Sunday, October 18, 2009

গুলতি দিয়ে অসম যুদ্ধ!

সালটা ৯২-৯৩। তখন ভোরের কাগজ-এ 'একালের রূপকথা' নামে ফি-হপ্তাহে নিয়মিত লিখছিলাম, বছর দেড়েক ধরে। প্রতিটা লেখার জন্য পেতাম ৫০ টাকা। মাসে হতো ২০০/ ২৫০ টাকা।
টাকাটা আমার নামে ডাকে পাঠিয়ে দিলেই হয়, বেঁচে যেতাম। কিন্তু না, এদের অফিসে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। লে বাবা, যে টাকা পাব তারচে বেশিই আসা-যাওয়াতেই খরচ হয়ে যাবে।
কী আর করা, কয়েক মাসের টাকা জমিয়ে নিতে যেতাম। 'উঠ ছুঁড়ি তোর বিয়া'-'উঠল বাঁই ঢাকা যাই' বলে গাট্টি-বোচকা নিয়ে মাসের যে-কোন দিন রওয়ানা দিলেই হবে না। নিয়মটা ছিল সম্ভবত এরকম, ২১ তারিখের পূর্বে গেলে হবে না, আবার ২৬ তারিখের পর গেলেও 'নাক্কো'-হবে না।

গেলাম তারিখ মিলিয়ে। ওয়াল্লা, গিয়ে শুনি এ মাসে হবে না, ফান্ড নাই! এইরকম কয়েকবার হওয়ার পর আমার মেজাজ খুব খারাপ হলো। যাকেই বলি, সেই বলে, করো লেখালেখি, তোমার এতো লালচ কেন? পত্রিকায় টাকা দেয় এই তো ঢের! তাছাড়া তুমি কি এই টাকা দিয়া চাউল কিনবা!

বটে রে, এটা আমাকে কেন জনে জনে বলতে হবে, এই টাকা দিয়ে আমি চাউল কিনব, নাকি বেশ্যালয়ে যাব। ফাজিলের দল, এটা আমার অধিকার-প্রাপ্য। আমার পাওনা নিয়ে কেন ভিক্ষুকের মত দাঁড়াতে হবে!

আমি এইসব নিয়ে এই পত্রিকার জন্যই কঠিন একটা লেখা লিখে বসলাম। কিন্তু জমা দেয়ার পর এই পাতার সম্পাদক বললেন, করেছেন কী! সম্পাদক ভাইয়া ক্ষেপে লাল! যান, সরি বলে আসেন।
আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম, যে অন্যায় আমি করিনি এটার জন্য কেন সরি বলব? বলব না।
মনে মনে বললাম, হুশ সম্পাদক, হুশ!

প্রায় ১ মাস পর লেখাটা হুবহু ছাপা হলো। আমার চোখ দিয়ে পানি চলে আসল। আমার মত মফস্বলের অখ্যাত একজন কলমচির জন্য বিশাল এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ এক অসাধারণ বিজয়!
পরে আর এখানে জমল না। আমার এই লেখাটা না-ছাপানোর কারণে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ ছিলাম। মানের কারণে না-ছাপানো হলে আমার বলার কিছু ছিল না কিন্তু আমাকে বলা হয়েছিল, এই লেখাটা নাকি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে!

আসলে এইসব বিজয় নামের নির্বোধ আচরণের কোন অর্থ হয় না। এইসব ছাতাফাতা কান্ডের জন্য ক্রমশ আমার লেখালেখির ক্যারিয়ার
হয়ে গেল টিফিন ক্যারিয়ার । টিফিন ক্যারিয়ার-ঝুলিতে কেবল রয়ে গেল ব্রেভহার্টের সেই বিখ্যাত সংলাপ, "কেউ-কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যায়, কেউ বিছানায়"।
... ... ...
ভোরের কাগজে এদের নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলাম:

"সহনশীল প্রাণী
ভূত অপ্রার্থিব গলায় বলল, ‘এই আবর্জনা লেখক, তোকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। ফাঁসি-টাসি না, জাস্ট একটানে মুণ্ডুটা ছিঁড়ে ফেলব।’

একজন লেখক অখ্যাত কুখ্যাত পরের কথা, কিন্তু কী সীমাহীন তার ক্ষমতা! ইচ্ছে হলেই একটা চরিত্র সৃষ্টি করে হাসায় কাঁদায়- বিষণ্নবোধ করলে মেরে ফেলে। কাল্পনিক সৃষ্টির মিছে স্রষ্টার এ সম্বোধন ভালো না লাগারই কথা। লেখক রাগ চেপে বললেন, ‘ভাই ভূত, আপনি সভ্য না অসভ্য দেশের ভূত?’
ভূত দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ‘পেটা গাইল্যা ফালামু (এটার অর্থ হবে সম্ভবত এরকম, অমানুষিক শক্তি প্রয়োগে নাড়ী ভুঁড়ি ভর্তা করে ফেলা হবে)। রাস্কেল, ইউ নো, আমার গায়ে নীল রক্ত বইছে।’

লেখক: আ বেগ য়্যু’ পার্ডন স্যার। নীল রক্ত, আপনি দেখি অতি সভ্য ভূত! তা আপনি স্যার একটু ভুল বললেন, এখন আপনার ধমনীতে নীল রক্ত দূরের কথা, লাল-সবুজ-সাদা-কালো কোনও রক্তই এক ফোঁটা বইছে না।
ভূত (জাঁক করে): ইয়েস-ইয়েস, সভ্য দেশের অতি সভ্য ভূত আমি।
লেখক: সভ্য দেশে মৃত্যুদণ্ড উঠিয়ে দেয়া হয়েছে, আপনি দিচ্ছেন, এটা কি ঠিক হচ্ছে? আর তুই-তোকারি করছেন এটাই বা কেমন কথা!
অতি সভ্য ভূত: তুই-তাই না করলে ভূতদের বাজার পড়ে যায়। কি বললি, মৃত্যুদন্ড? মানুষ নামধারী অমানুষদের বিচার করে মেরে ফেলতে হবে না, আশ্চর্য! পৃথিবীটাকে চমৎকার বানাতে গিয়ে মানুষকে নিষ্ঠুর হতে হয়। এই-ই নিয়ম।

লেখক: সার, আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা। কিছু বর্বর দেশ অবশ্য এ বিষয়ে বহু এগিয়ে আছে। এরা স্টেডিয়ামের মতো বিশাল জায়গায় উন্মুক্ত শিরচ্ছেদের ব্যবস্থা করে। রেডিও,
টেলিভিশনে আগাম ঘোষণা দিয়ে টেলিভিশনে ঘটা করে দেখানো হয়। অবশ্য এরা দয়ার সাগর, ঘোষণা দিয়ে দেয়, শিশু এবং অসুস্থ লোকজনকে যেন এ অনুষ্ঠান দেখতে না দেয়া হয়। দলে দলে লোকজন শিরচ্ছেদ দেখে। অপার আনন্দ লাভ করে।
অ. স. ভূত: ভালোই তো, অপরাধীদের জন্যে উদাহরণ সৃষ্টি হবে।

লেখক: ‘অপরাধীর পায়ের চেয়ে আইনের হাত লম্বা’ এটা অন্যভাবেও বোঝানো যায়। ভারতে অসংখ্য প্রাণ হরণকারী একজন ডাকাতকে ধরার জন্যে এক হাজার সামরিক, আধা-সামরিক কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। একে ধরতে গিয়ে এ পর্যন্ত পঁচিশ কোটি রুপী খরচ হয়েছে। ডাকাতের মাথার দাম ধরা হয়েছে চল্লিশ লাখ রুপী। একে আটকে মেরে ফেললে কি হবে? মৃত্যুর পর সবাই আনন্দ-বেদনার ঊর্ধ্বে? হেনরী শ্যারিয়ারের ‘প্যাপিলন’-এর প্যাপীকে ‘আইলস ডু স্যালুট’-এর নির্জন সেলে যে রকম আটকে রাখা হয়েছিল- ওরকম অন্ধকূপে চরম অপরাধীদের আজীবন আটকে রাখা উচিত। মাঝে মধ্যে এদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফলাও করে জানানো যেতে পারে। প্যাপীলনের মতো এদেরও সময় থেমে যাবে, মনে হবে এ কষ্ট পৃথিবীর কষ্ট না ।
অ. স. ভূত: দরিদ্র দেশগুলোর টাকা কই, ফটাফট মেরে ফেললেই তো সুবিধে?
লেখক: যে মানুষ তার মতো কাউকে সৃষ্টি করতে পারে না সে কোন অধিকারে একটা প্রাণ নষ্ট করবে। এসব থাক, এখন বলেন, আমাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দিলেন।
অ. স. ভূত: তুই না কি আমাদের নিয়ে যা-তা লিখিস, লোকজন হাসি-ঠাট্টা করে। জন নামের একজন ভূতকে নিয়ে লিখেছিস ‘রাম ছাগল ভূত’। এইসব কি, অন্তত ‘জন ছাগল ভূত’ বললেও তো পারতি। এসব ছাই ভস্ম লিখে মাল কামিয়ে লাল হচ্ছিস।

লেখক (বেদনাহত হয়ে): সার-সার, এমন কুৎসিত ভঙ্গিতে বলবেন না। লাল-নীল জানি না এরকম একটা লেখা লিখে পাই ৫০ টাকা।
অ. স. ভূত: ৫০ টাকা দিয়ে কি করিস?
লেখক: এটা তো সম্মানী, এ দিয়ে আবার কি করব, ছবির বাঁধিয়ে রাখি। এটা সম্মানী তো, বিশেষ দিনে গিয়ে নিয়ে আসতে হয়। ‘অসৌজন্য কপি’ কিনে নিজের লেখা নিজেই পড়ি। আসলে লেখকদের লিখতে হাত চুলকায়। মহাপুরুষ ব্যতীত অন্য কেউ চুলকানি উঠলে না-চুলকে পারেন না, লেখক কোন ছার। গিলোটিনে মাথা পেতে এরা লিখে যান। ভরপেট খাবার খেতে, চকচকে পোশাক পরতে এদের কখনোই ইচ্ছা করে না- নিয়ম নেই। তবে হ্যাঁ, পাঠকের ভালোবাসার কথা যদি বলেন, তখন পৃথিবীর সব বেদনা তুচ্ছ মনে হয়।"

এসব লেখালেখি, 'এসব নিয়েই' এবং এসব চালবাজি!


আমরা দূর থেকে লেখালেখির ভুবনটা দেখে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। ভুবনটা এক অদেখা স্বপ্নের ভুবন মনে হয়।

একজন লেখককে মনে হয় অন্য ভুবনের কেউ। এ ধারণার উৎস কী আমি জানি না। ভাবখানা এমন, একজন লেখক অন্য ভুবন থেকে এসে এই ভুবন উদ্ধার করবেন। চাড্ডি পরে উবু হয়ে লিখেই যাবেন। (এমনিতে চাড্ডি জিনিস আরামদায়ক কিনা জানি না তবে এটা পরে জনসমক্ষে বের হওয়াটা শোভন হবে না মনে হয়!)

তো, টাকা-পয়সার তার কাছে বাদামের খোসা, এর ব্যতয় হলেই চিড়বিড় করে বলা হবে, টাকা কেন আপনার প্রয়োজন? চাউল কিনবেন, নাকি বেশ্যালয়ে গমন করবেন?

কেন রে বাপু, তার জাগতিক কোন চাওয়া-পাওয়া থাকতে নেই! কস্মিনকালেও না, কেন?
একজন লেখালেখি করে তার ন্যূনতম চাহিদাও মেটাতে পারবেন না, কেন?
টাকা-পয়সা সংক্রান্ত কোন প্রসঙ্গ এলে চোখ ছোট করে তার দিকে তাকাতে হবে, কেন?
একজন মেথর গু ফেলার কাজ করে, একজন পেটকাটা রমজান পেট কেটে, এটাকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন কিন্তু একজন লেখালেখি করে লেখাকে পেশা হিসাবে নিয়ে বাঁচতে পারবেন না, কেন?
একজন লেখক লেংটি পরে, জ্যোস্নায় গোসল সেরে, জ্যোৎস্না কপকপ করে খেয়ে দিন কাবার করে দেবেন, কেন?

লেখক যেন তিনি-এর মত, তাকে কোন ভাবনা কাবু করার যো নেই!

জীবনানন্দ দাদার কথা ধার করে বলি:

"...কবিকে দেখে এলাম
দেখে এলাম কবিকে
...শীতের সকালে চামসে চাদরখানা ভালো করে জড়িয়ে নেয় গায়
ঘড়ি ঘড়ি মুখে একবার হাত বুলায়
মাজনহীন হলদে দাঁত কেলিয়ে একবার হাসে
মাইনাস এইট লেন্সের ভিতর আধমরা চুনো মাছের মতো দুটি চোখ:
বেঁচে আছে! না মরে?
কোনদিন যৌবনের স্বাদ পেয়েছিল? পায়নি?
...পৃথিবী থেকে আনন্দ সংগ্রহ করছে
সবাইকে ভরসার কথা শোনাচ্ছে
ভালোবাসার জয়গান করছে।"

বলছিলাম লেখালেখি ভুবনের অন্ধকার দিকের কথা।
'আলুয়া-ঝালুয়া' টাইপের একটা লেখা নিয়ে ’এসব নিয়েই’ নামে একটা উপন্যাস বের হয়েছিল ৯২ একুশে বইমেলায়। দাম্পত্য কলহ নিয়ে সরল একটা লেখা। এখনও গুছিয়ে লিখতে পারি এটা দাবী করি না আর তখন তো লিখতেই জানতাম না। দাম্পত্য কলহ দূরের কথা দাম্পত্য কী এটাই কী জানি ছাই!
কি কারণে জানি না এই বইটার কিছু রিভিউ বের হয়েছিল। কোথায়-কোথায় সবটা তো জানি না, 'রহস্য পত্রিকা' এবং 'উপমা ডাইজেস্ট' হাতের নাগালে পেয়েছিলাম।

রহস্য পত্রিকার সমালোচনায় জানলাম, এটা মুলত প্রেমের উপন্যাস। আমি আনন্দিত, বাহ, আমি দেখি প্রেমের উপন্যাস লিখতে পারি; প্রেম না-করেও (এটা আমার দাবী কিন্তু নিজেরই ঘোর সন্দেহ আছে)। যাগ গে, দাম্পত্য কলহ নিয়ে লেখাকে প্রেমের উপন্যাস বলে, বাহ,
বেশ তো!
ওই সমালোচনা পড়ে অন্তত এটা ধারণা করা চলে ভদ্রলোক শেষ-অবধি বইটা পড়ার জন্য যথেষ্ট ক্লেশ স্বীকার করেছেন। কেউ আমার বই শেষ করতে পেরেছেন এটা আমার জন্য অভিভূত হওয়ার মত একটা বিষয়!

কিন্তু 'উপমা ডাইজেস্ট'-এর সমালোচনা পড়ে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আমি নিজের প্রতি সন্দেহের চোখে তাকালাম। আমিই কী সেই ব্যক্তি যে 'এসব নিয়েই' নামের আবর্জনা সৃষ্টি করেছে?
সমালোচক ভদ্রলোক লিখেছেন: "এটি একটি উপন্যাস। বইটি লিখেছেন আলী মাহমেদ। আমরা প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছি বিভিন্ন সমস্যার দ্বারা। এ সমস্যা আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত বিদ্যমান আর এতসব সমস্যার মোকাবেলা করেই বেঁচে থাকে মানুষ। স্বপ্ন দেখে জীবনের। কখনও কোন সমস্যা আমাদের যন্ত্রণা দেয় ভীষণভাবে। আবার সেই সমস্যার সমাধান করতে পারলে আনন্দিত হই। আর এই সুখ-দু:খ, হাসি-বেদনা নিয়েই আমাদের প্রতিদিনের জীবন। এরই প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করেছেন লেখক তার এসব নিয়েই উপন্যাসে।”

লেখকের এবং বইয়ের নাম ব্যতীত এই সমালোচনার একটা অক্ষরও ৯২ সালে বুঝিনি, ২০০৯-এ এসেও! ইনশাল্লাহ, ২০৫০- এ এসেও বুঝব না।
হা হা হা। প্রকারান্তরে নিজের অতি লম্বা আয়ু চেয়ে নিলাম আর কী। হুদাহুদি, লম্বা সময় দূরের কথা জীবনটাই আমার কাছে ক্লান্তিকর! ব্লাস্টার দিয়ে পাখি শিকার করতে আমার ভাল লাগছে না। কেবল ঝুম বৃষ্টিতে আমি মরতে চাই না!


যাই হোক, আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, এই সমালোচক মহোদয় এই বইয়ের একটা লাইনও পড়েননি। অথচ এ আস্ত একটা বইয়ের সমালোচনা লিখে বসে আছে এবং যথারীতি তা ছাপাও হয়েছে। এইসব চালবাজি করে তিনি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পার করেছেন, অজস্র বইয়ের সমালোচনা লিখেছেন।
আফসোস, এরাই একজন লেখকের লেখার মান নির্ধারণ করে দেন। এরাই নিশ্চিত করেন কে লেখক, কে লেখক নন! বড় বিচিত্র দেশ
আমাদের, ততোধিক বিচিত্র এ দেশের মানুষ, তারচেয়েও বিচিত্র লেখালেখি ভুবনের মানুষ!