Sunday, June 7, 2009

মৃত্যুদন্ড- কোথাও কেউ নেই- কঠিন অভিযোগ

আমার কেবলই মনে হয়, মৃত্যুদন্ড না থাকলে আজ হয়তো বা কর্নেল তাহের নামের অগ্নিপুরুষ বেঁচে থাকতেন!
"To save just one innocent life from execution, if the lives of hundreds of criminals need to be spared, it's worth saving that one innocent life".

­
১ জুন, ২০০৯। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল ৪-এর বিচারক শুক্কুর মিয়া নামের একজনকে ফাঁসির আদেশ দিয়ে এজলাস ত্যাগ করার পরই শুক্কুর মিয়া চিৎকার করে বলতে থাকেন, "স্যার, আমি নির্দোষ, আমি কোন হত্যা করিনি"। বলেই তিনি গলায় ব্লেড চালিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন।
আমি বিশ্বাস করি, তাঁর কথায় সত্যতা প্রবল। তাঁর স্থলে আমি হলে আমিও তাই করতাম।

আমি এতো তত্ত্বজ্ঞান বুঝি না। আমার অল্প জ্ঞানে বুঝি, অদ্যাপি মানুষ প্রাণ সৃষ্টি করতে পারেনি। যদ্যপি মানুষ প্রাণ সৃষ্টি না-করতে পারবে, কোন প্রাণ সংহার করার অধিকার তার নাই। খানিকটা আরবি কপচাই: বে, শীন। ব্যস।

১৩ ডিসেম্বর, ২০০৬। ক্যালিফোর্নিয়ার San Quentin শহরের প্রাদেশিক কারাগারে ষ্ট্যানলি টুকি উইলিয়ামসের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।
তার বিরুদ্ধে ৪ জনকে হত্যার অভিযোগ ছিল। তিনি একটা সন্ত্রাসী দল গঠন করেছিলেন এটা সত্য কিন্তু বারবার বলে এসেছেন, এই নরহত্যার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। সন্ত্রসী দল গঠন করার জন্য প্রকাশ্যে কোর্টে ভুল স্বীকার করেছেন এবং তিনি যে অনুতপ্ত তা বারংবার বলেছেন।
কারাগারে বসে তিনি বাচ্চাদের জন্য বেশ কটি বই লিখেছিলেন এবং সন্ত্রাসবিরোধী প্রচুর আর্টিকেলও লিখেন।
একজন মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামীর জন্য, তাঁর মৃত্যুদন্ড কার্যকর না করার জন্য এত বেশি সংখ্যক মানুষ বিক্ষোভ করেছে এর নজির তেমন নাই! তবুও ষ্ট্যানলি টুকি উইলিয়ামস নামের মানুষটাকে মেরে ফেলা হয়।
তাঁকে বিচারক বলেছিলেন খুনের অভিযোগ স্বীকার করলে তার মৃত্যুদন্ডাদেশ বিবেচনা করা হবে। কিন্তু এই মানুষটার দৃপ্ত উত্তর ছিল, "Why should I apologize for a crime that I haven't committed".

অনেকদিন পর আবারও 'কোথাও কেউ নেই' নাটকটা দেখলাম। সেই ভালো লাগা, সেই পাক খেয়ে উঠা কষ্ট! কারাগারে বাকেরের লাশ নিতে আসা মুনার সেই পান্ডুর মুখ! চারদিকে আজান হচ্ছে, কী হাহাকার করা দৃশ্য! বুকের উপর পাথর চেপে বসে। ইচ্ছা করে বাথরুমে গিয়ে খানিকটা কেঁদে আসি!

আহা, এখন কত অখাদ্য-কুখাদ্য নাটক প্রচারিত হয়, যা দেখে গা রি-রি করে। হায়, আওলজমিতে কেবল দুর্বাঘাস! এক তৃতীয়াংশ নাটক পাতে দেয়ার মত হলেও আমার আফসোস থাকত না। কারা এগুলো বানায়, কারা দেখে আল্লামালুম। আফসানা মিমির মত লোকজনের এখন তো আবার একটা ঢং হয়েছে, দেশে নাকি পান্ডুলিপির আকাল। তো, চলো দাদাদের দেশ থেকে আমদানি করি। দাদারা কফের সিরাপ ফেন্সিডিল খাইয়ে খাইয়ে আমাদের ভাবনাগুলোও কফ-মার্কা করে ফেলেছেন। আমরা বড় অতিথিপরায়ন, কাউকে না করতে পারি না। দাদাদের কত আবদার-বায়নাক্কা, না করি কেমনে!

কালেভদ্রেও, কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়া 'কোথাও কেউ নেই' প্রচার করে না, করেনি। আমি এই নাটকের কপি যোগাড় করেছিলাম অনেক যন্ত্রণা করে। সম্ভবত ভিসিআর ক্যাসেটের ফরম্যাটে ছিল, ওখান থেকে সিডিতে কপি করা হয়েছে। যাচ্ছেতাই রেকডিং, তবুও আমার আনন্দের শেষ নাই। দুম করে অনেক কটা বছর বয়স কমে গেল।

আমি জানি না এইসব ক্লাসিক নাটকগুলোর কোন ব্যাকআপ আমাদের আপৎকালীন আর্কাইভে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে কিনা? অলুক্ষণে কথাটা বলতে চাচ্ছিলাম না- ধারণা করি, নাই। অন্ততপক্ষে চেষ্টাটাও নাই, অদ্যাবদি এমন কোন নমুনা চোখে পড়েছে বলে তো মনে পড়ে না! আমাদের কিছু অদ্ভুতদর্শন ভাবনা আছে, সবই অদৃষ্টলিপির উপর চাপিয়ে দেই, এই অদূরদর্শীতা আমাদের রক্তে খেলা করে।

'কোথাও কেউ নেই' নাটকটা ঠিক কত সালে প্রচারিত হয়েছিল আমার মনে নাই। এখন আবার দেখতে গিয়ে প্রসঙ্গটা মনে পড়ল।
সালটা ৯২। তখন আমি 'ভোরের কাগজে 'একালের রূপকথা' নামে ফি-হপ্তাহে একটা করে লেখা লিখি। পাতাটা দেখতেন সঞ্জীব চৌধুরী। একদিন সঞ্জীবদা বললেন, 'একজন পাঠক আপনার "শাসক" লেখাটা নিয়ে কঠিন একটা চিঠি পাঠিয়েছেন। তিনি আপনার বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উত্থাপন করেছেন'।
চোর-চোট্টায় দেশটা ভরে গেছে, আমিও এই দেশেই বসবাস করি। আমি 'বেহেস্তের বড়ি পাতা' এমন জোর দাবিও করি না কিন্তু কি চুরি করে বমাল ধরা পড়লাম এটা জানা প্রয়োজন।


এমনিতে আমার রাগের পাশাপাশি খানিকটা আনন্দও হলো। আমার ধারণা ছিল, এ দেশে 'একালের রূপকথা'-র একজনই পাঠক, আমি নিজে। দেয়ালে ঠ্যাং তুলে নিজের লেখা নিজেই পড়ি। ওয়াল্লা, এখন দেখছি আরেকজন পাঠেও আছেন। 'একালের রূপকথা'' নামের আবর্জনায় তিনি কেবল চোখ বুলিয়েই দায় সারেন না, খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ভুলও বের করেন। বাহ, বেশ তো!
আমি
সঞ্জীবদাকে বললাম, 'অভিযোগটা কী রকম'?
সঞ্জীবদা টেবিলে তাল ঠুকে বললেন, 'আপনি "শাসক"-এ সোডিয়াম লাইটের যে প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন তা নাকি "কোথাও কেউ নেই"-এ আছে'।
আমি চেপে রাখা শ্বাস ছাড়লাম। আচ্ছা, এই তাহলে কাহিনি!

ঘটনাটা হচ্ছে এইরকম। "কোথাও কেউ নেই"-এ কোর্টের একটা দৃশ্য থাকে এরকম। একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন, খুন করার সময় বাকেরের গায়ে তিনি লালচে টাইপের চাদর দেখেছেন। উকিল হুমায়ূন ফরিদি এই মিথ্যা সাক্ষ্য তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। রাস্তায় সোডিয়াম লাইট ছিল বিধায় লালচে বা মেরুন কালারের চাদর কুচকুচে কালো দেখা যাওয়ার কথা। 

কিন্তু "শাসক" লেখাটায় এই প্রসঙ্গটা আছে কিন্তু অন্য রকম। নতুন রাজা একদিন গভীর রাতে ছদ্মবেশে শহর দেখতে বেরুলেন। প্রথমেই বিরক্তিতে মন ছেয়ে গেল। রাজা বিড়বিড় করছেন: "এরা শহরে কী জঘন্য রঙের বাতি লাগিয়েছে (সোডিয়াম লাইট)। টকটকে লাল রঙের আলখেল্লা গায়ে দিয়ে বেরিয়েছেন অথচ কুচকুচে কালো দেখাচ্ছে। এই ফাজলামীর মানে কী"!

আমি হিসাব করে বের করেছিলাম, "শাসক" লেখাটা ছাপা হয়েছিল নাটকের ওই অংশটুকু প্রচারের পূর্বে। এবং "কোথাও কেউ নেই" মূল পান্ডুলিপিতে (বইয়ে) কোথাও এই প্রসঙ্গের উল্লেখ ছিল না। নাট্যকার (হুমায়ূন আহমেদ) পরে এই অংশটুকু কাহিনির প্রয়োজনে যোগ করেছিলেন। একটার সঙ্গে অন্যটা মিলে যাওয়া স্রেফ কাকতালীয়!

"শাসক"-এ যে প্রসঙ্গটা ব্যবহার করেছিলাম- বিষয়টা আসলে আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। রাতের ঢাকায় এক বন্ধুর সঙ্গে রিকশায় ঘুরতে বেরিয়েছি। বন্ধুটি শস্তা রসিকতার অংশ হিসাবে বললেন, কালো শার্টে তোমায় মানিয়েছে ভাল। তোমার চামড়ার সঙ্গে ভালই মিশ খেয়েছে।
আমি খানিকটা ধন্ধে পড়ে গেলাম। বিষয় কী? এই মহতরমার কথায় বুকে কষ্ট পাক খেয়ে ওঠে, মহিলা মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয় কেমন করে! লাল শার্টকে কালো বলছেন কেন? কষ্ট চেপে ভাল করে লক্ষ করে দেখি, লাল শার্ট আর লাল নাই; কুচকুচে কালো দেখাচ্ছে।


সহায়ক সূত্র:
১. শাসক: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_03.html
২. ছবি সূত্র: http://activistchat.com/phpBB2/viewtopic.php?p=31512