Wednesday, December 16, 2009

হে পতাকা, আমি নতজানু হয়ে ক্ষমা চাইছি


আজ বাসা ফাঁকা। সবাই গেছে বেড়াতে। সারাটা দিনই আমি আমার লেখা নিয়ে ব্যস্ত। বাসার সবার ফিরতে ফিরতে রাত।

এখন রাত বাজে সাড়ে ১০টা। আমার মেয়েটা বয়স ৫। আমার মেয়ে কানে কানে কি যেন বলার চেষ্টা করছিল। আমি চরম বিরক্ত, আমার লেখালেখি নামের জিনিসটার ব্যাঘাত ঘটছে বলে। মেয়েটা খুব নেওটা, ও বলবেই। ওর কথা শুনে আমার গা কাঁপতে থাকে। ও বলছিল, বাবা, পতাকা এখনও নামানো হয়নি।

বাসায় বিজয়দিবসে লাগানো পতাকা এখনও নামানো হয়নি! এ আমি কী করলাম! কেমন করে ভুলে গেলাম! এই অমার্জনীয় ভুলের জন্য নিজেকে চাবকাতে ইচ্ছা করছিল। এমন ভুল কেমন করে করলাম। ভাগ্যিস, আজ বাসায় কিছু মেহমান আসার কথা ছিল, আসেনি। আসলে, কী জবাব দিতাম তাদের কাছে? ওদের কাছ থেকে না-হয় বাঁচলাম কিন্তু আমি নিজের চোখেই চোখ রাখি কেমন করে।

বুড়া শেয়াল ফাঁদে পড়লে মৃত্যু ভয়ের চেয়ে লজ্জায় মরে যায়, আমিও লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম। পাশাপাশি আমার চোখ আনন্দের পানিতে ভরে গিয়েছিল। ক-দিন আগেই আমার সন্তানদের বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধিস্থলে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন এদের সঙ্গে টুকরা-টুকরা কথা হচ্ছিল: যুদ্ধ, বীরশ্রেষ্ঠ, পতাকাকে সম্মান, সূর্যাস্তের সময় নামিয়ে ফেলা ইত্যাদি। আমার মেয়েটা ঠিকই মনে রেখেছে। আমরা এই প্রজন্ম যে-ভুলগুলো করছি আগামী প্রজন্ম তা শুধরে দেবে।

আমরা চাউল বিক্রি করে কফের সিরাপ খাওয়া জাতি!

অসমসাহসি দুলা মিয়া (তাঁর প্রতি সালাম)-কে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি লিখেছিলাম, আমরা দুধ বিক্রি করে শুটকি খাওয়া জাতি। এখন বলি, আমরা চাউল বিক্রি করে কফের সিরাপ (ফেন্সিডিল) খাওয়া জাতি!

দুলা মিয়াকে নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলাম, আমার ক্ষীণ আশা ছিল, কেউ-না-কেউ এগিয়ে আসবেন। অন্তত তাঁর কবরটা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা করবেন। ক-কোটি টাকা লাগে একজন অগ্নিপুরুষের কবর চিহ্নিত করতে? কোটি লাগে না? তাহলে লাখ, বেশি হয়ে যায়? হাজার?

video

এই ভিডিও ক্লিপিংস-এর শেষে এক অখ্যাত ফকিরের সমাধি আছে। তখন আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছিলাম, দুলা মিয়ার নিচিহ্ন হয়ে যাওয়া কবরের পাশেই এই অখ্যাত ফকিরের কবর টিন-বেড়া দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।

এখন সেই অখ্যাত ফকিরের কবরটা বাঁধাই করা হচ্ছে। এটা আরও সুদৃশ্য হবে। কালে কালে এটা কোন এক বিখ্যাত মাজারে রুপান্তরিত হবে এতে আর কোন সন্দেহ নাই। হায় মাজার, রসু মিয়াদের জন্য মাজারের বড়ো প্রয়োজন!

*কথিত মাজারের ছবিঋণ: দুলাল ঘোষ
**দুলা মিয়ার ছবিঋণ (সাদা-কালো): তিতাসের কাগজ, আখাউড়া