আমগাছ, বেশ!
একটা শেষ-হয়ে আসা নাটকের কথা বলি, আপতত আমি যে ‘বড় ভাই’ এর কোলে বসে থাকি, এই তো সেদিন ঝকঝকে এক তরুনের পাসপোর্ট সাইজের একটা ছবি দিয়ে আড়মোড়া ভেঙে বললেন, এই মুখ আমার পছন্দ না একে এমন একটা মুখবন্ধ বাক্সে ফেলে দাও যে বাক্স কেউ কোনোদিন খুলবে না। এই শুয়োরের বাচ্চা কাউকে চিরতরে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ এভাবেই দেন। চিনে রাখার চেষ্টায় ভাল করে তাকালাম, বিশ-বাইশ বছরের এই ছেলের চোখগুলো কী মায়া-মায়া। অল্পক্ষণ তাকালেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়, গা-ছমছম করে। একজন যন্ত্রদানবের তো এতসব দেখলে চলে না। যথারীতি নির্দেশ পালিত হল।


বড় ভাই তো আবার প্রখ্যাত জনসেবক তাই মৃতের পরিবারকে এই চরম দুঃসময়ে সান্ত্বনা না দিলে আপনারাই তো আবার ভারি গোলামাল করবেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় বড় ভাই সাঙ্গোপাঙ্গ সাংবাদিকসহ যথাসময়ে উপস্থিত হলেন। মৃতের মা-বোন লাশের উপর ঝাঁপিয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল: খোকা-খোকা, তুই ফিরে আয়। বড় ভাইয়ের উপস্থিতি হারিয়ে-যাওয়া মানিকের মতো এ পরিবারে খানিকটা স্বল্পমেয়াদি স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে এল। বড় ভাই তাঁর স্বভাব অনুযায়ী পরিবারের একজনকে বেছে নিলেন- তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদার মতো একটা ভাব করলেন। কাছে-পিঠে দাঁড়ানো সাংবাদিকগণ নিমিষে অতি তৎপর হলেন। পরদিন প্রায় সমস্ত দৈনিকে বিশাল বিশাল হেডিং-এ বড় ভাইয়ের কাঁদো-কাঁদো চেহারা মোবারকের ছবি ছাপা হল।
জনগণ সব্বাই মুগ্ধ। থ্যাঙ্ক গড, মুগ্ধতা চুঁইয়ে পড়ার ব্যবস্থা নেই নইলে অসময়ে বন্যা বয়ে যেত। যাক, চিন্তার কিছু নেই ওই মৃত ছেলে আপনার আমার ভাই-বন্ধু কেউ না। খানিকটা সমস্যা অবশ্য থেকেই যাচ্ছে । পৃথিবীর সবচাইতে ভারী ওজন এ মুহূর্তে ধারণ করে আছেন যিনি- মৃত সন্তানের যে-লাশ, যে-পিতা শিরদাঁড়া বাঁকা করে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, অনঢ়। তিনি, তিনি কি ভাবছেন? যে-সব জনতার সেবক জনগণের সেবা করবেনই বলে পণ করে আছেন তাদের সবাইকে জড়ো করে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিতে? কী লাভ, এদের শূণ্যস্থানে অন্য কেউ আসবে। অবশ্য এ-ও সত্য এরিমধ্যে দেশ বহুদূর এগিয়ে যাবে। নোংরা সে-সব মানুষদের সঙ্গে আমাকেও ছুঁড়ে ফেলো হে পিতা, দেখো তখন যেন তোমার চোখের পাতাটিও না কাঁপে।”

লেখক উপন্যাসের নাম কেটে গোটা গোটা অক্ষরে লিখলেন, পশুর পিঠে শিশু। কারণ তিনি জানেন এমন রগরগে নাম পাবলিক খাবে ভাল... 

মৌসুমি লেখক, ১: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_14.html

Tuesday, September 14, 2010

মৌসুমি লেখক: ১

ওঁ একজন লেখক। তেমন জনপ্রিয় নন। জনপ্রিয় নন এই জন্য তাঁর এখনও কোনও সাক্ষাৎকার ছাপা হয়নি। বহুদিনের স্বপ্ন ওঁর কোনও-না-কোনও দিন, কখনও-না-কখনও, কোথাও-না-কোথাও একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হবেই। সাক্ষাৎকারে অতি প্রয়োজনীয় একটা প্রশ্ন থাকে, আপনি কি খেতে পছন্দ করেন? লেখক তখন আলাদা একটা ভাব নিয়ে বলবেন, তিমি মাছের ঝোল। সঙ্গে এটাও বলবেন, আফসোস, চাইলেই এই দুর্লভ ঝোলটা রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় না।

বয়স প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই হলে তাকে কি যুবক বলা চলে? বেশ, তাহলে লেখক যুবক। এখনো ‘চির কুমার সভা’র সদস্য। বিয়ে করবেন কিন্তু কাকে? অন্তত একটা মেয়ে তো প্রয়োজন! ভালবাসাবাসির কোনও মানুষ না থাকলে বিয়ে করবই পণ করলেই তো আর বিবাহযোগ্য মেয়ে পয়দা হয় না। অবশেষে ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনই শেষ ভরসা। বিজ্ঞাপনটা লিখলেন নিজেই। কপটতা, ছাপাছাপি লেখকের অপছন্দ বলেই বিজ্ঞাপনটা দাড়াল এরকম:
"ত্রিশ দাঁত বিশিষ্ট (৫-১১) একজন ‘লেখক কাম ব্যবসায়ী’ মুসলিম গ্রাজুয়েট পাত্রের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছে। এক কাপড়ে এবং অনুষ্ঠান ছাড়া বিয়েতে আগ্রহী পরিবারের লোকজন যোগাযোগ করুন।"
লোকজন জোর নিষেধ করে বলল: এ বিজ্ঞাপন ছাপা হলে সমস্যা হবে।
লেখক ভারি অবাক হলেন: সমস্যা হবে কেন?
ফাজিল ধরনের চিঠি আসবে।
ফাজিল ধরনের চিঠি আবার কি রকম?
এই বখা ছেলেরা মেয়ে বা মেয়ের অভিভাবক সেজে ফাজলামো করবে।


এইসব নিষেধ লেখককে খুব একটা কাবু করল না। ওঁর এক আত্মীয় একটা খবরের কাগজে চাকরি করেন তাকেই কাজটা গছিয়ে দিলেন।
আত্মীয় বেচারা দুদিন পরেই মুখ শুকিয়ে এলেন, এই বিজ্ঞাপন আমাদের কাগজ ছাপবে না।
লেখক অবাক, কেন, ছাপবে না কেন?
আমাদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক বলেছেন: এটা উম্মাদ-কার্টুন পত্রিকার অফিস না।
সমস্যাটা কি?
আত্মীয় এবার রাগী গলায় বললেন, এই সব কি লিখেছেন ‘ত্রিশ দাঁত বিশিষ্ট’ লেখক কাম ব্যবসায়ী, হাবিজাবি।
লেখক এবার চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন: সাদাকে সাদা বলিতে পারিব না! সাদাকে কি গাধা বলিতে হইবে?  আল্লাহপাকের নির্দেশে ডেন্টিষ্ট বাবাজী আমার দুটা দাঁত শখ করে রেখে দিয়েছেন, এতে তো আমার হাত নাই ব্রাদার।
পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে দাঁতের প্রসঙ্গ আসছে কেন?
আসছে এই জন্য, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে লোকজনকে একটা ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করেছি যে আমার গোপন করার কিছু নাই। আর ‘লেখক কাম ব্যবসায়ী’ লেখালেখির পাশাপাশি ব্যবসা করি এটা বললে অনেকে তাচ্ছিল্য-তাচ্ছিল্য ভঙ্গি করে বলেই হিউমার করে এটা লেখা। অনেকের বদ্ধমূল ধারণা লেখক মানেই ওরাংওটাং টাইপের একটা কিছু। একজন লেখকের পোশাক-পরিচ্ছদ থাকবে অপরিছন্ন, সস্তা, চুলের সঙ্গে চিরুনির কি সম্পর্ক এ নিয়ে থিসিস সাবমিট করবেন, আকন্ঠ মদ্যপান করে নর্দমা কেন রাস্তার মাঝখানে এ নিয়ে মাঝরাতে নর্দমার সঙ্গে কাপড় খুলে ঝগড়া করবেন। বড় বড় নোখ দিয়ে বেশ্যাকে অহরহ খামচাবেন। অনেকেরই ধারণা লেখক-টেখকরা অন্যভুবন থেকে এ গ্রহে আসেন দেশ উদ্ধার করার মিশন নিয়ে। লেখালেখি ছাড়া কিছুই করবেন না।


আত্মীয় বেচারা পড়লেন মহা ঝামেলায়। তিনি ছা-পোষা চাকুরে, সাহিত্য-টাহিত্য বঙ্গোপসাগরে ভেসে যাক তার কী! কম্বল ছেড়ে দিতে পারেন কিন্তু কম্বল ছাড়বে কেন, নৈব নৈব চ!
লেখক এইবার হংকার দিলেন: এই-এই, তোমাদের কাগজের একজন কর্মীকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে তার সহকর্মীরা- কি মনে  পড়ছে না ওই দিনের বিজ্ঞাপনটা: কবি-উপন্যাসিক-গদ্যকার্টুনিষ্ট-কলাম লেখক-সাংবাদিক-প্রকৌশলী ও সদ্য আমেরিকা ফেরত অমুককে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা। সদ্য আমেরিকা ফেরত কি এই ভদ্রলোকের উপাধি? নামের শেষে কি লেখা হবে স.আ.ফে? এটা কি স্থূল বিজ্ঞাপন না? তখন কি সূক্ষ্মরুচি ভোঁতা হয়ে যায় এই জন্য, এরা তোমাদেরই পত্রিকার লোক, সেই জন্যই কি তোমাদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের অসুস্থ হওয়ার সংবাদ আসে তোমাদের পত্রিকার প্রথম পাতায়?
আত্মীয় বেচারা লেখকের কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচলেন এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, এই জিনিস যন্ত্রদানব ট্রাকের মতই ভয়াবহ। ইহার নিকট হইতে একশো হাত দূরে থাকিবেক। লেখকের আত্মীয় হওয়ারও দূর্ভাগ্যও কম না। এরা বড় যন্ত্রণা করে, চারপাশের লোকজনকে জ্বালিয়ে মারে। এটা এমন কেন, ওটা তেমন কেন? আরে ব্যাটা এত কথা কিসের! 
লেখক একমনে লিখে যাচ্ছেন। হরতাল-অবরোধের কারণে অখন্ড অবসর এ বিরল সৌভাগ্য এনে দিয়েছে। সময়ের অভাবে লেখালেখি হয় না। এইবার একটা উপন্যাস নামিয়ে ফেলবেন বলে পণ করেছেন।

Sunday, September 12, 2010

জাফর ইকবাল, আলো-ছায়া

আমি আগেও লিখেছি, এই দেশে যে অল্প কিছু মানুষকে আমি পছন্দ করি তাঁদের মধ্যে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল একজন। এই মানুষটার সঙ্গে কথা বলার আমার সুযোগ হয়েছে, আমার মনে হয়েছে ভান বিষয়টা তাঁর মধ্যে নাই। যেটা তাঁর অগ্রজ হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে প্রবল। হুমায়ূন আহমেদ আপাদমস্তক একজন ভানবাজ!

জাফর ইকবালের আরেকটা বিষয় আমাকে অভিভূত করে সেটা হচ্ছে, ঢাকায় বসবাস করার লোভ তাঁর নাই অথচ ইচ্ছা করলেই মানুষটার ঢাকায় থাকতে পারেন। এই দেশের সুশীলরা ঢাকায় বসবাস করার জন্য পারলে তাদের আত্মা বিক্রি করে দেন। পারলে প্রিয় মানুষকে কারও বিছানায় তুলে দেন। না-না, হইচই করার কিছু নাই- বিবাহ নামের বৈধতার মোড়কে। এই সুশীলরাই ঢাকাকে একটা মৃত্যুকূপ বানাচ্ছে [১], অচিরেই লক্ষ-লক্ষ মানুষের হত্যাকারীর খাতায় এরা নাম লেখাবে। 
এই মানুষটার প্রতি মুগ্ধতার আরও কারণ আছে। ১০ টাকার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের যে ক্ষীণবপু যে বইটা বের করেছেন [২] এটা একটা অসাধারণ কাজ হয়েছে এতে অন্তত আমার কোন সন্দেহ নেই।

আবার আমি এটাও মনে করি, প্রিয় মানুষের সব কিছুতে লাফাতে হবে এমন না। জাফর ইকবালের অনেক বিষয় আবার আমার পছন্দ না। ৭১ সালে সমস্ত দেশ যখন যুদ্ধে উত্তাল তখন এঁরা দু-ভাই পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। কেন জাফর ইকবাল যুদ্ধে গেলেন না এর উত্তর তিনিই ভাল দিতে পারবেন কিন্তু কাজটা অমর্যাদার, লজ্জার!
হরতাল নিয়ে তাঁর ভাবনা হাস্যকর [৩]! মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি নামে যে দল চকচকে মোড়কে মুড়িয়ে 'লেবেনচুষ' বিক্রি করে, জাফর ইকবাল অন্যদের মত এই বিষয়টা গুলিয়ে ফেলেন।
যাই হোক, মানুষ দেবতা না তাই তাঁর সব কিছুই নিখুঁত হবে এমনটা আশা করা সমীচীন না। দেখা প্রয়োজন যেটা, একজন মানুষের কতটা পচন ধরেছে...।

তাঁর লেখার চোর্যবৃত্তি  নিয়ে গুরুতর আপত্তি উঠেছে [৫] । আমি জাফর ইকবালের সমস্ত লেখা পড়িনি বলে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলাম। এর সদুত্তর দিতে পারবেন জাফর ইকবাল এবং ডিউক জন।
তদুপরি আমি মনে করি, এই পোড়া দেশে জাফর ইকবালের মত লোকই বা কোথায়? অন্তত তাঁর অগ্রজ হুমায়ূন আহমেদের [৬] মত দু-নম্বর তো আর না...। 

সহায়ক লিংক:
১. মৃত নগরী, ঢাকা: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_06.html
২.কুর্নিশ করি হে স্বপ্নবাজ: http://www.ali-mahmed.com/2009/03/blog-post_27.html
৩. হরতাল: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_3914.html
৪. পক্ষপাতদুষ্টতা: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8885.html
৫. ডিউক জন: http://dukejohndj.blogspot.com/2010/08/blog-post_25.html
৬. হুমায়ূন আহমেদ: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_09.html 

শৈশব, ফিরে আসে বারবার


এমনিতে ঈদ-পূজা নামের উৎসবগুলো আমি অসম্ভব সমীহের চোখে দেখি। কারণ এই উৎসবগুলো আমাদেরকে শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়- শেকড়ের কাছে ফেরা! কিন্ত খুব বেশি সময় হয়নি ঈদ নামের পর্বগুলোর পালন অশ্লীলতা-উৎকট-হারামিপনার পর্যায়ে চলে গেছে! এই দেশে সবচেয়ে বেশি দূর্নীতি হয় ঈদকে সামনে রেখে। শ্লা, সব ভিক্ষুক হয়ে যায় [১]! এই নিয়ে অন্য লেখায় আলোচনা করেছি [২], এখানে বিস্তারিত আলোচনায় যাই না।
ঈদকে সামনে রেখে উৎকট-অসভ্যতার জন্য আমাদের মিডিয়াও অনেকখানি দায়ী। জাতীয় দৈনিকগুলোর নকশা পাতায় দেড় লক্ষ টাকা দামের লেহেংগা, ৫৫০ টাকা গজ করে পাকিস্তানী কাপড়ের বিস্তারিত খবর যখন দিনের পর দিন ঘটা করে ছাপে তখন আমাদের নগ্ন-নাচ না নেচে উপায় কী!
...
বেশ ক-বছরের অভ্যাস। ঈদের দিন বের হওয়া হয় না কোথাও। দুর্জনেরা বলেন, আমি নাকি সমাধি নিয়ে নেই। নিজের রুমেই থাকি, অধিকাংশ সময় ফোন-টোন বন্ধ থাকে। ক্ষমতার কী বিপুল অপচয়!]
অথচ আমার প্রবাসী এক বন্ধু নিয়ম করে ঈদের দিন মেইল করবে, 'খাওয়াতে পারিস এক চামচ সেমাই? তোকে ১০০০ ডলার দেব'। ব্যাটা ফাজিল, কারও চশমার কাঁচ ঝাপসা করে দেয়া কোন কাজের কাজ না!

এবারে ঈদটা আমার জন্য অন্য রকম ছিল। তিনটা স্কুলের প্রায় ৮০জন বাচ্চা-কাচ্চা, কাচ্চা-বাচ্চা! দিনভর এদের নিয়ে আমার কিছু পরিকল্পনা ছিল, সবটা এখানে শেয়ার করতে চাচ্ছি না।
তিনটা স্কুলের মধ্যে 'স্কুল তিন' [৩], এটার প্রতি আমার আগ্রহ অন্য রকম, খানিকটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে। এখানকার বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ যে অপরিসীম।
যে টিচার এদের পড়ায় ওর ওখানে আজ এদের খানাপিনার আয়োজন ছিল। বিকেলে এদের ক্রিকেট খেলা। আয়োজন করে শিল্ড-মেডেল যোগাড় করা হয়েছে।

গিয়েছিলাম এদের খেলা দেখতে। আমার সঙ্গে আরও ৩জন। হঠাৎ মনে হলো এদের সঙ্গে খেলায় নেমে পড়লে তো মন্দ হয় না। আমরা দু-জন করে দুদলে। আমার দল হেরেছে :( কিন্তু দু-চোখ ভরে দেখলাম এদের উল্লাস, এদের খেলা, এদের চোখে আটকে থাকা উচ্ছ্বাস!
ছবি ঋণ: দুলাল ঘোষ
আমি জানি না, এরা বড়ো হয়ে কি কেউ ড, আতিউর রহমানের মতো হবে, নাকি চোর-চোট্টা। কিন্তু এদের জীবনে গল্প বলার মত গল্পের বড়ো অভাব! আজ থেকে এদের মস্তিষ্ক এই দেখা-অদেখা স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে খেলবে, সবিরাম।

ছবি ঋণ: সমীর চক্রবর্তী
ছবি ঋণ: সমীর চক্রবর্তী
আমি মানুষটা বড়ো স্বার্থপর টাইপের। এদের কি হবে, না হবে এটা নিয়ে এই মুহূর্তে মাথা ঘামাচ্ছি না। ঘামাচ্ছি নিজেকে নিয়ে। আমার নিজের কতটা কাল পর মাঠে বল পেটানো- আমার কেবলি মনে হচ্ছিল, শৈশবের একটা অংশ আবার ফেরত পেয়েছি। হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরে আসে, বারবার...।

সহায়ক লিংক:
১. ভিক্ষুক: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_03.html
২. এমন দেশটি কোথাও...: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_30.html
৩. আমাদের ইশকুল, ৩: http://tinyurl.com/327aky3
৪.আমাদের কুমিল্লা: http://www.dailyamadercomilla.com/content/2010/09/14/news0865.htm  

Friday, September 10, 2010

কাকে কাকে যে ধন্যবাদ জানাই!

আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সবার ভেতরের শিশুটা অবিরত কাঁদে। এই শিশুটা বড়ো লাজুক-অভিমানী, পারতপক্ষে এ জনসমক্ষে বেরুতে চায় না।
কোন এক লেখায় আমি বলেছিলাম, "আমাদের ভেতরের পশু এবং শিশু ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে- হরদম এদের মারামারি লেগেই আছে। কে যে বিজয়ী হবে এটা আগাম বলা মুশকিল। অগ্রজদের রেখে যাওয়া অর্জিত জ্ঞান-অভিজ্ঞতা-নরোম মন-ধর্মীয় শেকল এই সব হচ্ছে আমাদের বাড়তি সুবিধাটুকু। এই সুবিধা নামের অস্ত্রের জোরে পশুটা ফালাফালা হয়"!

পশু এবং মানুষের মধ্যে পার্থক্য কি এটা আমার মত সাধারণকে জিজ্ঞেস করলে আমরা চট করে বলব, লেজ। কিন্তু কে কথাটা বলেছিলেন, কোথায় পড়েছিলাম মনে পড়ছে না:
"পশু এবং মানুষের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, পশু তার পূর্বপুরুষের অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে পারে না কিন্তু মানুষ পারে"।

আমি কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের অনেকের মধ্যে কিছু একটা করার গোপন স্পৃহা লুকিয়ে থাকে কেবল দিকনির্দেশনার অভাবে আমরা উৎসাহ বোধ করি না! সবার ছোট-ছোট সহায়তা আমাকে যে কী মুগ্ধ করে!
যেদিন চোখে দেখতে পান না তাঁদের সন্তানদের জন্য স্কুল [১] এবং মসজিদ করে দেয়া হলো, সেদিন সন্তানদের বাবা-মা সবাই উপস্থিত ছিলেন।

দুলাল ঘোষ নামের একজন কেবল এঁদের ছবি উঠিয়েই ক্ষান্ত হলেন না সেই ছবির বিশাল এক ব্যানার বানিয়ে দিলেন। সেই ব্যানার এখন স্কুলে ঝুলছে। ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুলে ঢুকেই অপার বিস্ময়ে ব্যানারটা দেখে। তাদের বাবা-মা চোখে দেখতে পান না কিন্তু এরা নিশ্চয়ই ঝলমলে মুখে বলতে থাকে, জানো বাজান, তোমার লগে আম্মা আছে, আমিও আছি; ওয়াল্লা, আমাগো কী সোন্দর যে লাগতাছে!


আমি যখন হরিজন পল্লীর স্কুলের [২] জন্য তিনটা মাদুর কিনি তখন স্কুলে নিয়ে খুলে দেখি চারটা মাদুর। আমি প্রথমে ধারণা করেছিলাম, দোকানদার ভুল করেছে। ফিরে এসে বলার পর দোকানদার উদাস হয়ে বললেন, 'থাকুক, আমার এখানে চাডিডা (মাদুর) পইরা ছিল, পোলাপান পড়ব'।

আমি যখন স্টেশনের বাচ্চাদের জন্য স্কুল [৩] করার জন্য পাগলের মত একটা ঘর খুঁজছি তখন রেলের লোকজনরা আস্ত একটা অফিস আমাদের জন্য দিয়ে দিলেন!
স্কুলের কিছু মেয়ে হাতের কাজ শেখে। এদের জন্য ফ্রেম এবং আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র কিনতে গেলে দোকানদার এর সঙ্গে আরও অনেক কিছু দিয়ে দেন, বিনে পয়সায়!

একটি দৈনিকে [৪] স্কুল নিয়ে যখন প্রতিবেদন ছাপা হয় আমার জানার আগেই রটে যায় এটা। স্টেশনের যেসব ছেলেরা পানি বিক্রি করে দিনযাপন করে, তিনবেলা ঠিকভাবে খেতেও পায় না, এরা আস্ত একটা পত্রিকা কিনে ফেলে আমাকে দেখাবে বলে। আমি জানি এদের এই পত্রিকার দাম ৮০০ পয়সা! আমার চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়।

আবার এর উল্টোটাও আছে। একজন মানুষ কিছু টাকা জমিয়েছিলেন চোখের ছানি অপারেশন করাবার জন্য। এই টাকায় অপারেশন হয় না। তাঁকে বলেছিলাম, আগে আপনাকে ডাক্তার দেখাই তারপর দেখা যাক। ডাক্তার দেখাবার পর জানা গেল এই মানুষটার অপারেশন করা যাবে না। চোখে অসম্ভব প্রেসার। তাঁকে প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ডাক্তার ওষুধ দিলেন।
যথারীতি আমাদের দেশে অতি প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোর দাম চড়া। তো, আমি দোকানদারকে অনুরোধ করলাম, 'ভাই, মানুষটা খানিকটা সমস্যায় আছে; পারলে ওষুধের দাম একটু কম রাখবেন'।
দোকানদার নামের মানুষটা অহেতুক রূক্ষ গলায় বলেছিল, 'কিন্না যখন দিবেন পুরা টাকা দিয়াই কিন্না দেন'। আমার বুকে একটা ধাক্কার মত লাগল, একজন না পারলে না করবে কিন্তু এমন জানোয়ারের মত গাঁ গাঁ করছে কেন?
পরে এই লোকটাই বলেছিল, 'আচ্ছা, ৫ টাকা কম দেন'।
তখন আমি আর কিচ্ছু বলিনি। গুণে গুণে টাকা দিলাম, ওষুধ নিলাম। যখন চলে আসছি তখন ওই মানুষটা আমাকে বলছে, 'আরে, ৫ টাকা নিয়া যান'।
আমি শান্ত গলায় বলেছিলাম, 'এটা রেখে দেন। আপনার ইফতারের জন্য দিলাম'।
আহ, এটা বলতে পেরে কী যে শান্তি লেগেছিল! আমি এটাও মনে করি, যার যা প্রাপ্য তা তাকে বুঝিয়ে দেয়াই সমীচীন। এটা তার পাওনা, একটা পশুর প্রাপ্য।
 
যে মানুষটার জন্য ওষুধ কেনা হয়েছিল, মানুষটা একদিন রাস্তায় আমায় পেয়ে একটা শিশুর মত হাত-পা ছুঁড়ে হড়বড় বলতে থাকেন, 'কী তামশা, অহন সব ফকফকা দেখি'।
আমি হাসিমুখে বলি, 'আমাকে দেখতে পাইতাছেন, বলেন তো আমার হাতে এইটা কি'?
মানুষটা ঠিক-ঠিক বলে দেন আমার হাতে সেল-ফোন।

আমি লম্বা লম্বা পা ফেলে এগুতে থাকি। দূর-দূর, ওই দোকানদারের মত পশু-মানবদের নিয়ে মাথা ঘামাবার অবকাশ কই আমার...।

সহায়ক লিংক:
১. আমাদের স্কুল, দু্ই: http://tinyurl.com/2fs9j4p
২. আমাদের স্কুল, এক: http://tinyurl.com/3xpuov5
৩. আমাদের স্কুল,তিন: http://tinyurl.com/327aky3
৪. দৈনিকের প্রতিবেদন: http://tinyurl.com/3adh7uu  

Thursday, September 9, 2010

ভান-গুরু, ভাজনেষু-পদেষু হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদকে হাতের নাগালে পেলে পা ধরে কদমবুসি করতাম কারণ মানুষটা ভান নামের জিনিসটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন! এই দুরূহ কাজটা সবাই পারেন না, হুমায়ূন আহমেদের মত মানুষরাই পারেন।
ভান নামের লেবেনচুষটাকে আবেগের মোড়কে জড়িয়ে আমাদের হাতে ধরিয়ে দেন। তাই এই লেখাটা আমি শ্রদ্ধাভাজনেষু, শ্রদ্ধাস্পদেষু হুমায়ূন আহমেদকে উৎসর্গ করছি। ভাজনেষু-পদেষু টাইপের জিনিসগুলো হুমায়ূন আহমেদের খুবই প্রিয়, তাঁর বইয়ের উৎসর্গে নিয়ম করে থাকে।

হুমায়ূন আহমেদ কালের কন্ঠে 'ঈদ আনন্দ সংখ্যা ২০১০' (৭ সেপ্টেম্বর, ২০১০) [১] -এ ইমদাদুল হকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "১৯৭১ সালে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসার পর বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তই আমার জন্য আনন্দের। শাওনের সঙ্গে যখন ঝগড়া করি তখনো আনন্দ পাই। মনে হয় বেঁচে আছি বলেই তো ঝগড়া করতে পারছি। আমি যে আপনি কেমন আছেন প্রশ্নের উত্তরে 'বেঁচে আছি' বলি, এটাই একটা কারণ।"

ওয়াও! কী সোন্দর-কী সোন্দর! কী আবেগঘন বাতচিত—দুর্বলচিত্তের মানুষ হলে এতক্ষণে আমি কেঁদেই ফেলতাম! এই সাক্ষাৎকার পড়ে মনে হবে ১৯৭১ সালে হুমায়ূন আহমেদ বীরের মত লড়তে লড়তে একটুর জন্য বেঁচে গেছেন, পাক আর্মির নির্যাতন সেলে ছুঁরি পিছলে গেছে বলে গলা কাটা পড়েনি! যেমন মাসুদ রানার গায়ে গুলি চামড়া ছুঁয়ে চলে যায় অনেকটা এমন।
কিন্তু আমরা জানি, ১৯৭১ সালে যখন এই দেশের আপামর জনতা, মায় ১০ বছরের বালকও গ্রেনেড মেরে পাক-বাহিনীর বাঙ্কার উড়িয়ে দিচ্ছিল তখন হুমায়ূন আহমেদ ইঁদুরের মত পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন, তাঁর ভাই জাফর ইকবালসহ! কেবল তিনি প্রাণ হাতে নিয়ে ইঁদুরের মত পালিয়েই বেড়াননি তিনি চাচ্ছিলেন ঝামেলা এড়াতে। যেটার অনেকটা আঁচ করা যায় তাঁর লেখায়:
"মাতাল হাওয়ায় (পৃষ্ঠা নং: ১৯৫) হুমায়ূন আহমেদ নিজের সম্বন্ধে বলছেন, 'আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কেমেস্ট্রির বইখাতা খুললাম। ধুলা ঝাড়লাম। সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে...আবারও কেমিস্ট্রের বইখাতা বন্ধ। ...আসামি শেখ মুজিবর রহমান প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছেন। আবার আমার স্বস্তির নিঃশ্বাস। যাক সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। এখন ভাসানী কোন ঝামেলা না করলেই হলো। এই মানুষটা বাড়া ভাত নষ্ট করতে পারদর্শী। হে আল্লাহ, তাকে সুমতি দাও। সব যেন ঠিক হয়ে যায়। দেশ শান্ত হোক।"
মাতাল হাওয়ায় হুমায়ূন আহমেদ সীমাহীন ফাজলামী করেছেন। তাঁর 'মাতাল হাওয়া' নিয়ে আমি যে লেখাটা লিখেছিলাম, 'মাতাল হাওয়ায় মাতাল হুমায়ূন আহমেদ' [২], ওই লেখায় আমি উল্লেখ করেছিলাম, 
"আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, স্বাধীনতার এই উত্তাল সময়টায় হুমায়ূন আহমেদ নামের মানুষটার গাছাড়া, উদাসীন মনোভাব। যেখানে ১০ বছরের বালক গ্রেনেড মেরে পাকআর্মির বাঙ্কার উড়িয়ে দিচ্ছে সেখানে একজন তরতাজা, মতান্তরে ধামড়া মানুষ গা বাঁচিয়ে চলে কেমন করে! মানলাম, একেকজনের একেক ভূমিকা। সবাইকে যোদ্ধা হতে হবে এমনটা নাও হতে পারে। আহা, হুমায়ূন আহমেদ নামের কেমেস্ট্রির পুতুপুতু ছাত্রটা যদি একখানা পেট্রল বোমা বানিয়ে কাউকে ধরিয়ে দিত তাও তো একটা কাজের কাজ হতো। আর কিছু না পারলে নিদেনপক্ষে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নিয়ে একখানা ৪ লাইনের কবিতা লিখতেন?" 
বেচারা, হুমায়ূন আহমেদ, তখন তিনি কেমিস্ট্রের বইখাতা নিয়ে তখন বড়ই চিন্তিত ছিলেন।
শর্ষীনার পীর তাঁকে এবং তাঁর ভাইকে লুকিয়ে থাকার জায়গা দেননি বলে হুমায়ূন আহমেদ অনেক কষ্ট বুকে পুষে রেখেছিলেন। এই নিয়ে তিনি ফেনিয়ে প্রচুর লেখা লিখেছেন, কাঁদতে কাঁদতে কপোল (!) ভিজিয়ে ফেলেছিলেন! এই করে করে, কী কষ্ট-কী কষ্ট, বুকের ভালভ নষ্ট!
বেচারা এই কষ্ট চেপে রাখতে না-পেরে রাজাকার মাওলানা (!) মান্নানের [৩] পত্রিকা 'ইনকিলাব', 'পুর্ণিমা'য় নিরবচ্ছিন্ন-নিয়ম করে লেখা শুরু করলেন। ননস্টপ লিখতে থাকলেন। এমন কি জাহানারা ইমাম বলে বলে হুমায়ূন আহমেদকে থামাতে পারেননি। বেচারা জাহানারা ইমাম, তিনি কেমন করে জানবেন হুমায়ূন আহমেদের অতি লোভের ন্যালনেলে, লকলকে জিভ কেমন লম্বা হয়!

তাঁর সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গে আসি। হুমায়ূন আহমেদই কি এই দেশের একমাত্র ব্যক্তি যিনি ১৯৭১ সালে বেঁচে গেছেন? সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে তিনি ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গ কেন নিয়ে আসলেন? ওই যে ভান, 'ভানবাজী'!
তাঁর কথায় আমরা জানতে পারি মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ওটির ট্রলিতে হাত-পা ছড়িয়ে তিনি নাকি চিঁ চিঁ করছিলেন, "বাঁচব নারে, বাঁচব না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা কাজের লেখা না-লিখে শেষ শ্বাস ত্যাগ করব না"।
তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। তিনি আয়ু পেয়েছিলেন। ফিরে এসে অনেক বছর পর তার স্বপ্ন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে বইটা লিখলেন সেই বইটার দাম ৪০০ টাকা। প্রচুর পাঠক বইটার চড়ামূল্যের কারণে কিনতে পারেননি! অথচ ইচ্ছা করলে তিনি অন্তত এই বইটার মূল্য কমিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ওপথ মাড়াননি। ন্যূনতম চেষ্টাও তাঁর ছিল না।
ওই যে লেখার শুরুতে বলেছিলাম, ভান-গুরু। এমনিতে ১৯৭১ সাল নিয়ে তাঁর আবেগ এতোটাই প্রবল যে তাঁর 'তহবন' ভিজে একাকার হয়ে যায়! অতি সিক্ত 'তহবন' দিয়ে যে আমরা খানিকটা চোখ মুছব সেই অবকাশটুকুও রাখেননি। এ অন্যায়, ভারী অন্যায়!

নাটক-ভান কেমন করে করতে হয় এটা তাঁর চেয়ে ভাল কে জানে [৪]! হুমায়ূন আহমেদ ভান নামের বলটাকে নিয়ে জাগলিং করেন আর আমরা গোল হয়ে দাড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় দেখি। হুমায়ূন আহমেদ বলেন, 'তালিয়া'। আমরা সজোরে তালি বাজিয়ে বলি, জয় গুরু, জয় ভান-গুরু। 

সহায়ক লিংক:
২. মাতাল হাওয়ায় মাতাল হুমায়ূন আহমেদ: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_6179.html 
৩. মাওলানা (!) মান্নান: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_18.html
৪. হুমায়ূন স্যারের নাটক: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_2278.html

Tuesday, September 7, 2010

ন্যানো ক্রেডিট: ৮

এই মানুষটার নাম আমি জানি না, জানার আগ্রহও বোধ করি না। সবাই বলে 'জসীমের মা', আমিও বলি, 'জসীমের মা'। জসীমের মার খোঁজ পাওয়ার ইতিহাস খানিকটা বিচিত্র!


লোকজনকে একটা খাওয়াবার আয়োজন করা হয়েছিল। একটা হোটেল থেকে ভাত-মাংস প্যাকেট করে কয়েকজন কাঁধে করে বেরিয়ে পড়েছেন। বুদ্ধিটা হলো এই, একসঙ্গে অতি দ্রুত, ক্ষুধার্ত যাকে পাওয়া যাবে  তাকেই দেয়া হবে।
কেমন কেমন করে যেন স্টেশনের বিচ্ছু বাহিনী টের পেয়ে গেল। এরা সবাই দল বেঁধে পিছু পিছু ঘুরতে লাগল। এদের ধমক-টমক দিয়েও লাভ হচ্ছে না, কঠিন চিজ! এরা এদের সমস্ত বুদ্ধির প্রয়োগ করা শুরু করল। প্রথমে বলল, 'ভাত খাওয়ান, আপনাদের লাইগ্যা মিছিল করুম'।
এরা এতে অভ্যস্ত কারণ এরা দেখেছে কেউ খাওয়ালে-টাওয়ালে তার পক্ষে 'অমুক ভাই জিন্দাবাদ' এই টাইপের মিছিল করতে হয়। এদের একের পর এক বুদ্ধি ফ্লপ করছে আর প্যাকেটের সংখ্যা কমে আসছে, শুকিয়ে আসছে এদের মুখ। যখন প্যাকেট মাত্র আর একটা তখন এদের আর বুদ্ধি চলে না। এবার সুর অনেকখানি নরোম, 'একটা প্যাকেটই দ্যান, আমরা সবাই ভাগ কইরা খামু'।
একজন চাচ্ছিলেন, প্যাকেটটা এদের হাতে ধরিয়ে দিতে।

এতক্ষণ আমি দূর থেকে এদের কান্ড-কারখানা দেখছিলাম। আমি নিষেধ করলাম কারণ একটা প্যাকেট বনাম পঁচিশ-ত্রিশজন বিচ্ছু বাহিনী! একটা রক্তারক্তি কান্ড হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। আমি এদের বললাম, 'না, এটা তোমাদের দেয়া যাবে না। তোমরা একজন অন্যজনের মাথা ফাটিয়ে ফেলবে'।
বিচ্ছু বাহিনীর নেতাগোছের একজন চটজলদি বলল, 'তাহলে দশ টাকা কইরা দেন, ভাত খামু'।
আমি অবাক, দশ টাকায় ভাত পাওয়া যায়! মুখে বললাম, 'কোথায় দশ টাকায় ভাত খাওয়ায়'?
এরা যে জায়গায় নিয়ে গেল সেখানে কেবল ভাত এবং ডাল দেয় তাও বেঁচে যাওয়া। এটা আমার পছন্দ হলো না। এরপরই এরা খোঁজ দেয় পনেরো টাকায় ভাত-মাছ পাওয়া যায়। মাছ, বাহ বেশ তো! যেখানে পাওয়া যায় সেটাই জসীমের মার দোকান। এরা এখানে কনুই ডুবিয়ে যে আরাম করে খেয়েছে এই স্মৃতি আমি ভুলব না! এই বিচ্ছু বাহিনীই পরবর্তীতে এই স্কুলের [১] ছাত্র। এদের দেখে এদের জন্য স্কুল করার ভাবনাটা আমার মাথায় আসে।

আজকাল অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে। এক ঢিলে কয়েকটা পাখি না-মারলে শান্তি লাগে না। ভালই তো, একেক দিন পঁচিশ-ত্রিশ-পয়ত্রিশজন করে খাচ্ছে। জসীমের মার মত যারা এখানে দোকান চালান তাঁদের ব্যবসা চাঙ্গা।
এখানেই আমি খোঁজ পাই বৃষ্টির মার [২]। জসীমের মার কাছে জানতে চাই ব্যবসার পুঁজির উৎস কি? সেই একই কাহিনী! কোন এক ডিমওয়ালার কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়েছেন। জসীমের মাকে অনেক বলে-কয়েও ৩০০ টাকার বেশি নিতে রাজি করানো গেল না। তাঁর চাহিদাই এই-ই! এটাই স্থির হয়, মাস শেষ হলে তিনি তাঁর সুবিধামতো টাকা স্কুলের শিক্ষকের কাছে জমা করবেন।

জসীমের মা মানুষটা বড়ো আলাভোলা টাইপের। আমি লক্ষ করেছি, পাঁচ-সাতজন একসঙ্গে বসলেই জসীমের মার সব এলোমেলো হয়ে যায়। হিসাব-টিসাব গুলিয়ে ফেলেন। অনেকে ফাঁকি দেয়, মানুষটার এই নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য নাই। কত বিচিত্র মানুষই না আছে এই গ্রহে!

সহায়ক লিংক:
১. বিচ্ছুদের স্কুল: http://tinyurl.com/327aky3
২. বৃষ্টির মা: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_31.html         

Monday, September 6, 2010

স্কুল এবং 'ঈশ্বরের ভালবাসার সন্তান'

ওঁর নাম জসীম। ঈশ্বরের ভালবাসার সন্তানদের একজন- যাদের চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও নাই, আমি কোন ছার! অনেক আগে এঁদের নিয়ে আমি একটা লেখা লিখেছিলাম, 'অমানুষ' [১]। Hermaphrodite- যাদের প্রচলিত নাম হচ্ছে হিজড়া।

পূর্বেও লিখেছিলাম, লোকজনকে খাওয়াবার জন্য আমার কাছে কিছু ফান্ড ছিল। দু-দিন আগে এঁদের দাওয়াত ছিল। এর পেছনে কয়েকটা কারণও ছিল। এঁদের প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব ব্যতীত এখানে মুগ্ধতাও কাজ করেছে। স্টেশনের কাছে এই স্কুলটা [২] যখন চালু করি তখন ছেলেপেলেদের ধরা যাচ্ছিল না, পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। প্রথম দিন এসেছিল মাত্র ৬ জন! এখন ছাব্বিশ ছাড়িয়ে গেছে। ফি-রোজ দুয়েকজন করে বাড়ছে।
স্টেশনের এই সব ছেলেপেলেদের জসীমরাই বকে-মেরে স্কুলে পাঠিয়েছেন। আমার আসা-যাওয়ার সময় এঁরা আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইতেন, 'আইজ পুলাপাইন স্কুলে গেসে তো'?
কাউসার নামের স্কুলের একটা ছেলে আছে যার ঘুম কুম্ভকর্ণকেও হার মানায়। একে ঘুম থেকে জাগাতে গিয়ে এঁদের একজন কাউসারের কাঁথা ওভারব্রীজ থেকে নীচে ফেলে দিয়েছিলেন। কাউসারের স্কুলে না-আসা পর্যন্ত এঁরা ক্ষান্ত হননি।
এই কারণেও আমি ইশ্বরের এই সব ভালবাসার সন্তান নামের হিজড়াদের প্রতি ভারী কৃতজ্ঞ ছিলাম। এঁদের যখন বললাম, আপনাদের একবেলা খাওয়াতে চাচ্ছিলাম...। আমরা উল্লাস প্রকাশ করি হাতে কিল মেরে, এরা খানিকটা অন্যভাবে। বিচিত্র ভঙ্গিতে তালি বাজিয়ে। আমাকে একজন বললেন, আমাদের আরও কয়েকজন আছে, এদেরও বলি?
আমি সানন্দে বলি, আচ্ছা।
সব মিলিয়ে এঁরা হয়েছিলেন ১২ জন। আমি অবাক হই, প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূর থেকেও কয়েকজন চলে এসেছিলেন! এমন না এঁরা একবেলা খেতে পান না কিন্তু এঁদের কাছে নিমন্ত্রণ এবং সবার সঙ্গে একত্র হওয়াটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, আনন্দের।

বিকালে আমি তখন স্কুলে। স্কুলের ছেলেরা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছে, আমি চোখ ভরে দেখছি।

বাইরে হইচই! বেরিয়ে দেখি এরা সবাই দাঁড়িয়ে। আমার বুক কেঁপে উঠে, হঠাৎ জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় এঁদের খাওয়ার সময় আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি যদিও সমস্ত আয়োজন করা ছিল। তাহলে কি খাবার পছন্দসই হয়নি? এঁরা এই জন্য কি আমার জবাবদিহি চাইতে এসেছেন?
আমি ভয়ে ভয়ে জিগেস করি, কি হয়েছে?
সম্ভবত আগে থেকেই 'শুকতারা' নামের একজনের চোখে পানি টলমল করছিল। এক্ষণ 'শুকতারা' হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। 
ঘটনাটা হয়েছে এমন, এঁরা খাওয়ার পর কয়েকজন যখন কুমিল্লায় ফেরার জন্য ট্রেনে উঠেছিলেন তখন ট্রেনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ইছু মিয়া নামের একজন, ট্রেনের দরোজায় কেন দাঁড়িয়ে আছে এই সামান্য অপরাধে শুকতারাকে লাথি মেরে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়। এরপর বেদম পেটায়।
শুকতারা যখন তাঁর হাতের পেটানোর দাগগুলো দেখাচ্ছিলেন তখন আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি- অদম্য রাগে আমার শরীর কাঁপছিল। ঈশ্বর, একজন মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয় কেমন করে!
 জিআরপি ওসি স্টেশনের বাইরে। এঁরা জিআরপি থানায়ও গিয়েছিলেন কিন্তু এদের হাঁকিয়ে দেয়া হয়।

এঁরা আমার কাছে বড়ো আশা নিয়ে এসেছেন কিন্তু আমার সেই ক্ষমতা কই? আমি চোখের পানি গোপন করে একজনের পর একজনের কাছে পাগলের মত ফোন করতে থাকি।
ইতিমধ্যে প্রায় সমস্ত জাতীয় দৈনিকের, প্রিন্ট মিডিয়ার লোকজনরা চলে এসেছেন। আমি এখন আর আগের মত অবাক হই না। অনুমান করি, সমস্ত পত্রিকার লোকজন এই খবরটা এখান থেকে পাঠিয়েছেন কিন্তু কোন দৈনিকেই এই খবরটা আসেনি। দৈনিকগুলোর এই তুচ্ছ খবর ছাপাবার সময়, স্পেস কোথায়! আমাদের 'সো কলড' বিবেক!

নিতল অন্ধকারেও কোথাও-না-কোথায় আলো থাকেই, জিআরপি ওসি নামের সহৃদয় মানুষটার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এই মানুষটা কেবল এঁদের কাছে দুঃখ প্রকাশই করেননি, অভিযুক্ত ইছু মিয়াকে শাস্তি দেয়ারও ব্যবস্থা করেছেন। কেবল কঠিন তিরস্কার করেই ক্ষান্ত হননি, ইছু মিয়াকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। ইছু মিয়ার ঈদটা ভাল কাটবে না কারণ ব্যারাকে থেকে তার ঈদের উপরি আয় বন্ধ।

এটা হিজড়া নামের মানুষদের কেবল বিজয়ই না, আমাদের নগ্নতা ঢাকার একচিলতে কাপড়ও বটে। 'শুকতারা' নামের মানুষটার শরীরে মারের দাগ শুকাতে হয়তো খানিকটা সময় লাগবে। কিন্তু তাঁর যাওয়ার সময় আমি যে হাসি দেখেছি, আমি নিশ্চিত, তাঁর মনের দাগ খানিকটা শুকিয়েছে।
'শুকতারা' নামের মানুষটার ইতিহাস জেনে আমি হতভম্ব হই। এঁ একজন আর্মি অফিসারের সন্তান এবং আর্মি অফিসার নামের বাবাটা এখনও কর্মরত। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি কিন্তু অন্য সূত্র ধরে নিশ্চিত হওয়া গেল শুকতারা মিথ্যা বলছেন না। নিজের মান বাঁচাতে যে আর্মি অফিসার নামের বাবাটা এই অভাগা সন্তানকে ত্যাগ করেছেন তার নাম-ধাম এখানে দেয়াটাই সমীচীন ছিল। শুকতারার অনুরোধে দিলাম না, আমি শুকতারাকে কথা দিয়েছি।

এঁরা যখন সবাই একজোট হয়ে থানার দিকে যাচ্ছিলেন তখন আমি ট্রেনেথাকা এবং আশেপাশের মানুষদের অভিব্যক্তি লক্ষ করি। এদের প্রায় সবার চোখেই অপার কৌতুহল। ঢলঢলে মুখে, চকচকে চোখে যেমনটা আমরা চিড়িয়াখানার পশুদের দেখে অপার আনন্দ লাভ করি, অনেকটা তেমন। কেউ কেউ অযাচিত মন্তব্যও করছিলেন। যারা বিদ্রুপের বন্যা বইয়ে দিচ্ছিলেন এদের অনেকেই আমার চেয়ে সুশ্রী, চকচকে কাপড়পরা, চোখ বন্ধ করে এও বলা চলে অনেকে আমার চেয়ে শিক্ষিতও।
আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, আমরা আসলে সেই আদিম মানুষই রয়ে গেছি। একপেট আবর্জনা ঢেকে রাখার অযথাই ব্যর্থ চেষ্টাই করি...।

সহায়ক লিংক:
১. অমানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_30.html
২. অভাগাদের স্কুল: http://tinyurl.com/327aky3    

Sunday, September 5, 2010

ন্যানো ক্রেডিট: ৭

আল আমীন। এর মা অন্ধ। একটা সেলুন চালায়, কষ্টেসৃষ্টে-কায়ক্লেশে। আজ থেকে ১৫/ ২০ দিন পূর্বে এর মা আমার কাছে এই সেলুনটার জন্য টাকা চেয়েছিলেন চুল কাটাবার ঘূর্ণায়মান চেয়ার কেনার জন্য। ঠিকানা নিয়ে বলেছিলাম, পরে জানাব।

পরে বলার কারণ আছে। ন্যানো ক্রেডিট [১] নিয়ে কাজ করার পূর্বে অনেকে জোর নিষেধ করেছিলেন টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না, আমি গা করিনি। এখন পর্যন্ত যাদের দেয়া হয়েছে কোথাও কোন সমস্যা হয়নি। ঠিক-ঠিক সবাই কথামতো টাকা পরিশোধ করে যাচ্ছেন। মন মিয়া [২] নামের এই মানুষটার কাছে ১০০০ টাকার মধ্যে এখন কেবল পাওনা ২৭০ টাকা। এরিমধ্যে এই মানুষটা খানিকটা পুঁজিও জমিয়ে ফেলেছেন। এই টাকা শোধ হলে তাঁকে ২০০০ টাকা দেয়া হবে এমনটাই স্থির হয়েছে।
কেউ কেউ আমাকে বোকা বানাবার চেষ্টাও করেছেন। ছলিম মিয়া নামের একজন চোখে পানি নিয়ে আমার কাছে টাকা চাইল ব্যবসা করার জন্য। আমি কথায় কথায় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি থাকেন কোথায়?
ছলিম মিয়া ঠিকানা বলেছিল। আমি ওখানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানলাম, ব্যবসা দূরের কথা একে কোন কাজ-কাম করতে কেউ কখনও দেখেনি। ছলিম মিয়া যে কাজটা নিয়ম করে করে সেটা হচ্ছে গাঁজা সেবন।
সলিম মিয়া পরের দিন যখন আমার কাছে আসল, আমি তাকে বলেছিলাম, কিসের ব্যবসা করবেন, গাঁজার? মানুষটা পালিয়ে বেঁচেছিল। এ হয়তো আশা করেনি আমি সত্যি সত্যি ওর অবর্তমানে বাসায় হাজির হয়ে যাব। এর হয়তো জানা ছিল না হরিজন পল্লীতে কাজ করার অভ্যেস আছে আমার।
এমনও হতে পারে ব্লগস্ফিয়ারে এটা রটে যেতে পারে আমাকে দেখা গেছে শুকরের রেসে শুকরের পিঠে। এই নিয়ে অবশ্য আমার কোন বিকার নাই। 

তো, আল আমীনের দোকানটা আমি দেখে এসেছিলাম হপ্তাখানেক আগে। আল আমীন নামের ছেলেটা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'আপনে কি চুল কাটাইবেন'?
চুল কাটাবার মত যথেষ্ঠ বড়ো ছিল, কাটালে মন্দ হতো না কিন্তু আমার কুখ্যাত চুলের ছাঁট আবার সবাই দিতে পারে না। এই কুখ্যাত ছাঁট দিতে সবাই রাজিও হয় না।
আমি হাসিমুখে বললাম, চুল কাটাব না বেল (ন্যাড়া) হবো এটা এখনো ঠিক করি নাই। তা তোমার নাকি চেয়ার কেনা দরকার? বিষয় কি, তোমার তো দেখি চেয়ার একটা আছে?
আল আমীন এখন বুঝতে পারে এই মানুষটা চুল কাটাবে না এর মতলব অন্য। আল আমীন বলে, কাস্টমার দিগদারী (যন্ত্রণা) করে। কয়, কি চিয়ার রাখছস, হো... ব্যথা হয়া যায়।

কাল একে চেয়ার কেনার জন্য ১৫০০ টাকা দেয়া হয়েছিল- প্রতি মাসে ২০০, ৩০০ যা পারবে জমা দিয়ে ১৫০০ টাকা শোধ করবে। আজ এটাই দেখতে এসেছি। চোখের পলকে আমি ছবি তুলে ফেলি। আল আমীন আর উঠে দাঁড়াবার সুযোগ পায়নি, মুখে আমি বলি, চেয়ারটায় বসে থাকো।

আমি আল আমীনের এখান থেকে হেঁটে হেঁটে ফিরে আসছি। একটা ট্রাক এতোটাই পাশ ঘেঁষে গেল ফতুয়ার হাতায় আমি এর স্পর্শ টের পাই। খুব কাছ থেকে মৃত্যুকে দেখে মানুষ কি জমে যায়, জানা নেই আমার? আমি শূণ্য দৃষ্টিতে অপসৃত ট্রাকটার দিকে তাকিয়ে থাকি।
এই সব ক্ষেত্রে যা নিয়ম, ট্রাক ড্রাইভার এবং তার আত্মীয়-স্বজনকে জড়িয়ে কুৎসিত গালি দেয়া। আমি দেবতা না যে আমার গালি জানা নেই কিন্তু আমার মাথা কাজ করছিল না। আমার কেবল মনে হচ্ছিল, মৃত্যু আমার গা ছুঁয়ে বলে গেছে, এই পাগল তোকে ছুঁয়ে দিলাম! এটা কি আমার জন্য কোন ম্যাসেজ? যা করার তাড়াতাড়ি করে ফেল, সময় নাই রে পাগলা, সময় নাই।
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমার মস্তিষ্ক কি ভেবেছিল আমি জানি না কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমাদের জীবনটা কী ঠুনকো! এই ঠুনকো জিনিসটা নিয়ে আমাদের কত অন্যায়-অনাচার-লোভ-অহংকার, এর কোন মানে হয় না আসলে!

এই রাস্তাটা যথেষ্ঠ কুখ্যাতি আছে যদিও এটার জাঁকালো নাম আন্তর্জাতিক রাস্তা কারণ এই রাস্তা দিয়ে বাস-ট্রাক ভারতে যায়। 'ছাল উঠা কুত্তা, বাঘা তার নাম'- এমন সরু রাস্তা আন্তর্জাতিক রাস্তা হয় কেমন করে এটা অবশ্য গবেষণার বিষয়।
ট্রাক ড্রাইভারকে আমি খুব একটা দোষ দেই না। তার সরে যাওয়ার পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না, হর্নও দিয়েছিল। আমার অন্যমনস্কতাই এর জন্য দায়ী। ঢাকার রাস্তায় [৩] হাঁটার বিষয়ে আমার উপর লোকজনের কঠিন নিষেধাজ্ঞা আছে, এখন কি এখানেও এটা প্রযোজ্য হবে!
ব্লেসিং কাজ করে কি করে না এটা আমি জানি না। আমার জন্য কি এই গ্রহের কোথাও-না-কোথাও, কোন-না-কোন জায়গায়, কেউ-না-কেউ, কখনও-না-কখনও কি কোন কলকাঠি নেড়ে ছিলেন? কারও ব্লেসিং কি আমার পিছু তাড়া করেছে? জানি না আমি।

ফিরে আসার পথে আব্দুল মিয়া নামের এই মানুষটাকে পেয়ে যাই। এই মানুষটাকে আমি চিনি, ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের স্কুল [৪] করার সুবাদে। এই রাস্তা ধরেই তিনি হেঁটে যাচ্ছেন, গতি স্লথ কিন্তু যানবাহনকে ঠিকই পাশ কাটাচ্ছেন!
আমি খানিকটা বিভ্রান্ত, এই মানুষটা চোখে দেখতে পান না এমনটাই জানা ছিল। তাহলে কি মানুষটা মিথ্যাবাদী? আমি এঁর পিছু পিছু খানিকটা দূর যাই। কাছে গেলে মানুষটা আমাকে চিনতে পারেন আমি এই ফাঁকে মানুষটার চোখের দিকে তাকাই, নষ্ট চোখ। এই চোখ দিয়ে দেখার প্রশ্নই আসে না।

আমার অসম্ভব মন খারাপ হয়। আমার এই ভাল চোখ কোন কাজের...!

সহায়ক লিংক:
১. ন্যানো ক্রেডিট: http://tinyurl.com/39dkbhh
২. মন মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_4248.html
৩. ঢাকা: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_27.html
৪. ঈশ্বরের বিশেষ: http://tinyurl.com/2fs9j4p        

Friday, September 3, 2010

ভিক্ষুক!

জীবনে আমি অনেক ধরনের ভিক্ষুক দেখেছি। এদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, একবার যখন হাত বাড়িয়ে পয়সা পাওয়া যায় তখন আর এরা নড়াচড়া করতে চায় না। জাহাঙ্গির আলম [১] নামের এই মানুষটা এর জলজ্যান্ত প্রমাণ।

আমি ভিক্ষুকের ডাক্তার না কিন্তু কিছু ওষুধপত্র কাজ দেয়। কয়েকদিন পূর্বে ট্রেনে এক ভিক্ষুককে দেখলাম, ঠ্যাং দেখিয়ে দেখিয়ে ভিক্ষা করছে। আমার কাছে আসলে আমি বললাম, সমস্যা কি?
ভিক্ষুক বলল, অপারেশন করামু।
আমি বললাম, কি অপারেশন?
ভিক্ষুক, ঠ্যাং।
আমি বলি, বেশ। তা এই এক টাকা-দুই টাকা তুলে তুমি কত দিনে অপরারেশনের টাকা যোগাড় করবে। যে টাকা তুমি তুলবে ওখান থেকে তো খেয়েও ফেলবে।

আমি এর পা দেখলাম। এর বর্ণনা যদি সত্য হয় খুব ছোট্ট একটা কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হবে। এর জন্য ডাক্তারেরও প্রয়োজন নেই, ডাক্তারের সহকারীর পক্ষেই সম্ভব। তবে পয়সা খরচ হবে এটা সত্য। 
এবার আমি তাকে বললাম, তোমাকে আমি একজন এফসিপিএস ডাক্তারকে দেখিয়ে এই পায়ের জন্য যা যা লাগে সব ব্যবস্থা করব। কেবল তুমি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এই ঠিকানায় চলে আসবে। আমি ওখানে থাকব। আমি অপেক্ষায় ছিলাম কিন্তু মানুষটা আসেনি। ভিক্ষুকের যা অভ্যাস।

ট্রেনে প্রায়ই ছোট্ট একটা ছেলেকে দেখি অনেক দিন ধরে। এর পেটে লালচে দগদগে ঘা, ভয়াবহ। আরও কিছু বিষয় আছে লেখতে ইচ্ছা করছে না তবুও লেখা প্রয়োজন। খানিক চাপ পড়লেই ওখান থেকে পেটের আবর্জনা বেরিয়ে আসে। বিভিন্ন সময়ে ট্রেনে উঠলে একে দেখিনি এমনটা খুব কম হয়েছে। একবার নিয়ত করে গেছি, কপালে যা থাকে ঝুলে পড়ব। একে বললাম, ঘটনা কি?
অপারেশন করামু।
ঠিক-ঠিক তো, অপারেশন করাবি?
হ।
চল আমার সাথে। তুই আমার সাথে থাক, হাসপাতালে নিয়ে তোর অপারেশন করাব।
এ কোন ফাঁকে সটকে পড়েছে আমি বলতেও পারব না। আরেক দিন যখন পেয়েছি তখন মেজাজ খারাপ করে বলেছি, দূর হ এখান থেকে, আমার চোখের সামনে থেকে।
এর ছবি তুলেছিলাম কিন্তু ছবিটা এমন বীভৎস দুর্বলচিত্তের একজন মানুষের হার্টবিট মিস করবে। এখানে দেয়া থেকে অনেক কষ্টে বিরত রইলাম। এদের ধরে ধরে জেলখানার মতো কোথাও আটকে রাখা প্রয়োজন।

এই মানুষটা ভিক্ষা করেন তার কথামতে নিজের জন্য না, বাঁদরের জন্য। আবার কাহিনিও আছে। তিনি যে নিজের জন্য চান না এই বিষয়ে কোন ছাপাছাপির যেন অবকাশ না থাকে এই হেতু প্রমাণ দেয়ার নিমিত্তে টাকা নেয়ার সময় নিজের হাতে নেন না। কেউ দিলে বিরক্তি সহকারে বলেন, আহ, আমারে দিতাছেন ক্যান। এইটা দিয়া আমি কি করমু! বান্দইরারে দেন, হের যন্ত্রণায় বাঁচি না। হের সারা শইল জুইড়া খিদা। 
একবার আমি খানিকটা রগড় করেছিলাম, বান্দরের জন্য আপনের অনেক যন্ত্রণা হয়। মাইনষের কাছে হাত পাততে হয়...।
তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, আপনে একজন শিকখিত মানু হইয়া ক্যান উল্টাপাল্টা কইতাছেন! কুন সুমায় আমারে দেখলেন হাত পাততে?
আমি আর কথা বাড়াই না। তো এমন ভিক্ষুকের কথা বলে বলে একটা উপন্যাসের ম্যাটার দাঁড় করিয়ে ফেলা যাবে। (আমি যখন ছবিটা উঠাই তখন দুজনই গভীর ঘুমে।)

তবে কসম, চকচকে পোশাক-জুতা লাগিয়ে কাউকে ভিক্ষা করতে দেখেছি বলে তো মনে হয় না। এই মানুষটাকে দেখে প্রাণ জুড়ালো।

*ছবি ঋণ (পুলিশ ভিক্ষুক) : কালের কন্ঠ

সহায়ক লিংক:
১. জাহাঙ্গীর আলম: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_06.html  
 

Thursday, September 2, 2010

পরিবহন ধর্মঘট

ছোট্ট মেয়েটা আজও কুড়িয়ে পাওয়া আজব জুতোটা পায়ে দিয়ে এক পাক ঘুরল।
মোলায়েম গলা ভেসে এলো, ‘খুকি, ভাল আছ?’
ছোট্ট মেয়েটা যার নাম, মৌ। মৌ কিন্তু মোটেও মিষ্টি করে হাসল না। মৌ রাগ-রাগ গলায় বলল, ‘হেই ধৈত্য, তোমায় রোজ বলি আমায় খুকি বলবে না, তবু বলো, বিষয়টা কী, আমার নাম নাই?’

বিশাল দৈত্যটা মাথা নীচু করে রাখল, খুকি যে ওকে ‘ধৈত্য’ বলে এটা ওর একদম ভাল লাগে না। কেন, 'লম্বা আঙ্কেল' বললে কি হয়? অনেক সাহস করে চোখ তুলে বলল, ‘মৌ, ধৈত্য বললে মনে কষ্ট হয়। দেও-দানবের মনে কষ্ট দেয়া ঠিক না।’

মৌ বালিশের সঙ্গে ঘুসাঘুসি খেলছিল। একতরফা খেলা, বালিশ বেচারা মার খেয়েই যাচ্ছিল, টুঁ-শব্দও করছিল না। সত্যি বলতে কী, বালিশদের পাল্টা মার দেয়ার নিয়ম নাই। বালিশের মাঝখানে মৌ প্রায় আধ হাত গর্ত করে ফেলেছে। মৌ ঝাকড়া চুল ঝাঁকিয়ে রাগী গলায় বলল, ‘আহ, কিছু জিজ্ঞেস না করলে কথা বলো কেন? তোমার মুখ থেকে বিশ্রী পচা গন্ধ বেরুচ্ছে। আজ আবারও মানুষ মেরেছ?’

অসম্ভব কষ্টে দৈত্যটার চোখ ভরে এল। ওর পায়ের কাছে মৌ’র গোসল করার ছোট্ট বাথটাবটা ছিল। পাঁচ নাম্বার ফুটবলের মতো একটাই চোখ টিপে গোপনে চোখের জল খালি বাথটাবে ফেলল। বাথটাব থেকে পানি একটুর জন্য উপচে পড়ল না। মনে মনে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলল। বাদশা সোলেয়মানের কৃপায় কী বাঁচাই না বেঁচে গেছে। মৌ দেখে ফেললে কী লজ্জাই না হতো! আড় চোখে তাকিয়ে চাপা নিঃশ্বাস ফেলল। মানুষের মাংস খাওয়া ছেড়েছে সেই কবে, যেদিন মৌ’র সঙ্গে দেখা হল, প্রতিজ্ঞা করল, সেই দিন থেকে।

এরপর থেকে কী কষ্ট-কী কষ্ট! মরা জীব-জন্তুর মাংস খেয়ে ওর পেট নেমে গেল। একেকবার পাঁচশোটা করে পেট ধরার ওষুধ ‘এমোডিস’ খেতে হয়। এতগুলো ওষুধের দাম কী কম, যোগাড় করাও কী কম ঝামেলা! 

দৈত্য অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ঘরটায় যেন ছোটখাট ঝড় বয়ে গেল। মৌ’র খেলনা সব উড়ে বেড়াতে লাগল। দৈত্য অসম্ভব লজ্জিত হয়ে খেলনাগুলো জড়ো করতে লাগল। কিছু খেলনা মোটা-মোটা আঙুলের ফাঁক দিয়ে টুপটুপ করে পড়ে গেল। ভয়ে মৌ’র দিকে তাকাল না। কথা ঘুরাবার জন্য গলা খাঁকারি দিয়ে মিনমিন করে বলল, ‘আচ্ছা মৌ, তোমার তো অনেক বুদ্ধি, একটা বুদ্ধি দাও না।’
মৌ অবাক, ‘কী বুদ্ধি চাও?’
দৈত্যটা বলল, ‘এই যে আমার মুখে পচা গন্ধ হয়।’
‘অ-এইটা,’ মৌ মাথা এপাশ-ওপাশ করল, ‘এর তো কোন বুদ্ধি নাই।’
দৈত্য সাহস করে বলল, ‘তোমার মুখে গন্ধ হলে কি কর?’

মৌ বিরক্ত হল। থমথমে গলায় বলল, ‘কি যে বুদ্ধি তোমার! আমি কি তোমার মতো অচা-পচা জিনিস খাই, আর দিনে তিনবার ব্রাশ করি না!’
দৈত্যর চোখ চকচক করতে লাগল, ‘দাঁত ব্রাশ করলে দাঁত পরিষ্কার হয়, গন্ধ হয় না বলছ?’ দৈত্য স্বল্প পরিসরে অদ্ভুত কায়দায় ডিগবাজি খেয়ে আবার বলল, ‘ঠিক বলছ তো?’
‘হুঁ’
‘দাও না মৌ, তোমার একটা পুরনো ব্রাশ আমায়,’ দৈত্যর চোখে মিনতি ঝরে পড়ল।

মৌ হাসতে-হাসতে খাট থেকে গড়িয়ে পড়ল। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে চোখ মুছে বলল, ‘আমার ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার হবে তোমার দাঁত। হি-হি-হি, হিক-হিক-হিক, হো-হো-হো, হা-হা-হা!’
‘হবে না তাহলে,’ দৈত্যর চোখ নিভে গেল।
‘উহুঁ, তোমার জন্য তো অনেক বড় ব্রাশ লাগবে। এত বড় ব্রাশ কোথায় পাওয়া যাবে। উম-ম, দাঁড়াও, ভাবতে দাও। ইউরেকা, পেয়েছি, টয়লেট পরিষ্কার করার যে বড় ব্রাশ, ওটা দিয়ে তোমার কাজ চলবে।’

দৈত্যর মনে হলো বুকটা ফেটে যাবে, কষ্টে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। এত বাতাস পৃথিবীতে অথচ ওর বুকটা মরুভূমি হয়ে আছে। মৌ অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। আরে এ এরকম করছে কেন! মাথা খাটিয়ে কী দারুন একটা বুদ্ধিই না দিল।
মৌ দেবশিশুর মত হাসি দিয়ে বলল, ‘হয়েছে কি তোমার, এমন করছ কেন? বুদ্ধিটা পছন্দ হয়নি?’
‘না,’ দৈত্য রুদ্ধ গলায় বলল।
‘কেন-কেন?’
‘আমি টয়লেটের ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার ক্ক-র-ব,’ দৈত্য কথাটা শেষ করতে পারল না। ওর গলা ভেঙ্গে গেল।
‘অ, এই ব্যাপার! তোমার প্রেষ্টিজে লেগেছে। ধুর পাগলা, আমি তো তোমায় একদম নতুন একটা ব্রাশ কিনে দেব। পাগলু কোথাকার!’

এবার দৈত্যর মনের মেঘ কেটে গেল। কোদালের মতো আট-দশটা দাঁত বের করে দরাজ গলায় বলল, ‘মৌ, আমার মনে এখন বড় আনন্দ হইছে, আমি বড় খুশি হইছি। বল কি চাও আমার কাছে যা চাইবে তাই পাবে।’

মৌ ভাবনায় তলিয়ে গেল। কি চাওয়া যেতে পারে? অনেকক্ষণ ভেবে বলল, ‘এই যে হরতাল হয়- মানুষের কষ্টের শেষ থাকে না। ওদিন বাবা বলছিলেন, সারা দেশের মানুষ একটা বিশাল জেলখানায় আটকা পড়ে। মানুষের বড় কষ্ট-বড়ো কষ্ট। তুমি এই কষ্টের শেষ করো।’

দৈত্য লজ্জায় মিইয়ে গেল। প্রায় শোনা যায় না এমনভাবে বিড়বিড় করে বলল, ‘মৌ, এটা আমার ক্ষমতার বাইরে, তুমি অন্য কিছু চাও। সোনা-দানা, খাবার-দাবার, আকাশ ভ্রমণ- কি চাই বল?’
‘না, আমি অন্য কিছু চাই না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, হরতাল হলে দেশটার চাকা চারকোণা হলে হোক, হরতালের দিনে তুমি যেখানে যেতে চাইবে আমি তোমায় উড়িয়ে নিয়ে যাব, প্রমিজ।
‘না-না-না,’ মৌ’র জেদী গলায় বলল।
‘প্লিজ, মৌ, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড মি-।’
‘না-না-না। আমি অন্য কিছু চাই না। হরতালে মানুষের কি কষ্ট হয় এটা আসলে তুমি বুঝতে পারছ না। তোমার কি, লম্বা লম্বা ঠ্যাং ফেলে মাইলের পর মাইল চলে যাও।’

দৈত্য টাক মাথা চুলকে বিব্রত গলায় বলল, ‘প্লিজ মৌ, প্লিজ, দয়া করো। তুমি অন্য কিছু চাও, বাদশা সেলেয়মানের কসম, আমি সঙ্গে সঙ্গে হাজির করব!’
‘না।’
‘আহ, তুমি কেন বড়দের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ। যারা এ দেশ চালায় তাদের মাথাব্যথা নাই যতো মাথা ব্যথা তোমার,’ এবার দৈত্যর গলায় উষ্মা প্রকাশ পেল।
মৌ গলা ফাটিয়ে কাঁদতে লাগল, ‘তুমি কোন কাজের না। আসলে তুমি মানুষের উপকার করতে চাও না। যাও, তুমি আমার সামনে থেকে। আর কখখনো আমার সামনে আসবে না, আজকের পর কখখনো আমি তোমাকে ডাকব না, আজ থেকে তোমার জন্য মৌ মরে গেছে।’
দৈত্য মিলিয়ে যেতে যেতে ছলছল চোখে ভাবল, ‘আহ, হরতাল থামিয়ে দেয়ার ক্ষমতাটা থাকলে বেশ হতো!

*কেউ লেখাটা ভুলক্রমে পড়ে শেষ করে ফেললে সময় থাকতে এখন জানিয়ে দেই, এটা লিখেছিলাম ছোটদের জন্য। হা হা হা।
সঞ্জীব চৌধুরী [১] এটা কেন বড়দের পাতায় ছাপিয়েছিলেন আমি জানি না।
* আমি বিভিন্ন নামে লিখেছি। তখন শুভ্র আহমেদ নামে লিখতাম!

সহায়ক লিংক:
১. সঞ্জীব চৌধুরী: http://www.ali-mahmed.com/2007/11/blog-post.html

Wednesday, September 1, 2010

অভাগাদের স্কুল: ২

আমি জানি না মনখারাপ করা দিনে ঝুম বৃষ্টি নামে কেন?

দুপুর থেকেই কেমন অস্থির-অস্থির লাগছিল, কারণটার বিশদে যেতে চাচ্ছি না। আমার সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি, তীব্র। মনখারাপ হলেও তা হয় অতি তীব্র- এর ধাক্কা সামলানো আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। মাথায় তখন হাবিজাবি ভাবনা খেলা করে। এই ভাবনাগুলোর নমুনা কেমন এই নিয়েও আলোচনার ইচ্ছা নাই। অল্প কথায় বলা যায় নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা তখন দুস্কর হয়ে পড়ে।

এমনটা হলে আমি যেটা করি সোজা হাইড-হাউজে চলে যাই, ফোন বন্ধ করে দেই। নামটা শুনতে গালভরা কিন্তু এটা তেমন উল্লেখ করার মত কিছু না। নদীর তীরে একটা টং ঘরের মত। এটার খোঁজ আমি কাউকে বলি না, খুব কাছের মানুষকেও না।
এখানে যে মানুষটা থাকেন তিনি বিচিত্র কারণে আমাকে পছন্দ করেন- টুকটাক কথা চলে। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, মানুষটা যখন দেখেন আমার কথা বলার আগ্রহ নাই তখন কোন একটা ছল করে ওখান থেকে সরে পড়েন। মুখে বলেন, শইলডা ম্যাজম্যাজ করতাছে, যাই হাইট্টা আসি।
এই মানুষটার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!

এখানে আসার সময়ই আকাশ জুড়ে মেঘ ছিল। কী অসাধারণ প্রকৃতির খেলা! মানুষের বানানো যন্ত্রের এই ক্ষমতা কই একে ধরে রাখার, তাও আবার ৩.২ মেগাপিক্সেল সেলফোন ক্যামেরার?
ওয়াল্লা, আকাশ দেখি তার সমস্ত চুল এলোমেলো করে ঢেকে ফেলে সব, ঝাঁপিয়ে পড়ে বৃষ্টি! বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে, পা ঝুলিয়ে বসার সুখটা আর রইল না। আমার ধারণা ছিল অনেকক্ষণ লাগিয়ে বৃষ্টি হবে। কিসের কী, অল্পক্ষণেই বৃষ্টির আর নাম-গন্ধও নেই। ফিরে আসতে আসতে আমার খেয়াল হয় কাল যে স্কুল চালু হয়েছে [১] এটা আজ চারটা থেকে শুরু হওয়ার কথা। চারটা বাজতে আর বেশি বাকী নাই।


হা ইশ্বর, এটা সম্ভবত এই গ্রহের অসাধারণ একটা দৃশ্য! আমি কি ঠিক দেখছি? কাল ছাত্র ছিল কেবল ছয় জন, এখন দেখছি ১৯ জন! শিক্ষক আমাকে দেখে চোখ বড়বড় করে হড়বড় করে কিসব যেন বলতে থাকে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি শিক্ষক নামের মেয়েটা হতভম্ব হয়ে গেছে। এ আশা করেনি এরা দল বেঁধে সবাই ঠিক-ঠিক সময়মতো চলে আসবে। কেবল চলেই আসেনি, সবাই মিলে প্রথমে ঘরটা পরিষ্কার করেছে। ঘরটা দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত থাকায় রাজ্যের আবর্জনায় গিজগিজ করছিল। আমি নিশ্চিত, এই সংখ্যা আরও বাড়বে। আমি আগের লেখাও বলেছিলাম, অন্য দুইটা স্কুল থেকে [২] [৩]এই স্কুলের বাচ্চারা চমৎকার করবে।
এই ফাঁকে কখন যে আমার নিতল বিষণ্নতা বাষ্পের মতো উবে গেছে আমি নিজেও জানি না!

কালকের লেখায় একজন পাঠক আপত্তি জানিয়েছিলেন, এটাকে অভাগাদের স্কুল বলায়। ওখানে আমি ব্যাখ্যা দিয়েছি তদুপরি সবিনয়ে আবারও বলি, এটা কেবল আমার জন্য। এখানে আমার লেখার পাঠককেও জড়াতে চাই না। বুকে হাত দিয়ে বলি, এদের দেখে আমার কেবল মনে হয় একেকটা চাবুকের কথা। যে চাবুকের দগদগে ঘা আমার পিঠে।
আমি পড়ার সুযোগ পেয়েছি, আমার সন্তানও। হরিজন পল্লীর বাচ্চাদের মা-বাবা আছে। চোখে দেখতে পান না এমন মানুষদের বাচ্চাদেরও কিন্তু এই স্কুলের অধিকাংশ বাচ্চাদের মা-বাবার হদিস নাই। তাই অন্য স্কুলের চেয়ে এই স্কুলটা প্রতি আমার বিশেষ পক্ষপাতিত্ব আছে। অন্য স্কুলগুলোয় মাস্টাররা পড়ান, না-বলে কোন একদিন আমি চলে আসি। কিন্তু এখানে শিক্ষকের সঙ্গে আমিও থাকি কারণ এই বাচ্চাগুলো হচ্ছে দামাল টাইপের। নমুনা:
পরশু স্টেশনে একটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাঁটছিলাম, এ আমার অতি সামান্য পেছনে ছিল। হঠাৎ মনে হলো কোন প্রতিউত্তর পাচ্ছি না যে। ফিরে দেখি ভোজবাজির মত এ উবে গেছে। নাই তো নাই- পরক্ষণেই একে খুঁজে পেলাম রেলগাড়ির ছাদে, দাঁত একটাও ভেতরে নেই!
তো, এই সব মহা বিচ্ছুদের সামাল দেয়াটা মাস্টারের জন্য খানিকটা কঠিন বটে।


আমি যখন এই স্কুলটার জন্য বেদম দৌড়াচ্ছি তখন কেউ কেউ আমাকে কঠিন কথার ফাঁদে ফেলতে চেয়েছেন। দুয়েকটার নমুনা দেই:
১. এইসব পিরাইল্লারা (এটা ভাল বাংলা হবে সম্ভবত বখা) কী পড়ব?
আগেও বলেছিলাম, এমনিতে আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না, কথা জড়িয়ে যায় কিন্তু প্রচন্ড রেগে গেলে খানিকটা গুছিয়ে কথা বলতে পারি। আমি শান্ত ভঙ্গিতে বললাম, খোদা-না-খাস্তা, আপনার বাচ্চা হারিয়ে কোথাও-না-কোথাও বড়ো হলে এদের মত যে হবে না এটা আপনাকে কে বলল?
মানুষটা আর রা কাড়েননি।
২. একজন আমাকে কঠিন আক্রমণ করলেন, এই স্কুল করে কি আপনারা টাকা-পয়সা নিবেন?
আমি বললাম, না।
তিনি বললেন, তাহলে আপনার লাভ কি?
আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, লাভ কি-লাভ কি। ঝড়ের গতিতে আমার মাথার তথ্যগুলো ওলটপালট হচ্ছে- আমার ফাঁকা মাথায় খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না। মনে পড়ে, আমি মানুষটাকে ইতিপূর্বে দেখেছি সিগারেট খেতে। আমি বলি, আচ্ছা, সিগারেট খেয়ে আপনার লাভ কি?
মানুষটার উত্তর, জানি না। ভাল লাগে।
আমি বলি, আমিও জানি না। ভাল লাগে।

এদের পড়ার নমুনা দেখে আমি হতভম্ব! এর মধ্যে কয়েকটাকে পেয়েছি, চুপচাপ বসে আছে। আমি বলি, পড়ো না কেন?
এরা উদাস হয়ে বলে, বই শেষ।
আমি নিশ্চিত, ফাজলামী করছে। খানিকটা টাইট দিতে হবে। উল্টাপাল্টা অক্ষর ধরে দেখলাম ঠিক ঠিক বলতে পারছে। যেটা জানা গেল এরা পূর্বেও স্কুলে পড়েছে।
কাল এদের জন্য বড়দের বই যোগাড় করতে হবে। অন্যদেরও যেটা দেখলাম, শেখার ক্ষমতা আমার মতো মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ঠ। আমি নাকি অল্পতে মুগ্ধ হই এই বিষয়ে আমার খানিকটা কুখ্যাতি আছে। বেশ, অল্পতে মুগ্ধ হন না এমন একজনকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দেখি না...।

সহায়ক লিংক:
১. অভাগাদের স্কুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post.html
২. আমাদের ইশকুল, এক: http://tinyurl.com/3xpuov5
৩. আমাদের ইশকুল, দুই: http://tinyurl.com/2fs9j4p

অভাগাদের স্কুল

কাল লিখেছিলাম, রেল-স্টেশনে স্কুলটা চালু করতে চাই আজই [১] কিন্তু সত্যি বলতে এটা আজই চালু হবে এমন দৃঢ় বিশ্বাস ছিল না।
এও এক বিচিত্র! কেমন কেমন করে এটা হলো আমি নিজেই বড়ো অবাক হচ্ছি। বিষয়টা খুব একটা সহজ ছিল না। কাল পর্যন্ত স্কুল-ঘরের নাম-নিশানা নেই, শিক্ষকের পাত্তা নেই, ছাত্রের হদিস নেই।
আগেকার লোকজনরা নাকি বেশি ক্ষেপে গেলে রাতারাতি পুকুর কেটে ফেলত, শুনেছি কিন্তু চোখে দেখিনি! তীব্র ইচ্ছা থাকলে একা-একা খেটেখুঁটে একটা স্কুল দাঁড় করানো সম্ভব এটা অন্তত জানলাম। বাহ, জানার দেখি শেষ নাই!

ক্লাশ চালাবার জন্য একটা জায়গা বড়ো জরুরি ছিল। শুনতে চমৎকার শোনায়, প্ল্যাটফরমে ক্লাশ শুরু করে দেয়া, বাস্তবে যা অশ্বডিম্ব! কারণ লোকজন যেমন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বান্দরের খেলা দেখে স্কুলের অবস্থাটাও হতো তথৈবচ- ছেলেপেলেদের লেখাপড়া শিকেয় উঠত। এটা বাদ দিলেও পুলিশ এসে দাদাগিরি দেখিয়ে হাঁকিয়ে দিলে কোথায় ছাত্র? পড়ে থাকত কেবল কিছু বাদামের খোসা।

এটারও কাকতালীয়ভাবে একটা ব্যবস্থা হয়। স্টেশনের পাশেই রেলের একটা বিল্ডিং-এ উদীচীর একটা অফিস আছে যেটার কথা আমার জানা ছিল না। ওই অফিসটা দীর্ঘকাল ধরে বন্ধ পড়ে ছিল অথচ এটায় চেয়ার-টেবিল, ছোটখাটো বইয়ের সংগ্রহসহ সবই আছে! বিনেপয়সায় এটা পাওয়া গেল।
শিক্ষকের ব্যবস্থাও হয়ে গেল। উদীচী করত ইন্টার পড়ুয়া এমন একটা মেয়ের খোঁজও পাওয়া গেল। স্বল্প সময়ে আমি যা দেখলাম, এই শিক্ষক চমৎকার করবে এবং এখানকার ছাত্ররাও।

স্টেশনে যেসব বাচ্চাদের জন্য এই স্কুল খোলার ভাবনা খেলা করেছিল এদের সবাইকে পাওয়া গেল না, কেবল ছয়জনকেই পাওয়া গেল। মুলত এরা পানি বিক্রি করে। গাড়িতে করে অনেকেই কোথাও চলে গেছে। তাছাড়া ছোট থেকে এরা বড়ো হয়েছে চারপাশে অবিশ্বাস দেখে। স্বভাবতই আমার কথাও এরা বিশ্বাস করেনি, ভেবেছে শুধুশুধু বলা হয়েছে।

এমনিতে 'পড়শী ফাউন্ডেশন'-এর স্কুলগুলোর নাম হচ্ছে, 'আমাদের ইশকুল' কিন্তু আমি এই স্কুলের নাম রেখেছি 'অভাগাদের স্কুল'। যাদের বাবা-মা-বাড়ির কোন খোঁজ নাই এদের আর কী নাম দেব? হো.মো এরশাদের 'পথকলি'?
এরশাদের মত মানুষদের জন্য না-হয় ওই নাম তোলা থাকুক। আমার মত হতভাগা অভাগাকে অভাগাই বলি- সাদাকে সাদা বলাই শ্রেয়।
আমি অল্প কথায় যেটা বুঝি, আমার সন্তানের পড়ার অধিকার থাকলে এদের থাকবে না কেন? এটাও আমি বিশ্বাস করি, এদের মধ্যে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মত একজন ড. আতিউর রহমান বের হয়ে আসবে না এটাও অবিশ্বাস করা চলে না।

*পোস্টে আমার লেখার অস্পষ্টতার কারণে সম্ভবত এই বিভ্রান্তিটা সৃষ্টি হয়েছে, এই জন্য দুঃখ প্রকাশ করি।
'অভাগাদের জন্য স্কুল' বা 'এরা অভাগা' এটা কখনই এদের কাছে শেয়ার করা হবে না, এটুকু সেন্স আমার আছে বলেই মনে করি। এই বক্তব্যটা কেবলমাত্র আমার জন্য এবং পাঠকের জন্য।


সহায়ক লিংক:
১. ন্যানো ক্রেডিট, ৬: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_31.html
WhatsApp