Thursday, December 24, 2009

অভিশাপ দেই নিজেকে

কখনও কখনও কিছু বিষয় আমাকে বিভ্রান্ত করে দেয়, ভেবাচেকা খেয়ে যাই। তীব্র ঝাঁকুনি কাবু করে ফেলে, নতুন করে ভাবতে শেখায়। ভ্রুকুঞ্চন করে আজ যে প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, আমার কাজটা কি আসলে? কেন আমার এ গ্রহে ভ্রমন? আসলাম অনিচ্ছায়, যাবো অনিচ্ছায়; মাঝের যাপিত দিনগুলোও অনিচ্ছায়। ভুল রোলে অভিনয় করে করে ক্লান্ত হয়ে গেছি, ব ক্লান্ত।
নড়বড়ে সাঁকোটা ধরে ধরে পেরিয়ে যায়
একেকটা দিন, অমসৃণ।
আমি বুঝি না, এ কী অবিচার! আমি যেখানে থাকি, এখানে কয়েক লক্ষ মানুষ বাস করে; আমি কেন! হোয়াই? এইসব যন্ত্রণার আমাকে কেন মুখোমুখি হতে হবে?

মানসিক প্রতিবন্ধী ৪ বছরের এই শিশুটি নাকি রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সমস্ত শরীরের মারের দাগ। লোকজন দু-কলম লেখালেখির সুবাদে আমাকে ধরে বসেছে পত্রিকায় নিখোঁজ সংবাদ ছাপাবার ব্যবস্থা করে দিতে। অথচ এই কাজটা এরা অনায়াসেই করতে পারে, এর সঙ্গে লেখালেখির কোন যোগসূত্র নাই। পত্রিকার সঙ্গে জড়িত জুনিয়র কিছু ছেলেপেলেকে ধরে এই ব্যবস্থা করে দিলাম।
কেউ আসেনি এই শিশুটির খোঁজে!

এখন কী? লোকজনের স্পষ্ট বক্তব্য, একে রেলস্টেশনে ছেড়ে দিয়ে আসা হোক। বলে কী! এ কি কুকুর, না বেড়াল যে দূরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসলেই হলো!

কেউ বললেন, একে রাখলে পুলিশি ঝামেলা পোহাতে হবে। এটাও নাকি বিচিত্র না, অভিযোগ উঠবে, এর কিডনি খুলে রেখে দেয়া হয়েছে।
শ্লা, এই দেশটা বড়ো বিচিত্র! কোন একজন মানুষ রাস্তায় দুর্ঘটনায় রক্তে ভাসতে থাকলেও কেউ এগিয়ে আসবে না পুলিশি ঝামেলার ভয়ে। সাহস করে কেউ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও ডাক্তার তাকে ছোঁবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না পুলিশকে ইনফর্ম করা হবে। আজিব!

থানাওয়ালা এই শিশুটির বিষয়ে কোন দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না, চাচ্ছেন না এলাকার জননেতাও। অথচ এই জননেতার নিয়ন্ত্রণে আছে সমাজ-কল্যাণ অধিদপ্তর, গন্ডায়-গন্ডায় অধিদপ্তর। এতো দপ্তর মিলে একটা শিশুর দায়িত্ব নিতে না পারলে আমরা গাদাগাদা ট্যাক্স দিচ্ছি কেন, বেহুদা।

বাস্তবতায় আবেগের স্থান কোথায়? আমার এখানে শিশুটিকে রেখে দেয়াটা চাট্টিখানি কথা না।
ঝড়ে আমার নিজের ঘর সামলাতেই আমাকে যথেষ্ঠ বেগ পেতে হচ্ছে। মানসিক প্রতিবন্ধী (খানিকটা অন্য রকম) এই শিশুটিই যখন গু-পেশাবে মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকবে বাসার লোকজনরা ক্রমশ বিরক্ত হবেন। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আমার লেখার কাগজপত্র যখন ছিঁড়ে কুটিকুটি করবে তখন আমিই কি বিরক্ত হবো না?
আমার পরিচিত মানুষরা আমাকে একজন হৃদয়হীন মানুষ হিসাবেই জানেন। এরা কখনই জানবেন না, কাঁদে সবাই; কেউ প্রকাশ্যে, কেউ বাথরুমে। কেউবা কাঁদতে পারে না, এদের মত অভাগা আর কেউ নাই!

আমি শিশুটির চোখে চোখ রাখতে চাই না, কী তীব্র সেই চোখের দৃষ্টি! তার চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা কই আমার! এইসব শিশুদের জন্য একটা হোম করতে মিলনিয়র হতে হয় না। মাসে ১০ হাজার টাকা খরচ করলে ১০/১৫ জন শিশুকে অনায়াসে রাখা যায়। আমি নতচোখে নিজেকে ধিক্কার দেই। আফসোস, আমার মত মানুষরা কেবল মুখ আর রেকটাম নিয়ে এসেছে, আর কিচ্ছু না। নিজের সীমাবদ্ধতার উপর আজ আমার দুর্দান্ত রাগ। অভিশাপ দেই নিজেকে।

অন্যদের মত মানুষ হতে
আমার ইচ্ছা করে না বুঝি। অপেক্ষায় আছি, সেই দিন কবে যেদিন আমি এই শিশুটিকে স্টেশনে ফেলে দিয়ে আসব...।

*ছবিটা উঠিয়েছে ৫ বছরের আরেক শিশু, লামিয়া। কাজটা আমার ইচ্ছাকৃত, রোবটিক যুগে তাকে কঠিন বাস্তবের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। আমার এই উত্তরাধিকারের শরীরে আমি আমার শরীরের উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে চাই। এতে আমি কতটা সফল হলাম, কি ব্যর্থ; তা
তে কিছুই আসে যায় না। অন্তত আমার চেষ্টায় কোন খাদ নাই।