Sunday, December 20, 2009

উদ্বোধক আবশ্যক

আমি থাকি পুরনো ধাঁচের একটা বাড়িতে। বাড়িটা বুড়া হয়ে গেছে, বয়স ১০০ ছুঁই ছুঁই! এই বুড়ার কাছে ফিরে আসার মায়াটা কেউ ভালো চোখে দেখেন না।
বাচ্চার মার স্পষ্ট বক্তব্য, এটা ভূতের বাড়ি। বাড়িটার ছাদ বিশাল কিন্তু তিনি যেতে আগ্রহ বোধ করেন না, ছাদে নাকি ভূত-প্রেত তাশ খেলে। কী যন্ত্রণা, খেললে খেলুক না, টাকা দিয়ে জুয়া তো আর খেলছে না! সমস্যা কোথায়!

কারা কারা নাকি ছাদেও পরীও দেখেছেন। একদিন এক গেস্ট সকালে উঠে বলছিলেন, ছাদে তিনি নাকি নুপুরের শব্দ শুনেছেন। অতএব আমার বাড়িতে তিনি আর পদকাদা (সময়টা বর্ষাকাল ছিল বিধায় পদধূলি দুর্লভ) দিতে চান না।
বেশ, কিন্তু আমি তো কোন সমস্যা দেখি না। পরী নাচলে সমস্যা কী, পরীর নাচ দেখার ভাগ্য ক-জনের হয়! আর খোদা-না-খাস্তা পরী
আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলে আমার আপত্তি করার তো কিছু দেখছি না। অবশ্য পরীরাজ্যে নেটের লাইন না-থাকলে আগ্রহ খানিকটা কমে আসবে।

আগেকার দিনে, ব্রিটিশরা বাড়ি বানাবার সময়, টাট্টিখানা-লেট্রিন-বাথরুম-টয়লেট-রেস্টরুম যে নামেই ডাকা হোক না কেন পরিচয় তো একটাই, বৃক্ষ তোমার পরিচয় কি...। তো, এটা লাগোয়া করা হতো না। বাড়ি থেকে দূরে থাকত।
এই বাড়িটাতেও এই ব্যবস্থাই ছিল। শীতের সময় বড়ো ঝামেলা হয়ে যেত। দাস্তের কথা আর বললাম না...।

বিট্রিশ সাহেবরা বাইরে লোটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করুক, আমার কী!
সালটা সম্ভবত ৮৪-৮৫ হবে। ঠিক করলাম, লাগোয়া একটা টাট্টিখানা বানাব। কষ্টেসৃষ্টে বানাবার পর মনে হলো, আমাদের দেশে উদ্বোধন করার চল চালু আছে- এই কাতারে রাস্তা, ব্রীজ হেনতেন কী নেই! একটা কিছু পেলেই হলো আর কী। তাহলে টাট্টিখানা কি দোষ করল, এর উদ্বোধন করাই সমীচীন?

আমি এটা উদ্বোধনের জন্য উদ্বোধক খুঁজতে লাগলাম। নামি-দামি মানুষের সঙ্গে পরিচয় নাই বিধায় যেনতেন একজন হলেই হয় এমন একটা ভাব। কিন্তু কেউ রাজি হলেন না। টাট্টিখানা উদ্বোধন করলেই তো হবে না, টাট্টির বেগও চাপতে হবে। যেমন চল- দস্তুরমতো কাজকাম করে উদ্বোধন করা।
এই দেশের উদ্বোধকের প্রতি আমার ভালবাসার কারণে এই ফানটা অনেকেই ভালো চোখে দেখলেন না। আশেপাশে ছড়িয়ে গেল, কারা কারা নাকি ছাদে আমাকে আকাশের সঙ্গে বাতচিত করতে
দেখেছেন। দেখতে আপত্তি নাই কিন্তু আমার গায়ে নাকি সুতাও ছিল না। শোনো কথা, সুতা থাকবে কেন, আমি কী সুতার বেপারি?

আমার দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হতো, ওহে, বঙ্গালদেশের উদ্বোধকগণ, আপনার মধ্যে এমন কেক্ক (কেহ-এর কোমল রূপ) নাই বাথরুম উদ্বোধন করে এই অভাজনের প্রতি দয়া করবেন। প্লাসিবো এবং নসিবো এই দুই বোধ-চিন্তাই নাকি মানুষকে চালায়। প্লাসিবো- পজিটিভ চিন্তাই নাকি প্রকারান্তরে মানুষকে সফল করায়, নসিবো- নেগেটিভ চিন্তা অসফল। আমার মধ্যে এখানে প্লাসিবোটা কাজ করেছে ভালই।

ওয়াল্লা, আছে-আছে, বাথরুম উদ্বোধন করার যোগ্য লোকও আছেন দেশে। দেখি বলেকয়ে রাজি করাতে পারি কিনা। ধার-দেনা করে বাথরুমটা খানিকটা অদলবদল করে 'পুনঃউদ্বোধন হইবে' এমন একটা ফলক লাগিয়ে ল্যাট্রিনে যাওয়ার জন্য লোটা ধরিয়ে দেব। স্যার ডেলিভারি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা হাততালি দেব। স্যারও বেরিয়ে ঝলমলে মুখে বলবেন, কী শান্তি! এমন উদ্বোধন করার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হয় না!
*ছবিঋণ: জাহাঙ্গীর কবির জুয়েল, ময়মনসিংহ/ প্রথম আলো